ভ্যাকসিনে ভরসা, ব্যবসা ও শঙ্কা

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে অসম নীতির কারণে বিশ্ব একটি ‘বিপর্যয়কর নৈতিক ব্যর্থতা’র মুখে দাঁড়িয়েছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ডব্লিউএইচওর মহাসচিব টেড্রোস আধানম গেব্রিয়াসিস জানান, করোনার ঝুঁকিতে থাকা গরিব দেশের নাগরিকদের আগে ধনী দেশগুলোর কম বয়সী ও স্বাস্থ্যবান লোকজনের টিকা পাওয়াটা মোটেই নৈতিক নয়। তাকে রূঢ়ভাবে বলতে হচ্ছে যে, বিশ্ব এক বিপর্যয়কর নৈতিক ব্যর্থতার মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর এই ব্যর্থতার মূল্য বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোয় জীবন ও জীবিকা দিয়ে দিতে হবে।

এতটা আতঙ্ক আর এতো আকাঙ্ক্ষা সারা পৃথিবীতে সাম্প্রতিক সময়ে আর দেখা যায়নি। মানুষ আতঙ্কিত হয়েছে করোনা মহামারির ভয়াবহতায় আর আকাঙ্ক্ষা করেছে কখন ভরসা টিকা আসবে। যে কারণে এত সব কিছু সেই মুকুট আকৃতির ভাইরাসটিকে নভেল করোনা ভাইরাস বলে অভিহিত করা হয়েছিল প্রথমে। তারপর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাস-ঘটিত রোগের নামকরণ করে করোনাভাইরাস ডিজিজ ২০১৯ যা কোভিড – ১৯ হিসেবে এখন পরিচিত। এই শতকের এক ভয়ংকর বিপদের নাম করোনা। কিন্তু পরিস্থিতি যত ভয়ংকর হোক না কেন মানুষ হার মানে না।

‘মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু হার মেনে নেয় না।’ আরনেস্ট হেমিংওয়ের এই বিখ্যাত উক্তি শুধু একটি আপ্তবাক্য নয়, এ হচ্ছে মানবজাতির সংগ্রামী ইতিহাসের নির্যাস। করোনা মহামারিতে আবারও তা প্রমাণিত হতে যাচ্ছে। এ যাবৎকাল যত ধরণনর সংক্রামক রোগের কথা মানুষ জেনেছে করোনা সংক্রমণ তার মধ্যে ভয়াবহতম। এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা, এত ঘন ঘন রূপ পরিবর্তন করতে পারা, ফুসফুসসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো আক্রমণ করে মালটিঅর্গান ফেইলর করে দিয়ে মৃত্যু ঘটানোর কারণে করোনা প্রাণঘাতী মহামারি হিসেবে ভয় ও সমীহ আদায় করে নিয়েছে মানুষের কাছ থেকে। মানুষ স্বেচ্ছাবন্দিত্ব গ্রহণ করে বাঁচতে চেয়েছে, তারপরেও লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা। ফলে বিশ্বব্যাপী আতঙ্কিত মানুষের মতো বাংলাদেশের মানুষ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের খবর শুনে আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষায় আছে।

দেশে ৩৫ লাখ ডোজ করোনার ভ্যাকসিন আসবে, এর মধ্যে ২০ লাখ ডোজ শুভেচ্ছা হিসেবে। এরপর প্রতি ডোজ ৫ ডলার দামের ৩ কোটি ডোজ আসবে আগামী ৬ মাসে। এর বাইরে বেক্সিমকো ১৩ ডলার দামে আনবে ১০ লাখ ডোজ। সম্ভবত বিভিন্ন দেশ থেকে আরও ভ্যাকসিন আসবে। অতীতের মহামারির মতো করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারে ৭/৮ বছর সময় লাগেনি।

এক বছরের মধ্যেই করোনা থেকে বাঁচবার বিজ্ঞানসম্মত পথ আবিষ্কার হয়েছে। ভ্যাকসিন বা টিকা দিয়ে শরীরের প্রতিরোধ-ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলে করোনা প্রতিরোধ করা যাবে। মানুষ তাই আশায় বুক বাঁধছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নও উঠছে যে, এটা কেমন করে পাওয়া যাবে, বিনামুল্যে না বহুমুল্যে? শুরুতে কেউ কেউ ধর্মের নামে বলতে চেয়েছে করোনা মুসলমানদের হবে না, বিধর্মীদের শায়েস্তা করার জন্য করোনা এসেছে, অন্যদিকে কেউ কেউ বলেছেন গো মূত্র করোনা ঠেকাবে, আবার করোনা প্রাকৃতিক না মনুষ্যসৃষ্ট এ বিতর্কও চলেছে জোরেশোরে। কিন্তু বিজ্ঞানের যুক্তিতে সব পথ মিলে গেল এক মোহনায়। করোনা ভাইরাস-ঘটিত রোগ, এর কারণ জানা গেছে, কারণ দূর করবার পথ বের করার জন্য দেশে দেশে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছিলেন। তাদের দেশ এবং ভাষা আলাদা, গায়ের রং এবং ধর্ম পরিচয়ও আলাদা কিন্তু বিজ্ঞান তাদেরকে এক মোহনায় মিলিয়ে দিল। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই। মানুষকে বাঁচাতে মানুষের প্রতি দায় অনুভব করে বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে সাধনা করতে হবে। সে সাধনার ফল মানবজাতি পেতে যাচ্ছে টিকা বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মাধ্যমে।

করোনা মহামারি যখন মহামারি হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি, সেই সময় থেকে সতর্ক থাকার কথা বলেছেন বিজ্ঞানীরা। এক বছরে ২১৮টি দেশে প্রায় ১০ কোটি মানুষকে সংক্রমিত করে ২০ লাখ মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে করোনা যেমন তার ভয়ংকর রূপের প্রমাণ দিয়েছে, তেমনি পুঁজিবাদের দুর্বলতাও উন্মোচন করে দিয়েছে সে বহুদিক থেকে। পুঁজিবাদ শুধু শ্রম শোষণ করে না, কৃত্রিম চাহিদায় মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

পুঁজিবাদ শেখায় নিজে বাঁচ। যোগ্যতা থাকলে তোমাকে ঠেকায় কে? টাকা রোজগারের যোগ্যতা হলো সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। পাগলের মতো টাকা রোজগার কর, মাতালের মতো ফুর্তি কর। জীবনকে উপভোগ কর। যে এসব করতে পারে না তার জীবন ব্যর্থ। বুড়ো হয়েছে তো তাকে বাতিল করে দাও। করোনায় ইউরোপ আমেরিকায় তাই বেশি মারা গেলেন অসহায় বুড়োরা, যারা যৌবনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছিলেন। বেকার হয়ে গেল যুবকেরা আর অনিশ্চিত হয়ে পড়লো শিশুদের ভবিষ্যৎ। করোনা দেখালো একা একা বাঁচা যায় না। মহাশূন্যে স্যাটেলাইট পাঠানো, সর্বাধুনিক মডেলের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, গাড়ি দরকার কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার সর্বাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, উন্নত ওষুধ, হাসপাতাল।

বাণিজ্যিক হাসপাতাল ব্যবসা বুঝে কিন্তু সামাজিক দায় গ্রহণ করে না। তাই দরকার মানবিক ডাক্তার আর সামাজিক হাসপাতাল। দরকার সামাজিক সুরক্ষা। অত্যাধুনিক মডেলের মোবাইল না হলেও বছরের পর বছর বেঁচে থাকা যাবে কিন্তু খাদ্য না হলে এক সপ্তাহ বাঁচা কঠিন। সবাইকে বাসায় থাকতে বললেও করোনাকালে ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিক খাদ্য, বিদ্যুৎ, পানি, ওষুধ, বস্ত্র উৎপাদনে নিয়োজিত না থাকলে, পরিবহণ ও বিপণনে যুক্ত না থাকলে মানুষের নিরাপদে বাসায় থাকা অসম্ভব হয়ে পড়তো সে কথা যেন আমরা ভুলে না যাই।

করোনা ভ্যাকসিন তো আসছে। গবেষণা এবং উৎপাদনে টাকা দিয়েছে কারা? ভ্যাকসিন তৈরির টাকা দেয়ার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে সরকারগুলোই দিচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৯ ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে করোনার ২৩২টি টিকা নিয়ে কাজ চলছে। চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার আগে ৬টি ধাপে টিকার পরীক্ষা করতে হয়। ৬০টি টিকা বিভিন্ন দেশে মানবদেহে পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপে আছে। এদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড, যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার ও মডারনা, রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি, চীনের সিনোভ্যাক ও সিনোফার্মের টিকা নিয়ে বেশি আলোচনা চলছে। এই টিকা আবিষ্কার ও উৎপাদনে সরকারগুলো দিয়েছে ৬৫০ কোটি পাউন্ড, অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়েছে ১৫০ কোটি পাউন্ড আর কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করেছে ২৬০ কোটি পাউন্ড। অথচ কত বিশাল বিশাল কোম্পানি ও কর্পোরেট হাউস বিশ্বব্যাপী কত কিছু নিয়েই না ব্যবসা করছে ! মানুষের বিপদে তাদের ভূমিকা তেমন দেখা গেল না।

অন্যদিকে টিকা কেনার ক্ষেত্রেও ধনী দেশগুলো একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেছে। পিপলস ভ্যাকসিন এলায়েন্স নামের একটি জোট হিসেব করে দেখিয়েছে যে, ধনী দেশগুলোর জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৪ শতাংশ। অথচ তাঁরা কিনেছে মোট চাহিদার ৫৩ শতাংশ টিকা। যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা ৩৩ কোটি, তারা কিনেছে একশ’ কোটি টিকা। যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যা সাড়ে ছয় কোটি, তারা কিনছে ৩৫ কোটি ৭০ লাখ, ভারত কিনছে একশ’ ৫০ কোটি, জাপানের জনসংখ্যা ১৩ কোটি, টিকা কিনছে ২৯ কোটি, কানাডার লোক সংখ্যা সাড়ে ৪ কোটি, ৩৬ কোটি ডোজ টিকা কিনছে তারা। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন মিলে কিনছে ১৬০ কোটি ডোজ। এ পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে অসম নীতির কারণে বিশ্ব একটি ‘বিপর্যয়কর নৈতিক ব্যর্থতা’র মুখে দাঁড়িয়েছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

ডব্লিউএইচওর মহাসচিব টেড্রোস আধানম গেব্রিয়াসিস সোমবার এই সতর্কতার কথা উচ্চারণ করেন। তিনি জানান, বিশ্বের ৪৯টি ধনী দেশে ইতোমধ্যে ৩৯ মিলিয়ন ডোজের বেশি করোনার টিকা দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে, একটি গরিব দেশে মাত্র ২৫ ডোজ টিকা দেয়া হয়েছে। ২৫ মিলিয়ন নয়, ২৫ হাজারও নয়, মাত্র ২৫টি। ডব্লিউএইচওর মহাসচিব বলেন, করোনার ঝুঁকিতে থাকা গরিব দেশের নাগরিকদের আগে ধনী দেশগুলোর কম বয়সী ও স্বাস্থ্যবান লোকজনের টিকা পাওয়াটা মোটেই নৈতিক নয়। গেব্রিয়াসিস বলেন, তাকে রূঢ়ভাবে বলতে হচ্ছে যে, বিশ্ব এক বিপর্যয়কর নৈতিক ব্যর্থতার মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর এই ব্যর্থতার মূল্য বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোয় জীবন ও জীবিকা দিয়ে দিতে হবে।

বাংলাদেশের অবস্থাও এরকম। ১৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশে ৩/ ৪ কোটি ভ্যাকসিন আনলে তা চাহিদা মেটাবে না বরং টিকা ব্যবসায়ীদের মুনাফার সুযোগ বাড়বে। প্রতি মানুষের ২ ডোজ করে টিকা প্রয়োজন হলে ৩৩ কোটি ডোজ টিকা লাগবে। ব্যবসায়ীর হাতে টিকা আমদানির দায়িত্ব না দিয়ে সরকারিভাবে আমদানি করলে সিরাম ইন্সটিটিউটের টিকার দাম লাগতো একশ’ কোটি ডলার বা ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে পরিবহণ, সংরক্ষণ, টিকাদানের খরচ যুক্ত হলে ১২ হাজার কোটি টাকায় সকলকেই টিকা দেয়া সম্ভব। সরকার এই টাকার ব্যবস্থা করলে জনগণ বিনামূল্যে টিকা পেতে পারত।

বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আছে ফলে টাকার অভাব হবে না। কিন্তু ব্যবসায়ীদেরকে টিকা বাণিজ্যের সুযোগ করে দিলে, ‘টাকা ছাড়া টিকা নাই’ এই নীতি কার্যকর হবে। করোনার প্রথম ঢেউয়ের অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। টিকার ক্ষেত্রেও সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

