রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে ‘বদর যুদ্ধের’ ডাক ও কিছু জিজ্ঞাসা

রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে ‘বদর যুদ্ধের’ ডাক ও কিছু জিজ্ঞাসা

রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে দেশের বাইরে থেকে কোটি কোটি টাকাও সংগ্রহ করা হয়। পরিকল্পনা এখানেই থেমে ছিল না। ক্ষমতা দখলের কৌশল রপ্ত করতে কেউ কেউ পাকিস্তানে দীক্ষা নিতে গিয়েছিলেন। পাকিস্তানের উগ্র রাজনৈতিক সংগঠন তেহরিক-ই লাব্বাইক পাকিস্তান (টিএলপি)-কে মডেল হিসেবে গ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের দীক্ষা নেন তারা। হেফাজতের খিলাফত প্রতিষ্ঠার অভিলাষে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর সম্পৃক্ততার তথ্যও মিলেছে।

৩ মে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুবুল আলমের বরাত দিয়ে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে, আরেকটি ‘বদর যুদ্ধের’ ডাক দিয়েছিল হেফাজত। রমজান মাসে বদরের যুদ্ধ হয়েছিল। তাই গত ২৬ মার্চ শুরু হওয়া হেফাজতের সহিংসতা রমজান পর্যন্ত টেনে আনার পরিকল্পনা ছিল বলেও জানান তিনি। রমজানে দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা ছিল হেফাজতের। কাগজে-কলমে অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও হেফাজতের কজন নেতা ছিলেন রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী। হেফাজত ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেছিলেন তারা। ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়ানোর পাশাপাশি সরকারবিরোধী একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করেছিলেন হেফাজত নেতারা এটা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বর ও আশপাশের এলাকায় তাণ্ডব থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ভয়ংকর সহিংসতায় এর ইঙ্গিত মেলে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে দেশের বাইরে থেকে কোটি কোটি টাকাও সংগ্রহ করা হয়। পরিকল্পনা এখানেই থেমে ছিল না। ক্ষমতা দখলের কৌশল রপ্ত করতে কেউ কেউ পাকিস্তানে দীক্ষা নিতে গিয়েছিলেন। পাকিস্তানের উগ্র রাজনৈতিক সংগঠন তেহরিক-ই লাব্বাইক পাকিস্তান (টিএলপি)-কে মডেল হিসেবে গ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের দীক্ষা নেন তারা। হেফাজতের খিলাফত প্রতিষ্ঠার অভিলাষে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর সম্পৃক্ততার তথ্যও মিলেছে।

আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ)-এর আদেশ-নির্দেশ ও বিধান প্রতিষ্ঠায় কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধাচরণ করার কথা নয়। কিন্তু যে পদ্ধতিতে ও মডেল অনুসরণ করে হেফাজতে ইসলাম খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায় তা ইসলামসম্মত কি? রাসুল (সাঃ) শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন। আরবে তখন জাহিলিয়াতের সময় তথা অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ ছিল। তাগুতের তথা পথভ্রষ্টদের শাসন ছিল। তিনি কি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ইসলাম প্রাতিষ্ঠা করেছিলেন? বদর যুদ্ধ হয়েছিলে মুসলমান ও কাফেরদের মধ্যে। হেফাজতের আরেকটি ‘বদর যুদ্ধে’ কাফের প্রতিপক্ষ কে? বদর যুদ্ধ তো রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের যুদ্ধ ছিল না। মুসলমানদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার জন্য আবু সুফিয়ান ও তার দল শাম থেকে অস্ত্র নিয়ে মক্কা ফিরছিল।

মুসলমানরা কাফেরদের ভবিষ্যৎ আক্রমণের কথা ভেবে আত্মরক্ষার্থে আবু সুফিয়ানকে আটকিয়ে অস্ত্র জব্দ করতে চেয়েছিল। বিষয়টি আবু সুফিয়ান টের পেয়ে দ্রুত সাহায্যের জন্য মক্কায় খবর পাঠান। মক্কায় প্রচার হয় মুসলমানরা আবু সুফিয়ানের কাফেলার ওপর হামলা করেছে। খবর পেয়ে আবু জাহেলের নেতৃত্বে এক হাজার সশস্ত্র যোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী মদিনা আক্রমণের জন্য বের হয়। মদিনার অদূরে অবস্থিত একটি কূপের নাম ছিল বদর। সেই সূত্রে এই কূপের নিকটবর্তী আঙিনাকে বলা হতো বদর প্রান্তর। এখানেই যুদ্ধ সংঘটিত হয় বলে এটি বদর যুদ্ধ নামে খ্যাত।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বদর যুদ্ধ ছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ যা মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যে দ্বিতীয় হিজরিতে সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিমরা সংখ্যায় অনেক কম হয়েও মক্কার কাফির শক্তিকে পরাজিত করে ইসলামের সোনালি দিনের সূচনা করেন। বদরের যুদ্ধ ছিল সত্য মিথ্যা তথা হক্ক ও বাতিলের মধ্যে যুদ্ধ। আরেকটি বদর যুদ্ধে কে হক্ক আর কে বাতিলপন্থি? রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করার ওপর ইসলাম তাগিদ দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন-

“তোমরা নির্দেশ পালন কর আল্লাহ, রাসুল ও তোমাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবানদের।” (সুরা নিসা: ৪৯)।

রাষ্ট্রে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহতায়ালা বলেন-

“পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না”। (সুরা কাসাস: ৭৭)।

ইসলাম শাসকশ্রেণির আনুগত্যের প্রতি বিশেষ তাগিদ দিলেও অন্ধভাবে সব অন্যায়কে মাথা পেতে নিতে নির্দেশ করে না। ইসলাম বিভিন্ন অন্যায় কাজে শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অবকাশ রেখেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের অনুমতি দেয় না। রাসুল (সা.) বলেছেন-

“সর্বোত্তম জিহাদ হলো, অত্যাচারী শাসকের সামনে ন্যায় ও ইনসাফের কথা বলা।” (তিরমিজি, ২১৭৪)। তবে স্মরণ রাখতে হবে, শাসকের অবাধ্যতা কেবল ধর্ম ও আল্লাহর নাফরমানির কারণেই বৈধ। অন্য ক্ষেত্রে নয়। রাসুল (সা.) আরও বলেছেন-

“মনে রেখো, যে ব্যক্তি কোনো শাসককে আল্লাহর নাফরমানিমূলক কাজ করতে দেখে, সে ওই কাজকে মন্দ বলবে। তবুও তার আনুগত্য ত্যাগ করা যাবে না।” (বোখারি, ৪৭৬৮)।

রাসুল (সাঃ) অন্য এক হাদিসে বলেছেন-

“রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্য ততক্ষণ পর্যন্ত অপরিহার্য, যতক্ষণ সে আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ না করে।” (বোখারি, ২৯৫৫)

এ প্রসঙ্গে রাসুল (সাঃ) আরও বলেন-

“আমার পরে এমন শাসক আসবে, যে আমার দিকনির্দেশনার ওপর চলবে না। আমার আদর্শ মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা করবে না। তাদের মধ্যে এমন লোকও হবে, যাদের অন্তর হবে শয়তানের অন্তর। তখনও শাসকের কথা শুনবে, মানবে। যদিও সে তোমাকে প্রহার করে, তোমার সম্পদ কেড়ে নেয়। তখনও তার আনুগত্য করবে। বিদ্রোহ করবে না।” (মুসলিম, ৪৭৪৮)

প্রশ্ন হলো, কতদিন পর্যন্ত মুসলমানরা শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে পারবে না? রাসুল (সা.) বলেন-

“নিশ্চয়ই তোমাদের ওপর এমন শাসক নিযুক্ত করা হবে, যার কিছু কাজকে তোমরা ভালো বলবে, কিছু কাজকে মন্দ বলবে। যে ব্যক্তি অন্যায়কে অপছন্দ করবে, সে (গুনাহ থেকে) দায়মুক্ত থাকবে। তবে যে অন্যায়ের প্রতি সন্তুষ্ট থেকে তাকে অনুসরণ করবে সে গুনাহগার হবে। সাহাবিগণ প্রশ্ন করলেন, ‘আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না? রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নামাজ পড়ে’। (মুসলিম, ৪৭৬৪)

হজরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলমানদের মধ্যে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তাতে সাহাবায়ে কেরাম কেউ কেউ নিজ ইজতেহাদ অনুসারে কোনো একপক্ষে যোগ দিলেও অন্যরা কোনো পক্ষকেই সমর্থন করেননি। হজরত উসামা (রা.) হজরত আলী (রা.)-কে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি যদি কোনো বাঘের উদ্ধত থাবার সম্মুখেও হতেন, আমি আপনার সঙ্গ দিতাম। কিন্তু গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণকে আমি বৈধ মনে করি না’। (বোখারি, ৭১১৩)।

ঐক্যবদ্ধ জাতিকে বিভক্ত করা ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “নিশ্চিতভাবে জেনে রেখ, সামনে অনেক মন্দ বিষয়াবলি ঘটবে। কাজেই যে ব্যক্তি জাতির ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় অনৈক্য সৃষ্টি করবে, তরবারি দ্বারা তার মাথা উড়িয়ে দাও। সে যেই হোক না কেন।” (মুসলিম, ৪৭৫৯)

নাগরিকের দায়িত্ব হলো, ভালো কাজে রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করা ও মন্দ কাজে বাধা দেয়া। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-

“তোমরা শুভ কাজ ও খোদাভীরুতার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা কর, আর পাপ ও খোদাদ্র্রোহিতার কাজে সহযোগিতা করবে না”। (সুরা মায়েদা: ২)

মন্দ কাজে বাধা দেয়া মানে রাষ্ট্রে অরাজকতা সৃষ্টি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল নয়। রাষ্ট্রপ্রধানের আনুগত্য করার জন্য ইসলাম যেমন আদেশ দিয়েছে তেমনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করার জন্য এবং রাষ্ট্রে অরাজকতা সৃষ্টি না করার জন্য কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। কুরআন, হাদিসের নির্দেশ লঙ্ঘন করে ‘আরেকটি বদর যুদ্ধের’ ডাক দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজে ভয়ংকর ফিতনা সৃষ্টি কি হক্কপন্থির কাজ হবে? হেফাজত যে পাকিস্তানকে সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করছেন সে পাকিস্তান তো প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্রসমূহের কাতারে। পাকিস্তান খেলাফতের মডেল হতে পারে না। ‘পাকিস্তান খেলাফত’কে অস্বীকার করে ৫০ বছর আগে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসেছে। বেলুচিস্তান ও সিন্ধু পাকিস্তান থেকে আলাদা হতে বহু বছর ধরে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করছে। অর্থনৈতিকভাবে ও উগ্রবাদে ভয়ংকরভাবে বিপর্যস্ত পাকিস্তান। অতি সম্প্রতি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সংসদে।

এই প্রস্তাবটির পক্ষে ৬৮১ এবং বিপক্ষে মাত্র ৬টি ভোট পড়ে। ইইউর প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পাকিস্তানকে দেয়া বিশেষ ব্যবসায়িক অধিকার (জিএসপি স্ট্যাটাস) অবিলম্বে কার্যকরভাবে বাতিল করা হবে। এর কারণ হিসেবে পাকিস্তানে মৌলবাদীদের আধিপত্য ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে কঠোর আইন ব্যবহারের অভিযোগকে তুলে ধরা হয়েছে। এমনিতেই পাকিস্তানের অর্থনীতির ভয়ংকর রকম খারাপ অবস্থা, এর মধ্যে ইইউর এই প্রস্তাবের মাধ্যমে অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এরপরও রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে কেন পাকিস্তানি দীক্ষা?

