স্বাধীনতার ৫০ বছর, মহামারি ও রাজনীতি

স্বাধীনতার ৫০ বছর, মহামারি ও রাজনীতি

একটি বড় সময় ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপরিচালনার নেতৃত্ব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের হাতে ছিল না। সে কারণে রাজনীতিতে বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। আদর্শহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সুবিধাবাদ, উগ্র মতাদর্শিক হঠকারিতা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের জলাঞ্জলির মতো বিষয়গুলো রাষ্ট্র-রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, এবং ব্যাপক মানুষের মনোজগতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে আমরা সেই রাজনৈতিক আদর্শবান, মেধাবী ও নিষ্ঠাবানদের আর খুঁজে পাই না।

মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর এবার উদযাপিত হতে যাচ্ছে। এমন একটি ঐতিহাসিক সময় জাতির জীবনে আর কখনও আসবে না। ৫০ বছরে আমাদের অর্জনসমূহ যেমন দেখার সুযোগ ঘটছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারিনি; সেগুলো আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

মার্চ থেকে সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, পেশাজীবী সংগঠন স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে কী ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তা হয়তো দেখতে পাব। মোটাদাগে বাংলাদেশ ৫০ বছরে আর্থ-সামাজিকভাবে ভালো একটি অর্জনের জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছে। একসময় পৃথিবীর অনেক দেশ বাংলাদেশকে হতদরিদ্র বলে আখ্যায়িত করত। এখন এই দেশটিই মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করার কৃতিত্ব অর্জন করেছে।

সর্বশেষ সংবাদ হচ্ছে, জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দিয়েছে। তবে যেটি দেখা ও বোঝার বিষয়, তা হচ্ছে ভিশনারি-মিশনারি রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে, উন্নয়ন ও মানবকল্যাণের ধারণা বাস্তবায়নে কাজ করেছে, তখনই বাংলাদেশ অগ্রগতির চাকা দ্রুত ঘোরাতে পেরেছে। তবে দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হচ্ছে, একটি বড় সময় ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপরিচালনার নেতৃত্ব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের হাতে ছিল না। সে কারণে রাজনীতিতে বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। আদর্শহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সুবিধাবাদ, উগ্র মতাদর্শিক হঠকারিতা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের জলাঞ্জলির মতো বিষয়গুলো রাষ্ট্র-রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, এবং ব্যাপক মানুষের মনোজগতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে আমরা সেই রাজনৈতিক আদর্শবান, মেধাবী ও নিষ্ঠাবানদের আর খুঁজে পাই না।

বাংলাদেশ ৫০ বছরে অর্থনৈতিক জিডিপিতে প্রশংসনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কিন্তু সেই তুলনায় রাজনীতির গুণগত প্রবৃদ্ধি আমাদেরকে আশাহত করে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো ৫০ বছর পূর্তির আনুষ্ঠানিকতায় কতখানি ভেবে দেখবে কিংবা প্রস্তুতি নেবে সেটি দেখার বিষয়। তবে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের একটি বড় ধরনের বিস্তারের সময় পৃথিবীব্যাপী পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরাও এর ভয়ানক প্রভাব থেকে মুক্ত নই। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের ভাবাদর্শ যদি চর্চায় স্থান না পায়, তাহলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আগামীর দিনগুলোতে কতটা প্রতিষ্ঠিত থাকবে তা বলা কঠিন। সে ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন গভীর সংকটে পড়তে পারে। এর নজির পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন, নাইজার, সুদান, নাইজেরিয়াসহ বেশ কিছু দেশ এখন ভয়ানক সংকটে রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ওইসব শক্তির আদর্শগত মিল অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ করা যায়।

সুতরাং স্বাধীনতার ৫০ বছরে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে পেছনের এই অপশক্তির উৎসমূলকে যেমন চিহ্নিত করতে হবে, একইভাবে সামনের বছরগুলোতে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারার রাষ্ট্র, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে নিষ্ঠাবান, দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেই হবে।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির এই সময়ে বৈশ্বিক মহামারি করোনা সংক্রমণের সংকট আমাদেরকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছিল। তারপরও দেশে খাদ্যঘাটতি না থাকায় তখন সংকটটা মোকাবিলা করা গেছে , দেশে করোনা চিকিৎসায় শূন্য থেকে অন্তত আক্রান্তদের চিকিৎসা দেয়ার মতো হাসপাতাল, চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক কিছু অনুকূল আবহাওয়াগত পরিবেশ থাকায় মহামারিটি ইউরোপ, আমেরিকার মতো এখানে ব্যাপকভাবে ছড়ায়নি। করোনায় আমাদের মৃত্যু সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও অনেক মুল্যবান মানুষকে আমাদের হারাতে হয়েছে।

এছাড়াও করোনার ধাক্কা আমাদেরও জিডিপিতে নেতিবাচকভাবে কিছুটা হলেও পড়েছে। সবচাইতে বড় ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। এমনিতেই শিক্ষার মান নিয়ে আমাদের যথেষ্ট রকম অতৃপ্তি রয়েছে, তার ওপর এক বছর হতে চলল করোনার কারণে শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ফিরতে পারছে না।

অনলাইন মাধ্যম হিসেবে আমাদের দেশে খুব একটা বিস্তার লাভ করতে পারেনি। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকগণ এই অবস্থায় অস্থির হয়ে উঠেছেন। এর কিছু বহিঃপ্রকাশ সম্প্রতি রাস্তায় আন্দোলনে দেখা গেছে। তবে বাংলাদেশে টিকাগ্রহণের উদ্যোগটি বিশ্বের অনেক দেশের চাইতেও আগে শুরু করতে পারার কারণে আশা করা যাচ্ছে দু-তিন মাসের মধ্যেই করোনার সংক্রমণের রাশ টেনে ধরা সম্ভব হতে পারে। এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার একটি প্রটোকল ঘোষণা করেছে। ফলে দু-তিন মাস পরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে লেখাপড়ার পরিবেশ আবার ফিরে আনার চেষ্টা হবে- সেটি যেন কোনো অবস্থাতেই ব্যাহত না হয়, তা সকল মহলকে মনে রাখতে হবে। এমনিতেই গত এক বছরে করোনার কারণে যে সংকটের ঢেউ লেগেছে তাতে অনেকেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, নানা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। এই সংকট অতিক্রম করার চ্যালেঞ্জ ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে নেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক এই সংকট আমাদের এখানে নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতার সঙ্গে কর্মহারাদের অনেককেই যুক্ত হতে দেখা গেছে। এর সঙ্গে রয়েছে নানা ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি, জোর-জবরদস্তি এবং প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা। ফলে সমাজজীবনে অস্থিরতার লক্ষণ বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। এটিকে মোকাবিলা করার জন্য রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তই নতুন অঘটন ঘটছে।

অপরদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও চলছে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। ক্ষমতাশীন সরকারের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগে ২০১৯ সালে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছিল সেটি এখন খুব একটা শোনা ও দেখা যাচ্ছে না। দলের অভ্যন্তরে নানা ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অপতৎপরতাও মাঝেমধ্যে প্রকাশিত হয়।

সম্প্রতি নোয়াখালি অঞ্চলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে দেশব্যাপী যে তোলপাড় লক্ষ্ করা গেছে তা দলকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে সেটি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কেন আগে থেকে রাশ টেনে ধরতে পারেননি সেই প্রশ্ন সকল মহলেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি দেশের অন্যত্র দৃশ্যমান না হলেও জেলা-উপজেলাগুলোতে গ্রুপিং, বিভাজন, এবং স্থানীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা ধরনের বিরোধ প্রকাশ্য হয়েছে। বেশ কজন নিহতও হয়েছেন। সুতরাং, ক্ষমতাশীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে এখন যা চলছে তা দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার ভাবমূর্তিকে সাধারণ পর্যায়ে ক্ষুণ্ন করছে।

অপরদিকে, সরকার উৎখাতের নানা ধরনের হুংকার ও আলামত দেশে-বিদেশে বসে অনেকেই দিচ্ছেন। সেসব প্রচার-প্রচারণা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কতখানি প্রচার পাচ্ছে তা দেখার বিষয়। স্বাধীনতার ৫০ বছরের এই সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে একটি মহল উৎখাত ও ষড়যন্ত্রের যে প্রস্তুতি ও আহ্বানের কথা বলছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তারা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না, কিন্তু তাদের আত্মাহুতিকে আমরা সবাই মুখে শ্রদ্ধা করি, তাদের জীবন উৎসর্গের পেছনে যেসব মহৎ উদ্দেশ্য ছিল সেগুলোকে কতটা স্মরণ ও শ্রদ্ধা করছি সেটি ভেবে দেখার বিষয়।

লেখক : অধ্যাপক, গবেষক, সমাজচিন্তক

আরও পড়ুন:
হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু নেই
ঘাতক বিষয়ে কিছু কথা
টিকায় বদলাচ্ছে প্রচলিত প্রেক্ষাপট
তিনিও অদম্য
নাইট রাইডার্সের সাকিব ও আমার ভালোবাসাশূন্য কথা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

হেফাজতের রাজনৈতিক চরিত্র ও নষ্ট অভিলাষ

হেফাজতের রাজনৈতিক চরিত্র ও নষ্ট অভিলাষ

নিজেদের অরাজনৈতিক ইসলামি সংগঠন হিসেবে দাবি করলেও আহমদ শফীর মৃত্যুর পর বাস্তবে হেফাজতে ইসলামের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। শফীর সঙ্গে সরকারের সুসম্পর্ক থাকায় যেহেতু এই অংশটি তাদের স্বার্থ হাসিল করতে পারছিল না, তাই তাকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিতে নিষ্ঠুর পন্থা বেছে নেয়া হয়। পরিকল্পিতভাবে ঠেলে দেয়া হয় মৃত্যুর দিকে।

উগ্রবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ততধিক উগ্র নেতা মামুনুল হককে মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে গত ১৮ এপ্রিল গ্রেপ্তার করা হয়। পাশাপাশি, গত বেশ কিছুদিনে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে সংগঠনটির অন্তত চার শতাধিক নেতাকর্মীকে।

অপরদিকে, সরকারের কঠোর অবস্থান অনুধাবন করে কোণঠাসা হেফাজতের মূল নেতা জুনায়েদ বাবুনগরী এক ভিডিও বার্তায় ২৬ মার্চ-পরবর্তী ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

