20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের হাল ফেরাতে হবে

ক্রমবর্ধমান বেসরকারি খাতের বিকাশ, নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারির বিষয়টিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এটিকে দশকের পর দশক উপেক্ষা করে এসেছে। ফলে দিনে দিনে অনিয়মের পাহাড় তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে একটি অসন্তোষ বিদ্যমান আছে। এটি স্বাধীনতার পর থেকে চলে আসছে। সবাই জানত দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অদক্ষতা এবং অব্যবস্থায় পরিপূর্ণ। এই খাতটি দুর্নীতি ও লুটপাটের একটি উর্বর ক্ষেত্র। কিন্তু এখানে ঠিক কী ধরণের পুকুরচুরি, নদীচুরি বা সাগরচুরি হচ্ছে সে ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ওয়াকিবহাল ছিল না। মোটকথা স্বাস্থ্য বিভাগকে ঘিরে একটি পর্দা আটকানো ছিল। করোনা মহামারীর মহাঝড়ে এই পর্দাটি উড়ে গেছে। ফলে বেরিয়ে পড়েছে ভিতরের দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার অতি রুগ্ন চিত্র।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুটো অংশ। একটি অংশ হলো সরকারি খাত এবং অন্যটি বেসরকারি খাত। দেশবাসীকে কীভাবে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হবে সেটা মূলত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। দেশের মানুষ এবং তাদের দ্বারা নির্বাচিত সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। স্বাস্থ্যসেবার প্রধান অংশ হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের জনসাধারণকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা শুরু হয়। যদিও ১৯৭২ সালে ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে সমাজভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে বেসরকারি উদ্যোগে একটি নতুন ধারার জন্ম হয়। ১৯৮২-এর ‘দি মেডিক্যাল প্রাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেজিস্ট্রেশন) অর্ডিন্যান্স-১৯৮২’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে বেসরকারি স্বাস্থসেবা খাতের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। স্মর্তব্য তখন দেশে সামরিক শাসন চলছে। বর্তমানে দেশে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিপুল বিস্তার ঘটেছে। মোটাদাগে বলা যায় দেশের এক-তৃতীয়াংশ স্বাস্থ্যসেবা সরকার দ্বারা পরিচালিত হয়। বাকি কমবেশি দুই-তৃতীয়াংশ সেবা বেসরকারিভাবে প্রদান করা হয়। করোনাকালের জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপারে সাধারণ মানুষ অসন্তুষ্ট এবং হতাশ। একইভাবে বেসরকারি সেবার বিষয়ে অসন্তুষ্ট, হতাশ এবং বিক্ষুব্ধ। মানুষের অভিযোগের ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে- ১. প্রতিষ্ঠানের আইনী বৈধতা ২. সেবার মান ২. সেবামূল্য এবং ৩. সেবাব্যবস্থাপনা। সঙ্গতভাবেই বিষয়গুলো বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

দেশে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ হাসপাতাল, ক্লিনিক, নার্সিং হোম, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ইত্যাদির মোট সংখ্যা কত? এ প্রশ্নটির উত্তর দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের জানা নেই। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ব্যতিরেকে এ ধরণের কোনো প্রতিষ্ঠান দেশে স্থাপন করা যায় না। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের বৈধ ও অবৈধ সকল প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায় দেশে পনের হাজারের বেশি প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ইত্যাদি রয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো এর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি প্রতিষ্ঠানের সরকারি অনুমোদন বা লাইসেন্স নেই। অনেকগুলোর লাইসেন্স বছরের পর বছর নবায়ন করা হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান আবেদন করার পর সেটা দিনের পর দিন ঝুলে আছে। অনেক প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের জন্য আবেদন পর্যন্ত করেনি।

এসব প্রতিষ্ঠানের আইনি বৈধতার বিষয়টিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কখনও গুরুত্ব দেয়নি। এরকম অবৈধ প্রতিষ্ঠানের সাথে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দ্বিপাক্ষিক চুক্তি পর্যন্ত করেছে। সেখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বয়ং উপস্থিত থেকেছেন। প্রয়োজনীয় আইন থাকা সত্ত্বেও অধিদপ্তর কেন বেআইনিভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ? এর একটিই কারণ। সেটা হলো এই নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির কাজটি করার জন্য যে জনবলের দরকার তা অধিদপ্তরের নেই। মূলকথা হচ্ছে ক্রমবর্ধমান বেসরকারি খাতের বিকাশ, নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারির বিষয়টিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বের সাথে ভাবা হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এটিকে দশকের পর দশক উপেক্ষা করে এসেছে। ফলে দিনে দিনে অনিয়মের পাহাড় তৈরি হয়েছে। যেহেতু নজরদারি অনুপস্থিত তাই মান নিয়ন্ত্রণের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজের মতো করে পরিচালিত হয়। এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থার ভিতর দিয়ে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের বিকাশ ঘটছে। তাই এখানে কোনো ধরনের পেশাদারিত্ব গড়ে ওঠেনি। স্বাস্থ্যসেবায় স্বাধীন ও স্বতন্ত্র কোনো মাননিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। তাই সরকারি ও বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানেই সেবামানের নিয়ন্ত্রণ নেই। ব্যবস্থাপনা বলে যে একটা বিষয় আছে সেটা দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের কেউ মাথায় রাখে না। এক্ষেত্রেও কোনো ধরনের পেশাদারিত্বের বিকাশ ঘটেনি। তাই দেখা যায় প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সেবা নিয়ে অধিকাংশ সেবাগ্রহীতার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।

