টিকা ও কল্যাণমুখী রাজনীতি

 টিকা ও কল্যাণমুখী রাজনীতি

এখন টিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলটি একেবারেই নিশ্চুপ হয়ে গেছে। অথচ রাজনৈতিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে চিন্তা করলে তাদের দায়িত্ব ছিল, মানুষকে টিকা নেয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা, ঐক্যবদ্ধ করা। করোনার টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে সফলতা, তা সাধারণ মানুষকে জানিয়ে তাদের টিকা নেয়ার বিষয়ে অনুপ্রাণিত করাই হতে পারত তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি। সরকারের পাশে থাকার জন্য সবাইকে আহ্বান জানালে, সেটাও রাজনীতিতে একটা নতুন মাত্রা যোগ হতে পারত।

টিকা নিয়ে রাজনীতি হতে পারে, তা আগেই ধারণা করা গিয়েছিল। অবশেষে তা-ই দেখা গেলো। টিকা আবিষ্কার করলো যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড, উৎপাদন করল ভারতের সেরাম। সেই টিকা কেনার চুক্তিও হয়েছে। অবশ্য ভারত সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ দেখিয়ে বর্তমান বাংলাদেশকে কিছু টিকা ‘উপহার’ দিয়েছে। চুক্তি অনুসারে ৫০ লাখ টিকা দিয়েছে সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। এ নিয়ে অনেক রাজনীতি হয়েছে যে টিকা দেবে না, সময়মতো পাওয়া যাবে না। কিন্তু বাস্তবে এর ব্যতিক্রম হয়েছে। ভুল ধারণা ভেঙে গেছে। তারপরও এটি নিয়ে রাজনীতি হয়েছে। সরকারের বিরোধীপক্ষ এটা ভাবছে না যে, বিশ্বের অনেক দেশ এখনও টিকা পায়নি, বাংলাদেশ সেই টিকা অনেক আগে পেয়েছে, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কয়েক লাখ মানুষ টিকা নিয়েছে। টিকাদানে বাংলাদেশ যে দারুণ সাফল্য দেখালো, তা প্রশংসনীয়। এ জন্য সরকার ধন্যবাদ আশা করতেই পারে।

একটি মহল প্রশ্ন তুলেছিল, ‘ভ্যাকসিন সাধারণ মানুষ পাবে কি না তা কোনো রোডম্যাপে নেই, কোনো প্ল্যানিংয়ে নেই। বলছে, আগে ২০ লাখ আসবে। এই ২০ লাখ কারা পাবে -সেটা মানুষ জানে না। প্রতি মাসে নাকি ৫০ লাখ করে আসবে, সেটা কারা পাবে তাও মানুষ জানে না। সাধারণ মানুষ, আমরা কখন পাব, না পাব তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’ ওই রাজনৈতিক মহলের সব বক্তব্যই ভুল প্রমাণিত হলো। এখন সাধারণ মানুষ টিকা নিতে পারছে, কোনো জটিলতা নেই।

এখন টিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলটি একেবারেই নিশ্চুপ হয়ে গেছে। অথচ রাজনৈতিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে চিন্তা করলে তাদের দায়িত্ব ছিল, মানুষকে টিকা নেয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা, ঐক্যবদ্ধ করা। করোনার টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে সফলতা, তা সাধারণ মানুষকে জানিয়ে তাদের টিকা নেয়ার বিষয়ে অনুপ্রাণিত করাই হতে পারত তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি। সরকারের পাশে থাকার জন্য সবাইকে আহ্বান জানালে, সেটাও রাজনীতিতে একটা নতুন মাত্রা যোগ হতে পারত।

আমাদের দেশে টিকার সঠিক বণ্টন হয়েছে। টিকাদান শুধু রাজধানী-কেন্দ্রিক করা হয়নি, সব জেলা-উপজেলায় সঠিকভাবে বিতরণ করা হয়েছে। টিকা প্রয়োগ হচ্ছে। সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যে চুক্তি করা হয়েছে, এটা ভালো উদ্যোগ ছিল । অন্যথায় হয়ত আরও দেরিতে টিকা আসতো। আরও সুসংবাদ হলো, টিকার দ্বিতীয় চালান চলতি মাসের ২২ তারিখে আসতে পারে এবং টিকার পরিমাণ হতে পারে ২০-২৫ লাখ ডোজ।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো তাদের উৎপাদিত টিকা সফল বলে প্রমাণ করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে; যেখানে ক্ষমতা ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে যেন প্রভাব থাকে সেই চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তির বিষয়টি জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশ এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এসবের মধ্যে আমরা যে অন্যান্য দেশের আগে টিকা পেয়েছি, এতে প্রমাণ হয় সরকারের সঠিক পরিকল্পনা। সরকার করোনা নিয়ে যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিল।

বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ এখন পরিচিত এক নাম, অধিকাংশ মানুষই লাল সবুজ পতাকার এই দেশকে জানেন, চেনেন। এই পরিচয়, পৃথিবীর মাঝে আমাদের এই অস্তিত্ব ও অগ্রসরমাণ পরিচিতি সম্ভব হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার কারণে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবতার প্রতীক। তিনি সর্বদা সুখে দুঃখে মানুষের পাশে দাঁড়ান। টেকনাফের মামুন শেখ হাসিনার মোবাইলে খুদে বার্তা প্রেরণ করলে আগের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী মামুনের পরিবারকে ঘর করে দিতে এলাকার জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দেন।

এখন মামুনের মুখে খুশির হাসি। এ ধরনের কাজ, মানুষের পাশে থাকার এই প্রচেষ্টা, আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও, আদতে খুবই ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয়, কারণ তা একজন ব্যক্তিমানুষের জন্য তার দরদকেই প্রকাশ করে। এজন্যই তিনি হলেন ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ।

অতীতে বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননায় ভূষিত করেছে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই)। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন জিএভিআই বোর্ডের চেয়ার নগচি ওকোনজো-আইয়েলা। বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাপক সফলতা, পোলিও নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং ডিপথেরিয়া, হেপাটাইসিস বি-এর মতো ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অবদান রাখায় শেখ হাসিনার প্রশংসা করে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। এই পুরস্কার তাদের দেওয়া হয় যারা শিশুর জীবন রক্ষার জন্য জরুরি টিকাদানে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং সব শিশু যাতে টিকা পায়, তা নিশ্চিত করতে কাজ করে। সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে বলা হয়, ‘শুধু টিকাদান কর্মসূচি নয়, শিশু ও নারীর অধিকার আদায়ে শেখ হাসিনা একজন সত্যিকারের সফল রাষ্ট্রনায়ক।’ সম্মাননা পাওয়ার পর শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ পুরস্কার আমার না। এটা বাংলাদেশের জনগণকে আমি উৎসর্গ করলাম।’

পরিশেষে বলতে চাই টিকা নিয়ে গুজব নয়, বরং টিকা নিয়ে বর্তমান সরকার যা করছে , তাতে প্রমাণ হয় প্রধানমন্ত্রীর সকল পরিকল্পনা কল্যাণমুখী রাজনীতি ও দিকনির্দেশনার বহিঃপ্রকাশ।

লেখক: সাবেক সভাপতি- শিক্ষক সমিতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

আরও পড়ুন:
করোনা: চীনে ভেজাল টিকা কেলেঙ্কারির হোতা গ্রেপ্তার
গ্লোব বায়োটেকের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন
করোনার টিকা পাবে না গর্ভবতী ও ১৮ বছরের কম বয়সীরা
ভ্যাকসিন নিয়ে যেন বাণিজ্য না হয়: জিএম কাদের
সবচেয়ে কম দামে করোনা ভ্যাকসিন: সালমান এফ রহমান

শেয়ার করুন

মন্তব্য

২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন

২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন

পঞ্চম সংশোধনীতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো জঘন্য কালাকানুন শুধু সংবিধানে অন্তর্ভুক্তই করেননি রাষ্ট্রপতি জিয়া, বঙ্গবন্ধু-হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের বিচারের পথ চিরতরে রুদ্ধ করায় সহযোগী ভূমিকা পালনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা ও চেতনাই বাঙালি জাতির জাগরণের মূলশক্তি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ই সংবিধান থেকে মুছে দিলেন সংবিধান সংশোধন করে! যে ‘জয়বাংলা’ রণধ্বনি দিয়ে বাংলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছে, সেই জয়বাংলা মুছে দিয়ে মৃত পাকিস্তানের ‘জিন্দাবাদ’ ফিরিয়ে আনলেন সংশোধনীতে। বাংলাদেশ বেতারের নাম বদলে রেডিও পাকিস্তানের স্টাইলে করলেন রেডিও বাংলাদেশ!

আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর, ১৭ মার্চ, ১০ জানুয়ারির মতো স্মরণীয় দিনগুলো যেমন ত্যাগ আর গৌরবের মহিমায় জ্বল জ্বল করছে, তেমনি গণহত্যার ২৫ মার্চ, ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্ট, ১৭ই আগস্ট, ২৬ সেপ্টেম্বর, ৯ জুলাইয়ের মতো ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কিছু কালো দিনও আছে। না চাইলেও আমরা ভুলে যেতে পারব না। তেমনই কলঙ্কিত একটি দিন ২৬ সেপ্টেম্বর। ১৯৭৫ সালের এই দিনে খন্দকার মোশতাক তার সেই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, যা জেনারেল জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠনের পরে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই পার্লামেন্টে আইনে পরিণত করে পঞ্চম সংশোধনী হিসেবে সংবিধানে ভুক্ত করা হয়।

দেশি-বিদেশি চক্রান্ত বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল যে খুনিরা, তাদের যাতে কোনোদিন বিচারের মুখোমুখি হতে না হয়, সেই অশুভ উদ্দেশ্যেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্র যখন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে, তখন তা কেবল কোনো ব্যক্তি বা প্রশাসনযন্ত্রের জন্যেই নিন্দনীয় কাজ নয়, গোটা জাতির জন্যই তা কলঙ্ক আর চরম লজ্জার ঘটনা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে ঘাতকচক্রের গড়া পুতুল সরকারের রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ওই সালেরই ২৬ সেপ্টেম্বর জারি করেছিল ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ, শিরোনাম ছিল রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ নম্বর ৫০। খন্দকার মোশতাকের পাশাপাশি তাতে স্বাক্ষর করেন সে সময়ের আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবও।

সেই অধ্যাদেশ এর আইনগত বৈধতা দেয় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রধান বেনিফিশিয়ারি জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিএনপি এই কলঙ্কিত অধ্যাদেশকে বিল হিসেবে পাস করিয়ে নেয়। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর পর সেদিন সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এই কালো আইনটি। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুহত্যা তো বটেই ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর জেলে জাতীয় চার নেতা হত্যা পর্যন্ত বিচার থেকে অব্যাহতি পেয়ে যায়! দায় মুক্তির পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি দিয়েও খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যার অব্যবহিত পর পরই সেনাপ্রধান হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। মেজর জেনারেল থেকে হয়ে যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল। সামরিকশাসন জারি থাকা অবস্থায়ই প্রেসিডেন্ট পদে থাকার বৈধতা নিয়েছিলেন হ্যাঁ-না ভোটের প্রহসন করে। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে সারা দেশে ভোটকেন্দ্র বসিয়ে সেই হ্যাঁ-না গণভোটের নাটক হয়েছিল।

সামরিক পোশাকেই জেনারেল জিয়ার রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠন এবং ১৯৭৯ সালে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিজয় নিয়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী আনার পূর্বাপর সব ঘটনাই আজ ইতিহাসের অংশ। সেই সংসদেই সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী এনে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালে সামরিকশাসন তুলে নেয়া পর্যন্ত জিয়া-মোশতাক গংদের সমস্ত কার্যক্রমকেই বৈধতা দেয়া হয়।

সংগত কারণেই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি সৃষ্টিকারী কালো দিন ৯ জুলাই অনাগত কাল ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি কলঙ্কিত তারিখ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

একই সঙ্গে বিএনপি এবং এর দোসরদের ললাটেও এই কলঙ্কের দাগ অমোচনীয় হয়েই থাকবে। ইতিহাসের শিক্ষাই হচ্ছে এই যে, কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না। যদি করত, তাহলে খন্দকার মোশতাক বাংলার ইতিহাসের আরেক মীরজাফর হিসেবে ধিকৃত হয়ে বিদায় নেবার পরও ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের পক্ষে কারো দাঁড়াবার কথা ছিল না।

মীরজাফরের মতো মোশতাকওতো মাত্র কদিনের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন খুনিদের ক্রীড়নক হিসেবে। গলাধাক্কা দিয়ে তাকে বিদায়ের পর বিচারপতি সায়েমকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করেন জেনারেল জিয়া। তাকে নামমাত্র রাষ্ট্রপতি বানিয়ে জিয়া নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে রাজনীতিতে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মাত্র।

প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, খন্দকার মোশতাকের মতো গণধিকৃত, সেই একই বেঈমানি তিনিও কি করেননি? রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হবে জেনেও তিনি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বরং ‘গো এহেড’ বলে ফারুক-রশীদের সমর্থন দিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যায়! বিস্ময়কর হলেও সত্য একজন উপপ্রধান সেনাবাহিনী প্রধান হয়েও তিনি এমন নৃশংস ভূমিকাই পালন করেছিলেন!

