স্মৃতির পাতায় উনসত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলো

বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দেওয়ার পর আমাদের বলেছিলেন, ‘সাঁকো দিলাম স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ অর্থাৎ এই ৬ দফার সিঁড়ি বেয়ে তিনি স্বাধীনতায় পৌঁছবেন। বিচক্ষণ নেতা ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে রাজনীতি করেছেন। স্বাধীনতার লক্ষ্য সামনে নিয়েই ’৪৮-এ ছাত্রলীগ, ’৪৯-এ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার বীজ রোপণ করে ৬ দফায় তা প্রতিফলিত করেন।

প্রতিবছর বাঙালি জাতির জীবনে যখন জানুয়ারি মাস ফিরে আসে তখন ১৯৬৯-এর অগ্নিঝরা দিনগুলো স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। প্রত্যেক মানুষের জীবনে উজ্জ্বলতম দিন আছে। আমার জীবনেও কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা আছে। ‘উনসত্তর’ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কালপর্ব। এই কালপর্বে আইয়ুবের লৌহ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে বাংলার ছাত্রসমাজ ’৬৯-এর ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। জীবনের সেই সোনালি দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্তের কথা মনে পড়ে। অনেক সময় ভাবি, কী করে এটি সম্ভব হয়েছিল!

’৬৬-’৬৭ তে আমি ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি এবং ’৬৭-’৬৮তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ তথা ডাকসু’র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সূতিকাগার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ’৬০-এর দশকের গুরুত্ব অনন্য। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ’৪৮ ও ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ৬ দফা ও ’৬৯-এর ১১ দফা আন্দোলন হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু যখন ৬ দফা দিয়েছিলেন আমি তখন ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) সহ-সভাপতি। ইকবাল হলের সহ-সভাপতির কক্ষ ছিল ৩১৩ নম্বর। এই কক্ষে প্রায়শই অবস্থান করতেন শ্রদ্ধেয় নেতা শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান এবং আবদুর রাজ্জাক। ৬ দফা দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু দেশব্যাপী ঝটিকা সফরে ৩৫ দিনে ৩২টি জনসভা করেন এবং বিভিন্ন জেলায় বার বার গ্রেপ্তার হন। বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দেওয়ার পর আমাদের বলেছিলেন, ‘সাঁকো দিলাম স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ অর্থাৎ এই ৬ দফার সিঁড়ি বেয়ে তিনি স্বাধীনতায় পৌঁছবেন। বিচক্ষণ নেতা ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে রাজনীতি করেছেন।

স্বাধীনতার লক্ষ্য সামনে নিয়েই ’৪৮-এ ছাত্রলীগ, ’৪৯-এ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার বীজ রোপণ করে ৬ দফায় তা প্রতিফলিত করেন। ৬ দফা দেয়ার পর আইয়ুব-মোনায়েমের নির্দেশে দেশের বিভিন্ন জেলায় বঙ্গবন্ধুর নামে ১০টি মামলা দায়ের করা হয়। প্রতিটি মামলায় জামিন পেলেও দেশরক্ষা আইনে তাকে কারাবন্দী করা হয়। শেষবার নারায়ণগঞ্জ থেকে সভা করে ঢাকায় আসার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের ডাকে ৭ জুন দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতালে ছাত্রলীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ’৬৮-এর ১৮ জানুয়ারি জেল থেকে মুক্তি পেলেও পুনরায় জেলগেট থেকেই গ্রেপ্তার করে আগরতলা মামলার ১ নম্বর আসামি হিসেবে অজানা স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে আমরা জানতাম না প্রিয়নেতা কোথায় কেমন আছেন। আমরা ছাত্রসমাজ এই গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে তুমুল গণ-আন্দোলন গড়ে তুলি। পরে তা আরও তীব্রতর হয়। ’৬৮-এর ১৯ জুন আগরতলা মামলার বিচার যখন শুরু হয়, সেদিন থেকেই আমরা জানতাম আইয়ুব খান রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ তুলে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যুদণ্ড দেবে। আইয়ুব খান প্রদত্ত মামলার নামই ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য।’

স্মৃতিকথা লিখতে বসে মনে পড়ছে, ডাকসুসহ ৪টি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ঐতিহাসিক ১১ দফার ভিত্তিতে ’৬৯-এর ৪ জানুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠার কথা। মনে পড়ে, ১১ দফা আন্দোলনের প্রণেতা-ছাত্রলীগ সভাপতি প্রয়াত আব্দুর রউফ ও সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী; ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ) সভাপতি প্রয়াত সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক ও সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দোহা; ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার ও সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল্লাহ; এবং এনএসএফ-এর একাংশের সভাপতি প্রয়াত ইব্রাহিম খলিল ও সাধারণ সম্পাদক ফখরুল ইসলাম মুন্সীর কথা। এই ছাত্রনেতাদের প্রত্যেকেই ছিলেন খ্যাতিমান। আমি ডাকসু’র ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করি।

আমার সঙ্গে ছিলেন ডাকসু’র সাধারণ সম্পাদক নাজিম কামরান চৌধুরী। ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ১১-দফা প্রণয়নের পর এটাই প্রথম কর্মসূচি। এর আগে আমরা ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছি। ১৭ জানুয়ারি মাত্র শ’ পাঁচেক ছাত্র বটতলায় জমায়েত হয়েছিল। ডাকসু’র ভিপি হিসেবে আমার সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গভর্নর মোনায়েম খান ১৪৪ ধারা জারি করেছে। সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব ছিল সিদ্ধান্ত দেওয়ার ১৪৪ ধারা ভাঙবো কি ভাঙবো না। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এমনকি গুলিও চলতে পারে, গ্রেপ্তার তো আছেই। জমায়েতে উপস্থিত ছাত্রদের চোখেমুখে ছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দৃঢ়তা। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে শ’ পাঁচেক ছাত্র নিয়ে রাজপথে এলাম। পুলিশ বাহিনী আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে। আমরাও সাধ্যমতো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেষ্টা করি। শুরু হয় কাঁদানে গ্যাস আর ফায়ারিং। ছাত্রলীগ সভাপতি আবদুর রউফ ঘটনা স্থলেই আহত হন। আমরা ক্যাম্পাসে ফিরে আসি।

পরদিন ১৮ জানুয়ারি পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও ঢাকা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট পালনের কর্মসূচি দেই। ১৮ জানুয়ারি বটতলায় জমায়েত। যথারীতি আমি সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট ছিল বিধায় সকালে বটতলায় ছাত্র জমায়েতের পর খণ্ড খণ্ড মিছিল এবং সহস্র কণ্ঠের উচ্চারণ- ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, আইয়ুব খানের পতন চাই।’ গতকালের চেয়ে আজকের সমাবেশ বড়। সেদিনও ১৪৪ ধারা বলবৎ ছিল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজপথে নেমে এলাম। দাঙ্গা পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ আর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করলো। ফিরে এলাম ক্যাম্পাসে। পরদিন ছিল রবিবার। সে সময় রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকতো। কিন্তু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় খোলা ছিল। কর্মসূচি নেয়া হলো ১৯ জানুয়ারি আমরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল করব এবং ১৪৪ ধারা ভাঙব। আমরা মিছিল শুরু করি। শুরু হয় পুলিশের বেপোরোয়া লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ। কিন্তু কিছুই মানছে না ছাত্ররা। শঙ্কাহীন প্রতিটি ছাত্রের মুখ। গত দু’দিনের চেয়ে মিছিল আরও বড়। পুলিশ গুলি চালালো। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রলীগকর্মী আসাদুল হক গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ে রাজপথে। বাড়ি দিনাজপুর। পুলিশের বর্বরতা ও গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে ২০ জানুয়ারি সোমবার আবার বটতলায় সমাবেশের কর্মসূচি দেই।

২০ জানুয়ারি উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের মাইলফলক। এ দিন ১১ দফার দাবিতে ঢাকাসহ প্রদেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। সভাপতির আসন থেকে বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার পরিসর সমাবেশের তুলনায় ছোট। তিন দিনে আমরা সাধারণ ছাত্র ও বিপুলসংখ্যক জনসাধারণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছি। যখন সভাপতির ভাষণ দিচ্ছি তখন মিল-কারখানা, অফিস-আদালত থেকে দলে দলে মানুষ আসছে বটতলা প্রাঙ্গণে। সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তক্রমে সভাপতির ভাষণে সেদিন বলেছিলাম, ‘যতদিন আগরতলা মামলার ষাড়যন্ত্রিক কার্যকলাপ ধ্বংস করে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীর মুক্ত করতে না পারবো, ততদিন আন্দোলন চলবে। স্বৈরশাসক আইয়ুব-মোনায়েম শাহীর পতন না ঘটিয়ে বাংলার ছাত্রসমাজ ঘরে ফিরবে না।’

পুনরায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঘোষণা দিলাম। লক্ষ মানুষের মিছিল নেমে এলো রাজপথে। কোথায় গেল ১৪৪ ধারা! আমরা ছিলাম মিছিলের মাঝখানে। মিছিল যখন আগের কলাভবন বর্তমান মেডিক্যাল কলেজের সামনে ঠিক তখনই গুলি শুরু হয়। আমি, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী ও আসাদুজ্জামান একসঙ্গে ছিলাম। আমাদের লক্ষ্য করে এক পুলিশ ইন্সপেক্টর গুলি ছোড়ে। গুলি লাগে আসাদুজ্জামানের বুকে। সঙ্গে সঙ্গে ঢলে পড়ে আসাদ। আসাদকে ধরাধরি করে মেডিক্যাল কলেজের দিকে নেওয়ার পথে আমাদের হাতের উপরেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। একজন শহীদের শেষ নিঃশ্বাস স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। মৃত্যু এত কাছে হাতের ওপর!

মেডিক্যালের সিঁড়িতে আসাদের লাশ রাখা হলো। তার গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত শার্টটি সংগ্রামের পতাকা করে আসাদের রক্ত ছুঁয়ে শপথগ্রহণ করে সমস্বরে আমরা বলি, ‘আসাদ তুমি চলে গেছো। তুমি আর ফিরে আসবে না আমাদের কাছে। তোমার রক্ত ছুঁয়ে শপথ করছি, আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’

এরপর ছুটে গেলাম শহীদমিনার চত্বরে। আসাদের মত্যুর খবর ঘোষণা করলাম শোকার্ত জনতার মাঝে। আসাদের রক্তাক্ত শার্ট সামনে রেখে সমাবেশের উদ্দেশে বললাম, ‘আসাদের এই রক্ত আমরা বৃথা যেতে দেবো না’ এবং ২১ জানুয়ারি পল্টনে আসাদের গায়েবানা জানাজা ও ১২টা পর্যন্ত হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করি। আমাদের সত্তা ও অস্তিত্ব আসাদের রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ হলো। শহীদমিনার থেকে শুরু হলো শোক মিছিল। শোক মিছিল মুহূর্তেই লক্ষ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে পরিণত হলো। ইতোমধ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। শোক মিছিলের সম্মুখভাগ যখন তিন নেতার সমাধি সৌধের কাছে তখন সেনাসদস্যরা মাইকে বলছে, ‘ডোন্ট ক্রস, ডেঞ্জার-ডেঞ্জার, ডোন্ট ক্রস!’ কিন্তু শোক মিছিল শোকে আর ক্ষোভে উত্তাল। ‘ডেঞ্জার’ শব্দের কোনো মূল্যই নেই সেই মিছিলের কাছে। মিছিল থামলো না, নির্ভয়ে এগিয়ে গেল। ২১ জানুয়ারি পূর্বঘোষিত হরতাল কর্মসূচি সফলভাবে পালিত হলো। এরপর চারদিক থেকে স্রোতের মতো মানুষের ঢল নামলো পল্টন ময়দানে। মাইক, মঞ্চ কিছুই ছিল না। পল্টনে চারাগাছের ইটের বেষ্টনির ওপর দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখতে হলো। বক্তৃতার পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করি:

২২ জানুয়ারি শোক মিছিল, কালো ব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন। ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মশাল মিছিল, পরে কালো পতাকাসহ শোক মিছিল। ২৪ জানুয়ারি দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল।

২২ জানুয়ারি ঢাকা নগরীতে এমন কোনো বাঙালি দেখিনি যার বুকে কালো ব্যাজ নেই। বাড়িতে, অফিসে সর্বত্রই কালো পতাকা উড়ছে। একমাত্র ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া ঘৃণা প্রকাশের এই প্রতীকী প্রতিবাদ ছিল সর্বত্র। ২৩ জানুয়ারি, শহরের সমস্ত অলিগলি থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হয় মশাল মিছিল। সমগ্র ঢাকা পরিণত হয় মশালের নগরীতে। সে-এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। চোখে না দেখলে লিখে বোঝানো যাবে না। ২৪ জানুয়ারি সর্বাত্মক হরতাল পালিত হলো।

