করোনায় দায়হীন প্রশাসন, ভয়হীন জনতা

করোনায় দায়হীন প্রশাসন, ভয়হীন জনতা

স্বাস্থ্য খাতে বিশেষত করোনা মোকাবিলায় সীমিত বাজেটেও উদ্যোগগুলো কেমন নেয়া দরকার, তা নিয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অন্তত বাস্তবায়িত হবে সে প্রত্যাশা নিশ্চয়ই অমূলক ছিল না। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সবাই বলেছেন, মহামারির দ্বিতীয় ঢেউটা প্রথমটার চেয়ে মারাত্মক হয়ে থাকে। কে শোনে কার কথা! প্রথমবার ছিল দম্ভ। আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী। আর দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রাক্বালে আত্মতৃপ্তি। আমরা করোনা জয় করতে পেরেছি, বাকি সবকিছুই জয় করতে পারব।

করোনায় ভয়াবহতা বাড়ছে। শুধু বাংলাদেশে নয় ইউরোপ, আমেরিকা, ব্রাজিল, ভারতেও বাড়ছে মৃত্যু। ভারত এবং ব্রাজিলে মৃত্যু গত বছরের রেকর্ড অতিক্রম করছে। আর এক দিনে এত মৃত্যু বাংলাদেশেও গত বছর ঘটেনি। গত বছরের তুলনায় সংক্রমণ, শনাক্ত ও মৃত্যু তিনটাই বেশি করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে।

টানা কয়েক দিন মৃত্যু ৬০ জনের বেশি এবং এক দিন তা ৬৬ জনে উন্নীত হয়েছে আর শনাক্ত ৭ হাজারের বেশি বলে সরকারি ঘোষণায় বলা হচ্ছে। গত বছর ৩০ জুনে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সর্বাধিক, ৬৪ জন। নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে বেশি, নমুনা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২২ শতাংশের মতো কিন্তু মৃত্যু, শনাক্ত বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি ঘোষণা কেন যেন আস্থা অর্জন করতে পারছে না। এ পর্যন্ত ১০ হাজারের মতো মৃত্যুবরণ করলেও অনেকেই বলছেন সংখ্যা হয়তো আরও বেশি।

ঢাকা মহানগরের হাসপাতালগুলোতে ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই অবস্থা। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে রোগী নিয়ে ছুটছেন স্বজনেরা। তাদের উদ্বেগ, আশঙ্কা, অসহায়ত্ব যে কেমন তা ভুক্তভোগীরা ছাড়া আর কেউ বুঝবেন না। শ্বাসকষ্ট হলে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন অক্সিজেন। আর তা নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করতে গেলে প্রয়োজন হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা। সেটা পাওয়া যাবে কোথায় বা কোন হাসপাতালে? হাসপাতালের বেড খালি পাওয়া যাবে তো? আর গুরুতর আক্রান্ত রোগীর জন্য আইসিইউ খালি পাওয়া যাবে কি? প্রায় দুই কোটি জনসংখ্যার ঢাকা শহরে সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ ১০৪টি আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ৩৭৬টি। ফলে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা সংকটাপন্ন রোগীর স্বজনরা প্রতিমুহূর্তে কামনা করতে থাকে যারা ভর্তি হয়ে আছে, তাদের মৃত্যু। কারণ, মৃত্যু ছাড়া আইসিইউ বেড খালি হওয়ার উপায় নেই। করোনা মহামারি মানুষকে কতটা অসহায় আর অমানবিক করে ফেলছে! মুখে না বললেও মনে মনে ভাবতে থাকে, একটা বেড দরকার। নিজের স্বজন ছাড়া বাকিরা মরে যাক!

২০২০ সালের মার্চের ৮ তারিখে প্রথম করোনা শনাক্ত হওয়ার পর এক বছর এক মাস পার হয়েছে। করোনা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল আর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বেফাঁস কথা জনগণের সামনে উন্মোচন করেছিল। এরপর বাজেট প্রণীত হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে সে বাজেটে সেটা ভিন্ন আলোচনা, তা করলে হয়তো দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিরক্ত হবেন। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে বিশেষত করোনা মোকাবিলায় সীমিত বাজেটেও উদ্যোগগুলো কেমন নেয়া দরকার, তা নিয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অন্তত বাস্তবায়িত হবে সে প্রত্যাশা নিশ্চয়ই অমূলক ছিল না। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সবাই বলেছেন, মহামারির দ্বিতীয় ঢেউটা প্রথমটার চাইতে মারাত্মক হয়ে থাকে। কে শোনে কার কথা! প্রথমবার ছিল দম্ভ। আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী। আর দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রাক্বালে আত্মতৃপ্তি। আমরা করোনা জয় করতে পেরেছি, বাকি সব কিছুই জয় করতে পারব।

প্রথম ঢেউ বা ধাক্কার শিক্ষাটা কী ছিল? তা কি কর্তাব্যক্তিদের মনে আছে? যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের ৭৫ শতাংশ ছিল পুরুষ। বাকিরা নারী। বয়স বিবেচনায় ৬০ বছরের বেশি বয়সী ৫৬ শতাংশ, ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সী ২৫ শতাংশ, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী ১১ শতাংশ মৃত্যুর কথা পরিসংখ্যান বলছে। মৃত্যুর সংখ্যার শীর্ষে ছিল ঢাকা, প্রায় ৫৭ শতাংশ। করোনার উচ্চ ঝুঁকিতে ছিল ৩১টি জেলা। করোনায় কাজ হারিয়েছে, আয় কমেছে, শ্রমজীবীদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা এবং বিবিএস পর্যন্ত জরিপ করে দেখিয়েছে কীভাবে মানুষের জীবনে কষ্ট বেড়েছে করোনার আঘাতে। প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছিল এবং ৯৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের অন্তত ২০ শতাংশ আয় কমে গিয়েছিল। এর সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের জীবনে যে অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছে তা কাটাতে অনেকদিন সময় লাগবে। কিন্তু এসব তো তথ্য। তথ্যের কি শক্তি থাকে যদি তা কেউ বিবেচনায় না নেয়? বিশেষ করে যারা ক্ষমতায় আছেন তারা। যে যা-ই বলুক না কেন, ক্ষমতায় যারা থাকেন কিছু করার ক্ষমতা তো তাদেরই থাকে। কারণ ট্যাক্সের টাকা বা রাজস্ব আয় সব তো তাদের হাতে, প্রশাসন তাদের নিয়ন্ত্রণে। সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ যত পরামর্শই দিন না কেন বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা তো ক্ষমতাসীনদের হাতেই।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী গত মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর মহাখালীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মার্কেট হাসপাতালের নতুন ২০০টি করোনা আইসিইউ বেড ও ১০০০টি আইসোলেশন বেডের প্রস্তুতকরণ ও কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন শেষে বলেন, ‘করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকার লকডাউন ঘোষণা করেছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর ১৮টি জনগুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এখন করোনা প্রতিরোধে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চলছে। অথচ দেশের কোথাও কোথাও লকডাউন তুলে নিতে আন্দোলন করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে সরকারের লকডাউন ব্যবস্থা জরুরি ছিল, তাই সরকার দিয়েছে। যখন লকডাউন তুলে নেয়ার প্রয়োজন হবে, সরকার সেই সিদ্ধান্ত নেবে। এখন এসব সরকারি নির্দেশনা মেনে না চললে ভবিষ্যতে করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু উভয়ই নিয়ন্ত্রণহীন হতে পারে।’ এই কথার সঙ্গে দ্বিমত করার কি কিছু আছে? কিন্তু যখন সিদ্ধান্তগুলো পালটে যায়, তখন হতবাক হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার আছে কি?

লক ডাউন করা হচ্ছে না কি হয় নি, তা নিয়ে এক রহস্য তৈরি হয়েছে। একবার বলা হচ্ছে কঠোর ভাবে মেনে চলতে হবে আবার নগরে গনপরিবহন চলার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। অফিস আদালত চলবে, কারখানা চলবে, ব্যক্তিগত গাড়ী, রিক্সা চলবে, বই মেলা চলবে কিন্তু মার্কেট বন্ধ থাকবে। ঢাকাকে যদি করোনার সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত এলাকা ধরা হয় তাহলে সাধারণ ছুটি বা লক ডাউনের সঙ্গে সঙ্গে যে মানুষ ছুটল গ্রামের দিকে তারা কি সংক্রমণের বিস্তার ঘটিয়ে দিতে সহায়তা করল না? জনগণ করোনাকে ভয় পাচ্ছে না, লক ডাউন মানছে না, স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করছে, দোকানপাট খুলতে চাইছে- এভাবে তাদেরকে দায়ী করা যাবে কিন্তু তাদের ওপর দায় চাপিয়ে করোনা সংক্রমণ ঠেকানো যাবে কি?

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন

মন্তব্য

তিনি ফিরেছিলেন দেশ ও মানুষের জন্য

তিনি ফিরেছিলেন দেশ ও মানুষের জন্য

হুমকি ও ষড়যন্ত্রের সকল জাল ছিন্ন করে তিনি এসেছিলেন বলেই আজ দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে। ফাঁসি হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের মূল হোতাদের। আর জামায়াত-হেফাজতে ইসলামীসহ সকল জঙ্গিবাদী সংগঠন নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।

‘এ দেশ আমার। আমার পিতা এদেশকে স্বাধীন করেছেন। আমি আমার দেশে ফিরব। কারো অনুমতি নিতে হবে না।’ এ কথা বলে ২০০৭ সালের ৭ মে ফিরে এলেন দীপ্ত পদচারণায়। তারপর শুরু হলো গণতন্ত্রের অভিযাত্রা। ২০০৭ সালের ৭ মে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারঘোষিত জরুরি অবস্থা চলাকালে শত বাধা ও হুমকি উপেক্ষা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা শেষে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসেন। সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষের অভিনন্দনে সেদিন পুনরায় আপ্লুত হন তিনি। দেশে ফিরে জনগণের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় শুরু করেন নতুন সংগ্রাম।

২০০৭ সালের এই দিনে তিনি ফিরে না এলে এদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হতো না। আর ২০০৯ থেকে ২০২০ সালের মুজিববর্ষ পর্যন্ত তার নেতৃত্বের মহিমান্বিত রূপ দেখা যেত না। বাঙালির চিরঞ্জীব আশা ও অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস শেখ হাসিনা বর্তমানে করোনা ভাইরাসের মহামারি থেকে দেশের মানুষকে ভ্যাকসিন ও খাদ্য সহায়তা দিয়ে রক্ষার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রমে দিনযাপন করছেন।

১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি দেশে ফিরেছিলেন ৬ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে। এরপর ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৭ সালের সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল পর্যন্ত একাধিকবার বন্দি অবস্থায় নিঃসঙ্গ মুহূর্ত কাটাতে হয়েছে তাকে। তিনি লিখেছেন- ‘দেশ ও জনগণের জন্য কিছু মানুষকে আত্মত্যাগ করতেই হয়, এ শিক্ষাদীক্ষা তো আমার রক্তে প্রবাহিত। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর পর প্রবাসে থাকা অবস্থায় আমার জীবনের অনিশ্চয়তা ভরা সময়গুলোয় আমি তো দেশের কথা ভুলে থাকতে পারিনি? ঘাতকদের ভাষণ, সহযোগীদের কুকীর্তি সবই তো জানা যেত।’ (নূর হোসেন, ওরা টোকাই কেন, পৃ. ৫৩)