সকল বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো একই ধরণের নয়। প্রতিষ্ঠানের ধরণ নির্ভর করে মূলধনের যোগানের ওপর। কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো ট্রাস্ট/ ফাউন্ডেশন/সমিতি/সোসাইটি দ্বারা পরিচালিত হয়। দান বা অনুদান হিসাবে এখানে অর্থের যোগান আসে। এ অর্থ কোনোমতেই লাভজনক বিনিয়োগ নয়। অলাভজনকভাবে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়ার কথা। বেসরকারি সাহায্য সংস্থা বা এনজিও দ্বারা বেশ কিছু সেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। দেশের হতদরিদ্র বা অভাবগ্রস্ত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য নিবন্ধিত এনজিও ভিন্ন দাতাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। সে অর্থ দিয়ে হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়। এগুলো অলাভজনকভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু এদের অনেকেই সরকার ও দাতাদের দেওয়া শর্ত ভেঙে মুনাফামুখী হয়ে যায়।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আরেকটা ধরণ হলো ব্যক্তি বা কোম্পানির মালিকানায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এরা রাষ্ট্রের নিয়মকানুন মেনে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবে এবং এর বিনিময়ে যৌক্তিক লাভ অর্জন করবে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সেবাকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র মুনাফার জন্য কাজ করে থাকে। এদের ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্বের প্রকট অভাব। সেবামূল্য নির্ধারণে মুনাফার লাগামহীন প্রবণতা লক্ষণীয়। বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সেবামূল্য নির্ধারণ করা দরকার এখন গুরুত্বপূর্ণ জনদাবি। যেমন ট্রাস্ট দ্বারা পরিচালিত কুমুদিনী হাসপাতাল, এনজিও পরিচালিত গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল এবং ব্যক্তিখাতের হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের সেবামূল্য এক হতে পারে না। কুমুদিনী হাসপাতালের খরচ জোগানোর জন্য দানবীর আর পি সাহা বিশাল সম্পদ দান করে গিয়েছেন। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র বিভিন্ন দাতাদের নিকট হতে অনুদান গ্রহণ করে হাসপাতাল নির্মাণ করেছে। এ দুটো প্রতিষ্ঠান জনকল্যাণের ঘোষণা দিয়ে সেই মোতাবেক নিবন্ধিত হয়েছে। অন্যদিকে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসাবে ব্যবসা করতে হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতাল জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে নিবন্ধিত। এই তিনটি ক্ষেত্রেই সেবামূল্যের ভিন্নতা থাকতে হবে। জনকল্যাণে নিবেদিত অর্থ থেকে লাভ করা যায় না। আবার যারা ব্যবসা করবে তারাও সেবাগ্রহীতার গলা কাটতে পারে না। তাদের লাভের সীমা যৌক্তিকতার মধ্যে থাকতে হবে। এই তিন ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য সেবামূল্যের উচ্চতম সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে। এই কাজগুলো করার দায়িত্ব মূলত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অথবা অধিদপ্তরের।

বেসরকারি খাতের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের অনুমোদন, সেবা ও ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন এবং সেবামূল্য নির্ধারণে স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি। কিন্তু এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনবল অত্যন্ত কম। হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। এর শাখা প্রশাখা আগের চেয়ে অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এই খাতটির বিকাশ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য বিপুল জনবলের প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সরকারিভাবে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য। বর্তমান বাস্তবতায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার কলেবর সরকারি সেবার প্রায় দ্বিগুণ। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় বিদ্যমান স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দ্বারা বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ও বিকাশ সম্ভব নয়। এ জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সরকারি ও বেসরকারি সেবা বিভাগে বিভক্ত করা প্রয়োজন। একজন মহাপরিচালকের অধীনে দুইজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক দুই বিভাগের দায়িত্বে থাকবেন। প্রতিটি বিভাগে প্রয়োজনীয় জনবলের যোগান থাকবে। স্বাস্থ্যসেবাকে কখনও শুধুমাত্র মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হতে দেওয়া যায় না। এ জন্য মানসম্মত সেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে নিরন্তর নজরদারি প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়োজনে বেহাল বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের হাল ফেরানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

ডা. লেলিন চৌধুরী: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
ই-মেইল: [email protected]

শেয়ার করুন

মন্তব্য