ঢাকাই সিনেমা: ‘এখনই অন্ধ, বন্ধ করো না পাখা’

সুস্থ, স্বাভাবিক ও মূলধারার ছায়াছবি নির্মাণ এখন সময়ের চাহিদা। সেসব মূলধারার ছবিগুলোই পারে শিল্প রুচি ও জীবনবোধের চাহিদা মেটাতে। অনেকে রসিকতা করে বলেন, দেশের রাজনীতিতে যখন অভিনয় চলে, তখন দর্শক কেন টাকা খরচ করে পর্দায় সিনেমা দেখবে? এটা রসিকতা হলেও আমরা কি বাস্তবে তা রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখছি না?

সোহেল রানা নামটি কি বর্তমান প্রজন্মের কাছে পরিচিত? এখন যারা তরুণ-তরুণী তারা কি আদৌ চেনে তাকে?

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা এগিয়ে এসেছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়।

একদিকে যেমন ‘ওরা এগার জন’, ‘বাঘা বাঙালি’, ‘রক্তাক্ত বাংলা’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’র মতো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল আরেকদিকে সুকৌশলে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘আবার তোরা মানুষ হ’ বলে অপপ্রচারও হয়েছিল সিনেমা জগতে।

এই সোহেল রানা একজন খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা। এবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি তার কান্না লুকাতে পারেননি। আবেগ ও স্মৃতি রোমন্থনে কাতর সোহেল রানার কান্না উপস্থিত অনেককেই আবেগপ্রবণ করে তোলে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তিনিও তার আবেগ সংবরণ করেছেন কষ্ট করে। বিশেষত, সোহেল রানা যখন বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ও অতীতে তার আদেশে সিনেমায় অভিনয় করার কথা বলেন, তখন সবাই নির্বাক হয়ে তা শুনেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মোটামুটি সব বিষয়ে খবর রাখেন। আশা করি এই ঘটনাও তার মনে আছে। রাজনৈতিক ঝামেলায় সরকার প্রধানকে চেনা অচেনা মনে হলেও সংস্কৃতির কথা আসলেই আমরা পাই দরদি বাঙালি এক নারী শেখ হাসিনাকে। যিনি শুধু বড়দের জন্য না ছোটদের জন্য সিনেমা বানানোর কথাও মনে করিয়ে দেন।

সেই কবে ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ নামে একখানা ছবি হয়েছিল তারপর কি আসলে আদৌ কেউ ছোটদের জন্য ছবি বানানোর কথা ভেবেছেন? মাঝে ‘একাত্তরের যীশু’ বা এমন দু একখানা সিনেমা পাওয়া গেছে বটে। বিনোদন আর মনোজাগতিক আনন্দে ছোটদের জন্য জায়গা নেই বললেই চলে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার বিতরণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলতে ভোলেননি।

শিশুদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘এর মধ্যে দিয়ে কিন্তু একটা শিশু তার জীবনটাকে দেখতে পারবে, জীবনটাকে তৈরি করতে পারবে, বড় হতে পারবে। সেদিকে লক্ষ রেখেই শিশুদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করা, তার মধ্য দিয়ে তাদের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো প্রতিফলিত করা, এটাও কিন্তু আমাদের করতে হবে।’

চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট সবাইকে এই সামাজিক দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সিনেমাগুলো সেভাবেই তৈরি করতে হবে, যেন পরিবার-পরিজন নিয়ে দেখতে পারে।’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? আজকাল দুনিয়ার কোনো দেশেই মানুষ আগের মতো হলে গিয়ে সিনেমা দেখেন না। কিন্তু এটাও ঠিক আমাদের দেশের মতো অতোটা খারাপ নয় অবস্থা।

আমার একমাত্র সন্তান তার ক্যারিয়ার হিসেবে অভিনয়-নির্দেশনা, চিত্রনাট্য রচনা বেছে নেয়ার পর থেকে আমি খুব কাছ থেকে অস্ট্রেলিয়া ও বলিউডের সিনে জগৎ দেখছি। প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে সিনেমা। সব এখন হলে গিয়ে দেখতে হয় এমনও নয়।

বিলিয়ন ডলার বাজেটের মু্ভি বিশ্বনন্দিত সিরিজ ‘মুলান’। ডিজনি ওয়ার্ল্ডের এই ছবিতে খুব ছোট একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছে আমার ছেলে অর্ক। এটি অস্ট্রেলিয়া তথা এশিয়ার কোনো যুবকের ডিজনি মু্ভিতে প্রথম অভিনয়। সেই বিগ বাজেটের ছবিটি করোনার কারণে হলে মুক্তি না পেলেও জমিয়ে ব্যবসা করেছে ডিজনি চ্যানেলে। আজকাল ঘরে বসেও মানুষ সিনেমা দেখা রপ্ত করে নিয়েছে। তাই একথা বলা যাবে না, সিনেমা শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে। মূলত বিপাকে পড়েছে সিনেমা হল-কেন্দ্রিক ব্যবসা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন মানুষকে সিনেমা হল-মুখী করে তুলতে। ভালো কথা। কিন্তু বিনয়ের সঙ্গেই বলি পারির্পাশ্বিক বাস্তবতা কি তা সমর্থন করে? ইন্টারনেটে চলছে বিনোদনবিরোধী অপপ্রচার। সেগুলো এত জঘন্য আর এত বিদ্বেষপ্রসূত যে ভাবেই যায় না। যেহেতু এগুলোর সঙ্গে পবিত্র ধর্মকে ট্যাগ করে দেয়া হয়েছে, সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাস করছে এবং গিলছে। এর সঙ্গে সিনেমার সম্পর্ক সাপে নেউলে। তাহলে সে সমাজে মানুষকে কীভাবে হলমুখী করা সম্ভব?

সিনেমার বৈরী হয়ে ওঠা সমাজকে গাইড করছে যেসব মৌলবাদী গোষ্ঠী তারাও কিন্তু ইলেকট্রনিক বাহনের মাধ্যমেই তা করছে। অন্যদিকে ভালো, মাঝারি মান আর সাধারণ মানুষের সিনেমাগুলো বন্ধ করার পাঁয়তারা চলছে। তবে অশ্লীল নাম ও সিনেমা বন্ধ হয়নি। কাট পিসের জগৎ এড়িয়ে এখন সরাসরি অশ্লীল ছবি জুড়ে দেয়ার পাশাপাশি উদোম নারী শরীর প্রদর্শনও পিছিয়ে নেই। এসবের ব্যাপারে সমাজের নীরবতা চোখে পড়ার মতো। এ বাস্তবতা আশঙ্কারও কারণ বটে।

সুস্থ, স্বাভাবিক ও মূলধারার ছায়াছবি নির্মাণ এখন সময়ের চাহিদা। সেসব মূলধারার ছবিগুলোই পারে শিল্প রুচি ও জীবনবোধের চাহিদা মেটাতে। পাশের দেশে কলকাতায় চলচ্চিত্রে গভীর জীবনবোধের চর্চা হচ্ছে বলেই আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে তাদের সিনেমা জগৎ। এর কোনোটাই আমরা মানি না। অনেকে রসিকতা করে বলেন, দেশের রাজনীতিতে যখন অভিনয় চলে, তখন দর্শক কেন টাকা খরচ করে পর্দায় সিনেমা দেখবে? এটা রসিকতা হলেও আমরা কি বাস্তবে তা রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখছি না?

সুখের কথা, তবু দেশে সিনেমা নির্মিত হচ্ছে। চলচ্চিত্র জগতে নবীন-প্রবীণেরা কাজ করছেন। প্রতিবছর নতুন আশায় নতুন ছবি সামনে এসে দাাঁড়য়। কারো অভিনয়প্রতিভা, কারো কাহিনি, নির্মাণশৈলী, নির্দেশনা, কারো সুর, ক্যামেরার কাজ আমাদের মুগ্ধ করে। তারা পুরষ্কার জিতে নেন। জাগিয়ে দেন আশা।

সিনেমা বা অভিনয়শিল্প মৌলিক। এর বিনাশ নেই। এর বিকাশে দরকার সরকারি আনুকূল্য আর মানুষকে সিনেমামুখী করা। সে কাজটা সমাজের আরও অনেক কিছুর সঙ্গে থমকে আছে। কবে কীভাবে উদ্ধার হবে বা ঘুরে দাঁড়াতে শিখবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক : প্রবাসী কলাম লেখক

শেয়ার করুন

মন্তব্য

স্বাধীনতার ৫০ বছর, মহামারি ও রাজনীতি

একটি বড় সময় ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপরিচালনার নেতৃত্ব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের হাতে ছিল না। সে কারণে রাজনীতিতে বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। আদর্শহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সুবিধাবাদ, উগ্র মতাদর্শিক হঠকারিতা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের জলাঞ্জলির মতো বিষয়গুলো রাষ্ট্র-রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, এবং ব্যাপক মানুষের মনোজগতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে আমরা সেই রাজনৈতিক আদর্শবান, মেধাবী ও নিষ্ঠাবানদের আর খুঁজে পাই না।

মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর এবার উদযাপিত হতে যাচ্ছে। এমন একটি ঐতিহাসিক সময় জাতির জীবনে আর কখনও আসবে না। ৫০ বছরে আমাদের অর্জনসমূহ যেমন দেখার সুযোগ ঘটছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারিনি; সেগুলো আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

মার্চ থেকে সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, পেশাজীবী সংগঠন স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে কী ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তা হয়তো দেখতে পাব। মোটাদাগে বাংলাদেশ ৫০ বছরে আর্থ-সামাজিকভাবে ভালো একটি অর্জনের জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছে। একসময় পৃথিবীর অনেক দেশ বাংলাদেশকে হতদরিদ্র বলে আখ্যায়িত করত। এখন এই দেশটিই মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করার কৃতিত্ব অর্জন করেছে।

সর্বশেষ সংবাদ হচ্ছে, জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দিয়েছে। তবে যেটি দেখা ও বোঝার বিষয়, তা হচ্ছে ভিশনারি-মিশনারি রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে, উন্নয়ন ও মানবকল্যাণের ধারণা বাস্তবায়নে কাজ করেছে, তখনই বাংলাদেশ অগ্রগতির চাকা দ্রুত ঘোরাতে পেরেছে। তবে দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হচ্ছে, একটি বড় সময় ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপরিচালনার নেতৃত্ব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের হাতে ছিল না। সে কারণে রাজনীতিতে বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। আদর্শহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সুবিধাবাদ, উগ্র মতাদর্শিক হঠকারিতা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের জলাঞ্জলির মতো বিষয়গুলো রাষ্ট্র-রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, এবং ব্যাপক মানুষের মনোজগতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে আমরা সেই রাজনৈতিক আদর্শবান, মেধাবী ও নিষ্ঠাবানদের আর খুঁজে পাই না।

বাংলাদেশ ৫০ বছরে অর্থনৈতিক জিডিপিতে প্রশংসনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কিন্তু সেই তুলনায় রাজনীতির গুণগত প্রবৃদ্ধি আমাদেরকে আশাহত করে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো ৫০ বছর পূর্তির আনুষ্ঠানিকতায় কতখানি ভেবে দেখবে কিংবা প্রস্তুতি নেবে সেটি দেখার বিষয়। তবে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের একটি বড় ধরনের বিস্তারের সময় পৃথিবীব্যাপী পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরাও এর ভয়ানক প্রভাব থেকে মুক্ত নই। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের ভাবাদর্শ যদি চর্চায় স্থান না পায়, তাহলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আগামীর দিনগুলোতে কতটা প্রতিষ্ঠিত থাকবে তা বলা কঠিন। সে ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন গভীর সংকটে পড়তে পারে। এর নজির পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন, নাইজার, সুদান, নাইজেরিয়াসহ বেশ কিছু দেশ এখন ভয়ানক সংকটে রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ওইসব শক্তির আদর্শগত মিল অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ করা যায়।