জিয়াউর রহমান যে ক্ষমতার কী তীব্র পিপাসু, সেটা স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু থেকেই টের পাওয়া গিয়েছিল। কালুরঘাটে স্থাপিত বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের জন্য ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমানকে নিয়ে যাওয়ার পরে তিনি যে কাণ্ড করেছিলেন, তাও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ।

চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান ঘোষণা দেয়ার পরও সবাই ভাবলেন যে, একজন বাঙালি সেনাকর্মকর্তাকে দিয়ে ঘোষণাটি দেয়ানো গেলে সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সেনারা মুক্তিযুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ হবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা না করে সরাসরি নিজেকে রাষ্ট্রপতি বলে সে ঘোষণা পাঠ করেছিলেন জিয়া! সঙ্গে সঙ্গে বিরূপ প্রতিক্রিয়া! আবার পাঠ করলেন তিনি এবং এবার বললেন, “অন বিহাফ অব আওয়ার ন্যাশনাল লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান...।”

সুতরাং সেই জিয়ার স্বরূপ উন্মোচন যে একদিন হবে সে তো ছিল অনিবার্য সত্য এবং সময়ের ব্যাপার মাত্র। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে জিয়া কেন যাবেন? তার অন্তরে যে পাকিস্তান! বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমানের গভীর পাকিস্তানপ্রীতি প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল!

পঞ্চম সংশোধনীতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো জঘন্য কালাকানুন শুধু সংবিধানে অন্তর্ভুক্তই করেননি রাষ্ট্রপতি জিয়া, বঙ্গবন্ধু-হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের বিচারের পথ চিরতরে রুদ্ধ করায় সহযোগী ভূমিকা পালনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা ও চেতনাই বাঙালি জাতির জাগরণের মূলশক্তি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ই সংবিধান থেকে মুছে দিলেন সংবিধান সংশোধন করে!

যে ‘জয়বাংলা’ রণধ্বনি দিয়ে বাংলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছে, সেই জয়বাংলা মুছে দিয়ে মৃত পাকিস্তানের ‘জিন্দাবাদ’ ফিরিয়ে আনলেন সংশোধনীতে। বাংলাদেশ বেতারের নাম বদলে রেডিও পাকিস্তানের স্টাইলে করলেন রেডিও বাংলাদেশ!

জ্ঞাতসারে বলতে হবে এ কারণে যে, কর্নেল ফারুক-রশিদ, ডালিমদের ১৫ আগস্টের পরিকল্পনা জিয়াউর রহমান জেনেছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার ৪ মাস ১৯ দিন আগে! ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে কর্নেল ফারুক ও রশিদ গং প্রথমে ঢাকা থেকে ব্যাংককে চলে গিয়েছিলেন। সেনাপ্রধান জিয়া তাদেরকে দ্রুত বিশেষ ব্যবস্থায় দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেন। সেখানেই ব্রিটিশ সাংবাদিক ম্যাসকারাহ্যানসকে টেলিভিশনের জন্য যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, রশিদ, ফারুকরা তাতে উল্লেখ করেছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা।দুজনই বলেছেন ২০ মার্চ সন্ধ্যায়

আমরা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাই। আমাদের পরিকল্পনা শুনে তিনি বললেন, সিনিয়র অফিসার হিসেবে আমি তোমাদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকতে পারি না। তোমরা ইয়াং অফিসাররা করতে চাইলে এগিয়ে যাও। শেষ বাক্যটা ছিল, ‘গো এহেড।’

ফারুক ও রশিদের সেই সাক্ষাৎকার আগ্রহী পাঠক ইচ্ছে করলে ইউটিউবে সার্চ দিয়ে এখনও শুনতে পারেন।

যাহোক, পৃথিবীর ইতিহাসের এই কলঙ্কিত আইন, বিচারহীনতার এই বিধানটি বঙ্গবন্ধু হত্যার ২১ বছর পর তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে সংবিধানে সংশোধনী এনে সংবিধানকে কলঙ্কমুক্ত করেন কালো আইনটি বাতিলের মাধ্যমে।

দুঃখের বিষয়, এই একুশটি বছর দেশ যারা পরিচালনা করেছেন তাদের কারো বিবেক দংশিত হয়নি এই কালো আইনটি দেখে! বিচারপতি আব্দুস সাত্তার, জেনারেল এরশাদ এবং বেগম খালেদা জিয়ার সরকার এই একুশ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন। একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতাকে হত্যা করা হলো- তার হত্যাকারীদের বিচারের কোনো ব্যবস্থাই নেয়া যাবে না!

এমন কালো আইন সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকলে তা জাতি হিসেবে তাদের কোন আদিম বর্বর যুগে ঠেলে দেয়? এ প্রশ্ন কি তাদের কারো মনেই জাগেনি? নিশ্চিত করেই বলা যায়, জাগেনি। কারণ, যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা সকলেই পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী।

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ যারা রুদ্ধ করে রেখেছিলেন তারা দেশের যে সর্বনাশ করে গেছেন, তা কোনোদিন মোচন হবার নয়। ১৫ আগস্ট কোনো সরকারপ্রধানকেই হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছিল একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষাকেও। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্র, যেখানে থাকবে না কোনো অর্থনৈতিক বৈষম্য আর ধর্মীয় সহিংসতা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের রাষ্ট্রে থাকবে না ধর্মের নামে রাজনীতি আর শোষণ-বঞ্চনার মতো পাকিস্তানি অভিশাপ। মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক পরিচালক (বার্তা), বিটিভি।

আরও পড়ুন:
করোনা: চীনে ভেজাল টিকা কেলেঙ্কারির হোতা গ্রেপ্তার
গ্লোব বায়োটেকের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন
করোনার টিকা পাবে না গর্ভবতী ও ১৮ বছরের কম বয়সীরা
ভ্যাকসিন নিয়ে যেন বাণিজ্য না হয়: জিএম কাদের
সবচেয়ে কম দামে করোনা ভ্যাকসিন: সালমান এফ রহমান

শেয়ার করুন

দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ

দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ

১৯৭৯ সালে সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে ২৬ সেপ্টেম্বরের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ৫০ অতিরিক্ত সংযোজনী হিসেবে ৬ এপ্রিল পাস করা হয়। এদের বিচার সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। যারা ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সকল অপরাধ, অপকর্মের সুবিধাভোগী তারা তাদের স্বার্থে খন্দকার মোশতাকের অবৈধ অধ্যাদেশকে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান ও চরিত্রকেই কলঙ্কিত করেছিল। এই কলঙ্ক যারা বহন ও ধারণ করেছে তারা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্মাতা হতে পারে না। তারা এর বিরোধী শক্তি। রাজনীতির এই পাঠ যারা বোঝেন না কিংবা গুলিয়ে ফেলেন তারাও ঘাতকদেরই অনুসারী।

১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অবৈধ সরকারপ্রধান খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট যারা বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জন নিরপরাধকে রাতের আঁধারে গুলি করে হত্যা করেছিল তাদেরকে বিচারের আওতা থেকে মুক্ত রাখার জন্য দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করে। এই অধ্যাদেশটি দুটি অংশে বিভক্ত।

দুই অংশের এই অধ্যাদেশের প্রথম অংশে লেখা হয়-

“১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবৎ আইনের পরিপন্থি যা-ই কিছু ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।”

দ্বিতীয় অংশে বলা হয়-

“রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হল। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।”

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের এবং নিকট আত্মীয়স্বজনদের যারা হত্যা করেছিল তাদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র যাত্রা শুরু করছিল সেটিকে মৌলিক আদর্শ থেকে সম্পূর্ণরূপে উল্টোপথে পরিচালিত করা। এজন্য তারা সামরিক বাহিনীর ট্যাঙ্ক, বন্দুক, গোলাবারুদ ব্যবহার করে। যারা হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের সবাই ছিল সামরিক বাহিনীর জুনিয়র কর্মকর্তা এবং অধস্তন সেনাসদস্য। এদের একটি অংশ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে সামরিক বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত ছিল, অন্য অংশটি সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ছিল।

সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ বেশিরভাগ কর্মকর্তা এই হত্যাকাণ্ডের গোপন কোনো ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সামান্যতম অবহিত ছিল না। তবে ধারণা করা হচ্ছে- সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা উচ্চাভিলাষী কোনো কোনো ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা গোটা ষড়যন্ত্রের পূর্বাপর প্রস্তুতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। নতুবা ট্যাঙ্কের মতো সাঁজোয়া বাহিনী সেনানিবাসের বাইরে এভাবে আগে থেকে বের হওয়ার কোনো সামরিক বিধানমতে থাকার ন্যূনতম কারণ ছিল না। তাছাড়া সামরিক বাহিনীর জুনিয়র কিছু কর্মকর্তার ইচ্ছাতেই সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে কেউ কেউ বা কিছু জুনিয়র কর্মকর্তা সামরিক অস্ত্রের নির্বিচার ব্যবহার করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। যারা হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল তারা সবাই অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ঘাতক চরিত্রের অধিকারী ছিল।

সে কারণে হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী ঘাতকরা বঙ্গবন্ধু, শেখ মণি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাত পরিবারের সদস্যদের অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য এবং বাড়িতে থাকা অন্য সবাই তারা ভয়ানক আক্রোশ নিয়ে হত্যা করে। অন্য দুটি পরিবারেও আক্রোশের মাত্রা প্রায় একই রকম ছিল। দুচারজন শিশু সৌভাগ্যক্রমে পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিল। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার বাইরে আরও অনেকেই ছিল যারা বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের প্রহরা বসিয়েছিল। তাদের হাতেই নিহত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সাহায্যার্থে এগিয়ে আসা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল উদ্দিন আহমেদ বা কর্নেল জামিল নামে পরিচিত মিলিটারি সেক্রেটারি।

