ক্ষুধা সূচকেও বাংলাদেশের কাছে ভারতের হার

ক্ষুধা সূচকেও বাংলাদেশের কাছে ভারতের হার

বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের এই পরিসংখ্যান ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য রীতিমতো উদ্বেগের।

খুবই ‘গুরুতর’ পরিস্থিতি ভারতের জন্য। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারত বিশ্বের ১০৭টি দেশের মধ্যে ৯৪ নম্বরের দেশ। প্রতিবেশি দেশগুলির প্রায় সবাই তালিকায় ভারতের আগে রয়েছে। ভারতের তুলনায় তাদের অবস্থা ভালো। বাংলাদেশ রয়েছে ৭৫ নম্বরে। মিয়ানমার রয়েছে ৭৮ নম্বরে এবং পাকিস্তান রয়েছে ৮৮ নম্বরে। অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নেপাল আছে ৭৩ নম্বরে। শ্রীলংকা আছে ৬৪ নম্বরে।

১০৭টি দেশের মধ্যে ভারতের পেছনে রয়েছে আফগানিস্তান, রুয়ান্ডা, নাইজেরিয়া, লাইবেরিয়া, মোজাম্বিক, চাদের মতো অনুন্নত দেশগুলি। এই ইনডেক্স প্রকাশের পরেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।

টুইটে রাহুল লিখেছেন, ‘ভারতের গরিব মানুষেরা ক্ষুধার্ত। কারণ, সরকার শুধু নিজের কিছু ‘মিত্র’র পকেট ভরতেই ব্যস্ত!’ রাহুল প্রায়ই অভিযোগ করেন, দেশের ১৫–২০ জন শিল্পপতিকে কোটি কোটি টাকার কর মওকুফ করে তাদের পকেট ভরাতেই ব্যস্ত মোদি।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং সমাজকর্মী জঁ দ্রেজ নিউজ বাংলা টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, ‘সদ্য প্ৰকাশিত বিশ্ব ক্ষুধা সূচক আরও একবার মনে করিয়ে দিল, বিশ্বের সবচাইতে অপুষ্টির দেশটি হচ্ছে ভারত। পরিতাপের বিষয় এই যে, ২০১৩ সালের জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন প্রবর্তিত হওয়ার পরও অপুষ্টিজনিত সমস্যা মোকাবিলায় এদেশে কোনো বড়সর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অথচ ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বিপুল অর্থের যোগান ধরে, রাজনৈতিক মদতে কিনা শিশু পুষ্টি নিয়ে প্রকল্প শুরু করা হয়েছিল। ন্যূনতম খাদ্যের যোগান ছাড়া পুষ্টি নিয়ে ভাবার কি অবকাশ আছে?’

বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১০৭টি দেশকে পাঁচটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। অপুষ্টি, শিশুমৃত্যু, পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুর উচ্চতার তুলনায় কম ওজন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার মতো কয়েকটি দিক-নির্দেশক বিষয়ের ওপর পয়েন্টের ভিত্তিতে ওই স্তরগুলি ভাগ করা হয়েছে। যেমন, যে দেশগুলির পয়েন্ট ৯ দশমিক ৯-এর নিচে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে অভুক্তের সংখ্যা ‘সবচেয়ে কম’ হিসাবে। এই স্তরে আছে চীন, বেলারুশ, ইউক্রেন, তুরস্ক, কিউবা, কুয়েত, বসনিয়া, ব্রাজিলসহ ৪৭টি দেশ।

দ্বিতীয় স্তরে আছে সেইসব দেশ, যাদের পয়েন্ট ১০ থেকে ১৯ দশমিক ৯-এর মধ্যে। এই স্তরকে বলা হচ্ছে ‘মাঝারি’। নেপাল, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ এই স্তরে আছে ২৬টি দেশ।

তৃতীয় স্তর হলো ২০ থেকে ৩৪ দশমিক ৯-এর মধ্যে পয়েন্ট পাওয়া দেশগুলিকে নিয়ে। এই স্তরকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘গুরুতর’ হিসাবে। এই স্তরে আছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিয়ানমার, ভারত, আফগানিস্তান, কঙ্গো, নাইজেরিয়াসহ ৩১টি দেশ। চতুর্থ স্তরে আছে সেইসব দেশ, যাদের পয়েন্ট ৩৫ থেকে ৪৯ দশমিক ৯-এর মধ্যে। ‘উদ্বেগজনক’ হিসাবে চিহ্নিত এই স্তরে আছে ৩টি দেশ-মাদাগাস্কার, টিমোর এবং চাদ।

‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ চিহ্নিত পঞ্চম স্তরটি হচ্ছে ৫০-এর ওপর পয়েন্ট পাওয়া দেশগুলির জন্য। ২০২০-এর রিপোর্ট অনুযায়ী এই স্তরে এবার কেউ নেই।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের ১৪ শতাংশ মানুষ অপুষ্টির শিকার। অপুষ্টিতে ভুগছে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু। বয়সের অনুপাতে দৈর্ঘ্য এবং ওজন অনেক কম এমন শিশুর সংখ্যা ভারতে বাড়ছে। যার ফলে অপুষ্টিতে মৃত্যুও হচ্ছে অনেক শিশুর। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের এই পরিসংখ্যান ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য রীতিমতো উদ্বেগের।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন ও নিয়মিত নজরদারির অভাবই ভারতের সমস্যার বড় কারণ। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলিতে অবস্থার উন্নতি হলেই সার্বিকভাবে ভারতের স্থান উপরে উঠতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো পূর্ণিমা মেনন একটি ওয়েব পোর্টালে বলেছেন, ‘উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং মধ্যপ্রদেশের মতো কয়েকটি বড় রাজ্যে অপুষ্টির হার কমানো দরকার। তবেই গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ভারত উন্নতি করবে।’ তার কথায়, ‘ভারতে প্রতি পাঁচ শিশুর একজন জন্মগ্রহণ করে উত্তরপ্রদেশে। যে রাজ্যে জনঘনত্ব বেশি, সেখানে যদি বহু মানুষ অভুক্ত থাকেন, তাহলে সামগ্রিকভাবে গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ভারতের অবস্থান নেমে যায়।’

ভারতে গত প্রায় দেড় দশক ধরে ‘খাদ্যের অধিকার’ আন্দোলনের নেত্রী ও সমাজকর্মী কবিতা শ্রীবাস্তবের মতে, বিশ্ব ক্ষুধা সূচক অনুযায়ী ১০৭টি দেশের মধ্যে ৯৪, খুবই খারাপ র‍্যাঙ্ক। এটা পূর্ব সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। পরবর্তী বছরগুলিতে, বিশেষ করে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরে ভারতের ক্ষুধা সূচকের মানদণ্ডগুলি আরও নিম্নগামী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

বর্তমান সময়ে কী হচ্ছে তা বোঝার জন্য নতুন তথ্য প্রয়োজন, যা বর্তমান সরকার কখনোই দেবে না।

কবিতা শ্রীবাস্তব বলেন, ‘প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ আমাদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে সবক্ষেত্রে। মাথাপিছু গড় আয়, অপুষ্টির হার কমিয়ে আনা, জিডিপির হার বৃদ্ধি সবকিছুতেই তারা উন্নতি করছে। তারা একাধিক বিষয়ে মনোনিবেশ করেছে। নারী শিক্ষায় বাংলাদেশ আমাদের চেয়ে অনেক ভালো। এমনকি স্কুল শিক্ষায় কর্মসংস্থানেও বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে।’

আশিস গুপ্ত: সাংবাদিক, নয়াদিল্লি

শেয়ার করুন

দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা

দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা

সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম কোনো নথিপত্রের ছবি তুলেছেন কি না, এটি অনেক বড় বিতর্ক। সরকারের নথি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য ওই নথি পাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। এমনি এমনি ওই নথি সাংবাদিকের কাছে আসে না। নথি না পেলে প্রতিবেদন হয় না, প্রতিবেদন না হলে পাঠক এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল তথ্য পাবে না।

রোজিনা নথি নিয়ে থাকলে জনস্বার্থে তা কতটা গ্রহণযোগ্য এবং আইনের সঙ্গে কতটা সাংঘর্ষিক—এটা নিয়ে তাত্ত্বিক, আইনি ও নৈতিক আলোচনায় সিদ্ধান্তে পৌঁছা কঠিন। তার কাছে এসব নথি পাওয়া গেছে, না তাকে এসব নথি দেখিয়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে- সেই প্রশ্নের সুরাহা হবে আদালতে। সোমবারের নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের পর তার বিরুদ্ধে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা হয়েছে, তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। দোষী প্রমাণিত হলে তার শাস্তি হতে পারে।

আমি কথা বলতে চাই মামলা ও বিচার প্রক্রিয়ার আগের নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে। টানা পাঁচ ঘণ্টা একজন নারী সাংবাদিককে নিয়ে যে টানাহেঁচড়া নিজ চোখে দেখেছি, তা কোনো সভ্য সমাজে হতে পারে না। তাকে একটি কক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছে, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলেছে তার ওপর, সেখান থেকে শাহবাগ থানায় এনে মধ্যরাতে মামলা দায়ের করা হলো। চিকিৎসা না দিয়ে সারা রাত তাকে থানা হাজতে রাখা হয়। থানা থেকে সকাল ৮টা না বাজতেই কোর্ট হাজতে নেয়া হয়, এরপর সেখান থেকে কাশিমপুর কারাগারে। এসব ঘটনাপ্রবাহ দেখে সংশ্লিষ্টদের সুস্থ মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

সচিবালয়ে একজন সাংবাদিককে আটকে রাখার খবর শোনার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সচিবের কক্ষের সামনে করিডরজুড়ে দেখতে পাই সাংবাদিকদের ভিড়। একান্ত সচিবের কক্ষে রোজিনাকে আটকে রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনি দুবার জ্ঞান হারিয়েছেন। সাবেক সহকর্মী হওয়ার সুবাদে জানতাম, রোজিনার শারীরিক নানা সমস্যা রয়েছে। আবার সোমবারই তিনি টিকার দ্বিতীয় ডোজ নিয়ে সচিবালয়ে গেছেন খবরের সন্ধানে।

সচিবালয় থেকে শাহবাগ থানা পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টার নাটকীয় নানা দৃশ্য দেখে নিজের মধ্যে কিছু প্রশ্ন জাগে।

দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা

গলা টিপে ধরার ছবি

রোজিনার গলা টিপে ধরছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী। এই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এটা কি বিশ্বাস করা যায়? তবু বিশ্বাস করতেই হয়। কারণ ছবি তো কথা বলে। একজন সরকারি চাকুরে গলা টিপে ধরার শিক্ষাটা কোথায় পেলেন? এই অপরাধ করে তিনি কি বিচারের ঊর্ধ্বে থাকবেন?

