রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না

রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ফিলিস্তিনি জাতিগোষ্ঠীর সংগ্রামের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন। বাংলাদেশে পিএলওর কার্যালয়ও খোলা হয়। ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র গঠনের অধিকারের পক্ষে বাংলাদেশের জনগণ সব সময়ই সংহতি প্রকাশ করে এসেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তিতে ইয়াসির আরাফাত আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার গভীর সম্পর্ক ছিল। তার মৃত্যুর পরও বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণ ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাষ্ট্রলাভের অধিকারে অকুণ্ঠভাবে সমর্থন প্রদান করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ কখনোই ইসরায়েলি রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি।

জেরুজালেমকেন্দ্রিক প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম ইতিহাসখ্যাত অঞ্চল হচ্ছে বর্তমান ইসরায়েলিদের দখল করা এবং ফিলিস্তিনিদের রক্তঝরা ভূখণ্ড। এক সপ্তাহ ধরে আবার এই নিরীহ ফিলিস্তিনিদের রক্ত ঝরছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নির্দেশে সেনাবাহিনী গাজা এবং জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরে বসবাসরতদের ওপর ক্রমাগত বোমাবর্ষণ করে চলেছে। এতে প্রতিদিন নারী-শিশু ও বৃদ্ধদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে। ইসরায়েল যদিও দাবি করছে, ফিলিস্তিনি উগ্র গোষ্ঠী হামাসকে দমন করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য, কিন্তু প্রতিদিন যেসব মানুষ নিহত ও আহত হচ্ছে, বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে, তারা সবাই ফিলিস্তিনের সাধারণ নাগরিক।

এই পর্যন্ত প্রায় তিন শ ফিলিস্তিনি ইসরায়লিদের হামলায় নিহত হয়েছে। গাজাকে এখন অনেকটাই মানব বসবাসের নিরাপদ জায়গা হিসেবে কেউ ভাবতে পারছে না। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এই আবাসভূমিকে ফিলিস্তিনিশূন্য করার লক্ষ্য নিয়েই একের পর এক বোমাবর্ষণ করে চলছে। সে কারণেই হামাস বাহিনী পাল্টা ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ সংঘটিত করার চেষ্টা করছে।

হামাস মনে করছে, ইসরায়েলকে প্রতিঘাত না করলে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের গাজা ও পশ্চিম তীরের ভূখণ্ড দখল করে নেবে। পৃথিবীর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শক্তিসমূহ ইসরায়েলিদের বর্বরোচিত হামলার নিন্দা এবং বিক্ষোভ প্রদর্শন করে চলছে।

বৈশ্বিক করোনা সংক্রমণের এমন ভয়াবহ অবস্থাতেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী দেশের অভ্যন্তরে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য ফিলিস্তিনিদের ওপর নতুন করে এই হামলা চালানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তাকে সরাসরি সমর্থন জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলিদের এমন আগ্রাসী আক্রমণ নতুন নয়। বরং প্রায় আট দশক ধরে সংঘটিত ঘটনা যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই ইসরায়েলকে সমর্থন এবং শক্তি জুগিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলিদের অনেক আক্রমণ ভয়াবহ রক্তাক্ত যুদ্ধের দুঃখজনক নজির সৃষ্টি করেছে, যা পৃথিবীব্যাপী মানুষের মধ্যে ইসরায়েলিদের প্রতি ঘৃণা, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমবেদনা ও সমর্থন তৈরি করে চলছে। তারপরও ইসরায়েলিদের জায়ানবাদী আক্রমণ, আগ্রাসন রোধে সারা বিশ্ব যেমন এক হতে পারছে না, ফিলিস্তিনিদের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র অর্জিত হচ্ছে না। অধিকন্তু ফিলিস্তিনিরা একের পর এক ইসরায়েলিদের নৃশংস হামলায় আক্রান্ত হচ্ছে।

২০১৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব জেরুজালেমে তাদের দূতাবাস সরিয়ে নেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। কারণ ফিলিস্তিনিরা সব সময় পূর্ব জেরুজালেমে তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী স্থাপনের স্বপ্ন দেখে আসছে। সেখানে মার্কিনরা তাদের দূতাবাস সরিয়ে আনার ফলে ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনিদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার যে শক্তি আগে থেকে প্রয়োগ করছিল, সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ভূমিকা রাখে বলে ফিলিস্তিনিরা মনে করে। এর বিরুদ্ধে গাজায় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে যে বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়, সেটিকে দমন করতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গুলিবর্ষণ করে। তাতে নিহত হয় ৫৮ ফিলিস্তিনি এবং আহত হয় ৩ হাজারের বেশি ।

২০১৪ সালের ৮ জুলাইতে ইসরায়েলিরা গাজায় হামাস বাহিনীর ওপর হামলা শুরু করে। ৮ জুলাই থেকে আগস্টের ২৬ তারিখ পর্যন্ত ইসরায়েল বাহিনী বোমা ও গুলিবর্ষণ অব্যাহত রাখে। এতে ২ হাজার ৩০০ জনের মতো বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং প্রায় ১০ হাজার ৮০০ জন আহত হন। এভাবে পেছনের দিকে আমরা যত যেতে থাকব, তত ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলিদের আক্রমণ এবং হতাহতের বিবরণ একের পর এক দেখতে পাব।

১৯৪৮ সালের ১৪ মে ফিলিস্তিনি জাতিগোষ্ঠীর মূল ভূখণ্ডে ইসরায়েলিদের রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড একের পর এক দখল করে নেয়ার লক্ষ্যে সামরিক আক্রমণ পরিচালিত করে যাচ্ছে। অথচ ফিলিস্তিনিদের একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন এখন পর্যন্ত ইসরায়েলিদের বারবার আক্রমণের কারণে বাস্তবে রূপ নিতে পারছে না। বিশ্বের মোড়ল শক্তিগুলো ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ফিলিস্তিনিদের মর্যাদা তথা স্বীকৃতি দিচ্ছে না।

বর্তমান ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েল ভূখণ্ড ছিল প্রাচীন যুগের অন্যতম গুরত্বপূর্ণ সভ্যতা। এর নিকটবর্তী অন্যান্য সভ্যতা যথা- ব্যাবিলনীয়, আসিরীয়, পারস্য, মেসিডোনিয়া এবং রোমানরা সাম্রাজ্য বিজয়ে যেসব অভিযান পরিচালনা করেছিল তাতে হিব্রু সভ্যতার সঙ্গে সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়েছিল। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত পিতৃপুরুষরা এই অঞ্চলে ইহুদি রাষ্ট্রের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন বলে ইহুদিরা বিশ্বাস করেন। সে কারণে তারা এখানে তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ধর্মীয় অধিকার বলে দাবি করে থাকেন।

এ নিয়ে শুরু থেকেই অন্য ধর্মাবলম্বী, গোত্র এবং জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ ইতিহাসের পথপরিক্রমায় একের পর এক ঘটতে দেখা গেছে। তাতে পরাজিত হলে তাদের দাসে পরিণত করা হয়। জুডেয়া নামক স্থানে ইহুদিদের বড় ধরনের বিদ্রোহ ১৩৫ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত হয়। রোমান সম্রাট হাড্রিয়ান সেটি দমন করেন। এরপর তিনি রোমানদের নিয়ে সিরিয়া ও জুডেয়াকে একত্রিত করে সিরিয়া-প্যালেস্টাইন গঠন করে। কিন্তু এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং রক্তক্ষয় একের পর এক ঘটছিল। এখান থেকে অনেক ইহুদি পালিয়ে অন্যত্র চলে যায় অষ্টম শতকে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড জয় করে আরব মুসলমানরা। ইউরোপ থেকে একাদশ-ত্রয়োদশ শতকে ধর্মযুদ্ধের অভিযান শুরু হলে জেরুজালেম পর্যন্ত সেই অভিযানে অনেকেই নেতৃত্ব প্রদান করেন।

ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সম্পর্কের সংকট ১৯৪৮ সালের ১৪ মে থেকে নতুন করে শুরু হয়। ফিলিস্তিন তখনও কোনো রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়নি। ফিলিস্তিনিদের আবাসভূমির প্রতিশ্রুত সীমা জাতিসংঘ নির্ধারণ করেনি, ইসরায়েল তা বাস্তবায়ন করতে দেয়নি। এই সংকট উভয় জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্রতর হতে থাকে। ফিলিস্তিনিরা নিজের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৬৭ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে পরাশক্তি এবং আরবদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও বিভাজন সৃষ্টি হয়। ১৯৯৩ সালে অসলোতে পিএলও এবং ইসরায়েল একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে, তাতে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের দখল করা ভূখণ্ড ছেড়ে দেয়া এবং পর্যায়ক্রমে চলে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। পিএলও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে ইসরায়েলের অস্তিত্ব মেনে নেয়। হামাস এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে। পিএলওর নেতা হিসেবে ইয়াসির আরাফাত বিশ্বের গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের ব্যাপক সমর্থন লাভ করেন। তিনি ২০০৪ সালের ১১ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। প্যালেস্টাইন আন্দোলন যোগ্য নেতৃত্বের সংকটে পড়ে।

অপরদিকে আরব দেশগুলোর মধ্যেও নানা অনৈক্য দেখা দেয়। ইসরায়েল সেই সুযোগ গ্রহণ করে। ফলে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র বাস্তবে আজও প্রতিষ্ঠা কিংবা স্বীকৃতি লাভ করতে পারেনি। ইসরায়েলের বারবার হামলার প্রতিক্রিয়া থেকে হামাস ফিলিস্তিনে তার শক্তি বৃদ্ধি করার চেষ্টা করে। তবে ফিলিস্তিনের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

একটি চরম রাজনৈতিক সংকট এই অঞ্চলকে দিন দিন ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনকে কেন্দ্র করে জটিল হচ্ছে। এতে প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ ফিলিস্তিনিরা। ইসরায়েলিরা ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনিদের আবাসভূমি দখলে নিচ্ছে। বিতাড়িত করছে তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে। এত আরব রাষ্ট্র থাকতে ইসরায়েল ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়া ফিলিস্তিনি জাতিগোষ্ঠীর পাশে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে পারেনি বলেই এই জাতির এত অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও রাষ্ট্র পরিচয়ের স্বীকৃতির অভাব।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ফিলিস্তিনি জাতিগোষ্ঠীর সংগ্রামের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন। বাংলাদেশে পিএলওর কার্যালয়ও খোলা হয়। ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র গঠনের অধিকারের পক্ষে বাংলাদেশের জনগণ সব সময়ই সংহতি প্রকাশ করে এসেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তিতে ইয়াসির আরাফাত আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার গভীর সম্পর্ক ছিল। তার মৃত্যুর পরও বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণ ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাষ্ট্রলাভের অধিকারে অকুণ্ঠভাবে সমর্থন প্রদান করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ কখনোই ইসরায়েলি রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে ফিলিস্তিনি জনগণের রাষ্ট্রলাভের প্রতি বাংলাদেশের নৈতিক সমর্থন বহাল থাকা।

ফিলিস্তিনে চলমান রক্তক্ষয়ের মধ্যেই একটু সুখবর হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামিক জিহাদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির কথা জানা গেছে শুক্রবার। হামাস যুদ্ধে বিজয় লাভ করেছে দাবি করে নিজেরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। এখানে স্বস্তির বিষয় হলো- দৃশ্যত আপাতত প্রাণহানি ও রক্তক্ষয় বন্ধ হলো। এটি স্থায়ী হবে বলে আমরা আশা করতেই পারি। সেই সঙ্গে আরও প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা ফিলিস্তিনিদের স্বভূমি ও স্বাধীনতা ফিরে পাবে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে।

লেখক: গবেষক, অধ্যাপক।

আরও পড়ুন:
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি
চীনের বন্ধুত্ব কি নিখাদ?
রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলাভাষার জন্য আত্মদানের ষাট বছর
মহামারিতে বিধি ও তথ্য না মানার সুলুক সন্ধান

