মাতৃভাষার চেতনা নিয়ে ভাবনা

একসময় স্বৈরাচারের পতন হয়, কিন্তু শহীদমিনারের ওপর রাজনৈতিক দখলদারী নতুনভাবে শুরু হয়। এর মধ্যে দীর্ঘ পনেরো বছরের সামরিক শাসনের সময় অনেক নতুন উপাদান ঢুকে যায়। সর্বস্তরে মাতৃভাষা চালু করার যে বার্তা আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে এসেছিল, এর রং ধূসর হয়ে ইংরেজির রংটা উজ্জ্বলতর হতে থাকে।

১৯৫২ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে শীতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও শীতটা মার্চ মাস পর্যন্ত থেকে যেতো। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমার প্রথম দাঁতের ব্যথা শুরু হয়। মায়ের কোলে কাঁদতে কাঁদতে মামা বাড়ির স্কুল-ঘরের সামনে গিয়েছিলাম। আমার কান্না থামাতে থামাতে আমার অষ্টাদশবর্ষীয়া মা স্কুল-ঘরের সামনে এসে পড়েছিলেন। আমার ছোট মামা তখন জোরে জোরে স্লোগান দিচ্ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, নুরুল আমিনের কল্লা চাই।

এরপর ছোটবেলার ২১ পালনের আর কোনো স্মৃতি আমার নেই। বাবা সরকারি চাকরি করতেন ছোট ছোট থানা শহরে। সেগুলোকে শহর বলা যায় না একটু বড় গ্রাম। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময় আবার শহর-গ্রাম জেগে উঠেছিল কিন্তু ২১ পালন তেমন একটা হতো না। শুনেছি ঢাকায় এবং বড় শহরগুলোতে প্রভাতফেরি হতো। বুকে থাকতো কালো ব্যাজ। ষাটের দশকে সামরিক সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় ২১ পালনের পরিধি বাড়তে থাকে। উনসত্তর থেকে একাত্তর সাল পর্যন্ত ২১ পালনের মাত্রাও বাড়তে থাকে। এর আগে পয়লা বৈশাখ উদযাপনও শুরু হয়। পয়লা বৈশাখের মেলা অবশ্য তারও বহু আগের ঘটনা। আমাদের সেই বাল্যকালে গ্রামে গ্রামে বৈশাখের মেলা বসতো, সারাদিন নানা ধরনের মুড়ি-মুড়কি, হালচাষের যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় সামগ্রী বেচাকেনা হতো। কিন্তু অবশ্যম্ভাবীভাবে কেমন করে যেন বিকেল বেলায় কালবৈশাখী হয়ে সব ভেঙে চুরমার করে দিতো। ষাটের দশকে ২১ পালন বাঙালির জীবনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। বাঙালির আত্মপরিচয়ের কালে এই মাত্রা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কালে কালে তা এক পালনীয় বিষয় রূপ গ্রহণ করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২১ পালন এবং তার সঙ্গে সৃজনশীলতার সর্ম্পকও গড়ে ওঠে, বিশেষ করে একুশে বইমেলা যখন থেকে শুরু হয়। প্রথমে লেখকদের কাছে এবং পরে পাঠকদের কাছেও একুশের বইমেলার জন্যে অপেক্ষা একটা বাৎসরিক ঘটনা হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

পরবর্তী সময়ে সম্ভবত আশির দশকের গোড়ার দিকে প্রভাতফেরির স্থান দখল করে পশ্চিমা নিয়ম। ২১ ফেব্রুয়ারির দিন গণনা শুরু হয় ২০ তারিখ রাত বারোটার পর থেকে। শহীদমিনারে কে আগে ফুল দেবে তা নিয়ে একটা তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই প্রতিযোগিতা ধাক্কা-ধাক্কি, ধস্তাধস্তি এবং শেষ পর্যন্ত মারামারিতে গিয়েও শেষ হয়েছে। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার পর থেকে রাত বারোটায় আর শহীদমিনারে যাওয়া হয়নি।

সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে শহীদমিনারেও কর্মকাণ্ড বাড়তে থাকে। নানা ধরনের প্রতিবাদী অনুষ্ঠানের কেন্দ্রভূমি হয়ে দাঁড়ায় শহীদমিনার।

একসময় স্বৈরাচারের পতন হয়, কিন্তু শহীদমিনারের ওপর রাজনৈতিক দখলদারী নতুনভাবে শুরু হয়। এর মধ্যে দীর্ঘ পনেরো বছরের সামরিক শাসনের সময় অনেক নতুন উপাদান ঢুকে যায়। সর্বস্তরে মাতৃভাষা চালু করার যে বার্তা আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে এসেছিল, এর রং ধূসর হয়ে ইংরেজির রংটা উজ্জ্বলতর হতে থাকে। ইংরেজি স্কুলের সংখ্যা বাড়তে থাকে আর ধনাঢ্য, রাজনৈতিক নেতা, আমলার সন্তানরা শিক্ষার জন্যে বিদেশে পাড়ি জমাতে থাকে। কোটি কোটি টাকা লগ্নি হতে থাকে ইংরেজি শিক্ষা এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে। ও লেভেল, এ লেভেল পরীক্ষার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। গ্রামের স্কুল বা কলেজগুলোতে ভালো শিক্ষক পাওয়া দুরূহ হয়ে ওঠে। ইংরেজি ও বাংলা দু’টি ভাষারই ভালো শিক্ষক পাওয়া দুষ্কর হওয়ার কারণে শিক্ষার মান ক্রমানবতির দিকে ধাবিত হয়। যাদের প্রবল ইংরেজিপ্রীতি তাদের কোনো ধরনের দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ থাকে না। সাধারণভাবেই তারা বিদেশে পাড়ি জমায়। সঙ্গে করে নিয়ে যায় দেশে দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ। এই সময়ে মনে হয় বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে আরও একটি ভাষা আন্দোলন প্রয়োজন।

ইতোমধ্যে পৃথিবীর দরিদ্র এবং ছোট রাষ্ট্রগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্যে সদাপ্রস্তুত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছে। পৃথিবীর দেশে দেশে স্বাধীনতার সংগ্রামে যে রাষ্ট্রটি সর্বদা এই দায়িত্বটি পালন করতো প্রথমে নিজেদের মধ্যে ভাঙন এবং পরে তাদের সমমনা রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

গ্লোবাল ভিলেজের নামে একচেটিয়া পুঁজির দৌড়াত্ম্য যেকোনো জাতির সংস্কৃতিকে আঘাত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সহযোগী ইউরোপীয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে সারা পৃথিবীকে প্রভাবিত করে ফেলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর সেই রাষ্ট্রগুলোও পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এর ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দুটোতেই আর জনগণের অধিকার থাকে না, পণ্য হয়ে পড়ে। শিক্ষা নামের এই পণ্যটি কেনার ক্ষমতা তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের নেই। তাই দুর্বল বিদ্যালয়গুলো থেকে দুর্বল ছাত্ররাই বেরিয়ে আসে। এই অবস্থায় ভাষা শিক্ষাটাই প্রথমে আক্রান্ত হয়। নিজের ভাবনাকে কথায় এবং লেখায় প্রকাশ করার যে দক্ষতা প্রয়োজন তার জন্যে বিদ্যালয় থেকে ছাত্ররা যে প্রস্তুতি গ্রহণ করে তা নিতান্তই দুর্বল। এই বিষয়টি একটি মানুষের সারা জীবনকে একটা টানাপোড়েনের মধ্যে ফেলে দেয়। এর মধ্যে শিক্ষার উপর নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয়। এই নিরীক্ষার একটা বড় অংশ সৃজনশীল নামের একটি শিক্ষাপদ্ধতি । এই পদ্ধতিতে যেকোনো বিষয়ে আত্মস্থ করার বিনিময়ে শুধু মুখস্থ বিদ্যা হলে কাজ চলে যায়। এই এমসিকিউ পরীক্ষা পদ্ধতিতে দেশের সর্বোচ্চ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চাকরির পরীক্ষাও পরিচালিত হয়ে থাকে। দেশের প্রশাসনিক কাজে যারা নিয়োজিত তাদের নিয়োগের জন্যে এই পরীক্ষা পদ্ধতি একেবারেই সমীচীন নয়। দেখা যায় মূল বিষয় না বুঝে শুধু রাত-দিন মুখস্থ করে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। একেবারেই সাধারণ মানের কোনো শিক্ষার্থী এখানে উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সত্যিকারের মেধাবী ছাত্রটি প্রাথমিক পরীক্ষায়ই বাদ পড়ে যায়। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী দেশের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে নূন্যতম দেশপ্রেমও থাকছে না। ভাষা হিসেবে বাংলার যে উন্নতমান এবং সাহিত্য হিসেবে পৃথিবীর অনেক ভাষার চাইতেও এগিয়ে। সেই উপলব্ধিও তাদের মাঝে জন্ম নিচ্ছে না।

বাংলা ভাষায় আজকের দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গবেষণা এবং সেই গবেষণা গুদামজাত না করে মানুষের কাজে লাগানোর চেষ্টা করা দরকার। ইতোমধ্যে যে গবেষণাগুলো সত্যিকার অর্থে শিক্ষক-ছাত্রদের কাজে লাগবে সেগুলোকে নিয়ে চর্চা করার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় যেসব ডক্টরেট দিয়ে থাকে সেগুলোও ডক্টরেটদের কাছেই সঞ্চিত থাকে। ভাষার প্রশ্নে বিভিন্ন সৃজনশীল মাধ্যমে, স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদপত্রে সর্বত্র বছরব্যাপী আলোচনা, বিতর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বর্তমানে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রকাশ ভঙ্গিতে ভাষার ব্যপক পরিবর্তন আসা উচিত। যেকোনো দেশের শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে ভাষারও একটা বিপ্লব সাধিত হয়। আমাদের দেশেও সে সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভবনাকে মানবিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

দুঃখজনক এই যে, আমরা ২০ ফেব্রুয়ারির রাতে ভাষার জন্যে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ি এবং ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুর পর্যন্ত তা স্থায়ী হয়। আরও দুঃখজনক তা শহীদমিনারকে কেন্দ্র করেই, শহীদমিনারের ফুল শুকিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের ভাষাপ্রেম যেন শেষ হয়ে যায়। এই ফুল সারা বছর জীবন্ত রাখার ব্যবস্থা করা জরুরি।

শুধু বাংলা ভাষা নয় আমাদের দেশের আদিবাসীদের আরও চল্লিশটি ভাষা আছে। পরিচর্যার অভাবে সেগুলোও শুকিয়ে যাবার পথে। তাঁদেরকেও বাঁচিয়ে রাখা আমাদের জরুরি কর্তব্য।

লেখক : নাট্যজন, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

আরও পড়ুন:
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?
মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক

শেয়ার করুন

মন্তব্য

যে কথা যায় না ভোলা

১৯৭২ সালের অনুরূপ ঘটনা পুনরায় জাতি দেখতে পেল ২০২০ সালে। জাতির পিতা ১৯৭২ সালের সেদিনের সেই বিধ্বস্ত, স্বামী পরিত্যক্তা খালেদা জিয়াকে স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন নিজের কন্যার মর্যাদা দিয়ে। জাতির পিতা হয়তো ভাবতে পারেননি খালেদা জিয়া স্বেচ্ছায় ১৯৭১-এর নয় মাস পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে ছিলেন। তিনি তার বিরাট হৃদয় দিয়ে, মহানুভবতা দিয়ে খালেদার সংসার রক্ষা করেছেন। বিপরীতে খালেদা জাতির পিতা নিহতের পর কী কর্মকাণ্ড করেছেন দেশবাসীকে আর নতুন করে বলতে হবে না। যাহোক, খালেদা জিয়ার ভাইবোন আত্মীয়-স্বজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর মানবতার মাতা দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকারের বিশেষ ক্ষমতায় এই দাগী সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে জামিন দিতে সরকারের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করলেন। অবশেষে গত ২৫ মার্চ ২০২০ সাজাপ্রাপ্ত এই আসামি জামিনে মুক্তি পেলেন।

স্বাধীনতার পর জামায়াতসহ সকল স্বাধীনতাবিরোধী দলই নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু জাতির পিতাকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যার পর ইতিহাসের চাকা পালটে দেয়া হয়। কায়েমি স্বার্থবাদী দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারী ও স্বাধীনতার শত্রুরা স্বাধীনতার তিন বছরের মাথায় জাতির পিতাকে হত্যা করেছে অত্যন্ত নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালোরাতে ফজরের আজানের আগে ঘাতকেরা তাকে হত্যা করে। প্রকৃতি সেদিন আঝোর ধারায় কেঁদেছিল। আমরা স্তম্ভিত, বিহ্বল ছিলাম। মানবতার এহেন অবমাননা ইতিহাসে ইতঃপূর্বে আর ঘটেনি। এই হত্যাকাণ্ড কারবালাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