সর্বত্র মানুষের একটাই প্রশ্ন, ‘শেখ মুজিব কবে মুক্তি পাবেন?’ ‘কবে আগরতলা মামলা তুলে নেওয়া হবে?’ ঢাকায় এ ধরনের আলোচনাই চলছিল। হরতালের পরও মিছিলের বিরাম নেই। সমগ্র বাংলাদেশ গণ-অভ্যুত্থানের প্রবল বিস্ফোরণে প্রকম্পিত, অগ্নিগর্ভ। জনরোষ নিয়ন্ত্রণ করে নিয়মতান্ত্রিকতা বজায় রাখা যে কত কঠিন, সেদিন মর্মে মর্মে অনুভব করেছি। কিছুক্ষণের মধ্যে সেনাবাহিনী, ইপিআর এবং পুলিশ মরিয়া হয়ে ওঠে বিক্ষোভ দমনে। যত্রতত্র গুলি চালাতে থাকে। সে গুলিতেই শহীদের তালিকায় যুক্ত হয় মতিউর, মকবুল, আনোয়ার, রুস্তম, মিলন, আলমগীরসহ আরও অনেকে। লক্ষ মানুষ নেমে আসে ঢাকার রাজপথে। মানুষের পুঞ্জিভূত ঘৃণা এমন ভয়ংয়র ক্ষোভে পরিণত হয় যে, বিক্ষুব্ধ মানুষ ভয়াল গর্জন তুলে সরকারি ভবন ও সরকার সমর্থিত পত্রিকাগুলোয় আগুন ধরিয়ে দেয়। ‘দৈনিক পাকিস্তান’, ‘মর্নিং নিউজ’ এবং ‘পয়গাম’ পত্রিকা অফিস ভস্মীভূত হয়। আগরতলা মামলার প্রধান বিচারপতি এস রহমান তার বাসভবন থেকে এক বস্ত্রে পালিয়ে যায়। নবাব হাসান আসকারি, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য এনএ লস্কর এবং রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধকারী খাজা শাহাবুদ্দীনসহ আরও কয়েক মন্ত্রীর বাসভবনে আগুন দেওয়া হয়।

ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশনের দশম শ্রেণীর ছাত্র মতিউর রহমানের লাশ নিয়ে আমরা পল্টনে যাই। লক্ষ লক্ষ মানুষ পল্টনে সমবেত হয়। জানাজা অনুষ্ঠিত হয় পল্টন ময়দানে। বিক্ষুব্ধ জনতা গভর্নর হাউস আক্রমণ করতে চায়। বিনা মাইকে বক্তৃতা করে সংগ্রামী জনতাকে শান্ত করে মতিউরের লাশ নিয়ে পল্টন ময়দান থেকে গণমিছিল নিয়ে আমরা ইকবাল হলের মাঠে আসি। যে মাঠে এসেছিলেন সদ্য-সন্তানহারা শহীদ মতিউরের পিতা আজহার আলী মল্লিক। তিনি ক্রন্দনরত অবস্থায় বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে চলে গেছে দুঃখ নাই। কিন্তু আমার ছেলের এই রক্ত যেন বৃথা না যায়।’

যখন ইকবাল হলে পৌঁছলাম তখনই রেডিওতে ঘোষণা করা হলো ঢাকা শহরে কারফিউ বলবতের কথা। মতিউরের পকেটে নাম-ঠিকানাসহ এক টুকরো কাগজে লেখা ছিল, ‘মা-গো, মিছিলে যাচ্ছি। যদি ফিরে না আসি মা, মনে কোরো তোমার ছেলে বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য, শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য জীবন দিয়েছে। ইতি- মতিউর রহমান, ১০ম শ্রেণী, নবকুমার ইন্সটিটিউশন। পিতা- আজহার আলী মল্লিক, ন্যাশনাল ব্যাংক কলোনি, মতিঝিল।’

কারফিউর মধ্যেই আমরা মতিউরের লাশ নিয়ে গেলাম ন্যাশনাল ব্যাংক কলোনিতে। আমরা পিতামাতার আকুল আর্তনাদের আশঙ্কা করছিলাম। কিন্তু মা শুধু আঁচলে চোখ মুছে বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে চলে গেছে দুঃখ নাই! আজ থেকে তুমি আমার ছেলে। মনে রেখো, যে জন্য আমার ছেলে রক্ত দিয়ে গেলো, সেই রক্ত যেন বৃথা না যায়।’ শহীদ মতিউরের পিতা ২০১৭-এর ১৭ জুলাই মৃত্যুবরণ করেছেন। মতিউরের কবরেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত। তার কথা সবসময় মনে করি।

প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সহযোগিতায় উত্তরায় তার জীবদ্দশায় একটি প্লট দেওয়া হয়। যেখানে ৬ তলা ভবন নির্মিত হয়েছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করতেন।

উনসত্তরের ২৪ জানুয়ারি গণ-আন্দোলন-গণবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয় গণ-অভ্যুত্থান। কারফিউর মধ্যে একদিনও থেমে থাকেনি আমাদের সংগ্রাম। দেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানি প্রশাসন বর্জন করেছে। কল-কারখানা, অফিস-আদালত, সচিবালয় সর্বত্র প্রশাসন ভেঙে পড়েছে। সরকারি কর্মকর্তাগণ জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জন্য ধরনা দিতেন ইকবাল হলে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের কাছে। কিছুদিনের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ইকবাল হল।

২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা ১১-দফার প্রতি ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীসহ বাংলার সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিলাম। এরপর সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করা হলে ৯ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ‘শপথ দিবস’ পালন করে। শপথ দিবসে আমার সভাপতিত্বে সভা শুরু হয় এবং আমরা ১০ ছাত্রনেতা ‘জীবনের বিনিময়ে হলেও ১১-দফা দাবি বাস্তবায়ন করবো’ জাতির সামনে এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করার শপথ নিয়ে স্লোগান তুলি, ‘শপথ নিলাম শপথ নিলাম, মুজিব তোমায় মুক্ত করবো, শপথ নিলাম শপথ নিলাম, মা-গো তোমায় মুক্ত করবো।’

আজ ভাবতে ভালো লাগে, ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি প্রিয় নেতাকে মুক্ত করে স্লোগানের প্রথম অংশ এবং ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি হানাদারদের কবল থেকে প্রিয় মাতৃভূমিকে মুক্ত করে স্লোগানের দ্বিতীয় অংশের পূর্ণ বাস্তবায়ন করেছি। ১৪ ফেব্রুয়ারি হরতাল পালন ও ডাকের জনসভায় জনতার দাবির মুখে প্রিয় নেতার ছবি বুকে ঝুলিয়ে বক্তৃতা করি। ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক ও ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহার হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।

সংগ্রামী ছাত্র-জনতা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও প্রিয়নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের মুক্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে। মানুষ ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণে উদ্যত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবসে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভা থেকে স্বৈরশাসকের উদ্দেশে আলটিমেটাম প্রদান করে বলি, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীর নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।’ ২২ ফেব্রুয়ারি তথাকথিত লৌহমানব আইয়ুব খান আমাদের দাবির কাছে নতিস্বীকার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীকে নিঃশর্ত মুক্তি প্রদানে বাধ্য হয়।

পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠদিন। সেদিন সদ্যকারামুক্ত প্রিয় নেতাকে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক গণসংবর্ধনা প্রদান করা হয়। স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে দিনটির ছবি। এমন একজন মহান নেতার গণসংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেদিনের জনসভা ছিল জনসমুদ্র। রেসকোর্স ময়দান কানায় কানায় পরিপূর্ণ। চিরাচরিত প্রথা ভঙ্গ করে আগেই সভাপতির ভাষণ দেওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুরোধ জানিয়েছিলাম।

দশ লক্ষাধিক লোক দু’হাত তুলে সম্মতি জানিয়েছিল। বক্তৃতায় আমি বঙ্গবন্ধুকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করে বলেছিলাম, ‘প্রিয় নেতা, তোমার কাছে আমরা ঋণী, বাঙালি জাতি চিরঋণী। কারণ তুমি জেল-জুলুম অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছো। তোমার জীবন তুমি বাঙালি জাতির জন্য উৎসর্গ করেছো প্রিয় নেতা। এই ঋণ আমরা কোনোদিন শোধ করতে পারবো না। তাই কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে তোমাকে একটি উপাধি দিয়ে সেই ঋণের বোঝাটা আমরা হালকা করতে চাই।’ দশ লক্ষাধিক লোক দু’হাত উত্তোলন করে সম্মতি জানাবার পর সেই নেতাকে-যিনি জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন-‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে সেদিন এই প্রস্তাব গ্রহণ করে বাংলার মানুষ লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনি তুলেছিল, ‘জয় বঙ্গবন্ধু।’

অনেক সময় চিন্তা করি যদি বঙ্গবন্ধু ৬ দফা কর্মসূচি না দিতেন তবে আগরতলা মামলা তথা ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলা হতো না; আগরতলা মামলা না হলে প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সকল রাজবন্দীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ১১ দফাভিত্তিক গণ-আন্দোলন-গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হতো না; আর ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান না হলে এক মাথা এক ভোটের ভিত্তিতে ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন হতো না এবং সেই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন না পেলে আন্তর্জাতিকভাবে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম চিহ্নিত হতো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলন হিসেবে। ফলে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ডাকে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সকলের জাতীয় ঐক্য যে নিশ্চিত হয়েছিল, তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল ৬ দফা ও ’৭০-এর নির্বাচনি ফলাফল। সুতরাং, ৬ দফা থেকে ১১ দফা হয়ে ১ দফা তথা স্বাধীনতার কর্মসূচিতে পৌঁছানোর এই নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া একসূত্রে গাঁথা। সেদিন ছাত্রসমাজ সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে সংগ্রাম করেছে। সোনালি সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে গর্বে বুক ভরে ওঠে। তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল রাজনৈতিক নেতা তৈরির কারখানা। সহনশীল ও পরমতসহিষ্ণু থেকে সামাজিক সম্পর্ক অটুট রেখে আমরা রাজনীতি করেছি। মানুষের সুবিপুল আস্থা আর বিশ্বাস আমাদের উপর ছিল বলেই দেশব্যাপী তুমুল গণ-আন্দোলন সংগঠিত করতে পেরেছিলাম।

আমরা মানুষের বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়েছি। শহিদ মতিউরের মা ক্রন্দনরত অবস্থায় বলেছিলেন, ‘আমার সন্তানের রক্ত যেন বৃথা না যায়।’ শহিদ মতিউরের রক্ত আমরা বৃথা যেতে দেইনি। ২০ জানুয়ারি আসাদের রক্তের মধ্য দিয়ে যে আন্দোলন রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, সেই আন্দোলনের সফল পরিণতি বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দীর নিঃশর্ত মুক্তি, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার প্রাপ্তি, ’৭০-এর নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ এবং পরিশেষে ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মহত্তর বিজয় অর্জন। আর এসব অর্জনের ড্রেস রিহার্সেল ছিল ’৬৯-এর অগ্নিঝরা দিনগুলো-যা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে এবং থাকবে চিরদিন।

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

আরও পড়ুন:
স্বপ্নের জলশহর: ‘কঠিনের’ ঘটুক উত্তরণ

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের মুক্তির আলো ৭ মার্চের ভাষণ

১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি বিত্ত-বৈভবের বিভাজন নির্বিশেষে এক মহাঐক্যে জাগ্রত করেছিলেন মহাভাষণের মাধ্যমে। এই মহাভাষণের পটভূমি তিনিই তৈরি করেছিলেন তার দীর্ঘ ২৩ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

বাঙালির মুক্তির সোপানে আগুন ঝরা মাস মার্চ প্রতিবারই আমাদের আন্দোলিত করে, স্ফুলিঙ্গ ছড়ায় চেতনার ঘরে। মার্চ আসে নানা মাত্রা নিয়ে। এর মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ আমাদের সবচেয়ে বেশি আন্দোলিত করে। আর দুদিন পরেই এ ভাষণের সুবর্ণজয়ন্তী। এ ভাষণের নানা মাত্রিকতা নিয়ে একটু আলোকপাত করার চেষ্টা বক্ষ্যমাণ রচনায়। প্রথমে অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু যাক। ৭ মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন-

“৭ মার্চের ভাষণ বঙ্গবন্ধুর অমর রচনা, বাঙালির মহাকাব্য। এ মহাকাব্য বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রামের ধারা ও স্বাধীনতার লালিত স্বপ্ন থেকে উৎসারিত। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই এ মহাকাব্য রচনা সম্ভব ছিল।”

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র ১৮ মিনিটের অনলবর্ষী ভাষণে ১১০৫টি শব্দের সমন্বয়ে এই মহাকাব্য রচনা করেছিলেন। যে মহাকাব্যের মধ্যে নিহিত হয়েছে বাঙালি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূলমন্ত্র। ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ভাষণের শব্দশৈলী ও বাক্যবিন্যাসে তা হয়ে ওঠে গীতিময় ও শ্রবণের চতুর্দিকে অনুরণিত। যে কারণে মার্কিন ম্যাগাজিন Newsweek বঙ্গবন্ধুকে আখ্যা দিয়েছে ÔPoet of Politics’ হিসেবে। এদেশের কোটি জনতার বহু যুগের লালিত স্বপ্ন-ত্যাগ, তিতিক্ষা-আন্দোলন ও সংগ্রামের ফসল আমাদের এই মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ। বিশ্ব মানচিত্রে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষাভিত্তিক একমাত্র জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ। হাজার বছরের সংগ্রাম শেষে যে রাষ্ট্রের বীজ রোপিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে।

১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি বিত্ত-বৈভবের বিভাজন নির্বিশেষে এক মহাঐক্যে জাগ্রত করেছিলেন মহাভাষণের মাধ্যমে। এই মহাভাষণের পটভূমি তিনিই তৈরি করেছিলেন তার দীর্ঘ ২৩ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

