শেখ হাসিনার আরেক ম্যাজিক

তালিকায় করোনার সার্বিক ক্ষতি মোকাবেলার সক্ষমতা বিবেচনায় বিশ্বে বসবাস উপযোগী নিরাপদ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২০তম বলা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সেটা শীর্ষস্থান।

সারাবিশ্বে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করাসহ অর্থনীতির ক্ষতি মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখা দেশগুলোর পয়েন্ট তালিকা করেছে আন্তর্জাতিকভাবে শক্তিশালী মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গ।

করোনাভাইরাস শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বের ৫৩টি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ১০টি সূচকের উপর ভিত্তি করে সূচক প্রকাশ করেছে গণমাধ্যমটি। প্রতি লাখে আক্রান্ত, একমাসে মৃত্যু, সামগ্রিক মৃত্যুহার, পজিটিভ পরীক্ষার হার, কোভিড ভ্যাকসিন প্রাপ্তির সক্ষমতা, লকডাউন পরিস্থিতি, করোনার সময়কালে জনগণের চলাচল, জিডিপির প্রবৃদ্ধি, সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও মানব উন্নয়ন সূচক বিষয় গুলো বিবেচনায় নিয়ে এই পয়েন্ট তালিকা করা হয়।

তালিকায় করোনার সার্বিক ক্ষতি মোকাবেলার সক্ষমতা বিবেচনায় বিশ্বে বসবাস উপযোগী নিরাপদ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২০তম বলা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সেটা শীর্ষস্থান। ব্লুমবার্গে প্রকাশিত জরিপে বলা হয়, সামাজিক অর্থনৈতিক বিভিন্ন দিক এবং কোভিড-১৯ সংক্রমণ ও মৃত্যুর বিবেচনা করে এই প্রতিবেদন করা হয়।

সংক্রমণ ও মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে রেখে সামাজিক অগ্রগতির বিভিন্ন সূচক জরিপে ৮৫ দশমিক ৬০ স্কোর নিয়ে শীর্ষস্থানে রয়েছে নিউজিল্যান্ড। দ্বিতীয় স্থান তাইওয়ানের স্কোর ৮২.৪০। শীর্ষ বাকি দেশগুলোর পর্যায়ক্রম হল – অস্ট্রেলিয়া (স্কোর ৮১), নরওয়ে (৭৭), সিঙ্গাপুর (৭৬.২), ফিনল্যান্ড (৭৫.৮), জাপান (৭৪.৫), দক্ষিণ কোরিয়া (৭৩.৩), চীন (৭২), ডেনমার্ক (৭০.৮), কানাডা (৭০), ভিয়েতনাম (৬৯.৭), হংকং (৬৮.৫), থাইল্যান্ড (৬৮.৫), আয়ারল্যান্ড (৬৭.৩), সংযুক্ত আরব আমিরাত (৬৫.৫), ইসরায়েল (৬২.৪), রাশিয়া (৬১.৭), নেদারল্যান্ড (৬১.৩) ও বাংলাদেশ (৫৯.২)। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রতি লাখে আক্রান্তের সংখ্যা বলা হয়েছে ৩৪ জন। মৃত্যুহার ১.৬ শতাংশ ও প্রতি দশ লাখে মারা গেছেন ৪৪ জন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্থান ২৯তম (স্কোর ৫৪.৪), ভারত ৩৯ (স্কোর ৫০)। তালিকায় বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্র যুক্তরাজ্য ৩০তম ও যুক্তরাষ্ট্র ৩৭তম অবস্থানে আছে।

করোনা পরিস্থিতিতে সংক্রামণ ও মুত্যুহার নিয়ন্ত্রণে রেখে অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার দুরদর্শী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে। বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সফলতার তিনিই চালিকাশক্তি।

করোনা ভাইরাসের তাণ্ডব পুরো পৃথিবীটাকেই স্থবির করে দিয়েছে। অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে শক্তিশালী, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার দেশগুলোতেও করোনা ভাইরাসের আঘাতে মৃত্যুপুরীতে পরিনত হয়েছে। সেখানে সীমিত সম্পদ, জনসংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সঠিক পরিকল্পনার কারণে একজন আক্রান্ত ব্যক্তিরও বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করতে হয়নি।