এছাড়া সাভারে ১১জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যকেও নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা বেতার ভবন দখল এবং গণভবনে ১৫ তারিখ থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। কোনো ধরনের আইন, বিধিবিধান, সামরিক-বেসামরিক সৌজন্যতাবোধ তারা তাদের কর্ম ও আচরণে দেখায়নি। এমনকি সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও তারা ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে দ্বিধা করেনি। তাদের আচরণে অনেকেই ক্ষুব্ধ হলেও প্রাণভয়ে কেউ মাথা তুলতে পারেননি। রাষ্ট্রের কোথায় কে কী করবেন, কাকে বসানো হবে, কাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে সবকিছু তারা খন্দকার মোশতাকের মাধ্যমে একের পর এক বাস্তবায়ন করতে থাকে। খন্দকার মোশতাক অসংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদে বসার পেছনে ছিল এসব হত্যাকারী ও ঘাতকদের পূর্বপরিকল্পনা। সংবিধান অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব আপনাআপনি উপরাষ্ট্রপতি তথা সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রতি অর্পিত হওয়ার কথা। খন্দকার মোশতাক কোনো আইনেই রাষ্ট্রপতি পদে বসার কারণ ছিল না।

তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারের অধীন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। সুতরাং তার রাষ্ট্রপতি পদ ছিল দখল করা, কোনোভাবেই সাংবিধানিকভাবে বৈধ পন্থায় নয়। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করে থাকেন যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হওয়ার মানেই হচ্ছে আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া। এটি দুর্জনের কুযুক্তি। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুহত্যার পর সরকার গঠনের কোনো সুযোগ পায়নি। খন্দকার মোশতাক আওয়ামী লীগ করলেও ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যেহেতু তার ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্তি ছিল তাই মোশতাক ছিলেন একজন ষড়যন্ত্রকারী, ঘাতক ও ক্ষমতালোভী ব্যক্তি যিনি বঙ্গবন্ধু কিংবা আওয়ামী লীগের আদর্শের ধারক ছিলেন না।

তিনি যে একজন বিশ্বাসঘাতক, ষড়যন্ত্রকারী এবং ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তি ছিলেন সেটি ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ছিলেন না যে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ক্ষমতায় বসার জন্য আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা ইচ্ছার কোনো বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়েছিল। সেই সুযোগ তখন কারো ছিল না।

সাংবিধানিকভাবে উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্বগ্রহণের পথ যারা রুদ্ধ করেছিল তারা প্রমাণ দিয়েছিল যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশ পরিচালিত হবে তাদের ইচ্ছায়, সংবিধান বা জনপ্রতিনিধিদের কোনো দায়দায়িত্ব রাখার সুযোগ দেয়া হয়নি। সুতরাং ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল বঙ্গবন্ধুর বৈধ সরকারকে সম্পূর্ণরূপে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উচ্ছেদ করে ক্ষমতা নিজেদের ইচ্ছেমতো দখল করা। সেকারণেই ঘাতকরা ১৫ আগস্টের রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে তাদের নরঘাতকদের চরিত্র সম্পূর্ণরূপে উন্মোচন করে সবাইকে হত্যা করেছিল। তারা কাউকেই জীবিত থাকতে দেয়নি- যারা রাষ্ট্র-রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেন।

শুধু তাই নয়, ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তথা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামারুজ্জামানসহ গুরুত্বপূর্ণ সব নেতৃবৃন্দকে প্রথমে গৃহবন্দি করে রাখে, পরে জেলখানায় বিনা অপরাধে আটকে রাখে। তোফায়েল আহমেদসহ কয়েকজনের ওপর শারীরিকভাবে নির্যাতনও করা হয়। খন্দকার মোশতাককে সরকারপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তার অধীনে সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়। যারা তাতে সম্মতি দেননি তাদের জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এখন অনেকে বলার চেষ্টা করেন যে বঙ্গবন্ধুর লাশ ৩২ নম্বরে থাকা অবস্থাতেই আওয়ামী লীগের কিছু নেতা বিকাল ৪টায় মোশতাকের মন্ত্রিসভায় শপথ গ্রহণ করেন। যারা বিষয়টিকে এত সহজভাবে উপস্থাপন করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন তারাও ১৫ আগস্টের ঘাতকদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের সমর্থক, মানসিকভাবে ক্ষমতা-রোগাক্রান্ত, রাজনৈতিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পশ্চাৎ গমনেরই অনুসারী।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিল তারা রাষ্ট্রবিরোধী, মানবতাবিরোধী এবং রাষ্ট্রের সকল প্রকার প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসকারীও ছিল। এদের অপকর্মের কোনো তুলনা হয় না। কোনো স্বাভাবিক সমাজে এমন অপরাধীর বসবাস হতে পারে না। রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী হচ্ছে সেনাবাহিনী। সেই সেনাবাহিনীর অস্ত্র ব্যবহার করে তারা রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানসহ এত সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ মানুষকেই শুধু হত্যা করেনি, রাষ্ট্রক্ষমতা শুধু দখল করেনি, সংবিধানই শুধু লঙ্ঘন করেনি, সেনাবাহিনীকেও তারা একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে নিক্ষেপ করে।

১৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে যেসব বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছিল। তার ফলে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে চেইন অব কমান্ড নষ্ট হয়ে যায়। অসংখ্য সেনা কর্মকর্তা চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে গিয়ে আত্মাহুতি দেন, এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া ঘটে। গোটা সেনাবাহিনী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য মর্যাদায় ফিরে আসতে অনেক সময় নিয়েছিল। এর ফলে সেনাবাহিনী হারিয়ে ছিল অসংখ্য মেধাবী চৌকষ দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাকে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্র রাজনৈতিক হঠকারী মতাদর্শের বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়।

সেনাবাহিনীর জন্য এটি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন একটি পর্ব। যা পার হতে সেনাবাহিনীকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, সময়ও নিয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়। রাজনৈতিক ময়দানে সুবিধাবাদী, ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানি ভাবাদর্শের রাজনীতির উত্থান ঘটে। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানে এবং বৃহত্তর সমাজ ব্যবস্থায়। অথচ এমন এক কলঙ্কজনক এবং ইতিহাসের নির্মম নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের অপরাধকে দায়মুক্তি দেয়ার জন্য খন্দকার মোশতাক ২৬ সেপ্টেম্বর এই অধ্যাদেশ জারি করে যা ছিল অবৈধ, সংবিধানবিরোধী এবং মানবতাবিরোধীও।

সেকারণেই খন্দকার মোশতাক এই অপরাধীদের দ্বারা ২ নভেম্বর দিবাগত রাত তথা ৩ নভেম্বর জেলখানার অভ্যন্তরে ৪ জাতীয় নেতাকে হত্যা করার জন্য জেলের ভেতরে বেয়নেট এবং অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়। এরপরে ১৫ আগস্ট থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড, অবৈধ ক্ষমতা দখল, সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড বিনষ্ট এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এতসব অপরাধ সংগঠনের অপরাধীদের বিনাবিচারে দেশ থেকে চলে যাওয়ার সুযোগ রাষ্ট্রীয়ভাবে করে দেয়া হয়। তাদেরকে বিমানে সপরিবারে ব্যাংককে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।

পৃথিবীর ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন এক অপরাধ সংগঠনের ঘটনা যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সেই সময়কার ক্ষমতা দখলকারী এবং পরবর্তী সময়ে যারা এই অপরাধের উত্তরাধিকারী হন তাদের জন্য। এদেরকে শুধু খন্দকার মোশতাকই নয় সামরিক শাসক জিয়া, সাত্তার, এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া এবং চারদলীয় জোট সরকার বিদেশে দূতাবাসে চাকরি প্রদান, দেশে তাদের শাসনামলে অবাধে আসা-যাওয়া করার সুযোগ দেয়া, রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করারও ঘটনা ঘটেছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা এই সরকারগুলো নেয়নি। অধিকন্তু ১৯৭৯ সালে সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে ২৬ সেপ্টেম্বরের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ৫০ অতিরিক্ত সংযোজনী হিসেবে ৬ এপ্রিল পাস করা হয়। এদের বিচার সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

যারা ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সকল অপরাধ, অপকর্মের সুবিধাভোগী তারা তাদের স্বার্থে খন্দকার মোশতাকের অবৈধ অধ্যাদেশকে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান ও চরিত্রকেই কলঙ্কিত করেছিল। এই কলঙ্ক যারা বহন ও ধারণ করেছে তারা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্মাতা হতে পারে না। তারা এর বিরোধী শক্তি। রাজনীতির এই পাঠ যারা বোঝেন না কিংবা গুলিয়ে ফেলেন তারাও ঘাতকদেরই অনুসারী।

সংবিধানে এমন মানবতাবিরোধী আইন আমাদেরকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বহন করতে হয়েছিল। আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের মাধ্যমে সংবিধানে থাকা মানবতাবিরোধী কালো আইনটি রহিত করার উদ্যোগ নেয়। বিএনপি জামায়াতসহ কয়েকটি দল এর বিরোধিতা করে, সংসদে অনুপস্থিত থাকে। ১২ নভেম্বর সংসদে আইন পাসের দিন তারা হরতাল ডাকে।

তারপরও সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ৫ম সংশোধনীর কালো আইনটি রহিত করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশ এবং এর সংবিধান মুক্তি পায় অপরাধী ও দায়মুক্তির আইন থেকে। এরপরে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলার বিচার শুরু হয়। উচ্চ আদালতের রায়ে কয়েকজনের সাজা কার্যকর করা হয়। কয়েকজন দণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশে পালিয়ে আছে। ইতিহাসে এরা মানবতাবিরোধী অপরাধী, এদের সহযোগীরা রাজনীতিতেও ১৫ আগস্টের হত্যাকারী এবং তাদের অনুসারী হিসেবে চিরকালের জন্য চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

লেখক: অধ্যাপক-গবেষক।

আরও পড়ুন:
করোনা: চীনে ভেজাল টিকা কেলেঙ্কারির হোতা গ্রেপ্তার
গ্লোব বায়োটেকের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন
করোনার টিকা পাবে না গর্ভবতী ও ১৮ বছরের কম বয়সীরা
ভ্যাকসিন নিয়ে যেন বাণিজ্য না হয়: জিএম কাদের
সবচেয়ে কম দামে করোনা ভ্যাকসিন: সালমান এফ রহমান

শেয়ার করুন

কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ

কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ

জিয়া এবং মোশতাক উভয়েই যে বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল কুশীলব ছিল সে যুক্তির পক্ষে যেসব প্রমাণ রয়েছে তার অন্যতম প্রমাণ এই অধ্যাদেশ বা আইন। জিয়া-মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যার অংশীদার না হলে কেন তারা বন্দুকধারী খুনিদের বিচারের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের পুরস্কৃত করেছিল, কেনইবা তাদের উঁচু কূটনৈতিক পদে চাকরি দিয়েছিল? এ প্রশ্নের জবাব নিশ্চয় খুনি জিয়া এবং খুনি মোশতাকের পক্ষে যারা কথা বলার চেষ্টা করে, তাদের কাছে নেই।

বিশ্বের ঘৃণ্যতম কালো কানুনগুলোর অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশের খুনি মোশতাক ও জিয়া প্রণীত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বা আইন। আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সভ্য সমাজের অভ্যুদয়ের পর কোনো দেশে এ ধরনের কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। আর রাষ্ট্রপ্রধান হত্যার ব্যাপারেতো নয়ই।

পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা হয়েছে। যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের অনেকেই ছিলেন মানবিক গুণাগুণের অধিকারী আর তাই মানবতাবিরোধীরাই তাদের হত্যা করেছে।