সেই থেকেই এদেশে রাজনীতি কলুষিতকরণ শুরু। এই ঘটনার মূলনায়ক ইতিহাসের দুই মীরজাফর খন্দকার মোশতাক ও জিয়াউর রহমান। তিন মাসের মধ্যেই আসল নায়ক জিয়াউর রহমান মোশতাককে নিক্ষিপ্ত করেন অন্ধকারে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমকে অস্ত্রের মুখে পদত্যাগ করিয়ে সেনাপ্রধান হিসেবে খলনায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি কায়দায় ক্ষমতা গ্রহণ করেন। জাতির পিতাকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান সকল স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্ষমা করে দেন। রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। স্বাধীনাতাবিরোধী সকল শক্তি সগৌরবে ফিরে আসে। পাকিস্তানি দালাল শাহ্ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। রাজাকার মৌলানা মান্নান, আলীম, রাজাকার চখা মিয়াসহ বহু দালাল রাজাকার পুনর্বাসিত হয় এবং অনেককে মন্ত্রী করা হয়। এভাবেই স্বাধীনতার তিন বছরের মাথায় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলো পুনর্বাসিত হয়। কুখ্যাত দালাল পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির সভাপতি গোলম আযমসহ অনেক দালাল পলাতক অবস্থা থেকে ফিরে আসে। তাদের নাগরিকত্ব দেয়া হয়। সকল যুদ্ধাপরাধী, দালাল, রাজাকার মুক্ত হয়। দুই মীরজাফর মোশতাক ও জিয়া আগস্ট ১৯৭৫ থেকে মে, ১৯৮১ পর্যন্ত দেশ শাসন ও শোষণ করে।

১৯৮১ সালের ৩১ মে জিয়াউর রহমান নিহত হন। বিচারপতি সাত্তার অতঃপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বছর খানেকের মধ্যেই বিচারপতি সাত্তার নিজদলের নানাবিধ দুর্নীতি ও অপকর্মের অভিযোগে সেনাপ্রধান হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেন। এরশাদ নয় বছর দেশ শাসন ও শোষণ করেন। সামরিক শাসকেরা যুগে যুগে দেশে দেশে এভাবেই এসেছেন আবার গেছেন। পাকিস্তান এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

সামরিক শাসক এরশাদ দেশ শাসালে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ ও উপজেলা পদ্ধতি গ্রহণ উল্লেখযোগ্য। উপজেলা পদ্ধতি এখন স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। তিনিও ছলেবলেকলা-কৌশলে দালাল, রাজাকার, ডান, বাম রাজনীতিবিদদের দিয়ে রাজনীতি কলুষিত করেছেন। জিয়া ও এরশাদ দুজনেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার মূল্যবোধকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছেন। জিয়া বলেছিলেন, “I will make politics difficult for the politicians. Money is no problem.” মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান, চিন্তাচেতনা তিনি ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এভাবেই দুই সামরিক শাসক স্বাধীনতার শিশু বয়সেই মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছেন। ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এভাবেই অনেক রক্ত ও ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত মহান স্বাধীনতার মূল্যবোধ ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে। যুগে যুগে দেশে দেশে সামরিক শাসকেরা এভাবেই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে। এরশাদের শাসনামলের শেষ দিকে নব্বইয়ের তুমুল গণ-আন্দোলনে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।

পরবর্তী সময়ে জাতীয় নির্বাচনে জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া বিএনপি নেত্রী অবিশ্বাস্যভাবে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। স্বশিক্ষিত খালেদার বিজয় ছিল এক বিস্ময়। তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত দেশ শাসন করেছেন। তার দোসর হলেন একাত্তরের পরাজিত জামায়াত-শিবির, মুসলিমলীগসহ সকল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। তিন জোটের রূপরেখাকে অমান্য করে মেয়াদ শেষে ১৯৯৬ এর ফেব্রুয়ারিতে তিনি একটি একক নির্বাচন করে দুই মাসও টিকতে পারেননি। পদত্যাগে বাধ্য হয়ে স্বশিক্ষিত খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হন।

জুন ১৯৯৬ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।

১৯৭৫ থেকে জুন ১৯৯৬ পর্যন্ত দেশ চলেছে সম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ধারায়। জিয়া-এরশাদ-খালেদা একই ধারায় দেশ শাসন করেছে। ২৩ জুন ১৯৯৬ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশরত্ন শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেন। শুরু হলো নতুন এক জয়যাত্রা। জনগণ স্বাধীনতার সুফল পেতে শুরু করল। উন্নয়নের ধারা সূচিত হলো। কৃষি, শিক্ষা, যোগযোগ, খাদ্য, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তিত ও নানাবিধ উন্নয়নে বৈপ্লবিক উন্নয়ন সাধিত থেকে লাগল। বিএনপি জামায়াত আমলে যেখানে লোডশেডিংয়ে মানুষ ছিল বিপর্যস্ত, আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে জনগণকে স্বস্তি দিতে সমর্থ হলেন। বিএনপি আমলে বিদ্যুতের দাবির জন্য কানসাটে ১৮ জন মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কৃষকের সারের দাবির জন্যও প্রাণ দিতে হয়।

২০০১ সালে মেয়াদান্তে নতুন নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল প্রায় ৫০০০ মেগাওয়াট। আমি তখন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম-সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলাম। আর সচিব ছিলেন ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী; আজকের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা।

২০০১-এর নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের নীল নকশায় আওয়ামী লীগ তথা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে হারিয়ে দিয়ে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। শুরু হলো এক বিভীষিকাময় দুঃশাসন। এহেন দুষ্ট, নষ্ট ও দুর্নীতিবাজ সরকার পৃথিবীতে আর কখনও ছিল কি না, আছে কি না জানা নেই। দুর্নীতি, হত্যা সন্ত্রাস, ধর্ষণ ও সম্পদ পাচার ছিল তাদের আদর্শ। ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে ১০০ দিনের ক্রাসপ্রোগ্রম হাতে নিয়ে যে অত্যাচার, অবিচার, অন্যায়, জুলুম, হত্যা, সন্ত্রাস ও ধর্ষণ তারা এদেশের জনগণের ওপর চালিয়েছে এর নজির পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই। এদের অত্যাচারে শত পূর্ণিমা, মহিমা, ফাহিমার ক্রন্দনে আজও এদেশের আকাশ বাতাস কাঁদে। এই রাজাকার সরকারের শত্রু ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। এই জালেম সরকার শত শত মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের অকারণে চাকুরিচ্যুত করেছে। প্রশাসনকে স্থবির করেছে। বিএনপি-জামায়াতসমৃদ্ধ রাজাকার আলবদরের সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করতে চেয়েছে। খালেদা জিয়ার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য ‘হাওয়া ভবন’ ও ‘খোয়াব ভবন’ দুইটি দুর্নীতির কারখানা সৃষ্টি করে। এহেন অপকর্ম নেই যা তাদের দ্বারা সংগঠিত হয়নি। পরবর্তী সময়ে তাদের লুণ্ঠিত সম্পদের সামান্য অংশ সিঙ্গাপুর আদালতের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। তার সন্তানদের সাজাও হয়। তার ছোট ছেলে দুর্নীতির এই বরপুত্র মৃত্যুবরণ করে বেঁচে গেছে। অবশ্য লুণ্ঠিত সম্পদ দিয়ে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা মালয়েশিয়া, লন্ডনে সুখে কালাতিপাত করছে। জীবিত থাকলে হয়তো আরও অনেক অজানা তথ্য পাওয়া যেত। মহা দুর্নীতিবাজ তারেকের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফবিআইএসে সাক্ষ্যও দিয়ে যায়। তারেক দুর্নীতি ও নানাবিধ অপকর্মের মূর্ত প্রতীক। নানা অপরাধে এই অপরাধী আজ আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত এক পলাতক আসামি। এই আসামি ১/১১-এর সরকারের সময় মুচলেকা দিয়ে ক্ষমা চেয়ে লন্ডন পালিয়েছিল। লুণ্ঠিত সম্পদ নিয়ে সে আজ স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মহাসুখে লন্ডন কালাতিপাত করছে। সে এখন নাকি ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত। কানাডার উচ্চ আদালতের রায়ে বিএনপি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। তারেক এক বিপজ্জনক ও ভয়ংকর ব্যক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই তালিকাভুক্ত করেছে। তাই তার যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকাও নিষিদ্ধ। এ মর্মে যুক্তরাজ্যকে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। খালেদা জিয়া মধ্যপ্রাচ্য ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কত সম্পদ পাচার করেছে এর হিসেব কে দেবে? ২০০১-২০০৬ সালে ক্ষমতাকালে সৌদি আরব ভ্রমণকালে শত সুটকেস ভর্তি সম্পদ, অর্থ পাচার এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এই ছবি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। খালেদা জিয়া তার ভাই সাঈদ ইস্কান্দার ও নিকট আত্মীয়-স্বজন দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এসব তথ্যাদি এসেছে (সমকাল ২৪.১০.২০০৯)।

বিদেশে জিয়া পরিবারের সম্পদ নিয়ে তদন্ত চলছে। গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কের প্রতিবেদনে বিএনপি চেয়ারপার্সন থেকে আরম্ভ করে তার পরিবারের সদস্যদের অফুরন্ত সম্পদের বিবরণী আছে (১৪.০৯.২০১৭, প্রথম আলো)। এই প্রতিবেদনে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ অনেক নেতানেত্রীর অবৈধ সম্পদের বিবরণীও আছে। খালেদা জিয়া ও তার দলের অনেক নেতাকর্মী অবৈধ উপার্জনের অর্থের জন্য জরিমানা দিয়ে কর পরিশোধ করেছেন। তাইতো ২০০১-২০০৬ কালে বিএনপি সরকার বিশ্বে পাঁচ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বিগত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের লন্ডনে বসে শতশত কোটি টাকার মনোনয়ন বাণিজ্য এদেশে কারো অজানা নেই। তাইতো তখন স্লোগান উঠেছিল ‘টাকা গেল লন্ডনে, হামলা কেন পল্টনে আর গুলশানে’? এভাবেই সামরিক শাসক জিয়া তার স্ত্রী খালেদা জিয়া ও ছেলে তারেক জিয়া দেশকে দুর্নীতিতে বার বার চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছে। দলের চেয়ারপার্সন তার ছেলে ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-নেত্রী একেকজন আন্তর্জাতিক কুখ্যাতিসম্পন্ন দুর্নীতিবাজ। পাকিস্তানের সেই সেনা কর্মকর্তারা জেনারেল জানজুয়া ইত্যাদি যারা ১৯৭১ সালে ক্যান্টনমেন্টে খালেদা জিয়াকে তাদের আতিথেয়তায় সুখে রেখেছেন, তারা বেঁচে থাকলে আজ জোরে হাততালি দিতেন। তাইতো এককালের বিএনপি নেতা কর্নেল অলি এই বলে বোমা ফাঠালেন; মা ভালো হলে ছেলে খারাপ হবে কেন, দুটোই বদমাশ। যুক্তরাষ্ট্রের এক সভায় তিনি এহেন বক্তব্য রাখেন (২০.০৬.২০০৬, সংবাদ)।

২০০৬ সালে খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে কর্নেল অলির বক্তব্য দেশবাসী আজ যথার্থই উপলব্ধি করছে।

১৯৯১ সালে ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এতিমদের অনুদানের জন্য ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২শ’ ১৬ টাকা গ্রহণ করেন। প্রাপ্ত টাকা এতিমদের জন্য খরচ না করে তারেক, কোকো ও মমিনুরের সমন্বয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করেন, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই। এই দুর্নীতির জন্য বিগত ১/১১-এর সরকারের সময় ৩.৭.২০০৮ তারিখে এজাহার দায়ের করা হয়। আসামি খালেদা জিয়া বার বার উচ্চ আদালতে বিভিন্ন অজুহাতে আপিল করে মামলার কার্যক্রম ব্যাহত ও সময়ক্ষেপণ করেন। বিচারক বদলের আবেদনও মঞ্জুর করা হয় কয়েকবার। দীর্ঘ দশ বছরের বেশি মামলা চলার পর মহামান্য আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে উপযুক্ত শাস্তিই দিয়েছেন। প্রায় দুই বছরের বেশি তিনি জেলজীবন ভোগ করছেন। তার জামিনের জন্য বার বার উচ্চ আদালতে ধর্না দিয়েও আদালত জামিন দিতে পারেননি। ন্যায়বিচারের কোনো ধারায়ই উচ্চ আদালত তাকে জামিন দিতে পারেননি। অবশ্য তিনি জেলজীবনের বেশির ভাগ সময়েই বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। জেলে তাকে যত প্রকার সুবিধা দেয়া হয়েছে, পৃথিবীতে আর কোনো সাজাপ্রাপ্ত আসামি এত বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন বলে কোনো নজির নেই। প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন ভাগ্যবতী মহিলা।

১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন নয় মাস ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি বাহিনীর অতিথি হিসেবে আয়েশে জীবন কাটিয়েছেন। জিয়াউর রহমান বার বার চেষ্টা করেও তাকে কাছে নিতে পারেননি। যাদেরকে নেয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল তাদেরকে অপমান করে বলেছেন, ‘ওই গাদ্দার জিয়ার কাছে আমি যাব না।’ দুগ্ধ ফেননিভ শয্যায় তিনি নয় মাস আরাম আয়েশেই ছিলেন। আরাম ও সুখ ছাড়তে রাজি হননি। পাকিস্তানি মানুষরূপী পশুদের সঙ্গে তিনি স্বেচ্ছায় নয় মাস কাটিয়েছেন। তার জীবনের ভয় ছিল না।