রোজিনা কোনো নথি নিয়ে থাকলে, সেই নথি উদ্ধারে বা যেকোনো কারণে হোক, কেউ তাকে গলা টিপে ধরতে পারেন না, তার শরীর তল্লাশি করার এখতিয়ার থাকলেও সেটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি।

পুলিশ কর্মকর্তার দাপট

ঘটনার সময় একজন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার যেন দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। তিনি রোজিনার ওপর চড়াও তো হয়েছেন, অন্যান্য নারী সাংবাদিকের ওপরও চড়াও হলেন।

রোজিনা কোনো সন্ত্রাসী বা দাগি আসামি নন। তার বিপদে পড়ার খবর শুনে যারা গেছেন তারা বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক। পুলিশের ওই কর্মকর্তার দাপিয়ে বেড়ানোর ছবি বা ভিডিও দেখলে তার পেশাদারত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন উঠবেই। তিনি বাড়তি ফোর্স আনার হুমকি দিয়েছেন, রশি আনার কথা বলেছেন।

প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে এমন একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। ওনার ক্ষমতা ও দাম্ভিকতা দেখে মনে হচ্ছিল—পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষু্ণ্ন করার জন্য এমন গুটিকয়েক কর্মকর্তাই যথেষ্ট।

দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা

সচিব ও একান্ত সচিবের দায়িত্বহীনতা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থানা পুলিশের কাছে যে অভিযোগ দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে—টিকা কেনাকাটা নিয়ে দেশে–বিদেশে নানা তথ্য বা চিঠিপত্র আদান–প্রদান হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে নন–ডিসক্লোজার চুক্তি প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। রোজিনা ইসলাম এমন কিছু নথি নিয়েছেন।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় এমন গুরুত্বপূর্ণ নথি কেউ টেবিলের ওপর রেখে যাবে না, এটাই স্বাভাবিক। এ জীবনে বহু সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে কাজ করেছি। যে ফাইলটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি তারা আগলে রাখেন। টেবিলের সামনেই সাধারণত রাখেন না, লকারে বা ড্রয়ারে রাখেন।

কিন্তু যে সচিব বা তার একান্ত সচিব রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নন-ডিসক্লোজার চুক্তির নথি টেবিলের ওপর রেখে চলে যান, দায়িত্বহীনতার জন্য তাদেরই সাজা প্রাপ্য। কারণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নথি তারা হেফাজত করতে পারেননি। সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে গোপনীয় তথ্য প্রকাশ করা। এজন্য রাষ্ট্র বা সরকারের ক্ষতি হয় না, ক্ষতি হয় ব্যক্তিবিশেষের। যে কর্মকর্তা রাষ্ট্র ও সরকারের কথা ভাবেন, তিনি যেন নিজেকে একমাত্র সচেতন নাগরিক মনে না করেন। অন্য কেউ দেশের কথা ভাবেন না, তার এই চিন্তা অজ্ঞতার পর্যায়ে পড়ে।

দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা

প্রতিকার চাইতে পারেন রোজিনা

পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন নিবারণ আইন আছে, যার মূল কথা হেফাজতে নির্যাতন করা যাবে না। রোজিনার ওপর সচিবালয়ে প্রায় সাত ঘণ্টা যে নির্যাতন হয়েছে, সেখানে সরকারি কর্মকর্তা ছাড়াও পুলিশ কর্মকর্তারা ছিলেন। এসব কর্মকর্তা বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এসেছেন। সেখানে প্রশাসন ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত একজন সচিব যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন অতিরিক্ত সচিব, উপসচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার কয়েকজন কর্মকর্তা।

আবার একজন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার থেকে শুরু করে পুলিশ কনস্টেবল পর্যন্ত ছিলেন। সব মিলিয়ে এক ডজনের বেশি কর্মকর্তা–পুলিশ একজন নারী সাংবাদিকের ওপর চড়াও হলেন। তার গায়ে হাত তোলা হয়েছে, গলা টিপে ধরা হয়েছে। দেহ তল্লাশি করা হয়েছে।

এসব ঘটনা যখন ঘটেছে তখন রোজিনা পুলিশ ও কর্মকর্তাদের হেফাজতে ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে রোজিনা মামলা করতে পারেন।

নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের সংজ্ঞায় বলা আছে, নির্যাতন মানে কষ্ট হয় এমন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং ‘কারও সম্মতিক্রমে অথবা নিজ ক্ষমতাবলে কোনো সরকারি কর্মকর্তা অথবা সরকারি ক্ষমতাবলে-এইরূপ কর্ম সাধনও নির্যাতন হিসেবে গণ্য হইবে।’

একই আইনে বলা হয়েছে, ‘ক্ষতিগ্রস্ত অথবা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অর্থ ঐ ব্যক্তি যাহাকে এই আইনের অধীনে তাহার উপর অথবা তাহার সংশ্লিষ্ট বা উদ্বিগ্ন এমন কারও উপর নির্যাতন করা হইয়াছে।’

তার মানে হচ্ছে, রোজিনার ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, এর আইনি প্রতিকার তিনি পেতে পারেন। রোজিনার আইনজীবীও আদালতপ্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি আইনী প্রতিকার চাইতে পারেন।

দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা

ব্যক্তিবিশেষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ

একজন সাংবাদিক যদি কোনো নথিপত্র নিয়েও থাকেন এবং তা ধরা পড়লে এত পানি ঘোলা করার প্রয়োজন আদৌ ছিল কী? এখানে দুটি বিষয় ঘটতে পারে; একটি হচ্ছে—কর্মকর্তা ও পুলিশের সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছেন। তারা ঘটনায় জড়িয়ে যাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা তাদের কাছে ছিল না।

আবার এও হতে পারে—স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যক্তিবিশেষের রাগ ও ক্ষোভের মুখে পড়েছেন তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী অনেক দিন ধরেই ক্ষুব্ধ ছিলেন রোজিনার ওপর। সাম্প্রতিক তিনি বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন করেছেন, যেখানে মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি, অনিয়ম ও ব্যর্থতার প্রসঙ্গ রয়েছে।

হতাশার মধ্যে ঐক্য

অনেক হতাশার মধ্যেও আজ সাংবাদিকেরা একযোগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং বর্জন করেছেন। যখন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এসে বসলেন, তখনই সব সাংবাদিক একযোগে উঠে গেলেন। সচিবালয় ও স্বাস্থ্য বিটের সাংবাদিকদের অভিনন্দন।

যদিও ভিন্নমত রয়েছে অনুষ্ঠান বর্জনের বিষয়ে। কেউ কেউ বলছেন, সংবাদ সম্মেলন থেকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা উচিত ছিল। সেটি কতটা সম্ভব হতো জানি না। তবে এই প্রতিবাদটুকু অন্তত প্রয়োজন ছিল।

দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা

ওপর মহলকে দেখানোর প্রবণতা

রোজিনাকে আটকে রাখার পর সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের মুখে একটিই কথা, বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ মহল দেখছে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত আসবে। ঘটনার পর রোজিনার সুহৃদ, শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এরপর প্রত্যেকের মধ্যে ধারণা হয়, বিষয়টি তাদের হাতে নেই।

কী অদ্ভুত ব্যাপার! একজন সাংবাদিক সংবাদের তথ্যউপাত্ত জোগাড় করতে গিয়ে বিশেষ পরিস্থিতিতে পড়লেন। একজন জনসংযোগ কর্মকর্তা বা সচিবের একান্ত সচিব পর্যায়ে এই বিষয়টি সুরাহা হতে পারত। সেই সিদ্ধান্ত কেন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসতে হবে?

মনে পড়ে এক–এগারোর সময়ে দলের অনেক নেতাকে তখনকার আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এমন ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, পুলিশ যাকে, যে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করুক না কেন তাকে (দলের প্রধান শেখ হাসিনা) যেন দেখিয়ে দেয়া হয়। অর্থাৎ নির্যাতন–নিপীড়ন ঠেকাতে দলের প্রধান হিসেবে তিনি সব দায় কাঁধে নেয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এখন ছোটখাটো অনেক কাজের ভারও ওনার কাঁধে মন্ত্রী–আমলাদের অনেকেই তুলে দিতে চান। নিজেকে নিরাপদ রাখা, সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষমতা এবং অন্যের ওপর দায় চাপানোর এই প্রবণতা কয়েক বছর ধরে বেশ লক্ষণীয়।

গোপনীয়তার নামে সমালোচনা উন্মুক্ত

একজন সাংবাদিককে নিয়ে নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ দেখল সারা বিশ্ব। এতে সরকারের লাভ না ক্ষতি হয়েছে, কার ভাবমূর্তি কতটুকু বেড়েছে-একটু ভেবে দেখুন।

মানবাধিকার, মুক্তচিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা- এসব বিষয় নিয়ে আগামী দিনগুলোতে সরকারের বিরুদ্ধে যত প্রশ্ন উঠবে, তার বড় দৃষ্টান্ত হবে এই গ্রেপ্তার। সরকার ও পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের গোপনীয়তা রক্ষার নামে সমালোচনার শতসহস্র মুখ উন্মুক্ত করে দিলেন। এর দায় কিন্তু আপনাদের ওপর বর্তায়।

শরিফুজ্জামান পিন্টু: সাংবাদিক

শেয়ার করুন

দখলদার ইসরায়েলের আগ্রাসন ও বাংলাদেশের অবস্থান

দখলদার ইসরায়েলের আগ্রাসন ও বাংলাদেশের অবস্থান

আরব এবং ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমাগত তিক্ততা এবং সীমান্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ১৯৬৭ সালে আবার আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়। পাঁচ দিনের যুদ্ধে মিসর, সিরিয়া এবং জর্ডানের সেনাবাহিনী ইসরায়েলের কাছে পরাস্ত হয়। ইসরায়েল গাজা উপত্যকা, মিসরের সিনাই মরুভূমি, সিরিয়ার গোলান মালভূমি এবং জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। এই প্রথমবারের মতো জেরুজালেম ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।

যে ভূখণ্ডকে ইসরায়েল নামে ডাকা হয়, তা আসলে ইসরায়েলের ভূখণ্ড নয়, এটি ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে। সে হিসেবে আন্তর্জাতিক ভূমিদস্যু ইসরায়েল অবৈধ দখলদার।

