জুলিও কুরি শান্তি পদক: বঙ্গবন্ধুই আনেন প্রথম বৈশ্বিক সম্মান

জুলিও কুরি শান্তি পদক: বঙ্গবন্ধুই আনেন প্রথম বৈশ্বিক সম্মান

বিশ্ব শান্তি পরিষদ প্রদত্ত ‘জুলিও কুরি’ শান্তিপদক ছিল জাতির পিতার কর্মের স্বীকৃতি। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার অবদানের মূল্যায়ন। জুলিও কুরি পদকপ্রাপ্তি ছিল বাংলাদেশের জন্য প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সম্মান। এ মহান অর্জনের ফলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু থেকে হয়েছেন বিশ্ববন্ধু। সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য এ পদক ছিল বিরাট এক সাফল্য। এ পদকপ্রাপ্তি আন্তর্জাতিক বিশ্বে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। বাংলাদেশকে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার দ্রুত স্বীকৃতি পেতে বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি পদকপ্রাপ্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

“বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।” ২৩ মে ১৯৭৩, ঢাকায় আয়োজিত আন্তর্জাতিক বিশ্ব শান্তি পরিষদের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ পদক প্রদান করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শান্তি পরিষদের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে কথাটি বলেছিলেন বিশ্ব শান্তি পরিষদের সে সময়ের মহাসচিব শ্রী রমেশ চন্দ্র। সেদিন থেকেই বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃতি পায় বিশ্ববন্ধু হিসেবে।

বিশ্ববিখ্যাত নোবেল বিজয়ী দম্পতি বিজ্ঞানী ম্যারি কুরি ও পিয়েরে কুরি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় রেখেছেন অসামান্য অবদান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় হাসপাতালগুলোতে যখন চিকিৎসার জন্য এক্স-রে সরঞ্জামাদির ঘাটতি দেখা দেয় তখন তারা ২২০টি রেডিওলজি স্টেশন গঠন করে প্রায় ১০ লাখ যুদ্ধাহত মানুষকে এক্স-রে করতে সাহায্য করেন।

তাদের এই অসামান্য অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৯৫০ সাল থেকে বিশ্ব শান্তি পরিষদ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বা অঞ্চলে ফ্যাসিবাদ কিংবা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন, মানবতার কল্যাণে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তাদের কর্মকে স্বীকৃতি দিতে বরণীয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদকে সম্মানিত করে আসছে।

১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে চিলির রাজধানী সান্টিয়াগোতে বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্সিয়াল কমিটির সভায় বাঙালি জাতির মুক্তি আন্দোলন এবং বিশ্ব শান্তির সপক্ষে বঙ্গবন্ধুর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদক প্রদানের প্রস্তাব উপস্থাপিত হয় এবং পৃথিবীর ১৪০টি দেশের শান্তি পরিষদের ২০০ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকে সর্বসম্মতিক্রমে জুলিও কুরি শান্তি পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্তি ছিল তার সারা জীবনের লড়াই-সংগ্রামের ফসল। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন ও মানবতার জন্য বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বঙ্গবন্ধুকে এই আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ পদক প্রদান করা হয়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিদের ওপর অন্যায়-অত্যাচার, নির্যাতন-নিপীড়ন বঙ্গবন্ধু শুরু থেকেই মেনে নিতে পারেননি। আর যখন বাংলা ভাষার ওপর প্রথম আঘাত আসে তখনই তিনি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ১৯৪৮ সালেই পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয়-দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনে বিজয় লাভ করাসহ বাঙালির ন্যায়সংগত প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন।

এরই ধারাবাহিকতায় বাংলার সংখ্যাগরিষ্ট জনগণের নির্বাচিত নেতা হিসেবে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন-

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

৭ মার্চের ভাষণই মূলত স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি শুধু স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন-

“এটাই আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।”

দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ শেষে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। ‘সবার প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বৈরিতা নয়’- এই মতবাদে পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বের ক্ষমতাধর নেতৃত্বকে উদ্দেশ করে বলেন-

“পৃথিবীর বৃহত্তম শক্তি যে অর্থ ব্যয় করে মানুষ মারার অস্ত্র তৈরি করছে, সেই অর্থ গরিব দেশগুলোকে সাহায্য দিলে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে।”

তখনকার সময়ে অস্থির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শান্তি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।২৩ মে, ১৯৭৩ ঐতিহাসিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, ঢাকায় আয়োজিত আন্তর্জাতিক শান্তি পরিষদ সম্মেলনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের উন্মুক্ত প্লাজায় বিশ্ব শান্তি পরিষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর হাতে পদক তুলে দেয়া হয়। পদক পেয়ে সম্মানিত হয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন-

“যে পটভূমিতে আপনারা বিশ্ব শান্তি আন্দোলনের সহকর্মী প্রতিনিধিরা আমাকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদকে ভূষিত করেছেন। এই সম্মান কোনো ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়। এ সম্মান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের আত্মদানকারী শহীদদের, স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানীদের, ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদক সমগ্র বাঙালি জাতির। এটা আমার দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের। বাংলাদেশের চরম দুঃসময়ে বিশ্ব শান্তি পরিষদ যেমন আমাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন, এদেশের মানুষও ঠিক একইভাবে বিশ্বশান্তি আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে এসেছেন।”

তিনি আরও বলেন-

“আমি ১৯৫২ সালে পিকিংয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলীয় শান্তি সম্মেলনের একজন প্রতিনিধি ছিলাম। বিশ্বশান্তি পরিষদের ১৯৫৬ সালের স্টকহোম সম্মেলনেও আমি যোগ দিয়েছিলাম। একই সাথে এটাও আমি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে চাই, বিশ্ব শান্তি আমার জীবনদর্শনের মূলনীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, শান্তি ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যেকোনো স্থানেই হোক না কেন, তাদের সাথে আমি রয়েছি। আমরা চাই বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।”

বিশ্বের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোচ্চ পদক হলো ‘জুলিও কুরি’ পদক। বিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তিগণ যারা নিজদেশ কিংবা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তারাই কেবল এ পুরস্কার পেয়ে থাকেন। বঙ্গবন্ধু ছাড়াও এ বিরল সম্মান অর্জন করেছেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, ভিয়েতনামের হো চি মিন, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, চিলির সালভেদর আলেন্দে, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, মাদার তেরেসা, চিলির কবি ও রাজনীতিবিদ পাবলো নেরুদা, যুক্তরাষ্ট্রের মার্টিন লুথার কিং, সোভিয়েত ইউনিয়নের লিওনিদ ব্রেজনেভসহ আরও কিছু বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তি।

বিশ্ব শান্তি পরিষদ প্রদত্ত ‘জুলিও কুরি’ শান্তিপদক ছিল জাতির পিতার কর্মের স্বীকৃতি। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার অবদানের মূল্যায়ন। জুলিও কুরি পদকপ্রাপ্তি ছিল বাংলাদেশের জন্য প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সম্মান। এ মহান অর্জনের ফলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু থেকে হয়েছেন বিশ্ববন্ধু। সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য এ পদক ছিল বিরাট এক সাফল্য। এ পদকপ্রাপ্তি আন্তর্জাতিক বিশ্বে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। বাংলাদেশকে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার দ্রুত স্বীকৃতি পেতে বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি পদকপ্রাপ্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

যতদিন বিশ্বে জাতি, সম্প্রদায়, ধর্মে-বর্ণের সংঘাত তৈরি হবে ততদিনই বঙ্গবন্ধুর দর্শন, কর্ম, আদর্শ ও মানবতাবোধ অসহায় মানুষের কাছে প্রেরণা হয়ে শক্তি জোগাবে। তিনি তার কর্ম দিয়ে হাজার বছর মানুষের মাঝে শক্তি হয়ে থাকবেন। আজ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্তির ৪৮তম বার্ষিকী। এই দিনে বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, মহান স্বাধীনতার স্থপতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি রইল অবনত মস্তকে বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

[email protected]

আরও পড়ুন:
গতির উন্মাদনায় কত প্রাণ ঝরবে?
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া

শেয়ার করুন

মন্তব্য

একুশ দফা-ছয় দফা ও স্বাধীনতা

একুশ দফা-ছয় দফা ও স্বাধীনতা

বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় ছিল বাঙালির আর্থসামাজিক মুক্তি। তিনি নির্বাচনি প্রচারে ২১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে থাকেন। তার লক্ষ্য ছিল- এ কর্মসূচিকে জনগণের কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে। আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় না-ও থাকে, তাহলেও যেন ২১ দফা কর্মসূচি কেউ অস্বীকার করতে না পারে।

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও ২১ দফা একসঙ্গে উচ্চারিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ৭ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে পাকিস্তান আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা রাখা দল মুসলিম লীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। কয়েকটি দলের যুক্তফ্রন্টকে সে সময় হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট হিসেবেও অভিহিত করা হতো। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ব্রিটিশ আমলে একাধিকবার অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও এ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৪৬ সালে। এর আগে শেরেবাংলার মন্ত্রিসভাতেও তিনি ছিলেন।