ভ্যাকসিন সঠিকভাবে সংরক্ষণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যথাযথভাবে সংরক্ষণের অভাবে সারা বিশ্বে প্রায় ৫০ শতাংশ ভ্যাকসিন নষ্ট হয়ে যায় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে। এই বিষয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভ্যাকসিন পাবার ক্ষেত্রে কারা গুরুত্ব পাবেন সেটাও বিবেচনা করতে হবে। টাকার অভাবে টেস্ট করানোর অনাগ্রহ শ্রমজীবী মানুষের ছিল, টিকার ক্ষেত্রেও তা হবে। দেশের কমপক্ষে ৬০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় না আনলে করোনা ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। ফলে যে শ্রমিক কৃষক অর্থনীতির চালিকাশক্তি তারা যেন অতীতের মতো উপেক্ষিত না হয়, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যেন বহুগুণ দামে ভ্যাকসিন বিক্রি না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এবং বিনামূল্যে টিকা সরবরাহের সক্ষমতা দেশের আছে। প্রয়োজন দায়িত্বপূর্ণ মনোভাব ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা।

লেখক: রাজনীতিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকর

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বাঙালির মুক্তির দিশা যে ভাষণে

প্রকৃতপক্ষে ’৭১-এর ১ মার্চ থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে মুজিবের শাসন কায়েম হয়। যে জন্য তিনি বলতে পেরেছেন, ২৮ তারিখ কর্মচারীরা বেতন নিয়ে আসবেন। তিনি পাকিস্তানি শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলারও আহ্বান জানান। অনেকেরই আশঙ্কা ছিল বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলা হতে পারে।

বিশ্ব ইতিহাসে এ পর্যন্ত যে কটি স্মরণীয় বরণীয় অসাধারণ ভাষণ রয়েছে, ১৯৭১-এর ৭ মার্চ ১০ লক্ষাধিক লোকের উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কামান, বন্দুক, মেশিনগানের সামনে রেসকোর্স ময়দানে দেয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি শুধু অন্যতমই নয়, শ্রেষ্ঠতম বটে।

১৯৭১-এর ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার আগে শেখ মুজিবকে জানানো হয়। পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সরকারের তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস্ টু সারেন্ডার’ গ্রান্থে লিখেছেন- ১ মার্চের আগের দিন সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গবন্ধুকে গভর্নর হাউসে ডেকে নিয়ে স্থগিত করা বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

সালিক লিখেছেন, গভর্নর আহসানের কাছে এ কথা শোনার পর মুজিব চলে গেলেন না। শেখ মুজিব জানান, ‘এটাকে আমি ইস্যু করব না, যদি মার্চের অধিবেশন বসার নতুন তারিখ দেয়া হয়। আরেকটি ঘটনা হচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি জানানোর জন্য পিন্ডি থেকে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীকে তলব করা হয়। ৪ মার্চ (১৯৭১) রাতে যাওয়ার আগে তিনি ৩২ নম্বরে গিয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ফরমান আলী পরবর্তীকালে তার গ্রন্থে লিখেছেন ‘কোনো ভূমিকা না করে সরাসরি শেখকে প্রশ্ন করলাম, প্লিজ বলুন, পাকিস্তানকে কি রক্ষা করা সম্ভব? আমার প্রশ্নের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং পূর্ব পাকিস্তানে আমরা যে যন্ত্রণার মধ্যে ছিলাম, এর প্রকাশ ঘটেছিল। মুজিব বললেন, হ্যাঁ, পাকিস্তানকে রক্ষা করা যায়- যদি কেউ আমাদের কথা শোনে। আর্মি বহু মানুষকে হত্যা করেছে। তারা শোনে ভুট্টোর কথা। তারা আমার কথা শোনে না। এমনকি এখানো, এত সবের পরও আমরা আলোচনা করতে আগ্রহী আছি। জেনারেল ফরমানের এই একটিমাত্র জিজ্ঞাসা (পাকিস্তানকে কি রক্ষা করা সম্ভব?) থেকেই বোঝা যায় ওই সময় শেখ মুজিব কত বড় শক্তিমান নেতা ছিলেন।

ওই সময় পূর্ব পাকিস্তানে বেসামরিক প্রশাসনের প্রধান রাও ফরমান আলী তার ‘How Pakistan Got Divided’ (ইউপিএল প্রকাশিত বাংলাদেশের জন্ম) গ্রন্থে লিখেছেন-

‘১ মার্চ দুপুরে অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পর তখন প্রতিটি বাঙালির প্রতিক্রিয়া ছিল সহিংস এবং সকলের ভেতরেই বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়ার অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল। সমগ্র বাঙালি জাতিই এবার যুদ্ধের পথে নেমে গিয়েছিল। আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই যে, অধিবেশন মুলতবি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ১ মার্চেই পাকিস্তানের ভাঙন ঘটেছিল। পরবর্তীকালের ঘটনাবলি ছিল প্রধান ঘটনার অনুসরণ মাত্র। জনতার জঙ্গি মেজাজ থেকে এ কথা তখন পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, তারা আর শুধু ভাষণে সন্তুষ্ট নয়, তারা চায় অ্যাকশন।’

৩ মার্চের ছাত্রলীগের সভার পর ফরমান তার গ্রন্থে লিখেছেন- ‘সবকিছু অচল হয়ে যায়। ঐটা ছিল এক আইনহীনতার রাজত্ব। মানুষের মেজাজ ছিল সহিংস। বিকেল ৩টার মধ্যে জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত হয়ে পল্টন ময়দান জনতার সাগরে পরিণত হয়ে যায়।’

সিদ্দিক সালিকের লেখা থেকে ১ মার্চ (’৭১) রাতের আরও একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। সালিক লিখেছেন- ঐ সময় মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি শফিউল আজমের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসহযোগ আন্দোলনে শামিল করেন। ২ মার্চ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে শফিউল আজম সেনাবাহিনী নিয়োগের জন্য জেনারেল ফরমান আলীকে অনুরোধ করেন। একই অনুরোধ করেন স্বরাষ্ট্রসচিব ও পুলিশের আইজি। সামরিক প্রশাসন সেনা নিয়োগে প্রথম রাজি ছিল না। জেনারেল ফরমান জিজ্ঞাসা করলেন, সেনা নিয়োগের জন্য শেখ সাহেবেরে সঙ্গে কথা বলেছেন কি না। শফিউল আজম জানান, হ্যাঁ কথা বলেছি। তার অনুমোদন নিয়েই বলছি। সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হলো। কারফিউ জারি হলো। জনতা কারফিউ ভাঙল। সেনাসদস্যের গুলিতে ৬ জন নিহত হলো। নিহত ব্যক্তিদের নিয়ে প্রধান প্রধান সড়কে মিছিল হয়।

সালিক লিখেছেন, ‘মৃতদেহগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে একজন বাগ্মী হিসেবে মুজিব নিজের শ্রেষ্ঠতম প্রতিভার পরিচয় দিলেন। তার আগুনঝরা বক্তৃতা মিছিলে এমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল যে, তারা তাদের জীবনবাজি রেখে যেকোনো ধরনের ভয়াবহ কাজে তাৎক্ষণিকভাবে নেমে যেতে পারে।’

২রা মার্চ রাতে এক দীর্ঘ বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু জনপ্রতিনিধিদের একমাত্র বৈধ ক্ষমতার উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বেআইনি সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য সরকারি কর্মচারীসহ সমাজের সকল স্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। জেনারেল ইয়াকুব ২ মার্চ মধ্যরাতের কিছু আগে সাড়ে ১১টা থেকে ৪০ মিনিট অনুনয় বিনয় করেন বঙ্গবন্ধুকে বিবৃতি প্রত্যাহারের জন্য। বঙ্গবন্ধু পালটা যুক্তি দিয়ে বসেন, আমি খুব চাপের মধ্যে আছি। এই বিবৃতি তেমন কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি করবে না। শেষ পর্যন্ত বিবৃতি প্রত্যাহারে রাজি করাতে ব্যর্থ জেনারেল ইয়াকুব বলেন, ‘শেখ সাহেব আপ খুউব সেয়ানে হ্যায়।’ এমনিভাবে প্রতিদিন একটার পর একটা ঘটনার মাধ্যমে পরিস্থিতি চরম উত্তেজনার দিকে ধাবিত হতে থাকে। ঘনিয়ে এলো ৭ মার্চ।

’৭০-এর জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৯৮ জন ভোটার শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে।

৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ’৭১-এর ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের পিপিপি নেতা জেড এ ভুট্টো এবং পাকিস্তান সামরিক চক্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে অর্থাৎ আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ষড়যন্ত্রকারীদের হাতের পুতুলে পরিণত হলেন সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান। ’৭১-এর ১ মার্চ ১টা ৫ মিনিটে আকস্মিক এক বেতার ঘোষণায় ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত হওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গর্জে ওঠে বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান)।

বেতারের ঘোষণা শুনে রাস্তায় নেমে আসেন মানুষ। সে সময় ঢাকায় হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি কমিটির বৈঠক চলছিল। হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষ নেতার নির্দেশের জন্য মিছিল সহকারে হোটেল পূর্বাণীতে সমবেত হন। জনতাকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধু ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ ঢাকাসহ সারা দেশে হরতাল আহ্বান করেন।

২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্রলীগের সভা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ওই সভায় প্রথমবারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা দেখা যায়। লাল-সবুজের এই পতাকায় হলুদ রঙে বাংলাদেশের মানচিত্র ছিল। স্বাধীনতার পর জাতীয় পতাকায় দেশের মানচিত্র না রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

৩ মার্চ বুধবার পল্টনে ছাত্রলীগের সভায় অনির্ধারিতভাবে বঙ্গবন্ধু উপস্থিত হন। ওই সভায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ছিল দৃশ্যমান। বঙ্গবন্ধুকে তার উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা ঘোষণা করে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন পদাধিকারবলে ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ। পল্টনে ছাত্রলীগের এই সভায় বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করা হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানকে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত নির্ধারণ করা হয়। সভায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ও গ্রহণ করা হয়।

পল্টনে ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগের সভায় প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন-

‘আমি থাকি আর না থাকি, বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন যেন থেমে না থাকে। বাঙালির রক্ত যেন বৃথা না যায়। আমি না থাকলে- আমার সহকর্মীরা নেতৃত্ব দিবেন। তাদেরও যদি হত্যা করা হয়, যিনি জীবিত থাকবেন, তিনিই নেতৃত্ব দিবেন। যে কোনো মূল্যে আন্দোলন চালাইয়া যেতে হবে- অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

বঙ্গবন্ধু আগেই ঘোষণা করেছিলেন, ৭ মার্চ রোববার রেসকোর্স ময়দানে তিনি পরবর্তী কর্মপন্থা ঘোষণা করবেন। ৪ মার্চ থেকে ৬ মার্চ সকাল ৬ থেকে ২টা পর্যন্ত সারা দেশে হরতাল পালনের আহ্বান জানান বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দুর্বার গতিতে আন্দোলন এগিয়ে চলল। সারা দেশে তখন একজন মাত্র নেতা। তিনি হচ্ছেন দেশের শতকরা ৯৮ জন মানুষের ভোটে নির্বাচিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশের সামরিক শাসন চালু থাকলেও সামরিক সরকারের কথা তখন কেউ শুনছে না। শেখ মুজিবের কথাই তখন আইন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সমগ্র বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে।

সেই আন্দোলনমুখর পরিস্থিতিতে ঘনিয়ে এলো ৭ মার্চ। সবার দৃষ্টি ৭ মার্চের দিকে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে কী বলবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভাবিয়ে তুলল পাকিস্তান সামরিক চক্রকেও। কারণ, তারা বুঝে গেছে, বাংলাদেশের মানুষের ওপর তাদের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। দেশ পরিচালিত হচ্ছে বিরোধী দলের নেতা শেখ মুজিবের কথায়।

এই অবস্থায় ৭ মার্চ শেখ মুজিব যদি রেসকোর্সের জনসভায় স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসেন। চিন্তিত পাকিস্তান সামরিক চক্র কৌশলের আশ্রয় নেয়। ৭ মার্চের একদিন আগে অর্থাৎ ৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান টেলিফোনে কথা বলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা, আওয়ামী লীগপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। ৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া কী বলেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানকে? ৭ মার্চের আগের রাতে জেনারেল ইয়াহিয়া টেলিপ্রিন্টারে শেখ মুজিবের কাছে একটি বার্তাও প্রেরণ করেন। সালিকের গ্রন্থে রয়েছে- একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়ার সেই বার্তা ৭ মার্চের আগের রাতে শেখ মুজিবের ৩২ নম্বরের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসেন।

৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া তার দীর্ঘ টেলিফোন আলাপে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বলার চেষ্টা করেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) যেন এমন কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করেন, যেখান থেকে ফিরে আসার উপায় আর না থাকে।’ বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রেরিত ইয়াহিয়ার বক্তব্যটি ছিল নিম্নরূপ। মেজর সালিক ওই বার্তাটি সংক্ষিপ্ত আকারে তার ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন। বার্তায় জেনারেল ইয়াহিয়া শেখ মুজিবকে অনুরোধ করেন, ‘অনুগ্রহ করে কোনো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন না। আমি সহসাই ঢাকা আসছি এবং আপনার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করব। আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমি আপনার আকাঙ্ক্ষা এবং জনগণের প্রতি দেয়া আপনার প্রতিশ্রুতির পুরোপুরি মর্যাদা দেবো। আমার কাছে একটি পরিকল্পনা আছে- যা আপনাকে আপনার ছয় দফা থেকেও বেশি খুশি করবে। আমি সনির্বন্ধ অনুরোধ করছি, কোনো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন না।’ (সূত্র : Witness to Surrender)