২০০৬ থেকে ২০০৭ সালে দেশে তখন শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে ‘মাইনাস’ করার চেষ্টা চলছিল। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল, রাজনীতিবিদদের বিশেষ আইনে কারান্তরীণ করে রাখা হয়। এমন এক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের পথ সুগম হয় শেখ হাসিনার আগমনে। আসলে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশ ও জনগণের কাছে প্রত্যাবর্তনের মতো শেখ হাসিনার ২০০৭ সালের ৭ মে আমেরিকা থেকে দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তনও ছিল আমাদের জন্য মঙ্গলকর। ২০০৭ সালে ১১ জানুয়ারির পর তার দেশে ফেরার ওপর বিধিনিষেধ জারি করে সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়।

তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু ১৬ জুলাই যৌথবাহিনী তাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে ৩৩১ দিন কারাগারে বন্দি করে রাখে। সেসময় গণমানুষ তার অনুপস্থিতি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। তার সাব-জেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উদ্বেগ, গ্রেপ্তারের সংবাদ শুনে দেশের বিভিন্ন স্থানে চারজনের মৃত্যুবরণ, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের উৎকণ্ঠা আপামর জনগোষ্ঠীকে স্পর্শ করেছিল। কারণ সে সময় আদালতের চৌকাঠে শেখ হাসিনা ছিলেন সাহসী ও দৃঢ়চেতা; দেশ ও মানুষের জন্য উৎকণ্ঠিত; বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে সত্যকথা উচ্চারণে বড় বেশি সপ্রতিভ। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ধর্ষণ ও লুটপাটের মাধ্যমে এদেশকে নরকে পরিণত করেছিল। নেত্রীকে গ্রেনেড, বুলেট, বোমায় শেষ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন নির্ভীক; এখনও তেমনটাই আছেন।

২০০৭ সালের ৭ মে হাসিনা ফিরে এসেছিলেন মাটি ও মানুষের কাছে। এজন্য ‘আমার বাংলাদেশ, আমার ভালোবাসা’ এই অমৃতবাণী তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে। তিনি নানা বিশেষণে বিশেষায়িত। সততা, নিষ্ঠা, রাজনৈতিক দৃঢ়তা; গণতন্ত্র, শান্তি, সম্প্রীতি ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের অনন্য রূপকার আর মানব কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ- তার চেয়েও আরও অনেক কিছু তিনি। এই দরদি নেতা দুঃখী মানুষের আপনজন; নির্যাতিত জনগণের সহমর্মী তথা ঘরের লোক। তিনি বলেছেন, ‘বাবার মতো আমাকে যদি জীবন উৎসর্গ করতে হয়, আমি তা করতে প্রস্তুত।’

সমৃদ্ধশালী এক বাংলাদেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার পথে তিনি এগিয়ে চলেছেন নির্ভীকভাবে। আর এসব কিছুই হতো না যদি তিনি ২০০৭ সালের ৭ মে নিজের দেশে ফিরে না আসতেন। হুমকি ও ষড়যন্ত্রের সকল জাল ছিন্ন করে তিনি এসেছিলেন বলেই আজ দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে। ফাঁসি হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের মূল হোতাদের। আর জামায়াত-হেফাজতে ইসলামীসহ সকল জঙ্গিবাদী সংগঠন নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।

এমনকি ২০২০ সালে শুরু হওয়া করোনা মহামারি সত্ত্বেও বাংলাদেশ এশিয়া মহাদেশের সর্বোচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এই অগ্রগতিতে দেশবাসী গর্বিত। কারণ বাংলাদেশের শক্তিশালী অর্থনীতি গড়তে শেখ হাসিনার অবদান অন্য দেশের জন্যও প্রেরণাদায়ক। এজন্যই বলা হয় ২০০৭ সালের ৭ মে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। ২০০৭ সালে কবি বেলাল চৌধুরী কবিতায় লেখেন-

‘‘শেখ হাসিনাই গণতন্ত্রের শেষ ভরসা,/তাই তো কোটি কণ্ঠে আওয়াজ/ ‘মুক্ত করে আনতে হবে তাকে সহসা’।/ এত কিছুর পরও জানি আমরা/ শেষ হাসিটি হাসবেন শেখ হাসিনাই।’’(কোটি কণ্ঠে এক আওয়াজ)

লেখক: অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, নির্বাহী সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদশ, কলাম লেখক।

শেয়ার করুন

৭ মে এক অনন্য দিন

৭ মে এক অনন্য দিন

বঙ্গবন্ধু কোনোদিন জেল জীবনকে ভয় পাননি। তাকে ক্যান্টনমেন্টেও বন্দি রাখা হয়েছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালে। শেখ হাসিনার মা মহিয়সী নারী ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সঙ্গে বার বার পিতার বন্দিজীবন দেখেছেন। কী করে কঠিন সময়েও মাথা উঁচু করে থাকতে হয়, সে শিক্ষা তিনি পিতার কাছ থেকে পেয়েছেন। এইচএম এরশাদের শাসনামলে তাকে একাধিকবার গৃহবন্দি রাখা হয়। কিন্তু তাকে দমন করা যায়নি।

৭ মে ২০০৭ সাল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেসন কাউন্টার থেকে বের হয়ে এসে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু ভবনের উদ্দেশে রওনা হবার সময় হাতে-গোনা কয়েকজন নেতা তাকে স্বাগত জানান। তখন ছিল জরুরি আইন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিশাল জমায়েত করে দলের সভাপতিকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানানোর সুযোগ আওয়ামী লীগের নেই।

সবচেয়ে বড় কথা, ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে বাংলাদেশে ফিরতে না দিতে বিশেষভাবে তৎপর ছিল। কিন্তু বিমানবন্দরের ভেতরের সড়ক থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে নিয়ে গাড়িটি প্রধান সড়কে পড়তে না পড়তেই দেখা গেল অভূতপূর্ব দৃশ্য- দলে দলে আওয়ামী-ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীরা প্রশস্ত রাজপথ ভরে ফেলল। এ যেন ম্যাজিক! কেবল একটি স্থানে নয়, বিমানবন্দর থেকে ধানমন্ডি পর্যন্ত ১৫-১৬ কিলোমিটার পথজুড়ে কেবল মানুষ আর মানুষ। কণ্ঠে তাদের স্লোগান জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনার আগমন স্বাগতম স্বাগতম। উই পোকার হঠাৎ আবির্ভাব- এ দৃশ্য আমাদের দেশে অপরিচিত নয়। একটা-দুইটা উই পোকা হঠাৎ করেই ঢিবি থেকে বের হয়ে আসে, মুহূর্ত যেতে না যেতেই অনেকটা এলাকাজুড়ে কেবল উই আর উই। হাজারে হাজারে, লাখে লাখে।

৭ মে তেমনটিই ঘটেছিল- জনে জনে মিলে জনস্রোত। সাধারণত আওয়ামী লীগ কিংবা এ ধরনের দলের বড় সমাবেশে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মী আসেন বাস-ট্রাকে। কিন্তু সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এমনটি ঘটতে পারেনি। দেশে জারি রয়েছে জরুরি আইন। তারা আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রবল আন্দোলনের মুখে ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসের শেষদিকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানো বিএনপির অনেক নেতাও তখন কারাগারে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। এমন অবস্থায় কী করে সম্ভব হলো এ ধরনের জমায়েত?

গোয়েন্দারা কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। তারা ধরেই নিয়েছিল বিমানবন্দরে কয়েকজন নেতা হাজির থাকবেন, তারপর শেখ হাসিনা ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে অদূরে সুধা সদনে ফিরে যাবেন নিজের ঘরে। ব্যস, তারপর সবকিছু আগের মতো-তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিয়ন্ত্রণে।

শেখ হাসিনা আরও দুই সপ্তাহ আগে স্বদেশে ফেরার জন্য লন্ডন বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। তিনি চিকিৎসার জন্য প্রথমে যান যুক্তরাষ্ট্রে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ভয়ংকর গ্রেনেড হামলার দিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে প্রণীত পরিকল্পনা অনুযায়ী ভয়ংকর গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাসহ গোটা আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল সেই অভিশপ্ত দিনে। অন্তত ২৪ জন সেই হামলায় নিহত হন। এদের মধ্যে ছিলেন কেন্দ্রীয় নেত্রী আইভী রহমান। আহেত অন্তত ৫ শ’। বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ অনেকে আহতের দলে। ট্রাকে অস্থায়ী মঞ্চ বানানো হয়েছিল। শেখ হাসিনাসহ আরও অনেক নেতা ছিলেন মঞ্চে।

সমাবেশ ও মঞ্চ লক্ষ্য করে একের পর এক গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। চারদিকে মৃত্যুপথযাত্রীদের আর্তচিৎকার। এর মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকন্যাকে শরীর দিয়ে আড়াল করে রাখেন একদল নেতাকর্মী। ভয়ংকর গ্রেনেড হামলায় তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও প্রচণ্ড শব্দ ও গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের আঘাতে শ্রবণশক্তি কমে যায় এবং তা স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়। এ ব্যাধি নিয়েই তিনি ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার আরেকটি প্রহসনের নির্বাচন আয়োজন ব্যর্থ করার সফল আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। জরুরি আইন জারির পর তিনি কানের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যান। ফিরে আসবেন লন্ডন হয়ে। সেখান থেকেই বিমানে ওঠার তারিখ নির্ধারিত হয় ২৩ এপ্রিল (২০০৭)। কিন্তু ততদিনে ঢাকায় নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়। অপ্রচারও চলতে থাকে। কিন্তু তিনি বঙ্গবন্ধুর মতোই অদম্য।

মামলার কথা জানতে পেরে ঘোষণা দেন- আদালতে গিয়ে তিনি প্রমাণ করে দেবেন যে, এ মামলা হয়রানিমূলক। রাজনৈতিকভাবে তাকে দমিয়ে রাখার জন্যই এটা করা হচ্ছে। ততদিনে ঢাকায় ‘মাইনাস টু’ গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। বলা হচ্ছিল শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক নির্বাসনে পাঠানো হবে। তবে রাজনৈতিক হালচাল যাদের জানা, তারা বলছিল- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘মাইনাস টু’ নয়, প্রকতপক্ষে চাইছিল শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দিতে। তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ‘মাইনাস ওয়ান’। সামরিক বাহিনী নেপথ্যে থেকে যে সরকার চালাচ্ছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলছে তারা। কিন্তু আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়াউর রহমান ও এইচএম এরশাদ একই কথা বলেছিলেন। জনগণ দেখেছে- এদের কেউ গণতন্ত্র দিতে চায় না। আর তাদের অসৎ উদ্দেশ্য ভণ্ডুল করে দিতে বার বার যে দলটি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে সেটির নাম আওয়ামী লীগ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং একই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ চার সহকর্মীকে হত্যা করেও এ দলকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব এ দলটির। জরুরি আইনের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা রুখে দাঁড়াবেন, এ নিয়ে শাসকদের সন্দেহ ছিল না। এ কারণে তারা চেয়েছিল রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে তাকে সরিয়ে দিতে। তাদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক ছিল বাংলাদেশের বাইরে লন্ডন কিংবা অন্য কোনো স্থানে তাকে নির্বাসিত জীবনযাপনে বাধ্য করা। প্রয়োজনে আরাম-আয়েশে জীবন কাটানোর ব্যবস্থা করা হবে।