১০ হাজার ৪২৯ বর্গমাইল আয়তনের ফিলিস্তিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমানরা পরাজিত হলে ফিলিস্তিন ব্রিটিশদের অধিকারভুক্ত হয়। ১৯২২ সালে জাতিসংঘ তার গঠনতন্ত্রের ২২ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ফিলিস্তিন প্রশাসন পরিচালনার জন্য ব্রিটিশ সরকারকে সাময়িকভাবে কর্তৃত্ব বা ম্যান্ডেট প্রদান করে। উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনের প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবকাঠামো গড়ে ওঠার পর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় সত্তা গঠন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজিত রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে অধিকৃত কিছু ঔপনিবেশিক অঞ্চলের সাময়িক শাসনের দায়িত্বও জাতিসংঘের কোনো কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর অর্পণ করা হয়। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয়ের আগে অন্তর্বর্তীকাল এসব অঞ্চলের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠিত কোনো রাষ্ট্রের অভিভাবকত্বের অধীনে প্রদান করা হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজিত তুরস্ক, জার্মানি, ইতালি ও জাপানের কাছ থেকে অধিকৃত যেসব অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের অভিভাবকত্বের অধীনে প্রদান করা হয়েছিল, একে একে সবাই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণতি লাভ করেছে। কিন্তু ব্যতিক্রম দেখা দেয় ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে।

ফিলিস্তিনের ব্রিটিশ রক্ষক ভক্ষককে পরিণত হয়। ফিলিস্তিনের জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটেন ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রিটিশ সরকার ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলেও ফিলিস্তিনে রাষ্ট্র গঠনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক ইহুদি ছিল না। অল্প কয়েক হাজার ইহুদির বাস ছিল তৎকালীন ফিলিস্তিনে। ব্রিটিশ সরকার ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে তাই নানা প্রান্ত থেকে ইহুদিদের নিয়ে এসে ফিলিস্তিনে জড়ো করতে থাকে। ইহুদিদের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মুসলমানদের ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত করতে ব্রিটিশ সরকার ইহুদি সন্ত্রাসীদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য করে। অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ পেয়ে ইহুদিরা বেশ কয়েকটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন গড়ে তোলে। এদের মধ্যে ভয়ংকর সন্ত্রাসী সংগঠন ছিল হাগানাহ, ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং; যারা হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের বাধ্য করে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে৷ আর এই সুযোগে ফিলিস্তিনিদের জমিজমা ইহুদিরা দখল করে নেয়।

১৯২২ সালে ফিলিস্তিনে ইহুদি ছিল মাত্র ১২ শতাংশ, ১৯৩১ সালে তা হয় ২৩ শতাংশ, আর ১৯৪৭-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ শতাংশে। ইহুদিদের সংখ্যা ও শক্তি বৃদ্ধি পেলে ব্রিটিশ সরকার নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১৯৪৭ সালের ২ এপ্রিল ব্রিটিশ সরকার নবগঠিত জাতিসংঘকে চিঠি দেয় পরবর্তী সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফিলিস্তিন ইস্যুকে এজেন্ডাভুক্ত করে ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য সুপারিশ গ্রহণ করতে। অথচ এ বিষয়ে জাতিসংঘের কিছুই করণীয় ছিল না। ব্রিটিশ সরকারের দায়িত্ব ছিল জাতিসংঘ প্রদত্ত ম্যান্ডেটের শর্ত অনুযায়ী তার কর্তৃত্বের অবসান ঘটিয়ে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ঘোষণা করা। চিঠি পেয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ একই বছরের ১৫ মে ১০৬ নং সিদ্ধান্তে ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ফিলিস্তিন বিষয়ে অনুসন্ধান করে উপযুক্ত সুপারিশমালা প্রণয়ণের জন্য U.N. Special Committee on Palestine (UNSCOP) গঠন করে।

পক্ষপাতদুষ্ট UNSCOP ১৯৪৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে প্রদত্ত তার রিপোর্টে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানে ফিলিস্তিনকে ভাগ করে ইহুদি ও মুসলমানদের জন্য দুটি রাষ্ট্র অথবা এক রাষ্ট্রের অধীনে দুই সম্প্রদায়ের জন্য দুটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। ফিলিস্তিনে মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ আরব আর ৩৩ শতাংশ ছিল ইহুদি। মোট ভূমির ৮৫ শতাংশের মালিক আরবরা আর ৭ শতাংশের মালিক ছিল ইহুদিরা। আরবদের নিয়ন্ত্রণে ৮৫ শতাংশ ভূমি থাকা সত্ত্বেও ৪৫ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ে আরব রাষ্ট্র আর ৭ শতাংশের মালিক ইহুদিদের জন্য ৫৫ শতাংশ নিয়ে ইহুদি রাষ্ট্র গঠন করার সুপারিশ করে UNSCOP।

প্রসঙ্গত, ব্রিটিশ সরকারের পাশাপাশি এই UNSCOP-ই ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে তাদের রাষ্ট্র কেড়ে নেয়া ও ফিলিস্তিন সমস্যা সৃষ্টির প্রধান অভিযুক্ত। UNSCOP রিপোর্টের সুপারিশের সাথে ঐকমত্য পোষণ করে ব্রিটিশ সরকার বিবৃতি দেয়। কিন্তু আরব রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে UNSCOP রিপোর্টের সুপারিশকে প্রত্যাখ্যান করে বলা হয় ফিলিস্তিনের কোনো বিভক্তি কিংবা ইহুদি সংখ্যালঘুদের জন্য কোনো বিশেষ অধিকার সৃষ্টি করা হলে আরবরা সম্ভাব্য সব উপায়ে তা প্রতিহত করবে। আরবরা ঘোষণা করে ম্যান্ডেটের বিধান অনুযায়ী সমগ্র ফিলিস্তিন নিয়ে আরব রাষ্ট্র গঠিত হবে, যেখানে সংখালঘু সব সম্প্রদায়ের মানবাধিকার, স্বাধীনতা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা, নিজ নিজ ধর্মপালনের স্বাধীনতা ও পবিত্র স্থানগুলোয় সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হবে। এমতাবস্থায় সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিন সমস্যার সঙ্গে জড়িত আইনগত বিষয়াবলি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য Ad Hoc Committee on the Palestinian Question গঠন করে। অ্যাডহক কমিটি ১৯৪৭ সালের ১১ নভেম্বর তার প্রতিবেদন সাধারণ পরিষদে জমা দেয়। কমিটি স্পষ্ট করে বলে যে, ফিলিস্তিনে আরব ও ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে UNSCOP রিপোর্টে যে যুক্তি উল্লেখ করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক আইন ও সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা সমর্থনযোগ্য নয়। বরং, League of Nations কর্তৃক ফিলিস্তিনের ওপর ব্রিটেনকে দেয়া ম্যান্ডেট অবসান হলে এবং ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলে ফিলিস্তিনের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপান্তর হতে বাধা নেই। কেবল ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপান্তরই ম্যান্ডেটের উদ্দেশ্যের যৌক্তিক পরিণতি লাভ করবে ও League of Nations-এর সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

অ্যাডহক কমিটি আরও বলে যে, ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান ছাড়া সাধারণ পরিষদের আর কোনো সুপারিশ করার এখতিয়ার নেই। পর্যবেক্ষণে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করা জাতিসংঘ সনদের নীতিমালার পরিপন্থি এবং নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি করার এখতিয়ার জাতিসংঘের নেই। কমিটির পর্যবেক্ষণে জোর দিয়ে বলা হয়, ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ সরকার নির্ধারণ করার ও একটি রাষ্ট্র ভেঙে একাধিক রাষ্ট্র গঠন করার এখতিয়ার কেবল ফিলিস্তিনের জনগণের।

অ্যাডহক কমিটি তার সুপারিশে আরও বলে, ফিলিস্তিন নিয়ে জাতিসংঘে আর আলোচনার প্রয়োজন নেই এবং ফিলিস্তিন ইস্যুকে সাধারণ পরিষদের এজেন্ডা থেকে বাদ দেয়া সমীচীন হবে। এরপরও এ বিষয় নিয়ে কোনো বিরোধ হলে তা আন্তর্জাতিক আদালতের উপদেশমূলক মতামতের জন্য প্রেরণ করা যেতে পারে। প্রসঙ্গত, আরব রাষ্ট্রসমূহও বারবার ফিলিস্তিন ইস্যুকে আন্তর্জাতিক আদালতে প্রেরণের দাবি করে আসছিল।

সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক আদালতে অভিমতের জন্য না পাঠিয়ে ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ১৮১ নং সিদ্ধান্তে UNSCOP-এর সুপারিশ মোতাবেক ফিলিস্তিন ভাগ করে আরব ও ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। নিরাপত্তা পরিষদকে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সাধারণ পরিষদের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়। নিরপত্তা পরিষদের সদস্যরা এ নিয়ে চরম বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। নিরপত্তা পরিষদের সামনে প্রশ্ন দাঁড়ায়, কোনো রাষ্ট্রের জনগণের সম্মতি ছাড়া ওই রাষ্ট্রকে ভাগ করার, বিধিবিধান তৈরি করার, কোনো চুক্তি চাপিয়ে দেয়ার এখতিয়ার সাধারণ পরিষদের আছে কি না? তা ছাড়া সাধারণ পরিষদ নিরাপত্তা পরিষদকে যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য অনুরোধ করেছে, তা জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদের কাজের অন্তর্ভুক্ত কি না? বিতর্ক শেষে ঐকমত্য হয়, জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদ কেবল তখনই সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারে, যখন আগ্রাসন বা অন্য কোনো কারণে বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় বা হুমকির মুখে পড়ে। রাষ্ট্র বিভাজনের পরিকল্পনা যা পক্ষগণ প্রত্যাখ্যান করেছে তা নিজেই শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হওয়ায় নিরাপত্তা পরিষদ কখনোই এমন কাজে যুক্ত হতে পারে না। নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি চীনা প্রতিনিধি মত দেন, নিরাপত্তা পরিষদ সৃষ্টি করা হয়েছে বিশ্ব শান্তি বজায় রাখার জন্য। এটি খুবই দুঃখজনক হবে, রাষ্ট্রভাগের নাম করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে জাতিসংঘ নিজেই যদি যুদ্ধের কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়।

এমন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার ১৫ মে ১৯৪৮ ফিলিস্তিনের ওপর তাদের ম্যান্ডেট অবসানের ঘোষণা দেয়। পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করায় দ্রুত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বানের প্রস্তাব পাস করে নিরাপত্তা পরিষদ। উদ্বেগাকুল এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ১৪ মে ১৯৪৮ ইহুদিরা একতরফাভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। তাদের ঘোষণার ভিত্তি হিসেবে সাধারণ পরিষদের ১৮১ নং সিদ্ধান্তকে উল্লেখ করে যেখানে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কথা রয়েছে। আশপাশের আরব দেশগুলো ইসরায়েলের এ সিদ্ধান্ত মেনে না নিয়ে হামলা চালালে ইসরাইল, ফিলিনিনের পুরোটাই দখল করে নেয় (শুধু গাজা মিসরের দখলে, এবং পশ্চিম তীর জর্ডানের দখলে ছিল)।