সুতরাং স্বাধীনতার ৫০ বছরে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে পেছনের এই অপশক্তির উৎসমূলকে যেমন চিহ্নিত করতে হবে, একইভাবে সামনের বছরগুলোতে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারার রাষ্ট্র, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে নিষ্ঠাবান, দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেই হবে।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির এই সময়ে বৈশ্বিক মহামারি করোনা সংক্রমণের সংকট আমাদেরকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছিল। তারপরও দেশে খাদ্যঘাটতি না থাকায় তখন সংকটটা মোকাবিলা করা গেছে , দেশে করোনা চিকিৎসায় শূন্য থেকে অন্তত আক্রান্তদের চিকিৎসা দেয়ার মতো হাসপাতাল, চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক কিছু অনুকূল আবহাওয়াগত পরিবেশ থাকায় মহামারিটি ইউরোপ, আমেরিকার মতো এখানে ব্যাপকভাবে ছড়ায়নি। করোনায় আমাদের মৃত্যু সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও অনেক মুল্যবান মানুষকে আমাদের হারাতে হয়েছে।

এছাড়াও করোনার ধাক্কা আমাদেরও জিডিপিতে নেতিবাচকভাবে কিছুটা হলেও পড়েছে। সবচাইতে বড় ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। এমনিতেই শিক্ষার মান নিয়ে আমাদের যথেষ্ট রকম অতৃপ্তি রয়েছে, তার ওপর এক বছর হতে চলল করোনার কারণে শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ফিরতে পারছে না।

অনলাইন মাধ্যম হিসেবে আমাদের দেশে খুব একটা বিস্তার লাভ করতে পারেনি। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকগণ এই অবস্থায় অস্থির হয়ে উঠেছেন। এর কিছু বহিঃপ্রকাশ সম্প্রতি রাস্তায় আন্দোলনে দেখা গেছে। তবে বাংলাদেশে টিকাগ্রহণের উদ্যোগটি বিশ্বের অনেক দেশের চাইতেও আগে শুরু করতে পারার কারণে আশা করা যাচ্ছে দু-তিন মাসের মধ্যেই করোনার সংক্রমণের রাশ টেনে ধরা সম্ভব হতে পারে। এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার একটি প্রটোকল ঘোষণা করেছে। ফলে দু-তিন মাস পরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে লেখাপড়ার পরিবেশ আবার ফিরে আনার চেষ্টা হবে- সেটি যেন কোনো অবস্থাতেই ব্যাহত না হয়, তা সকল মহলকে মনে রাখতে হবে। এমনিতেই গত এক বছরে করোনার কারণে যে সংকটের ঢেউ লেগেছে তাতে অনেকেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, নানা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। এই সংকট অতিক্রম করার চ্যালেঞ্জ ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে নেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক এই সংকট আমাদের এখানে নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতার সঙ্গে কর্মহারাদের অনেককেই যুক্ত হতে দেখা গেছে। এর সঙ্গে রয়েছে নানা ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি, জোর-জবরদস্তি এবং প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা। ফলে সমাজজীবনে অস্থিরতার লক্ষণ বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। এটিকে মোকাবিলা করার জন্য রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তই নতুন অঘটন ঘটছে।

অপরদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও চলছে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। ক্ষমতাশীন সরকারের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগে ২০১৯ সালে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছিল সেটি এখন খুব একটা শোনা ও দেখা যাচ্ছে না। দলের অভ্যন্তরে নানা ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অপতৎপরতাও মাঝেমধ্যে প্রকাশিত হয়।

সম্প্রতি নোয়াখালি অঞ্চলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে দেশব্যাপী যে তোলপাড় লক্ষ্ করা গেছে তা দলকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে সেটি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কেন আগে থেকে রাশ টেনে ধরতে পারেননি সেই প্রশ্ন সকল মহলেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি দেশের অন্যত্র দৃশ্যমান না হলেও জেলা-উপজেলাগুলোতে গ্রুপিং, বিভাজন, এবং স্থানীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা ধরনের বিরোধ প্রকাশ্য হয়েছে। বেশ কজন নিহতও হয়েছেন। সুতরাং, ক্ষমতাশীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে এখন যা চলছে তা দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার ভাবমূর্তিকে সাধারণ পর্যায়ে ক্ষুণ্ন করছে।

অপরদিকে, সরকার উৎখাতের নানা ধরনের হুংকার ও আলামত দেশে-বিদেশে বসে অনেকেই দিচ্ছেন। সেসব প্রচার-প্রচারণা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কতখানি প্রচার পাচ্ছে তা দেখার বিষয়। স্বাধীনতার ৫০ বছরের এই সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে একটি মহল উৎখাত ও ষড়যন্ত্রের যে প্রস্তুতি ও আহ্বানের কথা বলছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তারা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না, কিন্তু তাদের আত্মাহুতিকে আমরা সবাই মুখে শ্রদ্ধা করি, তাদের জীবন উৎসর্গের পেছনে যেসব মহৎ উদ্দেশ্য ছিল সেগুলোকে কতটা স্মরণ ও শ্রদ্ধা করছি সেটি ভেবে দেখার বিষয়।

লেখক : অধ্যাপক, গবেষক, সমাজচিন্তক

শেয়ার করুন

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু নেই

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর ১৭ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময়ে ধর্মান্ধ চরমপন্থি গোষ্ঠী তাদের তৎপরতা বন্ধ করেনি। বরং নানা পথ অনুসরণ করে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করে চলেছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজানে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা ছিল এ অপতৎপরতারই অংশ। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কিছু সফলতা অর্জন করেছে। তবে আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। এ গোষ্ঠী বাংলাদেশকে তাদের কাজের উপযুক্ত স্থান মনে করছে এবং সেটা প্রকাশ্যেই বলছে।

হুমায়ুন আজাদ শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের মনের কোণে আলো ফেলতে পারতেন, চেতনার অলিন্দে লাল-নীল দীপাবলি জ্বালিয়ে দিতেন- এভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা প্রিয় শিক্ষককে স্মরণ করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের মনে প্রশ্ন জাগিয়ে দিতেন। একইসঙ্গে দিয়েছেন উত্তরের দিকনির্দেশনা।

তিনি ‘ভালো থেকো’ কবিতায় লিখেছেন-

“ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।

ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।

ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা।

ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা।

ভালো থেকো।”

সবার ভালো তিনি চেয়েছেন। দেশের ভালো চেয়েছেন। এ কারণেই তিনি ধর্মান্ধ অপশক্তির টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। তাকে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে কেড়ে নিয়েছে এই গোষ্ঠী।

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর তিনি একুশের গ্রন্থমেলা থেকে বের হয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন। এ সময়েই তার ওপর ভয়ংকর হামলা হয়। কয়েক মাস পর জার্মানিতে তার মৃত্যু হয়। হামলার ধরন দেখে সহজেই ধারণা করা যায়- জেমএমবি কিংবা এ ধরনের কোনো ধর্মান্ধ ও উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী রয়েছে এর পেছনে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ উপন্যাস লিখেছিলেন। এতে ধর্মের নামে যারা ভণ্ডামি করে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হয়। তাকে প্রাণে মারার হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু তিনি ছিলেন নির্ভীক। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে কিংবা পরিচিত-অপরিচিত সব স্থানে যেতেন অসম সাহসে। একুশের বইমেলায় দেখেছি ‘আগামী প্রকাশনীর’ স্টলে ‘নারী’, ‘ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল’, ‘আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম’, ‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’- নিজের এসব বই পাঠকের হাতে তুলে দিচ্ছেন অটোগ্রাফসহ। তার বই কেনার জন্য বইয়ের স্টলের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যেত।

এসব পছন্দ হয়নি সেই অপশক্তির, যারা ধর্মের নামে অধর্মের কাজ করে, ব্যবসা করে, মানুষকে কষ্ট ও যন্ত্রণা দেয়। তারা তাকে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু দিতে চেয়েছে। উন্মত্ত ঘাতকেরা তাকে অনেকটা প্রকাশ্যেই আক্রমণ করেছে। পিস্তল বা রিভলবারের গুলিতেও তারা আঘাত হানতে পারত, নিভৃত কোনো স্থানে। কিন্তু তাতে লেখককে যথেষ্ট যন্ত্রণা দেওয়া হয় না, মানুষকে সন্ত্রস্ত করা হয় না। এ কারণে প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। তিনি রক্তাক্ত হয়ে ছটফট করেছেন। বেঁচে থাকার আকুতি করেছেন। ঘাতকেরা বুক ফুলিয়ে চলে গেছে নির্ভয়ে, নিরাপদে আশ্রয়ে। তারা জানত, ক্ষমতাসীন খালেদা জিয়া সরকারের দিক থেকে কোনো ভয় নেই। বাংলাদেশে এ ধরনের অপশক্তির উত্থান ঘটছে- সেটা এ সরকার বিশ্বাস করতে রাজি ছিল না। রাজশাহীর বাগমারায় শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের জেএমবি প্রকাশ্যে দাপট দেখাচ্ছে, মানুষ হত্যা করছে, ‘ইসলামি হুকুমত কায়েমের’ কথা বলছে- কিন্তু খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্য মতিউর রহমান নিজামী বলছেন- সব বানোয়াট, মিডিয়ার কল্পকাহিনি। ২৭ ফেব্রুয়ারি হামলার পরদিন ঢাকার বাসাবো এলাকায় বিএনপির জনসভা ছিল, যেখানে বক্তব্য রেখেছেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন- ‘বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার জন্য আওয়ামী লীগ দায়ী। আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি তারা দেশব্যাপী হরতাল ডেকেছে। এই হরতাল সফল করার জন্য তাদের একটা ইস্যু দরকার। এ জন্যই পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে।’ [যুগান্তর, ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০০৪]

হুমায়ুন আজাদের চিকিৎসা চলে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে, সিএমইচ-এ। জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সরকারি বাধার কারণে তাকে সেখানে দেখতে যেতে পারেননি।

কয়েক মাস পর ২০০৪ সালেরই ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আরও নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে- শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের গোটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং রাজধানী ঢাকার কয়েক হাজার কর্মী-সমর্থক সমবেত হয়েছিলেন একটি সমাবেশে। সেখানে চারদিক থেকে একযোগে গ্রেনেড হামলা চলে। শেখ হাসিনা স্প্লিন্টারের আঘাত পেয়েও বেঁচে যান। কিন্তু মহিলা নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ওবায়দুল কাদের, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে আহত হন। এ হামলার পরিকল্পনা হয়েছিল তারেক রহমানের উপস্থিতিতে, কুখ্যাত ‘হাওয়া ভবনে’। অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল মুফতি হান্নানের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘হুজি’। একটি রাজনৈতিক দলের সব নেতাকে একযোগে হত্যা করার ভয়ংকর এই অপরাধের পরও সে সময়ে ক্ষমতায় থাকা বিএনপি নেতৃত্বের টনক নড়েনি। তারা এই হামলার দায়ভার চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগের ওপর।

হুমায়ুন আজাদের হত্যাচেষ্টার এক মাস যেতে না যেতেই ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের একটি সরকারি মালিকানাধীন সার কারখানার জেটিতে ১০ ট্রাক অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র খালাস করার সময় ধরা পড়ে। এ জেটি ছিল শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে, যে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার সহযোগী কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর কমান্ডার মতিউর রহমান নিজামী। এসব অস্ত্র ভারত সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত আসামের এক গোষ্ঠীর জন্য একটি দেশ থেকে চোরাইপথে আনা হয়েছিল। সে সময়ের বাংলাদেশ সরকার ছিল এই ‘ভয়ংকর খেলার’ অংশীদার।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের অপরাধের রেশ কাটতে না কাটতেই ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট শায়খ আবদুর রহমানের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জেএমবি দেশের প্রায় ৫০০ স্থানে একযোগে বোমা হামলা চালায়। এ হামলার দায়ও আওয়ামী লীগের ওপর চাপানোর অপচেষ্টা চলে। সারা দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ যায়- আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেপ্তার কর। ঢাকায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী মিছিল-সমাবেশ করে বলতে থাকে- ‘এ কাজ আওয়ামী লীগের।’ কিন্তু অপরাধ এত প্রকাশ্যে ঘটেছে এবং হামলা পরিচালনাকারী জেএমবি নিজেদের কৃতিত্ব প্রচারে এত ব্যাকুল হয়ে পড়ে যে আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা ছাড়া কোনো উপায় খালেদা জিয়ার ছিল না।

