বাঙালির স্বাধীন জাতিসত্তা তথা পৃথক জাতি রাষ্ট্রের চেতনার অন্যতম ভিত্তি যদি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে ধরে নেওয়া হয় তাহলেও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় বাঙালির রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবে। তবে, এর বিরোধীদের মধ্যে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যাও কম ছিল না।
তাদের অনেকে আমাদের রাজনীতিতে নেতৃত্বস্থানীয়ও ছিলেন। খাজা নাজিমউদ্দিন ও নুরুল আমিনের নাম সবাই জানলেও ভেতরে ভেতরে তাদের সংখ্যা ছিল প্রচুর। তাদের ধারণা ছিল, সমগ্র পাকিস্তানে উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে তা ইসলাম আর ভূগোলের বিভ্রান্তি নিয়ে সৃষ্ট পাকিস্তানের অখণ্ডতার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
তারা বাংলা ও বাঙালিত্বের মধ্যে হিন্দুয়ানির গন্ধ সবসময়ই পেত। যার ফলে দেখা যায়, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ করা হয় পূর্ব পাকিস্তানে। তারও আগে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময়ও বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধেও এ দেশে প্রচুর লোকের অবস্থান ছিল। ১৯৬৬ সালে যখন ছয় দফা ঘোষণা করা হয় তখনও ছয় দফাকে ভারতীয়দের প্ররোচনায় ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার লোক এ দেশে প্রচুর ছিল। পরবর্তী সময়ে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ও আইয়ুবশাহীর পক্ষে এবং ৭০-এর নির্বাচনে বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের বিপক্ষে প্রচুর বাঙালি অবস্থান নিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘পাকিস্তানের সংবিধান ও গণতন্ত্র সমুন্নত’ রাখতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও নিপীড়নের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছিল হাজার হাজার আলবদর, রাজাকার। জামায়াতে ইসলামীসহ অনেক অতিবাম রাজনৈতিক দল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতা করে পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধে নেমেছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দুনিয়ার অধিকাংশ দেশই আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিরোধিতাকে পরাজিত করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এ জাতি বিজয় অর্জন করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। পরাজিত হয় ৫২, ৫৪, ৬১, ৬৬, ৬৯, ৭০-এর বাঙালি চেতনার বিরুদ্ধাবলম্বনকারী শক্তি।
কিছুদিনের জন্য পরাজিত শক্তি চুপচাপই ছিল, কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে পুনরায় ক্ষমতাসীন হয় দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের বিরোধীপক্ষ ৭১-এর পরাজিত শক্তি। আসলে ওই দিন যারা রাষ্ট্রক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে তারা মূলত আবার পূর্ব পাকিস্তানকেই কায়েম করে। মোশতাক, জিয়ার নেতৃত্বে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন হয় আজীবন বাঙালিত্বের বিরোধিতাকারী অপশক্তি। ইতিহাসের চাকা ঘুরতে থাকে পেছনের দিকে। ১৯৭৬ সালের ৩ মে এক ফরমান জারি করে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নিষিদ্ধ সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনর্বাসিত করেন। রাজনীতিতে নিয়ে আসা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীকে।
১৯৭৬ সালের ২১ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমের কাছ থেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ কেড়ে নিয়ে কিছুদিন পর স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে আইয়ুবীয় কায়দায় হ্যাঁ-না ভোটে ৮৮.৫ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতিতে ৯৮.৮৮ শতাংশ ভোট তার পক্ষে দিয়েছে বলে প্রচার করেন। ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই পিপিআর ঘোষিত হওয়ার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হয়। যদিও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতায় আরও দুটি আওয়ামী লীগ তৈরির চেষ্টা করা হয়। আওয়ামী লীগে একাধিক বিভাজন সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু সময়ের পরীক্ষায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মূল আওয়ামী লীগই টিকে যায়।
সামরিক শাসনের মধ্যে সেনানিবাসে বসে রাষ্ট্রীয় অর্থে উচ্চাভিলাসী ও ক্ষমতালিপ্সু সামরিক-বেসামরিক পাকিস্তানপন্থি দালাল ও সুবিধাবাদী দলছুট রাজনীতিকদের নিয়ে প্রথমে ‘জাগো দল’ পরে ‘বিএনপি’ গঠন করা হয়। ১৯৭৭ সালের ৯ এপ্রিল সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকা অবস্থায় জিয়াউর রহমান জাগো দলে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালের ১ মে থেকে উন্মুক্ত রাজনীতি শুরু হয়। জিয়া নির্বাচন সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে কেবল সেনাবাহিনী প্রধানের রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন ব্যাপক কারচুপিমূলক নির্বাচনে ৭৮.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জিয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
‘রাজনীতি রাজনীতিকদের জন্য ডিফিকাল্ট’ করার রাজনীতির প্রবর্তক ও ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ অর্থনীতির জনক জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের ব্যাপক জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনে ২০৭টি আসন পেয়ে ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত বিএনপি সংসদ দখল করে। প্রথমে মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে সিনিয়র মন্ত্রী এবং পরে ১৯৭৯ সালের ১২ মার্চ তিনি মারা গেলে পাকিস্তানপন্থি মুসলিম লীগ নেতা শাহ্ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। বাংলাদেশকে পাকিস্তানিকরণের ষোলকলা পূর্ণ করলেন জিয়াউর রহমান। পুরো দেশ চলে গেল পাকিস্তানি ভাবধারার লোকদের দখলে। বাকি থাকল কেবল পতাকা আর মানচিত্রটি, জাতীয় সংগীতটি বদলানোর চেষ্টার ধৃষ্টতাও দেখালেন তারা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বলবৎ হওয়া সামরিক আইন ও সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করা হয় ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল।
১৯৮১ সালের ১৩-১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সময় ভাগ্যক্রমে বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনা নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন দিল্লিতে। সভাপতি পদ গ্রহণে শেখ হাসিনাকে রাজি করানো এবং দেশে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগের অংশ হিসেবে দিল্লিতে একাধিক বৈঠকে বসেন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। তাদের মধ্যে ছিলেন আবুল মালেক উকিল, ড. কামাল হোসেন, জিল্লুর রহমান, আবদুল মান্নান, আবদুস সামাদ আজাদ, এম কোরবান আলী, জোহরা তাজউদ্দীন, সাজেদা চৌধুরী, ডা. এস এ মালেক, আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ।
২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দিল্লিতে কয়েক দফা বৈঠক হয় আওয়ামী লীগ নেতবৃন্দের। ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রতিরোধের জন্য পাকিস্তানপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিএনপি দেশব্যাপী প্রচারণা শুরু করে। তারা সারাদেশে প্রচুর লিফলেট ও হ্যান্ডবিল বিতরণ করে। জয় ও পুতুল জলবসন্তে আক্রান্ত হওয়ায় শেখ হাসিনার ঢাকা প্রত্যাবর্তন কয়েকদিন বিলম্বিত হয়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দুপুর ১২টায় পুতুলকে নিয়ে ঢাকায় আসেন শেখ হাসিনা। কিছুটা হলেও ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণের মতো। ওই দিন বঙ্গবন্ধুর অবতরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক প্রজাতন্ত্রটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল। শেখ হাসিনার ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণের মধ্য দিয়ে যে ভিত্তিকে উপড়ে ফেলার চেষ্টায় নড়বড়ে করে ফেলা হয়েছিল তা পুনঃগ্রথিত হওয়ার যাত্রার শুভসূচনা।
শেখ হাসিনাকে পেয়ে বাঙালি তার ‘বাঙালিত্ব’ ও ‘বাংলাদেশকে’ ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বাঁধল। আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয় ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে। জনস্রোতে কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল। অনেক ঝুঁকি নিয়েই অবতরণ করেছিল শেখ হাসিনাকে বহনকারী ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ৭০৭ বোয়িং বিমানটি। লাখো লাখো মানুষ রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়েছিল। গগনবিদারী স্লোগানের মধ্যে বেরিয়ে আসেন সাদা রংয়ের ওপর কালো ডোরাকাটা তাঁতের মোটা শাড়ি পরা প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তখন কাঁদছিলেন, প্রকৃতিও একই পথ ধরল। চারদিক অন্ধকার হয়ে বৃষ্টি শুরু হল, সঙ্গে ঝড়। ট্রাক ও মিছিল চলছিল খুব ধীরগতিতে।
সেই মিছিলে যোগ দেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। মিছিল বনানী কবরস্থান হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউতে আসতে তিন ঘণ্টা সময় লাগল। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় যখন শেখ হাসিনা গণসংবর্ধনার মঞ্চে দাঁড়ালেন তখনও প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দাঁড়িয়েছিল কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষ। শেখ হাসিনা কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবেগময় ভাষণ দেন। তবে ভাষণে দৃঢ়তার কোনো অভাব ছিল না। আওয়ামী লীগের মতো স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী বৃহৎ সংগঠনটিকে নেতৃত্বদানে যে তিনি নিশ্চিতভাবে সফল হবেন তার বক্তৃতায় সে লক্ষণই পরিলক্ষিত হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য আমি এসেছি। আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’