১৯৩৮ সালে দুজনে এসেছিলেন গোপালগঞ্জে, যেখানে ১৮ বছর বয়সী মুজিবকে দেখে মুগ্ধ হন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর টাঙ্গাইলের একটি আসন থেকে পূর্ববঙ্গ আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার নানা কূটকৌশল করে তার সদস্যপদ খারিজ করে দেয়। পরে আর কখনও তিনি পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হননি। কিন্তু যেকোনো নির্বাচনের প্রচারকাজে তার অংশগ্রহণ অপরিহার্য বিবেচিত হতো। তিনি জনগণকে উদ্বুদ্ধ, অনুপ্রাণিত করতে পারতেন।

যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলোর প্রার্থীরা প্রত্যেকেই চেয়েছেন এই তিন জনপ্রিয় নেতা তাদের আসনে যেন প্রচারকাজের জন্য যান। সে সময় ৩৪ বছর বয়স্ক শেখ মুজিবকেও তারা চাইতেন নিজ নিজ এলাকায় বক্তা হিসেবে।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আন্দোলনের পর থেকে মুসলিম লীগের পায়ের নিচে মাটি ছিল না। তারা হয়ে পড়ে জনধিক্কৃত দল। আওয়ামী লীগ তখন দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে। তরুণ শেখ মুজিব বারবার সভা-সমাবেশ করছেন জেলা ও মহকুমাগুলোতে।

আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের পাশাপাশি ছাত্রলীগের সংগঠন শক্তিশালী করার প্রতিও তার নজর ছিল। ভাষা আন্দোলনের কারণে ছাত্রসমাজের ওপর জনগণের আস্থা ও মর্যাদা ছিল আকাশছোঁয়া। যুক্তফ্রন্টের পক্ষে নির্বাচনের প্রচারে তারা বড় ভূমিকা রাখবে, এটা বোঝা যাচ্ছিল।

মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, গণতন্ত্রী পার্টি, শেরেবাংলার কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলামী ও কমিউনিস্ট পার্টি প্রভৃতি দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনের জনদাবি ছিল। তবে নেজামে ইসলামীর নেতারা কমিউনিস্ট পার্টিকে যুক্তফ্রন্টে নেয়া চলবে না- এ শর্ত দিলেন এবং শেরেবাংলা দৃঢ়ভাবে তাদের পক্ষে দাঁড়ালেন।

মুসলিম লীগ নির্বাচনে হেরে যাবে, জনমনে এ ধারণা ছিল। এ দলের অনেক নেতাও সেটা বুঝতেন। তারা যুক্তফ্রন্টের বিভিন্ন দলে নাম লেখাতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু আদর্শভিত্তিক ঐক্যের পক্ষে ছিলেন। কেবল মুসলিম লীগকে হারাতে হবে, এর মধ্যেই সীমিত থাকতে চাননি তিনি। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে লিখেছেন-

‘ক্ষমতায় যাওয়া যেতে পারে, তবে জনসাধারণের জন্য কিছু করা সম্ভব হবে না, আর এ ক্ষমতা বেশি দিন থাকবেও না। যেখানে আদর্শের মিল নাই, সেখানে ঐক্যও বেশি দিন থাকে না।’ [পৃষ্ঠা ২৫০]

তিনি আরও লিখেছেন-

‘আমি চেষ্টা করতে লাগলাম যাতে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে যুক্তফ্রন্ট চলে। দুই দিন না যেতেই খেলা শুরু হল। নামও শুনি নাই এমন দলের আবির্ভাব হল।’ [পৃষ্ঠা ২৫২]

যুক্তফ্রন্টের কর্মসূচি নির্ধারিত হয় ২১ দফা। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে আরও জানাচ্ছেন-

‘আবুল মনসুর আহমদ বিচক্ষণ লোক সন্দেহ নাই। তিনি ব্যাপারটি বুঝতে পারলেন এবং তাড়াতাড়ি কফিলউদ্দিন চৌধুরীর সাহায্যে একুশ দফা প্রোগ্রামে দস্তখত করিয়ে নিলেন হক সাহেবকে দিয়ে। তাতে আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসন, বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা, রাজবন্দিদের মুক্তি এবং আরও কতকগুলি দাবি মেনে নেওয়া হল। আমরা যারা এ দেশের রাজনীতির সাথে জড়িত আছি তারা জানি, এই দস্তখতের কোনো অর্থ নাই অনেকের কাছে।’ [পৃষ্ঠা ২৫১]

বঙ্গবন্ধু ছাত্রজীবন থেকেই মহৎ কিছু লক্ষ্য সামনে রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালনা করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র সাড়ে চার মাসের মধ্যে তিনি ছাত্রলীগ গঠন করেন। সে সময় তার বয়স ২৮ বছরও পূর্ণ হয়নি। কিন্তু বুঝতে পারেন, পাকিস্তানের ক্ষমতায় যারা বসেছে তারা পূর্ব বাংলাকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দমিয়ে রাখতে চাইছে। এমনকি মাতৃভাষার অধিকারও কেড়ে নিতে চায়। উর্দু চাপিয়ে দেয়া হলে চাকরি ও ব্যবসায় বাঙালিরা দারুণভাবে পিছিয়ে পড়বে।

২১ দফায় এসব দাবি স্থান পায়। কিন্তু শেরেবাংলার দল কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং নেজামে ইসলামীর মতো দল কেবল ক্ষমতা চাইছিল- মুসলিম লীগের পরিবর্তে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা হলেই তারা খুশি। মন্ত্রী-এমপিরা প্রোটোকল সুবিধা পাবে, ব্যবসা করতে পারবে, লাইসেন্স-পারমিটে অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় ছিল বাঙালির আর্থসামাজিক মুক্তি। তিনি নির্বাচনি প্রচারে ২১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে থাকেন। তার লক্ষ্য ছিল- এ কর্মসূচিকে জনগণের কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে। আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় না-ও থাকে, তাহলেও যেন ২১ দফা কর্মসূচি কেউ অস্বীকার করতে না পারে।

তিনি লিখেছেন-

‘কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল জানেন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসনের জন্য জনমত সৃষ্টি করেছে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিন বেড়ে চলেছে- চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মিলিটারিতে বাঙালিদের স্থান দেওয়া হচ্ছে না- এ সম্বন্ধে আওয়ালী লীগ সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে কতগুলি প্রচারপত্র ছাপিয়ে বিলি করেছে সমস্ত দেশে। সমস্ত পূর্ব বাংলায় গানের মারফতে গ্রাম্য লোক কবিরা প্রচারে নেমেছেন।’ [পৃষ্ঠা ২৫৮]

বঙ্গবন্ধুর আশঙ্কা যথার্থ প্রমাণিত হয়েছিল- যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠনের মাস দুয়েকের মধ্যেই তা ভেঙে দিয়ে গভর্নরের শাসন জারি করা হয়। রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক জনগণকে প্রতিবাদের ডাক দেননি। শত শত নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। মন্ত্রীদের মধ্যে গ্রেপ্তার কেবল কনিষ্ঠতম সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে দুঃখ করে লিখেছেন-

‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনো দিন একসাথে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।’ [পৃষ্ঠা ২৭৩]

পরের বছরগুলোতে তিনি স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে আরও সোচ্চার হন। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠিত হলে নতুন করে স্বায়ত্তশাসনের ইস্যু সামনে আসে।

১৯৫৭ সালের এপ্রিল মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মহিউদ্দিন আহমদ ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের উদ্যোগে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভায় স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব পাস হয়। এ আলোচনায় অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু ‘পাকিস্তানে দুই অর্থনীতি’ বা টু ইকোনমি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি দলীয় সংগঠনের কাজে বেশি করে সময় দেয়ার জন্য আতাউর রহমানের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। দলের স্বার্থে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ- এমন নজির পাকিস্তানে নেই, বিশ্বেও বিরল।

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়। পরের বছর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। সর্বমহলে ধারণা ছিল নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হবে এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হবেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এটা ঠেকাতেই সামরিক শাসন জারি করা হয়।

এ ঘটনায় বঙ্গবন্ধু শিক্ষা নেন। তিনি ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের ক্ষমতার দুর্গ শহর হিসেবে পরিচিত লাহোরে বসে স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানকে এ কর্মসূচি উত্থাপনের জন্য বঙ্গবন্ধু অনুরোধ করলে তিনি বলেছিলেন, ‘মজিবর মিয়া, এ কর্মসূচি দিলে আমিও ফাঁসিতে ঝুলব, তোমাকেও লটকাবে।’

কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন অদম্য। তার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। তিনি ২১ দফার ১৯ দফায় স্বায়ত্তশাসনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব থেকে মৌলিকভাবে সরে আসেন।

২১ দফায় ছিল- ঐতিহাসিক লাহোর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক এবং মুদ্রাব্যবস্থা ছাড়া অন্য সব বিষয়ে পূর্ব বাংলার স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা। প্রতিরক্ষা বিষয়েও কেন্দ্রে যেমন থাকবে ‘নেভি হেডকোয়ার্টার্স’ এবং পূর্ববঙ্গকে অস্ত্রের ব্যাপারে স্বনির্ভর করার জন্য তেমনি পূর্ববঙ্গে হবে ‘অস্ত্র কারখানা’ প্রতিষ্ঠা। আনসারদের পুরোপুরি সৈনিকরূপে স্বীকৃতি।