হেফাজতের কিছু নেতা পাকিস্তানের যে দলকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করেছেন সেই তেহরিক-ই লাব্বাইক পাকিস্তান তথা টিএলপিকে উগ্রপন্থি আচরণের দায়ে পাকিস্তান সরকার দুই সপ্তাহ আগে নিষিদ্ধ করেছে। ফ্রান্সে মহানবী (সাঃ)-এর ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশের ঘটনার জেরে পাকিস্তানে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে আন্দোলনে নামে টিএলপি। টিএলপি-প্রধান সাদ রিজভীকে গ্রেপ্তার করে সরকার। তার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে দেশটির প্রধান প্রধান শহরে সহিংস বিক্ষোভ শুরু করে টিএলপি কর্মী-সমর্থকরা। টিএলপির সন্ত্রাসী হামলায় দুজন পুলিশ নিহত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও ৩৪০ সদস্য গুরুতর আহত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা এবং জনসাধারণের জানমালের ক্ষতি করার অভিযোগে পাকিস্তান টিএলপিকে নিষিদ্ধ করেছে।

ধর্মীয় উগ্রবাদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া পাকিস্তান যদি টিএলপিকে নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়, তাহলে হেফাজত কেন পাকিস্তান থেকে টিএলপি মডেল আমদানি করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল তথা খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়? হেফাজতে ইসলাম খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে যুদ্ধ শুরু করলে প্রতিপক্ষ নিঃসন্দেহে বসে থাকবে না। কেউ রাষ্ট্রের চেয়ে বড় হয়ে উঠলে রাষ্ট্র তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পালটা জবাব দেবে এটাই স্বাভাবিক। শুরু হবে গৃহযুদ্ধ, যুক্ত হবে নানা পক্ষ। এমন অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের ফলাফল আমাদের চোখের সামনে।

এরপরও হেফাজত বাংলাদেশকে কেন আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, সোমালিয়া বানাতে চায়? তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই হেফাজত খেলাফত প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হলো, টিকিয়ে রাখতে পারবে কি? কাদের সমর্থন নিয়ে খেলাফত চালাবে হেফাজত? মুসলিম উম্মাহর চোখের সামনে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র কেড়ে নিলো ইহুদিরা। চার দশক ধরে মিয়ানমারের মুসলমানরা গণহত্যা, ধর্ষণ, রাষ্ট্র থেকে বিতাড়নসহ নানা জুলুমের শিকার হলো মুসলিম উম্মাহ কতটুকু কার্যকরভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে? আর উইঘুর মুসলিমদের ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহ তো মুখে কুলুপ এটেছে। হেফাজতের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল জরুরি কেন? হেফাজতের বিবেচনায় বাংলাদেশে তাগুতের শাসন পরিচালিত হচ্ছে।

যদি ধরে নিই তাদের বক্তব্য সত্য, তাহলে প্রশ্ন হলো রাসুল (সাঃ) যখন পৃথিবীতে আসেন তখন জাহেলি তথা অন্ধকারের যুগ ছিল, তাগুতের শাসন ছিল। আল্লাহর রাসুল (সাঃ) কি তাগুতের শাসন পরিবর্তনের জন্য জোর করে, নেতিবাচক পন্থায়, নৈরাজ্য ও ধ্বংসাত্মক পন্থা অবলম্বন করেছিলেন? রাসুল (সাঃ) তার সাহাবিদের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে দিতে উগ্র বক্তব্য দিতেন, না সুন্দর ব্যবহার, উত্তম চরিত্র, আল্লাহর পথে আহ্বান, আত্মগঠন ও সমাজ-সংস্কারের মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন? আপনারা তাহলে কার অনুসরণ করছেন? আল্লাহর আইন বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ করতে হলে তা শুধু আল্লাহর কুরআন ও রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথেই করতে হবে। ইসলামের নামে কোনো শায়খের খামখেয়ালিপনা কিংবা ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শবিরোধী পন্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন-

“হে নবী, লোকদের বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমাকে অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও অসীম দয়াবান। তাদের বলুন আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য প্রকাশ কর। এরপর বস্তুত যদি তারা বিমুখতা অবলম্বন করে, তাহলে আল্লাহ কাফেরদেরকে ভালোবাসেন না”। (সুরা আল ইমরান:৩১-৩২)।

কুরআনের অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন-

“নিঃসন্দেহে রাসুলের জীবনে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। অবশ্য তাদের জন্য, যারা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের ও পরকালীন মুক্তির ব্যাপারে আশা রাখে এবং যারা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে”। (সুরা আহযাব: ২১)

জিহাদের আহ্বান কে করতে পারে? যদি যে কেউ জিহাদের আহ্বান ও নেতৃত্ব দিতে পারত, তাহলে মুসলমানরা নানা দলে বিভক্ত হয়ে জিহাদের ডাক দিত, আর সেক্ষেত্রে নিশ্চিত বিশৃঙ্খলা, নিজেদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগে যেত। ইসলামে বিশৃঙ্খলা, বিপর্যয় সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই, বরং বিশৃঙ্খলা, বিপর্যয়কে কুরআনে হত্যার চেয়েও জঘন্য অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইসলামে একমাত্র মনোনীত নেতাই জিহাদের আহ্বান ও নেতৃত্ব দিতে পারেন। রাসুল (সাঃ) বলেন-

“রাষ্ট্রপ্রধান হলেন ঢাল, যাকে সামনে রেখে কিতাল বা যুদ্ধ পরিচালিত হবে।” (বুখারী, ৫৫৩, ১০২৬; মুসলিম ১৪৭১)

সাহাবীগণ কখনই রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের বাইরে যুদ্ধ বা কিতালে লিপ্ত হননি। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ইসলামি জ্ঞান শিক্ষার কথা বলে ভর্তি করে তাদেরকে ধর্মীয় উন্মাদনা দিয়ে, জিহাদের ভুল মন্ত্রে উজ্জীবিত করে, অরাজকতার জন্য রাস্তায় নামিয়ে দেয়া, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বন্দুকের শিকারে পরিণত করা শিক্ষার্থীদের আভিভাবকের সঙ্গে প্রদত্ত ওয়াদার বরখেলাপ নয় কি? ধর্মের জন্য যদি সন্ত্রাস হয়ে থাকে, তবে ইসলামে তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা’য়ালা কুরআনে ঘোষণা করেছেন-

“দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হেদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে। অতএব, যে ব্যক্তি তাগুতকে (সীমালঙ্ঘনকারী, আল্লাহদ্রোহী, বিপথগামী) অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, অবশ্যই সে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে, যা ছিন্ন হওয়ার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সুরা বাকারা:২৫৬)

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ আরও বলেছেন-

“আর যদি আপনার প্রভু ইচ্ছা করতেন তাহলে পৃথিবীর বুকে বসবাসকারী সব মানুষকেই একসঙ্গে বিশ্বাসী বানিয়ে ফেলতে পারতেন। সুতরাং (হে মুহাম্মদ) আপনি কি তাহলে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য লোকদের জবরদস্তি করতে চান?” (সুরা ইউনুস : ৯৯)।

ইসলামে জিহাদ বা কিতাল তথা যুদ্ধের বৈধতার সর্বপ্রথম শর্ত হলো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব। কিতাল বা জিহাদ কখনই ইসলামি রাষ্ট্র বা ইসলামি বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যম নয়।

ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একমাত্র মাধ্যম দাওয়াত বা প্রচার। কিতাল বা যুদ্ধ হলো প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সংরক্ষণ, রাষ্ট্র ও নাগরিকদের নিরাপত্তার মাধ্যম। রাসুল (সাঃ) দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। দাওয়াতের ভিত্তিতে মদিনার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ইসলামি জীবনব্যবস্থা মেনে নেন এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে তাদের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গ্রহণ করেন। যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিতাল বা যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইসলাম অনেক শর্ত আরোপ করেছে। সেগুলোর অন্যতম হলো- রাষ্ট্রের বিদ্যমানতা ও রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমতি, রাষ্ট্র বা মুসলিমদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া, সন্ধি ও শান্তির সুযোগকে প্রাধান্য দেয়া ও কেবলমাত্র যোদ্ধা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা। অরাজকতা সৃষ্টি করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল কখনই ইসলামের দৃষ্টিতে জিহাদ বা কিতাল নয়। তাই আরেকটি বদর যুদ্ধের ডাক কোনোভাবেই ইসলামসম্মত নয়।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

আরও পড়ুন:
উত্তাল তরঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দর্শনই আশার তরী
করোনায় অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছি?
কিছু কোমলহৃদয় কেন ‘সুন্দর ভুবনে বাঁচিবারে’ চায় না?
প্রতিভা বিকাশ ও গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা সময়ের দাবি
সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস নির্মূল জরুরি

শেয়ার করুন

মন্তব্য

করোনাকালে নির্ভরতা পেয়েছে টেলিসেবা

করোনাকালে নির্ভরতা পেয়েছে টেলিসেবা

করোনা মহামারি শুরুর দিকে অনেক হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা ছাড়া অন্যান্য সেবা যখন মিলছিল না বা প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসক রোগী দেখা বন্ধ করে দেন, তখন চিকিৎসা পরামর্শ পাওয়ার একটি জানালা খোলা ছিল, টেলিমেডিসিন।

বিশ্বব্যাপী প্রাণসংহারী মহামারি কোভিড-১৯-এর ভয়াবহতা তছনছ করে দিচ্ছে। দিশেহারা মানুষ জানে না কবে আবার ফিরে আসবে সেই স্বাভাবিক দিন। চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সংক্রমণভীতি। চরম চাপের মুখে পড়ে স্বাস্থ্য সেবা। এ সময়ে মানুষের চিকিৎসার প্রধান সহায় হয়ে ওঠে টেলিমেডিসিন সেবা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারির সময় চিকিৎসার সেরা বিকল্প এটি, যার মাধ্যমে রোগীরা হাসপাতালের চেয়ে বেশি সেবা পাচ্ছেন এই বিকল্প পন্থায়। মূলত, মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে ভিডিও কলের মাধ্যমে রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসকরা কথা বলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়াটাই টেলিমেডিসিন সেবা।

স্বাভাবিক সময়ে টেলিসেবার কথা ভাবতেই পারেননি অনেকে। করোনা বদলে দিল সেই চিত্র। এখন দূরের গ্রামে বসেও দেখানো যাচ্ছে ঢাকার ডাক্তার। দেশের বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারও উদ্যোগী হয়ে আরও বড় পরিসরে টেলিমেডিসিন সেবা দিতে শুরু করে। ফলে গ্রাম বা প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসরত ধনী-গরিব সকলের জন্যই বিনা মূল্যে সরকারি চিকিৎসকদের কাছ থেকে চিকিৎসা পরামর্শ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

দেশের ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান টেলিমেডিসিন সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সরকারের স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩, লাইফস্প্রিং, অর্ক হেলথ লিমিটেড, সিনেসিস হেলথ, টনিক, ডিজিটাল হেলথ, প্রাভাহেলথ প্রভৃতি। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ফেসবুক মেসেঞ্জারেও চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে ডাক্তারের পরামর্শ পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। অনেক চিকিৎসক নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে রোগীদের সেবা দিচ্ছেন ভয়েস ও ভিডিও কলে এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ভাইবার ব্যবহার করেও।

দেশের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসকের কাছ থেকে বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য পরামর্শ নিতে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ৪৮২টি হাসপাতালে একটি করে মোবাইল ফোন দেয়া হয়েছে। এসব মোবাইল ফোনের নম্বর স্থানীয় পর্যায়ে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

চিকিৎসা ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এর সুবিধা পাচ্ছেন চিকিৎসক ও রোগী। এ বিষয়ে ফেনী সদরের স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাসুদ রানা বলেন, করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৫৬,৩৮৫ জনকে টেলিফোনের মাধ্যমে সেবা দেয়া হয়েছে। এই এলাকার কারও শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে কন্ট্রোল নম্বরে ফোন করেন। তাদের অবস্থা বুঝে প্রাথমিকভাবে প্রেসক্রিপশন দেয়া হয়, কয়েকটি টেস্টও করা হয়। পরবর্তী সময়ে করোনা টেস্টের জন্য নোয়াখালীতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

করোনা মহামারি শুরুর দিকে অনেক হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা ছাড়া অন্যান্য সেবা যখন মিলছিল না বা প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসক রোগী দেখা বন্ধ করে দেন, তখন চিকিৎসা পরামর্শ পাওয়ার একটি জানালা খোলা ছিল, টেলিমেডিসিন। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, মহামারির সময়ে পুরোপুরি না হলেও রোগীদের একটি অংশের এ পদ্ধতিতে ভালো কাজ করেছে। তবে সব রোগীকে এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব না বা রোগীর মধ্যেও অতৃপ্তি কাজ করে। যেমন কোনো রোগী যদি তার পেটে ব্যথা বা বুকে ব্যথার কথা বলেন সেক্ষেত্রে সরাসরি রোগীর শরীরের অনেক কিছু পরীক্ষা করার থাকে। ফলে তাদেরকে হাসপাতালে শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন।

এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা নেন ঝিনাইদহ সদরের মালা আক্তার। দুই দিন ধরে মাথা ব্যথা ও জ্বর নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ায় সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসকের সঙ্গে নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আলাপ করেন। প্রথম দিকে টেলিমেডিসিন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। কারণ টেলিফোনে কার সঙ্গে কী কথা বলবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তাছাড়া রোগী না দেখে ডাক্তার কী ওষুধ দেবেন বা সেই ওষুধের ওপর কতটা নির্ভর করা যায় তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। মালার স্বামী জিয়াউল হকের পরামর্শে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাক্তারের সঙ্গে একবার কথা বলে ভুল ধারণা পালটে যায়। ডাক্তার কিছু ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে কোভিড টেস্ট করতে বলেন। পরীক্ষা করে মালা করোনা আক্রান্তের খবর জানতে পারেন। বাড়িতে তার বৃদ্ধা শাশুড়ি ও সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে ডাক্তারের পরামর্শে বাসায় আইসোলেশনে থাকেন এবং নিয়মিত ওষুধ খেয়ে ও ব্যায়াম করে সুস্থ হয়ে ওঠেন ৪২ বছর বয়সী মালা।

টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন এমন অনেকের মধ্যে রাজধানীর মো. হানিফ। সরকারি চাকরিজীবী হানিফ করোনার লক্ষণ অনুভব করায় হাসপাতালে যাওয়া অনিরাপদ ভেবে পরিচিত ডাক্তারের সঙ্গে টেলিফোনের মাধ্যমে শরণাপন্ন হন। তিনি বলেন, কাঙ্ক্ষিত বিশেষজ্ঞকে পেয়ে এবং তার পরামর্শে উপকৃত হয়েছি।