শেখ হাসিনার আগমন গণজোয়ার নিয়ে আসে সারাদেশে। হতাশাগ্রস্ত আওয়ামী লীগ কর্মীরা সুসংগঠিত হতে শুরু করে। বিপন্ন যে জাতি দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের সব অর্জন হারাতে বসেছিল, তাদের মনে আবারও হারানো মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ফিরে পাওয়ার আশা ফিরে আসে। শুরু হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের পথ চলা।
এরই মধ্যে ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনী অভ্যুত্থানে নিহত হন। অবশ্য এটি ছিল জিয়ার আমলে অনেক সামরিক অভ্যুত্থানের একটি। ৭৫ থেকে ৮১ সাল পর্যন্ত সময়ে সেনাবাহিনীতে বহু অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানে প্রাণ দিতে হয় হাজার হাজার সেনাসদস্যকে। তাদের অনেককেই বিনাদোষে জিয়াউর রহমান হত্যা করেছিলেন বলে বহু প্রমাণ আছে।
জিয়াউর রহমানের হত্যার মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের অবসান হল না, বরং উল্টো ‘হেলিকপ্টার-সানগ্লাস-সাফারির’ জায়গায় জেঁকে বসল ‘ছেঁড়া গেঞ্জি ও ভাঙা সুটকেস’ বাহিনী। কালুরঘাট এলাকা থেকে কথিত জিয়ার লাশের বাক্স ঢাকায় এনে লুই আই ক্যানের স্থাপত্য নকশার চরম বিচ্যুতি ঘটিয়ে মাজার নির্মাণ করা হল পবিত্র সংসদ এলাকায়। পাঠক লক্ষ করবেন জিয়ার কথিত দ্বিতীয় কবরস্থানকে মিডিয়াতে এবং বিএনপির পক্ষ থেকে ‘মাজার’ হিসেবে প্রচার চালানো হয়। অবশ্য জিয়ার মাজার তৈরির আগেই সংসদ ভবন এলাকায় সামনের দিকে আরেক কোনায় দখল নেয় সবুর খানসহ পাকিস্তানপন্থি কুখ্যাত রাজাকারের দল, সেটাও করেছিলেন জিয়াউর রহমান পরিকল্পিতভাবেই।
১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর ভোট কারচুপি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিচারপতি সাত্তারকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে নিয়ে আসে বাঙালির ইতিহাসের আরেক খলনায়ক এইচ এম এরশাদ। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ড. কামাল হোসেনকে প্রার্থী মনোনীত করেছিল। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ‘ছেঁড়া গেঞ্জি আর ভাঙা সুটকেস’ বাহিনীর শিখণ্ডী বৃদ্ধ সাত্তারকে সরিয়ে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। এরশাদ ক্ষমতা দখল করে জিয়ার পাকিস্তানি অসমাপ্ত কাজে নিবিড়ভাবে হাত দেন। ‘মাজার-পীর ও লেডি’ সংস্কৃতির নব উত্থান ঘটে রাজনীতিতে। চরম ভণ্ডামির অংশ হিসেবে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম কায়েম করেন। বিভিন্ন পীর, বিশেষ করে আটরশির পীর চলে আসেন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কে হবেন- সে সিদ্ধান্ত আসত আটরশি থেকে। কথিত আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট কর্তৃক প্যানেল নির্বাচনের রাতেই এক প্রার্থী চলে গিয়েছিলেন আটরশি, কিন্তু অধিকতর চতুর অন্যজন প্রতিদ্বন্দ্বী বহর আটরশি পৌঁছার আগেই এরশাদের এক বন্ধুকে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগ সই করিয়ে নেন।
মাদ্রাসা ও মসজিদকে ব্যবহার শুরু করেন রাজনৈতিক লুণ্ঠনের আবরণ হিসেবে। বেঁচে থাকলে যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারে যার ফাঁসি হতো, এমন রাজাকার নেতা মাওলানা মান্নানকে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আনোয়ার জাহিদরা পাকিস্তানিকরণের সিপাহসালার হিসেবে যোগ দেন এরশাদ বাহিনীতে। একই ধারাবাহিকতায় চুরির দায়ে এরশাদ জেল খাটার পর খালেদা জিয়ার উজির বাহিনীতে এসে শামিল হন আলবদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামী আর আলী আহসান মুজাহিদ।
জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এরশাদও হ্যাঁ-না গণভোটের খেলা আয়োজন করেছিলেন। এবার ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয় ৯৫ শতাংশ, যার ৭১ শতাংশ এরশাদের ১৮ দফা কর্মসূচির পক্ষে। সামরিক শাসন চলতে থাকে। ১৯৮৩ সালের শুরুতে আওয়ামী লীগের ১৫ দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। ৯ এপ্রিল হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত ১৫ দলীয় ঐক্যজোটের এক সম্মেলনে শেখ হাসিনা সামরিক শাসনবিরোধী ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ১৯৮৬ সালের মার্চে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুমুল আকার ধারণ করে।
১৯৮৭ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে কয়েকবার গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার সমাবেশমুখী মিছিলে গুলি চালিয়ে এরশাদের পেটোয়া বাহিনী ৩৮ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করে। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। শুরু হল শেখ হাসিনাকে হত্যার আনুষ্ঠানিক মহড়া, যা ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ‘ভাঙা সুটকেস’ বাহিনীর অন্যতম কর্ণধার হাওয়া ভবনখ্যাত তারেক রহমানের নেতৃত্বে গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ পায়।
‘লেডি (মেরি)-পীর-বাম-রাজাকার-গোয়েন্দা’ শাসিত শাসনব্যবস্থার ভিত রক্ষার জন্য ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় অনুশাসনের বহু দূরে অবস্থানকারী এরশাদ রাষ্ট্রের জন্য ধর্ম নির্ধারণ করে দেন ইসলাম। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনুভূতি নিয়ে রাজনীতিই ছিল এর উদ্দেশ্য।
তবে কোনো কিছুতেই এরশাদের শেষ রক্ষা হয়নি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এরশাদবিরোধী আন্দোলন এত বেগবান হয় যে জরুরি অবস্থা জারি করেও এরশাদ ব্যর্থ হন। সামরিক-বেসামরিক আমলারা পক্ষ ত্যাগ করতে শুরু করেন। আ স ম রব ও মওদুদরা পিছুটান দিতে থাকেন। ১৯৯০-এর ৬ নভেম্বর শেখ হাসিনা পান্থপথের জনসভায় সাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ দেখান। ৬ ডিসেম্বর সেই রূপরেখা অনুযায়ী এরশাদ শাসনের অবসান হয়।
তারপরও ষড়যন্ত্রকারীরা দমে যায়নি। ১৯৯১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সূক্ষ্ম কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে ক্যান্টনমেন্টবাসী। ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানকারী খালেদা জিয়ার দল ৩০ শতাংশ ভোট পেয়ে জামায়াতের সহযোগিতায় ক্ষমতাসীন হয়। ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েও আসনসংখ্যার হিসাবে আওয়ামী লীগ আবারও রাজপথে। ক্যান্টনমেন্ট নিবাসী খালেদা জিয়া তার উত্তরসূরি ক্যান্টনমেন্টবাসী জিয়া-এরশাদের মতোই নির্যাতন, নিপীড়ন, লুণ্ঠন, সীমাহীন দুঃশাসনের রাজত্ব কায়েম করেন।
১৯৯২ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাসে উদ্যোগী হন। বিভিন্ন কমিটি ও উপ-কমিটি গঠন করে দলীয় রাজনীতিতে আধুনিক ব্যবস্থাপনায় মেধার সমাবেশ ঘটান। আওয়ামী লীগ তার ঐতিহ্যকে অক্ষুন্ন রেখে আধুনিক মানসিকতার দলে রূপান্তরিত হয়। ঘাতক-দালাল নির্মূল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনও বেগবান করা হয়। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রহসনের এক নির্বাচন করে বিএনপি, কিন্তু ক্ষমতায় টিকতে পারেনি। ৩০ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন।
২১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে অংশ নেন। শেখ হাসিনার বিজয় আঁচ করতে পেরে ক্যান্টনমেন্টবাসী অন্ধকারের শক্তি আবারও অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালায়, জাগ্রত জনতার প্রতিরোধের ভয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিচক্ষণতায় তা ব্যর্থ হয়। ২৩ জুন সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। বাংলার জনগণ তাদের হৃত মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ আবার ফিরে পায়।
তবে আবার সক্রিয় হয় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা। ২০০১ সালে পাকিস্তানপন্থিদের আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা হয়। এবার জামায়াতে ইসলামী চলে আসে ক্ষমতার কেন্দ্রে, মন্ত্রিসভায় ঠাঁই করে নেয় তারা, জঙ্গি উত্থানের সকল পৃষ্ঠপোষকতা শুরু হয় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে, সামরিক গোয়েন্দারা হাওয়া ভবনের সঙ্গে মিলেমিশে শুরু করে অস্ত্র এবং মাদকের ব্যবসা, দশ ট্রাক অস্ত্র এরই অংশ। শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য গ্রেনেড হামলাসহ পরিচালনা করা হয় একাধিক হত্যাপ্রচেষ্টা।
একই ধারায় দেশ চলে ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত। এমনকি ২০০৭-০৮ সালে আবারও দেশকে দখলে নেয় পাকিস্তানি মানসিকতার সামরিক গোয়েন্দা ব্রিগ্রেডিয়ার বারী ও আমিনরা। একমাত্র শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দৃঢ়তার কারণেই ২০০৯-পরবর্তী বাংলাদেশ সেনা বা সেনাসমর্থিত শাসনের অবসান হয়। বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নয়নের মহাসড়কে।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
আজকের কোনো অভিভাবককে যদি বলা হয়, তাঁর সন্তানকে একটি বিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে যেখানে নেই কোনো পাকা ভবন, নেই স্মার্ট ক্লাসরুম, নেই পরীক্ষার নম্বরের প্রতিযোগিতা, এমনকি নিজের খাবারের ব্যবস্থাও অনেক সময় নিজেকেই করতে হবে—তাহলে তিনি নিশ্চয়ই বিস্মিত হবেন। অথচ ভারতবর্ষের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন একটি সময় ছিল, যখন এই ব্যবস্থাকেই শিক্ষার সর্বোত্তম রূপ বলে মনে করা হতো। সেই সময় জ্ঞানকে চাকরির সিঁড়ি হিসেবে নয়, মানুষ হওয়ার শিল্প হিসেবে দেখা হতো।
কল্পনা করুন, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের একটি ভোর। অরণ্যের কিনারায় ছোট ছোট কুটির। দূরে নদীর ধারা। সূর্যের প্রথম আলো গাছের পাতায় এসে পড়েছে। কয়েকজন কিশোর ঘুম থেকে উঠে নদীতে স্নান করতে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন কোনো রাজ্যের যুবরাজ, আরেকজন হয়তো একজন সাধারণ কৃষকের ছেলে। কিন্তু আশ্রমের ভেতরে তাদের পরিচয়ের কোনো পার্থক্য নেই। তারা সবাই শিষ্য। সবার কাজ একই, সবার নিয়ম একই, সবার লক্ষ্যও একই—জ্ঞান অর্জন।
