20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
অপশক্তিকে গুড়িয়ে দেয়ার এখনই সময়

ভবিষ্যতের কোনো একদিন মোস্তাক-জিয়াদের কোনো উত্তরসুরি যখন বড় গলায় ইতিহাসের এই অঘটনগুলোর সঙ্গে তাদের পূর্ব-পুরুষদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করবে, তখন এর প্রতিবাদ করার বড়-ছোট কোনো গলাই আমাদের আর থাকবে না।

বাংলাদেশে যেমন বারো মাসে তের পার্বন, তেমনি কোনো-কোনো মাসে আছে চৌদ্দ রকমের অঘটনের ইতিহাস। নভেম্বর এর অন্যতম।

পঁচাত্তরে নভেম্বরের ৩ তারিখে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যেই হত্যা করা হয়েছিল জাতীয় চার নেতাকে, যার দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ পৃথিবীতে সম্ভবত নেই। আর এর চার দিন পরই ৭ নভেম্বর সংঘটিত হয়েছিল তথাকথিত সিপাহী জনতার বিপ্লব। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম কালো অধ্যায় নভেম্বরের এই দিন দুটি। একইসঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসের সব চাইতে ঘোলাটে দিনও এই দুটি।

আমরা শুধু উপরে-উপরে জানি কী ঘটেছিল নভেম্বরের ৩ ও ৭ তারিখে। জানি না কী ঘটেছিল নেপথ্যে। জানি না কারা ছিল নেপথ্যের কুশীলব। ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক পেরিয়ে খুনিরা কীভাবে, কার নির্দেশে চার নেতার সেল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল- খোলাসা হয়নি সেই ইতিহাস।

জানা হয়নি ১৫ আগস্ট আর ৩ নভেম্বরের খুনিদের বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার পরেও কেন খন্দকার মোস্তাক বা জেনারেল জিয়ার কাছে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জারি করা এবং একে আইনে পরিণত করা এত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেনই বা জেনারেল খালেদ মোশারফ সময় পেয়েও জেলে বন্দি জাতীয় নেতাদের মুক্ত করার উদ্যোগ নেননি।

কিসের ভরসায় প্রবল পরাক্রমশালী জাসদ সেদিন তাদের সাফল্যের মোয়াগুলো তুলে দিয়েছিল জেনারেল জিয়ার ঝুলিতে, আর কেনই বা কমিউনিস্ট পার্টির কমরেডরা জেনারেল সাহেবের খাল কাটায় কোদাল ধরেছিলেন। এমনি হাজারও অজানা প্রশ্ন জমে আছে নভেম্বরের ৩ আর ৭ তারিখকে ঘিরে।

এই প্রেক্ষাপটে সঙ্গত কারণেই দাবি উঠেছে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের মাধ্যমে ১৫ আগস্টের নেপথ্যের কুশীলবদের শনাক্ত করার। অতি সম্প্রতি মাননীয় আইনমন্ত্রী জাতীয় সংসদকে অবহিত করেছেন শিগগিই এই স্বাধীন কমিশনটি গঠিত হতে যাচ্ছে। আর কান টানলে যেমন মাথা আসে, ১৫ আগস্টের নেপথ্য উদঘাটনে গঠিত এই কমিশনের তদন্তে ৩ আর ৭ নভেম্বরের অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তরও যে উঠে আসবে তা বলাই বাহুল্য। তারপরেও অনুরোধ থাকবে এই বহুল প্রত্যাশিত কমিশনটির কার্যপরিধিতে ১৫ আগস্টের পাশাপাশি ৩ আর ৭ নভেম্বরও যেন অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তা না হলে আগামী প্রজন্মের কাছে ঐতিহাসিক সত্যটা তুলে ধরা আর ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় নিয়ে যাওয়ায় আমাদের যে দায়বদ্ধতা, তা অপূর্ণই রয়ে যাবে। আর এর জন্য ইতিহাস কখনই আমাদের ক্ষমা করবে না।

ভবিষ্যতের কোনো একদিন মোস্তাক-জিয়াদের কোনো উত্তরসুরি যখন বড় গলায় ইতিহাসের এই অঘটনগুলোর সঙ্গে তাদের পূর্ব-পুরুষদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করবে, তখন এর প্রতিবাদ করার বড়-ছোট কোনো গলাই আমাদের আর থাকবে না।

এই প্রেক্ষাপটেই এবারের ৭ নভেম্বরে দেশের দুটো বড় রাজনৈতিক দলের দুজন বড় নেতার বক্তব্য বিশেষ প্রণিধানযোগ্য।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব ওবায়দুল কাদের সরাসরি বলেছেন ৭ নভেম্বরের বড় বেনিফিসিয়ারি ছিলেন জেনারেল জিয়া। তবে তার চেয়েও বড় সত্যটি বেড়িয়ে এসেছে দেশের অপর বড় রাজনৈতিক দলের মহাসচিবের।

তার ভাষায়, ৭ নভেম্বরে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীন হয়েছিল। তার এই বক্তব্যটি যে স্বাধীন তদন্ত কমিশনটি গঠিত হতে যাচ্ছে, তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করবে।

এটি আজ দিবালোকের মত সত্য যে, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল অনেকের কাছে পরাধীনতার শামিল। এরা স্বাধীন হয়েছিল ৪৭-এ আগস্টের ১৪ তারিখ, যেদিন ব্রিটিশদের বদান্যতায় ভারত ভেঙে জন্ম নিয়েছিল পাকিস্তান নামের একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র।

একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর যে স্বপ্নযাত্রা, এরা তার প্রতিপক্ষ ছিল প্রতি পদক্ষেপে। একাত্তরে এদের আশায় গুড়ে বালি দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন জাতির পিতা। ওই পরাজয় এই অপশক্তি মেনে নিতে পারেনি। পচাত্তরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তারা তাদের প্রতিশোধ নিয়েছিল মাত্র, কিন্তু সেদিন তাদের বিজয় আসেনি। তাদের বিজয়ের দিন পচাত্তরের ৭ নভেম্বর, যেদিন তাদের আদর্শিক নেতা সরাসরি ক্ষমতার মসনদে বসেছিল। মহাসচিব মহোদয়ের বক্তব্যে এই সত্যটাই স্পষ্ট!

এখন এই অপশক্তির চরম দুঃসময়। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতাসীন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সরকার। নিভু-নিভু প্রদীপের হঠাৎ জ্বলে ওঠার মতোই কখনও বাসে আগুন দেয়া আর কখনও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য উপড়ে ফেলার হুমকিতে সেটাই প্রতিভাত। এই শক্তিকে পাকাপাকিভাবে গুড়িয়ে দেয়ার সময়টাও তাই এখনই। আরও একটি নভেম্বর যখন শেষের দিকে আর ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টিয়ে আমরা যখন ডিসেম্বরে বিজয়ের আরও একটি উৎসবের মেতে উঠতে যাচ্ছি, তার আগেই তড়িঘড়ি তাই এই লেখাটি লিখে ফেললাম।

লেখক: চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন

মন্তব্য