শুরু থেকেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জটা অন্যান্য দেশগুলোর থেকে একটু ভিন্ন ধরনের ছিল। এখানে ১৬ কোটি মানুষের বসবাস। বিশাল জনসংখ্যা, সীমিত সম্পদ। সমাজের একটি বড় অংশের মানুষই শ্রমজীবি। একদিকে করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা, অপর দিকে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকাকে সচল রাখা। সেজন্যই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার লড়াইটা ছিল অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানদের থেকে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের।

করোনা সংক্রামণের শুরুতে লকডাউনে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ, গার্মেন্টেসের একের পর অর্ডার বাতিল, শ্রমিকদের কাজ হারানোর আশঙ্কা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যখন চারিদিকে অস্থিরতা বিরাজ করছিল তখন প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ঘোষণা করলেন সোয়া লক্ষ কোটি টাকারও বেশি অংকের বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ। যা জিডিপির ৪.০৩ শতাংশ। এই প্যাকেজ অর্থনীতির গতি ফেরাতে ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে। বাংলাদেশে করোনার সফলতার মূল চালিকা শক্তিই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। তিনি যে গাইড লাইন দিয়েছেন সেটাই সফলতার মূলমন্ত্র। প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ১ এপ্রিল ৩১ দফা, ৭ এপ্রিল ১০ দফা, ১৬ এপ্রিল ১০ দফা, ২০ এপ্রিল ১৩ দফা, ২৭ এপ্রিল ১০ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। যা গণসচেতনতা বিবেচনা ও পরিস্থিতি মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

করোনার প্রাথমিক পর্যায়ে একটি মাত্র পিসিআর ল্যাব দিয়ে শুরু হলেও খুব দ্রুতই সারাদেশে কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য ল্যাব প্রস্তুত করা হয়। কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রস্তুত, সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড-১৯ ওয়ার্ড তৈরি, জরুরি ভিত্তিতে দুই হাজার ডাক্তার, ছয় হাজার নার্স ও পাঁচ হাজার হেলথ টেকনোলজিষ্ট নিয়োগ করে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়।

জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি জীবিকা নিশ্চিতকরণের জন্য নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্তের প্রায় পাঁচ কোটি লোককে রেশনের আওতায় এনে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ কার্যক্রম চালু, এক কোটি পরিবারকে ত্রাণ বিতরণ, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিবার প্রতি ২৫০০ টাকা করে ৫০ লক্ষ পরিবারকে নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। নন-এমপিও ভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী, গ্রাম পুলিশ, সমাজের পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ, ছিন্নমূল ভাসমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়। যাতে একটি মানুষকেও না খেয়ে থাকতে না হয়, সেটাও নিশ্চিতকরণ করা হয়েছে। এবং পরবর্তীতে খাদ্য সংকট মোকাবেলার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাজেটে সর্বাধিক ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

করোনা মোকাবেলায় ফ্রন্টলাইন যোদ্ধাদের জন্য পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকার স্বাস্থ্যবীমা এবং পাঁচ গুণ জীবনবীমা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। স্বাস্থ্য বিষয়ক হটলাইন (১৬২৬৩,৩৩৩,১০৬৫৫) চালু করা হয়।

করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পর্যায়ে সব শ্রেণি পেশার মানুষদেরকে নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক কমিটি গঠন করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্দেশনা প্রদান করেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই জীবন ও জীবিকার উপর সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। একদিকে সংক্রমণ রোধ, আক্রান্ত মানুষের জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। অর্থনীতিকে রেখেছেন গতিশীল।

করোনা ভ্যাকসিন দ্রুত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। জানুয়ারির শেষ দিকে কিংবা ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকেই করোনার ভ্যাকসিন বাংলাদেশে চলে আসবে।

সংকটের সময়ই হয় নেতৃত্বের পরীক্ষা। করোনা সংকট মোকাবেলা করে দেশরত্ন শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন তিনি শুধু বাংলাদেশেরই নেতা নন, আন্তর্জাতিক বিশ্বের একজন প্রভাবশালী মানবিক নেতা। করোনা সংকট সুষ্ঠুভাবে মোকাবিলা করে বারংবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা। পেয়েছেন বিশ্বনেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

শেয়ার করুন

মন্তব্য