২০২১-এ শিল্প ও কৃষি

জাপানের একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, সেখানে শতকরা ৭২ ভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠান মনে করছে, তারা ২০২১-এ মহামারি থাকা সত্ত্বেও একটি মোটামুটি সন্তোষজনক উৎপাদনে ফিরতে পারবে। ২৯ ভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বলছে, তাদের যে অবস্থা হয়েছে এই করোনাতে, তাতে তারা কবে তাদের উৎপাদনে ফিরে আসতে পারবে, তা বুঝতে পারছে না। অন্যদিকে ১৩ ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান মনে করছে, ২০২৩-এর আগে তারা তাদের উৎপাদনকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবে না।

জাপানের এই সমীক্ষাটি ছিল তাদের তৃতীয় ওয়েভে ভয়াবহ আকারে কোভিড আসার কয়েকদিন আগে। তারপর এক সপ্তাহের ভেতর জাপানে কোভিড-১৯ এর তৃতীয় ওয়েভ ভয়াবহ আকারে এসেছে। সেখানে কারফিউ ও লকডাউন দুটোই দিতে হয়েছে। এবং তাদের এ ওয়েভ কখন কাটবে, তা এখনোই বলা যাচ্ছে না।

পাশাপাশি গত সপ্তাহে ইউরোপে কোভিড-১৯ ভয়াবহ আকারে বেড়েছে। সেটা এতই ভয়াবহ যে, তাদের মতো বাকস্বাধীনতার দেশও কিছু কিছু বিষয় চেপে যেতে বাধ্য হচ্ছে। কোভিড-১৯ ফিরে এসেছে চীনে। এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তৃতীয় অর্থনীতির দেশ থাইল্যান্ডেও। সেখানেও লকডাউন দিতে হচ্ছে। আর আমেরিকাতে তাদের প্রতিদিনেই মৃত্যুর সর্বোচ্চ রেকর্ড ভাঙ্গছে। অন্যদিকে কোভিড বাড়ছে রাশিয়াতে। তাছাড়া কমেনি ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও খুব ভালো অবস্থানে এখনও ফিরতে পারেনি।

বর্তমানের পৃথিবীতে শিল্পপণ্য ও শিল্প উৎপাদন মূলত বিশ্বায়িত। এ অবস্থায় বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি দেশ তুলনামূলক ভালো থেকে শিল্পকে সচল রাখা মোটেই সম্ভব নয়। যেমন জাপানের শিল্প পণ্যের উৎপাদন নির্ভর করে চীন থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবগুলো দেশের বাজারের ওপর। আবার আমেরিকা, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের ওপর। তাই একদিকে তার বাজার বন্ধ, অন্যদিকে নিজ দেশে উৎপাদনের পরিবেশ নেই। এ অবস্থায় জাপানে ২০২১-এ যে ৭২ ভাগ শিল্প মোটামুটি একটি মডারেট অবস্থায় উৎপাদন নিয়ে যাবে, তাতেও বেশ খানিকটা ধাক্কা খেয়ে গেল। তারপরেও এই সমীক্ষা থেকে জাপান খুব বেশি পিছিয়ে যাবে না বলে ধারণা করা যায়। কারণ, তাদের প্রতিটি শিল্প মালিকই মতামত দিয়েছেন ভ্যাকসিনকে মাথায় নিয়ে। সকলেই ধরে নিচ্ছেন, আগামী মে -জুনের মধ্যে জাপানের প্রয়োজনীয় মানুষ ভ্যাকসিন পেয়ে যাবে। আর তারপরে যে ছয় মাস থাকবে, ওই ছয় মাস উৎপাদন করলে এবং এর আগের ছয় মাসে যতটুকু সম্ভব উৎপাদন করতে পারলে সব মিলিয়ে ৭২ ভাগ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের মূল রপ্তানি পণ্য পোশাকের বড় বাজার ইউরোপ ও আমেরিকা। ২০২০ এর বড় উৎসব ক্রিসমাস ও ২০২১-এর নিউ ইয়ারের উৎসব উদপযাপিত হয়নি। এ দুটোকে ঘিরে একটা বিপুল পরিমাণ পোশাকের চাহিদা থাকে সেখানে। এ বছর তাদের সে চাহিদা ছিল না। নভেম্বর থেকেই তারা বুঝতে পেরেছিল, তাদের পোশাকের বাজার খুব ভালোভাবে খোলা সম্ভব নয়। তাই এ অবস্থায় বাংলাদেশও পারেনি অন্য বছরের মতো পোশাক রপ্তানি করতে।

ইউরোপ ও আমেরিকার এই মৌসুম ঘিরে বাংলাদেশে যে চাহিদা হয়, এই চাহিদা পূরনের জন্যে বাংলাদেশে অনেক মৌসুমি ছোট ছোট পোশাক কারখানা জন্ম নেয়। এরা সারা বছর কাজ করে না। মৌসুমি কাজ করে। কিন্তু এবার তারা সে কাজ করতে পারেনি। তাই সে কারখানাগুলো কতভাগ, তার একটা হিসাব দরকার। পাশাপাশি বছর জুড়ে পুঁজি নষ্ট হয়ে গিয়ে তারা কী অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, তার একটা পরিসংখ্যান এখন জরুরি। বাস্তবে পোশাক খাতে এখন একটা পরিপূর্ণ সীমক্ষা দরকার। কারণ, যারা টিকে আছে, তাদের বাস্তবতা জানা দরকার। জানা দরকার ২০২১-এ তারা কতটা ফিরে দাঁড়াতে পারবে, তাদের শতকরা কতভাগ একটা মডারেট উৎপাদনে যেতে পারবে ২০২১ এর মধ্যে, এই উৎপাদনে যাবার জন্যে তাদের কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, আর কতভাগ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। পাশাপাশি ২০২১ না হোক, ২০২২ বা ২০২৩-এর মধ্যে একটা মডারেট উৎপাদনে আসতে পারবে কতভাগ পোশাক শিল্প, পোশাক শিল্পের পাশাপাশি জুতা, খেলনাসহ বেশি কিছু পণ্যও ভালো রপ্তানি হয় ইউরোপ ও আমেরিকায়, তাদের অবস্থা কি তারও একটি সমীক্ষা প্রয়োজন।

