ইন্দ্রমোহন রাজবংশী: সঙ্গীতাকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

বাংলাদেশের একমাত্র সঙ্গীত বিষয়ক পত্রিকা ‘মাসিক সঙ্গীত পত্রিকা’র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। তার একটি ধারাবাহিক লেখা ‘লোকসঙ্গীতের ক্রমবিবর্তন’ প্রকাশিত হয় সঙ্গীত পত্রিকায়। এই লেখাটির ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি জার্মানি থেকে একটি পুরস্কারও পেয়েছেন।

ইন্দ্রমোহন রাজবংশী বাংলা লোকগানের জনপ্রিয় একজন কণ্ঠশিল্পী। লোকগান ছাড়াও তিনি নজরুল সঙ্গীত, গণসঙ্গীত এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতসহ সঙ্গীতের অন্যান্য শাখার গান করেছেন। সঙ্গীত চর্চার পাশাপাশি তিনি একজন গীতিকবি ও সুরকারও ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। বাংলাদেশ লোকসংগীত পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং গীতিঅঙ্গন নামের সঙ্গীত বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশের একমাত্র সঙ্গীত বিষয়ক পত্রিকা ‘মাসিক সঙ্গীত পত্রিকা’র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। তার একটি ধারাবাহিক লেখা ‘লোকসঙ্গীতের ক্রমবিবর্তন’ প্রকাশিত হয় সঙ্গীত পত্রিকায়। এই লেখাটির ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি জার্মানি থেকে একটি পুরস্কারও পেয়েছেন।

২০১০ সালে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘কালজয়ী আব্বাসউদ্দিন’ নামে আরেকটি গ্রন্থ্। পরবর্তীতে কাজ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং লোকসঙ্গীতের বাংলাদেশ নামে দু’টি বিষয় নিয়ে।

১৯৬৭ সালে ‘চেনা অচেনা’ চলচ্চিত্রে গাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা সিনেমায় প্লে-ব্যাকে অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর তিনি ‘নয়নমণি’সহ আরও বেশ কিছু চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন। নয়নমণি চলচ্চিত্রে ‘কাঁদিস কেন মন’ গানটির জন্য তিনি বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেন।

তিনি পাকিস্তান আমল থেকে এ পর্যন্ত অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে আছে- একুশে পদক, ওয়ার্ল্ড মাস্টার অ্যাওয়ার্ড, শিল্পাচার্য পুরস্কার ও শব্দসৈনিক সম্মাননাসহ অসংখ্য পদক ও পুরস্কার।

জন্ম ও পরিবারের কথা

মরমী লোকসঙ্গীতশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার নবীন চন্দ্র রাজবংশী আর পূর্ণশশী রাজবংশীর প্রথম সন্তান ইন্দ্রমোহন রাজবংশী। ঠাকুরদা কৃষ্ণমোহন রাজবংশীও ছিলেন গানপাগল মানুষ। লোকসঙ্গীতের জগতে ঠাকুরদা কৃষ্ণ সাধু আর বাবা নবীন সাধু নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। তাদের পৈত্রিকভিটা ঢাকা জেলার খিলগাঁও থানার দাসেরকান্দি গ্রামে। তখন অবশ্য তেজগাঁও থানার মধ্যেই পরতো।

বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান বলে মা তার জন্মের আগেই নাইওর চলে যান বাবার বাড়ি বালাপুর গ্রামে। সেখানেই দেশবিভাগের (ভারত-পাকিস্তান, ১৯৪৭ সাল) কাছাকাছি একটি সময়ে ২৬ জানুয়ারি জন্ম হয় ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর। তারা ছিলেন সাতভাই আর এক বোন। ফলে গ্রামে সবাই তাদের সাতভাই চম্পা বলেই ডাকতেন। এই সাতভাই এক বোন চম্পার মাঝে ছোট দুই ভাই তাদের শৈশবেই বসন্ত রোগে মৃত্যুবরণ করেন।

শৈশবে দেখা গ্রামের দিনগুলো

তিনি যখন ছোট ছিলেন তখন বিনোদনের জন্য তেমন কোনো উপকরণই ছিল না। বিনোদন বলতে পড়াশোনার পর খেলাধুলাই ছিল তাদের একমাত্র উপায়। আর গ্রামের প্রকৃতিও ছিল উদার। চারিদিকে খোলা মাঠ, সবুজে ছাওয়া গাছ-গাছালি। সারাদিন মাঠে খেলেছেন, গাছে চড়েছেন, নদীতে সাঁতার কেটেছেন। এই খেলাধুলা আর দুষ্টুমির জন্য বাবা-মায়ের কাছে বকা আর মার খেয়েছেন প্রচুর। কিন্তু খেলা বন্ধ হয়নি কখনও।

সঙ্গীতে-শিক্ষায় বেড়ে ওঠা

বাল্যকাল থেকেই তার সঙ্গীতের প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল। বাবা যখন গান করতেন তখন ২/৩ বছরের ইন্দ্র মন্দিরা হাতে বাবার পাশে বসে পড়তেন। ওই সময় থেকেই মন্দিরা বাজানোয় খুব পাকা ছিলেন। এভাবে বেশ কয়েক বছর কাটে।

যখন পাঁচবছর বয়স তখন বাবার এক দুঃসম্পর্কীয় চাচা কেষ্টমোহন বাবাকে তার সম্পর্কে বলেন। তিনি অনেকদিন ধরেই ইন্দ্রকে খেয়াল করছিলেন। বাবাকে তিনি জানান, ইন্দ্রর গলা ভীষণ মিষ্টি। ওর গলায় সুরও ভালো আছে। তখন বাবা তাকেই ইন্দ্রকে গান শেখানোর ভার দিলেন। ফলে গানে তার হাতে খড়ি শুরু হয়ে যায় দাদা কেষ্ট সাধুর কাছে। তিনি তাকে লোকসঙ্গীতে তালিম দিতে শুরু করেন।

গানে তালিম নিতে নিতেই তাদের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়া শুরু করেন। এরই মধ্যে কখন যে নিজেই অনুষ্ঠানে গান গাইতে শুরু করেন তা আর আজ মনে পড়ে না। তবে স্মৃতির মাঝে যে আজও আছে, সবসময়ই থাকবে সেটা হলো লোকগানের সম্রাট আব্দুল আলীমের সামনে গান করার স্মৃতি।

ছোটবেলা থেকেই তার একটি স্বভাব ছিল, তাকে কেউ গান করতে বললেই তিনি কোনোরকম সংকোচ না করেই গান শুরু করতেন। তখন তার মাত্র ৬/৭ বছর বয়স। তাদের এলাকার একটি স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলার প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আব্দুল আলীম এসেছেন। তিনিও সেই অনুষ্ঠানে গান করবেন।

ছোট্ট ছিলেন বলে তাকে একটি টেবিলের ওপর দাঁড় করিয়ে সামনে মাইক্রোফোন দেয়া হলো। সামনে লোকসঙ্গীতের এতো বড় পণ্ডিত বসা। কিন্তু তিনি কোনো রকম দ্বিধা না করেই তারই একটি গান গাইতে শুরু করেন।

তখন রোজার মাস মাত্র শেষ হয়েছে। তিনি ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি করেন। আব্দুল আলীম তন্ময় হয়ে তার গানটি শুনলেন। গান শেষে তিনি ছোট্ট ইন্দ্রকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়েছিলেন। এভাবেই তার সঙ্গীতগুরুর সঙ্গে পরিচয়।

পরবর্তী সময়ে খিলগাঁও স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় স্কুলেরই আরেক শিক্ষক শামসুদ্দিন সাহেবের মাধ্যমে নতুন করে পরিচয় ঘটে আব্দুল আলীমের সঙ্গে। তখন আবার তার কাছে লোকসঙ্গীতে তালিম নিয়েছেন। গানে তালিম নেয়ার পাশাপাশি তিনি স্কুলজীবন শুরু করেন দাসেরকান্দি গ্রামেরই ত্রিমোহিনী প্রাইমারি স্কুলে। এই স্কুল থেকেই প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষায় তিনি পুরো ঢাকা জেলায় প্রথম হন।

ছোটবেলা থেকেই তিনি বেশ মেধাবী ছিলেন। কিন্তু তাদের এলাকায় কোনো হাইস্কুল না থাকায় ভর্তি হলেন কে. এল. জুবিলি হাই স্কুলে। দাসের কান্দি গ্রাম থেকে ওয়ারি কে.এল. জুবিলি স্কুলে যাওয়া অনেক লম্বা পথের আর সময়ের ব্যাপার ছিল। তাই তখন তিনি চলে গেলেন ওয়ারিতে তারই এক আত্মীয় নরেণ কাকুর বাসায়।

সেখানে কিছুদিন পড়ার পর সেই নরেণ কাকুর বাবা মারা গেলে তিনি চলে এলেন বাড়িতে। ঠিক সেই সময় তার পরিচয় ঘটে খলিলুর রহমান নামে এক কলেজ ছাত্রের সঙ্গে। খলিলুর রহমান তার প্রতিভায় ভীষণ মুগ্ধ। এতো ভালো গান করে, পড়াশোনায়ও ভালো। তিনি তখন তাকে নিয়ে গেলেন নরসিংদিতে।

সেখানে ননী গোপালের বাড়িতে লজিং থেকে ব্রাহ্মণদী হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। তখন তিনি ক্লাস সিক্সের ছাত্র। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি ওই বাড়ির গৃহকর্তার ছোট দুই ছেলে-মেয়েকে পড়াতেন। নরসিংদিতে দুই বছর থাকার পর ঢাকায় নিজের গ্রামে চলে এসে ভর্তি হলেন সিদ্ধেশ্বরী বালক বিদ্যালয়ে। এখান থেকেই মেট্রিক পাস করেন। ভর্তি হন সলিমুল্লাহ কলেজে। সেখান থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে আবার ১৯৬৩ সালে মিউজিক কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে আই মিউজ ও বি মিউজ করেন।

সঙ্গীত চর্চা ও কর্মজীবন

১৯৫৮ সালে ভর্তি হন বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে। এখানে নজরুল সঙ্গীতের ওপর চার বছরের একটি কোর্সে তালিম নেন। পাশাপাশি মেট্রিক পাস করার পরই তিনি খিলগাঁও স্কুলের প্রাইমারি শাখায় বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যে শিক্ষকতা শুরু করেন। দিনে সেখানে পড়াতেন। ইন্টারমিডিয়েট করেই আবার ভর্তি হলেন সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ে রাতের শিফটে।

তার শিক্ষক ছিলেন তারই গুরু আব্দুল আলীম। এরমাঝে ১৯৬৫ সালে নিখিল পাকিস্তানের সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভ করার পর টেলিভিশন এবং রেডিওতে সরাসরি বি গ্রেডের শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে যান। রেডিও-টিভিতে গান করছেন। আবার সঙ্গীত কলেজে পড়ছেন। তখন শিল্পী আব্দুল আলীম মহাব্যস্ত একজন লোকসঙ্গীত শিল্পী। প্রায় প্রতিদিনই তার কোথাও না কোথাও গানের অনুষ্ঠান থাকতোই।

তার অনুপস্থিতিতে তখন সঙ্গীত কলেজে লোকসঙ্গীতের অনেক ক্লাসই ইন্দ্রমোহন রাজবংশী নিতেন। এমনকি তৃতীয়, চতুর্থ বর্ষের ক্লাসও তিনি দ্বিতীয় বর্ষে থাকতে নিয়েছেন। কারণ তখন তিনি রেডিও, টিভির এ গ্রেডের একজন শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে গেছেন। এভাবে সঙ্গীত কলেজের ছাত্র থাকাকালীন থেকেই তিনি সেখানকার শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিতে থাকলেন।

