বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কেরও সুবর্ণজয়ন্তী

বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কেরও সুবর্ণজয়ন্তী

এই মার্চ মাসেই ভারত বঙ্গবন্ধুকে ‘গান্ধী শান্তি পুরস্কার’ দিয়েছে। কারণ বঙ্গবন্ধু দুই দেশের সম্পর্ক ও জোরালো অংশীদারের ভিত্তি গড়েছিলেন। ২০২০ সালের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার কাণ্ডারি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ভারতীয়দের কাছেও তিনি নায়ক। বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার ও অনুপ্রেরণা দুই দেশের ঐতিহ্যকেও ঋদ্ধ করেছে। তার দেখানো পথেই দুই দেশের বন্ধুত্ব, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।’

নয়াদিল্লিতে গত ২৪ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, ‘সম্ভাব্য চুক্তি ও সমঝোতাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সফরের মূল বিষয় হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর এবং মুজিববর্ষ। তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালে ভারতীয়রাও বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছে। একটি দেশ স্বাধীন করতে প্রতিবেশী দুই দেশের একসঙ্গে হয়ে রক্তদান ও আত্মত্যাগ বিরল।’

মোদির সফরের গুরুত্ব তুলে ধরে শ্রিংলা আরও বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ আলাদা রাষ্ট্র ঘোষণা করেছিলেন। এই দিনটি উদযাপন অনুষ্ঠানে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। গত ডিসেম্বর মাসেও শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদি ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলন করেছিলেন। সেখানেও সমঝোতা হয়েছিল। এবারও হবে। কিন্তু এবারের সফরের যে বিশেষ তাৎপর্য, তা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।’

প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ককে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু বার বার বলে গেছেন ভারতের কথা। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি। যেমন- ‘‘আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এবং ভারত, সোভিয়েট ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার জনসাধারণের প্রতি আমাদের এই মুক্তি সংগ্রামে সমর্থনদানের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমার দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ ঘর বাড়ি ছেড়ে মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারত সরকার ও তার জনসাধারণ নিজেদের অনেক অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও এই ছিন্নমূল মানুষদের দীর্ঘ নয় মাস ধরে আশ্রয় দিয়েছে, খাদ্য দিয়েছে। এজন্য আমি ভারত সরকার ও ভারতের জনসাধারণকে আমার দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের পক্ষ থেকে আমার অন্তরের অন্তস্থল হতে ধন্যবাদ জানাই।’’ (১০/১/১৯৭২)

এরপর ১৯৭২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু একইভাবে বলেন-

‘‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চিরদিন অটুট থাকবে। বিশ্বের কোনো শক্তিই পারবে না এই মৈত্রীতে ফাটল ধরাতে। ভারত-বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আর সাম্রাজ্যবাদের কোনো খেলা চলতে দেওয়া হবে না।’’

এই মার্চ মাসেই ভারত বঙ্গবন্ধুকে ‘গান্ধী শান্তি পুরস্কার’ দিয়েছে। কারণ বঙ্গবন্ধু দুই দেশের সম্পর্ক ও জোরালো অংশীদারের ভিত্তি গড়েছিলেন। ২০২০ সালের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার কাণ্ডারি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ভারতীয়দের কাছেও তিনি নায়ক। বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার ও অনুপ্রেরণা দুই দেশের ঐতিহ্যকেও ঋদ্ধ করেছে। তার দেখানো পথেই দুই দেশের বন্ধুত্ব, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।’

প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু অনুসৃত কূটনৈতিক সম্পর্কের পথেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাঁটছেন। তার আমন্ত্রণেই মোদি ঢাকা সফরে পৌঁছাবেন ২৬ মার্চ। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নিতে দুই দেশেরই জোরালো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সময়ে এ সম্পর্ক সত্যিকার অর্থেই ‘সোনালি অধ্যায়ে’ পরিণত হয়েছে।

১৭ মার্চ (২০২১) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০১তম জন্মবার্ষিকীতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলায় টুইট করে লিখেছেন-

“মানবাধিকার ও স্বাধীনতার রক্ষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকীতে তার প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা। সকল ভারতীয় নাগরিকের কাছেও তিনি একজন বীর হিসেবে গণ্য হন।”

অপরদিকে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে দশ দিনের অনুষ্ঠানমালার পাঁচ দিনের আয়োজনে যোগ দিয়েছেন প্রতিবেশী পাঁচ দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান; যার মধ্যে নরেন্দ্র মোদিও আছেন। এই সফর নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে মোদি টুইটে লিখেছেন-

“এই মাসের শেষের দিকে ঐতিহাসিক মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ সফর করতে পারা আমার জন্য সম্মানের বিষয়।”

নরেন্দ্র মোদি দুই দিনের সফরে ঢাকায় আসছেন আগামীকাল ২৬ মার্চ । তার ঢাকা সফরের মধ্যে দিয়ে প্রতিবেশী দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে আশা করছেন বিশিষ্টজনরা। সফরের অংশ হিসেবে ২৭ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। বৈঠকে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা করবেন দুই সরকারপ্রধান। আলোচনা হবে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সব ইস্যু নিয়ে। বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে স্বাক্ষর হবে ৩টি সমঝোতা স্মারক। এসময় যৌথভাবে কয়েকটি প্রকল্পের উদ্বোধনের ঘোষণাও দিতে পারেন দুই দেশের সরকারপ্রধান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য প্রদান করবেন। সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথভাবে বঙ্গবন্ধু-বাপু ডিজিটাল প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হবে।

২৭ মার্চ সকালে তিনি টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ পরিদর্শন করে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। তাছাড়া তিনি সাতক্ষীরা ও গোপালগঞ্জে দুটি মন্দির পরিদর্শন করে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কথা বলবেন। বিকেলে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একান্ত বৈঠক ছাড়াও ভারতের প্রধানমন্ত্রী একইসঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের ৫০ বছর উপলক্ষে পৃথক দুটি স্মারক ডাকটিকেট উন্মোচন করবেন।এই সফরকে সামনে রেখে গত ৯ মার্চ (২০২১) সীমান্তবর্তী ফেনী নদীর ওপর একটি সেতুর উদ্বোধন করা হয়েছে। সেতুটি সরাসরি যুক্ত করেছে বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলোকে। এখন ভারতের এই রাজ্যগুলো সেতু দিয়ে সহজে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আনা নেয়া করতে পারবে। পাঁচ বছর আগেই ভারতের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার বা ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা কার্যকর হয়েছে। মূলত স্থল সীমান্ত-বাণিজ্যে সমস্যা কমানো গেছে, কানেক্টিভিটি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নতুন জিনিস যোগ হয়েছে। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, দু’দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে।

অপরদিকে ২০২০ ও ২০২১ সাল মহামারির জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, তবে এর মাঝেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভালো সহযোগিতামূলক লেনদেন গড়ে উঠেছে। ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা আছে। নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের অংশীদারত্ব এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনা মোকাবিলায় চীনের আগে এদেশে এসেছে ভারতের জরুরি চিকিৎসা সহায়তা সরঞ্জাম। ৩০ হাজার সার্জিক্যাল মাস্ক এবং ১৫ হাজার হেড কভার ছিল আমাদের জন্য মূল্যবান। এই উপহার ছিল করোনাভাইরাস বিস্তাররোধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ। ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির অংশ হিসেবে এবং কোভিড ১৯-এর বিস্তাররোধ করার জন্য একটি সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগ নিতে ১৫ মার্চ ২০২০ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং অন্যান্য সার্ক নেতৃবৃন্দ একটি ভিডিও সম্মেলন করেন। এই অঞ্চলের প্রতি ভারতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এটি। এই উপহারের মতো ভ্যাকসিনও উপহার পেয়েছি আমরা। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার আবিষ্কৃত কোভিশিল্ড নামের টিকা তৈরি করেছে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট। সেই কোভিশিল্ড নামের ভ্যাকসিন ২১ জানুয়ারি (২০২১) ভারতের উপহার হিসেবে ঢাকায় এসে পৌঁছায়।

আগেই ভারত জানিয়েছিল, কুড়ি লাখ ডোজ টিকা বিনামূল্যে বাংলাদেশকে উপহার দেবে তারা। এই উপহার দু’দেশের একসঙ্গে সংকট মোকাবিলার অনন্য নজির। উপরন্তু ২৬ মার্চ মোদির এদেশ সফরে বাংলাদেশকে ১০৯টি অ্যাম্বুলেন্স উপহার দেবে ভারত। ২৪ মার্চ অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছে গেছে এদেশে। হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, এ যাবত ভারতের তৈরি করোনার টিকা সবচেয়ে বেশি পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, বাংলাদেশের করোনা টিকার চাহিদা মেটাতে ভারত যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।

দিল্লিতে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির সরাসরি সাক্ষাৎ হয় ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে। তারপর করোনা মহামারিতে ভার্চুয়ালি একাধিক বৈঠক হয়েছে। আসলে ভারতের সঙ্গে এদেশের সংযোগ সবসময় অটুট রয়েছে। আর এজন্য তিস্তা চুক্তির বিষয়ে ভারত সরকার আন্তরিক এবং এ বিষয়ে কাজ অনেকটা এগিয়ে আছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার মতে, ‘শুধু তিস্তা চুক্তি নয়, বাকি যে আমাদের ৬টি অভিন্ন নদীর পানি নিয়েও আমরা আলোচনা করি।’

আমাদের পররাষ্ট্রনীতির পাঁচ লক্ষ্যের অন্যতম হলো- ‘ভারত ও নিকট প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখা।’ এই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে চলেছে শেখ হাসিনা সরকার।

২০১১ সালে বাংলাদেশ ও ভারত স্থলসীমানা চুক্তি ১৯৭৪-এর প্রটোকল স্বাক্ষর এবং ২০১৫ সালে স্থলসীমানা চুক্তির অনুসমর্থন শেখ হাসিনার সুদীর্ঘ প্রচেষ্টারই সুফল। ইন্সট্রুমেন্ট অব রেটিফিকেশন এবং লেটার অব মোডলিটিস স্বাক্ষরের মাধ্যম তৎকালীন ১১১টি ভারতের ছিটমহল বাংলাদেশের এবং আমাদের ৫১টি ছিটমহল ভারতের অংশ হয়ে যায়। ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে এর আগে নাগরিকত্বহীন ৫০ হাজারের বেশি মানুষ তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নাগরিকত্ব লাভ করে। এই মাইলস্টোন ঘটনাটি ঘটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলে। তিনি ২০১৫ সালের ৬-৭ জুন বাংলাদেশ সফর করেন। এ সফরে সর্বমোট ২২টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর হয়। শেখ হাসিনা সরকারের সফল কূটনৈতিক তৎপরতায় ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত স্থলসীমানা ও সমুদ্রসীমা শান্তিপূর্ণভাবে নির্ধারিত হয়েছে। তবে মনে রাখা দরকার, ২০১১ সলের ৬-৭ সেপ্টেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সফরের ঐতিহাসিক সাফল্য হচ্ছে, এর সুবাদেই ১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন ঘটে যার ফলে ভারতে কংগ্রেসের উভয়পক্ষ অর্থাৎ লোকসভা ও রাজ্যসভায় চুক্তির রেটিফিকেশন সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এ সাফল্যের কারণেই দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত স্থলসীমানা নির্ধারণ ও ছিটমহল-বিনিময় শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। অবশ্য নরেন্দ্র মোদির আমলে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশের সুযোগের কারণে (সাফটা নেগেটিভ লিস্ট-এর ২৫ ধরনের আইটেম ব্যতীত) ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে গতিশীলতা এসেছে। দু’দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিশাল বাণিজ্যঘাটতি নিরসনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছেন। সেসময় ভারতের প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়টির উল্লেখ করে বাণিজ্যঘাটতি নিরসনে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন।

বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ফুলবাড়িতে (বাংলাবান্ধার বিপরীতে) ইমিগ্রেশন সুবিধা চালু করা হয়। স্থল শুল্ক স্টেশন বা স্থল বন্দর এবং অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যিক অবকাঠামো উন্নয়নে দু’দেশ ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়নে এসব পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি, অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল রুট সম্পর্কিত প্রটোকল, ঢাকা-গৌহাটি-শিলং এবং কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার সম্পর্কিত সমঝোতা স্মারকসহ বিভিন্ন চুক্তি দেশ দু’টির আন্তঃযোগাযোগ সম্প্রসারণে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। মৈত্রী এক্সপ্রেসের ঢাকা ও কলকাতায় প্রান্তীয় কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। খুলনা-কলকাতা ট্রেন সার্ভিস চলছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ভারত দু’দেশের মানুষেরই ভিসাপ্রাপ্তি সহজীকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

এখন রেল, বিমান ও বাসযাত্রার তারিখ উল্লিখিত টিকিট দিয়ে কোনো ধরনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই ভিসার জন্য আবেদন করা যায়। উপরন্তু হাইকমিশনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই ভারতের হাসপাতাল ও ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে সরাসরি মেডিক্যাল ভিসার জন্য আবেদন করা যাচ্ছে। ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ৫ বছরের মাল্টিপল ভিসা ইস্যুর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জনযোগাযোগ তথা কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ভারত বাংলাদেশের খুলনা ও সিলেট এবং বাংলাদেশ ভারতের মুম্বাই ও গৌহাটিতে উপ-হাইকমিশন চালু করেছে।

নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে ভারতের গোয়াতে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত ব্রিকস-বিমসটেক আউটরিচ সামিটে অংশ নেন শেখ হাসিনা। ওই সম্মেলনে বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোতে মানসম্মত ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পুনরায় ২০১৮ সালের ২৫-২৬ মে শেখ হাসিনা মোদির আমন্ত্রণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সফর করেন। এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় মেয়াদের দ্বিতীয় ভারত সফর। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের অর্থায়নে নবনির্মিত ‘বাংলাদেশ ভবন’ উদ্বোধন করেন। পাশাপাশি তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত সমাবর্তনে ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে যোগদান করেন। সফরকালে আসানসোলে অবস্থিত কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার (ডি. লিট) উপাধিতে ভূষিত করে।

ভারত সফরকালে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা ও গুরুত্বারোপের ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভারতের সঙ্গে আজ আমরা সহযোগিতার এক অনন্য অবস্থানে উপনীত হয়েছি। ভারত থেকে ভেড়ামারা-বহরমপুর গ্রিডের মাধ্যমে এবং ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বর্তমানে ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে।

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ রেলপথে ভারত থেকে ২২৬৮ মেট্রিক টন হাই-স্পিড ডিজেল আমদানি করে। ইতোমধ্যে দু’দেশের মধ্যে তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। পাশাপাশি, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে বিশেষত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌর শক্তি ও পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে দু’দেশের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ভারত ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগে গঠিত আন্তর্জাতিক সোলার অ্যালায়েন্সে বাংলাদেশও যুক্ত হয়েছে। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সংরক্ষণে এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা পালন করবে।

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত একাধিক সম্মেলনে যোগ দেন মন্ত্রী মহোদয়রাও। যেমন, ২০১৬ সালের ৩-৫ নভেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত দ্বি-বার্ষিক এশিয়ান মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্স অন ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশান (এএমসিডিআরআর) অংশ নেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী। ২০১৬ সালের ৬-৭ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান ইকোনমিক সামিটে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন পরিকল্পনামন্ত্রী।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) এবং কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজ (সিআইআই)-এর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সভায় তিনি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি ও সাম্প্রতিক নানামুখী সাফল্য তুলে ধরেন।

ভারতের সঙ্গে ‘তিস্তাচুক্তি’ সম্পন্ন না হলেও পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য সুপেয় ও নিরাপদ পানি এবং পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা নিশ্চিতকরণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিবেচনায় বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও পানিসম্পদ-বিষয়ক আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামের আলোচনায় পানিকে অন্যতম ‘মানবাধিকার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর মাধ্যমে মানবজাতির অস্তিত্ব সুরক্ষায় পানির অপরিহার্যতার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। জাতিসংঘের পানি-বিষয়ক ‘হাই লেভেল প্যানেল অন ওয়াটার’-এ কথা বলেছেন শেখ হাসিনা।

২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিশ্বজুড়ে মহামারির মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক হয় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর। মহামারির মধ্যেও দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত থাকার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা তখন বলেছিলেন, বছরজুড়ে রেলরুট দিয়ে বাণিজ্য, উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শন ও সভা, সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, কলকাতা থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতে ভারতীয় পণ্যসামগ্রীর প্রথম পরীক্ষামূলক চালান প্রেরণ এবং অবশ্যই কোভিড-১৯ বিষয়ে সহযোগিতার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি। তিনি বলেন, করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করতে ব্যাপক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন ব্যাপক বিঘ্ন ঘটা এবং ভোক্তাদের চাহিদা হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও আমাদের অর্থনীতি ঊর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। বেশ কিছুসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশের উৎপাদন ও সেবা খাতে নিযুক্ত রয়েছেন এবং তারা নিজদেশ ভারতে রেমিটেন্স পাঠিয়ে থাকেন। অপরদিকে, বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক পর্যটক এবং চিকিৎসা সেবা গ্রহণকারীকে ভারত গ্রহণ করে।

এভাবে ৫০ বছরে গড়ে উঠেছে দু’দেশের কূটনৈতিক সেতুবন্ধন। নরেন্দ্র মোদির সফরে সেই সেতুবন্ধন আরও দৃঢ় হবে বলে সকলের প্রত্যাশা। তাছাড়া ২০১৯ সালের মে মাসে শুরু হওয়া নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় দফার মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হবে। মনে করা হচ্ছে, তখন ভারত চীনকে টপকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশে পরিণত হবে, আবার এই দেশটি হবে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। আর এ কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক গুরুত্ব বহন করে। অথচ মোদির বাংলাদেশ সফর নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে একটি গোষ্ঠীকে উসকানি দিচ্ছে বিএনপি। এমন অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, মোদির বিরোধিতার আড়ালে মুজিববর্ষের বিরোধিতা করছে দলটি। অপরদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বিরোধিতা হলেও নরেন্দ্র মোদিকে সর্বোচ্চ সম্মান ও নিরাপত্তা দেবে সরকার। নরেন্দ্র মোদিকে দল-মতের ঊর্ধ্বে রেখে আঞ্চলিক সহযোগিতার অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ী নেতা হিসেবে অভিনন্দন জানানো এদেশের জনগণের কর্তব্য।

লেখক : ইউজিসি পোস্ট ডক ফেলো, কবি, লেখক, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
স্মৃতি ২৫ মার্চ ’৭১ বিশ্বাসঘাতকতার একরাত
পাকিস্তানি গণহত্যা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
একাত্তরে পাকিস্তানের গণহত্যা মহাকলঙ্কজনক অধ্যায়
ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়
প্রকাশিত হোক পাকিস্তানি গণহত্যার বিবরণ

শেয়ার করুন

মন্তব্য

করোনার ভয়াবহতা ও সহনশীলতা

করোনার ভয়াবহতা ও সহনশীলতা

সরকারের ব্যর্থতা যত বাড়ে, মানুষের মধ্যে সে কারণে ক্ষোভ যত বাড়তে থাকে- ততই সরকার ও সরকারি দলে সহনশীলতা হ্রাস পায়। সমালোচনা বন্ধ করে দেয়া হয় যেনতেন প্রকারে। আমরা যেন ভুলতে বসেছি সরকারের সমালোচনা করা নাগরিকদের সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার।

করোনা সংক্রমণ প্রথম ধরা পড়ার পর ১৯ এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত একটি দিনও মৃত্যুর মিছিল থামেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনন্দিন ব্রিফিং বা বিজ্ঞপ্তিতে একটি দিনও দেশবাসীকে জানাতে পারল না ‘আজ একটিও মৃত্যু ঘটেনি-একজনও সংক্রমিত হয়নি করোনায়।’ বরং ঘটেছে, ঘটেই চলেছে সম্পূর্ণ বিপরীতটা। মৃত্যু ও সংক্রমণের মিছিল ঘরে ঘরে কান্নার ঢেউ বেড়েই চলেছে।

প্রথমদিকে সরকারপক্ষ থেকে বলা হলো গুজবে কান দেবেন না, করোনাকে শিগগিরই প্রতিহত করা হবে। একজন বাকপটু মন্ত্রী তো বলেই ফেললেন, করোনা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আওয়ামী লীগ করোনার চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী, আজ আর তিনি এ দাবি ভুলেও করেন না। এ ব্যাপারে মুখে তালা লাগিয়েছেন। এ দাবিটি যদি বাস্তবে সত্য হতো অর্থাৎ, সরকারের কোনো ব্যাপারে ত্রুটি অবহেলা বা ব্যর্থতা না থাকত কতই না আনন্দের হতো বিষয়টি। তখন কিন্তু কোনো মন্ত্রীর মুখ থেকে টেলিভিশনে মানুষ শুনত না বরং নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা বলে বেড়াতেন অফিস আদালতে, হোটেলে-রেস্তোঁরায়, মাঠে ময়দানে, ক্লাব-লাইব্রেরিতে। তা ঘটে না দেখে সরকার বাস্তবে ক্ষুব্ধ এবং সে ক্ষোভ নানাজনের মুখ থেকে নানাভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এই পটভূমিতে যখন তাকিয়ে দেখি ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যু এক শ ছাড়িয়েছে, তখন কী বলব? আমরা সেঞ্চুরিয়ান হওয়ার গৌরব অর্জন করেছি? অভিজ্ঞতায় বলে, সরকারের ব্যর্থতা যত বাড়ে, মানুষের মধ্যে সে কারণে ক্ষোভ যত বাড়তে থাকে- ততই সরকার ও সরকারি দলে সহনশীলতা হ্রাস পায়। সমালোচনা বন্ধ করে দেয়া হয় যেনতেন প্রকারে। আমরা যেন ভুলতে বসেছি সরকারের সমালোচনা করা নাগরিকদের সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার।

একটি জাতীয় দৈনিকে ১৬ এপ্রিলের সংখ্যায় প্রথম পৃষ্ঠায় ‘করোনায় ভয়ংকর এপ্রিল’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিলের ১৫ দিনে মৃত্যু, ১০৩৯, ১৬ দিনে আক্রান্ত এক লাখ। এই প্রতিবেদনটিতে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্য দেয়া হয়েছে, কিন্তু ১৬ এপ্রিলে মৃত্যুসংখ্যা লাফিয়ে ১০১-এ পৌঁছায় । ১৭ এপ্রিলেও তাই। তা হলে ১৬ দিনে মৃত্যু ঘটেছে ১১৪০। এপ্রিলের বাকি দিনগুলোতে কী দাঁড়াবে কে জানে!