খ্রিস্ট জন্মের আগে জুলিয়াস সিজারকে হত্যা করেছিল তারই অতি আপনজন ব্রুটাস। রোমান কর্তৃপক্ষের প্রিয়জন হওয়া সত্ত্বেও তার বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ব্রুটাস পালিয়ে যাওয়ায় এবং পরে আত্মহত্যা করায় তার বিচার করা যায়নি। গত দুই শতকে যেসব রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা হয়েছে তার মধ্যে ছিলেন মার্কিন মানবতাবাদী প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন যিনি কৃষ্ণাঙ্গ কৃতদাসদের মুক্ত করার জন্য গৃহযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, আর সে কারণেই তাকে হত্যা করেছিল জন উইলকিস বুথ নামের এক অভিনেতা। ১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল তার সঙ্গে ষড়যন্ত্রে ছিল ৮ জন।

হত্যার পর পরই বুথ পালিয়ে যেতে সক্ষম হওয়ায় তাকে খোঁজার জন্য শুরু হয় দেশব্যাপী অভিযান, ঘোষণা করা হয় তাকে খুঁজে পেতে ১ লাখ ডলার পুরস্কার। তাকে খুঁজে পেলেও সে আত্মহত্যা করার কারণে তারও বিচার সম্ভব হয়নি, তবে তার সঙ্গে যে ৮ জন ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল তাদের বিচার হয় এবং এক মহিলাসহ ৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় লিংকন হত্যা বিচারের জন্য গঠিত মিলিটারি কমিশন।

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি ভারতের অহিংসবাদের নায়ক মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করে হিংসার চরম দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিল নাথুরাম গডসে নামের এক হিংসাবাদী। গান্ধীজি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর বলেছিলেন তার হত্যাকারীকে ক্ষমা করতে। কিন্তু আইনের কঠোর হাত নাথুকে ক্ষমা করেনি, দিয়েছিল মৃত্যুদণ্ড।

পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি জন কেনেডি হত্যারও বিচার হয়েছিল, বিচার হয়েছিল ইন্দিরা, রাজিব হত্যার। তাদের সবার হত্যার পরও সাংবিধানিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়নি, সাংবিধানিক নিয়মেই তাদের উত্তরসূরিদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল। একমাত্র ব্যতিক্রম হয়েছে বাংলাদেশে যেখানে সব খুনি এবং ষড়যন্ত্রকারীদের আইনের হাত থেকে রক্ষা করার অপপ্রয়াস হিসেবে বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতম কুশীলব খুনি মোশতাক প্রথমে ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর খুনিদের রক্ষা করার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বাংলাদেশকে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে এ ধরনের কালো আইনপ্রণেতা দেশের তালিকাভুক্ত করে।

মোশতাক বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি, পারেনি তার উত্তরসূরি বিচারপতি সায়েমও। বঙ্গবন্ধু হত্যার আসল খলনায়ক খুনি জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে, যে কিনা ঘটনার আগে ছিল ক্ষমতার আড়ালে। জিয়া ক্ষমতায় যেয়েও অধ্যাদেশটি বাতিল করেনি বরং এক কদম এগিয়ে সব বন্দুকধারী খুনিদের বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে পদোন্নতিসহ লোভনীয় কূটনৈতিক পদে পদায়ন করে। জিয়ার কাজ সেখানেই শেষ হয়নি, সে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনি মর্যাদা দিয়ে পঞ্চম সংশোধনী আইন প্রণয়ন করে।

তথাকথিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ যে শুধু বন্দুকধারী খুনিদের জন্য রক্ষাকবচ তৈরি করা হয়েছিল, তা নয় এতে সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত সব ষড়যন্ত্রকারীদেরও। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে- ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যারাই বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে বা কোনো ট্রাইব্যুনালে দেওয়ানি বা ফৌজদারি কোনো ধরনের মামলা হবে না, কোনো ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গমূলক মামলা কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষের কাছে করা যাবে না, কোনো সামরিক আদালতে বা কোর্ট মার্শালে বিচার হবে না, কোনো বিভাগীয় বিচার হবে না, কোনো দেওয়ানি মামলাও হবে না।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল সেই দিনের ঘটনাবলির জন্য যারা পরিকল্পনা করেছিল, ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, প্রস্তুতিপর্বে অংশীদার ছিল অথবা কার্যকর করিয়েছিল তাদের সবার জন্যই এই অধ্যাদেশ প্রযোজ্য হবে। অধ্যাদেশের দ্বিতীয় পর্বে খুনিদের নাম উল্লেখ করা হয়। অধ্যাদেশের ভাষা থেকে এটি পরিষ্কার যে, শুধু বন্দুকধারী খুনিরাই নয়, এই অধ্যাদেশ দ্বারা রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে সব ষড়যন্ত্রকারী, নীলনকশাকারী, পরিকল্পনাকারী এবং সেগুলো বাস্তবায়নে যাদের ভূমিকা ছিল। এ ধরনের আইন করে বাংলাদেশকে প্রবেশ করানো হয়েছিল বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারক দেশে আর এ কারণে খুনি এবং ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার ২১ বছর বিলম্বিত হয়।

জিয়া এবং মোশতাক উভয়েই যে বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল কুশীলব ছিল সে যুক্তির পক্ষে যেসব প্রমাণ রয়েছে তার অন্যতম প্রমাণ এই অধ্যাদেশ বা আইন। জিয়া-মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যার অংশীদার না হলে কেন তারা বন্দুকধারী খুনিদের বিচারের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের পুরস্কৃত করেছিল, কেনইবা তাদের উঁচু কূটনৈতিক পদে চাকরি দিয়েছিল? এ প্রশ্নের জবাব নিশ্চয় খুনি জিয়া এবং খুনি মোশতাকের পক্ষে যারা কথা বলার চেষ্টা করে, তাদের কাছে নেই। জিয়া তথাকথিত রাষ্ট্রপতি পদটি জবরদখল করার পর ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি আরও পাকাপোক্ত করার জন্য সেটিকে আইনে রূপান্তরিত করেছিল। জিয়া তার পঞ্চম সংশোধনী আইনের মাধ্যমে (যে আইনকে পরবর্তীকালে সুপ্রিমকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন) এই কালো আইনকে সংবিধানের অংশে পরিণত করার অপচেষ্টা করেছিল, যা ধোপে টেকেনি।

পরবর্তীতেকালে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেশকে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল তার অন্যতমটি ছিল ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু এবং জেল হত্যার বিচারের পথ খুলে দেয়া, সেই উদ্দেশ্যেই আওয়ামী লীগ সরকারের সে সময়ের আইনমন্ত্রী, প্রয়াত অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু সংসদে ইনডেমনিটি আইন বাতিলের জন্য বিল উত্থাপন করলে তা ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়, বাতিল হয়ে যায় কলঙ্কিত ইনডেমনিটি আইন। আইনটি বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দুজন খুনি হাইকোর্টে রিট করলে মহামান্য হাইকোর্ট ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন এই মর্মে রায় দেন যে, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বা আইন কখনও বৈধ ছিল না, যার অর্থ এই যে, এগুলো শুরু থেকেই অচল, অপ্রয়োগযোগ্য ছিল।

উল্লেখযোগ্য যে আইনটি বাতিল করে সংসদে আইন পাস হওয়ার কয়েকদিন আগেই লালবাগ থানায় বঙ্গবন্ধু হত্যার এজাহার দায়ের করা হয়েছিল। এটিও উল্লেখযোগ্য যে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের দিনই ধানমন্ডি থানায় এজাহার দায়ের করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু থানা পুলিশ এই বলে মামলা ফিরিয়ে দিয়েছিল যে “আপনারাও বাঁচেন, আমাদেরও বাঁচতে দেন। এই মামলা করলে আমাদের সকলের কল্লা যাবে।”

অধ্যাদেশ বা আইনটি রহিত করার পরে বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং জেল হত্যামামলা চালানো সম্ভব হয়, দেশ বেঁচে যায় বিচারহীনতার কলঙ্কময় অধ্যায় থেকে। এরপর বন্দুকধারী খুনিদের বিচার হয়েছিল বটে কিন্তু পেছনের খলনায়কদের অর্থাৎ যারা পরিকল্পনায়, নীলনকশা প্রণয়ন, ষড়যন্ত্র এবং ষড়যন্ত্র কার্যকর করার ব্যাপারে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিল তাদের মৃত্যুজনিত কারণে বিচার হলো না। আরও কয়েকজন রয়ে গেছে আইনের আওতার বাইরে এবং তাই আজকের গণদাবি এসব কুশীলবদেরও মুখোশ উন্মোচন করার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী কমিশন।

লেখক: আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।

আরও পড়ুন:
করোনা: চীনে ভেজাল টিকা কেলেঙ্কারির হোতা গ্রেপ্তার
গ্লোব বায়োটেকের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন
করোনার টিকা পাবে না গর্ভবতী ও ১৮ বছরের কম বয়সীরা
ভ্যাকসিন নিয়ে যেন বাণিজ্য না হয়: জিএম কাদের
সবচেয়ে কম দামে করোনা ভ্যাকসিন: সালমান এফ রহমান

শেয়ার করুন

২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় তখন কেবল তিনি একটু একটু করে ঠাঁই নিতে শুরু করেছেন। তিনি তখন রাষ্ট্রপ্রধান তো পরের কথা, মন্ত্রীও ছিলেন না। ছিলেন না দাপুটে জাঁদরেল কেউকেটা। কিন্তু বাংলা ছিল তাঁর হৃদয়জুড়ে। আর সে কারণেই যখন তিনি বাংলাদেশের শীর্ষনেতা হলেন, বাঙালির জাতির পিতা হয়ে যোগ দিলেন জাতিসংঘের অধিবেশনে, তখনও তার হৃদয়জুড়ে ছিল কেবল বাংলা। বাংলা ভাষাকে তিনি জাতিসংঘের মাধ্যমে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিলেন বিশ্বদরবারে।

১৯৪৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের কৃষ্ণনগরে এক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ওই অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানের পরদিন নৌকায় করে আশুগঞ্জ রওনা দিয়েছিলেন তারা। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-

“... নদীতে বসে আব্বাসউদ্দিন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তাঁর নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটা দিক অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, নদীর ঢেউগুলিও যেন তাঁর গান শুনছে।... তিনি আমাকে বলেছিলেন, “মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালবাস, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।” আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্টা করেছিলাম।” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)

বঙ্গবন্ধু এমন মানুষ, যিনি কথা রাখেন। বাঙালিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দেয়ার কথা রেখেছিলেন। তেমনি আব্বাসউদ্দিনকে দেয়া কথাও রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলা ভাষাকে উপস্থাপন করেছিলেন গর্বিত মস্তকে। আজ সেই ঐতিহাসিক দিন।

আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। বাংলাই এখন পর্যন্ত দুনিয়ার একমাত্র ভাষা, যে ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে প্রাণও দিয়েছে বাঙালি। এটা বাঙালি হিসেবে আমাদের গর্ব। কিন্তু এই গর্বের স্তম্ভটাকে যে আরও উঁচুতে তুলে ধরার বেলায় আর বাঙালিদের পাওয়া যায় না। রক্তের বিনিময়ে বাঙালি ভাষা ও দেশ অর্জন করেছে ঠিকই, কিন্তু সেখানেই তৃপ্তির ঢেকুরও তুলেছে।

বিশ্বদরবারে বাঙালিদের অনেক অর্জন আছে। রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাময় নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তিও। এ যাবৎ তিন বাঙালি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিকে অমর্ত্য সেন এবং ২০০৬ সালে শান্তিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রথম নোবেল বিজয়ী বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার আনার জন্য সুইডেনে যাননি।

পরের দুই বাঙালি নোবেল পুরস্কার আনার জন্য সুইডেন গিয়েছিলেন এবং বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার গ্রহণ করার সময় বক্তৃতাও করেছেন। এই দুই বাঙালি যে ‘নোবেল স্পিচ’ দিয়েছিলেন, তাতে তাদের পরিচয়টা কোথায়? তারা কোন ভাষার মানুষ? তাদের বক্তৃতার ভাষায় তাদের আত্মপরিচয় ছিল না। অমর্ত্য সেন পুরো বক্তৃতাটাই করেছেন ইংরেজিতে। আর মুহাম্মদ ইউনূস তার নোবেল বক্তৃতার ৩৫ মিনিটের মধ্যে মাত্র দেড় মিনিট মানে নব্বই সেকেন্ডের জন্য বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে বাংলা ভাষাকে ‘দয়া’ করেছিলেন!