ছয় দফায় বঙ্গবন্ধু অর্থ কেন্দ্রের হাত থেকে প্রদেশ বা রাজ্যের হাতে নিয়ে আসার কথা বলেন। তিনি বলেন, দুটি প্রদেশে পৃথক মুদ্রা থাকবে। অথবা এক মুদ্রা হবে, কিন্তু দুই প্রদেশে থাকবে দুটি রিজার্ভ ব্যাংক। এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে মুদ্রা পাচার বন্ধ করা হবে। রাজস্ব ধার্য ও আদায়র ক্ষমতা থাকবে প্রদেশের হাতে। প্রতিটি প্রদেশ যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে তার নিয়ন্ত্রণ রাখার ব্যবস্থা তাদের হাতেই থাকবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেছেন, ছয় দফা বলবৎ হলে পাকিস্তানে এমনকি শিথিল ফেডারেশনও অসম্ভব ছিল।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে ছয় দফার প্রশ্নে গণভোট ঘোষণা করেন এবং জনগণ তাকে ম্যান্ডেট প্রদান করে। পাকিস্তানিরা এ ম্যান্ডেট মানতে অস্বীকার করে এবং গণহত্যা চাপিয়ে দেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং জনগণ তার কথামতো ‘যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করে’ স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
গতির উন্মাদনায় কত প্রাণ ঝরবে?
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া

শেয়ার করুন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে এখনই ভাবা জরুরি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে এখনই ভাবা জরুরি

করোনার এই সময়ে শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পড়াশোনার সীমিত সুযোগ পেলেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা একেবারেই বঞ্চিত। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। আর আমাদের দেশে এই ভার্চুয়াল পড়াশোনা দিয়েও কাজের কাজ কিছুই হয় না।

গেল ১৫ মাস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ছে দফায় দফায়। আবারও ছুটি বেড়েছে ৩০ জুন পর্যন্ত। এখনও বোঝা যাচ্ছে না, কবে নাগাদ প্রতিষ্ঠানের ফটক খুলবে। এই মহামারিতে অন্য সব প্রতিষ্ঠানের বিক্ষিপ্ত ক্ষতি হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে অপরিমেয়। দীর্ঘ সময় স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে বেসরকারি, প্রাইভেট স্কুল এবং কলেজগুলো মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে। এখানে কর্মরতরা প্রচুর আর্থিক ক্ষতির মুখে, শহর থেকে গ্রামে ছোটাছুটি করেও টিকে থাকতে পারছেন না। কেউ হয়েছেন ফলের দোকানদার, কেউ মুদি, কেউবা চায়ের দোকানদার, কেউ দিয়েছেন লন্ড্রি। কেউ আদি পেশা কৃষিতে ফিরে গেছেন।

আবার কেউবা বেঁচে আছেন অন্যের দাক্ষিণ্যে। বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনে অমানিশার কালো মেঘ জমেছে, আর্থিক দৈন্যে ছোট হতে হতে মিশে যেতে বসেছে মাটির সঙ্গে। তবে অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, রাষ্ট্র কারো দায় নেয়নি, পায়নি কেউ কোনো প্রণোদনা। করোনা পুরোপুরি বিনাশ হলেও কিছু প্রতিষ্ঠান আর কোনো দিনও আলোর মুখ দেখবে না বললে অত্যুক্তি হবে না।

অপরদিকে এই বন্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় অর্থনৈতিক ক্ষতির মারাত্মক দিকটির সঙ্গে চার কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনও ডুবে আছে অন্ধকারে, যা কোনো অর্থমূল্যেই শোধ হবে না।

ইউনিসেফের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা ১৪টি দেশের একটি বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বহুমাত্রিক প্রভাবে ছিন্নভিন্ন হতে বসেছে দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে একটি শিক্ষাবর্ষের পুরোটাই হারিয়ে গেছে। আরেকটি বর্ষও হারিয়ে যাওয়ার পথে। গবেষণায় এসেছে, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আর কখনোই পড়াশোনায় ফিরবে না। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের দুটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে।

একটি কারণ দীর্ঘ শিখন বিরতির ফলে পাঠ না পারা ও বোঝার পরিস্থিতি এবং অপর সম্ভাব্যটি দারিদ্র্যের কশাঘাতে নিপতিত হয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজে ভিড়ে যাওয়া। বিশেষ করে মাধ্যমিকে ঝরে পড়াদের ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটতে পারে। আর ঝরে পড়া এসব শিক্ষার্থীর মেয়েশিশুদের বিয়ে হয়ে যেতে পারে। দেশে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রমের মতো বিষয়গুলো আগে থেকেই প্রকট ছিল, করোনার কারণে তা ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

আবার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা শেষ না হওয়ায় কর্মজীবনে প্রবেশ করতে না পেরে তীব্র হতাশায় ভুগছে অনেকেই।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জনসংখ্যার বড় অংশকে গণটিকার আওতায় না আনা পর্যন্ত করোনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। সেটা দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, মহামারি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত শিক্ষাক্ষেত্রে কী হবে?
কঠিন এ প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর জানা না থাকলে অবশ্যই উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষার বহুমাত্রিক ক্ষতির সমাধানে আর সময়ক্ষেপণ করা যাবে না। ক্ষতি যা হওয়ার তা আর কোনোক্রমেই বাড়তে দেয়া যায় না।
করোনার এই সময়ে শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পড়াশোনার সীমিত সুযোগ পেলেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা একেবারেই বঞ্চিত। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। আর আমাদের দেশে এই ভার্চুয়াল পড়াশোনা দিয়েও কাজের কাজ কিছুই হয় না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঘরবন্দি শিক্ষার্থীদের শুধু যে পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে তা-ই নয়, পাশাপাশি শারীরিক এবং মানসিক বিকাশও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। ছোট থেকে বড় প্রায় সবাই ভার্চুয়াল জগতে আসক্ত হয়ে পড়ছে, আসক্ত হচ্ছে মাদকেও।

মনোযোগ হারাচ্ছে পড়াশোনায়। বিষণ্ণতা, একাকিত্ব, উদ্বেগ আর মানসিক চাপে শিক্ষার্থীরা হারিয়ে ফেলছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। এমনকি আত্মহত্যা এবং আত্মহত্যা-প্রবণতার মতো মানসিক ব্যাধিও লক্ষ করা যাচ্ছে। অর্থনীতির চাকা চালু রাখার পাশাপাশি শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, আচরণগত পরিবর্তনের কারণে মহামারি পরবর্তী জীবনেও খাপ খাইয়ে নিতে মারাত্মক অসুবিধার সৃষ্টি হবে।
শিক্ষার্থীদের সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশে পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উভয়েরই সমান দায়িত্ব এবং গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমানে পরিবারের কাঁধে পুরো দায়িত্ব এসে পড়ায় পরিবারগুলো এককভাবে এই গুরুদায়িত্ব পালনে হোঁচট খাচ্ছে। শিক্ষার বহুমুখী ইতিবাচক দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সামাজিকীকরণ।

একটি শিশু সামাজিকভাবে গড়ে না উঠলে সে যত বড় বিদ্বানই হোক না কেন, সংকীর্ণতার ঘেরাটোপে বন্দি থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সামাজিকীকরণের জায়গায় পরিবারগুলোও ব্যর্থ হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে অতিরিক্ত চাপে পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তাকে সাথি করেই পথ চলতে হবে। সেটাই হবে নতুন স্বাভাবিক জীবন। ইতোমধ্যে অন্য খাতগুলো শুরু হয়েছে শুধু শিক্ষা খাত ছাড়া। হাটবাজার, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণপরিবহন সবই খুলে দেয়া হয়েছে। বিয়েসহ সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতাও বন্ধ নেই। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটছে না। ঝড় এলে উটপাখির মতো বালুতে মাথা না গুঁজে বরং ঝড়ের মোকাবিলা করাটাই যুক্তিযুক্ত।

অনির্দিষ্ট সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না রেখে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। করোনাকে সঙ্গে নিয়েই ঠিক করতে হবে কর্মপরিকল্পনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে একসঙ্গে না খুলে বরং ধাপে ধাপে খুলতে হবে। যেসব এলাকায় সংক্রমণ নেই বা কম, সেসব এলাকায় পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আধুনিক সভ্যতার প্রধানতম ভিত্তি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষক

আরও পড়ুন:
গতির উন্মাদনায় কত প্রাণ ঝরবে?
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া

শেয়ার করুন

এসডিজি অর্জনে সাফল্য

এসডিজি অর্জনে সাফল্য

২০১৫ সালে এসডিজি গৃহীত হওয়ার পর এই প্রথম এর সূচকের স্কোর আগের বছরের চেয়ে কমে গেছে। এর কারণ হলো কোভিড মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া। বিশ্বের অপরাপর দেশের মতো বাংলাদেশও কোভিড মোকাবিলায় কঠিন সময় পার করছে। এর মধ্যেও বাংলাদেশ অনেক সামাজিক সূচকেই ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে।

খুন, নারী নির্যাতন, গুম, কোভিডে মৃত্যু, ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়ম ইত্যাদি নানা নেতিবাচক খবরের ভিড়ে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো একটা খবর। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বিশ্বের যে তিনটি দেশ সবচেয়ে এগিয়ে আছে, এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্কের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৫ জুন এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের এই সাফল্যের খবর অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এসডিজি অর্জনে এগিয়ে থাকা বাকি দুটি দেশ হলো আফগানিস্তান ও আইভরিকোস্ট। এর মধ্যে আফগানিস্তানের নাম থাকাটা একটা বিস্ময়।