আরব এবং ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমাগত তিক্ততা এবং সীমান্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ১৯৬৭ সালে আবার আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়। পাঁচ দিনের যুদ্ধে মিসর, সিরিয়া এবং জর্ডানের সেনাবাহিনী ইসরায়েলের কাছে পরাস্ত হয়। ইসরায়েল গাজা উপত্যকা, মিসরের সিনাই মরুভূমি, সিরিয়ার গোলান মালভূমি এবং জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। এই প্রথমবারের মতো জেরুজালেম ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।

সেখান থেকে বহু ফিলিস্তিনিকে বিতাড়িত করা মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনার যত আলোচনা পাঁচ যুগ ধরে হয়ে এসেছে, সেগুলোতে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে ১৯৬৭ সালের আগের অবস্থানে ইসরায়েলের পিছু হটার কথা বলা হয়েছে।

ইসরায়েল একের পর এক জাতিসংঘের প্রস্তাব উপেক্ষা করে ১৯৬৭ সালে দখল করা ফিলিস্তিনি ও আরব ভূমি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এরপর ১৯৮০ সালে ইসরায়েল আবার পূর্ব জেরুজালেমের দখলী অংশকে ইসরায়েল সম্প্রসারিত অঞ্চল হিসেবে অধিগ্রহণের কথা ঘোষণা করে। ওই বেআইনি অধিগ্রহণকে নিরাপত্তা পরিষদ (৩০ জুন ১৯৮০, প্রস্তাব ৪৭৬) বাতিল বলে ঘোষণা করে। ইসরায়েলই হচ্ছে একমাত্র রাষ্ট্র, যার বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিশ্বশক্তিগুলো নির্বিকার। ইসরায়েল জাতিসংঘের প্রস্তাবিত ৫৬ শতাংশ ভূমির বাইরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রর জন্য প্রস্তাবিত এলাকায় নতুন ইহুদি বসতি নির্মাণ শুরু করে। ইতিমধ্যে সাবেক ফিলিস্তিনের প্রায় ৮০ শতাংশ দখল করে নিয়েছে।

পূর্ব জেরুজালেম, গাজা এবং পশ্চিম তীরে যে ফিলিস্তিনিরা থাকে, সেখানে নতুন করে ইহুদি বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলিদের উত্তেজনা প্রায়শই চরমে ওঠে। সম্প্রতি পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জাররাহ হতে কিছু ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদের হুমকি ফিলিস্তিনিদের আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। পবিত্র রমজানের শুরু থেকে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। তখন প্রায় প্রতিরাতেই ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ চলছিল। এরই পরিণতিতে ইসরায়েল বর্বর আগ্রাসন শুরু করে।

অভ্যুদয়ের পরই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ইসরায়েলকে দখলদার হিসেবে অভিহিত করে স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আরব রাষ্ট্রগুলো পাকিস্তানের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকিস্তানকে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার তখনও ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরবদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে পিছপা হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ইসরায়েলের ভূমিকা ছিল বিস্ময়কর। Jewish Telegraphic Agency (JTA)-এর ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি Daily News Bulletin-এ `Israel Recognizes Bangladesh’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের ভাষ্য অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মাত্র কয়েক সপ্তাহের (একটি সূত্রমতে ৩৩ দিনের) মাথায় ইসরায়েল প্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। সংবাদে প্রকাশ বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করে ইসরায়েল এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বরাবর একটি চিঠি পাঠায়। একাত্তরের ২ জুলাই ইসরায়েলি পার্লামেন্ট বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বেপরোয়া ধ্বংসলীলায় নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়। এমনকি ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের অনুরোধে ইসরায়েলি রেডক্রস বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ওষুধ, কাপড় ও খাবার পাঠায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় লাভের পর প্রথম যেসব রাষ্ট্র বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় ইসরায়েল তাদের অন্যতম। ১৯৭২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে। নবপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি খুবই প্রয়োজন ছিল। তদুপরি দুটি যুদ্ধে আরব বিশ্বকে পরাজিত করে ইসরায়েল বেশ শক্তিশালী রাষ্ট্র। ইসরায়েলের সঙ্গে বিশ্বের অনেক শক্তিশালী রাষ্ট্রের দহরমমহরম। তবু বাংলাদেশে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি জোরালো সমর্থন অব্যাহত রাখতে এবং মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি হোক এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে ইসরায়েলের স্বীকৃতি গ্রহণ করেনি। ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারির অবসান ঘটিয়ে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা অর্জনকে সমর্থন করা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অতিগুরুত্বপূর্ণ নীতি।

১৯৬৭ সালে নির্ধারিত সীমানা অনুযায়ী জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে সমর্থন করে বাংলাদেশ। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ফিলিস্তিনকে সমর্থন করে মেডিক্যাল টিম ও ত্রাণ সহায়তা পাঠিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সহায়তা করে। ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ১৯৭৪ সালে লাহোরে ওআইসির দ্বিতীয় সম্মেলনের সময় ইয়াসির আরাফাত ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তার প্রথম ভাষণে, ১৯৭৪ সালে ওআইসির দ্বিতীয় সম্মেলনে এবং ১৯৭৩ সালে চতুর্থ ন্যাম সম্মেলনে ফিলিস্তিনি জনগণের সংগ্রাম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। ঢাকায় প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)-এর কার্যালয় স্থাপনের অনুমতি প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও পিএলওর মধ্যে সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। বাংলাদেশ সরকার ফিলিস্তিনি ছাত্রদের বাংলাদেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ফিলিস্তিনের সামরিক সদস্যদের বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সামরিক সম্পর্কও তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ যেমন ইসরায়েলের স্বীকৃতি গ্রহণ করেনি তেমনি গত ৫০ বছরে ইসরায়েলকেও বাংলাদেশ স্বীকৃতি দেয়নি। বাংলাদেশের পাসপোর্টে স্পষ্টভাবে উৎকীর্ণ রয়েছে, ‘This Passport is valid for all countries of the world except Israel.’ উপরন্তু, বাংলাদেশি নাগরিকদের ইসরায়েল ভ্রমণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে সব রকম বাণিজ্য (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ) সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্কও নেই।

বাংলাদেশ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ক্রমাগত ও জোরালো সমর্থক এবং ইসরায়েলের দখলদারির বিরোধিতাকারী। এরই ধারাবাহিকতায় ইসরায়েলের চলমান বর্বরোচিত আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী লিখিতভাবে প্রতিবাদ করেছেন। ইসরায়েলি হামলায় হতাহত ব্যক্তিদের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানিয়ে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাসকে চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি আল-আকসা মসজিদ কমপ্লেক্সে নিরীহ মুসলমান এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার গভীর দুঃখ এবং উদ্বেগ প্রকাশ করছি।’ প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দার পাশাপাশি হামলার শিকার ফিলিস্তিনিদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন। ফিলিস্তিনসহ সারা বিশ্বের যেসব স্থানে এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলো বন্ধে টেকসই ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন।

শেখ জাররাহ এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে ইসরাইলের দখলের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করে সেই এলাকা দখল করে ইসরাইলি বাহিনী মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন করেছে। চিঠিতে ফিলিস্তিনের রাজধানী পূর্ব জেরুজালেমসহ ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ওপর ভিত্তি করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশ বিশ্বাস করে সংঘাত, সহিংসতা, দখলদারি ফিলিস্তিন বা মুসলিম সম্পর্কিত বিষয় নয়; বিষয়টি মানবাধিকার ও মানবিকতার। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগ্রামরত মানুষকে সব সময় সমর্থন দিয়েছেন। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ও দ্বিরাষ্ট্র নীতির ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও টেকসই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির পক্ষে উচ্চকিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুকন্যা ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার রক্ষায় এবং জাতিসংঘ প্রস্তাব, আরব পিস ইনিশিয়েটিভ ও কোয়ার্টেট রোডম্যাপের আলোকে স্বাধীন, সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ফিলিস্তিন সংকটের একটি টেকসই এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

অনেক মুসলিম দেশ ইতিমধ্যে ফিলিস্তিনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে কিংবা গোপনে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রীতির সম্পর্ক তৈরি করেছে, কিন্তু বাংলাদেশ বিশ্বাসভঙ্গ কিংবা কোনো ভান-ভনিতার আশ্রয় নেয়নি। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ইসরায়েলি দখলদারি ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং স্বাধীন-সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অটল রয়েছে।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন

শেখ হাসিনা: অর্জন আর বিজয়ের ঠিকানা

শেখ হাসিনা: অর্জন আর বিজয়ের ঠিকানা

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, ধন্য পৃথিবী, তিনি নিজ কর্মগুণে শত কোটি মানুষের দোয়া আর ভালোবাসায় সিক্ত, পিতার আত্মা তিনি নিজ দেহে বহন করে, পিতার পথে হেঁটে নিজে হয়েছেন গর্বিত, অপরাজিতা, অপ্রতিরোধ্য নেতৃত্ব, তিনিই আমাদের শেখ হাসিনা; অর্জন আর বিজয়ের ঠিকানা।

প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ এক সময় বিদেশি বেনিয়াদের শোষণ ও নীলকরদের অত্যাচারের শিকার, কখনও ব্রিটিশের জুলুমে নিষ্পেষিত, এরপর সাধের পাকিস্তান আমাদের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে। বাঙালির উপর জুলুম-নির্যাতন, অত্যাচার, শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষের আত্ম বলিদান, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম আর নরক যন্ত্রণার সাগর পাড়ি দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অর্জন করলাম লাল-সবুজের স্বাধীন বাংলাদেশ।

স্বাধীন বাংলার পোড়া-মাটি ও নির্যাতিত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করে দেশ পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন ঠিক তখনই পাকিস্তানি হায়েনার দোসর মোস্তাক-জিয়ার ষড়যন্ত্রে ‘৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডে থমকে দাঁড়ালো বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধাক্কা খেলো।

রাষ্ট্র-ক্ষমতায় বেঈমান ঘাতকদের দলপতি জিয়ার নেতৃত্বে রাজাকার-আলবদরদের দল প্রধানরা। দিকহারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ, লক্ষ্যহীন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, দিশাহীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব- এমন এক বিভ্রান্ত সময়ে ১৯৮১ সালে ১৭ মে ঢাকার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন সন্ধ্যা নামার আগে সূর্য ঢাকা পড়েছে ঘন কালো মেঘে, মাঝে মধ্যে দমকা ঝড়ো হাওয়া জানান দিচ্ছে, যে কোনো সময়ে আকাশ ভেঙে নামবে বৃষ্টি। এমন এক গুমট পরিবেশের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিশ্বাসীদের রাজনৈতিক আকাশে আরেক সূর্যের আলোকছটা হাজারো দুঃখ-কষ্ট যন্ত্রণাকে ধারণ করে পিতা-মাতা ভাই আত্মীয়-স্বজন হারানোর বেদনাকে সাথী করে প্রায় ৬ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আত্মা কন্যা শেখ হাসিনার দেহে প্রবেশ করে বাংলাদেশে পদার্পন করলেন।