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বদলে যাক আমলাতন্ত্র

বদলে যাক আমলাতন্ত্র

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনপ্রতিনিধিরা নীতিনির্ধারণ করেন। আর আমলারা সেই নীতি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করেন। আমলারা কিন্তু জনপ্রতিনিধি নন, তাই জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিও করতে হয় না। কিন্তু অনেক দিন ধরেই দেশে কার্যকর গণতন্ত্র নেই। জনপ্রতিনিধিরাও আর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তেমন ভূমিকা রাখেন না। দেশ এখন আমলাশাসিত।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে আমার বিট ছিল নির্বাচন কমিশন। তখন আমি ভোরের কাগজের রিপোর্টার। শ্যামল দার (শ্যামল দত্ত, ভোরের কাগজের সম্পাদক) সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে যাচ্ছি নতুন। একদিন কমিশনে যেতেই সংবাদের লিটন ভাই (মনির হোসেন লিটন, বর্তমানে একাত্তর টিভিতে কর্মরত) বললেন, আপনাকে মান্নান ভাই খুঁজছেন। মান্নান ভাই মানে এম এ মান্নান, আজকের পরিকল্পনামন্ত্রী; তখন তিনি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব। নির্বাচন পরিচালনায় তখন তার দারুণ ব্যস্ততা। আমি লিটন ভাইকে বললাম, আমি তো অল্প কয়েক দিন এলাম। আমাকে তো মান্নান ভাইয়ের চেনার কথা নয়। খুঁজবেন কেন? লিটন ভাই বললেন, তা জানি না, আপনাকে না চিনলেও ভোরের কাগজের রিপোর্টারকে তো চেনেন, তাকেই খুঁজছেন। মনে মনে একটু শঙ্কিতও হলাম। মাত্র নির্বাচন কমিশন বিটে এসেছি। সামনে নির্বাচন।

এই সময়ে উল্টাপাল্টা কিছু হলে মুশকিল। গেলাম মান্নান ভাইয়ের রুমে। পরিচয় দিতেই তিনি উল্লসিত কণ্ঠে বললেন, আরে আপনাকেই তো খুঁজছি। কাল আমি যে ব্রিফ করেছি, আপনার রিপোর্টে তা যথাযথভাবে উঠে এসেছে। তাই ধন্যবাদ দিতে আপনাকে খুঁজছিলাম। শুনে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। সেই থেকে মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে আমার চমৎকার সম্পর্কের শুরু। মন্ত্রী হওয়ার পরও যে তিনি আমলাজীবন নিয়ে গর্ব করেন, সেই জীবনটার একটা পর্ব আমি কাছ থেকে দেখেছি। শুধু আমার সঙ্গে নয়, সাংবাদিকদের সঙ্গে ছিল তার দারুণ সম্পর্ক। তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনাও ছিলেন সাবেক আমলা। সব মিলিয়ে সেবার দারুণ দক্ষতায় নির্বাচন পরিচালনা করেছিলেন।

এম এ মান্নান পরে এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। এখন আর তেমন যোগাযোগ নেই বটে, তবে একজন দক্ষ আমলাকে, তার কাজের স্টাইলকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। বাস্তবে আমলাদের হওয়ার কথা জনগণের সেবক। কিন্তু মানতেই হবে, বরাবরই আমলাদের সঙ্গে জনগণের একটা বিশাল ফারাক রয়ে গেছে।

এ জন্য দায় যতটা জনগণের, তারচেয়ে অনেক বেশি আমলাদের। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, তবে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই আমলারা নিজেদের চারপাশে একটা বিচ্ছিন্নতার দেয়াল তুলে দেন। জনগণ বারবার সেই দেয়ালে গিয়ে হোঁচট খায়।

দেশসেরা মেধাবীরাই বিসিএসের নানা ধাপ পেরিয়ে আমলা হন। তবে সাধারণ মানুষের কথা শুনলে মনে হয়, আমলা হওয়াটা বিশাল অপরাধ। আমলাদের সম্পর্কে সাধারণের পারসেপশন হলো- আমলা মানেই ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, গণবিরোধী। শুধু আমলা নয়, কোনো একটি পেশার মানুষকে ঢালাও গালি দেয়ার প্রবণতা তাদের মজ্জাগত।

সাংবাদিক, ডাক্তার, পুলিশ তো প্রতিদিন গালি খাচ্ছে। বাস্তবতাটা হলো, কোনো পেশার মানুষকেই ঢালাও গালি দেয়ার সুযোগ নেই। ভালো ডাক্তার যেমন আছেন, খারাপ ডাক্তারও আছেন। ভালো সাংবাদিক যেমন আছেন, খারাপ সাংবাদিকও আছেন। তেমনি অসৎ আমলা যেমন আছেন, সৎ আমলাও আছেন।

দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখলে মনে হয়, ফেসবুকের সবাই সত্যবাদী যুধিষ্ঠির, সততার পরাকাষ্ঠা। আর সব পেশার মানুষ খারাপ। আমলাদের সম্পর্কে প্রচলিত যে ধারণা, তা যদি সত্যি হতো, তাহলে দেশ এতদিনে টিকতে পারত না। পছন্দ করি আর না করি, দেশটা কিন্তু এখন আমলারাই চালায়।

আমলাতন্ত্র যুগে যুগে ছিল, আছে, থাকবে। আমলাতন্ত্র নিয়ে আমাদের আলোচনা-সমালোচনাও আমলাতন্ত্রের সমান বয়সী। তবে সম্প্রতি নানা কারণে আমলাতন্ত্র নিয়ে আলোচনা বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে সচিবালয়ে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে ছয় ঘণ্টা আটকে রাখা, এক উপসচিবের দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তারের পর আমলাতন্ত্র আরেকবার সমালোচনার শিখরে পৌঁছেছে। শুরুতে সাবেক আমলা, বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের কথা বলছিলাম। কারণ তিনি সম্প্রতি আমলাতন্ত্র নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। এম এ মান্নান বরাবরই একটু সরল ধরনের। যা মনে আসে বলে ফেলেন। সম্প্রতি একনেক বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘আমলাতন্ত্র মন্দ নয়। আমলাতন্ত্র ভালো।

আমলাতন্ত্রের বিকল্পও তো নাই। কেউ আমলাতন্ত্রের বিকল্প বের করতে পারেনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন এর বিকল্প বের করতে পারেনি। চীনারা পারেনি। ফেরাউনও পারেনি। খলিফারাও পারেনি। সেই মহান আমলাতন্ত্র আমাদের মাঝেও আছে।’ পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আমি নিজেও একসময় ছোটখাটো আমলা ছিলাম। মনেপ্রাণে এখনও বড় আমলা আছি। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কেটেছে আমলাতন্ত্রের ভেতরে। সেই মহান আমলাতন্ত্রের জন্য তাদের যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে সাভারে, সেটির আধুনিকায়ন, সংস্কার, ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, প্রশস্ত, সবকিছু করব। সেখানে ২০তলা অত্যাধুনিক ভবন হবে। তবে আশা করছি তাদের কাজের গতিও আধুনিকায়ন হবে।’

এই প্রকল্পটি নিয়েই আমার একটু বলার আছে। সাভারে লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র-পিএটিসির সক্ষমতা বাড়াতে ১ হাজার ২০৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে, একনেক যা অনুমোদনও করেছে। এম এ মান্নান বলেছেন, সেটাই চরম সত্যি।

আমলাতন্ত্রের কোনো বিকল্প কেউ কখনও বের করতে পারেনি। তাই ঢালাও গালি না দিয়ে আমলাতন্ত্রকে কীভাবে জনবান্ধব করা যায় তার উপায় বের করতে হবে। সেক্ষেত্রে পিএটিসির ভূমিকাটাই সবচেয়ে বেশি। হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে পিএটিসির অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে তাদের মৌলিক চিন্তায় বদল আনতে হবে। সব আমলাকেই পিএটিসির চৌকাঠ পেরিয়ে আসতে হয়। তাই সেখানে আমলাদের শেখাতে হয় মানবিকতার প্রাথমিক পাঠ।

বিসিএস দিয়েই যেন কেউ প্রশাসক বনে না যান। শেখাতে হবে তারা জনগণের শাসক নয়, সেবক। প্রায়ই পত্রিকায় খবর দেখি, মাঠপর্যায়ের কোনো ছোট আমলাকে ‘স্যার’ না বলায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাদের অনেক কষ্টে, মেধার অনেক পরীক্ষা দিয়ে আমলা হতে হয়, সেটা মানলাম। কিন্তু আমলা হলেই তাদের ‘স্যার’ বলতে হবে কেন। ভয় দেখিয়ে জনগণের সমীহ আদায় করা যাবে না, ভালোবেসে তাদের হৃদয় জয় করতে হবে।

৩৩৩ তে ফোন করে খাবার চাওয়ার অপরাধে এক গরিব মানুষকে ৪০০ লোকের খাবার দেয়ার শাস্তি বা ছাগল ফুলগাছ খাওয়ায় মালিকের জরিমানা করার ঘটনা আমলাতন্ত্র সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাই শুধু তৈরি করবে। আমলারা অবশ্যই আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর হবেন। একই সঙ্গে তাদের মানবিক হতে হবে, দেশের বাস্তবতা বুঝে কাজ করতে হবে।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনপ্রতিনিধিরা নীতিনির্ধারণ করেন। আর আমলারা সেই নীতি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করেন। আমলারা কিন্তু জনপ্রতিনিধি নন, তাই জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিও করতে হয় না। কিন্তু অনেক দিন ধরেই দেশে কার্যকর গণতন্ত্র নেই। জনপ্রতিনিধিরাও আর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তেমন ভূমিকা রাখেন না। দেশ এখন আমলাশাসিত। আমলারাই নীতিনির্ধারণ করেন, তারাই তা প্রয়োগ করেন। সব মিলিয়ে একটা স্বেচ্ছাচারী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এর জন্য আমি আমলাদের ততটা দোষ দিই না। এই পরিস্থিতি আমরাই তৈরি করেছি। ক্ষমতা পেলে কেউ কেউ তো তার অপব্যবহার করতেই পারে। ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ বেয়ে আসে দুর্নীতি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী কানাডার বেগমপাড়ায় বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে এখন এগিয়ে আমলারাই। তবে সবাই তো আর তা করছেন না। কিছু আমলার বিরুদ্ধে ক্ষমতা অপব্যবহার, দুর্নীতির অভিযোগ যেমন আছে, তেমনি শত শত মানবিক, দক্ষ, যোগ্য আমলাও আছে দেশে। তারা আছে বলেই দেশটা এখনও ঠিকঠাকমতো চলছে।

পিএটিসির কাজ হলো তেমন সৎ, দক্ষ, যোগ্য, মানবিক ও দেশপ্রেমিক আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা। তাতেই দেশের লাভ। এ জন্য পিএটিসির জন্য প্রয়োজনে বরাদ্দ আরও বাড়ানো হোক। তবে আবারও বলছি, সেই বরাদ্দে যেন খালি ভবন বানানো না হয়। হার্ডওয়্যারের পাশাপাশি আমলাতন্ত্রের সফটওয়্যারেও পরিবর্তন আনতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি
চীনের বন্ধুত্ব কি নিখাদ?
রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলাভাষার জন্য আত্মদানের ষাট বছর
মহামারিতে বিধি ও তথ্য না মানার সুলুক সন্ধান

শেয়ার করুন

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সংগঠন নয় কেন

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সংগঠন নয় কেন

ইসলাম হেফাজতের নাম করে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের একটি অংশ ১১ বছর ধরে যেভাবে চলছে, সেটি কতটা ধর্মের পবিত্রতাকে রক্ষা করার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়, কিংবা শিক্ষকদের কারও কারও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধন, কিংবা ব্যক্তিগত সুযোগসুবিধা লাভ, বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি করে সেটি এখন গভীরভাবে চিন্তা করার বিষয়। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের অনেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে শুধু যুক্তই নন, অনেকে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীনও আছেন।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে কওমি মাদ্রাসা। দেশে মোট কতটি কওমি মাদ্রাসা রয়েছে, কত শিক্ষক আছেন, ছাত্রসংখ্যা কত, এর পরিচালনা পরিষদ কীভাবে গঠিত হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কাদের অনুমোদনে প্রতিষ্ঠিত হয়, এর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান কোনটি- এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর বাইরের কারও জানা নেই।