৬ মার্চ টেলিফোনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা, টেলিপ্রিন্টারে বঙ্গবন্ধুর কাছে বার্তা প্রেরণ করেও পুরোপুরি স্বস্তি পাচ্ছিলেন না জেনারেল ইয়াহিয়া। ৬ মার্চ এও ঘোষণা করা হলো যে, ২৫ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।

৭ মার্চ রেসকোর্সে জনসভার বক্তব্য কী হবে- এই নিয়ে ৬ মার্চ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির দীর্ঘ বৈঠক হয়। জনসভায় বঙ্গবন্ধু কী বলবেন- এ নিয়ে বিভিন্নজন বক্তব্য রাখেন। একপক্ষের মত, বঙ্গবন্ধু যেন জনসভায় সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। অন্যপক্ষ স্বাধীনতার সরাসরি ঘোষণা পরিহার করে আলোচনার পথ খোলা রাখার পক্ষে মত প্রদান করে। সভা ৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত মুলতবি রইল। ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের চরমপন্থিরা বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধুকে ৭ মার্চের জনসভায় স্বাধীনতা ঘোষণা করার জন্যে।

পরিস্থিতির চাপে ভীত-সন্ত্রস্ত পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সদর দফতর থেকে বিভিন্নভাবে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে এই মেসেজ দেওয়া হয় যে, ৭ মার্চ যেন কোনোভাবেই স্বাধীনতা ঘোষণা না করা হয়। ৭ মার্চ জনসভাকে লক্ষ্য করে কামান বসানো হয়। এমনকি আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়। মেজর সিদ্দিক সালিক তার গ্রন্থে লিখেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি ৭ মার্চের জনসভার প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ নেতাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন,‘পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা হলে তা শক্তভাবে মোকাবেলা করা হবে। বিশ্বাসঘাতকদের (বাঙালি) হত্যার জন্য ট্যাংক, কামান, মেশিনগান সবই প্রস্তুত রাখা হবে। প্রয়োজন হলে ঢাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হবে। শাসন করার জন্যে কেউ থাকবে না কিংবা শাসিত হওয়ার জন্যও কিছু থাকবে না।’

এমন এক কঠিন সংকটময় পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৭ মার্চ রেসকোর্সে তার ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষকে চারটি শর্ত দিয়ে ভাষণের শেষাংশে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন-

“এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কিছু অংশ ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, তিনি সেদিন যুদ্ধের ঘোষণা যেমন পরোক্ষভাবে প্রদান করেন- আবার যুদ্ধে কিভাবে জয়ী হতে হবে সে ব্যাপারেও বক্তব্য রাখেন। বঙ্গবন্ধু বলেন-

‘২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপর যদি বেতন দেয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের উপর আমার অনুরোধ রইলো প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে।’

প্রকৃতপক্ষে ’৭১-এর ১ মার্চ থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে মুজিবের শাসন কায়েম হয়। যেজন্য তিনি বলতে পেরেছেন, ২৮ তারিখ কর্মচারীরা বেতন নিয়ে আসবেন। তিনি পাকিস্তানি শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলারও আহবান জানান। অনেকেরই আশঙ্কা ছিল বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলা হতে পারে। যে জন্য তিনি ঘোষণা করেন- আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি তোমরা রাস্তাঘাট সবকিছু বন্ধ করে দিও। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলেও শত্রু পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যেন যুদ্ধ অব্যাহত থাকে- ৭ মার্চের ভাষণে তাই তিনি বলেছেন। তাছাড়া ভাতে মারবো, পানিতে মারবো- এই কথার মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীকে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পর্যুদস্ত করার কথাই বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সে সময় এমন ছিলো যে, কোনো কোনো বিদেশি পত্রিকাও তখন জানিয়েছিল- ৭ মার্চ শেখ মুজিব হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। ’৭১-এর ৫ মার্চ লন্ডনের গার্ডিয়ান, সানডে টাইমস, দি অবজারভার এবং ৬ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ৭ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্বাভাস দেয়া হয়। ৬ মার্চ ’৭১ লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ছাপা হয়-

‘East Pakistan UDI (Unilateral Declaration of Independence) Expected. Sheikh Mujibur Rahman expected to declare independence tomorrow.’ অর্থাৎ ‘শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল (৭ মার্চ) পূর্ব পাকিস্তানের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ’৭১-এর ৭ মার্চ সরাসরি কেন স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, তার ব্যাখ্যা পরবর্তীকালে তিনি নিজেই দিয়েছেন। ১৯৭২-এর ১৮ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে এনডব্লিউ টিভির জন্য দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ৭ মার্চের ওই কাহিনি বর্ণনা করেন। ফ্রস্ট শেখ মুজিবের কাছে জানতে চান, ‘আপনার কি ইচ্ছা ছিলো যে, তখন ৭ মার্চ রেসকোর্সে আপনি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষণা দেবেন?’

জবাবে শেখ মুজিব বলেন, ‘আমি জানতাম এর পরিণতি কী হবে এবং সভায় আমি ঘোষণা করি যে, এবারের সংগ্রাম মুক্তির, শৃঙ্খল মোচন এবং স্বাধীনতার।’ ফ্রস্ট প্রশ্ন করেন, ‘আপনি যদি বলতেন, আজ আমি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষণা করছি, তো কী ঘটতো?’ শেখ মুজিব উত্তর দেন, ‘বিশেষ করে ওই দিনটিতে আমি এটা করতে চাইনি। কেননা, বিশ্বকে তাদের আমি এটা বলার সুযোগ দিতে চাইনি যে, মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং আঘাত হানা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প ছিল না। আমি চাইছিলাম তারাই আগে আঘাত হানুক এবং জনগণ তা প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত ছিল।’

কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের মতে, বঙ্গবন্ধু যেমন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে মানুষের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছেন- কালের পরিক্রমায় তার ৭ মার্চের ভাষণও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক: একাত্তরে দাউদকান্দি (কুমিল্লা) থানা মুজিব বাহিনীর কমান্ডার, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, সিনিয়র সাংবাদিক।

শেয়ার করুন

অনন্য ৭ মার্চ

বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের এবং বাঙালিরা তাতে অভূতপূর্ব সাড়া দিল। একটি স্বাধীন দেশের যাবতীয় কর্তৃত্ব জনতা তার হাতে তুলে দিল পরম নির্ভরতায়। পরের দিনগুলো বাংলাদেশ চলল তার নির্দেশনায়। শাসকদের সঙ্গে জনগণের পূর্ণ অসহযোগের গৌরবের অধ্যায়ের সূচনা হলো, যা বিশ্বে নজিরবিহীন।

কত লোক এসেছিল একাত্তরের ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স নামে পরিচিত সুবিশাল ময়দানে? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই পড়ন্ত বিকেলে দেশের অন্য সব নেতার তুলনায় নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। বাঙালির পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস ছিল তার প্রতি। তিলে তিলে তা অর্জিত হয়। তবে এমন মহাকাব্যিক উপস্থাপনা যে তিনি করবেন, সেটা ক’জন ভাবতে পেরেছিল?

তিনি লিখিত ভাষণ দেননি। ভাষণে যেসব শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করেছেন তার বিশ্লেষণ চলছে দশকের পর দশক; আরও বহুকাল চলতে থাকবে। তিনি “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” বললেন।

কোন পথে দেশ অগ্রসর হবে, সেটাও বললেন। “আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি”, আমার সহকর্মীরা যদি না থাকে- এমন পরিস্থিতিতেও জনতার কী করণীয় সেটা বলে দিলেন। কিন্তু সরাসরি বললেন না- ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’। বললেন না যে ‘আজ থেকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সরকার শাসনভার গ্রহণ করেছে।’

কর্নেল (অব.) এমএজি ওসমানীকে দায়িত্ব দিলেন না প্রধান সেনাপতির। নির্দেশ দিলেন না ঢাকা এবং অন্যান্য ক্যান্টনমেন্টে হামলা পরিচালনা করার। এসব ঘোষণা দিলে কি হঠকারিতা হতো? এ ধরনের ঘোষণা এলে কি ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ট্যাঙ্ক ও বিমান নিয়ে তাৎক্ষণিক গণহত্যা শুরু করে দিত? ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইট কি তাহলে এগিয়ে আসত? তার একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণাকে কি আন্তর্জাতিক সমাজ স্বাধীনতা সংগ্রাম নয়, বরং নিছকই বিদ্রোহ হিসেবে ধরে নিত?

সময় বহমান। যেমন বহমান নদী বা সমুদ্রের ঢেউ। একবার যা ঘটে তা বদলানো যায় না। এটা না হয়ে ওটা হলে কী হতো, এ নিয়ে কেবল মূল্যায়ন- বিশ্লেষণ করা চলে। ৭ মার্চের ক্ষেত্রেও সেটাই সত্য। কেউ কেউ মনে করেন, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে সমবেত জনতাকে নিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে হামলা চালালে সহজেই তা দখলে আসত।

এ সময়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা গোলাগুলি চালালে হয়তো কয়েক হাজার লোকের মৃত্যু হতো, কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন পাকিস্তানি সৈন্যরা হয় মরত না হয় আত্মসমর্পণ করত। এর ফলে ৯ মাসের যুদ্ধে যে জানমালের বিপুল ক্ষতি হয়েছে, তা থেকে রেহাই মিলত। তবে এ ধারণা যারা পোষণ করেন তারা বাস্তবতা সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। তাদের মনোভাব চরম হঠকারিতাপূর্ণ।

নিরস্ত্র জনতাকে এভাবে ক্যান্টনমেন্টে হামলার জন্য নির্দেশ দেয়া যায় না। বঙ্গবন্ধুর মতো কোনো দায়িত্বশীল নেতা এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন না।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিল। আমিও ছিলাম তাদের দলে। বাঁশের লাঠি ছিল অনেকের হাতে। আমার একটি বিশেষ দায়িত্ব ছিল- ওই জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণের বিষয়বস্তু যত দ্রুত সম্ভব আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট নেতা মোহাম্মদ ফরহাদকে জানানো। তিনি তখন থাকতেন গুলিস্তানের কাছে সিদ্দিক বাজারে রাজা ফজলুল হকের বাসায়। আমি ভাষণ শেষ হতেই প্রায় দৌড়ে তার বাসায় যাই। সন্ধ্যা নাগাদ তার বাসায় দ্বিতীয়বার যাওয়ার আগে ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের অভিমত জেনে যাই। তারা বলেছিলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা কেন সরাসরি দেওয়া হলো না, ছাত্র ইউনিয়ন-কর্মীরা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এ জন্য কেউ কেউ ক্ষোভও প্রকাশ করছে।

আমি মোহাম্মদ ফরহাদের জন্য ৭ মার্চের ভাষণের প্রায় সবটাই নোট করে নিয়েছিলাম। সভামঞ্চের যতটা সম্ভব কাছে যাওয়ার চেষ্টা ছিল আমার। তবে লোকের ভিড়ের কারণে মঞ্চের অনেক দূরেই কেবল আমি বসতে পারি। তরুণ বয়স থেকেই সাংবাদিকতার প্রতি ঝোঁক থাকার কারণে নোট নেয়া সহজ হয়েছিল।

ফরহাদ ভাই আমার কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জেনে নিলেন। কত লোক হয়েছিল, মানুষের মনোভাব কেমন ছিল, আর কে কে বক্তৃতা দিয়েছেন- এসব প্রশ্ন করেন। তারপর হেসে বললেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে শেখ সাহেব সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিলেন।’ তিনি ভাষণের দুটি বিষয়ের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন : এক, “আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, বাংলার মানুষের অধিকার চাই।”

দুই, “তোমাদের যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।”

তার মতে, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শাসকদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়তে বলেছেন। জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হয়েও পাকিস্তানের শাসনদণ্ড হাতে নিতে কোনো ইচ্ছা না থাকার কথাও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর পদ চাইলে বাঙালিদের ন্যায্য দাবির সঙ্গে আপস করতে হতো, যার জন্য তিনি কোনাভাবেই প্রস্তুত ছিলেন না। তার মতো নেতা জাতির ক্রান্তিলগ্নে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীকে যা বলেছেন, পরিণতি সম্পূর্ণ জেনেই সেটা বলেছেন। তিনি যা বলেছেন সেটা কার্যত স্বাধীনতারই ঘোষণা, সেটা জনতা ঠিকই বুঝে নেয়। তিনি দুইবার উচ্চারণ করেন- “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের এবং বাঙালিরা তাতে অভূতপূর্ব সাড়া দিল। একটি স্বাধীন দেশের যাবতীয় কর্তৃত্ব জনতা তার হাতে তুলে দিল পরম নির্ভরতায়। পরের দিনগুলো বাংলাদেশ চলল তার নির্দেশনায়। শাসকদের সঙ্গে জনগণের পূর্ণ অসহযোগের গৌরবের অধ্যায়ের সূচনা হলো, যা বিশ্বে নজিরবিহীন।

মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনে এবং বিশাল ভারতবর্ষের সব শ্রেণি-পেশার নারী-পুরুষকে ঐক্যবদ্ধ করেন। কিন্তু তিনি সরকার পরিচালনা করেননি কিংবা তার চেষ্টাও করেননি।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালের ১ মার্চের পর এবং বিশেষভাবে ৭ মার্চের রেসকোর্সের মহাসমাবেশের পর বাংলাদেশের প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত হয় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ও পরামর্শে। তিনি খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দিতে বলেন। জনগণ সেটাই করে। প্রতিদিন তাজউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, ড. কামাল হোসেন ও রেহমান সোবহানসহ কয়েকজনের একটি দল সংবাদপত্র ও বেতার-টিভির মাধ্যমে যে নির্দেশাবলি পাঠাতেন, সবাই সেটা মেনে চলত। সামরিক কর্তৃপক্ষও নির্দেশ পাঠাত, সেটা কেউ মানত না। এমনকি বাঙালি গোয়েন্দারাও তাদের হয়ে কাজ করত না।

