‘বঙ্গবন্ধু’ ও বাংলাদেশ

৬ দফা আন্দোলন না হলে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান হতো না; ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান না হলে বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে পারতাম না; বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্ত না হলে ’৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তানে আমরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারতাম না; আর পাকিস্তানে যদি আমরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারতাম, তাহলে ৯ মাস যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করতে পারতাম না। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রসমাজের যে ভূমিকা তা গৌরবোজ্জ্বল। বছর ঘুরে এমন একটি মধুর দিন যখন ফিরে আসে হৃদয়ের মানসপটে কতো স্মৃতি ভেসে ওঠে।

ইতিহাসের মহামানব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ তথা ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনের মহতী কালপর্বে ভাষার মাস ‘ফেব্রুয়ারি’ আমাদের জাতীয় জীবনে নবরূপে আবির্ভূত হয়েছে। বছরব্যাপী ‘মুজিববর্ষ’ পালনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু আজ স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। তার সংগ্রামী জীবনের প্রতিটি ক্ষণ আজ নতুন প্রজন্মসহ সবাই জানতে পারছেন।

মহান ভাষা আন্দোলন থেকে মহত্তর মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে তার ঐতিহাসিক অবদান পরম শ্রদ্ধায় সকলেই স্মরণ করছেন। মহান ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক দিন ‘অমর একুশে ফেব্রুয়ারি’ ১৯৯৯ থেকে অর্থাৎ বিগত ২২ বছর যাবত বিশ্বের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়ে বিশ্বজুড়ে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে সগৌরবে পালিত হচ্ছে। সর্বস্তরের বাঙালির জন্য দিনটি গৌরব ও মর্যাদার।

জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের গৌরবময় এই ইতিহাস সৃষ্টি করতে যে নেতা তার যৌবনের তেরোটি মূল্যবান বছর পাকিস্তানের কারাগারে কাটিয়েছেন; কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে যে নেতা প্রিয় মাতৃভূমি বাংলার ছবি হৃদয় দিয়ে এঁকেছেন; ফাঁসির মঞ্চকেও তুচ্ছজ্ঞান করেছেন; সেই নেতার জন্মশতবর্ষে ৭০ হাজার গৃহহীন পরিবার গৃহ পেয়েছে; দেশের শতভাগ লোক বিদ্যুৎ ব্যবহারের দ্বারপ্রান্তে; শিক্ষার হার ৭৪.৭%; গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে ৭২.৬ বছর; মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৬৪ ডলার ছাড়িয়েছে; বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪১ বিলিয়ন ডলার; অনেকগুলো মেগাপ্রজেক্ট আজ বাস্তবায়নের পথে; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে; এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি।

এসবই সম্ভবপর হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সবল-সমর্থ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে। জাতির পিতা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই উপলব্ধি করেছিলেন এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি, একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদের হতে হবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে তিনি ’৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ এবং ’৪৯-এর ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর সংগ্রামের সুদীর্ঘ পথে নেতৃত্ব দিয়ে মহান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে বাংলার মানুষের জন্য ৫টি মৌলিক অধিকার সাংবিধানিকভাবে বিধিবদ্ধ করেন। যার সুফল আজ দেশের মানুষ ভোগ করছেন।

এই ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ তারিখটি প্রতিবছর গভীরভাবে স্মরণ করি। দিবসটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। ১৯৬৯-এর এই দিনে বাংলার দুঃখী মানুষের বন্ধু, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতাকে জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ’৬৯-এর গণ-আন্দোলন এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কালপর্বটি ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ‘ড্রেস রিহার্সেল’।

জাতির মুক্তিসনদ ৬ দফা দেয়াকে অপরাধ গণ্য করে বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সর্বমোট ৩৫ জনকে ফাঁসি দেয়ার লক্ষ্যে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব এবং অন্যান্য’ তথা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করা হয় এবং নির্বিঘ্নে পুনরায় ক্ষমতায় আরোহণের এক ঘৃণ্য মনোবাসনা চরিতার্থে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। আগরতলা মামলার বিচার যখন শুরু হয় তখন আমরা উপলব্ধি করি বঙ্গবন্ধুকে যদি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয় তাহলে চিরদিনের জন্য বাঙালি জাতির কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাবে। কেননা এই একটি কণ্ঠে কোটি কণ্ঠ উচ্চারিত হয়। তাই আমরা ’৬৯-এর ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডাকসু’ কার্যালয়ে চার ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং ৬ দফাকে হুবহু যুক্ত করে ঐক্যবদ্ধ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করি। ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জমায়েত অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় এবং পূর্বঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়। ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি যে আন্দোলন আমরা শুরু করেছিলাম, ২০ জানুয়ারি শহিদ আসাদের রক্তাক্ত জামা হাতে নিয়ে যে শপথ নিয়েছিলাম, ২৪ জানুয়ারি মতিউর-মকবুল-রুস্তম-আলমগীরের রক্তের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন সর্বব্যাপী গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছিল। ৯ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে শপথ দিবসে স্লোগান দিয়েছিলাম ‘শপথ নিলাম শপথ নিলাম, মুজিব তোমায় মুক্ত করব; শপথ নিলাম শপথ নিলাম, মা-গো তোমায় মুক্ত করব।’

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করে সান্ধ্য আইন জারি করা হলে সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথে প্রতিবাদ মিছিল করি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সেনারা বেয়োনেট চার্জে নির্মমভাবে হত্যা করে পুনরায় সান্ধ্য আইন জারি করলে যথারীতি আমরা সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখি। ২০ ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা নগরীকে মশাল আর মিছিলের নগরীতে পরিণত করলে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবসে পল্টনের মহসমুদ্রে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক সকলের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম প্রদান করি। সমগ্র দেশ গণবিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়। জনরোষের ভয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান সকল রাজবন্দিকে বিনা শর্তে মুক্তি দিলে দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। প্রিয় নেতাকে কারামুক্ত করার মধ্য দিয়ে শপথ দিবসের স্লোগানের প্রথম অংশ ‘মুজিব তোমায় মুক্ত করব’, এবং ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নিয়ে যুদ্ধ করে প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদার মুক্ত করে স্লোগানের দ্বিতীয় অংশ ‘মা-গো তোমায় মুক্ত করব’ বাস্তবায়ন করেছিলাম।

বস্তুত, ’৬৬-এর ৮ মে’র গভীর রাতে ৬ দফা প্রদানের অভিযোগে দেশরক্ষা আইনে যে মুজিব গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, ৩৩ মাস পর ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি যে মুজিব মুক্তিলাভ করেন- নাম বিচারে এক হলেও, বাস্তবে ওই দুই মুজিবের মধ্যে ছিল গুণগত ফারাক।

আগরতলা মামলাটি ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য অগ্নিপরীক্ষার মতো। সেই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বন্দিদশা থেকে মুক্তমানব হয়ে বেরিয়ে আসেন। ২২ ফেব্রুয়ারি আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেই যে, প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জানাব। সেই সিদ্ধান্ত অনুসারেই রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টায় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়।

শুরুতেই বলেছি ২৩ ফেব্রুয়ারি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। সেদিনের রেসকোর্স ময়দান যারা দেখেননি তাদের বলে বোঝানো যাবে না সেই জনসমুদ্রের কথা। আমরা যখন সেখানে পৌঁছেছি, তখন রেসকোর্স ময়দানে মানুষ আর মানুষ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রেন, বাস, ট্রাক, লঞ্চ-স্টিমার বোঝাই হয়ে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, কৃষক-শ্রমিক, সাধারণ মানুষ ছুটে এসেছে। ঢাকার মানুষ তো আছেই। অভিভূত হয়ে পড়লাম। এর পূর্বে এত বড় জনসভা দেখিনি। সেই জনসমুদ্রে লাখ লাখ লোক এসেছে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে একনজর দেখতে। প্রিয় নেতাকে নিয়ে আমরা মঞ্চে উঠলাম। সেদিন সেই মঞ্চে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রেখেছিলেন। চিরাচরিত প্রথা ভঙ্গ করে আগেই সভাপতির ভাষণ দেয়ার জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে লাখ লাখ মানুষকে অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলাম, ‘সবার শেষে বক্তৃতা করার কথা থাকলেও আপনাদের অনুমতি নিয়ে আমি আগেই বক্তৃতা করতে চাই।’ দশ লাখ লোকের সম্মতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আগেই বক্তৃতা করি। সেদিন যে ভালোবাসা মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি তা বলে বোঝাতে পারব না। বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করে বলেছিলাম-

‘প্রিয় নেতা তোমার কাছে আমরা ঋণী, বাঙালি জাতি চিরঋণী। এই ঋণ কোনো দিনই শোধ করতে পারব না। সারা জীবন এই ঋণের বোঝা আমাদের বয়ে চলতে হবে। আজ এই ঋণের বোঝাটাকে একটু হালকা করতে চাই জাতির পক্ষ থেকে তোমাকে একটা উপাধি দিয়ে।’

১০ লাখ লোক ২০ লাখ হাত তুলে সম্মতি জানিয়েছিল। তখনই ঘোষিত হয়েছিল-

‘যে নেতা তার জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, সেই নেতাকে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে “বঙ্গবন্ধ” উপাধিতে ভূষিত করা হলো।’

১০ লাখ লোক তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে এই প্রস্তাব গ্রহণ করে প্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনি তুলেছিল, ‘জয় বঙ্গবন্ধু!’

বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন হয়েছে- ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ। একেকটি আন্দোলনের একেক রকম চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্য ছিল। ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য এমন ছিল যে, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বিচারের কাজ চলছিল। বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে ’৬৮-এর ১৯ জুন বিচারের কাজ শুরু হয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাবার জন্য আইয়ুব খান পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। আইয়ুব খানের তথ্য সচিব আলতাফ গওহর ‘আইয়ুব খান’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। সেই বইয়ে উল্লেখ আছে কীভাবে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনের শহিদদের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ সেই ষাড়যন্ত্রিক প্রচেষ্টাকে সমাধিস্থ করে এবং আসাদ-মতিউর-মকবুল-রুস্তম-আলমগীর-সার্জেন্ট জহুরুল হক-আনোয়ার-ড. শামসুজ্জোহার জীবনের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আন্দোলন সফল হয়। জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে নারায়ণগঞ্জের এক জনসভায় দম্ভোক্তি করে আইয়ুব খান বলেছিলেন, তিনি আবার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হবেন। অথচ ১৭ জানুয়ারি আন্দোলন শুরু হলো, ২০ জানুয়ারি আসাদ শহিদ হলেন, ২৪ জানুয়ারি শহিদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলে সর্বব্যাপী গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং সেই আইয়ুব খান একদিন পরেই বলেছেন ‘আমি আর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো না।’

একটি আন্দোলন সাত দিনের মধ্যে গণ-অভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়- ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে, ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে! এর তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ, যাদের রক্ত ঋণে গোটা জাতি ঋণী, তাদের সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে ভোলায় নিজগ্রামে ‘স্বাধীনতা জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করেছি। সেই জাদুঘরে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শহিদ সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারের স্মৃতি, মহান ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-আন্দোলন, শহিদদের স্মৃতিচিহ্ন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির পিতার দুর্লভ সব আলোকচিত্র সেখানে স্থান পেয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। এই বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন। তিনি ছিলেন বিশ্ববরেণ্য মহান নেতা। তার কোনো তুলনা হয় না। তিনি জন্মেছিলেন বলেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তিনি যদি না জন্মাতেন আমরা আজও পাকিস্তানের দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ থাকতাম। সেই মহান নেতা তার জীবদ্দশায় সবসময় এই দিনগুলোর কথা সংবাদপত্রে বাণী, বিবৃতি দিয়ে শহিদদের কথা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করতেন। কেননা, তিনি জানতেন ৬ দফা আন্দোলন না হলে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান হতো না; ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান না হলে বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে পারতাম না; বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্ত না হলে ’৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তানে আমরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারতাম না; আর পাকিস্তানে যদি আমরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারতাম, তাহলে ৯ মাস যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করতে পারতাম না। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রসমাজের যে ভূমিকা তা গৌরবোজ্জ্বল।

বছর ঘুরে এমন একটি মধুর দিন যখন ফিরে আসে হৃদয়ের মানসপটে কতো স্মৃতি ভেসে ওঠে। আমরা সংখ্যাসাম্যের বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরুর অবস্থান থেকে ‘এক মাথা এক ভোটে’র দাবি তুলে তা আদায় করেছিলাম। ফলে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সংখ্যাধিক্য আসন আমরা লাভ করেছিলাম। এদিনের প্রতিটি মুহূর্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে মনে পড়ে। সেদিন বক্তৃতায় আরো বলেছিলাম-

‘৬ দফা ও ১১ দফা পাকিস্তানি বাস্তবায়নে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের রক্তের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আমরা ফিরে পেয়েছি। তাদের সে রক্ত যেন বৃথা না যায়, তার জন্য জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাই। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসহ সকল মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য এই আন্দোলন শুরু হয়েছে।’

বক্তৃতা শেষ করে ঘোষণা করেছিলাম, ‘এখন বক্তৃতা করবেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।’ তুমুল করতালির মধ্যে তিনি বক্তৃতা করতে দাঁড়ালেন। চারদিকে তাকিয়ে উত্তাল জনসমুদ্রের উদ্দেশে বললেন-

‘রাতের অন্ধকারে সান্ধ্য আইনের কঠিন বেড়াজাল ছিন্ন করে যে মানুষ “মুজিবকে ফিরিয়ে আনতে হবে” বলে আওয়াজ তুলে গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে তাদের দাবির সাথে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না।’

সংগ্রামী ছাত্রসমাজকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন-

‘আমি ছাত্রদের ১১ দফা শুধু সমর্থনই করি না, এর জন্য আন্দোলন করে আমি পুনরায় কারাবরণে রাজি আছি। ছাত্রদের ১১ দফার মধ্যে আমার ৬ দফা দাবিও নিহিত রয়েছে। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি যদি এদেশের মুক্তি আনতে ও জনগণের দাবি আদায় করতে না পারি, তবে আন্দোলন করে আবার কারাগারে যাব।’

সেদিন বঙ্গবন্ধু আরো বলেছিলেন-

‘আমি গোলটেবিল বৈঠকে যাব, সেখানে আমার ৬ দফাও পেশ করব, ১১ দফাও পেশ করব।’

তিনি জীবদ্দশায় কোনো দিন ১১ দফার কথা ভোলেননি। তার বক্তৃতায় সব সময় ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনের কথা থাকত। এমনকি ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে আছে-

‘১৯৬৯-এর আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গণতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম।’

পরিশেষে স্বভাবসুলভ কণ্ঠে কৃতজ্ঞস্বরে বলেছিলেন-

‘ভাইয়েরা আমার, তোমরা যারা রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছ, যদি কোনো দিন পারি নিজের রক্ত দিয়ে আমি সেই রক্তের ঋণ শোধ করে যাব।’

তিনি একা রক্ত দেননি-’৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবার রক্ত দিয়ে বাঙালি জাতির রক্তের ঋণ তিনি শোধ করে গেছে। বাঙালি জাতির ইতিহাসে ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দিন। যত দিন বেঁচে থাকব হৃদয়ের গভীরে লালিত এ দিনটিকে স্মরণ করব।

লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য;

সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ।

আরও পড়ুন:
মাতৃভাষার চেতনা নিয়ে ভাবনা
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?

শেয়ার করুন

মন্তব্য

শেখ হাসিনার সাফল্যে নতুন মাত্রা : সবার জন্য টিকা

সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে বাংলাদেশে অনেক নেতিবাচক অপপ্রচার করা হয়েছিল। এমনটিও বলা হয়েছিল যে ভিভিআইপিরা এই টিকা গ্রহণ না করে সাধারণদের ওপর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনুসন্ধান চালাবে। কিন্তু সেই অপপ্রচারকে ভুল প্রমাণিত করে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যসহ অসংখ্য বিশিষ্ট নাগরিক স্বেচ্ছায় এই টিকা গ্রহণ করছেন। সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব পার করে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে টিকা গ্রহণ করছেন।

সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দীর্ঘ এক বছর ধরে লড়াই করছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। ইউরোপ-আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশগুলো পর্যন্ত জীবন ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখার লড়াইয়ে দিশাহারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, কানাডাসহ গোটা ইউরোপ ঠেকাতে পারছে না মৃত্যুর মিছিল। বিশ্বের উন্নত কিছু দেশে ডিসেম্বরে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও অনেক দেশ এখনো টিকার সরবরাহ পায়নি। বিশ্বের বড় বড় দেশ যখন এখনো করোনার টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং যেসব দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে সেখানেও এখন পর্যন্ত সম্মুখসারির যোদ্ধারা টিকা পাননি। জনসাধারণ এমনকি সিনিয়র সিটিজেনরাও এখন অপেক্ষমাণ টিকা পাবার আশায়।

সারা বিশ্ব যখন টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য হিমশিম খাচ্ছে, তখন করোনা প্রতিরোধের লড়াইয়ে সফলতার দিক থেকে প্রথম থেকেই সম্মুখ সারিতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১-এ দেশব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে করোনাভাইরাসের গণটিকা কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশের ইতিহাসে রচিত হলো নতুন মাইলফলক। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন বাংলাদেশে বিশ্বের ৫৪তম দেশ হিসেবে প্রয়োগ করছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ভ্যাকসিন গ্রহণকৃতদের তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি এবং টিকাজনিত মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়নি এবং সকলে ভালো আছেন।

সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে বাংলাদেশে অনেক নেতিবাচক অপপ্রচার করা হয়েছিল। এমনটিও বলা হয়েছিল যে ভিভিআইপিরা এই টিকা গ্রহণ না করে সাধারণের ওপর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনুসন্ধান চালাবে। কিন্তু সেই অপপ্রচারকে ভুল প্রমাণিত করে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যসহ অসংখ্য বিশিষ্ট নাগরিক স্বেচ্ছায় এই টিকা গ্রহণ করছেন। সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব পার করে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে টিকা গ্রহণ করছেন।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে সবাই এই টিকার অপেক্ষায় ছিলেন। সব ধরনের বাধা, ভয়ভীতি, শঙ্কা ও পাহাড়সমান গুজব পেছনে ফেলে করোনাভাইরাস প্রতিরোধী লড়াইয়ে ৫৪তম দেশ হিসেবে টিকার যাত্রায় নাম লিখাল বাংলাদেশ।

টিকার মূল্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে অপপ্রচার- এসব পরিস্থিতি সামলে নির্ধারিত সময়ে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা ছিল সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এসব পেরিয়ে টিকা প্রদান করার সক্ষমতা অর্জন নিঃসন্দেহে বিরাট অর্জন।

বিনা মূল্যে আজ সবাই এই টিকা পাচ্ছেন এবং ইতিমধ্যে বেসরকারি হাসপাতালে বাণিজ্যিকভাবে টিকা বিক্রির প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ভ্যাকসিনেশনের জন্য অসামান্য সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে গ্লোবাল অ্যালায়েন্সখ্যাত আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমুনাইজেশন (গ্যাভি) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কারে ভূষিত করেছেন ২০১৯ সালে।

প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় অত্যন্ত চমৎকার ব্যবস্থাপনায় টিকা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য গর্বিত। উন্নত দেশের নাগরিকরা এমনকি সম্মুখযোদ্ধারাও টিকা পাচ্ছেন না অথচ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সরকার সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় বিনা মূল্যে পৌঁছে দিল করোনার টিকা।

ভ্যাকসিন বিতরণের প্রশ্নে সারা পৃথিবীর মানুষের মনে যখন একটাই প্রশ্ন- আমার টিকা হবে তো? আমি কখন টিকা পাব? সেই সময়ে বাংলাদেশ বিনা মূল্যে গণটিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরল বিশ্বের দরবারে। বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের জন্য টিকা নিশ্চিতকরণের প্রক্রিয়া শুরুর মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।

লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং আইসিএলডিসির সহকারী পরিচালক

আরও পড়ুন:
মাতৃভাষার চেতনা নিয়ে ভাবনা
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?