১৯৪৮ থেকে ১৯৬৮ দীর্ঘ দুই দশকে তিনি যে অসংখ্যবার বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় চেতনাকে জাগ্রত করার জন্য জেলে গিয়েছেন, তা বাঙালি-মননে অগ্নিশিখার মতো কাজ করেছিল। ৭ মার্চের ভাষণটি ছিল তার দীর্ঘ সংগ্রামের একটি পরিণত ফুল ও ফল। সেদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসমুদ্রের প্রত্যাশা ছিল, সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন বঙ্গবন্ধু। জনসভায় রওনা দেবার আগে ছাত্রলীগের একাংশের নেতাকর্মীরা দীর্ঘক্ষণ তার পথ আগলে রেখে তাকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেবার জন্য কাকুতি-মিনতি জানিয়েছিল। কিন্তু তিনিতো জাতির পিতা, স্বাধীনতার মহানায়ক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি ভালো করেই জানতেন কসাই ইয়াহিয়া খান ও টিক্কা খান ওঁত পেতে ছিল ওই একটি ভ্রান্ত পদক্ষেপের জন্য। বঙ্গবন্ধু তাদেরকে সে সুযোগ দেননি। উলটো ২৫ মার্চ অ্যাসেম্বলিতে যোগ দেয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে চারটি দাবি উত্থাপন করলেন- (১) সামরিক আইন প্রত্যাহার (২) সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া (৩) সব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এবং (৪) জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর। যে দাবিগুলো মানার সাধ্য ছিল না পাক সামরিক জান্তার।

৬ মার্চ ইয়াহিয়া খান যে কূটচাল দিয়েছিলেন, তার পাল্টা ও সমুচিত জবাব ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ।

৭ মার্চের ভাষণ পর্যালোচনা করে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন লিখেছেন-

“বর্তমান যুগের ইতিহাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক জন্ম একটি বিরাট ঘটনা। ... সুচিন্তিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা যে সম্ভব, শেখ মুজিবুর রহমান তার প্রমাণ সমগ্র পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালির বন্ধু ও অধিনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও মহানেতা। তা ছাড়া বঙ্গবন্ধুর উৎসাহ শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তিনি চেয়েছিলেন বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সভ্যতা, সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা, সব মানুষের মানবাধিকারের স্বীকৃতি। তার সাবলীল চিন্তাধারার সঠিক মূল্য শুধু বাংলাদেশ নয়, সমস্ত পৃথিবীও স্বীকার করবে, এ আশা আমাদের আছে ও থাকবে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তির আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যে শেখ মুজিবের বিশাল মহিমার একটি প্রকাশ যেমন আমরা দেখতে পাই, তাঁর মহামানবতার আর একটা পরিচয় আমরা পাই তার চিন্তাধারার অসাধারণতায়।”...

৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন লিখেছেন-

‘৭ মার্চ অপরাহ্ণে তিনি যখন জনসভার মঞ্চে উঠেছেন তখন তো জনসমুদ্র প্রবঞ্চক পাকিস্তানিদের প্রত্যাখ্যান করে নায়কের নির্দেশের অপেক্ষায় মাত্র- তারা তো জানে যুদ্ধ অনিবার্য, আসন্ন। নেতা লড়াইয়ের অগ্নিমন্ত্রে শানিয়ে দিলেন জনতার অন্তর। যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পথে এভাবেই রওয়ানা করিয়ে দিলেন জাতিকে ৭ মার্চ অপরাহ্ণে।” তিনি আরও লিখেছেন, বঙ্গবন্ধুর বাগ্মিতার জাদুতে- বক্তব্যে সমালোচনা, অভিযোগ, ক্ষোভের প্রকাশ তো ছিলই, কিন্তু তাতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও চূড়ান্ত ঘোষণার গুরুত্ব চাপা পড়েনি, মূল অভীষ্ট সাধনে ভুল হয়নি। তাৎক্ষণিকভাবে এ ভাষণটি দিলেও শব্দ হাতড়ানো, লাগসই শব্দের অভাবে যতি কিংবা যথার্থ বয়ানের ব্যর্থতায় বক্তব্য অস্পষ্ট বা জটিল হওয়ার মতো কোনো অঘটন ছাড়াই টানা বলে গেছেন তিনি। ঠিক যেন চয়িত শব্দফুলের মালা গাঁথলেন এক মহাকবি। মাঝে মাঝে বাঙাল শব্দের ব্যবহার- যেমন দাবায়ে রাখতে পারবা না- বক্তৃতাটিকে দিয়েছে দেশজ সৌরভ এবং মুজিব ব্যক্তিত্বের সপ্রাণ ওজস্বিতা। ভাষণটি কেবল বুদ্ধির নির্মাণ নয়, ভালোবাসার আবেগ জীবন্ত। এটির আবেদন যুগপৎ বৃদ্ধি ও হৃদয়বৃত্তির কাছে। তাই অনুপ্রাণিত এক বক্তা সেদিন তার মুখাপেক্ষী জনতাকেই সবচেয়ে বড় ব্রত সাধনের আবাহন করেছিলেন। তার ডাক মানুষের অন্তরে পৌঁছেছিল। এমন মর্মভেদী, অন্তরস্পর্শী, দূরদর্শী বক্তৃতার দৃষ্টান্ত মেলে না ইতিহাসে।

প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন উদ্ধৃত করেন-

“বঙ্গবন্ধু হয়ে যেমন কেউ জন্মান না তেমনি সাতই মার্চের ভাষণও কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ইতিহাসের উজান বেয়ে একজন রাজনৈতিক কর্মীর উত্তরণ ঘটে। আর বাঁকবদলের কালে নেতার পরীক্ষা নেয় ইতিহাস- সাহসে, ত্যাগে, প্রেম ও প্রজ্ঞায়, পারবেন কি সময়োচিত কাজটি করতে? সাতই মার্চে তেমন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।” .... একদিকে স্বাধীনতার আশায় বুক বেঁধে দাঁড়ানো বাঙালি আর অন্যদিকে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগের অপেক্ষায় পাকবাহিনী। নেতার জন্যে যথার্থই অগ্নিপরীক্ষা। নেতা অগ্নিপরীক্ষার উত্তর দিলেন অগ্নিগর্ভ ভাষণে- যা আমাদের ইতিহাসে আর বিশ্বের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে লিখিত থাকবে স্বর্ণাক্ষরে। ... সাতই মার্চের ভাষণের মাধ্যমে একটি জাতির জন্ম হয়েছে, আর সেই জাতি একজন অবিসংবাদিত নেতাকে পেয়েছে।”

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতারই ঘোষণা। যে ঘোষণার সূত্র ধরে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর মানচিত্রে নিজস্ব অবস্থানের চূড়ান্ত স্বীকৃতি পায় ‘বাংলাদেশ’ নামে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র। একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে কিংবা বহির্বিশ্বে যাতে চিহ্নিত না হন, সে বিষয়ে বঙ্গবন্ধু সব সময় সতর্ক ছিলেন। নিজেকে এবং বাঙালিকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার লক্ষ্যে নাইজেরিয়ার বিয়াফ্রা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধু ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। এ বিষয়ে Newsweek ম্যাগাজিনের বর্ণনা নিম্নরূপ:

“A month ago, at a time when he was still publicly refraining from proclaiming independence, Mujib privately told Newsweek’s Loren Jenkins that “there is no hope of salvaging the situation. The country as we know it is finished.” But he waited for President Yahya Khan to make the break. “We are the majority so we cannoy secede. They, the westerners, are the minority, and it is up to them to secede.”

১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যে কৌশলী পথ বেছে নিয়েছিলেন, তাতে বিশ্বের সেরা সমর-কৌশলীরাও অবাক হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের ইতিহাসের দায় মোচন করেছিলেন অবিস্মরণীয় এক ভাষণের মধ্য দিয়ে। তিনি অবিশ্বাস্যভাবে মুক্তিপথে সংহত করে দাঁড় করিয়ে দিলেন বাংলার মানুষকে, যার ফলে সামনের দিনগুলোতে যা-ই ঘটুক না কেন, অনন্য দৃঢ়তায় ঐক্যবদ্ধ জাতি তা মোকাবিলায় হয়ে উঠেছিল ক্ষমতাবান। ৭ মার্চের ভাষণের ছত্রে ছত্রে কর্তব্যের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছিল এবং আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এই ভাষণের কোনো আন্তর্জাতিক মাত্রা ছিল না। কিন্তু বৃহত্তর পরিসরে বিবেচনাকালে আমরা বুঝে নিতে পারি এই ভাষণ ছিল সাড়ে সাত কোটি মানুষের জাতিসত্তার আশু মুক্তির দিগদর্শন। ফলে ২৫ মার্চের কালোরাত্রিতে পাকবাহিনী গণহত্যা শুরু করলেও জাতি দিশেহারা হয়ে যায়নি এবং পরবর্তীকালে যুদ্ধরত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিণ্ডলে বন্ধুহীন হয়ে পড়েনি।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃত। গ্রিক নগররাষ্ট্র এথন্সের রাষ্ট্রনায়ক পেরিক্লিস থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোনাল্ড রিগ্যান পর্যন্ত ২৫০০ বছরের বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ৪১ জন সামরিক-বেসামরিক জাতীয় বীরের বিখ্যাত ভাষণ নিয়ে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ Jacob F field, ‘We shall Fight on the Beaches: The Speeches That Inspired History’ শিরোনামে একটি বই লিখেন। যে বইটি ২০১৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। সে বইয়ে আলেজান্ডার দ্য গ্রেট, জুলিয়াস সিজার, অলিভার ক্রমওয়েল, জর্জ ওয়াশিংটন, নেপোলিয়ান বোনাপার্ট, যোসেফ গ্যারিবোল্ডি, আব্রাহাম লিংকন, ভ্লাদিমির লেনিন, উইড্রো উইলসন, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, উইনস্টন চার্চিল, ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট, চার্লস দ্য গল, মাও সেতুং, হো চি মিন প্রমুখের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বিশ্ব ইতিহাসে যে কয়টি অসাধারণ বক্তৃতা আছে, ১৯৭১-এর ৭ মার্চ প্রায় দশ লক্ষ মানুষের সামনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণটি দিয়েছিলেন, তা তার অন্যতম, সম্ভবত শ্রেষ্ঠতম। আর কোনো স্মরণীয় ভাষণের বক্তা এরকম একটি বিশাল জনসমুদ্রে তাৎক্ষণিক শব্দচয়নের মাধ্যমে এমন একটি মহাকাব্যিক ভাষণ দেননি।

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের পিতা ফিলিপের হাতে যখন একে একে গ্রিক নগর-রাষ্ট্রগুলোর পতন ঘটছিল, তখন ডেমোস্থেনিস নগর-রাষ্ট্রগুলোর নাগরিকদের স্বাধীনতা হারানোর অশনিসংকেত নির্দেশ করে যে ভাষণগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলো বিশ্ব ইতিহাসে স্মরণীয় ভাষণ। সেসব ভাষণের বিভিন্ন অংশ কালের সীমানা পেরিয়ে আজও আমাদের উদ্দীপ্ত করে। খ্রিস্টের জন্মের চার শ’ বছর আগে অ্যাথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে ত্রিশ বছর ধরে যে যুদ্ধ চলেছিল, তা ‘পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। সে যুদ্ধের একপর্যায়ে অ্যাথেন্সের রাষ্ট্রনায়ক পেরিক্লিস যে অবিস্মরণীয় ও মৃত্যুঞ্জয়ী ভাষণটি দিয়েছিলেন, তা আজও গণতন্ত্রের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার চিরন্তন বাণী হিসেবে ইতিহাসকে আলোকিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গ অধিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৬৩ সালের আগস্টে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ‘আমার একটি স্বপ্ন আছে (I have a dream)’ শিরোনামে যে ভাষণটি দিয়েছিলেন, তা-ও বিশ্ব ইতিহাসের একটি অমর বক্তৃতা। পেরিক্লিস, আব্রাহাম লিংকন এবং অন্যান্য মহান জাতীয় নেতা ও রাষ্ট্রনায়কগণ যেসব ভাষণ দিয়েছিলেন, তা কোনো জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে নয়। সেসব ভাষণে কোনো একটা জাতিকে হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতাযুদ্ধে এবং মুক্তি সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানানো হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণে বাঙালি যেন হাজার বছরের জড়তা, দৈন্য ও গ্লানি অতিক্রম করে এক মহাচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আজন্ম সাধন-ধন, আজন্ম-অধরা স্বাধীনতাকে পাওয়ার জন্য মরণপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার দীক্ষা পেল।

৭ মার্চের বক্তৃতার আগে বঙ্গবন্ধু দুটি বিপরীত স্রোতের মাঝখানে নিজেকে দেখতে পাচ্ছিলেন। একদিকে ছাত্র-জনতার দাবি- এখনই স্বাধীনতা ঘোষণা করা হোক, অপরদিকে চতুর সামরিক শাসক ও তাদের দোসরদের পক্ষ থেকে সমঝোতায় আসার জন্য বৈঠকের আহ্বান। এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু যে উভয় সংকটে পড়েছিলেন, সে রকম সংকটে মনে হয় কোনো স্বাধীনতাকামী নেতাকে পড়তে হয়নি।

বঙ্গবন্ধুর ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনে ৭ মার্চই ছিল সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুহূর্ত। তার দল আওয়ামী লীগ ৬ দফার ভিত্তিতে নির্বাচন করেছে এবং নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করেছে। টালবাহানা করার পর যখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সরকার ঢাকায় এসে ৬ দফা নিয়ে আলোচনা করে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের নিষ্পত্তি করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে তখন সেই উদ্যোগকেও প্রত্যাখ্যান করা যায় না। অপরদিকে যে উত্তাল জনসমুদ্র প্রতিদিন রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং সংগ্রামী স্লোগান দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের আশ্বাস না দিলে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হবেন। ছাত্রদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের পর থেকে জনতার পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার দাবি দুর্বার হয়ে উঠেছিল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন রেসকোর্সের ময়দানে ভাষণ দিতে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তিনি ভয়াবহ সংকটের সামনে দাঁড়িয়ে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকে কখনো ভাষণ দিতে হয়নি; পৃথিবীর কোনো নেতার সামনেও কখনও এমন পরিস্থিতি আসেনি। বক্তৃতায় কী বলবেন? কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবেন? একই সঙ্গে কীভাবে প্রতিপক্ষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেবেন? এমন বহু বিষয় তাঁকে প্রচণ্ড চাপের মুখে ফেলেছিল। এ বিষয়ে প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করেছেন বঙ্গবন্ধুর প্রথম সন্তান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার ভাষায়-