এখন তারেক রহমান যেমন লন্ডনে জীবন কাটাচ্ছেন, অনেকটা সে ধরনের ব্যবস্থাই প্রায় করে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা সে অপচেষ্টা বানচাল করে দেয়। শেখ হাসিনা লন্ডনে ব্রিটিশ সরকার ও বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন- মিথ্যা মামলা টিকবে না। তিনি আদালতে হাজির হবেন। বিচারে যদি দণ্ড হয়, সেটা মাথা পেতে নেবেন। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের পথ ছাড়বেন না।

বঙ্গবন্ধু কোনোদিন জেল জীবনকে ভয় পাননি। তাকে ক্যান্টনমেন্টেও বন্দি রাখা হয়েছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালে। শেখ হাসিনার মা মহিয়সী নারী ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সঙ্গে বার বার পিতার বন্দিজীবন দেখেছেন। কী করে কঠিন সময়েও মাথা উঁচু করে থাকতে হয়, সে শিক্ষা তিনি পিতার কাছ থেকে পেয়েছেন। এইচএম এরশাদের শাসনামলে তাকে একাধিকবার গৃহবন্দি রাখা হয়। কিন্তু তাকে দমন করা যায়নি। এখনও যাবে না। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বাধ্য করেন তার স্বদেশ ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে। এরপর ফিরে আসেন ৭ মে।

তিনি জানতেন, তাকে বিমানবন্দরেই গ্রেপ্তার করা হতে পারে। কিংবা সুধা সদনে গৃহবন্দি করে রাখা হতে পারে। কিন্তু নাথিং উইল গো আনচ্যালেঞ্জড। তিনি দলকে জানিয়ে দেন- রাজপথে থাকতে হবে। নেতাকর্মীরা বার্তা বুঝে যায়। দলে দলে তারা অবস্থান নেয় ১৫-১৬ কিলোমিটার পথজুড়ে। গোয়েন্দাদের নজর এড়াতে পারে তারা। হয়ত তাদের কেউ কেউ ফুটপাতে কিংবা রাস্তার মোড়গুলোতে বাড়তি লোকের উপস্থিতি দেখতে পেয়েছেন।

সড়কের আশাপাশের গাছের ছায়ায় কিংবা বিভিন্ন দোকান ও বাসভবনের সামনে ভিড় লক্ষ করা গেছে। তবে কেউ বিশেষভাবে খতিয়ে দেখেনি কেন এত দীর্ঘ পথজুড়ে বাড়তি লোকের সমাবেশ। ওই রাতে টেলিভিশন সংবাদ থেকে এবং পরদিন সংবাদপত্রের মাধ্যমে সবাই জেনে যায় বঙ্গবন্ধুকন্যা অভাবনীয় সংবর্ধনা পেয়েছেন। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ তার সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় রাখতে পেরেছে।

শেখ হাসিনা বেশি দিন মুক্ত জীবনে থাকতে পারেননি। তাকে ১৬ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিনই আদালতে নেয়া হলে দলের নেতা-কর্মীরা ফের স্লোগানমুখর হয়- শেখ হাসিনার মুক্তি চাই। তিনি যতদিন কারাগারে ছিলেন, একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু তিনি ছিলেন নির্ভীক। কর্মীরাও ছিলেন রাজপথের সাহসী সৈনিক। ১১ মাসের বন্দিজীবন শেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন তিনি মুক্তিলাভ করেন। সাড়ে ৬ মাস পর ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে জয়ী হয়। যে নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনেন তাদের পরিশ্রম সার্থক হয়। শুরু হয় বাংলাদেশের নতুন যাত্রা।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

শেয়ার করুন

লড়াকু শেখ হাসিনা

লড়াকু শেখ হাসিনা

২০০৭-এর ১৮ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রেসনোটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দু-দু’বার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী, দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি’ ঘোষণা করে তার দেশে আসার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর পরেও শেখ হাসিনা দমে গেলেন না। চাঁদাবাজির মামলা, খুনের মামলায় চার্জশিট, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি ঘোষণা’ কোনো কিছুকেই পরোয়া করলেন না অসম সাহসী মুজিবের দুঃসাহসী কন্যা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এটাই সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য যে, জাতীয় স্বার্থে দেশের জনগণের জন্য পিতার মতোই যে কোনো ত্যাগ স্বীকার এমনকি মৃত্যুকে পর্যন্ত আলিঙ্গন করতে সর্বদা প্রস্তুত থাকেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বার বার লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে বন্দি গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করেছেন। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত সরকারের নিষেধাজ্ঞা, মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা, খুনের মামলায় চার্জশিট, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা উপেক্ষা করে ২০০৭ সালে শেখ হাসিনা স্বদেশে ফিরে না এলে বাংলাদেশে আজও হয়তো অসাংবিধানিক শাসন কায়েম থাকত। অসম সাহসী মুজিবের দুঃসাহসী কন্যা কীভাবে সেই অসাধ্য সাধন করেছেন, সে এক মস্ত ইতিহাস।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস একটি। আর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস দুটি। পিতা-কন্যার এই তিনটি প্রত্যাবর্তন দিবসই বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে।

৮ জানুয়ারি পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তির পর লন্ডন ও ভারত হয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তার স্বপ্নের স্বাধীন সোনার বাংলায় প্রত্যাবর্তন করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ৬ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা স্বদেশে ফিরে আসেন। এর পর সেনাসমর্থিত অনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে লড়াই করে ২০০৭ সালের ৭ মে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন শেখ হাসিনা। তবে দ্বিতীয়বার ২০০৭ সালে শেখ হাসিনা সেনাসমর্থিত সরকারের সঙ্গে যেভাবে লড়াই করে দেশে আসেন, এর কোনো তুলনা হয় না। ৩ কোটি টাকার চাঁদাবাজির মামলা, খুনের মামলায় চার্জশিট, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, সর্বশেষ ‘রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি’ ঘোষণা করেও শেখ হাসিনাকে ফখরুদ্দীন সরকার বিদেশের মাটিতে আটকে রাখতে পারেনি। একটি ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে একজন মানুষের এমনিভাবে লড়াই করার অনন্য নজির বিশ্ব রাজনীতিতে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে- তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে এক চুলও সরে আসেননি। তিনি দেশ ও জাতির স্বার্থে যখন যা ভালো মনে করেছেন, তা বাস্তবায়িত করেছেন।

বিএনপি আমলে মাগুরা-বগুড়া উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির পর শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তোলেন এবং দাবি মানতে খালেদা জিয়াকে বাধ্য করেন। আবার তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিকে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে বঙ্গবন্ধুকন্যা এই পদ্ধতি বাতিল করেন। আরও এমন অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে যে, জননেত্রী তার চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে দেশ ও জাতির স্বার্থে যা যথার্থ মনে করেছেন, তা বাস্তবায়িত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি বিজয় অর্জন করে। নবজাত রাষ্ট্রের জনকের অবর্তমানে জনগণের কাছে স্বাধীনতা এবং বিজয়কে তখন অপূর্ণ মনে হচ্ছিল। মুক্ত স্বদেশে বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে বাংলার অপূর্ণ স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়।

১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা স্বদেশ ফিরে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে খুঁজে পাননি। বীর উত্তম খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল জিয়া তার ৬ বছরের উর্দি-শাসনে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ‘মিনি পাকিস্তানে’ পরিণত করেন। জিয়া-এরশাদ-খালেদার বাংলাদেশ আর মোনায়েম খানের পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। পাকিস্তানের প্রেতাত্মা ঘাতক সর্দার জিয়া তার ৬ বছরের শাসনামলে মুক্তির মহানায়ক, স্বাধীনতার জনক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি মুজিবের নাম প্রায় মুছে ফেলেন। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জিয়াকে তার সাঙ্গপাঙ্গরা স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রচার করতে থাকে। সেই পাকিস্তান মার্কা বাংলাদেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বদেশে ফিরে এসে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনা ২০০৭-এর ৭ মে স্বদেশে ফিরে আসেন সেনাসমর্থিত তিন উদ্দিনের (ফখরুদ্দীন, মইনউদ্দীন ও ইয়াজউদ্দিন) এর সরকারের সঙ্গে সরাসরি লড়াই করে। কী কঠিন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকন্যা ৭ মে দেশে ফিরে আসেন তা জানতে হলে আমাদেরকে একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার ১৯ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে খুবই ভালোভাবে দেশ পরিচালনা করেন শেখ হাসিনা।

২০০১ সালে ষড়যন্ত্রের নির্বাচনে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে হারিয়ে দেয়া হয়। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরকে সঙ্গে নিয়ে খালেদা জিয়া ও তার পুত্র তারেক রহমান দেশে সন্ত্রাসের রামরাজত্ব কায়েম করেন।

মেয়াদ শেষে সংবিধান লঙ্ঘন করে খালেদা জিয়া দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহাম্মদকে একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বানিয়ে তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন প্রধান উপদেষ্টার পদ দখল করে কারচুপির নির্বাচনে আবারও খালেদা-নিজামীকে ক্ষমতায় বসানোর নীল নকশা প্রণয়ন করেন। শেখ হাসিনা আন্দোলনের কঠিন কর্মসূচি প্রদান করেন। খালেদা গংয়ের প্ররোচনায় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন দেশে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে সেনাপ্রধানের সমর্থনে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা দখল করে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমেদ হলেও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ। ওয়ান-ইলেভেনের আগেই খালেদা জিয়া সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদকে সরাসরি ক্ষমতা নিতে অনুরোধ করেছিলেন।

সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকার ক্ষমতা দখল করলে আওয়ামী লীগ উল্লসিত না হলেও অখুশি হয়নি। সবার ধারণা ছিল, ফখরুদ্দীন সরকার অল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে। আওয়ামী লীগসহ সবাই জানত, নির্বাচনে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসবে। দেশের মানুষ বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করল, দুই বড় দলের দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে দূরে রেখে সেনাসমর্থিত সরকার ৫/৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ওই সময় নোবেল পুরস্কার জয়ী ড. ইউনূসকে ক্ষমতায় বসানোর জন্যও চেষ্টা করা হয়। ড. ইউনূস রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পাওয়ায় দল গঠন সম্ভব হয়নি।

সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ ২০০৭-এর ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরিয়ে ড. মোহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টার পদে বসাতে চেয়েছিলেন। ১১ জানুয়ারি রাতে সেনা কর্মকর্তারা বাসায় গিয়ে প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করতে ড. ইউনূসকে আমন্ত্রণ জানান। ড. ইউনূস ওই পদ গ্রহণ করতে বিনয়ের সঙ্গে অস্বীকার করেন। সেনাকর্মকর্তারা তার পছন্দের অন্য কোনো নাম দিতে ড. ইউনূসকে অনুরোধ করেন।

যতদূর জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীনের নাম ড. ইউনূসই সিলেক্ট করে দেন। ১২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ। অসুস্থ পুত্রবধূকে দেখতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ২০০৭-এর ১৫ মার্চ ব্যক্তিগত সফরে যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকার তখন শেখ হাসিনাকে বিদেশে রেখে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেশের বাইরে পাঠানোরও পরিকল্পনা নেয়।