ঝড়ের পাগলা নৃত্য, মেঘের গর্জন, আর শান্তির বারিধারার মাঝে শতকোটি কণ্ঠে উচ্চারিত ‘হাসিনা তোমার ভয় নাই, আমরা আছি লাখো ভাই; ঝড় বৃষ্টি আঁধার রাতে, আমরা আছি তোমার সাথে, জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে মুখরিত লক্ষ লক্ষ মানুষের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় অভিষিক্ত হয়ে পিতার মতো উচ্চারণ করলেন ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দারিদ্র-পীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য পিতার মতো জীবন দিতে হলেও দিব, কিন্তু অধিকার প্রতিষ্ঠা করবই করব ইনশাআল্লাহ্।’

সেই যে পথ চলা শুরু ১৯৮১ সালের ১৭ই মে থেকে ১৯৯৬ সালের জুন, দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম, কারাবাস আর বারবার হত্যা চেষ্টার জাল ছিন্ন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বুনেছেন শেখ হাসিনা।

তিনি জানেন তার পিতা পোড়া-মাটি আর গৃহহীন, আশ্রয়হীন, দারিদ্র-পীড়িত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধ স্বদেশ গড়ার যে যাত্রা শুরু করেছিলেন মাঝখানে ২১ বছর বাংলাদেশ পেছনের দিকে হেঁটেছে, সেই বিপরীতমুখী অবস্থান থেকে যথা সময়ে যথা সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারঙ্গম শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে ঘোষণা করলেন- ‘আমি শাসক নয়, সেবক হিসেবে দেশের মানুষের সেবা করে প্রায় মেরুদণ্ড ভেঙেপড়া বাংলাদেশকে উন্নত আর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে চাই’।

একের পর এক সাফল্য অর্জনের মধ্য দিয়ে জনগণের সমৃদ্ধি, ভালোবাসা আর ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন দেশরত্ন শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা ২০০১ এর নির্বাচনে আবার ষড়যন্ত্রের কাছে পরাজিত হলেন, বাংলার মানুষের উন্নয়ন আর সমৃদ্ধির রথযাত্রা থমকে গেল ষড়যন্ত্রের কাছে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে ‘৭১ আর ৭৫’ এর খুনিদের কর্ণধার খালেদা-নিজামীর নির্মম রাজনৈতিক নির্যাতন, সন্ত্রাস, লুটপাট, বাংলাভাই নামক ধর্মের নামে জঙ্গি সৃষ্টি করে একযোগে সারা দেশে সিরিজ বোমা হামলা, হত্যা, সন্ত্রাস, দুর্নীতি আর লুটতরাজের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করে দেশকে।

তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ৫ বছরেই বাংলাদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়। অপর দিকে রাষ্ট্রীয় মদদে ২১ আগস্ট দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা করে ২৪ জন নেতাকর্মীকে হত্যা, হাজার হাজার আহত নেতাকর্মীর আর্তনাদ ও রক্তশ্রোত পৃথিবীর অন্যতম নারকীয় ঘটনা।

লাগাতার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা যখন ক্ষুণ্ন ঠিক তখনই অদ্যম সাহসিকতার সঙ্গে শেখ হাসিনা বিএনপি-জামাতের সমস্ত অপকর্মের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে লাগাতার আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের বিজয় সুচিত করেন।

কিন্তু আবার নতুন ষড়যন্ত্রের মইনুদ্দীন-ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে নিপতিত হলো দেশ জাতি। জেল-জুলুম হুলিয়া হত্যার হুমকি দু’পায়ে দলে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা অধিকার আদায়ে সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে প্রায় ২ বছর পর এই জগতদল পাথর অপসারিত করেন। নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৮ আবার দেশরত্ন শেখ হাসিনা সেবকের আসনে অধিষ্ঠিত হন। অদ্যবধি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মহাসড়ক ধরে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলেছে।

রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্ব গুণে অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি, ভারতের সঙ্গে ৩০ বছরের পানি চুক্তি, বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, ভেঙে পড়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনর্গঠন, ভারত ও মিয়ানমারের সাথে জলসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে।

বিনামূল্যে বই বিতরণ, ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান, কৃষি, ভূমিহীন দুঃস্থ মানুষদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে তাদেরকে সহযোগিতার মাধ্যমে স্বাবলম্বী করা, শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে বয়স্ক, বিধবা, শিক্ষাভাতাসহ গৃহহীনদের গৃহ প্রদান, আশ্রয়হীনদের আশ্রয় প্রদান, বিশ্ব ব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম পদ্মাসেতু নির্মাণ, সড়ক, মহাসড়ক, উড়াল সড়ক, রেল, মেট্রোরেল, আকাশপথ-পানিপথসহ যোগাযোগের সকল মাধ্যমে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে পৃথিবীতে এক অনন্য রেকর্ড স্থাপন করার একমাত্র কারিগর রাষ্ট্রনায়ক দেশরত্ন শেখ হাসিনা।

অপরদিকে ‘৭১ এর খুনি রাজাকার আলবদর সরদারদের বিচার করে ফাঁসির রায় কার্যকর, ‘৭৫ এর বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার এবং জেলখানায় জাতীয় চার নেতার খুনিদের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসির রায় কার্যকরের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে কলঙ্কমুক্ত করে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি বন্ধ করেন তিনি।

দৃঢ় অবস্থান, অসীম সাহসিকতা ও যোগ্য নেতৃত্বের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্ব গুণে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণের মর্যাদা লাভ করায় বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত, যার কারিগর রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব, চিন্তাশীল ভাবনা নিদর্শন ‘রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শন’ জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ এই ‘রাষ্ট্র উন্নয়ন দর্শন’ গ্রহণ করায় শেখ হাসিনা বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত আর বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত।

এই অর্জন আর বিজয়ে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ, কারা অন্তরীণ হতে হয়েছে কমপক্ষে ৮ বার। ১৯ বার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। শতশত নেতাকর্মীর জীবনদান, লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর এই আত্মত্যাগে তিনি হয়েছেন আরও কঠোর। তেজোদীপ্ত শপথে নেতাকর্মীদের রক্তরঞ্জিত পথে সমস্ত ষড়যন্ত্রের পথ পাড়ি দিয়ে সত্য ও সুন্দরকে ধারণ করে দেশরত্ন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত, যার প্রমাণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯টি ডিগ্রি, পদক, সম্মাননা।

এ থেকে নিঃসংকোচে বলা যায়, আজ থেকে ৪০ বছর পূর্বে পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে বাংলায় ফিরে জননেত্রী হয়েছেন শেখ হাসিনা। জননেত্রী হিসেবে মানুষের দোয়া, ভালোবাসা, আস্থা ও বিশ্বাসে রাষ্ট্রনায়ক হয়েছেন, রাষ্ট্রনায়ক থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব, সততা, যোগ্যতা ও কর্মগুণে বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কোটি মানুষের দোয়া ভালোবাসায় সিক্ত, আমাদের বিশ্বাস, ভরসা অর্জন আর বিজয়ের ঠিকানা শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, ধন্য পৃথিবী, তিনি নিজ কর্মগুণে শত কোটি মানুষের দোয়া আর ভালোবাসায় সিক্ত, পিতার আত্মা তিনি নিজ দেহে বহন করে, পিতার পথে হেঁটে নিজে হয়েছেন গর্বিত, অপরাজিতা, অপ্রতিরোধ্য নেতৃত্ব, তিনিই আমাদের শেখ হাসিনা; অর্জন আর বিজয়ের ঠিকানা।

লেখক: মোহাঃ আসাদুজ্জামান আসাদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগ

শেয়ার করুন

ইতিহাস সৃষ্টি করা দিন

ইতিহাস সৃষ্টি করা দিন

শেষ পর্যন্ত দলের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই শেখ হাসিনাকে সভানেত্রী করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিল না। এদিকে সভানেত্রী হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ প্রায় চার যুগ ধরে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চলছে। মৃত্যু-ঝুঁকি নিয়েই তিনি রাজনীতি করছেন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হওয়ার জন্য শেখ হাসিনার আকাঙ্ক্ষা বা প্রস্তুতি কোনোটাই ছিল না। আসলে নিয়তিই বঙ্গবন্ধুকন্যাকে রাজনীতিতে নিয়ে এসেছে।

১৭ মে বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক স্মরণীয় দিন। ৬ বছর স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকার পর ১৯৮১ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা স্বদেশে ফিরে আসেন। নির্বাসিত নেত্রী শেখ হাসিনা স্বদেশে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া বাংলাদেশ ও ৩০ লাখ শহিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে ফিরে পাননি। যেই বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না, যেই তাজউদ্দীন প্রধানমন্ত্রী না হলে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না- সেই মুজিব-তাজউদ্দীনরা তখন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ।

পাকিস্তানের প্রেতাত্মা জেনারেল জিয়াউর রহমানের ৬ বছরের স্বৈরশাসনে মুজিবের বাংলা পাকিস্তানের আদলে মিনি পাকিস্তানে পরিণত হয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের রণধ্বনি ‘জয় বাংলা’র পরিবর্তে পাকিস্তানিদের স্লোগান জিন্দাবাদ চালু হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন বলেই জিয়া-এরশাদ-খালেদা গংয়ের ছিনতাই করা বাংলাদেশকে বাংলার মানুষ পুনরায় ফিরে পেয়েছে। শেখ হাসিনা নেতৃত্বে এসেছেন বলেই আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং জাতির পিতাকে হত্যার ২১ বছর পর স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।

আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে হত্যার জন্যই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের সদস্যসহ স্বাধীনতার মহানায়ক শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়। জাতির পিতা হত্যার ৭৯ দিনের মাথায় স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী চার জাতীয় নেতাকে ৩ নভেম্বর হত্যার পর পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর ক্ষমতায় আনা হয় জিয়াকে। জিয়া, এরশাদ ও খালেদা তাদের আড়াই দশকের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে হত্যার মাধ্যমে একাত্তরের ঘাতক স্বাধীনতাবিরোধীদের রামরাজত্ব কায়েম করে।

শেখ হাসিনা ১৭ মে স্বদেশে ফিরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুই দশক আন্দোলন-সংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশকে পুনরুদ্ধার করেন।