শেয়ার করুন

অসহায় মানুষের সৈয়দ আবুল মকসুদ

শুধু মানুষের জন্য বা মানুষের পক্ষে প্রতিবাদ করেছেন, এমনটি নয়। ব্যক্তিজীবনে নিজেও প্রতিবাদ করেছেন। ২০০৪ সালে লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার পর পত্রিকায় তার শক্ত একটি লেখা ছাপা হয়, এ জন্য তাকে সতর্ক করা হয়েছিল। এর প্রতিবাদে তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) চাকরি ছেড়ে দেন, সেখানে তিনি উপপ্রধান বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।

‘আচ্ছা বলেন তো, নিজের খেয়ে আর কত বনের মহিষ তাড়াব।’ গত এক দশকে এই কথাটি অনেকবার শুনেছি মকসুদ ভাইয়ের মুখে। মনে ​হতো মানুষের জন্য কাজ করতে করতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

এর কারণ যেখানেই প্রতিবাদের প্রয়োজন পড়ত, সেখানে সেলাইবিহীন সাদা কাপড় পরা এই পরিচিত মুখের ডাক আসত।

আমাদের এই সমাজে মানবাধিকার লঙ্ঘন, শোষণ, বঞ্চনা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনাই বেশি ঘটে। এসব নিয়ে কাজ করার মানুষ বা সংগঠন কমে এসেছে। মানবাধিকার সংগঠন আছে নামকাওয়াস্তে। সংবাদপত্রে সব মানুষের কথা বলার সুযোগ কম। বেসরকারি সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। সুশীল সমাজের কণ্ঠ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে। এরই মধ্যে যে কয়েকটি কণ্ঠ সোচ্চার ছিল, সেগুলোর অন্যতম ছিলেন ​সৈয়দ আবুল মকসুদ।

জোর গলায় তাকে কথা বলতে শুনিনি। কাছাকাছি বসেও অনেক সময় ওনার কথা শুনতে কষ্ট হতো। কিন্তু তার ক্ষীণকণ্ঠ প্রতিবাদ–প্রতিরোধ হয়ে ছ​ড়িয়ে পড়ত সমাজ ও সরকারের মধ্যে। সাংবাদিকতা পেশায় থাকার কা​রণে বুঝতে পারি, অসংখ্য সাধারণ মানুষ তার প্রতিবাদী অবস্থানের কারণে সুফল পেয়েছেন।

মকসুদ ভাই হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ ও অসহায় মানুষের ঠিকানা। সমাজে নির্যাতিত ও বঞ্চিত কেউ তার কাছে পৌঁছাতে পারলেই সমস্যা সমাধান হবে—এমন স্বপ্ন দেখার ভরসা বা সাহস পেত। তার কণ্ঠে অসহায় মানুষেরা নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরার সুযোগ পেত গণমাধ্যমে বা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে।

অসংখ্য গুণের অধিকারী মকসুদ ভাইকে ভালো লাগা ও পছন্দ করার এটিই ছিল বড় কারণ। জাতীয় বিষয় বাদই দিলাম, আঞ্চলিক ও ব্যক্তিগত অগণিত বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। কখনও দাঁড়িয়েছেন সংখ্যালঘুদের পাশে, কখনও ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর সদস্যদের পক্ষে। নির্যাতিত নারী, ক্ষুদ্র পেশাজীবী, চাকরিচ্যুত কর্মচারী, বেতনবঞ্চিত শিক্ষক, পাটকল বা গার্মেন্টস শ্রমিক— কার পক্ষে তিনি লড়াই করেননি?

জাতীয় রাজনীতিতে ন্যূনতম ঐক্য চাইতেন সব সময়। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও সুশাসন প্রশ্নে বিবেকের সঙ্গে আপস করেননি। সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করেছেন। নিরাপদ সড়ক, পরিবেশ আন্দোলন, নদী বাঁচানো, রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন না করা, পাটকল রক্ষা, গাছ কাটা বন্ধ করা, বাকস্বাধীনতা রক্ষা, সংখ্যালঘুর অধিকার, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ নানা ইস্যুতে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। তার মূল ঠিকানা ছিল জাতীয় প্রেস ক্লাব ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। এই দুটি জায়গায় খুঁজলেই তাকে পাওয়া যেত। যেখানেই অনশন কর্মসূচি সেখানেই ছুটে গেছেন তিনি। একাত্মতা প্রকাশ করেছেন, পানি বা শরবত খাইয়ে অনশন ভঙ্গ করিয়েছেন।

সাদামনের মানুষ মকসুদ ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কটা গড়ে ওঠে সাংবাদিকতা পেশার সূত্রে, তবে সম্পর্কটা ছিল অম্লমধুর। প্রায় এক দশক ধরে সংবাদপত্রে প্রধান প্রতিবেদক বা বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার সময় নানান বিষয়ে তার সঙ্গে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। ওনার কাছ থেকে শেখার ছিল অনেক কিছুই। সর্বশেষ বিতর্ক হয় পাটকল বন্ধ করা ও পাটকলশ্রমিকদের কর্মসূচি নিয়ে। কেন এই খবর সংবাদপত্রগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে না, শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না— এ নিয়ে তার ক্ষোভের অন্ত ছিল না।

মকসুদ ভাই ছিলেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবরের সোর্স। তার কাছ থেকে নানা ঘটনার প্রাথমিক তথ্য পেয়েছি। আবার এমন অনেক বিষয় যেগুলো খবর হিসেবে গুরুত্ব পেত না, অথবা প্রতিবেদন তৈরি করা হলেও স্থানের অভাবে ছাপা যেত না, সেগুলো নিয়ে ওনার অতৃপ্তি ছিল। অনেক খবর ছাপার অনুরোধ তিনি করতেন অন্যের স্বার্থে বা প্রয়োজনে। সকালবেলা তার ফোন দেখলেই মনে হতো, পত্রিকায় কী যেন ভুল করে ফেলেছি।

এই মানুষটির প্রতি অগাধ শ্রদ্ধার আরেকটি কারণ ছিল, তাকে কেনা যায়নি। কেউ কেউ চেষ্টা করে​ও তাকে কিনতে পারেনি। তার আক্ষেপ ছিল অন্যদের বিত্তবান হওয়া, অকারণে বিদেশ ভ্রমণ এবং নীতিগর্হিত নানান কাজকর্ম নিয়ে। কিন্তু এগুলো তাকে আকৃষ্ট করেনি।

বেশ কয়েকবার তিনি আমাকে বলেছেন, প্রতিদিন একাধিক অনুষ্ঠানে যান, কারণ তিনি সাধারণত ‘না’ বলতে পারেন না। কিন্তু গাড়ির তেলের টাকাটাই তার দুশ্চিন্তার কারণ। তার মানে এই নয় যে, কেউ টাকা দিতে চাইলেও তিনি নেবেন। তাকে যে টাকা দিয়ে কেনা যায় না, এই সত্যটা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন সাদামনের মানুষটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন বটে, কিন্তু নিজের আর্থিক অবস্থা নিয়ে খুব একটা ভেবেছেন বলে মনে হয় না।

তার অমায়িক ব্যবহার, সহজসরল জীবনযাপন, নীতি ও আদর্শের সঙ্গে আপস না করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো— এসব গুণাবলি তাকে অন্য অনেকের চেয়ে আলাদা করেছে।

মকসুদ ভাই শুধু মানুষের জন্য বা মানুষের পক্ষে প্রতিবাদ করেছেন, এমনটি নয়। ব্যক্তি​জীবনে নিজেও প্রতিবাদ করেছেন। ২০০৪ সালে লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার পর পত্রিকায় তার শক্ত একটি লেখা ছাপা হয়, এ জন্য তাকে সতর্ক করা হয়েছিল। এর প্রতিবাদে তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) চাকরি ছেড়ে​ দেন, সেখানে তিনি উপপ্রধান বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।

২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর আবুল মকসুদ পশ্চিমা পোশাক ত্যাগ করেন। গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতি অনুরক্ত হয়ে তিনি প্রতিবাদের পোশাক হিসেবে সেলাইবিহীন সুতির সাদা কাপড় বেছে নেন।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মকসুদ ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে যাই স্কয়ার হাসপাতালে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সাদা কাপড়ে মুড়ে রাখা হয়ে​ছিল ওনার মরদেহ। সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এই সাদা কাপড়টুকুই সাদামনের মানুষটির শেষ সম্বল। কিন্তু তিনি যেসব কাজ করে গেছেন, তা মানুষ মনে রাখবে, স্মরণ করবে।

সৈয়দ আবুল মকসুদের লেখালেখির পরিমাণ তিনি নিজেও হয়তো জানতেন না। ধর্ম, ইতিহাস ও রাজনীতি সম্পর্কে তার ধারণা ছিল স্পষ্ট। তার সঙ্গে কথা বললে বেরিয়ে আসত নতুন ও অজানা অনেক তথ্য। অনেক সময় ইতিহাসের কোনও বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি হলে বা ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে ধারণা পেতে ওনার সহায়তা নিতাম।

লেখালেখি করাটাই ছিল তার পেশা। জীবনী, কলাম, কবিতা, প্রবন্ধ, দর্শন, ধর্মতত্ত্বসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, গোবিন্দচন্দ্র দাসসহ অনেকের ওপর তিনি গবেষণা করেছেন। কিন্তু তাকে আমরা কতটা সম্মান দিতে পেরে​ছি, সেই প্রশ্নটিও উঁকি দেয় মনে।

সৈয়দ আবুল মকসুদ জীবদ্দশায় একুশে পদক পেলেন না। এখন তো প্রতিবছর একুশে পদক দেওয়া হয় একুশজনকে। এই লম্বা তালিকার মধ্যেও সৈয়দ আবুল মকসুদের নামটি স্থান পায়নি। তিনি নিশ্চয়ই কারও কাছে যাননি, তদবির করেননি। তাকে সরকারবিরোধী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন কেউ কেউ। কিন্তু বিএনপি সরকারকে ফ্যাসিবাদ বলায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাসসের চাকরি ছেড়েছিলেন তিনি। তবে হ্যাঁ, এটা সত্য তিনি কোনও রাজনীতির অন্ধসমর্থক ছিলেন না। তার লেখায় এমন প্রমাণ মেলে না।

আজকাল একুশে পদকপ্রাপ্ত কারও কারও অবদানের কথা খুঁজে খুঁজে বের করতে হয়। কারও কারও যেটুকু অবদান তার চেয়ে অতিরঞ্জিত করা হয় পুরস্কার দেওয়ার বিবেচনা জায়েজ করার জন্য। অথচ সৈয়দ আবুল মকসুদের মতো মানুষ একুশে পদক পাননি। এটি সত্যিই লজ্জার বিষয়, দুঃখের বিষয়।

শরিফুজ্জামান পিন্টু, সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
মাতৃভাষার চেতনা নিয়ে ভাবনা
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?