এ সময় সেনাসমর্থিত সরকার নিযুক্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হঠাৎ করে ঘোষণা করেন ‘দেড় বছরের আগে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়।’ শেখ হাসিনা বুঝে গেলেন আলামত সুবিধার নয়। ক্ষমতা দখলকারীরা ক্ষমতাকাল দীর্ঘায়িত করার ষড়যন্ত্র করছে। চুপ করে থাকতে পারলেন না বিদেশ সফররত শেখ হাসিনা। ৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে সিইসির বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, ‘নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিলম্ব করলে জনগণের ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে। যতদূর সম্ভব তাড়াতাড়ি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে।’ শেখ হাসিনার প্রতিবাদী বক্তব্য ক্ষমতাসীনরা সহজভাবে গ্রহণ করেনি। মাত্র ৩ দিনের মাথায় ৯ এপ্রিল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ৩ কোটি টাকার চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করা হয়।

জনৈক তাজুল ইসলাম তেজগাঁও থানায় এই মামলা করেন। মামলার কথা শুনে ক্ষুব্ধ বঙ্গবন্ধুকন্যা ব্যক্তিগত সফর সংক্ষিপ্ত করে দ্রুততার সঙ্গে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। সরকার এবং তাদের মুরব্বিদের ধারণা ছিল, মামলার কথা শুনে শেখ হাসিনা ধীরে-সুস্থে পদক্ষেপ নেবেন এবং তার সফর কিছুটা হলেও বিলম্বিত হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল এর বিপরীত। এদিকে সরকারের লেজ গোটানোরও সুযোগ নেই। চাঁদাবাজির মামলার ২ দিন পর ৬ মাস আগের ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে সহিংসতার ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ৪২ জন দলীয় নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। চার্জশিটের কথা শুনে ১১ এপ্রিল ২০০৭ ওয়াশিংটনে এক সভায় শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, হয়রানি ও ভয় দেখাতেই তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দায়ের এবং খুনের মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়েছে।

সাহসী মুজিবের দুঃসাহসী কন্যা জোরের সঙ্গে বলেন, ‘প্রয়োজনে জীবন দেব কিন্তু কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করব না। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করায় ক্ষমতাসীনরা জনসমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। ওই দিনই বার্তা সংস্থা এপির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জননেত্রী বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে আনা হত্যা ও চাঁদাবাজির মামলা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। আইনি পথেই মামলার মোকাবিলা করা হবে। হেয় করতেই এই মামলা দেয়া হয়েছে। আমি নির্ধারিত তারিখের আগেই আমার দেশে ফিরে যাব। বিমানের টিকিটও কাটা হয়ে গেছে।’

আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর দেশে আসার কথা ছিল ২৩ এপ্রিল। আরও ৯ দিন এগিয়ে তিনি ১৪ এপ্রিল দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। শেখ হাসিনার দুঃসাহসী কর্মকাণ্ড এবং দেশে ফেরার তারিখ এগিয়ে আনায় সেনাসমর্থিত সরকারের কর্তাব্যক্তিরা হতভম্ভ হয়ে পড়ে। এ সময় সরকার কিছুটা পিছু হটে। সরকারের পক্ষ থেকে পূর্বনির্ধারিত তারিখে দেশে ফিরতে শেখ হাসিনার প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

১১ এপ্রিল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘সরকারের একজন উঁচু পর্যায়ের কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের নেত্রী এবং ঢাকায় আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। ওই কর্মকর্তা নেত্রীর দেশে আসার তারিখ পরিবর্তন না করে পূর্বনির্ধারিত ২৩ এপ্রিল আসার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।’ (দৈনিক সংবাদ, ১২.৪.২০০৭)

সরকার চেয়েছিল শেখ হাসিনা দেশে না এলে বেগম জিয়াকে এই সুযোগে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। দুই পুত্রের বিরুদ্ধে পর্বতসমান দুর্নীতির অভিযোগ থাকার কারণে বেগম জিয়ার বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে তেমন জোরালো আপত্তি করার কথা নয়। শেখ হাসিনাকে আমেরিকায় রেখে ওই সময়ের মধ্যে বেগম জিয়াকে বিদেশ প্রেরণের প্রস্তুতি চলে। ফখরুদ্দীন গং মনে করেছিলেন বেগম জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর পর শেখ হাসিনাকে হয়তো বুঝিয়ে সুঝিয়ে হলেও আরও কিছুদিন বাইরে রাখা যাবে।

বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব শুনে বেগম জিয়া তার দুই পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। কিন্তু গ্রেপ্তার তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ হরেকরকমের বড় অভিযোগ থাকায় তাকে কোনোভাবেই ওই সময় বাইরে যেতে দেয়া হবে না বলে বেগম জিয়াকে জানানো হয়। অগত্যা বেগম জিয়া কনিষ্ঠপুত্র কোকো এবং দুই পুত্রবধূকে নিয়েই বিদেশে পাড়ি জমাতে সম্মত হন। ওই সময় জানাজানি হয়ে যায়, বেগম জিয়া যেকোনো সময় বিদেশের উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করবেন।

২১ এপ্রিল ২০০৭ বেগম জিয়া কারাগারের বাইরে বিশেষ ব্যবস্থায় অতি গোপনে বন্দি পুত্র তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। তখন বিএনপি নেত্রীর বিদেশ যাত্রার ব্যাপারে সবাই শতভাগ নিশ্চিত হয়ে যান। বেগম জিয়া বিদেশে চলে গেলে শেখ হাসিনাকে যে সরকার কোনোভাবেই দেশে ফিরতে দেবে না, এই চিন্তায় অস্থির শেখ হাসিনা যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরতে একরকম মরিয়া হয়ে ওঠেন। শেখ হাসিনা হয়ত তখন এই বিষয়টি ভেবে উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, দুই বড় দলের শীর্ষনেত্রী বিদেশে থাকলে সেনাসমর্থিত সরকার আবার ৫/৭ বছরের জন্য ক্ষমতায় জেঁকে বসবে।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বিলম্বিত হবে। ওই অবস্থায় বেগম জিয়ার দেশত্যাগের আগেই শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তখন সরকার দেখল, খালেদা কোনো সমস্যা নয়। প্রধান সমস্যা শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা যদি দেশে চলেই আসেন, তাহলে খালেদাকে বিদেশে পাঠিয়ে লাভ কী? তাছাড়া ওরা জানত, হাসিনাকে যে কোনোভাবে বাইরে আটকাতে পারলে, খালেদাকে বিদেশে পাঠাতে তাদের জন্য কোনো সমস্যাই হবে না।

শুধু দেশ ও জাতির স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই জনগণের নেত্রী মামলা, হামলাসহ জীবনের ঝুঁকি নিয়েই স্বদেশে ফেরার সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। কিন্তু কোনোভাবেই যখন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বিদেশে থাকতে রাজি হচ্ছিলেন না, তখনই সরকার তার দেশে ফেরার ব্যাপারে এক অদ্ভুত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বসে। ২০০৭-এর ১৮ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রেসনোটে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দু-দু’বার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী, দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি’ ঘোষণা করে তার দেশে আসার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর পরেও শেখ হাসিনা দমে গেলেন না।

চাঁদাবাজির মামলা, খুনের মামলায় চার্জশিট, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি ঘোষণা’ কোনো কিছুকেই পরোয়া করলেন না অসম সাহসী মুজিবের দুঃসাহসী কন্যা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এটাই সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য যে, জাতীয় স্বার্থে দেশের জনগণের জন্য পিতার মতোই যে কোনো ত্যাগ স্বীকার এমনকি মৃত্যুকে পর্যন্ত আলিঙ্গন করতে সর্বদা প্রস্তুত থাকেন।

এভাবে পর্বতসমান বাধার মুখে ২৩ এপ্রিল (২০০৭) ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে ঢাকা ফেরার ঘোষণা দিয়ে শেখ হাসিনা ওয়াশিংটন থেকে ১৯ এপ্রিল লন্ডন পৌঁছেন। ২২ এপ্রিল সিএমএম আদালত পল্টন সহিংসতা মামলার চার্জশিট গ্রহণ করে শেখ হাসিনা, মোহাম্মদ নাসিমসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ২২ এপ্রিল ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ শেখ হাসিনাকে বিমানে ওঠার অনুমতি দেয়নি। সেনাসমর্থিত সরকারের দমননীতির মুখে শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরার আকুলতা ও ব্যাকুলতায় শুধু দেশের মানুষ নন, বিদেশের মানুষও খুশি হন।

সাহস, দেশপ্রেম এবং মাতৃভূমি ও পিতৃভূমিতে ফিরে আসার অদম্য আকাঙ্ক্ষার জন্য শেখ হাসিনা রাতারাতি বিশ্বনেত্রীতে পরিণত হন। ২৩ এপ্রিল বিশ্বের ৪১টি দেশের ১৫১টি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় শেখ হাসিনা বিষয়ক খবর ছাপা হয়েছিল বলে একটি সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়।

শেষ পর্যন্ত ফখরুদ্দীন সরকার পিছু হটল। দেশ-বিদেশের সমালোচনার মুখে সরকার ২৫ এপ্রিল ২০০৭ বুধবার উপদেষ্টা পরিষদের একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। ওই বৈঠকের পর আরও বলা হয়, বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে প্রেরণের ব্যাপারেও সরকার কোনো চাপ দেয়নি বা এখনও দিচ্ছে না।

এর পর ৭ মে ২০০৭ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলে জরুরি অবস্থার মধ্যেও হাজার হাজার লোক ঢাকা বিমানবন্দরে নেত্রীকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে মিছিল সহকারে ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবনে নিয়ে আসে। সেদিন যদি প্রবল প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা দেশে না আসতেন, তাহলে কী ঘটত? ব্যাগেজ নিয়ে তৈরি বেগম জিয়াপুত্র কোকোকে নিয়ে বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হতেন। জিয়া-এরশাদের মতো একতরফা নির্বাচনে সুবিধাবাদীদের নিয়ে সরকার গঠন করা হতো। হয়তো ৫/১০ বছর এমনিভাবে অপশাসন কায়েম থাকত দেশে।

লড়াই করে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশে আসাতেই বেগম জিয়াকেও বিদেশে যেতে হয়নি। আর এ জন্যই বেগম জিয়ারও শেখ হাসিনার কাছে ঋণী থাকা উচিত। ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত স্মরণকালের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সিংহভাগ কৃতিত্ব অবশ্যই শেখ হাসিনার। জিয়া, এরশাদের স্বৈরশাসন থেকে দেশকে গণতন্ত্রের পথে আনার বেশিরভাগ কৃতিত্বও বঙ্গবন্ধুকন্যাকে দিতেই হবে।

২০০৬ সালে ইয়াজউদ্দিনের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোটই লড়াই-সংগ্রাম করেছে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একদলীয় নির্বাচনে বেগম জিয়া ক্ষমতা জবরদখল করেছিলেন। শেখ হাসিনার আন্দোলনের ফলেই তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, বর্জন ও সন্ত্রাসী আন্দোলনের মুখে জননেত্রী শেখ হাসিনার সাহস, দৃঢ়তা, বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার জন্যই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইতিহাস একদিন লিখবে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এদেশে বার বার বন্দি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক ও বেসরকারি টেলিভিশন সত্য প্রকাশের ব্যাপারে বিশেষ অবদান রেখেছে।

সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশের জনগণই হচ্ছে প্রকৃত নায়ক। বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনা ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের’ নেত্রী হিসেবেই খ্যাতি লাভ করবেন। আর এ জন্যই গত চার দশকে গণতন্ত্রবিরোধী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বঙ্গবন্ধুকন্যাকে বার বার হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে। পরম করুণাময় বঙ্গবন্ধুকন্যাকে সকল বিপদ-আপদে রক্ষা করেছেন।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক।