সাংবাদিকদের হুমকি দিয়ে বলা হতো ‘রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও সংহতির বিরুদ্ধে’ কিছু প্রকাশ বা প্রচার করা হলে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে। কিন্তু কেউ সেটা মানতেন না। তারা অপেক্ষা করতেন, বঙ্গবন্ধু ‘৩২ নম্বর’ থেকে কী বলেন সেটার জন্য। ঢাকায় তখন প্রধান হোটেল ছিল ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেল। বঙ্গবন্ধু খাজনা-ট্যাক্স আদায় বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলে রাজস্ব বিভাগ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। এর ফলে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের মতো আন্তর্জাতিক মানের হোটেলেও খাদ্যদ্রব্যের ওপর শুল্ক-কর আদায় বন্ধ হয়ে যায়। পরিণতিতে সেখানে খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক কমে আসে এবং এটা জেনে অনেক ‘সাধারণ লোক’ সেখানে খাবারের জন্য ভিড় জমায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৩২ নম্বর থেকে নতুন নির্দেশনা আসে- এ ধরনের ক্ষেত্রে শুল্ক-কর আদায় করা যাবে, তবে তা জমা রাখতে হবে বাঙালিদের মালিকানাধীন কোনো ব্যাংকে। ইন্টারকন্টিনেন্টালে খাবারের দাম আবার আগের অবস্থায় চলে যায়।

এ ধরনের আরও কিছু ছাড় মার্চ মাসে ৩২ নম্বর থেকে প্রদান করা হয়েছিল। প্রকৃত পরিস্থিতি ছিল- বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে যেটা করতে বলা হতো, সেটা করা হতো এবং যেটা করতে নিষেধ করা হতো, সেটা করা হতো না।

ঐতিহাসিক ৭ মার্চের পঞ্চাশ বছর পূর্তির এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। আমার প্রত্যাশা, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর বছরে একটি দিন নির্ধারিত হবে যে দিনে প্রতিটি বিদ্যালয়, প্রতিটি কারখানা এবং আরও অনেক স্থানে ওই ভাষণ ও তার তাৎপর্য আলোচনা হবে। ছাত্রছাত্রী, সংস্কৃতি কর্মী, রাজনৈতিক কর্মী, বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত নারী-পুরুষ- সবার প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত হবে এক একটি দল এবং তারা উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তুলে ধরবে সেই অনন্য দিনের কথা।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলাম লেখক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।

শেয়ার করুন

৭ মার্চের ভাষণ প্রচারের তিন অধ্যায়

৭ মার্চের ভাষণকে একটি উৎকৃষ্টমানের কবিতার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ভাষণটিতে বঙ্গবন্ধুর সংযত আবেগ, মাপা বাক্য ব্যবহার, উচ্চারণের বলিষ্ঠতা, যুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ইত্যাদির দিকে তাকালে বোঝা যায়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ যে ইতিহাস রচনা করেছেন বঙ্গবন্ধু, তা এ জাতির উত্থানপর্বের সুমহান প্রকাশ।

এ কথা এখন সবাই জানেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ ৮ মার্চে প্রচারিত হয়েছিল রেডিওতে। এর অডিও ধারণ করে রেকর্ড আকারে প্রকাশ করা হয়েছিল এবং ভিডিওতেও তা ধারণ করা হয়েছিল।

এই তিনটি প্রক্রিয়ারই ছিল প্রস্তুতি। প্রথমটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইত্তেফাকের তৎকালীন বার্তা সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন ও জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আমির হোসেন, দ্বিতীয়টির সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন এমএনএ আবুল খায়ের ও ঢাকা রেকর্ডের চেয়ারম্যান এ. সালাউদ্দীন, তৃতীয়টির সঙ্গে ছিলেন এম এ মবিন।

বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন, রেসকোর্স ময়দানে এসে কত মানুষ আর তা শুনতে পাবেন? এ ভাবনাকে মাথায় রেখে সিরাজুদ্দীন হোসেন ভাবলেন, যদি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভাষণটি রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারের দাবি ওঠে, তাহলেই কেবল দেশের সকল এলাকার মানুষ তা শুনতে পাবে।

তাছাড়া সে সময় দেশের যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেকর্ড করা না হলে যে কেউ সেই ভাষণকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন। একটি ভুল পদক্ষেপ পুরো আন্দোলনকে ভিন্নপথে প্রবাহিত করতে পারে। তাই সিরাজুদ্দীন হোসেন ভাবলেন, এই ভাষণটি রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচার করা হলে কেউ তা ভুলভাবে উপস্থাপিত করতে পারবে না।

২ মার্চ রাত। সিরাজুদ্দীন হোসেন বললেন আমির হোসেনকে, ‘চা খেয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের ধর। বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা রেডিওতে প্রচারের দাবি জানিয়ে একটি বিবৃতি ছেপে দিই। দেখা যাক কিছু হয় কি না। বিবৃতিটা তুই-ই লিখে ফেল, শুধু কনসেন্ট নিয়ে নে।’

তখন রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে। চা খেতে খেতেই টেলিফোন করা শুরু করলেন আমির হোসেন। উত্তাল সে সময়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। তখন সিরাজুদ্দীন হোসেন বললেন, ‘সময় চলে যাচ্ছে। দেরি করা ঠিক হবে না। কী করা যায় বল তো!’

আমির হোসেন বললেন, ‘বিবৃতিটা তোফায়েল আহমেদের নামে হলে যদি চলে, ছেপে দিই। কাল তাকে সব খুলে বললেই হবে।’

সেভাবেই ইত্তেফাকে ছাপা হলো তোফায়েলের বিবৃতি।

পরদিন আওয়ামী লীগ অফিসে তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে দেখা হলে তিনি বললেন, অন্য পত্রিকাগুলো একটু মনঃক্ষুণ্ন হয়েছে, তাদের পত্রিকায় বিবৃতিটি না দেয়ায়। আসল ঘটনা তো বলা যায় না, তাই তোফায়েল জানিয়েছেন, গভীর রাতে যোগাযোগ হওয়ায় শুধু একটি পত্রিকায়ই বিবৃতিটা গেছে। বঙ্গবন্ধু অফিসেই ছিলেন। আমির হোসেনকে ডেকে তিনি বললেন, ‘আমির, তোর বিরুদ্ধে তোফায়েলের নালিশ আছে। তুই নাকি তার নাম জাল করে বিবৃতি ছেপেছিস ইত্তেফাকে?’

আমির হোসেন বললেন, ‘যা করেছি গুডফেইথেই করেছি এবং সিরাজ ভাইয়ের নির্দেশেই করেছি।’

বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘খুব ভালো করেছিস। এটা আরো আগেই করা উচিৎ ছিল। ওরা হয়তো খেয়ালই করেনি। সিরাজ এসব ব্যাপারে খুবই সজাগ। এজন্যই তো ওর ওপর আমি এত ভরসা করি।’

রেডিও কর্তৃপক্ষ প্রথমে দাবি অগ্রাহ্য করলেও প্রবল গণদাবির মুখে রেডিওতে ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এ ভাষণে স্বাধীনতার দাবি তুলতে পারেন ভেবে সরাসরি সম্প্রচার করেনি। পরে প্রবল গণরোষে পড়ে ৮ মার্চ সকালে ভাষণটি তারা প্রচার করতে বাধ্য হয়।

এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমার নামে যে বিবৃতিটি গিয়েছিল, সেটি আসলে সিরাজ ভাইয়ের। আমি তো আসলে এ বিবৃতি দিতে পারি না। আমি তখন ছাত্রলীগেও না, ডাকসুর ভিপিও না। এমএনএ একজন। তারপরও সিরাজ ভাই মনে করেছেন আমার নামে বিবৃতি গেলে ভালো হয়।’

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে থাকা ৪৫ আরপিএম রেকর্ডটির ইতিহাসও অনেকটা এ রকম। কাকতালীয়ভাবেই নির্মিত হয়েছিল এই রেকর্ড।

এ ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তৎকালীন ফরিদপুর-৫ আসনের জাতীয় পরিষদ সদস্য মো. আবুল খায়ের।

তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে ভাষণটি ঢাকা রেকর্ড কোম্পানি থেকে রেকর্ড করার অনুমতি চান। তিনি ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন এ সালাউদ্দীন। কারিগরি দিকটি দেখছিলেন এন এইচ খন্দকার।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আবুল খায়েরের নির্বাচনি প্রচারণায় বঙ্গবন্ধু নিজেই অংশ নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার গড়ে উঠেছিল পারিবারিক সম্পর্ক।

ছোট্ট এ রেকর্ডটিতে কোম্পানির লেবেলের জায়গায় ‘জয় বাংলা’ লেখা। অল্প কয়েকটি, হতে পারে শ’ খানেক রেকর্ড তখন হয়তো তৈরি করা হয়েছিল। ঢাকা রেকর্ড থেকে তা তৈরি হয়। খুবই গোপনে করা হয় ধারণের কাজটি।

বঙ্গবন্ধুর কাছে আবুল খায়ের গেলেন ভাষণটি রেকর্ড করা যায় কিনা, সেই অনুমতি নিতে। বঙ্গবন্ধু রেকর্ড করার অনুমতি দিলেন। বললেন, খুব গোপনে করতে হবে কাজ।

নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা রেকর্ডের টেকনিশিয়ান এনএইচ খন্দকারের ঠাঁই হয়েছিল মঞ্চের নিচে। সেখানেই তিনি যন্ত্রপাতি নিয়ে বসে গিয়েছিলেন। নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া বাকিরা টেরই পায়নি সেখানে নির্মিত হচ্ছে একটি ইতিহাস। আমরা সে কথা শুনি আবুল খায়েরের ছেলে নজরুল সংগীতশিল্পী খাইরুল আনাম শাকিলের কাছ থেকে।

রেকর্ডের কাজটি নির্বিঘ্নেই হয়। এরপর চলতে থাকে ৪৫ আরপিএম রেকর্ড তৈরির কাজ। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে রেকর্ডটি বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেওয়া হয়। রেকর্ডটি দেখে তোফায়েল আহমেদ ঠাট্টা করে বলেন, ‘এই রেকর্ডের আয় বাবদ রয়্যালটি তো আওয়ামী লীগের পাওনা।’

বঙ্গবন্ধু কৃত্রিম গাম্ভীর্য কণ্ঠে এনে বলেন, ‘কণ্ঠ আমার, ভাষণ আমার, রয়্যালটি তো পাব আমি!’

যতটা জানা যায়, এই রেকর্ডগুলো বাজারজাত করা হয়নি।

সালাউদ্দীন সাহেব তা বাক্সবন্দি করে মাটির নিচে পুঁতে রাখেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে আবুল খায়ের একটি রেকর্ড নিয়ে কলকাতায় চলে যেতে সক্ষম হন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ‘বজ্রকণ্ঠ’ নামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে যে প্রচারিত হতে থাকে, এই রেকর্ডই ছিল তার উৎস।

রেকর্ডটির কপি করার প্রয়োজন পড়ল। এইচএমভি ৩০০০ কপি করে দিল। সে রেকর্ডগুলোই পৌঁছে দেয়া হলো মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে। ‘আমার সোনার বাংলা’ আর বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানো হতো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোয়। ভারতে বিদেশি দূতাবাসগুলোতেও পৌঁছে দেয়া হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অডিও কপি।

৭ মার্চের যে ভিডিও ভাষণটি দেখা যায়, সেটি করেছিল চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর। তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে যে ফিল্মস ডিভিশন ছিল, এর ছিল পিআর ডিপার্টমেন্ট। তারাই এটি করেছিল।

ভাষণটি ধারণ করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেন জেড এম এ মবিন (ক্যামেরাম্যান), এম এ রউফ (ক্যামেরাম্যান) আমজাদ আলী খন্দকার (ক্যামেরা সহকারী), এসএম তৌহিদ (ক্যামেরা সহকারী), সৈয়দ মইনুল আহসান (ক্যামেরা সহকারী), জোনায়েদ আলী (ক্যামেরা সহকারী) খলিলুর রহমান এমএলএসএস। মাইক সরবরাহ করেছিল কল রেডি নামের প্রতিষ্ঠান।

পাকিস্তান সরকার এই ভাষণের ফুটেজ ধ্বংস করে ফেলতে পারে, এই সংশয় মনে জাগলে চলচ্চিত্র বিভাগের তদানীন্তন পরিচালক মহিবুর রহমান খাঁ (অভিনেতা আবুল খায়ের) সে বিভাগেরই সহকারী আমজাদ আলী খন্দকারকে দায়িত্ব দেন সেটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার জন্য। সেনাবাহিনীর চোখ এড়িয়ে মুন্সিগঞ্জের জয়পাড়ায় মজিদ দারোগার বাড়িতে তা লুকিয়ে রাখা হয়। স্বাধীনতার পর আবার তা ফিরিয়ে আনা হয়।

৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে এখন অনেক ধরনের বিশ্লেষণ হয়। এই ভাষণকে পৃথিবীর সেরা ভাষণগুলোর সঙ্গে তুলনা করা হয়। বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ থেকে ভাষণটির গূঢ়ার্থ বোঝার একটা সুযোগও তৈরি হয়।

সত্যিই ৭ মার্চের ভাষণকে একটি উৎকৃষ্টমানের কবিতার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ভাষণটিতে বঙ্গবন্ধুর সংযত আবেগ, মাপা বাক্য ব্যবহার, উচ্চারণের বলিষ্ঠতা, যুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ইত্যাদির দিকে তাকালে বোঝা যায়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ যে ইতিহাস রচনা করেছেন বঙ্গবন্ধু, তা এ জাতির উত্থানপর্বের সুমহান প্রকাশ।

সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে বিচার করতে পারত এবং সে বিচারে মৃত্যুদণ্ডই সর্বনিম্ন শাস্তি হতে পারত। কিন্তু কী কৌশলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘যদি’র ওপর সবকিছু চাপিয়ে দিয়ে অবলীলায় স্বাধীনতা ও মুক্তির কথা বলে দিলেন!