শেয়ার করুন

তিনিও অদম্য

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল সেটা মিথ্যা প্রমাণ করেছে কানাডার আদালত। এ রায়ের পেছনে বাংলাদেশের কোনো হাত ছিল না। যদি কানাডার আদালত এমন দ্ব্যর্থহীন রায় না দিত, তাহলে একটি মহল বলেই যেত- বাংলাদেশকে ঋণ দিও না, সে দেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করো না। কারণ সবকিছু লুটপাট হয়ে যাবে। কেউ কেউ শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগের দাবি করত। ঋণচুক্তি বাতিলের সময় (২৯ জুন, ২০১২) বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সরকারবিরোধী আন্দোলন ছিল তুঙ্গে। হরতাল-অবরোধ সফল করায় তাদের হাতিয়ার ছিল পেট্রোল বোমা। ধর্মান্ধ চরমপন্থি গোষ্ঠীও ছিল মরিয়া। তারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে থাকে। পুলিশের ওপর হামলা চালায়। গৃহযুদ্ধের হুমকি দেয়।

বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা মহাকালের ব্যবধান ঘুচিয়ে দিলেন প্রমত্ত পদ্মার বুকে সেতু নির্মাণের মাধ্যমে। গণভবনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বিশ্বব্যাংকের অন্যায় আচরণ প্রসঙ্গে আমাদের বলেছিলেন- এ ধরনের বাধা কিংবা চক্রান্তকে ভয় পাই না। আমার কাজ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন, সমগ্র দেশের উন্নয়ন। সেতুতে ইস্পাতের কাঠামোর কারণে ব্যয় কিছুটা বাড়বে, কিন্তু দেখতে সুন্দর হবে। আমরা মনের দিক থেকে যে কতটা শৈল্পিক সেটিরও তো প্রমাণ রাখা চাই।

১৯৯৮ সালের ৪ জুন যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর শেষ অংশটি ঢালাইয়ের সময় অকুস্থলে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। প্রকৌশলীদের সঙ্গে কাজ করছিলেন রাজমিস্ত্রিরা। ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুতে ইস্পাতের ৪১ নম্বর স্প্যানটি বসানোর দৃশ্য দেখেছি টেলিভিশনে। শিহরিত হওয়ার মতো ঘটনা যে!

বরিশালসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর অনেকেই বলেন- চলাচলের ক্ষেত্রে আমরা প্রকৃতির হাতে জিম্মি। শীতে কুয়াশা, বর্ষায় নদ-নদীতে উত্তাল ঢেউ ও স্রোত, গ্রীষ্মে ঝড়। স্থল-জল-আকাশপথে গন্তব্যে পৌঁছানো দুঃসহ। একাধিকবার বর্ষায় স্টিমারে ঢাকা থেকে বরিশাল যাওয়া ও আসার সময় পদ্মা-মেঘনার সংযোগস্থলে ডেকের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ঢেউ চলে যেতে দেখেছি। কী ভয়ংকর মুহূর্ত ছিল তখন। প্রমত্ত পদ্মা নদী বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বরিশাল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর যে ‘দূরত্ব’ তৈরি করেছে, সেটা ঘুচিয়ে দিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। এ কাজে একটি বড় বাধা ছিল প্রকৃতির তরফে। সে বাধা জয় করায় প্রযুক্তিগত সম্পদ ও অর্থের প্রয়োজন ছিল। সে বাধার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বব্যাংক। তারা ২০১২ সালের ২৯ জুন জানায়- ‘নিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে যে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র ঘটেছে।’ এ অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগের তীর কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের প্রতিও তাক করা ছিল। শেখ হাসিনা ছিলেন আপসহীন- বিশ্বব্যাংক কিংবা অন্য কারো অন্যায় দাবির কাছে নতিস্বীকার করার প্রশ্ন আসে না। এ অটল মনোভাবের জয় হয়েছে। বাংলাদেশ নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।

নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে স্বীকার করে নেন- পদ্মা সেতু প্রকল্পে কল্পিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রতিশ্রুত ঋণ প্রত্যাহার করা ভুল পদক্ষেপ ছিল। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে তিক্ততা তৈরি হয়েছিল সেটা আর থাকবে না- এই ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক বাড়তি সহায়তা দেবে।’ বাস্তবে সেটাই ঘটেছিল।

পদ্মা সেতু চেতনার জয় এভাবেই হয়!

এ প্রসঙ্গে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান স্মরণ করতে পারি। স্বাধীনতার চার বছর পূর্ণ না হতেই তিনি ডাক দেন দ্বিতীয় বিপ্লবের- মূল লক্ষ্য ঔপনিবেশিক আমলের জঞ্জাল দুর্নীতি-অনিয়ম নির্মূল এবং স্বনির্ভরতা অর্জন। স্বনির্ভরতা যে কল্পিত নয়, আমাদের ভেতরেই এর রসদ রয়েছে, সেটা বলেন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের পর ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু সাধারণ পরিষদে ভাষণ প্রদানের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। নিউইয়র্কে বিশ্বসভায় বাংলায় বক্তব্য রাখার পর যান ওয়াশিংটন, সে সময়ের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে আলোচনার জন্য। এ সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং বিশ্বব্যাংকের দুই সিনিয়র অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশকে তাচ্ছিল্য করে ‘বাস্কেট কেস’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তাদের বিবেচনায় ‘বাংলাদেশ যদি উন্নতি করতে পারে, তাহলে বিশ্বের যে কোনো দেশ উন্নতি করতে পারবে।’ এর সহজ ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে- এই ছেলে যদি এসএসসি পাস করে তাহলে কলাগাছও পাস করবে।

বঙ্গবন্ধু হেনরি কিসিঞ্জার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের বাংলাদেশ সম্পর্কে তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্যের মোক্ষম জবাব প্রদানের জন্য ওয়াশিংটনকেই বেছে নেন।

ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থে লিখেছেন-

“ওয়াশিংটনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, কেউ কেউ বাংলাদেশকে International Basket Case বলে উপহাস করেন। কিন্তু বাংলাদেশ Basket Case নয়। দুইশ’ বছর ধরে বাংলাদেশকে লুট করা হয়েছে। বাংলাদেশের সম্পদেই শ্রীবৃদ্ধি করা হয়েছে লন্ডন, ডান্ডি, ম্যাঞ্চেস্টার, করাচি, ইসলামাবাদের।... আজো বাংলাদেশে অফুরন্ত সম্পদ রয়েছে। একদিন আমরা দেখাবো বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।”

শেখ হাসিনা আমাদের যে পদ্মা সেতু চেতনা উপহার দিয়েছেন, সেটা জাতির পিতার এ অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা। আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি।

আমরা নিশ্চয়ই এতে তৃপ্ত থাকব না। এ অর্জন অনেক অনেক বড়, সন্দেহ নেই। সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে যেভাবে বড় বড় বাধা আমরা জয় করেছি, সেটা আমাদের প্রেরণা জোগাবে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন- বাংলাদেশের নেতৃত্ব, প্রশাসন এবং অন্য অনেক প্রতিষ্ঠান ‘অদক্ষ’। তাদের জন্য সর্বক্ষণ বাইরের ‘কনসালট্যান্ট’ প্রয়োজন। এ কনসালট্যান্টদের উচ্চহারে বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় ঋণের বোঝা। সত্তরের দশকের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে একটি ঋণ দিয়েছিল ‘কৃষি ঋণের সুদ ৩৬ শতাংশ করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের’ জন্য। ঋণের প্রায় সব অর্থ ব্যয় হয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ‘কনসালট্যান্টদের’ সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য, যাদের কাজ ছিল কৃষকদের চড়া সুদে ঋণ প্রদানের ফর্মুলা বের করা।

আশুগঞ্জের একটি সার কারখানায় ‘দাতাদের ঋণ’ নিয়ে কাজের সময়েও দেখেছি- ‘কনসালট্যান্টরা’ যা চায়, তাই পায়। বিলাসী জীবন না হলে যে আমাদের উন্নতির সূত্র বের করতে পারেন না! একবার বিদেশি অর্থে পরিচালিত এক ‘এনজিও বস’ আমাকে বলেছিলেন- ‘দারিদ্র্য দূর করার চিন্তায় তিনি সব সময় অস্থির থাকেন। যখন কাজের চাপ বেশি পড়ে, তখন সুস্থ মস্তিষ্কে কাজ করার জন্য চলে যান রাজেন্দ্রপুরের ব্র্যাক সেন্টারে, যেখানে গ্রামীণ পরিবেশে মেলে ফাইভ স্টার হোটেলের সুবিধা।’

শেখ হাসিনা উন্নত বিশ্ব ও তাদের নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে চ্যালেঞ্জ করার সৎ সাহস দেখিয়েছেন, যা উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত অনেক দেশের নেতারা পারেননি। পদ্মা সেতু তাদেরও পথ দেখাবে।

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল সেটা মিথ্যা প্রমাণ করেছে কানাডার আদালত। এ রায়ের পেছনে বাংলাদেশের কোনো হাত ছিল না। যদি কানাডার আদালত এমন দ্ব্যর্থহীন রায় না দিত, তাহলে একটি মহল বলেই যেত- বাংলাদেশকে ঋণ দিও না, সে দেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করো না। কারণ সবকিছু লুটপাট হয়ে যাবে। কেউ কেউ শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগের দাবি করত। ঋণচুক্তি বাতিলের সময় (২৯ জুন, ২০১২) বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সরকারবিরোধী আন্দোলন ছিল তুঙ্গে। হরতাল-অবরোধ সফল করায় তাদের হাতিয়ার ছিল পেট্রোল বোমা। ধর্মান্ধ চরমপন্থি গোষ্ঠীও ছিল মরিয়া। তারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে থাকে। পুলিশের ওপর হামলা চালায়। গৃহযুদ্ধের হুমকি দেয়। এমন সময়েই বিশ্বব্যাংকের ঢাকাস্থ আবাসিক প্রতিনিধি এলেন গোল্ডস্টেইন এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন- ‘ভবিষ্যতে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণ পেতে হলে শেখ হাসিনাকে অনেক অঙ্গীকার করতে হবে। ঋণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে এবং তা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে কি না সে বিষয়েও প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিলের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার পেছনে বাংলাদেশের মানুষের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে।’

এটা ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বসেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিশ্ব্যাংকের এক কর্মকর্তার নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ। অভ্যন্ত্যরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের আরও ঘটনা আমরা পাই দৈনিক সমকালের ৩১ অক্টোবর, ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে-

“বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা ভারত সফরে গিয়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও আগামী নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় অসন্তুষ্ট বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন- বিদেশি কূটনীতিকদের বেশিরভাগই কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চললেও কেউ কেউ তা লঙ্ঘন করছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে ড্যান মজীনার সফরের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে আমাদের সঙ্গে কথা বলাই শিষ্টাচার। আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন নিয়ে বাইরে গিয়ে কথা বলাটা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন।”

নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যে স্বাধীনচেতা মনোভাব বঙ্গবন্ধুকন্যা দেখিয়েছেন সে জন্যই কি তাকে উচিত শিক্ষা দিতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের হুকুমে চলা বিশ্বব্যাংক?