স্বাধীনতার পর যখন তিনি ঘরে উঠতে চাইলেন, জিয়া তাকে ঘরে উঠতে দেননি। গালি দিয়ে বের করেছেন। খালেদা জিয়া সেদিন ৩২ নম্বরের বাসায় জাতির পিতার শরণাপন্ন হন। সেদিন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহায়তায় এই মহিলা নতুন জীবন ফিরে পান। জাতির পিতা খালেদাকে নিজকন্যার মর্যাদা দিয়ে জিয়ার হাতে তুলে দেন। জাতির পিতার ধমকে জেনারেল জিয়াউর রহমান তাকে গ্রহণ করতে বাধ্য হন। সেই থেকে এই খালেদা জিয়া নতুন করে বাঁচতে পারলেন। বঙ্গবন্ধুর যদি ১৯৭১ সালে ফাঁসি হয়ে যেত, বাংলাদেশে না আসতে পারতেন তাহলে খালেদা জিয়া আজ কোথায় থাকতেন? পাকিস্তান না কোথায়, জানি না। জাতির পিতার মহানুভবতায় তিনি সেদিন নতুন করে বাঁচতে পেরেছিলেন।

খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ভুলে গেলেন পিতৃঋণ। পরবর্তীকালে তিনি ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে জাতির পিতার হত্যা দিবসকে নিজের ভুয়া জন্মদিন হিসেবে পালন করেন। কোনো অকৃতজ্ঞ, অসভ্য বর্বরের পক্ষেও এহেন কর্মকাণ্ড সম্ভব হবে কি না জানি না। নিজের সারা জীবনের অশুভ কর্মকাণ্ডের জন্য, দুনীতির জন্য, এতিমের টাকা আত্মসাতের জন্য উচ্চ আদালত তাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। ইসলাম ধর্মের বিধানে একজন মুসলমানের এতিমের অর্থ আত্মসাৎ মহাপাপ। শেখ হাসিনার সরকার এহেন একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে জেলে প্রাপ্যতার বাইরে সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন। উচ্চ আদালত তার কৃত অপরাধ, দুর্নীতির জন্য জামিন দিতে পারেননি। তার আইনজীবীরা শত চেষ্টা করেও আইনের কোনো ধারায়ই এই দুর্নীতিবাজকে মুক্ত করতে পারেননি। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলে, এটাই অমোঘ নিয়তি। অবশেষে তার নিকট আত্মীয়-স্বজন, ভাইবোন সরকারের শরণাপন্ন হলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন।

১৯৭২ সালের অনুরূপ ঘটনা পুনরায় জাতি দেখতে পেল ২০২০ সালে। জাতির পিতা ১৯৭২ সালের সেদিনের সেই বিধ্বস্ত, স্বামী পরিত্যক্তা খালেদা জিয়াকে স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন নিজের কন্যার মর্যাদা দিয়ে। জাতির পিতা হয়তো ভাবতে পারেননি খালেদা জিয়া স্বেচ্ছায় ১৯৭১-এর নয় মাস পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে ছিলেন। তিনি তার বিরাট হৃদয় দিয়ে, মহানুভবতা দিয়ে খালেদার সংসার রক্ষা করেছেন। বিপরীতে খালেদা জাতির পিতা নিহতের পর কী কর্মকাণ্ড করেছেন দেশবাসীকে আর নতুন করে বলতে হবে না।

যাহোক, খালেদা জিয়ার ভাইবোন আত্মীয়-স্বজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর মানবতার মাতা দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকারের বিশেষ ক্ষমতায় এই দাগী সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে জামিন দিতে সরকারের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করলেন। অবশেষে গত ২৫ মার্চ ২০২০ সাজাপ্রাপ্ত এই আসামি জামিনে মুক্তি পেলেন। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বাইরে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের বিশেষ ক্ষমতায় নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়াকে জামিনে মুক্তি দিলেন। এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা। অথচ এই খালেদা জিয়া তার বিপজ্জনক ছেলে তারেক জিয়া বিএনপি জামায়াত সরকার তাকে হত্যার জন্য বিশবার প্রচেষ্টা চালায়। বার বার তিনি অলৌকিভাবে বেঁচে যান। সর্বশেষ ২১ আগস্ট ২০০৪-এর ঘটনা নতুন করে বলার আর কিছু নেই। সেদিন তাদের বিশেষ করে হাওয়া ভবনের পরিকল্পনায় ছিল আর একটি ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। বিধাতার অশেষ রহমতে হয়তো শেখ হাসিনা সেদিন বাঁচতে পেরেছিলেন। পবিত্র সংসদে দাঁড়িয়ে সেদিন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, “উনাকে আবার কে মারত যাবে। ভ্যানিটি ব্যাগে করে তিনিই গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন।” আজ যখন সব সত্য প্রকাশিত হয়েছে, এখন তিনি কী বলবেন? সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে এই হত্যায় জড়িতের জন্য খালেদার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরসহ আরও ১৯ জনের ফাঁসি হয়েছে। তার সন্তান তারেক জিয়াসহ আরও ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। সেদিনের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হন এবং শত শত নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন। অনেকের শরীরে এখনও স্প্লিন্টার রয়েছে, তারা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। শরীরের স্প্লিন্টারের যন্ত্রণায় প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, সাবেক সফল মেয়র মোহাম্মদ হানিফসহ কয়েকজন মৃত্যুবরণ করেছেন। খালেদা জিয়া এই অপরাধ কি অস্বীকার করতে পারবেন?

১৯৭২ সালে খালেদা জিয়া নতুন জীবন পেয়েছিলেন জাতির পিতার মহানুভবতায়; আবার ২০২০ সালে দুর্নীতির জন্য সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়েও জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার মহানুভবতায়ই সরকারের বিশেষ ক্ষমায় জামিন পেলেন। আদালত তাকে কোনো বিবেচনায়ই জামিন দিতে পারেননি। বিধাতার কী অপরূপ খেলা!

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সচিব

আরও পড়ুন:
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?
মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক

শেয়ার করুন

মাতৃভাষার চেতনা নিয়ে বিক্ষিপ্ত ভাবনা

বঙ্গবন্ধু ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে মর্যাদা দিয়েছেন অকুণ্ঠচিত্তে। তিনি বলেছেন, পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের দাবি জোরেশোরে উত্থাপন করে ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেন।

ভাষা আন্দোলন, ভাষাশহিদ, ভাষাসংগ্রামীদের তত্ত্বতালাশ যতটুকুই করা হোক না কেন, বিধাতা যেন সারা বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ফেব্রুয়ারির ২৮-২৯ দিনকেই নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। অন্তত আমাদের আচরণে তেমন ধারণাই জন্মে।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি-জুড়ে আমরা ঢাকা-পাবনা তথা দেশজুড়ে বইমেলার আয়োজন করি। কোথাও মাসজুড়ে আবার কোথাওবা দশ, সাত বা তিন দিনের জন্যে। বিদেশে পর‌্যন্ত এমন আয়োজনের কমতি নেই।

কিন্তু কমতি অবশ্যই আছে ভাষাশহিদ ও ভাষাসৈনিকদের তত্ত্বতালাশ নেওয়ার, ভাষা আন্দোলনের অবিকৃত ইতিহাস আলোচনার-পর্যালোচনার, ভাষাসংগ্রামীদের অবদানের ঐতিহাসিক কাহিনিগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেয়ার এবং তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে ভাষাসংগ্রামীদের সম্মানিত করার ক্ষেত্রে। এ রোগ ও পীড়া থেকে কত দিনে মুক্তি পাওয়া যাবে, তা বুঝে ওঠা কঠিন।

যে ঘাটতিগুলোর কথা বললাম, সে ঘাটতি যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, সেহেতু তা আমাদের অনেকটা যেন গা-সওয়া হয়ে গেছে। তাই এগুলো নিয়ে আমাদের কারও তেমন একটা মাথাব্যথা নেই। রাষ্ট্রের তো নেই-ই। তবে রাষ্ট্রের কর্ণধাররা তাদের বক্তব্য-ভাষণে ভাষাসংগ্রামী ও শহিদদের শ্রদ্ধা নিবেদন, ভাষার উন্নয়ন এবং জনগণের ইতিহাস নিয়ে তাদের মতো করে আলোচনা করে থাকেন। সেই আলোচনায় ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব, এর তাৎপর্য, তার লক্ষ্য ও আদর্শ- তেমন একটা স্থান পায় না। ইতিহাসের বাস্তবতাও খুব একটা উঠে আসে না।

ভাষা আন্দোলন কেবলই মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা, ভাষা আন্দোলন না হলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সম্ভব হতো না- এমনতরো কথাবার্তা অবশ্য ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে সবাই বলে থাকি। কিন্তু তেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের যারা নির্মাতা, যারা সংগঠক, যারা অংশগ্রহণকারী তাদের খোঁজখবর রাখার উদ্যোগ তেমন একটা চোখেই পড়ে না।

মাত্র দিন কয়েক আগে একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেখছিলাম ভাষাশহিদ সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী। এরা তো শহিদ হয়েছিলেন বায়ান্ন সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে বা রাত্রে। কিন্তু এদের পরিবারদের আর্থিক সাহায্য দিলেন বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় এসে ১৯৭৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর। সেই আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ ছিল, ওই তথ্যমতে, পরিবারপ্রতি ২০০০ টাকা করে। আজ হয়তো ওই ২ হাজারের দাম ২০ হাজার টাকার সমতুল্য। কিন্তু আর কি দেয়া হয়েছে পরবর্তীকালে, এই ৪৭ বছরে? হয়ে থাকলে খুব ভালো, নতুবা নিন্দা করার ভাষা নেই।

শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

ইতিহাস বলে, শহিদ ধীরেন দত্তই প্রথম পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্য হিসেবে ১৯৪৮ সালের ফেরুয়ারিতে করাচি অধিবেশনে যোগ দিয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন। অধিবেশনটি বসেছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮। কিন্তু ধীরেন দত্ত ওই প্রস্তাব উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে সংসদে হইচই শুরু হয়। সরকারি প্রস্তাব ছিল পাকিস্তানির রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। কিন্তু তার পাশাপাশি, পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ বাঙালি এবং তাদের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও, বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি জানাতে শুধু অস্বীকৃতিই জানানো হয়নি, প্রস্তাবক ধীরেন দত্তকে ‘ভারতের দালাল’, ‘পাকিস্তানের দুশমন’ প্রভৃতি আখ্যায় আখ্যায়িত করলেন পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ মুসলিম লীগের অপরাপর বাঙালি-অবাঙালি নেতারা।

ওই অধিবেশনেই ২৯ মার্চে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়ে আনীত বিল পাস করা হয়। প্রতিবাদ করেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একক কণ্ঠে।

অতঃপর দ্রুত তিনি ফিরে আসেন পূর্ববাংলায়। ঢাকা বিমানবন্দরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্ররা তাকে মাল্যভূষিত করেন, সশ্রদ্ধ সংবর্ধনা জানান। ভাষা আন্দোলন অতঃপর জনতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া শুরু করে ছাত্রসমাজ। যার শুরু ১৯৪৮-এ। অবশ্যই এই বিশাল তাৎপর্যময় আন্দোলনের সূচনা করেন ধীরেন দত্ত। ফলে তাকেই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রথম দাবিদার ও অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব কিন্তু এ ক্ষেত্রে যদি দলবাজি-নেতাবাজি-ব্যক্তিবাদ প্রভৃতি এনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়, তবে নিশ্চিভাবেই এই বীরের অবমূল্যায়ন করা হবে।

বঙ্গবন্ধু ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে মর্যাদা দিয়েছেন অকুণ্ঠচিত্তে। তিনি বলেছেন, পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের দাবি জোরেশোরে উত্থাপন করে ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেন।

সেই ধীরেন দত্ত কুমিল্লার সন্তান এবং কংগ্রেস নেতা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও দেশত্যাগ তো দূরের কথা, নিজের বাড়ি ছেড়েও যাননি। বলতেন, ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গদপি গরীয়সী’ -অর্থাৎ জননী ও জন্মভূমি স্বর্গাপেক্ষা গৌরবের। তাই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তাঁকে জীবন দিতে হলো- তিনি শহিদ হলেন দেশ মাতৃকাকে ভালোবেসে।

দুঃসংবাদ : ধীরেন দত্তের বাড়ি

সেই ধীরেন দত্তের কুমিল্লার গ্রামের বাড়িটি দেখাশোনার আজ আর কেউ নেই। বাড়িটি কার্যত জরাজীর্ণ। এর ছবিটি দিন কয়েক আগে ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে সরকার ‘ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র’ হিসেবে ওই বাড়িটিকে গড়ে তুলে ধীরেন দত্তের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখাতে ও তাকে স্মরণীয় করে রাখতে পারে।