যুদ্ধবিধ্বস্ত জঙ্গিকবলিত দেশটিতে দশকের পর দশক ধরে চলছে চরম নিরাপত্তা সংকট। জঙ্গিদের আত্মঘাতী বোমা হামলা এখনও দেশটির নিয়মিত দৃশ্য। এর মধ্যেও এসডিজি অর্জনে আফগানিস্তানের সাফল্য উন্নয়ন গবেষকদের কাছে যথেষ্ট বিস্ময়ের।

যাহোক, এসডিজির ক্ষেত্রে অগ্রগতির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ মহামারির কারণে নির্ধারিত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

২০১৫ সালে এসডিজি গৃহীত হওয়ার পর এই প্রথম এর সূচকের স্কোর আগের বছরের চেয়ে কমে গেছে। এর কারণ হলো কোভিড মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া। বিশ্বের অপরাপর দেশের মতো বাংলাদেশও কোভিড মোকাবিলায় কঠিন সময় পার করছে। এর মধ্যেও বাংলাদেশ অনেক সামাজিক সূচকেই ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘ ২০১৫ সালে এসডিজি গ্রহণ করে। এটি ১৫ বছর মেয়াদি। এর উদ্দেশ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আর ১৬৯টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। জাতিসংঘ এর আগে সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) গ্রহণ করেছিল। এরপরই এসডিজি আসে। এসডিজির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য দূর করা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুস্বাস্থ্য, উন্নত শিক্ষা নিশ্চিত ও লিঙ্গবৈষম্য প্রতিরোধ অন্যতম।

এসডিজির এবারের সূচকে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছর এ স্কোর ছিল ৬৩ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০১৫ সালে যখন এসডিজি গৃহীত হয়, তখন বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৫৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। বিশ্বের ১৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে।

এবারের তালিকায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ফিনল্যান্ড। দেশটির স্কোর ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশ। এর পরের চার দেশ হলো সুইডেন (৮৫.৬%), ডেনমার্ক (৮৪.৯%), জার্মানি (৮২.৫%) ও বেলজিয়াম (৮২.২%)। আর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের স্কোর ৩৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। এর আগে আছে দক্ষিণ সুদান ও চাদ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে ৭০তম স্থানে আছে ভুটান। এরপর আছে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল। এদের অবস্থান যথাক্রমে ৭৯, ৮৭ ও ৯৬তম।

সামাজিক বিভিন্ন অগ্রগতির সূচকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের নিবিড় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহার এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে তার ভূমিকা, বৃক্ষরোপণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের করা মন্তব্য এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য।

তার মতে, কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বকে চমকে দেবার মতো সাফল্য আছে বাংলাদেশের। বিশেষত শিক্ষাসুবিধা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার ও জন্মহার কমানো, গরিব মানুষের জন্য শৌচাগার ও স্বাস্থ্যসুবিধা প্রদান এবং শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম অন্যতম।

এমডিজির সব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখনও বহুপথ পাড়ি দিতে হবে। এসডিজি অর্জনের এখনও প্রধান দুর্বলতা তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি। অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি বিচার-বিশ্লেষণ করার মতো প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত পর্যন্ত নেই। বৈষম্য দূরীকরণ, শান্তি ও ন্যায়বিচার, জলবায়ু রক্ষায় ভূমিকা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের এখনও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। মানুষের পুষ্টি পূরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি।

দেশে এখনও পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩১ শতাংশ শিশু খর্বকায়, ২২ শতাংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর ওজনস্বল্পতা রয়েছে। নগরে- দারিদ্র্য ও ঘনবসতি, পার্বত্য চট্টগ্রামে- দুর্গম এলাকা, খাদ্য ঘাটতি, ফসলি জমির অভাব, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এবং পোশাক শিল্পে- নারীদের কঠোর পরিশ্রম ও অসচেতনতার কারণে পুষ্টি পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নত হয়নি।

এসডিজিতে ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নারীর মালিকানা স্থাপনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। ভূমির ওপর নারীদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলে পরিবার ও জনগোষ্ঠীর খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার নিশ্চয়তা তৈরি হয়। ভূমি কেবল আয়ের উৎস নয়, এটা সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। বিষয়টা এখনও যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।

নারীদের জন্য মানসম্মত কাজের পরিবেশ এবং ন্যায্য মজুরিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে। গার্মেন্টস, কৃষি, ঘর-গৃহস্থালিসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কর্মরত নারী শ্রমিকদের উপযুক্ত কাজের পরিবেশ এবং ন্যায্য মজুরির ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের এমন একটি উন্নয়ন কৌশল দরকার যেখানে শ্রমিক, তার পরিবার ও ওই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি মানসম্মত মজুরি নির্ধারণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে করে একজন শ্রমিক সম্মানের সঙ্গে তার জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।

শান্তি ও ন্যায়বিচার বা ন্যায্যতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পরেনি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া, সুশাসনের ঘাটতি নারী অধিকার নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নারীর প্রতি সহিংসতাকে সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন যা অন্যান্য উন্নয়ন ও অধিকারের অন্তরায় হিসেবে মনে করা হয়। সহিংসতার ফলে নারী এবং শিশু গৃহহীন, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, নিরাপত্তাহীনতাসহ নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

এর জন্য সকল স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এটা শুরু করতে হবে ঘর থেকে এবং সরকারি উচ্চপর্যায় পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে। তৃণমূল এবং জাতীয়পর্যায়ে নারীদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ হলো নারী অধিকার, জেন্ডার সমতা, টেকসই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত।

মনে রাখা দরকার যে, এসডিজির লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হলে সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব প্রয়োজন। পদ্ধতিগতভাবে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ এসডিজি অর্জনেও সফল হবে।

বাংলাদেশের যেকোনো ভালো প্রস্তাব কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা রয়েছে। প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি সুশাসনও দরকার। এসডিজির পরিকল্পনাগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেটা একটা বড় ইস্যু। এর জন্য বিশ্ব অংশীদারত্ব প্রয়োজন।

সামর্থ্য ও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেতে অনেক বেশি বিনিয়োগ, শক্ত-সমর্থ উন্নয়ন সহায়তা, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও কার্যকর সংস্কারের উদ্যোগ প্রয়োজন এবং উন্নত ব্যবসার পরিবেশ, আর্থিক শৃঙ্খলা স্থাপন ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ সমুন্নত রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য একটি সক্রিয় ও ক্রমাগত স্থিতিশীল পরিবেশ, সরকারি খাতের সুশাসন এবং সরকার ও বিচার বিভাগের দক্ষতা ও সততা শক্তিশালীকরণ, একটি দ্রুত বর্ধনশীল ও ক্রমবর্ধমান শহুরে শ্রমশক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার ও বিশ্বের দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে ঝুঁকি মোকাবিলার কার্যকরী ব্যবস্থাপনা।

সর্বোপরি, এসডিজি অর্জনে সফল হতে হলে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। উন্নত দেশ হতে হলে ২৪ বছরের মধ্যে দেশের মোট আয় তিন ট্রিলিয়নে উন্নীত করতে হবে। অর্থনীতির আকার ১০ থেকে ২০ গুণ বাড়াতে হবে। যা মোটেও সহজ কাজ নয়।

একথা ঠিক যে, কোভিড-১৯ মহামারি সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করছে। তবে আশার কথা হলো, সরকার এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে। এসডিজি বাস্তবায়নে সরকারের যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কোভিড-পরবর্তী সময়ে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও বেগবান হলে এসডিজি অর্জন অসম্ভব হবে না।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
গতির উন্মাদনায় কত প্রাণ ঝরবে?
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া

শেয়ার করুন

মডেল মসজিদ ও শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা

মডেল মসজিদ ও শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা

মডেল মসজিদগুলোর সুযোগ-সুবিধা দেখলে সহজে বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী একটি বিশুদ্ধ ও মানবিক জাতি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করছেন, অটিজমের শিকার মানুষদের জন্য এসব মডেল মসজিদে বিশেষ সুবিধা থাকছে। অতিথিশালা থাকছে, বিদেশি পর্যটকদের জন্য আবাসনও থাকছে। এ যে কত বড় উদারতা ও মহানুভবতা তা ইতিহাসই সাক্ষ্য দেবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে ইসলামের খেদমতে সর্বপ্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের জন্য তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে যান। টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার জন্য সুবিশাল প্রান্তর বরাদ্দ করেন বঙ্গবন্ধুই। আজকের বাংলাদেশের মুসলমানদের তাবলিগ জামাতের যে মূল কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদ, সেটিও জাতির পিতার অবদান। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে প্রকৃত ইসলামি মূল্যবোধ থেকে সরে গিয়ে এ দেশের মাথার ওপর উগ্রবাদ জেঁকে বসে।

২১ বছর পর বঙ্গবন্ধুতনয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এরপর নানামুখী ষড়যন্ত্র তাকে কিছু সময়ের জন্য দেশসেবা থেকে দূরে রাখলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি পুনরায় সরকার গঠন করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ১৩ বছরে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। পৃথিবীর অনেক শক্তিশালী দেশের চেয়েও এখন বাংলাদেশের জিডিপি ও এসডিজির অগ্রগতি ভালো।