এরপর বিএনপির শাসনামলে ধর্মান্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরও কয়েকটি হামলা চালায়। তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অভিলাষ ব্যক্ত করে প্রকাশ্যে লিফলেট বিতরণ করতে থাকে। সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার প্রদান করে। দেশের ভেতর থেকে ও বাইরের কয়েকটি দেশ ভয়ংকর চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থানের ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর সরকারের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর ১৭ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময়ে ধর্মান্ধ চরমপন্থী গোষ্ঠী তাদের তৎপরতা বন্ধ করেনি। বরং নানা পথ অনুসরণ করে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করে চলেছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজানে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা ছিল এ অপতৎপরতারই অংশ। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কিছু সফলতা অর্জন করেছে। তবে আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। এ গোষ্ঠী বাংলাদেশকে তাদের কাজের উপযুক্ত স্থান মনে করছে এবং সেটা প্রকাশ্যেই বলছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর একের পর এক আঘাত করার পরও তারা প্রকাশ্য সমাবেশ করে জন্মশতবর্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙে বুড়িগঙ্গায় নিক্ষেপের ঔদ্ধত্য দেখাতে পারে। অতএব, কেবল সাবধান ও সতর্ক থাকা নয়, এ অপশক্তির বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বহুমাত্রিক লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। তিনি আমাদের সবার ভালো থাকার জন্য কাজ করে গেছেন। তার মৃত্যু নেই।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলাম লেখক ও সাংবাদিকতায় একুশে পুরস্কারপ্রাপ্ত

শেয়ার করুন

খুলে যাক স্কুল-কলেজ

অচিরেই ক্লাস, পরীক্ষা চালু হোক। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের মতামত শুনুন। শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সরকার আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল, করোনাকালেও তা প্রমাণিত। কিন্তু অতিসতর্কতার ফলে সামাজিক অস্থিরতা কাম্য নয়।

করোনা মহামারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের সামাল দেয়ার যেসব বিকল্প উদ্যোগ তা প্রায় সবাই মেনে নিয়েছেন। কিন্তু সবকিছু যখন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, তখন শিক্ষা কর্তৃপক্ষের অনেক কিছুই আর মেনে নিতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। এর ফলে তারা রাস্তায় নেমেছেন, কেউবা চান পরীক্ষা দিতে, কেউ কেউ ফিরতে চান শ্রেণিকক্ষে।

প্রায় এক বছর আলাপ-আলোচনা করে, বিজ্ঞজনের পরামর্শ নিয়ে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বার্ষিক ও পাবলিক পরীক্ষা বিষয়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এসব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাস্তবতার কারণে বা বিকল্প না থাকায় অনেকেই তা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া এখন সবকিছুই করোনাপূর্ব অবস্থায় ফিরে এসেছে। তাই ক্লাস পরীক্ষা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব যত দেখানো হচ্ছে, ততই বাড়ছে ক্ষোভ ও অস্থিরতা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার ক্ষেত্রেও সরকার সময়োচিত পদক্ষেপ নিয়েছিল। ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয় ১৭ মার্চ। যদিও ওই সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের জন্য জনমত সৃষ্টি হয়েছিল, মূল ধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পক্ষেই অবস্থান নেয়। এর ফলে সরকারের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়াটা হয়তো সহজ হয়েছিল।

এখনও কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেওয়ার দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন। ঢাকা ছাড়াও পরীক্ষা ​দেয়ার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন জেলায় বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

পরিস্থিতি​ পর্যালোচনা করে বলা যায়, শিক্ষা কর্তৃপক্ষের নানা সিদ্ধান্তহীনতা, অস্পষ্ট বক্তব্য এবং কথার সঙ্গে বাস্তবের মিল না থাকাসহ নানা কারণে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর মধ্যে অস্থি​রতা ছড়িয়েছে। এটা যে ইচ্ছাকৃত তা নয়, তবে কোটি কোটি শিক্ষার্থী নিয়ে সরকারের যে বিভাগ কাজ করে, সেখানে আরও বেশি সতর্কতা ও শৃঙ্খলা কাম্য। শিক্ষা নিয়ে একটি বক্তব্য, মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বত্র। এ নিয়ে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয় ব্যাপক।

দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় স্কুল প্রাঙ্গণে শিশুদের এমন উচ্ছ্বাস স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। ছবি: নিউজবাংলা

গত সোমবার শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সময় ঘোষণা করেছেন ২৪ মে। এতে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। কারণ গত মাস দুয়েকের যে আলোচনা তাতে মার্চে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে, এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই ধারণা পেয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থীরাও প্রস্তুত হয়েছেন। কিন্তু প্রায় তিন মাস পর বিশ্ববিদ্যালয় খোলার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর আকস্মিক ঘোষণায় শিক্ষার্থীদের অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আবার স্কুল-কলেজ খোলার সিদ্ধান্ত বিষয়ে সভা ডাকা হয়েছে ২৭ ফেব্রুয়ারি, শনিবার। তিন মাস পরে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সিদ্ধান্ত দিয়ে স্কুল-কলেজ ১ মার্চ থেকে খোলা হবে কি না, সেই আলোচনা চলছে চারদিকে।

শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলন চলছে, তা মূলত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলমান তিনটি বড় পরীক্ষা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত ঘিরে। গত সোমবার যারা শিক্ষামন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন ফলো করেছেন, তাদের অনেকেরই মন্তব্য হচ্ছে, শিক্ষামন্ত্রী বাছবিচার ছাড়াই তাৎ​ক্ষণিক এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনের শেষ ভাগে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, সব বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে ২৪ মে, কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তো পরীক্ষা চলছে। এর জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ওই পরীক্ষাও বন্ধ থাকবে।

এরপর দেশজুড়ে অস্থি​রতা ছড়াতে থাকে। সোমবার রাত ৯টার দিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, পরীক্ষা যথারীতি চলবে। আবার রাত সাড়ে ৯টায় পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে।

কী অদ্ভূত কাণ্ড! শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি বা অনাপত্তি নিয়েই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা শুরু করেছিল যা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে। এই পরীক্ষা শুরুর প্রেক্ষাপট কিন্তু ভিন্ন।

মূলত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিনটি পরীক্ষা চলছিল, এসব পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে সাড়ে ৫ লাখ ছাত্র-ছাত্রী। এর মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে স্নাতক সম্মান ফাইনাল পরীক্ষা, যেখানে পরীক্ষার্থী ২ লাখ ২৬ হাজার। এই পরীক্ষার্থীরা আসলেই হতভাগা। তাদের পাঁচটি পরীক্ষা হওয়ার পর গত বছরের ১৭ মার্চ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা হয়। বাকি ছিল দুটি পরীক্ষা। এই দুটি পরীক্ষা ও ভাইবা নিয়ে তাদের বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিতে চাইছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু সেই সুখ ওদের কপালে সইল না। করোনার আগে পাঁচটিসহ সাম্প্রতিক সময়ে সবকটি পরীক্ষা শেষ হলো। কিন্তু বাকি রয়ে​ গেল মৌখিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষার জন্য যদি তাদের তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে ফল প্রকাশেও লাগবে আরও তিন-চার মাস সময়। তাহলে বছর প্রায় শেষ হয়ে আসবে। অথচ গত বছরের জুনে তাদের স্নাতক সম্মান পরীক্ষার ফল প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল।

পরীক্ষা চালু রাখার দাবিতে সম্প্রতি রাজধানীর নীলক্ষেত মোড় অবরোধ করে আন্দোলনে নামে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। ছবি: নিউজবাংলা

আবার স্নাত​কোত্তর চূড়ান্ত পরীক্ষাও শুরু হয়ে​ছিল। তাদের পাঁচটি পরীক্ষা শেষ হয়েছে, দুটি বাকি আছে। মৌখিক পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল ২৭ ফেব্রুয়ারি। এরাও আটকে গেল। এই স্তরে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষাও শুরু করেছিল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এই পরীক্ষা শুরু হয়, শেষ হওয়ার কথা ছিল ২৩ মার্চ। তারাও আটকে গেল।

এই তিনটি পরীক্ষা শুরু করলেও পাইপলাইনে ছিল আরও চারটি বড় পরীক্ষা। কথা ছিল আগের তিনটি স্তরের পরীক্ষা শেষ হলেই পরের চারটি স্তরের পরীক্ষা শুরু হবে। কিন্তু সরকার চলমান পরীক্ষাগুলো স্থগিত করে দেয়ায় সেশনজট আরও বেড়ে যাবে।

আসলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ও দৃশ্যমান কাজ পরীক্ষা নেয়া ও ফল প্রকাশ করা। বছরে প্রায় ২০০ পরীক্ষা নেয় এই বিশ্ববিদ্যালয়। এর অধীনে কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীসংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নিম্নবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাদের লক্ষ্য থাকে পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যুদ্ধে নেমে পড়া, হতদরিদ্র মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করা।

যাই হোক, সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চলমান পরীক্ষাগুলো স্থগিত করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলায় কিন্তু ভিন্ন ঘটনা ঘটেছে, যা একই যাত্রায় দুই ফলের মতো। অধিভুক্ত সাতটি কলেজের বিষয়ে কিন্তু ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ​ক্ষ। এর কারণ, শিক্ষার্থীদের রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন। যেহেতু আন্দোলনের মুখে সাত কলেজের স্থগিত করা পরীক্ষা চালু হয়েছে, সেহেতু এবার মাঠে নেমেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের আটক করা হয়েছে, আবার ছেড়েও দেয়া হয়েছে। ​আগামী রোববার পর্যন্ত চূড়ান্ত সময় দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, তিন মাস পরে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সিদ্ধান্তটি অযৌক্তিক হয়েছে। তার মানে ধারণা করা হচ্ছে, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও হয়তো ওই সময়ে খুলবে। সরকারের এই অতিসতর্কতা অনেকেরই পছন্দ হয়নি।

দেশে করোনায় মৃতের সংখ্যা এখন প্রতিদিন পাঁচ-সাতের কাছাকাছি। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পুরোদমে চলছে। রাস্তাঘাটে মানুষের ভিড়ে চলা দায়, সড়কে যানজট লেগে​ই থাকছে। এই দৃশ্য দেখে কষ্টে থাকা শিক্ষার্থীরা আর চুপ থাকতে পারছেন না। অনেকের টিউশনি ছুটে গেছে। হল বন্ধ থাকায় ঢাকায় এসে অবস্থান করার সুযোগ নেই। সেশনজট হাতছানি দিচ্ছে। কবে পরীক্ষা হবে, কবে ফল প্রকাশ হবে, সেই অনিশ্চয়তা ভর করেছে। করোনায় অভিভাবকদের অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। করোনায় অভিভাবকহারা সন্তানের সামনে এখন শুধুই অন্ধকার।

পরীক্ষা চালু রাখার বিষয়ে আন্দোলন করে যাচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। ছবি: নিউজবাংলা

করোনা প্রত্যেক পরিবারের ওপর কমবেশি কালো থাবা বসিয়েছে। প্রচণ্ড ঝড়ে লন্ডভন্ড হওয়ার পর গাছপালা যেমন উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, অসংখ্যা পরিবারের অবস্থা ঠিক তেমনই। এর মধ্যে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থী থাকা পরিবারগুলোতে অস্থিরতা চলছে। এসব শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রেণিক​ক্ষে আনা জরুরি।

গত প্রায় এক বছরে মোবাইল ফোন, ট্যাব ও ল্যাপটপে শিক্ষার্থীর আসক্তি​ কতটা বেড়েছে তা চারপাশে তাকালেই টের পাওয়া যায়। চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে চশমাওয়ালার সংখ্যা অস্বাভাবিক বেড়েছে, শিক্ষার্থীদের অনেকেরই চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্রমাগত লোপ পাচ্ছে। দিনভর এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত এসব গ্যাজেট হচ্ছে শিক্ষার্থীর নিত্যসঙ্গী। অনেক মা-বাবাই এমন পরিস্থিতিতে অসহায়। সারা দিন মোবাইল ফোন বা ট্যাব হাতে সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তার মনমানসিকতায় কী প্রভাব ফেলছে, এসব নিয়ে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই।

এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হোক। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও শিক্ষার্থীদের তা মানতে উদ্বুদ্ধ করা বা প্রয়োজনে বাধ্য করার দায়িত্বটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে অভিভাবকের উচিত তাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না পাঠানো, শিক্ষকের দায়িত্ব তাকে বুঝিয়ে বাসায় বা বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া। মাস্ক ব্যবহার, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা এবং শরীরের তাপমাত্রা দেখাসহ কিছু স্বাস্থ্যবিধি ​মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করলে শিক্ষাবিদ, অভিভাবক থেকে শুরু করে আমজনতারও আপত্তি থাকবে না। গত দেড়-দুই মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যাবে না, এমন মতামত কিন্তু কেউ দেননি। অতএব, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের মতামত শুনুন। শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সরকার আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল, করোনাকালেও তা প্রমাণিত। কিন্তু অতি সতর্কতার ফলে সামাজিক অস্থিরতা কাম্য নয়।

শরিফুজ্জামান পিন্টু, সাংবাদিক

শেয়ার করুন

ঘাতক বিষয়ে কিছু কথা

একাত্তরের ঘাতক ও দালালদের সময়মতো বিচার করা হয়নি বলে তারাই দেশের রাজ–কার্যাবলির সঙ্গেও যুক্ত হতে পেরেছিল একদা। বিএনপির সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় এসেছিল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের দলের দুই ঘাতক এ দেশের মন্ত্রীও হয়েছিল। একে বিজয়ের পরাজয় বলে মনে হয়েছিল অনেকের কাছেই। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হলে আবার আশার আলো জ্বলে উঠেছিল মানুষের মনে। একাত্তরের ঘাতকদের মধ্যে যারা ছিল পালের গোদা, তাদের অনেকেরই বিচার হয়েছে।

এ কথা এখন অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যে দেশে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আর বিপক্ষের শক্তি আছে। কথাটা খুবই সত্য ও ভয়ংকর। যে জাতি তার বীরদের শ্রদ্ধা করে না, সরকার পরিবর্তন হলেই বীর পরিবর্তন হয়; সে জাতির মতো অভাগা জাতি আর একটিও নেই। এ ধরনের অভাগা জাতি তার ভাগ্য পরিবর্তন করবে কীসের ওপর ভর করে? এ রকম হিংসা আর শত্রুতা নিয়ে কি দেশ গড়া যায়?

একই সঙ্গে এ কথাও তো বলতে হয় যে, ১৯৭১ সালে যে যুদ্ধের আপাত সমাপ্তি ঘটেছিল, সে যুদ্ধ আসলে চলমান এবং সেই চলমান বিষয়ই ধীরে ধীরে পরাজিত ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকেই আবার প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে এই দেশে। আমাদের মাথার সামনের দিকে মনে হয় চোখ নেই, চোখ পিছনে; তাই কোনদিকে কীভাবে চলছি, সে ব্যাপারে আমাদের মনে প্রশ্নেরও উদয় হয় না। ফল হয় একটাই, দ্রুত পশ্চাৎপদ ভাবনার মধ্যে নিজেদের ভাসিয়ে দিয়ে এক মহা সংকটের জন্য অপেক্ষা করা।

যে মূলমন্ত্র নিয়ে এ দেশে একদা মুক্তির সংগ্রাম হয়েছিল, সে মূলমন্ত্রগুলো জাতির সমবেত মস্তিষ্ক থেকে সমূলে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। শুধু প্রচারণা বা প্রচার দিয়ে তো আর সত্য প্রতিষ্ঠিত করা যায় না, প্রতিষ্ঠার জন্য চাই সত্যিকার গভীরতা ও সত্য। মিথ্যাকে বা অর্ধমিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রকাশ করলে অধঃপাতে যাওয়া ছাড়া তো আর কিছুই থাকতে পারে না। তাই যারা অপরাধ করেছে, তাদের অপরাধগুলোকে তথ্যভিত্তিক করা, মানুষকে জানানো, কোন অপরাধের জন্য তাকে আমরা দোষী বলছি। তাদের ঘৃণ্য আদর্শের জন্য পৃথিবীজুড়ে যদি নাৎসি ও ফ্যাসিস্টদের অপরাধের কথা এখনও বলা হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের এই ঘাতকেরা আর কতকাল তাদের নিষ্পাপ চেহারা নিয়ে দেশবাসীর মায়া অর্জন করে যাবে? আমি কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, ‘আহা রে! কতদিন আগের কথা! ওদের ক্ষমা করে দিলেই তো হয়!’

ক্ষমা করে দিলে আসলে হয় না। মানুষকে খুন করা, তার ভিটেমাটি পুড়িয়ে দেওয়া, তাকে জাতিগতভাবে ঘৃণার শিকারে পরিণত করার সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল, তাদের জন্য জিরো টলারেন্সই একমাত্র সত্য। তা পালন করতে না পারলে পরবর্তীকালের নৃশংসতাগুলোও ক্ষমার আওতায় পড়ে যাবে।

এখানেই একটা কথা পরিষ্কার করে বলি, যেকোনো সরকারের সময় যেকোনো মানবতাবিরোধী কাজেরই বিচার হওয়া উচিত। জবাবদিহি না থাকলে রাষ্ট্র তার চরিত্র হারায়। না চাইলেও ফ্যাসিবাদ এসে জায়গা করে নেয় দেশের শ্বাস–প্রশ্বাসে। এ কারণেই আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া আদি পাপের বিচার জরুরি।

স্বাধীনতার পর কী করলে কী হতো, সে বিতর্কে এখন আর লাভ নেই। বরং এখনও যা অবশিষ্ট আছে, তা নিয়ে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায়, সেটাই বিবেচনায় আনা উচিত।

যে সত্য আমরা জানি, তা নিয়েও কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। একাত্তরের ঘাতক ও দালালদের সময়মতো বিচার করা হয়নি বলে তারাই দেশের রাজ–কার্যাবলির সঙ্গেও যুক্ত হতে পেরেছিল একদা। বিএনপির সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় এসেছিল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের দলের দুই ঘাতক এ দেশের মন্ত্রীও হয়েছিল। একে বিজয়ের পরাজয় বলে মনে হয়েছিল অনেকের কাছেই। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হলে আবার আশার আলো জ্বলে উঠেছিল মানুষের মনে। একাত্তরের ঘাতকদের মধ্যে যারা ছিল পালের গোদা, তাদের অনেকেরই বিচার হয়েছে। এদের একটা অংশ অবশ্য বিচারকাজ শুরু হওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেছে, ফলে তারা তাদের কৃতকর্মের শাস্তি না পেয়েই পৃথিবী ছাড়তে পেরেছে।

দুর্ভাগা বাংলাদেশের কথাই বললাম। এবার সেই দুর্ভাগ্য যে আরও অনেকের জন্য প্রযোজ্য, সে কথা না বললে এই আলোচনাটি থেকে যে প্রশ্নটি উঠে আসবে, তা নিয়ে বিতর্ক করার মতো রসদ পাওয়া যাবে না।

২.

ঘাতকদের বিচারের ব্যাপারে আমরা প্রায়ই একটা উদাহরণ দিয়ে এসেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত নাৎসি আর ফ্যাসিস্টদের ব্যাপারে পৃথিবীর যেকোনো দেশে জিরো টলারেন্স দেখানো হয়। আমরা বলে এসেছি, ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের কথা, টোকিও ট্রায়ালের কথা। সেসব অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়েই চলেছে আমাদের ঘাতকদের বিচারকাজ। কিন্তু একটি দিক রয়ে গেছে আমাদের চোখের আড়ালে। সত্যিই কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের হত্যাকারী নাৎসি ও ফ্যাসিস্ট সদস্যদের ঘৃণার চোখেই দেখা হয়েছে। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার অঙ্গীকার কি বাস্তবায়িত হয়েছে?

আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলতে পারি। যুক্তরাষ্ট্রেও নাৎসিদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেখানে নাৎসিদের একটি অংশ মার্কিন অনুমতি নিয়েই সে দেশে ঢুকেছে, বহাল তবিয়তে সেখানে করে খাচ্ছে। ফলে নাৎসিদের ব্যাপারে যে সতর্ক ও ক্ষমাহীন দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলা হয়, সেটা একটা চক্ষুধোলাই কি না, কে জানে।

এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, স্বার্থের কারণে নাৎসিদের ব্যাপারেও চোখ বন্ধ করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। এত যে হম্বিতম্বি, তারপরও পেশাদার, বুদ্ধিদীপ্ত নাৎসিদের নাগরিকত্ব দিয়ে কাজে লাগিয়েছে তারা। সম্প্রতি নাৎসিদের নির্যাতন শিবিরের রক্ষী ফ্রিডরিখ কার্ল বারগারকে যুক্তরাষ্ট্র–ছাড়া করার পর অনেকেই সরকারকে বাহবা দিয়েছে। অনৈতিকভাবে এই নাৎসিদের তোষণ করার বদলে দেশছাড়া করার এই প্রক্রিয়া যেন চলতে থাকে, সে আশা পোষণ করছে মার্কিন নাগরিকদের সচেতন অংশটি। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল মন্টি উইলকিনসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশংসা করে বলেছেন, ‘আমেরিকা নৃশংস নাৎসিদের পালানোর জায়গা হতে পারে না।’

৩.

ঘটনাটি কী করে ঘটল?

এর সহজ উত্তর হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই পৃথিবী মার্কিনি ও সোভিয়েতদের মধ্যে যে ঠান্ডা যুদ্ধ দেখেছে। এই ঠান্ডা যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য মার্কিনিরা অবাধে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মার্কিন দেশে অবাধে প্রবেশের ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, জার্মান বাহিনীকে পরাজিত করার ক্ষেত্রে যারা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল, তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ৪ লাখ মার্কিনি নিহত হয়েছে। এই বিষণ্ন ও শোকাহত ঘটনাবলির পর যা হওয়া উচিত ছিল, তা না হয়ে বরং নাৎসি তোষণ শুরু হলো যুক্তরাষ্ট্রে। নাৎসিদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠল দেশটি।

কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করলে কথাগুলো বোঝা সহজ হবে।

নাৎসি ও এসএস বাহিনীতে যারা ছিল, যারা নির্যাতন শিবিরগুলো পাহারায় ছিল, যারা নির্যাতনে অংশ নিয়েছে, এমনকি নাৎসি সরকারে ছিল, তাদের অনেকেই আশ্রয় পেয়েছে এই দেশটিতে। শুধু আশ্রয় দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি মার্কিনিরা, তাদের যেন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে না হয়, সে ব্যবস্থাও করেছে।

এ কারণেই কেউ কেউ প্রশ্ন করেছে, ১৬১৯ সালে আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাস বানিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের এই দেশে নিয়ে আসা থেকে শুরু করে যে অন্যায় করা হয়েছে, সেগুলোর কাছে পৌঁছাতে হলে ১৯৪৫ সালের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। নইলে সত্যের নাগাল পাওয়া দুরূহ হয়ে উঠবে।

এ কথা তো এখন আর অজানা নেই যে, তৃতীয় রাইখের ১২০ জন বিজ্ঞানীকে উড়িয়ে নিয়ে এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র। অপারেশন পেপারক্লিপ নামে তা পরিচিত ছিল। এই নাৎসি বিজ্ঞানীরা কাজ করেছিল নাসায়। এদের মধ্যে ফন ব্রাউনের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হয়।

যখন মার্কিনিরা চাঁদে অবতরণ করল, তখন ফন ব্রাউন আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা হয়ে উঠল সুপারস্টার। পত্রপত্রিকা থেকে শুরু করে সরকার পর্যন্ত সবাই তাদের তারিফ করতে শুরু করল।

এ কথা ভাবলে ভুল হবে যে, ফন ব্রাউন আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা মূলত অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসর এবং তারা প্রত্যেকেই রাজনীতির বলি। কখনওই না। তারা মহানন্দে হিটলারের হাতে তুলে দিয়েছিল রকেট, যা দিয়ে লন্ডনের শান্তিকামী মানুষদের হত্যা করেছিল নাৎসিরা। ধ্বংস করে দিয়েছিল বাড়ির পর বাড়ি, শহরের পর শহর। নির্যাতন শিবিরের বন্দিদের বাধ্য করা হয়েছিল এই রকেট বানানোর জন্য। সাক্ষী আছে, যারা বলেছে ফন ব্রাউন সেসব কারখানায় যেতেন। সেসব কারখানায় বন্দিদের অমানুষিকভাবে পেটানো হতো এবং ক্রীতদাসের মতোই তাদের সঙ্গে ব্যবহার করা হতো। ফন ব্রাউন নিজেও বলেছেন, এসব বন্দির ইচ্ছার বিরুদ্ধে রকেট বানাতে বাধ্য করা হতো।

এই বিজ্ঞানীরা ছিলেন নাৎসি, কিন্তু মার্কিন সরকারের মাথায় ছিল মহাশূন্যের যুদ্ধে জয়ী হতে হবে তাদের। অন্যদিকে ব্রিটেন আর সোভিয়েত ইউনিয়নও তৃতীয় রাইখ থেকে কখনও কখনও পিস্তলের মুখেও বিজ্ঞানীদের তুলে এনেছে।

ইউক্রেনের দালাল ইয়ারোস্লাভ স্তেৎস্কো নাৎসিদের স্বাগত জানিয়ে কত ইহুদিকে হত্যা করেছে, এর হিসাব নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে স্তেৎস্কো লিখেছিলেন, জার্মানির আদলে ইউক্রেনের ইহুদিদের হত্যা করার অঙ্গীকারের কথা। তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে, সেখানে ওয়াশিংটনের উচ্চশ্রেণির রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গেই ছিল তার দহরম মহরম। রোনাল্ড রিগ্যান ও জর্জ বুশ (সিনিয়র) তার মধ্যে দেখেছিলেন একজন তুখোড় কমিউনিস্ট–বিরোধীকে, আর তাতেই তারা ছিলেন আহ্লাদিত।

কমিউনিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অভিপ্রায়েই পশ্চিমারা নাৎসিদের এতটা প্রশ্রয় দিয়েছে।

৪.