একই ধরনের কথা বললেন ময়মনসিংহের এসকে হাসপাতালের টেলিমেডিসিন সেবাগ্রহীতা করোনার ভলান্টিয়ার ও প্রেস ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী। তিনি বলেন, গত বছর ২৫ আগস্ট রাতে জ্বরে আক্রান্ত হন। পরদিন শরীরে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং পরবর্তী সময়ে খাবারে স্বাদ না পাওয়ায় করোনা উপসর্গ মনে করে চিকিৎসকের সঙ্গে টেলিফোনে পরামর্শ নেন। পরীক্ষা করে করোনা আক্রান্তের রিপোর্ট পান। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. প্রদীপ চন্দ্র করের পরামর্শে ওষুধ ও স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন। অসুস্থ অবস্থায় ডাক্তার ফোন করে সব সময় খোঁজখবর নিয়েছেন, যা দ্রুত সুস্থতার জন্য সহায়ক হয়েছে বলে জানান ইউসুফ।

ডা. প্রদীপ চন্দ্র করের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর আগস্ট থেকে করোনার ভয়াবহ অবস্থার সময় বেশির ভাগ মানুষের কাছে প্রধান ব্যবস্থা হয়ে ওঠে টেলিসেবা প্রযুক্তি। তবে করোনা মারাত্মক রোগ হলেও এ থেকে শতকরা ৮০ জন এমনিতেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। তার মতে, একজন রোগীকে টেলিফোনে গাইড করলে তার মনোবল বৃদ্ধি পায় এবং দ্রুত সুস্থতার সহায়ক হয়।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৯৬ শতাংশ করোনা রোগী বাড়িতে চিকিৎসা নেন। বাকি ৪ শতাংশের চিকিৎসা নিতে যেতে হচ্ছে হাসপাতালে। বাড়িতে থাকা রোগীদের বড় অংশ টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা পরামর্শ নিচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কল সেন্টার স্বাস্থ্য বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী করোনা মহামারি শুরুর সাত মাসের মধ্যে দেশের প্রায় ৩ লাখ করোনা রোগী এই সেবা পেয়েছেন। টেলিমেডিসিন সেবা নিয়েছেন ২ কোটি ৩৬ লাখ মানুষ। এ সেবা প্রদানে ৪ হাজার ডাক্তার যুক্ত রয়েছেন। তারা বিনা পয়সায় এই টেলিমেডিসিন সেবা দিয়েছেন। ৩৩৩ সহ সরকারের টেলিমেডিসিন সেবায় এসব কল এসেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কল সেন্টার ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩’ করোনায় সংক্রমিত রোগী বা সন্দেহভাজনের কাছ থেকে প্রায় প্রতিদিন ১৫ হাজারের বেশি কল পাচ্ছে। মহামারি শুরুর প্রথম ৯ মাসে অর্থাৎ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়নের টেলিমেডিসিন সেবার হটলাইন ১৬২৬৩ এই নম্বরে ফোন করে ১ কোটিরও বেশি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন।

করোনাকালে আরও একটি মাধ্যম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সুরক্ষা অ্যাপ। এই অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইন-রেজিস্ট্রেশন করে সারা দেশে করোনাভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
উত্তাল তরঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দর্শনই আশার তরী
করোনায় অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছি?
কিছু কোমলহৃদয় কেন ‘সুন্দর ভুবনে বাঁচিবারে’ চায় না?
প্রতিভা বিকাশ ও গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা সময়ের দাবি
সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস নির্মূল জরুরি

শেয়ার করুন

 করোনাকালের ঈদ

 করোনাকালের ঈদ

শুধু নিজ ধর্মাবলম্বীরাই নয়, প্রতিবেশী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বন্ধুবান্ধবরা সাদরে আমন্ত্রিত হন। ঈদের আনন্দ উপভোগে দলমত, গরিব-ধনী, ধর্ম ইত্যাদি পরিচয়ে কোনো বাধানিষেধ থাকে না। সেই হিসেবে ঈদুল ফিতর সবচাইতে বড় সামাজিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে।

মুসলমানদের সবচাইতে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে এই ঈদ অনুষ্ঠিত হয় বলে বিভিন্ন দেশে ঈদের উৎসব নিজেদের মতো করে হয়। তবে এটি কোথাও আগের দিন, কোথাও পরদিন অনুষ্ঠিত হয়। ফলে মুসলিম দেশগুলোতে দুই দিন পৃথকভাবে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। এক মাস রোজা শেষে এই ঈদ অনুষ্ঠিত হয় বলে ঈদযাপনের আগ্রহ ও প্রতীক্ষা থাকে বিশেষভাবে। যুগে যুগে এই উৎসবটি মুসলমানদের মধ্যে শুধু পারিবারিকভাবেই নয়, সামাজিকভাবেও উদযাপিত হয়ে এসেছে।

ঈদের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা মসজিদ কিংবা ঈদগাহের আশপাশে বসবাসকারী মুসলমানদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে ঈদের জামাতে পাড়া-প্রতিবেশী একসঙ্গে মিলিত হয়, নামাজ শেষে কোলাকুলি বা কুশল বিনিময় করে থাকে। অনেক জায়গায় ঈদের জামাত বেশ বড় আকারে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সেখানে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ নামাজে অংশগ্রহণ করেন। এই ঈদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সকলেই নতুন পোশাক, জুতা-স্যান্ডেল পরার চেষ্টা করেন। সে কারণে ঈদের জামাতের দৃশ্যটি বেশ নতুন পোশাকে সজ্জিত মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। ছোট-বড় সকলেই নতুন সাজে ঈদ জামাতে অংশগ্রহণ করে। আরেকটি গুরত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, শহরে যারা চাকরি, ব্যবসায়-বাণিজ্য বা অন্যান্য কাজকর্ম করেন, তারাও ঈদ উপলক্ষে গ্রামে যান। ফলে ঈদে গ্রামে যাওয়া সকলের সঙ্গেই ঈদ জামাতে দেখা-সাক্ষাৎ হয়। কুশল বিনিময় এবং আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটানো হয়। ঈদ জামাত শেষে রান্না করা বিশেষ খাবার খাওয়ায় পরিবারের সদস্যরাই শুধু নয়, পাড়া-প্রতিবেশী এবং নিকট আত্মীয়স্বজনরাও এসে অংশ নেন। খাবার পরিবেশনায় শুধু নিজ ধর্মাবলম্বীরাই নয়, প্রতিবেশী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বন্ধুবান্ধবরা সাদরে আমন্ত্রিত হন। ঈদের আনন্দ উপভোগে দলমত, গরিব-ধনী, ধর্ম ইত্যাদি পরিচয়ে কোনো বাধানিষেধ থাকে না। সেই হিসেবে ঈদুল ফিতর সবচাইতে বড় সামাজিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে।

ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে বর্তমান যুগে দেশে দেশে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখা যাচ্ছে। মূলত ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটায় পোশাক-পরিচ্ছদ, জুতা-স্যান্ডেল, গয়না এবং ঘরের নানা ধরনের সৌন্দর্যবর্ধক পণ্যসামগ্রী ব্যাপকভাবে কেনাবেচা হয়। মানুষের এসব চাহিদাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ফ্যাশন, ডিজাইনের পোশাক, কাপড়চোপড়, পণ্যসামগ্রীর পসরা সাজিয়ে অনেকেই শপিং মল, বিভিন্ন মার্কেট এবং ফুটপাতেও হকারদের বিক্রয়ের আয়োজন থাকে। ক্রেতাসাধারণ নিজেদের সামর্থ্য ও পছন্দ অনুযায়ী কেনাকেটা করে থাকেন। পোশাক ও জুতা-স্যান্ডেলের চাহিদা ও বেচাকেনা সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে।

পরিবারের শিশু সদস্যদের ঈদ মানেই হচ্ছে নতুন পোশাক, নতুন জুতা-স্যান্ডেল পাওয়া। সচ্ছল পরিবারে ঈদ উপলক্ষে উপহার দেয়ার, কেনাকাটা বেশ ঘটে। ঈদে নতুন নতুন পোশাক পাওয়ার তালিকায় শিশুদের কথা সবাই বিশেষভাবে গুরত্ব দেন। এ ছাড়া বয়স্কদেরও জামাকাপড়, শাড়ি পরিবারের সচ্ছল সদস্যরা দিয়ে থাকেন। সমাজের গরিব মানুষদের মধ্যে অনেকেই শাড়ি, লুঙ্গি জামাকাপড় বিতরণ করে থাকেন। ঈদ উপলক্ষে গৃহকর্মীদের সবাই নতুন কাপড়চোপড় প্রদান করেন। ফলে বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বিগত বছরগুলোতে বেশ বড় ধরনের কেনাবেচা, আর্থিক লেনদেন ঘটতে দেখা গেছে। এটি অর্থনীতির চাকা সচলে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে।

সমাজের সব ক্ষেত্রে রমজান এবং ঈদ উপলক্ষে ব্যবসা-বাণিজ্য, কেনাবেচা, অতিরিক্ত অর্থ বোনাস হিসেবে পাওয়া এবং খরচ করার মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরের মানুষ উৎসব-আনন্দ উপভোগ এবং নিজেদের মতো করে ছুটির কয়েকটি দিন আনন্দ উৎসবে কাটিয়ে দেন। এই ঈদ উপলক্ষে ‘নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার’ এবং পরিবারের সদস্য ও নিকটজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছেন। এই দৃশ্য আমরা অনেক আগে থেকেই দেখে আসছিলাম।

দেশ যত অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছিল, ঈদের উৎসবও ততটা সর্বজনীনতা লাভ করতে শুরু করছিল। প্রবাসে যারা কর্মরত আছেন, তারাও ঈদ উপলক্ষে পরিবারের সদস্যদের জন্য অর্থ প্রেরণ করেন। ফলে, ওইসব পরিবারও কেনাকাটা এবং উৎসব-আনন্দে নিকটজনদের নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করে থাকে।

অর্থনীতি যখন ততটা সচ্ছল ছিল না, তখন ঈদ পালিত হতো, কিন্তু সবার ঘরে ঘরে নতুন জামাকাপড় কেনা বা উপহার হিসেবে পাওয়া যেত না। ঈদ জামাতের পরিবেশ ততটা চাকচিক্যময় ছিল না। মানুষ নামাজ শেষে ঘরে ফিরে মিষ্টিজাতীয় খাবার পরিবার এবং নিকটজনদের নিয়ে খেত। আনন্দ উপভোগটাও ছিল খুব সীমিত আকারে।

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন গ্রামে ঈদের আগ্রহ ছিল, কিন্তু কেনাকাটার সামর্থ্যটা বেশির ভাগ মানুষের ছিল না। পরিবারের সবার নতুন জামাকাপড় পরার অবস্থাও অনেকের ছিল না। তারপরও ঈদ্গাহে সবাই নামাজ শেষে কোলাকুলি ও কুশল বিনিময় করতে, শহর থেকে গ্রামে আসা প্রতিবেশীদের সঙ্গে গালগল্প করে সময় কাটানোর রেওয়াজ ছিল। আরেকটি বিষয় তখন প্রায়ই দেখা যেত, গ্রামে ঈদ উপলক্ষে নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, হাডুডু, দাড়িয়াবান্ধা, ফুটবল, ভলিবল খেলার আয়োজন করা হতো।

ঈদের পরদিন এসব আয়োজনে পাড়া-প্রতিবেশী বয়স নির্বিশেষে সকলেই আনন্দ উপভোগ করত। অনেক সময় এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের ফুটবল বা ভলিবলের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানও হতো। বর্ষাকালে নৌকাবাইচ বেশ উপভোগ্য ছিল। এই ধরনের পরিবেশ ঈদ উপলক্ষে কয়েক দশক আগে নিয়মিত ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম দিকে কিছুদিন অব্যহত থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঈদ কিংবা ঈদ-পরবর্তী সামাজিক চিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। সমাজে অর্থবিত্তের ব্যাপক প্রসার ঘটছে, জৌলুসও বাড়ছে। কিন্তু সামাজিক ঐতিহ্যে পরিণত বিষয়গুলো উপেক্ষিত হচ্ছে, নানা ধরনের বাধানিষেধ, অনাগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে সাংস্কৃতিকভাবে গ্রামীণ সমাজে ঐতিহ্যের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক পশ্চাৎপদ পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে এখন গ্রামে ঈদের আনন্দ বাহ্যিক সাজসজ্জা, নতুন পোশাক-আশাক, খাওয়াদাওয়া এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।

গেল কয়েক বছর দেশে ঈদ অর্থনীতিতে একটি ধারণা চালু হয়েছে। ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে গোটা রমজান মাস দেশে নতুন পণ্যসামগ্রীর উৎপাদন, বাণিজ্যিকীকরণ, বিপণন ইত্যাদিতে প্রায় লাখ কোটি টাকার সঞ্চালন ঘটে থাকে। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে ঈদ অর্থনীতির প্রভাব বেশ গুরত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। উদ্যোক্তারাও রমজানকে কেন্দ্র করে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে থাকেন। অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান এই উপলক্ষে ঘটছিল।

গেল বছর আকস্মিকভাবে বৈশ্বিক করোনার সংক্রমণের কারণে আমাদের উদীয়মান অর্থনীতিতে বৈশাখী উৎসব এবং রমজান ও ঈদ উৎসবের সামগ্রিক আয়োজন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গেল বছর মানুষ রমজান ও ঈদে করোনা সংক্রমণের ভয়ে বের হতে পারেননি। গেলবারের ঈদ খুবই নিরানন্দের মধ্যে কাটে। ছন্দপতন ঘটে গ্রামে দলবেঁধে পাড়ি জমানোর। তারপরও নিম্ন ও মধ্যবিত্তের কিছু মানুষ গেলবার গ্রামে ঈদ উদযাপন করতে গিয়েছিলেন। তবে এই উদযাপন আগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার মতো ছিল না। শহরেও ঈদের অনুষ্ঠান স্বাস্থ্যবিধির নানা নিষেধাজ্ঞার কারণে তেমন একটা হতে পারেনি।

আশা করা গিয়েছিল ২০২১ সালের রমজানে অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এত দীর্ঘস্থায়ী হবে সেটি অনেকেরই জানা ছিল না, বিশ্বাসেও ছিল না। তবে বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই বলে আসছিলেন যে করোনার সঙ্গে বিশ্বের মানুষকে আরও অনেক দিন বসবাস করতে হতে পারে। সেটিও অনেকের কাছে স্পষ্ট ছিল না।

বিশেষত এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে যখন সংক্রমণের হার নিম্নমুখী হতে থাকে, তখন অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে, করোনার সংক্রমণ শেষ হতে যাচ্ছে। কিন্তু মার্চে আবার সংক্রমণের গতি ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পর দেশে করোনার বিস্তার গেল বছরের চাইতেও বেশি অঞ্চলে ঘটতে দেখা যায়। এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত করোনার আতঙ্ক নতুনভাবে ছড়িয়ে পড়ায় স্বাস্থ্যবিধি মানা, লকডাউন ইত্যাদি বিধিনিষেধ সরকার আরোপ করতে বাধ্য হয়। এর ফলে জীবন-জীবিকার স্বাভাবিক গতি অনেকটাই কমে যায়। গেল এক বছরে নিম্ন আয়ের মানুষ কর্ম হারানোর মিছিলে যুক্ত হয়। বেসরকারি, ছোট ও মাঝারি নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। সেই সময়ে আবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আমাদের ওপর আঘাত হানে। এবার করোনা সংক্রমণ ও উপসর্গের গতি-প্রকৃতি আগের বছরের চাইতে আগ্রাসী ছিল। অনেক মানুষ অক্সিজেনের অভাবে দ্রুত মৃত্যুবরণ করেন। হাসপাতালগুলোতে বেড, অক্সিজেন ও আইসিউ পাওয়া নিয়ে অনেকদিন বেশ সংকট ছিল।

সরকার দ্রুত উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবস্থা নেয়। তবে করোনা সংক্রমণের চেইন ভেঙে দেয়ার জন্য বেশ কিছু কড়াকড়ি নিয়ম আরোপ করায় করোনার ঊর্ধ্বগতি নিম্নমুখী হতে থাকে। কিন্তু এই সময়ে দুটি সংকট নতুন করে দেখা যায়। একটি হচ্ছে ভারতের নতুন ভ্যারিয়েন্ট আরও আগ্রাসী চরিত্র নিয়ে দ্রুত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এটি নেপালেও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটায়। বাংলাদেশে এই ভাইরাসের অনুপ্রবেশ ঘটার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেকারণে সরকার ও বিশেষজ্ঞমহল বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। দ্বিতীয় সমস্যাটি হচ্ছে টিকার মজুত শেষ হয়ে যাওয়া। ভারতের সেরাম কোম্পানি প্রতিশ্রুত টিকা দিতে পারছে না। অপরদিকে উন্নত দুনিয়া টিকা নিয়ে দর কষাকষি, প্রভাব বিস্তারের আলামত, টিকা হাতে রেখে বিভিন্ন দেশে করোনার সংক্রমণকে ছড়িয়ে দেয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টিতে কার্যত বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক অবস্থা জোরদার করার লক্ষণ দেখা দিয়েছে।

ফলে আমাদের টিকা কর্মসূচি এখন অনেকটাই থমকে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের নতুন ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসা-ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। একারণেই সরকার এ বছর সবাইকে যার যার অবস্থানে থেকে ঈদ করার আহ্বান জানিয়েছে। আগের মতো দলবেঁধে বাড়ি যাওয়ার পরিণতি বাংলাদেশে ভয়াবহ হতে পারে এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞগণ বেশ কদিন থেকেই করে আসছেন। সেকারণেই সরকার আন্তজেলা পরিবহন, বাস-ট্রেন, লঞ্চ-স্টিমার বন্ধ রেখে মানুষকে সীমিত আকারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, কেনাকাটা করা এবং ঈদ উদযাপন করার আহবান জানিয়েছেন। কিন্তু বিপণিবিতান সীমিত সময়ের জন্য খুলে দেয়ার পর স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার প্রবণতা সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। শহরাঞ্চলে গণপরিবহন চলাচলের অনুমতি দেয়ার পর মানুষের চলাচল ও যাতায়ত যেভাবে বেড়েছে তাতে স্বাস্থ্যবিধি দারুণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। বিরাটসংখ্যক মানুষ আন্তজেলা পরিবহন না থাকা সত্ত্বেও ছোট ছোট পরিবহন বা পায়ে হেটে গ্রামে ঈদ করবার জন্য শহর ছেড়েছেন। এমনকি পদ্মার ফেরি পারাপার নিয়েও যে দৃশ্যের অবতারণা ঘটেছে তা অভাবনীয়, অবর্ণনীয় এবং অকল্পনীয়ও বটে।

ঈদে বাড়ি যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষের কতটা তীব্র সেটি এবারের ঈদযাত্রার দৃশ্য ও অভিজ্ঞতা দেখে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছে। বেশিরভাগ মানুষকেই সাধারণভাবে ঈদে যে পরিমাণ বাড়তি অর্থ খরচ করে বাড়ি যেতে দেখা যেত, তার চাইতেও বেশ কয়েকগুণ অর্থ খরচ করে তাদের এবার যেতে হয়েছে এবং সেটি তারা করছেনও। কিন্তু কোথাও স্বাস্থ্যবিধি নূন্যতম মেনে চলার তাগিদ নেই। যেকোনো মূল্যে বাড়ি যেতে হবে, পরিবার পরিজনদের সঙ্গে ঈদ করতে হবে, ঢাকায় থেকে একা একা তাদের কাছে ঈদ করা সম্ভব নয়।

ঈদযাত্রার এসব চিত্র দেখে যেটি বুঝতে হবে তা হলো ঢাকা বা বড় শহরে অনেকে জীবিকা নির্বাহের জন্য থাকলেও তাদের পরিবারের সদস্যরা আছেন বাড়িতেই। সুতরাং, ঈদে বাড়ি যাওয়ার মানসিকতা তাদের অনেক পুরোনো এবং প্রয়োজনীয়ও বটে। সেকারণে তারা মরিয়া হয়ে ঈদ যাত্রায় সকল বিড়ম্বনা ও অর্থদণ্ড মেনে নিচ্ছেন। আবার অনেকেই আছেন পরিবার-পরিজন নিয়েও এতসব বাধানিষেধ, অর্থদণ্ড উপেক্ষা করে গ্রামে ঈদ করতে যাচ্ছেন। এই সংখ্যাটিও কম নয়।

ছোট যানবাহনগুলো গত দেড় মাস পরিবহন সংকটের সুযোগ পেয়ে দারুণভাবে অর্থ কামাইয়ে নেমে পড়েছে। কোনো বাধানিষেধ ও জরিমানা তাদেরকে দূরপাল্লার যাত্রীবহনে থামাতে পারছে না। এবারের ঈদ যাত্রায় এমন দৃশ্য সচেতন মহলকে হতবাক করেছে। বিশেষজ্ঞগণ স্তম্ভিত, ক্ষুব্ধ এবং হতাশও বটে। তারা গণমাধ্যমের বিভিন্ন টক শোতে এসব দৃশ্য দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে, ঈদের পরে এই মানুষগুলো ফিরে আসার দুই সপ্তাহ পর মের শেষ এবং জুনের প্রথম সপ্তাহে দেশের গ্রামাঞ্চলেও করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। কেননা যারা দলবেঁধে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে গ্রামে এভাবে গিয়েছেন তাদের অনেকেই পথিমধ্যে করোনা সংক্রমিত হতে পারেন, বাড়ি গিয়ে তারা পরিবারের বয়স্কদের সংক্রমিত করতে পারেন। সেই সংক্রমণটি নীরবেই গ্রামের একজন থেকে অন্যজনে সংক্রমিত হতে পারে।

ঈদ শেষে আবার যখন তারা ফিরবেন তখন সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সকল সম্ভাবনা থাকবে। এই অবস্থাটি আগামী দুই সপ্তাহ পরে ভিন্নরকম হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে পারবে তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন চিকিৎসকরা।

সুতরাং, ঈদের আগে যেখানে আমরা মানুষকে পরিবার-পরিজনদেরকে নিয়ে আনন্দ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করার কথা বলতাম, লেখালেখি করতাম। এবার ঠিক বিপরীত কথাই লিখতে হচ্ছে, বলতে হচ্ছে। কিন্তু যত সংখ্যক মানুষই স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে ঈদ করতে বাড়ি গিয়েছেন তারা শেষ পর্যন্ত সুস্বাস্থ্য নিয়ে ফিরতে পারবেন কি না, ফিরলেও করোনায় আক্রান্ত হওয়া থেকে মুক্ত থাকবেন কি না সেটি- দেখার জন্য আমাদেরকে কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। তবে আমরা কায়মানোবাক্যে প্রার্থনা করি তারা যেন নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছাতে পারেন, প্রিয়জনদের নিয়ে নির্বিঘ্নে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, ঈদ শেষে ভালোভাবে কর্মস্থলে ফিরে আসতে পারেন এবং কোনোরকম করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত না হন। একই সঙ্গে আমাদের সকলেরই প্রার্থনা হোক, এবার ঈদের পর যেন নতুন করে ভয়ানক কোনো করোনার সংক্রমণকে দেখতে না হয়, ভারতের মতো অবস্থা সৃষ্টি না হয়।

লেখক: গবেষক, অধ্যাপক

আরও পড়ুন:
উত্তাল তরঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দর্শনই আশার তরী
করোনায় অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছি?
কিছু কোমলহৃদয় কেন ‘সুন্দর ভুবনে বাঁচিবারে’ চায় না?
প্রতিভা বিকাশ ও গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা সময়ের দাবি
সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস নির্মূল জরুরি

শেয়ার করুন

ঈদে মুঠোভরে পেয়ে নয়, দিয়েও অনেক সুখ

ঈদে মুঠোভরে পেয়ে নয়, দিয়েও অনেক সুখ

সবচেয়ে কষ্টের সময় কাটছে শিশু-কিশোরদের। টানা দেড়টা বছর স্কুল, খেলাধুলা, বেড়াতে যাওয়া, বাবা-মায়ের হাত ধরে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করা সব বন্ধ। যারা চাকরি করেন, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দ বছরে দুইটা বোনাস পাওয়া। এই দুই বছরে সেই বোনাসের উপরেও চাপ পড়েছে। কেউ পাচ্ছেন, কেউবা অর্ধেক পাচ্ছেন, আর কেউবা পাচ্ছেনই না। কেউ কেউ তো গত দেড়টা বছরে তেমনভাবে কোনো আয়ই করেননি। সেসব মানুষের ঈদ কোথায়?

ছোট একটি মেয়ে বাবা-মায়ের হাত ধরে নিউমার্কেটের পেছনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টোরে গিয়ে সেমাই-ঘি, ডালডা-পোলাওয়ের চাল, বিভিন্ন ধরনের গরম মসলা এবং আরও কিছু জিনিসপত্র কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরত। আর লাইট কনফেকশনারি থেকে কেনা হতো মেয়েটির প্রিয় রাংতা দিয়ে মোড়ানো বিখ্যাত নেশসতার হালুয়া।

এই দিনটি ছিল সেই মেয়েটির কাছে স্বপ্নের একটি দিন। কারণ, এর ঠিক এক দিন পরেই রোজার ঈদ। ঈদের জন্য একটা রঙিন জামা, জুতো, ফিতা, ক্লিপ কেনা হয়েছে। বাকি ছিল শুধু এই বাজারটা। মেয়েটির এখনো মনে আছে ওই নেশসতার হালুয়া কিনতে গিয়ে ওকে কিনে দেয়া হতো হট প্যাটিস, একটা পেস্ট্রি আর কিছু চকোলেট। এই জিনিসগুলোই ছিল মেয়েটির জীবনে অনেক বেশি কিছু পাওয়া। একমাত্র সন্তান হলেও হররোজ এতকিছু সে একসঙ্গে পেত না।

সেই সময়ে অর্থাৎ ৭০-এর দশকে মানুষের হাতভর্তি টাকা ছিল না, বাবা-মায়েরা সন্তানকে দেদার জিনিস কিনে দিতে পারতেন না বা চাইতেন না, এমনকি যাদের বনেদিয়ানা ছিল, তারাও টাকার চমক দেখাতেন না। ঢাকা শহরজুড়েই ভোগবাদিতার কোনো নজির ছিল না। জীবন ছিল সহজ-সরল, আন্তরিক। কাজেই বাবার কিনে দেয়া সেই সামান্য কিছু চকোলেট যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখে ঈদের দিনের জন্য অপেক্ষা করত মেয়েটি।

মাঝে অনেকগুলো ঈদ চলে গেছে। সেই মেয়েটি ছোট থেকে বড় হয়েছে। সংসারের দায়িত্ব এসে পড়েছে তার উপরে। এখন সে আর বাবার হাত ধরে কেনাকাটা করতে যায় না, বরং নিজেই অন্যের জন্য কেনাকাটা করে। সে খুব ভালো করে বুঝতে পারে বড়দের জন্য ঈদটা শুধুই দায়িত্ব। আর ঈদের আনন্দটা ছোটদেরই জন্য। সত্যি এখনও যখন ঈদের কথা ভাবি, চোখের সামনে ভেসে ওঠে শৈশবের সেই ভালোবাসাময় সাদামাটা ঈদ।

আমরা জানি ঈদ মানে আনন্দ, উৎসব ও আয়োজন। তবে গত বছর আর এই বছর ঠিক বিপরীত দুটো ঈদ উদযাপন করছি আমরা। জীবনে এমন বিবর্ণ ঈদ পরপর দুবছর ধরে চলছে। এমনিতেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনে ঈদের আনন্দ হালকা হয়ে এসেছিল, এর মধ্যে এ রকম নিরানন্দময় ঈদ আমাদের আরও অনেকটাই দূরে সরিয়ে দিল।

অথচ ছোটবেলায় ঈদের দিনটি যত এগিয়ে আসত, আমাদের আনন্দ ততই বেড়ে যেত। শুধু ভাবনা ছিল নতুন কাপড় পরে পাড়া বেড়ানো আর মজার মজার খাবার খাওয়া। আমরা শুধু দুই ঈদেই ভালো কাপড় ও জুতা পেতাম। ঈদে কার জামা কেমন হবে, তা লুকানোর জন্য ছিল পড়িমরি চেষ্টা। অনেক না পাওয়ার মধ্যে ঈদের এই পাওয়াটা ছিল অনেক বেশি কিছু।

সংসারজীবনে এসে দেখলাম ঈদ উপলক্ষে আমার সেই পরিচিত শহরের লোকজনই ফার্নিচার, গয়নাগাটি, শাড়ি, কাপড়, পর্দা, চাদর, হাঁড়ি-পাতিল, ক্রোকারিজ সব আইটেমই কেনাকাটা করে। এমনকি নতুন ফ্ল্যাটও কিনতে দেখেছি। শৈশবের আনন্দময় ঈদের বদলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম জাঁকজমকে।

সেই মেয়েটির শৈশব-কৈশোরে মধ্যবিত্ত বাসাগুলোতে ঈদের চার-পাঁচ দিন আগে বাসার চাদর, টেবিল ক্লথ, সোফার কভার, পর্দা সব ধোলাই করা হতো। ওই কটা দিন আমাদের বেশ আবরণহীন অবস্থায় থাকতে হতো। সবকিছু ধুয়ে, কড়া করে মাড় দেয়া হতো। পুরোনো জিনিস নতুন করে সাজানোর সে এক অন্যরকম আনন্দ ছিল।

পাড়ার বিভিন্ন বাড়ি থেকে কিছু ফুল, পাতা এনে ঘর সাজানো হতো। তখন ফুলের জন্য কোনো বাজার ছিল না। ঈদ উপলক্ষে আম্মা নেপথলিনের গন্ধমাখা চাদর, কুরুশ কাঁটার টেবিল ক্লথ, ড্রেসিং টেবিলের ঢাকনা বের করতেন। ৭০-৮০-এর দশকে এ রকম ঈদ অভিজ্ঞতা ঢাকা শহরের অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারেরই আছে।

ঈদের দিন ভোর থেকে রান্নার গন্ধে ঘুম ভেঙে যেত- সেমাই, জর্দা, পোলাও, কোরমার গন্ধ। ঘুম থেকে ওঠার আগেই আম্মা টেবিলে খাবার সাজিয়ে ফেলত। আম্মার বহু শখের ক্রোকারিজগুলো সেদিনই শোকেস থেকে বের করা হতো। বাসার ছেলেরা নামাজ থেকে ফিরে এলে সবাই একসঙ্গে বসে নাশতা খেয়েই নতুন কাপড় পরে বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়াই ছিল ঈদের নিয়ম। অন্যান্য দিন যা যা কিনে খেতে পারতাম না, সামান্য সালামির টাকা দিয়ে তাই খেতাম বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে। রাতের খাবার খেয়েই বসে যেতাম বিটিভির সামনে ঈদের আনন্দমেলা ও নাটক দেখতে।

এই ঢাকা শহরেই মধ্যবিত্ত পরিবারের আজকালের ঈদ এবং আমাদের ছোটকালের ঈদের সবকিছুর মধ্যেই অনেক ফারাক হয়ে গেছে। তখন ঐশ্বর্য ছিল কম কিন্তু আনন্দ ছিল বেশি। আজকালকার শিশুরা এত জামা-কাপড়, এত খেলনা, খাওয়াদাওয়া পায় বলে হয়তো ঈদের জামা-জুতো কেনার আনন্দটা তারা সেভাবে উপলব্ধিই করতে পারে না।

যাহোক, পরপর দুবছর করোনার কারণে প্রায় প্রত্যেকেরই ঈদ আনন্দ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে গেছে। কারও কারও জীবন থেকে ঈদ আনন্দ চলেই গেছে। যে পরিবারগুলো প্রিয়জন হারিয়েছে, যে পরিবারগুলো কাজ হারিয়েছে, তারা এখন একেবারেই আনন্দশূন্য।

এ ছাড়া দিনরাত এক করে কেনাকাটা করা, চাঁদরাতে ঘুরে বেড়ানো, বাজি ফোটানো, নতুন কাপড়-আসবাবপত্র-গৃহের প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা, ঈদের উপহার দেয়া-নেয়া, গ্রামে যাওয়া, শহরময় ঘুরে বেড়ানো, দেশ-বিদেশে ছুটি কাটাতেও যাওয়া হচ্ছে না।

সবচেয়ে কষ্টের সময় কাটছে শিশু-কিশোরদের। টানা দেড়টা বছর স্কুল, খেলাধুলা, বেড়াতে যাওয়া, বাবা-মায়ের হাত ধরে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করা সব বন্ধ। যারা চাকরি করেন, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দ বছরে দুইটা বোনাস পাওয়া। এই দুই বছরে সেই বোনাসের উপরেও চাপ পড়েছে। কেউ পাচ্ছেন, কেউবা অর্ধেক পাচ্ছেন, আর কেউবা পাচ্ছেনই না। কেউ কেউ তো গত দেড়টা বছরে তেমনভাবে কোনো আয়ই করেননি। সেসব মানুষের ঈদ কোথায়?

দেশে অগণিত দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ আজ পেটপুরে খেতে পারছেন না। কোনো কাজ নেই তাদের। দিনে দিনে আরও অনেক মানুষ বেকার হবেন। যেহেতু ঈদের সামাজিক আনুষ্ঠানিকতার ব্যয় অনেকটাই কমে গেছে, কাজেই সচ্ছল মানুষ যদি কিছু দান করেন, তবেই নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের মুখে কিছু হাসি ফুটবে।

অসহায় মানুষ যদি আপনার দেয়া টাকায় দুমুঠো ভাত মুখে তুলতে পারেন বা একজন মানুষও যদি তার বাড়িভাড়ার টাকাটা দিতে পারেন বা ঝড়ে উড়ে যাওয়া চালটা ঠিক করতে পারেন বা একটা গরু-ছাগল কিনতে পারেন, তবে সেটাই হবে সবার জন্য অনেক কিছু পাওয়া।

মাঝখানে অনেকগুলো বছরে রাংতামোড়া নেশসতার হালুয়া খাওয়া মেয়েটিও অনেকটাই বদলে গিয়েছিল। ছোট ছোট প্রাপ্তিতে তার মন ভরত না। এই করোনার কারণে সৃষ্ট অভাব তাকে আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে- যদি ভালোবাসা ও আন্তরিকতা থাকে, তবে খুব ছোট কিছুতেও আনন্দ পাওয়া যায়। শুধু মুঠোভরে পেয়ে নয়, দিয়েও অনেক সুখ পাওয়া যায়। আসুন করোনা আক্রান্ত দেশে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বাঁচি। আর সেটাই হবে আমাদের ঈদের আনন্দ। ঈদ মোবারক!

লেখক: সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন:
উত্তাল তরঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দর্শনই আশার তরী
করোনায় অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছি?
কিছু কোমলহৃদয় কেন ‘সুন্দর ভুবনে বাঁচিবারে’ চায় না?
প্রতিভা বিকাশ ও গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা সময়ের দাবি
সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস নির্মূল জরুরি

শেয়ার করুন

চীনা রাষ্ট্রদূতের ক্ষমা চাওয়া উচিত

চীনা রাষ্ট্রদূতের ক্ষমা চাওয়া উচিত

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় শোক দিবসে অর্থাৎ ১৫ আগস্টে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বা ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারকে কোনো শোকবার্তা প্রেরণ করেননি। কিন্তু ১৫ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়ার ভুয়া জন্মদিন উপলক্ষে ঠিকই শুভেচ্ছা বার্তা প্রেরণ করেছেন তিনি। এমন একটি কাজের জন্য সমালোচনার শিকার হবার পরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের বেঁচে থাকা কোনো সদস্যকে শোকবার্তা জানাননি এই রাষ্ট্রদূত।

বর্তমান বিশ্বে কূটনৈতিক শিষ্টাচার বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র তার প্রতিবেশী বা দূরবর্তী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যে বাণিজ্যিক বা কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে তার মধ্যে কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের যুগে কোনো রাষ্ট্রকে কটাক্ষ বা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বৈশ্বিক কূটনৈতিক কার্যক্রম যখন বিরাজমান সুসম্পর্কের ভিত্তিতে তখন একটি দেশের অভ্যন্তরে থেকে সেই দেশকে হুমকি দেয়া এবং ভয়-ভীতি প্রদর্শন নিশ্চিতভাবে চরম অপরাধ। আর এ কারণেই বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূতকে সবার সামনে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

একটি রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্রনীতিতে কী যুক্ত করবে এবং কী বাদ দেবে তা সেই রাষ্ট্রের একান্ত নিজস্ব বিষয়। সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ বিষয়টি চিন্তা করেই মন্তব্য করা উচিত ছিল চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিংয়ের। গণমাধ্যমের সামনে এসে বাংলাদেশকে সতর্ক করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের জোট ‘কোয়াড’-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘যথেষ্ট খারাপ’ করবে।

চীনের এই রাষ্ট্রদূত অবশ্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কখনই খুব একটা উদ্যোগী ছিলেন না। বরং বিগত বছরগুলোতে বিতর্কিত বেশ কিছু কাজের জন্য হয়েছেন সমালোচিত। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় শোক দিবসে অর্থাৎ ১৫ আগস্টে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বা ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারকে কোনো শোকবার্তা প্রেরণ করেননি। কিন্তু ১৫ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়ার ভুয়া জন্মদিন উপলক্ষে ঠিকই শুভেচ্ছা বার্তা প্রেরণ করেছেন তিনি। এমন একটি কাজের জন্য সমালোচনার শিকার হবার পরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের বেঁচে থাকা কোনো সদস্যকে শোকবার্তা জানাননি এই রাষ্ট্রদূত।

বাংলাদেশের জাতির পিতার শাহাদাতের দিনে শুভেচ্ছা বার্তা প্রেরণের মাধ্যমে তিনি কোন কূটনীতির চর্চা করছেন তা সকলের কাছে স্পষ্ট। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই যে জন্মদিন বেগম খালেদা জিয়ার ওপর চাপিয়ে দিয়ে গেছে, সেই জন্মদিন উদযাপনে শুভেচ্ছা জানানোর মাধ্যমে বাংলাদেশে বসে পাকিস্তানের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্কের বার্তা জানিয়েছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। এ সকল কাজ করার পর আবার বাংলাদেশকে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক নিয়ে শাসিয়ে যাচ্ছেন তিনি! একজন রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার এ সকল ঘটনার জন্য বাংলাদেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই বাংলাদেশের পক্ষে ছিল না চীন। সর্বদাই তাদের দৃঢ় সম্পর্ক ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মাটি যে রাইফেলের গুলিতে লাল হয়েছে তা ছিল চাইনিজ রাইফেল। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস পাকিস্তানকে শুধু অস্ত্র দিয়ে নয়, বরং কূটনৈতিকভাবেও সহায়তা প্রদান করেছে চীন। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও চীন বাংলাদেশকে মেনে নিতে সময় নিয়েছে ৫ বছর। বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ১৬ দিন পর ৩১ আগস্ট সর্বশেষ দেশ হিসেবে চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ নিয়ে চীনের আগ্রহের কেন্দ্রে আসলে কোন কূটনৈতিক সম্পর্ক নয় বরং ব্যবসায়ীক লাভ রয়েছে। আর বাংলাদেশের প্রতি তার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ও এই ব্যবসায় ক্ষতির কারণেই।

সকলের নিশ্চয়ই মনে আছে, করোনা মহামারি গত বছর তুঙ্গে থাকাকালে চীনের একদল প্রতিনিধি বাংলাদেশ সফর করে। এ সময় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পরামর্শ প্রদানের পাশাপাশি চীনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু প্রস্তাবও দেয়া হয়। এর মধ্যে একটি প্রস্তাব ছিল করোনা পরীক্ষার জন্য চীন থেকে ফ্রি পিসিআর মেশিন গ্রহণ। যা শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করেনি বাংলাদেশ সরকার। কেননা এই ফ্রি মেশিন দিয়ে পরবর্তী সময়ে বেশি দামে টেস্টিং কিট এবং অন্যান্য দ্রব্য কিনতে বাধ্য করার শর্ত জুড়ে দিয়েছিল চীন, যা গ্রহণ করেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সুতরাং ব্যবসা হয়নি।

এ ছাড়াও বাংলাদেশে হাসপাতালে আরও বেশ কিছু অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাবও দেয়া হয়, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল কঠিন বেশ কিছু বাণিজ্যিক শর্ত। সে কারণেই তার কোনোটিই গ্রহণ করেনি বাংলাদেশ। এমনকি সর্বশেষ বড় ব্যবসার ক্ষতিটি হয়েছে ভারত থেকে কোভিড ভ্যাকসিন গ্রহণের মাধ্যমে। কেননা বাংলাদেশের ১৭ কোটির টিকার বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা করতে চেয়েছিল চীন। কিন্তু টিকার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার কথা বিবেচনায় এনে বাংলাদেশ অক্সফোর্ডের টিকাকে প্রাধান্য দেয়। ফলে বাংলাদেশে একচেটিয়া ব্যবসার বাজার হারানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের এই বাজারের সাফল্য দেখিয়ে বিশ্ববাজারে ব্যবসার পরিকল্পনা মাঠে মারা যায়। অবশ্য শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক কারণে চীনের টিকা গ্রহণ করছে বাংলাদেশ। কেননা চীনের টিকা গ্রহণ না করলে ব্যবসার জন্যও দেশটিতে ভ্রমণ করা যাচ্ছে না। ফলে চীনের সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত সকলে এখন বাধ্য হয়ে অপেক্ষা করছে চীনের টিকার।

‘উলফ ওয়ারিয়র’ ডিপ্লোম্যাসি বা আগ্রাসী কূটনীতি বলে একটি বিষয় বেশ আলোচিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। বিশ্বের অনেক ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রে এরই মধ্যে চীন তার চীনের আগ্রাসী কূটনীতি শুরু করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রথম তাদের আগ্রাসী কূটনৈতিক আচরণ দেখা গেল। কিন্তু এই আগ্রাসী আচরণেরও একটি শিষ্টাচার রয়েছে। যা মানেননি চীনের রাষ্ট্রদূত। চীনের এই আচরণের যথোপযুক্ত এবং কার্যকর জবাবও প্রদান করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন। গণমাধ্যমের সামনে এসে চীনের রাষ্ট্রদূত যা বলেছেন এবং ইতোপূর্বে যেই আচরণ তিনি করেছেন তার জন্য ক্ষমা চেয়ে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেয়া উচিত তার। অথবা বাংলাদেশের উচিত তাকে প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
উত্তাল তরঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দর্শনই আশার তরী
করোনায় অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছি?
কিছু কোমলহৃদয় কেন ‘সুন্দর ভুবনে বাঁচিবারে’ চায় না?
প্রতিভা বিকাশ ও গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা সময়ের দাবি
সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস নির্মূল জরুরি

শেয়ার করুন

নীতিহীন ভিসির ‘মানবিক’ নিয়োগ!

নীতিহীন ভিসির ‘মানবিক’ নিয়োগ!

পদাধিকারবলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য রাষ্ট্রপতি। বর্তমান আচার্য আবদুল হামিদ অনেকবার উপাচার্যদের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছেন; তাদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যদের ক্ষমতার হাত যেন রাষ্ট্রপতির চেয়েও লম্বা। এখন পর্যন্ত অনেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে অনেক তদন্ত হয়েছে, সুপারিশ হয়েছে; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অভিযোগ গুরুতর বা আন্দোলন তীব্র হলে তাদের সরিয়ে দেয়া হয় বা পদত্যাগের সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু আর্থিক দুর্নীতির শাস্তি তো কেবল অপসারণ নয়।

ছেলেবেলায় দেখতাম কোনো শিক্ষক অবসরে গেলে শিক্ষার্থী এবং সহকর্মীরা তাকে আয়োজন করে বিদায় দিত। সবাই আবেগঘন স্মৃতিচারণ করত, একটি মানপত্র পাঠ করা হত এবং সেটি বাঁধাই করে দেয়া হতো। সঙ্গে শিক্ষক মুসলমান হলে তসবিহ, জায়নামাজ, কোরআন শরিফ, লাঠি ইত্যাদি উপহারও দেয়া হতো। একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক যদি এই মর্যাদা পান, তাহলে শিক্ষকদের মধ্যে যার মর্যাদা সবার ওপরে, সেই উপাচার্যের বিদায় সংবর্ধটনাটা তো জাতীয়ভাবেই হওয়া উচিত।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহানের বিদায়টা জাতীয় ইস্যুই হয়েছে, তবে একটু নেতিবাচকভাবে। তার বিদায়ের দিনে বিক্ষোভ হয়েছে, ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে মারামারি হয়েছে। দুই দফায় আট বছর উপাচার্যের দায়িত্ব পালনের পর তাকে বিদায় নিতে হয়েছে পুলিশ পাহারায়।

মেয়াদের শেষ দিনে তিনি সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৩৭ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন। অবশ্য সে নিয়োগ স্থগিত করে দিয়েছে সরকার। চলছে তদন্ত। একজন উপাচার্যকে নিয়ে যখন পত্রিকায় শিরোনাম হয়, ‘চক্রের পকেটে ৫ কোটি, ভিসি ৫০ লাখ!’ তখন লজ্জায় আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যায়। অবশ্য ড. আব্দুস সোবহানের ন্যূনতম নীতিবোধ আছে বলে মনে হয় না। কথায় বলে ‘চোরের মায়ের গলা সবসময় বড়ই হয়।’ আমাদের যত লজ্জাই লাগুক, ড. সোবহানের লজ্জা আছে বলে মনে হয় না

তিনি বরং তার এই অপকর্মের সাফাই গাইছেন, বলছেন, মানবিক কারণে তিনি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নিয়োগ দিয়েছেন। কিছুদিন আগে মামুনুল হক আমাদের ‘মানবিক বিয়ে’ শিখিয়েছিলেন। আর এবার ড. সোবহান শেখালেন ‘মানবিক নিয়োগ’। নিয়োগ হতে হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে, নিয়ম মেনে। এখানে যে মানবিকতার কোনো ব্যাপার নেই, এটুকু নৈতিকতা ড. সোবহান দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে অর্জন করতে পারেননি!

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ডের মাথা হলো বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় হলো শিক্ষার সর্বোচ্চ ধাপ। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিই সবার আগ্রহ। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ব্যয় নামমাত্র। শিক্ষার মানের দিক থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কেই অনেকে এগিয়ে রাখেন। নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগই এখনও মানের দিক থেকে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ছাড়িয়ে গেছে। তবে উচ্চব্যয়ের কারণে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এখনও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। তাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ এখনও বেশি।

দেশে এখন ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো মানদণ্ডেই বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে পরিচিত, আমাদের সবার গর্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও কোনো রেটিংয়ে আগাতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বললেই আন্দোলন, সংগ্রাম, রাজনীতির ঐতিহ্যই সামনে আসে; শিক্ষা বা গবেষণা নিয়ে গর্ব করার মতো কিছু নেই। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও দশ টাকায় এক কাপ চা, একটা শিঙাড়া, একটা চপ এবং একটা সমুচা পাওয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ব করেন।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছেন উপাচার্যরাই। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মানে সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তি। একসময় দেশে সম্মানের সর্বোচ্চ আসনটা তাদের জন্যই বরাদ্দ থাকত। উপাচার্য নাম শুনলেই শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসত। সেই দিন পাল্টেছে অনেক আগেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য এখন সরকার নিয়োগ দেয়। আর নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম বিবেচনা হয় দলীয় আনুগত্য।

বেশ কয়েক বছর আগে আওয়ামী লীগের এক সম্মেলনে দেখি, এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দলীয় কার্ড গলায় ঝুলিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসে আছেন। অথচ উপাচার্য হিসেবে তিনি সম্মানের অন্য সারিতে বসতে পারতেন। তিনি দলীয় পরিচয়টাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কোনো কোনো উপাচার্য টক শোতে এমনভাবে সরকারের পক্ষ নেন, আওয়ামী লীগ নেতারাও মুখ টিপে হাসেন। কোনো কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে মনে হয় ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি। সমস্যার শুরুটা এখানেই।

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু যে শিক্ষার সর্বোচ্চ ধাপ তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলো একজন শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শেষ ধাপও। বিশ্ববিদ্যালয় একজন মানুষকে শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য কিছু সার্টিফিকেট দেবে না। বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু কাগুজে উচ্চশিক্ষা নয়; বিশ্ববিদ্যালয় একজন মানুষকে শিক্ষা-দীক্ষা, প্রজ্ঞা, নেতৃত্ব, জীবনবোধ, মানবিকতা, নৈতিকতার উচ্চশিক্ষা দেবে। কিন্তু দেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের যে মান, তারা শিক্ষার্থীদের কী শেখাবেন? যাদের নিজেদের নৈতিকতা নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন, শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা শেখানোর নৈতিক অধিকার কি তাদের থাকে? দুঃখটা হলো, আপনি গুগলে ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়’ লিখে সার্চ দিলে শুধু দুর্নীতি আর অনিয়মের খবরই পাবেন।

শিক্ষা-সংক্রান্ত কিছুই পাবেন না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিভিন্ন সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের অনিয়ম নিয়ে তদন্ত করেছে। এখনও বেশ কয়েকটি উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। উপাচার্যদের বিরুদ্ধে অনিয়ম আর তদন্তের ফিরিস্তি দিতে গেলে সেটা মহাকাব্য হয়ে যাবে। তবে উপাচার্যদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সবই অতি নিম্নমানের দুর্নীতি।

এক উপাচার্য বছরের পর বছর ক্যাম্পাসে যান না। ঢাকায় বসেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় চালান। মাঝে মধ্যে বিমানে গিয়ে আবার দ্রুততম সময়ে ফিরে আসেন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দিনের পর দিন আন্দোলন করছেন। কিন্তু লাভ হয়নি। আন্দোলন দেখার জন্যও তিনি যান না। একবার উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন শুনে শিক্ষকরা গেল তার সঙ্গে দেখা করতে। তিনি পেছনের দরজা দিয়ে চোরের মতো পালিয়ে চলে এলেন!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদায়ী উপাচার্য ড. সোবহান শুধু যে মেয়াদের শেষদিনে বিধিবহির্ভূতভাবে ১৩৭ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন তাই নয়, এর আগেও মেয়ে আর মেয়ে জামাইকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ নির্লজ্জতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরনগুলো একটু দেখে আসি চলুন- নির্মাণকাজে অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, ক্যাম্পাসে না থাকা, ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির ঘটনা ধামাচাপা দেয়া, নিয়ম না মেনে ঢালাও জনবল নিয়োগ, শিক্ষক ও জনবল নিয়োগে দুর্নীতি, ইচ্ছামতো পদোন্নতি, কেনাকাটায় অনিয়ম। অভিযোগের যা ধরন, তাতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন নয়, তদন্তটা করা উচিত দুর্নীতি দমন কমিশনের।

রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যদের অনেকে দায়িত্ব নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি মনে করেন। ‘সরকার কা মাল, দরিয়া মে ঢাল’- মেনে তারা হরিলুটে নেমে পড়েন। পদাধিকারবলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য রাষ্ট্রপতি। বর্তমান আচার্য আবদুল হামিদ অনেকবার উপাচার্যদের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছেন; তাদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যদের ক্ষমতার হাত যেন রাষ্ট্রপতির চেয়েও লম্বা।

এখন পর্যন্ত অনেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে অনেক তদন্ত হয়েছে, সুপারিশ হয়েছে; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অভিযোগ গুরুতর বা আন্দোলন তীব্র হলে তাদের সরিয়ে দেয়া হয় বা পদত্যাগের সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু আর্থিক দুর্নীতির শাস্তি তো কেবল অপসারণ নয়। অভিযোগের তদন্ত আর সুপারিশে দায়িত্ব শেষ নয়। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অপচয় করা অর্থ ফেরত নিতে হবে।

আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি শেকড় গেড়েছে। কিন্তু শিক্ষার সর্বোচ্চ ধাপ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও পড়াশোনা ফেলে যদি দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে যায়; তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের সামনে ভয়ংকর অন্ধকার সময় অপেক্ষা করছে। অন্তত আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। শিক্ষার মান যেমনই হোক, অন্তত নৈতিকতার মান যেন উচ্চ হয়। উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে যেন দলীয় আনুগত্যের আগে তার ব্যক্তি চরিত্র বিবেচনায় নেয়া হয়।

বিদায়ের দিনে ড. আব্দুস সোবহানের কেলেঙ্কারিও যেন নিছক তদন্তসর্বস্ব না হয়। তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি। শাস্তির একটা দৃষ্টান্ত না থাকলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতির এই মহা উৎসব চলতেই থাকবে। এমন দৃষ্টান্ত লাগবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ দুর্নীতি করার সাহস না পায়। দুর্নীতি নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিরোনামে আসুক শিক্ষার উৎকর্ষের জন্য, গবেষণার মানের জন্য।