পদ্মা সেতু এখন বাস্তব। তবে উন্নত বিশ্বের সারিতে উঠে বসতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে এখনও লক্ষ্য পূরণে অনেক দুস্তর পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে বড় ভরসা শেখ হাসিনার পদ্মা সেতু চেতনা। আমাদের জয় হবেই, যেমন হয়েছে একাত্তরে।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলাম লেখক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
মাতৃভাষার চেতনা নিয়ে ভাবনা
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?

শেয়ার করুন

নাইট রাইডার্সের সাকিব ও আমার ভালোবাসাশূন্য কথা

সাকিব বাংলাদেশের হয়ে না খেলে আইপিএল খেলতে ছুটি নিলেও মুস্তাফিজের মতো জুনিয়র খেলোয়াড়ও জানিয়েছেন, দলে সুযোগ পেলে তিনি বাংলাদেশের হয়ে খেলবেন, আইপিএল নয়। সাকিব কি মুস্তাফিজের কাছে কিছু শিখবেন? অর্থটাকেই যারা সবকিছু ভাবছেন, তারা বলুন তো টাকাটা মুস্তাফিজের বেশি দরকার না সাকিবের?

আবেগ আমাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য। যেকোনো প্রবল আবেগে আমরা ভেসে যাই। এই আবেগ আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও। আমি নিজেও একজন হৃদয়চালিত প্রবল আবেগপ্রবণ মানুষ। আমরা দেশ, ধর্ম, রাজনীতি, খেলা ও খেলোয়াড় নিয়ে প্রবল আবেগে ভাসি। সমস্যা হলো, আবেগের মেঘ আমাদের বিবেককে ঢেকে দেয়, যুক্তিকে পরাজিত করে, বিবেচনাকে অন্ধ করে দেয়। যাকে পছন্দ করি, তার কোনো ভুল আমাদের চোখে পড়ে না। যাকে অপছন্দ করি, তার কোনো গুণ খুঁজে পাই না। কিন্তু বাস্তবতা হলো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান-দল, শতভাগ ভালো বা শতভাগ মন্দ হতেই পারে না। সবারই দোষ-গুণ, ভালো-মন্দ আছে। ফুটবল বিশ্বকাপের সময় আমরা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায় বিভক্ত হয়ে যাই। ব্রাজিল সমর্থকদের চোখে মেসি কোনো খেলোয়াড়ই না, আবার আর্জেন্টিনার সমর্থকদের চোখে নেইমার নিছক একজন অভিনেতা। অথচ দুজনই গ্রেট ফুটবলার। আবেগে অন্ধ হয়ে যাওয়ার এমন হাজারটা উদাহরণ আছে। আবেগের প্রসঙ্গটি এসেছে সাকিব আল হাসানকে নিয়ে চলমান বিতর্ক ঘিরে।

বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি সাকিব আল হাসান। একটা স্লোগান খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল- ‘বাংলাদেশের জান, সাকিব আল হাসান’। স্লোগানটি জনপ্রিয় হয়েছিল, কারণ বিষয়টা সত্যি। সাকিব সত্যি সত্যিই আমাদের জান। সাকিব বাংলাদেশের মানমর্যাদা অনেক উঁচুতে তুলে নিয়েছেন। অনেকেই সাকিবকে দিয়ে বাংলাদেশকে চেনে। একজন ব্যক্তি অনেক সময় তার প্রতিভায় সবকিছু ছাড়িয়ে যেতে পারেন। সাকিব তেমনই একজন সর্বপ্লাবি প্রতিভা। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যত ক্রিকেটার খেলেছেন, তাদের মধ্যে সবার সেরা সাকিব। আসলে সবার সেরা বললে, একটু কম বলা হবে। সাকিব সবাইকে ছাড়িয়ে এক নাম্বার। তার ধারেকাছেও কেউ নেই। আর এটা জানেন বলেই গড়পড়তা বাংলাদেশ দলের সঙ্গে টিম ফটোসেশনেও তার অনীহা। যত প্রতিভাবান আর যত বড় পারফরমারই হোন না কেন, সাকিবও একজন মানুষ এবং তিনিও ভুল করতে পারেন। সমস্যাটা এখানেই, সাকিবের ক্রিকেটটাই শুধু সঠিক আর বাকি সব ভুলে ভরা। তিনি একের পর এক ভুল করেন এবং সেটা যে ভুল সেটা মনেই করেন না। তার চেয়ে বড় কথা হলো, সাকিব অনুরাগীদের চোখেও তার ভুলগুলোকে ফুল মনে হয়। ক্যামেরার সামনে তিনি অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করেন। পরে যুক্তি দেন, ক্যামেরা যে ছিল এটা তিনি জানতেন না। কিন্তু একজন সভ্য মানুষ তো ক্যামেরা দিয়ে তার আচরণ ঠিক করবে না। এমনকি বদ্ধঘরেও কেউ এমন অঙ্গভঙ্গি করে না।

সাকিব যখন একজন দর্শককে পেটায়, তখন তার অন্ধ অনুরাগীরা পালটা যুক্তি দেন, আপনার স্ত্রীকে কেউ বিরক্ত করলে আপনি কী করতেন? আরে ভাই সাকিব যদি ইশারা করতেন, পুলিশ সেই দর্শকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিত। কিছুতেই সাকিবের মতো একজন স্পোর্টস আইকন আইন হাতে তুলে নিতে পারেন না। সাকিব দিনের পর দিন একজন জুয়াড়ির সঙ্গে কথা বলেছেন, লেনদেনের প্রসঙ্গ আসাতে বসতে চেয়েছেন। আইসিসির দীর্ঘ অনুসন্ধানে সাকিব দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। সাকিব দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে মাত্র এক বছরের সাজা পেয়েছেন। তিনি যখন বুঝতে পারলেন শাস্তি আসছে, তখন তিনি নানা দাবিদাওয়া নিয়ে বিসিবির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে গেলেন। নিজের দল ভারী করতে চাইলেন। আন্দোলনের দুই দিন পরই যখন আইসিসির শাস্তির ঘোষণা এলো সাকিবের অন্ধ অনুরাগীরা বলতে লাগলেন, বিসিবির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন বলেই বিসিবি আইসিসিকে দিয়ে তাকে নিষিদ্ধ করিয়েছে। পুরো ব্যাপারটাই আইওয়াশ। সাকিব নিজে যে অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছেন, সেটাও তার অন্ধ অনুরাগীরা মানতে রাজি নন। আইসিসিকে দিয়ে সাকিবকে শাস্তি দেয়ানোটা যে অসম্ভবই নয়, অবাস্তবও সেটা বোঝার মতো বিবেচনাও অনেকের নেই। অন্ধ অনুসরণ তাদের সব বিবেচনাবোধকে আড়াল করে দিয়েছে। অথচ অন্য দেশ হলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার দায়ে আইসিসির শাস্তির সঙ্গে আরও কিছু শাস্তি যোগ করত। সাকিব বলেই বিসিবি সেটা করার কথা কল্পনাও করেনি। উলটো এই নিষেধাজ্ঞায় যে তাদের কোনো হাত নেই, সেই ব্যাখ্যা দিতে দিতেই ক্লান্ত বিসিবি। সাকিব অনুরাগীদের অভিযোগ, বিসিবি বিপদের সময় সাকিবের পাশে দাঁড়ায়নি। বিসিবি যে বাড়তি কোনো সাজা যোগ করেনি, এটাই সাকিবের পাশে দাঁড়ানো। যে অপরাধে আশরাফুলের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেল, সেই একই অপরাধ করেও সাকিব হয়ে গেলেন ধোয়া তুলসীপাতা। আবেগ আসলেই কোনো যুক্তি মানে না।

যখন আপনি অনেক মানুষের প্রিয় হবেন, তখন আপনার প্রতিটি আচরণ উদাহরণ হয়ে যাবে। এখন তরুণ প্রজন্মের যারা সাকিবের মতো হতে চান, তারা কিন্তু মনে করতে পারে কাউকে পেটানো, খোলা গ্যালারিতে বসে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করা, জুয়াড়িদের সঙ্গে যোগাযোগ- এসব কোনো অপরাধ নয়। সাকিব যা করতে পারে, তা তারাও করতে পারবে। সাকিবের মধ্যে ক্রিকেট থাকলেও, ক্রিকেটীয় মূল্যবোধ নেই বললেই চলে। টাকা পেলে সাকিব ‘পূজা উদ্বোধন’ করতে করোনার মধ্যেও কলকাতা চলে যেতে পারেন। আবার মৌলবাদীদের হুমকির মুখে মাফও চাইতে পারেন। কিন্তু একজন আইকনের কাছ থেকে আমরা শুধু মাঠের খেলা নয়, মাঠের বাইরেও উচ্চ নৈতিকতা এবং দৃঢ়তা আশা করব। সেখানেই সাকিবের বড় ঘাটতি। সাকিব কখনোই অনুসরণীয় চরিত্র হয়ে উঠতে পারেননি।