“আমি আব্বার মাথার কাছে বসে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। এটা ছিল আমার রুটিন ওয়ার্ক। আমি সবসময় করতাম। ভাবতাম এটা না করতে পারলে আমার জীবন বৃথা। আব্বা যখন খাটে শুতেন, বালিশটা নামিয়ে আমার বসার জন্য একটা জায়গা করে দিতেন। আমি আব্বার মাথার কাছে বসে মাথায় হাত বুলাচ্ছিলাম। মা পাশে এসে বসলেন। বললেন, আজ সারা দেশের মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। সামনে তোমার বাঁশের লাঠি, জনগণ আর পেছনে বন্দুক। এই মানুষদের তোমাকে বাঁচাতেও হবে- এই মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে। অনেকে অনেক কথা বলবে- তোমার মনে যে ঠিক চিন্তাটা থাকবে- তুমি ঠিক সেই কথাটা বলবে- আর কারো কথায় কান দেবা না। তোমার নিজের চিন্তা থেকে যেটা আসবে যেভাবে আসবে- তুমি ঠিক সেইভাবে কথাটা বলবা। এই ছোট্ট কথাটুকু মা আমার আব্বাকে ঐ সভায় যাবার আগে বলে দিয়েছিলেন।”

অধ্যাপক অজয় রায় ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে তার অনুভূতি ব্যক্ত করে লিখেছেন-

“মন বলছিল আজ বাংলার-বাঙালির এক নতুন ইতিহাসের অধ্যায় রচিত হবে। ইতিহাস রচনার এই মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত থাকা হাজার বছরে একবারই আসে। কাজেই সেদিন এই ময়দানে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা, তাঁরা অনেকের চাইতে ভাগ্যবান, তাঁরা জননন্দিত নেতা বঙ্গবন্ধুর সাথে ইতিহাস রচনায় অংশ নিয়েছিলেন, আর ইতিহাসের নিয়ন্ত্রক অমর কাব্যখানি লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধু স্বয়ং, যে কাব্যের নাম ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

অধ্যাপক অজয় রায় আরও লিখেছেন-

“আমি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে অনেক মহাপুরুষের, মহান রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সুভাষণ শুনেছি, কিন্তু এমন কবিত্বময় অথচ প্রাণস্পর্শী, উদ্দীপনাময় অথচ সংযত বক্তৃতা আমাকে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেনি। সত্যিই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এক অনুপম অমর কবিতা। ... এটি ছিল একটি অনন্য কবিতা, একটি মন্ত্র যা সেদিন সেই মুহূর্তে কেবল শেখই রচনা করতে পারতেন, আবৃত্তি করতে পাররতেন এবং শ্রোতাদের উদ্বেলিত করতে পারতেন- অন্য কেউ নয়। ... ৭ মার্চে আমরা যদি ক্যান্টনমেন্ট দখলের চেষ্টা করতাম তাহলে বিশ্ববিবেক ও জনমত আমাদের পক্ষে থাকত না, আমরা চিহ্নিত হতাম বিচ্ছিন্নতাবাদীরূপে, আর বঙ্গবন্ধু কলঙ্কিত হতেন ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইতিহাসবিদ ড. এ আর মল্লিক লিখেছেন-

“আমার মনে হয়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাঙালির ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। ... ৭ মার্চের ভাষণ বেতার (পরদিন) মারফত চট্টগ্রামে থেকেই আমাদের শোনার সুযোগ হয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি সংগ্রামে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নেই ঐ দিনই।”

এই ভাষণের জন্যই হয়তো বাঙালি সহস্র বছর অপেক্ষা করেছে। ৭ মার্চের ভাষণ শোনার জন্য শহীদুল্লা কায়সার ও পান্না কায়সারের প্রস্তুতি তাই বলে। ‘মুক্তিযুদ্ধ : আগে ও পরে’ গ্রন্থে পান্না কায়সার লিখেছেন-

“শহীদুল্লা কায়সার তাকে বলেন, তোমার জীবদ্দশায় এমন ভাষণ শোনার সৌভাগ্য হবে না। চল, কিছুক্ষণ থেকে চলে এসো। আমার ছেলে তার জন্মের আগেই স্বাধীনতার ঘোষণা শুনবে। তোমার জীবনে এ দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে শোনালেন জাতির বহু যুগের লালিত স্বপ্নের ও স্বপ্নভঙ্গের কথা, আসন্ন সংগ্রামে পথচলার দিকনির্দেশনার কথা। তার পক্ষেই এমন নির্দেশনা দেয়া সম্ভব ছিল, কারণ তিনি কখনোই ক্ষমতার মোহে অন্ধ ছিলেন না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে যত আসন তিনি পেয়েছিলেন, তাতে আপস করলে, শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মেলালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও হয়তো হতে পারতেন। কিন্তু তাতে দেশ ও জাতির মুক্তি আসত না। এই পথে পা বাড়াননি তিনি।

লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষক

আরও পড়ুন:
স্বপ্নের জলশহর: ‘কঠিনের’ ঘটুক উত্তরণ

শেয়ার করুন

স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি কে করছে?

বিএনপি নেতারা স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের (২ মার্চ, ১৯৭১) কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বরাবরের মতো বলেছে- আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করছে। কিন্তু বাস্তবতা কী? ৩ মার্চ পল্টনে ছাত্রলীগ ও ডাকসুর চারনেতাকে নিয়ে গঠিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে এ ইশতেহার পাঠ করেছিলেন শাজাহান সিরাজ। এ ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক ঘোষণা দেয়া হয়। বিএনপি নেতারা কি তা বলেন? তাদের কাছে তো ‘জিয়ার ঘোষণায় স্বাধীনতার সূচনা’। এর চেয়ে নির্লজ্জ মিথ্যাচার আর কী হতে পারে?

বিএনপি মার্চ-জুড়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বছরের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। দলের নেতারা মিত্র দলগুলোর কর্মসূচিতেও অংশ নিচ্ছে। একটি কর্মসূচির আয়োজন করেছিল আ স ম আবদুর রবের জাসদ। ৩ মার্চ ‘স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা’ কর্মসূচিতেও তারা অংশ নেয়। সম্প্রতি বিএনপি জোটের শরিক মেজর জেনারেল (অব.) ইব্রাহিমের কল্যাণ পার্টির একাধিক কর্মসূচিতে বিএনপি নেতাদের দেখা গেছে। দেখা যাক, জামায়াতে ইসলামী এবং জোটে থাকা অন্য দলগুলোর ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী’ পালনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তারা কী বলে!

বিএনপি নেতারা স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের (২ মার্চ, ১৯৭১) কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বরাবরের মতো বলেছে- আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করছে। কিন্তু বাস্তবতা কী? ৩ মার্চ পল্টনে ছাত্রলীগ ও ডাকসুর চারনেতাকে নিয়ে গঠিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে এ ইশতেহার পাঠ করেছিলেন শাজাহান সিরাজ। এ ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক ঘোষণা দেয়া হয়। বিএনপি নেতারা কি তা বলেন? তাদের কাছে তো ‘জিয়ার ঘোষণায় স্বাধীনতার সূচনা’। এর চেয়ে নির্লজ্জ মিথ্যাচার আর কী হতে পারে? এটা তো সর্বোচ্চ আদালতের রায় এবং সংবিধানেরও লঙ্ঘন। সবচেয়ে বড় কথা, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে বিভিন্নভাবে অংশ নেয়া কোটি কোটি মানুষ এখনও জীবিত। বিএনপি নেতারা মনে করেন- মিথ্যা বলতে থাকলে কিছু লোক তো বিশ্বাস করবেই।

আমাদের আরেকটি বাস্তবতা মনে রাখতে হবে- ত্রিশ লাখ শহিদের মহান আত্মদানে অর্জিত বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে প্রায় তিন দশক ক্ষমতায় ছিল এমন শক্তি, যারা স্বাধীনতা চায়নি। অর্থনৈতিক মুক্তি চায়নি। উন্নয়ন চায়নি। স্বয়ংসম্পূর্ণতা চায়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান ও মর্যাদার বাংলাদেশ চায়নি। এখন তারা বলছে- ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে’। [মির্জা ফকরুল ইসলাম, ১ মার্চ বিএনপির স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ]

৩ মার্চ মির্জা ফকরুল ইসলাম বিএনপির এক সমাবেশে বলেছেন- সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকার জন্য হিমশিম খাচ্ছে। বাস্তবতা কি সেটা বলে? শেখ হাসিনার সরকার করেনার মহাদুর্যোগ খুব ভালোভাবে সামলাতে পারছে, এটাই তো বলছেন বিশ্বনেতারা। শুরুর দিকে কিছু সমস্যা হয়েছে আমাদের। কিন্তু আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত দেশের সমস্যা হয়েছে ঢের বেশি।

এখনও ১৩০টির মতো দেশ করোনার ভ্যাকসিন পায়নি। বাংলাদেশের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। উন্নত দেশগুলোতে যেসব বাংলাদেশি বসবাস করছে তারা মনে করছে যে বাংলাদেশে থাকলে সহজে ভ্যাকসিন পাওয়া যেত। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী এক বাংলাদেশি বিজ্ঞানী আমার কাছে শুনে বিস্মিত হয়েছেন- এক সময় ‘বাস্কেট কেস’ হিসেবে উপহাস করা বাংলাদেশে মন্ত্রী-এমপি-কোটিপতি থেকে শুরু করে দরিদ্র মানুষ, প্রত্যেকেই ভ্যাকসিন পাওয়ার ক্ষেত্রে সমান অধিকার ভোগ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগে সব মানুষ ভ্যাকসিন পাবে, তারপর তিনি নেবেন।

এটাই তো একাত্তরের চেতনার বাংলাদেশ। এ দেশের নাগরিক হতে পেরে গর্ববোধ করি আমরা। বিএনপি-জাতীয় পার্টি-জামায়াতে ইসলামী- যারা স্বাধীনতার ঘোষণা মানে না, ৭ মার্চ মানে না, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অস্বীকার করে, তারাই কিন্তু বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে তিন দশকের মতো ক্ষমতায় ছিল।

বিএনপির মহাসচিব ১ মার্চ বলেছেন-

‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভ্রান্ত ইতিহাস জানিয়ে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করছে।’

বিএনপির আরেক নেতা বলেছেন-

‘জিয়াউর রহমান মানেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। বাংলাদেশ মানেই জিয়াউর রহমান।’

বিএনপি নেতারা ইতিহাস শুধু বিকৃত করছেন না, নির্লজ্জ মিথ্যাচার করছেন। আমাদের সংবাদপত্র, টেলিভিশন, বেতার ও সামাজিক গণমাধ্যম তার প্রচার দিচ্ছে কোনো এডিট ছাড়াই। তারপরও বলা হচ্ছে- দেশে কথা বলার স্বাধীনতা নেই, লেখার স্বাধীনতা নেই।

স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনের প্রাক্কালে বিশ্বসম্প্রদায় একটি স্বীকৃতি দিয়েছে- ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তে অর্জিত দেশটি আর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় নেই। আন্তর্জাতিক বাস্কেট কেস নেই। এ স্বীকৃতি তাদের খুশি করে না কেন? এর প্রধান কারণ বোধগম্য। গত একযুগে বাংলাদেশ অর্থনীতি অনেকটা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে প্রায় ৫ কোটি ছাত্রছাত্রী। ডিজিটাল বাংলাদেশ আর স্লোগান নেই, বরং অনেকটাই বাস্তব। প্রচণ্ড গরমের সময়েও লোডশেডিং হয় না। পদ্মা সেতুর মতো বড় অর্থনৈতিক বিকল্প নিজের অর্থে বাস্তবায়ন করতে পারছি। অনেক উন্নত দেশও যখন করোনার ভ্যাকসিন সংগ্রহ নিয়ে সমস্যায়, বাংলাদেশ রয়েছে নির্ভাবনায়।

একবার ভেবে দেখুন তো বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসের প্রায় পাঁচভাগের তিনভাগ সময় বিএনপি-জাতীয় পার্টি-জামায়াতে ইসলামীর মতো শক্তি ক্ষমতায় না থাকত, আমাদের অর্জন কত বড় হতে পারত? আওয়ামী লীগ যে প্রায় ত্রিশ বছর ক্ষমতায় ছিল না, তার প্রধান কারণ সামরিক শাসন। বলপ্রয়োগ করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশ এ বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে। বিএনপি এ স্মরণীয় বার্ষিকী উপলক্ষে কর্মসূচি গ্রহণ করবে কি না, এমন প্রশ্নই যে অনেকের মনে ছিল। এই প্রশ্ন উদ্রেক হওয়ার মধ্যেই প্রকৃত সত্য নিহিত। এখন এ দলটির নেতৃত্বে যারা রয়েছেন, তাদের নিশ্চয়ই ১৯৯৬ সালের ২৬ মার্চের কথা মনে আছে। ওই দিনটিতে পূর্ণ হয়েছিল স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী। বিএনপির কোনো কর্মসূচি এ দিনে তো নয়ই, গোটা বছরেও ছিল না। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর রজন্তী উপলক্ষে দেশে ব্যাপক কর্মসূচি নেয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিলিস্তিন মুক্তি সংগ্রামের নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী সুলেমান ডেমিরেল এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৯৯৭ সালের মহান স্বাধীনতা দিবসে বাংলাদেশ সফরে আসেন। তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বড় ধরনের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, যেখানে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।... সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।”

বিএনপি স্বাধীনতার ৫০ বছর পালনের সিদ্ধান্ত, কেবল মার্চ-জুড়ে নয়, আরও কর্মসূচি গ্রহণ করবে। এ কারণে কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন- অবশেষে তাদের সুমতি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেটা ঘটেনি। স্মরণীয় মাসটিকে তারা সেই পুরানো রেকর্ড বাজানোর জন্যই ব্যবহার করছে। বছরের বাকি সময় কী করবে, বুঝতে সমস্যা হয় না।

পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকায় ২০১৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পারভেজ হুদবয় নামের এক কলামিস্ট লিখেছিলেন- পাকিস্তানের অনেকেরই ধারণা ছিল ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে টিকবে না। বাঙালিরা শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে হাতে-পায়ে পড়বে, কাকুতি-মিনতি করে বলবে- ভুল করেছি হুজুর, মাফ করে দেন। অনুগ্রহ করে আবার আমাদের পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।

বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তীর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমরা শুনছি তার স্বীকৃতি। ‘Miraculous’ Bangladesh outshines India, Pakistan on development indicators’-

ভারতের বিখ্যাত টাইমস অব ইন্ডিয়া ২০২০ সালের ১৮ আগস্ট এ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে আরও লিখেছে ‘Bangladesh is a 'South Asian miracle.’