হারিয়ে যাওয়া নেতারা

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে ধীরে ধীরে সবার অলক্ষ্যেই অনেক নেতা হারিয়ে যাচ্ছেন। স্মৃতি হাতড়ে যাদের নাম পাচ্ছি তারা হলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, অলি আহাদ, গাজীউল হক, আবদুল মতিন, ইমাদুল্লাহ, হাসান হাফিজুর রহমান, মোহাম্মদ সুলতান, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, কেজি মোস্তফা প্রমুখ হারিয়ে গিয়েছেন।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর তেপ্পান্ন সালে প্রধানত আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীরা সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, প্রবন্ধ, ছোট গল্প ও একগুচ্ছ কবিতা নিয়ে ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ নামে একটি সংকলন প্রকাশ করেন ওই সময়ে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের বিপরীতে অবস্থিত ‘পুঁথিপত্র’ প্রকাশনা কেন্দ্র থেকে। প্রকাশের পর পরই মুসলিম লীগ সরকার বইটিকে বে-আইনি ঘোষণা করেন। অতঃপর ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন সরকার বেআইনি ঘোষণার আদেশটি প্রত্যাহার করে। অতঃপর জনপ্রিয় ওই বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সামরিক আইন জারি হলে বইটি আবারও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় এবং তারপর থেকে বইটি বাজারেও পাওয়া যায় না। ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনটির ঐতিহাসিক মূল্য থাকায় বাংলা একাডেমির উচিত নতুন একটি সংস্করণ প্রকাশ করা।

স্মৃতিরক্ষায় অবহেলা

ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে বাঙালি জাতি অত্যন্ত গর্বিত দলমতধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে। বায়ান্নর পরে দীর্ঘ ৬৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও গ্রাম থেকে শহর-বন্দর-নগর পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহর থেকে অন্তত বেলা ১১টা পর্যন্ত শহীদ মিনারগুলোতে মানুষের ঢল নামে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এ এক কল্পনাতীত ব্যাপার, সন্দেহ নেই।

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিরক্ষায় একমাত্র বাংলা একাডেমি ব্যতিরেকে তার গবেষণা কেন্দ্র, ইতিহাস সংরক্ষণ কেন্দ্র, ভাষাসংগ্রামীদের বাড়িঘর সংরক্ষণ, তাদের পরিবার-পরিজনদের (অনেক ভাষাসংগ্রামী যেহেতু আজ লোকান্তরে) খোঁজখবর রাখা, ভাষাসংগ্রামীদের ছবি জেলায় জেলায় সংরক্ষণ, তাদের তালিকা উপজেলাপর‌্যায়ে প্রণয়ন ও যত দ্রুত সম্ভব তাদের নামের তালিকা সরকারিভাবে গেজেট আকারে প্রকাশ ও মর্যাদাপূর্ণ ভাতাদি প্রদান রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের চলাফেরার জন্য কোটি টাকার গাড়ি বরাদ্দ হচ্ছে, কিন্তু ভাষাসংগ্রামীরা যারা বাঙালি জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির নব উন্মেষ ঘটালেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করলেন, দেশ ও জাতিকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করলেন, তাদের প্রতি অবহেলা কষ্টের কারণ। এর অবসান হওয়া জরুরি।

ভাষাসৈনিকদের প্রতি সম্মান জানাতে তাদের নামে স্টেডিয়াম, রাস্তা, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা করা যেতে পারে।

ভাষা আন্দোলন ও ভাষাসৈনিকদের শ্রদ্ধা জানানোর ক্ষেত্রে অবহেলার তালিকা আর দীর্ঘ না করি। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সুসংবাদ তুলে ধরছি:

সুসংবাদ

ভাষাসৈনিক ‘আবদুল মতিনের গ্রামে শহীদ মিনার: খুশি এলাকাবাসী’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয়। প্রতীক্ষার ৬৮ বছর পর ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের নিজ গ্রাম গুধিবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নবনির্মিত শহীদ মিনারে ব্যাপক আয়োজনে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস। সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদের অর্থায়নে দিবসটি পালন করা হয়। এর ফলে আশা মিটেছে আবদুল মতিনের জন্মভূমির সর্বস্তরের মানুষের।

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে কালো ব্যাজধারণ করে জামিরতা ডিগ্রি কলেজ, জামিরতা জহুরা খাতুন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, জামিরতা উচ্চ বিদ্যালয়, সোনাতুনি ও স্তপিয়াখালি উচ্চ বিদ্যালয়সহ মোট তিনটি ইউনিয়নের শিক্ষার্থীরা প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে গুধিবাড়ি সরকারি প্রাথমিকবিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। এরপর বিকেলে আলোচনা সভা ও লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন আবদুল মতিনের ছোট ভাই গোলাম কিবরিয়া হান্নান। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সর্বদলীয় (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মতিনের জন্মভূমি চৌহালিতেও নবনির্মিত শহীদ মিনারেও দিসটি পালন করা হয় যথাযোগ্য মর্যাদায়। চৌহালি উপজেলার দুর্গম মৌলজানা গ্রামটি (আবদুল মতিনের মূল জন্মস্থান) নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার কারণে তার বাবা বসতি গড়ে তোলেন নদীর পশ্চিম পাড় গুধিগড়ি গ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে এই দুই গ্রামে স্থায়ী কোনো শহীদ মিনার ছিল না। ফলে অস্থায়ীভাবে কলাগাছ দিয়ে শহীদ মিনার তৈরি করে ওই এলাকার মানুষ শহিদ দিবস পালন করছিলেন।

ওই এলাকার মানুষ এই অভাবটি মোচনের জন্য দীর্ঘকাল ধরে দাবি জানাচ্ছিলেন স্থায়ীভাবে শহীদ মিনার নির্মাণের। এ দাবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফের উদ্যোগে জেলা পরিষদের অর্থায়নে সম্প্রতি দুই গ্রামে দুইটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে দেন।

ভাষাসৈনিক প্রয়াত আবদুল মতিনের জন্মভূমি সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী-শাহনাজপুর জনপদে রয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দেশে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতির দীর্ঘকাল পরও অনেক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ীভাবে নির্মিত কোনো শহীদ মিনার না থাকায় শিক্ষার্থীরা ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহিদদের প্রতি উপযুক্ত শ্রদ্ধা জানাতে পারতেন না। তাদের বাঁশ ও কলাগাছ দিয়ে শহীদ মিনার বানাতে হতো। বিশেষ করে আজীবন সংগ্রামী, ভাষাসৈনিক ও কৃষক নেতা আবদুল মতিনের জন্মভূমি চৌহালির ধুবুলিয়া-শৈলজানা চরে কোনো শহীদ মিনার নির্মিত না হওয়ায় এলাকাবাসী ব্যথিত ছিল।

পরিশেষে, ব্যাপক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালে প্রশিকার চেয়ারম্যান কাজী ফারুকের সহযোগিতায় শৈলজানা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় চত্বরে জাতীয় নকশার শহীদ মিনার ও লাইব্রেরি উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেন ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন। এরপর থেকে চরাঞ্চলের মানুষ এই শহীদ মিনারে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতিবছর মাতৃভাষা দিবস পালন করে আসছিলেন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০১৫ সালের ১ জুন ভাষাসৈনিকের গ্রামের সেই শহীদ মিনারটি যমুনাগর্ভে বিলীন হয় এর পর থেকে আবারও বাঁশ-কলাগাছ দিয়ে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ মিনারেই প্রতিবছর শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছিল।

অতঃপর সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নতুন শহীদ মিনার নির্মাণ করে দিলে জনদাবি আবারও পূরণ হয়। ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের সহধর্মিণী গুলবদন নেছা মনিকা ও ছোট ভাই গোলাম কিবরিয়া হান্নান বলেন, এই শহীদ মিনার দুটি অনেক প্রতীক্ষার ফল।

এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রী ও সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মণ্ডল বলেন, ‘ভাষাসৈনিক মতিন ভাইকে নিয়ে আমরা কতই না গর্ব করি। তার জন্মভূমি ও গ্রামে শহীদ মিনার নেই জেনে আমিও ব্যথিত ছিলাম- তাই গ্রাম দুটিতে দুটি শহীদ মিনার নির্মাণ করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি।’

খবরটি নিশ্চয় একটি সুসংবাদ। সারা দেশে জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা শিক্ষা নিলে সারা দেশে ভাষাসৈনিকদের স্মরণে অনেক বড় কিছু হতে পারে।

লেখক : কলাম লেখক ও সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত

আরও পড়ুন:
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?
মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক

শেয়ার করুন

শেখ হাসিনার সাফল্যে নতুন মাত্রা : সবার জন্য টিকা

সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে বাংলাদেশে অনেক নেতিবাচক অপপ্রচার করা হয়েছিল। এমনটিও বলা হয়েছিল যে ভিভিআইপিরা এই টিকা গ্রহণ না করে সাধারণদের ওপর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনুসন্ধান চালাবে। কিন্তু সেই অপপ্রচারকে ভুল প্রমাণিত করে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যসহ অসংখ্য বিশিষ্ট নাগরিক স্বেচ্ছায় এই টিকা গ্রহণ করছেন। সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব পার করে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে টিকা গ্রহণ করছেন।

সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দীর্ঘ এক বছর ধরে লড়াই করছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। ইউরোপ-আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশগুলো পর্যন্ত জীবন ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখার লড়াইয়ে দিশাহারা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, কানাডাসহ গোটা ইউরোপ ঠেকাতে পারছে না মৃত্যুর মিছিল। বিশ্বের উন্নত কিছু দেশে ডিসেম্বরে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও অনেক দেশ এখনো টিকার সরবরাহ পায়নি। বিশ্বের বড় বড় দেশ যখন এখনো করোনার টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং যেসব দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে সেখানেও এখন পর্যন্ত সম্মুখসারির যোদ্ধারা টিকা পাননি। জনসাধারণ এমনকি সিনিয়র সিটিজেনরাও এখন অপেক্ষমাণ টিকা পাবার আশায়।

সারা বিশ্ব যখন টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য হিমশিম খাচ্ছে, তখন করোনা প্রতিরোধের লড়াইয়ে সফলতার দিক থেকে প্রথম থেকেই সম্মুখ সারিতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১-এ দেশব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে করোনাভাইরাসের গণটিকা কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশের ইতিহাসে রচিত হলো নতুন মাইলফলক। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন বাংলাদেশে বিশ্বের ৫৪তম দেশ হিসেবে প্রয়োগ করছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ভ্যাকসিন গ্রহণকৃতদের তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি এবং টিকাজনিত মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়নি এবং সকলে ভালো আছেন।

সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে বাংলাদেশে অনেক নেতিবাচক অপপ্রচার করা হয়েছিল। এমনটিও বলা হয়েছিল যে ভিভিআইপিরা এই টিকা গ্রহণ না করে সাধারণের ওপর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনুসন্ধান চালাবে। কিন্তু সেই অপপ্রচারকে ভুল প্রমাণিত করে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যসহ অসংখ্য বিশিষ্ট নাগরিক স্বেচ্ছায় এই টিকা গ্রহণ করছেন। সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব পার করে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে টিকা গ্রহণ করছেন।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে সবাই এই টিকার অপেক্ষায় ছিলেন। সব ধরনের বাধা, ভয়ভীতি, শঙ্কা ও পাহাড়সমান গুজব পেছনে ফেলে করোনাভাইরাস প্রতিরোধী লড়াইয়ে ৫৪তম দেশ হিসেবে টিকার যাত্রায় নাম লিখাল বাংলাদেশ।

টিকার মূল্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে অপপ্রচার- এসব পরিস্থিতি সামলে নির্ধারিত সময়ে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা ছিল সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এসব পেরিয়ে টিকা প্রদান করার সক্ষমতা অর্জন নিঃসন্দেহে বিরাট অর্জন।

বিনা মূল্যে আজ সবাই এই টিকা পাচ্ছেন এবং ইতিমধ্যে বেসরকারি হাসপাতালে বাণিজ্যিকভাবে টিকা বিক্রির প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ভ্যাকসিনেশনের জন্য অসামান্য সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে গ্লোবাল অ্যালায়েন্সখ্যাত আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমুনাইজেশন (গ্যাভি) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কারে ভূষিত করেছেন ২০১৯ সালে।

প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় অত্যন্ত চমৎকার ব্যবস্থাপনায় টিকা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য গর্বিত। উন্নত দেশের নাগরিকরা এমনকি সম্মুখযোদ্ধারাও টিকা পাচ্ছেন না অথচ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সরকার সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় বিনা মূল্যে পৌঁছে দিল করোনার টিকা।

ভ্যাকসিন বিতরণের প্রশ্নে সারা পৃথিবীর মানুষের মনে যখন একটাই প্রশ্ন- আমার টিকা হবে তো? আমি কখন টিকা পাব? সেই সময়ে বাংলাদেশ বিনা মূল্যে গণটিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরল বিশ্বের দরবারে। বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের জন্য টিকা নিশ্চিতকরণের প্রক্রিয়া শুরুর মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।

লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং আইসিএলডিসির সহকারী পরিচালক

আরও পড়ুন:
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?
মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক

শেয়ার করুন

অসহায় মানুষের সৈয়দ আবুল মকসুদ

শুধু মানুষের জন্য বা মানুষের পক্ষে প্রতিবাদ করেছেন, এমনটি নয়। ব্যক্তিজীবনে নিজেও প্রতিবাদ করেছেন। ২০০৪ সালে লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার পর পত্রিকায় তার শক্ত একটি লেখা ছাপা হয়, এ জন্য তাকে সতর্ক করা হয়েছিল। এর প্রতিবাদে তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) চাকরি ছেড়ে দেন, সেখানে তিনি উপপ্রধান বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।