স্বাধীনতাবিরোধী এই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীটি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিববর্ষের উদযাপনকে ভালো চোখে দেখতে পারেনি। তারা একেবারে শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কটূক্তি করেছে, অপপ্রচার চালিয়েছে।

এর অংশ হিসেবে কৌশলী হেফাজত মামুনুলের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে মূর্তি হিসেবে উপস্থাপন করে গোটা দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এই ফতোয়া দেয়ার জন্য তারা মাসিক আল কাউসার আর জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দুটি লেখাকে ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল। যেখানে স্বয়ং আরবি ভাষাতে মূর্তি এবং ভাস্কর্যের বিষয় দুটোকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং আরবের দেশগুলোসহ মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোতে প্রচুর ভাস্কর্য থাকার নিদর্শন রয়েছে।

ওই সময়ে মামুনুল যে ভাষায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়েছিলেন তা ছিল রীতিমতো রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। যিনি এই রাষ্ট্রটির স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন, এই দেশটিকে স্বাধীনতা দান করেছেন- মামুনুল তার ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেয়ার স্পর্ধাও দেখিয়েছিলেন। অথচ এমনটি হওয়ার কথাই ছিল না। এই দুটো বিশেষ আয়োজনকে ঘিরে সারা দেশে আনন্দের বন্যা বয়ে যাবে, এটিই ছিল কাম্য।

অথচ, হেফাজতে ইসলাম এমনটি হতে দেয়নি। এই দুটো আয়োজনকে ঘিরে প্রথমে তারা কৌশলে বিরোধিতায় নামে এবং পরবর্তী সময়ে ব্যাপকভাবে তাণ্ডব-ভাঙচুরে নেতৃত্ব দেয়। তাদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের পেছনে লোক দেখানো কারণটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতা হলেও মূল কারণটি ছিল অন্য।

একটি নব্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে তারা পাকিস্তানপন্থি জামায়াত-বিএনপি, এমনকি প্রগতিশীলতার দাবিদার কিছু পচে যাওয়া সংগঠনের সাম্প্রদায়িক শক্তির শক্ত সহযোগী হিসেবে রাজনীতির মাঠে অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করতে চেয়েছিল।

এজন্য স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এমন একটি দেশের সরকারপ্রধানের বাংলাদেশে আগমনের বিরোধিতা করে নজিরবিহীন ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেয়া হয়, যে দেশটি মহান মুক্তিযুদ্ধে এক কোটিরও বেশি শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে, খাবার জুগিয়ে এবং সর্বোপরি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে বাংলাদেশের বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল।

এর কিছুদিন আগে মামুনুল হকের জনসভা পরবর্তী একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র তারা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনেও ন্যক্কারজনক সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব চালায় সুনামগঞ্জের শাল্লায়।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হেফাজতে ইসলাম বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনকে কলঙ্কিত করতে গত বছরের সেপ্টেম্বর অক্টোবরের দিক থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকে। এসবের নেতৃত্বেও ছিলেন হেফাজত নেতা মামুনুল হক। সরকারের সতর্ক এবং কৌশলী অবস্থানের কারণে তখন তাদের পরিকল্পনা পুরোপুরি সফলতার মুখ না দেখলেও ২০২১ সালের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনকে তারা পাখির চোখ করে।

এরই অংশ হিসেবে দলটির বর্তমান আমির জুনায়েদ বাবুনগরী এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মামুনুল হকসহ অন্যান্য নেতা ওয়াজ মাহফিলের নামে দেশব্যাপী স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারত এবং দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক উক্তি ছড়ানো শুরু করে। এসবে তারা সফলও হয়। একটি বিশেষ গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ইউটিউবে এসব ব্যাপকভাবে প্রচার করছিল।

এগুলোর মাধ্যমে তারা বার্তা দিতে চেয়েছিল যে- হেফাজতে ইসলাম এখন আর তাদের সাবেক প্রধান শাহ আহমেদ শফী এবং তার অনুসারীদের নিয়ে গঠিত সংগঠনটির মতো নেই। তারা এখন নতুন নেতৃত্বে একটি নব্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করছে।

হেফাজতে ইসলাম এখন এমন একটি সংগঠন যারা রাজনৈতিক দলের চেয়েও বেশি কিছু, যারা কৌশলগত কারণে দাবি করে যে তাদের কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই। কিন্তু এরা ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে দেশে ২০১৩ সালের মতো একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, যে পরিস্থিতির ওপর ভর করে বিএনপি জামায়াত দেশে গণ-অভ্যুত্থানের ডাক দিত। এসব আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে হেফাজতের বিভিন্ন প্রোগ্রামের সঙ্গে সংগতি রেখে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে।

আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম সরকারের পতন ঘটানোর উদ্দেশ্যে মতিঝিলে জমায়েত হয়ে কী তাণ্ডব সৃষ্টি করেছিল। সেদিনও তাদের প্রধান মিত্র ছিল বিএনপি।

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ধারণা করেছিলেন, হেফাজতিদের দিয়ে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরকারের পতন ঘটানো যাবে। বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের এই গোপন আঁতাত সম্পর্কে সম্প্রতি হেফাজত নেতা মুফতি ফখরুল ইসলাম ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম দেবদাস চন্দ্র অধিকারীর আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি জানান, ৫ মের অবরোধ কর্মসূচির এক সপ্তাহ আগে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে বাবুনগরীর নেতৃত্বে সাক্ষাৎ করেছিলেন হেফাজত নেতারা। এমনকি ওই সময় তারা জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন মুফতি ফখরুল ইসলাম।

জবানবন্দিতে তিনি আরও জানিয়েছেন, ওইসময় মাওলানা মাঈনুদ্দীন রুহী তাকে বলেছিলেন যে, আন্দোলন ও সহিংসতার বিষয়ে দুজন বিএনপি নেতা এবং একজন জামায়াত নেতা তাদের অর্থ সহযোগিতা করছে।

হেফাজতের প্রোগ্রাম শাপলা চত্বরে স্থায়ী হলে বিএনপি-জামায়াতও যোগ দেবে বলেও আলোচনা হয় বৈঠকে। কিন্তু সরকারের পতন না ঘটায় সেদিন নিরাশ হয়েছিল বিএনপি ও হেফাজত উভয়েই।

হেফাজত কিংবা মামুনুল ২০১৩ সালের মতো এবারও সরকারের শক্তিকে ভুল বুঝেছিল। যে কারণে তারা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ বানচালের পরিকল্পনা করে সরকারকে উৎখাতের পরিকল্পনা করছিল। এমনকি এখনও তারা সরকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে চলছে।

সরকার ঘোষণা দিয়েছে, এতিমখানা ছাড়া দেশের সব মাদ্রাসা বন্ধ থাকবে, চলবে না পরীক্ষাও। কিন্তু কে শোনে কার কথা? হেফাজত সরকারের সিদ্ধান্ত মানে না। দেশের সব মাদ্রাসায় তাদের দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষা চলেছে। ভাবখানা এমন, ‘সরকার আমাদের ব্যাপারে নির্দেশ দেয়ার কে?’

এই ধ্বজাধারীরা মানুষকে ধর্মের নামে উত্তেজিত করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে জ্বালাও পোড়াও করেছে, তা শুধু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। তারা শিশুদের রাস্তায় নামিয়েছে। অনেকে বলেন এরা ইসলামি দল। বাস্তবে এরা হচ্ছে একদল সন্ত্রাসী, যারা দিনের পর দিন ইসলামকে অপমানিত করে চলছে।

নিজেদের অরাজনৈতিক ইসলামি সংগঠন হিসেবে দাবি করলেও আহমেদ শফীর মৃত্যুর পর বাস্তবে হেফাজতে ইসলামের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। শফীর সঙ্গে সরকারের সুসম্পর্ক থাকায় যেহেতু এই অংশটি তাদের স্বার্থ হাসিল করতে পারছিল না, তাই তাকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিতে নিষ্ঠুর পন্থা বেছে নেয়া হয়। পরিকল্পিতভাবে ঠেলে দেয়া হয় মৃত্যুর দিকে।

ইতোমধ্যে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এই হত্যার সঙ্গে হেফাজতের বর্তমান আমির জুনায়েদ বাবুনগরী, যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক ও সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদীসহ ৪৩ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে।

হেফাজতের আরও গোমর ফাঁস হয় গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে ‘প্রয়াত শাহ আহমেদ শফীর জীবনকর্ম, অবদান’ শীর্ষক আলোচনা ও মতবিনিময় সভায়। ওই সভায় শফিঘনিষ্ঠ হেফাজতের সাবেক নেতারা দাবি করেন, হাটহাজারী মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর করার পাশাপাশি আল্লামা শফীর প্রতি চরম বেয়াদবি করা হয়। গৃহবন্দি করে নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে শাহাদাত বরণ করতে বাধ্য করা হয়েছে। তারা জানান, খাবার-ওষুধ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, অ্যাম্বুলেন্স বন্ধ ছিল- আর এগুলোই ছিল আহমেদ শফীর মৃত্যুর মূল কারণ।

ওইসময় মামুনুল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না আসতে পারলেও গত বছর বাবুনগরী গ্রুপের বিদ্রোহের মুখে বিনা চিকিৎসায় আল্লামা শফীর মৃত্যুর পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট। শফীর অনুসারীদের দূরে সরিয়ে রেখে হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটিতে মূলনেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয় জুনায়েদ বাবুনগরীকে। এক নম্বর যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে নিয়ে আসা হয় বাবুনগরীর চাইতে আরও একধাপ বেশি উগ্র মামুনুল হককে। গত ডিসেম্বরে মহাসচিব মাওলানা নূর হোসেন কাসেমী মারা যাওয়ার পর কার্যত যাকে সংগঠনটির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ধরা হয়।

তিনি এবং জামায়াতঘেঁষা কয়েকজন নেতা আল্লামা শাহ আহমেদ শফীর জানাযায় জামায়াত-শিবিরের নেতৃবৃন্দকে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে জামায়াতের সঙ্গে হেফাজতের সেতুবন্ধন সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। এসব সমীকরণে হেফাজতের নতুন কমিটিতে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এক তৃতীয়াংশ নেতাই আসে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের দলগুলো থেকে। আর এই কারণেই হেফাজতের এবারের হরতালে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের লোকজন ঢুকে হামলা ভাঙচুর করে।