কওমি মাদ্রাসার অভ্যন্তরে যারা আছেন তারাও কতটা জানেন-সেটিও কারও জানা নেই। অথচ কওমি মাদ্রাসা দেশের শিক্ষাব্যবস্থারই অন্যতম একটি ধারা। আলিয়া মাদ্রাসাও একটি শিক্ষার ধারা। দেশে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম প্রধান শিক্ষার ধারা।

এগুলোর বাইরেও ভোকেশনাল, টেকনিক্যাল, কৃষি, পলিটেকনিক্যাল, বেসরকারি কেজি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কেজি স্কুলের অনুমোদনকারী ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম খুব একটা জানা যায় না। তবে কওমি মাদ্রাসা ছাড়া অন্য সব ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজস্ব সংগঠন বা সমিতি রয়েছে। বেসরকারি কেজি স্কুল এবং কলেজের মালিকদের সমিতি রয়েছে।

বেসরকারি কেজি স্কুল ও কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের কোনো সমিতির নাম শোনা যায় না। সাধারণত সরকারি-বেসরকারি সব ধরন ও স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজস্ব পেশাগত সুযোগসুবিধা আদায় এবং বাস্তবায়নের জন্য নিজস্ব সমিতি রয়েছে। অনেক সময় একই স্তরে একাধিক সমিতিও কার্যকর থাকতে দেখা যাচ্ছে। একসময় শিক্ষক সমিতিগুলোকে নিজেদের পেশাগত সুযোগসুবিধা লাভের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করতে দেখা গেছে। সরকারের সঙ্গে দেন-দরবার করে শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া আদায় করে নিয়েছে।

বর্তমানে আমরা প্রায় ৩০ হাজারের কাছাকাছি বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল, বেসরকারি কলেজ ও মাদ্রাসাকে দেখছি। এগুলো আগে সরকারি অনুদান খুব একটা পেত না। বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে কিছু অনুদান সরকার থেকে দেয়া হতো। তাতে বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বলতে যা বুঝায় তার অনেকটাই অনুপস্থিত ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছাত্রবেতন সংগ্রহ করে তা থেকে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যা দিতে পারত তাই তাদের বেতন হিসেবে ধরে নেয়া হতো। তারা কোনো জাতীয় স্কেল অনুযায়ী বেতন পেতেন না।

যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয় ভালো ছিল, সেখানকার শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অপেক্ষাকৃত অন্য সমগোত্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কিছুটা ভালো অবস্থানে ছিল। বেশির ভাগ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনদানে খুব একটা সক্ষম ছিল না। অথচ শিক্ষা ও মাদ্রাসা বোর্ড থেকে এগুলোর অনুমোদন দেয়া হতো। কিন্তু শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের বিষয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এর ফলে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধাবীরা শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদ যাদের নিয়োগ দিতেন তাদের বেশির ভাগই এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন ভালো কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারার কারণে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়-উন্নতি ভালো ছিল সেখানে অপেক্ষাকৃত মেধাবীদের সংযুক্তি ঘটেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেও এই ধারা কিছুটা ছিল। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

শিক্ষাবোর্ডের অনুমোদনপ্রাপ্ত বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা নিজেদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে সমিতি গঠন করতে থাকে । সমিতির নেতৃত্বে শিক্ষক কর্মচারীরা দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য আন্দোলন সংগ্রামও করতে থাকেন। একপর্যায়ে প্রায় সব সমিতিই আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এমপিওভুক্ত করাতে সক্ষম হয়। এতে শুরুর দিকে সরকার মূল বেতনের একটি অংশ প্রদান শুরু করে। এভাবেই এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতনভাতা বিভিন্ন সরকার বৃদ্ধি করতে থাকে। বেশ কয়েক বছর আগেই সরকার এমপিওভুক্ত সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের শতভাগ, আংশিক বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাভাতা জাতীয় স্কেল অনুযায়ী প্রদান করতে শুরু করেছে। এর বাইরে বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির ব্যানারে রেজিস্টার্ড-ননরেজিস্টার্ড ইত্যাদি নামে প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ আন্দোলন-সংগ্রাম করে নিজেদের জাতীয়করণ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে।

২৬ হাজারের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয় নতুনভাবে সরকারি বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। এর আগে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু প্রায় ৩৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারীকরণ করেন। এর সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে ২৬,১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন এবং ১ লাখের বেশি শিক্ষক সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতো সমান সুযোগ লাভ করেন।

এখনও মাঝেমধ্যে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে কিছু শিক্ষক সমিতির ব্যানারে প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণ এবং বেসরকারি স্কুল-কলেজের এমপিওভুক্ত করার দাবি জানিয়ে অনেককে আন্দোলন করতে দেখা যায়। এভাবে এমপিওভুক্ত ও জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার মান খুব একটা বৃদ্ধি পায় বলে মনে হয় না। অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে। কম দক্ষ, অনভিজ্ঞ ও দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরি লাভ করে অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী এবং জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা শেষবিচারে মানের সংকট থেকে এখনও বের হতে পারেনি।

এ ব্যাপারে শিক্ষকদের সংগঠনগুলো খুব একটা সোচ্চার নয়। দেশে এখন আগের মতো বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক সমিতির নামধাম ততটা শোনা যায় না। যদিও উপজেলাগুলোতে বিভিন্ন সমিতির অফিস ও কার্যক্রম দৃশ্যমান আছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সমিতির কথা সকলেই অবগত আছেন। অন্যান্য স্তরেও শিক্ষকদের সংগঠন রয়েছে। কিন্তু কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকরা কোনো সমিতির পতাকাতলে আছেন কি না সেটি খুব একটা জানা যায় না। তবে ২০১০ সাল থেকে কওমি মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলাম নামে একটি সংগঠন দেশব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠে।

গত ১১ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে হেফাজতে ইসলাম ‘অরাজনৈতিক ধর্মীয় সামাজিক’ সংগঠন নামে নিজেদের পরিচয় প্রদান করলেও এর কার্যক্রম, দাবিনামা, অংশগ্রহণ ইত্যাদি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশে কোনো স্তরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্রছাত্রীরা এ ধরনের কোনো সংগঠনে অতীত বা বর্তমানে একসঙ্গে যুক্ত হয়েছে-এমন কোনো নজির নেই। কিন্তু হেফাজতে ইসলাম যেকোনো কর্মসূচি প্রদানে যে নজির স্থাপন করে তাতে শিক্ষক ও ছাত্রদের নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে।

২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল এবং ৫ মে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্ররা ঢাকা অবরোধ, সরকার উৎখাত ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করে। এ বছর ২৬, ২৭ ও ২৮ মার্চ হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে মাদ্রাসার শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সরকারি স্থাপনা ধ্বংসের কাজে একসঙ্গে যেভাবে অংশগ্রহণ করেছে সেটি বাংলাদেশের অন্য কোনো স্তরের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যৌথভাবে করার মতো কল্পনা কেউ করতে পারছে না। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তা করেছে।

এটি কতটা আইনসিদ্ধ, নীতিনৈতিকতার মধ্যে পড়ে সেটিও বিবেচ্য বিষয়। ইসলাম হেফাজতের নাম করে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের একটি অংশ ১১ বছর ধরে যেভাবে চলছে, সেটি কতটা ধর্মের পবিত্রতাকে রক্ষা করার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়, কিংবা শিক্ষকদের কারও কারও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন, কিংবা ব্যক্তিগত সুযোগসুবিধা লাভ, বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি করে সেটি এখন গভীরভাবে চিন্তা করার বিষয়। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে শুধু যুক্তই নন, অনেকেই দলের গুরত্বপূর্ণ পদে আসীনও আছেন।

রাজনীতি করার অধিকার বাংলাদেশে যেকোনো মানুষের আছে। কিন্তু সেটি করতে হলে দলের কাজেই নিজেকে যুক্ত রাখা নিয়মসিদ্ধ। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে যারা বিভিন্ন মাদ্রাসায় যুক্ত আছে, তাদের প্রধান কাজ শিক্ষকতা করা, শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে শিক্ষা দেয়া, ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করা। কিন্তু যিনি কোনো একটি মাদ্রাসার শিক্ষকতার একটি পদ অলংকৃত করছেন, তিনি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আবার হেফাজতে ইসলাম সংগঠনেরও নেতৃত্ব কিংবা কর্মকাণ্ডে ভীষণভাবে জড়িয়ে পড়ছেন যা তার মহৎ শিক্ষকতা পেশার দায়িত্ব পালনে মোটেও সহায়ক নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এ ধরনের শিক্ষকদের ইতিবাচক প্রভাবের চাইতে নেতিবাচক প্রভাবই বেশি পড়ে।

বাংলাদেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক শিক্ষকই কর্মরত আছেন, যাদের কেউ কেউ রাজনৈতিক দলের সদস্য কিংবা কর্মী-সমর্থক বলে পরিচিত। তবে ওইসব শিক্ষক তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অন্য শিক্ষক কর্মচারী কিংবা শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ বা বাধ্য করে থাকেন এমনটি শোনা যায় না। বাস্তবেও এটি সম্ভব নয়। কিন্তু কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষকরা তাদের পেশাগত কোনো সমিতি গঠন না করে হেফাজতে ইসলাম নামে যে সংগঠনটি দাঁড় করিয়েছেন এবং গত ১১ বছর যাবৎ দেশে সবচাইতে আলোচিত, সমালোচিত সংগঠন হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছেন সেটি মোটেও কওমি মাদ্রাসার জন্য ভালো কোনো বার্তা বয়ে আনেনি। ২০১৩ সালেও ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের অগ্নিকাণ্ড, বায়তুল মোকাররমের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের লাইব্রেরি পোড়ানো, মতিঝিলে ভাঙচুর, তাণ্ডব, শিশু-কিশোরদের দেশের আনাচকানাচ থেকে নিয়ে আসা, সরকার উৎখাতে তাদের ব্যবহার করার চেষ্টা, একইভাবে ২৬-২৮ মার্চে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক জায়গায় যা করা হয়েছে- তা মোটেও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাজ হতে পারে না। শিক্ষকরা নিজেরাও যেমন এ ধরনের কাজে অংশ নিতে পারেন না, শিক্ষার্থীদেরও তারা এসব কাজে ব্যবহার করতে পারেন না। এটি ধর্মীয় বা সাধারণ কোনো শিক্ষায়ই সমর্থন করে বলে মনে করার কোনো ভিত্তি নেই।

হেফাজতে ইসলামের নেতৃরা মূলতই কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক। তাদের কাছ থেকে সবাই শিক্ষার নানা দিক লাভ করার আশা করেন। কিন্তু যখন তারা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার কার্যক্রম ছেড়ে বাইরের জগতে আইনকানুন ভেঙে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের পথে পা বাড়ান, জড়িয়ে পড়েন, তখন তাদের পেশাগত সীমানা ও মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়। তারাও নিজেদের মহৎ শিক্ষকের মর্যাদার আসনে ধরে রাখতে পারেন না। এমনটির প্রমাণ এখন আমরা কিছুটা দেখতে পাচ্ছি। তবে পত্রপত্রিকায় কওমি মাদ্রাসার অভ্যন্তরের শিক্ষার্থীদের জীবনাচরণের সীমাবদ্ধতা, নানা ধরনের অন্যায়-অনিয়ম, অনাচারের খবর উঠে আসছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনায় আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণ, দেশি ও বিদেশি ব্যক্তি বা সংস্থা থেকে অর্থ-অনুদান লাভ এবং তা নানাভাবে আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহার করা ইত্যাদি অভিযোগ এখন মিডিয়া ও মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত বিষয়।