১৯৮১ সালের ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে ৬ বছর নির্বাসিত থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু কন্যা সর্বসম্মতিক্রমে দলের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলে লাখ লাখ মানুষ তাকে প্রাণঢালা সম্বর্ধনা জানায়। ওই দিন ঢাকায় আরেক ১০ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তি হয়।

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে গণবিরোধী স্বৈরশাসনের ভিত কেঁপে ওঠে। বঙ্গবন্ধু কন্যার আগমনের পর ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ছিনতাইকৃত স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে বাঙালি জাতি। এমনিভাবে ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর, ১০ জানুয়ারির মতো ১৭ মে বাংলা ও বাঙালির কাছে ঐতিহাসিক দিন।

ওই সময় শেখ হাসিনার স্বদেশে ফিরে আসাটা ছিল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের মূল হোতা জিয়াউর রহমান তখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধুর খুনি ফারুক-রশিদ ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গরা দেশেই অবস্থান করছে।

নেত্রী দেশে এলে জিয়া-ফারুক-রশিদচক্র যে তাঁকে যে-কোনো মূল্যে হত্যার ষড়যন্ত্র করবে, এতে কোনো সন্দেহ ছিল না। নেত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের তারিখ ঠিক হলে জিয়াচক্র তা বানচাল করার অপচেষ্টা শুরু করে। বিভিন্নভাবে ওই চক্রটি চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র চালায়। সারা দেশে অসংখ্য লিফলেট-হ্যান্ডবিল ইত্যাদি বিলি করে স্বদেশে ফেরার প্রতিরোধের চেষ্টা চালায়।

নেত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের খবরে উদ্বিগ্ন জিয়াচক্রের বিষয়টি ড. ওয়াজেদ মিয়ার গ্রন্থেও উঠে এসেছে। ড. ওয়াজেদ তাঁর আত্মজীবনীমূলক সেই ঐতিহাসিক গ্রন্থে লিখেছেন-

“শনিবার, সাপ্তাহিক ছুটির দিন সকালে নাশতা খাওয়ার সময় হাসিনা আস্তে আস্তে বলে, ‘ইতিমধ্যে পাকিস্তানপন্থী এবং জিয়ার রাজনৈতিক দল সারা বাংলাদেশে লিফলেট, হ্যান্ডবিল ইত্যাদি বিলি করে আমার ঢাকায় ফেরা যে কোনোভাবেই হোক প্রতিরোধ করার ডাক দিয়েছে। আমার মনে হয় জয়-পুতুলকে নিয়ে আমার ঢাকায় ফেরা সমীচীন হবে না।”

তাছাড়া জিয়াচক্র তার সাড়ে ৫ বছরের শাসনামলে ৩০ লাখ শহিদ ও চার লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন বাংলাদেশকে পুরোপুরিভাবে পাকিস্তানি আদর্শ ও ভাবধারায় নিয়ে যায়। জিয়ার বাংলাদেশ এবং পরাজিত পাকিস্তানের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না বললেও অত্যুক্তি হবে না। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে অসম সাহসী মুজিবের দুঃসাহসী কন্যা পিতার মতোই নিজের জীবনকে উৎসর্গ করার মানসে ১৭ মে স্বদেশে ফিরে আসেন।

রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ১৯৬৭ সালে বিয়ের পর থেকে শেখ হাসিনা সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসেননি। ১৯৭৭ থেকে ’৮১- পর পর তিনটি কাউন্সিলে গ্রুপিং, স্লোগান-পাল্টা স্লোগান- এসব ছিল শীর্ষ নেতৃত্বের সীমাহীন ব্যর্থতা। এরই মধ্যে স্বৈর-সামরিক শাসক ও পাকিস্তানপন্থিদের প্রতিনিধি জেনারেল জিয়ার প্ররোচণায় ১৯৭৮ সালে মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ভাগ হয়ে যায়।

১৯৭৯-এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রাক্কালে ওই বিভক্তি দলকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। এতকিছুর পরেও আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে ৩৯ আসন পেয়ে সংসদে বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়।

শেষ পর্যন্ত দলের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই শেখ হাসিনাকে সভানেত্রী করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিল না। এদিকে সভানেত্রী হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ প্রায় চার যুগ ধরে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চলছে। মৃত্যু-ঝুঁকি নিয়েই তিনি রাজনীতি করছেন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হওয়ার জন্য শেখ হাসিনার আকাঙ্ক্ষা বা প্রস্তুতি কোনোটাই ছিল না। আসলে নিয়তিই বঙ্গবন্ধুকন্যাকে রাজনীতিতে নিয়ে এসেছে।

তার সাহসী নেতৃত্বের জন্যই একাত্তরের ঘাতকদের বিচার ও ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। তার সাহস ও প্রজ্ঞার কারণেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর ওই নির্বাচনের জন্যই বাংলাদেশে আজও গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রয়েছে। তার কারণেই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হয়েছে।

বাংলা ও বাঙালির কাছে ১৭ মে নেত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য অপরিসীম। শেখ হাসিনা নেতৃত্বে আছেন বলেই আওয়ামী লীগ আজ ঐক্যবদ্ধ। আর আওয়ামী লীগ রয়েছে বলেই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বাংলাদেশকে এখনো ‘মিনি পাকিস্তান’-এ রূপান্তরিত করতে পারেনি। তাই যতদিন এ দেশের মানুষ বেঁচে থাকবে, ততদিন ১৭ মে নেত্রীর প্রত্যাবর্তনের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক; কলাম লেখক

শেয়ার করুন

বিশ্বের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক

বিশ্বের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক

বাংলাদেশে যখন সংকট তীব্র হয়, যখন সবকিছু আবর্তিত হয় অনিশ্চয়তায়, বাংলার আকাশে কালো মেঘ জমে থাকে, তখন শেখ হাসিনাই আমাদের শেষ ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়ান। একজন ব্যক্তি অদম্য সংকল্প এবং কঠোর নিষ্ঠার সঙ্গে ভয়ের কালো মেঘকে সরিয়ে দেন, দেশের মানুষ আশার আলো দেখে। যখনই মনে হয় যে সবকিছু শেষ হয়ে আসছে, তখন আমরা খারাপ সময়টির মুখোমুখি হই, তখন একজন ত্রাণকর্তাই দক্ষতার সঙ্গে খারাপ দুঃস্বপ্নটি সরিয়ে ফেলেন, তিনিই আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী।

১৭ মে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৪০তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৮১ সালের এই দিনে ছয় বছর নির্বাসনে থাকার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম হত্যাকাণ্ডে পর শেখ হাসিনা ভারত থেকে দেশে ফেরত আসেন। শেখ হাসিনা এবং তার বোন শেখ রেহানা তখন জার্মানিতে ছিলেন বলেই বেঁচে গিয়েছিলেন।

১৯৮১ সালের ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। শেখ হাসিনা সবচেয়ে দুঃসময়ে দলের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি গণতন্ত্রের সংগ্রামে সব সময় লড়াই করেছেন। তিনি বারবার মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে এসেছেন। তিনি ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে একটি জনপ্রিয় দল হিসেবে ক্ষমতায় এনেছেন এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করে যে অসম্ভব কাজটি সম্ভব করেছিলেন তা হলো বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার এবং পরে ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। আর সেই সুযোগ এসেছিল বাঙালি জাতির আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাবার।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক কল্যাণ, বিকাশ, এবং মুক্তির লক্ষ্যে অগ্রণী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিকাশের জন্য তার বিকল্প নেই। শেখ হাসিনার সততা, নিষ্ঠা, যুক্তিবাদী মানসিকতা, দৃঢ় মনোবল, প্রজ্ঞা এবং অসাধারণ নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিশ্ব অঙ্গনে এক ভিন্ন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং তিনি বিশ্ববিখ্যাত নেতা হিসেবে পরিচিত।

আওয়ামী লীগ সব সময় সকল প্রকার শোষণ, বঞ্চনা, অবিচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার, রক্ষণাত্মক ভূমিকা পালন করেছে এবং অব্যাহত রেখেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে জনগণের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য কাজ করে। এই দলটি ক্ষমতায় থাকলে জনগণের ভাগ্য উন্নতি হয়। এই দলের ভিত্তি থেকে ৭২ বছরের ইতিহাস সেই সত্যের সাক্ষ্য দেয়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সাহসী কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে এখন আওয়ামী লীগ ১২ বছর ক্ষমতায় রয়েছে এবং তিনি জনগণের কল্যাণে নিবেদিত হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনার অদম্য শক্তি, সাহস, মনোবল এবং দৃঢ় নেতৃত্ব বিশ্বকে অবাক করে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৯তম এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ২৩তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে।

২০২১ সালে বাংলাদেশ একটি ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এবং ২০৪১ সালে একটি ‘উন্নত দেশ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে তার বড় প্রমাণ হলো গত কয়েক বছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বর্তমান মাথাপিছু আয় ১,৬১০। অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কয়েকটি শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে একটি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪টি মাইলফলক দিয়েছেন। প্রথমটি হলো ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিশন ২০২১, দ্বিতীয়টি ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন করা, তৃতীয়টি ২০৪১ সালে একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়া এবং চতুর্থটি ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্থপতি প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন।

বাংলাদেশে যখন সংকট তীব্র হয়, যখন সবকিছু আবর্তিত হয় অনিশ্চয়তায়, বাংলার আকাশে কালো মেঘ জমে থাকে, তখন শেখ হাসিনাই আমাদের শেষ ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়ান। একজন ব্যক্তি অদম্য সংকল্প এবং কঠোর নিষ্ঠার সঙ্গে ভয়ের কালো মেঘকে সরিয়ে দেন, দেশের মানুষ আশার আলো দেখে। যখনই মনে হয় যে সবকিছু শেষ হয়ে আসছে, তখন আমরা খারাপ সময়টির মুখোমুখি হই, তখন একজন ত্রাণকর্তাই দক্ষতার সঙ্গে খারাপ দুঃস্বপ্নটি সরিয়ে ফেলেন, তিনিই আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী।

তার পরিচয় প্রধানমন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতার চেয়ে বেশি তিনি এক অদম্য সাহসী মানুষ। তিনি একজন যোদ্ধা ও একজন অভিভাবক। তিনি সাহসিকতার সঙ্গেই কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা করছেন, এখনও, এখন এটি বিশ্বের সেরা উদাহরণ এবং বিশ্বনেতারা বিশ্বব্যাপী সংকট পরিচালনার জন্য তার উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন।

এই চার দশকে তিনি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জন্য লড়াই করেছেন। সংগ্রামের এই গতিপথ ছিল প্রতিকূল। শেখ হাসিনা, যিনি অলৌকিকভাবে ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় বেঁচে গিয়েছিলেন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার জন্য জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ। নিউইয়র্কে ইউনাইটেড নেশনস কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা ইউএন-সিডিপির পাঁচ দিনের ত্রিবার্ষিক সভায় পর্যালোচনা সভার পরে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।