বাংলাদেশের মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন এবং স্বাধীনতাবিরোধী কার্যকলাপে একটি বিদেশি দূতাবাস ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার বড় ভূমিকার অভিযোগ আছে। বার বার সতর্ক করার পরও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা এবং ভারতবিরোধী কার্যকলাপ চালিয়ে আসা তাদের পুরনো স্বভাব। এবারে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে মামুনুলদের সঙ্গে তাদের কীভাবে কতটুকু ভূমিকা ছিল সেটা নিয়েও সরকারকে ভাবতে হবে।

বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো দেওবন্দের আদলে প্রতিষ্ঠিত এবং নীতি-আদর্শে পরিচালিত হয়। তবে দেওবন্দের ওলামারা ঐতিহ্যগতভাবে সরাসরি রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতের কাছে তাদের মূল পরিচয় গৌণ হয়ে রাজনৈতিক অভিলাষ বড় হয়ে পড়েছে।

অপরদিকে, দেওবন্দে যারা পড়ালেখা করেন তারা ভারতে ইসলামের নামে কোনো সন্ত্রাস বা সহিংসতা সৃষ্টি না করলেও ২০১৩ সালের মে থেকে এই সংগঠনটি এতটাই উগ্র আর ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে যে, এর জন্য মানুষের মুক্তচিন্তা, স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়াই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৬, ২৭ ও ২৮ মার্চ তারা দেখিয়েছে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং স্বাভাবিক জীবনের জন্য তারা কত বড় হুমকি। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনের এই বিষাক্ত চক্র থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে।

সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের আশঙ্কা থেকে যে অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছে তা থেকে উত্তরণে সময় এসেছে এখন গণজাগরণের। বঙ্গবন্ধুকন্যা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা নানা ধরনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে যেভাবে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করে ফাঁসি কার্যকর করেছেন, জঙ্গিবাদকে দমন করেছেন- রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ রক্ষার জন্য আরও একবার তাকে ওইরকম সাহস ও দৃঢ়তার পরিচয় দিতে হবে। হেফাজতে ইসলাম নামক সংগঠন, জামায়াতে ইসলামীর স্টাইলে যারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের বিষয়ে সরকারকে এখনই কঠোর এবং নির্মোহ সিদ্ধান্তে আসতে হবে। এই সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানপন্থিদের জন্য কোনো সহমর্মিতা থাকতে পারে না।

লেখক: কবি, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু নেই
ঘাতক বিষয়ে কিছু কথা
টিকায় বদলাচ্ছে প্রচলিত প্রেক্ষাপট
তিনিও অদম্য
নাইট রাইডার্সের সাকিব ও আমার ভালোবাসাশূন্য কথা

শেয়ার করুন

প্রাণহানির তদন্ত প্রতিবেদন প্রাণ পাবে কবে?

প্রাণহানির তদন্ত প্রতিবেদন প্রাণ পাবে কবে?

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পণ্যবাহী জাহাজটির বেপরোয়া গতি দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। একই সঙ্গে শীতলক্ষ্যায় নির্মাণাধীন সেতুর পিলার নদীর মধ্যে স্থাপন করা এবং নৌপথে প্রতিবন্ধকতামূলক নির্মাণসামগ্রী রাখায় নৌপথ সরু হয়ে গেছে। যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। প্রতিবেদনে সেতুর পিলার সরিয়ে নদীর প্রশস্ততা বাড়ানো, ছোট আকারের সানকেন ডেকবিশিষ্ট লঞ্চ ক্রমান্বয়ে সরিয়ে দেয়া, অলস জাহাজ যেখানেসেখানে পার্কিং বন্ধ করাসহ বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়।

করোনায় মৃত্যুর ভিড়ে রাজধানীর অদূরে শীতলক্ষ্যা নদীতে কার্গোর ধাক্কায় লঞ্চডুবিতে ৩৫ জনের প্রাণহানি কি আড়াল হয়ে যাচ্ছে? গণমাধ্যমেও এর তেমন একটা ফলোআপ নেই। ওই ৩৫ জন মানে তো ৩৫টি পরিবার। তারা কেমন আছেন, কেউ খোঁজ নিয়েছেন?

এ ঘটনায় যে তদন্ত কমিটি হয়েছিল, সম্প্রতি তারা প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেখানে দুর্ঘটনার জন্য এমভি এসকেএল-৩ পণ্যবাহী কার্গোচালকের বেপরোয়া গতি ও কয়লাঘাট এলাকায় নির্মাণাধীন সেতু নির্মাণে ত্রুটিকে দায়ী করা হয়েছে। ১২ এপ্রিল ২৭ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। যেখানে কয়েকটি সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পণ্যবাহী জাহাজটির বেপরোয়া গতি দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। একই সঙ্গে শীতলক্ষ্যায় নির্মাণাধীন সেতুর পিলার নদীর মধ্যে স্থাপন করা এবং নৌপথে প্রতিবন্ধকতামূলক নির্মাণসামগ্রী রাখায় নৌপথ সরু হয়ে গেছে। যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। প্রতিবেদনে সেতুর পিলার সরিয়ে নদীর প্রশস্ততা বাড়ানো, ছোট আকারের সানকেন ডেকবিশিষ্ট লঞ্চ ক্রমান্বয়ে সরিয়ে দেয়া, অলস জাহাজ যেখানেসেখানে পার্কিং বন্ধ করাসহ বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়।

প্রসঙ্গত, ৪ এপ্রিল সন্ধ্যার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের বিআইডব্লিউটিএ টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী লঞ্চ এমএল সাবিত আল হাসানকে শহরের কয়লাঘাট এলাকায় পেছন থেকে ধাক্কা দেয় কার্গো জাহাজ এসকেএল-৩। এতে লঞ্চটি ডুবে যায়। লঞ্চের অনেকে সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও নিখোঁজ থাকেন অনেকে। পরে ৩৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

কয়লাঘাট এলাকায় তদন্ত কমিটির গণশুনানিতে সাক্ষ্য দিতে আসা যাত্রীরা জানান, সেদিনের দুর্ঘটনার কথা ভোলার নয়। জাহাজটি তাদের লঞ্চকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়। বেপরোয়া জাহাজ চালানোর দায়ে তারা সংশ্লিষ্টদের শাস্তির দাবি জানান।

প্রতিটি দুর্ঘটনার পরেই এ রকম তদন্ত কমিটি হয়। কোনো কোনো কমিটিকে ‘উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি’ নামেও অভিহিত করা হয়। তদন্ত কমিটির লোকজন সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার নেন। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। কখনও বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটিও হয়। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই এসব তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে না। অনেক সময় সেই রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেয়া হলেও গণমাধ্যমকে জানানো হয় না। আবার এ-জাতীয় ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য রিপোর্টে কিছু সুপারিশও থাকে। কিন্তু সংগত কারণেই সেসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় না, বা করা হয় না।

দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি বড় তদন্ত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৭ সালে ছাত্র-শিক্ষক নির্যাতনের ঘটনায়। নবম সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ওই তদন্ত করে এবং তারা একটি বড় তদন্ত রিপোর্ট সংসদে পেশ করে, যেখানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদকে দায়ী করে তাদের বিচারের সুপারিশ করা হয়। সেই সঙ্গে ওই সময়ে ওই স্থানে দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকের নাম উল্লেখ করে প্রচলিত আইনে বিচারের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সেসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।

পুরান ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ আগুনে ৮০ জনের বেশি প্রাণহানির ঘটনায়ও তদন্ত কমিটি হয়েছিল। কমিটি হয়েছিল বনানীতে বহুতল ভবনে আগুনের ঘটনায়। তা ছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যখনই বস্তিতে আগুন লাগে, সঙ্গে সঙ্গেই তদন্ত কমিটি হয়। কিন্তু এসব কমিটির রিপোর্টে কী থাকে তা যেমন সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ হয় না, তেমনি এসব রিপোর্টের সুপারিশগুলো কেন বাস্তবায়ন হয় না, তাও এখন অজস্র প্রশ্ন। কেননা, ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যালের গোডাউনে লাগা আগুনে ১২৪ জনের মৃত্যুর পরে যে তদন্ত কমিটি হয়েছিল, তাদের সুপারিশগুলো যে বাস্তবায়িত হয়নি, তার প্রমাণ চকবাজারে একই কায়দায় আগুন। নিমতলীর আগুনের ঘটনায় তদন্ত রিপোর্টে আবাসিক এলাকা থেকে কেমিক্যালের গোডাউন সরিয়ে ফেলার সুপারিশ করা হয়। সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। হলে ৯ বছরের মাথায় গিয়ে এরকম আরেকটি ট্র্যাজেডি দেখতে হতো না দেশবাসীকে।

সদ্যপ্রয়াত লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ তার একটি লেখায় (প্রথম আলো, ৩১ জুলাই ২০১৮) উল্লেখ করেছিলেন, ‘৯৯ ভাগ তদন্ত কমিটি গঠিত হয় ক্ষুব্ধ জনগণকে শান্ত করতে বা সান্ত্বনা দিতে। বাঙালি ৫০ বছর আগে যতটা বেকুব ছিল, আজ আর তা নেই। সে সবই বোঝে, কিন্তু তার করার কিছু নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের চাঞ্চল্যকর রিজার্ভ পাচার নিয়ে সরকার সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। যথাসময়ে তিনি প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। বোধগম্য কারণে তার সেই রিপোর্ট আজও প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করলে বাংলাদেশ ব্যাংক যতটা বিব্রত হতো, সেটি গোপনে তালা মেরে রাখায় সরকার অনেক বেশি সন্দেহভাজনে পরিণত হয়েছে। প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে।’

আশার কথা, শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবি নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি দ্রুতই প্রতিবেদন দিয়েছে এবং সেটি আলোর মুখ দেখেছে। কিন্তু তদন্ত কমিটি কতটা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে এবং তাদের ওপর কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল কি না— সে প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কার্গো জাহাজটির মালিক একজন সংসদ সদস্য এবং একটি প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান।

স্মরণ করা যেতে পারে, লঞ্চডুবির পরে তিন দিন ধরে থানায় ঘোরাঘুরির পরও পুলিশ মামলা নেয়নি। ডুবে যাওয়া লঞ্চ এমএল সাবিত আল হাসানের কেরানি মঞ্জুর হোসেনের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় গেলে বলে ফাঁড়িতে যেতে, ফাঁড়িতে গেলে বলে বন্দর থানায় যান। কেউ মামলা নিচ্ছে না। লঞ্চের চালক জাকির হোসেন বলেন, ‘থানায় ঘুরতাছি কিন্তু মামলা নেয় না। আজকে সারাদিন থানায় বসায় রাইখা বলে মামলা নিবে না।’ পুলিশ কেন মামলা নেয় না বা নিতে চায় না অথবা নিতে ভয় পায়— তা বুঝতে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই জাহাজটির চলাচলের অনুমতি ছিল না। তাহলে এটি কীভাবে চলল, কোন ক্ষমতার বলে?