বিভিন্ন অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের পাশাপাশি দেশরত্ন শেখ হাসিনা ধর্মীয় ও নৈতিক উন্নয়নের দিকেও নজর দিয়েছেন। পিতার দেখানো পথ ধরে তিনি জাতিগত সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। আর এই জন্যই দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ইবাদতের জায়গার নির্মাণ শুধু নয়, সেটিকে মডেল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।

চলমান মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশের জেলা, উপজেলা, উপকূল, মহানগর ও বিভাগীয় শহরে সরকারিভাবে ৫৬০টি মডেল মসজিদের অনুমোদন দিয়েছেন। এসব মসজিদ নির্মাণে ৮ হাজার ৭২২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্মিত ৫০টি মডেল মসজিদ একযোগে উদ্বোধন করে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন সম্প্রতি।

বলার অপেক্ষা রাখে না, পরবর্তী মডেল মসজিদগুলো উদ্বোধনের সময়ে তিনি একযোগে এত মসজিদ উদ্বোধনের নিজের রেকর্ড নিজেই আবার ভাঙবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা-সংবলিত সুবিশাল এসব মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে নারী ও পুরুষদের পৃথক ওজু ও নামাজ আদায়ের সুবিধা, লাইব্রেরি, গবেষণাকেন্দ্র, ইসলামিক বই বিক্রয় কেন্দ্র, পবিত্র কোরআন হেফজ বিভাগ, শিশু শিক্ষা, অতিথিশালা, বিদেশি পর্যটকদের আবাসন, মৃতদেহ গোসলের ব্যবস্থা, হজযাত্রীদের নিবন্ধন ও অটিজম সেন্টার, প্রতিবন্ধী মুসল্লিদের টয়লেটসহ নামাজের পৃথক ব্যবস্থা, গণশিক্ষা কেন্দ্র, ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থাকবে। এ ছাড়াও ইমাম-মুয়াজ্জিনের প্রশিক্ষণ-আবাসন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অফিসের ব্যবস্থা এবং গাড়ি পার্কিং-সুবিধা রাখা হয়েছে।

মডেল মসজিদগুলোতে দ্বিনি দাওয়াত কার্যক্রম ও ইসলামি সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি মাদক, সন্ত্রাস, যৌতুক, নারীর প্রতি সহিংসতাসহ বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধি রোধে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

সারা দেশে এসব মসজিদে প্রতিদিন ৪ লাখ ৯৪ হাজার ২০০ জন পুরুষ এবং ৩১ হাজার ৪০০ নারী একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন। একসঙ্গে প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ কোরআন তেলাওয়াত করতে পারবেন, ৬ হাজার ৮০০ জন ইসলামিক বিষয়ে গবেষণা করতে পারবেন, ৫৬ হাজার মানুষ দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নিতে পারবেন এবং প্রতিবছর এখান থেকে ১৪ হাজার কোরআনে হাফেজ হবেন।

মডেল মসজিদগুলোর সুযোগ-সুবিধা দেখলে সহজে বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী একটি বিশুদ্ধ ও মানবিক জাতি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করছেন, অটিজমের শিকার মানুষদের জন্য এসব মডেল মসজিদে বিশেষ সুবিধা থাকছে। অতিথিশালা থাকছে, বিদেশি পর্যটকদের জন্য আবাসনও থাকছে। এ যে কত বড় উদারতা ও মহানুভবতা তা ইতিহাসই সাক্ষ্য দেবে।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রথম পর্যায়ে ৫০টি মডেল মসজিদের উদ্বোধন করা হয়েছে গত ১০ জুন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রাখার সঙ্গে সঙ্গে সন্ত্রাস ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এসব মসজিদ ভূমিকা রাখবে।”

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের গুরুত্ব খুবই অর্থবহ ও সুদূরপ্রসারী। তিনি ইসলাম ধর্মের প্রকৃত মর্মবাণী প্রতিটি মুসল্লির কাছে পৌঁছে দিতে চাচ্ছেন। আর একজন প্রকৃত মুসলমান কখনও নারীর প্রতি সহিংস হবেন না, জঙ্গিবাদে জড়াবেন না। আর এই লক্ষ্যেই তিনি ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণী নিয়ে গবেষণার সুযোগ রেখেছেন এসব মসজিদে, ইমাম-মুয়াজ্জিনরা যাতে প্রকৃত ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মুসল্লিদের কাছে ইসলামের আসল বার্তা নিয়ে যেতে পারেন সেই ব্যবস্থাও রেখেছেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দর্শন ও দূরদর্শিতা ফুটে উঠেছে এসব মডেল মসজিদে। তিনি যতদিন আছেন, ততদিন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ ‘দাবায়ে’ রাখতে পারবে না। বাংলাদেশ একদিন বিশ্বের বুকে মডেল রাষ্ট্র হবে। শেখ হাসিনা দীর্ঘজীবী হোন।

লেখক: ছাত্রনেতা ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
গতির উন্মাদনায় কত প্রাণ ঝরবে?
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া

শেয়ার করুন

শেখ হাসিনা-ম্যাজিকে বদলে গেছে দেশের অর্থনীতি

শেখ হাসিনা-ম্যাজিকে বদলে গেছে দেশের অর্থনীতি

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন ৪২তম রপ্তানিকারক ও ৩০তম আমদানিকারক দেশ। অগ্রসরমাণ অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, ওপরে আছে ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখতে এসে ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেছিলেন, ‘শুধু বলার জন্য নয়, দারিদ্র্য বিমোচনে সত্যিই আজ বিশ্বে বাংলাদেশ রোল মডেল।

কিছুদিন আগে বিদেশি এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, তোমাদের দেশে এত উন্নয়ন হচ্ছে টাকা পাও কোথায়? পদ্মা সেতু, উড়াল সেতু, মেট্রোরেলসহ অনেক কিছুই তো হচ্ছে, যেটা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমরাও দেখতে পাই। তোমাদের উন্নয়নের ম্যাজিক কী? বন্ধুটির প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলাম, আমাদের ম্যাজিকের নাম শেখ হাসিনা।

হ্যাঁ, শেখ হাসিনা-ম্যাজিকেই গত এক যুগে বদলে গেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, নারীর ক্ষমতায়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাসসহ বেশ কিছু সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্ব নেতৃত্বকে চমকে দিয়েছে।

বিপুল খাদ্য ঘাটতির দেশটি আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাই শুধু অর্জন করেনি, সাহায্যনির্ভর দেশটি খাদ্য রপ্তানি করার পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সরকারের সময়োপযোগী কৃষিনীতির কারণে বাংলার কৃষকরা খাদ্যপণ্য উৎপাদনে জাদু দেখিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিতকে মজবুত করছে প্রধানত তিনটি খাত। কৃষি, তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসী ভাইদের পাঠানো রেমিট্যান্স। একসময়ের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ এখন সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ১৯৭২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করে বলেছিল, ‘সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল হবে’।

অপরদিকে ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট অর্থনীতিবিদ অ্যাডওয়ার্ড অস্টিন রবিনসন ১৯৭৩ সালে ‘ইকোনমিক প্রসপ্রেক্টাস অব বাংলাদেশ’ নামে একটি গবেষণাগ্রন্থে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় মাত্র ৭০ ডলার। এই মাথাপিছু আয়ের বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে গরিব ১০টি দেশের একটি। ভালো মানের মাথাপিছু আয় ধরা হয় ৯০০ ডলার। সেটা অর্জন করতে বাংলাদেশ যদি ২ শতাংশ হারে মাথাপিছু আয় বাড়ায়, তাহলে লাগবে ১২৫ বছর, আর ৩ শতাংশ হারে আয় বাড়লে লেগে যাবে ৯০ বছর।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণিত করে বাংলাদেশ দ্রুততম সময়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, যখনই আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব দিয়েছে, তখনই বাংলাদেশের অগ্রগতির গ্রাফটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আর দেশরত্ন শেখ হাসিনার বিগত ১২ বছরের ধারাবাহিক নেতৃত্বের কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে।

অর্থনীতির এই অর্জনের সরকারের নীতিনির্ধারণী ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষির আধুনিকায়ন করা, নতুন বীজ উদ্ভাবন, স্বল্পমূল্যে সার ও বীজ বিতরণ, সব কৃষিপণ্যের ভ্যাট প্রত্যাহার করাসহ প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কৃষি খাতে ভর্তুকি দেয় সরকার। যার কারণে কৃষি ক্ষেত্রে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

অথচ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় কৃষিতে ভর্তুকি দেয়া তো দূরের কথা, সারের দাবিতে ১৮ কৃষককে জীবন দিতে হয়েছিল। ধান উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে শাকসবজি, মাছ ও ফলফলাদি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে দেশ। বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুসারে, বাংলাদেশ সবজি, ধান ও আলু উৎপাদনে বিশ্বে যথাক্রমে ৩য়, ৪র্থ ও ৭ম। এ ছাড়াও মাছ, আম, পেয়ারা উৎপাদনে ৪র্থ, ৭ম ও ৮ম স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান প্রায় ১৬.৬।

শিল্পকে বিকশিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ করা। সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরই বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে বিশেষ নজর দেয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শেষ সময় ২০০৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৩ হাজার ৩৭৮ মেগাওয়াট, উৎপাদন কেন্দ্র ছিল ৪২টি। বর্তমান সরকারের এক যুগে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার মেগাওয়াট, উৎপাদন কেন্দ্র বেড়ে হয়েছে ১৪০টি।