এর ফলে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের সরল বিশ্বাস অনেকটাই হোঁচট খেয়েছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে অরাজনৈতিক পরিচয়ে যে সংগঠনটি তারা গত ১১ বছর ধরে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেটি বাস্তবেই একটি নিয়ন্ত্রণহীন রাজনৈতিক দলের চরিত্রের ফাঁদে আটকে পড়েছে। সংগঠনের নেতাদের মধ্যে নানা ধরনের উচ্চাভিলাষ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা থেকে কারও পদস্খলনও ঘটেছে। তাদের সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির মৃত্যুর আগে হাটহাজারী মাদ্রাসায় ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে যে ধরনের বিভাজন ও হাঙ্গামা প্রদর্শিত হয়েছে তা ভাবতেও কষ্ট হয়।

তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে তার পেছনে ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিসহ নানা ধরনের অপরাধ প্রবণতা; যা থেকে মুক্ত হতে পারেননি এই মাদ্রাসার অনেক নামীদামি শিক্ষকও।

এরপর তড়িঘড়ি করে সংগঠনের কমিটি গঠন, অন্যদেরকে বাইরে রাখা, এ নিয়ে পালটাপালটি অভিযোগ, আবার নতুন করে কমিটি গঠন, এর বিপরীতে নতুন কমিটি গঠন- এ এক দীর্ঘ বিতর্ক লড়াইয়ে হেফাজতের নেতৃত্ব এখন দেশে বিতর্কের এমন এক জায়গায় চলে গেছে যেখান থেকে বের হওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়।

যদি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের পেশাগত কিংবা শিক্ষার সুযোগসুবিধা সৃষ্টি করার জন্য একটি পেশাজীবী সংগঠন তথা কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি গঠন করতেন, সেটিকে অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের গঠনতন্ত্র মোতাবেক পরিচালিত করার উদ্যোগ নিতেন, তাহলে তাদের কওমি মাদ্রাসাগুলো প্রতিষ্ঠানগতভাবে যেমন লাভবান হতো, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে কিংবা পড়াশোনা করে দেশ ও জাতির কাজে আত্মনিয়োগ করতে সক্ষম হতেন।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি ধারাসমূহ যেভাবে নানা সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এখন সম্মুখের দিকে অগ্রসর হওয়ার মতো একটি পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে কিংবা হচ্ছে, কওমি মাদ্রাসাও সে ধরনের পেশাজীবী সংগঠনের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য স্তরে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পেত। শিক্ষাব্যবস্থার যেকোনো ধারাই শিক্ষার নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলায় পরিচালিত হতে হয়। কওমি মাদ্রাসার হেফাজতে জড়িয়ে লাভের চাইতে ক্ষতি বেশি হয়েছে। এই আত্মোপলব্ধি তাদেরকে এখন বিশেষভাবে করা উচিত। কোনটি তাদের পথ? সমিতি, নাকি ‘অরাজনীতির নামে রাজনৈতিক সংগঠন’?

লেখক: গবেষক, অধ্যাপক।

আরও পড়ুন:
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি
চীনের বন্ধুত্ব কি নিখাদ?
রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলাভাষার জন্য আত্মদানের ষাট বছর
মহামারিতে বিধি ও তথ্য না মানার সুলুক সন্ধান

শেয়ার করুন

১১ জুন একটি ঐতিহাসিক দিন

১১ জুন একটি ঐতিহাসিক দিন

শেখ হাসিনার মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সেদিন গণতন্ত্রও মুক্তি পায়। ক্ষমতাসীনরা শেখ হাসিনাকে দেশের বাইরে রেখে ৫-৭ বছর ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল। শেখ হাসিনা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন। সে সময় মিথ্যা মামলা দিয়ে অপমান ও হেনস্তা করা হয়। দেশের স্বার্থে-গণতন্ত্রের স্বার্থে মুজিবকন্যা সব নির্যাতন-অপমান সহ্য করে জেলের জীবনই বেছে নেন। অবশেষে ক্ষমতাসীনরা শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়।

১১ জুন বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি আনন্দঘন স্মরণীয় দিন। ২০০৮ সালে এদিন শেখ হাসিনার মুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দি গণতন্ত্রও মুক্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস। শেখ হাসিনার ইতিহাস, গণতন্ত্র রক্ষার ইতিহাস। স্বাধীনতা অর্জন গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্যই বাংলার মানুষ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল।

২০০৮ সালের ১১ জানুয়ারির পর থেকে বাংলাদেশে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে বিভিন্নমুখী অপতৎপরতা শুরু হয়। সরকারসহ বিভিন্ন মহল দেশের দুরবস্থার জন্য রাজনীতি ও রাজনীতিকদের দায়ী করতে থাকে। ‘মাইনাস-টু ফর্মুলা’র নামে দেশের রাজনীতি থেকে দুই শীর্ষ নেত্রীকে নির্বাসনে ঠেলে দেয়ার পাঁয়তারা শুরু হয়। মাইনাস-টু ফর্মুলার কথা বলা হলেও আসলে মূল টার্গেট ছিল শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ।

সাত দশকের ইতিহাসে বার বার ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে আওয়ামী লীগ এবং দলের নেতৃবৃন্দ। অথচ এই দেশ, এই জাতির সবকিছুর অর্জনের মূলে রয়েছে আওয়ামী লীগ। সেই পাকিস্তান আমল থেকে যখনই দলটির ক্ষমতায় যাওয়ার সময় এসেছে, তখনই ষড়যন্ত্র হয়েছে।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে এবং ’৭০-এর পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় যেতে দেয়া হয়নি। ’৮৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগকে স্বৈরশাসক এরশাদ মিডিয়া ক্যু’র মাধ্যমে পরাজিত দেখায়।

২০০১-এর নির্বাচনেও ষড়যন্ত্রের শিকার হয় আওয়ামী লীগ। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়।

জাতির পিতাকে হত্যার তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে জেলখানার নিরাপদ কক্ষে যুদ্ধকালীন সরকারে নেতৃত্বদানকারী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, মন্ত্রী এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের হত্যার ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার দশকে শেখ হাসিনার প্রথম টার্মের শাসনকাল স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচিত। ৫টি বছর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। চিরায়ত ঘাটতির বাংলাদেশ খাদ্যে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণই হয়নি, উদ্বৃত্তও হয়ে যায়। বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পায়।

এতকিছুর পরেও ২০০১ সালে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় যেতে দেয়নি। ২০০১-২০০৬, খালেদা জিয়া-নিজামীদের নেতৃত্বে ৫ বছরের চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দেশটাকে রীতিমতো লুট করা হয়। এমন কোনো নির্যাতন-হয়রানি, কুকর্ম নেই, যা তারা করেনি।

জোটের পাঁচ বছরের অপশাসনের পর ২০০৭ সালে মোটামুটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেও বিপুল ভোটাধিক্যে ক্ষমতায় আসত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও ১৪-দলীয় জোট। শুধু শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার বাইরে রাখার জন্যই খালেদা জিয়া-নিজামীরা সংবিধান লঙ্ঘন করে দলীয় রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়ে তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।

অন্যায় ও অসংবিধানিকভাবে প্রধান উপদেষ্টার পদ দখলকারী প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন ২০০৭-এর ২২ জানুয়ারি একতরফা, অগণতান্ত্রিক ও অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া-নিজামীদের পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্র করেন।

এ সময় খালেদা-নিজামী-ইয়াজউদ্দিন গং ছাড়া জাতি ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট গঠিত হয়।

ড. কামাল, ডা. বি চৌধুরী, জেনারেল এরশাদ, কর্নেল অলি আহমদরাও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোটে শামিল হন। খালেদা-নিজামীদের প্ররোচনায় নির্বাচনের নামে প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন দেশকে গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যান। ওই পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে ড. ইয়াজউদ্দিন অপসারিত হন। দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। ক্ষমতায় আসে ফখরুদ্দীন সরকার। নাটের গুরু ড. ইয়াজউদ্দিন এবং তার দোসর খালেদা জিয়া-নিজামীদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ায় জাতি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।

অসাংবিধানিক হওয়া সত্ত্বেও ফখরুদ্দীন সরকারকে জনগণ বিপুলভাবে অভিনন্দন জানায়। কিন্তু গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার জন্যে দায়ী ড. ইয়াজউদ্দিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতায় রয়ে গেলেন। অথচ দেশ ও জাতিকে বিপর্যয়ের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য ড. ইয়াজউদ্দিনের বিরুদ্ধেই সর্বপ্রথম ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল। কেন এমন হলো? পরবর্তীকালে ইতিহাসবিদরা একদিন তা নিশ্চয়ই খুঁজে বের করবেন।

ফখরুদ্দীন সরকার ক্ষমতায় এসে শুরুতে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। বেশ কটি গণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করায় সরকার জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়।

মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আশা করেছিল, পাঁচ বছরের জোট আমলের সীমাহীন লুটপাট, নির্যাতন-হয়রানি, গ্রেপ্তার, অপশাসন, কুশাসনের জন্য দায়ী ওই সরকার পরিচালনাকারী নেতানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, মতিউর রহমান নিজামী, তারেক রহমান ও মান্নান ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা বানানোর মূল লক্ষ্যই ছিল পুনরায় অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা। কারণ, জোটের পাঁচ বছরে তাদের নেতা-কর্মীরা যত লুটপাট ও অপকর্ম করেছে, তা ’৭৫-পরবর্তী সরকার থেকে ’৯০-এর স্বৈরশাসনামলকেও হার মানিয়েছে। ১১ জুন সেনা-সমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকার শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১১ মাস আগে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে সেনা-সমর্থিত অসাংবিধানিক সরকার শেরে বাংলা নগরে সংসদ ভবন চত্বরে একটি ভবনকে সাবজেল বানিয়ে আটক রাখে।

শেখ হাসিনার মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সেদিন গণতন্ত্রও মুক্তি পায়। ক্ষমতাসীনরা শেখ হাসিনাকে দেশের বাইরে রেখে ৫-৭ বছর ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল। শেখ হাসিনা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন। সে সময় মিথ্যা মামলা দিয়ে অপমান ও হেনস্তা করা হয়। দেশের স্বার্থে-গণতন্ত্রের স্বার্থে মুজিবকন্যা সব নির্যাতন-অপমান সহ্য করে জেলের জীবনই বেছে নেন। অবশেষে ক্ষমতাসীনরা শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়।

জুনের শুরু থেকেই শেখ হাসিনার মুক্তির প্রত্যাশায় সাবজেলের আশপাশে কয়েক দিন ধরেই হাজার হাজার মানুষ ভিড় করে। দুপুরে বিশেষ কারাগার থেকে তিনি বের হন। হাজার হাজার উল্লসিত নেতা-কর্মী শেখ হাসিনার গাড়ির সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ভবনে আসেন। দীর্ঘ ১১ মাস পর প্রিয় নেত্রীকে কাছে পেয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ অগণিত নেতা-কর্মীর মধ্যে উৎসবের আমেজ লক্ষ করা যায়। উৎসবমুখর জনতায় পরিবেষ্টিত শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু ভবন থেকে যান সুধা সদনে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি
চীনের বন্ধুত্ব কি নিখাদ?
রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলাভাষার জন্য আত্মদানের ষাট বছর
মহামারিতে বিধি ও তথ্য না মানার সুলুক সন্ধান

শেয়ার করুন

কারামুক্তির দিনে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন

কারামুক্তির দিনে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন

শেখ হাসিনার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়া, বিএনপির চেয়ারপারসন। আমাদের দেশের রাজনীতির একটি বিশেষ ‘দুষ্টচক্র’ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ‘দুই নেত্রী’ অভিধা চালু করে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে তথা আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে এক পাল্লায় তুলে রাজনীতির বড় ক্ষতি করেছে। দুজনের রাজনীতির মত ও পথ এক নয়। যারা বলেন, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি রাজনীতির মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, তারা আসলে অতিসরলীকরণ দোষেদুষ্ট। পানি এবং আলকাতরার তফাৎ বুঝতে না পেরে রাজনীতিকে যারা স্বার্থ হাসিলের উপায় বলে ভেবে মানুষের মধ্যে মুখরোচক শব্দাবলি ছড়িয়ে দিয়ে অহেতুক কৌতূহল ও আশাবাদ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন, তারা রাজনীতির বড় ক্ষতি করেছেন।