কিন্তু তারপরও এই ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে এ জাতীয় দুর্ঘটনা এড়াতে যে কিছু সুপারিশ করা হয়েছে, সেটিই বরং আপাতত সান্ত্বনা। কিন্তু তদন্ত রিপোর্টে জাহাজের বেপরোয়া গতিকে দায়ী করা হলেও এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি কী হবে এবং যারা নিহত হলেন, তাদের ক্ষতিপূরণের কী ব্যবস্থা, সে প্রশ্ন আড়ালেই থাকছে।

দেশে এরকম নৌ দুর্ঘটনার মামলা হয় ১৯৭৬ সালের ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্সের (অভ্যন্তরীণ নৌ অধ্যাদেশ) আওতায়। কোনো কোনো দুর্ঘটনায় দণ্ডবিধির ধারাও আসে। দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা যদি প্রয়োগ করা যায় অর্থাৎ অপরাধজনক প্রাণনাশের অভিযোগ আনা হলে সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবির জন্যও কার্গোর বেপরোয়া গতিকে দায়ী করা হয়েছে।

সুতরাং কার্গো জাহাজ চালকের বেপরোয়া গতির কারণে লঞ্চ ডুবে ৩৫ জনের প্রাণহানির সর্বোচ্চ শাস্তি কী হবে এবং কতদিনে এই বিচার শেষ হবে— তা এখনই বলা মুশকিল। তবে চালকের যদি মৃত্যুদণ্ডও হয়, তারপরও কি ওই ৩৫ জনের জীবন ফেরানো যাবে? নিহতদের মধ্যে কতজন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন? দায়ী জাহাজের মালিক বা রাষ্ট্র কি ওই পরিবারগুলোর দায়িত্ব নেবে?

যে ৩৫ জন তার জাহাজের ধাক্কায় নিহত হলেন, তাদের স্বজন ন্যায়বিচার পাবেন কি না; বিচার কতদিনে শেষ হবে; নানা অজুহাতে বিচার প্রলম্বিত হবে কি না—এসব প্রশ্ন ও সংশয়ও থাকছে। কারণ আইন যে সবার জন্য সমান নয় এবং একই অপরাধে রাষ্ট্রের সব নাগরিক যে সমান শাস্তি ভোগ করে না, তার ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে।

যার ভুল-খামখেয়ালি-অদক্ষতা বা অপরাধে লঞ্চটি ডুবে গিয়ে এতগুলো মানুষের প্রাণহানি হলো, তার ক্ষতি নিরূপণের উপায়ইবা কী? একেকটি জীবনের দাম কত? বহু বছর আগে নৌডুবিতে নিহতদের পরিবারকে একটি করে ছাগল দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। সেই ঘটনার উল্লেখ করে মানুষ এখনও রসিকতা করে। বিদ্রূপ করে। তার মানে আমাদের দেশে একজন মনুষের জীবনের মূল্য একটি ছাগলের বেশি নয়। এ কারণেই বোধ হয় আমরা পরস্পরকে ‘ছাগল’ বলে গালি দিই। কিন্তু এবার নিহতদের পরিবারকে একটি করে ছাগল দেয়ার কথাও শোনা যায়নি। মানে জীবনের দাম আরও কমেছে!

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু নেই
ঘাতক বিষয়ে কিছু কথা
টিকায় বদলাচ্ছে প্রচলিত প্রেক্ষাপট
তিনিও অদম্য
নাইট রাইডার্সের সাকিব ও আমার ভালোবাসাশূন্য কথা

শেয়ার করুন

কোনো পক্ষেরই বাড়াবাড়ি কাম্য নয়

কোনো পক্ষেরই বাড়াবাড়ি কাম্য নয়

সব পেশাতেই ভালো এবং মন্দ মানুষ আছে। পেশাজীবীদের সংগঠনগুলো সদস্যদের মান ভুলত্রুটি সংশোধনের দিকে সামান্য নজর দিলেও হয়তো দেশের মানুষের উপকার হতো। মানুষের সেবা দেয়া যাদের কাজ, তাদের কেউ কেউ যে মানুষের প্রতি খারাপ আচরণ করেন, তারা যে অনেক সময় মানুষের বাড়তি দুঃখ-দুর্ভোগের কারণ হন। তা নিশ্চয়ই সংগঠনের নেতাদের অজানা নয়। কিন্তু কোনো সংগঠন কি তাদের কোনো সদস্যকে কখনও মানুষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্য নিন্দা বা তিরস্কার করেছেন? ক্ষমতা পেলে তার অপব্যবহার আমাদের একটি জাতীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ১৮ এপ্রিল রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে লকডাউনের মধ্যে একজন নারী চিকিৎসক, পুলিশ ইন্সপেক্টর এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যে যে বাগবিতণ্ডা হয়েছে, তা এখন অনেকেরই জানা। ঘটনার সময় ধারণকৃত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা হতে থাকে। কেউ মনে করছেন, চিকিৎসকের অন্যায়। তিনি বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। আবার কেউ বলছেন, পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেট বাড়াবাড়ি করেছেন। একটু ঠাণ্ডা মাথায় পুরো ঘটনাটি ভাবলে এটা বোঝা যায় যে, একটি ছোট ঘটনাকে বড় করে তুলতে তিনজনই সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন। এই বিষয়ে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এবং বিএমএ’র দেয়া বিবৃতি ফয়সালার পথে না হেঁটে পেশাগত বিদ্বেষ বাড়াতে প্ররোচনা জোগানো হয়েছে বলেও অনেকে মনে করছেন।

কী হয়েছিল সেদিন? এলিফ্যান্ট রোডের নিরাপত্তা চৌকিতে একজন চিকিৎসকের গাড়ি থামিয়ে পুলিশের একজন ইন্সপেক্টর এবং একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তার পরিচয়পত্র দেখতে চান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাঈদা শওকত জেনির কাছে তখন পরিচয়পত্র না থাকলেও লকডাউনের সময় হাসপাতালে কাজ করার আদেশনামা, গাড়িতে বিএসএমএমইউর স্টিকার এবং পরনে তার নাম লেখা গাউন ছিল। তারপরও তার সঙ্গে কর্তব্যরত পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট কেন নমনীয় না হয়ে পরিচয়পত্র না থাকার জন্য অসৌজন্যমূলক আচরণ করলেন, তা মোটেও স্বাভাবিক নয়। এ থেকে মনে হতে পারে যে, ওই দুইজনের ডাক্তারের প্রতি কোনো কারণে ক্ষোভ বা অসন্তোষ ছিল। সুযোগ পেয়ে তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

বলা হচ্ছে, চিকিৎসক ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করেছেন এবং গালি দিয়েছেন। এটাও অসত্য নয়। এখানে প্রশ্ন হলো, চিকিৎসক কি আগে উত্তেজিত হয়ে তুই বলেছেন, নাকি তাকে প্ররোচিত করা হয়েছে? নিশ্চয়ই কোনো অবস্থাতেই একজন চিকিৎসকের মুখে অশোভন শব্দ উচ্চারণ ঠিক নয়। সবাইকে তার শিক্ষা ও পদমর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কথাবার্তা, চালচলন করতে হবে। কিন্তু অন্যদিকটিও দেখতে হবে। একজন চিকিৎসককে না জেনে ‘ভুয়া’ বলা, পাপিয়া নামের একজন বিতর্কিত নেত্রীর সঙ্গে তুলনা করা কি ঠিক?

এলিফ্যান্ট রোডের ঘটনা দেখে মনে হয়, আমাদের দেশে লকডাউন কার্যকর করতে ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ সাহেবেরা বুঝি জীবনপণ করে মাঠে নেমেছেন। কাউকে বোধহয় বাইরে বের হতে দেয়া হচ্ছে না। বিষয়টি তো আসলে তা নয়। অপ্রয়োজনে, মিথ্যা কথা বলে অসংখ্য ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় চলছে। তাদের অনেকের কাছেই মুভমেন্ট পাস বা বাইরে বের হওয়ার কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। ব্যক্তিগত গাড়ি এবং অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার বাইরে জনপরিবহন অব্যাহত আছে। কই কারো সঙ্গেই তো পুলিশ মারমুখী আচরণ করছে না। অ্যাপ্রোন পরা একজন চিকিৎসকের ব্যাপারেই ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ ইনস্পেক্টর এত কড়া হলেন কেন? এ থেকে কি পেশাদারি দায়িত্বশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়, নাকি একটি বিশেষ পেশার প্রতি বিরাগের প্রকাশ লক্ষ করা যায়?

ডা. সাঈদা ঘটনার একপর্যায়ে নিজেকে একজন খেতাবপ্রাপ্ত

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে পরিচয় দেয়াতেও অনেককে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করতে দেখা যাচ্ছে। কেউ প্রশ্ন তুলছেন, যাদের পরিবারে মুক্তিযোদ্ধা নেই তাদের কী হবে? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে পৃথক আলোচনা করা যাবে। তবে এখানে বলার কথা এটাই যে, কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা প্রসঙ্গ টেনে না আনাই ভালো। এমনিতেই বিষয়টিকে আমরা অনেক হালকা করে ফেলেছি। কিন্তু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান যদি কোনো কারণে এই গৌরবের কথা প্রকাশ করেন, তাতে বড় কোনো অন্যায় হয় না। ডা. সাঈদা নিশ্চয় পিতার পরিচয় ভাঙিয়ে তার বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাননি। এ নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা তারাই করতে পারে যাদের রক্তে বিরোধিতার বীজ আছে। কেউ যদি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে তা বলতে না চান, সেটা তার ব্যক্তিগত রুচিবোধের ব্যাপার। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যে পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি, সে পরিবারের সদস্যদের তো এই গ্লানি বহন করতেই হবে। ডা. জেনি পিতার পরিচয় হয়তো উত্যক্ত হয়েই দিয়েছেন। কিন্তু তিনি তো মিথ্যা বলেননি। অসত্য তথ্য দিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ মো. মামুনুর রশীদ। তিনিও নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলে দাবি করলেও জানা গেছে, তার পিতা একাত্তরে খুলনায় রাজাকার হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন এবং বিএমএর পক্ষ থেকে দুটি পৃথক বিবৃতি দেয়া হয়েছে। পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে ‘ওই চিকিৎসক গোটা বাহিনীকে হেয় করেছেন’ উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। অপরদিকে চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএর বিবৃতিতে ‘চিকিৎসককে হেনস্তায় জড়িতদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনার’ দাবি জানানো হয়েছে।