প্রাচীন ভারতের গুরুকুলগুলো ছিল এমনই। সেখানে শিক্ষা শুরু হতো বই দিয়ে নয়, জীবন দিয়ে। শিষ্যরা শুধু বেদ বা উপনিষদ মুখস্থ করত না; তারা শিখত কীভাবে বিনয়ী হতে হয়, কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করতে হয়, কীভাবে নিজের চেয়ে বড় কোনো আদর্শের জন্য বাঁচতে হয়। আজকের ভাষায় যাকে ‘ভ্যালু এডুকেশন’ বলা হয়, তখন সেটিই ছিল শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।
তবে এই শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল ধর্মীয় শিক্ষা বলে ভাবলে ভুল হবে। প্রাচীন ভারতীয়রা বিস্ময়করভাবে বাস্তববাদীও ছিলেন। তারা জানতেন, শুধু আধ্যাত্মিক জ্ঞান দিয়ে সমাজ চলে না। তাই গুরুকুলের পাঠ্যক্রমে স্থান পেয়েছিল ব্যাকরণ, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, কৃষিবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রনীতি। পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে যখন জ্ঞানচর্চা এখনও সীমিত পরিসরে আবদ্ধ, তখন ভারতীয় শিক্ষার্থীরা নক্ষত্রের গতি নিয়ে চিন্তা করছে, ভাষার গঠন বিশ্লেষণ করছে, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা শিখছে।
এই শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি সৌন্দর্য ছিল প্রশ্ন করার স্বাধীনতা। উপনিষদের পাতা খুললেই দেখা যায়, শিষ্য প্রশ্ন করছে, গুরু উত্তর দিচ্ছেন। আবার কখনো গুরু এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন, যার উত্তর খুঁজতে শিষ্যকে বছরের পর বছর ভাবতে হচ্ছে। জ্ঞানকে তখন চূড়ান্ত সত্য হিসেবে পরিবেশন করা হতো না; বরং তাকে দেখা হতো অনুসন্ধানের এক অবিরাম যাত্রা হিসেবে।
এরপর ইতিহাসের মঞ্চে এল বৌদ্ধধর্ম, আর তার সঙ্গে শিক্ষার জগতেও শুরু হলো নতুন অধ্যায়। বনাঞ্চলের গুরুকুল ধীরে ধীরে জায়গা করে দিল বিশাল বিহারগুলোকে। শিক্ষা আরও প্রাতিষ্ঠানিক হলো, আরও আন্তর্জাতিক হলো। নালন্দা, বিক্রমশীলা, তক্ষশীলা কিংবা বলভীর মতো মহাবিহারগুলো কেবল ভারতের নয়, সমগ্র এশিয়ার জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হলো।
নালন্দার কথা ভাবলেই আজও বিস্ময় জাগে। আমরা প্রায়ই বলি, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বায়নের প্রতীক। অথচ দেড় হাজার বছর আগে নালন্দার আবাসিক প্রাঙ্গণে চীন, কোরিয়া, তিব্বত, সুমাত্রা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বসে অধ্যয়ন করতেন। তখনকার পৃথিবীতে কোনো বিমান ছিল না, দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল না। তবু জ্ঞানের আকর্ষণে মানুষ হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিত।
চীনা পরিব্রাজকদের বিবরণে নালন্দার যে ছবি পাওয়া যায়, তা আজও বিস্ময়কর। হাজারো শিক্ষার্থী, অসংখ্য শিক্ষক, বিশাল গ্রন্থাগার, দিনভর বিতর্ক আর আলোচনা। সেখানে জ্ঞানকে মুখস্থ করার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো তাকে যাচাই করার ওপর। যুক্তি ছিল মর্যাদার বিষয়, বিতর্ক ছিল শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সবচেয়ে বড় কথা, সেই শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে কেবল পেশাজীবী বানানোর চেষ্টা করেনি। তার লক্ষ্য ছিল মানুষকে জ্ঞানী, সংযমী, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। হয়তো সে কারণেই প্রাচীন ভারতের শিক্ষাকেন্দ্রগুলো শুধু বিদ্যার প্রতিষ্ঠান ছিল না; ছিল সভ্যতা নির্মাণের কারখানা।
আজ আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে বাস করছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড়, গবেষণাগারগুলো আরও উন্নত, তথ্যের প্রবাহও অভূতপূর্ব। কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—আমরা কি শিক্ষার সেই গভীর উদ্দেশ্যকে ধরে রাখতে পেরেছি? আমরা কি এখনও মানুষ তৈরির কথা ভাবি, নাকি শুধু দক্ষ কর্মী তৈরির?
প্রাচীন ভারতের গুরুকুল ও মহাবিহারের ইতিহাস হয়তো আমাদের সেই প্রশ্নটাই নতুন করে ভাবতে শেখায়। কারণ সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রায় প্রযুক্তি বদলায়, প্রতিষ্ঠান বদলায়, পাঠ্যক্রম বদলায়; কিন্তু শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য বদলায় না। তার কাজ এখনও মানুষের ভেতরের আলো জ্বালিয়ে দেওয়া। আর সেই আলোর সন্ধানেই তো হাজার বছর আগে অরণ্যের পথে বেরিয়েছিল একদল কিশোর, যারা জানত—জ্ঞানই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু অধ্যায় আছে, যেগুলো কেবল অতীতের স্মৃতি নয়—বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা। প্রাচীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা তেমনই এক বিস্ময়কর অধ্যায়। তখন শিক্ষা ছিল না চাকরি বা জীবিকার সিঁড়ি; ছিল আত্মার উৎকর্ষ, চরিত্রের নির্মাণ এবং সত্যের অনুসন্ধানের এক পবিত্র যাত্রা। অরণ্যের ছায়াঘেরা নির্জনতায় গড়ে ওঠা গুরুকুলগুলো ছিল সেই যাত্রার প্রথম তীর্থস্থান। ‘উপনয়ন’-এর মাধ্যমে এক কিশোর যেন নতুন করে জন্ম নিত জ্ঞানের জগতে। গুরুর আশ্রমে রাজপুত্র ও সাধারণের সন্তান একই ছাদের নিচে বাস করত, একই নিয়মে জীবনযাপন করত। প্রতিদিনের শ্রম, কাঠ সংগ্রহ, ভিক্ষা এবং অধ্যয়ন তাদের শেখাত বিনয়, আত্মসংযম ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার পাঠ। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সহাবস্থানে গড়ে উঠত এমন এক শিক্ষাদর্শন, যেখানে জ্ঞান ও জীবন ছিল অবিচ্ছেদ্য।
সময়ের প্রবাহে এই শিক্ষাব্যবস্থা আরও সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। বেদ ও উপনিষদের আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা অর্জন করত জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, রাষ্ট্রনীতি এবং যুদ্ধকৌশলের মতো বাস্তব জ্ঞান। রামায়ণ ও মহাভারতের পৃষ্ঠাগুলোয় আমরা সেই শিক্ষারই জীবন্ত প্রতিফলন দেখতে পাই। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—এই জ্ঞানচর্চা কেবল পুরুষদের একচেটিয়া ক্ষেত্র ছিল না। গার্গী, মৈত্রেয়ীর মতো বিদুষী নারীরা তৎকালীন পণ্ডিতসমাজে নিজেদের অসাধারণ প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। জ্ঞানকে তখন কোনো বইয়ের পাতায় বন্দী তথ্য হিসেবে দেখা হতো না; তা ছিল এক জীবন্ত শিখা, যা গুরু থেকে শিষ্যের হৃদয়ে সঞ্চারিত হতো শ্রদ্ধা, অনুশাসন ও অনুপ্রেরণার মাধ্যমে।
এরপর ভারতীয় শিক্ষার ইতিহাসে আসে এক নতুন দিগন্ত—বৌদ্ধ শিক্ষার উন্মেষ। গুরুকুলের সীমা অতিক্রম করে শিক্ষা পৌঁছে যায় বৃহত্তর সমাজে। জাত-পাত ও বংশগৌরবের প্রাচীর ভেঙে বৌদ্ধ বিহারগুলো শিক্ষাকে করে তোলে অধিকতর উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। ‘প্রব্রজ্যা’ ও ‘উপসম্পদা’ গ্রহণ করে অসংখ্য তরুণ প্রবেশ করত এই জ্ঞানসংঘে। বিহারগুলো ছিল কেবল ধর্মীয় সাধনার কেন্দ্র নয়; ছিল শিক্ষা, গবেষণা ও বৌদ্ধিক বিনিময়ের প্রাণকেন্দ্র। কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যেও সেখানে বিকশিত হয়েছিল আলোচনা, বিতর্ক ও সম্মিলিত সিদ্ধান্তগ্রহণের এক অনন্য সংস্কৃতি। জাতকের গল্পগুলো আজও সাক্ষ্য দেয়—সেই শিক্ষা ছিল মানবিক, প্রাণবন্ত এবং জীবনঘনিষ্ঠ।
এই দীর্ঘ বিবর্তনের পরিণতিতে জন্ম নেয় বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম দিককার আবাসিক আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো—তক্ষশিলা, নালন্দা ও বিক্রমশীলা। এর মধ্যে নালন্দা ছিল যেন জ্ঞানের এক মহাসাম্রাজ্য। দূর চীন, কোরিয়া, তিব্বত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শিক্ষার্থীরা হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে এখানে আসতেন। প্রবেশদ্বারে ‘দ্বারপণ্ডিতদের’ কঠোর মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছিল এক বিরাট সম্মানের বিষয়। নয় তলা বিশিষ্ট বিশাল গ্রন্থাগারে সঞ্চিত ছিল তৎকালীন বিশ্বের বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার। ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ-এর ভ্রমণবৃত্তান্তে আমরা পাই এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র, যেখানে হাজারো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী প্রতিদিন জ্ঞানের অন্বেষণে নিমগ্ন থাকতেন। ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ—এই দুই মহান ধারার সম্মিলনে নির্মিত সেই শিক্ষাব্যবস্থা আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃত শিক্ষা কেবল তথ্যের সঞ্চয় নয়; এটি মানুষকে আরও প্রাজ্ঞ, সহনশীল এবং মানবিক করে তোলার এক অনন্ত সাধনা।
লেখক: মামুনুর রশীদ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পিরোজপুর সদর, পিরোজপুর।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে তালগাছ: প্রকৃতির প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক ও পরিবেশ রক্ষার অনন্য উপায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে, দিনমজুর এবং খোলা জায়গায় চলাচলকারী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাই বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা এখন শুধু সচেতনতার বিষয় নয়, বরং জীবন রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই প্রেক্ষাপটে প্রকৃতির এক অনন্য উপহার হলো তালগাছ। বহু গবেষক ও পরিবেশবিদ মনে করেন, তালগাছ শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে না, বরং বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গ্রামবাংলার পরিচিত এই গাছটি আজ আবার নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে ‘প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক’ হিসেবে।
তালগাছ কেন বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ?