বিএনপি ও এর মিত্ররা স্বাধীনতার মাস হিসেবে পরিচিত মার্চ মাসটিকে যেভাবে ব্যবহার করছে, তাতে কিন্তু আমাদের এ ধারণাই বদ্ধমূল থাকবে- দলটি আদৌ বদলাতে চায় না। আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তরুণ প্রজন্ম জানুক, সে জন্য তাদের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা-আগ্রহ নেই। বরং তারা চাইছে- যেখানে যতটা সুযোগ পাওয়া যায়- চলুক না বিভ্রান্তি সৃষ্টি!

একইসঙ্গে তারা চাইছে ‘দৃষ্টি অন্য পথে ঘুরে যাক’।

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরটি জুড়ে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা এবং আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জন নিয়ে আলোচনা হবে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। আমাদের কোথায় কোথায় ঘাটতি আছে এবং কীভাবে সে সব দূর করা যাবে সেটা নিয়েও আলোচনা কাম্য। অর্থনীতিতে যে ইতিবাচক রূপান্তর ঘটছে, তার গতি বাড়াবে। শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে। শহর ও গ্রামের সুযোগ-সুবিধায় সামঞ্জস্য আনতে হবে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমাতে হবে। আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির সুবিধা ধনবানরা যতটা ভোগ করছে, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তরা সেটা পারছে না। এ ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্নীতি-অনিয়মের প্রতি কঠোরহস্ত হতে হবে।

এ সব ক্ষেত্রে ক্ষমতায় যারা রয়েছে, তাদের দায় বড়। কিন্তু ক্ষমতার বাইরে থাকা সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিরও সক্রিয় অংশগ্রহণ চাই। সরকারের বাইরে যারা, ক্ষমতায় যেতে প্রবল আকাঙ্ক্ষা তাদের থাকবেই। তাদের সব পদক্ষেপ-বক্তব্য সব সময় যুক্তিপূর্ণ হবে, এমন আশা করাও ঠিক নয়। ক্ষমতায় না থাকার যে অনেক জ্বালা!

এটাও মনে রাখতে হবে যে আওয়ামী লীগ টানা ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল। কিন্তু রাজনীতিতে তারা প্রাসঙ্গিতা হারায়নি। তারা নির্দিষ্ট কিছু এজেন্ডায় অবিচল ছিল- মুক্তিযুদ্ধের ধারায় বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার করতে হবে। পরনির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে হবে।

১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ যে লক্ষ্য অর্জনে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে পেরেছে তার মূলে কিন্তু এটাই। এটাও আমাদের ভুললে চলবে না যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার জন্য যে দীর্ঘ আন্দোলন করেছে তাতে প্রধান মনোযোগ ছিল জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপর। তারা বিএনপি নেতাদের মতো বলেনি- ‘লাঠি লাগে, অস্ত্র লাগে যা কিছু লাগে আমরা প্রস্তত। সাত দিনের মধ্যে সরকারকে ফেলে দেব!’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শক্তির উৎসও ছিল এই জনগণ, যাদের সংগঠিত ও সচেতন করার জন্য দুই দশকেরও বেশি সময় ঘুরেছেন বাংলার পথে-প্রান্তরে। এ জনগণের শক্তিতেই তিনি পাকিস্তানের নিষ্ঠুর সামরিক শাসকদের চ্যালেঞ্জ করতে এবং তাদের পরাভূত করতে পেরেছিলেন। তার নাম উচ্চারণ পর্যন্ত নিষিদ্ধ করার পরও যে জনগণ তাকে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে রেখেছে, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির আসনে ঠাঁই দিয়েছে; এর কারণ বুঝতে তাই কারও সমস্যা হয় না।

বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন যে, একাত্তরের রাজাকার-আলবদরের দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট থাকা ঠিক নয়। একাত্তরের গণহত্যা ও নারী ধর্ষণে জামায়াতে ইসলামীর সরাসরি অংশগ্রহণের কারণে নয়, বরং এ দলটির প্রতি ‘পশ্চিমা দেশগুলোর বিরূপ মনোভাবের’ কারণে এমন ভাবনার উদ্রেক তাদের।

হায়রে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল! স্বাধীনতার ৫০ বছরে বিদেশি প্রভুদের খুশি করার চিন্তা ছাড়া কিছুই মাথায় আসে না তাদের। অথচ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা কী সাহস ও দৃঢ়তায় বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিলেন- নিজেদের অর্থেই নির্মিত হবে পদ্মা সেতু।

বিএনপি নেতারা কিছুই কি শিখবে না?

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, কলাম লেখক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
স্বপ্নের জলশহর: ‘কঠিনের’ ঘটুক উত্তরণ

শেয়ার করুন

অবিনাশী কণ্ঠের চেতনা

বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালির মনে যখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, ইতোমধ্যেই জ্বলে উঠছে, পুনরায় উনুন স্থাপনের দরকার নেই। তাই তিনি কেবল অগ্নি সংযোগের ক্ষেত্র আর পদ্ধতিগুলোই বলেছেন। যাতে করে অগ্নিস্নাত হয়ে পবিত্র জন্মভূমি পায় প্রকৃত মুক্তি।

জাতির জীবনে এসেছে এক স্মরণীয় সময়। জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ চলছে। এ সময়ে দ্বারপ্রান্তে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। দরজায় কড়া নাড়ছে ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধুর পঞ্চাশ বছর আগে দেয়া তার দিকনির্দেশনা আজও বাঙালি জাতিকে ধ্রুবতারা হয়ে পথ দেখায়।

বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ তার ১৮.৩১ মিনিটের ভাষণে বাঙালি জাতিকে মুক্তির পূর্ণ রূপরেখা দেখিয়েছিলেন। যে ভাষণে তিনি বাঙালির মুক্তির পথ তুলে ধরেছিলেন সে ভাষণ আজ আর কেবল বাঙালির জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের অধিকারবঞ্চিত মানুষের মুক্তির সনদ। UNESCO তার এই ভাষণকে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর Memory of the World Register-এ অন্তর্ভুক্ত করে। এছাড়াও ব্রিটিশ গবেষক জ্যাকব এফ ফিল্ড তার সম্পাদিত গ্রন্থ ‘We Shall Fight on the Beaches : Speeches that Inspired History’ (2013)-এ অন্তর্ভুক্ত করেন; যেখানে স্থান পেয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ থেকে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ৪১টি ভাষণ।

ভাষণের শুরুতেই তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বাঙালির বৈষম্যের ইতিহাস তুলে ধরেন। আর বাঙালির অস্তিত্বের স্বকীয়তা রক্ষার প্রয়োজনীতা তুলে ধরেন। তিনি আগেই জ্ঞাত হয়েছিলেন যে, স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে বিরাট রক্তপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ পাকিস্তানি মিলিটারি তখন চতুর্দিকে এমনকি হেলিকপ্টারে করেও সশস্ত্র পাহারা দিচ্ছিল। তাই তিনি সকলের পরামর্শ সত্ত্বেও ‘বাংলাদেশ স্বাধীন’ কথাটি বলেননি। কিন্তু পরোক্ষভাবে তিনি কেবল স্বাধীনতার ঘোষণাই দেননি বরং যুদ্ধের রণকৌশলও বর্ণনা করেছেন। তিনি পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে প্রশাসনিক, সামরিক, বিচার বিভাগীয়, আইনশৃঙ্খলাসহ সার্বিক অসহযোগিতার ঘোষণা দেন। আবার সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে রেল, গণপরিবহন, বন্দর চালু এবং ব্যাংক কেবল বেতন তুলতে দুই ঘণ্টার জন্য খোলা রাখার নির্দেশ দেন। আবার এটিও উল্লেখ করেন যে, একটি টাকাও যেন পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার না হয়। একদিকে যেমন পাকিস্তানি শোষক সরকারের অসহযোগিতা শুরু হয় তেমনি শাসন, বিচার ও শৃঙ্খলা বিষয়ক যাবতীয় সিদ্ধান্ত তার নেতৃত্বে চলে আসে। ফলে ৩২ নম্বর বাড়ি হয়ে ওঠে অস্থায়ী সচিবালয় আর তিনি হয়ে ওঠেন দেশের ডি ফ্যাক্টো সরকার।

তিনি বাঙালিকে দৃঢ়কণ্ঠে রণকৌশলের দিকনির্দেশনা দেন তা ছিল বিন্দুতে সিন্ধু বর্ণনার মতো অনবদ্য আর শক্তি ও সাহস জোগাতে অনন্য। তিনি এভাবে বলেন-

“আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।”

তিনি আরও বলেন-

“তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।”

অর্থাৎ তিনি সর্বতোভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতির আহবান জানান। আর একাগ্রতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন-

“রক্ত যখন দিয়েছি, আরও দেব। তবু এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।”

সর্বশেষ তিনি ঘোষণা করেন-

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম! এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ স্বাধীন’ শব্দ দুটি ছাড়া তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের এমন কোনো দিকনির্দেশনা নেই যা উল্লেখ করেননি। তাই একে একটি দার্শনিক ভাষণ হিসেবে চিহ্নিত করাই সমীচীন। কারণ বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালির মনে যখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, ইতোমধ্যেই জ্বলে উঠছে, পুনরায় উনুন স্থাপনের দরকার নেই। তাই তিনি কেবল অগ্নি সংযোগের ক্ষেত্র আর পদ্ধতিগুলোই বলেছেন। যাতে করে অগ্নিস্নাত হয়ে পবিত্র জন্মভূমি পায় প্রকৃত মুক্তি। তার এ ভাষণের মূল্যায়ন করতে গিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ একে কবিতা বলে আখ্যায়িত করেছেন এভাবে-

“শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে

অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,

হৃদয়ে লাগিল দোলা,

জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা- ;

কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?

গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর

অমর কবিতাখানি।”

তিনি আরও বলেছেন সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের। আর প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তার এক স্মৃতিচারণে বলেছেন-

তিনি তখন তিনি এক বিদেশি পরিদর্শকের ভাষান্তরের কাজ করছিলেন সেই ময়দানে। ভাষণ শুরুর অল্প পরেই পরিদর্শক ভাষান্তর থামিয়ে দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভাষণ শুনলেন। এবং যখন তিনি পরিদর্শককে জিজ্ঞেস করলেন তিনি কী বুঝলেন। পরিদর্শক তাকে কেবল বললেন, “Get ready”।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ তাই আজ দেশ-কাল-ভাষার ঊর্ধ্বে কেবল মানবতার সংগ্রামের কথা বলে। মানুষের অস্তিত্ব স্বকীয়তা আর স্বাধীনতার কথা বলে। তার দেখানো পথে নিরস্ত্র বাঙালি কেবল অদম্য সাহস আর চেতনায় ভর করে মুক্তির সংগ্রাম শুরু করেছিল আজ তার ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে তার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বিশ্ব দরবারে অর্জন করেছে সম্মানের আসন। রবীন্দ্রনাথের ভাষ্যের মতোই তিনি আজও বাঙালির চেতনা আর ধমনীতে চির প্রবহমান।

লেখক: ছাত্রনেতা

আরও পড়ুন:
স্বপ্নের জলশহর: ‘কঠিনের’ ঘটুক উত্তরণ

শেয়ার করুন

ভোটার দিবস ও ভোটের নির্বাচন

সাধারণ মানুষ ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন করতে পারে, প্রধানমন্ত্রী বদলে দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো সাধারণ জনগণের ক্ষমতার মূল অস্ত্র যে ভোটাধিকার, সেটি অনেকদিন ধরেই অকার্যকর। ভোটাধিকারের জন্য মানুষের হাহাকার সংসদের সমান বয়সী। ৭৩ সালে প্রথম সংসদেও জাসদের রশিদ ইঞ্জিনিয়ারের বিপক্ষে খন্দকার মুশতাককে জেতাতে দাউদকান্দি থেকে ব্যালট বাক্স ঢাকায় উড়িয়ে আনতে হয়েছিল। আর পঁচাত্তরের পর থেকে ৯১ পর্যন্ত নির্বাচনি ব্যবস্থা পিষ্ট ছিল বুটের তলায়। এই সময়ে অবিশ্বাস্য সব নির্বাচনি পরিসংখ্যান এখনও হাসির খোড়াক জোগায়। ‘হোন্ডা-গুন্ডা-ডান্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা’- এই ছিল বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা। স্বৈরাচার পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একাধিক বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে বটে, তবে মাঝে ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, নির্বাচনি ব্যবস্থার আরেকটি কলঙ্ক হয়ে আছে। ব্যারিস্টার মওদুদের কূটকৌশল ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকেও অকার্যকর করে দেয়।