যদিও ইদানিং ‘মডিফাই বাঙালি’রা তাদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করান, নিজেরা ইংরেজিতে কথা বলেন। যেন ইংরেজিতে কথা বলাটাই ‘স্ট্যাটাস’ রক্ষা করার একমাত্র উপায়। নিজেকে জাহির করার জন্যও তারা অনর্গল ইংরেজিতে বকরবকর করতে থাকেন।

প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ইংরেজি ‘টক’ করে তারা কাকে হেয় করেন? তাদের জাতিভাই আরেক বাঙালিকে? নাকি নিজের ভাষাকে? আসলে তারা নিজেকেই হেয় করেন। নিজের জাতিভাইকে হেয় করা মানে তো নিজেকেই হেয় করা। আর নিজের ভাষাকে হেয় করা মানে... সবসময় সবটা বুঝিয়ে বলা লাগে না।

যাহোক। দুনিয়ায় সম্ভবত একমাত্র জাতি আমরাই, যারা মাতৃভাষায় কথা বলতে গেলে হীনম্মন্যতায় ভুগি। নিজেদের কখনও ‘রাজা’ ভাবতে পারি না। সবসময় অদৃশ্য একটা দাসত্বের শিকল পরে থাকি। সেটা ভাষারই হোক বা সংস্কৃতিরই হোক। নিজেকে ‘রাজা’ ভাবতে পারে কজন? বিশেষ করে জাতিসংঘের মতো দুনিয়ার সর্ববৃহৎ আর্ন্তজাতিক সংগঠনের আর্ন্তজাতিক অনুষ্ঠানে ‘রাজা’ হিসেবেই বাঙালি জাতির প্রতিনিধিত্ব করেছেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে বাংলাকে দিয়েছেন অপরিসীম মর্যাদা। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ছয়টি। এর মধ্যে বাংলা নেই। সেদিন সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেছিলেন ইংরেজিতে বক্তৃতা করার জন্য। বঙ্গবন্ধু বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘মাননীয় সভাপতি, আমি আমার মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’

বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে অধিবেশনের সভাপতি তাকে বাংলায় বক্তব্য দেয়ার অনুমতি দেন। অথচ অবাক করা বিষয় হচ্ছে, বাংলায় বঙ্গবন্ধুর দেয়া এই ভাষণের মাত্র আটদিন আগে ১৯৭৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ১৩৬তম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের অর্ন্তভুক্ত হয় বাংলাদেশ। তার ওপর ইংরেজিতে ভাষণ দেয়ার জন্য তার ওপর চাপও ছিল। কিন্তু তিনি যে বাঙালি জাতির পিতা। তিনি কোনো চাপের কাছে কখনও মাথা নোয়াননি। ভাষার বেলায় আপস করবেন কেন?

হয়ত অনেকে বলতে পারেন, তিনি তো বাঙালির একছত্র নেতা। স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। বাঙালি হৃদয়েও তার নিরঙ্কুশ সমর্থন। তিনি বাংলায় ভাষণ দেয়ার দুঃসাহস দেখাতেই পারেন। এ আর এমন কী! তাহলে একটু পিছনের দিকে যাওয়া যাক। যাওয়া যাক আরও বাইশ বছর আগে।

১৯৫২ সালে চীনের রাজধানী পিকিঙে (বর্তমানে বেইজিং) শান্তি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সেই শান্তি সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সাঁইত্রিশ দেশের তিনশ আটাত্তর প্রতিনিধি। স্বাভাবিকভাবে শেখ মুজিব তখন পাকিস্তানের প্রতিনিধি ছিলেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু জানিয়েছেন-

“... পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও অনেকেই বক্তৃতা করলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম। আতাউর রহমান সাহেব ইংরেজি করে দিলেন। ইংরেজি থেকে চীনা, রুশ ও স্পেনিশ ভাষায় প্রতিনিধিরা শুনবেন। কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না? ভারত থেকে মনোজ বসু বাংলায় বক্তৃতা করেছেন। পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে জানে না এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ায় অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য। আমার বক্তৃতার পর মনোজ বসু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ভাই মুজিব, আজ আমরা দুই দেশের লোক, কিন্তু আমাদের ভাষাকে ভাগ করতে কেউ পারে নাই। আর পারবেও না। তোমরা বাংলা ভাষাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছ, আমরা বাংলা ভাষাভাষী ভারতবর্ষের লোকেরাও তার জন্য গর্ব অনুভব করি।”

‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইতে বঙ্গবন্ধু বিষয়টাকে আরেকটু খোলাসা করেছেন।

“... আমি বক্তৃতা করলাম বাংলা ভাষায়, আর ভারত থেকে বক্তৃতা করলেন মনোজ বসু বাংলা ভাষায়।

বাংলা আমার মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় বক্তৃতা করাই উচিত। কারণ পূর্ব বাংলার ভাষা-আন্দোলনের কথা দুনিয়ার সকল দেশের লোকই কিছু কিছু জানে। মানিক ভাই, আতাউর রহমান খান ও ইলিয়াস বক্তৃতাটা ঠিক করে দিয়েছিল। দুনিয়ার সকল দেশের লোকই যার যার মাতৃভাষায় বক্তৃতা করে। শুধু আমরাই ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করে নিজেদের গর্বিত মনে করি।

... অনেকেই আমাদের জিজ্ঞাসা করলো, ভারত থেকে একজন বাংলায় বক্তৃতা করলেন, আর পাকিস্তান থেকেও একজন বক্তৃতা করলেন, ব্যাপার কী! আমি বললাম, বাংলাদেশ ভাগ হয়ে একভাগ ভারত আর একভাগ পাকিস্তানে পড়েছে। বাংলা ভাষা যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষা এ অনেকেই জানে। ঠাকুর দুনিয়ায় ‘ট্যাগোর’ নামে পরিচিত। যথেষ্ট সম্মান দুনিয়ার লোক তাঁকে করে। আমি বললাম, পাকিস্তানের শতকরা ৫৫ জন লোক এই ভাষায় কথা বলে। এবং দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ভাষার অন্যতম ভাষা বাংলা। আমি দেখেছি ম্যাডাম সান ইয়াৎ-সেন খুব ভালো ইংরেজি জানেন, কিন্তু তিনি বক্তৃতা করলেন চীনা ভাষায়। একটা ইংরেজি অক্ষরও তিনি ব্যবহার করেন নাই।

চীনে অনেক লোকের সাথে আমার আলাপ হয়েছে, অনেকেই ইংরেজি জানেন, কিন্তু ইংরেজিতে কথা বলবেন না। দোভাষীর মাধ্যমে কথা বলবেন। আমরা নানকিং বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে যাই। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ইংরেজি জানেন, কিন্তু আমাদের অভ্যর্থনা করলেন চীনা ভাষায়। দোভাষী আমাদের বুঝাইয়া দিলো। দেখলাম তিনি মাঝে মাঝে এবং আস্তে আস্তে তাকে ঠিক করে দিচ্ছেন যেখানে ইংরেজি ভুল হচ্ছে। একেই বলে জাতীয়তাবোধ। একেই বলে দেশের ও মাতৃভাষার উপরে দরদ।”

(সূত্র: আমার দেখা নয়াচীন- শেখ মুজিবুর রহমান। পৃষ্ঠা ৪৩-৪৪)

মাতৃভাষার প্রতি বঙ্গবন্ধুর দরদের কথা কে না জানে! বাংলাকে মাতৃভাষা করার আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন সেই ১৯৪৮ সালেই। জেলও খেটেছিলেন। তখন তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। তারপর ১৯৫২ সালে যখন চীনের শান্তি সম্মেলনে গিয়ে বাংলায় বক্তৃতা করলেন, তখনও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রভাব এত বিশাল ছিল না। বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় তখন কেবল তিনি একটু একটু করে ঠাঁই নিতে শুরু করেছেন। তিনি তখন রাষ্ট্রপ্রধান তো পরের কথা, মন্ত্রীও ছিলেন না। ছিলেন না দাপুটে জাঁদরেল কেউকেটা। কিন্তু বাংলা ছিল তাঁর হৃদয়জুড়ে। আর সে কারণেই যখন তিনি বাংলাদেশের শীর্ষনেতা হলেন, বাঙালির জাতির পিতা হয়ে যোগ দিলেন জাতিসংঘের অধিবেশনে, তখনও তার হৃদয়জুড়ে ছিল কেবল বাংলা।

বাংলা ভাষাকে তিনি জাতিসংঘের মাধ্যমে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিলেন বিশ্বদরবারে। এ যোগ্যতা সত্যিকারের ‘রাজা’র পক্ষেই সম্ভব। নইলে তার পরে বাংলাদেশের আরও অনেক শীর্ষনেতাও তো জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন। তারা তো কেউ বাংলায় ভাষণ দেননি! নিজভাষা নিয়ে ওইসব রাষ্ট্রনায়করা নিজেরাই যখন হীনম্মন্যতায় ভুগছিলেন, কিংবা তাদের কাছে মাতৃভাষার চেয়ে ইংরেজি ভাষা প্রাধান্য পেয়েছিল, সেই তারা জাতিকে যে কেমন নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটা এই বাংলাভাষা বিমুখতা থেকেই বোঝা যায়।

১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলা ভাষার যে গৌরব প্রতিষ্ঠা করেন, সে গৌরব অব্যাহত রেখে চলেছেন তারই সুযোগ্য উত্তরসূরি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বরাবরের মতো বিগত কয়েকবছর ধরে জাতিসংঘের বিভিন্ন অধিবেশনে বাংলাতেই ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন। মাতৃভাষার এমন অধিকার প্রতিষ্ঠা করায় বাঙালি হিসেবে তাদের প্রতি আজীবনের কৃতজ্ঞতা।

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় দেয়া ভাষণের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে যুক্তরাজ্যের নিউইয়র্ক রাজ্যে প্রতিবছর ২৫ সেপ্টেম্বর পালিত হয় ‘বাংলাদেশি ইমিগ্রান্ট ডে’ বা ‘বাংলাদেশি অভিবাসী দিবস’ হিসেবে। ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি স্টেট সিনেট অধিবেশনে বিলটি পাস হয় ও স্টেট ক্যালেন্ডারে দিবসটি অর্ন্তভুক্ত করা হয়।

তথ্যসূত্র:

অসমাপ্ত আত্মজীবনী- শেখ মুজিবুর রহমান

আমার দেখা নয়াচীন- শেখ মুজিবুর রহমান

dhakatribune.com/bangladesh/2021/09/17/bangladeshi-immigrant-day-to-be-observed-in-new-york-on-september-25

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
করোনা: চীনে ভেজাল টিকা কেলেঙ্কারির হোতা গ্রেপ্তার
গ্লোব বায়োটেকের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন
করোনার টিকা পাবে না গর্ভবতী ও ১৮ বছরের কম বয়সীরা
ভ্যাকসিন নিয়ে যেন বাণিজ্য না হয়: জিএম কাদের
সবচেয়ে কম দামে করোনা ভ্যাকসিন: সালমান এফ রহমান