আগেই বলেছি, এলিফ্যান্ট রোডে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটা অনভিপ্রেত। একটি ছোট বিষয়কে অকারণ বড় করা হয়েছে। এ নিয়ে পুলিশের পেশাদারি সংগঠন এবং চিকিৎসকদের পেশাদারি সংগঠন নিজ নিজ সংগঠনের সদস্যদের পক্ষ নিয়ে বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছেন। বিষয়টিতে যে উভয়পক্ষের বাড়াবাড়ি আছে তা কোনো সংগঠন স্বীকার করেনি। এটা দুঃখজনক।

আমাদের দেশে এটাও একটা সমস্যা যে, পেশাজীবীদের নিজস্ব সংগঠন আছে এবং এই সংগঠনগুলো নিজেদের সদস্যদের অসদাচরণের প্রতি সব সময় নমনীয়তা দেখাতে অভ্যস্ত।

সব পেশাতেই ভালো এবং মন্দ মানুষ আছে। পেশাজীবীদের সংগঠনগুলো সদস্যদের মান ভুলত্রুটি সংশোধনের দিকে সামান্য নজর দিলেও হয়তো দেশের মানুষের উপকার হতো। মানুষের সেবা দেয়া যাদের কাজ, তাদের কেউ কেউ যে মানুষের প্রতি খারাপ আচরণ করেন, তারা যে অনেক সময় মানুষের বাড়তি দুঃখ-দুর্ভোগের কারণ হন। তা নিশ্চয়ই সংগঠনের নেতাদের অজানা নয়। কিন্তু কোনো সংগঠন কি তাদের কোনো সদস্যকে কখনও মানুষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্য নিন্দা বা তিরস্কার করেছেন? ক্ষমতা পেলে তার অপব্যবহার আমাদের একটি জাতীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চিকিৎসকদের কারো কারো বিরুদ্ধে যেমন মানুষের ক্ষোভ-অসন্তোষ আছে, তেমনি পুলিশের ব্যাপারেও তো মানুষের অভিযোগের অন্ত নেই। আবার এই দুই পেশার সদস্যদের কাছেই অন্যরা বিপদে আপদে ছুটে যায়। জীবন এবং সম্পদের নিরাপত্তার জন্য মানুষকে ডাক্তার এবং পুলিশের ওপরই নির্ভর করতে হয়। এই যে গত এক বছরের বেশি সময় করোনাভাইরাসের ভয়ে মানুষ তটস্থ আছে, এই সময়েও তো ডাক্তার এবং পুলিশ নিজেদের জীবনবাজি রেখেই মানুষের সেবায় নিয়োজিত আছেন। এই সময় করোনায় ১৪০ জন চিকিৎসক, ৯০ জন পুলিশ প্রাণ হারিয়েছেন। তাই এই দুই পেশার মানুষ তো পরস্পরের প্রতিপক্ষ নন। আমরা আশা করব, একে অপরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ না ছড়িয়ে, একে অপরকে প্রতিপক্ষ না ভেবে পেশাজীবী সংগঠনগুলো সৌহার্দ্যের মনোভাব নিয়ে মানুষের বিপদের দিনে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ইতিবাচক মানসিকতার পরিচয় দিক। কার ক্ষমতা বেশি সে বিতর্কে না গিয়ে কে কত বেশি মানবিক এবং সহনশীল – সেটাই হোক আলোচনার বিষয়। একটি কঠিন সময়ের মধ্যে আছি আমরা। এখন বিভেদ ভুলে এক হয়ে চলার সময়। এলিফ্যান্ট রোডের ঘটনা নিয়ে পানি ঘোলার নীতি না নিয়ে ডাক্তার এবং পুলিশের সংগঠন দুটি একটি সুষ্ঠু এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানসূত্র খুঁজে বের করতে তৎপর হবে বলেই আমরা আশা করব। মনে রাখতে হবে, সম্মান বা মর্যাদা জোর করে আদায় করার বিষয় নয়। এগুলো অর্জন করতে হয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে উদ্ধত নয়, বিনয়ী করে।

সবার মধ্যে শুভবোধের উদয় হোক। মানুষের বিপদ-সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই মনুষ্যত্ববোধের পরিচয় দেই। খারাপ দৃষ্টান্ত সামনে এনে কূটতর্কে না জড়িয়ে ভালো দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আমরা নিজেরাই যেন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু নেই
ঘাতক বিষয়ে কিছু কথা
টিকায় বদলাচ্ছে প্রচলিত প্রেক্ষাপট
তিনিও অদম্য
নাইট রাইডার্সের সাকিব ও আমার ভালোবাসাশূন্য কথা

শেয়ার করুন

বিএনপির থলের বিড়াল বেরিয়ে গেছে

বিএনপির থলের বিড়াল বেরিয়ে গেছে

সত্যকে কেউ কোনো দিন চাপা দিয়ে রাখতে পারে না। সে স্বমহিমায় একদিন প্রকাশ পাবেই। এতদিন ধরে গুম, খুনের জন্য সরকারের ওপর দোষারোপের রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছিল বিএনপি। যা কিছু ঘটুক তার জন্য দায়ী করত সরকারকে। সেটা যে সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া হতো তা কিন্তু আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে। হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছে তাদের দলের অন্যতম শীর্য নেতা মির্জা আব্বাস।

গত ১৭ এপ্রিল সিলেট বিভাগ জাতীয়তাবাদী সংহতি সম্মিলনী, ঢাকার ব্যানারে বিএনপির নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর ‘নবম নিখোঁজ দিবস’ উপলক্ষে একটি ভার্চুয়াল আলোচনা সভা করে। সেখানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনাসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন। সেখানে একটি সত্য কথা বলে রাজনীতিতে বোমা ফাটিয়ে দিয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। সেদিন আলোচনা সভার এক পর্যায়ে তিনি বলেন-

“আমি আজকে বলতে চাই, এখানে সেক্রেটারি জেনারেল আছেন, কথাটা আমি বলতে বলতে ভুলে গেছিলাম। ইলিয়াস গুমের পেছনে, আমি রিপিট করছি, ইলিয়াস গুমের পেছনে আমার দলের লুটপাটকারী, বদমাইশগুলো আছে, তাদের দয়া করে আইডেন্টিফাইড করার ব্যবস্থা করেন, প্লিজ। এদেরকে অনেকেই চেনেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইলিয়াস গুম হওয়ার আগের রাতে দলীয় অফিসে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার বাগবিতণ্ডা হয় মারাত্মক রকমের। ইলিয়াস খুব গালিগালাজ করেছিল তাকে। সেই পেছন থেকে দংশন করা যে সাপগুলো, আমার দলে এখনও রয়ে গেছে। যদি এদের দল থেকে বিতাড়িত না করেন, তাহলে কোনো পরিস্থিতিতেই দল সামনে আগাতে পারবেন না।”

মির্জা আব্বাস বিএনপির যেনতেন কোনো নেতা নয়। তিনি সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের প্রভাবশালী নেতা, তার কথাকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ইলিয়াস আলী বনানী থেকে তার ড্রাইভারসহ ‘অপহৃত’ হন। এরপর থেকে বিএনপি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ তুলে লাগাতার হরতাল দেয়। তাদের হরতাল, অবরোধ মানেই মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করা। বাসের মধ্যে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল একজন বাসচালককে।

রাজধানীতে ২৫-৩০টি বাসে আগুন দেয়া হয়। বিশেষ করে সিলেটে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালায়। ইলিয়াসের জন্মস্থান বিশ্বনাথে একাধিক নিরীহ মানুষের লাশ ফেলে আন্দোলনকে চাঙা করার চেষ্টা করে। বিএনপি তো প্রতিটি ঘটনায়ই সরকার পতনের রাস্তা খোঁজে । ইলিয়াসের নিখোঁজকে পুঁজি করেও তারা সরকার পতনের চেষ্টা করেছিল।

ইলিয়াস আলী বিএনপি’র সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হলেও জাতীয় রাজনীতিতে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন না। তবে সিলেটে বিএনপির রাজনীতিতে তার একটা প্রভাব ছিল, এটি সকলেই স্বীকার করেন। বিএনপির তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সঙ্গে তার ছিল সাপে নেউলে সম্পর্ক। তাদের দু-পক্ষের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ হতো। তার আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে সাইফুর রহমান পদত্যাগ করতেও চেয়েছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার হস্তক্ষেপে ইলিয়াস আলীকে সাইফুর রহমানের পা ধরে ক্ষমা চাইতেও হয়েছিল। সে ছবি গনমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।

ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার দুই দিন পর তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনা ২০১২ সালের ১৯ এপ্রিল এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার স্বামীকে বেআইনিভাবে আটক করে রেখেছে। এ ছাড়া ইলিয়াস আলীর মুক্তির জন্য তিনি হাইকোর্টে আবেদন করেন।

ইলিয়াস আলীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে- স্ত্রীর এই অভিযোগের পর, ইলিয়াস আলীকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, সরকারকে তা জানাতে বলে আদালত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার পক্ষ থেকে হাইকোর্টে প্রতিবেদন জমা দিয়ে বলা হয়, ইলিয়াস আলীকে তারা তুলে নেয়নি বা আটক করেনি এবং ইলিয়াস আলী তাদের জিম্মায়ও নেই। দেরিতে হলেও আজ কিন্তু সেকথাই প্রমাণিত হলো।

নিখোঁজের কয়েকদিন পর ২৫ এপ্রিল বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, আজকের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, “আমাদের নেত্রী সরকারকে এক্সজিটের রাস্তা করে দিতে চার দিন সময় দিয়েছেন। যদি এই সময়ের মধ্যে ইলিয়াস আলীকে সরকার ফিরিয়ে না দেয়, তাহলে রোববার থেকে দেশে যে আগুন জ্বলবে, সেই আগুন নেভানোর শক্তি আপনাদের (সরকার) থাকবে না।

মির্জা আলমগীর সাহেব সেদিন তো বিনা কারণে আগুন জ্বালিয়ে ছিলেন, এখন আপনি কী বলবেন? সেদিন তো ইলিয়াস আলী ইস্যুতে নাটক তৈরি করে সরকার পতনের রাস্তা খুঁজছিলেন। আর ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় মির্জা আব্বাস সাহেব তো আপনাকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বলেছিলেন। আপনি তো কোনো প্রতিবাদ করেননি! তাহলে আপনিও জানেন ইলিয়াস আলী কোথায় আছেন? এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত অতিদ্রত এদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় এনে ইলিয়াস আলী ইস্যুর যবনিকাপাত করা।

২.