জাতীয় ভোটার দিবস ছিল ২ মার্চ। আসলে ভুলেই গিয়েছিলাম,
বাংলাদেশে এমন একটি দিবস আছে। পরে খোঁজ নিয়ে দেখলাম, এবারই প্রথম নয়, তিন বছর ধরে নির্বাচন কমিশন জাতীয় ভোটার দিবস পালন করছে। বাংলাদেশের ভোটারদের ভোটাধিকার না থাকলেও, তাদের জন্য একটি দিবস আছে, নির্বাচন কমিশন ভোটারদের মনে রেখেছে; এ বড় আনন্দের খবর।

এবারের জাতীয় ভোটার দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘বয়স যদি আঠারো হয়, ভোটার হতে দেরি নয়’। স্লোগানটি অবশ্য প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী। ভোট দিতে না পারলেও ভোটার হতে সবার দারুণ আগ্রহ।
এটা অবশ্য নিছক ভোটার হওয়ার ভালো লাগার আগ্রহ নয়। ভোটার হওয়াটা অত জরুরি হয়তো নয়, তবে জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়াটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নামে জাতীয় পরিচয়পত্র হলেও সবাই একে চেনে ‘ভোটার আইডি কার্ড’ নামে। ভোট দিতে জাতীয় পরিচয়পত্র অপরিহার্য না হলেও জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া এখন একজন নাগরিকের পা ফেলার জো নেই। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে পদে পদে এখন জাতীয় পরিচয়পত্রের দরকার হয়। তাই ভোট দিতে পারুক আর না পারুক, ভোটার হতে সবাই ব্যাকুল।
ভোট দেয়া মানুষের অধিকার। এই যে আমরা বলি সকল ক্ষমতা জনগণের। তো জনগণের সেই ক্ষমতার উৎস কী, ক্ষমতা প্রয়োগের অস্ত্র কী? জনগণের সকল ক্ষমতার উৎস ভোট।
কারণ সাধারণ মানুষ ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন করতে পারে, প্রধানমন্ত্রী বদলে দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো সাধারণ জনগণের ক্ষমতার মূল অস্ত্র যে ভোটাধিকার, সেটি অনেকদিন ধরেই অকার্যকর। ভোটাধিকারের জন্য মানুষের হাহাকার সংসদের সমান বয়সী। ৭৩ সালে প্রথম সংসদেও জাসদের রশিদ ইঞ্জিনিয়ারের বিপক্ষে খন্দকার মুশতাককে জেতাতে দাউদকান্দি থেকে ব্যালট
বাক্স ঢাকায় উড়িয়ে আনতে হয়েছিল। আর পঁচাত্তরের পর থেকে ৯১ পর্যন্ত নির্বাচনি ব্যবস্থা পিষ্ট ছিল বুটের তলায়। এই সময়ে অবিশ্বাস্য সব নির্বাচনি পরিসংখ্যান এখনও হাসির খোড়াক জোগায়। ‘হোন্ডা-গুন্ডা-ডান্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা’- এই ছিল বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা। স্বৈরাচার পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একাধিক বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে বটে, তবে মাঝে ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, নির্বাচনি ব্যবস্থার আরেকটি কলঙ্ক হয়ে আছে। ব্যারিস্টার মওদুদের কূটকৌশল ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকেও অকার্যকর করে দেয়।

২০০৮ সালের পর থেকে নির্বাচন ব্যবস্থার অধঃপতন শুরু। ২০১৪ সালের একতরফা আর ২০১৮ সালের অবিশ্বাস্য নির্বাচন পুরো নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে শূন্যে নামিয়ে এনেছে। নির্বাচন মানেই যেন প্রহসন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর দলীয় সরকারের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয়
প্রার্থীদের বিপুল বিজয় সত্ত্বেও জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। একতরফা সে নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যাওয়ায় নির্বাচনের নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। নির্বাচন ঠেকানোর নামে বিএনপি দেশকে সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত করেছিল। তারা আশা করেছিল আন্দোলন করে নিজেরা আরেকটি নির্বাচন আদায় করতে পারবে।

১৫ ফেব্রুয়ারির পর আওয়ামী লীগ যেটা পেরেছিল, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি সেটা পারেনি। ২০১৪ সালের নির্বাচনই আসলে বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থায় শেষ পেরেক। নির্বাচন নিয়ে এখন আর কেউ সিরিয়াস নয়। সবাই যেন আগেই জানে, নির্বাচনে
ফলাফল কী হবে! তবে আগের মতো এখন আর ‘হোন্ডা-গুন্ডা-ডান্ডা’র নির্বাচন হয় না। দেশ ডিজিটাল হয়েছে, কৌশলও ডিজিটাল হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ আগের রাতেই ভোট হয়েছে। অভিযোগ বহুল প্রচলিত, ধারণাটা শক্ত; কিন্তু প্রমাণিত নয়। বিএনপি ঐক্যফ্রন্ট করে নির্বাচনে অংশ নিলেও আসন পেয়েছে মাত্র ছয়টি। কিন্তু অভিযোগ যতটা গুরুতর, প্রতিরোধ ততটাই নিরুত্তাপ। মাঠে বা আদালতে কোথাও বিএনপি সে নির্বাচনের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়তে পারেনি। এমনকি ‘যাব না, যাব না’ করেও শেষ মুহূর্তে সংসদে যোগ দিয়ে বিএনপি ২০১৮ সালের নির্বাচনকে এক ধরনের বৈধতাই দিয়েছে।

বিএনপির মূল যে দাবি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, সেটি বোধহয় তারাও ভুলে গেছে। তবু নিয়ম করে নানা নির্বাচন আসে। কোনোটাতে বিএনপি অংশ নেয়, কোনোটাতে নেয় না। বিএনপি অংশ নিক আর না নিক, নির্বাচনের ফলাফল কিন্তু অনুমিত-
ক্ষমতাসীন দলের বিপুল বিজয়। পাঁচ দফায় দেশে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল পৌরসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি ঘটেছে। ২৩০টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জিতেছে ১৮৫, বিএনপি মাত্র ১১টিতে।

৯৩ পৌরসভায় বিএনপি প্রার্থীরা জামানত হারিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপি আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বিএনপি অংশ নিক আর না নিক, নির্বাচন নিশ্চয়ই যে স্টাইলে চলছে, সে স্টাইলেই চলবে। পৌরসভা নির্বাচন নিয়েও অভিযোগের অন্ত নেই। সব পুরোনো অভিযোগ। সব যেন আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। নির্বাচন কোনটা কোনটা খারাপ, তার তালিকা লম্বা হয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু যায় আসে না। গণমাধ্যম আর বিরোধী দলের অভিযোগ নির্বাচন কমিশন এক কান দিয়ে শোনে আরেক কান দিয়ে বের করে দেয়। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার একা একা কথা বলেন, প্রতিবাদ করেন; কে শোনে কার কথা!
নির্বাচনিব্যবস্থা যখন আস্থাশূন্যতায় ভুগছে, তখন ঘটা করে জাতীয় ভোটার দিবস পালন আসলে প্রহসনেরই নামান্তর।

আরও পড়ুন:
স্বপ্নের জলশহর: ‘কঠিনের’ ঘটুক উত্তরণ

শেয়ার করুন

বাংলাদেশ: এশিয়ায় বিস্ময়কর ডিজিটাল লিডার

সরকার সাড়ে ৮ হাজার ডিজিটাল সেন্টারের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে যা বলতে গেলে আজীবন অনলাইন সেবা দিচ্ছে। জন্মনিবন্ধন, কর্মসংস্থান এবং অনলাইন স্বাস্থ্যসেবা এই ডিজিটাল সেবার আওতাধীন। অনেক জাতীয় কর্মসূচিও অনলাইনের অন্তর্ভুক্ত। গত বছর করোনাভাইরাসের সময় লকডাউনে সরকারি সেবায় বলতে গেলে কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি।

এক দশকের কিছু আগে বাংলাদেশ অঙ্গীকার করেছিল, স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকী ২০২১ সালের মধ্যে প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর জাতিতে নিজেদের রূপান্তর ঘটানো হবে।

অনেকেই বিশ্বাস করেনি যে, এটা আমরা করতে পারব।

এই প্রকল্পের প্রধানতম ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় আসেন, সেই ২০০৯ সালে দেশে মাত্র ২ কোটি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন ছিল। কিন্তু এখন ১২ কোটি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন রয়েছে এবং আরও কয়েক কোটি মানুষ প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দ্রুত গতির নেটওয়ার্কে যুক্ত। এর ফলে অগণিত মানুষের জীবনের উন্নয়নও রক্ষা পেয়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা ঘোষণা হয় ২০০৯ সালে। যার লক্ষ্য ছিল সরকারি দীর্ঘসূত্রতা ও কাগজভিত্তিক সেবাকে সহজসাধ্য ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনের আওতায় নিয়ে যাওয়া। ই-সিগনেচার ও ইলেকট্রনিক ফাইলিংয়ের ব্যাপক ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

এটা কাজ করেছে। সরকার সাড়ে ৮ হাজার ডিজিটাল সেন্টারের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে যা বলতে গেলে আজীবন অনলাইন সেবা দিচ্ছে। জন্মনিবন্ধন, কর্মসংস্থান এবং অনলাইন স্বাস্থ্যসেবা এই ডিজিটাল সেবার আওতাধীন। অনেক জাতীয় কর্মসূচিও অনলাইনের অন্তর্ভুক্ত। গত বছর করোনাভাইরাসের সময় লকডাউনে সরকারি সেবায় বলতে গেলে কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি।

আদালত তার কার্যক্রম চালিয়ে গেছে নতুন বিচারিক পোর্টালের মাধ্যমে। কৃষি পোর্টালের মাধ্যমে আবহাওয়া ও কৃষি সম্পর্কিত অনেক খবর পেয়েছেন কৃষকেরা। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে করোনা সম্পর্কিত তথ্য পেয়েছেন সাধারণ জনগণ।

বিশ্বের অন্যতম বড় সরকারি পোর্টাল চালু করেছে সরকার, যেখানে সরকারের প্রায় প্রতিটি সেবা সংযুক্ত। বাংলাদেশের লক্ষ্য হলো, ৮৫ ভাগ সেবা আঙুল চেপে (স্মার্টফোনের মাধ্যমে) পাবেন জনগণ, ১০ শতাংশ সেবা বাড়ির দরজায় পৌঁছে যাবে, আর ৫ শতাংশ কাজের জন্য যেতে হবে সরকারি দপ্তরে।

তাই অনেক কর্মসূচি অনলাইনে চলে গেছে, যেখানে সরকারি অফিসের সঙ্গে বলতে গেলে সরাসরি কোনো কাজ করারই দরকার পড়ছে না। পাসপোর্ট প্রাপ্তি, ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদনের মতো কাজের ক্ষেত্রে নাটকীয় উন্নতি ঘটেছে।

সাফল্যের এই গল্পের পেছনে একটি বড় ভূমিকা রেখেছে মোবাইল ফোন। বাংলাদেশের এখন একটি টোল ফ্রি জাতীয় জরুরি ৯৯৯ হেল্পলাইন আছে, যেখানে জনগণ ফোন করে দুর্ঘটনা, সাইবার ক্রাইমসহ বিভিন্ন অপরাধ, নারীর প্রতি সহিংসতা, আগুন ও জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে সেবা চাইতে পারছেন।

সংশ্লিষ্ট জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য কৌশলকে ধন্যবাদ, টেলিমেডিসিন কেবল সম্ভবই হয়নি, এটি বিশেষ করে বঞ্চিত প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখন একটি কমপ্লায়েন্স। এর কর্মসূচিগুলো সুস্বাস্থ্যের অধিকারী জনগোষ্ঠী তৈরির লক্ষ্যে মৌলিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য প্রচার করছে । এ ছাড়া সরকার আরও জবাবদিহিনির্ভর এবং দায়বদ্ধ হয়ে উঠেছে। অনলাইন অভিযোগের প্রতিকার ব্যবস্থা বাংলাদেশিদের সহজেই সরকারি সেবা বা পণ্য সম্পর্কে অনলাইনে অভিযোগ দেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

বিস্তৃত সংযোগ অর্থনীতিতেও সহায়তা করেছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। একটি দক্ষ, ডিজিটালি প্রস্তুত জনবল তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ তার পুরো শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করেছে এবং এখন বার্ষিক পাঁচ লাখ স্নাতক কর্মী বের হচ্ছেন। কেবল গত বছরই তাদের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী তৈরি হয়েছেন ৬৫ হাজার।

ডিজিটাল কেন্দ্রগুলোই তাদের কাজের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে তিনটি পদের জন্য একটি নারীর জন্য নির্ধারিত।

মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই ২৫ বছরের কম বয়সী বলে বাংলাদেশ সাইবার কর্মী তৈরির একটি উপযুক্ত জায়গা। তরুণরা সুযোগটি লুফে নিচ্ছেন। এর আগে তাদের বেশির ভাগ পরিবারের সদস্য কৃষিকাজের বাইরে নতুন কিছু করার কথা কল্পনাও করতে পারতেন না। বর্তমানে তরুণ বাংলাদেশিদের বেশির ভাগই নগরজীবন, স্মার্টফোনে অভ্যস্ত এবং নতুন অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশে প্রস্তুত।

ডিজিটালাইজেশন থেকে উল্লেখযোগ্য রকম লাভবান হয়েছে বাংলাদেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণাটির সূচনা হওয়ার পর থেকে প্রযুক্তিতে দক্ষ ১৩ লাখের বেশি পেশাজীবী বাংলাদেশে থিতু হয়েছেন। দেশটির প্রযুক্তি খাতে উদ্যোক্তার সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। সম্মিলিতভাবে এ খাত থেকেই তারা প্রতি বছর ১০০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আনছেন। অন্যদিক থেকে দেখতে গেলে, ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণা চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশিরা ২০০ কোটি ঘণ্টা, ৮০০ কোটি ডলার এবং সরকারি স্থাপনাগুলোতে ১০০ কোটি পরিদর্শন বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশ এখন আক্ষরিক অর্থেই নক্ষত্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ২০১৮ সালে প্রথম যোগাযোগ স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ মহাকাশে পাঠায় এ দেশ। টেলিযোগাযোগ সেবায় যুক্ত হয়ে এই স্যাটেলাইট আমাদের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে।

কী অসাধারণ অভিযাত্রা!