শেয়ার করুন

জাতিসংঘে বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা

জাতিসংঘে বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সে ভাষণের ঐতিহাসিক তাৎপর্য আলোচনার আগে আরও একটি তথ্য অনিবার্যভাবে আসে, তা-হলো তার সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও জাতিসংঘে বাংলাদেশকে গৌরবময় ভূমিকায় উপস্থাপন। তার ধারাবাহিক নেতৃত্ব বাংলাদেশকে যে বহির্বিশ্বে উন্নত থেকে উন্নততর মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করছে, জাতিসংঘের নানামাত্রিক সম্মাননা ও স্বীকৃতিতে সে বাস্তবতাই দেদীপ্যমান করে তুলেছে।

বছর ঘুরে এই দিনটি (২৫ সেপ্টেম্বর) এলেই স্মৃতিতে জেগে ওঠে এদেশের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। জাতিসংঘে ভাষণ দিচ্ছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সে ভাষণ মাতৃভাষা বাংলায়। রবীন্দ্রনাথের নোবেল বিজয়ের ৬১ বছর পর বাংলা ভাষা আরেকবার সম্মানিত হলো বিশ্ব সামাজে এবং তা বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মধ্য দিয়ে।

সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ, নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দেশের পুনর্গঠন আর বিশ্ব সমাজে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য বঙ্গবন্ধু দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পর পর দুবছর পাকিস্তানের বিরোধিতা এবং চীনের ভেটোর কারণে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ।

অবশেষে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী কূটনৈতিক চেষ্টায় ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সদস্যপদ লাভ করে বাংলাদেশ। এর ঠিক এক সপ্তাহ পরে জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। নানা কারণে সে ভাষণ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের উদার মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, অপরদিকে মানব সভ্যতার কল্যাণে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের জন্য বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহ্বান।

বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর দুঃখ-দুর্দশা মোচনের জন্য জাতিসংঘকে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বঙ্গবন্ধুর আহবান সারা পৃথিবীতে প্রশংসিত হয়েছিল। সেসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছিল বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর টিকে থাকার সংগ্রামে শক্তি, সাহস ও আত্মপ্রত্যয়ের দৃঢ় চেতনা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সে ভাষণের ঐতিহাসিক তাৎপর্য আলোচনার আগে আরও একটি তথ্য অনিবার্যভাবে আসে, তা-হলো তার সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও জাতিসংঘে বাংলাদেশকে গৌরবময় ভূমিকায় উপস্থাপন। তার ধারাবাহিক নেতৃত্ব বাংলাদেশকে যে বহির্বিশ্বে উন্নত থেকে উন্নততর মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করছে, জাতিসংঘের নানামাত্রিক সম্মাননা ও স্বীকৃতিতে সে বাস্তবতাই দেদীপ্যমান করে তুলেছে। গতকাল শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদে পিতার মতোই প্রিয় মাতৃভাষা বাংলায় সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী।

মহামারির এ সময়ে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব মানুষের টিকাপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ভূমিকা গ্রহণ, বিশ্বের জলবায়ু বিপর্যয় রোধে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের আহ্বানসহ গুরুত্বপূর্ণ কটি দফা তিনি উপস্থাপন করেছেন। এজন্য দেশ-বিদেশে ইতোমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা দীর্ঘ ৪৭ বছরের ব্যবধানে জাতিসংঘে বাংলাদেশ আজ এক মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে মহিমান্বিত। যে বিশ্ববাস্তবতায় ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে ভাষণ দেন, সেসময়ের অনেক বিবর্তন ঘটেছে কিন্তু এত বছর পরেও তার সে ভাষণের তাৎপর্য এতটুকু ম্লান হয়নি।

তিনি নামিবিয়াসহ স্বাধীনতা সংগ্রামে নিয়োজিত বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে তার অবস্থান তুলে ধরেন স্পষ্ট ভাষায়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিরসন, বর্ণবাদ, দারিদ্র্য, বেকারত্ব নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, আবহাওয়া ও জলবায়ু বিপর্যয় রোধে সম্মিলিত প্রয়াস এর ওপর গুরুত্বারোপ করে যে বক্তৃতা করেছিলেন, এর আবেদন এখনও ফুরিয়ে যায়নি। কারণ এই সমস্যাগুলো ৪৭ বছর পরও বৈষম্যপীড়িত পৃথিবীতে রয়ে গেছে।

বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের তাৎপর্য যেমন শাশ্বত, তেমন বাংলা ভাষায় প্রথম জাতিসংঘে বক্তৃতা করার ঘটনাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা ও জন্মভূমির প্রতি তার যে তীব্র অনুরাগ এর কোনো তুলনা নেই। সত্য বটে রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলি কাব্যের জন্য ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, কিন্তু নোবেল ভাষণ দিয়েছিলেন ইংরেজিতে। পরবর্তীকালে যে দুজন বাঙালি নোবেল পুরস্কার পায় তাদের একজন ড. অমর্ত্য সেন, আরেকজন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তারা কেউ নোবেল ভাষণ মাতৃভাষা বাংলায় দেয়নি। বক্তৃতা করে ইংরেজিতে। শুধু বঙ্গবন্ধুই ব্যতিক্রম।

বঙ্গবন্ধুকে প্রথমে অনুরোধ করা হয় ইংরেজিতে বক্তৃতা করার জন্য- ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন।’ বঙ্গবন্ধু সবিনয়ে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন-‘আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’

বক্তৃতার শুরুতেই বললেন-

“মাননীয় সভাপতি, আজ এই মহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সাথে আমি এইজন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগীদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাতকোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশের মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়া বাঁচার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাহারা বিশ্বের সকল জাতির সঙ্গে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়া বাস করিবার জন্যে আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত রহিয়াছে, আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন। আমি জানি শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের উপযোগী একটি বিশ্ব গড়িয়া তুলিবার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের এই অঙ্গীকারের সহিত শহীদানের বিদেহী আত্মাও মিলিত হইবেন।”

ওই বক্তৃতায় প্রয়োজনীয় কোনো দিক তিনি বাদ রাখেননি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তির সংগ্রামে যেসব দেশ সমর্থন দেয়, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন-

“যাহাদের ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ বিশ্ব-সমাজে স্থান লাভ করিয়াছে, এই সুযোগে আমি তাহাদেরকে অভিনন্দন জানাই। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সমর্থনকারী সকল দেশ ও জনগণের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ছিল শান্তির জন্য সংগ্রাম, জাতিসংঘ গত ২৫ বছর ধরে এই শান্তির জন্য সংগ্রাম করিয়া যাইতেছে।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি ওই বক্তৃতায় জনগণের অধিকার কেড়ে নেয়ার ক্ষেত্রে দেশে দেশে সেনাবাহিনী ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানান এবং বাংলাদেশসহ চারটি দেশ আলজেরিয়া, গিনিবিসাউ এবং ভিয়েতনামের নাম উল্লেখ করে বললেন- “এই দেশগুলি অপশক্তির বিরুদ্ধে বিরাট বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।”

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে ফিলিস্তিন, জাম্বিয়া, নামিবিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গেও একাত্মতা ঘোষণা করেন। বিশ্বের শোষিত-বঞ্চিত, দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তার ভাষণে।

ওই সময় বন্যায় বিপর্যস্ত হয়েছিল বাংলাদেশ। দুর্গত মানুষের সহায়তার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু একটি অসামান্য কথা বলেন। তার বক্তব্য ছিল আমাদের মতো জাতিসমূহ- যাদের অভ্যুদয় সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে, তাদের অদম্য মানবীয় শক্তি রয়েছে।

তিনি বলেন- “আমাদের কষ্ট করতে হতে পারে কিন্তু আমাদের ধ্বংস নাই।”

দুরূহ বাধা অতিক্রমের অদম্য শক্তির প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল দৃঢ় বিশ্বাস। বিশ্বের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এবং সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি দেখে বিহ্বল হয়ে পড়েন তিনি। জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান মানুষের দুঃখ দুর্দশা লাঘবে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের জন্য।

এর আগের বছর আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ দেশগুলোর সম্মেলনেও দরিদ্র ও লড়াকু দেশগুলোর মানুষের সে অদম্য শক্তির কথা তিনি বলেন। বলেন দ্বিধা-বিভক্ত পৃথিবীর বৈষম্যের কথাও। শোষক ও শোষিতে বিভক্ত পৃথিবীতে তিনি নিজেকে সুস্পষ্টভাবে শোষিতের পক্ষে ঘোষণা করেছিলেন এবং সে কারণে প্রচলিত পথ ছেড়ে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দিকে যাচ্ছিলেন।

১৯৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বরের ভাষণই জাতিসংঘে তার প্রথম এবং শেষ ভাষণ। পরের বছর সেপ্টেম্বর আসার আগেই তিনি সপরিবারে নিহত হন।

কিন্তু দারিদ্র্য ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ, আঞ্চলিক অখণ্ডতা আর সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বিশ্বসমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার অনন্য ভাষ্যকার হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আমাদের সঙ্গে বিশ্ববাসীকেও অনুপ্রাণিত করবে যুগ যুগ ধরে। বিশ্বসমাজও আজ তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।

২০১৯ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের উদ্যোগে ১৫ আগস্ট জাতিসংঘ ভবনে বঙ্গবন্ধুর স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও অংশগ্রহণ করে। অত্যাচারিত, নিপীড়িত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামকে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য উদাহরণস্বরূপ বলে মন্তব্য করে এবং বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ব মানবের মুক্তির দূত হিসেবে বিশ্ববন্ধু বা ‘ফ্রেন্ডস অব দ্যা ওয়ার্ল্ড’ বিশেষণে ভূষিত করে।

আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা তার দেখানো পথে বিশ্বনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ১৯৯৬ থেকে (২০০১-২০০৮ সাল ছাড়া) বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে তিনি সব সময় জাতির পিতার মতোই বাংলায় ভাষণ দেন। বাংলা ভাষা ও বাঙালির প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে গভীর ভালোবাসা সে প্রতিধ্বনিই যেন শুনি তার সুযোগ্য কন্যার কণ্ঠে।

জাতিসংঘে নানাক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ সম্মান এবং মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। দারিদ্র্য মোচনের ক্ষেত্রে দ্রুত গতিতে অগ্রসর বাংলাদেশ। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুহার কমিয়ে রয়েছে নেতৃত্বের আসনে। বিশ্ব পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যে নেতৃত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন, তাতে তিনি বিশ্বনেতার সম্মান অর্জন করেন, এজন্য তাকে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ’ সম্মাননায় ভূষিত করে জাতিসংঘ।

এবারসহ ১৭ বার জাতিসংঘে ভাষণ দেন তিনি। বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ, দারিদ্র্য বিমোচন, পরিবেশ বিপর্যয় রোধ, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা নেতৃত্বস্থানীয়।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুর সমাধান, বিশ্বব্যাপী শরণার্থী মানুষের দুঃখ দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে তা মোচনের জন্য অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এ বছর জাতিসংঘ তাকে ‘ক্রাউন জুয়েল’ বা মুকুটমণি অভিধায় ভূষিত করে। বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন।

বিশ্বের গোলযোগপূর্ণ দেশগুলোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ যে অসামান্য ভূমিকা পালন করছে, সে শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যেমন গৌরবের, দেশের জন্য তেমনি অসামান্য অর্জন।

১৯৭৪ থেকে ২০২১ সাল- এ দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে যেতে যেভাবে ধাপে ধাপে গৌরবের সোপান অতিক্রম করছে, তাতে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের গর্বিত হওয়ার কথা।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক পরিচালক (বার্তা) বাংলাদেশ টেলিভিশন।