হেফাজত নেতাদের গ্রেপ্তারে বিএনপি খুবই অস্বস্তিতে পড়েছে। হেফাজত নেতাদের গ্রেপ্তারে গর্জে উঠেছে মির্জা ফখরুল ইসলাম সাহেবরা। হেফাজত নেতা মামুনুল হক গ্রেপ্তারের পর তিনি বলেছেন, ‘দেশের ধর্মীয় নেতা, আলেম-ওলামাদেরকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে যারা আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় মানুষ, শ্রদ্ধেয় আলেম, এদেশে মানুষের কাছে যারা অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র তাদেরকেও গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মিথ্যা মামলাও দেয়া হচ্ছে। অবিলম্বে এই সমস্ত মামলা-মোকাদ্দমা তুলে ফেলা, ধর্মীয় নেতা, আলেম-ওলামাদের মুক্তি দাবি করেন।

তিনি হেফাজত নেতাদের ধর্মীয় নেতা বলে উস্কানি দিচ্ছেন। অথচ এই নেতাদের উস্কানি ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বায়তুল মোকাররম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্রগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিরীহ মানুষকে হত্যা, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ভাঙচুর করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম যখন করেছিল, তখন এ ধ্বংসাত্মক কাজের বিরুদ্ধে একটি কথাও তারা বলেননি। বরং বার বার বলতে চেয়েছে এগুলো সরকারই করাচ্ছে। অথচ আজ যখন হেফাজত নেতাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তখন দিশাহারা হয়ে পড়ছে বিএনপি। এদেরকে ধর্মীয় নেতা আখ্যা দিয়ে মাঠ গরম করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

হেফাজতের সঙ্গে বিএনপি জোটের মধুর সম্পর্ক অনেক পুরোনো। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে বিএনপি চেয়ারপার্সন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে তাদের কর্মী মাঠে নামিয়েছিল। খাবার, পানি দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল সেটি দেশবাসী দেখেছে। আজ আবার নতুন করে ষড়যন্ত্র করে ধর্মীয় তকমা দিয়ে হেফাজতকে মাঠে নামিয়ে ফায়দা তুলতে চেয়েছিল বিএনপি। তাদের সে আশার গুড়ে বালি।

শাপলা চত্বরে সমাবেশের আগে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন বাবুনগরী। দেয়া হয় অর্থ ও সন্ত্রাস করার জন্য সশস্ত্র জামায়াতি ক্যাডার। ইতোমধ্যে সেকথা স্বীকার করে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা মহানগর কমিটির সাবেক প্রচার সম্পাদক মুফতি ফখরুল ইসলাম ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের কর্মসূচির ঠিক এক সপ্তাহ আগে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন জুনায়েদ বাবুনগরী। বিএনপির পক্ষ থেকে ওই আন্দোলনে দেয়া হয় অর্থ এবং পাশাপাশি জামায়াতের নেতাকর্মীরা সরাসরি হেফাজতের কর্মসূচিতে ঢুকে জ্বালাও-পোড়াও করবে সেই সিদ্ধান্ত হয়। সেটাই তারা করেছিল। সরকারের পতন ঘটানোই ছিল তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।

হেফাজত নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের আরও অনেক ষড়যন্ত্রের কাহিনি বের হয়ে আসবে। নতুন ষড়যন্ত্রে বিএনপির কোনো কোনো নেতার সঙ্গে আবার মিটিং হয়েছে, অর্থ লেনদেন হয়েছে সেটাও বের হয়ে আসবে। সেজন্য আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। এদিকে নয় বছর পর মির্জা আব্বাস সাহেবের বক্তব্যে যেভাবে বিএনপির ষড়যন্ত্রের থলের বিড়াল বের হয়ে গেছে। আবার মানুনুল গংদের জবানবন্দিতে আরও যে কত বিড়াল বের হয়ে আসবে, সেই অজানা আতঙ্কে মির্জা ফখরুল সাহেবরা দিশাহারা হয়ে পাগলের প্রলাপ বকছেন।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

[email protected]

আরও পড়ুন:
হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু নেই
ঘাতক বিষয়ে কিছু কথা
টিকায় বদলাচ্ছে প্রচলিত প্রেক্ষাপট
তিনিও অদম্য
নাইট রাইডার্সের সাকিব ও আমার ভালোবাসাশূন্য কথা

শেয়ার করুন

মানবিক বিয়ে নয়, এবার কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ!

মানবিক বিয়ে নয়, এবার কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ!

মামুনুলের পিতা শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক একজন স্বঘোষিত স্বাধীনতাবিরোধী। তবে তিনি ইসলাম বিষয়ে একজন আলেম ছিলেন। আর মামুনুল হক হলেন সেই আলেমের ঘরে জালেম। মুখে ইসলামের কথা বললেও তার চালচলন, কথাবার্তা, আচার-আচরণ, জীবনযাপন সব ইসলামবিরোধী। ইসলাম শান্তির কথা বলে। মামুনুল সহিংসতার কথা বলেন। ইসলাম নিয়মতান্ত্রিক জীবন বিধানের কথা বললেও, মামুনুলের পুরোটাই ছিল উচ্ছৃঙ্খল আর ইসলামবিরোধী।

ইসলামের নামে মামুনুল হক যে ভাষায় উসকানি দিয়ে আসছিলেন, তার সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক ছিল না। মামুনুল হক যে ভণ্ড, প্রতারক, মিথ্যুক সেটা আমি অনেক আগে থেকেই বলে আসছিলাম। তবে সোনারগাঁয়ের রয়্যাল রিসোর্টে অভিসারের পর মামুনুল হকের সব জারিজুরি ফাঁস হয়ে গেছে।

রিসোর্টে মিথ্যা দিয়ে তার শুরু। তারপর একের পর এক মিথ্যার জালে জড়িয়ে পড়েছেন নিজে, সঙ্গে জড়িয়েছেন ইসলামকেও। এত দিন মামুনুল যা বলতেন তাই বিশ্বাস করতে হতো মানুষকে। কিন্তু এখন ধরা পড়ার পর তার বাকি আবরুটাও খসে গেছে। এখন সবাই বুঝে গেছে, মামুনুল একটা লম্পট ছাড়া আর কিছুই নয়। মামুনুলের মিথ্যার শুরু তার রিসোর্ট বুকিং থেকে। রিসোর্ট বুকিংয়ের সময় তার ওপর কোনো চাপ ছিল না।

সেখানে তিনি সঙ্গে থাকা নারীর নাম লেখেন আমেনা তৈয়েবা, এই নামটা তার প্রথম স্ত্রীর। অথচ তার সঙ্গে ছিল কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত আরা ঝর্ণা। স্থানীয় লোকজন মামুনুলকে আটক করার পরও তিনি দাবি করেন, তার সঙ্গে থাকা নারীর নাম আমেনা তৈয়েবা। অথচ পরে তিনি নিজেই জানিয়েছেন, তার কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম জান্নাত আরা ঝর্ণা।

প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোন আলাপের সময়ও তিনি দাবি করেছেন, সঙ্গে থাকা নারী ‘আমগোর শহীদুল ভাইয়ের ওয়াইফ’। স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য তিনি বলেছিলেন, তুমি আবার মাঝখান দিয়া কিছু মনে কইরো না। প্রথম স্ত্রী কিছুই মনে করেননি। টেলিফোনে কিছুই বলেননি। খালি বলেছেন, ‘বাসায় আসেন, কথা হবে’। প্রথম স্ত্রীর এই হুমকি মামুনুল হক নিতে পারেননি। রয়্যাল রিসোর্ট কেলেঙ্কারির পর মামুনুল আর বাসায় ফেরার সাহস পাননি। পুলিশের কাছে ধরা দেবেন, তবু প্রথম স্ত্রীর কাছে যাবেন না।

প্রথম স্ত্রী তেমন কিছুই করেননি, শুধু সন্তানদের নিয়ে বাসা ছেড়ে চলে গেছেন। রয়্যাল রিসোর্টে ধরা খাওয়ার পর ফেসবুক লাইভে দ্বিতীয় স্ত্রীর কথা স্বীকার করেছিলেন মামুনুল, সঙ্গে স্বীকার করে নিয়েছিলেন ফাঁস হওয়া ফোনালাপ সবই সত্যি। তিনি বরং তার ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করে টেলিফোন কথোপকথন ফাঁস করার প্রতিবাদ করেছিলেন। বিভিন্ন পর্যায়ের ফাঁস হওয়া টেলিফোন সংলাপে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, মামুনুল আসলে দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। করলেও সেটা তার প্রথম স্ত্রী এবং পরিবারের কেউ জানতেন না।

মামুনুল দাবি করেছিলেন, জান্নাত আরা ঝর্ণার সঙ্গে তার স্বামীর ছাড়াছাড়ির পর ‘মানবিক কারণে’ শরিয়তসম্মতভাবে তাকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। এর মধ্যেই ফাঁস হয়ে যায় তার তৃতীয় বিয়ের খবর। যদিও সেটা স্বীকার করার মতো সময় তিনি পাননি।

মামুনুলের পিতা শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক একজন স্বঘোষিত স্বাধীনতাবিরোধী। তবে তিনি ইসলাম বিষয়ে একজন আলেম ছিলেন। আর মামুনুল হক হলেন সেই আলেমের ঘরে জালেম। মুখে ইসলামের কথা বললেও তার চালচলন, কথাবার্তা, আচার-আচরণ, জীবনযাপন সব ইসলামবিরোধী। ইসলাম শান্তির কথা বলে। মামুনুল সহিংসতার কথা বলেন। ইসলাম নিয়মতান্ত্রিক জীবন বিধানের কথা বললেও, মামুনুলের পুরোটাই ছিল উচ্ছৃঙ্খল আর ইসলামবিরোধী।

ইসলামে চার বিয়ের অনুমোদন আছে বটে। তবে অবশ্যই দ্বিতীয় বিয়ের আগে প্রথম স্ত্রীর অনুমোদন নিতে হবে এবং সব স্ত্রীকে সমান মর্যাদা দিতে হবে। কিন্তু মামুনুল ধরা খেয়ে স্বীকার করা দ্বিতীয় স্ত্রীকে মর্যাদা তো দূরের কথা কোনো সামাজিক স্বীকৃতিই দেননি।