এতগুলো কথা বললাম হতাশা থেকে। রাজনীতির কারণে পৃথিবীর সর্বত্রই নৃশংস লোকেরা পার পেয়ে যায়। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করে যদি কেউ পার পেয়ে যায়, তাহলে শান্তির সব হিসাব–নিকাশই পাল্টে যায়।

এ কারণেই যেকোনো অপরাধীকে আগে তার অপরাধী পরিচয়েই দেখতে হবে। সে কোন দল করে, সেটা দেখার দরকার নেই। বিচার বিভাগ কাজ করবে নিজের মতো। শাসক দল যেন কোনোভাবেই বিচার বিভাগের ওপর কর্তৃত্ব করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু পৃথিবীর সর্বত্রই এখন উগ্রবাদ আবার ঘনীভূত হচ্ছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য ছলেবলেকৌশলে কী না করে যাচ্ছে শাসক দলগুলো! এই গভীর অসুখ থেকে বের হয়ে আসতে হলে আইনের শাসন খুব দরকারি।

এই মুহূর্তে সেটা পৃথিবীর আনাচ–কানাচে খুঁজে দেখলেও খুব একটা মিলছে না।

ঘাতকদের নিজের ছায়ায় রাখলে তা দৈত্য হয়ে ঘাড় মটকাবার জন্য প্রস্তুত হবেই।

লেখক: গবেষক, কলাম লেখক-সাংবাদিক

শেয়ার করুন

টিকায় বদলাচ্ছে প্রচলিত প্রেক্ষাপট

করোনায় ইউরোপ-আমেরিকার শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোও যেখানে নাকানি-চুবানি খেয়েছে; অর্থনীতির বারোটা বেজেছে—সেখানে তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি যথেষ্ট কম। এর প্রধান কারণ সরকারের, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা এবং তার দৃঢ়চেতা মনোবল। প্রথম দফাতেই বাংলাদেশ যে করোনার টিকা পেল, সেখানেও ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনার ভূমিকাই মুখ্য।

২৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকালে করোনার টিকা নিতে যাই রাজধানীর শ্যামলিতে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে, যেটি মূলত পঙ্গু হাসপাতাল নামেই পরিচিত। আগে যেখানটায় আউটডোর ছিল, সেই জায়গাটি এখন টিকাকেন্দ্র। পরিপাটি। গোছানো। পরিচ্ছন্ন। কোনো ভিড় নেই। অনেকগুলো বুথ। ফলে টিকা নিতে যাওয়া মানুষের অপেক্ষায়ও দীর্ঘ নয়।

কেন্দ্রে ঢুকতেই শরীরের তাপমাত্রা মাপার পরে স্বেচ্ছাসেবক টিকা কার্ড পরীক্ষা করে পাঠিয়ে দেন নির্দিষ্ট বুথে। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কক্ষের ভেতরে গিয়ে টিকা গ্রহণ। সব মিলিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট। এরপর নার্সের পরামর্শ অনুযায়ী ৩০ মিনিট অপেক্ষা—যদি কোনো জটিলতা বা অসুস্থতা দেখা দেয়! যদিও টিকা নেয়ার পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়া বা জটিলতার সম্মুখীন হওয়ার কথা এখনও সেভাবে শোনা যায়নি।

যারা কাজ করছেন, তারা রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবী এবং এই কাজের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাদের আচরণ সুন্দর। মার্জিত। সব মিলিয়ে সরকারি হাসপাতালের সেবা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যে সাধারণ ধারণা বা কমন পারসেপশন ও অভিজ্ঞতা—তার সঙ্গে করোনার টিকা ব্যবস্থাপনার এই চিত্র একেবারেই ভিন্ন। ফলে প্রশ্ন হলো, হাসপাতালটির এই জায়গাটিতে কিছুদিন আগেও যে আউটডোর ছিল, সেখানে কেন এমন পরিচ্ছন্নতা, এমন সুন্দর সেবা, কর্মীদের এমন আন্তরিকতা ছিল না? টিকাকেন্দ্রে যারা কাজ করছেন, তারা তো অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসেননি। তাহলে পার্থক্যটা কোথায়? টিকাকেন্দ্রের এই ব্যবস্থাপনা দেশের পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কেন প্রতিনিধিত্ব করে না?

এর মূল কারণ করোনার টিকাব্যবস্থাপনাটি সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচি এবং যেহেতু করোনা একটি বৈশ্বিক মহামারি, ফলে এই সংকট বাংলাদেশ কীভাবে মোকাবিলা করছে, তার দিকে পুরো বিশ্বের নজর রয়েছে। দ্বিতীয়ত, করোনার শুরু থেকেই এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানারকম তর্ক-বিতর্ক এবং রাজনীতির মাঠ ঘোলা হয়েছে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগেরও শেষ নেই। ফলে করোনা ব্যবস্থাপনার কোথাও ন্যূনতম কোনো ত্রুটি থাকলে সেটি সরকারের বিরোধীপক্ষের জন্য যে বড় ইস্যু হবে—সরকার সেটি জানে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে টিকা ব্যবস্থাপনায় সরকারের সর্বোচ্চ মহলের দৃষ্টি রয়েছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রথম দফায় বিশ্বের হাতে গোণা যে কটি দেশ করোনার টিকা পেয়েছে, বাংলাদেশ সেই সামান্য সংখ্যক দেশের একটি। নিশ্চয়ই এটি বর্তমান সরকারের একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য। টিকা নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে এখনও জনমনে যে কিছুটা অনাস্থা রয়ে গেছে, তার মূল কারণ টিকা নিয়ে প্রচারের চেয়ে অপপ্রচার বেশি হয়েছে। অনেকে এটিকে রাজনৈতিক ইস্যুও করতে চেয়েছেন। ফলে শত ভাগ মানুষ এখনও এই টিকার ব্যাপারে আস্থাবান নন। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেও এ কথা বলা যায়, করোনায় ইউরোপ-আমেরিকার শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোও যেখানে নাকানি-চুবানি খেয়েছে; অর্থনীতির বারোটা বেজেছে—সেখানে তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি যথেষ্ট কম। এর প্রধান কারণ সরকারের, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা এবং তার দৃঢ়চেতা মনোবল। প্রথম দফাতেই বাংলাদেশ যে করোনার টিকা পেল, সেখানেও ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনার ভূমিকাই মুখ্য। বিশ্বকেও এটি দেখানোর প্রয়োজন ছিল যে, বাংলাদেশ করোনার টিকা শুধু আগে পেয়েছে তাই নয়, বরং একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নাগরিকদের টিকা প্রয়োগের সক্ষমতাও বাংলাদেশের রয়েছে।

সুতরাং, যে দেশ এরকম একটি প্যানডেমিক বা অতিমারির ব্যবস্থাপনায় উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে, সেই দেশের হাসপাতালে গিয়ে মানুষ সেবা পাবে না; হয়রানির শিকার হবে; দালালের খপ্পরে পড়ে জানমাল খোয়াবে; জনগণের করের পয়সায় কেনা ওষুধ লুটপাট হয়ে যাবে; বালিশকাণ্ড ঘটবে—তা মেনে নেয়া যায় না। যে দেশ করোনার টিকাব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে রাতারাতি হাসপাতালের একটি অংশের চেহারা বদলে দিতে পারে, সেই দেশ নিশ্চয়ই হাসপাতালের অন্যান্য অংশেও একইরকম পরিবর্তন আনতে পারে।

আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে নাগরিকদের ক্ষোভ ও প্রশ্নের শেষ নেই। স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী ধরে আমরা স্বাস্থ্য বা চিকিৎসাব্যবস্থার নামে কী গড়ে তুলেছি, সেটি করোনার মতো একটি অণুজীব এসে সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে মরে যাওয়ার একাধিক ঘটনা সংবাদ শিরোনাম হয়েছে।

করোনার প্রকোপ শুরুর পর থেকেই দাবি উঠছিল স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। হয়েছেও তাই। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বরাদ্দকৃত অর্থ কোথায় কীভাবে খরচ হয়, সেটির খবর কি সাধারণ মানুষ জানে? বড় কোনো অনিয়ম দুর্নীতির খবর সংবাদমাধ্যমে না আসার আগে সেসব চোখের আড়ালেই থাকে। সাহেদ-সাবরিনার মতো কিছু লোক ধরা পড়েছেন। কিন্তু তারা কীভাবে অন্যায় করলেন, কাদের যোগসাজসে করলেন, কারা প্রশ্রয় দিয়েছেন—তার সঠিক ও নির্মোহ তদন্ত হয়েছে? শুধু সাহেদ-সাবরিনার নাম জানা গেছে। নাম না জানা এরকম মাফিয়ার সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের অনেক ‍গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও রয়েছেন। ধরা না পড়ার আগপর্যন্ত তারা সাধু।

গত অর্ধ শতাব্দীতে যারা সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বড় বড় পদে ছিলেন, তারা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে আসলে কী করেছেন; বেসরকারি খাতে যে বড় বড় হাসপাতালের অনুমোদন দেওয়া হলো, সেগুলো হাসপাতাল না কসাইখানা—কী হিসেবে গড়ে উঠলো, রাষ্ট্র সেটি কোনোদিন খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেছে? নাকি ঠিকাদারের তালিকা অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার কেনাকাটা এবং সেই টাকার ভাগ নেয়া আর সুন্দর সুন্দর ভবন নির্মাণকেই আমরা স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন হিসেবে ধরে নিয়েছি?