তালগাছ সাধারণত অনেক উঁচু হয়ে থাকে। এর উচ্চতা অনেক সময় আশপাশের অন্যান্য গাছ বা স্থাপনার চেয়ে বেশি হয়। বজ্রপাত সাধারণত উঁচু বস্তুর ওপর আঘাত হানে। তালগাছ সেই বজ্রবিদ্যুৎ নিজের শরীরের মাধ্যমে মাটির গভীরে পৌঁছে দিতে পারে। ফলে আশপাশের মানুষ বা ছোট গাছপালা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকতে পারে।
বৈজ্ঞানিকভাবে বলা যায়, বজ্রপাত যখন ঘটে তখন আকাশে সৃষ্ট বৈদ্যুতিক চার্জ দ্রুত মাটিতে নামার পথ খোঁজে। উঁচু ও সোজা গাছ সেই চার্জের জন্য সহজ পথ তৈরি করে। তালগাছের গঠন এমন যে এটি বিদ্যুৎকে মাটিতে প্রবাহিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগে রাস্তার ধারে, খোলা মাঠে এবং গ্রামাঞ্চলে প্রচুর তালগাছ দেখা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গাছের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকিও বেড়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
শুধু তালগাছ নয়, অন্যান্য গাছও ভূমিকা রাখে:
তালগাছের পাশাপাশি নারকেল, সুপারি, বটগাছসহ কিছু উঁচু গাছও বজ্রপাতের ক্ষেত্রে আংশিক সুরক্ষা দিতে পারে। বিশেষ করে বটগাছের বিস্তৃত শিকড় মাটির গভীরে ছড়িয়ে থাকে, যা বিদ্যুৎ পরিবাহিত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে তালগাছের উচ্চতা ও গঠন একে বিশেষভাবে কার্যকর করে তোলে।
নারকেল ও সুপারি গাছ উপকূলীয় এলাকায় বেশি দেখা যায়। এসব গাছও অনেক উঁচু হয় এবং বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ নিজের শরীরে গ্রহণ করতে পারে। তবে এগুলো কোনো “নিশ্চিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ নয়; বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার অংশ।
বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে দাঁড়ানো বিপজ্জনক:
অনেকেই ভুল করে মনে করেন, বজ্রপাতের সময় বড় গাছের নিচে আশ্রয় নিলে নিরাপদ থাকা যায়। বাস্তবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ বজ্রপাত সরাসরি গাছের ওপর আঘাত করলে সেই বিদ্যুৎ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং গাছের নিচে থাকা মানুষ গুরুতর আহত বা নিহত হতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বজ্রপাতের সময় কখনোই তালগাছ, নারকেল গাছ, বটগাছ কিংবা অন্য কোনো উঁচু গাছের নিচে দাঁড়ানো উচিত নয়। অনেক সময় বজ্রপাতের তাপে গাছ ফেটে যায়, ডাল ভেঙে পড়ে বা আগুন ধরে যায়। তাই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়।
বজ্রপাতের সময় কী করবেন ?
বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন। যেমন, দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যান। বজ্রপাত শুরু হলে যত দ্রুত সম্ভব পাকা ঘর বা নিরাপদ ভবনের ভেতরে আশ্রয় নিতে হবে। খোলা মাঠ, নদী, হাওর বা উঁচু জায়গা এড়িয়ে চলতে হবে। মোবাইল ও বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে দূরে থাকুন। বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করাই ভালো। টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার বা তারযুক্ত ফোন থেকে দূরে থাকতে হবে। গাছের নিচে আশ্রয় নেবেন না। এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা। বড় গাছ বজ্রপাত আকর্ষণ করতে পারে। তাই গাছের নিচে দাঁড়ানো বা বসা বিপজ্জনক। পানিতে থাকা থেকে বিরত থাকুন। নদী, পুকুর বা খালে গোসল করা কিংবা মাছ ধরা বজ্রপাতের সময় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাঠে থাকলে নিচু হয়ে বসুন। যদি খোলা মাঠে আটকা পড়েন, তাহলে দুই পা একসঙ্গে রেখে নিচু হয়ে বসতে হবে। তবে মাটিতে পুরো শরীর শোয়ানো যাবে না।
গ্রামবাংলায় তালগাছের ঐতিহ্য:
তালগাছ শুধু বজ্রপাত প্রতিরোধেই নয়, গ্রামীণ সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলার কবিতা, গান ও লোকজ ঐতিহ্যে তালগাছের উল্লেখ বহুবার এসেছে। গ্রামবাংলার রাস্তার ধারে সারি সারি তালগাছ একসময় ছিল খুব পরিচিত দৃশ্য। তালের ফল পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে জনপ্রিয়। তাল দিয়ে পিঠা, পায়েস, বড়া ও বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি হয়। তালপাতা দিয়ে তৈরি হতো হাতপাখা, ছাউনি ও নানা গৃহস্থালি সামগ্রী। অর্থাৎ তালগাছ পরিবেশ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি—তিন ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।
তালগাছ পরিবেশ রক্ষায় কীভাবে সহায়তা করে ?
তালগাছ পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত উপকারী। এটি বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গাছ লাগানো সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। তালগাছ দীর্ঘজীবী হওয়ায় বহু বছর ধরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রাখে। এছাড়া তালগাছ মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং ঝড়-ঝঞ্ঝার সময় বাতাসের গতি কমাতে সাহায্য করে। গ্রামীণ জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও এই গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কেন কমে যাচ্ছে তালগাছ ?
একসময় গ্রামে প্রচুর তালগাছ থাকলেও বর্তমানে এর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এর কয়েকটি কারণ হলো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ। রাস্তা সম্প্রসারণ। কৃষিজমির পরিবর্তন। দ্রুত ফলদায়ী গাছের প্রতি মানুষের ঝোঁক। তালগাছ লাগানোর দীর্ঘমেয়াদি অনীহা। তালগাছ বড় হতে সময় লাগে। ফলে অনেকেই দ্রুত লাভের আশায় অন্য গাছ লাগাতে বেশি আগ্রহী হন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তালগাছের পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত গুরুত্ব অনেক বেশি।
সরকার ও সমাজের করণীয়:
বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ব্যাপকভাবে তালগাছ রোপণ কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। স্কুল, কলেজ, রাস্তার ধারে, খোলা মাঠে এবং কৃষিজমির আশপাশে পরিকল্পিতভাবে তালগাছ লাগানো হলে ভবিষ্যতে এর সুফল পাওয়া যাবে। পাশাপাশি বজ্রপাত সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, কৃষি বিভাগ ও পরিবেশ সংগঠনগুলো একযোগে কাজ করলে একটি ‘সবুজ সুরক্ষা বলয়’ তৈরি করা সম্ভব।
কৃষকদের জন্য বিশেষ সতর্কতা:
বাংলাদেশে বজ্রপাতে নিহতদের বড় অংশ কৃষক। কারণ তারা খোলা মাঠে কাজ করেন। তাই কৃষকদের জন্য কিছু বিশেষ সতর্কতা জরুরি, আকাশে কালো মেঘ ও বজ্রধ্বনি শুনলেই মাঠ ত্যাগ করতে হবে। ধাতব কৃষিযন্ত্র দূরে রাখতে হবে। একা উঁচু স্থানে দাঁড়ানো যাবে না। আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত দেখতে হবে। গ্রামের আশপাশে বেশি করে তালগাছ লাগাতে হবে। তালগাছ লাগানো এখন সময়ের দাবি।
বর্তমান সময়ে বজ্রপাত শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি জননিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রকৃতিনির্ভর সমাধানও গুরুত্বপূর্ণ। তালগাছ সেই সমাধানের অন্যতম প্রতীক। একটি তালগাছ হয়তো একদিনে বড় হয় না, কিন্তু এটি বহু বছর ধরে মানুষ ও প্রকৃতিকে সুরক্ষা দেয়। তাই আজ একটি তালগাছ লাগানো মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা।
বজ্রপাত থেকে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও সচেতনতা ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের মাধ্যমে ঝুঁকি অনেক কমানো যায়। তালগাছ সেই উদ্যোগের একটি কার্যকর অংশ। এটি যেমন বজ্রবিদ্যুৎ নিজের শরীরে ধারণ করে আশপাশের পরিবেশকে আংশিক সুরক্ষা দিতে পারে, তেমনি পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও গ্রামীণ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে মনে রাখতে হবে, বজ্রপাতের সময় কখনোই কোনো গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ নয়। নিরাপদ ভবনে অবস্থান করাই সবচেয়ে ভালো উপায়।
আজকের দিনে প্রয়োজন শুধু সচেতনতা নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপ। তাই আসুন, নিজের নিরাপত্তা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে বাড়ির আশেপাশে, রাস্তার ধারে ও খোলা জায়গায় বেশি করে তালগাছ লাগাই। একটি গাছই হতে পারে জীবন রক্ষার নীরব প্রহরী।
লেখক: সমীরণ বিশ্বাস, কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের জেরে ঢাকায় জ্বালানি সংকট ও নানা ধরনের রাজনৈতিক-প্রাকৃতিক উত্তাপের ছড়াছড়ি। এর মাঝেও গত ২৪ এপ্রিল (শুক্রবার) ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার (আইসিসিবি) গাড়ি ও যন্ত্রাংশের মেলায় বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) প্রদর্শনীর মুগ্ধতা যেন গ্রীষ্মের প্রার্থীত বৃষ্টি। আমরা যখন মেলায় পৌঁছালাম তখন বিকাল প্রায় ৫.৩০টা। পড়ন্ত বিকালের রোদে বসুন্ধরার হলুদাভ সোনালু ফুলগুলো হয়ে উঠল আরো অপরূপ। এই লেখায় বৈদ্যুতিক গাড়িসহ বাংলাদেশের গাড়ি নির্মাণ শিল্পের কিছু দিক তুলে ধরছি।
ঢাকা অটো শো: গত ২৩ এপ্রিল থেকে আইসিসিবিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩ দিনব্যাপী (২৩-২৫ এপ্রিল) ১৯তম ঢাকা অটো সিরিজ অব এক্সিবিশনস ২০২৬। এখানে একই ছাদের নিচে গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রদর্শনীর পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘৩য় ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) বাংলাদেশ প্রদর্শনী’।
এবারের এক্সিবিশনে জাপান, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যসহ ১০টি দেশের ৭০টিরও বেশি কোম্পানী অংশ নিয়েছে এবং প্রায় ২০০ বুথে নতুন প্রযুক্তি ও যানবাহন প্রদর্শন করা হয়েছে। এতে অংশ নিয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অটো মোবাইল কোম্পানী, যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি সরবরাহকারীরা। প্রদর্শনীতে মিতসুবিশি, টয়োটা, মার্সিডিজ বেঞ্জ, হোন্ডা, এমজি, প্রোটন, চাঙ্গান প্রভৃতি ব্র্যান্ডের গাড়ি প্রদর্শন করা হয়েছে। মেলাটির আয়োজক ছিলেন সেলস-গ্লোবাল।
ইলেক্ট্রিক ভেহিকেল বা বৈদ্যুতিক গাড়ি বলতে বোঝায় এক বা একাধিক বৈদ্যুতিক মোটর দ্বারা চালিত যানবাহন, যার ট্রাকশন শক্তি গাড়িতে ইন্সটলকৃত রিচার্জেবল ব্যাটারি দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে। মেলায় প্রদর্শিত হয়েছে বিভিন্ন মডেলের বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল (ই-বাইক)। দেশে জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি। তাই দর্শনার্থীদের আগ্রহ বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেলের স্টলগুলোতে। বিশেষ করে তরুণ দর্শনার্থীদের বেশি আকর্ষণ ছিল বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের (ই-বাইক) স্টলে।
দল বেঁধে গাড়ি দেখা: তরুণ-তরুণীদের ভিড় ঠেলে আমরা প্রথমে এলাম বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (বেইল) এর প্রদর্শনীতে। আমরা মানে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ১৪তম ব্যাচের দশ বারো জন সতীর্থ বা ব্যাচমেট।
বেইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবির (এমডি, ম্যাংগো টেলিসার্ভিস লি.) এর আমন্ত্রণেই এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি ইভি দেখতে আমাদের আসা। এই প্রদর্শনীতে বেইল তাদের বহুল প্রতীক্ষিত প্রোটোটাইপ মডেল উন্মোচন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এই অটো প্রদর্শনীতে তাদের তিনটি ব্র্যান্ড-চার চাকার যাত্রী ও পণ্যবাহী যান ‘এমইভি’, মোটরবাইক ব্র্যান্ড ‘গ্লাইডার’ এবং তিন চাকার যান ‘অটোম্যাক্স’- উন্মোচন করে।
হল-১ এ বেইল ও অন্যান্য কোম্পানীর মোটর বাইক ও তিন চাকার যান দেখা ছিল চমৎকার এক অভিজ্ঞতা। চোখে পড়ার মতো দৃশ্য হলো- এসব গাড়িতে চড়ে তরুন তরুনীদের ছবি/সেলফি তোলার ধুম। আমরাও অংশ নিলাম এই ফটো- উৎসবে। এই বয়সে ই বাইকে চড়া কারো কারো ছবি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল মহাবিশ্বে!