ওই পত্রিকাতেই একই দিনে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ার পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আগেই জানিয়েছেন বাংলাদেশ এখন আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টের করোনায় আক্রান্ত। এই ভ্যারিরেন্টের লক্ষণগুলো হলো: এক. এই ভাইরাস অতি সংক্রমণশীল অর্থাৎ ছোঁয়াচে; দুই. একজন থেকে আর একজনে দ্রুত ছড়ায়; তিন. ছোঁয়াচে এই ধরনটি কোনো উপসর্গ ছাড়াই সরাসরি ফুসফুসে আক্রমণ করে; চার. এই ধরনটি বয়স্ক ও আগে থেকেই অসুস্থদের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং রোগের তীব্রতা বেশি হওয়ায় মৃত্যুর হারও বেশি।

অপর একটি জাতীয় দৈনিক ১৭ এপ্রিলে প্রকাশিত সংখ্যায় ‘সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার আরও বাড়তে পারে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে লিখেছে: ‘প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ও মৃত্যুর মধ্যেই আরও আতঙ্কের খবর এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনাভাইরাস ব্যবস্থাপনা কমিটি করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছে। করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু আরও বাড়বে উল্লেখ করে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সংক্রমণের চলমান ধারা অব্যাহত থাকলে ও নমুনা পরীক্ষা ৩৫ হাজার বা তার বেশি হলে প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার করে কোভিড রোগী শনাক্ত হতে পারে এবং মৃত্যু হবে ১০০ জনের কাছাকাছি।

পূর্বাপর ঘটনাবলি সাজালে ছবিটা অবিকল সবার সামনে ভেসে উঠবে।

প্রথমদিকে নানা মহল থেকে অভিযোগ উঠেছিল করোনা চিকিৎসার জন্য পৃথক ওয়ার্ড করা হলো। কোনো কোনো সরকারি হাসপাতালে (ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে) তা করাও হলো। পাশাপাশি বের হলো স্বাস্থ্য খাতের বিরাজমান বিচিত্র দুর্নীতির ভয়াবহ সব ঘটনা। হাসপাতাল (বেসরকারি) আবিষ্কার হলো যেখানে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও রোগী বা সন্দেহভাজনদের দিব্যি করোনা পরীক্ষা করে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রোগীর প্রয়োজন বা চাহিদা অনুযায়ী রিপোর্ট প্রদান। ঢাকা, চট্টগ্রামের কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে করোনা টেস্টের ব্যবস্থা হলো- তাতে যে সংখ্যক লোকের পরীক্ষা সম্ভব হলো তা নেহায়েতই অনুল্লেখযোগ্য। ফলে আক্রান্ত মৃতের সংখ্যাও কম আসতে থাকল। ধীরে ধীরে টেস্টের সুযোগ নানা জেলায় সম্প্রসারিত হলেও সুদীর্ঘ ১৪ মাসের মধ্যেও সকল জেলা হাসপাতালে টেস্টিং ব্যবস্থা নেই। নমুনা নিয়ে পাঠানো হয় দূরবর্তী কোনো জেলায় টেস্ট করে ফলাফল জানানোর জন্য। এতে এক থেকে দুসপ্তাহ সময় লাগে।

করোনা চিকিৎসার অপরিহার্য আইসিইউ ও বাড়তি অক্সিজেনের ব্যবস্থা আজও ঢাকা চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও সিলেটের সরকারি হাসপাতালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু অত স্বল্পসংখ্যক রোগীর চাহিদা যেমন তখন মেটানো যায়নি- তেমনই আজও তা যাচ্ছে না। হ্যাঁ, বেড ও আইসিইউর সংখ্যা সম্প্রতি ওই হাসপাতালগুলোয় বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য।

জেলা হাসপাতালগুলোর তো কথাই নেই। সেগুলোতে নেই করোনা রোগীর জন্য পৃথক ওয়ার্ড। করোনা চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার নার্স স্বাস্থ্যকর্মী কিছু নেই। নেই আইসিইউ-সুবিধা। তাই দ্রুত সকল জেলা হাসপাতালে পৃথক যথেষ্টসংখ্যক শয্যা, পৃথক করোনা ওয়ার্ড, ডাক্তার নার্স প্রভৃতি এবং অন্তত ১০টি করে আইসিইউর ব্যবস্থা করা হোক, ব্যবস্থা করা হোক জেলা-উপজেলাপর্যায় পর্যন্ত। করা হোক করোনা টেস্টের ব্যবস্থাও। টেস্টিংয়ের জন্য যে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে প্রতিদিন অন্তত ৫০ হাজার লোকের করোনা টেস্টিংয়ের ব্যবস্থা করা হোক।

স্বাস্থ্য বিভাগের যাবতীয় দুর্নীতির বিচারও ত্বরান্বিত করা হোক।

লকডাউনের নামে (নরম ও কঠোর) যে প্রহসন দেখা গেল, বিশেষজ্ঞরাই তার অসারতা খোলামেলাভাবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতামত গ্রহণ করে অবিলম্বে নতুন করে সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করা হোক। কোনো প্রকার যানবাহন, বিমানের সাধারণ বা স্পেশাল ফ্লাইট, গার্মেন্টসহ সকল ছোটবড় শিল্পকারখানা ব্যাংক বন্ধ ঘোষণা করা হোক।

এর ফলে লাখ লাখ শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষ, এমনকি, নিম্নমধ্যবিত্ত অসংখ্য পরিবার, যারা না খেয়ে থাকলেও কারো কাছে কিছু চাইতে পারেন না- আগামী ছয় মাস কমপক্ষে তাদের সবার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ প্রণোদনা দিয়ে যেতেই হবে।

লেখক: রাজনীতিক-কলাম লেখক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
স্মৃতি ২৫ মার্চ ’৭১ বিশ্বাসঘাতকতার একরাত
পাকিস্তানি গণহত্যা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
একাত্তরে পাকিস্তানের গণহত্যা মহাকলঙ্কজনক অধ্যায়
ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়
প্রকাশিত হোক পাকিস্তানি গণহত্যার বিবরণ

শেয়ার করুন

করোনাকালে শিক্ষার বাস্তবতা

করোনাকালে শিক্ষার বাস্তবতা

আমাদের জন্য ভয়াবহ তথ্যটা হচ্ছে ২০২০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে অসংখ্য শিশু ঝরে পড়েছে শুধু করোনাকালে অভাবের কারণে। সানেমের এক গবেষণায় বলা হয়, ধারণা করা হচ্ছে শতকরা ৩০ জন ছাত্রছাত্রী আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসবে না। কারণ তাদের পরিবার কাজ হারাবে ও সংসারে অভাব বাড়বে।

সুলেখার কষ্টটা আমি কল্পনাও করতে পারছি না। গত বছরের আগস্টে ওর সঙ্গে আমার পরিচয়। সুলেখা বলেছিল, ‘আন্টি আমি কীভাবে আবার স্কুলে যেতে পারব বলো তো?’

আমি বলেছিলাম, মা, করোনা শেষ হয়ে গেলে আবার তোমাদের স্কুল খুলবে; তুমি আবার স্কুলে ফিরে যাবে।

উত্তরে সুলেখা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ‘আন্টি আমার স্কুল একদম বন্ধ হয়ে গেছে। আমি নিজে দেখেছি স্কুলের টেবিল, চেয়ার, বোর্ড সব বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। দরজায় তালা লাগিয়ে টু-লেট ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।

‘আর আমরাও গোড়ানের বাড়ি ছেড়ে বাড়ি চলে যাচ্ছি। কারণ বাবার চাকরিও চলে গেছে।’

আমার জীবনে এত কষ্টের অভিজ্ঞতা আর কখনও শুনেছি কি না, মনে করতে পারিনি।

আট বছরের ছোট নাতনি সেদিন করুণ স্বরে বলল, ‘নানু আমরা কি স্কুলে গিয়ে আর কখনো ক্লাস করতে পারব নাকি ঘরে বসে ক্লাস করতে করতেই বড় হয়ে যাব?

‘আমি এক ক্লাস থেকে আরেকটা ক্লাসে উঠে গেলাম ক্লাসরুম, টিচার আর বন্ধুদের সামনাসামনি না দেখেই।’

ওর এই অনুভূতির সঙ্গে ভীষণ রকমের কষ্ট জড়িয়ে আছে। ঘরের বন্দি জীবনের সঙ্গে যখন পড়াশোনার করার মতো আরেকটি ‘কঠিন’ বিষয় যোগ হয়, তখন একটি শিশুর জীবন কতটা কষ্টের হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। শিশুকালে পড়াশোনা করাটা তখনই আনন্দময় হয়, যখন এর সঙ্গে স্কুল, স্কুলের মাঠ, পরীক্ষা, খেলাধুলা ও সহপাঠীদের সঙ্গে গল্প-গুজব করার বিষয়টি জড়িত থাকে।

অপরদিকে মেহেরুন্নেছা নামের ১৪-১৫ বছরের একটি মেয়ে গ্রাম থেকে মোটামুটি পালিয়েই খালার হাত ধরে শহরে আমার কাছে চলে এসেছে। ও গ্রামের সরকারি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। স্কুল বন্ধ বলে পরিবার জোর করে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ও বিয়ে করবে না বলে এখানে চলে এসেছে।

স্কুল খুললে চলে যাবে এই আশাতেই ছিল। কিন্তু নতুন করে করোনা শুরু হওয়াতে মেহেরুন্নেছা খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে গেছে। সুলেখা, নয়নতারা ও মেহেরুন্নেছারা সবাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।

মেহেরুন্নেছার দুশ্চিন্তার খুবই যুক্তিসংগত কারণ আছে। কারণ গত বছর দেশের এক কোটি ৯০ লাখ স্কুল শিক্ষার্থীর অধিকাংশই পড়াশোনার বাইরেই থেকে গেছে।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাত মাসে দেশের ২১টি জেলার ৮৪ উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিয়ে হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ৮৯ জন স্বীকার করেছে, করোনাকালে তারা অপ্রত্যাশিতভাবে গর্ভধারণ করেছে। এসবই গতবারের করোনাকালের দুঃসহ অভিজ্ঞতার চিত্র। তাহলে কি আমরা একই অবস্থা আবারও প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছি?

যেসব মেয়েরা বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে শতকরা ৫০.৬ জনের বিয়ে হয়েছে ১৬-১৭ বছরের মধ্যে। শতকরা ৪৭.৭ জনের বিয়ে হয়েছে ১৩-১৫ বছরের মধ্যে। এমনকি শতকরা ১.৭ জনের বিয়ে হয়েছে ১০-১২ বছর বয়সে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের করা ‘বাল্যবিয়ের অবস্থা দ্রুত বিশ্লেষণ: করোনাকাল ২০২০’ শীর্ষক এক জরিপ রিপোর্টে এই তথ্যগুলো উঠে এসেছে।

উল্লেখ্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বাল্যবিয়ের হার। শতকরা ৫১ জন। বাল্যবিয়ের হার বেশি, বিশ্বের এ রকম ১০টা দেশের মধ্যে বাংলাদেশ আছে। করোনাকালে মেয়েশিশুরা যে কতটা অসহায় তা আবার প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফা করোনা শুরু হওয়াতে আবার নতুন করে এসব প্রশ্ন বা আশঙ্কা আমাদের সামনে এসেছে।

পিছনে ফিরে দেখছি যে, ২০২০ সালে অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের অন্যতম বড় চিন্তা ছিল করোনার পরে স্কুল খুললে বাচ্চাদের হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা হবে কি? হলে কবে হবে? সিলেবাস কী হবে? ঘরবন্দি অবস্থায় অনলাইনে পড়াশোনা করা কতটা সম্ভব? আবারও এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

প্রায় দুই কোটি শিক্ষার্থী পড়ছে প্রাথমিক স্কুল ও মাধ্যমিক স্কুলে। গত বছর সরকার ভেবেছিল ফাইনাল পরীক্ষা পিছিয়ে দেবে; সিলেবাস কমিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কোনো পরীক্ষা দিতে পারেনি। গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি শিক্ষার্থী পড়াশোনাই করতে পারেনি।

গ্রামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকায় বা শহরের বস্তিতে যে শিশুটি পড়ছে, যার স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা শেখা ছাড়া, শেখার আর কোনো উপায় নেই অথবা এমন অনেক ছাত্রছাত্রী আছে, যাদের অভিভাবকরা পড়তে পারেন না কিংবা তাদের পড়াশোনাতে সহায়তাও করতে পারেন না। তাদের অবস্থা খুবই করুণ হয়েছিল গত বছর।

দূরশিক্ষণ ক্লাসের ব্যবস্থা গত বছর সফল হয়নি। এই ব্যবস্থায় টিভি, রেডিও, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটের মাধ্যমে সর্বোচ্চসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা মোটামুটি মুখথুবড়ে পড়ে। কারণ বাংলাদেশে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীর ইন্টারনেট অ্যাকসেস নেই এবং ইন্টারনেট ডাটা কেনার সক্ষমতাও নেই বললেই চলে।

এ বিষয়ে ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী গত বছর সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনোমিক মডেলিংয়ের (সানেম) একটি সেমিনারে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘চর, হাওর ও চা বাগানের বাচ্চাদের স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট নেই। দেশের শতকরা ৪৪ ভাগ পরিবারের টেলিভিশনও নেই। তাহলে তারা কেমন করে অনলাইনে ক্লাস করবে?’