একটা মজার কথা বলে নিই। মামুনুল হকের দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম জান্নাত আরা ঝর্ণা। আর ফাঁস হওয়া তৃতীয় স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস লিপি। তার মানে জান্নাতের প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ ছিল। ইসলামে বলা আছে, পুণ্যবানরা মৃত্যুর পর জান্নাতে যাবেন এবং সেখানে তাদের জন্য ৭২ জন হুর অপেক্ষা করছে। কিন্তু মামুনুলের মনে হয় ধৈর্য একটু কম। মৃত্যুর পর জান্নাতে গিয়ে হুরের জন্য অপেক্ষা করার চেয়ে দুনিয়াকেই জান্নাত বানিয়ে ফেলার প্রকল্প নিয়েছিলেন। তাই জান্নাত নামের নারীদেরই যেন তিনি টার্গেট করেছিলেন।

সাধারণ নৈতিকতায় দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার আছে। কেউ কারো ওপর জোর খাটালেই সেটা অন্যায়। কিন্তু ইসলামে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কোনো বৈধতা নেই। মামুনুল হক মুখে ইসলামের কথা বললেও যাপন করেছেন এক ইসলামবিরোধী জীবন। রিসোর্ট কেলেঙ্কারির পর থেকেই আমি মামুনুলের মিথ্যাচার নিয়ে বলে আসছি। তার ‘রুহানী পুত্র’রা সেটা বিশ্বাস করেনি। তারা বরং আমাকে মিথ্যাবাদী বলে আসছিলেন।

মামুনুল যখন নিজের সব মিথ্যার দায় স্বীকার করে নিলেন এবং ‘স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করতে সীমিত পরিসরে সত্য গোপন করার’ ফতোয়া জারি করলেন, তখন তাদের কারও কারও টনক নড়লেও সবার নয়। বাকি অন্ধরা বলতে চেষ্টা করল, ইসলামে চার বিয়ে করার অনুমোদন আছে। মামুনুলও হুঙ্কার দিলেন, আমি একাধিক বিয়ে করলে কার কী? মামুনুলের কথাবার্তার ধরন এবং কসম আর অভিশাপের বাহার দেখে আমি তখনই নিশ্চিত ছিলাম লম্পট মামুনুল আসলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় কোনো বিয়েই করেনি। কারণ, বারবার বলার পরও মামুনুল বিয়ের কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। তখন তার রুহানী পুত্ররা দাবি করছিলেন, তিনি শরিয়তসম্মতভাবে বিয়ে করেছিলেন। অথচ এই মামুনুলই আগে বলেছিলেন, ইসলামে গোপন বিয়ের কোনো বৈধতা নেই। মামুনুলরা নিজেদের লাম্পট্য জায়েজ করার জন্য ইসলামকে নিজেদের মতো করে কাস্টমাইজ করে নেন।

পুলিশ রিমান্ডে যাওয়ার পর এখন মামুনুল স্বীকার করছেন, সকলি গরলে ভেল। তিনি বিয়েশাদি কিচ্ছু করেননি। জান্নাত আরা ঝর্ণা এবং জান্নাতুল ফেরদৌস লিপির অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েছিলেন তিনি। নামকাওয়াস্তে ভরণপোষণের বিনিময়ে তিনি তাদের দিনের পর দিন ভোগ করেছেন। মামুনুলের দাবি তিনি দুই জান্নাতের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। এখন বোঝা যাচ্ছে, জান্নাত আরা ঝর্ণার ডায়েরিই সত্য। ডায়েরিতে বিয়ের কোনো কথা নেই, আছে কন্টাক্টের কথা। এক লম্পট মামুনুল যে আমাদের কত কিছু শেখালেন। এখন তিনি দাবি করছেন, ‘কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ’। হে আল্লাহ, এই লম্পটদের কবল থেকে তুমি ইসলামকে হেফাজত কর।

মামুনুলের ভাগ্য ভালো, তারা যে বাংলাদেশ কায়েম করতে চান, সেটা এখনও হয়নি। হলে এত গ্রেপ্তার, রিমান্ডের সুযোগ তিনি পেতেন না। এত দিনে পাথর ছুড়ে এই জেনাকারীকে হত্যা করা হতো।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু নেই
ঘাতক বিষয়ে কিছু কথা
টিকায় বদলাচ্ছে প্রচলিত প্রেক্ষাপট
তিনিও অদম্য
নাইট রাইডার্সের সাকিব ও আমার ভালোবাসাশূন্য কথা

শেয়ার করুন

মালেকা বেগম: নিভে গেল শিক্ষার প্রতিবাদী কণ্ঠ

মালেকা বেগম: নিভে গেল শিক্ষার প্রতিবাদী কণ্ঠ

মাধ্যমিক শিক্ষার কোথায়, কতটুকু অসঙ্গতি—এটা ভালো করেই জানতেন প্রতিবাদী ও প্রবীণ শিক্ষক নেতা মালেকা বেগম। তার সঙ্গে বেশিরভাগ কথায় হতো শিক্ষা বিভাগের অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে। উনি যেহেতু শিক্ষক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, সেহেতু শিক্ষার অনেক খবরাখবর রাখতেন। সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির একাংশের সভাপতি ছিলেন এক সময়।

‘ভাই, এই অন্যায় আর মানা যায় না। প্লিজ, কিছু লেখেন।’ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক নেতা মালেকা বেগমের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে এই কথাটি কানে বাজছে।

ভাঙা গলায় বলা তার এই বাক্যটি বারবার মনে পড়ছে। করোনা কেড়ে নিয়েছে প্রতিবাদী ও প্রবীণ এই শিক্ষক নেতাকে।

মালেকা আপাকে কবে থেকে চিনি, মনে পড়ছে না। তবে ১৯৯৮ সাল থেকে ভালোভাবে চিনি। তখন জনকণ্ঠে প্রায়ই আসতেন। বেশিরভাগ সময় তিনি ঢাকার বাইরে শিক্ষকতা করেছেন। ঢাকার নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তখন প্রায়ই যোগাযোগ হতো। সর্বশেষ খুলনা জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তবে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তিনি অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত।

মালেকা আপা ফোন করলেই তার প্রতিবাদী বক্তব্য শুনতে হতো। মাধ্যমিক শিক্ষার কোথায়, কতটুকু অসঙ্গতি—এটা তিনি ভালোই জানতেন। অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে ফোন ধরতে পারতাম না। একদিন উনি কয়েকবার ফোন করেছিলেন। কোনো জরুরি কাজে ফোন ধরতে পারিনি।

পরে বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ভাই, আপনি ফ্রি থাকেন কখন?’

বললাম, ‘বেশি রাতে’।

আপা বললেন, ‘বেশি রাত মানে কয়টা?’

বললাম, ‘রাত সাড়ে ১১ বা ১২টা’।

‘এত রাতে ফোন দেব?’

বললাম, ‘অনেকেই তো দেন। কারণ, অন্য সময় বেশি কথা বলার সুযোগ পাই না।’

এরপর থেকে উনি রাতেই ফোন করতেন। বেশিরভাগ ফোন শিক্ষা বিভাগের অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে। উনি যেহেতু শিক্ষক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, সেহেতু শিক্ষার অনেক খবরাখবর রাখতেন। সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির একাংশের সভাপতি ছিলেন এক সময়।

একবার উনি নিজেই শিক্ষা বিভাগের রোষানলে পড়েছিলেন। ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ওনার পক্ষে জনকণ্ঠে একটি লেখা লিখেছিলেন। সেই লেখাটি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। আমিও প্রতিবেদন লিখেছিলাম ওনার ওপর অন্যায়ের চিত্র তুলে ধরে। এরপর তিনি রক্ষা পেয়েছিলেন।

সেই কৃতজ্ঞতা উনি অনেকবার প্রকাশ করেছেন। সর্বশেষ খুলনা জেলা স্কুলেও একটি ঝামেলায় পড়লেন। যেহেতু প্রতিবাদী কণ্ঠ ছিলেন, সেহেতু স্কুলে, শিক্ষা বিভাগে বা শিক্ষক রাজনীতিতে তার প্রতিপক্ষ ছিল।

সম্ভবত, ২০১৮ সালে উনি অবসরে গেলেন। খবরটি জানিয়ে তিনি বললেন, ‘এই আপা আর আপনাকে খবরাখবর দেবে না।’

বলেছিলাম, অবসরে গেলেও তো আপনার চোখ–কান বন্ধ হয়ে যাবে না। একদিন ঢাকায় আসেন কথা বলব। কিন্তু অবসরে যাওয়ার পর আর দেখা হয়নি। শুধু একদিন ফোন করে বললেন, ‘ভাই, কন দেখি আমি নাকি ভর্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতি করছি। জীবনভর দুর্নীতি ঠেকালাম। শেষ সময়ে আমাকে ফাঁসাতে চাইছে। আমার পেনশন আটকে রেখেছে।’

বললাম, ‘ধৈর্য ধরেন, আপা। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

এরপর তদন্তে দেখা গলে, তার বিরুদ্ধে ভর্তি অনিয়মের অভিযোগ সঠিক ছিল না। বেশ কিছুদিন ভোগার পর উনি পেনশন পেলেন।

আজ মালেকা আপার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। শিক্ষা বিষয়ে যখন সাংবাদিকতা করতাম, তখন আপনার অনেক সহায়তা পেয়েছি। যেখানেই অনিয়ম, দুর্নীতি দেখেছেন জানাতে দেরি করেননি। নিজের স্বার্থের চেয়ে শিক্ষার স্বার্থ বেশি দেখেছেন। খুলনা জেলা স্কুলের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।

মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন সেই ব্যস্ত সময়েও আপনার ফোন ধরতে হতো। স্কুলের ভালো ফল করার খবরটি আমাকে জানিয়ে যেন স্বস্তি পেতেন।

একবার আমার এক চাচাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছিলাম। খুলনায় মালেকা বেগমের তখন অনেক নামডাক। ওই চাচা তো ভেবেছেন খুলনা জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে কত কাঠখড় পোড়াতে হবে। কিন্তু চাচা ফিরে এসে তো ভাতিজার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। খুলনা জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমাকে এতো স্নেহ করতে পারেন, এটা নাকি চাচার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে।