১৯৭৪ সালে তিনি খিলগাঁও স্কুলে চাকরিটি ছেড়ে পুরোপুরিভাবে সঙ্গীত কলেজে যোগ দেন। ২০০৯ সালে এই কলেজের লোকসঙ্গীত বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণের পর আবার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিক হিসেবে দুই বছর চাকরি করেন।

মুক্তিযুদ্ধ পর্ব

১৯৭০ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় তারই আরেক সঙ্গীতগুরু হাফিজুর রহমানের লেখা ১২টি গণসঙ্গীত রেকর্ড করেন তিনি এবং রথীন্দ্রনাথ রায়। দেশকে নিয়ে, আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ওটাই ছিল প্রথম প্রকাশিত কোনো অডিও অ্যালবাম।

এই অ্যালবামটি প্রকাশ নিয়ে বেশ ঘটনা আছে। গানগুলো তারা করার পর কীভাবে রেকর্ড প্রকাশ করা হবে উপায় পাচ্ছিলেন না। তখন ডিস্ক আসতো ভারত থেকে। এই ডিস্ক পাবার উপায় একমাত্র এইচএমভি স্টুডিও। তখন বাংলাদেশে এইচএমভি’র প্রধান ছিলেন কলিম শরাফী।

একদিন তারা তার টিকাটুলির অফিসে গিয়ে সব খুলে বললেন। কলিম শরাফী ছিলেন দুর্দান্ত সাহসী একজন শিল্পী। তিনি তখনই একটি নোট লিখে পাঠালেন যে এটি দেশাত্ববোধক গানের একটি অ্যালবাম। জরুরি এক লাখ প্রিন্ট পাঠাতে হবে। এই নোট পড়েই আর কেউ কোনো প্রশ্ন না করে এক লাখ কপি পাঠিয়ে দেন।

এই অ্যালবামের একটি কপি তিনি এবং রথীন্দ্রনাথ রায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গিয়ে দিয়ে আসেন। তখন তারা দুজন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একটি ছবিও তুলেছিলেন। যেটি পরদিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯৭১ সালে তিনি একটি কাজে নরসিংদী যাওয়ার পথে পাক সেনার হাতে ধরা পড়েন। সেদিন তার ব্যাগে ওই ছবিটিও ছিল। কিন্তু নানা কৌশলে তাদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে যান। এরপর তিনি চলে যান মুক্তিযুদ্ধে। অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতে প্রশিক্ষণ শিবিরে গেছেন। সেখানে এক বিকেলে বসে গান করছিলেন। তার গান শুনে সবাই অবাক হয়ে যান। আসলে অনেকেই তাকে নামে চিনতেন কিন্তু চেহারায় চিনতেন না। ফলে গান করেন কি না জানতে চাইলে তিনি জানান তিনিই ইন্দ্রমোহন রাজবংশী।

এরপর আর তার অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেয়া হলো না। তিনি যোগ দিলেন শব্দসৈনিক হিসেবে। তার গান মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করে তুলতো।

চলচ্চিত্রে প্লে ব্যাক

ইন্দ্রমোহন রাজবংশী প্রথম প্লেব্যাক করেছিলেন ১৯৬৭ সালে চেনা অচেনা ছবিতে। ওই ছবিতে সত্য সাহার সুরে তার সঙ্গীতগুরু আব্দুল আলীমের সঙ্গে একটি গান করেছিলেন। এরপর তিনি ‘নয়নমণি’সহ আরও বেশ কিছু চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন। নয়নমণি চলচ্চিত্রে ‘কাঁদিস কেন মন’ গানটির জন্য তিনি বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি ৭৫টির বেশি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন।

সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান

ইন্দ্রমোহন রাজবংশী বাংলাদেশ লোকসংগীত পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি গঠন করেন। পাশাপাশি ২০০৫ সাল থেকে গীতিঅঙ্গন নামে আরও একটি সংগঠনে কাজ শুরু করেন।

গানের অ্যালবাম

অ্যালবাম বের করার ব্যাপারটি কখনোই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়নি ইন্দ্রমোহন রাজবংশীর কাছে। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান- ‘আমি শিল্পী, পাশাপাশি শিক্ষক। লোকগানের শিল্পী তৈরি করার দিকটাতে বেশি জোর দিয়েছি। তবে বছর তিরিশেক আগে রেডিওতে আমার কিছু গান নিয়ে কারা যেন একটি অ্যালবাম করেছিল। ইদানীং অনেকেই আমাকে অ্যালবাম করার জন্য অনুরোধ করছে। আমিও ভেবেছি, বিভিন্ন ছবিতে আমার গাওয়া গানগুলো নিয়ে পর্যায়ক্রমে চারটি অ্যালবাম করব। কারণ চলচ্চিত্রে আমার গাওয়া অনেক জনপ্রিয় গান রয়েছে। এগুলো একসময় হারিয়ে যাবে কিংবা বিকৃত হবে।’

গীতিকার ও সুরকার

লোকসঙ্গীতের পাশাপাশি একজন গীতিকার ও সুরকার হিসেবে ইন্দ্রমোহন রাজবংশী বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। শিশুতোষ গানের অভাব ও গুরুত্ব অনুভব করে তিনি বিভিন্ন সময় বেশ কিছু শিশুতোষ গান লিখেছেন ও সুর দিয়েছেন। তার লেখা ১২টি গান নিয়ে একটি অডিও অ্যালবাম ‘রাঙা পুতুল’ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির জগতের পুরোধাদের নিয়ে তিনি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বেশ কিছু গান রচনা করেছেন।

ব্যক্তিজীবন

ইন্দ্রমোহন রাজবংশী স্ত্রী দীপ্তি রাজবংশীর সঙ্গে সংসার জীবন শুরু করেন ১৯৭৪ সালে। দীপ্তি রাজবংশী নিজেও একজন লোকসঙ্গীত শিল্পী। সঙ্গীত চর্চার পাশাপাশি তিনি শহীদ ফারুক গার্লস হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সঙ্গীতশিল্পী দম্পতির দুই সন্তান। বড় মেয়ে সঙ্গীতা জাপান থাকেন। আর ছেলে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। দু’জনই সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত।

আরও পড়ুন:
কণ্ঠযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশী মারা গেছেন

শেয়ার করুন

মন্তব্য

লকডাউন, জীবন-জীবিকা ও সরকারের দায়বদ্ধতা

দেশের এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার অনুমোদন পেতে তিন দিন লাগাটা এই মুহূর্তে সবার জন্য কত যে ক্ষতিকর, তা হয়তো আইনপ্রণয়নকারীরা বুঝতেই পারেননি। এ ছাড়া তাড়াহুড়ো করে যে ঘোষণাগুলো দেয়া হলো, সেগুলোও ছিল অত্যন্ত খাপছাড়া ও অকার্যকর।

২০২০ সালে প্রথমবার করোনা হানা দিলে মানুষ যেমন ভয় পেয়েছিল, তেমনি সরকারও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তা মোকাবিলার চেষ্টা করেছিল। সরকার সে সময় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে লকডাউনের বিকল্প ব্যবস্থা নেয় ও পাশাপাশি মানুষের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য প্রণোদনা ঋণের ব্যবস্থাও নেয়। যদিও এসব ব্যবস্থায় নানান ভুলত্রুটি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে।

সে সময় সরকার ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঠিক করতে তেমন কিছু না করতে পারলেও মানুষকে ঘরে আটকে রাখার জন্য বেশ কিছু কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছিল। পাশাপাশি প্রতিদিন প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রত্যেক জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা করে এলাকাভিত্তিক সমস্যা সমাধানের যথেষ্ট চেষ্টা করেন।

এবার ২০২১-এর মার্চ মাসে করোনার তৃতীয় ঢেউ আঘাত হানল। মার্চের মাঝামাঝি থেকে সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা এমনভাবে বাড়তে শুরু করল যে বুঝতে বাকি রইল না, এবারের ধাক্কাটা আরও ভয়াবহ হবে। মার্চের শেষ সপ্তাহে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি এক ভয়াবহ রূপ নিল, কিন্তু কেন যেন সরকারকে অত্যন্ত নির্লিপ্ত দেখা গেল।

করোনার ঊর্ধ্বগামী পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচণ্ড হইচই শুরু হলে সরকার সংবিৎ ফিরে পেলেও কেমন যেন এলোমেলো আচরণ শুরু করে। যখন মানুষ জীবন বাঁচানোর জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছোটাছুটি শুরু করে তখন হঠাৎ করেই সরকার সাত দিনের জন্য লকডাউনের ঘোষণা দেয়। কিন্তু যেদিন থেকে লকডাউন শুরু হওয়ার ঘোষণা দেয়া হলো, বলা হলো তার তিন দিন পর সেই লকডাউনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দেবেন।

দেশের এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার অনুমোদন পেতে তিন দিন লাগাটা এই মুহূর্তে সবার জন্য কত যে ক্ষতিকর, তা হয়তো আইনপ্রণয়নকারীরা বুঝতেই পারেননি। এ ছাড়া তাড়াহুড়ো করে যে ঘোষণাগুলো দেয়া হলো, সেগুলোও ছিল অত্যন্ত খাপছাড়া ও অকার্যকর। যেমন একদিকে বইমেলা চালু, অন্যদিকে দোকানপাট বন্ধ, আবার অফিস-আদালত খোলা তো পরিবহন বন্ধ, অটোরিকশা, রিকশা, বাস সব চালু তো রাইড শেয়ার বন্ধ, কলকারখানা খোলা তো হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ।

সব মিলিয়ে সংক্রমণ রোধে যে মানুষকে ঘরে থাকতে বাধ্য করতে হবে এবং শহরে জনসমাগম রোধ করতে হবে, সেই ব্যবস্থা নেয়ার কোনো লক্ষণই দেখা গেল না। বরং হঠাৎ করে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করে দোকানপাট ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্তের জীবন-জীবিকার পথ রুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, যার প্রতিবাদে মানুষ পথে নেমে আন্দোলন শুরু করল।

সরকারের পক্ষে এই পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ল। এই অবস্থায় সংক্রমণ যখন হু হু করে বাড়ছে তখন বাধ্য হয়ে সরকার আবার দোকানপাট সবকিছু খুলে দিল।

গত বছরের শুরুতে করোনার প্রথম ধাক্কায় অর্থনীতি ধরে রাখতে সরকার প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছিল, যা পুরোটাই ছিল এক প্রহসন। এই অর্থ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কোনো কাজেই আসেনি।