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধিদপ্তর স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মাধ্যমিক স্তরের যে পড়া প্রচার করতে শুরু করেছিল সরকারের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের সহায়তায়, যাতে মহামারিকালে বাচ্চারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। এটা ছিল একটা সাময়িক সমাধান এবং ফলাফল একদমই আশানুরূপ হয়নি। আর আমাদের মতো দেশে এটা দীর্ঘমেয়াদি কোনো উপায় নয়।

আমাদের জন্য ভয়াবহ তথ্যটা হচ্ছে ২০২০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে অসংখ্য শিশু ঝরে পড়েছে শুধু করোনাকালে অভাবের কারণে। সানেমের এক গবেষণায় বলা হয়, ধারণা করা হচ্ছে শতকরা ৩০ জন ছাত্রছাত্রী আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসবে না। কারণ তাদের পরিবার কাজ হারাবে ও সংসারে অভাব বাড়বে। (সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন)

আমরা দেখেছি অনলাইন শিক্ষাদান পদ্ধতি প্রযুক্তিগত দুষ্প্রাপ্যতা, প্রান্তিকতা ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে সফল হয়নি। আমরা খুঁজে বের করতে পারিনি কত পরিবার খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে, কাদের প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নেই, কাদের হাতে টাকা নেই, কারা বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানোর বদলে কাজ করতে পাঠিয়েছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম গত বছর করোনাকালে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘আমাদের শিক্ষাবছর কমাতে হবে। ১০ মাস করে হিসাব করলে তিন বছরে এই ৬ মাস সময়টা অতিক্রম করা যাবে। সিলেবাসও কমাতে হবে ১০ ভাগ।

‘সময় নষ্ট কোনো চ্যালেঞ্জ নয়। আসল চ্যালেঞ্জ ঝরেপড়ার হার কমানো। আমি জানি না স্যার বা স্যারের মতো বিজ্ঞজনেরা এবার কী ভাবছেন?’

বিবিসির একটা খবর জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতকরা ৯৮ ভাগ হলেও শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক বলেছে, প্রাথমিকের ৬৫ ভাগ শিক্ষার্থী বাংলাই পড়তে পারে না। ইংরেজি আর গণিতে অবস্থা এর চেয়েও দুর্বল। এদের অনেকে অক্ষরও চেনে না। শিক্ষকরা মনে করেন এই বাচ্চাগুলোকে বাসায় পড়ানোর মতো কেউ নেই।

এ ছাড়া শতকরা ৫০ ভাগ শিক্ষকের বছরের পর বছর কোনো প্রশিক্ষণও হয় না। ইউনেসকো বলেছে, বাংলাদেশে শিক্ষকদের এই ট্রেনিং পাওয়ার হার এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। এই যদি হয় সাধারণ সময়ে শিশুদের শেখার অবস্থা, তাহলে করোনাকালে দূরশিক্ষণের মাধ্যমে তারা কতটা শিখবে আর পরীক্ষাই বা কীভাবে দিতে পারবে? আর নতুন করে আরেকটি করোনার ধাক্কা তারা পড়াশোনা ছাড়া কীভাবে পার করবে?

গতবারের অভিজ্ঞতা বলে যে, ইংরেজি মাধ্যমের সব ছাত্র-ছাত্রীর জন্য অনলাইনে পড়াশোনা করাটাও ছিল কঠিন। কারণ সবার বাসায় কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন বাড়তি থাকে না।

ফোনের মাধ্যমে পরীক্ষাও দেয়া যায় না। এই অনলাইনে ক্লাস করতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়েছেন প্রযুক্তি ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত নন এমন অভিভাবকরা। তারা বেশ বিপাকেই পড়েছেন শিশুকে অনলাইন ক্লাস করাতে গিয়ে।

এরই মধ্যে অনলাইনে ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষা দিলেও সত্যিকার অর্থে খুবই নিরানন্দময় এই শিক্ষা গ্রহণ তেমন কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি তাদের জীবনে। চীন, জাপান, আমেরিকার মতো ফাইভজি ব্যবহারকারী দেশগুলো এই পরিবর্তনকে খুব সহজেই গ্রহণ করতে পেরেছে। তাদের স্লোগান ছিল, ‘যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গা থেকেই পড়াশোনা’। কিন্তু বাংলাদেশে তা সফল হয়নি, এবারও হবে বলে মনে হয় না।

লকডাউনের ফলে আমাদের শিশু-কিশোর, তরুণরা বছরের পর বছর পড়ালেখা ছাড়া থাকতে পারে না। এটি মানসিক বিকাশের জন্য অনুকূল নয়। করোনা হয়তো চলে যাবে একদিন। সামনের দিনগুলোতে অর্থনৈতিক অবস্থা মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে। সেসব বিষয় ভেবে নিয়েই আমাদের করণীয় ঠিক করতে হবে।

বাংলাদেশে প্রাইমারি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় পৌনে ছয় কোটি শিক্ষার্থী শিক্ষাগ্রহণ করছে। এদের জীবনের ক্ষতি মানে দেশের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক খাতের ভয়াবহ ক্ষতি। এই ক্ষতি পরিমাপ করেই শিক্ষা বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আমরা আবার করোনাকালে প্রবেশ করেছি। গতবারে করোনাকালে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যে ধাক্কা খেয়েছে, সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই আমরা আবার দ্বিতীয় ধাক্কায় পড়েছি।

করোনাকালে শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে চলবে, এ নিয়ে আমাদের কোনো পরিকল্পনাও নেই। আমরা এ বছর যে উদ্যোগই নেই না কেন তাতে লক্ষ রাখতে হবে, যেন অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী অন্তর্ভুক্ত হয় এবং সুবিধাবঞ্চিত ছাত্র-ছাত্রীরা যেন বাদ না পড়ে। বিকল্প উপায়ে কী শিক্ষা দেয়া যায়, তা দেখতে হবে। যদি করোনা চলতেই থাকে তাহলে এ বছর কী হবে ছাত্র-ছাত্রীদের? আবারও কি সেই একই পথ পরিক্রমণ করতে হবে? সরকার, বিশেষজ্ঞরা কী ভাবছেন?

লেখক: সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন:
স্মৃতি ২৫ মার্চ ’৭১ বিশ্বাসঘাতকতার একরাত
পাকিস্তানি গণহত্যা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
একাত্তরে পাকিস্তানের গণহত্যা মহাকলঙ্কজনক অধ্যায়
ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়
প্রকাশিত হোক পাকিস্তানি গণহত্যার বিবরণ

শেয়ার করুন

সমর্থকদের পাশ কাটিয়ে সুপার লিগ নয়

সমর্থকদের পাশ কাটিয়ে সুপার লিগ নয়

ভক্তদের ক্ষোভটা বোঝা গেছে তাদের প্রতিক্রিয়াতেই। ইংল্যান্ডের ছয়টি ক্লাবের সমর্থকেরা ক্লাবের সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছেন নানা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার। কোনোটাতে লেখা ‘গরীবদের থেকে ছিনিয়ে ধনীদের জন্য’, কোনোটাতে ‘ধিক্কার তোমাদের’।

২০১২ সালে ম্যানচেস্টার সিটির ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জয়ের পর একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়। ৪৪ বছর পর সিটির লিগ শিরোপা জয়ের ম্যাচ দেখে ফেরা এক ভক্তের সাক্ষাৎকার ছিল ওই ছোট ভিডিওতে।

ইতিহাদ স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বয়স্ক ওই সিটি সমর্থক বলেন, ‘আমার ৪৪ বছরের অপেক্ষা শেষ হলো। ১৯৬৮ সালে তাদেরকে শিরোপা জিততে দেখেছি। তাদেরকে আমি ৭৫ বছর যাবৎ সমর্থন করে আসছি। ছয় ফিট দুই ইঞ্চি লম্বা এক তরুণ ছিলাম। মাথা ভর্তি চুল ছিল আমার। দেখো এরা আমার কী অবস্থা করেছে (নিজের টাক মাথার দিকে ইঙ্গিত করে)!

ভাইরাল হয়ে পড়া সেই বৃদ্ধের নাম জানা যায়নি। জানার প্রয়োজনও নেই বোধহয়। যারা ফুটবলকে ভালোবাসেন তারা জানেন খেলাটার আবেগটাই এমন। দলের যে অবস্থাই থাকুক না কেনো ভক্তরা সমর্থন যুগিয়ে যান আজীবন।

ইউরোপে ফুটবল সংস্কৃতির দিকে তাকালে দেখা যাবে এই সমর্থন ও সমর্থকেরাই টিকিয়ে রেখেছে ফুটবল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুড়ে চলে আসে নির্দিষ্ট কোনো দলের সমর্থন। কেউ বা বাবাকে দেখেছেন সমর্থন করতে। কারও বা জন্ম ও বেড়ে ওঠা নির্দিষ্ট শহরে যেখানে ফুটবল ক্লাব হাতে গোনা। ছোটবেলা থেকে তাদেরই সমর্থন করে চলা।

শহর বা এলাকা ভিত্তিক সমর্থকেরাই মূল ভিত্তি ইউরোপিয়ান ফুটবলের। লিভারপুল, ম্যানচেস্টার, মাদ্রিদ, মিলান, বার্সেলোনা কিংবা মিউনিখ এই শহরগুলোর পরিচয় বিশ্বজুড়ে এখন তাদের ফুটবল ক্লাবগুলোকে দিয়েই।

এই সমর্থকদের কথা না ভেবেই বা কিছু ক্ষেত্রে পাশ কাটিয়েই যখন ইউরোপের সেরা ১২টি ক্লাব চুক্তি করে ফেলে বিদ্রোহী এক টুর্নামেন্টের তখন তা আলোচনা- সমালোচনার ঝড় তুলবে সেটাই স্বাভাবিক। নতুন সুপার লিগ যাত্রার প্রাক্কালে ফুটবল ফ্যানদের কথা ভেবেছে কি না ক্লাবগুলো সেই প্রশ্ন তুলেছেন খোদ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।

সুপার লিগে যোগ দেয়া ছয় ইংলিশ ক্লাবের সমালোচনা করে বরিস জনসন বলেন, ‘পরবর্তী কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগে ক্লাবগুলোকে তাদের সমর্থক ও ফুটবল কমিউনিটিকে জবাব দিতে হবে।’

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পর এই পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা করেছে খোদ ইউয়েফা। তাদের চেয়ারম্যান আলেক্সান্ডার সেফেরিনের কাছে এই পদক্ষেপ ভক্তদের মুখে থুথু দেয়ার সমান।

‘আমার মতে এই পরিকল্পনা সমর্থক ও পুরো সমাজের মুখে থুতু দেয়ার মতো। আমরা কোনোভাবেই খেলাটিকে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যেতে দেবো না।’

ক্লাব ও ইউয়েফা দ্বন্দ্বের শুরুটা কোথায় সেটা জানতে কিছুটা পেছাতে হবে।

ইউরোপের সেরা ক্লাব নির্ধারণ করার জন্যে ১৯৫৫ সালে শুরু হয় ইউরোপিয়ান কাপ। তবে এতে অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। শুধু মাত্র চ্যাম্পিয়নরাই এতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেতো। আর টুর্নামেন্ট নক-আউট হওয়ায় খুব বেশি ম্যাচ খেলারও সুযোগ পেতো না ক্লাবগুলো।

১৯৯২ সালে ইউয়েফা বদলায় টুর্নামেন্টের নাম। অ্যাপিয়ারেন্স ফি ও প্রাইজমানি বাড়লেও দলের সংখ্যা রয়ে যায় আটে। পরের বছর সংখ্যা দ্বিগুণ হলেও বড় ক্লাবগুলো নাখোশ ছিল তাতেও। মূলত তখন থেকেই শুরু হয় সুপার লিগের পরিকল্পনা।