আরও পড়ুন:
করোনা: চীনে ভেজাল টিকা কেলেঙ্কারির হোতা গ্রেপ্তার
গ্লোব বায়োটেকের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন
করোনার টিকা পাবে না গর্ভবতী ও ১৮ বছরের কম বয়সীরা
ভ্যাকসিন নিয়ে যেন বাণিজ্য না হয়: জিএম কাদের
সবচেয়ে কম দামে করোনা ভ্যাকসিন: সালমান এফ রহমান

শেয়ার করুন

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষণ: ভাষার বিশ্বকরণ

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষণ: ভাষার বিশ্বকরণ

জাতিসংঘের সেক্রেটারিয়েট থেকে ইংরেজিতে ভাষণ দেয়ার কথা বলা হলে বঙ্গবন্ধু আগেই জানিয়ে দেন, তিনি বাংলায় ভাষণ দেবেন। মাতৃভাষার প্রতি দরদ ও মমত্ববোধ থেকে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও মুক্তি সংগ্রামে সমর্থনকারী দেশ ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ছিল শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মিলিত সংগ্রাম।”

আজ ২৫ সেপ্টেম্বর, বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গৌরবময় দিন। ১৯৭৪ সালে এ দিনে আমাদের মহান নেতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সর্বপ্রথম বাংলায় ভাষণ দেন। আর এ ভাষণের মাধ্যমে তিনি আমাদের সত্ত্বা ও আত্মমর্যাদাকে বিকশিত করেছিলেন বিশ্বদরবারে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাভাষা পেয়েছিল এক নতুন রূপ।

তিনি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। এর আগে মাতৃভাষায় এমন তেজোদীপ্ত ভাষণ কখনও কেউ দিতে পারেনি। এটিই ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ দরবারে জাতির পিতার প্রথম ও শেষ ভাষণ।

এ নিয়ে তিনি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে লিখেছেন-

“আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম।… কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না?… পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ায় অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য।” নিজের কর্তব্যবোধ সম্পর্কে সদাজাগ্রত বঙ্গবন্ধু মাতৃভাষায় বক্তৃতা দেয়ার সিদ্ধান্তটি আগেই নিয়েছিলেন।

বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের বয়ানে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর বাংলা বক্তৃতার ইংরেজি ভাষান্তর করার গুরু দায়িত্বটি অর্পিত হয়েছিল ফারুক চৌধুরীর (প্রয়াত) ওপর। তিনি ছিলেন লন্ডনে বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার। ছুটিতে দেশে এসেছেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ, ‘ফারুক, তোমার ছুটি নাই। তোমাকে এখানে কাজ করতে হবে।’ কাজগুলো হচ্ছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর আসন্ন বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ এবং বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণে বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে প্রতিনিধি দল নিয়ে বার্মায় গমন। বার্মা থেকে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু ফারুক চৌধুরীকে ডেকে বলেছিলেন, ‘তোমার লন্ডন যাওয়া চলবে না। তুমি আমার সঙ্গে নিউইয়র্ক যাবে এবং জাতিসংঘে আমি বাংলায় যে বক্তৃতাটি করব, তাৎক্ষণিকভাবে তুমি সেই বক্তৃতার ইংরেজি ভাষান্তর করবে।’

একথা শুনে ফারুক চৌধুরী একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তখন পরিস্থিতি সহজ করতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘রিহার্সাল দাও। বক্তৃতা ভাষান্তরের সময় ভাববে যেন তুমিই প্রধানমন্ত্রী। তবে পরে কিন্তু তা ভুলে যেও।’

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে এটি ছিল বঙ্গবন্ধুর বড় সাফল্য। বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ও সদস্যপদ অর্জনে জাতির পিতার নিরলস কূটনৈতিক চেষ্টা ও সাফল্যগাথা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এর মাত্র ৮ দিন পর ২৫ সেপ্টেম্বর তৈরি হয় আরও একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বাংলায় যে যুগান্তকারী ভাষণটি দেন সেটি ছিল বিশ্বের বঞ্চিত, নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বশান্তির জন্য বলিষ্ঠ উচ্চারণ।

জাতিসংঘের সেক্রেটারিয়েট থেকে ইংরেজিতে ভাষণ দেয়ার কথা বলা হলে বঙ্গবন্ধু আগেই জানিয়ে দেন, তিনি বাংলায় ভাষণ দেবেন। মাতৃভাষার প্রতি দরদ ও মমত্ববোধ থেকে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও মুক্তি সংগ্রামে সমর্থনকারী দেশ ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ছিল শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মিলিত সংগ্রাম।”

তিনি জাতিসংঘের আদর্শ, শান্তি ও ন্যায়বিচারের বাণীর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বাংলার লাখও শহিদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণপূর্বক বিশ্বশান্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানান। জাতির পিতা তার ভাষণে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার লাখ লাখ মুক্তিকামী মানুষের লড়াই ও ত্যাগের উদাহরণ টেনে বলেন, অন্যায় এখনও চলছে এবং বর্ণবাদও পূর্ণমাত্রায় বিলুপ্ত হয়নি। জনগণের ন্যায়সংগত অধিকার ও বর্ণবাদের অবসান ঘটাতে নতুন বিশ্বব্যবস্থার আহ্বান জানান তিনি। ফিলিস্তিন, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও মুক্তিসংগ্রামের কথাও বলেন।

বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্যে একদিকে বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন, অপরদিকে ক্ষুধায় আক্রান্ত দেশগুলোর জন্য জরুরি সহায়তার কথাও বলেছেন। তিনি অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে প্রতিটি মানুষের জন্য সুখী ও শ্রদ্ধাশীল জীবন নিশ্চয়তার তাগিদ দেন। অনাহার, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধভাবে ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান। যে ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের সমস্ত সম্পদ ও প্রযুক্তিজ্ঞানের যথাযথ বণ্টনের মাধ্যমে একটি জাতির কল্যাণের দ্বার উন্মুক্ত হবে, যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি সুখী ও সম্মানজনক জীবনের ন্যূনতম নিশ্চয়তা পাবে। তিনি বলেছেন, “আমি জীবনকে ভালোবাসি তবে আমি মানুষের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করতে ভয় পাই না।”

সেই ঐতিহাসিক ক্ষণের স্মৃতি থেকে একাধিক বিশিষ্টজনের লেখায় জানা যায়, জাতিসংঘ অধিবেশনে সচরাচর সবাই উপস্থিত থাকে না। অনেক চেয়ার খালি পড়ে থাকে। কিন্তু ওইদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সময় অধিবেশন কক্ষ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। গ্যালারিগুলোতেও ছিল অভিন্ন চিত্র। কারণ শেখ মুজিবুর রহমান তখন কেবল একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী নন। বরং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া একটি নতুন দেশের স্থপতি। সারাবিশ্বে আলোচিত তিনি। তাই সবাই এই নেতাকে দেখার জন্য, বক্তৃতা শোনার জন্য অধিবেশনে যোগ দিয়েছিল।

নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৪টায় তাকে বক্তৃতার জন্য আহ্বান জানানো হয়। এ সময় সাধারণসভার সভাপতি আলজিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) আব্দুল আজিজ ব্যুতফলিকা নিজ আসন থেকে উঠে এসে বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চে তুলে নেন। বক্তৃতা মঞ্চে দাঁড়ান গলাবন্ধ কোট, কালো ফ্রেমের চশমা, আর ব্যাকব্রাশ করা চুলের বঙ্গবন্ধু। দীর্ঘদেহী, স্মার্ট, সুদর্শন আর আভিজাত্যপূর্ণ এক সৌম্য ব্যক্তিত্ব শেখ মুজিবকে দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারেনি নানা দেশের প্রতিনিধিরা।

নাতিদীর্ঘ ভাষণের সূচনায় বঙ্গবন্ধু বলেন “আজ এই মহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সঙ্গে আমি এই জন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগীদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।”

মাতৃভাষায় বঙ্গবন্ধু মুজিবের এই ঐতিহাসিক বক্তৃতার পর অধিবেশনে সমাগত পাঁচটি মহাদেশের প্রতিনিধি এবং সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুল পঠিত জাতিসংঘের ‘ডেলিগেট বুলেটিন’ বঙ্গবন্ধুকে ‘কিংবদন্তির নায়ক মুজিব’ বলে আখ্যায়িত করে। বুলেটিনটিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কদের প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া পত্রস্থ করা হয়। বুলেটিনের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়- “এ যাবৎ আমরা কিংবদন্তির নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের নাম শুনেছি। এখন আমরা তাকে কাজের মধ্যে দেখতে পাব।” জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্পর্কে বলা হয়- “বক্তৃতায় ধ্বনিত হয়েছে মুজিবের মহৎকণ্ঠ।”

বাংলার এই নেতার মহান বীরত্ব দেখে বিশ্ব নেতারা হয়েছিলেন বিস্মিত! শোষিত মানুষের পক্ষে উচ্চারিত ভাষণে সাম্রাজ্যবাদের ভিত কেঁপে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেছিলেন, বিশ্ব আজ দুভাগে বিভক্ত, শোষিত। আর আমি শোষিতের পক্ষে।

এর আগে বিশ্ব পরিসরে মাতৃভাষা বাংলাকে এমন করে কেউ পরিচয় করিয়ে দেয়নি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে প্রথম বাঙালি হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তার মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে প্রথম বাংলা ভাষা পরিচিতি পেয়েছিল। কিন্তু বিশ্বাঙ্গনের কোথাও তিনি বাংলায় বক্তব্য রাখেননি।

১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল পুরস্কার পাওয়া দ্বিতীয় বাঙালি তিনি। তিনিও তার বক্তব্যটি রেখেছিলেন ইংরেজিতে। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূস ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। ড. মুহম্মদ ইউনূস চাইলে তার বক্তব্যের পুরোটি বাংলায় দিতে পারতেন। তাতে বাংলা ভাষা বিশ্বজনের কাছে আরও পরিচিত ও সম্মানিত হতে পারত। তিনি তার ৩৫ মিনিটের ভাষণের মধ্যে মাত্র দেড় মিনিট বাংলা বলেছেন।

জাতির পিতার পর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে চেতনায় ধারণ করে লালন করেছেন আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিতে পেরেছেন সুদৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ে। এবারও তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন বাংলায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে। এরপর শেখ হাসিনা যতবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এসেছেন, ততবার বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি দেয়ার দাবি করেছেন। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ ইউনেসকো স্বীকৃতি পেয়েছে।

বিশ্বব্যাপী ৩৫ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। তবে বাংলা ভাষা বলতে বিশ্ব বাংলাদেশকেই বোঝে। মাতৃভাষা বিবেচনায় বাংলা এখন চতুর্থ। সংখ্যার দিক দিয়ে সপ্তম।

ইউনেসকো ২০১০ সালে বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুরেলা ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা পড়ানো হয়।

এদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তার সম্মানে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের উত্তর লনের বাগানে একটি বেঞ্চ উৎসর্গের পাশাপাশি একটি বৃক্ষরোপণ করার অনুমতি দিয়েছে জাতিসংঘ। আর এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত সোমবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী এই বৃক্ষ রোপণ করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই বৃক্ষ শতবর্ষ পরেও টিকে থাকবে। শান্তির বার্তাই বয়ে বেড়াবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা সবসময় শান্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন। দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই ছিল তার এই সংগ্রাম। ওই বৃক্ষটির কাছে বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে একটি বেঞ্চ উন্মুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। বেঞ্চটিতে বঙ্গবন্ধুর বাণী রয়েছে। গত শুক্রবার তিনি বাংলায় ভাষণ দিয়ে আবারও জাতির পিতার কথা জাতিসহ বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিলেন।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
করোনা: চীনে ভেজাল টিকা কেলেঙ্কারির হোতা গ্রেপ্তার
গ্লোব বায়োটেকের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন
করোনার টিকা পাবে না গর্ভবতী ও ১৮ বছরের কম বয়সীরা
ভ্যাকসিন নিয়ে যেন বাণিজ্য না হয়: জিএম কাদের
সবচেয়ে কম দামে করোনা ভ্যাকসিন: সালমান এফ রহমান