সব ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ হওয়া দুর্দশাগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য বরাদ্দকৃত ওই প্রণোদনার অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারের ভুল নীতির কারণে ব্যাংকগুলো যা করেছে সে কথা উল্লেখ না করলেই নয়; ১) ব্যাংক ক্লায়েন্ট সম্পর্কের ভিত্তিতে এই প্রণোদনা ঋণ দেয়ার সরকারি নির্দেশ থাকার কারণে ব্যাংকগুলো শুধু তাদের ঘনিষ্ঠ ক্লায়েন্টদের এই সুবিধা দিয়েছে। ২) আরেক শ্রেণির লোকদের ব্যাংক ঋণ দিয়েছে, যা দিয়ে তারা নিজেদের পুরনো খেলাপি ঋণের খাতা পরিষ্কার করেছে। অর্থাৎ আগে যারা খেলাপি ছিল তাদের এই প্রণোদনা ঋণ অনুমোদন করে সেই অর্থ দিয়ে তাদের আগের ঋণের টাকা সমন্বয় করে ব্যবসায়ীদের খালি হাতে বিদায় করেছে। ৩) ঋণ বিতরণের সময় সরকারের প্রণোদনার ৪% এর ঋণের অংকের সঙ্গে নিজেদের ৯% এর অংকের সমপরিমাণ অর্থ ঋণ নিতে বাধ্য করেছে বিপদগ্রস্ত লোকদের। এর ফলে ঋণ গ্রহিতাকে সুদের হার গুণতে হয়েছে ৬.৫% এবং এর সঙ্গে সরকারের দেয়া ভর্তুকির ৪% নিয়ে ব্যংকগুলো চাতুর্যের সঙ্গে ঠিকই ১০.৫% লাভ করে নেয়। এই ঠকবাজির মধ্যে পড়ে প্রণোদনার অর্থ ব্যবসায়ীদের সামান্যতম কাজেও আসেনি। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো দেশে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি যারা, অর্থাৎ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যারা, তারা ব্যাংক পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারেনি।

এখন আলোচনায় আসা যাক, বর্তমান লকডাউন বা সাধারণ ছুটি বিষয়ক সংকট সমাধানের উপায় নিয়ে। সরকারের এত বিশেষজ্ঞ, এত উপদেষ্টা, এত পরামর্শক আছেন, অথচ তাদের কেউ প্রত্যেক নাগরিকের কথা চিন্তা করে এই সংকট সমাধানের উপায় বের করার বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ সরকারকে দেননি। এবার দেখা যাচ্ছে সরকার যেন করোনার কাছে এক ধরনের অসহায় আত্মসমর্পণই করেছে।

তবে আমাদের বাঁচতে হলে এই মুহূর্তে সব কিছু বন্ধ করে সবাইকে ঘরে ঢোকানো ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই তা মানতেই হবে।

যদি সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে দেশের করোনা সংক্রমণ রোধে সবাইকে ঘরে আটকে সৎ নিয়তে সবাইকে ভালো রাখতে চায় তাহলে গত বছর যেই অর্থ বরাদ্দ দিয়েছিল তার চেয়ে কম অর্থেই অত্যন্ত সফল ভাবে তা করতে পারবে।

দেশে ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর মোট সংখ্যা প্রায় এক কোটি ও দেশের সব শহরে ব্যবসায় নিয়োজিত কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি মানুষ। দেশে অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যাদের পুঁজি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা, তাদের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী যাদের পুঁজি এক লাখ টাকা থেকে ৬০ লাখ টাকা, তাদের সংখ্যা ২০ লাখ। এবং ১ কোটি টাকার চেয়ে বেশি পুঁজির ব্যবসায়ীর সংখ্যা ২০ লাখ। সেই হিসেবে প্রাথমিক ভাবে এক মাসের জন্য লকডাউন দিলে সরকার যদি ৬০ লাখ অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৮ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়, তাহলে ৪৮০ কোটি টাকা দিতে হবে, আর ২০ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের যদি তাদের কর্মচারীদের অর্ধেক বেতন, প্রতিষ্ঠানের ভাড়া পাশাপাশি নিজেদের জীবন ধারণের জন্য ১ লাখ টাকা করে প্রদান করা হয় তাহলে সরকারকে ২০ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে।

এর বাইরে অন্যান্য পেশার মানুষ ও হতদরিদ্র যারা বিভিন্ন শহরে জীবিকার সন্ধানে আসে তাদের সহায়তার জন্য আরো ৫ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে অর্থাৎ সব মিলিয়ে এক মাসে মোট সর্বোচ্চ ৩০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন, আর যদি তা কোনো কারণে দুমাস টানতে হয় তাতে ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। এর বাইরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণের কিস্তি প্রদান বিলম্বসহ অন্যন্য আর্থিক সুবিধার ব্যবস্থা নিয়ে সংকট নিরসনের পদক্ষেপ নিতে পারে। অনুদানের অংক এই ক্রান্তিকালীন সময়ে সবাইকে রক্ষার জন্য সরকারের কাছে কিছুই নয়। এই টাকা দেশ থেকে প্রতি বছর বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া টাকা অথবা খেলাপি ঋণের টাকার চেয়ে অনেক কম। পক্ষান্তরে সরকার এই টাকা দিয়ে সবার জীবিকার ব্যবস্থা না করলে শক্ত লকডাউন কার্যকর করা কখনোই সম্ভব হবে না।

সরকার যদি লকডাউন পরিস্থিতি সুন্দরভাবে মোকাবেলা করতে চায় তাহলে তাকে প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে সুষ্ঠু ও বাস্তবসম্মত নির্দেশ প্রদান করতে হবে। যেমন যারা বাসা, দোকান বা অফিস ভাড়ায় জীবিকা নির্বাহ করেন তাদের বিষয়টিও দেখতে হবে। দেখা যায় করোনার উসিলায় অনেক অসাধু ভাড়াটিয়া মাসের পর মাস ভাড়া না দিয়ে জায়গা ব্যবহার করছে। সরকার যদি প্রত্যেক দোকান ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের লকডাউন বা বন্ধ কালীন সময় তাদের মার্কেট মালিক, দোকান মালিক বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বাড়িওয়ালাকে অর্ধেক বাড়ি ভাড়া দেয়ার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেয় এবং শর্ত দেয় যে এই সময় কেউ ভাড়া করা জায়গার অংশ বা পুরোটা ছাড়তে পারবে না। তাহলে আয় কম হলেও ভাড়ার উপর যারা জীবন যাপন করছেন তারাও করোনাকালে বিপদগ্রস্ত হবে না। এসব দেখভালের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত অত্যন্ত কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।

সরকার সব ব্যবসায়ী সমিতি, স্থানীয় প্রশাসন, পৌর কর্পোরেশন ইত্যাদির সমন্বয় অত্যন্ত কঠোর প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের তালিকা করে সমস্ত দলিলাদি পরীক্ষান্তে এই প্রণোদনা দিতে পারে।

অত্যন্ত সুচারুরূপে আর্থিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারলেই সরকার এই আধাখেঁচড়া লকডাউনের দ্বিধাগ্রস্ততা থেকে বেড়িয়ে এসে কঠিন শাস্তির বিধান রেখে কার্যকর লকডাউন দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারবে৷

লেখক: বাংলাদেশ প্রতিনিধি, টিভি ফাইভ মন্ড (ফ্রান্স)

আরও পড়ুন:
কণ্ঠযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশী মারা গেছেন

শেয়ার করুন

ফিরে দেখা ১০ এপ্রিল ১৯৭১

১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের এক আবেগময়ী, ঐতিহাসিক ভাষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অসামান্য শক্তি সঞ্চার করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সরকারের আবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সম্ভাব্য সকল প্রকার সহযোগিতা দানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। অতিশয় দ্রুততার সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন খুবই সম্ভাবনাময় হয়ে ওঠে।

১০ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল রাতে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। ওই ভাষণে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা বিশ্ববাসীকে জানান। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানের সামরিক সরকার ঢাকাসহ সারা বাংলায় গণহত্যা শুরু করে। সামরিক চক্র বাঙালি জাতির ওপর এক অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা ওই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকসহ হাজার হাজার নিরস্ত্র নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে সত্তরের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের ভাষণের মাধ্যমে দেশবাসী ও বিশ্বের মানুষ জানতে পারে যে, স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনার জন্য একটি আইনানুগ সরকার গঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ১০ এপ্রিল রাতে এবং ভারতীয় বেতার আকাশবাণী থেকে ১১ এপ্রিল একাধিকবার প্রচারিত হয়।

২৫ মার্চ রাতে অনেক নেতাই বঙ্গবন্ধুকে আত্মগোপন করার পরামর্শ দেন। কিন্তু তার সিদ্ধান্তে অটল থেকে তিনি অন্য সবাইকে নিরাপদে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৫ মার্চ রাতে তাজউদ্দীন আহমদ লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি পরে, কাঁধে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে এবং ঘাড়ে একটি রাইফেল নিয়ে নিজের বাসা থেকে বের হন। আরহাম সিদ্দিকীর মাধ্যমে আগেই তিনি এই রাইফেল সংগ্রহ করেন। এরই মধ্যে তাজউদ্দীন আহমদ রাইফেল প্রশিক্ষণও গ্রহণ করে ফেলেন।

তাজউদ্দীন আহমদ, ড. কামাল হোসেন ও আমীর-উল ইসলাম ২৫ মার্চ রাতে এক বাড়িতে একত্র হওয়ার কথা ছিল। এই তিনজন ’৭১-এর মার্চে বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ অনুযায়ী অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে সকল কর্মসূচি প্রণয়ন করতেন। ড. কামাল হোসেন শেষ পর্যন্ত ওই রাতে নির্ধারিত বাড়িতে একত্রিত হননি। পরে তিনি গ্রেপ্তার হয়ে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকেন। ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তিনি একই বিমানে স্বদেশে ফিরে আসেন। ২৫ মার্চ রাতে ড. কামাল হোসেন কী কারণে তাজউদ্দীন আহমদ ও আমীর-উল ইসলামের সঙ্গে একত্রিত হননি- এই বিষয়টি আজও পরিষ্কার হয়নি। ড. কামাল সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে স্বেচ্ছায় কারাবন্দিত্ব গ্রহণ করেছিলেন কি না, গত পাঁচ দশকে একবারও তিনি এ বিষয়ে মুখ খোলেননি। দুই রাত একদিন গোলাগুলির মধ্যে আটক থেকে ২৭ মার্চ তাজউদ্দীন ও আমীর-উল ইসলাম ঢাকা ছাড়েন। এ দুজন নানা জনপদ ঘুরে ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় ঝিনাইদহে এসে উপস্থিত হন। ৩০ মার্চ বিকেলে তারা মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী ও ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মাহবুব উদ্দিন আহমদকে নিয়ে সীমান্তের দিকে অগ্রসর হন।

সেখান থেকে তারা স্থানীয় বিএসএফের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে একটি বার্তা পাঠান, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতা হিসেবে ভারত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করার জন্য তারা ভারতে প্রবেশ করতে চান। ভারত সরকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানালে তারা ভারতে প্রবেশ করতে আগ্রহী। কয়েক ঘণ্টা পর স্থানীয় বিএসএফ কমান্ডার এসে তাদের বিএসএফের ছাউনিতে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর সেখানে আসেন বিএসএফের আঞ্চলিক প্রধান গোলক মজুমদার। তিনি তাজউদ্দীন আহমদ এবং আমীর-উল ইসলামকে কলকাতার দমদম বিমানবন্দরে নিয়ে যান। গভীর রাতে এই দুই নেতা যখন কলকাতায় পৌঁছান, তখন ৩১ মার্চের প্রথম প্রহর। সেখানে বিএসএফের সর্বভারতীয় প্রধান কে এফ রুস্তমজীর সঙ্গে তাদের দেখা হয়। তিনি তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