শেয়ার করুন

শেখ হাসিনা: সাহস ও দৃঢ়তার নাম

শেখ হাসিনা: সাহস ও দৃঢ়তার নাম

শেখ হাসিনা যদি সাহস এবং দৃঢ় মনোভাবের পরিচয় দিয়ে দেশে না ফিরতেন তাহলে একদিকে মানুষ তার নেতৃত্বগুণের সমালোচনা করত, অপরদিকে জরুরি সরকারও তাদের অন্যায্য কাজ চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহ পেত। শেখ হাসিনাকে ভয় দেখানোর ক্ষমতা তাদের আছে– এটা বুঝলে তাদের আস্থা বাড়ত। ভয় দেখিয়ে শেখ হাসিনাকে যে কাবু করা যাবে না– এই বুঝ ৭ মে হয়েছিল জরুরি সরকারের নীতিনির্ধারকদের।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ মে তারিখটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। অনেকেই হয়ত ভাবতে পারেন ৭ মে এমন কী ঘটেছিল, যার জন্য তারিখটি লাল অক্ষরে লেখার মতো? ২০০৭ সালের ৭ মে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা চিকিৎসা শেষে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন। তিনি উন্নত চিকিৎসা নিতে লন্ডন গিয়েছিলেন, চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে আসবেন– এটাই তো স্বাভাবিক। এতে বিশেষ তাৎপর্য কী আছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ২০০৬-০৭ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একটু বিবেচনায় নিতে হবে।

২০০৬ সালে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ছিল। কিন্তু তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোটের নানা অপতৎপরতায় সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সংশয় দেখা দেয়। যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছা থেকে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার নানা অপকৌশলের দিকে হাঁটতে থাকে বিএনপি এবং তার মিত্র জামায়াতসহ অন্যরা। তবে সবকিছুর স্টিয়ারিং ছিল বিএনপির হাতে। অনুগত নির্বাচন কমিশন গঠন, ভুয়া ভোটার তালিকা তৈরি এবং পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার জন্য বিচারপতিদের চাকরির বয়সসীমা বাড়িয়ে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী গণতান্ত্রিক মহলে সন্দেহ তৈরি করে প্রকৃতপক্ষে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তোলা হয়। বিএনপি-জামায়াতের অভিসন্ধির বিরুদ্ধে শুরু হয় প্রতিবাদ-আন্দোলন। ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন বিএনপি কোনো কিছু তোয়াক্কা না করে তাদের বদমতলব বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে থাকে।

তারা এক সময়ের বিএনপি নেতা এবং তখন প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করতে চাইলে আওয়ামী লীগসহ অন্য দলগুলো আপত্তি জানায়।

কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হলে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়ে আন্দোলন শুরু করে। দেশে একটি অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হয়। জনমত উপেক্ষা করে বিএনপি তাদের লক্ষ্য পূরণে অগ্রসর হতে থাকে।

তাদের দুষ্টবুদ্ধির পৃষ্ঠপোষক হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। প্রবল আন্দোলনের মুখে মাহমুদ হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলে সবাইকে অবাক করে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন বিএনপির মদদে নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে ঘোষণা দেন। বিএনপির এসব একতরফা কর্মকাণ্ড দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে।

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠের আন্দোলনের ওপর জোর দেয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার শক্তি প্রয়োগের নীতি নিয়ে দেশকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। রাজপথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ঘ শুরু হয়।

এই অবস্থায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে কজন সেনাকর্মকর্তা বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে চাপ দিয়ে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য করেন। নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ড. ফখরুদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। দেশে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়।

ক্ষমতার মঞ্চ থেকে খালেদা জিয়ার বিএনপি অপসারিত হওয়ায় সাধারণভাবে মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়। সেনাবাহিনী সমর্থিত ফখরুদ্দীনের সরকার দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবে ধরে নিয়ে শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগ এই প্রক্রিয়ার পক্ষেই অবস্থান নেয়।

এরমধ্যেই কানসহ অন্য স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান শেখ হাসিনা। কিন্তু ধীরে ধীরে জরুরি সরকার এমন সব পদক্ষেপ নিতে শুরু করে, যা দেশে নতুন সন্দেহ ও বিতর্ক সৃষ্টি করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলে প্রাথমিকভাবে অনেকে সমর্থন করলেও কিছুদিনের মধ্যে এটা মনে হতে থাকে যে, ওই সরকারও বাড়াবাড়ি করতে শুরু করেছে।

রাজনীতিকদের ‘শিক্ষা’ দেয়ার একটি মনোভাব ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন গংয়ের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখা যায়। তারা শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে থাকে। সুশীল সমাজের একাংশ এবং দুএকজন সম্পাদক এ কাজে তাদের উৎসাহ জুগিয়ে সরাসরি অবস্থান নেন। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির ভেতর থেকেও দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার মতো কিছু নেতা পেতে জরুরি সরকারের অসুবিধা হয়নি।

নিজেদের নিয়ন্ত্রণ শক্ত করার নানামুখী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ষড়যন্ত্রের বিষয়টি আঁচ করতে শেখ হাসিনার অসুবিধা হয়নি। দেশের মানুষকে সংগঠিত করে দ্রুত একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আদায়ের গুরুত্ব বুঝেই শেখ হাসিনা সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ২০০৭ সালের ৭ মে দেশে ফিরে আসেন। বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে বিপুলসংখ্যক জনতা শেখ হাসিনার প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানান দেন।

শেখ হাসিনা যদি সাহস এবং দৃঢ় মনোভাবের পরিচয় দিয়ে দেশে না ফিরতেন তাহলে একদিকে মানুষ তার নেতৃত্বগুণের সমালোচনা করত, অপরদিকে জরুরি সরকারও তাদের অন্যায্য কাজ চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহ পেত। শেখ হাসিনাকে ভয় দেখানোর ক্ষমতা তাদের আছে– এটা বুঝলে তাদের আস্থা বাড়ত। ভয় দেখিয়ে শেখ হাসিনাকে যে কাবু করা যাবে না– এই বুঝ ৭ মে হয়েছিল জরুরি সরকারের নীতিনির্ধারকদের।

শেখ হাসিনা দেশে ফিরে দলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে জনমত গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের মাথায় হয়ত অন্য মতলব ছিল। তারা আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে তাদের অনুকূলে একটি রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে চেষ্টা করছিল।

ড. ইউনূস, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর মতো কিছু মানুষকে তারা পেয়েওছিল। কিন্তু শেখ হাসিনাকে মুক্ত রেখে, আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ বা অটুট রেখে তাদের পরিকল্পনা সফল করা যে সম্ভব নয়, সেটা বুঝেই ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আওয়ামী লীগ ভাঙার অপচেষ্টাও চলে ভেতরে ভেতরে। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যের সততা নিয়ে মানুষের মনে ততদিনে সন্দেহ তৈরি হয়ে গেছে। তুচ্ছ কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলযোগ পাকাতে গিয়ে সেনাসদস্যদের বাড়াবাড়ির প্রতিবাদে আন্দোলন গড়ে ওঠার ঘটনাটিও উল্লেখযোগ্য।

শেখ হাসিনাকে ১১ মাস আটক রেখে ২০০৮ সালের ১১ জুন মুক্তি দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসার জন্য তিনি আবার বাইরে যান এবং ৮ নভেম্বর দেশে ফিরে নির্বাচনি প্রচারে নেমে পড়েন।

২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে। আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ২০০৬ সালে ক্ষমতায় থাকার জেদে যেসব অপকৌশল অবলম্বন করেছিল তা দলটির জন্য বুমেরাং হয়েছে। ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়ে পরবর্তী সময়েও ভুল রাজনৈতিক কর্মসূচি, কৌশল এবং সহিংসতার পথ ধরে বিএনপি যে বড় খাদে পড়েছে তা থেকে আর উঠতে পারছে না।

আপসহীন, দৃঢ় মনোভাব এবং নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে মানুষের সঙ্গে থাকলে তার ফল খারাপ হয় না। কঠোরতা এবং নমনীয়তা– দুটোই রাজনীতির কৌশল। কখন কোনটা ব্যবহার করা হবে, সেটা নির্ভর করে ব্যক্তির বিচক্ষণতার ওপর। শেখ হাসিনা রাজনীতিতে কোন ধারার অনুসারী তা এতদিনে সবার কাছে স্পষ্ট হওয়ারই কথা। তার সাহস আছে, দৃঢ়তা আছে আর আছে মানুষের প্রতি গভীর দরদ।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ রাজনীতির সাধারণ নিয়মনীতি অনুসরণ না করে বার বার জটিলতা ও সংকট তৈরি করে কিন্তু শেখ হাসিনা ধৈর্যের সঙ্গে ঠাণ্ডা মাথায় তা মোকাবিলা করেন। তাই তিনি সবচেয়ে বেশি সময় ধরে সরকারপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে রেকর্ড তৈরি করেছেন। কেউ ইতিহাস দখল করতে চায়, কেউ চায় সৃষ্টি করতে। শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন ইতিহাসের স্রষ্টা, তেমনি শেখ হাসিনাও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিহাস তৈরি করেছেন, করছেন।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন

করোনায় প্রসূতির চিকিৎসাসেবা

করোনায় প্রসূতির চিকিৎসাসেবা

গর্ভবতী মা করোনা আক্রান্ত হলেও তা শিশুর মধ্যে ট্রান্সমিশনের সম্ভাবনা থাকে না। করোনায় আক্রান্ত মা নিশ্চিন্তে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন। তবে শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় মাকে অবশ্যই হাত ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার পোশাক ও মুখে মাস্ক পরতে হবে।

সন্তান লালনপালন নিয়ে মা-বাবার উদ্বেগের শেষ নেই। কতক্ষণ পর পর খাবার দেবেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবেন এসব নানা বিষয় নিয়ে ডাক্তার, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য, বন্ধুবান্ধব, বইপুস্তক আর ইন্টারনেট থেকে নানা রকম প্রচলিত ও আধুনিক পরামর্শ নিয়ে শিশুকে যত্নআত্তি ও উপযুক্ত শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করেন প্রথমত একজন মা। কিন্তু এই করোনাকালে অনেক কিছুই ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে।

প্রথমবার ছেলেকে কোলে নিয়ে কী করবেন, কী দেখবেন তাই ভেবে দিশেহারা রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা সদ্যপ্রসূত সন্তানের মা তাহসিন আজাদ নদী। গত ৭ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের ডা. হাফিজার তত্ত্বাবধানে ছেলে আরিয়ানের জন্ম। এই করোনাকালে গর্ভবতী নারীর চিকিৎসাসেবা যেমন ঝুঁকি ছিল, তেমনি ছিল তার শারীরিক অন্যান্য জটিলতা। তবে করোনা মহামারি কতদিন বিশ্বে স্থায়ী হবে তা কারোরই জানা নেই। তাই সময় সুযোগ বুঝে তারা সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন পারিবারিকভাবে পরিকল্পনা করেই। নদী বলেন, গর্ভাবস্থায় প্রথমদিকে শারীরিকভাবে কোনো সমস্যা ছিল না কিন্তু পরবর্তী সময়ে করোনায় আক্রান্ত হন।

ডাক্তার এ ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনে বা হোয়াটসঅ্যাপে প্রেসক্রিপশন ও পরামর্শ দিয়ে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। এই করোনাকালীন সময়ে সন্তানের ঝুঁকি এড়াতে ডাক্তার পরামর্শ দেন, মা মুখে মাস্ক পরে, হাত ধুয়ে এবং একটি পরিষ্কার কাপড় পরে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াবেন। বুকের দুধের মাধ্যমে নবজাতকের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। নিয়ম কানুন মেনে নদী শিশুসহ সুস্থ আছেন এবং ভাবছেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিশুর ৪৫ দিন বয়সে টিকা দিতে নিয়ে যাবেন টিকা সেন্টারে।

