সরকারের যুগপূর্তি ও ফখরুলের গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন

মির্জা ফখরুল বলেছেন, গণঅভ্যুত্থান করতে জনগণের বৃহত্তর ঐক্য এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য দরকার। কিন্তু সেখানে বড় রকমের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। যেখানে সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য দরকার, সেখানে সবাই আলগা আলগা। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় ঐক্যজোট আছে কাগজে-কলমে।

কথায় কথায় আমরা বলি, অমুক যুগ, তমুক যুগ। তার মানে ‘যুগ’ একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সরকারে থাকার যুগপূর্তি হয়েছে গত সপ্তাহে। সবকিছু ঠিক থাকলে আরও তিন বছর নিশ্চিত ক্ষমতায় থাকবে আওয়ামী লীগ। তারপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

কিন্তু সমস্যা হলো, নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের কোনো আস্থা নেই। নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে অন্য কেউ ক্ষমতায় আসবে, এটা এখন আর কেউ ভাবে না। আওয়ামী লীগের যুগপূর্তি নিয়ে অনেক বিশ্লেষণ হয়েছে। মানতেই হবে গত এক যুগে শেখ হাসিনার ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে দেশ অনেকদূর এগিয়েছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিবেচনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি অকল্পনীয়। শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্ব আমাদের ভাবনার জগত খুলে দিয়েছে। তবে মানতেই হবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গিয়ে আমরা মানবিক উন্নয়নে অনেক ছাড় দিয়েছি। উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্নীতি। সুশাসনের ঘাটতি পদে পদে। গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক অধিকার, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আজ ভুলুণ্ঠিত।

শুরুতেই নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে অন্য কোনো দল ক্ষমতায় আসবে, সেই বাস্তবতা বাংলাদেশে নেই। সেটা এখন আর কেউ বিশ্বাসও করে না। তাহলে কীভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে? এই প্রশ্নের উত্তর জানেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আওয়ামী লীগ একযুগ ক্ষমতায় মানে বিএনপি এক যুগ ক্ষমতার বাইরে। সঙ্গে ১/১১- এর দুই বছর যোগ করলে বিএনপির ক্ষমতাহীনতার ১৪ বছর কাটছে। যাদের বয়স ২০/২২ তাদের স্মৃতিতে ক্ষমতাসীন বিএনপি নেই। কিন্তু বিএনপি একটি ক্ষমতামুখী দল। আঁকড়ে ধরে রাখার মত আদর্শও তাদের নেই। তাই তারা ক্ষমতায় আসতে মরিয়া থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সেই উপায়টাই বাতলে দিয়েছেন মির্জা ফখরুল। গত সপ্তাহে ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘জনগণের বৃহত্তর ঐক্য, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের মধ্য দিয়ে, একটা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারকে পরাজিত করতে হবে। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি এবং আমরা সফল হব বলে বিশ্বাস করি এই ২০২১ সালে।’

মির্জা ফখরুল ঠিক বলেছেন। কিন্তু তিনি যদি বিএনপির মহাসচিব না হয়ে বুদ্ধিজীবী হলে ঠিক ছিল। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলবেন, কী করতে হবে; আর মির্জা ফখরুল সেটা করে দেখাবেন। কিন্তু মির্জা ফখরুলও যদি বলেন, করতে হবে; তাহলে করবেটা কে? যে ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গণঅভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছেন মির্জা ফখরুল, সেই ছাত্রদল একসময় বেগম জিয়ার ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত ছিল। আজ সেই খালেদা জিয়াও নেই, সেই ছাত্রদলও নেই।

মির্জা ফখরুল বলেছেন, গণঅভ্যুত্থান করতে জনগণের বৃহত্তর ঐক্য এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য দরকার। কিন্তু সেখানে বড় রকমের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। যেখানে সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য দরকার, সেখানে সবাই আলগা আলগা। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় ঐক্যজোট আছে কাগজে-কলমে। নির্বাচনের আগে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কাগজে-কলমেও নেই। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যেখানে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা, সেখানে তারা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

মির্জা ফখরুলের বাইরে শুধু নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার কণ্ঠবিপ্লব শুনি আমরা। তিনিও গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন দেখেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন, এক লাখ লোক রাম্তায় নেমে সরকার হটিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেছেন, পুতুপুতু করে আন্দোলন হবে না। রাস্তায় নামতে হবে। কিন্তু সমস্যাটা হলো, কাকে রাম্তায় নামতে বলছেন তিনি। নিজে তো নামছেন না। মাহমুদুর রহমান মান্নার সংগঠনের নাম ‘নাগরিক ঐক্য’। কিন্তু তিনি নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি। সংগঠনে নেই ১০ জন লোক, তিনি লাখো লোকের গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন দেখেন।

শুধু ডাক দিলে গণঅভ্যুত্থান হবে না। গণঅভ্যুত্থান করতে ‘গণ’ লাগবে। সেই ‘গণ’ নাগরিক ঐক্যে তো নেই-ই, বিএনপিও জনগণের ক্ষোভকে সংগঠিত করতে পারে নি। নয়াপল্টনে ব্রিফিং আর প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে গণঅভ্যুত্থান হবে না। জনগণের কাছে যেতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, গত ১৪ বছরে এই কাজটি বিএনপি একদমই করেনি। সরকারের ব্যর্থতা, দুঃশাসনে অতিষ্ঠ হলেও মানুষ বিএনপির ওপর ভরসা করতে পারছে না। তারচেয়ে বড় কথা হলো, অতীতের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতায় অতিষ্ঠ মানুষ বিদ্যমান স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক ধরনের স্বস্তিতে আছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার- এগুলো বুদ্ধিজীবীদের ইস্যু। সাধারণ মানুষ এখনই রাস্তায় নেমে আওয়ামী লীগকে সরিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে, তেমন তাগিদ দেখা যাচ্ছে না।

তবে আন্দোলন কেন সফল হচ্ছে না, সেই প্রশ্নের উত্তরও মির্জা ফখরুল জানেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল। তারা জনগণকে ভোটের অধিকার বঞ্চিত করে, জোর করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে, ২০১৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর রাতেই ভোট ডাকাতি করে একটি দখলদারি সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা দমনের মাধ্যমে জনগণের যে ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন গণতন্ত্রের জন্য, তাকে তারা দমন করার চেষ্টা করছে।

তবে ইতিহাস প্রমাণ করে কখন-ই দমনপীড়নের মধ্য দিয়ে মানুষের ন্যায়সঙ্গত দাবিকে দমিয়ে রাখা যাবে না। বাংলাদেশে কখনও পারেনি। আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিটি বছর আমাদের জন্য নতুন শক্তি সঞ্চয় হবে এবং ফ্যাসিস্ট সরকারকে আমরা পরাজিত করতে সক্ষম হব।’

মির্জা ফখরুল বুঝদার লোক। তার মধ্যে একটা বুদ্ধিজীবীসুলভ ব্যাপার আছে। গণঅভ্যুত্থান ছাড়া সরকারকে উৎখাত করা যাবে না, এটা তিনি জানেন। গণঅভ্যুত্থান করতে জনগণের ঐক্য লাগবে, এটাও জানেন। তারমানে গণঅভ্যুত্থানের থিওরিতে তিনি পাশ, কিন্তু সমস্যা হলো প্র্যাকটিক্যালে। জনগণ মাঠে নেই। তাই থিওরি বাদ দিয়ে জনগণের কাছে যান, নিজেদের অবস্থান তুলে ধরুন। আপনি যেমন জানেন, আমরাও জানি, জনগণের ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

শেয়ার করুন

মন্তব্য