আগের ঘটনা যা-ই হোক, বাংলাদেশের হয়ে না খেলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে খেলতে ছুটি নিয়েছেন; আমার ধারণা ছিল সাকিকের এই অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্ত তার অনুরাগীদের আবেগের পর্দা তুলে নেবে। কিন্তু হায়, সাকিবের এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেয়ার লোকেরও অভাব নেই। আমি আবেগপ্রবণ, কিন্তু অন্ধ নই।

আমি যেমন সাকিবের প্রবল অনুরাগী, তেমনি আশরাফুলের প্রবল অনুরাগী ছিলাম। কিন্তু আবেগ আমাকে কখনও অন্ধ করে দেয়নি। আশরাফুল নিষিদ্ধ হওয়ার পর আমি তার পক্ষে যুক্তি দিইনি। বরং অভিমান করে এক বছর ক্রিকেট খেলা দেখিনি। সাকিবের আইপিএল খেলার পক্ষে তার অনুরাগীদের যুক্তিগুলো হলো, একজন পেশাদার ক্রিকেটার যেখানে টাকা বেশি সেখানেই খেলবে। সাকিব আইপিএল খেলছে নিজের যোগ্যতায়। কোথায় খেলবে, সেটা বেছে নেয়ার স্বাধীনতা তার আছে। ক্রিকেটের সাথে দেশপ্রেম মেলানো ঠিক নয়। সাকিব তো বোর্ড থেকে ছুটি নিয়ে যাচ্ছে। ক্রিকেটকে আবেগ থেকে দূরে রাখতে হবে। বিসিবি কত সাকিবকে বানায়নি বা সাকিবের বিকল্পও কাউকে বানায়নি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি নিজেও একজন প্রবল সাকিব অনুরাগী; কিন্তু অন্ধ নই। আমি মনে করি, সাকিবের অন্ধ অনুরাগীরাই তার বারবার ভুল করার জন্য দায়ী। দিনের পর দিন সব ভুলের পক্ষে যুক্তি দিয়ে দিয়ে এই আপনারাই সাকিবকে দানব বানিয়েছেন। আপনাদের জন্যই বোর্ড সাকিবকে ন্যায্য কথাটাও বলতে পারে না।

সাকিব ছুটি নিয়ে আইপিএল খেলতে যাচ্ছেন, এটা ঠিক। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের ‘সি’ টিমের কাছে হোয়াইট ওয়াশ হওয়ার পর সবার যখন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জান দিয়ে লড়ার জন্য প্রস্তুত হওয়ার কথা, তখন দলের সেরা খেলোয়াড় ছুটি চাইছেন; এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কিছু হতে পারে না। সারা দেশের মানুষ অনুসরণ না করুক, অন্তত দলের জুনিয়ররা যাতে অনুসরণ করতে পারে, তেমন দৃষ্টান্ত তো সিনিয়রদের কাছে আশা করাই যেতে পারে। সাকিব কীভাবে ছুটি পেয়েছেন, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপন জানিয়ে দিয়েছেন, কেউ খেলতে না চাইলে বোর্ড কাউকে জোর করবে না। চাইলে মুস্তাফিজও ছুটি পাবেন। কিন্তু সাকিব বাংলাদেশের হয়ে না খেলে আইপিএল খেলতে ছুটি নিলেও মুস্তাফিজের মতো জুনিয়র খেলোয়াড়ও জানিয়েছেন, দলে সুযোগ পেলে তিনি বাংলাদেশের হয়ে খেলবেন, আইপিএল নয়। সাকিব কি মুস্তাফিজের কাছে কিছু শিখবেন? অর্থটাকেই যারা সবকিছু ভাবছেন, তারা বলুন তো টাকাটা মুস্তাফিজের বেশি দরকার না সাকিবের?

এটা ঠিক সাকিব ছুটি নিয়েই আইপিএল খেলতে যাচ্ছেন। কিন্তু সাকিবের ছুটি প্রসঙ্গে অসহায়ত্ব ছিল আকরাম খানের কণ্ঠে। নাজমুল হাসান পাপনও তার হতাশা, ক্ষোভ, রাগ, অভিমান, অসহায়ত্ব গোপন করেননি। পাপন বলেছেন, ‘আমরা চাই যারা খেলাটাকে ভালোবাসে তারাই খেলুক। জোর করে আমি খেলাতে চাই না। সাকিব তো আরও তিন বছর আগেই টেস্টে খেলতে চায়নি। ওতো এমনিতেই টেস্টের প্রতি আগ্রহ দেখায়নি। তখন তো ওকে টেস্ট অধিনায়ক করে দেওয়া হলো। জোর করে তো চেষ্টা করলাম। কিন্তু আসলে জোর করে খেলানোর মানে হয় না। আমার মনে হয় তাতে করে আমরা ভবিষ্যতে আগাতে পারবো না। আমরা যখন জানবো এই কজন প্লেয়ার টেস্ট খেলতে চায় না, তখন তো তাদের বিকল্প নিয়ে চিন্তা করতে পারবো। হয়তো সময় লাগবে, লাগুক। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য আমাদেরই ভালো হবে।’ পাপনের কণ্ঠে ক্ষোভ, ‘ওরা সবাই (সিনিয়র) যদি লিখে দেয় আমরা কেউ জাতীয় দলের হয়ে খেলতে চাই না, আমি এখনই রাজি। তবে আমাকে অবশ্যই জানতে হবে। ট্যুরের আগে যেয়ে বললে হবে না। হঠাৎ করে সিরিজের আগে আওয়াজ শুনি একটা, এগুলো চাচ্ছি না। খেলতে না চাইলে আগেই বলতে হবে, সিরিজের আগে না। ওরা না খেললে আমাদের সময় লাগবে, আমি একটা বছর সময় চাই। একবছর পরে কাউকে লাগবেও না, কোনো অসুবিধা নেই।’ লুকাননি হতাশাও, ‘সাকিবের সিদ্ধান্তে যে হতাশ হয়েছি, এটা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। এর আগেও এমন হয়েছে। কেউ যদি খেলতে না চায়, তাহলে সে খেলবে না। আমরা চাই নিজেদের সিদ্ধান্ত ওরা নিজেরা নিক।’ সাকিব প্রতিভাবান। কিন্তু সে প্রতিভা তো বিকশিত হয়েছে বাংলাদেশে খেলে, বোর্ডের পরিচর্যায়। সাকিব তো হঠাৎ আকাশ থেকে নাজিল হননি। এ ব্যাপারে পাপনের বক্তব্য হলো, ‘দেখেন একজন খেলোয়াড়ের পেছনে আমাদের বিনিয়োগ তো কম নয়। সবকিছু মিলিয়ে একজন খেলোয়াড়ের পেছনে যা ব্যয় হয়, তা তো আগে কল্পনা করাও যেত না। এই জায়গাতে এই রকম দুটি টেস্ট ম্যাচ হারের পরও সাকিব কীভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা আমার চিন্তায়ও আসে না। আমার ধারণা ছিল সবাই পরের টেস্টটা জয়ের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকবে। সেই জায়গা থেকে যদি কেউ বলে আমি টেস্ট খেলবো না, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলব। তাহলে আসলে আমাদের করার কিছুই থাকে না। আজকে যেসব খেলোয়াড় তারকা হয়েছেন, প্রথম ৬-৭ বছরে তাদের গড় কত ছিল। খেলতে খেলতেই তো তারা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। যখন তাদের সার্ভিস আমাদের পাওয়ার কথা, তখন তারা দলের কথা চিন্তা করছে না। সেটা তো অবশ্যই হতাশাজনক।’

সাকিবের এই অন্যায় আবদার মেনে নিলেও বোর্ড এখন চুক্তিতে কিছু বিষয় স্পষ্ট করতে চাইছে, ‘আমরা ওদের (জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের) সঙ্গে একটা চুক্তি তৈরি করব। নতুন এই চুক্তিতে নতুন কিছু বিষয় যুক্ত হবে। পরিষ্কারভাবে লেখা থাকবে, কে-কোন ফরম্যাট খেলতে চায়, তাদের বলতে হবে। তাদের যদি ওই সময়ে অন্য কোনো খেলা থাকে, এটাও জানাতে হবে। তখন এই চুক্তিতে যারা সই করবে, তাদের তো আমরা তখন যেতে দেব না।'

এক সাকিবের জন্য বোর্ডকে এখন নিজেদের বদলে ফেলতে হচ্ছে।

আরও অনেকের মতো সাকিব আমারও অনেক প্রিয়। আগেই বলেছি, সাকিব ভালো খেলেন বলে আমার প্রিয় নন, তিনি বাংলাদেশের হয়ে খেলেন বলেই তার জন্য আমাদের জান কোরবান। ড্যাশিং ভিভ রিচার্ডস, স্টাইলিস্ট ব্রায়ান লারা, ডিসিপ্লিনড শচিন টেন্ডুলকারও কিন্তু আমার প্রিয়। কিন্তু কেউই সাকিবের মতো প্রিয় নন। সাকিবকে আমি জান দিয়ে ভালোবাসি, কারণ সাকিব ভালো খেললে, বাংলাদেশ ভালো খেলে। সাকিবকে ভালোবাসার সঙ্গে আমার দেশের প্রতি আবেগটাও জুড়ে যায়। বাংলাদেশের হয়ে হারলেও আছি, জিতলেও। কিন্তু কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে সাকিব যতই ভালো খেলুক, আমার কিচ্ছু যায় আসে না। বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান আমার জান। কিন্তু কলকাতা নাইট রাইডার্সের সাকিব আল হাসানের জন্য আমার কোনো ভালোবাসা নেই।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
মাতৃভাষার চেতনা নিয়ে ভাবনা
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?