আর এই ভাষণটি রেডিওতে প্রচার, তার অডিও রেকর্ড এবং ভিডিওটি বঙ্গবন্ধুর এই মহাকাব্যটিকে যথার্থভাবে যথাসময়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে এবং স্থায়ী তথ্যভাণ্ডারে যুক্ত হয়েছে, এ বড় আনন্দ সংবাদ। জাতির জন্য এ এক মূল্যবান সংযোজন।

সহায়তা:

১. আমির হোসেন, সিরাজ ভাইকে যেমন দেখেছি, স্মৃতিপটে সিরাজুদ্দীন হোসেন

২. তোফায়েল আহমেদের সাক্ষাৎকার

৩. খাইরুল আনাম শাকিলের সাক্ষাৎকার

৪. চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট

৫. সিফাত বিনতে ওয়াহিদ: ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ ধারণ করেছিলেন আবুল খায়ের, প্রিয় ডটকম, ২৩ নভেম্বর, ২০১৭

৬. দ্য স্পিচ, তথ্যচিত্র পরিচালনা: ফখরুল আরেফিন

লেখক : গবেষক, সাংবাদিক-কলাম লেখক।

শেয়ার করুন

সর্বকালের সেরা স্বাধীনতা ও মুক্তির ভাষণ

বঙ্গবন্ধু ১৯৭১-এর ৭ মার্চের ভাষণে তার প্রকৃষ্ট পরিচয় প্রবলভাবে প্রতিভাত হয় যে; তিনি সকল অর্থে ছিলেন দেশের মাটি থেকে উৎসারিত একজন ঋত্বিক পুরুষ এবং মহান নেতা যার হৃদয় বাংলার মাটিতে প্রোথিত ছিল। এই বরাভয় মানুষটির অন্তর ও মস্তিস্ক সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত ছিল। এই মহামানব অন্তরে-বাইরে ছিলেন অবিকৃত ও খোলসমুক্ত।

সর্বকালের সেরা স্বাধীনতা ও মুক্তির ভাষণ নিয়ে লিখতে বসছি কেবল জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ ও আমাদের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের গৌরবময় অর্জনের কথা মনে করে।

কয়েকজন মহাপুরুষের ভাষণ বা কথামালা আমাদের পৃথিবীটাকে বাসযোগ্য এবং সুন্দর করেছে। আমাদের গ্রহের অগণিত মানুষের মধ্যে এমন ক্ষণজন্মা মানুষের জন্ম কদাচিৎ হয়ে থাকে। এরাই দুঃখ, কষ্ট, উৎপীড়নের মধ্যে আগামী দিনের স্বপ্ন দেখায় এবং দাসত্ব শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দেয় মানবসমাজকে।

খ্রিষ্টপূর্ব যুগে মানুষকে অমৃত কথা শোনাতেন দার্শনিক সক্রেটিস। সৎ ও সত্য কথা বলার জন্য তাকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। ৩৯৯ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দে নিজ হাতে হেমলক পান করতে বাধ্য করে তাকে তদানীন্তন গ্রিসের নিষ্ঠুর শাসকচক্র। এভাবে অনেক ক্ষণজন্মা পুরুষ, যারা যুগে যুগে মানুষকে আলোকবর্তিকা হাতে পথ দেখিয়েছিলেন বিভিন্ন সময়ে তাদের বক্তৃতা বা ভাষণ মানবসমাজকে আন্দোলিত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। সত্য কথা বলার জন্য, সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্যে তাদের প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছিল।

১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের উপস্থিতিতে ইংল্যান্ডের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল আমেরিকার জনগণের সামনে বিশ্ব মানবতার উদ্দেশ্যে যুদ্ধবিরোধী বক্তৃতা দিয়েছিলেন।

অনেক আগে ৩৩৫ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দে মেসিডোনিয়ার (প্রাচীন গ্রিস) মহাবীর রাজা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট জনগণের উদ্দেশে এক সাহস সঞ্চারকারী বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এভাবে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গল, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াসিংটন এবং আইজেন হাওয়ার জনগণের উদ্দেশে মানবতা-সম্পর্কিত বক্তৃতা দিয়ে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন।

মহাত্মা গান্ধীর ‘কুইট ইন্ডিয়া’ বক্তৃতা আজও মানুষের মনে গেঁথে আছে। আমেরিকার জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ঘাতকদের হাতে অকালে মৃতুবরণ করেন। তার ২০ জানুয়ারি, ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে ‘এ স্ট্যাটেজি অব পিস’ শিরোনামে বক্তৃতা বিশ্ববিখ্যাত হয়ে আছে। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র জগদ্বিখ্যাত একটি ভাষণ দিয়েছিলেন আগস্ট ২৮, ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ এই বক্তৃতার খণ্ডাংশ পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মুখে মুখে আজও উচ্চারিত হয়।

আমেরিকার কিংবদন্তিসম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের নাম বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এবং তার জনপ্রিয় ভাষণ ‘গেটেসবার্গ অ্যাড্রেস’-এর কিছু অংশ আজও অনেক মানুষের কণ্ঠে শোনা যায়। যেমন, আমরা আজও এই বক্তৃতার শেষ অংশটি উচ্চারণ করি-‘Government of the people by the people, for the people, shall not perish from the earth.’

ভারত যখন স্বাধীনতা অর্জন করল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকল থেকে তখন স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে স্মরণীয় বক্তৃতা দিয়েছিলেন ভারতীয় সংসদে যার শিরোনাম ছিল ‘ট্রাইস্ট উইথ ডেসটিনি’ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করলে যার অর্থ দাঁড়ায়–‘নিয়তির সঙ্গে অভিসার’।

যেসব বিশ্বখ্যাত বক্তৃতার কথা উল্লেখ করলাম, এগুলোর সবই ছিল প্রস্তুত বা অর্ধ প্রস্তুতকৃত বক্তৃতা। বাঙালির জাতির পিতা, বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ ছিল সম্পূর্ণ তাৎক্ষণিক, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই সর্বকালের সেরা এক কাব্যকথা। সেদিনের ঢাকার রমনা রেসকোর্সে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক দৃপ্ত দেবদূত যেন বাঁধভাঙা সমুদ্রসম জনতার সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং উচ্চারণ করেছিলেন যেন স্বর্গ থেকে প্রেরিত সর্বকালের সেরা শৃঙ্খল ভাঙার গান। কবিতা লেখার সময় কবি প্রবন্ধ রচনার মতো যেমন পূর্বপ্রস্তুতি নেন না, তার কলমই নিয়ে চলে তাকে সূর্যালোকিত দিগন্তের দিকে, তেমনি বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা বাঙালিকে নিয়ে গিয়েছিল; উইলিয়াম শেকস্‌পিয়রের ভাষায় ‘এক সাহসী নতুন বিশ্বের ঠিকানায়’।

শেখ মুজিবুর রহমান এসে দাঁড়ালেন বাঁধভাঙা জনতার সামনে; যেন এসে দাঁড়ালেন এক মহাবীর, দীর্ঘদেহী ও সুদর্শন, যেন মহাকাব্যের কোনো নায়ক। তারপর শুরু করলেন তার বজ্রকণ্ঠের শৃঙ্খল ভাঙার অপূর্ব ও অনন্য কথকতা। বক্তৃতা মঞ্চে এসে যখন দাঁড়ালেন সর্বকালের সেরা বাঙালি, আমাদের মহানায়ক, তখন মনে হচ্ছিল, মনে মনে তিনি উচ্চারণ করছেন শেকস্‌পিয়রের জুলিয়াস সিজার, নাটকের সেই বিখ্যাত সংলাপ-

‘Cowards die many times before their death; The valiant never taste of death but once.’

যার বাংলা অনুবাদ করেছেন আমাদের দেশের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক- ‘কাপুরুষ মৃত্যুর আগে বারবার মরে, বীর শুধু একবার’।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন হয়তো জগদ্বিখ্যাত কবি-নাট্যকার শেকসপিয়রের ভাষাতেই বক্তৃতা দিয়েছিলেন। শেকসপিয়রের নাট্য সংলাপের মতোই আমাদের অবিসংবাদিত নেতার কণ্ঠে জনতার উদ্দেশে জগৎ সেরা বাণী উচ্চারিত হয়েছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে।

মহাকবি শেকস্‌পিয়র যেমন সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে জানতেন এবং চিনতেন, আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুও সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষদের জীবনাচরণ সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন। সে জন্যই তিনি হয়ে উঠেছিলেন সত্যিকার অর্থে গণনায়ক। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতা অনন্য হয়ে উদ্ভাসিত হলো কয়েকটি কারণে। তিনি প্রায় কাব্যভাষায় কথা বলে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন, লক্ষ-কোটি বাংলার মানুষকে উদ্বেলিত ও অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলেন। একদিকে অপূর্ব মোহনীয় ও হৃদয়গ্রাহী, অন্যদিকে সূর্যরশ্মির মতো দীপ্র হওয়ার কারণে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ নিজেদের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে জীবনপণ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এই ভাষণে যুগপৎ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যঝঙ্কার এবং বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের ‘কারার ওই লৌহপকাট’ ভেঙে ফেলার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছিল।

ইউনেস্কোর লিখিত ‘হ্যারিটেজ’ (প্রাপ্ত সম্পদ)-এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর এই বক্তৃতা। সেটা বড় অর্জন হলেও, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিঃসন্দেহে বিশ্বের সেরা ভাষণ, কোনো মণিহার ছাড়াই। যেমন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার না পেলেও তিনি রবীন্দ্রনাথই থাকতেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতাকে কোনো মণিহারে পুরস্কৃত করার প্রয়োজন ছিল না, কারণ এই বক্তৃতা শ্রবণ করে বাংলার ৩০ লাখ মানুষ, যারা আধুনিক যুদ্ধ ও মারণাস্ত্র সম্পর্কে কিছুই জানত না তারা দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে অকাতরে প্রাণ বলি দিয়েছিল। সম্ভ্রম হারিয়েছিল দুই লাখেরও বেশি মা ও বোন।

মাত্র ১৯ মিনিটের ভাষণে সেদিন সারা পৃথিবীর মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সমগ্র বিশ্বে সর্বাধিক শ্রুত ভাষণ। কেবল একটি ভাষণ মানুষের রক্তস্রোতে যে এমন আগুন ধরিয়ে দিতে পারে তার নজির পৃথিবীতে আর নেই। এই ভাষণ ছিল যথার্থ এবং সময়পোযোগী, যার তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এমন দৃপ্ত ও সাহসী ভাষণের তুলনা বিশ্বে আর নেই। একটি অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি উপনিবেশিক প্রভুদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এমন সাহসী উচ্চারণ এই উপমহাদেশের অন্য কোনো গণনায়ক এর আগে কখনও করেননি। ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন এবং আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনকে বাস্তবে রূপান্তরিত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেছিলেন-

‘আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই আজ থেকে এই বাংলায় কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে ... রিকশা, গরুর গাড়ি চলবে, লঞ্চ চলবে; শুধু সেক্রেটারিয়েট সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জর্জ কোর্ট সেমিগভর্নমেন্ট, দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোনো কিছু চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা বেতন নিয়ে আসবেন।’...

বঙ্গবন্ধু ভাষণের উপরে উল্লেখিত অংশগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করলে উপলব্ধি করা যাবে যে, বঙ্গবন্ধু দেশের আপামর জনসাধারণের ভাষায় কথা বলতে জানতেন, যেভাবে শেকস্‌পিয়রের জুলিয়াস সিজার নাটকের প্রধান চরিত্র মার্ক এন্টনির বিখ্যাত দীর্ঘ সংলাপে পরিলক্ষিত হয়। তিনি বলেছেন- ‘বলে দিবার চাই যে; এবং পরিবর্তে যদি তিনি বলতেন ‘বলে দিতে চাই যে’, তাহলে জনগণের সঙ্গে তার দূরত্ব বেড়ে যেত। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণের শেষদিকে বলেছেন-

...‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।’... পরিবর্তে তিনি যদি অতি পরিশুদ্ধ ভাষায় বলতেন, ‘সাত কোটি মানুষকে অবদমিত করতে পারবে না’, তাহলে এই উচ্চারণটি বিদ্যুৎ-প্রবাহের মতো কাজ করত না। জাতির পিতা একটিও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার না করে ভাষণটি দিয়েছিলেন এবং আঞ্চলিক ভাষা তিনি ব্যবহার না করে বাংলা ভাষাতেই বক্তৃতা দিয়েছিলেন কিন্তু তাতে মুখোশঢাকা অতিপোশাকি শব্দ ছিল না।

তিনি ছিলেন অগণিত মানুষের প্রাণের মানুষ, বাঙালি জাতিকে তার আগমনের জন্যে যুগ যুগ অপেক্ষা করতে হয়েছে। তারপর তিনি এলেন, রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নকে সার্থক করে আমাদের দেশের মাটিতে পদযুগল রাখলেন। রবীন্দ্রনাথের গান বেজে উঠল দিগবিদিকে- ‘ওই মহামানব আসে/ দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে/ মর্ত্যধূলির ঘাসে ঘাসে।’...