এতসব প্রশ্নের মধ্যে করোনার টিকাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনার মতো ঘটনাগুলো আমাদের আশাবাদী করে। সেই আশাবাদে ভর করেই দেশবাসীর প্রত্যাশা, টিকাকেন্দ্রের মতোই বদলে যাবে দেশের সকল সরকারি হাসপাতালের জরুরি ও বহিঃবিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, বেড ও কেবিনের চিত্র। রেডক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকদের মতোই আন্তরিকভাবে সেবা দেবেন জনগণের করের পয়সায় বেতন হওয়া হাসপাতালের ডাক্তার, নার্সসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। যদিও কাজটি খুব সহজ নয়। বছরের পর বছর ধরে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যে অনিয়ম ও দুর্নীতির দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে, যে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বীজ এখন বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে, তার শেকড় একদিনে উপড়ে ফেলা যাবে না। কিন্তু করোনার টিকাব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে যে পরির্তনটি দৃশ্যমান হলো, সেটিকে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পরিবর্তনের একটি শুভসূচনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

শেয়ার করুন

যে কথা যায় না ভোলা

১৯৭২ সালের অনুরূপ ঘটনা পুনরায় জাতি দেখতে পেল ২০২০ সালে। জাতির পিতা ১৯৭২ সালের সেদিনের সেই বিধ্বস্ত, স্বামী পরিত্যক্তা খালেদা জিয়াকে স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন নিজের কন্যার মর্যাদা দিয়ে। জাতির পিতা হয়তো ভাবতে পারেননি খালেদা জিয়া স্বেচ্ছায় ১৯৭১-এর ৯ মাস পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে ছিলেন। তিনি তার বিরাট হৃদয় দিয়ে, মহানুভবতা দিয়ে খালেদার সংসার রক্ষা করেছেন। বিপরীতে খালেদা জাতির পিতা নিহতের পর কী কর্মকাণ্ড করেছেন দেশবাসীকে আর নতুন করে বলতে হবে না। যাহোক, খালেদা জিয়ার ভাইবোন আত্মীয়স্বজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর মানবতার মাতা দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকারের বিশেষ ক্ষমতায় এই দাগী সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে জামিন দিতে সরকারের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করলেন। অবশেষে গত ২৫ মার্চ ২০২০ সাজাপ্রাপ্ত এই আসামি জামিনে মুক্তি পেলেন।

স্বাধীনতার পর জামায়াতসহ সকল স্বাধীনতাবিরোধী দলই নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু জাতির পিতাকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যার পর ইতিহাসের চাকা পালটে দেয়া হয়। কায়েমি স্বার্থবাদী দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারী ও স্বাধীনতার শত্রুরা স্বাধীনতার তিন বছরের মাথায় জাতির পিতাকে হত্যা করেছে অত্যন্ত নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে ফজরের আজানের আগে ঘাতকেরা তাকে হত্যা করে। প্রকৃতি সেদিন আঝোর ধারায় কেঁদেছিল। আমরা স্তম্ভিত, বিহ্বল ছিলাম। মানবতার এহেন অবমাননা ইতিহাসে ইতিপূর্বে আর ঘটেনি। এই হত্যাকাণ্ড কারবালাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

সেই থেকেই এ দেশে রাজনীতি কলুষিতকরণ শুরু। এই ঘটনার মূল নায়ক ইতিহাসের দুই মীরজাফর খন্দকার মোশতাক ও জিয়াউর রহমান। তিন মাসের মধ্যেই আসল নায়ক জিয়াউর রহমান মোশতাককে নিক্ষিপ্ত করেন অন্ধকারে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমকে অস্ত্রের মুখে পদত্যাগ করিয়ে সেনাপ্রধান হিসেবে খলনায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি কায়দায় ক্ষমতা গ্রহণ করেন। জাতির পিতাকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান সকল স্বাধীনতাবিরোধীকে ক্ষমা করে দেন। রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। স্বাধীনতাবিরোধী সকল শক্তি সগৌরবে ফিরে আসে। পাকিস্তানি দালাল শাহ্ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। রাজাকার মওলানা মান্নান, আলীম, রাজাকার চখা মিয়াসহ বহু দালাল রাজাকার পুনর্বাসিত হয় এবং অনেককে মন্ত্রী করা হয়। এভাবেই স্বাধীনতার তিন বছরের মাথায় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলো পুনর্বাসিত হয়। কুখ্যাত দালাল পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির সভাপতি গোলম আযমসহ অনেক দালাল পলাতক অবস্থা থেকে ফিরে আসে। তাদের নাগরিকত্ব দেয়া হয়। সকল যুদ্ধাপরাধী, দালাল, রাজাকার মুক্ত হয়। দুই মীরজাফর মোশতাক ও জিয়া আগস্ট ১৯৭৫ থেকে মে, ১৯৮১ পর্যন্ত দেশ শাসন ও শোষণ করে।

১৯৮১ সালের ৩১ মে জিয়াউর রহমান নিহত হন। বিচারপতি সাত্তার অতঃপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বছর খানেকের মধ্যেই বিচারপতি সাত্তার নিজ দলের নানাবিধ দুর্নীতি ও অপকর্মের অভিযোগে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেন। এরশাদ ৯ বছর দেশ শাসন ও শোষণ করেন। সামরিক শাসকেরা যুগে যুগে দেশে দেশে এভাবেই এসেছেন আবার গেছেন। পাকিস্তান এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

সামরিক শাসক এরশাদ দেশ শাসনকালে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ ও উপজেলা পদ্ধতি গ্রহণ উল্লেখযোগ্য। উপজেলা পদ্ধতি এখন স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। তিনিও ছলেবলে কলা-কৌশলে দালাল, রাজাকার, ডান, বাম রাজনীতিবিদদের দিয়ে রাজনীতি কলুষিত করেছেন। জিয়া ও এরশাদ দুজনেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার মূল্যবোধকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছেন। জিয়া বলেছিলেন, “I will make politics difficult for the politicians. Money is no problem.” মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান, চিন্তাচেতনা তিনি ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এভাবেই দুই সামরিক শাসক স্বাধীনতার শিশু বয়সেই মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছেন। ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এভাবেই অনেক রক্ত ও ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত মহান স্বাধীনতার মূল্যবোধ ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে। যুগে যুগে দেশে দেশে সামরিক শাসকেরা এভাবেই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছেন। এরশাদের শাসনামলের শেষ দিকে নব্বইয়ের তুমুল গণ-আন্দোলনে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।

পরবর্তী সময়ে জাতীয় নির্বাচনে জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া বিএনপি নেত্রী অবিশ্বাস্যভাবে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। স্বশিক্ষিত খালেদার বিজয় ছিল এক বিস্ময়। তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত দেশ শাসন করেছেন। তার দোসর হলেন একাত্তরের পরাজিত জামায়াত-শিবির, মুসলিম লীগসহ সকল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। তিন জোটের রূপরেখাকে অমান্য করে মেয়াদ শেষে ১৯৯৬-এর ফেব্রুয়ারিতে তিনি একটি একক নির্বাচন করে দুই মাসও টিকতে পারেননি। পদত্যাগে বাধ্য হয়ে স্বশিক্ষিত খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হন।

জুন ১৯৯৬ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।

১৯৭৫ থেকে জুন ১৯৯৬ পর্যন্ত দেশ চলেছে সম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ধারায়। জিয়া-এরশাদ-খালেদা একই ধারায় দেশ শাসন করেছেন। ২৩ জুন ১৯৯৬ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশরত্ন শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেন। শুরু হলো নতুন এক জয়যাত্রা। জনগণ স্বাধীনতার সুফল পেতে শুরু করল। উন্নয়নের ধারা সূচিত হলো। কৃষি, শিক্ষা, যোগযোগ, খাদ্য, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি ও নানাবিধ উন্নয়নে বৈপ্লবিক উন্নয়ন সাধিত থেকে//// লাগল। বিএনপি-জামায়াত আমলে যেখানে লোডশেডিংয়ে মানুষ ছিল বিপর্যস্ত, আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে জনগণকে স্বস্তি দিতে সমর্থ হলো। বিএনপি আমলে বিদ্যুতের দাবির জন্য কানসাটে ১৮ জন মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কৃষককে সারের দাবির জন্যও প্রাণ দিতে হয়।

২০০১ সালে মেয়াদান্তে নতুন নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে, তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল প্রায় ৫০০০ মেগাওয়াট। আমি তখন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম-সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলাম। আর সচিব ছিলেন ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী; আজকের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা।

২০০১-এর নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের নীল নকশায় আওয়ামী লীগ তথা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে হারিয়ে দিয়ে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। শুরু হলো এক বিভীষিকাময় দুঃশাসন। এহেন দুষ্ট, নষ্ট ও দুর্নীতিবাজ সরকার পৃথিবীতে আর কখনও ছিল কি না, আছে কি না জানা নেই। দুর্নীতি, হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ ও সম্পদ পাচার ছিল তাদের আদর্শ। ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে ১০০ দিনের ক্রাশপ্রোগ্রাম হাতে নিয়ে যে অত্যাচার, অবিচার, অন্যায়, জুলুম, হত্যা, সন্ত্রাস ও ধর্ষণ তারা এ দেশের জনগণের ওপর চালিয়েছে, এর নজির পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই। এদের অত্যাচারে শত পূর্ণিমা, মহিমা, ফাহিমার ক্রন্দনে আজও এ দেশের আকাশ-বাতাস কাঁদে। এই রাজাকার সরকারের শত্রু ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। এই জালেম সরকার শত শত মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের অকারণে চাকরিচ্যুত করেছে। প্রশাসনকে স্থবির করেছে। বিএনপি-জামায়াতসমৃদ্ধ রাজাকার আলবদরের সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করতে চেয়েছে। খালেদা জিয়ার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য ‘হাওয়া ভবন’ ও ‘খোয়াব ভবন’ নামে দুটি দুর্নীতির কারখানা সৃষ্টি করে। এহেন অপকর্ম নেই যা তাদের দ্বারা সংঘটিত হয়নি। পরবর্তী সময়ে তাদের লুণ্ঠিত সম্পদের সামান্য অংশ সিঙ্গাপুর আদালতের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। তার সন্তানদের সাজাও হয়। তার ছোট ছেলে দুর্নীতির এই বরপুত্র মৃত্যুবরণ করে বেঁচে গেছে। অবশ্য লুণ্ঠিত সম্পদ দিয়ে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা মালয়েশিয়া, লন্ডনে সুখে কালাতিপাত করছে। জীবিত থাকলে হয়তো আরও অনেক অজানা তথ্য পাওয়া যেত। মহা দুর্নীতিবাজ তারেকের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফবিআই এসে সাক্ষ্যও দিয়ে যায়। তারেক দুর্নীতি ও নানাবিধ অপকর্মের মূর্ত প্রতীক। নানা অপরাধে এই অপরাধী আজ আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত এক পলাতক আসামি। এই আসামি ১/১১-এর সরকারের সময় মুচলেকা দিয়ে ক্ষমা চেয়ে লন্ডন পালিয়েছিল। লুণ্ঠিত সম্পদ নিয়ে সে আজ স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মহাসুখে লন্ডনে কালাতিপাত করছে। সে এখন নাকি ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত। কানাডার উচ্চ আদালতের রায়ে বিএনপি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। তারেক এক বিপজ্জনক ও ভয়ংকর ব্যক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই তালিকাভুক্ত করেছে। তাই তার যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকাও নিষিদ্ধ। এ মর্মে যুক্তরাজ্যকে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। খালেদা জিয়া মধ্যপ্রাচ্য ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কত সম্পদ পাচার করেছেন এর হিসাব কে দেবে? ২০০১-২০০৬ সালে ক্ষমতাকালে সৌদি আরব ভ্রমণকালে শত সুটকেস ভর্তি সম্পদ, অর্থ পাচার এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এই ছবি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। খালেদা জিয়া তার ভাই সাঈদ ইস্কান্দার ও নিকট আত্মীয়স্বজন দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এসব তথ্যাদি এসেছে (সমকাল ২৪.১০.২০০৯)।

বিদেশে জিয়া পরিবারের সম্পদ নিয়ে তদন্ত চলছে। গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কের প্রতিবেদনে বিএনপি চেয়ারপারসন থেকে আরম্ভ করে তার পরিবারের সদস্যদের অফুরন্ত সম্পদের বিবরণী আছে (১৪.০৯.২০১৭, প্রথম আলো)। এই প্রতিবেদনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ অনেক নেতা-নেত্রীর অবৈধ সম্পদের বিবরণীও আছে। খালেদা জিয়া ও তার দলের অনেক নেতা-কর্মী অবৈধ উপার্জনের অর্থের জন্য জরিমানা দিয়ে কর পরিশোধ করেছেন। তাইতো ২০০১-২০০৬ কালে বিএনপি সরকার বিশ্বে পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বিগত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের লন্ডনে বসে শত শত কোটি টাকার মনোনয়ন বাণিজ্য এ দেশে কারও অজানা নেই। তখন স্লোগান উঠেছিল ‘টাকা গেল লন্ডনে, হামলা কেন পল্টনে আর গুলশানে’? এভাবেই সামরিক শাসক জিয়া, তার স্ত্রী খালেদা জিয়া ও ছেলে তারেক জিয়া দেশকে দুর্নীতিতে বারবার চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছেন। দলের চেয়ারপারসন, তার ছেলে ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-নেত্রী একেকজন আন্তর্জাতিক কুখ্যাতিসম্পন্ন দুর্নীতিবাজ। পাকিস্তানের সেই সেনা কর্মকর্তারা জেনারেল জানজুয়া ইত্যাদি যারা ১৯৭১ সালে ক্যান্টনমেন্টে খালেদা জিয়াকে তাদের আতিথেয়তায় সুখে রেখেছেন, তারা বেঁচে থাকলে আজ জোরে হাততালি দিতেন। তাইতো এককালের বিএনপি নেতা কর্নেল অলি এই বলে বোমা ফাটালেন; মা ভালো হলে ছেলে খারাপ হবে কেন, দুটোই বদমাশ। যুক্তরাষ্ট্রের এক সভায় তিনি এহেন বক্তব্য রাখেন (২০.০৬.২০০৬, সংবাদ)।