ইভিতে চড়ে কিশোর কালের উচ্ছ্বাস: এর পর যাওয়া হলো হলো-২ এ বেইলের ৪ চাকার যাত্রীবাহী গাড়ি (স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি) দেখতে। কোম্পানীতে এই ব্রান্ডের আদুরে নাম- ‘এমইভি’। মীর মাসুদ কবির তার ইভির কথা ২০১৫ সালের বসন্তে এক সান্ধ্যকালীন আড্ডায় আমাদের বলেছিলেন। অবশেষে ২০২৬ এর কৃষ্ণচূড়া- জারুল-সোনালু ফোটা গ্রীষ্মে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হলো।
বহুদিন আগের কথা...। ছুটি শেষে পদ্মা পাড়ের রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে আমরা যাচ্ছি। ক্যাডেটদের বড় একটা অংশ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে মূলত ট্রেন ধরে (বিশেষত উত্তরা এক্সপ্রেস) কলেজে যোগদান করতো। বন্ধু মীর মাসুদ কবির (অপু) আসতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। বাবা মা দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমরা কেউ পাকশী, ইশ্বরদী, পাবনা, নাটোর, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ থেকে...।
সরদহ বা সারদা রেল স্টেশন থেকে মোক্তারপুর (ক্যাডেট কলেজ) প্রায় ৩ মাইলের পথ। স্টেশন থেকে কলেজের বাসে সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা। তবে মাঝেমধ্যে আমরা ঘোড়ার গাড়ি বা টমটমেও যেতাম। সে ছিল অসম্ভব আনন্দের এক যাত্রা। সেদিন বেইলের সাদা রঙের বৈদ্যুতিক গাড়িতে (এসইউভি) বসে আমরা কয়েকজন সানন্দে ছবি-টবি তুললাম। একজন সুরসিক বন্ধুর মন্তব্য মনে ধরলো- ‘ফ্রম টমটম টু ইভি’। ইভিতে বসে যেন সেই কিশোর বয়সে টমটমে চড়ার উচ্ছ্বাস। তবে এর মাঝে চলে গেছে কত বছর। জীবন এভাবেই এগিয়ে যায়। জানিনা, ঘোড়াগাড়ির চালক আমাদের প্রিয় গফুর ভাই এখন কেমন আছেন।
শতভাগ দেশে তৈরি গাড়ির যে গল্প: মাসুদ কবির ও বেইলের চেয়ারম্যান বন্ধুপ্রতীম এ.মান্নান খান (চেয়ারম্যান, ম্যাংগো টেলিসার্ভিস লি.) গল্পের মতো করে ইভি তৈরির অত্যান্ত চ্যালেঞ্জময় জার্নির কথা আমাদের বলেন। চট্টগ্রামের মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে একটি ইভি উৎপাদন কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে যানবাহনের প্ল্যাটফর্ম ও বডি তৈরি করে আমদানি নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা বলেন, দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ইভি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়।
বাংলাদেশে ইলেকট্রিক গাড়ি সংযোজন হওয়া শুরু হয়েছে আগেই। তবে বেইলের ইভি হবে ব্যাটারিসহ শতভাগ বাংলাদেশেই তৈরি। প্রদর্শনীতে বেইলের একটা চমৎকার ব্যানার চোঁখে পড়ল-‘দি ফাস্ট মেইড ইন বাংলাদেশ ইভি’ আনভেইলড বাই দি ‘কান্ট্রিস ফাস্ট অটোমোবাইল ম্যানুফেকচারার’-বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লি....। অর্থাৎ সম্পূর্ণ দেশীয়ভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) উৎপাদন করছে বেইল। এক্ষেত্রে বেইলই অগ্রপথিক বা পাইওনিয়ার।
ইভি নিয়ে আরো কিছু কথা: আয়োজকরা আশা করছেন এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের বাজার আরো সম্প্রসারিত এবং স্থানীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ হবে। দেশীয় অটোমোবাইল শিল্পের বিকাশে এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারে এই উদ্যোগ নতুন দিগন্ত উন্মোচক করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং পরিবেশ বান্ধব পরিবহনের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ইভি খাতের এই অগ্রগতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক হতে পারে।
অটোমোবাইল শিল্পে সম্ভাবনা: অটোমোবাইল শিল্পে নতুন সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মোটর গাড়ি শিল্প দক্ষিণ এশিয়ার মাঝে তৃতীয়। এক দশকের মাঝে বাংলাদেশের দুই চাকার মোটরসাইকেল বাজারের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। একে বিপ্লব বলা যায়।
বাংলাদেশে কয়েকটি বড় গাড়ির কারখানা রয়েছে যা মিতসুবিশি এবং প্রোটনের যাত্রীবাহী গাড়ি এবং হাইনো ও টাটার বাণিজ্যিক যানবাহনগুলো সংগ্রহ করে সংযোজন করে থাকে। এছাড়াও কয়েকটি দেশি কোম্পানী তাদের বিদেশি প্রযুক্তিবিষয়ক অংশীদারদের সঙ্গে মিরসরাই ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। বিদেশি কোম্পানীসমূহ তাদের ব্রান্ডেড যানবাহন প্রাথমিকভাবে গাড়ি সংযোজনের জন্য বিনিয়োগ করছে। ধীরে ধীরে সংযোজন কারখানাগুলো পূর্ণ গাড়ি উৎপাদন কারখানায় উন্নিত হবে।
গাড়ি তৈরির পাশাপাশি যন্ত্রাংশ (অটোমটিভ যন্ত্রাংশ) উৎপাদনেরও আছে বিশাল সম্ভাবনা। অটোমোবাইল, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও এগ্রো মেশিনারি খাত বাংলাদেশের শিল্প খাতের সম্ভাবনা ও সক্ষমতা তুলেধরেছে। এই সেক্টরগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানের ভবিষ্যৎ: বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অটোমোবাইল শিল্পে এখন ‘ইলেকট্রিক ভেহিকল’ বা ইভি-র জয়জয়াকার। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। জনঘনত্ব এবং ক্রমবর্ধমান দূষণ বিবেচনায় বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারের পরিকল্পিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
ইভি’র বিষয়ে সরকারের করনীয়: একটি টেকসই ইভি ইকোসিস্টেম তৈরি করতে বাংলাদেশ সরকারকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে: (১) চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণ, (২) শুল্ক ও কর ছাড়, (৩) বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী নীতিমালা, (৪) ব্যাটারি রিসাইক্লিং ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, (৫) গণপরিবহনে ইভি-র অন্তর্ভুক্তি এবং (৬) ব্যবহারকারীদের বিশেষ প্রণোদনা প্রদান...। সরকারকে ইভি বিষয়ের নীতিমালা চূড়ান্ত করতে হবে।
বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানের বিপ্লব কেবল সময়ের ব্যাপার। তবে এর দ্রুত প্রসারের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং সহজলভ্য অর্থায়ন। সরকার যদি আমদানিকারক, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তবে বাংলাদেশ খুব শিগগিরই দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবেশবান্ধব পরিবহনের রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হবে।
শিল্পায়নে গুরুত্ব দেওয়া হোক: গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য শিল্পায়ন হয়েছে। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, ঔষধ ও চামড়াশিল্প খুব ভালো করেছে। কয়েকটিতো বিশ্বমানের। আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়া উচিত শিল্প। আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্পায়নেও নতুন করে ভাবতে হবে।
আমাদের লক্ষ লক্ষ তরুণ এখন বেকার। ব্যাপক শিল্পায়ন না হলে এই বেকারত্ব দূর করা খুব কঠিন। তাই আমাদের ফোকাস হওয়া উচিত শিল্পায়নে। তবে শিল্প স্থাপনের সময় ২টি বিষয় মনে রাখতে হবে। প্রথমত শিল্প যেন পরিবেশ ধ্বংস না করে। দ্বিতীয়ত কৃষি জমি যেন নির্বিচারে শিল্পে ব্যবহার না করা হয়।
শেষের কথা: সরকারের শিল্প পরিচালনায় যুক্ত হওয়া উচিত নয়। সরকারের কাজ শিল্পের ফ্যাসিলিটেটর হওয়া। উদ্যোক্তাদের উৎসাহ ও সমর্থন দেওয়া। বাংলাদেশে ইভিকে স্বাগতম। অগ্রপথিক বেইল কর্তৃপক্ষকে অভিনন্দন। তরুণ শিল্পোদ্যোক্তাদের শুভেচ্ছা-তারাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে। অটোমোবাইলসহ সম্ভাবনাময় শিল্প সেক্টরসমূহকে এগিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশে ইভির যে সুযোগ সম্ভাবনা আছে তা কাজে লাগাতে হবে। ইভিই অটোমোবাইলের ভবিষ্যৎ। শিল্পে এগিয়ে যাক আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রানের বাংলাদেশ।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক, সাবেক চেয়ারম্যান বিটিএমসি।
সরকার পরিবর্তন হলে চাঁদাবাজ ও দখলদার পরিবর্তন হয়। ভিন্ন নামে ভিন্ন রুপে দেখা মেলে এদের। সরকার পরিবর্তন এর সাথে সাথে টেম্পু স্ট্যন্ড, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনালে দখলদার ও চাঁদাবাজ এর হাত বদল হয় অর্থাৎ দায়িত্ব হস্তান্তর হয় মাত্র।এই স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক হারে চাঁদাবাজি হয়। চাঁদাবাজদের সাথে আলাপ করে যেটা জানা যায়, জিবির চাঁদা, টার্মিনাল চাঁদা, মালিক সমিতির চাঁদা, শ্রমিক কল্যান চাঁদা নামকরণ করে তা আদায় করা হয়।
বর্তমান সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল ইসলাম দায়িত্ব পাওয়ার পর সাংবাদিক সম্মেলনে তার বক্তব্যে বলেন পরিবহন খাতের টাকাটা সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা হচ্ছে। জোর করে আদায় হচ্ছে না। এ জন্য এটিকে চাঁদা বলা যাচ্ছে না। মন্ত্রী নিজেই বলেছেন শ্রমিকের কল্যানের নামে কতটা কল্যাণে ব্যয় করা হয় তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং শ্রমিক সংগঠন যে দল ক্ষমতায় থাকে তারাই নিয়ন্ত্রণ করেন তা স্বীকার করেছেন তাহলে কোন সমঝোতার চাঁদা বলে উল্লেখ করেছেন সেটা নাগরিকদের কাছে বোধগম্য নয়। এখানে প্রশ্ন ওঠাটা তাই স্বাভাবিক যে মন্ত্রী কি সমঝোতা বলে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দিলেন?
সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা বাংলাদেশের নাগরিকদের দুর্ভোগ ও ট্রাজেটির মূল কারণ। সড়কে প্রতিদিন গড়ে ২৫ জনের বেশি মানুষ নিহত হয় যাদের বেশির ভাগ তরুণ ও কর্মক্ষম। সড়কে এই মৃত্যুর মিছিল নিছক দুর্ঘটনা নয় বরং কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। ২০২৪ সালে ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি)গবেষণায় দেখা যায় ব্যাক্তিমালিকানাধীন বাস মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়।
…অতীতে নানা সময়ে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার এক ধরনের চেষ্টা দেখা গেছে। যে দল ক্ষমতায় তাদের আর্শীবাদপুষ্ট পরিবহন মালিক শ্রমিক এই সেক্টর নিয়ন্ত্রণ নেয়। সড়ক পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বিআরটিএ ও পুলিশের সহিত সহযোগিতার অবৈধ সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে। সড়কে বিশৃঙ্খলা পিছনে এই দুর্নীতিপুষ্ট সহযোগিতা ব্যবস্থা চাঁদাবাজিই মূল কারণ। এখানে গোষ্ঠীবদ্ধ স্বার্থের বলি হতে হয় নাগরিকদের।
…বিগত সরকারগুলোর সময়ে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বৈধতা দেওয়ার এক ধরনের চেষ্টা দেখা গেছে। নাগরিক সমাজের প্রতিবাদের মুখে সেটা বন্ধ হলে ও পরিবহন খাতের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির হাত থেকে কোন সরকারই মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়নি। পরিবহন খাতে পরিচালন ব্যয়ের বাহিরে চাঁদা কিংবা কল্যান যে নামে টাকা তোলা হউক না কেন তাতে জনগনের ঘারে বাড়তি ব্যয়ের চাপ এসে পড়ে। রাস্তায় রাস্তায় চাঁদার কারণে পরিবহন ভাড়ার সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। বাংলাদেশে যে নৈরাজ্য পরিবহন খাত তার ভুক্তভোগী চালক ও সহকারীরাও। আইন অনুযায়ী তাদের নিয়োগপত্র এবং মাসিক বেতন দেওয়া নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে বড় শ্রমিক কল্যাণ।
বাস্তবে চাঁদাবাজির টাকার অংশ বিভিন্ন জনের পকেটস্থ হয়। চাঁদাবাজের এহেন কর্মের কারণে সাধারণ পাবলিকের ভোগান্তির শেষ নেই।
চাঁদাবাজদের মূল আখড়া ফুটপাতগুলো অন্যতম। একেকটা ফুটপাত একেক জনের অথবা ভাগাভাগি করে দায়িত্ব পালন করে।অথচ রাজধানী ঢাকার ফুটপাত এক সময় ছিল হাঁটার জায়গা। এখন সে অবস্থা নেই চাঁদাবাজি দখলদারিত্ব আর রাজনৈতিক পুলিশি ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এক অঘোষিত রামরাজত্ব যেন। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অফিস আদালত, স্কুল কলেজ, হাসপাতালে কিংবা ব্যবসা বাণিজ্যের কাজে বের হন সেই শহরেই এখন হাঁটার পথ নেই, ফুটপাত ভরা দোকান রাস্তা ভরা ভ্যান মাঝখানে জ্যাম আর বিশৃঙ্খলা।
এই অবস্থার পেছনে অনেকে ভাবতে পারেন দারিদ্র্য বা জীবিকার তাগিদ নয়-রয়েছে একটি সুসংগঠিত কুচক্রীমহলের অর্থনীতি। বিভিন্ন গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দুটি সিটি করপোরেশন এলাকায় ফুটপাত দখল করে বছরে প্রায় এক হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে কয়েক কোটি টাকা লেনদেন। এই বিপুল অংকের টাকা কিন্তু একটি টাকা ও সরকারের কোষাগারে জমা হয় না।সবটায় ভাগ পায় সিন্ডিকেট, গডফাদার রাজনৈতিক প্রভাবশালী এবং অসাধু পুলিশ সদস্য।
… ঢাকা তেজগাঁও কলেজের সম্মুখে ও ওভার ব্রিজের আশেপাশের অবস্থা খুবই খারাপ। রাজধানীর সবচেয়ে ব্যস্ততম সড়কের সংযোজন
এখানে। মেট্রোস্টেশন, এ্যালিভেট এক্সপ্রেস এর বহি:গমন এবং চার রাস্তার মোড় এখানে। রাস্তাগুলো খুব সুন্দর করে সাজানো ছিল । সেটার কি বেহাল দশা? তেজগাঁও কলেজের সামনের রাস্তা ও ওভার ব্রিজের আশেপাশের ফুটপাত জুড়ে ঠাসাঠাসিভাবে দোকান সাজিয়ে বসে আছে। শাকসবজি, ফলমূল, মশলাপাতি, জুতার সারি, মোবাইল এক্সসরি আইটেম, কাপড় চোপড়, চা বিস্কিটের দোকান থেকে শুরু করে সবকিছুই আছে। দোকানদের ভাষ্য মোতাবেক দোকান প্রতি ২০০টাকা থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। সন্ধ্যার পর লাইনম্যান এসে টাকা নিয়ে যায়। টাকা না দিলে দোকান বসতে দেওয়া হয় না। লাইনম্যানের কালেকশন সমস্যা হলে ম্যানেজার আসে। ম্যানেজারকে গড ফাদারের সরাসরি সহচর বলা হয়। বিভিন্ন সময় এই দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে অভিযান শেষে পুরোদমে আবার বসে যায়।
…গুলিস্তান এলাকায় দুপুর বেলায় গেলে মনে হবে এটি কোন সড়ক নয় বরং খোলা আকাশের নিচে গড়ে ওঠা বিশাল বাজার। সেখানকার ভিতরের রাস্তা গুলো একদম দখল হয়ে গেছে। অথচ ভিতরের রাস্তা গুলো দিয়ে ও গাড়ি চলাচল করত। এখন আর সে অবস্থা নেই। মেইন সড়কের অনেকাংশে দখল করে রাস্তার মাঝামাঝি চলে গেছে। কাপড়, জুতা, ব্যাগ আর নিত্যণ্যের সারি সারি পসরা বসানো হয়েছে এমনকি আখমাড়াই এর মেশিন বসিয়ে দিব্বি রস বিক্রি করছে। বাস চলাচল করাত দুরের কথা রিকশা চলাচল করা ও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কোনো সভ্য দেশে অমনটি আছে কিনা আমাদের জানা নেই। এখানে ও কয়েকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে পরবর্তীতে যেই সেই অবস্থা। এদের সাথে আলাপ করে জানা যায় এখানে চাঁদার রেইট একটু বেশি অর্থাৎ ৪০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা দৈনিক চাঁদা দিতে হয়। চাঁদাবাজির টাকা ভাগবাটোয়ারা ও দখলদারিত্ব দ্বন্দ্ব নিয়ে খুন খারবি ও অনেক হয়েছে। তবু ও সরকারের টনক নড়ে না। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি ঘটনা অন্যতম:…ঘটনা...১..রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় জানুয়ারি /২৬ মাসে আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা আজিজুর রহমান মুছাসাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে। কারওয়ান বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে ও গোপনে চাঁদা আদায়ের জন্য আট থেকে নয়টি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এ চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়। বিদেশে পলাতক আন্ডারওয়ারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসী দিলিপ ওরফে বিবাশ এর নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
…ঘটনা...২...জানুয়ারি /২৬ মাসে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দেশীয় অস্ত্র ধারাল দা নিয়ে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে গণপিটুনিতে রায়হান নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনায় প্রকাশ পায় নিহত রায়হান খান (৩০) চাঁদপুর জেলার চাঁদপুর থানার বহরিয়া গ্রামের মৃত বিল্লাল খানের ছেলে। তিনি পরিবারের সঙ্গে ফতুল্লায় তাঁতিবাড়ি এলাকায় ইয়ামিন বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। পুলিশ সূত্রে জানা যায় নিহত রায়হানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। সে একজন চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারী এবং মাদকসেবি। তার অত্যাচারে স্থানীয় জনগন অতিষ্ঠ।
স্থানীয় গ্যারেজ মালিকের কাছ থেকে সকালে ১হাজার ৫ শত টাকা চাঁদা নেয় এবং পরবর্তীতে হোটেল কর্মচারীর কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। তার দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকার করায় রায়হান বাসা থেকে ধারালো দা নিয়ে এসে হোটেল কর্মচারী কে মারধর করতে থাকে। এ সময় উপস্থিত জনতা উত্তেজিত হয়ে রায়হানকে গণপিঠুনি দেয় এবং দা দিয়ে মাথায় আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
ঘটনা...৩....বাংলাদেশের রাজধানী পুরান ঢাকার মিটর্ফোট হাসপাতালের সামনে ২০২৫ সালের ৯ জুলাই প্রকাশ্যে দিবালোকে এক বর্বরচিত হত্যাকাণ্ডে নিহত ব্যক্তি মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদ (বয়স ৩৯) পুরান ঢাকার একজন ভান্ডারি ব্যবসায়ী ছিলেন। কয়েকজন দুর্বৃত্তর জনসমক্ষে তাকে পাথর ও ধারাল
অস্ত্র দিয়ে পিঠিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডের পিছনে ছিল চাঁদাবাজি ও আধিপত্যবাধ নিয়ে দ্বন্ধ। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং জাতিকে স্তম্ভিত করে তোলে। হত্যাকাণ্ডটি রাজনৈতিক সামাজিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
…ফুটপাত দখল ও বিক্রির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এক সময় উচ্চ আদালত কঠোর নির্দেশ দিয়েছিল। রাজধানী ঢাকার অবৈধ দখলদারদের নামের তালিকা দিতে রিটের পরিপেক্ষিতে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিচ ফর বাংলাদেশ এর আবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে হলফনামা জমা দিতে বলা হয়। উদ্দেশ্য ছিল কারা ফুটপাত দখল করে চাঁদাবাজি করছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা। এর পরিপেক্ষিতে উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে কাগজে কলমে…নির্দেশ জারি হয়েছে তবু দখলদারিত্ব থেকে যায় …আগের মতোই।
বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন সারাদেশ ব্যাপী চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। সবার আগে রাজধানীতে এই ব্যাপারে বিশেষ অভিযান চালু করা হবে। এই ক্ষেত্রে যেহেতু প্রধান মন্ত্রী আন্তরিক এবং বিরোধী দল ও চাঁদাবাজ এর ব্যাপারে সোচ্চার… এবার আর চাঁদাবাজদের রেহাই নেই। তা ছাড়া বিএনপি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল চাঁদাবাজ নির্মুল করবে…অবশ্যই তা বাস্তবায়ন হবে যদি কর্মসূচিতে জনগণের ও অংশগ্রহণ থাকে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চাঁদাবাজি তালিকা করার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছেন তা যে দলেরই হউক জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। মিডিয়াতে প্রচার করা যেতে পারে। উচ্ছেদ অভিযানের সময় ছাত্র জনতা সাধারণ পাবলিকের সহযোগিতা থাকতে হবে। সকল শ্রেণির সহযোগিতা ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান সফল হওয়া যাবে না। চিহ্নত চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে দেশ থেকে চাঁদাবাজ ও দখলদাবাজ নির্মুল হবে।
লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক ব্যাংকার।
যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় আসে, যখন তার প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প থাকে না। এই মূহুর্তে বাংলাদেশ ঠিক এমনই এক ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক ক্রান্তিকাল পার করছে। এ পরিস্থিতিতে একদিকে নানামুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামাল দেওয়া এবং অন্যদিকে বিপুল কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা—সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপি সরকারের অগ্রাধিকার কাজমূহের অন্যতম। এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে নানা কর্মসূচিও নিয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে দৃশ্যমান হবে। বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহারের মূল দর্শন—‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপরেখার ভিত্তি। ইশতেহারে দেশে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ‘এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’ গঠনের যে রূপকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এজন্য তাদেরকে এখন গতানুগতিক ধারার প্রথাগত ‘ঋণদাতা’র খোলস থেকে বেরিয়ে এসে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকৃত কারিগর এবং অর্থনীতির ‘রূপান্তরকারী’ সক্রিয় অংশীদার হিসেবে অবতীর্ণ হতে হবে ।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে বর্তমানে ‘নিম্ন-স্তরের ভারসাম্য বা লো-লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম’ পর্যায়ে অবস্থান করছে। অর্থনীতির ভাষায়, এর অর্থ হলো—একটি দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকলেও তার প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার তার প্রকৃত সম্ভাবনার চেয়ে অনেক নিচে আটকে আছে। এই স্থবিরতা বা অচলায়তন ভাঙতে হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেই বাংলাদেশকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি বিনিয়োগ-চালিত প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হতে হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ঘোষিত নীতিগত অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা এবং ব্যাংকিং খাতে নিয়মভিত্তিক সুশাসন নিশ্চিত করা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক রূপকল্প এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুগোপযোগী নীতিমালার আলোকে, দেশে একটি শক্তিশালী উদ্যোক্তা শ্রেণি ও টেকসই স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সুনির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন:
জামানতের শেকল ভাঙা ও ক্যাশ-ফ্লো ভিত্তিক অর্থায়ন
দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো ঋণ বা বিনিয়োগ প্রদানে অতিমাত্রায় জামানত-নির্ভরতা। আইটি, ফিনটেক, এগ্রিটেক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা সিএমএসএমই খাতের একজন তরুণ উদ্যোক্তার মাথায় হয়তো একটি বিলিয়ন ডলারের আইডিয়া এবং দক্ষতা আছে, কিন্তু ব্যাংকে দেওয়ার মতো তার কোনো স্থাবর সম্পত্তি বা জমির দলিল নেই। ব্যাংকগুলোকে এখন এই প্রথাগত চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জমির দলিলের বদলে উদ্যোক্তার মেধা, দক্ষতা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং ক্যাশ-ফ্লোকে পুঁজি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। উদ্যোক্তাদের ‘ডিজিটাল লেনদেনের ফুটপ্রিন্ট’ (যেমন: মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন, ইউটিলিটি বিল পরিশোধের হার ইত্যাদি) বিশ্লেষণ করে ‘অলটারনেটিভ ক্রেডিট স্কোরিং’ পদ্ধতির ব্যাপক প্রয়োগ ঘটাতে হবে। অবশ্য বাংলাদেশে কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক খু্বই ক্ষুদ্র পরিসরে এ ধরণের উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল লোন বা ন্যানো লোন সুবিধা ইতোমধ্যে চালু করেছে। কিন্তু ব্যাপকহারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হলে এই উদ্যোগ আরো সম্প্রসারিত ও ত্বরান্বিত করতে হবে। একইসাথে সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার এবং পর্যাপ্ত গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণদান প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও ডিজটাল করতে পারলে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পথে আশানুরুপ গতি আসবে।
ইকুইটি ফাইন্যান্সিং ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরি
প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে বাংলাদেশে স্টার্টআপ ফাইন্যান্সের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। গতানুগতিক ঋণ বা ডেট ফাইন্যান্সিং দিয়ে কখনোই একটি উদ্ভাবনী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব নয়। স্টার্টআপগুলোর ব্যবসায়িক মডেলে ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই তাদের প্রয়োজন ‘ইকুইটি ফাইন্যান্সিং’। প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিজস্ব ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’ উইং বা ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ থাকা এখন সময়ের দাবি। তরুণদের নতুন আইডিয়া বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে সিড ফান্ডিং বা ইনোভেশন গ্রান্ট প্রদানে ব্যাংকগুলোকে আরও সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে বুঝতে হবে, আজকের একটি ছোট স্টার্টআপ আগামীর একটি ইউনিকর্ন কোম্পানিতে পরিণত হতে পারে।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’
ধর্ম-বর্ণ-দল-মত-বয়স-লিঙ্গ-অঞ্চল নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গঠন ছাড়া ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। আমাদের দেশে পারিবারিক সম্পত্তির মালিকানায় নারীদের অংশীদারিত্ব কম থাকায়, প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নারী উদ্যোক্তারা ঋণ পাওয়া থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হন। এই কাঠামোগত বাধা দূর করতে ব্যাংকগুলোকে পার্সোনাল গ্যারান্টি বা গ্রুপ গ্যারান্টির ভিত্তিতে নারীদের ঋণ দেওয়ার পরিধি বাড়াতে হবে। সরকারের ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’—এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে গ্রামীণ নারীদের ঐতিহ্যবাহী পণ্য উৎপাদনে অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি, এই দেশীয় পণ্যগুলো যেন অ্যামাজন বা আলিবাবার মতো বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সহজে বিক্রি করা যায়, সেজন্য ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ও লজিস্টিক সংযোগে সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যাংকগুলোর প্রতিটি শাখার ‘নারী উদ্যোক্তা ডেস্ক’ যেন কেবল নামসর্বস্ব না থেকে সত্যিকার অর্থেই নারীদের ব্যবসা সম্প্রসারণে কাজ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রান্তিক পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও বিজনেস অ্যাডভাইজরি
উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ভূমিকা কেবল ঋণ বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের প্রত্যেক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর উদ্যোগের সাথে সমন্বয় করে ব্যাংকগুলোকে তাদের প্রতিটি শাখা, উপশাখা বা এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে ‘বিজনেস অ্যাডভাইজরি সেন্টার’ বা ব্যাবসায়িক পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তা উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মশালা, উদ্যোক্তা কাউন্সিলিং এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মত নানা কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সরকারের যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র বা অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া অনেক নতুন উদ্যোক্তা ট্রেড লাইসেন্স করা, প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি, হিসাবরক্ষণ বা কর বিষয়ক আইনি জটিলতার কারণে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। ব্যাংকগুলো যদি তাদের নিজস্ব জনবল দিয়ে এই মেন্টরশিপ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে, তবে প্রান্তিক পর্যায়েও সফল উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও কমে আসবে।
গিগ ইকোনমি এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষ সুবিধা
বর্তমান বিশ্বে ‘গিগ ইকোনমি’ বা স্বাধীন পেশাজীবীদের অর্থনীতি একটি বড় বাস্তবতা। দেশে প্রায় ৮ লক্ষ ফ্রিল্যান্সার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর তৈরির যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার নির্ধারণ করেছে, তার সুফল পেতে ব্যাংকগুলোকে বিশেষায়িত সেবা চালু করতে হবে। ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের প্রমাণপত্র প্রথাগত চাকরিজীবীদের মতো হয় না। তাই তাদের আয় দেশে আনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন পেমেন্ট চ্যানেল তৈরি, আয়ের গড়ের ওপর ভিত্তি করে সহজ শর্তে ক্রেডিট কার্ড প্রদান এবং বিশেষ ডিপিএস ও ঋণ সহায়তা চালু করতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের এই কর্মীদের সঞ্চয় ও মূলধন গঠনে ব্যাংকগুলো সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
ক্লাস্টার ভিত্তিক শিল্পায়ন ও ব্লু-ইকোনমি
আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে সরকারের ইশতেহারে উল্লেখিত সুনির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক শিল্পায়নে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি অঞ্চল গড়ে তুলতে ব্যাংকগুলোর সিন্ডিকেটেড অর্থায়ন প্রয়োজন। অন্যদিকে, দেশের সুবিশাল সমুদ্রসীমাকে কেন্দ্র করে ‘সুনীল অর্থনীতি’ বা ব্লু-ইকোনমির যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে হবে। হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ ভাঙা শিল্প এবং ইকো-ট্যুরিজম খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ক্লাস্টার-ভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
সিএসআর ফান্ডের যুগোপযোগী ব্যবহার ও দক্ষতা উন্নয়ন