সুবিধাভোগী জনসংখ্যা ২০০৫-০৬ সালের ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় শতভাগে উন্নীত হয়েছে। দেশ এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। ২০০৯ সালে যেখানে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট, যা বর্তমানে বেড়ে সরবরাহ ২ হাজার ৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। নতুন শিল্প-উদ্যোক্তাদের শুরু থেকে ১৫ বছরের জন্য কর মওকুফ, শিল্প স্থাপন এবং ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, নির্মাণসামগ্রী ও কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কর মওকুফ করার ফলে নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে।

গ্রাম থেকে উপজেলা হয়ে জেলা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের নেটওয়ার্কে নিয়ে আসা হয়েছে। সড়ক, সেতু, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্টসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহরগুলো ও ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গাসহ ৪৫৩ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চার বা তদূর্ধ্ব লেনে উন্নীত করা হয়েছে, আবার কোথাও কাজ চলমান রয়েছে। যার কারণে শহর আর গ্রামের দূরত্ব কমে গেছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়ে, দারিদ্র্য কমে এসেছে। ২০০৬ সালে অতি দারিদ্রের হার ছিল ৪০ শতাংশ। যা বর্তমানে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং হতদরিদ্রের হার ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশে ২০০৯ সালে ৫ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করত। ২০১৮ সালের তথ্যমতে, চরম দারিদ্র্যসীমার মধ্যে আছে দেড় কোটির কিছু বেশি মানুষ। এই সময়ে জন্মহার কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ১৬ শতাংশে। ২০০৬ সালে বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল ৪৫ দশমিক ৬ কোটি ডলার। বর্তমানে ৩ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ১০ ডলার। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৫৬০ মার্কিন ডলার। একযুগে যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৭ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৩ টাকা। অবাক করার বিষয় হলো, করোনা মহামারির সময়ও বিগত বছর থেকে ৯ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তান থেকে দ্বিগুণ এবং অতিসম্প্রতি ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে। ভারত থেকে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ২৮০ ডলার বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশের একজন নাগরিক ভারতের একজন নাগরিক থেকে ২৩ হাজার ৭৫৩ টাকা বেশি আয় করেন। অথচ ২০০৭ সালেও ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের দ্বিগুণ।

বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে বিশ্বের অনেক দেশেই স্বাস্থ্য, খাদ্য ও অর্থনীতি— এই তিন খাতে বিপর্যয়ে পড়তে হয়েছিল। অনেকে বলেছিলেন, বাংলাদেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি নেমে আসবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তে আমাদের খাদ্য নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি।

স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে কিছুটা চাপ পড়লেও খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, মহামারি সত্ত্বেও বাংলাদেশ জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ার মধ্যে প্রথম অবস্থানে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে এতদিন পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে অবস্থান করেছিল বাংলাদেশ। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জিত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ।

এর ফলে ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঘোষিত হবে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের তিনটি শর্ত ছিল- মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলারে রাখা, মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ পয়েন্ট ও অর্থনীতির ভঙ্গুরতা সূচকে ৩২ বা নিচে আনা। এই তিনটি সূচক দিয়ে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কি না- সেই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়।

যেকোনো দুটি সূচকে যোগ্যতা অর্জন করতে হয় পরপর তিন বছর। ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ তিনটি শর্তই পূরণ করে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। এখন লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়া। এ লক্ষ্য পূরণের জন্য বেশ কিছু খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে সরকার। এর মধ্যে পোশাক খাতের বিশ্বব্যাপী বাজার সৃষ্টি করা, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ ও ওষুধের উপাদান, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল ও যানবাহন তৈরি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি ও কৃষিপণ্য আধুনিকীকরণসহ ৩২ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে সরকার।

রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং দারিদ্র্যের হার আরও কমে আসবে।

বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উত্থান এখন সারা বিশ্বে স্বীকৃত। প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘ইকোনমিস্ট’-এর ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৬৬টি উদীয়মান সবল অর্থনীতির দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান নবম। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৪তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ।

বিখ্যাত সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘গোল্ডম্যান স্যাকস’ ১১টি উদীয়মান দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ‘প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৯তম ও ২০৫০ সাল নাগাদ ২৩তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হবে। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবল’-২০২১ রিপোর্ট অনুসারে ২০৩৫ সাল নাগাদ ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান হবে ২৫তম।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন ৪২তম রপ্তানিকারক ও ৩০তম আমদানিকারক দেশ। অগ্রসরমাণ অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, ওপরে আছে ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখতে এসে ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেছিলেন, ‘শুধু বলার জন্য নয়, দারিদ্র্য বিমোচনে সত্যিই আজ বিশ্বে বাংলাদেশ রোল মডেল।

শেখ হাসিনার মতো সৎ-সাহসী এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই আজ বিশ্বের বুকে রোল মডেল হতে পেরেছে বাংলাদেশ। দক্ষতা, যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিকল্প কেবল শেখ হাসিনাই। বিগত এক যুগ রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে নিয়ে গেছেন মর্যাদাশীল একটি অবস্থানে। বঙ্গবন্ধুকন্যার সুযোগ্য নেতৃত্বে উন্নত সমৃদ্ধ দেশের স্বপ্ন নিয়ে অদম্য গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
গতির উন্মাদনায় কত প্রাণ ঝরবে?
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া

শেয়ার করুন

নৈতিক অবক্ষয় রোধে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন

নৈতিক অবক্ষয় রোধে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন

নানা কারণে আমাদের সমাজে মেধাবী কম না হলেও আদর্শনিষ্ঠ এবং সৎ ও নীতিপরায়ণ মেধাবী প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যা কমে আসছে। কমে যাচ্ছে ব্যতিক্রমী ধারার জনস্বার্থবাদী চিন্তাবিদদের সংখ্যা। স্বভাবতই হ্রাস পাচ্ছে বা শক্তিহীন হচ্ছে অনুরূপ গুণের বৈশিষ্ট্যযুক্ত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো জনস্বার্থবান্ধব হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন ও জাতীয় দৈনিকে নানারকম ভয়াবহ নেতিবাচক খবর দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন ও আঘাতের খবর এ মাধ্যমগুলো ভরা থাকে। অপরাধগুলো একটি শহরে কিংবা বিশেষ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের প্রায় সব শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে, অভিজাত এলাকা কিংবা প্রত্যন্ত জনপদে এসব ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অপরাধীদের মধ্যে কুখ্যাত সন্ত্রাসী বা মাস্তান যেমন রয়েছে, তেমনি সাধারণ জীবনযাপনকারী পারিবারিক সদস্যও রয়েছে।

বিশেষ করে পারিবারিক পর্যায়ে যে নৃশংস ও অবিশ্বাস্য ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে অপরাধীরা আসলে মানসিক রোগী। মনোরোগে আক্রান্ত লোক ছাড়া এ ধরনের নৃশংস অপরাধ কেউ করতে পারে না। নৃশংস অপরাধকে এখনও আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। আমাদের সভা-সেমিনার, ওয়ার্কশপ কিংবা গোলটেবিল আলোচনায় সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, মনোচিকিৎসক ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি বড় একটা দেখা যাচ্ছে না।

আমরা প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক, রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিয়ে এসব অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকি। সময় এসেছে, যখন আমাদের সমস্যার আরও গভীরে যেতে হবে। অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার পাশাপাশি মানসিক রোগী হিসেবে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

আমাদের দেখতে হবে, আমাদের দেহ-মনে এমন মারাত্মক কোনো জীবাণু বা রাসায়নিক দ্রব্য অবস্থান নিয়েছে কি না, যা আমাদের দলে দলে মানসিক রোগী করে তুলছে। সুস্থ ব্যক্তিরা যাতে এ রোগে আক্রান্ত না হয় সে জন্য আগেভাগে ব্যবস্থা নিতে হবে। কখনও ব্যক্তিপর্যায়ে, কখনও সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

আজকাল নিজেদের প্রাপ্তির জন্য আমরা সবাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে কাজ করছি। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। দেশ আর সমাজকে নিয়ে কি ভাবছি আমরা? আর কত সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় প্রয়োজন আমাদেরকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য? আর কত দিন অপেক্ষা প্রয়োজন হবে নিজেকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য? এই প্রশ্ন কার কাছে রাখব?

সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে চাইব? সবাই নিজেকে নিয়েই শুধু ব্যস্ত রয়েছি, শুধু ভাবছি নিজেকে নিয়ে। সরকার ব্যস্ত রয়েছেন উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নিয়ে দেশের উত্তরোত্তর কল্যাণের জন্য, আর বিরোধী দলগুলো ব্যস্ত রয়েছে তাদের ভাষায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার জন্য। তবে আমরা যারা সাধারণ জনগণ রয়েছি, তাদের কী হবে? আমাদের নিয়ে কেউ কি ব্যস্ত আছেন অথবা ভাবছেন, কিংবা ভাবার সময় কি আছে? এটা কিন্তু মোটেই দৃশ্যমান নয়।

আমরা কেমন জানি একটা বেড়াজালের মধ্যেই আছি। জাতি হিসেবে কি আমরা খুব একটা এগোতে পারছি? খুব একটা এগোচ্ছি বলে মনে হয় না, অবশ্যই কিছু ভালো অর্জন আমাদের আছে। সেগুলোও নষ্ট হয়ে যায় কাদা ছোড়াছুড়িতে, তাছাড়া সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় তো রয়েছেই, এই নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে আমাদের সব অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের অর্জনকে ধরে রাখতে পারছি না।

আমাদের মেধা ও মননের সার্বক্ষণিক চর্চা অপ্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়। গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতার পথ ছেড়ে কষ্টকর বিকল্প পথ ধরতে কার মন চায়? প্রয়োজনওবা কী এটাই মনে করেন অনেকে, আর আমাদের যেভাবে আগের অবস্থা চলে এসেছে সে অবস্থা থেকে খুব একটা বের হবার আগ্রহ আমরা প্রকাশ করি না। তাই প্রকৃত মেধাবীর সংখ্যা আমাদের সমাজে ক্রমেই কমে আসছে। সামাজিক অবক্ষয়ের পাল্লা ভারী হচ্ছে।

নানা কারণে আমাদের সমাজে মেধাবী কম না হলেও আদর্শনিষ্ঠ এবং সৎ ও নীতিপরায়ণ মেধাবী প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যা কমে আসছে। কমে যাচ্ছে ব্যতিক্রমী ধারার জনস্বার্থবাদী চিন্তাবিদদের সংখ্যা। স্বভাবতই হ্রাস পাচ্ছে বা শক্তিহীন হচ্ছে অনুরূপ গুণের বৈশিষ্ট্যযুক্ত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো জনস্বার্থবান্ধব হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

এগুলো সাংস্কৃতিক শূন্যতার অন্যতম কারণ। আর এই অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণের পথ দেখাতে পারে প্রকৃত ও মূলধারার সংস্কৃতিচর্চা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যা আমাদের নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়কে দূর করে জাতিকে নতুন যুগের পথ দেখাতে পারে।

আমাদের নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম আছে, আমরা কি তাদের কথা ভাবি? তারা ভবিষ্যতের হাল ধরবে, তাদেরকে সেভাবেই তৈরি করতে হবে আমাদের। প্রতিটি বাবা-মা কি তাদের সন্তানের খোঁজখবর রাখেন? সন্তানকে কীভাবে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায় তা নিয়ে কি ভাবেন? সন্তানের বাবা-মা ব্যস্ত রয়েছেন জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর জন্য, দিনরাত পরিশ্রম করে আনা অর্থ কোনো কাজে লাগছে কি না সে বিষয়ে কারও চিন্তা করার সময় নেই।

সন্তান কী শিখছে, কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, সে খেয়াল রাখার মতো অবস্থায় আমরা নেই। কিন্তু কেন, এমন তো হওয়ার কথা ছিল না! কেন এমন হলো তা নিয়ে সরকার ও নাগরিক সমাজকে ভাবতে হবে। সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এগুলো থেকে বের হয়ে আসা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

একসময় ছিল মানি ইজ লস্ট, নাথিং ইজ লস্ট, হেলথ ইজ লস্ট, সামথিং ইজ লস্ট, হোয়েন ক্যারেক্টার ইজ লস্ট এভরিথিং ইজ লস্ট। কিন্তু এটার একটু পরিবর্তন হয়েছে এভাবে, এখন ক্যারেক্টার ইজ লস্ট নাথিং ইজ লস্ট, হেলথ ইজ লস্ট সামথিং ইজ লস্ট, হোয়েন মানি ইজ লস্ট, এভরিথিং ইজ লস্ট। এখন টাকাই সব, টাকার জন্য সব কিছুই করা সম্ভব।

আমরা শুধু টাকার পেছনে দৌড়াচ্ছি। টাকার জন্য মানসম্মান, আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত আছি! অপরদিকে সমাজ বিনির্মাণে, রাষ্ট্রের একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারে আমাদের যে কিছু দায়িত্ব রয়েছে, সেগুলো আমরা সঠিকভাবে পালন করছি কি না, কিংবা বেমালুম ভুলে যাচ্ছি কি না, সেটা ভেবে দেখার সময় এসেছে। সব কিছুতেই আমাদের ভেজালের ছড়াছড়ি। ওষুধে ভেজাল, খাবারে ভেজাল, পরীক্ষায় ভেজালসহ, সবকিছুতেই ভেজাল। এমন অবস্থা তো চলতে পারে না এবং চলতে দেয়া যায় না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আমদের সব অর্জন ধ্বংস হতে বেশি সময় লাগবে না।

একটি ওষুধ কোম্পানির মালিক যদি মনে করেন, তার ওষুধে কোনো ভেজাল দেবেন না, তাহলে অন্যেরা নিশ্চয় তার ওষুধে ভেজাল দিতে আসবেন না। একজন মালিককে ভাবতে হবে তার কোম্পানির ওষুধ খেয়ে লাখ লাখ মানুষ বাঁচবে, তার ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য চেষ্টা করা একেবারেই উচিত নয়। একজন খাবারের দোকানের মালিক যদি মনে করেন, কম লাভে তার চলবে, তাহলে তাকে খাবারে ভেজাল মেশাতে হবে না।

ব্যবসায় মুনাফা করতে হবে এটাই নিয়ম, তবে নিজের মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে নয়। দেশের মানুষের কল্যাণ হয় না, শুধু নিজের লাভের জন্যই তা আমরা অনেক সময় করে থাকি। শুধু নিজের মুনাফা অর্জনের জন্য আমরা যেন একটি জাতিকে ধ্বংস করে না দিই, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে।

একজন ওষুধ কোম্পানির মালিক, খাবার প্রস্তুতকারী কোম্পানির মালিকের এটা মনে রাখতে হবে, তার ভেজাল মেশানোর কারণে হাজার হাজার মানুষ অসুস্থ হয়ে যেতে পারে, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ভেজাল খাবার ও ভেজাল ওষুধ একটি জাতিকে ধবংস করে দিতে পারে। এ দিকগুলো মনে রেখেই কাজ করতে হবে। কিন্তু আমরা কি তা করছি? আমার ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে পারলেই হলো। অন্যের কী হলো, দেশের কী হলো তা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানোর সময় নেই।

নিজের কাছে যদি নৈতিকতা না থাকে তাহলে জাতি বা দেশ তার কাছ থেকে কী আশা করতে পারে? আমি আমার পবিত্র নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে দিই, তা হলে তো আর কিছু বলার থাকবে না। আমি আমার ‘বাংলাদেশকে ভালোবাসি’ এই স্লোগানে আমাদের সবাইকে এক কাতারে এসে দাঁড়াতে হবে, এ জন্য নাগরিক সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

কারণ আগে জাতি হিসেবে আমাদের সকল সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় দূর করতে হবে। নৈতিক অবক্ষয়ের দিক থেকে আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে, চলুন, আমরা আবার সামনের দিকে ঘুরে দাঁড়াই, নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে, আমাদের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে, বাংলাদেশেকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই। ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে এক সুন্দর বাংলাদেশে পরিণত করি।

লেখক: প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
গতির উন্মাদনায় কত প্রাণ ঝরবে?
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া

শেয়ার করুন

এমপি, ইউএনও ও আমলাতন্ত্র

এমপি, ইউএনও ও আমলাতন্ত্র

২০১২ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন চলাকালে শিকাগোর নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে গিয়েছিলাম একটি কাজে। তখন ওই অফিসের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তিকে দেখেছি একজন বয়স্ক নাগরিককে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিচ্ছেন। এটুকু কাজ করতে ওই অফিসারের সময় লেগেছে বড়জোর দুই মিনিট। কিন্তু তার এই দুই মিনিটের আচরণ দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছি যে, ৯ বছর আগের সেই দৃশ্যটি এখনও চোখে ভাসছে।

প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী একটি জাতীয় দৈনিকে (দৈনিক ইত্তেফাক, ৬ জুন ২০২১) এ সময়ে আমলাদের ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ে লিখতে গিয়ে এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, এখনকার মন্ত্রী, উপমন্ত্রীদের অধিকাংশই কোনো দিন মন্ত্রী হওয়ার আশা স্বপ্নেও দেখেননি। সে যোগ্যতা ও সাহসও তাদের নেই। তবু তারা মন্ত্রী হয়েছেন। আমলাদের কোনো নির্দেশ দেয়ার সাহস তাদের নেই, যোগ্যতাও তাদের নেই। তাদের অনেকেই কোনো কাজের জন্য অনুরোধ জানালে বলেন, দেখি প্রধানমন্ত্রী কী বলেন। অর্থাৎ সব ক্ষমতা এবং সব দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর।

তাহলে তারা আছেন কেন—এর দুই দিন বাদেই আমলাতন্ত্র নিয়ে রসিকতার ছলে একটি নির্মম মন্তব্য করেছেন মন্ত্রিসভার জেন্টেলম্যান তথা সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেছেন, ‘আমলাতন্ত্র সব সময়ই থাকবে। ফেরাউনও অত্যন্ত শক্তিশালী শাসক ছিলেন। তিনিও আমলাতন্ত্রের বাইরে যেতে পারেননি। আমলাতন্ত্রের বিকল্প বের করতে পারেননি। সোভিয়েতরা চেষ্টা করে বের করতে পারেননি। চীনারাও বের করতে পারেননি। এমনকি খলিফারাও বের করতে পারেননি।’