আমরা আমাদের অর্থনীতি এবং সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে একবার নজর দিতে পারি। ২০০৮-০৯ সালে গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্টের (জিডিপি) পরিমাণ ছিল মাত্র ১০৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০-এ এটি বেড়ে দাঁডিয়েছে ৩৩০.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৮-০৯ সালে রপ্তানি আয় ছিল ১৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৮-১৯ সালে, এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০.৫৪ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৮.৪৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে আজ ৪৪.০৩ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে।

২০০১ সালে, দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৭.৯ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৪.৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে, দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ১০.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০৯-১০ সালে বিদ্যুতের ইনস্টলড ক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার ২৬১ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৪,৪২১ মেগাওয়াট করা হয়েছে বিদ্যুৎ থেকে উপকৃত জনসংখ্যা ৪৮ থেকে ৯৯ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্বের ধানের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদনকারী এবং মাছ, মাংস, ডিম এবং শাকসবজিতে স্বাবলম্বী। অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলে মাছ উৎপাদনের বৃদ্ধির হারের তুলনায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় এবং ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম অবস্থানে রয়েছে। আজ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর সুবিধা শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দুই ডজনেরও বেশি হাই-টেক পার্ক এবং আইটি-গ্রাম নির্মিত হচ্ছে।

শিক্ষায় উন্নতি, যোগাযোগের অবকাঠামো, নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে বই বিতরণ, সামাজিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত, অসহায়, বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সুরক্ষার সোশ্যাল সেফটি নেট সাপোর্ট প্রদান, স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের সহযোগিতা, অটিজম, প্রধানমন্ত্রীর সরকারের প্রধান উদ্যোগসমূহ বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় বীর হিসেবে মর্যাদা প্রদান, আশ্রয়ণ প্রকল্প, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, নারীর ক্ষমতায়ন এবং বিভিন্ন সেক্টরের সামগ্রিক উন্নয়ন তার সরকারেরই অবদান।

আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। এটিই বর্তমান নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই আমাদের কান্ডারি, আমাদের শেষ ভরসা ও আশ্রয়স্থল।

লেখক: প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন

শেখ হাসিনার প্রত্যার্বতনে গণতন্ত্র প্রবহমান

শেখ হাসিনার প্রত্যার্বতনে গণতন্ত্র প্রবহমান

এবার বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৪০ বছর পূর্ণ হলো। তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে ঢাকার মাটি ছুঁয়ে যে কথা দিয়েছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছেন। একইভাবে সেদিন ঢাকা শহরে লাখ লাখ কর্মী শপথ নিয়েছিলেন; দেশের সকল পরিস্থিতিতেই তাদের মায়ের মতো, বোনের মতো নেত্রীকে আগলে রাখবেন সেটিই তারা প্রমাণ করেছেন। আজকে সংকটাপন্ন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আবহে, হাজার বছরের বাঙালি কৃষ্টি সংস্কৃতির অবগাহনে ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশের প্রাণ। শেখ হাসিনার চারবার দেশ পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশ আজকে বিশ্বের বিস্ময়।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির অধিকার বাস্তবায়নে আপসহীন লক্ষ্য নিয়ে শত নির্যাতন, জেল-জুলুম, ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার এক দুর্দম লড়াই করেন। সুদীর্ঘ ২৩ বছরের লড়াই সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হলো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা, গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বাধীনতাবিরোধী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ইতিহাসের নৃশংসতম অধ্যায় সৃষ্টি করল।

এর পর নানা ইতিহাস। শুরু হলো আওয়ামী লীগ কর্মীদের হত্যা, ঘরছাড়া এবং দল ভাঙার এক গভীর ষড়যন্ত্র। কর্মীরা দিশেহারা, পথহারা, কিছু নেতা ক্ষমতার সঙ্গে মিশে গেল। মূলধারার নেতৃবৃন্দ হিমশিম খাচ্ছে ভাঙন ঠেকাতে, নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে। এমন সময়ে ১৯৮১ সালের ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশন। অপরদিকে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা শত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বুকের ভেতর কষ্ট-যন্ত্রণা নিয়ে পিতার হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন এবং বিশ্বজনমত সৃষ্টিতে ব্যস্ত।

কাউন্সিলে অনেক আলাপ আলোচনার পর জাতীয় ও দলীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তার একটি বার্তা সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক সম্মেলনে পাঠ করে শোনান। শেখ হাসিনা তার বার্তায় সব রকমের দ্বন্দ্ব-বিভেদ ভুলে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে কাউন্সিলর ও নেতাদের বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। কাউন্সিলরা সেদিন এক ধরনের স্বস্তি এবং আশা এবং আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

শেখ হাসিনার ফেরার দিনে কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে সেদিন জনসমুদ্রে শেখ হাসিনা বলেছিলেন-

“সব কিছু হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে ফিরে এসেছি। বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তিসংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য আমি এসেছি। আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের সঙ্গে থাকতে চাই।” কুর্মিটোলা থেকে শেরেবাংলানগর পর্যন্ত ৮ মাইল সময় লাগার কথা বেশি হলেও ৩০ মিনিট। প্রায় তিন ঘণ্টায় শেখ হাসিনা শেরে বাংলানগরে পৌঁছলেন। ঝড়বৃষ্টিতে নগর জীবন প্রায় বিপন্ন, রাস্তা-ঘাটে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়ে গেছে। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে শেরে বাংলানগরে অপেক্ষায় থাকেন লাখ লাখ মানুষ। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তিনি মানিক মিয়া এভিনিউর গণসংবর্ধনা মঞ্চে এলেন।

গণসংবর্ধনায় ভাষণদানকালে শেখ হাসিনা বলেন, “বঙ্গবন্ধু ঘোষিত দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমি জীবন উৎসর্গ করে দিতে চাই। আমার আর কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই। সব হারিয়ে আমি এসেছি আপনাদের পাশে থেকে বাংলার মানুষের মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য।” আনন্দঘন ও হৃদয়বিদারক এ অনুষ্ঠানে কর্মীরা মুহুর্মুহু নানা স্লোগানে মুখরিত করে রেখেছিল- ‘শেখ হাসিনা তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেব’, জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা, শুভেচ্ছা স্বাগতম, ঝড়বৃষ্টি আঁধার রাতে, আমরা আছি তোমার সাথে। শেখ হাসিনা সেদিন বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। কর্মীদের চোখেও ছিল অশ্রুধারা। তখন সময়টা খুব খারাপ ছিল।

পঁচাত্তরের খুনিরা তখনও তৎপর সব জায়গায় ওত পেতে আছে। এর মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকন্যা পিতার পথ ধরে জীবনের সকল ঝুঁকি নিয়ে শুরু করলেন বাংলার মানুষের মুক্তির সংগ্রাম। সেদিন তিনি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না করলে এতদিনে দেশ পুরোপুরি পাকিস্তানের মতো স্বৈরাচারী, বিশৃঙ্খল ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হতো। শেখ হাসিনা সে অবস্থা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছেন এবং বাংলার মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে, গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় অভিষিক্ত করেছেন।

৭ মে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন দিবসটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসের জন্য একটি বিশেষ দিন। শেখ হাসিনা যদি সেদিন তার একক সিদ্ধান্তে ফিরে না আসতেন তবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য আর কতদিন লড়াই করতে হতো, কত মানুষের আবারও জীবন দিতে হতো তা ভাবাই যায় না।

‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’- ৮১ থেকে ৯০ পর্যন্ত দীর্ঘ আন্দোলনের প্রধান নেতা ছিলেন শেখ হাসিনা এবং প্রধান শক্তি ছিল তার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সঙ্গে সহযোগী সংগঠনসমূহ। ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নৈরাজ্য, অনাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন শেখ হাসিনা।

এবার বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৪০ বছর পূর্ণ হলো। তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে ঢাকার মাটি ছুঁয়ে যে কথা দিয়েছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছেন। একইভাবে সেদিন ঢাকা শহরে লাখ লাখ কর্মী শপথ নিয়েছিলেন; দেশের সকল পরিস্থিতিতেই তাদের মায়ের মতো, বোনের মতো নেত্রীকে আগলে রাখবেন সেটিই তারা প্রমাণ করেছেন। আজকে সংকটাপন্ন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আবহে, হাজার বছরের বাঙালি কৃষ্টি সংস্কৃতির অবগাহনে ফিরে পেয়েছে বাংলাদেশের প্রাণ। শেখ হাসিনার চারবার দেশ পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশ আজকে বিশ্বের বিস্ময়।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আকাশ-সমুদ্র, সীমান্ত বিজয় পূর্ণ হয়ছে। এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো সকল শর্ত পূরণ করে বাংলাদেশ উন্নয়শীল দেশে পর্দাপণ করেছে।

বাংলাদেশের মাথা পিছু আয় এখন ২০৬৪ ডলার। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা, সৎ, যোগ্য, কর্মঠ, মানবতাবাদী গণতান্ত্রিক নেতা। গণতন্ত্রের মানসকন্যা এখন গণতন্ত্রের মূর্তপ্রতীক।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন, গণতন্ত্রের এ ধারা অব্যাহত রাখার জন্য, দেশকে একটি সম্পূর্ণ কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে পরিগণিত করার জন্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য আজকে দেশের মানুষের সামনে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই। সকল বিবেচনায় পরিস্থিতিটা এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যে, শেখ হাসিনা বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।

লেখক: চিকিৎসক, সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন

শেখ হাসিনার কৌশলের কাছে পরাজিত অপশক্তি

শেখ হাসিনার কৌশলের কাছে পরাজিত অপশক্তি

যারা ভেবেছিলেন বাংলাদেশে মুজিব হত্যার বিচার হবে না, আওয়ামী লীগ আর কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারীদের বিচার হওয়া সম্ভব নয়, তাদের ভুল প্রমাণ করেছেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে আর সবাই পরাজিত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু যেমন তার সময়ের অন্য সব রাজনীতিকের ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন, শেখ হাসিনাও তেমনি তার সময়ে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। কাজটি অবশ্যই সহজ ছিল না। ঘরে-বাইরে বৈরিতা ছিল এবং আছে।

৩৬৫ দিনে এক বছর। রাজনীতির ইতিহাসে প্রতিটি দিন বা বছরের সবগুলো মাস সমান গুরুত্ব বহন করে না। একেকটি তারিখ একেক কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকে। কোনোটা তারিখ বা দিন হয়তো আনন্দের আবার কোনোটা বেদনার। আমাদের দেশের রাজনীতি ঘটনাবহুল। তাই বছরের অনেকগুলো মাস এবং ওইসব মাসের কিছু তারিখ আমাদের আলোড়িত করে, তাড়িত করে, আবেগ আপ্লুত করে কিংবা বিষাদ-ভারাক্রান্তও করে। ১৭ মে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তেমনি একটি উল্লেখযোগ্য দিন। সেদিন শেখ হাসিনা ছয় বছর পর দেশে ফিরে এসেছিলেন, আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে। তার এই স্বদেশফেরা পঁচাত্তর-পরবর্তী দেশের রাজনীতির আবহ বদলে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল।

শেখ হাসিনা নিজে হয়ত কখনও ভাবেননি যে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হবেন। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন, কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভানেত্রীও নির্বাচিত হয়েছেন। অত্যন্ত কাছে থেকে দেখেছেন পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন। জেল-জুলুম-অত্যাচার-মামলা উপেক্ষা করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রাণপাত ধারাবাহিক সংগ্রাম। কিন্তু তিনিও রাজনীতির পিচ্ছিল পথে হাঁটবেন, সেটা হয়তো ভাবনায় সেভাবে ছিল না। অথচ তাই হলো। কীভাবে তিনি জড়িয়ে পড়লেন রাজনীতির সঙ্গে?