‘আচ্ছা বলেন তো, নিজের খেয়ে আর কত বনের মহিষ তাড়াব।’ গত এক দশকে এই কথাটি অনেকবার শুনেছি মকসুদ ভাইয়ের মুখে। মনে ​হতো মানুষের জন্য কাজ করতে করতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

এর কারণ যেখানেই প্রতিবাদের প্রয়োজন পড়ত, সেখানে সেলাইবিহীন সাদা কাপড় পরা এই পরিচিত মুখের ডাক আসত।

আমাদের এই সমাজে মানবাধিকার লঙ্ঘন, শোষণ, বঞ্চনা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনাই বেশি ঘটে। এসব নিয়ে কাজ করার মানুষ বা সংগঠন কমে এসেছে। মানবাধিকার সংগঠন আছে নামকাওয়াস্তে। সংবাদপত্রে সব মানুষের কথা বলার সুযোগ কম। বেসরকারি সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। সুশীল সমাজের কণ্ঠ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে। এরই মধ্যে যে কয়েকটি কণ্ঠ সোচ্চার ছিল, সেগুলোর অন্যতম ছিলেন ​সৈয়দ আবুল মকসুদ।

জোর গলায় তাকে কথা বলতে শুনিনি। কাছাকাছি বসেও অনেক সময় ওনার কথা শুনতে কষ্ট হতো। কিন্তু তার ক্ষীণকণ্ঠ প্রতিবাদ–প্রতিরোধ হয়ে ছ​ড়িয়ে পড়ত সমাজ ও সরকারের মধ্যে। সাংবাদিকতা পেশায় থাকার কা​রণে বুঝতে পারি, অসংখ্য সাধারণ মানুষ তার প্রতিবাদী অবস্থানের কারণে সুফল পেয়েছেন।

মকসুদ ভাই হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ ও অসহায় মানুষের ঠিকানা। সমাজে নির্যাতিত ও বঞ্চিত কেউ তার কাছে পৌঁছাতে পারলেই সমস্যা সমাধান হবে—এমন স্বপ্ন দেখার ভরসা বা সাহস পেত। তার কণ্ঠে অসহায় মানুষেরা নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরার সুযোগ পেত গণমাধ্যমে বা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে।

অসংখ্য গুণের অধিকারী মকসুদ ভাইকে ভালো লাগা ও পছন্দ করার এটিই ছিল বড় কারণ। জাতীয় বিষয় বাদই দিলাম, আঞ্চলিক ও ব্যক্তিগত অগণিত বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। কখনও দাঁড়িয়েছেন সংখ্যালঘুদের পাশে, কখনও ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর সদস্যদের পক্ষে। নির্যাতিত নারী, ক্ষুদ্র পেশাজীবী, চাকরিচ্যুত কর্মচারী, বেতনবঞ্চিত শিক্ষক, পাটকল বা গার্মেন্টস শ্রমিক— কার পক্ষে তিনি লড়াই করেননি?

জাতীয় রাজনীতিতে ন্যূনতম ঐক্য চাইতেন সব সময়। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও সুশাসন প্রশ্নে বিবেকের সঙ্গে আপস করেননি। সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করেছেন। নিরাপদ সড়ক, পরিবেশ আন্দোলন, নদী বাঁচানো, রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন না করা, পাটকল রক্ষা, গাছ কাটা বন্ধ করা, বাকস্বাধীনতা রক্ষা, সংখ্যালঘুর অধিকার, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ নানা ইস্যুতে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। তার মূল ঠিকানা ছিল জাতীয় প্রেস ক্লাব ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। এই দুটি জায়গায় খুঁজলেই তাকে পাওয়া যেত। যেখানেই অনশন কর্মসূচি সেখানেই ছুটে গেছেন তিনি। একাত্মতা প্রকাশ করেছেন, পানি বা শরবত খাইয়ে অনশন ভঙ্গ করিয়েছেন।

সাদামনের মানুষ মকসুদ ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কটা গড়ে ওঠে সাংবাদিকতা পেশার সূত্রে, তবে সম্পর্কটা ছিল অম্লমধুর। প্রায় এক দশক ধরে সংবাদপত্রে প্রধান প্রতিবেদক বা বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার সময় নানান বিষয়ে তার সঙ্গে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। ওনার কাছ থেকে শেখার ছিল অনেক কিছুই। সর্বশেষ বিতর্ক হয় পাটকল বন্ধ করা ও পাটকলশ্রমিকদের কর্মসূচি নিয়ে। কেন এই খবর সংবাদপত্রগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে না, শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না— এ নিয়ে তার ক্ষোভের অন্ত ছিল না।

মকসুদ ভাই ছিলেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবরের সোর্স। তার কাছ থেকে নানা ঘটনার প্রাথমিক তথ্য পেয়েছি। আবার এমন অনেক বিষয় যেগুলো খবর হিসেবে গুরুত্ব পেত না, অথবা প্রতিবেদন তৈরি করা হলেও স্থানের অভাবে ছাপা যেত না, সেগুলো নিয়ে ওনার অতৃপ্তি ছিল। অনেক খবর ছাপার অনুরোধ তিনি করতেন অন্যের স্বার্থে বা প্রয়োজনে। সকালবেলা তার ফোন দেখলেই মনে হতো, পত্রিকায় কী যেন ভুল করে ফেলেছি।

এই মানুষটির প্রতি অগাধ শ্রদ্ধার আরেকটি কারণ ছিল, তাকে কেনা যায়নি। কেউ কেউ চেষ্টা করে​ও তাকে কিনতে পারেনি। তার আক্ষেপ ছিল অন্যদের বিত্তবান হওয়া, অকারণে বিদেশ ভ্রমণ এবং নীতিগর্হিত নানান কাজকর্ম নিয়ে। কিন্তু এগুলো তাকে আকৃষ্ট করেনি।

বেশ কয়েকবার তিনি আমাকে বলেছেন, প্রতিদিন একাধিক অনুষ্ঠানে যান, কারণ তিনি সাধারণত ‘না’ বলতে পারেন না। কিন্তু গাড়ির তেলের টাকাটাই তার দুশ্চিন্তার কারণ। তার মানে এই নয় যে, কেউ টাকা দিতে চাইলেও তিনি নেবেন। তাকে যে টাকা দিয়ে কেনা যায় না, এই সত্যটা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন সাদামনের মানুষটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন বটে, কিন্তু নিজের আর্থিক অবস্থা নিয়ে খুব একটা ভেবেছেন বলে মনে হয় না।

তার অমায়িক ব্যবহার, সহজসরল জীবনযাপন, নীতি ও আদর্শের সঙ্গে আপস না করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো— এসব গুণাবলি তাকে অন্য অনেকের চেয়ে আলাদা করেছে।

মকসুদ ভাই শুধু মানুষের জন্য বা মানুষের পক্ষে প্রতিবাদ করেছেন, এমনটি নয়। ব্যক্তি​জীবনে নিজেও প্রতিবাদ করেছেন। ২০০৪ সালে লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার পর পত্রিকায় তার শক্ত একটি লেখা ছাপা হয়, এ জন্য তাকে সতর্ক করা হয়েছিল। এর প্রতিবাদে তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) চাকরি ছেড়ে​ দেন, সেখানে তিনি উপপ্রধান বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।

২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর আবুল মকসুদ পশ্চিমা পোশাক ত্যাগ করেন। গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতি অনুরক্ত হয়ে তিনি প্রতিবাদের পোশাক হিসেবে সেলাইবিহীন সুতির সাদা কাপড় বেছে নেন।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মকসুদ ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে যাই স্কয়ার হাসপাতালে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সাদা কাপড়ে মুড়ে রাখা হয়ে​ছিল ওনার মরদেহ। সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এই সাদা কাপড়টুকুই সাদামনের মানুষটির শেষ সম্বল। কিন্তু তিনি যেসব কাজ করে গেছেন, তা মানুষ মনে রাখবে, স্মরণ করবে।

সৈয়দ আবুল মকসুদের লেখালেখির পরিমাণ তিনি নিজেও হয়তো জানতেন না। ধর্ম, ইতিহাস ও রাজনীতি সম্পর্কে তার ধারণা ছিল স্পষ্ট। তার সঙ্গে কথা বললে বেরিয়ে আসত নতুন ও অজানা অনেক তথ্য। অনেক সময় ইতিহাসের কোনও বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি হলে বা ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে ধারণা পেতে ওনার সহায়তা নিতাম।

লেখালেখি করাটাই ছিল তার পেশা। জীবনী, কলাম, কবিতা, প্রবন্ধ, দর্শন, ধর্মতত্ত্বসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, গোবিন্দচন্দ্র দাসসহ অনেকের ওপর তিনি গবেষণা করেছেন। কিন্তু তাকে আমরা কতটা সম্মান দিতে পেরে​ছি, সেই প্রশ্নটিও উঁকি দেয় মনে।

সৈয়দ আবুল মকসুদ জীবদ্দশায় একুশে পদক পেলেন না। এখন তো প্রতিবছর একুশে পদক দেওয়া হয় একুশজনকে। এই লম্বা তালিকার মধ্যেও সৈয়দ আবুল মকসুদের নামটি স্থান পায়নি। তিনি নিশ্চয়ই কারও কাছে যাননি, তদবির করেননি। তাকে সরকারবিরোধী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন কেউ কেউ। কিন্তু বিএনপি সরকারকে ফ্যাসিবাদ বলায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাসসের চাকরি ছেড়েছিলেন তিনি। তবে হ্যাঁ, এটা সত্য তিনি কোনও রাজনীতির অন্ধসমর্থক ছিলেন না। তার লেখায় এমন প্রমাণ মেলে না।

আজকাল একুশে পদকপ্রাপ্ত কারও কারও অবদানের কথা খুঁজে খুঁজে বের করতে হয়। কারও কারও যেটুকু অবদান তার চেয়ে অতিরঞ্জিত করা হয় পুরস্কার দেওয়ার বিবেচনা জায়েজ করার জন্য। অথচ সৈয়দ আবুল মকসুদের মতো মানুষ একুশে পদক পাননি। এটি সত্যিই লজ্জার বিষয়, দুঃখের বিষয়।

শরিফুজ্জামান পিন্টু, সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?
মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক

শেয়ার করুন

তিনিও অদম্য

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল সেটা মিথ্যা প্রমাণ করেছে কানাডার আদালত। এ রায়ের পেছনে বাংলাদেশের কোনো হাত ছিল না। যদি কানাডার আদালত এমন দ্ব্যর্থহীন রায় না দিত, তাহলে একটি মহল বলেই যেত- বাংলাদেশকে ঋণ দিও না, সে দেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করো না। কারণ সবকিছু লুটপাট হয়ে যাবে। কেউ কেউ শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগের দাবি করত। ঋণচুক্তি বাতিলের সময় (২৯ জুন, ২০১২) বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সরকারবিরোধী আন্দোলন ছিল তুঙ্গে। হরতাল-অবরোধ সফল করায় তাদের হাতিয়ার ছিল পেট্রোল বোমা। ধর্মান্ধ চরমপন্থি গোষ্ঠীও ছিল মরিয়া। তারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে থাকে। পুলিশের ওপর হামলা চালায়। গৃহযুদ্ধের হুমকি দেয়।

বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা মহাকালের ব্যবধান ঘুচিয়ে দিলেন প্রমত্ত পদ্মার বুকে সেতু নির্মাণের মাধ্যমে। গণভবনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বিশ্বব্যাংকের অন্যায় আচরণ প্রসঙ্গে আমাদের বলেছিলেন- এ ধরনের বাধা কিংবা চক্রান্তকে ভয় পাই না। আমার কাজ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন, সমগ্র দেশের উন্নয়ন। সেতুতে ইস্পাতের কাঠামোর কারণে ব্যয় কিছুটা বাড়বে, কিন্তু দেখতে সুন্দর হবে। আমরা মনের দিক থেকে যে কতটা শৈল্পিক সেটিরও তো প্রমাণ রাখা চাই।

১৯৯৮ সালের ৪ জুন যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর শেষ অংশটি ঢালাইয়ের সময় অকুস্থলে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। প্রকৌশলীদের সঙ্গে কাজ করছিলেন রাজমিস্ত্রিরা। ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুতে ইস্পাতের ৪১ নম্বর স্প্যানটি বসানোর দৃশ্য দেখেছি টেলিভিশনে। শিহরিত হওয়ার মতো ঘটনা যে!

বরিশালসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর অনেকেই বলেন- চলাচলের ক্ষেত্রে আমরা প্রকৃতির হাতে জিম্মি। শীতে কুয়াশা, বর্ষায় নদ-নদীতে উত্তাল ঢেউ ও স্রোত, গ্রীষ্মে ঝড়। স্থল-জল-আকাশপথে গন্তব্যে পৌঁছানো দুঃসহ। একাধিকবার বর্ষায় স্টিমারে ঢাকা থেকে বরিশাল যাওয়া ও আসার সময় পদ্মা-মেঘনার সংযোগস্থলে ডেকের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ঢেউ চলে যেতে দেখেছি। কী ভয়ংকর মুহূর্ত ছিল তখন। প্রমত্ত পদ্মা নদী বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বরিশাল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর যে ‘দূরত্ব’ তৈরি করেছে, সেটা ঘুচিয়ে দিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। এ কাজে একটি বড় বাধা ছিল প্রকৃতির তরফে। সে বাধা জয় করায় প্রযুক্তিগত সম্পদ ও অর্থের প্রয়োজন ছিল। সে বাধার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বব্যাংক। তারা ২০১২ সালের ২৯ জুন জানায়- ‘নিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে যে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র ঘটেছে।’ এ অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগের তীর কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের প্রতিও তাক করা ছিল। শেখ হাসিনা ছিলেন আপসহীন- বিশ্বব্যাংক কিংবা অন্য কারো অন্যায় দাবির কাছে নতিস্বীকার করার প্রশ্ন আসে না। এ অটল মনোভাবের জয় হয়েছে। বাংলাদেশ নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।

নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে স্বীকার করে নেন- পদ্মা সেতু প্রকল্পে কল্পিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রতিশ্রুত ঋণ প্রত্যাহার করা ভুল পদক্ষেপ ছিল। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে তিক্ততা তৈরি হয়েছিল সেটা আর থাকবে না- এই ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক বাড়তি সহায়তা দেবে।’ বাস্তবে সেটাই ঘটেছিল।

পদ্মা সেতু চেতনার জয় এভাবেই হয়!

এ প্রসঙ্গে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান স্মরণ করতে পারি। স্বাধীনতার চার বছর পূর্ণ না হতেই তিনি ডাক দেন দ্বিতীয় বিপ্লবের- মূল লক্ষ্য ঔপনিবেশিক আমলের জঞ্জাল দুর্নীতি-অনিয়ম নির্মূল এবং স্বনির্ভরতা অর্জন। স্বনির্ভরতা যে কল্পিত নয়, আমাদের ভেতরেই এর রসদ রয়েছে, সেটা বলেন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের পর ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু সাধারণ পরিষদে ভাষণ প্রদানের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। নিউইয়র্কে বিশ্বসভায় বাংলায় বক্তব্য রাখার পর যান ওয়াশিংটন, সে সময়ের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে আলোচনার জন্য। এ সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং বিশ্বব্যাংকের দুই সিনিয়র অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশকে তাচ্ছিল্য করে ‘বাস্কেট কেস’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তাদের বিবেচনায় ‘বাংলাদেশ যদি উন্নতি করতে পারে, তাহলে বিশ্বের যে কোনো দেশ উন্নতি করতে পারবে।’ এর সহজ ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে- এই ছেলে যদি এসএসসি পাস করে তাহলে কলাগাছও পাস করবে।

বঙ্গবন্ধু হেনরি কিসিঞ্জার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের বাংলাদেশ সম্পর্কে তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্যের মোক্ষম জবাব প্রদানের জন্য ওয়াশিংটনকেই বেছে নেন।

ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থে লিখেছেন-

“ওয়াশিংটনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, কেউ কেউ বাংলাদেশকে International Basket Case বলে উপহাস করেন। কিন্তু বাংলাদেশ Basket Case নয়। দুইশ’ বছর ধরে বাংলাদেশকে লুট করা হয়েছে। বাংলাদেশের সম্পদেই শ্রীবৃদ্ধি করা হয়েছে লন্ডন, ডান্ডি, ম্যাঞ্চেস্টার, করাচি, ইসলামাবাদের।... আজো বাংলাদেশে অফুরন্ত সম্পদ রয়েছে। একদিন আমরা দেখাবো বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।”

শেখ হাসিনা আমাদের যে পদ্মা সেতু চেতনা উপহার দিয়েছেন, সেটা জাতির পিতার এ অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা। আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি।

আমরা নিশ্চয়ই এতে তৃপ্ত থাকব না। এ অর্জন অনেক অনেক বড়, সন্দেহ নেই। সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে যেভাবে বড় বড় বাধা আমরা জয় করেছি, সেটা আমাদের প্রেরণা জোগাবে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন- বাংলাদেশের নেতৃত্ব, প্রশাসন এবং অন্য অনেক প্রতিষ্ঠান ‘অদক্ষ’। তাদের জন্য সর্বক্ষণ বাইরের ‘কনসালট্যান্ট’ প্রয়োজন। এ কনসালট্যান্টদের উচ্চহারে বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় ঋণের বোঝা। সত্তরের দশকের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে একটি ঋণ দিয়েছিল ‘কৃষি ঋণের সুদ ৩৬ শতাংশ করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের’ জন্য। ঋণের প্রায় সব অর্থ ব্যয় হয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ‘কনসালট্যান্টদের’ সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য, যাদের কাজ ছিল কৃষকদের চড়া সুদে ঋণ প্রদানের ফর্মুলা বের করা।

আশুগঞ্জের একটি সার কারখানায় ‘দাতাদের ঋণ’ নিয়ে কাজের সময়েও দেখেছি- ‘কনসালট্যান্টরা’ যা চায়, তাই পায়। বিলাসী জীবন না হলে যে আমাদের উন্নতির সূত্র বের করতে পারেন না! একবার বিদেশি অর্থে পরিচালিত এক ‘এনজিও বস’ আমাকে বলেছিলেন- ‘দারিদ্র্য দূর করার চিন্তায় তিনি সব সময় অস্থির থাকেন। যখন কাজের চাপ বেশি পড়ে, তখন সুস্থ মস্তিষ্কে কাজ করার জন্য চলে যান রাজেন্দ্রপুরের ব্র্যাক সেন্টারে, যেখানে গ্রামীণ পরিবেশে মেলে ফাইভ স্টার হোটেলের সুবিধা।’

শেখ হাসিনা উন্নত বিশ্ব ও তাদের নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে চ্যালেঞ্জ করার সৎ সাহস দেখিয়েছেন, যা উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত অনেক দেশের নেতারা পারেননি। পদ্মা সেতু তাদেরও পথ দেখাবে।

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল সেটা মিথ্যা প্রমাণ করেছে কানাডার আদালত। এ রায়ের পেছনে বাংলাদেশের কোনো হাত ছিল না। যদি কানাডার আদালত এমন দ্ব্যর্থহীন রায় না দিত, তাহলে একটি মহল বলেই যেত- বাংলাদেশকে ঋণ দিও না, সে দেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করো না। কারণ সবকিছু লুটপাট হয়ে যাবে। কেউ কেউ শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগের দাবি করত। ঋণচুক্তি বাতিলের সময় (২৯ জুন, ২০১২) বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সরকারবিরোধী আন্দোলন ছিল তুঙ্গে। হরতাল-অবরোধ সফল করায় তাদের হাতিয়ার ছিল পেট্রোল বোমা। ধর্মান্ধ চরমপন্থি গোষ্ঠীও ছিল মরিয়া। তারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে থাকে। পুলিশের ওপর হামলা চালায়। গৃহযুদ্ধের হুমকি দেয়। এমন সময়েই বিশ্বব্যাংকের ঢাকাস্থ আবাসিক প্রতিনিধি এলেন গোল্ডস্টেইন এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন- ‘ভবিষ্যতে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণ পেতে হলে শেখ হাসিনাকে অনেক অঙ্গীকার করতে হবে। ঋণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে এবং তা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে কি না সে বিষয়েও প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিলের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার পেছনে বাংলাদেশের মানুষের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে।’

এটা ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বসেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিশ্ব্যাংকের এক কর্মকর্তার নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ। অভ্যন্ত্যরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের আরও ঘটনা আমরা পাই দৈনিক সমকালের ৩১ অক্টোবর, ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে-

“বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা ভারত সফরে গিয়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও আগামী নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় অসন্তুষ্ট বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন- বিদেশি কূটনীতিকদের বেশিরভাগই কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চললেও কেউ কেউ তা লঙ্ঘন করছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে ড্যান মজীনার সফরের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে আমাদের সঙ্গে কথা বলাই শিষ্টাচার। আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন নিয়ে বাইরে গিয়ে কথা বলাটা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন।”

নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যে স্বাধীনচেতা মনোভাব বঙ্গবন্ধুকন্যা দেখিয়েছেন সে জন্যই কি তাকে উচিত শিক্ষা দিতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের হুকুমে চলা বিশ্বব্যাংক?

পদ্মা সেতু এখন বাস্তব। তবে উন্নত বিশ্বের সারিতে উঠে বসতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে এখনও লক্ষ্য পূরণে অনেক দুস্তর পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে বড় ভরসা শেখ হাসিনার পদ্মা সেতু চেতনা। আমাদের জয় হবেই, যেমন হয়েছে একাত্তরে।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলাম লেখক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?
মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক

শেয়ার করুন

নাইট রাইডার্সের সাকিব ও আমার ভালোবাসাশূন্য কথা

সাকিব বাংলাদেশের হয়ে না খেলে আইপিএল খেলতে ছুটি নিলেও মুস্তাফিজের মতো জুনিয়র খেলোয়াড়ও জানিয়েছেন, দলে সুযোগ পেলে তিনি বাংলাদেশের হয়ে খেলবেন, আইপিএল নয়। সাকিব কি মুস্তাফিজের কাছে কিছু শিখবেন? অর্থটাকেই যারা সবকিছু ভাবছেন, তারা বলুন তো টাকাটা মুস্তাফিজের বেশি দরকার না সাকিবের?

আবেগ আমাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য। যেকোনো প্রবল আবেগে আমরা ভেসে যাই। এই আবেগ আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও। আমি নিজেও একজন হৃদয়চালিত প্রবল আবেগপ্রবণ মানুষ। আমরা দেশ, ধর্ম, রাজনীতি, খেলা ও খেলোয়াড় নিয়ে প্রবল আবেগে ভাসি। সমস্যা হলো, আবেগের মেঘ আমাদের বিবেককে ঢেকে দেয়, যুক্তিকে পরাজিত করে, বিবেচনাকে অন্ধ করে দেয়। যাকে পছন্দ করি, তার কোনো ভুল আমাদের চোখে পড়ে না। যাকে অপছন্দ করি, তার কোনো গুণ খুঁজে পাই না। কিন্তু বাস্তবতা হলো কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান-দল, শতভাগ ভালো বা শতভাগ মন্দ হতেই পারে না। সবারই দোষ-গুণ, ভালো-মন্দ আছে। ফুটবল বিশ্বকাপের সময় আমরা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায় বিভক্ত হয়ে যাই। ব্রাজিল সমর্থকদের চোখে মেসি কোনো খেলোয়াড়ই না, আবার আর্জেন্টিনার সমর্থকদের চোখে নেইমার নিছক একজন অভিনেতা। অথচ দুজনই গ্রেট ফুটবলার। আবেগে অন্ধ হয়ে যাওয়ার এমন হাজারটা উদাহরণ আছে। আবেগের প্রসঙ্গটি এসেছে সাকিব আল হাসানকে নিয়ে চলমান বিতর্ক ঘিরে।

বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি সাকিব আল হাসান। একটা স্লোগান খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল- ‘বাংলাদেশের জান, সাকিব আল হাসান’। স্লোগানটি জনপ্রিয় হয়েছিল, কারণ বিষয়টা সত্যি। সাকিব সত্যি সত্যিই আমাদের জান। সাকিব বাংলাদেশের মানমর্যাদা অনেক উঁচুতে তুলে নিয়েছেন। অনেকেই সাকিবকে দিয়ে বাংলাদেশকে চেনে। একজন ব্যক্তি অনেক সময় তার প্রতিভায় সবকিছু ছাড়িয়ে যেতে পারেন। সাকিব তেমনই একজন সর্বপ্লাবি প্রতিভা। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যত ক্রিকেটার খেলেছেন, তাদের মধ্যে সবার সেরা সাকিব। আসলে সবার সেরা বললে, একটু কম বলা হবে। সাকিব সবাইকে ছাড়িয়ে এক নাম্বার। তার ধারেকাছেও কেউ নেই। আর এটা জানেন বলেই গড়পড়তা বাংলাদেশ দলের সঙ্গে টিম ফটোসেশনেও তার অনীহা। যত প্রতিভাবান আর যত বড় পারফরমারই হোন না কেন, সাকিবও একজন মানুষ এবং তিনিও ভুল করতে পারেন। সমস্যাটা এখানেই, সাকিবের ক্রিকেটটাই শুধু সঠিক আর বাকি সব ভুলে ভরা। তিনি একের পর এক ভুল করেন এবং সেটা যে ভুল সেটা মনেই করেন না। তার চেয়ে বড় কথা হলো, সাকিব অনুরাগীদের চোখেও তার ভুলগুলোকে ফুল মনে হয়। ক্যামেরার সামনে তিনি অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করেন। পরে যুক্তি দেন, ক্যামেরা যে ছিল এটা তিনি জানতেন না। কিন্তু একজন সভ্য মানুষ তো ক্যামেরা দিয়ে তার আচরণ ঠিক করবে না। এমনকি বদ্ধঘরেও কেউ এমন অঙ্গভঙ্গি করে না।