২০০৮ সালে বাংলাদেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি ছিল প্রায় ৫ শতাংশ। আজ এ হার ৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এই উন্নতির জন্য দ্রুত গতির যোগাযোগব্যবস্থার ভূমিকা অনস্বীকার্য।

মালদ্বীপ, ভুটান, শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়ার বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশে ডিজিটালাইজেশন ছড়িয়ে দিতেও কাজ করছেন বাংলাদেশি প্রশিক্ষকরা।

এক দশক আগেও কেউ ভাবেনি, এটা কখনও সম্ভব।

সজীব ওয়াজেদ জয়: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আইসিটি উপদেষ্টা

নিবন্ধটি ৩ মার্চ যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টে প্রকাশিত। ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তর করেছেন সারোয়ার প্রতীক

আরও পড়ুন:
স্বপ্নের জলশহর: ‘কঠিনের’ ঘটুক উত্তরণ

শেয়ার করুন

বিষয়টি তুচ্ছ নয়

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কোনো দেশ যদি অধিকতর বাস্তবসম্মত শ্রম এবং কর্মসংস্থান নীতি গ্রহণ করতে চায়, তাহলে অবশ্যই নারীর অ-অর্থনৈতিক কাজকে শ্রমবাজার অর্থনীতির আলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে। এসডিজি লক্ষ্য ৫.৪ এ স্পষ্টতই বলা হয়েছে পরিবারে কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়ার, পুরুষকে কাজে নিয়োজিত করা এবং প্রজন্মান্তরে কর্ম বিভাজনের ধারার কথা।

দুটি ইঁদুর নরণ-চরণ আর লালঝুঁটি মুরগি বাস করত গ্রামের এক প্রান্তে। মুরগি সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির উঠান ঝাড় দেয়, রান্নাবানা করে। একদিন উঠান ঝাড় দিতে গিয়ে সে কুড়িয়ে পেল একটি গমের শীষ। সঙ্গে সঙ্গে নরণ-চরণকে ডাক দিয়ে বলল, নরণ-চরণ এদিকে আয়। দেখ কী কুড়িয়ে পেলাম! নরণ-চরণ দেখে খুশি হয়ে বলল, খুব ভালো, তাহলে পিঠা তৈরি কর।

মুরগি বলল, পিঠাতো বানাতেই পারি। কিন্তু আটা কুটবে কে?

নরণ-চরণ বলল, আমরা পারব না বাপু।

তাহলে আটার কলে গম ভাঙাতে নিয়ে যাবে কে?

নরণ-চরণ বলল, আমরা পারব না বাপু।

আচ্ছা, তাহলে পিঠাটা বানাবে কে?

এবারেও নরণ-চরণ বলল, আমরা পারব না বাপু।

লালঝুঁটি মুরগিটি তখন বলল, ঠিক আছে। তাহলে আমিই সব করছি। এবার নরণ-চরণ খুশি হয়ে নাচ-গান-খেলাধুলা শুরু করল।

পিঠা বানানোর পর নরণ-চরণ ছুটে এলো পিঠা খাওয়ার জন্য। এবার মুরগি বলল, গমের শীষ কুড়িয়ে পেলো কে?

উত্তর এলো, তুমি।

শীষটা ঝাড়াই বাছাই করল কে?

উত্তর এলো, কেন তুমি।

বাজার থেকে তেল, গুড় এনে পিঠা বানাল কে?

উত্তরে নরণ-চরণ চিঁচিঁ করে বলল, তুমিই তো সব করলে।

মুরগি বলল, তাহলে বল এবার পিঠাটা খাবে কে?

নরণ-চরণ কোনো উত্তর না দিয়ে মন খারাপ করে চলে গেল।

আমাদের পরিবারে মা বা গৃহিণীর ভূমিকাটা ঠিক এই গল্পের মতোই। শুধু পার্থক্য হলো মা সব কাজ করার পর পিঠাটা পরিবারের সদস্যদের মুখেই তুলে দেন। প্রায়শই নিজের ভাগটাও পান না। দেখা গেছে আমাদের পরিবারগুলোতে অধিকাংশ সদস্যের ভূমিকা এই নরণ-চরণের মতো। এরপরও এই নরণ-চরণরা বলে, আমার মা তো বা আমার স্ত্রীতো কিছুই করে না।

এই প্রসঙ্গটা উঠে আসার কারণ হলো, সম্প্রতি চীনের বেইজিংয়ের একটি আদালত বৈবাহিক জীবনে স্ত্রী ঘরের যেসব কাজ করেছেন, এর জন্য তাকে অর্থ দিতে স্বামীকে নির্দেশ দিয়েছেন। বেইজিংয়ের আদালতের এই রায়কে ঐতিহাসিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। আদালতের এই রায়ের ফলে ওই নারী তার পাঁচ বছরের বৈবাহিক জীবনে গৃহকর্মের জন্য ৫০ হাজার ইউয়ান পাবেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা সাড়ে ছয় লাখ টাকার বেশি। মামলা ও আদালতের রায় নিয়ে চীনের সাইবার জগতে ব্যাপক তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে।

নতুন আইন অনুযায়ী, বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রী ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবেন, যদি তিনি বৈবাহিক জীবনে তার জীবনসঙ্গীর তুলনায় ঘরের কাজ ও দায়িত্ব বেশি পালন করেন। আদালত বলেছেন, বিবাহবিচ্ছেদের পর সাধারণত দুজনের (দম্পতি) যৌথ পরিমাপযোগ্য সম্পত্তি ভাগাভাগি হয়। কিন্তু গৃহস্থালি কাজ অপরিমাপ্য সম্পত্তি, আর তার মূল্যও রয়েছে।

এই রায় নিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। খবরটির নিচেও মন্তব্যের ঘরে যথেষ্ট মতামত পাওয়া যাচ্ছে। অধিকাংশ পুরুষই এই রায়কে মেনে নিতে পারছেন না। তারা তাদের কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরছেন। যেসব পুরুষ সংসারে আয় করার পাশাপাশি ঘরের কাজেও দায়িত্ব পালন করেন, তারাতো অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। অবশ্য তাদের একথাও মনে রাখতে হবে যে অসংখ্য নারীও ঘরে-বাইরে সমানতালে কাজ করে চলেছেন। সেক্ষেত্রে তাদের মূল্যমান কিন্তু পুরুষের চেয়েও বেশি। এখন কথা হচ্ছে নারীর সেসব গৃহস্থালি, সেবামূলক ও কৃষিকাজ নিয়ে, যা উৎপাদনশীল অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত হওয়া সত্ত্বেও, বিভিন্ন কারণে অস্বীকৃতই থেকে যাচ্ছে। এমনকি সংসারে সিংহভাগ কাজ নারী করলেও তাকে এসব কাজের জন্য স্বামী-সন্তান- পরিবারের পক্ষ থেকে ন্যূনতম ধন্যবাদও দেয়া হয় না। এর মানে হচ্ছে তারা মনে করেন নারীর এসব কাজ মূল্যহীন।

প্রসঙ্গটি পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য একটি ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করছি। আম্মা একবার সপ্তাহখানেকের জন্য রংপুর যাওয়ার পর পরই বাসায় চূড়ান্ত অব্যবস্থা দেখা দিল। একজন সহযোগী থাকার পরও বাসার অবস্থা দুঃসহ। শেষমেষ ফোন করে আম্মাকে ৪ দিনের মাথায় ফিরিয়ে আনা হলো। হাড়ে হাড়ে বুঝলাম আম্মার সার্ভিস এবং ব্যবস্থাপনা ছাড়া আমরা অসহায় এবং আম্মা ছাড়া আমাদের সংসার শূন্য। সেবার থেকেই মেনে নিলাম আম্মাই হলো বাসার প্রকৃত বস।

একথা এখনও মানি যে, আম্মার তত্ত্বাবধান ছাড়া আমাদের কারো পড়াশোনা হতো না। অসুস্থতার সময় আম্মার সেবা না পেলে আমাদের সেবা করার আর কেউ ছিল না। আব্বা থাকলেও আম্মাই ছিলেন আসল। সেদিন আব্বা এবং আমরা কেউ বুঝিনি আম্মার এই গৃহস্থালি এবং সেবামূলক কাজের পরিমাপ কতটা বা এ কাজ জিডিপিতে কতটা প্রভাব রাখতে পারে। স্কুল থেকে বাসায় ঢুকে নরণ-চরণের মতো চিৎকার করে বলতাম, আম্মা খিদা লেগেছে, খাবার দাও। তারপর খেয়েদেয়ে আম্মার আঁচলে মুখ মুছে চলে যেতাম। এ শুধু আমার একার পরিবারের চিত্র নয়, সবাই ভেবে দেখলে একই ছবি দেখতে পাবেন।

আজ বুঝতে পারি সংসারে মায়ের কাজের যে ভার, তা আর কারো কাজের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং বেশি। গৃহস্থালি কাজকে আমরা এতটাই অবজ্ঞা করি ও নগণ্য মনে করি যে, একজন গৃহিণীকে দেখবেন নিজের পরিচয় দিতে খুব অস্বস্তিবোধ করেন। মৃদুস্বরে বলেন, আমি কিছু করি না, অথবা বলেন, আমি শুধু ঘরের কাজ করি।

লক্ষ করে দেখবেন এত কাজ করা সত্ত্বেও নিজেদের পরিচয় দেয়ার সময় গৃহিণীদের মাথা লজ্জায় নত হয়ে আসে। যে সন্তান বা যে স্বামীর জন্য তারা পুরো জীবন উৎসর্গ করেন, তারাও তাদের গৃহিণী মায়ের বা স্ত্রীর পরিচয় দিতে অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কারণ সমাজ আমাদের মাথায় গেঁথে দিয়েছে যে গৃহকাজ আসলে কোনো কাজ নয়। অথচ সকাল থেকে সন্ধ্যা-অব্দি একজন নারী যা করেন, কখনও কি সেই কাজের হিসাব করে দেখেছেন? সেই কাজটা গৃহিণী না করে, অন্য কাউকে দিয়ে করালে এই খাতে পরিবারের কী পরিমাণ খরচ হতো একবার চিন্তা করুন। শুধু কি খরচ? কত ধরনের ঝামেলা পোহাতে হতো পরিবারকে। মা বা স্ত্রী গৃহে আছেন বলেই তার পরিবারের সব সদস্য যথাসময়ে যথাযথ সুবিধাটি পাচ্ছে।

রোগে-শোকে মা বা স্ত্রী-ই পাশে থাকেন, সংসারের সব কাজ করেন, বয়স্ক মানুষ থাকলে তাদের দেখাশোনা করেন, বাচ্চাকে পড়ান, টিফিন তৈরি করে দেন মা, স্কুলে আনা-নেয়ার কাজটিসহ আরও অন্য সব সাংসারিক দায়িত্বও পালন করেন। কৃষিকাজের ২৩টি কাজের মধ্যে ১৭টিই করেন নারী। গৃহিণীরা কাজ করেন না, এরপরেও কি একথা ধোপে টেকে?

