যদি সব স্কুলে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ নিয়োগ দেয়া যেত

এখন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার দুঃখ প্রকাশ করছেন যদি তাদের দক্ষ জনবল থাকত! যদি রাজনৈতিক বা অন্য প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যেত! যাদের কারণে অদক্ষ লোককে চাকরি দিতে বাধ্য হয়েছেন তারা এখন জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। অতি সংকীর্ণ স্বার্থে তারা বৃহত্তর স্বার্থ উপেক্ষা করেছেন।

কয়েক বছর আগে একটি শহরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি দুঃখের সঙ্গে জানান যে তার বিদ্যালয়ে একজন তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য পরীক্ষা নিয়েছেন। কিন্তু শহরের এক অতি প্রভাবশালী ব্যক্তি এক তরুণকে চাকরিটি দেয়ার জন্য অনুরোধ করে পাঠিয়েছেন এবং তাকেই নিয়োগ দিতে হয়েছে। অথচ তিনি তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে কিছুই জানেন না। কম্পিউটার বিষয়ে সাধারণ জ্ঞানেরও প্রচণ্ড অভাব তার। প্রকৃতপক্ষে বিদ্যালয়ে যোগদান করার পর ওই শিক্ষকের কোনো কাজ নেই। তাকে নিম্ন শ্রেণিতে বাংলা ও ইতিহাস বিষয়ে কয়েকটি ক্লাস দেয়া হয়েছে। সেটাও তিনি মনোযোগ দিয়ে করেন না। তার খুঁটির জোর আছে সেটা বড়াই করে বলেন।

করোনাকালে ওই প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তিনি আপসোস করে বলেন তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে যদি একজন দক্ষ লোক সে সময় নিয়োগ দেয়া গেলে কী সুফলই না মিলত! তার বিদ্যালয়ের আশপাশেই রয়েছে অনেক তরুণ-তরুণী, যারা এই নিয়োগ পেতে পারত।

একবার গ্রামের এক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিয়োগ পরীক্ষা দেখেছি। স্থানীয় সংসদ সদস্যর প্রতিনিধি সবকিছুর তদারক করছিলেন, যার নিজের বিদ্যালয় শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা নেই।

করোনাকালে শহর ও গ্রামের অনেক শিক্ষক জানিয়েছেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজে যদি কম্পিউটার এবং তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান রয়েছে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হতো তাহলে করোনাকালে বহুবিধ সুবিধা মিলত। কিন্তু অপরিণমদর্শী প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। তারা পছন্দের লোককে চাকরি দিয়েছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গঠনের ডাক দিয়েছিলেন। তরুণ প্রজন্ম সেটা লুফে নেয়। নির্বাচনে বিপুল জয়লাভের পেছনে এই প্রতিশ্রুতি ছিল অন্যতম প্রধান কারণ। নতুন সরকার গঠন করে তিনি তথ্য-প্রযুক্তি সহজলভ্য করার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করেছিলেন। শুল্ক করে দিয়েছিলেন ছাড়। করোনাকালেও যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধসে যায়নি, তার পেছনে ডিজিটাল বাংলাদেশ স্লোগানের বাস্তবায়ন বড় ভূমিকা রেখেছে। এমনকি বর্তমান সরকারের প্রতিপক্ষও এটা অস্বীকার করে না।

কত ধরনের অনলাইন সুবিধা এখন আমরা ভোগ করছি। অনলাইন-মিটিং চলছে। কেনাকাটায় অনলাইন ব্যবসায় সক্রিয়। চিকিৎসকরা সুদূর গ্রামে থাকা রোগীকে পরামর্শ দিচ্ছেন অনলাইনে। এ জন্য ফিস নিচ্ছেন। শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক গ্রামে ছুটিতে গেছেন। সঙ্গে ল্যাপটপ। যে গ্রামে অবস্থান করেন সেখানে রয়েছে ওয়াই ফাই সুবিধা। সর্বক্ষণ বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। তিনি ক্লাস নেন একটানা দুই ঘণ্টা। ছাত্রছাত্রীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাংলাদেশের নানা প্রান্তে। কয়েক বছর আগে হলে শিক্ষক জানিয়ে দিতেন অনিবার্য কারণে ক্লাস নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এখন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার দুঃখ প্রকাশ করছেন যদি তাদের দক্ষ জনবল থাকত! যদি রাজনৈতিক বা অন্য প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যেত! যাদের কারণে অদক্ষ লোককে চাকরি দিতে বাধ্য হয়েছেন তারা এখন জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। অতি সংকীর্ণ স্বার্থে তারা বৃহত্তর স্বার্থ উপেক্ষা করেছেন। এখন তারা শিক্ষা নেবেন কি? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় অনাবশ্যক হস্তক্ষেপ বন্ধ করবেন কি?