বঙ্গবন্ধু ১৯৭১-এর ৭ মার্চের ভাষণে তার প্রকৃষ্ট পরিচয় প্রবলভাবে প্রতিভাত হয় যে; তিনি সকল অর্থে ছিলেন দেশের মাটি থেকে উৎসারিত একজন ঋত্বিক পুরুষ এবং মহান নেতা যার হৃদয় বাংলার মাটিতে প্রোথিত ছিল। এই বরাভয় মানুষটির অন্তর ও মস্তিস্ক সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত ছিল। এই মহামানব অন্তরে-বাইরে ছিলেন অবিকৃত ও খোলসমুক্ত।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অমিত সাহস হয়তোবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তাসের দেশ’ নাটকের রাজপুত্রের গানের সঙ্গে কিছুটা হলেও তুলনীয়- ‘যদি কোথাও কূল নাহি পাই/ তল পাবতো তবু/ ভিটার কোণে হতাশ মনে রইব না আর কভু।’ এই অকুতোভয় গণনায়কের পরিচয় অনেকটাই পাওয়া যায় তার ৭ মার্চের বক্তৃতায়। রাজনৈতিক কপটতার খোলস থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। তার হৃদয়ের সত্য আর মুখের সত্য একই ছিল।

বাঙালি জাতির মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতা কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই শুরু করেছিলেন, সর্বকালের সেরা শেকসপীয়রের ট্র্যাজিক হিরোদের মতো, বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন-‘আজ দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।’ যখন মহানায়ক দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে দেশের মানুষের সামনে এসে দাঁড়ান, তখন প্রতিটি মানুষ আবেগে আপ্লুত না হয়ে পারে না। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ ও বাক্যে উপস্থিত জনতা উদ্বেলিত এবং অশ্রুসিক্ত হয়েছিল। এমন যথার্থ শব্দের ব্যবহার ও বাক্যবিন্যাস বিশ্বের অন্য কোনো বিখ্যাত ভাষণে পাওয়া যায় না। অথচ, এই ভাষণটি ছিল তাৎক্ষণিক, যেন স্বর্গ থেকে প্রেরিত ছিল বিষয়বস্তু ও শব্দমালা। ভাষণের এক জায়গায় বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেছিলেন-

‘তেইশ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস, এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।’

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তিনি রক্ত বিসর্জন দেয়ার কথা বলেছিলেন এবং ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও ক্ষমতা না পাওয়ার দুঃখ ব্যক্ত করেছিলেন তার এই যুগান্তকারী বক্তৃতায়। এই ভাষণে যারা বাংলার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন-

‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই।’ এই জগদ্বিখ্যাত ভাষণে হরতাল ডেকে বঙ্গবন্ধু সমগ্র দেশকে অচল করে দিয়েছিলেন। ৭ মার্চের বক্তৃতায় স্বয়ং বিশ্বনিয়ন্তা তাকে শক্তি জুগিয়েছিলনে এবং তার কণ্ঠে সময়োপযোগী কথামালার জোগান দিয়েছিলেন।

ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ও যোদ্ধা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন-

‘আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদেরকে স্বাধীনতা দেব।’

ভারত স্বাধীন হয়েছিল ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে। দুৰ্ভাগ্যবশত, কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকচক্র আমাদের যুক্ত করে দিল হাজার মাইল দূরের একটি জনগোষ্ঠীর যাদের সঙ্গে আমাদের খাদ্যভ্যাস, ভাষা, জীবনাচরণসহ স্বপ্ন দেখার কোনো মিল ছিল না। আমরা, পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা ফুটন্ত পাত্র থেকে অগ্নিময় চুল্লিতে পড়ে গিয়েছিলাম। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকচক্রের হাতে নিষ্পেষিত হচ্ছিলাম। আমাদের বঞ্চিত জীবনের প্রান্তে আমাদের মাঝেই এক মহামানবের আবির্ভাব হলো। হিমালয়সম এই মানুষটি বললেন,

‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব’, তিনি নেতাজির মতো রক্ত চাননি; রক্ত দিতে বলেছেন। তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি তার ৭ মার্চের বক্তৃতায় মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানদের বিভাজন করেননি। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’; তিনি বাংলার মধ্যযুগের কবি বড়ু চণ্ডীদাসের এই উচ্চারণকে সর্বাংশে জীবনের ধ্রুব সত্যরূপে প্রকাশ করেছিলেন এবং বাস্তবায়িতও করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের বক্তৃতার সমাপ্তি টেনেছেন এই উচ্চারণে-

‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা!’ তার ৭ মার্চের বিশ্ববিখ্যাত বক্তৃতা, তথা বিশ্বের সর্বকালের সেরা ভাষণকে বিশ্বের সকল নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সাহস ও শক্তি জুগিয়েছিলেন। তার এই তাৎক্ষণিক বক্তৃতা ছিল হৃদয়াবেগের সঙ্গে মানবমুক্তির সর্বকালের সেরা উচ্চারণ। তার এই বক্তৃতাই বুকের রক্ত ঢেলে ও সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়ে বাঙালিকে একটি জাতি ও ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র অর্জনের ক্ষেত্রে প্রধান শক্তি হিসেবে তড়িৎ-প্রবাহের মতো কাজ করেছিল। শুধু তাই নয়, এই অদম্যসাহসী ভাষণ বিশ্বের সমগ্র নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ের কথা হিসেবে অনাগতকাল ধরে বিবেচিত হবে। সার্বিক বিবেচনায় বাঙালি জাতির পিতা, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের বক্তৃতা পৃথিবীর ইতিহাসে গণমানুষের বিশ্বের সেরা বক্তৃতা হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এই বক্তৃতা যেমন ছিল বস্তুনিষ্ঠ তেমনি ছিল হৃদয়গ্রাহী এবং এই কারণেই বিশ্বের সবচেয়ে অধিক শ্রুত এই ভাষণের তুল্য অন্য কোনো ভাষণ নেই, এই বক্তৃতার প্রতিটি শব্দচয়ন ছিল কাচ কাটা হীরের মতো ক্ষুরধার এবং সূর্যশিখার মতো দীপ্ত-অনির্বাণ।

লেখক: মঞ্চসারথি, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

শেয়ার করুন

দুনিয়া কাঁপানো মহাকাব্য

বঙ্গবন্ধু জানতেন সেদিনের পরিস্থিতি। যেটা তিনি আমাদের বলেছিলেন। সেনাবাহিনী তখন প্রস্তুত। মাথার উপর বোমারু বিমান এবং হেলিকপ্টার গানশিপ টহল দিচ্ছে। যখনই বঙ্গবন্ধু এই ভাষায় বলবেন যে, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’, তখনই তারা গোলাবর্ষণ শুরু করবে। সেজন্য বঙ্গবন্ধু সবকিছু জেনেই বক্তৃতা করেছেন। এত বিচক্ষণ নেতা ছিলেন যে, সমস্ত ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সামরিক শাসকের উদ্দেশে চারটি শর্ত আরোপ করলেন- মার্শাল ’ল প্রত্যাহার কর, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নাও, এ কয়দিনে যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার বিচারবিভাগীয় তদন্ত কর এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর কর।

১৯৭১-এর ৭ মার্চের দুনিয়া কাঁপানো ভাষণ বাঙালি জাতির মহান মুক্তিসনদ! ঐতিহাসিক এই ভাষণ জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক দিগন্তে বাঙালির গৌরবময় পতাকা মর্যাদার সঙ্গে উড্ডীন রেখেছে।

২০১৭-এর ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো ’৭১-এর ৭ মার্চে প্রদত্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণকে (ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ) বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। যা জাতির জন্য গৌরব এবং আনন্দের। আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চেরও সুবর্ণজয়ন্তী।

পঞ্চাশ বছর আগের এই দিনটির জন্যই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনভর সংগ্রাম করেছেন। দীর্ঘ ১৩টি বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট করে রাজনীতি করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই তিনি লক্ষ্য নির্ধারণ করেন ‘একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে।’ সেই পথেই তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়েছেন। মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করেন। ছয় দফার মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ তথা আগরতলা মামলার আসামি হিসেবে ফাঁসিকাষ্ঠে গিয়েছেন। কিন্তু বাঙালির জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে আপস করেননি। ’৬৯-এর প্রবল গণ-আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা তাকে কারামুক্ত করি।

জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখব, একেকটা ঘটনার সঙ্গে একেকটা ঘটনা সম্পর্কিত। তিনি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন একটি লক্ষ্য নিয়ে। ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের অগ্রগামী বাহিনী। জাতীয় নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু যা বলতে পারতেন না, ছাত্রলীগ দিয়ে সেটা বলাতেন। আজকাল অনেকে অনেক কথা বলেন, অনেক কিছু লেখেন কে তুলেছে ‘স্বাধীন বাংলার পতাকা’, কে বলেছে ‘জাতীয় সংগীত’ ইত্যাদি।

ইতিহাসের সত্য হচ্ছে, এগুলো বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নির্ধারিত। বঙ্গবন্ধুর অনুমোদন ছাড়া কোনো কিছু হয়নি। ১৯৬৬-এর মার্চে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা...’ পরবর্তীকালে আমাদের জাতীয় সংগীত-এই গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শুরু হয়। সম্মেলনের শেষদিন পল্টন ময়দানে জনসভার শুরুতে এই গান পরিবেশনের পর বঙ্গবন্ধু বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘ছয় দফা বাংলার মানুষের মুক্তিসনদ’। তারপরে এলো ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন। একটি কথা দ্বিধাহীনচিত্তে বলতে চাই-’৭০-এর নির্বাচনে যদি বঙ্গবন্ধু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেতেন, তাহলে কি আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেতাম? হয়তো পেতাম, কিন্তু অনেক সময় লাগত। নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই বঙ্গবন্ধু ’৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।

’৭০-এর ৩০ মার্চে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-২ অনুযায়ী লিগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্ক অর্ডার বা সংক্ষেপে এলএফও জারি হয়। সর্বমোট ৪৮টি অনুচ্ছেদ সংবলিত এই এলএফওতে ৬ ও ১১ দফার দুটি দফা- এক. ‘প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার’ এবং দুই. ‘জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব’ মেনে নেয়া হয়। ফলে, জাতীয় পরিষদে ৩১৩টি আসনের মধ্যে জনসংখ্যার অনুপাতে আমরা পাই ১৬৯টি আসন। কিন্তু ভবিষ্যতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও যাতে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে না পারেন সেজন্য ইয়াহিয়া খান এলএফওতে বিতর্কিত ২৫ ও ২৭ নং দু’টি অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত করেন। ২৫ নং অনুচ্ছেদের শিরোনাম ছিল, ‘শাসনতন্ত্রের প্রমাণীকরণ’। যাতে বলা হয়েছিল-

‘জাতীয় পরিষদে গৃহীত শাসনতন্ত্র বিল, প্রমাণীকরণের জন্য প্রেসিডেন্টের নিকট উপস্থাপিত হবে। এ পর্বে প্রমাণীকরণে প্রত্যাখ্যাত হলে জাতীয় পরিষদের অবস্থান লুপ্ত হবে।’

আর ২৭ নং অনুচ্ছেদের শিরোনাম ছিল, ‘আদেশের সংশোধন এবং ব্যাখ্যা, ইত্যাদি’; এর ক-ধারায় ছিল, ‘এই আদেশের কোন আইনের ধারা সম্পর্কে কোন ধারণা, কোন ব্যাখ্যা বা কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হলে সে সম্পর্কে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে এবং এ ব্যাপারে কোন আদালতে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।’

একই অনুচ্ছেদের খ-ধারায় ছিল, ‘জাতীয় পরিষদ নয় বরং রাষ্ট্রপতিই এই আদেশের সংশোধনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী।’

এলএফওতে সন্নিবেশিত দু’টি ধারাই ছিল আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী দলকে ঠেকানোর অপপ্রয়াস। যার জন্য অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ‘এই নির্বাচন করে কোন লাভ নেই।’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার এই নির্বাচন ক্ষমতায় যাওয়ার নির্বাচন নয়। এই নির্বাচন হলো গণভোট এবং নির্বাচনের পর পরই আমি এই এলএফও টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবো।’

’৭০-এর ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও ১৭ ডিসেম্বর ছিল প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের নির্বাচন ৭ ডিসেম্বর না হয়ে ’৭১-এর ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। ফলে নির্বাচনি প্রচারাভিযানে বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে থেকে সারা দেশ সফরের সুযোগ পাই।