নদীর মতো আরও একজন সদ্য মা হয়েছেন রাজশাহীর কাদিরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মুসবাহ আলীম তিন্নি। আবেগ-আদর, ভালোবাসা ও আদর্শ দিয়ে শিশু সন্তান ‘গল্প’কে বড় করে তোলার সাধ্যের সবটুকুই রয়েছে এই নতুন মাকে ঘিরে। এই করোনার সময়ে গর্ভাবস্থায় প্রথমদিকে আতঙ্কিত হলেও ডাক্তারদের সহযোগিতায় সে ভয় কাটিয়ে ওঠেন। সরাসরি বা টেলিফোনে নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ পেয়েছেন। এখন মা ও শিশু দুজনেই সুস্থ আছেন। করোনা মহামারি ও লকডাউনের কারণে নিজের ও গর্ভের শিশু নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকেন রাজধানীর মিরপুরের মিসেস রাবেয়া খাতুন। ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা রাবেয়ার প্রথম সন্তানের বয়স আড়াই বছর। এবারে করোনাকালে গর্ভধারণ করায় বেশ কটি হাসপাতাল ও চিকিৎসকের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে রেখেছেন, তবে এখনও ডাক্তারের কাছে যেতে পারেননি। করোনার কারণে সবকিছুই এখন অনিশ্চিত মনে করছেন রাবেয়া। করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি, হাসপাতালগুলোয় রোগীদের চাপ, নিজের গর্ভকালীন জটিলতা সবকিছু মিলিয়ে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন ২৮ বছর বয়সি রাবেয়া।

দেশে করোনার সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে গর্ভবতী নারী বা অন্তঃসত্ত্বাদের চিকিৎসাসেবা নিয়ে রাবেয়ার মতো অনেকের মধ্যে হাসপাতালের নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ও প্রসবকালীন সেবা কীভাবে পাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

যদিও চিকিৎসকরা বলছেন, দুশ্চিন্তা না করে সঠিক পরিকল্পনা ও সচেতনভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে মহামারিতেও সংক্রমণ এড়িয়ে সুস্থ সন্তান জন্মদান সম্ভব।

এ বিষয়ে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হসপিটালের বিভাগীয় প্রধান (প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ) এবং করোনার অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম বলেন, করোনার প্রথমদিকে সন্তান না নেয়ার পরামর্শ দিলেও এখন আর তেমনটি ভাবছেন না, কারণ করোনা নির্মূলের কোনো সময়সীমা বোঝা যাচ্ছে না। তাই বিশেষ প্রয়োজন হলে সন্তান নিতে পারবেন। তিনি জানান, গর্ভবতী মায়েরা যেন ঠিকমতো চিকিৎসা পান সেজন্য রাজধানীসহ জেলা-উপজেলা এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্দেশনা দেয়া আছে। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে কোনো গর্ভবতী নারীর চিকিৎসা ব্যহত না হয়। তবে গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ৮টি ভিজিটের কথা থাকলেও এখন করোনাকালে ৪টা ভিজিটে কমিয়ে আনা হয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট ডাক্তারের সঙ্গে টেলিফোনে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

কোভিড ডেডিকেডেট হাসপাতালে গর্ভবতীদের জন্য নির্দিষ্ট একটা ইউনিট রাখার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তিনি আশার কথা শুনিয়েছেন যে, গর্ভবতী মা করোনা আক্রান্ত হলেও তা শিশুর মধ্যে ট্রান্সমিশনের সম্ভাবনা থাকে না। করোনায় আক্রান্ত মা নিশ্চিন্তে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন। তবে শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় মাকে অবশ্যই হাত ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার পোশাক ও মুখে মাস্ক পরতে হবে।

ডা. রওশন বলেন, প্রসূতি করোনায় আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসা কোথায় হবে, তা পরিবারকে জেনে রাখতে হবে। অর্থাৎ যেখানে গর্ভবতী মা ও শিশুর করোনা দু’টোরই চিকিৎসা হয়, সেরকম হাসপাতালগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কোভিড পজিটিভ গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে করোনা চিকিৎসা হচ্ছে এবং গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। দেশের সব হাসপাতালে নির্দেশনা দেয়া আছে, যদি গর্ভবতী নারীদের মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমণ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে চিকিৎসা দিতে হবে।

মহামারির সময়ে একজন গর্ভবতী নারী অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলবেন এবং হাসপাতালে সন্তান প্রসব করাবেন, এ বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান (স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ) থেকে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত এবং পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের সাবেক চেয়ারপারসন অধ্যাপক ডা. ফাতেমা আশরাফ। তিনি বলেন, এখন অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অনেকের মধ্যেই করোনার সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে। তাই যেসব দম্পতি সন্তান নেয়ার কথা ভাবছেন, যারা এখনও গর্ভবতী হননি, তাদের এ সময় গর্ভধারণ থেকে বিরত থাকাই ভালো। এমনকি প্রত্যেক নারীকে প্রয়োজনবোধে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতির ফ্যামিলি প্লানিং সার্ভিসকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। কারণ করোনা মহামারিতে বাড়ির বাইরে যেতে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ তেমনই ঝুঁকি নিয়েই গর্ভবতীকে নিয়মিত চেক আপের জন্য ডাক্তারের কাছে যেতে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে একজন গর্ভবতী নারীর চেক আপও যেমন জরুরি আবার মা ও সন্তানের সুস্থতার জন্য ঘরে থাকাও জরুরি।

এ সময়ে গর্ভবতীর পরিবারকেও খুব বেশি সচেতন থাকতে হবে। বাড়ির কাছাকাছি হাসপাতালের ইমার্জেন্সির নাম্বার জেনে রাখা উচিত কারণ হঠাৎ করে জটিলতা দেখা দিতে পারে, যেমন ব্লিডিং বা শিশুর নড়াচড়া বন্ধ, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, গর্ভের সন্তান ঠিকমতো বেড়ে উঠছে না বা রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন বা হাসপাতালে ভর্তি করতে হতে পারে। আর এজন্য পরিবারের উচিত ঘরে টাকা পয়সার জোগাড় ও প্রসূতির রক্তের গ্রুপ জেনে রাখা। মহামারির এই সময়ে গর্ভবতী নারীর জন্য আলাদা সুরক্ষাপ্রাচীর গড়ে তোলার দায়িত্ব তার পরিবারের।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গর্ভবতী অবস্থায় যদি কারো কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়, তাদের জন্য সরকারি কোভিড হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে এবং সন্তানসম্ভবাদের অগ্রাধিকারও দেয়া হচ্ছে।

করোনানকালে দুর্ঘটনাও ঘটছে, যেমন করোনায় আক্রান্ত একাত্তর টেলিভিশনের সহযোগী প্রযোজক রিফাত সুলতানা ১৬ এপ্রিল নবজাতক শিশুকন্যাকে জন্ম দিয়েই মারা যান।

যদিও গত বছর জাতিসংঘ শিশু তহবিল থেকে জানানো হয়, গত বছর ১১ মার্চ কোভিড-১৯ মহামারি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ৪০ সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ২৪ লাখ শিশুর জন্ম হবে। এই মহামারির প্রভাবে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা চাপের মুখে এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহপ্রবাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। ইউনিসেফ আশঙ্কা করেছে, প্রসূতি মা ও নবজাতকদের রূঢ় বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

শেয়ার করুন

বই-বিচ্ছিন্নতা ও অনিশ্চিত গন্তব্যযাত্রা

বই-বিচ্ছিন্নতা ও অনিশ্চিত গন্তব্যযাত্রা

এখন প্রজন্ম স্কুল-কলেজের দায় কিছুটা মেটাতে পারলেও ফেসবুক গ্রাসে তারা অনেকটাই বিপর্যস্ত। ক্লাসে অমনোযোগিতা বেড়েছে। টের পাই পেছনের দিকে বসা ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই স্মার্টফোনের বাটন টিপছে। অনেক বাবা-মাকে দেখি শিশু সন্তানটিকে ট্যাব কিনে দিয়ে ট্যাবাসক্ত করে দিয়েছেন। এদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা নিয়ে আমার শঙ্কা হয়। আর বইপড়ায় মনোযোগী করে তোলা তো হবে সাধনার ব্যাপার।

দিন কয়েক আগে শিক্ষামন্ত্রীর একটি বক্তব্য পড়ছিলাম কাগজে। তিনি চিরকালীন প্রয়োজনীয় কথাটি বললেন। শিক্ষার্থীদের সিলেবাসের বাইরেও নানা ধরনের বই পড়ার ওপর গুরুত্বারোপ করছিলেন তিনি। এমন একসময় তিনি কথাটি বললেন যখন আমাদের প্রজন্ম ক্রমাগত বইপড়া বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

গত বছর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আমার শিক্ষক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। একপর্যায়ে কথা প্রসঙ্গে কষ্টের সঙ্গে স্যার বলছিলেন বই-বিচ্ছিন্ন এই মূর্খের দেশে কী হবে! সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে বললেন সরকারি কর্মকর্তাদের একটি ট্রেনিং প্রোগ্রামে গিয়েছিলেন বক্তৃতা করতে। বক্তৃতার মাঝখানে লক্ষ করলেন কয়েকজন ঘুমাচ্ছেন। অন্যদের মনোযোগ কতটা আছে বুঝতে পারছিলেন না। তবুও এই বিপন্ন সময়ে বইপড়া কর্মসূচি, আলোর স্কুল পরিচালনা, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আলোকিত মানুষ গড়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন স্যার।

যখন আমরা দেখি স্কুল আর কলেজ লাইব্রেরির আলমিরা বছরজুড়ে তালাবদ্ধ থাকে তখন অনেক স্কুলে লাইব্রেরি-চর্চার সুযোগ করে দিচ্ছে স্যারের বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র। কিন্তু একটি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র আর একজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কতক্ষণ আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে এগিয়ে যাবেন!