‘ঝুঁকি নিতে না পারলে জীবন মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হয়’– শেখ হাসিনা।

তিনি বার বার ঝুঁকি নিয়েছেন বলেই আজ বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে। তিনি তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য সামনে রেখে ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন বলেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। আজ ১১ জুন তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিন। আজ তার কারামুক্তির দিন।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের এই দিন তাকে সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল।

এর আগে ২০০৭ সালের ১৩ জুলাই তাকে সেনাসমর্থিত বিশেষ সরকার গ্রেপ্তার করে। তাকে গ্রেপ্তার করে রাজনীতিতে কালো অধ্যায়ের সূচনা করতে চেয়েছিল যারা, তারা শেষপর্যন্ত হেরেছে। তিনি জিতেছেন বলে জিতেছে বাংলাদেশ। কারাগার তাকে অবদমিত করতে পারেনি।

বরং তিনি নিজেকে আরও জনসম্পৃক্ত হওয়ার উপায় খুঁজে পেয়েছেন, নিজেকে দেশের জন্য উৎসর্গ করার শক্তি-সঞ্চয় করেছেন, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করেছেন।

কারগার পিতার মতো তার জন্যও শিক্ষাগার হয়েছে। স্বল্পকালের কারাবাস তাকে দীর্ঘকালের জন্য পায়ের নিচে শক্ত ভিত তৈরি করে দিয়েছে।

গ্রেপ্তারের আগে এক খোলা চিঠিতে শেখ হাসিনা দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন-

…‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। যে যেভাবে আছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। মাথা নত করবেন না। সত্যের জয় হবেই। আমি আছি আপনাদের সঙ্গে, আমৃত্যু থাকবো'।

তিনি তার কথা রেখেছেন। তিনি দেশের মানুষের সঙ্গে আছেন সব বাধা পায়ে দলে।

দেশের মানুষও তার কথায় সাহস পেয়েছিলেন, আস্থা রেখে তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রতিকূল পরিবেশে, ক্ষমতাসীনদের লালচোখ উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে জনমত প্রবল হয়ে ওঠায় এবং কারাগারে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তখনকার সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য আমেরিকা যান এবং চিকিৎসা শেষে ২০০৮ সালের ৬ নভেম্বর দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পর শেখ হাসিনা নির্বাচনি প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠন করে। এরপর আরও দুটি নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হয়। শেখ হাসিনা টানা তিন মেয়াদে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। দেশকে এগিয়ে নিয়েছেন নতুন উচ্চতায়।

শেখ হাসিনার রাজনীতিতে আসা এবং পথচলা– কোনোটাই ঝুঁকিমুক্ত নয়। ১৯৭৫ সালে তার বিদেশে অবস্থানকালে তিনি পিতা-মাতা- ভাই-ভাবীসহ স্বজনহারা হন। ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে বাংলাদেশের রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত ধারায় চালানোর অপচেষ্টা নেয়া হয়। সামরিকশাসক জিয়াউর রহমান ঘোষণা দিয়ে রাজনীতিকে রাজনীতিবিদদের জন্য ‘ডিফিকাল্ট' করে তোলার ব্রত নিয়ে সুবিধাবাদী এবং নীতিহীনতার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। জিয়ার রোপিত বিষবৃক্ষ ফল দিয়েছে এবং রাজনীতি এখনও সুস্থধারায় ফিরে আসতে পারছে না।

এক বিশেষ রাজনৈতিক ও দলীয় সংকটের মুহূর্তে ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয় শেখ হাসিনাকে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে শেখ হাসিনা পিতার রেখে যাওয়া দল আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। কিন্তু তার পথচলা কণ্টকমুক্ত ছিল না। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তাকে শারীরিকভাবে হত্যার কমপক্ষে ১৯টি অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ২০০৭ সালে তাকে রাজনৈতিকভাবে ‘হত্যার’ চেষ্টাও সফল হয়নি বলে বাংলাদেশ এখন তার সুযোগ্য নেতৃত্বে চলছে।

২০২০ সালের ১০ জুন জাতীয় সংসদে শেখ হাসিনা বলেছেন-

‘আমি এখানে (বাংলাদেশে) বেঁচে থাকার জন্য আসিনি। জীবনটা বাংলার মানুষের জন্য বিলিয়ে দিতে এসেছি। এখানে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

হ্যাঁ, তিনি নির্ভয়ে তার লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যাচ্ছেন ঘরে-বাইরে শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে। বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক, মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই অব্যাহত রেখেছেন অনেকটা নিঃসঙ্গ শেরপার মতো।

শেখ হাসিনার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়া, বিএনপির চেয়ারপারসন। আমাদের দেশের রাজনীতির একটি বিশেষ ‘দুষ্টচক্র’ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ‘দুই নেত্রী’ অভিধা চালু করে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে তথা আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে এক পাল্লায় তুলে রাজনীতির বড় ক্ষতি করেছে।

দুজনের রাজনীতির মত ও পথ এক নয়। যারা বলেন, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি রাজনীতির মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, তারা আসলে অতিসরলীকরণ দোষেদুষ্ট। পানি এবং আলকাতরার তফাৎ বুঝতে না পেরে রাজনীতিকে যারা স্বার্থ হাসিলের উপায় বলে ভেবে মানুষের মধ্যে মুখরোচক শব্দাবলি ছড়িয়ে দিয়ে অহেতুক কৌতূহল ও আশাবাদ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন, তারা রাজনীতির বড় ক্ষতি করেছেন।

হাসিনা-খালেদাকে এক জায়গায় আনার পথে যে ‘গোড়ায় গলদ’ আছে সেটা বুঝতে না পারলে, রাজনীতির মূল বিরোধগুলোর নিষ্পত্তি না করলে নতুন পথের সন্ধান পাওয়া কঠিন। শেখ হাসিনা একা এবং এককভাবে লড়াই করছেন। সাধারণ মানুষকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাছে পাওয়ার জন্য তাকে কিছু অপ্রিয় এবং সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে বলে অনেকেই মনে করেন। তিনি তা করবেন সে বিশ্বাস মানুষের আছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচারসহ এমন কিছু কাজ তিনি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছেন, যা অন্য কারো পক্ষে করা সম্ভব ছিল না। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলি টানেলসহ এমন সব নির্মাণকাজ সমাপ্তির পথে যেগুলো এক নতুন বাংলাদেশের পরিচয়বাহী। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রেকর্ড পরিমাণ রিজার্ভ, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিসহ অনেকক্ষেত্রেই যে ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ আজ বিশ্ববাসীর নজর কাড়ছে তা সবই শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দূরদর্শী ও সাহসী সিদ্ধান্তের কারণেই সম্ভব হয়েছে।

সে জন্যই এটা বলা যায় যে, শেখ হাসিনার সফলতা আসলে বাংলাদেশেরই সাফল্য। তাই তার সামনে জয়লাভের বিকল্প কিছু নেই। আজকের দিনে তাকে অভিনন্দন! তার সুস্থ দীর্ঘ জীবন কামনা করি।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি
চীনের বন্ধুত্ব কি নিখাদ?
রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলাভাষার জন্য আত্মদানের ষাট বছর
মহামারিতে বিধি ও তথ্য না মানার সুলুক সন্ধান

শেয়ার করুন

কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হলো, ইয়াজউদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকার শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই। আর বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয় ৫৮ দিন পরে ৩ সেপ্টেম্বর। অথচ জামায়াত-বিএনপি সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে দেশের সব পেশার মানুষ তখনও ক্ষুব্ধ ও ঐক্যবদ্ধ ছিল। সে সময় বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক অংশীদার মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ ইবরাহিম বলেছিলেন, ‘হাওয়া ভবন দুর্নীতির ওয়ান স্টপ সার্ভিস।’ সেই সরকারের প্রধানকে আগে গ্রেপ্তার না করে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিবস আজ। দীর্ঘ ১১ মাস কারাবন্দি থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ জুন সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন তিনি। উল্লেখ্য, ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় হয়রানি ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

কারাগারে থাকাকালে শেখ হাসিনা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময় চিকিৎসার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তার মুক্তির দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠন ও দেশবাসীর আন্দোলন, আপসহীন মনোভাব এবং অনড় দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

এই মুক্তির মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে আসে। বিকাশ ঘটে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের। তার নেতৃত্বেই বাঙালির গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়। সেই থেকেই তিনি আমাদের গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা, মাদার অব হিউম্যানিটি শেখ হাসিনা।

উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ভোরে তৎকালীন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্দেশে ধানমন্ডির বাসভবন সুধা সদন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথমে তাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগারে আটক রাখা হয়। অবশ্য এর আগে ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর ১৯৮৩, ১৯৮৫ এবং ১৯৯০ সালেও তিনি রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ করেন।

বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে মুক্তি দেয়ার দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। মুক্তি পেয়েই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যান তিনি। ২০০৮ সালের ৬ নভেম্বর দেশে ফিরলে স্থায়ী জামিন দেয়া হয় তাকে। পরে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি তার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠিত হয়।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তথা ওয়ান ইলেভেনের পর ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা অসুস্থ পুত্রবধূকে দেখতে যুক্তরাষ্ট্র যান। তারপর থেকে দেশের ভেতরে ক্ষমতালোভী-উচ্চাভিলাষী একটি চক্র তাকে দেশে ফিরতে না দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

প্রথমে একজন ঠিকাদারকে দিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দেয়া হয়। এফআইআরে নাম না থাকা সত্ত্বেও জামায়াত-শিবিরের দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়। চাঁদাবাজির বানোয়াট ও কল্পিত মামলাটি দায়ের করা হয় ৯ এপ্রিল। সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলাটি আইনগতভাবে মোকাবিলার জন্য তিনি সফর সংক্ষিপ্ত করে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে দেশে ফিরে আসার প্রস্তুতি নেন। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুল মতিন শেখ হাসিনাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, তাড়াহুড়ো করে দেশে ফেরার প্রয়োজন নেই। বলা হয়, তিনি যেন তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষ করে নির্ধারিত সময়ে দেশে ফেরেন।

প্রভাবশালী ওই উপদেষ্টা সাংবাদিকদের আরও বলেন, শেখ হাসিনার মর্যাদা ও সম্মানহানির কোনো কিছুই তার সরকার করবে না। এমনকি প্রেসনোট জারির আগের দিন ১৭ এপ্রিলও তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে না দেয়ার কোনো সিদ্ধান্ত তার জানা নেই। আবার প্রেসনোট জারির পর সাংবাদিকরা তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি বলেন, প্রেসনোটের প্রসঙ্গে তার কোনো বক্তব্য নেই। সবচেয়ে বিস্ময়কর বক্তব্য দিয়েছিলেন আইন ও তথ্য উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। উল্লেখ্য, সরকারি প্রেসনোটে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি উল্লেখ করা হয় এবং তার দেশে ফিরে আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। প্রেসনোট ইস্যু করার পর শেখ হাসিনা বিভিন্ন দেশের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেন।

একই দিন রাতে বাংলাদেশের মিডিয়ায় শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ফলে দেশের কোনো টিভি চ্যানেল বা পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুকন্যার সেদিনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে দেয়া হয়নি। সরকার তার ওপর নিষেধাজ্ঞার খবরটি দ্রুত বিভিন্ন সংস্থা ও কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেয়।

বিমান ও স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। অপরদিকে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করার পর উপদেষ্টা জেনারেল মতিন এবার সুর বদলে সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

২২ এপ্রিল ২০০৭ বিশ্বের প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় দৈনিক শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে নিষেধাজ্ঞা-সম্পর্কিত রিপোর্ট ছেপেছিল। ২৫ এপ্রিল ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ শেখ হাসিনাকে বোর্ডিং পাস না দেয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে। তারা জানিয়েছিল, বাংলাদেশ এভিয়েশন অথরিটির এক লিখিত নোটিশের কারণেই এই ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।