সাকিব যখন একজন দর্শককে পেটায়, তখন তার অন্ধ অনুরাগীরা পালটা যুক্তি দেন, আপনার স্ত্রীকে কেউ বিরক্ত করলে আপনি কী করতেন? আরে ভাই সাকিব যদি ইশারা করতেন, পুলিশ সেই দর্শকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিত। কিছুতেই সাকিবের মতো একজন স্পোর্টস আইকন আইন হাতে তুলে নিতে পারেন না। সাকিব দিনের পর দিন একজন জুয়াড়ির সঙ্গে কথা বলেছেন, লেনদেনের প্রসঙ্গ আসাতে বসতে চেয়েছেন। আইসিসির দীর্ঘ অনুসন্ধানে সাকিব দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। সাকিব দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে মাত্র এক বছরের সাজা পেয়েছেন। তিনি যখন বুঝতে পারলেন শাস্তি আসছে, তখন তিনি নানা দাবিদাওয়া নিয়ে বিসিবির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে গেলেন। নিজের দল ভারী করতে চাইলেন। আন্দোলনের দুই দিন পরই যখন আইসিসির শাস্তির ঘোষণা এলো সাকিবের অন্ধ অনুরাগীরা বলতে লাগলেন, বিসিবির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন বলেই বিসিবি আইসিসিকে দিয়ে তাকে নিষিদ্ধ করিয়েছে। পুরো ব্যাপারটাই আইওয়াশ। সাকিব নিজে যে অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছেন, সেটাও তার অন্ধ অনুরাগীরা মানতে রাজি নন। আইসিসিকে দিয়ে সাকিবকে শাস্তি দেয়ানোটা যে অসম্ভবই নয়, অবাস্তবও সেটা বোঝার মতো বিবেচনাও অনেকের নেই। অন্ধ অনুসরণ তাদের সব বিবেচনাবোধকে আড়াল করে দিয়েছে। অথচ অন্য দেশ হলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার দায়ে আইসিসির শাস্তির সঙ্গে আরও কিছু শাস্তি যোগ করত। সাকিব বলেই বিসিবি সেটা করার কথা কল্পনাও করেনি। উলটো এই নিষেধাজ্ঞায় যে তাদের কোনো হাত নেই, সেই ব্যাখ্যা দিতে দিতেই ক্লান্ত বিসিবি। সাকিব অনুরাগীদের অভিযোগ, বিসিবি বিপদের সময় সাকিবের পাশে দাঁড়ায়নি। বিসিবি যে বাড়তি কোনো সাজা যোগ করেনি, এটাই সাকিবের পাশে দাঁড়ানো। যে অপরাধে আশরাফুলের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেল, সেই একই অপরাধ করেও সাকিব হয়ে গেলেন ধোয়া তুলসীপাতা। আবেগ আসলেই কোনো যুক্তি মানে না।

যখন আপনি অনেক মানুষের প্রিয় হবেন, তখন আপনার প্রতিটি আচরণ উদাহরণ হয়ে যাবে। এখন তরুণ প্রজন্মের যারা সাকিবের মতো হতে চান, তারা কিন্তু মনে করতে পারে কাউকে পেটানো, খোলা গ্যালারিতে বসে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করা, জুয়াড়িদের সঙ্গে যোগাযোগ- এসব কোনো অপরাধ নয়। সাকিব যা করতে পারে, তা তারাও করতে পারবে। সাকিবের মধ্যে ক্রিকেট থাকলেও, ক্রিকেটীয় মূল্যবোধ নেই বললেই চলে। টাকা পেলে সাকিব ‘পূজা উদ্বোধন’ করতে করোনার মধ্যেও কলকাতা চলে যেতে পারেন। আবার মৌলবাদীদের হুমকির মুখে মাফও চাইতে পারেন। কিন্তু একজন আইকনের কাছ থেকে আমরা শুধু মাঠের খেলা নয়, মাঠের বাইরেও উচ্চ নৈতিকতা এবং দৃঢ়তা আশা করব। সেখানেই সাকিবের বড় ঘাটতি। সাকিব কখনোই অনুসরণীয় চরিত্র হয়ে উঠতে পারেননি।

আগের ঘটনা যা-ই হোক, বাংলাদেশের হয়ে না খেলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে খেলতে ছুটি নিয়েছেন; আমার ধারণা ছিল সাকিকের এই অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্ত তার অনুরাগীদের আবেগের পর্দা তুলে নেবে। কিন্তু হায়, সাকিবের এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেয়ার লোকেরও অভাব নেই। আমি আবেগপ্রবণ, কিন্তু অন্ধ নই।

আমি যেমন সাকিবের প্রবল অনুরাগী, তেমনি আশরাফুলের প্রবল অনুরাগী ছিলাম। কিন্তু আবেগ আমাকে কখনও অন্ধ করে দেয়নি। আশরাফুল নিষিদ্ধ হওয়ার পর আমি তার পক্ষে যুক্তি দিইনি। বরং অভিমান করে এক বছর ক্রিকেট খেলা দেখিনি। সাকিবের আইপিএল খেলার পক্ষে তার অনুরাগীদের যুক্তিগুলো হলো, একজন পেশাদার ক্রিকেটার যেখানে টাকা বেশি সেখানেই খেলবে। সাকিব আইপিএল খেলছে নিজের যোগ্যতায়। কোথায় খেলবে, সেটা বেছে নেয়ার স্বাধীনতা তার আছে। ক্রিকেটের সাথে দেশপ্রেম মেলানো ঠিক নয়। সাকিব তো বোর্ড থেকে ছুটি নিয়ে যাচ্ছে। ক্রিকেটকে আবেগ থেকে দূরে রাখতে হবে। বিসিবি কত সাকিবকে বানায়নি বা সাকিবের বিকল্পও কাউকে বানায়নি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি নিজেও একজন প্রবল সাকিব অনুরাগী; কিন্তু অন্ধ নই। আমি মনে করি, সাকিবের অন্ধ অনুরাগীরাই তার বারবার ভুল করার জন্য দায়ী। দিনের পর দিন সব ভুলের পক্ষে যুক্তি দিয়ে দিয়ে এই আপনারাই সাকিবকে দানব বানিয়েছেন। আপনাদের জন্যই বোর্ড সাকিবকে ন্যায্য কথাটাও বলতে পারে না।

সাকিব ছুটি নিয়ে আইপিএল খেলতে যাচ্ছেন, এটা ঠিক। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের ‘সি’ টিমের কাছে হোয়াইট ওয়াশ হওয়ার পর সবার যখন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জান দিয়ে লড়ার জন্য প্রস্তুত হওয়ার কথা, তখন দলের সেরা খেলোয়াড় ছুটি চাইছেন; এর চেয়ে বেদনাদায়ক আর কিছু হতে পারে না। সারা দেশের মানুষ অনুসরণ না করুক, অন্তত দলের জুনিয়ররা যাতে অনুসরণ করতে পারে, তেমন দৃষ্টান্ত তো সিনিয়রদের কাছে আশা করাই যেতে পারে। সাকিব কীভাবে ছুটি পেয়েছেন, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপন জানিয়ে দিয়েছেন, কেউ খেলতে না চাইলে বোর্ড কাউকে জোর করবে না। চাইলে মুস্তাফিজও ছুটি পাবেন। কিন্তু সাকিব বাংলাদেশের হয়ে না খেলে আইপিএল খেলতে ছুটি নিলেও মুস্তাফিজের মতো জুনিয়র খেলোয়াড়ও জানিয়েছেন, দলে সুযোগ পেলে তিনি বাংলাদেশের হয়ে খেলবেন, আইপিএল নয়। সাকিব কি মুস্তাফিজের কাছে কিছু শিখবেন? অর্থটাকেই যারা সবকিছু ভাবছেন, তারা বলুন তো টাকাটা মুস্তাফিজের বেশি দরকার না সাকিবের?

এটা ঠিক সাকিব ছুটি নিয়েই আইপিএল খেলতে যাচ্ছেন। কিন্তু সাকিবের ছুটি প্রসঙ্গে অসহায়ত্ব ছিল আকরাম খানের কণ্ঠে। নাজমুল হাসান পাপনও তার হতাশা, ক্ষোভ, রাগ, অভিমান, অসহায়ত্ব গোপন করেননি। পাপন বলেছেন, ‘আমরা চাই যারা খেলাটাকে ভালোবাসে তারাই খেলুক। জোর করে আমি খেলাতে চাই না। সাকিব তো আরও তিন বছর আগেই টেস্টে খেলতে চায়নি। ওতো এমনিতেই টেস্টের প্রতি আগ্রহ দেখায়নি। তখন তো ওকে টেস্ট অধিনায়ক করে দেওয়া হলো। জোর করে তো চেষ্টা করলাম। কিন্তু আসলে জোর করে খেলানোর মানে হয় না। আমার মনে হয় তাতে করে আমরা ভবিষ্যতে আগাতে পারবো না। আমরা যখন জানবো এই কজন প্লেয়ার টেস্ট খেলতে চায় না, তখন তো তাদের বিকল্প নিয়ে চিন্তা করতে পারবো। হয়তো সময় লাগবে, লাগুক। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য আমাদেরই ভালো হবে।’ পাপনের কণ্ঠে ক্ষোভ, ‘ওরা সবাই (সিনিয়র) যদি লিখে দেয় আমরা কেউ জাতীয় দলের হয়ে খেলতে চাই না, আমি এখনই রাজি। তবে আমাকে অবশ্যই জানতে হবে। ট্যুরের আগে যেয়ে বললে হবে না। হঠাৎ করে সিরিজের আগে আওয়াজ শুনি একটা, এগুলো চাচ্ছি না। খেলতে না চাইলে আগেই বলতে হবে, সিরিজের আগে না। ওরা না খেললে আমাদের সময় লাগবে, আমি একটা বছর সময় চাই। একবছর পরে কাউকে লাগবেও না, কোনো অসুবিধা নেই।’ লুকাননি হতাশাও, ‘সাকিবের সিদ্ধান্তে যে হতাশ হয়েছি, এটা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। এর আগেও এমন হয়েছে। কেউ যদি খেলতে না চায়, তাহলে সে খেলবে না। আমরা চাই নিজেদের সিদ্ধান্ত ওরা নিজেরা নিক।’ সাকিব প্রতিভাবান। কিন্তু সে প্রতিভা তো বিকশিত হয়েছে বাংলাদেশে খেলে, বোর্ডের পরিচর্যায়। সাকিব তো হঠাৎ আকাশ থেকে নাজিল হননি। এ ব্যাপারে পাপনের বক্তব্য হলো, ‘দেখেন একজন খেলোয়াড়ের পেছনে আমাদের বিনিয়োগ তো কম নয়। সবকিছু মিলিয়ে একজন খেলোয়াড়ের পেছনে যা ব্যয় হয়, তা তো আগে কল্পনা করাও যেত না। এই জায়গাতে এই রকম দুটি টেস্ট ম্যাচ হারের পরও সাকিব কীভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা আমার চিন্তায়ও আসে না। আমার ধারণা ছিল সবাই পরের টেস্টটা জয়ের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকবে। সেই জায়গা থেকে যদি কেউ বলে আমি টেস্ট খেলবো না, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলব। তাহলে আসলে আমাদের করার কিছুই থাকে না। আজকে যেসব খেলোয়াড় তারকা হয়েছেন, প্রথম ৬-৭ বছরে তাদের গড় কত ছিল। খেলতে খেলতেই তো তারা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। যখন তাদের সার্ভিস আমাদের পাওয়ার কথা, তখন তারা দলের কথা চিন্তা করছে না। সেটা তো অবশ্যই হতাশাজনক।’

সাকিবের এই অন্যায় আবদার মেনে নিলেও বোর্ড এখন চুক্তিতে কিছু বিষয় স্পষ্ট করতে চাইছে, ‘আমরা ওদের (জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের) সঙ্গে একটা চুক্তি তৈরি করব। নতুন এই চুক্তিতে নতুন কিছু বিষয় যুক্ত হবে। পরিষ্কারভাবে লেখা থাকবে, কে-কোন ফরম্যাট খেলতে চায়, তাদের বলতে হবে। তাদের যদি ওই সময়ে অন্য কোনো খেলা থাকে, এটাও জানাতে হবে। তখন এই চুক্তিতে যারা সই করবে, তাদের তো আমরা তখন যেতে দেব না।'

এক সাকিবের জন্য বোর্ডকে এখন নিজেদের বদলে ফেলতে হচ্ছে।

আরও অনেকের মতো সাকিব আমারও অনেক প্রিয়। আগেই বলেছি, সাকিব ভালো খেলেন বলে আমার প্রিয় নন, তিনি বাংলাদেশের হয়ে খেলেন বলেই তার জন্য আমাদের জান কোরবান। ড্যাশিং ভিভ রিচার্ডস, স্টাইলিস্ট ব্রায়ান লারা, ডিসিপ্লিনড শচিন টেন্ডুলকারও কিন্তু আমার প্রিয়। কিন্তু কেউই সাকিবের মতো প্রিয় নন। সাকিবকে আমি জান দিয়ে ভালোবাসি, কারণ সাকিব ভালো খেললে, বাংলাদেশ ভালো খেলে। সাকিবকে ভালোবাসার সঙ্গে আমার দেশের প্রতি আবেগটাও জুড়ে যায়। বাংলাদেশের হয়ে হারলেও আছি, জিতলেও। কিন্তু কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে সাকিব যতই ভালো খেলুক, আমার কিচ্ছু যায় আসে না। বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান আমার জান। কিন্তু কলকাতা নাইট রাইডার্সের সাকিব আল হাসানের জন্য আমার কোনো ভালোবাসা নেই।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?
মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক

শেয়ার করুন

করোনা নিয়ে নতুন ভাবনা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাছিও করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে না। বলা যায়, এর ফলেও আমাদের আরেকটি বিপদ কমলো। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাছি ৬৫টি বিভিন্ন রোগ ছড়াতে সাহায্য করে যাদের মধ্যে রয়েছে কলেরা, চোখ ওঠা, ডায়রিয়া, আমাশয়, যক্ষ্মা, টাইফয়েড, স্লিপিং সিকনেস ইত্যাদি। তাই করোনা মহামারির সময়ে মাছি করোনা ছড়ায় না বলে একে অবহেলা করা ঠিক হবে না।

মশা শুধু আমাদের দেশেই নয়, বরং পৃথিবীর বহু দেশে এক জনস্বাস্থ্যগত সমস্যার নাম। সবচেয়ে উন্নত দেশ আমেরিকাও এই সমস্যা থেকে মুক্ত নয়। উত্তর গোলার্ধের উন্নত দেশগুলোতে মশার উপদ্রব শুরু হয় মূলত বসন্তকালের পর। তবে আমাদের দেশে প্রায় সারা বছরই এই উপদ্রব থাকে। বিভিন্ন প্রজাতির মশার প্রজনন বৈশিষ্ট্যও আবার বিভিন্ন রকম। এই ক্ষুদ্র উড়ন্ত প্রাণীটি আমাদেরকে কামড়ে রক্ত শুষে নেয়, ফলে আমাদের কাজের মনোযোগ কমে এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। কিন্তু তার চাইতেও বড় সমস্যা হলো মশা বেশ কিছু প্রাণঘাতী অসুখ ছড়ায়।

মশার মাধ্যমে যেসব ভাইরাস ছড়ায় তাদের মধ্যে বেশি কুখ্যাতগুলো হলো ওয়েস্ট নাইল, ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাস। ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস আমাদের দেশে অপরিচিত, কিন্তু মারাত্মক রকম প্রাণঘাতী। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে, প্রায় অর্ধেক পৃথিবী জয় করা সম্রাট আলেকজান্ডার নাকি মিসর অভিযানের সময় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন রোগভোগের পর মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

অবশ্য অন্যদের মতে, তার মৃত্যুর কারণ ছিল অতিরিক্ত মদ্যপান ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার। যাহোক, নীল নদের পশ্চিম তীরের এলাকায় দাপট দেখানো এই ভাইরাসটি আমাদের দেশে না থাকলেও ডেঙ্গু জ্বর ও চিকুনগুনিয়ার ভাইরাসগুলো বিদেশ থেকেই এখানে এসেছে। এসব ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো মানুষকে মশা কামড়ালে মনুষ্যরক্তের মাধ্যমে ভাইরাস মশার পাকস্থলীতে পৌঁছে, সেখানে সংখ্যাবৃদ্ধির পর ভাইরাস মশার লালাগ্রন্থিতে গিয়ে বাসা তৈরি করে বাস করে। এই মশা যখন আবার কাউকে কামড়ায় তখন লালার মাধ্যমে ভাইরাসটি সেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এভাবেই ভাইরাসগুলো মশার মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে।

এডিস, কিউলেক্স ও এনোফিলিস- মূলত এই তিন প্রজাতির মশাই আমাদের জন্য ক্ষতিকর। এদের একেক প্রজাতি একেক রোগ ছড়ানোর জন্য দায়ী। উপরিউক্ত অসুখগুলো ছাড়াও এই তিন প্রজাতির মশা আরও যেসব রোগ ছড়ায় সেটির তালিকা বেশ দীর্ঘ।

এদের মধ্যে রয়েছে ম্যালেরিয়া, ইয়েলো ফিভার, এলিফ্যানটিয়াসিস বা লিম্ফ্যাটিক ফাইলেরিয়াসিস এবং বিভিন্ন রকম এনসেফালাইটিস, যার মধ্যে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া এনসেফালাইটিস, জাপানিজ এনসেফালাইটিস, ভেনিজুয়েলা এনসেফালাইটিস, সেন্ট লুই এনসেফালাইটিস, ওয়েস্টার্ন একুইন এনসেফালাইটিস, ইস্টার্ন একুইন এনসেফালাইটিস ইত্যাদি। এর সবগুলোই মারাত্মক ও প্রাণঘাতী। তার মানে প্রাণী হিসেবে মশা ক্ষুদ্র হলেও মন্দকর্মে তার ক্ষমতার বলয়টা বিশাল। তবে সুখের বিষয়, সব দেশে এ সবগুলো অসুখ হয় না।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার তাণ্ডব আমাদের দেশে কিছুকাল আগেও দেখেছি। এরা অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। এখন করোনা মহামারির এই সময়টাতে আমাদের দেশে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার আক্রমণ বেশ কম। অন্যান্য বছরের মতো এবারও যদি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব থাকতো এবং সঙ্গে করোনার প্রকোপও অব্যাহত থাকতো, তাহলে আমাদের অবস্থা অনেক শোচনীয় হতো।

প্রকৃতির অনেক রহস্য বিজ্ঞান এখনও জানে না। তাই করোনার প্রাদুর্ভাবকালে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ভাইরাস অবদমিত থাকে কি না তার কোনো ব্যাখ্যা আমরা এখনও জানি না। তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত এলাকায় করোনাভাইরাস যে সুবিধা করতে পারে না, এর প্রমাণ দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে। সেখানে যেসব অঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব রয়েছে সেসব জায়গায় করোনাভাইরাসে আক্রান্তের হার খুবই কম। এ সম্পর্কে পরবর্তী কোনো এক সময়ে লেখা যাবে।

এডিস ধরনের মশা ডেঙ্গুসহ অন্যান্য অসুখ ছড়ালেও কভিড-১৯ ছড়াতে পারে না বলে মনে হচ্ছে। এ বিষয়ে সর্বপ্রথম গত বছরের মার্চে ফ্রান্সের মশা-নিয়ন্ত্রক সংস্থা এতেঁত ইন্তারডিপার্তমেন্তেল দ্য দিমউসতিকেশন (ইআইডি) জানিয়েছে যে তাদের কীটতত্ত্ববিদরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, মশা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো বিভিন্ন প্যাথোজেন ছড়াতে পারলেও করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে না। যদি এই ভাইরাস মশার পাকস্থলীতে গিয়ে হজম না হয়ে এই প্রক্রিয়াকে বাধা দিতে পারতো, যদি এটি মশার পাকস্থলীর কোষগুলোকে সংক্রমিত করতে পারতো, কিংবা যদি এটি মশার লালাগ্রন্থিতে বাসা বানাতে পারতো- তাহলে আশঙ্কা ছিল যে, মশার কামড়ে লালার মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়াতে পারতো। তা এখনও হচ্ছে না। যদি ছড়াতে হয় তাহলে মশাকে হাজার বছর ধরে বিবর্তনের ধারায় ধীরে ধীরে নিজেকে রূপান্তরিত করতে হবে। ততদিন মোটামুটি নিশ্চিন্ত যে মশা করোনাভাইরাস ছড়াতে পারবে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত ৫ এপ্রিল ২০২০ এ বিষয়ে তাদের বিবৃতিতে বলেছে, এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি যাতে মনে হতে পারে যে, করোনাভাইরাস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এই নতুন ভাইরাসটি একটি শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস এবং এই ভাইরাসটি মূলত সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশি দেয়া কিংবা কথা বলার সময় নিঃসৃত অতি ক্ষুদ্র জলীয় কণা বা লালা কিংবা নাকের শ্লেষায় থাকা করোনাভাইরাসের কারণে ছড়ায়।

তাই নিজেকে সংক্রমণমুক্ত রাখতে অ্যালকোহলসমৃদ্ধ হ্যান্ড রাব দিয়ে হাত পরিষ্কার করুন কিংবা সাবান ও পানি দিয়ে ঘনঘন ভালো করে হাত ধোবেন। সেই সঙ্গে হাঁচি ও কাশি দেয়া কারো কাছ থেকে দূরে থাকুন।

এই বক্তব্যের সপক্ষে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ভাইরাস গবেষণার বিখ্যাত পাব-মেড জার্নাল ভাইরোলজিকা সিনিকা এটি প্রকাশ করেছে তাদের জুন ২০২০ সংখ্যায় (ভলিউম ৩৫, নম্বর ৩)। সেখানে গবেষকরা ল্যাবরেটরিতে এডিস মশার দেহকোষে সার্স-কভ-২ প্রবেশ করান। সব ধরনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা সত্ত্বেও সেই দেহকোষগুলোতে এই করোনাভাইরাসটির সংখ্যা বাড়তে দেখা যায়নি। এরপর তারা করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়া চীনের উহান শহরের আশপাশে থেকে এডিস, কিউলেক্স ও এনোফিলিস জাতের ১ হাজার ১শ’ ৬৫টি মশা ধরে তাদের শরীরে এই ভাইরাস আছে কি না পরীক্ষা করেন। তাদের একটিতেও এই ভাইরাস পাওয়া যায়নি। ফলে তারা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, মশারা সার্স-কভ-২ ভাইরাস ছড়াতে পারে না।

একইভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাছিও করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে না। বলা যায়, এর ফলেও আমাদের আরেকটি বিপদ কমলো। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাছি ৬৫টি বিভিন্ন রোগ ছড়াতে সাহায্য করে যাদের মধ্যে রয়েছে কলেরা, চোখ ওঠা, ডায়রিয়া, আমাশয়, যক্ষ্মা, টাইফয়েড, স্লিপিং সিকনেস ইত্যাদি। তাই করোনা মহামারির সময়ে মাছি করোনা ছড়ায় না বলে একে অবহেলা করা ঠিক হবে না।

মনে রাখতে হবে যে, করোনাকালে সুস্থ থাকাটা অত্যন্ত জরুরি বিষয়। তাই যেকোনো রোগ থেকে মুক্ত থেকে ইমিউনিটি বজায় রাখাটা খুব প্রয়োজন। এ সময়ে মাছিকে দূরে রাখার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকালে মশা-মাছি জনস্বাস্থ্যের জন্য কোনো হুমকি নয়। তবে মশা-মাছি করোনাভাইরাস ছড়াতে না পারলেও তারা অন্য অসুখগুলো ছড়াতে পারে এবং সেগুলো সবই কমবেশি প্রাণঘাতী। সে কারণে মশা যাতে কামড়াতে না পারে তার জন্য সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের বাড়িঘরের চারপাশে যেন আবর্জনা না জমে, নর্দমায় ময়লা পানি স্থির না থেকে যেন প্রবহমান থাকে, কোনো গর্তে কিংবা পরিত্যক্ত ডাবের খোসা, নারকেলের মালা, ডিব্বা, ফুলের টব, গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার বা অন্য কোনো পাত্রে যেন পানি জমে না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে।

মাছি নিয়ন্ত্রণের জন্য কীটনাশক, বিভিন্ন রকমের ফাঁদ, আঠালো ট্যাপ, বৈদ্যুতিক নেট ইত্যাদি ব্যবহার করে আমরা ঘরবাড়ির মাছি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। তবে মাছি মারার চাইতে মাছি যাতে না জন্মায় তার ব্যবস্থা করাই জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞান মতে মূল কাজ হওয়া উচিত। ঘরবাড়ি ও অঙিনাসহ চারপাশের পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখা এর অন্যতম শর্ত। এর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কম খরচের চারটি কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে।

১. মাছির প্রজননস্থলকে ধ্বংস করা। এজন্য নোংরা আবর্জনাময় স্থানগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে। ২. অন্য এলাকা থেকে মাছি আসা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। এজন্য ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত আবর্জনা সরিয়ে ফেলা প্রয়োজন। ৩. রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ও মাছির সংস্পর্শকে বাধা দেয়া। এজন্য সংক্রামক রোগীদেরকে আলাদা ও পরিচ্ছন্ন জায়গায় রাখা প্রয়োজন। এবং ৪. খাবার, থালা-বাসন, খাবারের সরঞ্জাম ও মানুষের সংস্পর্শে মাছিকে আসতে না দেয়া। এজন্য খাবার ও থালাবাসনকে ঢেকে রাখা, সরঞ্জামাদি ব্যবহারের আগে ধুয়ে নেয়া এবং মানুষের শরীরে যাতে মাছি বসতে না পারে তার ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

আমরা সাবধান হই। কারণ করোনা নিয়েই আমরা এত বেশি ব্যতিব্যস্ত আছি যে, মশাবাহিত অসুখগুলো ছড়াতে শুরু করলে তা আমাদের জন্য বিপদের কারণ হবে।

লেখক: পরিচালক, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার।

সাবেক চেয়ারম্যান, ফার্মেসি বিভাগ; সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবেক আহ্বায়ক, জাতীয় ওষুধনীতি ২০১৬ প্রণয়ন উপকমিটি।

আরও পড়ুন:
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাংলার বিশ্বব্যাপ্তি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কি নজরদারি ছিল না?
মিয়ানমার কি আদৌ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে?
মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক

শেয়ার করুন

ad-close 103.jpg