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম কম্পিউটার প্রযুক্তি ভালভাবেই রপ্ত করেছে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ক্লাস নিই। ছাত্রছাত্রীদের দেখে বিস্মিত হই তাদের তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে জ্ঞানের ভাণ্ডার যথেষ্ট সমৃদ্ধ। কোনো বিষয়ে ক্লাসে আলোচনা চলাকালেই তারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তথ্য বের করে দেয়। নোটশিট আদানপ্রদান করে মুহূর্তে। এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই তাদের। যা কিছু আয়ত্ত করেছে সবই প্রায় নিজের চেষ্টায়। অনেক বয়ষ্ক লোকের কাছে শুনি তাদের পরিবারের শিশুদের কাছ থেকে পর্যন্ত সহায়তা পাচ্ছেন জুম-মিটিংয়ের বিষয়ে।

এটা ঠিক যে শত ভাগ শিক্ষার্থীর হাতে আধুনিক ও বহুবিধ ব্যবহারের উপযুক্ত ফোন সেট নেই। অনেক জায়গায় নেটওয়ার্ক দুর্বল। বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর অতি মুনাফালোভ ও প্রতারণার কথাও শোনা যায়। কিন্তু সবার জন্য শতভাগ সুবিধা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত কি চুপচাপ থাকব?

আমাদের দেশে সবার ব্যক্তিগত গাড়ি নেই। তাই বলে কি বাজারে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনাবেচা বন্ধ রয়েছে? সকলে অত্যাধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসা সুবিধা নিতে পারে না। তাই বলে কি ঢাকায় এবং অনেক জেলা শহরে ল্যাব এইড ও পপুলার-এর মতো হাসপাতাল গড়ে উঠছে না?

করোনা আমাদের অনেক শিক্ষা দিয়েছে। শিক্ষার প্রয়োজনে তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করতে গিয়ে যে সব বিষয়ে ভুলত্রুটি ধরা পড়েছে, যেখানে যেখানে ঘাটতি দেখা দিয়েছে তা দূর করায় এখন মনোযোগী হতে হবে। ম্যানেজিং কমিটিতে উপযুক্ত লোক দিতে হবে।

বিভিন্ন সূত্র বলছে বাংলাদেশে এখন ১৭ কোটি মোবাইল সেট ব্যবহার হচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে সেট-এর সরবরাহ পর্যাপ্ত। হয়ত জনসংখ্যার ১৫-২০ শতাংশের হাতে মোবাইল সেট নেই। আবার কারও দুই বা তিনটি সেট রয়েছে। এটা হতেই পারে যে শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা সব সেট ইন্টারনেট ব্যবহারের উপযুক্ত নয়। এ সমস্যার সমাধানে সরকার এগিয়ে আসতে পারে। ঋণের ব্যবস্থা করা যায়। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে মোবাইল সেট-এর ওপর শুল্ক-কর তুলে দেয়া যায়। শিক্ষার জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও করা যায়। গত জুন মাসে একাধিক লেখায় বলেছি ছাত্রছাত্রীদের জন্য অ্যাসাইনমেন্ট-ভিত্তিক ক্লাস-পরীক্ষা চালুর জন্য। বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ব্যবহারিক ক্লাস চালু করা কঠিন। কিন্তু শিক্ষকরা বিভিন্ন বিষয়ে ছাত্রদের কিছু না কিছু লিখে আনার মতো প্রশ্ন করে দিতে পারেন। ছাত্রছাত্রীরা বাসায় বসে লিখে এনে জমা দেবে শিক্ষকের কাছে। তিনি টেলিফোনে পরামর্শ দেবেন ছাত্রছাত্রীদের। এ ধরনের সুবিধা চালু হয়েছে, তবে মূল্যবান সময় হারিয়ে ফেলার পর।

গ্রামে থাকার সময় দেখেছি শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের বাসায় ফোন করে পরীক্ষা নিচ্ছেন। অনেক শিক্ষক বলেন এই ফোনের বিল কে দেবে? কেউ বা বলেছেন শিক্ষার্থীর নিজের ফোন নেই। বাব-মায়ের ফোন আছে, কিন্তু তারা সচেতন নয়। এক অভিভাবককে আগেই তার সন্তানের পরীক্ষার সময়সূচি জানানো হয়। কিন্তু তিনি সেই সময়ে ফোন নিয়ে বাজারে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন।

এ সব ঘটনাকে আমি বিচ্ছিন্ন বলেই ধরে নিতে চাই। এমনও হতে পারে যে ৩০-৪০ ভাগ শিক্ষার্থীর পরিবারে সমস্যা রয়েছে। তাই বলে কি বাকিদের প্রতি আমাদের দায় থাকবে না?

কবে করোনামুক্ত পৃথিবী আসবে, সে জন্য অপেক্ষায় থাকা চলে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। কিন্তু অনেক স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা কোচিং ক্লাস চালাচ্ছেন। এতে কিছু ছাত্রছাত্রী লাভবান হচ্ছে। কিছু শিক্ষকও লাভবান হচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে নৈতিকতার প্রশ্ন আসতেই পারে। তারপরও এটা মেনে নিতে রাজী। এ থেকেও কিন্তু একটি সমাধান সূত্র মেলে শিক্ষকরা সব ছাত্রছাত্রীর জন্য কিছু না কিছু করতেই পারেন।

শিক্ষকদের সংগঠন রয়েছে। কয়েকটি ছাত্র সংগঠন সক্রিয়। শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠনের নেতারা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের সঙ্গে বসে পাঠদান ও পরীক্ষা গ্রহণের পথ বাতলাতে পারেন। সরকার কেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয় না, এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। সেটা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু জ্ঞানের দুয়ার খোলা রাখার অনেক সুবিধা এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। সেটা কেন কাজে লাগাব না?

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

শেয়ার করুন

মন্তব্য