২০০৬ সালে খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে কর্নেল অলির বক্তব্য দেশবাসী আজ যথার্থই উপলব্ধি করছে।

১৯৯১ সালে ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এতিমদের অনুদানের জন্য ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা গ্রহণ করেন। প্রাপ্ত টাকা এতিমদের জন্য খরচ না করে তারেক, কোকো ও মমিনুরের সমন্বয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করেন, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই। এই দুর্নীতির জন্য বিগত ১/১১-এর সরকারের সময় ৩.৭.২০০৮ তারিখে এজাহার দায়ের করা হয়। আসামি খালেদা জিয়া বারবার উচ্চ আদালতে বিভিন্ন অজুহাতে আপিল করে মামলার কার্যক্রম ব্যাহত ও সময়ক্ষেপণ করেন। বিচারক বদলের আবেদনও মঞ্জুর করা হয় কয়েকবার। দীর্ঘ ১০ বছরের বেশি মামলা চলার পর মহামান্য আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে উপযুক্ত শাস্তিই দিয়েছে। প্রায় দুই বছরের বেশি তিনি জেলজীবন ভোগ করছেন। তার জামিনের জন্য বারবার উচ্চ আদালতে ধরনা দিয়েও আদালত জামিন দিতে পারেনি। ন্যায়বিচারের কোনো ধারায়ই উচ্চ আদালত তাকে জামিন দিতে পারেনি। অবশ্য তিনি জেলজীবনের বেশির ভাগ সময়েই বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। জেলে তাকে যত প্রকার সুবিধা দেয়া হয়েছে, পৃথিবীতে আর কোনো সাজাপ্রাপ্ত আসামি এত বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন বলে কোনো নজির নেই। প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন ভাগ্যবতী মহিলা।

১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন ৯ মাস ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি বাহিনীর অতিথি হিসেবে আয়েশে জীবন কাটিয়েছেন। জিয়াউর রহমান বারবার চেষ্টা করেও তাকে কাছে নিতে পারেননি। যাদেরকে নেয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল তাদেরকে অপমান করে বলেছেন, ‘ওই গাদ্দার জিয়ার কাছে আমি যাব না।’ দুগ্ধ ফেননিভ শয্যায় তিনি ৯ মাস আরাম আয়েশেই ছিলেন। আরাম ও সুখ ছাড়তে রাজি হননি। পাকিস্তানি মানুষরূপী পশুদের সঙ্গে তিনি স্বেচ্ছায় ৯ মাস কাটিয়েছেন। তার জীবনের ভয় ছিল না।

স্বাধীনতার পর যখন তিনি ঘরে উঠতে চাইলেন, জিয়া তাকে ঘরে উঠতে দেননি। গালি দিয়ে বের করেছেন। খালেদা জিয়া সেদিন ৩২ নম্বরের বাসায় জাতির পিতার শরণাপন্ন হন। সেদিন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহায়তায় এই মহিলা নতুন জীবন ফিরে পান। জাতির পিতা খালেদাকে নিজ কন্যার মর্যাদা দিয়ে জিয়ার হাতে তুলে দেন। জাতির পিতার ধমকে জেনারেল জিয়াউর রহমান তাকে গ্রহণ করতে বাধ্য হন। সেই থেকে এই খালেদা জিয়া নতুন করে বাঁচতে পারলেন। বঙ্গবন্ধুর যদি ১৯৭১ সালে ফাঁসি হয়ে যেত, বাংলাদেশে না আসতে পারতেন তাহলে খালেদা জিয়া আজ কোথায় থাকতেন? পাকিস্তান না কোথায়, জানি না। জাতির পিতার মহানুভবতায় তিনি সেদিন নতুন করে বাঁচতে পেরেছিলেন।

খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ভুলে গেলেন পিতৃঋণ। পরবর্তীকালে তিনি ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে জাতির পিতার হত্যা দিবসকে নিজের ভুয়া জন্মদিন হিসেবে পালন করেন। কোনো অকৃতজ্ঞ, অসভ্য বর্বরের পক্ষেও এহেন কর্মকাণ্ড সম্ভব হবে কি না জানি না। নিজের সারা জীবনের অশুভ কর্মকাণ্ডের জন্য, দুনীতির জন্য, এতিমের টাকা আত্মসাতের জন্য উচ্চ আদালত তাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। ইসলাম ধর্মের বিধানে একজন মুসলমানের এতিমের অর্থ আত্মসাৎ মহাপাপ। শেখ হাসিনার সরকার এহেন একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে জেলে প্রাপ্যতার বাইরে সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন। উচ্চ আদালত তার কৃত অপরাধ, দুর্নীতির জন্য জামিন দিতে পারেননি। তার আইনজীবীরা শত চেষ্টা করেও আইনের কোনো ধারায়ই এই দুর্নীতিবাজকে মুক্ত করতে পারেননি। আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলে, এটাই অমোঘ নিয়তি। অবশেষে তার নিকট আত্মীয়-স্বজন, ভাইবোন সরকারের শরণাপন্ন হলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন।

১৯৭২ সালের অনুরূপ ঘটনা পুনরায় জাতি দেখতে পেল ২০২০ সালে। জাতির পিতা ১৯৭২ সালের সেদিনের সেই বিধ্বস্ত, স্বামী পরিত্যক্তা খালেদা জিয়াকে স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন নিজের কন্যার মর্যাদা দিয়ে। জাতির পিতা হয়তো ভাবতে পারেননি খালেদা জিয়া স্বেচ্ছায় ১৯৭১-এর ৯ মাস পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে ছিলেন। তিনি তার বিরাট হৃদয় দিয়ে, মহানুভবতা দিয়ে খালেদার সংসার রক্ষা করেছেন। বিপরীতে খালেদা জাতির পিতা নিহতের পর কী কর্মকাণ্ড করেছেন দেশবাসীকে আর নতুন করে বলতে হবে না।

যাহোক, খালেদা জিয়ার ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর মানবতার মাতা দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকারের বিশেষ ক্ষমতায় এই দাগী সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে জামিন দিতে সরকারের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করলেন। অবশেষে গত ২৫ মার্চ ২০২০ সাজাপ্রাপ্ত এই আসামি জামিনে মুক্তি পেলেন। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বাইরে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারের বিশেষ ক্ষমতায় নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়াকে জামিনে মুক্তি দিলেন। এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা। অথচ এই খালেদা জিয়া তার বিপজ্জনক ছেলে তারেক জিয়া বিএনপি-জামায়াত সরকার তাকে হত্যার জন্য ২০বার প্রচেষ্টা চালায়। বারবার তিনি অলৌকিভাবে বেঁচে যান। সর্বশেষ ২১ আগস্ট ২০০৪-এর ঘটনা নতুন করে বলার আর কিছু নেই। সেদিন তাদের বিশেষ করে হাওয়া ভবনের পরিকল্পনায় ছিল আর একটি ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। বিধাতার অশেষ রহমতে হয়তো শেখ হাসিনা সেদিন বাঁচতে পেরেছিলেন। পবিত্র সংসদে দাঁড়িয়ে সেদিন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, “উনাকে আবার কে মারতে যাবে। ভ্যানিটি ব্যাগে করে তিনিই গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন।” আজ যখন সব সত্য প্রকাশিত হয়েছে, এখন তিনি কী বলবেন? সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে এই হত্যায় জড়িতের জন্য খালেদার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরসহ আরও ১৯ জনের ফাঁসি হয়েছে। তার সন্তান তারেক জিয়াসহ আরও ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। সেদিনের সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হন এবং শত শত নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হন। অনেকের শরীরে এখনও স্প্লিন্টার রয়েছে, তারা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। শরীরের স্প্লিন্টারের যন্ত্রণায় প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, সাবেক সফল মেয়র মোহাম্মদ হানিফসহ কয়েকজন মৃত্যুবরণ করেছেন। খালেদা জিয়া এই অপরাধ কি অস্বীকার করতে পারবেন?

১৯৭২ সালে খালেদা জিয়া নতুন জীবন পেয়েছিলেন জাতির পিতার মহানুভবতায়; আবার ২০২০ সালে দুর্নীতির জন্য সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়েও জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার মহানুভবতায়ই সরকারের বিশেষ ক্ষমায় জামিন পেলেন। আদালত তাকে কোনো বিবেচনায়ই জামিন দিতে পারেননি। বিধাতার কী অপরূপ খেলা!

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সচিব

শেয়ার করুন

মাতৃভাষার চেতনা নিয়ে বিক্ষিপ্ত ভাবনা

বঙ্গবন্ধু ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে মর্যাদা দিয়েছেন অকুণ্ঠচিত্তে। তিনি বলেছেন, পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের দাবি জোরেশোরে উত্থাপন করে ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেন।

ভাষা আন্দোলন, ভাষাশহিদ, ভাষাসংগ্রামীদের তত্ত্বতালাশ যতটুকুই করা হোক না কেন, বিধাতা যেন সারা বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ফেব্রুয়ারির ২৮-২৯ দিনকেই নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। অন্তত আমাদের আচরণে তেমন ধারণাই জন্মে।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি-জুড়ে আমরা ঢাকা-পাবনা তথা দেশজুড়ে বইমেলার আয়োজন করি। কোথাও মাসজুড়ে আবার কোথাওবা দশ, সাত বা তিন দিনের জন্যে। বিদেশে পর‌্যন্ত এমন আয়োজনের কমতি নেই।

কিন্তু কমতি অবশ্যই আছে ভাষাশহিদ ও ভাষাসৈনিকদের তত্ত্বতালাশ নেওয়ার, ভাষা আন্দোলনের অবিকৃত ইতিহাস আলোচনার-পর্যালোচনার, ভাষাসংগ্রামীদের অবদানের ঐতিহাসিক কাহিনিগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেয়ার এবং তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে ভাষাসংগ্রামীদের সম্মানিত করার ক্ষেত্রে। এ রোগ ও পীড়া থেকে কত দিনে মুক্তি পাওয়া যাবে, তা বুঝে ওঠা কঠিন।

যে ঘাটতিগুলোর কথা বললাম, সে ঘাটতি যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, সেহেতু তা আমাদের অনেকটা যেন গা-সওয়া হয়ে গেছে। তাই এগুলো নিয়ে আমাদের কারও তেমন একটা মাথাব্যথা নেই। রাষ্ট্রের তো নেই-ই। তবে রাষ্ট্রের কর্ণধাররা তাদের বক্তব্য-ভাষণে ভাষাসংগ্রামী ও শহিদদের শ্রদ্ধা নিবেদন, ভাষার উন্নয়ন এবং জনগণের ইতিহাস নিয়ে তাদের মতো করে আলোচনা করে থাকেন। সেই আলোচনায় ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব, এর তাৎপর্য, তার লক্ষ্য ও আদর্শ- তেমন একটা স্থান পায় না। ইতিহাসের বাস্তবতাও খুব একটা উঠে আসে না।

ভাষা আন্দোলন কেবলই মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা, ভাষা আন্দোলন না হলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সম্ভব হতো না- এমনতরো কথাবার্তা অবশ্য ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে সবাই বলে থাকি। কিন্তু তেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের যারা নির্মাতা, যারা সংগঠক, যারা অংশগ্রহণকারী তাদের খোঁজখবর রাখার উদ্যোগ তেমন একটা চোখেই পড়ে না।