ভারতীয় বিএসএফের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গোলক মজুমদারের সহায়তায় তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর সীমান্ত অতিক্রম করে ওই রাতে কলকাতা পৌঁছেন। রাতেই একটি সামরিক বিমানে তারা দিল্লি চলে যান। প্রকৃতপক্ষে ২৫ মার্চের পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের এটাই ছিল প্রথম যোগাযোগ। তবে ভারত সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের একটা পূর্ব যোগাযোগ ছিল। তাজউদ্দীন আহমদের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের অন্যতম মঈদুল হাসান তার ‘মূলধারা ৭১’ গ্রন্থে এই তথ্য উল্লেখ করেছেন। ওই গ্রন্থে রয়েছে, শেখ মুজিবের নির্দেশে ’৭১-এর ৬ মার্চ তাজউদ্দীন আহমদ ঢাকাস্থ তৎকালীন ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার কেসি সেনগুপ্তের সঙ্গে দেখা করেন। দুর্যোগে পড়লে ভারত বাংলাদেশকে কীভাবে কতটুকু সাহায্য-সহায়তা করবে, ওই বৈঠকে তাই নিয়ে আলোচনা হয়। এই বৈঠকের পর কেসি সেনগুপ্ত বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য দিল্লি যান। ঢাকা ফিরে কেসি সেনগুপ্ত ১৭ মার্চ তাজউদ্দীন আহমদকে আশ্বস্ত করেন যে, পাকিস্তান সামরিক আঘাত হানলে ভারত যথাসম্ভব সাহায্য-সহায়তা করবে। ভারতীয় সাহায্যের রূপরেখা কী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য ২৪ মার্চ মিলিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ওই বৈঠকটি আর অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। এই অসমাপ্ত সংলাপের কারণে মুক্তিবাহিনীকে অস্ত্র, গোলাবারুদ সরবরাহ ও ভারতের মাটিতে মুক্তিবাহিনীর নিরাপদ বেস গঠনের বিষয়টি আর স্থির হতে পারেনি।

৩০ মার্চ ১৯৭১ রাতে দিল্লি পৌঁছার পর তাজউদ্দীন আহমদ ৩ এপ্রিল ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ভারতরত্ন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাতে কোনো সহযোগী ছিল না।

ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা শুরু করার পূর্বে তাজউদ্দীন আহমদকে কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বঙ্গবন্ধু শত্রুর হাতে বন্দি। দলের কেন্দ্রীয় কোনো নেতার সঙ্গে তখন পর্যন্ত তার দেখা হয়নি। সঙ্গী আমীর-উল ইসলামের সঙ্গেই বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। দলের বড় নেতাদের মধ্যে কে জীবিত কে মৃত, কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন কি না, কে কে সীমান্তের পথে রয়েছেন, কিছুই তাদের জানা নেই। এমন অবস্থায় তাকে স্থির করতে হয়, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনাকালে তার নিজের ভূমিকা কী হবে। তিনি কি শুধু আওয়ামী লীগের একজন ঊর্ধ্বতন নেতা হিসেবে আলোচনা করবেন? তাতে বিস্তর সুযোগ সহানুভূতি ও সমবেদনা লাভের সুযোগ থাকলেও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার উপযোগী পর্যাপ্ত অস্ত্র লাভের আশা আছে কি? কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন যে, একটি স্বাধীন সরকার গঠন এবং মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার পক্ষে সেই সরকারের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত হওয়ার আগে, ভারত বা অন্য কোনো বিদেশি সরকারের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট সাহায্য ও সহযোগিতা আশা করা নিরর্থক। এমতাবস্থায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণের পর জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা ও সরকার গঠন করা যুক্তিসংগত এবং সেই সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তাজউদ্দীনের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সাহায্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে দিল্লিতে আসা ও সাহায্য-সহযোগিতা চাওয়া যুক্তিসংগত বলে তাজউদ্দীন মনে করেন। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের আগের দিন (২ এপ্রিল ১৯৭১) দিল্লিতে তার এক ঊর্ধ্বতন পরামর্শদাতা তাজউদ্দীনের সঙ্গে আলোচনাকালে জানতে চান, আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে কোনো সরকার গঠন করেছে কি না। এই জিজ্ঞাসা ও আলোচনা থেকে তাজউদ্দীন বুঝতে পারেন, স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠিত হয়েছে কি হয়নি এই বিষয়ে ভারত সরকারের কাছে কোনো প্রকৃত সংবাদ নেই এবং সরকার গঠনের সংবাদে তাদের বিস্মিত বা বিব্রত হওয়ারও কিছু নেই। বরং সরকার গঠিত হয়েছে জানলে পূর্ব বাংলার জনগণের সংগ্রামকে সাহায্য করার জন্য ৩১ মার্চ ভারতের পার্লামেন্টে যে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে তা এক নির্দিষ্ট ও কার্যকর রূপ নেবে বলে তাজউদ্দীনের বিশ্বাস জন্মায়। যুদ্ধকালীন সরকারের সচিবালয়ে কর্মরত গবেষক মঈদুল হাসানের ‘মূলধারা ’৭১’ গ্রন্থে এসব কথা উঠে এসেছে।

এমনসব চিন্তাভাবনা থেকেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার শুরুতে তাজউদ্দীন জানান, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকার আক্রমণ করলে শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি সরকার গঠন করা হয়েছে। শেখ মুজিব সেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি এবং মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকে যোগদানকারী দলের সকল প্রবীণ সহকর্মী (হাইকমান্ড নামে পরিচিত) সেই মন্ত্রিসভার সদস্য। নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই উপস্থাপন করেন তাজউদ্দীন।

ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী সংসদীয় দলের হুইপ ছিলেন। আরেকজন হুইপ ছিলেন টাঙ্গাইলের আবদুল মান্নান। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস তিনি ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদের ছায়াসঙ্গী।

আগেই বলেছি, ড. কামাল হোসেনসহ এই দুজন বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে একাত্তরে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনের সকল কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পূর্বে আলোচ্যসূচি নিয়ে আমীর-উল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করেন তাজউদ্দীন। আমীর-উল ইসলাম বলেন, দলের সভাপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আপনি প্রধানমন্ত্রী হবেন। আর হাইকমান্ডের অন্য নেতারা হবেন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য। ১৯৭৮ সালে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণবিষয়ক ৬০-৭০ পৃষ্ঠার এই লেখাটিতে এমনই তথ্য আছে।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ব্যরিস্টার আমীরের পদবি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ‘প্রিন্সিপাল এইড’। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটির রচয়িতাও আমীর-উল ইসলাম। সুবৃহৎ এই লেখাটির পুরোটাই হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিশ খণ্ডের একটিতে ছাপা হয়েছে।

সাক্ষাৎ শেষে সহকর্মী আমীর-উল ইসলামকে জানান, মিসেস গান্ধী বারান্দায় পায়চারি করছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদের গাড়ি পৌঁছার পর তাকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী তার স্টাডি রুমে নিয়ে যান। স্বাগত সম্ভাষণ জানিয়ে মিসেস গান্ধী প্রশ্ন করেন- ‘হাউ ইজ শেখ মুজিব? ইজ হি অলরাইট?’ জবাবে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। ২৫ মার্চের পরে তার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়নি।’ তাজউদ্দীন আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। যেকোনো মূল্যে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। আগত শরণার্থীদের জন্য প্রয়োজন আশ্রয় ও খাদ্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তান সরকার আমাদের পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা চালাবে। কিন্তু তাদের এই চেষ্টা কোনোভাবেই সফল হতে দেয়া যাবে না।’ তিনি জানান, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে জোটনিরপেক্ষ, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি শত্রুতা নয়। বাংলার মানুষের সংগ্রাম, মানবতার পক্ষে ও হিংস্র ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে। সকল গণতন্ত্রকামী মানুষ ও সরকারের সহযোগিতা আমরা চাই।’ মাতৃভূমির স্বাধীনতাযুদ্ধে তাজউদ্দীন আহমদ ভারত সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।

প্রথম সাক্ষাতের এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি দ্বিতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ নিয়ে মতবিনিময় করেন। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের পরামর্শে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপ্রধান, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপ্রধান করে তাজউদ্দীন নিজেই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন। শত্রুর হাতে বন্দি বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি এবং তখনও দেখা মিলেনি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি করাটাও কম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল না।

১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠনের কথা বেতারের মাধ্যমে বিশ্ববাসী জেনে যায়। ১০ এপ্রিল প্রচারের জন্য প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণও রেকর্ড করা হয়। ইতোমধ্যে শেখ ফজলুল হক মণির নেতৃত্বে যুব ও ছাত্র নেতৃবৃন্দসহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা কলকাতা পৌঁছে তাজউদ্দীন আহমদের প্রধানমন্ত্রী হওয়াসহ সরকার গঠনের ব্যাপারে ভিন্নমত প্রকাশ করেন। ১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পূর্বাপর পরিস্থিতি বর্ণনা করে এক গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘ ভাষণ দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এক অমূল্য দলিল হিসেবেই বিবেচিত হয়।

১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের এক আবেগময়ী, ঐতিহাসিক ভাষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অসামান্য শক্তি সঞ্চার করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সরকারের আবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সম্ভাব্য সকল প্রকার সহযোগিতা দানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। অতিশয় দ্রুততার সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন খুবই সম্ভাবনাময় হয়ে ওঠে। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের দ্বিতীয় বৈঠকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য আশ্রয় এবং বাংলাদেশ সরকারের জন্য অবাধ রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালানোর অধিকার প্রদান করা ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেয়া হয়। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী দু দফা বৈঠকের পর এপ্রিল মাসেই ভারত সরকার ২টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর একটি হচ্ছে ভারত সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়া এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে- বাংলাদেশ সরকারকে ভারতীয় এলাকায় রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা চালানোর অধিকার প্রদান করা।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার পর বাংলাদেশের জনগণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নেতারা কে কোথায়, কে কেমন আছেন, তা কারো জানা নেই। বেতার-টিভি প্রশাসনসহ সবকিছু দস্যু বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলায় আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের ভাষণ বাংলার মানুষকে দারুণভাবে উজ্জীবিত করে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে ১০ এপ্রিল একটি ঐতিহাসিক চিরস্মরণীয় দিন হিসেবে বাংলার মানুষের কাছে চিরকাল ধ্রুততারার মতো জ্বল জ্বল করবে।

১০ এপ্রিলের পর প্রথমে এম মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান, তারপর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবদুল মান্নান এবং আরও পরে খোন্দকার মোশতাকসহ অন্য নেতারা কলকাতা পৌঁছেন। মোশতাক ও যুবনেতাদের বিরোধিতা সত্ত্বেও সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানসহ আরও অনেকের সমর্থন ও সহযোগিতায় তাজউদ্দীন আহমদ ঘোষিত সরকার বহাল থেকে যায়।

১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের মাটিতে মেহেরপুরের আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। অনুষ্ঠানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেন। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম রচিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম রচিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আরেকটি অমূল্য দলিল হয়ে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন তাৎক্ষণিকভাবে প্রবাসী সরকারের রাজধানীর নামকরণ করেন মুজিবনগর।

দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, গত ৪০ বছরের সকল সরকার এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও মুজিবনগর সরকার এবং ওই সরকারের নেতাদের সঠিক মূল্যায়ন হয়নি। আরও পরিতাপ ও বেদনার বিষয় হলো, বঙ্গবন্ধু মুজিব তার সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে একটিবারের জন্যও মুজিবনগরে যাননি। তবে কেউ স্মরণ করুন আর না করুন, স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস রচনা করতে গেলে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু মুজিবের পরে অবধারিতভাবেই তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং যুদ্ধকালীন সরকারের মন্ত্রী মনসুর-কামারুজ্জামানের নাম আসবে। ইতিহাস বিকৃতকারীরা বিগত বছরগুলোতে যাকে বা যাদের অন্যায়ভাবে টেনে এনে বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছে, তাদের মুখোশও একদিন উন্মোচিত হবে।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, কলাম লেখক-সিনিয়র সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
কণ্ঠযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশী মারা গেছেন