আমরা সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ জাতীয় পরিষদে ১৬৯টি আসনের ১৬৭টি আর প্রাদেশিক পরিষদে ২৯৮টি আসনে জয়লাভ করি। বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ’৭১-এর ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ অনুষ্ঠান। সেদিনের শপথসভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-

“৬ দফা আজ আমার না, আমার দলেরও না। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ৬ দফা জনগণের সম্পত্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। কেউ যদি এর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হবে এবং আমি যদি করি আমাকেও।”

এই শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ৬ দফাকে তিনি আপসহীন অবস্থায় উন্নীত করেন। এর পর অনেক ঘটনা ঘটেছে। ভুট্টো-ইয়াহিয়া ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। ’৭১-এর ১ মার্চ ৬ দফার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নের জন্য হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক চলাকালে পূর্বাহ্নে ডাকা ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে একতরফাভাবে স্থগিত ঘোষণা করেন। তৎক্ষণাৎ দাবানলের মতো আগুন জ্বলে ওঠে।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমরা পল্টন ময়দানে যাই। সেখানে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি। বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগ ও ডাকসু’র সমন্বয়ে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের নির্দেশ দেন। ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ পাঠ করা হয়। এরপর আসে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ।

৭ মার্চ একদিনে আসেনি। ধাপে ধাপে এসেছে। এই ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি বিচক্ষণ নেতা ছিলেন। সবসময় সতর্ক ছিলেন যাতে তিনি আক্রমণকারী না হয়ে আক্রান্ত হন। আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাহায্য-সহযোগিতা ও স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য তিনি বিশেষভাবে যত্নবান ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে কেউ যেন বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায়িত করতে না পারে সে জন্য তিনি সতর্কতার সঙ্গে বক্তৃতা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

এখানে শ্রদ্ধাভরে বঙ্গমাতাকে মনে পড়ে। ৬ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু বারান্দায় পায়চারী করে আগামীকালের বক্তৃতা নিয়ে ভাবছিলেন। শ্রদ্ধেয়া বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব অভয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার ভাববার কী আছে? সারাজীবন তুমি একটা লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করেছ। জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করেছ। বার বার ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছ। মৃত্যুকে ভয় পাওনি। বিশ্বাসী আত্মা থেকে তুমি যা বিশ্বাস করো, তাই বলবা।’ ঠিকই বঙ্গবন্ধু বিশ্বাসী অন্তর থেকে ৭ মার্চের বক্তৃতা করেছিলেন। এটি দুনিয়া কাঁপানো বক্তৃতা। পৃথিবীর কোনো ভাষণ এতবার উচ্চারিত হয়নি। একটি অলিখিত বক্তৃতা তিনি দিলেন বিশ্বাসী অন্তর থেকে। যা তিনি বিশ্বাস করতেন তা-ই বলতেন।

শত্রুপক্ষ গোলা-বারুদ, মেশিনগান, কামান, হেলিকপ্টার-গানশিপ, ট্যাঙ্কসহ সবকিছু নিয়ে প্রস্তুত। সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে নিরস্ত্র জনসাধারণের উপর। অনেকেই তো বঙ্গবন্ধুকে বলতে চেয়েছেন, আজকেই যেন বলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ কিন্তু বঙ্গবন্ধু কারো দ্বারা প্ররোচিত হননি। ৭ মার্চ সকাল থেকেই রেসকোর্স ময়দানে জনসভাতে আসতে থাকে। তখন সব মানুষের মুখে মুখে স্বাধীনতা। একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে।

৭ মার্চ দুপুরে আমি এবং আমারই আরেক প্রিয় নেতা-নামোল্লেখ করলাম না- আমরা দু’জন বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু আমাদের দু’জনের কাঁধে হাত রেখে কথা বলছিলেন। আমাদের সেই নেতা যখন বঙ্গবন্ধুকে বললেন, তিনি তাকে ‘লিডার’ বলে সম্বোধন করতেন- ‘লিডার, আজকে কিন্তু পরিপূর্ণ স্বাধীনতার ঘোষণা ছাড়া মানুষ মানবে না।’ আমাদের কাঁধে রাখা হাত নামিয়ে তার নামোচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু ইংরেজিতে বললেন, ‘আই অ্যাম দি লিডার অব দি পিপল। আই উইল লিড দেম। দে উইল নট লিড মি। গো অ্যান্ড ডু ইউর ডিউটি।’ এই বলে তিনি আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উপরে চলে গেলেন।

আমরা ধানমণ্ডি থেকে রওয়ানা হই পৌনে তিনটায়। রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছাই সোয়া তিনটায়। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা আরম্ভ করেন সাড়ে তিনটায়। দশ লক্ষাধিক জনতার গগনবিদারী স্লোগানে মুখরিত রেসকোর্স ময়দান। সেদিনের সভামঞ্চে জাতীয় চার নেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা দেয়ার জন্য দাঁড়ালেন, চারদিকে তাকালেন। মাউথপিসের সামনে পোডিয়ামের ওপর চশমাটি রাখলেন। হৃদয়ের গভীরতা থেকে যা তিনি বিশ্বাস করতেন, যার জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন, ফাঁসির মুখোমুখি হয়েছেন, সেই বিশ্বাসী আত্মা দিয়ে, বাংলার মানুষকে ডাক দিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার’। তারপর একটানা প্রায় ১৯ মিনিট ধরে বলে গেলেন দুনিয়া কাঁপানো মহাকাব্য। বক্তৃতায় তিনি মূলত স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। বঙ্গবন্ধুর সামনে ছিল দুটি পথ। এক. স্বাধীনতা ঘোষণা করা। দুই. পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব না নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত না হয়ে সুচিন্তিত বক্তব্য প্রদান করা। তিনি দুটোই করলেন।

বঙ্গবন্ধু জানতেন সেদিনের পরিস্থিতি। যেটা তিনি আমাদের বলেছিলেন। সেনাবাহিনী তখন প্রস্তুত। মাথার উপর বোমারু বিমান এবং হেলিকপ্টার গানশিপ টহল দিচ্ছে। যখনই বঙ্গবন্ধু এই ভাষায় বলবেন যে, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’, তখনই তারা গোলাবর্ষণ শুরু করবে। সেজন্য বঙ্গবন্ধু সবকিছু জেনেই বক্তৃতা করেছেন। এত বিচক্ষণ নেতা ছিলেন যে, সমস্ত ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সামরিক শাসকের উদ্দেশে চারটি শর্ত আরোপ করলেন- মার্শাল ’ল প্রত্যাহার কর, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নাও, এ কয়দিনে যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার বিচারবিভাগীয় তদন্ত কর এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর কর।

এই চারটি শর্তারোপ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত হলেন না। পাকিস্তানিরা তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন সদাসতর্ক এবং সচেতন।

অপরদিকে বক্তৃতাজুড়ে ছিল আসন্ন জনযুদ্ধের রণকৌশল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন-

“আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই। ‘আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।’… ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব।”… ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে’ তোলার আহ্বান জানিয়ে বললেন, “সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো ওয়াপদা কোনোকিছু চলবে না।” নির্দেশ দিলেন “আটাশ তারিখে কর্মচারীরা যেয়ে বেতন নিয়ে আসবেন।” সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে বললেন, “আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো, কেউ দেবে না।” গরিবের কথা খেয়াল রেখে বলেছেন, ‘গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে” সেজন্য শিল্প কল-কারখানার মালিকদের উদ্দেশে বলেছেন, “এই সাত দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছেন প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছায়া দিবেন।” জীবনভর লালিত প্রগাঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে বিরোধী রাজনীতিকদের উদ্দেশে বলেছেন, “যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।” আর রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন-

“প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, প্রত্যেক ইউনিয়নে, প্রত্যেক সাবডিভিশনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।”

বক্তৃতার শেষে বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতা ঘোষণা করে বলেছেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতা সংগ্রাম।” অর্থাৎ সামগ্রিকতায় জাতীয় মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে জনসাধারণ কর্তৃক নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার ভারসাম্যপূর্ণ বক্তৃতা। সেদিনের সেই স্মৃতি মানসপটে ভেসে ওঠে। অভূতপূর্ব দৃশ্য, কল্পনা করা যায় না। এটিই মানুষ প্রত্যাশা করেছিল। একটা কথা আমার বার বার মনে হয়।

একজন নেতা কত দূরদর্শী যে, তিনি সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে জানতেন। কোন সময় কোন কথা বলতে হবে এটা তার মতো ভালো জানতেন এমন মানুষ আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে দেখিনি। আমি লক্ষ্ করেছি, বঙ্গবন্ধু জীবনে কখনও স্ববিরোধী বক্তব্য দেননি। একটি বক্তব্য দিয়ে পরে সেই বক্তব্য অস্বীকার করা বা বক্তব্যের মধ্যে পরস্পরবিরোধীতা এটি তার কোনোদিন হয়নি। কারণ, যা তিনি বিশ্বাস করেছেন, ভেবেছেন, মনে করেছেন যে এটিই বাস্তবসম্মত, সেটিই তিনি বলেছেন সুচিন্তিতভাবে। আর যা একবার বলেছেন, মৃত্যুর কাছে গিয়েও আপসহীনভাবে সেই কথা তিনি বাস্তবায়ন করেছেন। বঙ্গবন্ধু তার হৃদয়ে ধারিত গভীর বিশ্বাস থেকেই সেদিন বক্তৃতা করেছেন।

আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতা বিশ্লেষণ করি তবে দেখব, অলিখিত একটি বক্তৃতা। ভাষণের সময় ১৯ মিনিট। শব্দ সংখ্যা ১৩০৮টি। আব্রাহাম লিংকনের Gettysburg Address-এর শব্দ সংখ্যা ২৭২, সময় ৩ মিনিটের কম এবং লিখিত। অপরদিকে, মার্টিন লুথার কিং-এর ‘I have a dream’ ভাষণটির সময় ১৭ মিনিট, শব্দ সংখ্যা ১৬৬৭। কিন্তু বিশ্বের কোনো নেতার ভাষণ এমন সংগ্রামমুখর ১০ লক্ষাধিক মুক্তিকামী নিরস্ত্র মানুষের সামনে হয়নি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণটি প্রদান করে মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে, নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করে মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিলেন। কী বিচক্ষণ একজন নেতা! আইএসআই ৭ মার্চ ঢাকা ক্লাবের সামনে ছিল। তারা অপেক্ষা করেছিল- যে ঘোষণাটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’-তারা মনে করেছিল সেই কথাটি তিনি ৭ মার্চ বলবেন।

আমি আগেই বলেছি বঙ্গবন্ধু ছিলেন সতর্ক। তিনি সবই বলেছেন, কিন্তু শত্রুর ফাঁদে পা দেননি। উলটো শত্রুকেই ফাঁদে ফেলেছেন। যার জন্য পরদিন আইএসআই রিপোর্ট করলো ‘চতুর শেখ মুজিব চতুরতার সঙ্গে বক্তৃতা করে গেল। একদিকে স্বাধীনতা ঘোষণা করল, আরেকদিকে ৪টি শর্ত আরোপ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায়িত হলো না এবং পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব নিল না। আমাদের নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। আমরা যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলাম সেটা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো।’

এই ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি একটি গণতান্ত্রিক-রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন। একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র বাঙালি জাতিতে রূপান্তরিত করেছেন। এই একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে তিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে একই মোহনায় দাঁড় করিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন ঠিকই কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদের দায় এড়িয়ে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের কালপর্বে এই মার্চ মাস থেকেই শুরু হলো স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এই মার্চই তো রক্তঝরা মাস। আজ ৭ মার্চেরও সুবর্ণজয়ন্তী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের দেরাদুনে আমাদের ট্রেনিং হতো। সেখানে আমরা মুজিব বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে বক্তৃতায় বলতাম-

“বঙ্গবন্ধু মুজিব তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ জানি না। কিন্তু তোমার নির্দেশিত পথে যুদ্ধ চালিয়ে যতক্ষণ আমরা বাংলা মাকে মুক্ত করতে না পারব, ততক্ষণ মায়ের কোলে ফিরে যাবো না।”

প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন ও বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করেই আমরা মায়ের কোলে ফিরে এসেছিলাম। ৭ মার্চের দুনিয়া কাঁপানো বক্তৃতা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের চলার পথের দিকনির্দেশনা- যা আমরা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করেছি। দুটি মহান লক্ষ্য সামনে নিয়ে বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছেন। এক. বাংলাদেশের স্বাধীনতা। দুই. অর্থনৈতিক মুক্তি। প্রথম লক্ষ্য পূরণ করে যখন তিনি দ্বিতীয় লক্ষ্য পূরণের দ্বারপ্রান্তে ঠিক তখনই ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করে। জাতির পিতার দুই কন্যা তখন বিদেশে অবস্থান করায় রক্ষা পান।

’৮১-এর ১৭ মে জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার হাতে আওয়ামী লীগের রক্তে ভেজা পতাকা আমরা তুলে দেই। সেই সংগ্রামী পতাকা হাতে নিয়ে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে আজ বাংলাদেশকে তিনি উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত করে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছেন। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ হবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা।

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

শেয়ার করুন

৭ মার্চের ভাষণ : বাঙালি জাতীয়তাবাদের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুকে ‘চতুর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা লেখেন, ‘শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেল, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারলাম না।’ পরদিন অর্থাৎ ৮ মার্চ সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রধান শিরোনাম ছিল এ রকম, ‘চতুর শেখ মুজিব চতুরতার সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন’।