২০০৭ সালের ৩ মে বিশ্বখ্যাত পত্রিকা ‘আউট লুক’-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে তার সংগ্রামের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ব্যক্ত করেছিলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘অসাংবিধানিক সরকার আমার জনপ্রিয়তা সহ্য করতে পারছে না। এই দেশে আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে, মাকে হত্যা করা হয়েছে, আমার ভাইদের ও পরিবারের বেশ কিছু সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও আমি আমার দেশে ছিলাম, জনগণের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমি ৫ বছর ক্ষমতায় ছিলাম, আমার সরকার ছিল খুবই সফল। আমরা বেশ কিছু সমস্যার সমাধান করেছি। গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা ছিল; কিন্তু আমার সময়ে ভারতের সঙ্গে ৩০ বছরের পানিবণ্টন চুক্তি সই হয়। আমাদের সময় খাদ্য উদ্বৃত্ত ছিল, জিডিপি বেড়েছিল, মুদ্রাস্ফীতি কমেছিল।’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আছে তার দায়িত্ব হলো জাতীয় নির্বাচন করা। কিন্তু তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে চায়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ৯০ দিনের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠান করা উচিত।’

৭ মে ২০০৭ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক অনন্য দিন। দিনটিতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে দ্বিতীয়বার শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

প্রথম ফিরে আসার দিন ছিল ১৭ মে ১৯৮১। আর ২০০৭ সালের এদিনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারঘোষিত নিষেধাজ্ঞা ও মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে বাংলাদেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে তার ঐকান্তিক দৃঢ়তা, সাহস ও গণতন্ত্রকামী দেশবাসীর চাপে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়। পরবর্তী সময়ে ৭ মে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় ফিরে এলে লাখো জনতা তাকে অভ্যর্থনা জানায়।

ঢাকা বিমানবন্দর থেকে মিছিল শোভাযাত্রাসহকারে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবনে নিয়ে আসা হয়। সেদিন নানা বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও লাখো জনতাকে রোখা যায়নি শত প্রচেষ্টায়। দেশে ফিরে জনগণের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় শুরু হয় তার নবতর সংগ্রাম।

সেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশে ফিরে আসতে না পারলে এ দেশে রাজনীতিতে নিষ্ঠুর-নৈরাজ্য বিরাজ করত। অগণতান্ত্রিক সরকার অতীতের মতো দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুযোগ করে নিত। কিন্তু তারপরও থেমে থাকেনি ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র। শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য হাজির করা হয় ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’।

রাজনৈতিক কর্মী নয়, একজন সংবাদকর্মী হিসেবে সে সময় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসার আন্দোলনে অন্যদের মতো নিজেও সম্পৃক্ত ছিলাম। আমি তখন শেখ রেহানার মাধ্যমে প্রকাশিত ও সম্পাদিত সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কাজ করি।

অফিস ছিল ধানমন্ডির ৩২ নং সড়কে (জাতির পিতার পাশের বাড়িতে)। সেখান থেকে বেবী আপার (প্রয়াত সাংবাদিক বেবী মওদুদ) নেতৃত্বে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে একটি ‘ট্যাবলয়েট’ (রঙিন) প্রকাশ করা হয়, সঙ্গে কিছু লিফলেটও। পরবর্তী সময়ে আরও কিছু লেখা সংযোজন করে এটি গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করা হয়। ট্যাবলয়েটে অন্যদের মতো আমারও একটি প্রতিবেদন ছিল। প্রকাশের পর এটি প্রচারে আমরা বিচিত্রাকর্মীরা (জসিম ভাই, ওয়ালিদ ভাই, চম্পকদা, স্বপনদা, বিল্লাল, মনিরসহ আরও অনেকে। সবার নাম এ মুহূর্তে মনে করতে পারছি না) নানা স্পটে কাজ করেছিলাম। সময়ের স্রোতে অপ্রতিরোধ্য হলেও সেই স্মৃতি আজও অমলিন।

২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ইয়াজউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পূর্বমুহূর্তে জাতির উদ্দেশে তিনি একটি চিঠি লিখে যান; যা পরদিন জাতীয় দৈনিকগুলো ফলাও করে প্রকাশ করে। সেদিন শেখ হাসিনা নির্ভীকচিত্তে জাতির উদ্দেশে অবিস্মরণীয় উক্তি করেছিলেন-

‘…অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। যে যেভাবে আছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। সত্যের জয় হবেই। আমি আছি আপনাদের সঙ্গে, আমৃত্যু থাকব। আমার ভাগ্যে যা-ই ঘটুক না কেন, আপনারা বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যান।’

সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হলো, ইয়াজউদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকার শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই। আর বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয় ৫৮ দিন পরে ৩ সেপ্টেম্বর। অথচ জামায়াত-বিএনপি সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে দেশের সব পেশার মানুষ তখনও ক্ষুব্ধ ও ঐক্যবদ্ধ ছিল।

সে সময় বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক অংশীদার মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ ইবরাহিম বলেছিলেন, ‘হাওয়া ভবন দুর্নীতির ওয়ান স্টপ সার্ভিস।’ সেই সরকারের প্রধানকে আগে গ্রেপ্তার না করে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৫৮ দিন পরে খালেদা জিয়াকে বাধ্য হয়ে গ্রেপ্তার করেছিল; কারণ শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এককাট্টা হয়ে গিয়েছিল। ঢাকা শহরের প্রায় ২৫ লাখ মানুষ শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর করে। তা একসময় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তখন একটা বিষয় স্পষ্ট ছিল যে, অগণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান টার্গেট ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। অথচ বিএনপি-জামায়াত জোটের অপশাসনের কারণেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ওয়ান ইলেভেন এসেছিল।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের একতরফা সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশে জারি হয় জরুরি অবস্থা। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবরণে গঠিত হয় সেনানিয়ন্ত্রিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’। সরকারের প্রায় দুই বছরে সংস্কারপন্থী নামে দল ভাঙা-দল গড়ার ‘খেলা’ও ওই সময়ে দেখেছে জনগণ।

শেখ হাসিনা তার ১১ মাসের কারাজীবন সৃজনশীল রাজনৈতিক চিন্তায় পার করেছেন। দেশ ও মানুষের কল্যাণে নির্জন কারাগারে তিনি জনগণের কল্যাণ চিন্তা করেছেন। এক স্মৃতিচারণায় শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার যে পরিকল্পনা, তা সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কারাগারে নিঃসঙ্গ দিনগুলোতেই তৈরি করেছিলেন তিনি।

শত বাধাবিপত্তি, প্রতিকূলতা ও হত্যার হুমকি উপেক্ষা করেও শেখ হাসিনা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য অবিচল সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। আজকের গণতান্ত্রিক ও জনমুখী বাংলাদেশকে অনেক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে এগোতে হয়েছে, হচ্ছে। ষড়যন্ত্রকারীরা থেমে নেই। শত বাধা ও ষড়যন্ত্র পাশ কেটেই শেখ হাসিনা গত এক যুগে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে এক সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন।

এখনও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গভীর ষড়যন্ত্রের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে দেশ। সম্প্রতি হেফাজতসহ নানা অরাজক ঘটনাবলিই তার প্রমাণ। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে বের করতে হবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই।

মনে রাখা দরকার, সেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যার মুক্তি না হলে অগণতান্ত্রিক সরকার অতীতের মতো দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকত, স্বাধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতো না, দেশ থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূল হতো না, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হতো না, এগোত না উন্নয়নের ধারা। সে কারণে বাঙালি ও বাংলাদেশের রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে আজকের দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনটি কেবল শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিবসই নয়, এটা গণতন্ত্রেরও ফের মুক্তি দিবস।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি
চীনের বন্ধুত্ব কি নিখাদ?
রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলাভাষার জন্য আত্মদানের ষাট বছর
মহামারিতে বিধি ও তথ্য না মানার সুলুক সন্ধান

শেয়ার করুন

বন্দিজীবনকে কাজে লাগিয়েছিলেন উন্নত দেশ গঠনে

বন্দিজীবনকে কাজে লাগিয়েছিলেন উন্নত দেশ গঠনে

২০০৭ সালের ১৬ জুলাই থেকে টানা ১১ মাস কাটে জেলখানায়। কিন্তু জেলে বা অন্তরিন থাকার সময়টি তিনি কাটিয়েছেন রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যৎ সরকারের কর্মসূচি প্রণয়নের কাজে। একই সঙ্গে তিনি লেখনী চালিয়ে গেছেন এবং প্রকাশের জন্য তৈরি করেছেন বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, আমার দেখা গণচীনের মতো কালজয়ী গ্রন্থ।

‘সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি’- বাংলা একাডেমি প্রকাশিত আমার এ গ্রন্থে ২০০৮ সালের উল্লেখযোগ্য ঘটনা উল্লেখ রয়েছে এভাবে- শেখ হাসিনার মুক্তি, খালেদা জিয়ার মুক্তি, জরুরি আইন প্রত্যাহার এবং সাধারণ নির্বাচন : ১৪ দলের বিপুল বিজয়।

শেখ হাসিনা মুক্ত হয়েছেন- এ কথার অর্থ হচ্ছে তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার সময় তিনি ছিলেন জার্মানিতে। এরপর প্রায় ৬ বছর তাকে কাটাতে হয় নির্বাসনে। জিয়াউর রহমান তাকে বাংলাদেশে আসতে দেননি। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরার পর এইচ এম এরশাদের শাসনামলে তাকে কয়েক দফা নিজ বাসগৃহে আটক রাখা হয়।

১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির পর বন্দি করে রাখা হয় ক্যান্টনমেন্টে। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই থেকে টানা ১১ মাস কাটে জেলখানায়। কিন্তু জেলে বা অন্তরিন থাকার সময়টি তিনি কাটিয়েছেন রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যৎ সরকারের কর্মসূচি প্রণয়নের কাজে। একই সঙ্গে তিনি লেখনী চালিয়ে গেছেন এবং প্রকাশের জন্য তৈরি করেছেন বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, আমার দেখা গণচীনের মতো কালজয়ী গ্রন্থ।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশে জরুরি আইন বলবৎ হয় এবং পরদিন ড. ফখরুদ্দীন আহমদ নির্দলীয় সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। জরুরি আইন জারির কারণ হিসেবে অভ্যন্তরীণ গোলযোগে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিপন্ন হওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু সবার জানা ছিল, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে জয়ী হওয়ার যে নীলনকশা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান চূড়ান্ত করেছিলেন, সেটা ব্যর্থ করে দিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখেই এ পদক্ষেপ নেয়া হয়, নিষিদ্ধ হয় সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড।

‘দলনিরপেক্ষ সরকার’ অচিরেই বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার করে। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়তে থাকা সেনাবাহিনীপ্রধান মঈন উ আহমদের পৃষ্ঠপোষকতায় শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূস ১৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা দেন- ‘নাগরিক শক্তি’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল তিনি গঠন করবেন। [বার্তা সংস্থা রয়টার্স, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭]

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। জরুরি আইন জারির পর পরই তিনি লাগাতার অবরোধ-হরতালসহ সব ধরনের আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন। একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জনগণের প্রত্যাশার কথা।

বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর শাসনামলে তাদের পছন্দের বিচারপতি আবদুল আজিজের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ১ কোটির বেশি ভুয়া ভোটার রেখে যে ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছিল, সেটা বাতিল করে নতুন করে ছবিযুক্ত তালিকা প্রকাশের দাবিও তিনি তুলে ধরেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই প্রত্যুষে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বাসভবন সুধা সদন থেকে পুলিশ ৪০টি সিডি, শতাধিক ফাইল, তিনটি মোবাইল ফোন সেট ও বিভিন্ন কাগজ জব্দ করে এবং একটি সিন্দুক সিলগালা করে দেয়া হয়। তাকে আদালতে তোলার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হেনস্তা করেছে- এ দৃশ্য দেশবাসী দেখেছেন টেলিভিশনের পর্দায়। [সমকাল ও প্রথম আলো। ১৭ জুলাই, ২০০৭]