শেয়ার করুন

করোনায় দায়হীন প্রশাসন, ভয়হীন জনতা

স্বাস্থ্য খাতে বিশেষত করোনা মোকাবিলায় সীমিত বাজেটেও উদ্যোগগুলো কেমন নেয়া দরকার, তা নিয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অন্তত বাস্তবায়িত হবে সে প্রত্যাশা নিশ্চয়ই অমূলক ছিল না। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সবাই বলেছেন, মহামারির দ্বিতীয় ঢেউটা প্রথমটার চেয়ে মারাত্মক হয়ে থাকে। কে শোনে কার কথা! প্রথমবার ছিল দম্ভ। আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী। আর দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রাক্বালে আত্মতৃপ্তি। আমরা করোনা জয় করতে পেরেছি, বাকি সবকিছুই জয় করতে পারব।

করোনায় ভয়াবহতা বাড়ছে। শুধু বাংলাদেশে নয় ইউরোপ, আমেরিকা, ব্রাজিল, ভারতেও বাড়ছে মৃত্যু। ভারত এবং ব্রাজিলে মৃত্যু গত বছরের রেকর্ড অতিক্রম করছে। আর এক দিনে এত মৃত্যু বাংলাদেশেও গত বছর ঘটেনি। গত বছরের তুলনায় সংক্রমণ, শনাক্ত ও মৃত্যু তিনটাই বেশি করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে।

টানা কয়েক দিন মৃত্যু ৬০ জনের বেশি এবং এক দিন তা ৬৬ জনে উন্নীত হয়েছে আর শনাক্ত ৭ হাজারের বেশি বলে সরকারি ঘোষণায় বলা হচ্ছে। গত বছর ৩০ জুনে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সর্বাধিক, ৬৪ জন। নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে বেশি, নমুনা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২২ শতাংশের মতো কিন্তু মৃত্যু, শনাক্ত বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি ঘোষণা কেন যেন আস্থা অর্জন করতে পারছে না। এ পর্যন্ত ১০ হাজারের মতো মৃত্যুবরণ করলেও অনেকেই বলছেন সংখ্যা হয়তো আরও বেশি।

ঢাকা মহানগরের হাসপাতালগুলোতে ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই অবস্থা। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে রোগী নিয়ে ছুটছেন স্বজনেরা। তাদের উদ্বেগ, আশঙ্কা, অসহায়ত্ব যে কেমন তা ভুক্তভোগীরা ছাড়া আর কেউ বুঝবেন না। শ্বাসকষ্ট হলে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন অক্সিজেন। আর তা নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করতে গেলে প্রয়োজন হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা। সেটা পাওয়া যাবে কোথায় বা কোন হাসপাতালে? হাসপাতালের বেড খালি পাওয়া যাবে তো? আর গুরুতর আক্রান্ত রোগীর জন্য আইসিইউ খালি পাওয়া যাবে কি? প্রায় দুই কোটি জনসংখ্যার ঢাকা শহরে সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ ১০৪টি আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ৩৭৬টি। ফলে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা সংকটাপন্ন রোগীর স্বজনরা প্রতিমুহূর্তে কামনা করতে থাকে যারা ভর্তি হয়ে আছে, তাদের মৃত্যু। কারণ, মৃত্যু ছাড়া আইসিইউ বেড খালি হওয়ার উপায় নেই। করোনা মহামারি মানুষকে কতটা অসহায় আর অমানবিক করে ফেলছে! মুখে না বললেও মনে মনে ভাবতে থাকে, একটা বেড দরকার। নিজের স্বজন ছাড়া বাকিরা মরে যাক!

২০২০ সালের মার্চের ৮ তারিখে প্রথম করোনা শনাক্ত হওয়ার পর এক বছর এক মাস পার হয়েছে। করোনা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল আর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বেফাঁস কথা জনগণের সামনে উন্মোচন করেছিল। এরপর বাজেট প্রণীত হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে সে বাজেটে সেটা ভিন্ন আলোচনা, তা করলে হয়তো দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিরক্ত হবেন। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে বিশেষত করোনা মোকাবিলায় সীমিত বাজেটেও উদ্যোগগুলো কেমন নেয়া দরকার, তা নিয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অন্তত বাস্তবায়িত হবে সে প্রত্যাশা নিশ্চয়ই অমূলক ছিল না। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সবাই বলেছেন, মহামারির দ্বিতীয় ঢেউটা প্রথমটার চাইতে মারাত্মক হয়ে থাকে। কে শোনে কার কথা! প্রথমবার ছিল দম্ভ। আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী। আর দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রাক্বালে আত্মতৃপ্তি। আমরা করোনা জয় করতে পেরেছি, বাকি সব কিছুই জয় করতে পারব।

প্রথম ঢেউ বা ধাক্কার শিক্ষাটা কী ছিল? তা কি কর্তাব্যক্তিদের মনে আছে? যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের ৭৫ শতাংশ ছিল পুরুষ। বাকিরা নারী। বয়স বিবেচনায় ৬০ বছরের বেশি বয়সী ৫৬ শতাংশ, ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সী ২৫ শতাংশ, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী ১১ শতাংশ মৃত্যুর কথা পরিসংখ্যান বলছে। মৃত্যুর সংখ্যার শীর্ষে ছিল ঢাকা, প্রায় ৫৭ শতাংশ। করোনার উচ্চ ঝুঁকিতে ছিল ৩১টি জেলা। করোনায় কাজ হারিয়েছে, আয় কমেছে, শ্রমজীবীদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা এবং বিবিএস পর্যন্ত জরিপ করে দেখিয়েছে কীভাবে মানুষের জীবনে কষ্ট বেড়েছে করোনার আঘাতে। প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছিল এবং ৯৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষের অন্তত ২০ শতাংশ আয় কমে গিয়েছিল। এর সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের জীবনে যে অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছে তা কাটাতে অনেকদিন সময় লাগবে। কিন্তু এসব তো তথ্য। তথ্যের কি শক্তি থাকে যদি তা কেউ বিবেচনায় না নেয়? বিশেষ করে যারা ক্ষমতায় আছেন তারা। যে যা-ই বলুক না কেন, ক্ষমতায় যারা থাকেন কিছু করার ক্ষমতা তো তাদেরই থাকে। কারণ ট্যাক্সের টাকা বা রাজস্ব আয় সব তো তাদের হাতে, প্রশাসন তাদের নিয়ন্ত্রণে। সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ যত পরামর্শই দিন না কেন বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা তো ক্ষমতাসীনদের হাতেই।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী গত মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর মহাখালীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মার্কেট হাসপাতালের নতুন ২০০টি করোনা আইসিইউ বেড ও ১০০০টি আইসোলেশন বেডের প্রস্তুতকরণ ও কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন শেষে বলেন, ‘করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকার লকডাউন ঘোষণা করেছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর ১৮টি জনগুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এখন করোনা প্রতিরোধে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চলছে। অথচ দেশের কোথাও কোথাও লকডাউন তুলে নিতে আন্দোলন করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে সরকারের লকডাউন ব্যবস্থা জরুরি ছিল, তাই সরকার দিয়েছে। যখন লকডাউন তুলে নেয়ার প্রয়োজন হবে, সরকার সেই সিদ্ধান্ত নেবে। এখন এসব সরকারি নির্দেশনা মেনে না চললে ভবিষ্যতে করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু উভয়ই নিয়ন্ত্রণহীন হতে পারে।’ এই কথার সঙ্গে দ্বিমত করার কি কিছু আছে? কিন্তু যখন সিদ্ধান্তগুলো পালটে যায়, তখন হতবাক হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার আছে কি?

লক ডাউন করা হচ্ছে না কি হয় নি, তা নিয়ে এক রহস্য তৈরি হয়েছে। একবার বলা হচ্ছে কঠোর ভাবে মেনে চলতে হবে আবার নগরে গনপরিবহন চলার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। অফিস আদালত চলবে, কারখানা চলবে, ব্যক্তিগত গাড়ী, রিক্সা চলবে, বই মেলা চলবে কিন্তু মার্কেট বন্ধ থাকবে। ঢাকাকে যদি করোনার সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত এলাকা ধরা হয় তাহলে সাধারণ ছুটি বা লক ডাউনের সঙ্গে সঙ্গে যে মানুষ ছুটল গ্রামের দিকে তারা কি সংক্রমণের বিস্তার ঘটিয়ে দিতে সহায়তা করল না? জনগণ করোনাকে ভয় পাচ্ছে না, লক ডাউন মানছে না, স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করছে, দোকানপাট খুলতে চাইছে- এভাবে তাদেরকে দায়ী করা যাবে কিন্তু তাদের ওপর দায় চাপিয়ে করোনা সংক্রমণ ঠেকানো যাবে কি?

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
কণ্ঠযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশী মারা গেছেন

শেয়ার করুন

অপশক্তি নির্মূলে প্রস্তুত শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ

বাংলাদেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের নিরাপত্তা, এদেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় শেখ হাসিনার বাংলাদেশ যেকোনো অপশক্তিকে কঠোর হাতে দমন করতে প্রস্তুত। যেকোনো অপশক্তিকে নির্মূল করার শক্তি এই রাষ্ট্রের রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে দেশবিরোধী কোনো অপতৎপরতার ঠাঁই নেই।

২০২১ সালে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর অর্থাৎ সূবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি। এমন এক সময়ে আমরা এই উৎসব উদযাপন করছি যখন সারা বিশ্ব এমনকি বাংলাদেশের শত্রুরাও বাংলাদেশের অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণে তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছে। বাংলাদেশ তথা বাঙালি জাতির জন্য এ ছিল এক অনন্য সাধারণ উৎসব। পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্র এবং বিশ্বনেতারা একদিকে দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রাম আর এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

অপরদিকে, রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব সাফল্যেরও প্রশংসা করেছেন তারা। ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশ, রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বে এক আদর্শ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেয়েছে। সমগ্র বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে শেখ হাসিনার বাংলাদেশ অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশে যখন এই সাফল্যের উৎসব উদযাপিত হচ্ছিল এবং সেই উদযাপনে বিশ্বনেতাদের সবাই যখন বাংলাদেশের জয়গান গাইছিল, ঠিক সেই সময়ে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে খাটো করার জন্যে, বাংলাদেশের সকল অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করাতে একটি চক্র ঘৃণ্য উন্মাদনায় মেতে উঠেছিল। এই কাজে তারা সেই মধ্যযুগীয় কায়দায় ধর্মকে ব্যবহার করেছে আর ধর্মান্ধগোষ্ঠীকে লেলিয়ে দিয়েছে।

আমরা বহু বছর ধরে দেখে আসছি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি গোষ্ঠী আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগুলোকে তারা নিজেদের স্বার্থ-পরিপন্থি মনে করে। এই গোষ্ঠী বার বার মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাকে আঘাত করেছে। তারা বাংলাদেশের এই আকাশচুম্বী সাফল্য ও অর্জনকে কোনোভাবে মেনে নিতে পারছে না। তারা শুরু থেকেই বাংলাদেশের আদর্শ ও চেতনাবিরোধী ছিল। তাই তারা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই মহোৎসবে ফুঁসে উঠেছে। তারা সবকিছু ধ্বংস করার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের সকল ক্ষোভ এই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশ আজ অনেক শক্তিশালী। পৃথিবীর অনেক শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশ আজ তার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে যোগ্যতার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আজ চ্যাম্পিয়ন। এই রাষ্ট্রকে দমাবার সাধ্য কারো নেই।