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে গত ২/৩ দশক ধরে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ৮০ সালের মাঝামাঝিতে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ৮ শতাংশ, ২০১৬-১৭ সালে এসে তা হয়েছে ৩৬.৩ শতাংশ। দেশের পিতৃতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থার কারণে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার পরও এই সংখ্যাগত হার তেমন বাড়েনি, বরং পুরুষের চেয়ে তা অনেক কম।

অর্থনীতিতে নারীর অবদান এখনও যথার্থ দৃষ্টি পাচ্ছে না। নারী তার সময়ের একটা বড় অংশ বাজার-কেন্দ্রিক কাজের চেয়ে বাজার বহির্ভূত কাজে ব্যস্ত থাকেন। এই বিনামূল্যের গৃহস্থালি কাজগুলোকেই অ-অর্থনৈতিক কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অস্বীকৃত এবং অদৃশ্য কাজগুলো শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রান্না, শিশুযত্ন, বয়স্ক মানুষের যত্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে আছে কৃষিকাজ, গবাদিপশুর দেখাশোনা ও বীজ সংরক্ষণ।

অর্থনীতিবিদরা দেখিয়েছেন দেশে ৪৩ শতাংশের বেশি নারী পুরোপুরিভাবে গৃহস্থালি কাজের সঙ্গে যুক্ত। পুরুষের সংখ্যা সেখানে ১ শতাংশেরও কম। অথচ দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপি) তে নারীর অবদান মাত্র ২০ শতাংশ।

যেহেতু আর্থিক মূল্য ছাড়া কোনো কাজই বাজার অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত হয় না, তাই বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতিবিদরা সাধারণত স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট সিস্টেমের ওপর নির্ভর করেন। স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে নারীর অমূল্যায়িত কাজকে চিহ্নিত করে তা নিরূপণ করা যাবে।

স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট সিস্টেম হচ্ছে এমন একটি হিসাব পদ্ধতি, যা দিয়ে ঘরের অ-অর্থনৈতিক সেবামূলক বা গৃহস্থালি কাজ মাপা হয়। এই কাজগুলো কোনো অর্থনৈতিক লেনদেন বা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশা ছাড়াই গৃহিণীরা করে থাকেন। কিন্তু এই কাজগুলো জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে ।

এখন বৈশ্বিক এজেন্ডা হচ্ছে এমন সমাধান খুঁজে বের করা, যার মাধ্যমে নীতি বা পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটিয়ে নারীর অর্থনৈতিক কাজকে উৎসাহিত করা যায়। সেসঙ্গে এমন সুযোগ সৃষ্টি করা যেন নারী কোনো সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাজে যোগ দিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।

জেন্ডার সমতা আনার ক্ষেত্রে এসডিজি ৫ অর্জন করতে চাইলে অবশ্যই নারীর অস্বীকৃত গৃহস্থালির কাজকে মূল্যায়ন করতে হবে, যা টার্গেট ৫.৪ এবং সূচক ৫.৪.১-এ সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে। এই পদ্ধতিতে সেবা কাজ মূল্যায়নের ভালো উদাহরণ নেপাল, মেক্সিকো, ব্রাজিল এবং কেনিয়াসহ আরও ৮টি দেশ।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কোনো দেশ যদি অধিকতর বাস্তবসম্মত শ্রম এবং কর্মসংস্থান নীতি গ্রহণ করতে চায়, তাহলে অবশ্যই নারীর অ-অর্থনৈতিক কাজকে শ্রমবাজার অর্থনীতির আলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে। এসডিজি লক্ষ্য ৫.৪ এ স্পষ্টতই বলা হয়েছে পরিবারে কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়ার, পুরুষকে কাজে নিয়োজিত করা এবং প্রজন্মান্তরে কর্ম বিভাজনের ধারার কথা ।

আমরা ঠিক এখনই বেইজিং আদালতের রায়ের মতো রায় চাই না, তবে চাই নারী যেন তার গৃহস্থালি ও সেবামূলক কাজের জন্য সম্মানিত হন। সংসারের সব কাজ করেও তাকে যেন সবার সামনে মাথা নত করে থাকতে না হয়। কোনো সন্তান যেন মনে না করে তার মা কিছু করে না। সর্বোপরি স্বামীসহ সংসারের আর কোনো সদস্য যেন বলতে না পারে- সারাটা দিন তুমি করটা কী?

লেখক : সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন:
স্বপ্নের জলশহর: ‘কঠিনের’ ঘটুক উত্তরণ

শেয়ার করুন

মুজিববর্ষে ডিজিটাল বাংলা : অগ্রযাত্রার নতুন মাত্রা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪টি মাইলস্টোন দিয়েছেন, প্রথম ২০২১ সালের রূপকল্প ডিজিটাল বাংলাদেশ, দ্বিতীয় ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা, তৃতীয় ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং চতুর্থ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ সালের জন্য। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তরুণ বয়সে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন আর্কিটেক্ট অব ডিজিটাল বাংলাদেশ সজীব ওয়াজেদ জয়। আইসিটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হওয়ার কারণে করোনা মহামারিকালে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অফিস-আদালত, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে। সরকার করোনা পোর্টাল, কোভিড ট্রেসার, কোভিড-১৯ ট্র্যাকার, ফুড ফর ন্যাশন ও হেলথ ফর ন্যাশনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে করোনা মোকাবিলা করছে।

বিজয়ের প্রায় অর্ধশত বছর পর বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল। জাতিসংঘ ঘোষিত উন্নয়নশীল দেশের পথে এখন বাংলাদেশ। জীবনযাত্রার মান বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ডিজিটাল জগতে প্রবেশ ও এর সদ্ব্যবহার। দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ডিজিটাল বাংলাদেশের বীজ রোপণ করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাংলাদেশকে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ)-এর সদস্যপদ গ্রহণ করান ১৯৭৩ সালে।

১৯৭৫ সালের ১৪ জুন তিনি বেতবুনিয়ায় উপগ্রহ ভূকেন্দ্র উদ্বোধন করে এর গোড়াপত্তন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রোপিত বীজ থেকে জন্ম নেয়া চারাগাছটির বিকাশ আমরা দেখি ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি স্পষ্টতই বলেছেন যে, ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণাটি পেয়েছেন তিনি তার পুত্র এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকে।

সেই ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর কেবল স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা। তথ্যপ্রযুক্তির বাহনে চড়ে দুরন্ত গতিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল সেবা। শহর থেকে শুরু করে দুর্গম প্রান্তিক এলাকার পিছিয়ে পড়া জনসাধারণের জীবনেও লেগেছে ডিজিটাল-স্পর্শ। ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন যাপিত জীবনকে বদলে দেয়ায় সফল এক অভিযাত্রার নাম। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের এ যুগে বাংলাদেশ আজ সামনের সারির একটি দেশ।

বর্তমানে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার। প্রযুক্তিনির্ভর এ পৃথিবীতে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশ এনে দিয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহরে প্রজন্মের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। বর্তমান বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপান্তরের পথে, আর এই স্বপ্ন এবার তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার মধ্যদিয়ে সত্যি হতে চলেছে।

প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করে এদেশের ১৬ কোটি মানুষের জীবনকে সুখী সমৃদ্ধশালী করা এখন আর স্বপ্ন নয়। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই স্বপ্নপূরণে অনেকখানি এগিয়ে গেছেন। মানুষের জরুরি সেবাগুলোর প্রাপ্তি সহজ হয়েছে এবং এরই মধ্যে তা জনগণের কাছে পৌঁছে গেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, এটি এখন বাস্তবতা।

প্রযুক্তির অগ্রগতির ছোঁয়া লেগেছে পুরো বিশ্বে। বাংলাদেশও মাত্র ১২ বছরে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর দিকে। গত এক যুগের অর্জনকে পূর্ণতা দিতে স্বাধীনতার জয়ন্তীতে সেন্টার অব এক্সিলেন্স-৪ আইআর, এজেন্সি টু ইনোভেশন-এটুআই, সাইবার সিকিউরিটি হেল্প ডেস্ক-১০৪ ও ন্যাশনাল ডিজিটাল লাইব্রেরিসহ আরও ১২টি উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের আইসিটি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ডিজিটাল বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার এক যুগে বছরে নানামুখী উদ্যোগ বাংলাদেশের ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়ে ওঠা, অর্জন ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার বিশদ উপস্থাপন করা হয়, বিগত ১২ বছরে দেশে একটি শক্তিশালী আইসিটির ভিত্তি তৈরি হয়েছে, যা গ্রাম এলাকা পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে। দেশের ৩ হাজার ৮০০ ইউনিয়ন এখন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির আওতায়। ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য ইন্টারনেট নিশ্চিত করা হবে। বিষয়গুলো গ্লোবাল ওয়ার্ল্ড সামিট ফর ইনফরমেশন সোসাইটিতে বিষয়গুলো স্বীকৃত ও প্রশংসিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশনে তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের পথিকৃৎ, ২০০৮ সালের ৫০ হাজারেরও কম কর্মসংস্থান এ ১২ বছরে ১৫ লাখের বেশিতে এসেছে; ২০০৮ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল মাত্র ৫৬ লাখ আর তা এখন প্রায় ১২ কোটি; সরকারি ওয়েবসাইট ছিল মাত্র ৫০টিরও কম আর ২০২১ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তথ্য বাতায়ন বাংলাদেশের, যেখানে সরকারি ওয়েবসাইট ৫১ হাজারেও বেশি; ২০০৮ সালে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বাজার ছিল ২৬ মিলিয়ন আর ২০২১ সালে তা এখন ১ বিলিয়ন ডলার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪টি মাইলস্টোন দিয়েছেন, প্রথম ২০২১ সালের রূপকল্প ডিজিটাল বাংলাদেশ, দ্বিতীয় ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা, তৃতীয় ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং চতুর্থ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ সালের জন্য। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তরুণ বয়সে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন আর্কিটেক্ট অব ডিজিটাল বাংলাদেশ সজীব ওয়াজেদ জয়।

আইসিটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হওয়ার কারণে করোনা মহামারিকালে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অফিস-আদালত, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে। সরকার করোনা পোর্টাল, কোভিড ট্রেসার, কোভিড-১৯ ট্র্যাকার, ফুড ফর ন্যাশন ও হেলথ ফর ন্যাশনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে করোনা মোকাবিলা করছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে দেশের জনগণকে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করা, সরকারের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকল্পে জনগণের দোরগোড়ায় নাগরিকসেবা পৌঁছানো, ডিজিটাল বাংলাদেশ লক্ষ্য অর্জনে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সবাইকে প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদানে সমন্বিতভাবে কাজ করে ব্যাপক সফলতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ।

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, পড়াশোনা সবকিছু এগিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তির সঙ্গে। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কল্যাণে এখন ঘরে বসেই নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী খুব সহজেই পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা যায়। ডিজিটাল কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ ও তরুণদের প্রচেষ্টায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তাদের হাত ধরেই দেশে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরা মোবাইলে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে পাচ্ছেন কৃষিসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য। প্রতারণা বা সহিংসতার শিকার হলে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় জরুরি সেবা। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যও এখন ঘরে বসেই মোবাইলের মাধ্যমে পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল কমিউনিকেশনের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যবসা, উদ্যোক্তা তৈরি, পণ্যের প্রচার ও প্রসার ঘটানো যায় খুব সহজেই।

ডিজিটাল বাংলাদেশ মানুষের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। ঘরে বসেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মুহূর্তেই টাকা পাঠানো যায় আপনজনদের কাছে। বিদ্যুৎ বিলও ঘরে বসেই দেয়া যায়। গ্রামীণ মায়েরা সন্তানের উপবৃত্তির টাকা পাচ্ছেন ঘরে বসেই। এখন আর কয়েক কিলোমিটার দূরে ব্যাংকে যেতে হয় না। ডিজিটাল বাংলাদেশে বড় পরিবর্তন এসেছে রাইড শেয়ারিং সেবা চালু হওয়ায়। এতে যুবসমাজের কর্মসংস্থান যেমন সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি যাতায়াতে সুবিধাও বেড়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম জাতীয় অঙ্গীকার হচ্ছে ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করে দেশ থেকে দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। এ জন্য জাতীয়পর্যায়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নের অগ্রাধিকার থাকতে হবে। সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।

প্রতিটি ঘরকে তার বা বেতার-পদ্ধতিতে ডিজিটাল নেটওয়ার্ক-ব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে। দেশের সব অঞ্চলের জনগণকে ডিজিটাল যন্ত্রে সজ্জিত করাসহ ডিজিটাল ডিভাইস প্রণয়ন করা জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া আরও যেসব বিষয় অগ্রাধিকার হিসেবে গণ্য হবে তা হলো— জনগণের নিজস্ব সংযুক্তি, জনগণের সঙ্গে সরকারের সংযুক্তি, সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর, শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর, উপযুক্ত মানবসম্পদ তৈরি, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসার রূপান্তর। এসব সেবা এখন দেশের প্রতিটি জনগণের দ্বারপ্রান্তে। আর এরই মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা ডিজিটাল বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে জনগণের দোরগোড়ায় তথ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নিয়েছে।

সরকারের ‘জাতীয় তথ্য বাতায়ন’ ওয়েবসাইট ভিজিট করে পাওয়া যাচ্ছে যাবতীয় সকল তথ্য। স্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি ডিজিটাল বাংলাদেশের মূল ভিত্তি। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে স্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অবদানের কারণেই। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সক্ষমতা তুলে ধরাই এ আয়োজনের লক্ষ্য।

দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী কোটিরও বেশি। গড়ে উঠেছে ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা। এর বাইরে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের একটি বড় অংশ ফ্রিল্যান্সার। দেশে প্রায় সাড়ে ছয় লাখের বেশি ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। এর বাইরে রয়েছেন সফটওয়্যার খাতের উদ্যোক্তারা। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বড় অগ্রগতি হয়েছে নারীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে যুক্ত করায়। সব মিলিয়ে ডিজিটাল কমিউনিকেশন বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে উদ্যোক্তা তৈরিতে, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে যা ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে। ডিজিটাল বিপণন প্রতিটি স্মার্টফোনকে শপিং ব্যাগে পরিণত করেছে। ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম মানুষের জীবনকে অনেক সহজ ও আধুনিক করেছে।

বাঙালির স্বাধীনসত্তা বিকাশের বড় প্রতীক জয় বাংলা খচিত ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ দেশের সবকটি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। এছাড়াও এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ডিটিএইচ সেবার সূচনা হয়েছে।

অপরদিকে, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন এবং দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে বিবেচনায় রেখে যোগ্য ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের উপরে। সারা দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে পতিত আবাদি জমিকে কাজে লাগিয়ে যে শিল্পোন্নয়নের কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠার পাশাপাশি অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হবে। আর এজন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিবিদ্যার অবাধ প্রসার ও প্রয়োগ।

ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার পদক্ষেপ অবশ্যই নিতে হবে। একটা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। ইন্টারনেট সহজলভ্য করা, প্রযুক্তি সম্পর্কিত অবকাঠামোর উন্নয়ন করা, মানুষকে প্রযুক্তি-সাক্ষর হিসেবে গড়ে তোলার মতো পদক্ষেপগুলো ডিজিটাল বৈষম্য রোধে চমৎকার ভূমিকা রাখবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
স্বপ্নের জলশহর: ‘কঠিনের’ ঘটুক উত্তরণ

শেয়ার করুন

ad-close 103.jpg