ছেলেবেলায় স্কুলে বিজ্ঞান নিয়ে রচনা লিখতে গিয়ে এই মুখস্থবিদ্যা দিয়ে প্রায় সকলেই শুরু করতাম যে, ‘বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ আর কেড়ে নিয়েছে আবেগ।’ বড় হয়ে এ কথার তাৎপর্য খুঁজতাম। মাঝে মাঝে মনে হতো কথাটির মধ্যে যুক্তি আছে। আবার বড় একপেশে মন্তব্য বলেও মনে হতো। আমি অনেকদিন থেকে একটি গণ্ড গ্রাম খুঁজে বেড়াচ্ছি। এখনও কেউ সন্ধান দিতে পারেনি। যে গ্রামে বড় সংখ্যক মানুষ যাতায়াতের অব্যবস্থার কারণে রাজধানী দূরের কথা, নিজজেলা শহরেও কখনও আসেনি। বিদ্যুতের দেখা পায়নি। সন্ধ্যার পর হ্যারিকেন কুপির টিম টিমে আলোতে সন্ধ্যার অন্ধকার দূর করার চেষ্টা। রাত ৯-১০টার মধ্যে ঘুমে নিঝঝুম হয়ে যায় গ্রাম।

শহর থেকে কোনো আত্মীয় দৈবাৎ বেড়াতে গেলে যারা মনে করে অন্য গ্রহের মানুষ। পাড়া ভেঙে মানুষ দলে দলে এক নজর দেখতে আসে। দূরের আত্মীয় হলেও একবেলা অন্তত পিঠে খাওয়াতে না পারলে যেন কারো স্বস্তি নেই। আর বিদায়ের দিনে করুণ ছবি। সকলের মুখ ভার। পুরো গ্রামের বৌঝি, ছেলে-বুড়ো বিদায় জানাতে গ্রামের শেষ মাথা পর্যন্ত চলে আসত। এসব গ্রামে তখনও বিজ্ঞানের কোনো সুবিধা প্রবেশ করেনি। পাশাপাশি আবেগ ছিল বুক ভরা। আর সে আবেগের পুরো ছোঁয়াই তখন পাওয়া যেত।

আমার ছেলেবেলার এমন দুটো গ্রামের কথা এখনও মনে পড়ে। একটি আমার নানা বাড়ি বিক্রমপুরের ভাগ্যকুলের উত্তর বালাসুর গ্রাম। আর অন্যটি বড় বোনের শ্বশুরবাড়ি শরিয়তপুরের নড়িয়া থানার শাওড়া গ্রাম। আমার ছেলেবেলায় অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে আরও অনেক গ্রামের মতোই এই দুটো গ্রামে বিজ্ঞানের সুবিধাবঞ্চিত ছিল। আর তাই বোধ হয় আবেগে আপ্লুত ছিল সবাই। প্রাণের টান প্রচণ্ডভাবে অনুভব করতাম।

এখন রাস্তাঘাট হয়ে যাওয়ায় আর যানবাহনের সুবিধা বাড়ায় দেড় দুই ঘণ্টা গাড়ি চালিয়েই জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাস থেকে নানা বাড়ি যেতে পারি। আর শাওড়াতে আড়াই-তিন ঘণ্টায়। আজ এসব গ্রামে যেতে সড়ক পথ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। রেডিও, টেলিভিশন আর ফ্রিজ চলছে। সড়ক ব্যবস্থাপনা না থাকায় গ্রাম তখন ছিল অনেক দূর।

মনে পড়ে নারায়ণগঞ্জ ঘাট থেকে বিকেল বেলায় রকেট স্টিমার ছাড়ত। নাম ছিল ‘গোয়ালন্দ মেল’। অনেকটা রাত করেই ভাগ্যকুল ঘাটে ভিড়ত। এখান থেকে অন্তত দেড় কিলোমিটার দূরে উত্তর বালাসুর গ্রাম। দেখতাম আমাদের এগিয়ে নেয়ার জন্য ঘাট পর্যন্ত চলে আসত গ্রামের কমপক্ষে ২০-২৫ জন ছেলেবুড়ো। বিদায়ের সময়টিও প্রায় একই রকম। আজ এই গ্রামগুলোতে আত্মীয়-পরিজন আছেন ঠিকই। আদর আপ্যায়ন সাধ্যমতো করেনও। কিন্তু সেই আবেগটির আর খোঁজ পাওয়া যায় না। শহরের যান্ত্রিকতা তাদেরও গ্রাস করেছে।

ছেলেবেলায় দেখতাম স্কুল এবং পরিবারের ভেতরে ক্লাসের পড়াশুনার পাশাপাশি পাঠভ্যাস গড়ে তোলার প্রণোদনা থাকত। গ্রামে বা মহল্লায় পাঠাগার গড়ে তোলা হতো। বন্ধুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল কে কটা বই পড়তাম তা নিয়ে। আমাদের হাতে বিজ্ঞানের অনেক আশীর্বাদই এসে তখনও পৌঁছেনি। ফলে সময় কাটাতে স্কুলের বাইরে খেলাধুলা আর বইপড়া বিনোদনের অংশেই পরিণত হতে লাগল।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে রেডিওর পাশাপাশি বিটিভি কিছুটা বিনোদনের উৎস ছিল। তবে তা বইপড়ার অভ্যাস ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চাকে তেমন বিঘ্ন ঘটায়নি। বরং বলা যায় সাংস্কৃতিক আবহকে কিছুটা প্রণোদনাই দিয়েছে। একুশ শতকের শুরুর দিকে আমরা আকাশ-সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হলাম। দিনে দিনে অনেক টিভি চ্যানেল হলো। প্রাইভেট অনেক রেডিও সম্প্রচার শুরু করল।

চ্যানেলের কল্যাণে হিন্দি সিরিয়াল আর হিন্দি ছবি তরুণ প্রজন্মকে অনেকটাই বন্দি করে ফেলল। তখন এদের একটি বড় সংখ্যক পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি ছাড়া বই পাঠ আর নন্দনচর্চায় খুব একটা সময় বের করতে পারছিল না।

এবার দাবানলের মতো প্রবেশ করল ফেসবুক, টুইটার জাতীয় আধুনিক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম।

এখন প্রজন্ম স্কুল-কলেজের দায় কিছুটায় মেটাতে পারলেও ফেসবুক গ্রাসে তারা অনেকটাই বিপর্যস্ত। ক্লাসে অমনোযোগিতা বেড়েছে। টের পাই পেছনের দিকে বসা ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই স্মার্ট ফোনের বাটন টিপছে। অনেক বাবা-মাকে দেখি শিশু সন্তানটিকে ট্যাব কিনে দিয়ে ট্যাবাসক্ত করে দিয়েছেন। এদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা নিয়ে আমার শঙ্কা হয়। আর বইপড়ায় মনোযোগী করে তোলাতো হবে সাধনার ব্যাপার।

আমাদের স্কুলের শিক্ষার্থীদের আমরা অদ্ভুত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রিত জীবন উপহার দিয়েছি। ওদের কারো মুক্তচিন্তা করার মতো জীবন নেই। পাঠক্রম বহির্ভূত পাঁচটা বইয়ের খোঁজরাখার সময় ওদের নেই। ক্লাস, কোচিং আর পরীক্ষা এই তিনে আটকে গেছে জীবন। জিপিএ-৫ অর্জন ছাড়া ভবিষ্যতের আর কোনো স্বপ্ন নেই।

আমি করোনাকালের আগের কথা বলছি। শহরকেন্দ্রিক হাতে গোনা কয়েকটি কলেজ ছাড়া অধিকাংশ কলেজে শিক্ষক মনে করেন না রেগুলার কলেজে যেতে হয়। আর গেলেও ক্লাস নিতে হয় না। অপরদিকে শিক্ষার্থী মনে করে শিক্ষক নির্দেশিত নোট গাইড সংগ্রহ করার বাইরে ক্লাসে যাওয়ার খুব একটা আবশ্যকতা নেই। ফলে ক্লাসের বই বলতে যারা গাইড বই বোঝে তাদের কাছে পাঠবহির্ভূত বইয়ের খোঁজ রাখা বাতুলতা মাত্র।

বিশ্ববিদ্যালয়কে কি এ অবস্থা থেকে দূরে রাখা যাবে? আমার মনে হয় না। আকাশ-সংস্কৃতি আর ফেসবুক টুইটার সংস্কৃতির ভেতর অবগাহন করতে গিয়ে অনেকের কাছে বইপড়া উপদ্রব ধরনের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এখন তরুণদের অনেকেরই কানে হেডফোন আর হাতের মোবাইল সেটে অনবরত আঙুলের ছন্দময় দোলা। বইপড়ার সময় কোথায় ওদের?

ভোর বেলা হাঁটতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ছাত্রছাত্রীদের ভিড় দেখে নতুনভাবে আশাবাদী হয়েছিলাম। তাহলে নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা কি আবার লাইব্রেরিমুখী হতে শুরু করেছে! খোঁজ করে জানলাম বিষয়টা তেমন নয়। এখন লাইব্রেরিতে আসন পাওয়া ভার। বিসিএস বা অন্য কোনো চাকরিপ্রত্যাশীরা নিজেদের প্রস্তুত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বেলায় এসে লাইব্রেরিতে যাচ্ছে। ভাগ্যিস স্নাতক স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এখন আর তেমন লাইব্রেরিতে যাওয়ার সময় পায় না। নয়তো লাইব্রেরিতে স্থান সংকুলান না হওয়ার জন্য এতদিনে আন্দোলন শুরু করে দিত।

কলকাতা বই মেলার পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। আগে যখন ময়দানে বইমেলা হতো তখন অনেকবারই আমি বইমেলায় গিয়েছি। এখনকার তুলনায় ময়দানের বইমেলা অনেক বেশি জাঁকালো ছিল। দীর্ঘ লাইন ধরে টিকিট কেটে মেলায় ঢুকতে হতো।

আমি গত শতকের ৯০-এর দশকের কথা বলছি। আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে একটি স্মৃতি কথা অনেক লেখাতে লিখেছি। বলেছি লাখ লাখ বইপ্রেমিক মানুষকে দেখেছি যাদের অধিকাংশই হাতভরা বই কিনে বাড়ি ফিরছে। তখন আফসোস করে বলতাম, আহা, আমাদের একুশের বইমেলায় দর্শকদের অর্ধেকও যদি বই কিনত তাহলে আমাদের প্রকাশনার চেহারাটাই পালটে যেত।

২০১৭তে কলকাতা বইমেলায় গিয়ে দেখি অবস্থা পাল্টে গেছে। কলকাতা বইমেলা চলে গেছে সল্টলেকে। বড় বড় প্যাভেলিয়ন খুব কমই চোখে পড়ল। বাংলাদেশের প্রায় ত্রিশটি প্রকাশনা সংস্থার স্টল ঘিরে একটি আলাদা প্যাভেলিয়ন করা হয়েছে। বই ছাড়াও সেখানে রয়েছে নানা রকম খাবারের দোকান। তাঁত বস্ত্রের দোকান, আচার চাটনির দেকান। বইয়ের দোকানের চেয়ে এসব দোকানেই ভিড় তুলনামূলকভাবে বেশি। মেলা থেকে বই কিনে বাড়ি ফেরা মানুষের সংখ্যাও বেশ কমে গেছে।

আগে ‘অবসরে বইপড়া’ বলে একটি কথা ছিল। এখনতো ফেসবুক, টুইটার আর আকাশ-সংস্কৃতির চাপে অবসর বলে কোনো কিছু নেই। তাই অবসরে বইপড়াটি ক্রমে প্রজন্মের কাছে অচেনা হয়ে পড়ছে। আমি দেখেছি- অনুভব করেছি কলকাতা বইমেলার চেয়ে একুশের বইমেলার চরিত্র এবং আবেগ আলাদা। একুশের বইমেলা অনেক বেশি গোছাল।

বই প্রকাশ নিয়ে প্রকাশকদের পরিমার্জনাও একটু আলাদা। করোনাকাল বাদে অনেকগুলো বছর ধরেই মেলায় আসা মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় বইমেলার বড় অংশ এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আকর্ষণীয় স্টল সাজিয়ে বসেছেন প্রকাশকরা। সুখের কথা এখন প্রতি মেলায় ক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে। তবে এতে সারা দেশে যে বইপড়ার প্রবণতা বাড়ছে তা বলা যাবে না।

এদেশে নানা নীতি-নির্ধারণী খেলায় বিভ্রান্ত আমরা আসলে প্রজন্মকে বইমুখী করে তুলতে পারছি না। আমি দেশের অন্যতম নামি এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করি। আমি ক্লাসে খোঁজ নিয়ে জেনেছি এদের কমপক্ষে ৫ ভাগ ছাত্রছাত্রী একুশের বইমেলা সম্পর্কে তেমন পরিষ্কার কিছু জানে না। ৫ ভাগ ছাত্রছাত্রী জানে না কোথায় বসে একুশের বইমেলা।

প্রায় ৪০ ভাগ ছাত্রছাত্রী কখনও বইমেলায় যায়নি। এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি নিয়মের হাতে বন্দি। ক্লাস-পরীক্ষা দিতে দিতে এরা তিন মাসের সেমিস্টারে নোট আর হ্যান্ড-আউটের বাইরে যাওয়ার সময় পায় না। যারা সংবাদপত্র পড়ার ধারণাই হারিয়ে ফেলছে তারা পরীক্ষার অক্টোপাস বেস্টনির বাইরে গিয়ে কীভাবে বইপড়ার জগতে প্রবেশ করবে!