মাত্র দিন কয়েক আগে একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেখছিলাম ভাষাশহিদ সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী। এরা তো শহিদ হয়েছিলেন বায়ান্ন সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে বা রাত্রে। কিন্তু এদের পরিবারদের আর্থিক সাহায্য দিলেন বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় এসে ১৯৭৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর। সেই আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ ছিল, ওই তথ্যমতে, পরিবারপ্রতি ২০০০ টাকা করে। আজ হয়তো ওই ২ হাজারের দাম ২০ হাজার টাকার সমতুল্য। কিন্তু আর কি দেয়া হয়েছে পরবর্তীকালে, এই ৪৭ বছরে? হয়ে থাকলে খুব ভালো, নতুবা নিন্দা করার ভাষা নেই।

শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

ইতিহাস বলে, শহিদ ধীরেন দত্তই প্রথম পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্য হিসেবে ১৯৪৮ সালের ফেরুয়ারিতে করাচি অধিবেশনে যোগ দিয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন। অধিবেশনটি বসেছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮। কিন্তু ধীরেন দত্ত ওই প্রস্তাব উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে সংসদে হইচই শুরু হয়। সরকারি প্রস্তাব ছিল পাকিস্তানির রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। কিন্তু তার পাশাপাশি, পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ বাঙালি এবং তাদের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও, বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি জানাতে শুধু অস্বীকৃতিই জানানো হয়নি, প্রস্তাবক ধীরেন দত্তকে ‘ভারতের দালাল’, ‘পাকিস্তানের দুশমন’ প্রভৃতি আখ্যায় আখ্যায়িত করলেন পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ মুসলিম লীগের অপরাপর বাঙালি-অবাঙালি নেতারা।

ওই অধিবেশনেই ২৯ মার্চে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়ে আনীত বিল পাস করা হয়। প্রতিবাদ করেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একক কণ্ঠে।

অতঃপর দ্রুত তিনি ফিরে আসেন পূর্ববাংলায়। ঢাকা বিমানবন্দরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্ররা তাকে মাল্যভূষিত করেন, সশ্রদ্ধ সংবর্ধনা জানান। ভাষা আন্দোলন অতঃপর জনতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া শুরু করে ছাত্রসমাজ। যার শুরু ১৯৪৮-এ। অবশ্যই এই বিশাল তাৎপর্যময় আন্দোলনের সূচনা করেন ধীরেন দত্ত। ফলে তাকেই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রথম দাবিদার ও অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব কিন্তু এ ক্ষেত্রে যদি দলবাজি-নেতাবাজি-ব্যক্তিবাদ প্রভৃতি এনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়, তবে নিশ্চিভাবেই এই বীরের অবমূল্যায়ন করা হবে।

বঙ্গবন্ধু ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে মর্যাদা দিয়েছেন অকুণ্ঠচিত্তে। তিনি বলেছেন, পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের দাবি জোরেশোরে উত্থাপন করে ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেন।

সেই ধীরেন দত্ত কুমিল্লার সন্তান এবং কংগ্রেস নেতা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও দেশত্যাগ তো দূরের কথা, নিজের বাড়ি ছেড়েও যাননি। বলতেন, ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গদপি গরীয়সী’ -অর্থাৎ জননী ও জন্মভূমি স্বর্গাপেক্ষা গৌরবের। তাই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তাঁকে জীবন দিতে হলো- তিনি শহিদ হলেন দেশ মাতৃকাকে ভালোবেসে।

দুঃসংবাদ : ধীরেন দত্তের বাড়ি

সেই ধীরেন দত্তের কুমিল্লার গ্রামের বাড়িটি দেখাশোনার আজ আর কেউ নেই। বাড়িটি কার্যত জরাজীর্ণ। এর ছবিটি দিন কয়েক আগে ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে সরকার ‘ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র’ হিসেবে ওই বাড়িটিকে গড়ে তুলে ধীরেন দত্তের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখাতে ও তাকে স্মরণীয় করে রাখতে পারে।

হারিয়ে যাওয়া নেতারা

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে ধীরে ধীরে সবার অলক্ষ্যেই অনেক নেতা হারিয়ে যাচ্ছেন। স্মৃতি হাতড়ে যাদের নাম পাচ্ছি তারা হলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, অলি আহাদ, গাজীউল হক, আবদুল মতিন, ইমাদুল্লাহ, হাসান হাফিজুর রহমান, মোহাম্মদ সুলতান, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, কেজি মোস্তফা প্রমুখ হারিয়ে গিয়েছেন।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর তেপ্পান্ন সালে প্রধানত আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীরা সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, প্রবন্ধ, ছোট গল্প ও একগুচ্ছ কবিতা নিয়ে ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ নামে একটি সংকলন প্রকাশ করেন ওই সময়ে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের বিপরীতে অবস্থিত ‘পুঁথিপত্র’ প্রকাশনা কেন্দ্র থেকে। প্রকাশের পর পরই মুসলিম লীগ সরকার বইটিকে বে-আইনি ঘোষণা করেন। অতঃপর ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন সরকার বেআইনি ঘোষণার আদেশটি প্রত্যাহার করে। অতঃপর জনপ্রিয় ওই বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সামরিক আইন জারি হলে বইটি আবারও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় এবং তারপর থেকে বইটি বাজারেও পাওয়া যায় না। ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনটির ঐতিহাসিক মূল্য থাকায় বাংলা একাডেমির উচিত নতুন একটি সংস্করণ প্রকাশ করা।

স্মৃতিরক্ষায় অবহেলা

ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে বাঙালি জাতি অত্যন্ত গর্বিত দলমতধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে। বায়ান্নর পরে দীর্ঘ ৬৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও গ্রাম থেকে শহর-বন্দর-নগর পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহর থেকে অন্তত বেলা ১১টা পর্যন্ত শহীদ মিনারগুলোতে মানুষের ঢল নামে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এ এক কল্পনাতীত ব্যাপার, সন্দেহ নেই।

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিরক্ষায় একমাত্র বাংলা একাডেমি ব্যতিরেকে তার গবেষণা কেন্দ্র, ইতিহাস সংরক্ষণ কেন্দ্র, ভাষাসংগ্রামীদের বাড়িঘর সংরক্ষণ, তাদের পরিবার-পরিজনদের (অনেক ভাষাসংগ্রামী যেহেতু আজ লোকান্তরে) খোঁজখবর রাখা, ভাষাসংগ্রামীদের ছবি জেলায় জেলায় সংরক্ষণ, তাদের তালিকা উপজেলাপর‌্যায়ে প্রণয়ন ও যত দ্রুত সম্ভব তাদের নামের তালিকা সরকারিভাবে গেজেট আকারে প্রকাশ ও মর্যাদাপূর্ণ ভাতাদি প্রদান রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের চলাফেরার জন্য কোটি টাকার গাড়ি বরাদ্দ হচ্ছে, কিন্তু ভাষাসংগ্রামীরা যারা বাঙালি জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির নব উন্মেষ ঘটালেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করলেন, দেশ ও জাতিকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করলেন, তাদের প্রতি অবহেলা কষ্টের কারণ। এর অবসান হওয়া জরুরি।

ভাষাসৈনিকদের প্রতি সম্মান জানাতে তাদের নামে স্টেডিয়াম, রাস্তা, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা করা যেতে পারে।

ভাষা আন্দোলন ও ভাষাসৈনিকদের শ্রদ্ধা জানানোর ক্ষেত্রে অবহেলার তালিকা আর দীর্ঘ না করি। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সুসংবাদ তুলে ধরছি:

সুসংবাদ

ভাষাসৈনিক ‘আবদুল মতিনের গ্রামে শহীদ মিনার: খুশি এলাকাবাসী’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরটিতে বলা হয়। প্রতীক্ষার ৬৮ বছর পর ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের নিজ গ্রাম গুধিবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নবনির্মিত শহীদ মিনারে ব্যাপক আয়োজনে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস। সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদের অর্থায়নে দিবসটি পালন করা হয়। এর ফলে আশা মিটেছে আবদুল মতিনের জন্মভূমির সর্বস্তরের মানুষের।

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে কালো ব্যাজধারণ করে জামিরতা ডিগ্রি কলেজ, জামিরতা জহুরা খাতুন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, জামিরতা উচ্চ বিদ্যালয়, সোনাতুনি ও স্তপিয়াখালি উচ্চ বিদ্যালয়সহ মোট তিনটি ইউনিয়নের শিক্ষার্থীরা প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে গুধিবাড়ি সরকারি প্রাথমিকবিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। এরপর বিকেলে আলোচনা সভা ও লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন আবদুল মতিনের ছোট ভাই গোলাম কিবরিয়া হান্নান। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সর্বদলীয় (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মতিনের জন্মভূমি চৌহালিতেও নবনির্মিত শহীদ মিনারেও দিসটি পালন করা হয় যথাযোগ্য মর্যাদায়। চৌহালি উপজেলার দুর্গম মৌলজানা গ্রামটি (আবদুল মতিনের মূল জন্মস্থান) নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার কারণে তার বাবা বসতি গড়ে তোলেন নদীর পশ্চিম পাড় গুধিগড়ি গ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে এই দুই গ্রামে স্থায়ী কোনো শহীদ মিনার ছিল না। ফলে অস্থায়ীভাবে কলাগাছ দিয়ে শহীদ মিনার তৈরি করে ওই এলাকার মানুষ শহিদ দিবস পালন করছিলেন।

ওই এলাকার মানুষ এই অভাবটি মোচনের জন্য দীর্ঘকাল ধরে দাবি জানাচ্ছিলেন স্থায়ীভাবে শহীদ মিনার নির্মাণের। এ দাবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফের উদ্যোগে জেলা পরিষদের অর্থায়নে সম্প্রতি দুই গ্রামে দুইটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে দেন।

ভাষাসৈনিক প্রয়াত আবদুল মতিনের জন্মভূমি সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী-শাহনাজপুর জনপদে রয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দেশে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতির দীর্ঘকাল পরও অনেক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ীভাবে নির্মিত কোনো শহীদ মিনার না থাকায় শিক্ষার্থীরা ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহিদদের প্রতি উপযুক্ত শ্রদ্ধা জানাতে পারতেন না। তাদের বাঁশ ও কলাগাছ দিয়ে শহীদ মিনার বানাতে হতো। বিশেষ করে আজীবন সংগ্রামী, ভাষাসৈনিক ও কৃষক নেতা আবদুল মতিনের জন্মভূমি চৌহালির ধুবুলিয়া-শৈলজানা চরে কোনো শহীদ মিনার নির্মিত না হওয়ায় এলাকাবাসী ব্যথিত ছিল।

পরিশেষে, ব্যাপক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালে প্রশিকার চেয়ারম্যান কাজী ফারুকের সহযোগিতায় শৈলজানা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় চত্বরে জাতীয় নকশার শহীদ মিনার ও লাইব্রেরি উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেন ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন। এরপর থেকে চরাঞ্চলের মানুষ এই শহীদ মিনারে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতিবছর মাতৃভাষা দিবস পালন করে আসছিলেন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০১৫ সালের ১ জুন ভাষাসৈনিকের গ্রামের সেই শহীদ মিনারটি যমুনাগর্ভে বিলীন হয় এর পর থেকে আবারও বাঁশ-কলাগাছ দিয়ে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ মিনারেই প্রতিবছর শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছিল।

অতঃপর সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নতুন শহীদ মিনার নির্মাণ করে দিলে জনদাবি আবারও পূরণ হয়। ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের সহধর্মিণী গুলবদন নেছা মনিকা ও ছোট ভাই গোলাম কিবরিয়া হান্নান বলেন, এই শহীদ মিনার দুটি অনেক প্রতীক্ষার ফল।

এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রী ও সিরাজগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মণ্ডল বলেন, ‘ভাষাসৈনিক মতিন ভাইকে নিয়ে আমরা কতই না গর্ব করি। তার জন্মভূমি ও গ্রামে শহীদ মিনার নেই জেনে আমিও ব্যথিত ছিলাম- তাই গ্রাম দুটিতে দুটি শহীদ মিনার নির্মাণ করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি।’

খবরটি নিশ্চয় একটি সুসংবাদ। সারা দেশে জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা শিক্ষা নিলে সারা দেশে ভাষাসৈনিকদের স্মরণে অনেক বড় কিছু হতে পারে।

লেখক : কলাম লেখক ও সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত

শেয়ার করুন

ad-close 103.jpg