সেটি ঠেকাতে ১৯৯৭-৯৮ সালে ইউয়েফা বর্ধিত কলেবরে আয়োজন করে চ্যাম্পিয়নস। ১৬ দল থেকে করা হয় ২৪ দলের টুর্নামেন্ট। তারও দুই বছর পর ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে শুরু হয় ৩২ দলের আসর। যা এখনও টিকে আছে।

ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো বরাবরের দাবী ছিল বড় ক্লাবগুলো যেন লভ্যাংশ বেশি পায় যেহেতু তারাই টিভি রেটিং ও মাঠের দর্শককে বেশি আকর্ষণ করে। কিন্তু ইউয়েফা তাদের দাবিতে কান না দেয়ায় পরিকল্পনা করা হয় সুপার লিগের।

সুপার লিগে অংশ নিলে বাড়তি অর্থ সুবিধা পাবে দলগুলো এটা নিশ্চিত। ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী আমেরিকান কোম্পানি জেপি মরগ্যান টুর্নামেন্টের জন্য বাজেট করেছে ছয় বিলিয়ন ডলার। আর ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কোম্পানি ডিএজিএন দিচ্ছে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। প্রতিটি দল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের জন্য পাবে অন্তত ১২ কোটি ডলার। যেটি যেয়ে ঠেকতে পারে ৪৩ কোটি ডলারে।

এ ছাড়া লক্ষ্য করার মতো বিষয় ১২ ক্লাবের জোটের পাঁচটি ক্লাব আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, টটেনহ্যাম হটস্পার, মিলান ও ইন্টারনাৎসিওনাল গত এক দশকে চ্যাম্পিয়নস লিগে নিয়মিত নয়। ঘরোয়া সাফল্যও কম পাচ্ছে এই দলগুলো।

বিশেষ করে ইংল্যান্ডের মাঝারি মানের দল আর্সেনাল, যারা সবশেষ লিগ জিতেছে ২০০৪ সালে ও কখনই চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতেনি। তাদের জন্য চ্যাম্পিয়নস লিগের আশায় বসে না থেকে সুপার লিগে খেলার প্রস্তাবই ভালো।

কারণ, এই ১২টি ক্লাব সহ মোট ১৫টি ক্লাবকে করা হবে টুর্নামেন্টের স্থায়ী সদস্য। বাকি ৫টি ক্লাব নির্বাচন করা হবে ঘরোয়া লিগে পারফর্মেন্সের ভিত্তিতে। ফলে, আর্সেনাল বা টটেনহ্যামের মতো অসফল কিন্তু জনপ্রিয় দলগুলোর সামনে সুযোগ নিশ্চিত ভাবে ১২ কোটি ডলার বাগানোর। সঙ্গে প্রতি মৌসুমের অন্যান্য আয় তো থাকছেই!

পাশাপাশি রয়েছে টিভি রেটিং ও স্টেডিয়ামে দর্শক উপস্থিতির বিষয়ও। ১২টি বিশ্বের অন্যতম জিনপ্রিয় ক্লাব হওয়ার কারণে প্রায় সবসময়ই তাদের ম্যাচের রেটিং থাকে উচ্চ। তবে, যখন তারা নিচু সারির কোনো দলের বিপক্ষে খেলেন ও ওই একই সময়ে অন্য দেশের লিগে বড় কোনো খেলা হচ্ছে তখন রেটিং কমে যাবার সম্ভাবনা থাকে বৈকি!

উদাহরণ হিসবে বলা যায়, যদি লিগ ম্যাচে আর্সেনাল মুখোমুখি হয় ফুলহ্যামের আর অন্য চ্যানেলে যদি থাকে মিলান বনাম ইউভেন্তাস লড়াই, বৈশ্বিক বাজারে দ্বিতীয়টিরই চাহিদা বেশি থাকবে সন্দেহ নেই।

এ ছাড়া এই ১২টি ক্লাবের স্টেডিয়ামগুলোও বিরাট। অন্তত ৭০ হাজার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন। বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যুয়ে ধরে প্রায় এক লাখ (৯৯ হাজার ৫০০)। এমন কোনো দল যখন চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলতে যায় বেলারুশের বাতে বরিসভের ১৩ হাজার ধারণক্ষমতার মাঠে, তখন টিকিট বিক্রি থেকে থেকে পাওয়া লভ্যাংশের পরিমাণ নিয়ে দুশ্চিন্তা করাটাই স্বাভাবিক তাদের জন্যে।

মোটা দাগে এই সব বিষয়গুলোই চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি করে ক্লাবগুলোর মধ্যে। সুপার লিগ হলে প্রতি সপ্তাহেই থাকবে ব্লকবাস্টার সব ম্যাচ। স্পনসররা ঝাপিয়ে পড়বেন, দর্শকে টইটুম্বুর হয়ে থাকবে গ্যালারি এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।

তবে, এতো পরিকল্পনা ও অর্থকড়ির ঝনঝনানিতে ক্লাবগুলো ভুলে গেছে ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশের কথা। সমর্থক। শুরুতে যেমনটা বলা হয়েছে, সেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের ভক্তদের কথা ভাবতে হবে ক্লাবগুলোকে সবার আগে। ভাবতে হবে তাদের সংস্কৃতি ও চিরকালীন অভ্যাসের কথা।

যে অভ্যাসে তারা প্রতি উইকেন্ডে ছেলে-মেয়ে-স্ত্রী-বান্ধবী-বন্ধুকে নিয়ে যান মাঠে। ম্যাচ শেষ দলের জয়ে একান থেকে ওকান হাসি নিয়ে ফেরেন, প্রতিপক্ষ সমর্থকদের দু’কথা শোনাতে শোনাতে। লোকাল ডার্বিগুলো এখনও সমর্থকদের দেয় ‘ব্র্যাগিং রাইটস’।

ইউয়েফা এরই মধ্যে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। বলেছে সুপারলিগের দলগুলোকে তারা খেলতে দেবে না ঘরোয়া লিগ ও অন্য মহাদেশিয় আসরগুলোতে। নিষিদ্ধ হবেন ফুটবলাররা।

এই কারণেই ভক্তরা সুপার লিগ চাচ্ছেন না। তাদের ভয় ক্লাবগুলো ঘরোয়া ফুটবল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে ও শুধুমাত্র খেলবে সুপারলিগে। নিষেধাজ্ঞার পরও থামবে না তাদের সেই নতুন ‘পয়সা বানানোর মেশিন’।

ভক্তদের ক্ষোভটা বোঝা গেছে তাদের প্রতিক্রিয়াতেই। ইংল্যান্ডের ছয়টি ক্লাবের সমর্থকেরা ক্লাবের সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছেন নানা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার। কোনোটাতে লেখা ‘গরীবদের থেকে ছিনিয়ে ধনীদের জন্য’, কোনোটাতে ‘ধিক্কার তোমাদের’।

সার্বজনীনতার কারণে ফুটবলকে ডাকা হয় দ্য বিউটিফুল গেইম। ভিয়া ফিয়োরিতার দিয়েগো মারাদোনা কিংবা আলজেরিয়ান ইমিগ্র্যান্ট জিনেদিন জিদান দোলা দেন ধনী গরীব নির্বিশেষে সকল সমর্থকের মনে। সুপার লিগ যদি জয় করতে পারে এই সমর্থকদের মন তাহলেই একমাত্র ইউয়েফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেও সাফল্য পাওয়া সম্ভব।

আর যদি ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে যেয়ে শুধুমাত্র টিভি রেটিং, বিজ্ঞাপণ ও মার্চেন্ডাইসিং-এ মনোযোগী হয় নতুন এই লিগ তাহলে হয়তো পুরনো সমর্থকদের ভুলে নতুনদের আকর্ষণ করার পরিকল্পনা আঁটতে হবে ক্লাবগুলোকে।

আরও পড়ুন:
স্মৃতি ২৫ মার্চ ’৭১ বিশ্বাসঘাতকতার একরাত
পাকিস্তানি গণহত্যা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
একাত্তরে পাকিস্তানের গণহত্যা মহাকলঙ্কজনক অধ্যায়
ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়
প্রকাশিত হোক পাকিস্তানি গণহত্যার বিবরণ

শেয়ার করুন

করোনায় সেনাবাহিনীর এক কল্যাণমুখী উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

করোনায় সেনাবাহিনীর এক 
কল্যাণমুখী উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

উপরোক্ত কল্যাণমুখী কার্যক্রম একজন প্রকৃত সেনানায়কের জন্য ফরজ। তার ওপর ন্যস্ত এই দায়িত্ব অত্যন্ত পবিত্র। একবার ভেবে দেখেছেন কি কখনও যে, সামনে মৃত্যু অবধারিত জেনেও কেন একজন সৈনিক তার কমান্ডারের জন্য জীবন কোরবান করতে সামান্য দ্বিধা করে না?

বনানী সামরিক কবরস্থানে ২০০৮ সাল থেকেই সদ্য নবজাতিকা কন্যা বিয়োগের পর হতেই ঘন ঘন যাতায়ত শুরু হয়। ২০১৭ সালের ১০ম রমজান ৭ জুনে পিতৃবিয়োগের পর কবর জিয়ারত করতে প্রতি শুক্রবার বাদ আসর যাওয়া হয়। এর মাঝে ২০১৯-এর ১৯ সেপ্টেম্বর মা প্রয়াত হন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)।

মায়ের কবর দেয়ার পরও বনানী সামরিক কবরস্থানে অনেক ফাঁকা জায়গা ছিল, বিশেষ করে দক্ষিণদিকে বনানী কবরস্থান দেয়াল বরাবর জায়গাটা পুরোটাই ছিল খালি।

এর মধ্যে ২০২০-এর মার্চ হতে বাংলাদেশ লক-ডাউনে চলে গেলে মৃত্যুর মিছিল হতে থাকে দীর্ঘায়িত, বিশেষ করে এপ্রিল ২০২১ অবধি দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ অতিক্রম করল পর পর ৩ দিন। দেশে সর্বমোট করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে ১০,০০০ অতিক্রম করেছে। একটু অক্সিজেন এবং আইসিইউয়ের একটি বেড যেন সোনার হরিণ।

এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল হারালাম আমার এক কোর্সমেট মেজর শহীদুল্লাহ, পদাতিক বাহিনীর একজন অফিসার যে ১২ দিন ঢাকা সিএমএইচের আইসিইউতে জীবন মরণের সঙ্গে যুদ্ধ করে ক্লাস সেভেন ও এইট পড়ুয়া দুই মাসুম সন্তানকে রেখে ইন্তেকাল করেন। সদ্য এলপিআর শেষ করে প্রয়াত মেজর শহীদুল্লাহর সেনা ওয়েলফেয়ার পরিদপ্তরের পরিচালনাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে যোগদান করার কথা ছিল। প্রয়াত বন্ধু মেজর শহীদুল্লাহর দুই সন্তানই এবার রোজা রেখেছিল বাবার সঙ্গে ইফতার করবে এই আশায়। কিন্তু…

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ২০২০ থেকে আজ অবধি এই করনায় বহু চাকরিরত, এলপিআরভুক্ত অফিসার, জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার, নন কমিশন্ড অফিসার, অন্যান্য পদবির কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছোট ছোট সন্তান সন্তানাদি রেখেই পরলোকে পাড়ি দিয়েছেন।

এহেন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ড তথা সেনাবাহিনী প্রধান ও সকল ফর্মেশন কমান্ডার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিম্মলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন:

১. মৃত ব্যক্তির পরিবারকে চাকরিরত অবস্হায় প্রাপ্ত রেশন-সুবিধা ন্যূনতম ৫ বছরের জন্য প্রদান করা হবে সংশ্লিষ্ট ফর্মেশনের উদ্যোগে।

২. মৃত ব্যক্তির পরিবারকে ন্যূনতম ৩ বছর সরকারি বাসস্হান ব্যবহার করতে দেয়া হবে।

৩. মৃত ব্যক্তির সন্তানাদির পড়াশোনার সকল খরচ সেনাবাহিনী পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মওকুফ করা হলো।

৪. মৃত ব্যক্তির স্ত্রী-স্বামীর যোগ্যতা অনুসারে সংশ্লিষ্ট ফর্মেশন কমান্ডারের দায়িত্বে তাদের সেনাসদরের এজিস শাখা পরিচালিত ট্রাস্ট ব্যাংক, সেনা কল্যাণ সংস্হা, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, বাংলাদেশ ডিজেল প্ল্যান্ট এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্মানজনক জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে চাকরির বন্দোবস্ত করতে সিদ্ধান্তে উপনীত হন।

উপরোক্ত কল্যাণমুখী কার্যক্রম একজন প্রকৃত সেনানায়কের জন্য ফরজ। তার ওপর ন্যস্ত এই দায়িত্ব অত্যন্ত পবিত্র। একবার ভেবে দেখেছেন কি কখনও যে, সামনে মৃত্যু অবধারিত জেনেও কেন একজন সৈনিক তার কমান্ডারের জন্য জীবন কোরবান করতে সামান্য দ্বিধা করে না?