বাংলাদেশবিরোধী এই অপতৎপরতা তথা উন্মাদনা সৃষ্টির অপচেষ্টায় ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে মৌলবাদী ও ধর্মান্ধগোষ্ঠী। কিন্তু মূল ষড়যন্ত্রকারীর ভূমিকায় রয়েছে বিএনপি-জামাত। ইতোমধ্যে এটি পরিষ্কার হয়েছে। লন্ডন থেকে কারা নীল নকশা তৈরি করছে, টেলিফোনে কারা যাত্রীবাহী বাস এবং যানবাহনে আগুন দিয়ে নিরীহ মানুষ মারার নির্দেশ দিচ্ছে; বিভিন্ন জায়গায় নাশকতার লক্ষ্যে কারা অর্থের জোগান দিচ্ছে, ইতোমধ্যে এগুলো আমরা জেনে গেছি।

কারা কাপুরুষের মতো বিদেশে বসে ফেসবুক আর ইউটিউবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে এবং বিদেশে বসে বাংলাদেশের ভেতরে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার আহ্বান জানাচ্ছে, তাদের প্রত্যেককে জনতা চিহ্নিত করছে। এই সাজানো বাংলাদেশকে কারা ধ্বংস করতে চায়, কারা এই আকাশচুম্বী উন্নয়নকে নস্যাৎ করতে চায়, তাদের নাম-পরিচয় একে একে উন্মোচিত হচ্ছে।

আমরা তাদেরকে পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, বাংলাদেশ আজ যেকোনো অবস্থায় এ ধরনের অপশক্তি ও অপতৎপরতা প্রতিহত ও নির্মূল করার সক্ষমতা রাখে । বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম একটি স্বপ্নপ্রেমী প্রজন্ম। তারা বিশ্বপর্যায়ে নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা রাখে। তাদেরকে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

একটা কথা বলা জরুরি, রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার বাংলাদেশ অনেক বেশি মানবিক । তার এই মানবিকতার গল্প আজ বিশ্বব্যাপী মানুষের মুখে মুখে। তবে এটি ভুলে গেলে চলবে না, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ আজ অনেক বেশি শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী। বাংলাদেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের নিরাপত্তা, এদেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় শেখ হাসিনার বাংলাদেশ যেকোনো অপশক্তিকে কঠোর হাতে দমন করতে প্রস্তুত। যেকোনো অপশক্তিকে নির্মূল করার শক্তি এই রাষ্ট্রের রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে দেশবিরোধী কোনো অপতৎপরতার ঠাঁই নেই।

রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা গত একযুগ ধরে দিনরাত পরিশ্রম করে এবং জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নানামুখী যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করে বাংলাদেশকে উন্নয়নের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন । শেখ হাসিনার বাংলাদেশ বিশ্বে আজ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র- এক আদর্শ রাষ্ট্র। এই রকম এক রাষ্ট্রের ক্ষতি বাঙালি জাতি মেনে নেবে না।

গুজব আর মিথ্যাচার করে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড চালানো যাবে না। বাংলাদেশের মানুষ সব জানে, সব তথ্য তাদের কাছে আছে। ষড়যন্ত্রকারীদের মনে রাখা উচিত, নিকট অতীতে এ জাতীয় সব অপতৎপরতা এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড রাষ্ট্র কঠোর হস্তে দমন করেছে। যেকোনো অপশক্তিকে আবারও প্রতিহত করতে প্রস্তুত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রিয় বাংলাদেশ।

এটি আমাদের মনে রাখতে হবে, এই রাষ্ট্র আমাদের সবার। এর নিরাপত্তা, সম্মান ও ভাবমূর্তি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের। ষড়যন্ত্রকারীদের চূড়ান্তভাবে জানিয়ে দিতে চাই, রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতা অবিলম্বে বন্ধ করুন, তা নাহলে রাষ্ট্র আপনাদের প্রতিহত করবে, প্রয়োজনে নির্মূল করবে।

লেখক: তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

আরও পড়ুন:
কণ্ঠযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশী মারা গেছেন

শেয়ার করুন

মানসিক স্বাস্থ্যে দৃষ্টি দেয়া জরুরি

বর্তমানে এত টানাপোড়েনের মধ্যে মানুষকে থাকতে হয় যে, মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখাই কঠিন। এখনকার শিশু প্রকৃতির কোলে বড় না হয়ে, ডিভাইস-নির্ভর হয়ে বড় হচ্ছে, সেটা কি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হচ্ছে? হচ্ছে না, কারণ খেলাধুলা মন ভালো রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আগে শিশুরা খেলত, বেড়াত, পরিবারের নৈমিত্তিক কথোপকথনের বাইরে থাকত বলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য আজকালকার শিশু-কিশোর-তরুণদের চেয়ে ভালো ছিল।

করোনাকালের ভয়াবহতার মাঝেও যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক বাড়ি থেকে ৬ বাংলাদেশির লাশ উদ্ধার করার ঘটনার কথা পড়ে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেছে। ‘বিষণ্নতা থেকেই’ পরিবারটির দুই ভাই তাদের মা-বাবা, নানি ও একমাত্র বোনকে হত্যার পর নিজেরাও আত্মহত্যা করেছে বলে পুলিশের ধারণা।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বিষয়ে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাস দিয়ে ওই পরিবারের এক সদস্য, যাকে পুলিশ সন্দেহ করছে অন্যতম হত্যাকারী ও আত্মহত্যাকারী হিসেবে সেই ফারহান জানিয়েছে, ২০১৬ সালে নবম গ্রেডে পড়ার সময় থেকে তার ‘বিষণ্নতায় আক্রান্ত’ হওয়ার কথা। সেখানে সে লিখেছে শিক্ষাজীবন বির্পযস্ত হওয়ার কথা, তাকে বন্ধুদের ত্যাগ করা ও জীবন দুর্বিষহ হওয়া এবং আত্মহত্যার কথা।

একজন তরুণ ঠিক কোন মানসিক অবস্থায় পৌঁছলে ভাইকে মোটিভেট করে পরিবারের সবাইকে হত্যা করে এবং পরে নিজে আত্মহত্যা করে, তা সহজেই অনুমেয়। এই ধরনের ঘটনা কিন্তু নতুন নয়। বাংলাদেশেও আমরা দেখেছি মা তার সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করে বা বাবা পরিবারের সবাইকে হত্যা করে নিজেও মারা গেছে। এগুলো কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। মানুষ যখন নিজের ‘মৃত্যুকে বরণ করে’ নেয়ার জন্য তৈরি হয়, তখন ধরেই নিতে হবে, সে মানসিকভাবে অসুস্থ বা ভয়াবহ রকমের ডিপ্রেশনের শিকার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে যে, ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে রোগের বোঝা হিসেবে বা ডিজিজ বার্ডেনের এক নম্বর কারণ হবে বিষণ্নতা। আর সে সময় বছরে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যাজনিত কারণে মৃত্যুর শিকার হবে। আধুনিক মানবজাতির জন্য এ এক ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী।

অথচ মানসিক স্বাস্থ্য বা রোগ নিয়ে ভুল ধারণা, লজ্জা, ভয়, কুসংস্কার বাংলাদেশে তো বটেই, এমনকি উন্নত দেশগুলোতেও রয়েছে নানা মিথ। তাই একদিকে যেমন মানসিক রোগী ও তার পরিবার চিকিৎসা নিতে চায় না, অন্যদিকে কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় আমাদের মতো দেশগুলোতে সব রোগী সুচিকিৎসা পায় না। এদেশে অধিকাংশ মানুষ একে মনে করে পাগলামি। আর মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসাকে সবসময়ই পাগলের চিকিৎসা বলে মনে করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কয়েক যুগ আগে ‘স্বাস্থ্য’-এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘কেবল নীরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয় বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য।’ আমাদের অসচেতনতার ফলে ‘স্বাস্থ্য’ শব্দটি সীমাবদ্ধ হয়ে আছে শুধু ‘শারীরিক’ অংশটুকুর মধ্যে। আর তাই বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই মানসিক সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

জীবনের চাপ-তাপ, অত্যাচার-নিপীড়ন, অন্যায়-অবিচার, ব্যর্থতা সব মানুষ সমানভাবে গ্রহণ করতে পারে না। বিশেষ করে শিশুদের ওপর ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের নেতিবাচক প্রভাব, তাদেরকে ডিপ্রেশন বা হতাশার মুখে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এমনকি কোনো কোনো সময় এই অবস্থার জের শিশুকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়।

মানসিক সমস্যাকে আমরা এতটাই অবহেলা করি বা এড়িয়ে চলি কিংবা বুঝতে না পেরে এমন একটা সময়ে চিকিৎসকের কাছে যাই, যখন পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে ওঠে, বিশেষ করে রোগী আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে। অথচ সমস্যার শুরুতেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া যে দরকার, তা আমরা এখনও বুঝি না। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো বাংলাদেশে অধিকাংশ রোগী এবং তার আশপাশের মানুষ বিশ্বাসই করেন না যে, মানসিক রোগ বলে কিছু আছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-২০১৯ অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগের হার ১৬.৮% এবং এদের ১০০ জনের মধ্যে ৭ জন ভুগছেন বিষণ্নতায়। অথচ অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এর শতকরা ৯২ জন রয়েছেন চিকিৎসা আওতার বাইরে।

অপরদিকে শিশু কিশোরদের মধ্যে এ হার ১৩.৬%। যাদের ৯৪% কোনো চিকিৎসা পাচ্ছেনা।

অথচ এর বিপরীতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকমাত্র ২৬০ জন, প্র্যাকটিস করছেন এমন সাইকোলজিস্টের সংখ্যা ৬০০-এর কাছাকাছি। স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দকৃত মোট বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে।

মানসিক রোগীর সংখ্যা নিঃসন্দেহে বর্তমানে আরও বেড়েছে। কারণ করোনাকালে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে যোগ হয়েছে অসংখ্য মৃত্যু-ব্যর্থতা, অভাব-বিপর্যয়। কিন্তু আমরা কেউই এই মানসিক সমস্যাটা নিয়ে সচেতন নই। আমরা পড়তে পারছি না, পরীক্ষা দিতে পারছি না, চাকরি পাচ্ছি না, চাকরি হারাচ্ছি, পারিবারিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছি- এগুলো সবই মানসিক চাপ কিন্তু এর জন্য নেই কোনো চিকিৎসা সহায়তা।

পরীক্ষায় ফেল করলে, বিয়ে ভেঙে গেলে, প্রেমে ব্যর্থ হলে, সম্পদহানি ঘটলেও মানসিক স্বাস্থ্য ভয়াবহভাবে হুমকির মুখে পড়ে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ তার এই বিষণ্নতা বা হতাশার কোনো চিকিৎসা করে না বা করতে পারে না।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “যেকোনো শারীরিক রোগকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখলেও মানসিক সমস্যাকে বাংলাদেশে এখনও ঠাট্টা, বিদ্রূপ বা হালকা বিষয় হিসেবে ধরা হয়। মানসিক রোগের অনেক শারীরিক প্রভাব আছে। আর সেসব শারীরিক লক্ষণ দেখা দিলেই মানুষ ডাক্তারের কাছে যান। এই সমস্যার মূল কারণ যে মানসিক স্বাস্থ্য- এটা রোগীদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের দেশের চিকিৎসকরা এটা বুঝতে পারেন না। কারণ আমরা যে এমবিবিএস পাস করি সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি পড়ানোই হয় না। এজন্য তারাও রোগীর মূল সমস্যা বুঝে তাকে আমাদের কাছে রেফার করতে পারেন না।”

