20201002104319.jpg
ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু হলে 
আর্থিক স্বস্তিতে থাকবেন 
ক্রিকেটাররা

পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী দিনগুলোতে কীভাবে ঘরোয়া ক্রিকেট, মূলত ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ এবং টি-টোয়েন্টি লিগ শুরু করা যায় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে ক্রিকেট বোর্ডকে।

কিছুদিনের মধ্যে ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে বিসিবি। এই ঘোষণায় বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা আশান্বিত হবেন। চলমান মহামারির কারণে দুনিয়া জুড়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন ব্যহত হওয়ার প্রভাব বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনকেও অস্থির করে তোলে। অনেক ক্রিকেটার আর্থিক সংকটে পড়েন। জাতীয় দলের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার ব্যক্তিগত উদ্যোগে সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের আর্থিক এবং অন্যভাবেও সহায়তা করে নিঃসন্দেহে অনেকের সম্মান এবং আস্থা কুড়িয়েছেন।

তামিম, মুশফিক, সাকিবসহ ক্রিকেটের মহারথীরা তাদের নিজস্ব স্থান থেকে ত্রাণ এবং আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।

শ্রীলংকা সফরকে সামনে রেখে মিরপুরে বিসিবি গুটিকয়েক প্র্যাকটিস ম্যাচের আয়োজন করে। শ্রীলংকার সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের কোভিড-১৯-এর স্বাস্থ্যবিধি শিথিল করতে না পারার কারণে শেষ পর্যন্ত সফর স্থগিত করা হয়।

ইতোমধ্যে বোর্ডের আন্তরিকতায় এবং কিছুটা হলেও চাপের কারণে ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু হয়েছে। ক্রিকেটারদের আর্থিক সংকটের খবর নিয়মিতভাবে দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছিল। ক্রিকেট যাদের রুটি-রুজির মূল মাধ্যম তাদের অনেকেই মাঠে খেলা না থাকায় হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে অধিকাংশ খেলোয়াড় মোটামুটি নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে আসা। তাদের ওপর পুরো পরিবারের ভরণ-পোষণ নির্ভর করে।বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে ন্যাশনাল ক্রিকেট লিগ, বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ চালু আছে। ইদানিংকালে আর্থিক আয় এবং নজর কাড়ার দিক থেকে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

৭০, ৮০ এবং ৯০-এর দশকের ক্রিকেট লিগ দর্শকের কাছে ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং ক্রিকেটারদের জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। সেই সময়ে অনূর্ধ্ব-১৯, অ্যাকাডেমি কিংবা বাংলাদেশ এ দল না থাকায় বিদেশ সফর এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের কোনো উপায়ই ছিল না।

সেই সময়কার ক্রিকেট দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মেজাজে হতো। বিশেষ করে ৭০ থেকে ৮০-এর দশকের প্রধান দলগুলির মধ্যে আবাহনী, মোহামেডান, আজাদ বয়েজ ক্লাব, বাংলাদেশ বিমান এবং ব্রাদার্স ইউনিয়নের খেলার দিনে স্টেডিয়াম ভরা দর্শক থাকতেন। মাঠে জমজমাট ও উঁচু মানের খেলা হতো।

তখনকার ক্রিকেটাররা বর্তমান ক্রিকেটারদের তুলনায় খুব সামান্য অর্থই উপার্জন করতেন। তারপরও খেলোয়াড়, সংগঠক, ক্লাব এবং দর্শকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষকতা বাংলাদেশকে টেস্ট স্ট্যাটাস অর্জনে সহায়তা করেছিল।

সেই সময়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে অসংখ্য বিদেশি প্লেয়ার খেলে গেছেন। নিরপেক্ষভাবে বললে শ্রীলংকার প্রচুর খেলোয়াড় যারা শুধু টেস্ট খেলুড়েই নন, শ্রীলংকার উঁচু মানের ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলতেন, তাদের অনেকেই খেলে গেছেন। রানাতুঙ্গা, মেন্ডিস, সামারসেকেরা, লেবরয়, জগন্নাথন, কুরুপ্পুসহ অনেকেই ঢাকার মাঠে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। ইংল্যান্ডের নিল ফেয়ারব্রাদার, পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরাম এবং ইন্ডিয়া থেকে অজয় শর্মা, প্রয়াত রমন লাম্বা এবং সঞ্জিত শর্মাও খেলেছেন ঢাকার লিগে।

বেশ কয়েক বছর ৮০ ওভারের ম্যাচ ও ডাবল লিগের আয়োজন করা হয়। এতে করে ক্রিকেটাররা শুধু মাত্র শর্টার ভার্সন নয় লংগার ভার্সনেও নিজেদের টেকনিক এবং টেম্পারমেন্ট উন্নয়নের সুযোগ পান। পাশাপাশি ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে ক্রিকেটাররা আর্থিকভাবে তাদের জীবিকা অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন সবসময়। বর্তমানে ডিপিএল শুরু হওয়ার মানে হচ্ছে খেলোয়াড়দের অর্থনীতির চাকা আবার ঘুরতে শুরু করবে।

ক্রিকেট বোর্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী তিন দলের একটি টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছে। কভিডের কারণে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে টুর্নামেন্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে অনূর্ধ্ব-১৯, হাই পারফর্মেন্স ও অ্যাকাডেমির খেলোয়াড়দের নিয়ে টুর্নামেন্ট হচ্ছে।

বর্তমানে, বিশেষত এই প্রজন্মের ক্রিকেটাররা একটি সিস্টেমের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা পাওয়ায় ক্রিকেটকে একটি পেশা হিসেবে নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করতে পারেন। কেবলমাত্র সর্বোচ্চ লেভেলে খেলার বিষয় শুধু নয়, তারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ার সুযোগও পেতে পারেন।

৭০ এবং ৮০-এর দশকের ক্রিকেটাররা মূলত উচ্চশিক্ষিত ছিলেন এবং ক্রিকেট সেই সময়ে এত এক্সপোজার পায়নি। এ কারণে অর্থনৈতিকভাবে তারা লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন না। কিছু কিছু ক্লাব কয়েকজন ক্রিকেটারকে অর্থের বিনিময়ে দলে খেলাত। সেটাও স্বল্প সময়কার ক্রিকেট মৌসুমের জন্য। সেই সময়কার বেশির ভাগ ক্রিকেটারা উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে আসার কারণে এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে তাদের অভাব অনটনে দিন কাটাতে হয়নি। যার কারণে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হলেও তাদের বেগ পেতে হতো না। তখনকার খেলোয়াড়রা প্রচণ্ড প্যাশন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক স্বভাবের কারণে সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেট খেলতে সক্ষম হতেন।

পরিস্থিতি বিবেচনা করে আগামী দিনগুলোতে কীভাবে ঘরোয়া ক্রিকেট, মূলত ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ এবং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট লিগ শুরু করা যায় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে ক্রিকেট বোর্ডকে। স্থগিত হওয়া শ্রীলংকা ক্রিকেট সফর এবং মার্চে নিউজিল্যান্ডে তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচের কথা মাথায় রেখে সেই মানের ব্যবস্থা নেবে ক্রিকেট বোর্ড আশা করি।

 

ইশতিয়াক আহমেদ: জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক খেলোয়াড় ও ক্রিকেট বিশ্লেষক।

শেয়ার করুন