বাঙালি জাতিসত্তা সৃষ্টির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় একটি দিন ৭ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) লক্ষ লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে বাঙালি জাতির উদ্দেশে এক তাৎপর্যপূর্ণ মহাকাব্য সৃষ্টি করেন। এই মহাকাব্যই ইতিহাসে ‘৭ মার্চের ভাষণ’ হিসেবে পরিচিত, যা পরবর্তী সময়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণের স্বীকৃতি পেয়েছে।

সারা বিশ্বের প্রথিতযশা ঐতিহাসিকগণ বিস্তর পরিসরে গবেষণা করে ৭ মার্চের ভাষণকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইতিমধ্যেই ইউনেস্কো ‘ডকুমেন্টরি হেরিটেজ’ (বিশ্ব প্রামাণ্য দলিল) হিসেবে ৭ মার্চের ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়ে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’-এ সংগৃহীত করেছে। অথচ একসময় স্বাধীন বাংলাদেশে এই ভাষণ প্রচার করা নিষিদ্ধ ছিল।

আমাদের বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ভাষণের ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতি পাওয়াকে ইতিহাসের প্রতিশোধ হিসেবে তুলনা করেছেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক ভাষণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাই আমরা বলি, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়ে ইউনেস্কোই সম্মানিত হয়েছে।

মাত্র ১৮ মিনিটের হলেও ৭ মার্চের ভাষণই ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের শ্রেষ্ঠ ভাষণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন একবার কোনো এক সেমিনারে বলেছিলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর জীবনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ শ্রেষ্ঠ ভাষণ’। সত্যিই এটা কল্পনাতীত, মাত্র ১৮ মিনিটের ছোট্ট একটা ভাষণ দিয়ে বঙ্গবন্ধু সমগ্র বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলতে পেরেছিলেন স্বাধিকারের দৃঢ় প্রত্যয়ে। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের জাদু। তার নির্দেশে বিনাবাক্যে সমগ্র বাঙালি জাতি স্বাধীনতার প্রত্যয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ২ মে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ এ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরা হয়েছিল।

সেই প্রতিবেদনের অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো, ‘মার্চে শাসনতান্ত্রিক এই সংকট যখন সৃষ্টি হয়, তখন শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। সাধারণ বাঙালির কাছে তার কাপড় স্পর্শ করা ছিল তাবিজে শুভ ফল পাওয়ার মতো। তার বাক্যই হয়ে উঠেছিল আইন। ধানমন্ডিতে তার বাসা থেকে তিনি সব করেছিলেন, সবার সঙ্গেই ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তার কাছে যাওয়ার কোনো বাধা ছিল না, প্রতিদিন তিনি দেখা করতেন অজস্র লোকের সঙ্গে।

সম্পদ বা পদমর্যাদার দিকে তার কোনো নজর ছিল না। তিনি সম্পূর্ণভাবে আন্তরিক ছিলেন জনগণের প্রতি। প্রতিটি বাঙালি, তিনি যত তুচ্ছ বা গরিবই হোন না কেন, বঙ্গবন্ধু তাকে মানুষের মর্যাদা ও সম্মান দিয়েই বিবেচনা করতেন, সাহায্য করতেন। তার নাম, তার পরিবারের অবস্থা কখনও ভুলতেন না। প্রতিদানে বাঙালিরা তাকে বিশ্বাস করতেন। তার সততা, আত্মত্যাগ, সাহস ও তাদের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার বিষয়টিও বিশ্বাস করতেন।’ (তথ্যসূত্র : এ কে এম আব্দুল মোমেন, ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’, ১৯৭১-এর স্মৃতিচারণা)।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের এই সূত্র ধরেই বোঝা যায়, সমগ্র বাঙালি জাতির ওপর বঙ্গবন্ধুর কতটা প্রভাব ছিল।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা। তিনি জানতেন, ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুর জনসভায় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তাই ভাষণের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। তিনি সুকৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন, যে কারণে পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে বিচার করার সুযোগ পেল না। ভেস্তে গেল পাকিস্তানি বাহিনীর বাঙালি নিধনের গোপন প্রস্তুতি।

সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গোয়ন্দা প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুকে ‘চতুর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা লেখেন, ‘শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেল, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারলাম না।’ পরদিন অর্থাৎ ৮ মার্চ সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রধান শিরোনাম ছিল এ রকম, ‘চতুর শেখ মুজিব চতুরতার সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন’।

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ঐতিহাসিকগণ প্রতিনিয়ত ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে গবেষণা করছেন। এখানে একটা কথা বলে রাখা উচিত, পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক ভাষণগুলোর প্রায় সব কটিই ছিল লিখিত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অলিখিত। বঙ্গবন্ধু নিজেও জানতেন না যে, তিনি কী বলবেন বা কীভাবে শুরু করবেন।

বঙ্গবন্ধু স্টেজে উঠে যখন বক্তৃতা শুরু করলেন, মনে হলো তিনি যেন বাঙালি জাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যটি রচনা করছেন। তাই ৭ মার্চের ভাষণ বঙ্গবন্ধুর অমর রচনা, বাঙালির শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য, যেটি বাঙালি জাতির সংগ্রাম ও স্বাধীনতার লালিত স্বপ্ন থেকে রচিত। যুগে যুগে সব সমাজের নিপীড়িত, নির্যাতিত এবং স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষকে উৎসাহ, উদ্দীপনা আর অনুপ্রেরণা জোগাবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ।

লেখক : সহসভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

শেয়ার করুন

৭ মার্চের ভাষণে রণকৌশলের কাব্যিক স্ফুরণ

পাকিস্তানকে ভাঙার শাস্তি প্রদানের জন্য ইয়াহিয়া, টিক্কা খান এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা সে মোতাবেক তাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছিল। রাজনীতির কবি শেখ মুজিব তাদেরকে সে সুযোগ দেননি। সেদিন তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, স্বাধীনতার সংগ্রামকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে উত্তরণের পথ দেখিয়েছেন, যুদ্ধের রণকৌশলও জানিয়েছেন, কিন্তু দায় নেননি পাকিস্তান ভাঙার।

৭ মার্চ, ১৯৭১। সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু এলেন, মঞ্চে উঠলেন, ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন, ‘ভাইয়েরা আমার’; গাঢ় থেকে গাঢ়তর হলো তার কণ্ঠ। কণ্ঠে কখনও বেদনার কান্না, কখনও ক্রোধ, কখনও সমাহিত শান্ত অথচ দৃঢ়তা। বঙ্গবন্ধু শুরু করেছেন বাংলার মানুষের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে- বাঙালির সহজাত বৈশিষ্ট্যের কথা দিয়ে। তিনি বলেছেন, পাকিস্তানি শাসকদের কাছে পাওয়া বঞ্চনা-নির্যাতন ও প্রতারণার প্রসঙ্গে। নিজের মানুষকে, নিজেদের মানুষকে জানিয়েছেন শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম, ইয়াহিয়ার আক্রমণাত্মক ভূমিকা ও ষড়যন্ত্রের কথা। প্রেরণা দিয়েছেন স্বৈরাচার ও ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের, আত্মবিশ্বাস ও সৎসাহসের। দ্বিধাহীন ও স্পষ্ট ভাষায় সরকারের কাছে জানিয়েছেন দাবি ও শর্ত। অতঃপর জনগণকে চরম সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি জানিয়ে নিজে নিয়েছেন বিকল্প সরকারের ভূমিকা। একান্তই আপন, নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে তিনি বলেছেন-

...“সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবা না।”…

কার্যত সেই থেকে বাঙালিকে আর দাবিয়ে রাখা যায়নি, স্বাধীনতার উৎসাহ-উদ্দীপনা, লড়াই-সংগ্রাম, রণযুদ্ধে বাঙালি আর পিছপা হয়নি।

লন্ডনের ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় ৬ মার্চ, ১৯৭১ সালে ছাপা হয়েছিল-

“শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল (৭ মার্চ) পূর্ব পাকিস্তানের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন।”

পাকিস্তানকে ভাঙার শাস্তি প্রদানের জন্য ইয়াহিয়া, টিক্কা খান এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা সে মোতাবেক তাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছিল। রাজনীতির কবি শেখ মুজিব তাদেরকে সে সুযোগ দেননি। সেদিন তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, স্বাধীনতার সংগ্রামকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে উত্তরণের পথ দেখিয়েছেন, যুদ্ধের রণকৌশলও জানিয়েছেন, কিন্তু দায় নেননি পাকিস্তান ভাঙার। অন্যভাবে বলা যায়, সেদিন তিনি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, আবার মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা ও রণকৌশলের কোনোকিছুই অবশিষ্ট রাখেননি। সেখানেই রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধুর মৌলিকত্ব, রাজনীতির কাব্যিকতার শ্রেষ্ঠত্ব। সাত কোটি বাঙালি সে কাব্যের ভাষা ঠিকই বুঝলেন, কিন্তু শাসকশ্রেণি তা বুঝল না। বলা যায়, বুঝতে পারলেও কিছুই করতে পারলেন না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক গোয়েন্দা কর্মকর্তাতো বলেই ফেললেন, শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে চলে গেলেন, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারলাম না।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমরা ভাতে মারব। আমরা পানিতে মারব। তার সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের একটি পর্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী খাদ্যসংকটে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-

...“প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।”…

তার সেই নির্দেশে বাংলাদেশের গ্রাম, মহল্লায় মুক্তিবাহিনী ও জনগণ সংগঠিত হয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেছেন-

...“আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের উপর আমার অনুরোধ রইল; প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে।”

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আঘাতের পালটা আঘাত করেছে বাঙালির মুক্তিবাহিনী। বঙ্গবন্ধুকে আর নতুন করে নির্দেশ দিতে হয়নি। ৭ মার্চের নির্দেশই ছিল চূড়ান্ত নির্দেশ।

‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ ১৯৭১-এর এক ভাষ্যে বলা হয়েছে-

“শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণই হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার মৌলিক ঘোষণা। পরবর্তীকালে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে ওই ভাষণেরই আলোকে।”

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বলেছেন-

“পৃথিবীর ইতিহাসে যতদিন পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম থাকবে, ততদিন শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণটি মুক্তিকামী মানুষের মনে চিরজাগরূক থাকবে। এ ভাষণ শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়, সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা।” অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছেন-

“৭ মার্চের শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুধু ভাষণ নয়, এটি একটি অনন্য রণকৌশলের দলিল।”

রণকৌশলগত দিক থেকে সেনাবাহিনী বা একটি প্রতিষ্ঠিত গোছানো বাহিনীর কৌশল আর সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে মুক্তিসংগ্রামের কৌশল প্রকৃতিগতভাবে এক নয়। জাতি-ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সর্বস্তরের বিভিন্ন বৈচিত্র্য-ধরনের জনসমাজকে একই ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, লক্ষ্য ও স্বাধীনতার মন্ত্রে ব্রতী করাই ছিল বঙ্গবন্ধুর মুক্তিসংগ্রামের মূলমন্ত্র। বাঙালি শত শত বছর ধরে যে স্বাধীনতার স্বপ্ন বুনছে; সংগ্রাম করছে, রক্ত দিয়েছে এবং তার ফলে স্বাধীনতার যে প্রত্যাশাটি উন্মুখ হয়ে উঠেছে তাকে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য ৭ মার্চের ভাষণে কাব্যিক ভাষায় রণকৌশল ঘোষণা করেছিলেন রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষণের রণকৌশল অনুসারে, যার যা আছে তাই নিয়ে (তোমাদের যা কিছু আছে...) মুক্তিযুদ্ধের প্রথমপর্যায়ে দেশের সর্বত্র পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ, ছাত্র-জনতা, চাকরিজীবী-ব্যবসায়ী, শিক্ষক-চিকিৎসক, কৃষক-প্রকৌশলীসহ সব পেশার মানুষ এবং ইস্ট বেঙ্গল, ইপিআর, পুলিশ প্রশাসন ও বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা মাতৃভূমিকে রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয়পর্যায়ে মুক্তিবাহিনী গেরিলা রণকৌশল অবলম্বন করেছিলেন। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে উঠেছিল। চোরাগোপ্তা হামলার মাধ্যমে মুক্তিবাহিনী যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস করে পাকিস্তানি বাহিনীর গতিরোধ করে দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষপর্যায়ে গেরিলা তৎপরতা জোরদার করার পাশাপাশি মুক্তিবাহিনী সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধজয়ের কৌশল সবকিছুই নিহিত ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে। সেই ভাষণের রণকৌশল ও দিকনির্দেশনা অনুযায়ী নয় মাস জনযুদ্ধ ও গেরিলাযুদ্ধের পথ অনুসরণ করে ত্রিশ লক্ষাধিক প্রাণের আত্মত্যাগ আর দুই লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালির মহত্তর বিজয় অর্জিত হয়েছে। স্বভাবতই, বহুমাত্রিক, সারগর্ভ, ওজস্বী ও যুক্তিযুক্ত, তির্যক, তীক্ষ্ন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির মুক্তি ও রণকৌশলের কাব্যিক স্ফূরণ। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ ও বাঙালির প্রজন্ম-পরম্পরায়, সংশয়-সংকটেও এই ভাষণ উজ্জ্বল আলোর পথ।

লেখক: প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন

ad-close 103.jpg