উপরোক্ত কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডে যখন একজন সৈনিকের থাকে কমান্ডের ওপর অগাধ বিশ্বাস, তখন সেই সৈনিক দেশের জন্য রক্ত দিতে করে না বিন্দুমাত্র চিন্তা।

বাংলাদেশের সার্বিক মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করে দেশকে করোনা হতে মুক্তির পথ প্রদর্শন করবেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।

লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
স্মৃতি ২৫ মার্চ ’৭১ বিশ্বাসঘাতকতার একরাত
পাকিস্তানি গণহত্যা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
একাত্তরে পাকিস্তানের গণহত্যা মহাকলঙ্কজনক অধ্যায়
ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়
প্রকাশিত হোক পাকিস্তানি গণহত্যার বিবরণ

শেয়ার করুন

নির্মোহ এক শিক্ষককে প্রণতি

নির্মোহ এক শিক্ষককে প্রণতি

একজন শিক্ষক ও জ্ঞানতাপস কতটুকু পরিশ্রমী ও নির্মোহ হলে এত অল্প সময়ে জ্ঞানের রাজ্যে বিশাল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেন, তার উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা তারেক শামসুর রেহমান। শিক্ষকতাকে ভালোবাসতেন, ছাত্র ও গবেষণা ফেলোদের সঙ্গে আন্তরিকতা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ফলে তার অধীনে ভালো মানের গবেষক তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব এক অস্থির সময় পার করছে। প্রতিনিয়ত চারদিকে মৃত্যুর সংবাদ। যা চারপাশকে আতঙ্কিত করছে এবং অনিশ্চয়তায় ঢেকে দিচ্ছে। স্বাভাবিক নিয়মে এ পৃথিবীতে মানুষের আগমন এবং প্রস্থান এ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত খবর নয়। বরং যা একেবারেই চিরন্তন সত্য। প্রতিদিন খবরের কাগজে পরিচিত এবং অপরিচিত মানুষজনের মৃত্যু সংবাদ দেখতে পাই। বরেণ্য ও অগ্রগণ্য মানুষের চলে যাওয়া আমাদেরকে ভাবায় এবং কাঁদায়। তেমনি একজন যৌক্তিক বোধশক্তিসম্পন্ন মানবতাবাদী কলাম-লেখক অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমানের পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে চলে যাওয়া সচেতন মানুষকে বেদনাহত করে।

এ ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব ১৯৫৩ সালের ৯ জুন পিরোজপুর জেলা সদরে পিতার কর্মস্থলের সরকারি বাসভবনে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃকসূত্রে সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার পিটুয়া গ্রামের বাসিন্দা, যিনি কিনা কর্মগুণে আজ স্বমহিমায় খ্যাত। এ মহান শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৭৪ সালে বিএসএস এবং ১৯৭৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমএমএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে জার্মানি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষকতার মাধ্যমে তার কর্মজীবনের সূচনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এবং ওই বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্যও ছিলেন। শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়ে তিনি ঢাকায় বসবাস করছিলেন।

এ মানুষটি শিক্ষকতার পাশাপাশি তার ক্ষুরধার লেখনী চিন্তাশক্তি দেশপ্রেম সততার চর্চায় এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন। কঠিন অধ্যবসায়ী মেধাবী এ লেখকের চিন্তার ক্ষেত্র ছিল প্রধানত আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক এবং বৈদেশিকনীতি। মৃত্যু অবধি এ আঙিনায় তার সরব বিচরণ নানা কলামে, বইয়ে এবং টকশোর আলোচনায় নানাভাবে উঠে এসেছে।

যুক্তিবাদী বুদ্ধিজীবীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে আগ্রহ এবং বিচরণ এতই বিস্তৃত যে সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি এবং রাজনীতির হাল হকিকত সবকিছুই তার নখদর্পণে ছিল। তার লিখিত বিশ্ব রাজনীতির ১০০ বছর আন্তর্জাতিক রাজনীতি কোষ নয়া বিশ্বব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এসব বিষয়ে জ্ঞানপিপাসু এবং বিশ্লেষকদের জ্ঞানের বাতিঘর হিসেবে ভাস্বর হয়ে থাকবে।

তার লেখনীর অন্যতম বিশেষত্ব ছিল দেশপ্রেম; যার সরব উপস্থিতি দেখা যায় আন্তরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ইস্যুতে যৌক্তিক এবং নির্মোহ মতামত তুলে ধরার মাধ্যমে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিশেষত তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা ফারাক্কা বাঁধ এবং টিপাইমুখ বাঁধ বিষয়ক তার তথ্যবহুল লেখনী নীতিনির্ধারকের সিদ্ধান্ত নিতে ও এগিয়ে যেতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। এ শক্তিমান লেখক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকার ও রাজনীতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এসব বিষয়ে পুস্তক রচনা করে পাঠকদের মনে স্থান করে নিয়েছেন।

এ মানুষটি দেশ মাটি ও মানুষের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ধারণ করতেন। নির্মোহ সত্যকথনে সামান্যতম আপোস করতেন না। যার চরিত্রে তোষামোদি স্থান করতে পারেনি। তিনি সবসময় ভাবতেন এ দেশের সার্বভৌমত্ব বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদার। যার ফলস্বরূপ তিনি রচনা করেছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও রাজনীতি, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ট্রানজিট ও গ্যাস রপ্তানি প্রসঙ্গ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও সমকালীন বিশ্ব বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের রাজনীতির পঞ্চাশ বছর এবং করোনা পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতি বইটি প্রকাশের অপেক্ষায়। তুলনামূলক রাজনীতির বিষয়ে তার আলাদা নজর ছিল। যিনি সমসাময়িক ও আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গে নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কাগজে কলাম লিখতেন। বিভিন্ন টকশোতে যৌক্তিক তথ্যবহুল আলোচক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

একজন শিক্ষক ও জ্ঞানতাপস কতটুকু পরিশ্রমী ও নির্মোহ হলে এত অল্প সময়ে জ্ঞানের রাজ্যে বিশাল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেন, তার উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা তারেক শামসুর রেহমান। শিক্ষকতাকে ভালোবাসতেন, ছাত্র ও গবেষণা ফেলোদের সঙ্গে আন্তরিকতা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ফলে তার অধীনে ভালো মানের গবেষক তৈরি হয়েছে। যারা এ বিষয়ে অবদান রেখে চলেছেন। কোনো কাজ তিনি আগামীর জন্য ফেলে রাখতেন না। ফেলোদের উপর অর্পিত কার্যাবলি যথাযথ তদারকি করে ইতিবাচক মতামত দিতেন।

এ শিক্ষকের সান্নিধ্যে যারাই এসেছেন তার অমায়িক ব্যবহার দৃঢ়চেতা মানসিকতা এবং দেশপ্রেমে মুগ্ধ হয়েছেন। এ মানুষটির কোনো শত্রু ছিল না। কর্মবীর এ মেধাবীকে ভালোবাসতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন তার অগণিত ছাত্র ও শুভার্থী। সবার মঙ্গল কামনাই ছিল যার ব্রত।

কিছুটা মেজাজি স্বভাবের এ মানুষটি কখনো অন্যায় ও অনিয়মের সঙ্গে আপস করেননি। সংসার জীবন ছিল অগোছালো, সর্বদা পড়ালেখায় ব্যস্ত মানুষটিকে শেষদিকে একাকিত্ব গ্রাস করে। যার কারণে প্রায়শই বলতে শোনা যেত, মহান প্রভু যেন তাকে সুস্থ অবস্থায় মৃত্যু দান করেন। আমৃত্যু লালিত এ বাসনা টুকু ও সৃষ্টিকর্তা পূরণ করেছেন। একজন শিক্ষকের কাজই তো নিরপেক্ষ থেকে কাজ করে যাওয়া। এ মহান শিক্ষক সারাজীবন এ কাজটি সুচারুভাবে করার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। জ্ঞান আহরণ জ্ঞানের চর্চা এবং জ্ঞান বিতরণ এ তিন ধারায় সমান পারদর্শী ছিলেন বলেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমসাময়িক রাজনীতি বিষয়ক ৫০-এর অধিক বই পাঠকের সামনে হাজির করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বিনয়ী মার্জিত সদালাপী এ মানুষটি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার রেখে যাওয়া সৃষ্টিশীল আকর যুগ যুগ ধরে জ্ঞানপিপাসুদের তৃষ্ণা নিবারণের প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে। এ মহান শিক্ষকের মাটি ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধ এবং তার লেখনী এগিয়ে চলার প্রেরণা।

লেখক: শিক্ষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
স্মৃতি ২৫ মার্চ ’৭১ বিশ্বাসঘাতকতার একরাত
পাকিস্তানি গণহত্যা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
একাত্তরে পাকিস্তানের গণহত্যা মহাকলঙ্কজনক অধ্যায়
ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়
প্রকাশিত হোক পাকিস্তানি গণহত্যার বিবরণ

শেয়ার করুন

মহামারিতে রাষ্ট্রের দায় ও বৈশ্বিক রাজনীতি

মহামারিতে রাষ্ট্রের দায় ও বৈশ্বিক রাজনীতি

বাস্তবতা হলো সব মৃত্যুই সমান কিন্তু সব জীবন সমান নয়। করোনাকালে সেই সত্য নতুনভাবে প্রতিভাত হচ্ছে। যার যতটুকু সামর্থ্য থাকে, তার ততটুকু সুরক্ষা। যার সামর্থ্য নেই, তার সুরক্ষার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সবাই সুরক্ষিত না হলে এককভাবে কেউ সুরক্ষিত হতে পারবে না। সুরক্ষা সবার জন্য, কেবল ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়। এখানে বিভক্তির কোনো সুযোগ নেই। করোনাকে ঘিরে সমাজে বিভক্তি তীব্র হচ্ছে। বৈষম্য সাদা চোখে ধরা পড়ছে।

ইসরায়েলের জেরুজালেম হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক ইউভাল নোয়াহ হারারির মতে, রাষ্ট্র এক সময় নাগরিকের শরীরের ওপরের অংশ পরিবীক্ষণ করত, বোঝার চেষ্টা করত রাজনৈতিক মতবাদ, অভিব্যক্তি, চিন্তাচেতনা ও গতিবিধি।

করোনা রাষ্ট্রকে সুযোগ করে দিয়েছে নাগরিকের শরীরের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশের। রাষ্ট্র আজ সহজেই ব্যক্তির অভ্যন্তরে সংরক্ষিত শরীর সম্পর্কিত তথ্য পরিবীক্ষণ করতে পারছে। রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকের ওপর অংশের পরিবীক্ষণকে হারারি বলছেন ‘ওভারস্কিন’ মনিটরিং। করোনাকালে এ পরিবীক্ষণে বড় ধরনের পরিবর্তন এলো- রাষ্ট্র অবাধে নাগরিকের ‘আন্ডারস্কিন’ মনিটরিংয়ের অবারিত সুযোগ পেল।

অনেক আগেই ডেভিড আরনল্ড তার বিখ্যাত বই ‘কলোনাইজিং দ্য বডি’তে উল্লেখ করেন যে, প্রতিটি মহামারি কীভাবে ব্যক্তির শরীরে উপনিবেশের শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে। কীভাবে আধিপত্যের শেকড় বিস্তৃত হয়। প্রতিটি মহামারি নতুন রাজনীতি, নতুন অর্থনীতি ও নতুন আধিপত্যের সোপান গাড়ে।