ব্যাংকগুলোর কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের ব্যয়ের ধরনেও গুণগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কেবল অনুদান বা ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, সিএসআর তহবিলের একটি বড় অংশ তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, বিদেশি ভাষা শিক্ষা এবং স্কিল ডেভেলপমেন্টে ব্যয় করা উচিত। শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করতে ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া’র দূরত্ব ঘোচাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগে ইনকিউবেটর, বুটক্যাম্প ও জব ফেয়ার আয়োজনে ব্যাংকগুলোর স্পন্সরশিপ দেশের জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
অলিগার্কিক কাঠামোর বিলোপ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা
উপরোক্ত সকল উদ্যোগ তখনই সফল হবে, যখন ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। ব্যাংক পরিচালনায় এবং ঋণ মঞ্জুরিতে সকল প্রকার রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক ও পারিবারিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে। মুষ্টিমেয় কিছু পরিবার বা গোষ্ঠীর হাতে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা কুক্ষিগত থাকার যে সংস্কৃতি, তা ভেঙে ফেলতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ আদায় করে, সেই তারল্য নতুন ও সম্ভাবনাময় সাধারণ উদ্যোক্তাদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে ন্যায়ভিত্তিক ও রুল-বেসড ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার যে কড়া বার্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিয়েছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদকে তা অবিলম্বে ধারণ করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি দেশের অর্থনীতি যখন নতুন উচ্চতায় আরোহণের প্রস্তুতি নেয়, তখন ব্যাংকিং খাতকে তার চালিকাশক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির মাধ্যমে একটি স্পষ্ট গন্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। দেশের আর্থিক খাতে নীতিনির্ধারক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে তার যুগোপযোগী মুদ্রানীতি ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে এই ইশতেহারে বর্ণিত অর্থনৈতিক গন্তব্যে পৌঁছানোর পথনকশাও তৈরি করতে হবে। এবং সেই পথনকশা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাঠে নেমে কাজ করার উদ্যোগ ও সদিচ্ছার। প্রকৃত অর্থে মেধা, পরিশ্রম, দক্ষতা, সম্ভাবনা ও তারুণ্যের ওপর আস্থা রেখে ব্যাংকগুলো যদি নতুন উদ্যোক্তাদের হাত ধরে এগোয়, তবে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের জোয়ার সৃষ্টি হবে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল ‘ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি’র স্বপ্ন বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে।
লেখক: ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষক।
শীতের সকালে আফতাবনগরের ঘাস-বনভূমি একসময় পাখির কলতানে মুখর এলাকা। প্রতিবছর শীতে উড়ে আসে পরিযায়ী পাখির ঝাঁক, গাছে গাছে শোনা যায় তাদের ডাক। কিন্তু প্রতিবছরের মতো এবারও সেই ঘাস-বনভূমির একাংশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে গেছে গাছ, ঝোপঝাড়—আর সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেছে অসংখ্য পাখির নিরাপদ আশ্রয়।
এই ঘাস-বন পোড়ানোর ফলে কার্বন নিশ্বরণের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাখিকুল। অনেক পাখির বাসা, ডিম ও ছানাপোনা আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। যারা উড়তে পারেনি, তারা প্রাণ হারিয়েছে। এই দৃশ্য শুধু হৃদয়বিদারকই নয়, আমাদের মানবিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
প্রতিবছর শীত মৌসুমে সাইবেরিয়া ও অন্যান্য শীতপ্রধান অঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আফতাবনগরে আসে। সাইবেরিয়ান স্টন চ্যাট, ইয়োল অকটেইলসহ নানা প্রজাতির পাখি এখানকার বনভূমি ও জলাভূমিকে নিরাপদ আশ্রয় ও খাদ্যের উৎস হিসেবে বেছে নেয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা আসে বেঁচে থাকার তাগিদে। কিন্তু ঘাস-বন পোড়ানোর কারণে তাদের সেই আশ্রয় আর নিরাপদ থাকছে না। খাদ্যের উৎস ধ্বংস হওয়ায় এসব পাখি আজ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে।
প্রকৃতির এই নির্মম ধ্বংস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঘাস- বন পোড়ানো কেবল পাখিদের জীবনই কেড়ে নিচ্ছে না, এটি পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্যও নষ্ট করছে। পাখি প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে, গাছের বীজ ছড়াতে সহায়তা করে এবং পরিবেশকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাখির সংখ্যা কমে গেলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেও এসে পড়ে—খাদ্যচক্র ভেঙে পড়ে, পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
পাখিদের বাঁচানো শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব এবং একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত। পাখির মাধ্যমে আমরা যে পরিবেশগত উপকার পাই, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই আফতাবনগরে ঘাস-বন পোড়ানোর মতো অমানবিক কাজ অবিলম্বে বন্ধ করা জরুরি।
এক্ষেত্রে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। ঘাস-বনভূমি রক্ষা, নজরদারি জোরদার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না করলে এই ধ্বংস থামানো সম্ভব নয়।
প্রকৃতি বাঁচলে, আমরাও বাঁচব—এই সত্য এখনই উপলব্ধি করার সময়। নইলে একদিন আফতাবনগরের ঘাস-বন থাকবে শুধু স্মৃতিতে, আর পাখির ডাক শোনা যাবে কেবল পুরোনো গল্পে।
অধ্যাপক ড. মোঃ আবু তালেব
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়েছে বলে উল্লেখ করে ভোট-পরবর্তী বিভ্রান্তি মোকাবিলায় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অধ্যাপক ড. মোঃ আবু তালেব। ড. মোঃ আবু তালেব অধ্যাপক ও গবেষক হিসেবে কর্মরত আছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়–এ।
একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখায় তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল অবাধ, স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক—যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। নির্বাচনে হার-জিত গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। ব্যালটের মাধ্যমে জনরায়কে সম্মান করা প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কিছু মহল ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’–এর অভিযোগ তুলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়াচ্ছে অভিযোগ, গুজব ও অপপ্রচার।
ড. তালেব মনে করেন, এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জন্য তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও কৌশলগত ভূমিকা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। তার প্রস্তাবিত মূল পদক্ষেপগুলো হলো:
১. প্রমাণভিত্তিক অবস্থান গ্রহণ: যে কোনো অভিযোগ তথ্য, পরিসংখ্যান ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করতে হবে। আবেগপ্রবণ বক্তব্যের পরিবর্তে লিখিত প্রতিবেদন, পর্যবেক্ষণ নথি ও আইনি কাঠামোর মধ্যে অভিযোগ উত্থাপন অধিক কার্যকর। একটি সুসংগঠিত ডকুমেন্টেশন সেল গঠন করলে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে দল শক্ত ভিত্তি পাবে এবং অপপ্রচারের সুযোগ কমবে।
২. ডিজিটাল ফ্যাক্ট-চেক ও সচেতনতা: ডিজিটাল যুগে অপপ্রচার সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায় সামাজিক মাধ্যমে। তাই একটি দক্ষ ফ্যাক্ট-চেক টিম গঠন জরুরি, যারা ভুয়া ভিডিও, পুরোনো ছবি বা বিকৃত তথ্য শনাক্ত করে প্রমাণসহ খণ্ডন করবে। দলীয় কর্মী-সমর্থকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য শেয়ার না করা এবং শালীন ভাষা ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
৩. ইতিবাচক ও নীতিনিষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষা: অপপ্রচারের জবাবে নেতিবাচকতা নয়—উন্নয়ন পরিকল্পনা, গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার ও সুশাসনের রূপরেখা তুলে ধরা উচিত। শালীন ও নীতিনিষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষা জনগণের আস্থা অর্জনে সহায়ক।
৪. গণমাধ্যমের সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগ: সংবাদ সম্মেলন, লিখিত বিবৃতি ও নিয়মিত ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে দলীয় অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরলে ভুল বোঝাবুঝি কমে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের শান্ত ও তথ্যসমৃদ্ধ জবাব দলীয় ভাবমূর্তি উন্নত করে। গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করাই উত্তম।
৫. আইনগত ও ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ: উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুয়া তথ্য ছড়ালে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না হয়—সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া জনগণের আস্থা বাড়ায়।
৬. তৃণমূল ও তরুণ সম্পৃক্ততা: তৃণমূল পর্যায়ে মতবিনিময় সভা ও সরাসরি যোগাযোগ বিভ্রান্তি দূর করতে কার্যকর। পাশাপাশি তরুণদের লক্ষ্য করে তথ্যভিত্তিক ভিডিও, ইনফোগ্রাফিক ও অনলাইন আলোচনার আয়োজন করলে অপপ্রচার মোকাবিলায় সচেতন প্রজন্ম তৈরি হবে।
৭. আত্মমূল্যায়ন ও পর্যালোচনা: অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের মাধ্যমে যোগাযোগের ঘাটতি ও কৌশলগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা উচিত। আত্মসমালোচনার সাহস একটি রাজনৈতিক দলের পরিপক্বতার প্রমাণ।
অপপ্রচার রোধ করা শুধু একটি দলের সুনাম রক্ষা নয়—বরং গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করা। সত্যনিষ্ঠতা, ধৈর্য ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক চর্চাই পারে বিভ্রান্তির অন্ধকার দূর করতে। যদি প্রমাণনির্ভর বক্তব্য, স্বচ্ছ যোগাযোগ ও ইতিবাচক রাজনীতির চর্চা অব্যাহত থাকে, তবে একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত থাকে সত্য ও আস্থায়। তাই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সর্বোত্তম অস্ত্র হলো তথ্য, যুক্তি ও নৈতিকতা।
মন্তব্য