শেয়ার করুন

করোনা নিয়ে নতুন ভাবনা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাছিও করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে না। বলা যায়, এর ফলেও আমাদের আরেকটি বিপদ কমলো। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাছি ৬৫টি বিভিন্ন রোগ ছড়াতে সাহায্য করে যাদের মধ্যে রয়েছে কলেরা, চোখ ওঠা, ডায়রিয়া, আমাশয়, যক্ষ্মা, টাইফয়েড, স্লিপিং সিকনেস ইত্যাদি। তাই করোনা মহামারির সময়ে মাছি করোনা ছড়ায় না বলে একে অবহেলা করা ঠিক হবে না।

মশা শুধু আমাদের দেশেই নয়, বরং পৃথিবীর বহু দেশে এক জনস্বাস্থ্যগত সমস্যার নাম। সবচেয়ে উন্নত দেশ আমেরিকাও এই সমস্যা থেকে মুক্ত নয়। উত্তর গোলার্ধের উন্নত দেশগুলোতে মশার উপদ্রব শুরু হয় মূলত বসন্তকালের পর। তবে আমাদের দেশে প্রায় সারা বছরই এই উপদ্রব থাকে। বিভিন্ন প্রজাতির মশার প্রজনন বৈশিষ্ট্যও আবার বিভিন্ন রকম। এই ক্ষুদ্র উড়ন্ত প্রাণীটি আমাদেরকে কামড়ে রক্ত শুষে নেয়, ফলে আমাদের কাজের মনোযোগ কমে এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। কিন্তু তার চাইতেও বড় সমস্যা হলো মশা বেশ কিছু প্রাণঘাতী অসুখ ছড়ায়।

মশার মাধ্যমে যেসব ভাইরাস ছড়ায় তাদের মধ্যে বেশি কুখ্যাতগুলো হলো ওয়েস্ট নাইল, ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাস। ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস আমাদের দেশে অপরিচিত, কিন্তু মারাত্মক রকম প্রাণঘাতী। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে, প্রায় অর্ধেক পৃথিবী জয় করা সম্রাট আলেকজান্ডার নাকি মিসর অভিযানের সময় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন রোগভোগের পর মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

অবশ্য অন্যদের মতে, তার মৃত্যুর কারণ ছিল অতিরিক্ত মদ্যপান ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার। যাহোক, নীল নদের পশ্চিম তীরের এলাকায় দাপট দেখানো এই ভাইরাসটি আমাদের দেশে না থাকলেও ডেঙ্গু জ্বর ও চিকুনগুনিয়ার ভাইরাসগুলো বিদেশ থেকেই এখানে এসেছে। এসব ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো মানুষকে মশা কামড়ালে মনুষ্যরক্তের মাধ্যমে ভাইরাস মশার পাকস্থলীতে পৌঁছে, সেখানে সংখ্যাবৃদ্ধির পর ভাইরাস মশার লালাগ্রন্থিতে গিয়ে বাসা তৈরি করে বাস করে। এই মশা যখন আবার কাউকে কামড়ায় তখন লালার মাধ্যমে ভাইরাসটি সেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এভাবেই ভাইরাসগুলো মশার মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে।

এডিস, কিউলেক্স ও এনোফিলিস- মূলত এই তিন প্রজাতির মশাই আমাদের জন্য ক্ষতিকর। এদের একেক প্রজাতি একেক রোগ ছড়ানোর জন্য দায়ী। উপরিউক্ত অসুখগুলো ছাড়াও এই তিন প্রজাতির মশা আরও যেসব রোগ ছড়ায় সেটির তালিকা বেশ দীর্ঘ।

এদের মধ্যে রয়েছে ম্যালেরিয়া, ইয়েলো ফিভার, এলিফ্যানটিয়াসিস বা লিম্ফ্যাটিক ফাইলেরিয়াসিস এবং বিভিন্ন রকম এনসেফালাইটিস, যার মধ্যে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া এনসেফালাইটিস, জাপানিজ এনসেফালাইটিস, ভেনিজুয়েলা এনসেফালাইটিস, সেন্ট লুই এনসেফালাইটিস, ওয়েস্টার্ন একুইন এনসেফালাইটিস, ইস্টার্ন একুইন এনসেফালাইটিস ইত্যাদি। এর সবগুলোই মারাত্মক ও প্রাণঘাতী। তার মানে প্রাণী হিসেবে মশা ক্ষুদ্র হলেও মন্দকর্মে তার ক্ষমতার বলয়টা বিশাল। তবে সুখের বিষয়, সব দেশে এ সবগুলো অসুখ হয় না।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার তাণ্ডব আমাদের দেশে কিছুকাল আগেও দেখেছি। এরা অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। এখন করোনা মহামারির এই সময়টাতে আমাদের দেশে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার আক্রমণ বেশ কম। অন্যান্য বছরের মতো এবারও যদি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব থাকতো এবং সঙ্গে করোনার প্রকোপও অব্যাহত থাকতো, তাহলে আমাদের অবস্থা অনেক শোচনীয় হতো।

প্রকৃতির অনেক রহস্য বিজ্ঞান এখনও জানে না। তাই করোনার প্রাদুর্ভাবকালে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ভাইরাস অবদমিত থাকে কি না তার কোনো ব্যাখ্যা আমরা এখনও জানি না। তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত এলাকায় করোনাভাইরাস যে সুবিধা করতে পারে না, এর প্রমাণ দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে। সেখানে যেসব অঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব রয়েছে সেসব জায়গায় করোনাভাইরাসে আক্রান্তের হার খুবই কম। এ সম্পর্কে পরবর্তী কোনো এক সময়ে লেখা যাবে।

এডিস ধরনের মশা ডেঙ্গুসহ অন্যান্য অসুখ ছড়ালেও কভিড-১৯ ছড়াতে পারে না বলে মনে হচ্ছে। এ বিষয়ে সর্বপ্রথম গত বছরের মার্চে ফ্রান্সের মশা-নিয়ন্ত্রক সংস্থা এতেঁত ইন্তারডিপার্তমেন্তেল দ্য দিমউসতিকেশন (ইআইডি) জানিয়েছে যে তাদের কীটতত্ত্ববিদরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, মশা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো বিভিন্ন প্যাথোজেন ছড়াতে পারলেও করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে না। যদি এই ভাইরাস মশার পাকস্থলীতে গিয়ে হজম না হয়ে এই প্রক্রিয়াকে বাধা দিতে পারতো, যদি এটি মশার পাকস্থলীর কোষগুলোকে সংক্রমিত করতে পারতো, কিংবা যদি এটি মশার লালাগ্রন্থিতে বাসা বানাতে পারতো- তাহলে আশঙ্কা ছিল যে, মশার কামড়ে লালার মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়াতে পারতো। তা এখনও হচ্ছে না। যদি ছড়াতে হয় তাহলে মশাকে হাজার বছর ধরে বিবর্তনের ধারায় ধীরে ধীরে নিজেকে রূপান্তরিত করতে হবে। ততদিন মোটামুটি নিশ্চিন্ত যে মশা করোনাভাইরাস ছড়াতে পারবে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত ৫ এপ্রিল ২০২০ এ বিষয়ে তাদের বিবৃতিতে বলেছে, এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি যাতে মনে হতে পারে যে, করোনাভাইরাস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এই নতুন ভাইরাসটি একটি শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস এবং এই ভাইরাসটি মূলত সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশি দেয়া কিংবা কথা বলার সময় নিঃসৃত অতি ক্ষুদ্র জলীয় কণা বা লালা কিংবা নাকের শ্লেষায় থাকা করোনাভাইরাসের কারণে ছড়ায়।

তাই নিজেকে সংক্রমণমুক্ত রাখতে অ্যালকোহলসমৃদ্ধ হ্যান্ড রাব দিয়ে হাত পরিষ্কার করুন কিংবা সাবান ও পানি দিয়ে ঘনঘন ভালো করে হাত ধোবেন। সেই সঙ্গে হাঁচি ও কাশি দেয়া কারো কাছ থেকে দূরে থাকুন।

এই বক্তব্যের সপক্ষে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ভাইরাস গবেষণার বিখ্যাত পাব-মেড জার্নাল ভাইরোলজিকা সিনিকা এটি প্রকাশ করেছে তাদের জুন ২০২০ সংখ্যায় (ভলিউম ৩৫, নম্বর ৩)। সেখানে গবেষকরা ল্যাবরেটরিতে এডিস মশার দেহকোষে সার্স-কভ-২ প্রবেশ করান। সব ধরনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা সত্ত্বেও সেই দেহকোষগুলোতে এই করোনাভাইরাসটির সংখ্যা বাড়তে দেখা যায়নি। এরপর তারা করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়া চীনের উহান শহরের আশপাশে থেকে এডিস, কিউলেক্স ও এনোফিলিস জাতের ১ হাজার ১শ’ ৬৫টি মশা ধরে তাদের শরীরে এই ভাইরাস আছে কি না পরীক্ষা করেন। তাদের একটিতেও এই ভাইরাস পাওয়া যায়নি। ফলে তারা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, মশারা সার্স-কভ-২ ভাইরাস ছড়াতে পারে না।

একইভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাছিও করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে না। বলা যায়, এর ফলেও আমাদের আরেকটি বিপদ কমলো। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাছি ৬৫টি বিভিন্ন রোগ ছড়াতে সাহায্য করে যাদের মধ্যে রয়েছে কলেরা, চোখ ওঠা, ডায়রিয়া, আমাশয়, যক্ষ্মা, টাইফয়েড, স্লিপিং সিকনেস ইত্যাদি। তাই করোনা মহামারির সময়ে মাছি করোনা ছড়ায় না বলে একে অবহেলা করা ঠিক হবে না।

মনে রাখতে হবে যে, করোনাকালে সুস্থ থাকাটা অত্যন্ত জরুরি বিষয়। তাই যেকোনো রোগ থেকে মুক্ত থেকে ইমিউনিটি বজায় রাখাটা খুব প্রয়োজন। এ সময়ে মাছিকে দূরে রাখার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকালে মশা-মাছি জনস্বাস্থ্যের জন্য কোনো হুমকি নয়। তবে মশা-মাছি করোনাভাইরাস ছড়াতে না পারলেও তারা অন্য অসুখগুলো ছড়াতে পারে এবং সেগুলো সবই কমবেশি প্রাণঘাতী। সে কারণে মশা যাতে কামড়াতে না পারে তার জন্য সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের বাড়িঘরের চারপাশে যেন আবর্জনা না জমে, নর্দমায় ময়লা পানি স্থির না থেকে যেন প্রবহমান থাকে, কোনো গর্তে কিংবা পরিত্যক্ত ডাবের খোসা, নারকেলের মালা, ডিব্বা, ফুলের টব, গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার বা অন্য কোনো পাত্রে যেন পানি জমে না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে।