মহামারি মানে কেবল জীবন ও মৃত্যুর সমীকরণ নয়, এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতা ও জ্ঞাননির্ভর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রাণান্তর লড়াই। এটাও মহামারিকে ঘিরে এক ধরনের আধিপত্যবাদ।

করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ঘোড়দৌড় দেখলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ মুহূর্তে যে রাষ্ট্র যত দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ভ্যাকসিন সবাইকে সরবরাহ করতে পারবে সেই রাষ্ট্র নিশ্চিতভাবে বিশ্ববাসীর মনোজগতে আলাদা একটা জায়গা পেতে সক্ষম হবে, যা হবে নতুন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায়।

করোনাকালে সমকালীন রাজনৈতিক প্রবণতা হলো ‘নলেজ সুপ্রিমিসি’ বা জ্ঞাননির্ভর আধিপত্য। ভ্যাকসিন ন্যাশনালিজম তার অন্যতম একটি দিক। করোনা ভ্যাকসিন হয়ে উঠছে ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণের নতুন নিয়ামক।

করোনাকালে নাগরিকের শরীরের উপর ও অভ্যন্তরে জমে থাকা তথ্যের ওপর রাষ্ট্রের পুনর্নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এ মহামারি প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রের কাছে জিম্মি করে তুলেছে। নিকট ভবিষ্যতে এ থেকে মুক্তির কোনো আশা নেই। তাই মহামারি হয়ে উঠছে দাসত্ব ও বন্দিত্বের সহায়ক উপায়। মহামারি কেবল ব্যক্তি সংরক্ষণবাদকে উৎসাহিত করছে না, বরং রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণবাদকে উৎসাহিত করে। নলেজ সুপ্রিমিসি দিয়ে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষায় ব্যস্ত ধনী ও উন্নত দেশগুলো। করোনার কারণে ক্ষতির মাত্রা সবার সমান নয়। যারা যত গরিব তারা ততবেশি ক্ষতিগ্রস্ত। যারা ধনী বা বিত্তবান তারা তত সুরক্ষিত বা উপকৃত। এ মহামারি জাতীয়তাবাদী ধারণাকে নতুন করে শক্তিশালী করে তুলছে।

মনে রাখতে হবে, মহামারি হলো রোগকেন্দ্রিক ও ওষুধ ও পণ্যের প্রসার। মোড়ে মোড়ে সুসজ্জিত ওষুধের দোকান, নতুন আউটলেট খোঁজার ধুম। দেখে মনে হবে, এ সমাজ কেবল জীবন আর মৃত্যুর পসরা সাজিয়ে বসেছে।

বাস্তবতা হলো সব মৃত্যুই সমান কিন্তু সব জীবন সমান নয়। করোনাকালে সেই সত্য নতুনভাবে প্রতিভাত হচ্ছে। যার যতটুকু সামর্থ্য থাকে, তার ততটুকু সুরক্ষা। যার সামর্থ্য নেই, তার সুরক্ষার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সবাই সুরক্ষিত না হলে এককভাবে কেউ সুরক্ষিত হতে পারবে না। সুরক্ষা সবার জন্য, কেবল ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়। এখানে বিভক্তির কোনো সুযোগ নেই। করোনাকে ঘিরে সমাজে বিভক্তি তীব্র হচ্ছে। বৈষম্য সাদা চোখে ধরা পড়ছে। করোনা ছড়ানোর অভিযোগে সংখ্যাগরিষ্ঠরা সংখ্যালঘিষ্ঠদের দুষছেন। এক দেশের সরকার আরেক দেশকে দুষছে। এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের মানুষকে দুষছেন। একইসঙ্গে চলছে ভিকটিম ব্লেমিং বা ভুক্তভোগীদের দোষারোপ। মহামারি থেকে সুরক্ষা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। জনগণকে সচেতন ও বাধ্য করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।

আরেকটি দিক হলো, করোনাকালে যেসব সুরক্ষা উপকরণ পথে-ঘাটে বিক্রি হচ্ছে এবং তা হচ্ছে তুলনামূলক কম দামে, সেগুলো কি যথেষ্ট মানসম্মত? এগুলো কি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে পারবে?

মহামারিতে স্বাস্থ্যসুরক্ষা সামগ্রীর মান ও ত্রুটিপূর্ণ বাজারব্যবস্থা সহজেই চোখে পড়ছে। মানবিক এ বিপর্যয় করোনা সুরক্ষার উপকরণের মান সকল ক্ষেত্রে সমান নয়। বড় বড় শহরগুলোতে যেসব সুরক্ষার উপকরণগুলো পাওয়া যাচ্ছে আর প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে যে উপকরণগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর মানের ভেতর বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। রয়েছে সহজলভ্যতার সংকট। আরও রয়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। অথচ করোনা রোগের প্রভাবে নেই কোনো পার্থক্য। জাতীয় সীমাবদ্ধতা হলো সবার জন্য সমমানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপকরণ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

মহামারি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের বিষয়টিকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আমরা জেনেছি, দুর্ভিক্ষে যারা বেশি লাভবান হয়েছে তাদের মধ্যে ডাক্তার শ্রেণি ছিল অন্যতম। করোনাকালে ওষুধ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের যেমন ফেসবুক, গুগল, জুম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন কেনাকাটার সাইটগুলো অর্থের পাহাড় গড়ছে। করোনা হচ্ছে সিংহভাগ মানুষকে নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া এবং স্বল্পসংখ্যককে বিত্তশালী করার উপায়। করোনা বিশেষ শ্রেণির কাছে বিত্তবৈভব অর্জনের উপায় হয়ে ওঠছে।

করোনা মহামারির আরেকটি বিশেষ দিক রয়েছে প্যানিক বায়িং। জনগণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে জিনিসপত্র কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ফলে বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে। প্যানিক বায়িং জনগণের পকেট কাটার এক অভিনব কৌশল। মাঝেমধ্যেই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলোর কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। যেমন, গত বছর এসময় ডেটলসহ বেশকিছু স্বাস্থ্য সুরক্ষা উপকরণ বাজার থেকে প্রায় উধাও হয়ে যায়। প্যানিক বায়িংয়ের পেছনে এক বড় ধরনের যোগসাজস কাজ করে। জনগণ জীবন বাঁচানোর তাগিতে অতিমূল্য দিয়ে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট দুষ্প্রাপ্য জিনিসপত্র কিনতে মরিয়া হয়ে ওঠে। নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বাজারের কাছে ব্যক্তি হয়ে পড়ছে অসহায়।

করোনাকালে নেমে এসেছে অনিশ্চিয়তার ঘন অন্ধকার। সঙ্গে এসেছে তথ্য এবং অপতথ্যের মিশেল। নেই কোনো স্বচ্ছ তথ্যব্যবস্থা। আইইডিসিআর-এর মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারোনা সংক্রমণের হার, সুস্থ ও মৃত্যের পরিসংখ্যান। কী পরিমাণ জাতীয় সুরক্ষা সামগ্রী রয়েছে এর কোনো জাতীয় হালনাগাদ তথ্য নেই। যেখানে তথ্য থাকে না, সেখানে শেকড় গেড়ে বসে গুজব। একদিকে অসুস্থতা, অপরদিকে তথ্যশূন্যতা ও গুজব মিলিয়ে এক ধরনের নতুন ‘পাবলিক সাইকি’।

এর একটি বিশেষ দিক হলো জন-অস্থিরতা। এই অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে যে পাবলিক আচরণ তৈরি হচ্ছে, তার একটি বিশেষ দিক হলো পারস্পরিক আস্থাহীনতা। জনগণ তথ্য শূন্যতায় নিজেদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় অসহায় বোধ করছে। জনগণ জানে না করোনাকে ঘিরে আসলে কী হতে যাচ্ছে বা সামনের দিনগুলো কতটুকু অন্ধকারাচ্ছন্ন বা আলোকময়।

করোনাকালের চরম বাস্তবতা হচ্ছে অস্পষ্টতা। কেবল রাষ্ট্র পারে এ অস্পষ্টতা দূর করতে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, এ বিষয়ে রাষ্ট্রের রয়েছে ঢাক ঢাক গুড় গুড় অবস্থা। এটা যে কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটছে তা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। করোনা মহামারি প্রমাণ করছে, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি কতটা ভঙ্গুর। রাষ্ট্র জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।

বিপরীতে বেসরকারি উদ্যোগকে প্রণোদনা দিয়েছে। চারদিকে সুরম্য ও ঝকঝকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। যারা মূলত, স্বাস্থসেবার নামে জনস্বাস্থ্য নিয়ে এক ধরনের বাণিজ্যবৃত্তিতে লিপ্ত হয়েছে। তাদের এত চড়া চিকিৎসাব্যয় ভাবা যায় না, যা স্বল্প আয়ের বা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। করোনাকালে বেসরকারি ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ছে।

রোগব্যাধিকে ঘিরে যেসব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক গড়ে উঠেছে, সেগুলোর ওপর রাষ্ট্রের নজরদারির শৈথিল্য লক্ষ করা যায়। এর পেছনে রয়েছে বড় ধরনের রাজনীতি-অর্থনীতি। এসব প্রাইভেট ক্লিনিক ও হসপাতালের মালিকানার সঙ্গে রয়েছে রাজনীতির সংযোগ। ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, একদিকে ভঙ্গুর সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অপরদিকে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের উচ্চ চিকিৎসাব্যয়। এই দুয়ের চোরাগলিতে ঢুকে পড়েছে জনগণ। এই চোরাগলির সুড়ঙ্গ ক্রমশও দীর্ঘ হচ্ছে। রাষ্ট্র যদি অন্ধকার জিইয়ে রাখে এবং তা আলোকায়নের উদ্যোগ না নেয়, তবে তা জনগণের জন্য চরম দুরাশার ব্যাপার হবে।

অন্ধকার পথে কোনো মুক্তি নেই। রাষ্ট্রের সামর্থ্য, প্রস্তুতি ও দক্ষতা নিয়ে জনগণ জানতে পারলে তাতে ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি। কিন্তু জনগণের সে জানার সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। করোনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং সুরক্ষা উপকরণের সহজলভ্যতা ও স্বাস্থ্যসেবা। প্রতিটি মানুষের বাঁচার অধিকার রয়েছে। আর এ অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকাই মুখ্য। নাগরিকের শরীর নিয়ন্ত্রণ নয়, নয় কোনো রাজনীতি। নাগরিকের জীবন সুরক্ষাই রাষ্ট্রের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত।

লেখক: প্রাবন্ধিক, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।

আরও পড়ুন:
স্মৃতি ২৫ মার্চ ’৭১ বিশ্বাসঘাতকতার একরাত
পাকিস্তানি গণহত্যা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
একাত্তরে পাকিস্তানের গণহত্যা মহাকলঙ্কজনক অধ্যায়
ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়
প্রকাশিত হোক পাকিস্তানি গণহত্যার বিবরণ

শেয়ার করুন

এলপিজির দাম পুনর্নির্ধারণ কতটা যৌক্তিক?

এলপিজির দাম পুনর্নির্ধারণ কতটা যৌক্তিক?