শেয়ার করুন

বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ: আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস

বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ: আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস

ফারুক চৌধুরীর লেখা ‘স্মরণে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সফরের আগে পররাষ্ট্র সচিব একদিন বলেন, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রণয়নে সেসময়ের তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর খুবই আগ্রহ দেখান। ঠাকুর এর আগে ইত্তেফাকের রিপোর্টার ছিলেন। তিনি মনে করতেন, বাংলা ভাষায় তার খুব দখল রয়েছে। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু বাংলাতেই ভাষণ দেবেন, এটি জানার পর তাহের ঠাকুর বাংলায় ভাষণের একটি খসড়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করেন। পরে জানা যায়, তাহের ঠাকুরের ওই ভাষণ বঙ্গবন্ধুর পছন্দ হয়নি।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। ওই শতাব্দীর শুরুতে ১৯১৩ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়ে বাংলা ভাষাকে বিশ্বে পরিচয় করান। ৬ দশক পর বাঙালি জাতির মুক্তির নায়ক শেখ মুজিব জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বাংলা ভাষাকে আবারও বিশ্বের কাছে তুলে ধরেন।

এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর (১৯৭৪) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশকে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে। তখন চীন ভেটো দেয়া থেকে বিরত থাকে। ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ আনন্দ উল্লাস করে।

২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু ঢাকা ত্যাগ করেন। ওই সময় জাতিসংঘে ৬টি ভাষায় বক্তৃতা দেয়ার রেওয়াজ ছিল। এ ৬টির মধ্যে বাংলা ভাষা ছিল না। আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাভাষী এই নেতার বক্তৃতা শুনে উপস্থিত সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানগণ মুগ্ধ হন।

ভাষণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত বিশ্বনেতারা নিজ আসন থেকে উঠে এসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে করমর্দন ও আলিঙ্গন করেন। বাংলা ভাষা আসলে সেদিন থেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মর্যাদা লাভ করে।

সৈয়দ আনোয়ারুল করিম জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রথম স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত হন। ওই সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ। জাতিসংঘে দেয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণটির একটি খসড়া তৈরি করে পররাষ্ট্র সচিব ফখরুদ্দীন আহমদ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেসময়ের পদস্থ কর্মকর্তা ফারুক আহমদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনায় বসেন। ভাষণ পাঠ শেষে প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে বলেন, “ভালোই তো তোমাদের ফরেন সার্ভিসের বক্তৃতা। কিন্তু তোমরা যে আসল কথাই লেখনি। দেশে বন্যা হয়ে গেল। দুর্ভিক্ষ হতে যাচ্ছে, সেই কথাটিই তো আমি জাতিসংঘে বলবার চাই। বাংলাদেশের সমস্যার কথা বিশ্ববাসী আমার মুখ থেকেই শুনুক। তোমাদের সংশয় কেন?”

সাঁটলিপিকার রোজারিওকে ডেকে আনা হলো। অদূরে সোফা দেখিয়ে ফারুক চৌধুরীকে বঙ্গবন্ধু বললেন, “ওখানে বসে আসন্ন খাদ্যাভাব সম্বন্ধে একটি লাইন তুমি আমার বক্তৃতায় জুড়ে দাও।”

পরবর্তী সময়ে ফারুক চৌধুরীর লেখা ‘স্মরণে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সফরের আগে পররাষ্ট্র সচিব একদিন বলেন, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রণয়নে সেসময়ের তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর খুবই আগ্রহ দেখান। ঠাকুর এর আগে ইত্তেফাকের রিপোর্টার ছিলেন। তিনি মনে করতেন, বাংলা ভাষায় তার খুব দখল রয়েছে। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু বাংলাতেই ভাষণ দেবেন, এটি জানার পর তাহের ঠাকুর বাংলায় ভাষণের একটি খসড়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করেন। পরে জানা যায়, তাহের ঠাকুরের ওই ভাষণ বঙ্গবন্ধুর পছন্দ হয়নি।

১৯৭৪ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় দেয়া সেই ইতিহাস সৃষ্টিকারী ভাষণের ইংরেজি অনুবাদটি পাঠ করেছিলেন ফারুক চৌধুরী।বঙ্গবন্ধু তার জীবনে সবসময় যা করেছেন, তা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছেন।

এই যে বিশ্ব ফোরামে বঙ্গবন্ধু একদিকে বাংলা ভাষণ দিচ্ছেন, সঙ্গে সঙ্গে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ফারুক চৌধুরী। আর এ জন্য নিউইয়র্কে বঙ্গবন্ধু যে হোটেলে অবস্থান করছিলেন, তার কামরার রুদ্ধ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী আর ফারুক চৌধুরীর মধ্যে বক্তৃতা পাঠের রিহার্সাল হয়েছিল অন্তত তিনবার।

এমনভাবে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের আর একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন ফারুক চৌধুরী। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। দিল্লিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণের খসড়াটিও লিখে দেন ফারুক চৌধুরী। ৯ জানুয়ারি দিল্লির অশোক হোটেলে লেখা সেই ছোট্ট বক্তৃতার স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে-

“এই তাঁর জয়যাত্রা অন্ধকার থেকে আলোয়, বন্দিত্ব থেকে স্বাধীনতায়, নিরাশা থেকে আশায়। ন’মাসের ব্যবধানে দেশে ফিরছেন তিনি। সেই সময়টুকুতেই আমার জনগণ শতাব্দী অতিক্রম করেছে, তিনি ফিরছেন বিজয়কে শান্তি, প্রগতি আর উন্নতির পথে চালিত করতে। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এই সান্ত্বনায় যে অবশেষে অসত্যের ওপর সত্যের, উন্মাদনার ওপর প্রকৃতিস্থতার, কাপুরুষতার ওপর শৌর্যের, অবিচারের ওপর ন্যায়বিচারের, অমঙ্গলের ওপর মঙ্গলের হয়েছে জয়।” পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদকে বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধু বলেন- “ওতো আমার মনের কথাই লিখেছে।”

অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বাঙালির সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সন্তান শেখ মুজিব ১৯৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে পিনপতন নীরবতার মধ্যে তার স্বভাবসুলভ সাবলীল ভাষায় দৃপ্তকণ্ঠে প্রথমেই বলেন-

“আজ এই মহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সঙ্গে আমি এই জন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির অংশীদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়া বাঁচার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাঁহারা বিশ্বের সকল জাতির সঙ্গে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়া বাস করিবার জন্য আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে- আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন। আমি জানি, শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশ্ব গড়িয়া তোলার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আমাদের এই অঙ্গীকারের সহিত শহীদানের বিদেহী আত্মাও মিলিত হইবেন। ইহা বিশেষ আনন্দের ব্যাপার যে, স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সক্রিয় যোদ্ধা সভাপতি থাকাকালেই বাংলাদেশকে এই পরিষদের অন্তর্ভুক্ত করিয়া নেয়া হইয়াছে।”

আগামীদিনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন-

“...আজিকার দিনে বিশ্বের জাতিসমূহ কোন পথ বাছিয়া নিবে তাহা লইয়া সংকটে পড়িয়াছে। এই পথ বাছিয়া নেওয়ার বিবেচনার ওপর নির্ভর করিবে আমরা সামগ্রিক ধ্বংস, ভীতি এবং আণবিক যুদ্ধের হুমকি নিয়া এবং ক্ষুধা, বেকার ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে মানবিক দুর্গতিকে বিপুলভাবে বাড়াইয়া তুলিয়া আগাইয়া যাইব অথবা আমরা এমন এক বিশ্ব গড়িয়া তোলার পথে আগাইয়া যাইব যে বিশ্বে মানুষের সৃজনশীলতা এবং আমাদের বিজ্ঞান ও কারিগরি অগ্রগতি আনবিক যুদ্ধের হুমকিমুক্ত উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের রূপায়ণ সম্ভব করিয়া তুলিবে এবং যে কারিগরি বিদ্যা ও সম্পদের পারস্পরিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সর্বক্ষেত্রে সুন্দর জীবন গড়িয়া তোলার অবস্থা সৃষ্টি করিবে। যে অর্থনৈতিক উত্তেজনা সম্প্রতি সমগ্র বিশ্বকে নাড়া দিয়াছে তাহা একটি ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিয়া জরুরিভাবে মোকাবিলা করিতে হইবে।”

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে স্বাধীনতাযুদ্ধকালে ধ্বংসলীলার কথা উল্লেখ করে বলেন- “সাম্প্রতিক বন্যা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।”

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বঙ্গবন্ধু বলেন-

“বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের অঙ্গীকার প্রমাণের জন্য উপমহাদেশে আপোষ মীমাংসার পদ্ধতিকে আমরা জোরদার করেছি।”

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের জন্য যেসব পদক্ষেপ ও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেসব কথাও তিনি উল্লেখ করেন। বলেন- “আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের অভ্যুদয় বস্তুতপক্ষে এই উপমহাদেশে শান্তির কাঠামো এবং স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অবদান রাখবে।”

পরিশেষে বঙ্গবন্ধু বলেন-

“জনাব সভাপতি, মানুষের অজয় শক্তির প্রতি বিশ্বাস, মানুষের অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতা এবং অজেয়কে জয় করার শক্তির প্রতি অকুণ্ঠ বিশ্বাস রেখে আমি আমার বক্তৃতা শেষ করিতেছি। আমরা দুঃখ ভোগ করিতে পারি, কিন্তু মরিব না। টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে জনগণের দৃঢ়তাই চরম শক্তি। আমাদের স্বনির্ভরতা।”

প্রথমবারের মতো জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণদানকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ন্যায়সংগত কথা বলতে কাউকে পরোয়া করেননি। এমনকি সেসময় কয়েক সপ্তাহ আগে দেয়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হেনরি কিসিঞ্জারের একটি বক্রোক্তিরও জবাব দেন খোদ সেদেশে বসেই।

ড. কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘Bangladesh is an international basket case।’ ওই সফরে ওয়াশিংটনে বসেই কিসিঞ্জারের বাজে বক্তব্যের জবাব দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এক সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন- ‘কেউ কেউ বাংলাদেশকে ‘international basket case’ বলে উপহাস করেন। কিন্তু বাংলাদেশ basket case নয়। দুশ বছর ধরে বাংলাদেশের সম্পদ লুট করা হয়েছে। বাংলাদেশের সম্পদেই শ্রীবৃদ্ধি করা হয়েছে লন্ডন, ডান্ডি, মাঞ্চেস্টার, করাচী, ইসলামাবাদের। ... আজো আমাদের অফুরন্ত সম্পদ রয়েছে। একদিন আমরা দেখাবো বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।”

জাতিসংঘে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়ে বঙ্গবন্ধু এক যুগান্তকারী ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন। সেই ভাষণ দেয়ার ৪৭তম বার্ষিকীতে ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক গবেষক, সিনিয়র সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
করোনা: চীনে ভেজাল টিকা কেলেঙ্কারির হোতা গ্রেপ্তার
গ্লোব বায়োটেকের টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন
করোনার টিকা পাবে না গর্ভবতী ও ১৮ বছরের কম বয়সীরা
ভ্যাকসিন নিয়ে যেন বাণিজ্য না হয়: জিএম কাদের
সবচেয়ে কম দামে করোনা ভ্যাকসিন: সালমান এফ রহমান

শেয়ার করুন