গ্রেপ্তারের মাস দুয়েক আগে ৭ মে তিনি লন্ডন থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কাউন্টার থেকে বের হয়ে এসে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু ভবনের উদ্দেশে রওনা হবার সময় হাতে গোনা কয়েকজন নেতা তাকে স্বাগত জানান।

জরুরি আইনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিশাল জমায়েত করে দলের সভাপতিকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানানোর সুযোগ আওয়ামী লীগের ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা, ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে বাংলাদেশে ফিরতে না দিতেই বিশেষভাবে তৎপর ছিল। কিন্তু বিমানবন্দরের ভেতরের সড়ক থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে নিয়ে গাড়িটি প্রধান সড়কে পড়তে না পড়তেই দেখা গেল অভূতপূর্ব দৃশ্য- দলে দলে আওয়ামী-ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতা-কর্মীরা প্রশস্ত রাজপথ ভরে ফেলল।

এ যেন ম্যাজিক! কেবল একটি স্থানে নয়, বিমানবন্দর থেকে ধানমন্ডি পর্যন্ত ১৫-১৬ কিলোমিটার পথজুড়ে কেবল মানুষ আর মানুষ। কণ্ঠে তাদের স্লোগান জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনার আগমন স্বাগতম স্বাগতম! সাধারণত আওয়ামী লীগ কিংবা এ ধরনের দলের বড় সমাবেশে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতা-কর্মীরা আসেন বাস-ট্রাকে। কিন্তু সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এমনটি ঘটতে পারেনি। কী করে সম্ভব হলো এ ধরনের জমায়েত? তিনি আন্দোলনের পাশাপাশি দলকে সংগঠিত করেছিলেন বলেই এমনটি ঘটতে পেরেছিল।

শেখ হাসিনা ৭ মে নয়, আরও দুই সপ্তাহ আগে স্বদেশে ফেরার জন্য লন্ডন বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। তিনি চিকিৎসার জন্য প্রথমে যান যুক্তরাষ্ট্রে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ভয়ংকর গ্রেনেড হামলার দিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। তাকেসহ গোটা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল সেই অভিশপ্ত দিনে। অন্তত ২৪ জন সেই হামলায় নিহত হন।

এদের মধ্যে ছিলেন কেন্দ্রীয় নেত্রী আইভী রহমান। আহত অন্তত ৫০০। ওবায়দুল কাদের, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ অনেকে আহতের দলে। ট্রাকে অস্থায়ী মঞ্চ বানানো হয়েছিল। শেখ হাসিনাসহ আরও অনেক নেতা ছিলেন মঞ্চে। সমাবেশ ও মঞ্চ লক্ষ্য করে একের পর এক গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। চারদিকে মৃত্যুপথযাত্রীদের আর্তচিৎকার। এর মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকন্যাকে শরীর দিয়ে আড়াল করে রাখেন একদল নেতা-কর্মী। তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও প্রচণ্ড শব্দ ও গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের আঘাতে শ্রবণশক্তি কমে যায় এবং তা স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়।

এ ব্যাধি নিয়েই তিনি ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো আরেকটি প্রহসনের নির্বাচন আয়োজন ব্যর্থ করার সফল আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। জরুরি আইন জারির পর তিনি কানের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যান। ফিরে আসার কথা ছিল লন্ডন হয়ে। সেখান থেকেই বিমানে ওঠার তারিখ নির্ধারিত হয় ২৩ এপ্রিল (২০০৭)। কিন্তু ততদিনে ঢাকায় নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়। অপপ্রচারও চলতে থাকে। কিন্তু তিনি বঙ্গবন্ধুর মতোই অদম্য। মামলার কথা জানতে পেরে ঘোষণা দেন- আদালতে গিয়ে তিনি প্রমাণ করে দেবেন যে, এ মামলা হয়রানিমূলক।

রাজনৈতিকভাবে তাকে দমিয়ে রাখার জন্যই এটা দায়ের করা হয়েছে। ততদিনে ঢাকায় ‘মাইনাস টু’ গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। বলা হচ্ছিল শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক নির্বাসনে পাঠানো হবে। তবে রাজনৈতিক হালচাল যাদের জানা, তারা বলছিল- তত্ত্বাবধায়ক সরকার মাইনাস টু নয়, প্রকৃতপক্ষে চাইছিল শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দিতে। তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য মাইনাস ওয়ান। সামরিক বাহিনী নেপথ্যে থেকে যে সরকার চালাচ্ছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলছে তারা। কিন্তু আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদ একই কথা বলেছিলেন।

জনগণ দেখেছে- এদের কেউ গণতন্ত্র দিতে চাননি। আর তাদের অসৎ উদ্দেশ্য ভণ্ডুল করে দিতে বারবার যে দলটি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে সেটির নাম আওয়ামী লীগ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করা হয়। একই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ চার সহকর্মীকে হত্যা করেও এ দলকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। জরুরি আইনের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা রুখে দাঁড়াবেন, এ নিয়ে শাসকদের সন্দেহ ছিল না। এ কারণে তারা চেয়েছিল রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে তাকে সরিয়ে দিতে।

তাদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক ছিল বাংলাদেশের বাইরে লন্ডন কিংবা অন্য কোনো স্থানে তাকে নির্বাসিত জীবনযাপনে বাধ্য করা। প্রয়োজনে আরাম-আয়েশে জীবন কাটানোর ব্যবস্থা করা হবে। এখন তারেক রহমান যেমন লন্ডনে জীবন কাটাচ্ছেন, অনেকটা সে ধরনের ব্যবস্থাই প্রায় করে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা সে অপচেষ্টা বানচাল করে দেয়। শেখ হাসিনা জানতেন, তাকে বিমানবন্দরেই গ্রেপ্তার করা হতে পারে। কিংবা সুধা সদনে গৃহবন্দি করে রাখা হতে পারে। কিন্তু দৃঢ় সংকল্প তার- ‘নাথিং উইল গো আনচ্যালেঞ্জড।’ তিনি দলকে জানিয়ে দেন- রাজপথে থাকতে হবে।

১৬ জুলাই তিনি গ্রেপ্তার হন। ওই দিনই আদালতে নেয়া হলে দলের নেতা-কর্মীরা ফের স্লোগানমুখর হয়- শেখ হাসিনার মুক্তি চাই। তিনি যতদিন কারাগারে ছিলেন, একের পর এক মামলা করা হয় তার বিরুদ্ধে। কিন্তু তিনি ছিলেন নির্ভীক। কর্মীরাও ছিলেন রাজপথের সাহসী সৈনিক। ১১ মাসের বন্দিজীবন শেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন তিনি মুক্তিলাভ করেন।

তাকে গ্রেপ্তারের এক মাস যেতে না যেতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা রাজপথে নামে। শুরু হয় আন্দোলন ঢাকা বিশ্বদ্যিালয় থেকে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যহারের দাবিতে। ২০ আগস্ট ছাত্রছাত্রীরা রাতভর বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পুলিশের চেকপোস্টে আগুন দেয়া হয়। পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হয় শতাধিক শিক্ষার্থী। কলাভবন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, টিএসসি এলাকা ছিল ছাত্রছাত্রীদের দখলে। পরের দুই দিন আন্দোলনে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা অংশ নেয়।

কারফিউ জারি এবং সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে সেন্সরশিপ আরোপ করেও আন্দোলন থামানো যায়নি। অধ্যাপক ড. হারুন-অর রশিদসহ কজন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৩ জুলাই প্রথম আলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বরাত দিয়ে লিখেছিল- ‘আন্দোলন থামাতে কারফিউ জারির বিকল্প ছিল না।’

এই আন্দোলনের কয়েক দিন পর ৩ সেপ্টেম্বর (২০০৭) বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং তার পুত্র আরাফাত রহমান কোকোকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তারেক রহমান গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ৭ মার্চ। একটি দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবার, যারা দেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল- তাদের গ্রেপ্তারে জনমনে স্বস্তি ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের গ্রেপ্তার ও তড়িঘড়ি বিচারের মাধ্যমে শাস্তি প্রদানের অপচেষ্টার কারণ তাদের বোধগম্য ছিল না।

শেখ হাসিনার বিচারকাজ শুরু হয় বিশেষ আদালতে। শুনানির দিনগুলোতে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী আদালতের আশপাশে জমায়েত হতে থাকে। তার বিরুদ্ধে মামলাগুলো যে ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক, সেটা আইনজীবীরা যুক্তি ও তথ্য দিয়ে প্রমাণ করে দেন। আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনও নানাভাবে দলনেত্রীর মুক্তির দাবিতে সক্রিয় থাকে। সে সময়ে তারা জরুরি আইনের পরিবেশেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার যে সক্ষমতা প্রদর্শন করে, সেটা ছিল অনন্য।

মুক্তির পর শেখ হাসিনা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় যে মহাজোট গঠন করেছিলেন সেটা আরও সম্প্রসারিত করতে পারেন। ফলে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মুখে খালেদা জিয়া হয়ে পড়েন একঘরে।

নির্বাচনের ইশতেহার প্রণয়নেও শেখ হাসিনা অনন্য উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখাতে পারেন। এর প্রস্তুতির জন্য তিনি বন্দিজীবনের সময়টি কাজে লাগিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ সম্পন্ন করা এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ শুরুর দাবির পাশাপাশি সামনে আনেন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গঠনের কর্মসূচি। তরুণ প্রজন্ম এসব ইস্যু লুফে নেয়। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় শেখ হাসিনার জয় ছিল আওয়ামী লীগের ইশতেহারের প্রতি বিপুল সমর্থনের প্রমাণ। এ জয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নবযাত্রা শুরু হয়। ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তে অর্জিত দেশটি এগিয়ে যেতে পারে সম্ভাবনার পথে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।

আরও পড়ুন:
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি
চীনের বন্ধুত্ব কি নিখাদ?
রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলাভাষার জন্য আত্মদানের ষাট বছর
মহামারিতে বিধি ও তথ্য না মানার সুলুক সন্ধান

শেয়ার করুন

ভার্চুয়াল-জগৎ: চেনা পৃথিবীকে করছে অচেনা

ভার্চুয়াল-জগৎ: চেনা পৃথিবীকে করছে অচেনা

সবার আলাদা ভার্চ্যুয়াল-জগৎ; সে জগতে ঠাঁই হয় না স্বজন প্রিয়জন বা আপনজনদের। হারিয়ে গেছে মনোযোগ দিয়ে গল্প শোনার আনন্দ, পাশাপাশি বসে আড্ডা দেবার চমৎকার অনুভূতি, রাতের ঘুম, কাজের প্রতি গভীর মনোযোগ, মেধার বিকাশ হওয়ার ক্ষমতা, অনেক কিছু। আস্তে আস্তে নিঃসঙ্গতা গ্রাস করছে। ঝুঁকে পড়ছে মাদকের ভয়ঙ্কর নেশার দিকে। তৈরি হচ্ছে ভয়ানক জটিল সব মানসিক সমস্যা। এভাবেই আমাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি, মনোযোগ, সময়, স্মৃতি, মনে রাখার ক্ষমতা...সব বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ক্লান্ত হয়ে কমিয়ে দিচ্ছে মস্তিষ্কের নিরঙ্কুশ কার্যকারিতা।