আমলাতন্ত্র নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রীর এই মন্তব্যের পাঁচ দিনের মাথায় একজন মাঠপর্যায়ের আমলার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দিয়েছেন সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান। কোনো একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুদ্ধে দুদকে একজন আইনপ্রণেতার এ রকম অভিযোগের ঘটনা বিরল। শুধু তা-ই নয়, অভিযোগ জানানোর পরে সাংবাদিকদের কাছে এমপি মোকাব্বির খান যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, সেটি আরও ভয়াবহ।

তিনি বলেছেন, ‘দেশ কীভাবে চলছে এইটা অনুমান করেন। আমি একজন সংসদ সদস্য হয়েও ইউএনওর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে জানিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দিয়েছি। উনিও বলেছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। কিন্তু এখনও আমার সব জায়গায় চেষ্টা চালিয়ে যেতে হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত হয়তো আমাকে রিট করতে হবে।’

এই আইনপ্রণেতা আরও বলেন, ‘দেশে অসৎ আমলা, অসৎ ব্যবসায়ী এবং অসৎ কিছুসংখ্যক রাজনীতিবিদ এদের সমন্বয়ে যে সিন্ডিকেট হয়েছে। এইটা অত্যন্ত শক্তিশালী। এদের কাছে প্রধানমন্ত্রী জিম্মি, মন্ত্রিপরিষদ জিম্মি, সংসদ জিম্মি, এমপিরাও জিম্মি এবং সর্বোপরি জনগণ জিম্মি।’

গণমাধ্যমের খবর বলছে, এমপি মোকাব্বিরের নির্বাচনি এলাকায় একটি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের জন্য জায়গা অধিগ্রহণ ইস্যুতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নির্দেশ মানছেন না। এ বিষয়ে সংসদ সদস্যের অভিযোগ, ইউএনও সরকারি নীতিমালা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে যাচ্ছেন। তিনি দুর্নীতিবাজদের মদদ দিচ্ছেন।

এ ঘটনার সত্যতা কতটুকু তা সঠিক তদন্ত হলেই জানা যাবে। তবে একজন আইনপ্রণেতাকে যদি ইউএনওর মতো মাঠ প্রশাসনের কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে নানা জায়গায়, এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছেও অভিযোগ জানাতে হয়, তাহলে এটি বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, দেশে আমলাতন্ত্র কী ভয়াবহ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

দেশের আমলাতন্ত্র কতটা শক্তিশালী হয়েছে, এর প্রমাণ নানা ঘটনায় পাওয়া যায়। এর পেছনে সুস্পষ্টভাবে বেশ কিছু কারণও রয়েছে। যার একটি বড় কারণ আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী উল্লেখ করেছেন। এর বাইরে আরও অনেক কারণ রয়েছে। যার সবগুলো হয়তো এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়।

সম্প্রতি আমলাদের মধ্যে, বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীদের মধ্যে ‘স্যার’ ও ‘ভাই’ সম্বোধন ইস্যুতে এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা শুধু অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, বরং এই ঘটনাগুলো আমাদের যে মূল প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে তা হলো, সংবিধানের ভাষায় যে জনগণ হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের মালিক এবং যাদের করের পয়সায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন হয়, সেই জনগণই কেন তাদের সেবক সরকারি কর্মচারীদের ‘স্যার’ সম্বোধন করবে?

বরং হওয়ার কথা তো উল্টো। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক সরকারি অফিসে কোনো সেবার জন্য গেলে সংশ্লিষ্ট অফিসারেরই উচিত তাকে স্যার বলে সম্বোধন করা এবং তিনি তার জন্য কী করতে পারেন—বিনয়ের সঙ্গে সেটি জানতে চাওয়া। এই চাওয়াটা খুব অমূলক বা অযৌক্তিক নয়।

অথচ বাস্তবতা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, সরকারি অফিসে কোনো কাজের জন্য যাওয়া মানে তাকে নিঃসন্দেহে কোনো না কোনো হয়রানির মধ্যে পড়তে হবে। হয় ঘুষ দিতে হবে, নয়তো যে কাজ এক দিনে হওয়ার কথা, সেই কাজের জন্য দিনের পর দিন ঘুরতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের গাফিলতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে প্রতিদিন যে কত মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, এর হিসাব কে রাখে?

অথচ সভ্য রাষ্ট্রে কোনো সিনিয়র সিটিজেন সরকারি অফিসে সেবা নিতে গেলে যথেষ্ট বড় পদের কর্মকর্তাও উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানান এবং চেয়ার এগিয়ে দেন। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এই প্র্যাকটিস দেখেছি এবং মেলানোর চেষ্টা করেছি, আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারীরা নাগরিকদের সঙ্গে কী আচরণ করেন!

স্মরণ করতে পারি, ২০১২ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন চলাকালে শিকাগোর নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে গিয়েছিলাম একটি কাজে।

তখন ওই অফিসের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তিকে দেখেছি একজন বয়স্ক নাগরিককে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিচ্ছেন। এটুকু কাজ করতে ওই অফিসারের সময় লেগেছে বড়জোর দুই মিনিট। কিন্তু তার এই দুই মিনিটের আচরণ দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছি যে, ৯ বছর আগের সেই দৃশ্যটি এখনও চোখে ভাসছে।

আমাদের সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে আমরা কি এই আচরণ প্রত্যাশা করতে পারি? কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পরে তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শরীরী ভাষা বদলে যায়।

তাদের কাছে যখন তাদের বাবা-মায়ের বয়সী কোনো নাগরিকও সেবা নিতে যান, উঠে দাঁড়ানো তো দূরে থাক, তাদের সঙ্গে চাকর-বাকরের মতো আচরণ করেন। অথচ জনগণের প্রতি তাদের আচরণ কেমন হতে হবে, সেই নির্দেশনা স্বাধীনতার পরেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্টভাবে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই সেই নির্দেশনা মানেননি বা এখনও মানেন না।

অবশ্য গণহারে সব সরকারি কর্মচারী নিশ্চয়ই খারাপ নন। প্রশ্ন হলো, সেই ভালো-মন্দের অনুপাতটা কত? নিশ্চয়ই অনেক ভালো আমলা আছেন। সে রকমই একজন ভালো আমলা সম্প্রতি আমলাতন্ত্রের দুটি বৈশিষ্ট্যের কথা লিখেছেন-

১. আমলারা নিজেদের স্বার্থে মিথ্যা বলতে কখনও পিছপা হন না। ২. একজন আমলা কোনো ভুল পদক্ষেপ নিয়ে ফেললে তারা সেটা স্বীকার করবেন না; বরং পদক্ষেপটি যে সঠিক ছিল, এটা প্রমাণের জন্য পুরো আমলাতন্ত্র একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

অনেক সময় সরকারের আচরণেও মনে হয়, তারা বুঝি গণকর্মচারীদের কাছে জিম্মি। বিশেষ করে প্রতিবছর যখন ডিসি সম্মেলন হয়, তখন সেখানে ডিসিরা যেসব দাবিদাওয়া তোলেন (এমনকি তারা বিচারিক ক্ষমতাও চান) তাতে মনে হয়, রাজনীতিবিদরা নন, বরং দেশটা আমলারাই চালান।

বাস্তবতা হয়তো সে রকমই। কিন্তু এখানে পলিটিক্যাল লিডারশিপের দায়িত্ব অনেক। তাদের শরীরী ভাষা আর আচার-আচরণে যদি প্রশাসনের লোকেরা ভয় না পায়, যদি কর্মচারীরা মনে করে যে সরকার তাদের ক্ষমতায় ভর করে টিকে আছে, তাহলে প্রশাসনের শৃঙ্খলা বজায় রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু কেন শরীরী ভাষা সে রকম হয় না—এর ব্যাখ্যা প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী দিয়েছেন।

ফলে আমরা যখন আমলাতন্ত্রের মানবিকীকরণ বা সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে মার্জিত আচরণের কথা লিখি, তখন এ প্রশ্নটিও সামনে চলে আসে যে, কেন তারা নিজেদের জনগণের সেবক না ভেবে প্রভু ভাবছে? কেন তারা প্রত্যাশা করে যে, সবাই তাদের ‘স্যার’ বলবে? কেন তারা জনগণের করের পয়সায় বেতন নিয়ে সেই জনগণকেই সেবা দেয়ার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে ঘুষ নিতে লজ্জাবোধ করে না?

কেন তারা মনে করে বা কেন তাদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে গেল যে, তারা দিনের পর দিন দুর্নীতি ও অনিয়ম করে গেলেও সেটার কোনো বিচার হবে না?

সুতরাং পুরো প্রশাসনযন্ত্র যেভাবে শক্তিশালী হয়েছে, তাতে সিলেটের এমপি মোকাব্বির খান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মতো একজন মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুদকসহ বিভিন্ন জায়গায় যে ঘোরাঘুরি করছেন, আখেরে হয়তো কিছুই হবে না। বড়জোর তাকে অন্য কোনো উপজেলার ইউএনও হিসেবে বদলি করে দেয়া হবে। আর এমপি সাহেবও হয়তো ভাববেন, তিনি খুব জিতে গেছেন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
গতির উন্মাদনায় কত প্রাণ ঝরবে?
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া

শেয়ার করুন