উন্নত দেশগুলোতে পরিবার, স্কুল এমনকি কর্মক্ষেত্রেও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু এরপরেও টেক্সাসের এই ঘটনার মতো ভয়ংকর ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। এর বিপরীতে আমাদের দেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও কোনো মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নেই।

এদেশে মানুষ যখন মানসিক সমস্যা দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন সবচেয়ে আগে যায় ওঝা-পির-ফকিরদের কাছে। মানসিক রোগ ভালো করার সবচেয়ে যুৎসই চিকিৎসা হচ্ছে পানিপড়া বা ঝাড়-ফুক। অধিকাংশ মানুষ বা পরিবার বুঝতেই পারে না হতাশা, বিষণ্নতা, সন্দেহ এগুলো এক ধরনের মানসিক রোগ এবং এর চিকিৎসা আছে। যদি এই রোগীরা ঠিকমতো চিকিৎসা না পান, তাহলে যেকোন ধরনের বড় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে।

বর্তমানে এত টানাপোড়েনের মধ্যে মানুষকে থাকতে হয় যে, মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখাই কঠিন। এখনকার শিশু প্রকৃতির কোলে বড় না হয়ে, ডিভাইস-নির্ভর হয়ে বড় হচ্ছে, সেটা কি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হচ্ছে? হচ্ছে না, কারণ খেলাধুলা মন ভালো রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আগে শিশুরা খেলত, বেড়াত, পরিবারের নৈমিত্তিক কথোপকথনের বাইরে থাকত বলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য আজকালকার শিশু-কিশোর-তরুণদের চেয়ে ভালো ছিল।

টাকা না থাকাও যেমন মানসিক চাপের কারণ, তেমনি অতিরিক্ত অর্থ আয়ের পেছনে ছুটলেও মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সততা মানুষের মনকে সুস্থ রাখে। মনকে চাঙ্গা রাখার জন্য ভালো কাজ করার কোনো বিকল্প হয় না।

প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটালে, বন্ধুকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরলে, বাবা-মায়ের পাশে বসে থাকলে, এমনকি আপনজনের কণ্ঠস্বর শুনলে- পরিবারের সবাইকে ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখলেও একটা আনন্দের ভাব আসে। কেউ যখন খুব কষ্টে থাকে, তখন কেউ যদি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, সেই মানুষটি কষ্ট কাটিয়ে উঠতে পারে বা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে।

প্রতিটি পরিবারেরই উচিত শিশুরা যেন এই গুণগুলো নিয়ে বড় হতে পারে, সেই চেষ্টা করা। শুধু মোবাইল, ভিডিও গেম বা ডিজিটাল ফ্রেমে ঘরে বন্দি হয়ে থাকলে শিশু মানসিক সমস্যা নিয়ে বড় হবে। মানুষ ভয়, ঘৃণা, ব্যর্থতা ও অপমান বা যেকোনো নেতিবাচক বিষয়ে মানসিক সাপোর্ট না পেলে অপমান উপেক্ষাতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। এরপর নিজেও একজন নেগেটিভ মানুষে পরিণত হয়।

সাধারণ স্বাস্থ্যশিক্ষা কখনোই পূর্ণাঙ্গ হবে না, যতক্ষণ মানসিক স্বাস্থ্যশিক্ষা না হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্য অর্থ কেবল মানসিক রোগ নয়, বরং মনের যত্ন নেয়া, নিজের সক্ষমতা আর দুর্বলতা বুঝতে পারা। আসলে দৈনন্দিন চাপের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে উৎপাদনশীল থাকাটাই মানসিক স্বাস্থ্য। শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যকেও গুরুত্ব দিতে হবে। মনকে বাদ দিয়ে শরীর নয়। সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে মানসিক স্বাস্থ্য চাঙ্গা রাখার জন্য ও মনে কোনো রোগ না হলেও মনের যত্ন নেয়ার জন্য।

লেখক: সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন:
কণ্ঠযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশী মারা গেছেন

শেয়ার করুন

অজ্ঞাত আসামি ও পুরুষশূন্য এলাকা

ঘরে পুরুষ লোকটি নেই বা তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে চুলায় আগুন জ্বলবে না— এটি খুবই হতাশার কথা। আমাদের এমন একটি সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, যেখানে নারী নিজেই তার উনুনে আগুন জ্বালাতে সক্ষম। বৃদ্ধ হলে কী খাবেন, কার কাছে থাকবেন, মেয়ের কাছে থাকতে পারবেন কি না, মেয়ে তার ভরণপোষণ দিতে পারবেন কি না, সেই ভীতি থেকে ছেলেসন্তানের প্রত্যাশা যাতে করতে না হয়, এরকম একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের দিকে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

‘গ্রেপ্তার এড়াতে পুরুষশূন্য শাল্লার তিন গ্রাম। বন্ধ মসজিদ-মাদ্রাসা। স্বামী-সন্তান কোথায়-কীভাবে আছে খোঁজ নেই কারো কাছে। খাবার সংকট আর আতঙ্ক নিয়ে শিশু ও নারীদের রাত কাটছে নির্ঘুম।’ সম্প্রতি গণমাধ্যমে এরকম শিরোনাম হয়তো পাঠকের নজর এড়ায়নি।

খবরে বলা হয়, সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নাচনী, কাশিপুর ও চণ্ডিপুর গ্রামে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের বাস। তবে ১৭ মার্চের সহিংসতার পর প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়।

অতীতেও এরকম সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। মূলত যখনই কোনো এলাকায় বড় ধরনের অপরাধ হয় এবং অজ্ঞাত লোকজনকে আসামি করে মামলা দেয়া হয়, তখনই পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতে গ্রামগুলো পুরুষশূন্য হয়ে যায়। মানে পুরুষেরা পালিয়ে বেড়ান। কারণ একবার গ্রেপ্তার হলে নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করে বেরিয়ে আসতে আসতে তার জীবন থেকে অনেক মূল্যবান সময় চলে যায়। পুলিশ ও আইনজীবীকে পয়সা দিয়ে দিয়ে অনেকে ফতুর হয়ে যান।

জায়গা-জমি বিক্রি করতে হয়। ফলে যখনই আসামির সংখ্যা অনেক এবং অজ্ঞাত, তখনই গ্রামগুলো এভাবে পুরুষশূন্য হয়ে যায় এবং তার প্রত্যক্ষ ভিকটিম হয় ওই পরিবারের বাকি সদস্যরা। কারণ সাধারণত পুরুষরাই সংসারে আয় করেন। কেউ চাকরি করেন, কেউ ব্যবসা, কেউ কৃষিকাজ। ফলে যখন তিনি পালিয়ে বেড়ান, তখন ঘরের উনুন জ্বলে না। বিশেষ করে যারা দিন আনেন দিন খান। সুনামগঞ্জের শাল্লার তিন গ্রামেও সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও আমরা এমন একটা অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি যে, ঘর বা গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে গেলেও নারীরা ঠিকই সব সামলে নেবেন বা নিতে পারবেন। পরিবার ও সমাজ এখনও এতটাই পুরুষনির্ভর যে, কোনো কারণে ঘরে পুরুষ লোকটি না থাকলে সেই ঘরে অনাহার উঁকি মারে।

২০১৩ সালে মাদারীপুরের কালকিনিতে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। তখন গণমাধ্যমের শিরোনাম ছিলো: হত্যাকাণ্ডের জেরে গ্রাম পুরুষশূন্য। নষ্ট হচ্ছে ১৫ একর জমির ধান। তবে ওই গ্রামে তখন শুধু পুলিশের গ্রেপ্তার আতঙ্কই নয়, বরং প্রতিপক্ষের হামলার ভয়েও অনেকে গ্রাম ছেড়ে চলে যান।

একটি অদ্ভুত ঘটনার খবর শিরোনাম হয় গত ২০ ফেব্রুয়ারি। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নের পূর্ব বেতবাড়িয়া গ্রামে এক তরুণীর মৃত্যু হয় লিভার ক্যান্সারে। জানাজার সময় মেয়ে পক্ষ ছেলের পরিবারের বিরুদ্ধে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ তোলে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের লোকজনের মধ্যে হাতাহাতি হয়। মেয়ে পক্ষ থানায় অভিযোগ করলে দুই পক্ষের লোকজন নিয়ে থানায় মীমাংসার জন্য ডেকে পাঠান উল্লাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। কিন্তু রাত বেশি হওয়ায় তখন থানায় যাননি কেউ। ওসির ডাকে সাড়া না দেয়ার খেসারত দেয়া শুরু হয়।

হাতাহাতির ঘটনায় কোনো পক্ষ অভিযোগ বা মামলা না করলেও শুরু হয় আটক বাণিজ্য। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, রাত হলেই ওসি পুলিশ নিয়ে গ্রামে হানা দেন। যাকে পান, তাকেই ধরে নিয়ে যান থানায়। এরপর ছাড়িয়ে আনতে হয় টাকা দিয়ে। অথচ কারো বিরুদ্ধে নেই কোনো মামলা। আটকের ভয়ে গ্রামটি পুরুষশূন্য হয়ে যায়। যদিও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওসি দাবি করেন, আটক বাণিজ্যের অভিযোগ মিথ্যা।

ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে গত ১৭ মার্চ শাল্লার নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা চালিয়ে হিন্দুদের অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এ ঘটনায় ৫০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও দেড় হাজার মানুষের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়। এরপরই শুরু হয় ধরপাকড়। গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে যেতে থাকেন পুরুষরা।

একটি টেলিভিশন চ্যানেলের খবরে কয়েকজন ভুক্তভোগী নারীর বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে এরকম: ‘চাইট্টা পাঁচটা দিন ধইরা পেটে কোনো দানাপানা নাই। ইয়ের পরে তারার বাপ যে কোন দেশে আছে তারও খোঁজ নাই। চুলাত এখন পর্যন্ত আগুন ধরছে না। কে যে কেমনে দিয়া গেছে কোনো খবর নাই। অহন আমরা কী কইরা চলতাম। কী কইরা খাইতাম। তারা অপরাধ না কইরাও অপরাধী।’

ঘরে পুরুষ না থাকায় শাল্লার তিন গ্রামের মানুষ যে খাবার সংকটে পড়েছেন, সেটি শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়। অর্থনীতিরও প্রশ্ন। যে ঘরে পুরুষ নেই, সেই ঘরের মানুষ না খেয়ে থাকেন? নিশ্চয়ই না। কিন্তু আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র এখনও এতটাই পুরুষনির্ভর যে, তাদের উপরেই নির্ভর করে চুলায় আগুন জ্বলবে কি না।

খুব ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ মানুষই ছেলেসন্তানের জন্য চেষ্টা করেন। কারণ মেয়ে থাকলেও তাদের মনে এই ভীতি কাজ করে যে, যদি স্বামী-স্ত্রী দুজন বা একজন বৃদ্ধ হয়ে যান, তখন তাকে কে দেখাশোনা করবে? তিনি কার কাছে থাকবেন? এটি ধরেই নেয়া হয় যে, বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা হয় ছেলের কাছে থাকবেন অথবা আলাদা থাকলেও ছেলেই তাদের ভরণপোষণ দেবেন। তার মানে কি মেয়েদের কাছে বাবা-মা থাকেন না? নিশ্চয়ই থাকেন। কিন্তু মেয়ের কাছে বাবা মা থাকতে পারবেন কি না, সেটি নির্ভর করে ওই মেয়ের স্বামীর ওপরে। যদি মেয়েটি সংসারে আয় না করেন, অর্থাৎ যদি তিনি স্বামীর আয়ের ওপরে নির্ভরশীল হন, তখন তার পক্ষে নিজের বাবা মাকে নিয়ে আসা খুব কঠিন। যদি না স্বামী খুব আন্তরিক হন। এটি এখনও আমাদের সমাজের নির্মম বাস্তবতা।

ঘরে পুরুষ লোকটি নেই বা তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে চুলায় আগুন জ্বলবে না— এটি খুবই হতাশার কথা। আমাদের এমন একটি সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, যেখানে নারী নিজেই তার উনুনে আগুন জ্বালাতে সক্ষম। বৃদ্ধ হলে কী খাবেন, কার কাছে থাকবেন, মেয়ের কাছে থাকতে পারবেন কি না, মেয়ে তার ভরণপোষণ দিতে পারবেন কি না, সেই ভীতি থেকে ছেলেসন্তানের প্রত্যাশা যাতে করতে না হয়, এরকম একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের দিকে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এই হোক প্রত্যাশা।

সেই সঙ্গে বড় কোনো ঘটনা ঘটলেই শত শত বা হাজার হাজার অজ্ঞাত লোককে আসামি করে মামলা দেয়া এবং গ্রেপ্তার বাণিজ্যও বন্ধ করা দরকার। পুলিশের তদন্ত এবং পুরো বিচার ব্যবস্থায় এখনও যেসব বড় ফাঁক রয়ে গেছে, সেগুলো নিরসন করা না গেলে স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুফল গুটিকয় মানুষ ভোগ করবে। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
কণ্ঠযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশী মারা গেছেন

শেয়ার করুন

‘কার মুখে শুনি অমৃত বাণী’

আমাদের দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ আলেম সমাজকে ভীষণ শ্রদ্ধা করে। তাদের মুখে ইসলামের কথা শুনে বুঝে কিংবা না বুঝে তা পালন করার চেষ্টা করে আসছে যুগ যুগ ধরে। শুধু ধর্মগুরু বা প্রচারক হিসেবে নয়, সমাজের আলোকিত মানুষ হিসেবে পারিবারিক-সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় আচারেও তাদেরকে মূল্যায়ন করা হয়।

বিগত কয়েক দশক ধরে কথিত আলেম সমাজের একটি উচ্চাভিলাষী অংশ সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগ ও সম্মানকে নিয়ে নানাভাবে বিভ্রান্ত করে আসছে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, তাদের কাছে ইসলামিক মূল্যবোধ ও এলেম শিক্ষার জন্য পাঠানো অসহায় ও অবুঝ শিশুদেরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ধর্মকে ঢাল বানিয়ে নিজেদের প্রয়োজনে ইচ্ছেমতো ফতোয়া কিংবা হাদিস দিয়ে ক্ষমতা ও অর্থলাভের জন্য তাদের মরিয়া হয়ে ওঠার ঘটনা এখন অহরহ ঘটছে। ধর্মপ্রাণ মানুষের দান খয়রাতের ওপর বেড়ে ওঠা এই পরগাছা আজ মূল বৃক্ষকে চেপে মারতে চাইছে। রাষ্ট্র, সংবিধান ও দেশকে অস্বীকার করে ওই গোষ্ঠীটি এক জঙ্গিবাদী তথাকথিত খেলাফত কায়েম করতে চায়।

একাত্তরে এদেশের মানুষ দেখেছে, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল বদর, আল শামস, শান্তি ও কল্যাণ পরিষদের মওলানা ও আলেম নেতৃবৃন্দ কীভাবে দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করেছে। মানুষ দেখেছে, আমাদের মা-বোনদের ধর্ষণ- নির্যাতন করতে পাকিস্তানি বাহিনীকে তারা কীভাবে সহায়তা করেছিল, কীভাবে ইসলামের নামে মানুষ খুন করেছে লুটপাট করেছে। আমাদের নারীদের গনিমতের মাল ঘোষণা করে ওরা পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছে। আজ এদের বংশধর ও রাজনৈতিক পরম্পরা বাংলাদেশ বিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতায়, উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় এদের কোন ভূমিকা নাই, বরং উল্টো ভূমিকা আছে। তারা বিভিন্ন সময়ে মোড়ক পরিবর্তন করে মুখোশ বদল করে কিন্তু তাদের ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক রূপ পরিবর্তন করে না।

মহান মুক্তিযুদ্ধে এদের নাকে খত দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে হলেও শেষপর্যন্ত সকল দেশবিরোধী রাজাকারকে বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে এই পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা আবার পুনর্বাসিত হয় শহীদের রক্তেভেজা বাংলায়। অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির কেউ কেউ এসব দেশবিরোধী পরিবারের সঙ্গে ছেলেমেয়ে বিয়ে দেয়া, ব্যবসায় জড়ানো এবং রাজনৈতিক আপসের মাধ্যমে এই অন্ধকারের শক্তিকে লালন-পালন করেছে এবং এখনও করছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বঙ্গবন্ধুকন্যা বিগত ১২ বছর একটানা ক্ষমতায় থাকলেও এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ধৃষ্টতা দেখিয়েছে এই স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-হেফাজত। আওয়ামী লীগের কিছু ভণ্ড, লোভী, আদর্শহীন ও জামায়াতের দালাল শ্রেণির নেতা ও এমপি-মন্ত্রীর প্রশ্রয়ে তারা আজ পুরো দেশটার ওপর জঙ্গিবাদী সাম্প্রদায়িক থাবা বসিয়েছে। সংখ্যালঘু নির্যাতন, বাউল, সুফি সাধক, ভাস্কর্য ইস্যুতে দেখেছি দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর উদাসীনতা কিংবা আপসকামিতা।

সম্প্রতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে ভাস্কর্য নিয়ে যে আস্ফালন হেফাজত দেখিয়েছে তা সত্যি লজ্জা ও ঘৃণার। উগ্র হেফাজত নেতা রাজাকারপুত্র মাওলানা মামুনুল হক ও বাবুনগরী যে সুরে রাষ্ট্র ও সংবিধানকে লঙ্ঘন করেছে তা দেশের যেকোনো দেশপ্রেমিক নাগরিকের জন্য অপমানের। প্রকাশ্যে রাষ্ট্রদ্রোহী বক্তব্য দিয়ে মামুনুল হক এই বাংলাদেশে বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে, যখন রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। এমন ঘটনার পরেও যখন দেখি নির্লজ্জ বেহায়ার মতো আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সেই তাণ্ডব কি তাহলে ভুলে গেছে রাষ্ট্র? কেনইবা সেই মামলাগুলো আর সচল হয় না? যদিও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সামাজিক সংগঠন সরব হলে অনেকে ঘুম ভেঙে হেফাজতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল হয় ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে পৃথিবীর বড় বড় রাষ্ট্রপ্রধান যখন বাংলাদেশের অর্জনে উচ্ছ্বসিত, আমাদের অহংকার প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ঠিক তখনই বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির আগমন নিয়ে এই স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-হেফাজত কীই না তাণ্ডবলীলা চালালো দেশজুড়ে। কত নিরীহ মানুষের জীবন কেড়ে নিল তারা । ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের নৃশংসতা একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর হামলার কথা মনে করিয়ে দেয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তাকারী অকৃত্রিম বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আগমনের বিরুদ্ধে কাদের গায়ে জ্বালা ধরেছে, সেই কথা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন নেই। এই অপশক্তি যে স্বাধীনতাবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী আজ তা সকলের কাছে স্পষ্ট।

এই মামুনুল গংরা যে নিজের স্বার্থে ইসলামকে ব্যবহার করে, ফতোয়া দেয়, গরম গরম বক্তব্য দেয়, অথচ নিজের জীবন ইসলামসম্মতভাবে পরিচালনা করে না- তার প্রমাণ এই কদিন আগে নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁয়ের একটি রিসোর্টে এক নারীসহ হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা।

আমার বিশ্বাস, এ ধরনের নষ্ট ও ভণ্ড নেতৃত্বকে বর্জন করার জন্য মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্রদের কাছে আহ্বান জানাবে দেশের প্রকৃত ইসলামের শিক্ষায় দীক্ষিত আলেম সমাজ। হেফাজত নেতার নৈতিক অবনমনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা তথ্যনির্ভর এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদে দেয়া বক্তব্যে ধর্ম ব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে বলে দেশবাসী মনে করে।

দেশবাসী নিশ্চয়ই দেখেছেন, একজন নারীসহ হেফাজতের নেতা মামুনুল হককে কিছু মানুষ আটক করেছেন। সেখানে তিনি আল্লাহর কসম খেয়ে বলেছেন, সেই নারী তার বিবাহিত স্ত্রী। যদিও মামুনুল হক তার যে নাম বলেছেন, ওই নারী নিজের ভিন্ন নাম বলেছেন। ওই নারীর বাবার নাম মামুনুল হক যেটা বলেছেন, সেটার সঙ্গেও মিল নেই। এর কিছুক্ষণ পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি অডিও বার্তা ফাঁস হয়। সেখানে মামুনুল হক তার স্ত্রীকে কল দিয়ে বলেছেন, তুমি কিছু মনে করো না, ‘এটা শহিদুল ভাইয়ের ওয়াইফ’।

মামুনুল হক আল্লাহর কসম খেয়ে বলছেন, ওই নারী তার স্ত্রী, অপরদিকে বিবাহিত স্ত্রীকে কল দিয়ে তিনি বলছেন, ‘তুমি কিছু মনে করো না, আমি পরিস্থিতির কারণে বলেছি। পরবর্তী সমময়ে কথিত স্ত্রীর সন্তানের একটি ভিডিও বার্তাও ভাইরাল হয়েছে। এ ঘটনাগুলো হেফাজতে ইসলামের নেতাদেরও যারা এদের সমর্থন করেন তাদের লজ্জা লাগছে কি না জানি না। যদিও এসব আলেমদের দ্বারা মাদ্রাসায় পড়া ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের বলাৎকারের বিষয়ে কোনো কথা বলতে শোনা যায় না। বরং উলটো সুরে এই ছদ্মবেশধারীকে বাঁচানোর জন্য অনেকে মরিয়া হয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখছেন।

পরিশেষে বলতে চাই, ধর্মকে ব্যবহার করে যারা ভোগ-উপভোগ-সম্ভোগে ব্যস্ত- তাদের এখনই চিহ্নিত করে মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষকে এদের মিথ্যাচার থেকে মুক্তি দিতে হবে। পবিত্র ধর্মকে এদের হাতে জিম্মি করতে দেয়া যাবে না। এই সকল উগ্রবাদী নেতাদের কারণে আজ ইসলামের নামে সন্ত্রাসী তকমা লাগছে! এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি, যেন শান্তির ধর্ম ইসলামের নাম করে পবিত্র ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা ও সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টিকারী উস্কানিমূলক বক্তব্য এসব ভণ্ডদের মুখে আর শুনতে না হয়।

লেখক: সাংবাদিক-কলাম লেখক, সাধারণ সম্পাদক- গৌরব ’৭১

আরও পড়ুন:
কণ্ঠযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশী মারা গেছেন

শেয়ার করুন