১৯৮১ সালের ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে দলের ঐক্য ধরে রাখার বৃহত্তর প্রয়োজনে বাধ্যতামূলক নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল। তিনি দেশে ফিরেছিলেন ১৯৮১ সালের ১৭ মে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের লালচোখ উপেক্ষা করে দেশে ফিরে রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়ার কারিগর হতে আত্মনিয়োগ করলেন। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তাই রাজনীতির বাইরের মানুষ তাকে বলা যাবে না। তবে রাজনীতির মঞ্চে তার আরোহণ স্বাভাবিক পথে হয়নি। বিশেষ অবস্থায়, বিশেষ প্রয়োজনে তিনি নৌকার হাল ধরেন।

১৯৮১ থেকে ২০২১। চার দশকের এই পথপরিক্রমা তাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যাত্রাপথ অবশ্যই ফুল বিছানো ছিল না। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে চলতে হচ্ছে তাকে। এখনও তিনি দলকে, দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। ইতিহাস যেন তার কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে অনেক দায় ও দায়িত্ব। দায়িত্ব পালনে তিনি ক্লান্তিহীন যোদ্ধা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে নির্মম হত্যাকণ্ডের দিন শেখ হাসিনা এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ১৫ আগস্ট তারা দেশে থাকলে তাদেরও পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো পরিণতি বরণ করতে হতো। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য।

ঘাতকচক্র এবং তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মদতদাতা ও পৃষ্ঠপোষকরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে উলটো ধারায় নিতে চেয়েছে। তারা প্রাথমিকভাবে সফলও হয়েছে। যে পাকিস্তানি ধারাকে পরাজিত করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, সেই পরাজিত ধারায় দেশকে নিয়ে যাওয়াই ছিল ঘাতক এবং তাদের মুরুব্বিদের লক্ষ্য। বঙ্গবন্ধু হত্যার ছয় বছর পর শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসা ছিল ওই খুনিচক্রের বিরুদ্ধে প্রথম কার্যকর প্রতিবাদ। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের বজ্রমুঠি শিথিল হওয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতার শুরু।

শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান যখন ঢাকার মাটি স্পর্শ করে তখন আকাশ ভেঙে নেমেছিল বৃষ্টি। বিমান থেকে মাটিতে নেমে শেখ হাসিনা কান্না থামাতে পারেননি। আবেগতাড়িত হওয়াই ছিল তার জন্য স্বাভাবিক। একদিন আকাশের কান্না, আর একদিকে শেখ হাসিনার কান্না- দুইয়ে মিলে গ্লানি মোচনের এক বিশেষ মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যে রাষ্ট্রটির জন্ম দিয়েছিলেন, সেই রাষ্ট্র তার জীবন রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। নিজের পরিচর্যায় আন্তরিক দরদে গড়া দল, আওয়ামী লীগ, যে দল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে, সে দলটিও মুজিব-হত্যার আকস্মিকতায় ছিল হতবিহ্বল। তারাও কোনো কার্যকর প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত ব্যর্থতা খুনিদের উল্লাস নৃত্য দেখতে বাধ্য করেছিল গোটা জাতিকে।

নেতার লাশ যখন রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে পড়ে ছিল, তখন তারই অনুসারী হিসেবে পরিচিত খন্দকার মোশতাকসহ অনেকেই চরম কাপুরুষতা দেখিয়ে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছে। তারপর নানা ঘটনাধারায় সময় গড়িয়েছে। উত্থানপতন চলেছে ক্ষমতা দখলকারীদের মধ্যেও।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় চারনেতাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে মূলত নেতৃত্বশূন্য করা হয়েছিল। হতোদ্যম, হতবল আওয়ামী লীগ আবার সংগঠিত হোক, শক্তি অর্জন করুক, সেটাও চায়নি ক্ষমতাদখলকারীরা।

দেশের রাজনীতি যখন চরম এক অনিশ্চয়তার মুখে, জাতির পতাকা যখন ‘খামচে ধরেছে পুরনো শকুন’ – ঠিক সেই সময় আওয়ামী লীগের হাল ধরলেন শেখ হাসিনা। যার রক্তে বহমান শেখ মুজিবের রক্ত। পিতা মুজিব চাননি তার কন্যা রাজনীতির ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পথে হাঁটুক, তাই তার বিয়ে দিয়েছিলেন একজন বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! সেই কন্যাকেই হতে হলো পিতার স্বপ্ন পূরণের কঠিন পথের পরিব্রাজক। শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্ব নেয়ায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্য যে আবেগ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়, তা আরও বেগবান হয় এক বৈরী পরিবেশে দেশে ফিরে আসায়।

শেখ হাসিনা যাতে দেশে ফিরে আসতে না পারেন, তিনি যাতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিতে না পারেন, তার জন্য নানা ঘোট পাকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন জিয়া এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা। শেখ হাসিনার সাহস ও দৃঢতার কাছে পরাভূত হয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা। আওয়ামী লীগের মধ্যেও বিভীষণ ছিল, ছিল মোশতাকের প্রেতাত্মা । কিন্তু তারা সুবিধা করতে পারেননি শেখ হাসিনা এবং তৃণমূল পর্যায়ের মুজিবভক্তদের জীবনপণ ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিজ্ঞার কাছে।

১৯৮১ সালের বৃষ্টিস্নাত ১৭ মে শেখ হাসিনাকে বরণ করার জন্য জনতার ঢল নেমেছিল। যারা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হারিয়ে দুফোঁটা চোখের জল ফেলতে পারেননি, তারা ১৭ মে অকাতরে চোখের জল ঢেলে দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন যেন। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও তাৎক্ষণিকভাবেই তৈরি হয়েছিল পরিবর্তনের অভিঘাত। মুক্তিযুদ্ধের হারানো চেতনাকে ফিরিয়ে আনার রাজনীতি বলবান হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

শেখ হাসিনা বাবার মতো রাজনীতিতে সাফল্য দেখাতে পারবেন কি না তা নিয়ে শুরুতে কারো কারো মধ্যে সংশয় ছিল। রাজনীতি থেকে যিনি নিজেকে পিতার ইচ্ছায় দূরে সরিয়ে নিয়েছিলেন, তিনি পিতার রাজনীতির ধারা এগিয়ে নিতে পারবেন কি না সে প্রশ্নও ছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই শেখ হাসিনা প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, তার ধমনীতে শেখ মুজিবের রক্ত বহমান, তাই তিনি পরাজয় মানতে জানেন না।

যারা ভেবেছিলেন বাংলাদেশে মুজিব হত্যার বিচার হবে না, আওয়ামী লীগ আর কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারীদের বিচার হওয়া সম্ভব নয়, তাদের ভুল প্রমাণ করেছেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে আর সবাই পরাজিত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু যেমন তার সময়ের অন্য সব রাজনীতিকের ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন, শেখ হাসিনাও তেমনি তার সময়ে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। কাজটি অবশ্যই সহজ ছিল না। ঘরে-বাইরে বৈরিতা ছিল এবং আছে। সব মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নেয়ার এক বিরল কৃতিত্বের অধিকারী এখন শেখ হাসিনার।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন শেখ হাসিনা। রাজনীতিবিদরা সাধারণ ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিতে অভ্যস্ত। ক্ষমতার বাইরে থেকে যা বলেন, ক্ষমতায় গিয়ে তা করেন না। কিন্তু শেখ হাসিনা এখানে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তিনি যা বলেন, তা করেন। চাপ দিয়ে, আন্দোলনের নামে সহিংসতা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে নমনীয় করা যায়নি, যায় না।

তিনি যেটা সঠিক মনে করেন, সেটা বাস্তবায়িত করার জন্য যে যে পদক্ষেপ নেয়া দরকার তিনি তা নিতে পিছপা হন না। তবে তাকে কখনও কখনও কৌশলী হতে হয়, সময় ও সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তাতে কারো কারো মধ্যে সংশয়ও হয়ত তৈরি হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত শেখ হাসিনা তার নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ়তা দেখাতে ভুল করেন না। তার গৃহীত পদক্ষেপ সবাইকে নিশ্চয়ই খুশি করে না। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত সমাজে রাজনীতিতে একমত একপথ হয়ে চলা সহজ নয়। তবে শেখ হাসিনার হাত ধরে রাজনীতিতে অস্থিরতা অনেকটাই দূর হয়েছে।

শেখ হাসিনাকে যদি সময় ও সুযোগ দেয়া যায় তাহলে তিনি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন। তিনি পর পর তিনবার দলকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করে তার রাজনৈতিক কৌশলের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। রাজনীতি মূলত নীতি ও কৌশলের খেলা। কৌশলে তিনি শতভাগ জিতেছেন। তবে দেশে নীতিহীনতার রাজনীতি প্রকট হয়ে উঠেছে। মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। রাজনীতি পরিণত হয়েছে কেনাবেচার পণ্যে। রাজনীতির ব্যবসা অনেকের ভাগ্য বদলে সহায়ক হয়েছে। এটা দুঃখজনক। রাজনীতি নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব অনেকের মধ্যেই প্রবল। নষ্ট রাজনীতি নিয়ে হতাশাও ব্যাপক। সেজন্য এখন ক্ষমতার রাজনীতির পাশাপাশি নীতির রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার সাফল্য দেখার অপেক্ষায় দেশের মানুষ।

করোনাভাইরাস এক অযাচিত চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে এসেছে, তারপরও আশা, যিনি পারেন, তিনি সব বিপদ-দুর্যোগই মোকাবিলা করতে পারেন।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে শেখ হাসিনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন