রুদ্র প্রকৃতি অসহায় মানুষ

 রুদ্র প্রকৃতি অসহায় মানুষ

প্রাকৃতিক নিয়মে বর্ষ শুরু হলো। জ্যৈষ্ঠ মাসে আম পাকল। আষাঢ়-শ্রাবণে বৃষ্টি হলো। ভাদ্রে তাল পাকল। আশ্বিনে শারদীয় উৎসব শুরু হলো। ঢাক-ঢোল-মাদলের করতাল। তারপর নবান্নের উৎসব। পৌষ-মাঘে শীতার্ত বাংলা। ফাল্গুনে পাতা ঝরার দিনের অবসান, গাছে গাছে নতুন কচি পাতায় জাগে নতুন বছরের আবাহন। এভাবেই হাজার বছর ধরেই বাংলা উর্বর হয়েছে।

অনেক দিন ধরেই কত দিন ধরে বলব, কয়েক বছর না, না, দুই যুগেরও বেশি সময় প্রকৃতি রুদ্র হয়ে উঠেছে। অনুমান করি আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে অথবা ষাট বছর আগে কিংবা সত্তর বছর আগের যতটা স্মৃতিচারণ করতে পারি, চৈত্রমাসে প্রচণ্ড তাপ এবং চৈত্রসংক্রান্তির মেলার দিন কালবৈশাখি ঝড় শুরু হলো। রুদ্র প্রকৃতি শীতল হলো। মেলা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। কাঁচা আম ঝরে পড়ার পর আম কুড়ানোর ধুম লেগে গেল। মেলা ভাঙায় কারো তেমন কোনো দুঃখ হলো না, এটাই নিয়ম।

প্রাকৃতিক নিয়মে বর্ষ শুরু হলো। জ্যৈষ্ঠ মাসে আম পাকল। আষাঢ়-শ্রাবণে বৃষ্টি হলো। ভাদ্রে তাল পাকল। আশ্বিনে শারদীয় উৎসব শুরু হলো। ঢাক-ঢোল-মাদলের করতাল। তারপর নবান্নের উৎসব। পৌষ-মাঘে শীতার্ত বাংলা। ফাল্গুনে পাতা ঝরার দিনের অবসান, গাছে গাছে নতুন কচি পাতায় জাগে নতুন বছরের আবাহন। এভাবেই হাজার বছর ধরেই বাংলা উর্বর হয়েছে।

ভারতবর্ষে সবচাইতে শস্য-শ্যামলা,সুজলা-সুফলা এই বাংলা। পাঠান, মোঘল, ইংরেজ সবারই লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল এই বাংলার ওপর। ছোটখাটো পাকিস্তানও কম শোষণ করেনি। একপর্যায়ে সোনার বাংলাকে শ্মশান করে দিয়েছে। এখন আর নবান্ন হয় না কারণ হাইব্রিডের কালে সারা বছরই শস্য উৎপাদান হয়ে থাকে।

ক্রমাগতভাবে সার, কীটনাশকের ব্যবহারে বিষাক্ত মৃত্তিকা প্রচুর ফলন দিয়ে যাচ্ছে। ফলদ বৃক্ষ মানুষের লোভ-লালসার শিকার হয়ে, যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নতি করতে গিয়ে লাখ লাখ টাওয়ার বসিয়ে স্বাভাবিক প্রজননকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তারপর আছে যুদ্ধবিগ্রহ, নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা-নীরিক্ষা।

পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছে, সেই সঙ্গে আমাদের এই গ্রহটি সব ধরনের চাপ আত্মস্থ করতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়ছে। এসেছে ব্যাধি, ভয়ংকর সব ব্যাধির কবলে মানুষের ওপর প্রকৃতির প্রতিশোধ শুরু হয়েছে। গতবার পয়লা বৈশাখ হয়নি, ঈদ হয়নি, হয়নি পুজো। প্রবল ক্ষতি হয়েছে ব্যাধিতে, এবারও তাই। এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তা চলছে দেশে। যাকে দেখা যায় না অথচ যার উপস্থিতি ছাড়া মানুষ বাঁচে না, সেই বায়ু দূষিত হয়ে গেছে। মানবজাতির নিত্যদিনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন কমে যাচ্ছে।

পশ্চিমা বিশ্ব প্রথম থেকেই অতি শিল্পায়ন দিয়ে ডেকে এনেছে ভয়াবহতা। শত শত বছর আগে থেকেই এসেছে সব মহামারি। প্লেগ, স্প্যনিশ ফ্লু, এইডস, ক্যানসার। ক্যানসার থেকে শুরু নানা ধরনের অজানা অভূতপূর্ব ব্যাধি। হাজার, লক্ষ, কোটিতে মানবজাতির সংখ্যা আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন ব্যাধিতে। প্রকৃতি যতই সাবধান বাণী দিয়েছে, মানুষ তা মানে না। এই দুর্বিনীত মানবজাতি প্রতিশোধে উন্মত্ত হয়ে একজাতি আরেক জাতিতে যুদ্ধ-বিগ্রহ, হিংসায় উন্মত্ত হয়ে ধ্বংস করেছে কোটি কোটি মানব সন্তান।

মানুষই একমাত্র প্রাণী যে ভুল উপলব্ধি করতে পারে, তার অনুভব আছে, অনুশোচনা আছে, আছে স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা। মুষ্টিমেয় মানুষ হয়তো এই ক্ষমতার অধিকারী কিন্তু অধিকাংশ মানুষ চলে গড্ডলিকা প্রবাহে। সেই গড্ডলিকা প্রবাহকে নানা ধরনের উদ্দীপক স্লোগানে ব্যবসায়ীদের প্রবল উৎসাহে একটা ভোক্তা সমাজ তৈরি হয়ে যায়। প্রবল মহামারিতেও এই ভোগের লিপ্সা বিন্দুমাত্র কমে না, বরং বেড়েই চলে। বড় বড় শহর ছাড়াও ছোট শহরে এমনকি গ্রামেও বিপণিবিতান বেড়েই চলেছে। দ্রুতহারে খাদ্যের দোকানে ভরে গেছে দেশ।

গ্রামাঞ্চলেও ব্র্যান্ডের দোকানে দোকানে সয়লাব হয়ে গেছে। জাতীয় সংস্কৃতিকে ছাপিয়ে আজ যে সংস্কৃতিটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়, তা হলো দোকানসংস্কৃতি। কোনো কোনো রাষ্ট্রনায়ক বলে থাকেন, এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না। তার মধ্য থেকে বোঝা যায় মানুষ শুধু খাবে খাদ্যই তার একমাত্র প্রয়োজন।

একদা এক আমলা বলেছিলেন, এদেশে অগ্রাধিকার একটিই- তা হলো খাদ্য, চাল-ভাত। এর বিপরীতে নাটকে উচ্চারিত হয় সংলাপ- “ভাত, শুধু ভাত ভাত করিস। শুধু কি ভাত খেয়ে মানুষ বাঁচে? শুধু ভাতের জন্য এতগুলো মানুষ প্রাণ দিলো?”

এসব আমলা রাজনীতিক এবং ভোগী সমাজপতিরা সাম্রাজ্যবাদের প্রেরণা ও অর্থে সৃষ্টি করেছিল ফুড ফর ওয়ার্ক প্রোগ্রাম। সকাল-সন্ধ্যা পরিশ্রম করে একজন শ্রমিক কিছু চাল বা গম পাবে। এর মানেই হচ্ছে প্রাণী জগতের আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হয় না তেমনি মানুষকে শেয়াল-কুকুরের পর্যায়ে নামিয়ে আনা। সেই সাম্রাজ্যবাদী এবং পুঁজিপুতিদের সংমিশ্রণে মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠল মার্কেট ইকোনোমি অর্থাৎ বাজার অর্থনীতি। দুর্বল দেশগুলো বাজার অধিকার করে নিল বড় বড় কোম্পানি। যাদের একটাই উদ্দেশ্য মানুষকে বাজারমুখী করা, ভোগী করে তোলা। তার সঙ্গে সঙ্গেই প্রযুক্তির বড় বিপ্লব ঘটে গেল হিরোইন, ইয়াবার নেশার চাইতে বড় নেশা হয়ে ওঠল প্রযুক্তির নেশা, নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে গেল সর্বত্র। ফোন, ফেসবুক এসব যোগাযোগ মাধ্যম গ্রাস করল উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নশ্রেণির মানুষকে।

একটি বিদেশি টেলিফোন কোম্পানির গবেষণায় দেখা গেল বাংলাদেশের মানুষের বর্তমানে বড় ক্ষুধা হচ্ছে ফোনে কথা বলা। সে না খেয়ে থাকতে পারে কিন্তু কথা বলা চাই। আর এসবকে মানুষের কাছে নিয়ে আসার জন্যে রয়েছে উত্তেজক সব বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের ভাষার ওপর রাষ্ট্রীয় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই যা খুশি তাই বলতে পারছে এবং অর্ধশিক্ষিত অশিক্ষিত এবং শিক্ষিত মানুষজনকেও উন্মাদনায় নিমজ্জিত করছে। এই মোহে আক্রান্ত হয়ে কত অনাসৃষ্টি যে সমাজে তৈরি হচ্ছে তার কোনো শেষ নেই। এক আদর্শহীন, উদ্দেশ্যহীন সমাজ সৃষ্টি হচ্ছে পৃথিবীর সর্বত্র। মানুষ ভোগ করছে কিন্তু সেই ভোগের ফলাফলটা কী? এমন একটি ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে যা চোখে তো দেখা যায় না বরং কোনো যন্ত্রেও ধরা পড়ছে না। প্রযুক্তি এখানে ব্যর্থ।

নেটওয়ার্কের মতোই অদৃশ্য এক ভাইরাস মানুষ সংহারে কাজ করে যাচ্ছে দ্রুত। অসহায় হয়ে পড়ছে চিকিৎসাবিজ্ঞান। যদিও কিছু তাৎক্ষণিক চিকিৎসার পথ বের হচ্ছে কিন্তু সেই সঙ্গে আরও শক্তিশালী ভাইরাস এসে তা ব্যর্থ করে দিচ্ছে। প্রকৃতি কখনই কোনো বাড়াবাড়ি সহ্য করে না। বাড়াবাড়ি হলেই সে ক্ষিপ্ত হয়, প্রতিশোধ নেয় বুঝিয়ে দেয়ার জন্যই যে ‘এখনও সময় আছে থামো’ বলে। এই ‘থামোটা’ মানুষ শোনে না, আরও কয়েকগুণ বাড়াবাড়ি করে ফেলে। এই বাড়াবাড়ি করে মানবজাতি সব ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়।

আদিম সমাজ দাসপ্রথা, সামন্তপ্রথাকে ধ্বংস করে পৃথিবীতে নতুন ব্যবস্থা এসেছে। কিন্তু পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদকেও যথেচ্ছ ব্যবহার করে নিজেই বিপদ ডেকে আনছে। সমাজতন্ত্র পৃথিবীতে তাবৎ অসাম্যকে বিনাশ করে একটা নতুন ব্যবস্থা এনেছিল কিন্তু মানুষ সবকিছুই চায় তার একান্ত ব্যাক্তিগত ভোগের জন্যে। সেই ভোগ করতে গিয়ে পুঁজিবাদের পাশাপাশি চেয়েছিল গণতন্ত্রকে। মানুষ সেই গণতন্ত্রেরও যে হাল করে ফেলেছে তা পাশের দেশ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন দেখেই বোঝা যায়। মানুষ মরছে শুধু তাই নয়, অসহিষ্ণুতা যে কোন পর্যায়ে যেতে পারে তা বোধের অযোগ্য।

তথাকথিত উন্নত দেশ, তার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে পরাজিত হয়ে সিনেট হাউজে আক্রমণ পর্যন্ত করে ফেলেছে। পৃথিবীর সব দেশের গণতন্ত্রই আজ অসহিষ্ণুতার এক প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীর এই সাত শ’ কোটি মানুষ তাহলে কোথায় যাবে? এ এক বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ এই ধরণিই এখন আক্রান্ত।

পৃথিবীর সব আদিবাসী মনে করে ধরিত্রী তাদের কাছে ‘মা’। মাকে যেমন যত্ন করতে হয় তেমনি ধরিত্রীকেও যত্ন করতে হয়। পাহাড়, বনানী, সমুদ্র এসবই তাদের কাছে মায়ের মতো। মায়ের ওপর অত্যাচার করলে বড় ধরনের অকল্যাণ নেমে আসে পৃথিবীতে। তাই হয়েছে।

পাহাড় বনানী কেটে সমুদ্রের ওপর বিনাশী কার্যক্রম চালিয়ে কোটি কোটি টন অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়ে একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে মানুষ। আজ তাই নববর্ষে আমাদের ধরিত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হবে ‘ক্ষমা করো’। আর নয়। তাতেই হয়ত অনাগত বৈশাখে আবার আশীর্বাদের মতোই ধরিত্রী সিঞ্চন করবে তার বারিধারা।

লেখক: নাট্যজন, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

শেয়ার করুন

মন্তব্য