এভাবেই আমাদের প্রজন্ম জ্ঞানচর্চার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব যারা দেবে তাদের এমন বইপড়াবিমুখ জীবনে সঞ্চয় বেশি থাকার কথা নয়। সুতরাং ভয়ংকর এক ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে না? বিষয়টি নিয়ে সকল মহলের ভাবনা সম্প্রসারিত হলেই মঙ্গল।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন

ব্যাংক নিয়ে ভাবনা

ব্যাংক নিয়ে ভাবনা

ইদানিং পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই অনেকে ব্যাংকিং খাত নিয়ে এমন সব মন্তব্য করছেন যা আসলে বাস্তবতার কাছাকাছি নেই। এজন্য এদিকে আরও সতর্ক হতে হবে। যে কোনো সংবাদের হেডলাইনের শব্দচয়নে নজরদারি বাড়ানো উচিত। সার্বিক পরিস্থিতি মাথায় রেখে এ ক্ষেত্রে কথা বলা উচিত বলে আমি মনে করি।

বর্তমানে করোনার সময়ে যেখানে জীবন-জীবিকার প্রশ্ন চলে আসে সেখানে ব্যাংকগুলো একটা সেবা হিসেবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জীবন-জীবিকার মাঝখানে ব্যাংকিং সেবাটা একটা রসায়ন তৈরি করে। এ রসায়নের অপারেটর খাতে ব্যাংক। করোনা মেনে নিয়েই আমাদের কাজ করতে হবে। এক এক সময় এক এক ভ্যারিয়েন্ট বিভিন্ন রূপে আসবে।

করোনার এই সেনসিটিভ সময়ে ব্যাংকগুলো লাভের দিকে না তাকিয়ে তাদের সেবা ও সার্ভিস, ব্যাংকের বিভিন্ন পণ্য সামনে নিয়ে আসা উচিত। লাভমুখী না হয়ে সেবামুখী ব্যাংকিং ব্যবস্থা থাকা উচিত এ সময়ে।

এ সেবামুখী ব্যাংকিং করতে গেলে ব্যাংকগুলোকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় সক্ষম হতে হবে। কারণ, করোনার সময়ে গ্রাহকদের আসা-যাওয়া সমস্যা। এজন্য ক্যাশ ছাড়া বাকি সব কর্মকাণ্ড অনলাইনে হওয়া উচিত। তাহলে গ্রাহকের সেবা বাসা পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে। ঘর থেকে বের হওয়ার দরকার হবে না।

করোনা সাময়িক বলে মনে হচ্ছে না। এটা দশকের ব্যাপার। ব্যাংকগুলোকে তাদের নতুন নতুন বিনিয়োগ ডিজিটাল খাতে নিয়ে আসা উচিত। যাতে আগামীতে করোনার উত্থান-পতনের সময়ে ব্যাংকগুলো সঠিক সেবা ডিজিটালভাবে দিতে পারে সেটার চিন্তা করা উচিত।

এজন্য প্রত্যেক ব্যাংকের মালিকদের এক্ষেত্রে বিনিয়োগে খেয়াল রাখতে হবে। এটাকে খরচ আকারে চিন্তা না করে বিনিয়োগ মনে করতে হবে।

করোনার সময় ছাড়াও অর্থনীতিতে ব্যাংকিং খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা বাজেটের অর্থনীতি সঞ্চালনে ব্যাংকগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি। এজন্য ব্যাংকগুলোকে সেনসিটিভ খাত বলা হয়।

এ খাত নিয়ে প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে যারা ‍বিভিন্ন সময়ে কথা বলেন তাদের সম্মুখ জ্ঞান থাকা উচিত। এবং শব্দ চয়ন সঠিকভাবে করা উচিত। যাতে কোনো ব্যাংককে বিড়ম্বনায় না পড়তে হয়। এমন কোনো শব্দ বা এমন কিছু ব্যবহার করা উচিত নয় যেটা মার্কেটে প্যানিক সৃষ্টি করে। অন্তত এ সময়ে। কারণ, করোনার কারণে গ্রাহকেরা এমনিতেই সংকুচিত। তাদের প্যানিক থাকে ব্যাংকের সঞ্চয় নিয়ে। গ্রাহককে যদি আরো প্যানিক করে দেয়া হয়, তাহলে সেটা সঠিক কাজ হবে না।

ইদানিং পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই অনেকে ব্যাংকিং খাত নিয়ে এমন সব মন্তব্য করছেন যা আসলে বাস্তবতার কাছাকাছি নেই। এজন্য এদিকে আরও সতর্ক হতে হবে। যে কোনো সংবাদের হেডলাইনের শব্দচয়নে নজরদারি বাড়ানো উচিত। সার্বিক পরিস্থিতি মাথায় রেখে এ ক্ষেত্রে কথা বলা উচিত বলে আমি মনে করি।

ব্যাংকগুলো সমসময় সরকারের সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির আওতায় প্রচুর অনুদান দিয়ে থাকে। অন্য কোনো করপোরেট খাত সেটা দিতে পারে না। এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ও অনেক।

জীবনচক্রে ব্যাংক জড়িত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো মতামত বা অন্য কোনো ব্যাংক সম্পর্কে লিখতে গেলে এমনকিছু লেখা উচিত না যাতে গ্রাহকের আস্থা নষ্ট হয়।

সম্প্রতি একজন অর্থনীতিবিদ একটি জাতীয় দৈনিকে পদ্মা ব্যাংক ও ইস্টার্ণ ব্যাংক নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু এ দুই ব্যাংকের তুলনা করা যায় না। কারণ, ইস্টার্ণ ব্যাংক ৩০ বছর ধরে আছে। আর পদ্মা ব্যাংক তিন বছর। এর আগে পদ্মা ব্যাংককে একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত পরিস্থিতি থেকে সরকার পুর্নগঠন করে। সরকার ৬৮ শতাংশ এখানে বিনিয়োগ করে।

যখন বিসিসিআই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় তখন ইস্টার্ণ ব্যাংক সরকারি অনুগ্রহে গঠন হয়। তখন ওই ব্যাংকের ৪৮ দশমিক ৩৩ ভাগ আমানত মূলধনে চলে যায়। অর্থাৎ প্রায় ৫০ শতাংশ আমানত তারা ফেরত দিতে পারেনি এবং তা মূলধনে রূপান্তর করে। বাকি ৫০ শতাংশ আমানত পাঁচ বছরে ব্যাংকের অবস্থা ভালো হলে ফেরত দেবে কিনা বিবেচনা করা হবে বলে জানানো হয়। এমন অবস্থায় ইস্টার্ণ ব্যাংক গঠন করা হয়। আমানতকারীদের টাকা পেতে অনেক দেরি হয়। সরকার এ ব্যাংকের ২০ শতাংশ নিয়েছিল। আর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৩১ দশমিক ৬৭ ভাগ নেয়।

কিন্তু পদ্মা ব্যাংকের ৬৮ শতাংশ বা ৭১৫ কোটি টাকা সরকারি ব্যাংক ও ৩২ শতাংশ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়েছে। তিন বছরে ব্যাংক পুনর্গঠন করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে এ ব্যাংকে মাত্র ৩১ হাজার টাকা ছিল। ব্যাংকের ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৪ হাজার কোটি টাকায় ছিল মন্দমানে শ্রেণিকৃত ঋণ। এখান থেকে ব্যাংকের কোনো আয় ছিল না। কিন্তু ইস্টার্ণ ব্যাংকের মন্দ ঋণ কম ছিল। ফলে ঋণ থেকে তাদের ব্যাংকের আয় হতো।

এ সময়ে পদ্মা ব্যাংক গ্রাহকদের একটি টাকাও ধরে রাখা হয়নি। চাহিদামাত্র টাকা দেয়া হয়েছে। গ্রাহকরা সময়মতো আমানতে মুনাফা পেয়েছে।

যে কোনো ব্যাংকের সরকারি আমানত একটা বড় অংশ। সরকার যদি আমানত তুলে নিয়ে যায় সেক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সাময়িক বিপাকে পড়ে। তারমানে ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায় না। বড় বড় আমানত তুলে নিলে ব্যাংক বিপাকে পড়ে, কিন্তু এর মানে এটা নয় যে, ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে, টিকবে না। কারণ, সরকারি আমানত তুলে নেয়ার পর সাময়িক সমস্যা সামলে নেয়ার সক্ষমতা পদ্মা ব্যাংক ইতোমধ্যে তৈরি করেছে এবং এই সক্ষমতা অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এজন্য এসব কথা বলে জনগণের মধ্যে প্যানিক সৃষ্টি করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এজন্য কোনো বক্তব্য না বুঝে প্রচার করা ঠিক না। এতে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থার সংকট তৈরি হয়। আমাদের যারা লেখেন বা কথা বলেন তাদের এটা চিন্তা করা উচিত যে, আমরা কী লিখছি? কথাগুলো সব সত্যি না।

ব্যাংক বিনিয়োগ করতে না পারলে আয় হবে কোথা থেকে? ঋণ বিতরণ ব্যাংকের প্রধান কাজ। কিন্তু এতদিন পদ্মা ব্যাংকের ঋণ দেয়ার অনুমোদনও ছিল না। ২০২০ সালের জুনের পর ঋণ দেয়ার অনুমতি মেলে। আর আগের যে চার হাজার কোটি টাকা মন্দ ঋণ ছিল সেখানেও কোনো আয় ছিল না। এটা আরও ভঙ্গুর ব্যাংকে রূপান্তর হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমাদের দক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রচেষ্টায় পদ্মা একটি শক্তিশালী ব্যাংকে রূপান্তর হতে যাচ্ছে। ‍

আমাদের আগে ৮০ ভাগ খেলাপি ঋণ ছিল, সেটা কমে ৬৩ শতাংশে নেমে এসেছে। আমানত-ঋণের রেশিও আগে ছিল ১১৮ শতাংশ। এখন সেটা কমে হয়েছে ৯৩ শতাংশ। এছাড়া মূলধন ৪০০ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। বর্তমানে ৬ হাজার কোটি টাকার উপরে আমানত রয়েছে। গ্রাহকদের আস্থা রয়েছে বলেই এ অর্জন সম্ভব হয়েছে।

এসব কারণে পদ্মা ব্যাংক ভালো উন্নতি করেছে।

বর্তমানে করোনার কারণে ঋণ নেয়ার হার খুব কম। আমাদের ১১ ধরনের আমানত স্কিম আছে। ঋণ বিতরণেও বিভিন্ন স্কিম রয়েছে, কিন্তু করোনার কারণে এসব থমকে আছে।

শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ ছোট ব্যাংকগুলোকে সহযোগিতার জন্য দেয়া উচিত। এক ধরনের গ্যারান্টি স্কিম করা যেতে পারে। এটার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

শেয়ার করুন