লেখক: সাংবাদিক-কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
উত্তাল তরঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দর্শনই আশার তরী
করোনায় অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছি?
কিছু কোমলহৃদয় কেন ‘সুন্দর ভুবনে বাঁচিবারে’ চায় না?
প্রতিভা বিকাশ ও গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা সময়ের দাবি
সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস নির্মূল জরুরি

শেয়ার করুন

কিউবিকল ও চেয়ার: ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ববাদ

কিউবিকল ও চেয়ার: ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ববাদ

সরকারপ্রধানগণ সাধারণত সুইভেল বা ঘূর্ণি চেয়ার ব্যবহার করেন না। তারা সাধারণত মেটাল, কাঠ বা কাঠ-মেটালের সমন্বয় তৈরি চেয়ার ব্যবহার করেন। তাদের চেয়ারের পেছনের অংশ মাথা ছাপিয়ে ওঠে না। কারণ, তারা হয়ত বুঝে গেছেন চেয়ার কোনো অংশই মাথার উপরে উঠতে পারে না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাসায় খুব সাধারণ মানের কাঠের তৈরি হাতলওয়ালা চেয়ার ব্যবহার করতেন।

অফিস পরিসরে কিউবিকল ও নতুন অবয়বের চেয়ার কর্পোরেটাইজেশনের সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে দৃশ্যমান হচ্ছে। কিউবিকল ও চেয়ারের সাইজ, ডিজাইন ও সুবিধা-অসুবিধা বুঝিয়ে দিচ্ছে অফিসে ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে। এগুলো ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব পরিমাপের স্মারক হয়ে উঠছে। কিউবিকল ও চেয়ারকে কেবল বিভিন্ন ম্যাটেরিয়ালের সমষ্টি ভাবলে ঠিক হবে না। যদিও অনেকে এগুলো অধিকতর আরামদায়ক ও কর্মপোযোগী অফিস পরিবেশের সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করেন। বিশ্বাস করেন ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষা বা একান্তে কাজের জন্য কিউবিকল সংস্কৃতি চালু হয়েছে।

অফিস পরিসরে কিউবিকল ও চেয়ার ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার সুযোগ রয়েছে। বিশেষত ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও অধস্তন মনোকাঠামো বিশ্লেষণে এ দুটি উপকরণ বিশেষভাবে সহায়ক।

প্রথমেই কিউবিকল প্রসঙ্গে আসা যাক- পশ্চিমাকরণ ও বৈশ্বিক পুঁজি ব্যবস্থার প্রভাবে সরকারি বা বেসরকারি অফিসগুলো বিশেষ রূপ ধারণ করছে। অফিস পরিসরের ডিজাইন বদলে যাচ্ছে। অফিস স্পেস মেপে মেপে খণ্ড খণ্ড করে কর্মীদের জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে। অফিস ব্যবস্থাপকরা এখন কেবল কর্মদায়িত্ব বণ্টন করেন না, অফিস পরিসরও ভাগবাটোয়ারা করেন। এ জন্য তারা পূর্ণ স্বত্ববানও বটে, যা অফিসের অভ্যন্তরে বিভক্তি বা খণ্ডিকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করছে।

কর্তাব্যক্তিগণ অফিসে গ্রুফওয়ার্ক, টিমস্পিরিট ও যৌথ উদ্ভাবনের কথা বলেন। অপরদিকে, কর্মীদের কবুতরের খোপে ঢোকার ব্যবস্থা করেন।

একটি আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা বিষয়ক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় দেখেছি চিফ অব পার্টি (প্রকল্প ব্যবস্থাপক) একজন সহকর্মীকে বিরক্ত হয়ে বলছিলেন- সারাদিন কবুতরের খাঁচার ভিতরে মাথা গুঁজে কী করেন? অর্থাৎ তিনি এ অফিস বিন্যাস ভেতর থেকে মেনে নিতে পারেননি। এ আধুনিক অবয়বের প্রতি প্রত্যাখ্যান রয়েছে। তবে দ্বিচারিতা বাঙালি স্বাভাবের মৌলিক দিক। ঐতিহ্যের প্রতি যেমন রয়েছে গভীর অনুরাগ অপরদিকে রয়েছে অনুকরণপ্রিয়তা।

পশ্চিমা সংস্কৃতি সামগ্রিক জীবনকে প্রভাবিত করছে। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে বাড়ি ও অফিস ডিজাইন সবকিছু তাদের অনুকরণেই হচ্ছে। একসময় বাড়ি থেকে দূরে অবস্থিত শৌচাগার কত সহজেই অ্যাটাচ টু দ্য বেড হয়ে গেল।

অফিসের সংস্কৃতি সহনশীল অবয়বগুলো হারিয়ে গেল। সবকিছুর ভেতর জমকালো ব্যাপার, দেখানোর ব্যাপার ঢুকে পড়ল। পরিবর্তিত এ অফিস বিন্যাসে সেবাগ্রহীতা স্বাছন্দ্যবোধ করেন না। একধরনের বিচ্ছিন্নতা অনুভব করেন, যা তাদের মধ্যে শক তৈরি করছে।

অফিসকর্মী হিসেবে যে কেউ থাকবে, হবে দ্বিমুখী অবস্থায়। একদিকে সঙ্ঘবদ্ধভাবে কাজ করার প্রেরণা, অপরদিকে কিউবিকলের বিচ্ছিন্নকরণ।

নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ও সাংবাদিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ‘দ্য বেস্ট প্রফেশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রবন্ধে সাংবাদিকদের জন্য কিউবিকল নির্ভর কর্মপরিবেশকে টয়েল ইন আইসোলেশন অর্থাৎ খাটুনির জন্য এক নিঃসঙ্গ খোপ হিসেবে উল্লেখ করেন।

অফিস ব্যবস্থাপকরা যদি অফিসের ডিজাইনগত পুনর্বিন্যাসের জন্য কোনো ইনটেরিওয়র ডিজাইন হাউসের সঙ্গে একবার বসেন তাহলে তার আর নিস্তার নেই। থ্রিডিসহ এমন বর্ণিল ডিজাইন তুলে ধরবে যাতে অফিস ব্যবস্থাপকদের মনে হবে তারা যথেষ্ট আধুনিক কর্মপরিবেশে কাজ করেন না। অফিস ব্যবস্থাপকগণ কিছুটা হতাশ হয়ে পড়বেন।

ডিজাইন হাউজগুলো দক্ষতার সঙ্গে কিউবিকলসহ আরও অনেক নতুন বিষয়ের চাহিদা তৈরি করবে, যা অফিস ব্যবস্থাপকদের আগে জানাও ছিল না। এভাবে অফিস ব্যবস্থাপকেরা সুন্দর ও অধিকতর কার্যকর কর্মপরিবেশের নামে দীর্ঘমেয়াদি এক চাহিদার তালিকার অন্তর্ভুক্ত হবেন। এগুলো সময়ান্তর রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হবে। খরচ বাড়বে।

কিউবিকল সংস্কৃতির রয়েছে এক রাজনৈতিক অর্থনীতি। প্রচলিত অফিস ফার্নিচারগুলো বদলে নতুন উপকরণ দিয়ে অফিসগুলো সাজানো হচ্ছে, যা মোটেও সস্তা কর্মযজ্ঞ নয়। এসব উপকরণ তৈরি ও সরবরাহের জন্য গড়ে উঠছে অনেক দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান। অসংখ্য ইনটেরিওয়র ডিজাইন হাউজ। গড়ে ওঠছে বিশাল বাজার।

সমবেত উদ্যোগে অফিসগুলোর ভেতর দেয়াল তোলার প্রক্রিয়া গতিশীল হচ্ছে। বসানো হচ্ছে মাথা বরাবর কিউবিকলের কাঠামো আর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য ঘোলা কাচের দেয়াল ও সাধারণ কাচের দরজা। ঘরের ভেতর অনেক ঘর। ঘোলা কাচের দেয়ালসর্বস্ব অফিস কর্মপরিবেশকে অধিকতর ঘোলা করে তুলছে। অফিস সাজানো প্রতিযোগিতা এত তীব্র হয়েছে যে, সরকারি ও বেসরকারি অফিস একই রূপ ধারণ করছে। সরকারি অফিস ডিজাইন কীভাবে হবে, কী উপকরণ দিয়ে হবে? কত টাকা খরচ করা যাবে? তার কি কোনো সরকারি নির্দেশনা রয়েছে?

কিউবিকল-নির্ভর অফিস পরিচালন অফিস পলিটিক্সকে প্রমোট করছে। অর্থাৎ অফিস পরিসরের সব জায়গায় সমান আলো-বাতাস বা টয়লেট সুবিধা থাকে না। অফিসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের সঙ্গে যাদের সখ্য তারা অধিকতর ভালো কিউবিকল পান। একে ঘিরে সহকর্মীদের ভেতর চাপা অসন্তোষ তৈরি হয়। তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষোভ। এক আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করার সময় দেখেছি এক সিনিয়র কলিগের জন্য যে কিউবিকলটি বরাদ্দ করা হয়েছিল তাতে এসির বাতাস লাগতো সরাসরি এবং তা লাগত মাথায় পেছনে। অথচ অপেক্ষাকৃত ভালো কিউবিকল পেয়েছিলেন প্রজেক্ট ম্যানেজারের অফিস সহকারী।

পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিমের অফিস কাঠামো, ব্যবস্থাপনা বা কর্মপরিবেশ এক নয়। আমরা অতিদ্রুত কিউবিকল সংস্কৃতির ভেতর ঢুকে পড়লাম। কাচ, মেটাল আর আর্টিফিশিয়ার উপকরণে অফিস ভরে ফেললাম। আমরা যে নিজেদের মতো করে অফিস সাজাতে পারতাম না, তা তো নয়। নিরপেক্ষ ও উৎপাদনশীল কর্মপরিবেশের জন্য উপযুক্ত বিন্যাস কী হবে তা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন বোধ করলাম না। আলো, বাতাস ও স্বাস্থ্যগত দিক উপেক্ষিত হলো। অনুকরণে গেলাম। বৈশ্বিক অফিস ব্যবস্থাপনার অংশ হয়ে উঠতে উঠেপড়ে লাগলাম। তা করলাম নির্বিচারে জনগণের টাকা খরচ করে।

এবার আসা যাক চেয়ার প্রসঙ্গে- চেয়ার ক্ষমতার সূচক হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে অফিস পরিসরে। অফিসগুলোতে নানা ধরনের নানা সুবিধা চেয়ারের ছড়াছড়ি। আলবার্ট আইনস্টাইন একবার দুঃখ করে বলেছিলেন- একটা টেবিল, একটা চেয়ার এবং ফলের ঝুড়ি, একটা ভায়োলিন- একজন মানুষকে সুখী হওয়ার জন্য আর কী কী দরকার? সত্যি তো চেয়ারগুলো হয়ে উঠছে সুখী হওয়ার উপায়। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা নিয়ে বোঝাপড়ার ভিন্ন সূচক।

চেয়ার দায়িত্ববোধ, রুচি, সংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে। চেয়ারকে নিছক চেয়ার হিসেবে দেখলে হবে না। চেয়ারগুলোর মধ্যে কী কী অর্থ লুকিয়ে আছে তা দেখতে হবে নিবিড়ভাবে। এ লেখাটি তৈরির উদ্দেশ্যে পৃথিবীর রাষ্ট্রপ্রধানসহ বিভিন্ন পাবলিক ফিগারগুলোর ব্যবহৃত চেয়ারের ডিজাইনগত দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেমন. আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, কানাডা ও ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত চেয়ারগুলোর আকার ও ডিজাইনের ভাবগত অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়েছে। একইসঙ্গে, বাংলাদেশে অফিস পরিসরে সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের চেয়ারের আকার ও ডিজাইনের ভাবগত অর্থ অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হয়েছে।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, কানাডা ও ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত চেয়ারগুলোর আকার ও ডিজাইনের মধ্যে একটি যৌক্তিক ও সহনশীল অবয়ব লক্ষ করা গেছে। এ চেয়ারগুলো আকার ও ডিজাইনের মধ্যে অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যায়নি। ব্যবহৃত চেয়ারগুলো বিভক্তির সূচকও নয়। ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কীভাবে সহনশীল উপায়ে ব্যবহৃত আর্টিফেক্টগুলোর মধ্য দিয়ে প্রকাশ করা যায় তার মান উদহারণ মনে হয়েছে।

অপরদিকে, বাংলাদেশে অফিস পরিসরে সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের চেয়ারের আকার ও ডিজাইনের ভাবগত অর্থ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এগুলো হলো- ক্ষমতার বিচ্ছুরক, অনেকক্ষেত্রে অস্বাভাবিক আকার ও ডিজাইন; ক্ষমতার স্তরবিন্যাস পরিমাপের বিশেষ সূচক; অধস্তন মানসিকতার বস্তুগত প্রকাশ; ম্যানিফ্যাকচারেরা নিপুণভাবে চেয়ারের ডিজাইন ও আকারের মধ্যে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও সেক্সের মিশেল ঘটিয়েছেন; চেয়ারগুলো ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের দ্যোতক।

একটি কথা চালু রয়েছে-সুইভেল বা ঘূর্ণি চেয়ারে বসে কোনো ভালো কাজ বা সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। চেয়ারগুলোর অবয়ব বিশ্লেষণের সময় দেখা গেছে সরকারপ্রধানগণ সাধারণত সুইভেল বা ঘূর্ণি চেয়ার ব্যবহার করেন না। তারা সাধারণত মেটাল, কাঠ বা কাঠ-মেটালের সমন্বয় তৈরি চেয়ার ব্যবহার করেন। তাদের চেয়ারের পেছনের অংশ মাথা ছাপিয়ে ওঠে না। কারণ, তারা হয়ত বুঝে গেছেন চেয়ার কোনো অংশই মাথার উপরে উঠতে পারে না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাসায় খুব সাধারণ মানের কাঠের তৈরি হাতলওয়ালা চেয়ার ব্যবহার করতেন।

বলা হয়, সেই চেয়ার সবচেয়ে উত্তম যে চেয়ারে অন্যকে বসার জন্য অনুরোধ করা যায় এবং যাকে অনুরোধ করা হয় তিনি সেই চেয়ারে বসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অফিস পরিসরে কিউবিকল ও চেয়ারের পুনর্পাঠ নতুনভাবে অনুভূত হচ্ছে।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও সমাজ বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
উত্তাল তরঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দর্শনই আশার তরী
করোনায় অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছি?
কিছু কোমলহৃদয় কেন ‘সুন্দর ভুবনে বাঁচিবারে’ চায় না?
প্রতিভা বিকাশ ও গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা সময়ের দাবি
সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস নির্মূল জরুরি

শেয়ার করুন

করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সামনে আরেক কঠিন চ্যালেঞ্জ

করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সামনে আরেক কঠিন চ্যালেঞ্জ

শঙ্কার বিষয় হচ্ছে এরইমধ্যে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অতিসম্প্রতি ভারতফেরত যাত্রীদের মধ্যে আটজনের শরীরে করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়, এদের মধ্যে দুইজনের শরীরে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়। কাজেই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং সরকারের এখনই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে।

নতুন করোনা ভ্যারিয়েন্ট সামাল দিতে ভারত বর্তমানে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে এক ভয়াবহ ও মানবিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়ে সারা বিশ্বের সংক্রমণের এক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য করোনাভাইরাসের নতুন একটি ভ্যারিয়েন্ট দায়ী বলে জানিয়েছে দেশটি।

গত মার্চে প্রথম এই ভ্যারিয়েন্টটি শনাক্ত হয়। দেশটির ধারণা দেশে করোনার যে দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হেনেছে এর পেছনে রয়েছে এই শক্তিশালী ভ্যারিয়েন্ট। ডবল মিউট্যান্ট এই ভ্যারিয়েন্টের নাম দেয়া হয়েছে বি.১.৬১৭। দেশটির একাধিক রাজ্যে এই ভ্যারিয়েন্টের উচ্চ সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়েছে। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এই ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। যদিও এর গবেষকরা এখনও দ্বিতীয় ঢেউ ও নতুন ভ্যারিয়েন্টের মধ্যেকার সম্পর্কের বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত নন।

নতুন ভ্যারিয়েন্টের বিষয়ে নিশ্চিত হতে বিস্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন ভারতীয় গবেষকরা। বিভিন্ন রাজ্য থেকে আনা ১৩ হাজার নমুনা বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এর মধ্যে ৩ হাজার ৫০০টিই নতুন ভ্যারিয়েন্টের। দেশটির ৮ রাজ্যে এর উপস্থিতি নিশ্চিত। এগুলোর মধ্যে কটি হচ্ছে- মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট ও ছত্রিশগড়। এর আগে ভারত দাবি করে আসছিল যে, ভারতীয় এই ভ্যারিয়েন্টের কোনো সম্পর্ক নেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সঙ্গে। নতুন ভ্যারিয়েন্ট আর নতুন ঢেউয়ের আঘাতে সমস্ত ভারত আজ টালমাতাল ও বেসামাল অবস্থা।

এ মুহূর্তে ভারতের করোনার তিনটি ভ্যারিয়েন্ট (B.1.617, B.1.617+S:V382L এবং B.1.618) নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিক্যাল বায়োটেকনোলজি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মারুফুর রহমান অপু বলেন, B.1.617 এটাকে বলা হচ্ছে বেঙ্গল ভ্যারিয়েন্ট। এই ভ্যারিয়েন্টে তিনটি মিউটেশন অব কনসার্ন আছে। যেগুলোতে ইমিউন এসকেপ (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ফাঁকি দেয়া, বেশি ইনফেক্টিভিটি (সংক্রমণ) এসবের সঙ্গে সম্পর্কিত।

দিল্লিতে জনস্বাস্থ্য বিষয়ক মার্কিন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিজ ডাইন্যামিকস, ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিসির পরিচালক ড. রামানান লক্ষ্মীনারায়ণ জানিয়েছেন, এই মাপের মানবিক বিপর্যয় তিনি তার জীবনে আগে দেখেননি। ‘হাসপাতালে মানুষ শুধু অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছে। এ ঘটনা তো অত্যন্ত দরিদ্র দেশে হয়। এই ট্র্যাজেডি ঘটছে দিল্লির মতো শহরে। গ্রামাঞ্চলে মানুষের পরিণতি তাহলে কী হচ্ছে অনুমান করতে পারেন!” মৃত্যু, অনিশ্চয়তা আর অশুভ হতাশা মিলে ভারতীয় জনগণ এখন দিশেহারা। করোনার নিষ্ঠুর থাবায় ভারতের অসহায়ত্বে প্রতিবেশী দেশ যেমন- নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পড়ছে।

ভারতের করোনা এ ভ্যারিয়েন্ট সকল রাজ্যগুলোতে দ্রুত বিস্তার ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংক্রমণ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু দুটোই হু হু করে বাড়ছে। দেশটির মহামারি এখন পুবদিকে এগোচ্ছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সতর্ক করে দিয়েছে। আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা, ঝাড়খন্ড ও বিহার- পূর্ব ভারতের এই পাঁচটি রাজ্যের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্যগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আপৎকালীন বৈঠকের পরই দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এ মন্তব্য করা হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ওই রাজ্যগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানা যায়। দক্ষিণ, পশ্চিম বা উত্তর ভারতের তুলনায় পূর্ব ভারতের পরিস্থিতি এতদিন কিছুটা ভালো ছিল। রাজ্যগুলোতে দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, যেমন বাড়ছে মৃত্যুহারও।

করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট অবাধে নেপালে ছড়িয়ে পড়ার কারণে নেপালে ক্রমশ করোনা পরিস্থিতি খারাপের দিকে ধাবিত হতে চলেছে। এ ক্ষেত্রে ভারত থেকে নেপালে অবাধে যাতায়াত, ভারতে কাজ করা নেপালি শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার বিষয়গুলোও রয়েছে। প্রতিবেশী ভারতের মতো করোনা বিপর্যয়ের মুখে নেপাল। সংকট মোকাবিলায় দেশটির সরকার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়েছে। রাজধানী কাঠমান্ডুসহ দেশের উত্তর-পশ্চিম ও পশ্চিমাঞ্চলে সংক্রমণের মাত্রা অনেক বেড়েছে। এই এলাকাগুলোতে সংক্রমণের হার ৪৭ শতাংশ।

এই পরিস্থিতিতে দেশটিতে একদিকে দেখা দিয়েছে টিকার সংকট অপরদিকে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে। করোনা পরিস্থিতি সামাল দেয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। চলতি সপ্তাহে তিনি টিকার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়েছেন। টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারের বিশৃঙ্খলার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে নাগরিকদের। এভাবে আরও ভাইরাস বিস্তার ঘটাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

নেপালের বিষয়টি আমাদের জন্য এক সকর্তবার্তা। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে ১৮টি স্থলবন্দর ও দীর্ঘ সীমান্ত এলাকা। এর মধ্যে কোনোটি পুরোপুরি বন্ধ, কোনোটিতে শুধু পণ্য পরিবহনের সুযোগ রাখা হয়েছে, আবার কোনো কোনোটি দিয়ে জরুরি কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশিরা দেশে আসার সুযোগ পাচ্ছে। এই সুযোগ নিয়ে প্রতিদিনই শত শত যাত্রী ভারত থেকে দেশে ঢুকছে। এ সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। বৈধভাবে আসা এসব যাত্রী ছাড়াও অবৈধভাবে বিভিন্ন সীমান্ত হয়ে প্রতিদিনই আরও কিছু মানুষ দেশে ঢুকছে যা হয়তো আমাদের অজানা। যদিও আমাদের সীমান্ত এখন কড়াকড়িভাবেই বন্ধ করা আছে। যারা ফিরছে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনও বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। তবু চারদিকে ভারত সীমান্তবেষ্টিত হওয়ায় বাংলাদেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট খুব সহজে দেশে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। কেননা কোনো এক অসতর্ক মহূর্তের জন্যই মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

শঙ্কার বিষয় হচ্ছে এরইমধ্যে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অতিসম্প্রতি ভারতফেরত যাত্রীদের মধ্যে আটজনের শরীরে করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়, এদের মধ্যে দুইজনের শরীরে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়। কাজেই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং সরকারের এখনই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে।

ভারতে করোনাভাইরাসের ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ আতঙ্ক কাটতে না কাটতেই সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে ‘ট্রিপল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়্যান্ট’-এর কথা। ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গসহ দেশটির অন্তত চারটি রাজ্যে এ ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে। বাকি রাজ্যগুলো হচ্ছে দিল্লি, মহারাষ্ট্র ও ছত্রিশগড়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ ভাইরাসের তিনটি আলাদা স্ট্রেইন মিলে তৈরি নতুন এই ভ্যারিয়্যান্টের সংক্রমণের ক্ষমতা তিন গুণ বেশি। নতুন এই স্ট্রেইনে আক্রান্তদের শারীরিক অবস্থারও দ্রুত অবনতি ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো লাগাম পরানো না গেলে এবার সংক্রমণের সুনামি ঘটবে। ভারত থেকে যাতে দেশে সংক্রমণ ছড়াতে না পারে, সে জন্য ২৬ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশও ভারতের সঙ্গে স্থলপথে যাতায়াত বন্ধ করেছে। তবে বিভিন্ন পণ্যবাহী পরিবহনে আমদানি-রপ্তানি চালু থাকায় পরিবহন শ্রমিকদের মাধ্যমে দেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ঢোকার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে ভারত থেকে দেশে প্রবেশকারীরাও সংক্রমণ ছড়ানোর হুমকি হয়ে উঠেছে।

চলমান লকডাউনে একটু শিথিলতায় ঈদে দোকানপাট ও শপিংমলে ঝুঁকি নিয়ে মানুষের যেভাবে উপচেপড়া ভিড় এবং ঘরমুখো মানুষের বাঁধভাঙা তীব্র জনস্রোত দেখা গেছে সেখানে স্বাস্থ্যবিধি অনেকটা ভেঙে পড়েছে। সচেতন নাগারিক হিসেবে আমাদেরকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আমাদের বাইরে বের হওয়া ও জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। সবাইকে সরকারি নির্দেশনা মানতে হবে। সবাইকে মাস্ক ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে কারণ একমাত্র মাস্কই পারে করোনার বিরুদ্ধে ৯০-৯৫ ভাগ রুখে দিতে। ভারতের মতো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবার আগে সরকারকে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে সাহস ও ধৈর্যের সঙ্গে করোনাকে মোকাবিলা করতে হবে।

আমাদের সিংহভাগ জনগণ এখনও ভ্যাকসিনের আওতার বাইরে, অপরদিকে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট দেশে ঢুকে পড়েছে। তাই বিদ্যমান পরিস্থিতির নিরিখে সরকারকে প্রয়োজনে সর্বাত্মক কঠোর লকডাউনে যেতে হবে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত বেড, প্রয়োজনীয় ওষুধপথ্য ও অক্সিজেন মজুদ করে রাখতে হবে। বিশেষ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চীন, রাশিয়া ও বিকল্প উৎস থেকে ভ্যাকসিন এনে সিংগভাগ জনগণকে টিকার আওতায় আনতে হবে। তাহলেই হয়তো এ অতিমারির বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব।

আমরা দেখেছি করোনার ঊর্ধ্বগতি সংক্রমণে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ তো দূরের কথা, সাধারণ বেডই পাওয়া দুষ্কর, সেখানে নতুন ভ্যারিয়েন্ট সংক্রমণের ব্যাপকতা বাড়লে আমাদের পক্ষে কুলিয়ে ওঠা কিছুতেই সম্ভব হবে না। ভেঙে পড়বে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। তবে পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন যেকোনো কঠিন পরিস্থিতির জন্য আমাদেরকে মানসিকভাবে তৈরি থাকতে হবে।

লেখক: গবেষক-কলাম লেখক, সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি

আরও পড়ুন:
উত্তাল তরঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দর্শনই আশার তরী
করোনায় অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছি?
কিছু কোমলহৃদয় কেন ‘সুন্দর ভুবনে বাঁচিবারে’ চায় না?
প্রতিভা বিকাশ ও গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা সময়ের দাবি
সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস নির্মূল জরুরি

শেয়ার করুন