ভালো থাকেন মালেকা আপা। খুলনায় শিক্ষকতা করলেও আপনার ছাত্ররা দেশে–বিদেশে ছড়িয়ে আছে। অসংখ্য শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে আপনি বেঁচে থাকবেন। সাংবাদিক হিসেবে আমার কাছে বেঁচে থাকবেন শিক্ষা জগতের ‘প্রতিবাদী কণ্ঠ’ হিসেবে। হে আল্লাহ, মালেকা আপার জন্য বেহেশতে একটু জায়গা রেখো।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু নেই
ঘাতক বিষয়ে কিছু কথা
টিকায় বদলাচ্ছে প্রচলিত প্রেক্ষাপট
তিনিও অদম্য
নাইট রাইডার্সের সাকিব ও আমার ভালোবাসাশূন্য কথা

শেয়ার করুন

করোনার ভয়াবহতা ও সহনশীলতা

করোনার ভয়াবহতা ও সহনশীলতা

সরকারের ব্যর্থতা যত বাড়ে, মানুষের মধ্যে সে কারণে ক্ষোভ যত বাড়তে থাকে- ততই সরকার ও সরকারি দলে সহনশীলতা হ্রাস পায়। সমালোচনা বন্ধ করে দেয়া হয় যেনতেন প্রকারে। আমরা যেন ভুলতে বসেছি সরকারের সমালোচনা করা নাগরিকদের সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার।

করোনা সংক্রমণ প্রথম ধরা পড়ার পর ১৯ এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত একটি দিনও মৃত্যুর মিছিল থামেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনন্দিন ব্রিফিং বা বিজ্ঞপ্তিতে একটি দিনও দেশবাসীকে জানাতে পারল না ‘আজ একটিও মৃত্যু ঘটেনি-একজনও সংক্রমিত হয়নি করোনায়।’ বরং ঘটেছে, ঘটেই চলেছে সম্পূর্ণ বিপরীতটা। মৃত্যু ও সংক্রমণের মিছিল ঘরে ঘরে কান্নার ঢেউ বেড়েই চলেছে।

প্রথমদিকে সরকারপক্ষ থেকে বলা হলো গুজবে কান দেবেন না, করোনাকে শিগগিরই প্রতিহত করা হবে। একজন বাকপটু মন্ত্রী তো বলেই ফেললেন, করোনা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আওয়ামী লীগ করোনার চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী, আজ আর তিনি এ দাবি ভুলেও করেন না। এ ব্যাপারে মুখে তালা লাগিয়েছেন। এ দাবিটি যদি বাস্তবে সত্য হতো অর্থাৎ, সরকারের কোনো ব্যাপারে ত্রুটি অবহেলা বা ব্যর্থতা না থাকত কতই না আনন্দের হতো বিষয়টি। তখন কিন্তু কোনো মন্ত্রীর মুখ থেকে টেলিভিশনে মানুষ শুনত না বরং নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা বলে বেড়াতেন অফিস আদালতে, হোটেলে-রেস্তোঁরায়, মাঠে ময়দানে, ক্লাব-লাইব্রেরিতে। তা ঘটে না দেখে সরকার বাস্তবে ক্ষুব্ধ এবং সে ক্ষোভ নানাজনের মুখ থেকে নানাভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এই পটভূমিতে যখন তাকিয়ে দেখি ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যু এক শ ছাড়িয়েছে, তখন কী বলব? আমরা সেঞ্চুরিয়ান হওয়ার গৌরব অর্জন করেছি? অভিজ্ঞতায় বলে, সরকারের ব্যর্থতা যত বাড়ে, মানুষের মধ্যে সে কারণে ক্ষোভ যত বাড়তে থাকে- ততই সরকার ও সরকারি দলে সহনশীলতা হ্রাস পায়। সমালোচনা বন্ধ করে দেয়া হয় যেনতেন প্রকারে। আমরা যেন ভুলতে বসেছি সরকারের সমালোচনা করা নাগরিকদের সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার।

একটি জাতীয় দৈনিকে ১৬ এপ্রিলের সংখ্যায় প্রথম পৃষ্ঠায় ‘করোনায় ভয়ংকর এপ্রিল’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিলের ১৫ দিনে মৃত্যু, ১০৩৯, ১৬ দিনে আক্রান্ত এক লাখ। এই প্রতিবেদনটিতে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্য দেয়া হয়েছে, কিন্তু ১৬ এপ্রিলে মৃত্যুসংখ্যা লাফিয়ে ১০১-এ পৌঁছায় । ১৭ এপ্রিলেও তাই। তা হলে ১৬ দিনে মৃত্যু ঘটেছে ১১৪০। এপ্রিলের বাকি দিনগুলোতে কী দাঁড়াবে কে জানে!

ওই পত্রিকাতেই একই দিনে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ার পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আগেই জানিয়েছেন বাংলাদেশ এখন আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টের করোনায় আক্রান্ত। এই ভ্যারিরেন্টের লক্ষণগুলো হলো: এক. এই ভাইরাস অতি সংক্রমণশীল অর্থাৎ ছোঁয়াচে; দুই. একজন থেকে আর একজনে দ্রুত ছড়ায়; তিন. ছোঁয়াচে এই ধরনটি কোনো উপসর্গ ছাড়াই সরাসরি ফুসফুসে আক্রমণ করে; চার. এই ধরনটি বয়স্ক ও আগে থেকেই অসুস্থদের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং রোগের তীব্রতা বেশি হওয়ায় মৃত্যুর হারও বেশি।

অপর একটি জাতীয় দৈনিক ১৭ এপ্রিলে প্রকাশিত সংখ্যায় ‘সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার আরও বাড়তে পারে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে লিখেছে: ‘প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ও মৃত্যুর মধ্যেই আরও আতঙ্কের খবর এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনাভাইরাস ব্যবস্থাপনা কমিটি করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছে। করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু আরও বাড়বে উল্লেখ করে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সংক্রমণের চলমান ধারা অব্যাহত থাকলে ও নমুনা পরীক্ষা ৩৫ হাজার বা তার বেশি হলে প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার করে কোভিড রোগী শনাক্ত হতে পারে এবং মৃত্যু হবে ১০০ জনের কাছাকাছি।

পূর্বাপর ঘটনাবলি সাজালে ছবিটা অবিকল সবার সামনে ভেসে উঠবে।

প্রথমদিকে নানা মহল থেকে অভিযোগ উঠেছিল করোনা চিকিৎসার জন্য পৃথক ওয়ার্ড করা হলো। কোনো কোনো সরকারি হাসপাতালে (ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে) তা করাও হলো। পাশাপাশি বের হলো স্বাস্থ্য খাতের বিরাজমান বিচিত্র দুর্নীতির ভয়াবহ সব ঘটনা। হাসপাতাল (বেসরকারি) আবিষ্কার হলো যেখানে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও রোগী বা সন্দেহভাজনদের দিব্যি করোনা পরীক্ষা করে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রোগীর প্রয়োজন বা চাহিদা অনুযায়ী রিপোর্ট প্রদান। ঢাকা, চট্টগ্রামের কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে করোনা টেস্টের ব্যবস্থা হলো- তাতে যে সংখ্যক লোকের পরীক্ষা সম্ভব হলো তা নেহায়েতই অনুল্লেখযোগ্য। ফলে আক্রান্ত মৃতের সংখ্যাও কম আসতে থাকল। ধীরে ধীরে টেস্টের সুযোগ নানা জেলায় সম্প্রসারিত হলেও সুদীর্ঘ ১৪ মাসের মধ্যেও সকল জেলা হাসপাতালে টেস্টিং ব্যবস্থা নেই। নমুনা নিয়ে পাঠানো হয় দূরবর্তী কোনো জেলায় টেস্ট করে ফলাফল জানানোর জন্য। এতে এক থেকে দুসপ্তাহ সময় লাগে।

করোনা চিকিৎসার অপরিহার্য আইসিইউ ও বাড়তি অক্সিজেনের ব্যবস্থা আজও ঢাকা চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও সিলেটের সরকারি হাসপাতালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু অত স্বল্পসংখ্যক রোগীর চাহিদা যেমন তখন মেটানো যায়নি- তেমনই আজও তা যাচ্ছে না। হ্যাঁ, বেড ও আইসিইউর সংখ্যা সম্প্রতি ওই হাসপাতালগুলোয় বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য।

জেলা হাসপাতালগুলোর তো কথাই নেই। সেগুলোতে নেই করোনা রোগীর জন্য পৃথক ওয়ার্ড। করোনা চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার নার্স স্বাস্থ্যকর্মী কিছু নেই। নেই আইসিইউ-সুবিধা। তাই দ্রুত সকল জেলা হাসপাতালে পৃথক যথেষ্টসংখ্যক শয্যা, পৃথক করোনা ওয়ার্ড, ডাক্তার নার্স প্রভৃতি এবং অন্তত ১০টি করে আইসিইউর ব্যবস্থা করা হোক, ব্যবস্থা করা হোক জেলা-উপজেলাপর্যায় পর্যন্ত। করা হোক করোনা টেস্টের ব্যবস্থাও। টেস্টিংয়ের জন্য যে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে প্রতিদিন অন্তত ৫০ হাজার লোকের করোনা টেস্টিংয়ের ব্যবস্থা করা হোক।

স্বাস্থ্য বিভাগের যাবতীয় দুর্নীতির বিচারও ত্বরান্বিত করা হোক।

লকডাউনের নামে (নরম ও কঠোর) যে প্রহসন দেখা গেল, বিশেষজ্ঞরাই তার অসারতা খোলামেলাভাবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতামত গ্রহণ করে অবিলম্বে নতুন করে সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করা হোক। কোনো প্রকার যানবাহন, বিমানের সাধারণ বা স্পেশাল ফ্লাইট, গার্মেন্টসহ সকল ছোটবড় শিল্পকারখানা ব্যাংক বন্ধ ঘোষণা করা হোক।

এর ফলে লাখ লাখ শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষ, এমনকি, নিম্নমধ্যবিত্ত অসংখ্য পরিবার, যারা না খেয়ে থাকলেও কারো কাছে কিছু চাইতে পারেন না- আগামী ছয় মাস কমপক্ষে তাদের সবার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ প্রণোদনা দিয়ে যেতেই হবে।

লেখক: রাজনীতিক-কলাম লেখক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু নেই
ঘাতক বিষয়ে কিছু কথা
টিকায় বদলাচ্ছে প্রচলিত প্রেক্ষাপট
তিনিও অদম্য
নাইট রাইডার্সের সাকিব ও আমার ভালোবাসাশূন্য কথা

শেয়ার করুন