রপ্তানি পণ্যের বাইরেও দেশের বাজারের চাহিদা মেটায় এমন পণ্য উৎপাদন করে অনেক শিল্প। এর ভেতর দেশের বাজারের জন্যে প্রয়োজনীয় পোশাক শিল্প থেকে জুতা শিল্পও রয়েছে। আবার রয়েছে নির্মাণ শিল্প থেকে খাদ্যপণ্য। দেশের বাজার এই কোভিডে কমে গেছে। ২০২১-এ সেটা কতটা বাড়বে, সে বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে ওই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে একটি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ, তাদের জন্যে সব থেকে বড় হলো তাদের উৎপাদন ও পুঁজি যেমন কমে গেছে, তেমনি দেশের বাজারও কমে গেছে। তাই ২০২১-এ তারা কতটা তাদের পুঁজি ফেরাতে পারবে ও দেশের বাজার কতটা ঘুরে দাঁড়াবে, এর জন্যে অন্তত একটা নিখুঁত সমীক্ষা দরকার, যাতে করে দেশের বাজার ও দেশের বাজারনির্ভর শিল্প কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তার একটি বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়।

শিল্পখাতের পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যে আছে কৃষিখাত। কৃষিখাত থেকে সব থেকে বেশি রপ্তানি হয় চিংড়ি, কাকড়া এবং কিছু সামুদ্রিক মাছ। গোটা পৃথিবী জুড়ে এখন হোটেল রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ভয়াবহ মন্দা চলছে। ২০২১-এর জুন-জুলাই হয়তো লেগে যাবে মোটামুটি একটি বড় সংখ্যক মানুষের কাছে ভ্যাকসিন পৌঁছাতে। এই ভ্যাকসিন পাবার পরে পৃথিবীতে মানুষ চলাচল বাড়বে। কিন্তু সেখানেও রয়েছে অনেক বড় বাধা। কারণ গত দুই দশকে পৃথিবীতে মানুষের চলাচল যে বড় আকারে বেড়েছিল তার মূলে ছিল বাজেট এয়ার। এই মহামারিতে বাজেট এয়ার কোম্পানিগুলো প্রায় সবাই বসে গেছে। শুধু তাই নয়, থাই এয়ারের মতো এয়ারলাইন্সও দেউলিয়া হয়ে গেছে। এ অবস্থায় বাজেট এয়ারগুলো ২০২১-এ কতটা ফিরতে পারবে, সেটা একটি বড় প্রশ্ন। তাই ২০২১-এ সারা পৃথিবীর হোটেল ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসা যে শতভাগ চালু হবে, এমনটি আশা করা যায় না। যদিও ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে তাদের দেশের মানুষের চাহিদার জন্যে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা অনেক বড় আকারে চলে। তারপরেও সেখানে যে চিংড়িসহ অন্যান্য মাছের চাহিদা শতভাগ আসবে সেটা আশা করা যায় না। তাই ২০২১-এ কৃষির এ খাত কতটা ফিরবে, তারও একটা সমীক্ষা দরকার।

আর এই সমীক্ষা দরকার মূলত কোভিডউত্তর শিল্প ও কৃষিকে সঠিক পথে এগিয়ে নেবার জন্যে। কারণ, আর যাই হোক কোভিডপূর্ব শিল্প ও কৃষি যে অবস্থায় ছিল, কোভিডউত্তর শিল্প ও কৃষি সে অবস্থায় রেখে এগিয়ে নেওয়ার চিন্তা করা ভুল হবে। কারণ, এ সত্য সকলকে স্বীকার করতে হবে, কোভিডউত্তর পৃথিবী সম্পূর্ণ ভিন্ন পৃথিবী হবে, যার সঙ্গে কোভিডপূর্ব পৃথিবীর কোনো মিল থাকবে না। কোভিডউত্তর পৃথিবীতে শিল্প ও কৃষিকে অনেক বেশি বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্তিনির্ভর ম্যানেজমেন্ট দিয়ে চলতে হবে। এবং এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, কোভিডই এই শতাব্দীর প্রথম ও শেষ সমস্যা নয়। আরো অনেক সমস্যা একের পর এক আসছে। বিশেষ করে গত দুই শতক ধরে পরিবেশের ওপর নির্যাতন করে পরিবেশকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তার একটি আঘাত পৃথিবীকে সহ্য করতেই হবে। তাই কোভিডউত্তর পৃথিবীতে শিল্প ও কৃষিকে অনেক বেশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর ম্যানেজমেন্টে আসতে হবে।

সেখানে দুটো বিষয় শতভাগ মাথায় রাখতে হবে: এক. কোভিডউত্তর পৃথিবী মোটেই কোনো ক্ষেত্রে পরিমাণের ওপর গুরুত্ব দেবে না, দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেবে। দুই. কোভিডউত্তর পৃথিবীকে শতভাগ ডিজিটাল হতে হবে। এ কারণে কোভিডউত্তর বাংলাদেশের শিল্প ও কৃষিকে যত দ্রুত সম্ভব দক্ষ ও ডিজিটাল করতে হবে। এটা বছরের শুরু থেকে শুরু হলে ২০২১-এ হয়তো ৭২ ভাগ না হোক, ৬০ ভাগ মডারেট ফল পাওয়া যাবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য