শহরাঞ্চলের ভোক্তারা এখন ভীষণ অসহায়। লাকড়ি ব্যবহার করার উপায় নেই ফলে জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু জ্বালানির মূল্য উৎসভেদে ভিন্ন থাকায় ভোক্তারা অসমনীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহারে ঢাকা শহরে দুই চুলার জন্য মাসিক স্থায়ী খরচ বর্তমানে ৯৫০ টাকা। কিন্তু যারা প্রি-পেইড মিটার ব্যবহার করেন, তাদের খরচ যথেষ্ট কম।

একই দ্রব্যের যদি পরিমাণ ও মান একই রকম থাকে, তাহলে দাম একই রকম হবে। কেউ কি দ্বিমত করবেন এর সঙ্গে? সবাই বলবেন এ তো সাধারণ কথা, যা সবাই সত্য বলে মেনে নেবে। কিন্তু এই সাধারণ সত্যের প্রয়োগ দেখছি না আমরা এখন অনেক ক্ষেত্রেই। যার সাম্প্রতিক নিদর্শন এলপিজির মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঘটল।

দীর্ঘ ২০ বছর পর এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৫৯১ টাকা আর বেসরকারি কোম্পানির ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৯৭৫ টাকা। সাড়ে ১২ কেজির দাম তাহলে ১ হাজার ১৭ টাকা। একই ধরনের দহন ক্ষমতাসম্পন্ন জ্বালানি কিন্তু দামের জ্বালাটা ভিন্ন।

বলা হয়ে থাকে চাহিদা এবং জোগান দ্বারাই সব জিনিসের দাম নির্ধারিত হয়। তাহলে প্রথমেই দেখা যাক এ দেশে এলপি গ্যাসের বাজার তথা চাহিদা ও জোগান কেমন। বিইআরসির দেয়া তথ্য থেকে বুঝা যায় যে, দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। ২০০৮ সালে এ দেশে এলপি গ্যাসের মোট ব্যবহার ছিল যেখানে মাত্র ৫০ মেট্রিক টন, ২০২০ সালে তা বেড়ে ১,০২০ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ১২ বছরে চাহিদা বেড়েছে ২০ গুণ।

২০০৮ সালে এ দেশে গৃহস্থালি রন্ধনকাজে মাথাপিছু এলপি গ্যাসের ব্যবহার ছিল ০.৩ কেজি, কিন্তু ২০২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৫.৬৩ কেজিতে। গৃহস্থালি রন্ধনকাজে এ দেশে এলপি গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে তা সত্ত্বেও এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এখনও যথেষ্ট কম। যেমন জাপানে মাথাপিছু এলপি গ্যাসের ব্যবহার ৫৮ কেজি, মালয়েশিয়ায় ২১, ভারতে ১৬, ভিয়েতনামে ১৩ কেজি।

বিইআরসির প্রদত্ত তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১১ শতাংশ বা ৩৮ লাখ পরিবার এলপিজি ব্যবহারকারী। অন্যদিকে মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৩ শতাংশ রান্নায় প্রাকৃতিক গ্যাস বা এনজি ব্যবহারকারী। সামান্য কিছু মানুষ বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে। এ ছাড়া বাকি প্রায় ৭৫ ভাগ জনগোষ্ঠী রান্নায় জ্বালানির জন্য বায়োমাসের ওপর নির্ভর করে থাকেন। দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রন্ধনকাজের পাশাপাশি শিল্প, বাণিজ্য ও অটোমোবাইল খাতেও এলপি গ্যাসের ব্যবহার বেশ ভালো মাত্রায় শুরু হয়েছে।

চাহিদা এবং মুনাফা যেখানে সেখানেই পুঁজিপতি ব্যবসায়ীরা ছুটবেন, বিনিয়োগ করবেন। জ্বালানির ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ২৯টি সরকারি-বেসরকারি কোম্পানি এলপিজি আমদানি, মজুতকরণ, বিতরণ, সরবরাহের কাজে নিয়োজিত। এলপিজির ডিলার প্রায় ৩ হাজার, আমদানিকারী অপারেটর ২০টি এবং এলপিজি আমদানি টার্মিনাল রয়েছে ১৪টি।

উল্লেখ্য, দেশে এলপি সরবরাহের সিংহভাগই (প্রায় ৯৮ শতাংশ) মেটানো হয় বেসরকারি খাতের মাধ্যমে। বাংলাদেশ মূলত কাতার, সংযুক্ত আরব-আমিরাত এবং সৌদি আরব থেকে এলপিজি আমদানি করে থাকে।

জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের জন্য এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন গণশুনানির আয়োজন করে থাকে। এ বছরের শুরুতে তেমনি এক গণশুনানির প্রাথমিক ধাপে ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি এলপিজি কোম্পানি, ব্যক্তিমালিকানাধীন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেড বিইআরসিতে এলপিজির মূল্যহার পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব দাখিল করেছিল। আরও দুটি বেসরকারি এলপিজি কোম্পানি কোনো প্রস্তাব পেশ করেনি। তারা লোয়াবের প্রস্তাবে অভিন্ন মত পোষণ করে পত্র দিয়েছে। অপর আরেকটি ব্যক্তিমালিকানাধীন এলপিজি কোম্পানি কোনো প্রস্তাব না দিয়ে সৌদিভিত্তিক এলপিজি উৎপাদক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আরামকো ঘোষিত এলপিজির মূল্যতালিকা পেশ করেছিল। প্রস্তাবে ১২ কেজি ওজনের সিলিন্ডার বা বোতলজাত গ্যাসে বেসরকারি সর্বোচ্চ ১০৬০ টাকা এবং সরকারি কোম্পানি কর্তৃক পেশকৃত সর্বনিম্ন মূল্য ৬০০-৭০০ টাকা বলা হয়েছিল। (তথ্যসূত্র: দৈনিক বণিক বার্তা, জানুয়ারি ১৪, ২০২১)।

এই মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, এর মানদণ্ড বা মাপকাঠিই বা কী হবে? বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন কর্তৃক গঠিত কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি মূল্য নির্ধারণের একটি সুপারিশ করেছে। এই সুপারিশমালার ৮ (১০) ক্রমে দেখা যায়, মোট ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের ইমপোর্ট প্যারিটি প্রাইস, অভ্যন্তরীণ পরিবহন, ডিলারদের মার্জিন, পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় যেমন মজুত, বিপণন ও বিতরণ, সংশ্লিষ্ট অবচয় যেমন মজুত, বিপণন ও বিতরণ, আয়কর ও অন্যান্য মজুত, বিপণন ও বিতরণ সংশ্লিষ্ট কর অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে বেসরকারি সরবরাহকারীদের সংগঠন লোয়াবের পেশকৃত মূল্যহারে অন্যান্য ব্যয়ের পাশাপাশি স্থায়ী ব্যয় উশুলকে ধরা হয়েছে। যা কারিগরি কমিটির মূল্যায়নে অবচয় খাতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা।
বাংলাদেশে গৃহস্থালি জ্বালানির বিকল্প উৎস হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ না দেয়া এবং একমাত্র রাষ্ট্রীয় এলপিজি সরবরাহকারী কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেডকে সীমিত পরিসরে রাখার (যারা মাত্র ২ শতাংশ সরবরাহে সক্ষম) ফলে এলপি গ্যাসের বাজারে বেসরকারি উদ্যোগকে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। বর্তমানে ২৯টি কোম্পানি এলপি গ্যাস আমদানি, বিতরণ ও বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তারা চাহিদার ৯৮ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে। আপাতদৃষ্টিতে এখানে প্রতিযোগিতা থাকার কথা কিন্তু দৃশ্যত তারা তাদের কার্টেল ও সিন্ডিকেট (যেমন লোয়াব) গঠন করে সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণ করে মুনাফা নিশ্চিত করে চলেছে।

শহরাঞ্চলের ভোক্তারা এখন ভীষণ অসহায়। লাকড়ি ব্যবহার করার উপায় নেই ফলে জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু জ্বালানির মূল্য উৎসভেদে ভিন্ন থাকায় ভোক্তারা অসমনীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহারে ঢাকা শহরে দুই চুলার জন্য মাসিক স্থায়ী খরচ বর্তমানে ৯৫০ টাকা। কিন্তু যারা প্রি-পেইড মিটার ব্যবহার করেন, তাদের খরচ যথেষ্ট কম।

ব্যবহারকারী পর্যায়ে কথা বলে জানা যায়, ১ হাজার টাকা রিচার্জ করলে গড়পড়তা ৫ জনের পরিবারে প্রায় দেড় মাসের বেশি চলে। মিটারবিহীন সংযোগে ভোক্তারা মাসে পরিশোধ করছেন ৯৫০ টাকা। পাইপ লাইনের গ্যাসের তবু হিসাব আছে, এলপি গ্যাসের ক্ষেত্রে খরচের সঠিক আন্দাজ করা দুরূহ। একদিকে এলপিজির বাজারমূল্য অস্থিতিশীল, যা এ মাসে ৯৫০ তো অন্য মাসে ১ হাজার ২০০ টাকা। আবার ১২ কেজির বোতলজাত গ্যাসে কখনও কখনও ১ মাসও যায় না। সে ক্ষেত্রে এলপিজি ব্যবহারকারী মাসে গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকার বেশি খরচ করে থাকে। শ্রমজীবীদের কথা তো বাদ, মাসে ৩০ হাজার টাকা উপার্জনকারীর যদি আয়ের ৫ থেকে ৬ শতাংশ জ্বালানির জন্য ব্যবহার করতে হয়, তাহলে সংসার চালানো যে কত কঠিন তা তারা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেন।

উন্নত অনেক দেশ যেমন জাপানে প্রাকৃতিক গ্যাস সঞ্চালন লাইনের পাশাপাশি এলপিজি বিদ্যমান। কিন্তু আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে বর্তমানে প্রাকৃতিক এবং এলপি গ্যাসের পরিবর্তে বিদ্যুতের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ভারতে এলপিজি ব্যবহারকারী প্রতিটি পরিবার বছরে প্রথম ১২টি ১৪.২ কেজি ওজনের বোতল ভর্তুকিতে পেয়ে থাকে। কোনো পরিবার এর চেয়ে বেশি ব্যবহার করলে বাজারমূল্যে ব্যবহার করে থাকে। জাপানে এলপি গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শীত-গ্রীষ্মে সঞ্চালনের প্রেশার পরীক্ষা করত রিফিলিং বা প্রতিস্থাপন নিজ দায়িত্ব করে থাকে।

এলপিজি গ্রাহক প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারকারী গ্রাহকের মতোই মাসিক বিল পরিশোধ করেন। ভারতেও এলপি গ্যাস সরবরাহ এবং ব্যবহার বেশ সহজতর। সেখানে প্রথমত নিয়ম মেনে ব্যবহারকারীকে নিবন্ধন করতে হয়। গ্রাহক বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে এলপি গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পেতে পারেন। যেমন, বিপণন এজেন্সি, অনলাইন অর্ডার, মোবাইল অ্যাপস, এসএমএস, আইভিআরএস বা ইন্টার-অ্যাকটিভ ভয়েস রেসপন্স সিস্টেম ব্যবহারের মাধ্যমে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ এ কথা বাংলাদেশের মতো আর কথাও হয়তো এত বেশি উচ্চারিত হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের অন্যান্য খাতের মতো এলপি গ্যাস ব্যবহারকারী গ্রাহক ডিজিটাল সেবার তেমন কিছুই পান না। অনেক ক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই জ্বালানি সংগ্রহ করতে বেশ বেগ পেতে হয়।

অঞ্চলভেদে মূল্যের তারতম্য তো আছেই। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি সরবরাহকারী এলপি গ্যাস কোম্পানির সক্ষমতা মাত্র ২ শতাংশ বিধায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেটদের হিমশিম খেতে দেখা যায়। অনেক সময় দেখা যায় তারা যে মূল্যতালিকা ঝুলিয়ে দেন, তা কোথাও মানা হয় না। দোহাই সেই একটাই! সরবরাহ কম, তাড়াতাড়ি নিয়ে যান, পরে আরও বেশি দামে কিনতে হবে। ক্রেতারা আর কী করবেন? আরও দাম বাড়ার ভয়ে কিনে নিয়ে যান বাড়িতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্যাপারটা কি যৌক্তিক বা ন্যায্য হচ্ছে?

লেখক: রাজনীতিক, কলাম লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
স্মৃতি ২৫ মার্চ ’৭১ বিশ্বাসঘাতকতার একরাত
পাকিস্তানি গণহত্যা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
একাত্তরে পাকিস্তানের গণহত্যা মহাকলঙ্কজনক অধ্যায়
ইতিহাসের কৃষ্ণ অধ্যায়
প্রকাশিত হোক পাকিস্তানি গণহত্যার বিবরণ

শেয়ার করুন