মাছি নিয়ন্ত্রণের জন্য কীটনাশক, বিভিন্ন রকমের ফাঁদ, আঠালো ট্যাপ, বৈদ্যুতিক নেট ইত্যাদি ব্যবহার করে আমরা ঘরবাড়ির মাছি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। তবে মাছি মারার চাইতে মাছি যাতে না জন্মায় তার ব্যবস্থা করাই জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞান মতে মূল কাজ হওয়া উচিত। ঘরবাড়ি ও অঙিনাসহ চারপাশের পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখা এর অন্যতম শর্ত। এর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কম খরচের চারটি কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে।

১. মাছির প্রজননস্থলকে ধ্বংস করা। এজন্য নোংরা আবর্জনাময় স্থানগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে। ২. অন্য এলাকা থেকে মাছি আসা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। এজন্য ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত আবর্জনা সরিয়ে ফেলা প্রয়োজন। ৩. রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ও মাছির সংস্পর্শকে বাধা দেয়া। এজন্য সংক্রামক রোগীদেরকে আলাদা ও পরিচ্ছন্ন জায়গায় রাখা প্রয়োজন। এবং ৪. খাবার, থালা-বাসন, খাবারের সরঞ্জাম ও মানুষের সংস্পর্শে মাছিকে আসতে না দেয়া। এজন্য খাবার ও থালাবাসনকে ঢেকে রাখা, সরঞ্জামাদি ব্যবহারের আগে ধুয়ে নেয়া এবং মানুষের শরীরে যাতে মাছি বসতে না পারে তার ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

আমরা সাবধান হই। কারণ করোনা নিয়েই আমরা এত বেশি ব্যতিব্যস্ত আছি যে, মশাবাহিত অসুখগুলো ছড়াতে শুরু করলে তা আমাদের জন্য বিপদের কারণ হবে।

লেখক: পরিচালক, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার।

সাবেক চেয়ারম্যান, ফার্মেসি বিভাগ; সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবেক আহ্বায়ক, জাতীয় ওষুধনীতি ২০১৬ প্রণয়ন উপকমিটি।

আরও পড়ুন:
মাতৃভাষার চেতনা নিয়ে ভাবনা
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?

শেয়ার করুন

কোভিডপরবর্তী বিশ্বে কূটনীতির পুনর্বিবেচনা : একটি ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি

২০২১ সালে স্বাভাবিকতায় ফিরে আসার অর্থ হবে নিরাপদ ভ্রমণ, উন্নত স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ এবং ডিজিটাল পরিষেবা। এই বিষয়গুলো পাবে নতুন সংজ্ঞা এবং নতুন ভাষা। কোভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্ব আরও বহু-মেরু, বহুত্ববাদী এবং পুনরায় ভারসাম্যপূর্ণ হবে এবং ভারত তার অভিজ্ঞতা দিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সাহায্য করবে।

আমরা ২০২১ সালে প্রবেশ করেছি কোভিড-১৯ মহামারিকে পরাস্ত করার আশায়। যদিও প্রতিটি সমাজ এটিকে অনন্যভাবে মোকাবেলা করেছে, তবু বিশ্ব কূটনীতি সাধারণ উদ্বেগ এবং অভিন্ন শিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ করবে। এর বেশিরভাই বিশ্বায়নের প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

আমাদের প্রজন্ম এটিকে মূলত অর্থনৈতিক দিক থেকে ভাবছে। সাধারণ ভাবনা হলো বাণিজ্য, অর্থ, পরিষেবা, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও গতিশীলতার যে কোনো একটি। এটি আমাদের যুগের আন্তঃনির্ভরতা এবং আন্তর্ব্যাপনকে প্রকাশ করে। তবে এটি আমাদের অস্তিত্বের গভীর অখণ্ডতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রকৃত বিশ্বায়ন মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। কূটনৈতিক আলোচনার মূলে অবশ্যই এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমনটি আমরা ২০২০ সালে দেখেছি, এই জাতীয় চ্যালেঞ্জগুলো উপেক্ষা করার বেশ বড় মাশুল দিতে হয়েছে।

এর অনেক সুবিধা থাকলেও বিশ্বায়নকে কেন্দ্র করে বিশ্ব তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখেছে। এর বেশিরভাগই সমাজের অসম সুবিধা থেকে উদ্ভুত হয়। এ জাতীয় ঘটনাগুলো যারা অবহেলা করেছে, তারাই প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছে। আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, এটি হার-জিতের বিষয় নয়, বরং সর্বত্র টেকসই সমাজ নিশ্চিত করার বিষয়।

কোভিড-১৯ নিরাপত্তা সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিয়েছে। এখন অবধি বিভিন্ন দেশ মূলত সামরিক, গোয়েন্দা, অর্থনৈতিক এবং সম্ভবত সাংস্কৃতিক দিক নিয়ে চিন্তা করছিল। আজ তারা কেবল স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়েই আরও গুরুত্ব দেবে না, এর সঙ্গে বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়েও চিন্তা করবে। কোভিড-১৯ যুগের চাপগুলো আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির ভঙ্গুরতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিকে ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য অতিরিক্ত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। প্রয়োজন আরও স্বচ্ছতা এবং বাজার-কার্যকরিতা।

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই অভিজ্ঞতা থেকে ভালোভাবে বেরিয়ে আসতে পারেনি। তাদের নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক বাদ দিয়ে ১৯৪৫ সালের পর থেকে সবচেয়ে মারাত্মক বৈশ্বিক সঙ্কটে সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া দেখানোর ভাণ করতেও দেখা যায়নি। এটি গুরুতর অন্তর্মুখিতার কারণ। কার্যকর সমাধান তৈরির জন্য বহুপাক্ষিকতার সংস্কার করা জরুরি।

কোভিড-১৯ চ্যালেঞ্জের প্রতি একটি দৃঢ় প্রতিক্রিয়া ২০২১ সালে বৈশ্বিক কূটনীতিতে আধিপত্য করবে। ভারত তাদের নিজস্ব উপায়ে একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। ভারত বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত উপায় বের করেছে মৃত্যুর হার কমাতে এবং সুস্থতার হার সর্বাধিক করার জন্য। এই সংখ্যাগুলোর একটি আন্তর্জাতিক তুলনা করলেই বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। শুধু তাই নয়, ভারত বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ সরবরাহ করে বিশ্বের ফার্মাসি হিসেবে এগিয়ে চলেছে। এদের অনেককে ওষুধ দেয়া হয়েছে অনুদান হিসেবে।

যেহেতু আমাদের দেশে একটি বড় আকারের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আশ্বাস দিয়েছেন যে, এই ভ্যাকসিন বিশ্বের কাছে সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী মূল্যে বিতরণ করতে সহায়তা করবেন, যা ইতোমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে। ভারতে উৎপাদিত ভ্যাকসিনের প্রথম চালান ভুটান, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ, নেপাল, মরিশাস, সেশেলস এবং শ্রীলঙ্কার মতো আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর বাইরে সুদূর ব্রাজিল এবং মরক্কোতেও পৌঁছেছে।

অন্যান্য মূল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলোও আজ একই ধরনের মনোযোগের দাবি রাখে। প্যারিস চুক্তির একটি কেন্দ্রীয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারত দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। ভারতের নবায়নযোগ্য শক্তির লক্ষ্যগুলো বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে, বনাঞ্চল সম্প্রসারিত হয়েছে, জীববৈচিত্র্য প্রসারিত হয়েছে এবং জলের ব্যবহারের উপর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে প্রচলিত সেরা অনুশীলনগুলো এখন আফ্রিকা এবং অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদার দেশগুলোতে প্রয়োগ করা হচ্ছে। উদাহরণ এবং শক্তির মাধ্যমে ভারতীয় কূটনীতি আন্তর্জাতিক সৌর জোট এবং দুর্যোগ প্রতিরোধ অবকাঠামো জোট উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

সন্ত্রাস ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জও ভয়াবহ। দীর্ঘদিন ধরে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসী হামলার শিকার একটি সমাজ হিসেবে, ভারত বিশ্ব সচেতনতা বাড়াতে এবং সমন্বিত পদক্ষেপকে উত্সাহিত করতে সক্রিয় রয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য এবং এফএটিএফ ও জি-২০ এর মতো ফোরামের সদস্য হিসেবে ভারতের কূটনীতিতে এই বিষয়ে প্রধান দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে।

কোভিড-১৯ এর অভিজ্ঞতার মধ্যে অন্যতম রয়েছে ডিজিটাল ডোমেইনের শক্তি। কন্টাক্ট ট্রেসিং বা আর্থিক এবং খাদ্য সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে হোক, ২০১৪ সালের পরে ভারতের ডিজিটাল দৃষ্টিভঙ্গি আশাব্যঞ্জক ফলাফল পেয়েছে। কোভিড-১৯ এর কারণে ‘স্টাডি ফ্রম হোম’ এর চেয়েও ‘ওয়ার্ক ফ্রম এনিহোয়্যার’ অনুশীলন জোরালোভাবে বাড়ানো হয়েছিল। এগুলি বিদেশে ভারতের উন্নয়ন কর্মসূচির উপাদান প্রসারিত করতে এবং অনেক অংশীদারদের পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।

২০২০ সালে ইতিহাসের বৃহত্তম প্রত্যাবাসন অনুশীলনও দেখেছিল বিশ্ব, যাতে ৪ মিলিয়নেরও বেশি ভারতীয় স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিল। এটি সমসাময়িক সময়ে গতিশীলতার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসে। স্মার্ট উৎপাদন এবং জ্ঞান অর্থনীতি পোক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বস্ত প্রতিভার প্রয়োজন অবশ্যই বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বের স্বার্থেই কূটনীতির মাধ্যমে এই চলাচলকে সহজতর করতে হবে।

২০২১ সালে স্বাভাবিকতায় ফিরে আসার অর্থ হবে নিরাপদ ভ্রমণ, উন্নত স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ এবং ডিজিটাল পরিষেবা। এই বিষয়গুলো পাবে নতুন সংজ্ঞা এবং নতুন ভাষা। কোভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্ব আরও বহু-মেরু, বহুত্ববাদী এবং পুনরায় ভারসাম্যপূর্ণ হবে এবং ভারত তার অভিজ্ঞতা দিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সাহায্য করবে।

ড. এস জয়শংকর : ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আরও পড়ুন:
মাতৃভাষার চেতনা নিয়ে ভাবনা
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?

শেয়ার করুন

ad-close 103.jpg