ডুয়ার্সের জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ের অংশবিশেষ, ক্রমান্বয়ে ঢালু হয়ে সমতল হওয়া গাছগাছালি ঘেরা, ঝোপজঙ্গলে ভরপুর কাঠের তৈরি বাড়িঘর আর সোঁদা মাটির গন্ধে ভরা উত্তরের সেই নিভৃত পল্লিতে বেড়ে ওঠার কালে আমার কাছে পৃথিবী বলতেই বাড়ির কাছের খেলার মাঠ, স্কুল, ধরলা নদীর ওপার আর কিছুটা দূরের রেললাইন, যার ওপর দিয়ে দিনেরাতে দুই কি তিনবার ট্রেন যাওয়া আসা করে। সেই পৃথিবীতে আমার মা বাবা, আত্মীয়-স্বজন, স্কুলের বন্ধুরাই ছিল আমার আপনজন, যারা আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখত। ঠিক যেন বিভূতিভূষণের অপু-দুর্গা।
কিছুটা বড় হওয়ার পর পৃথিবীটাও বড় হতে থাকল, দৃষ্টি খানিকটা প্রসারিত হতে থাকল। দেখতে পেলাম সেই ছোট্ট জনপদের বাইরেও পৃথিবী আছে, সে পৃথিবী এত বড় যে, কোনো কূল কিনারার নাগাল পেতাম না।

সেসময় মানুষে মানুষে নৈকট্য দেখেছি, আন্তরিকতা দেখেছি। প্রায় বাড়িতে টিভি ছিল না। পুরো পাড়া বা গ্রামের মানুষ মিলেমিশে একসঙ্গে বসে হয়তোবা একটাই টিভি দেখত বা টিভি দেখার নামে আড্ডা দিত, কুশল বিনিময় করত।

প্রযুক্তির সহজলভ্যতার আগে মানুষ সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে একে অন্যের পাশে দাঁড়াত, ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তখন কেউই এতটা স্বার্থপর আর আত্মকেন্দ্রিক ছিল না । কারো প্রতি অন্যায় আচরণের আগে দশবার ভাবত। সবাই মিলেমিশে এক সমাজের বাসিন্দা হয়েই থাকত।
এরপর এলো নব্বইয়ের দশক। সামাজিক-সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বিপ্লবের যুগান্তকারী কারিগর মুঠোফোনের দশক। প্রযুক্তিকে নিজের পকেটে ঢোকানোর দশক। সেই শুরু। আর পেছনে হাঁটেনি মানুষ। আবারও ছোট হয়ে গেল পৃথিবী, তবে এবার ঠিক আগের মতো নয়। আগে জানার সীমাবদ্ধতার কারণে, আর এবার জানার অবাধ সুযোগের কারণে।
গতির নিরন্তর ধারাবাহিকতায় সেই শিল্প বিপ্লবের কাল থেকেই এই রোবটিক যুগ পর্যন্ত মানুষের জানার আকাঙ্ক্ষার কোনো কমতি ছিল না। প্রযুক্তি দূরকে এনেছে নিকটে, অজানাকে বন্ধনীর ভেতর টেনে এনে গণ্ডিবদ্ধ করেছে। মানুষ চাইলেই এখন সবকিছু নিজের আয়ত্তে নিতে পারে।
যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন আবিষ্কারের ফলে মানুষের চিন্তা-চেতনা ধীরে ধীরে উন্নত হতে থাকল; বেড়ে যেতে থাকল জীবনের গতিও। সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের বিলাসী দ্রব্যগুলো নিজের অধীনে নিতে শুরু করল। নিজের সুখ ছাড়া অন্যকিছু ভাবতে ভুলেই গেল।

এখন কারো কাছেই দুদণ্ড সময় বা ইচ্ছে নেই, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কিংবা বসে দুটো মনের কথা বলার। সবাই ছুটছে অর্থ, ক্ষমতা, আরও প্রভাব প্রতিপত্তি বা অন্যকিছুর পেছনে। এই নিরন্তর চলায় নেই কোনো ক্লান্তি বা সন্তুষ্টি। উত্তরের সেই নিভৃত পল্লিতে আজ আর সোঁদা মাটির গন্ধ নেই, বুনো ফুলের তীব্র ঝাঁঝালো ঘ্রাণ নেই, আছে পাকা রাস্তা, উন্নয়নের চমক আর বৈদ্যুতিক বাতির ঝলমলে আলো।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আমাদের মধ্যকার যে রৈখিক দূরত্ব তা চোখের পলকে অতিক্রম করে প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলতে পারি, দেখতে পারি। দূরদেশে থাকা স্বজনরা আর এখন দূরে নয়, প্রতিমুহূর্তে সংযোগ রাখা যায়, ভালোমন্দের খবর জানা যায়। কী খাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে, আনন্দ-বেদনার সব খবরের সঙ্গী হওয়া যায়। পৃথিবীর বাইরে আর কোথায় বসতি গড়ে উঠতে পারে, মঙ্গলের মাটির রং কেমন, তা-ও ঘরে বসে জানা যায়।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাগলামি, বৃদ্ধ বাইডেনের তরুণ হয়ে ওঠার দৃশ্য... যা কল্প কাহিনিকেও হার মানায়, ভারতীয় কমলা হ্যারিসের বিশ্বের এক নাম্বার দেশের দ্বিতীয় ব্যক্তি হয়ে ওঠার গল্পও আর অজানা নয়।

জলবায়ু পরিবর্তনে আবহাওয়ার নেতিবাচক আচরণের তথ্যও মুহূর্তে জানা যায় যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যাণে।
অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছি আমরা। পঁয়তাল্লিশ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ, সাত শতাংশ জিডিপি, দুই হাজার ডলারের বেশি মাথাপিছু আয় নিয়ে ভারতকে পেছনে ফেলে তরতরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে লাফিয়ে বাড়ছে প্রবৃদ্ধি, গর্বে বুক ভরে ওঠে।

প্রযুক্তির উৎকর্ষতা বাড়ার ফলে মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি কমছে। আগাম সতর্কতার কারণে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রাণহানি কমছে। প্রযুক্তিই এক ফসলি জমিকে তিন বা চার ফসলিতে রূপান্তর করেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এনেছে আশাতীত সাফল্য। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ে মহামারির টিকা আবিষ্কার প্রযুক্তির প্রশ্নাতীত সাফল্য।
তাই প্রযুক্তির সাফল্যগাথা নিয়ে নেই কোনো প্রশ্ন, সংশয় কিংবা অভিযোগ। বরং প্রযুক্তির কল্যাণেই এখন অসম্ভবের পাতাটি ছোট হয়ে আসছে। তবে আলোকের উলটো পিঠে যেমন অন্ধকার আছে, তেমনি প্রযুক্তির সাফল্যে আনন্দ অবগাহনের অপর দিকটিতেও আছে কষ্টকর অনুভূতি, ব্যথা, বেদনার উপাখ্যান। প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় আমাদের অনুভূতি হয়েছে ভোঁতা, ক্ষণস্থায়ী, অতিমাত্রায় সাজানো, লৌকিক।

আবেগের জায়গাটি খুব নড়বড়ে হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধু-বান্ধব, প্রিয়জনের জন্মদিনে ফেসবুকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি, মোহনীয় শব্দের ঝঙ্কার তুলছি। তেমনি মৃত্যু সংবাদে শোক সাগরে অন্যদের ভাসিয়ে নিজেও ভেসে যাচ্ছি। কারো সাফল্যে আনন্দের হিল্লোল বইয়ে দিচ্ছি। এই অনুভূতিগুলো খুব সীমিত সময়ের জন্য, তাৎক্ষণিক। কিছুক্ষণের ভেতর সবই ভুলে যাচ্ছি। অন্তত গোল্ডফিশ মেমোরির চেয়েও কম সময় আমাদের হৃদয়কে আলোড়িত করে। আনন্দ-বেদনা, কষ্ট-দুঃখ, বিস্ময়-ভয় ঘৃণা... সবকিছুই তাৎক্ষণিক।
রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কখন যে ভোর গড়িয়ে সকাল হয়ে দিনের অর্ধেকটাই চলে যায়, সেটা ভাবতেই আবার সন্ধ্যা চলে আসে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি রাতজাগার ক্লান্তিতে একসময় মস্তিষ্কও স্মৃতিশক্তির কার্যক্ষমতাকে ধরে রাখতে পারে না।
প্রযুক্তির কারণে আমরা কাগজে ছাপানো বই পড়তে ভুলেই গিয়েছি। এখন পাতা উলটে পড়ার চেয়ে ই-বুক বা পিডিএফয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পাই। আগে একটা ভালো বই বা পত্রিকার জন্য তীর্থের কাকের মতো প্রতীক্ষা করতাম, এখন স্মার্টফোনের বাটনে চাপ দিলেই চলে আসে, সেই আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের দৈত্যের মতো। যেন যা হুকুম করব, তাৎক্ষণিকভাবে তা-ই এসে হাজির হবে। এখন আমাদের আর অপেক্ষা নেই, প্রতীক্ষা নেই।

তথ্য পাওয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টা নেই। তাই মনে রাখার বা আত্মস্থ করার তাগিদও নেই। আছে তীব্র নিঃসঙ্গতা আর একাকিত্বের জীবনচিত্র। এখন আর পরিবারের সবার একসঙ্গে বসে খাওয়া, টিভি দেখা বা আড্ডা দেয়ার সময় হয় না।
একই বাড়িতে একই পরিবারের সদস্যদের দেখা হয়, কথা হয় কালেভদ্রে। যদিও কখনও একসঙ্গে হয়, সবার হাতে থাকে ডিজিটাল ডিভাইস... ডুবে আছে নিজের জগতে। সবার আলাদা ভার্চ্যুয়াল-জগৎ; সে জগতে ঠাঁই হয় না স্বজন প্রিয়জন বা আপনজনদের।
হারিয়ে গেছে মনোযোগ দিয়ে গল্প শোনার আনন্দ, পাশাপাশি বসে আড্ডা দেবার চমৎকার অনুভূতি, রাতের ঘুম, কাজের প্রতি গভীর মনোযোগ, মেধার বিকাশ হওয়ার ক্ষমতা, অনেক কিছু। আস্তে আস্তে নিঃসঙ্গতা গ্রাস করছে। ঝুঁকে পড়ছে মাদকের ভয়ঙ্কর নেশার দিকে।

তৈরি হচ্ছে ভয়ানক জটিল সব মানসিক সমস্যা। এভাবেই আমাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি,মনোযোগ, সময়, স্মৃতি, মনে রাখার ক্ষমতা...সব বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ক্লান্ত হয়ে কমিয়ে দিচ্ছে মস্তিষ্কের নিরঙ্কুশ কার্যকারিতা। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, ডেটা, ওয়াইফাই, সার্চ ইঞ্জিন অর্থাৎ বিজ্ঞানের বেগের কাছে বন্ধক রেখেছি আমাদের সত্তা, আবেগ আর জীবনবোধের তীব্রতর অনুভূতিগুলোকে। হারিয়ে গেছে হাতে লেখা কাগজের চিঠি আর ডাকহরকরা।

যে চিঠির জন্য হরকরার ডাক শুনতে উৎকীর্ণ হয়ে থাকত প্রিয়তমা স্ত্রী, মা-বাবা আর সবাই। যে চিঠি ছুঁলেই ছুঁতে পারত হৃদয়, বুকের গভীরে মিশিয়ে নিতে পারত গলার ভেতরে দলা পাকানো মুষ্টিবদ্ধ আবেগকে। লোক দেখানো ভালোবাসা নয়, মায়া মমতার প্রগাঢ় বন্ধনে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে আত্মাটাকে অন্তরের গোপন কুঠুরিতে সযত্নে রাখতে পারত সেই প্রিয়জনকে, যার দেখা পাওয়া গেল অনেকদিন পর।
প্রযুক্তির কৃত্রিমতা বিনাশ করছে আবহমানকালের মায়া মমতা প্রেম ভালোবাসাকে। ভেতরে ভেতরে উইপোকায় খেয়ে ফেলেছে আমাদের সব সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞান ও মূল্যবোধের চর্চার বিপরীতে জিপিএ পাঁচকেই মানুষ গড়ার কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে। এখন আমাদের অনেককিছু আছে, কেবল ভালো থাকার বোধটুকুই নেই। সংকুচিত হয়ে পড়েছে জীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো।

আহ! আবার যদি ফেরত আসত ‘সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি’।

লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি
চীনের বন্ধুত্ব কি নিখাদ?
রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলাভাষার জন্য আত্মদানের ষাট বছর
মহামারিতে বিধি ও তথ্য না মানার সুলুক সন্ধান

শেয়ার করুন