20201002104319.jpg
নির্বাচনের পর পরীক্ষাতেও অটো পাস!

এবারের অটো এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীদের সারাজীবন ‘অটো ইন্টার’, বা ‘করোনা ইন্টার’ শুনতে হবে। শুধু মজা করে বলা নয়, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে, চাকরির ক্ষেত্রেও তাদের বাঁকা চোখে দেখা হবে, বঞ্চিত করা হবে।

করোনাভাইরাস গোটা বিশ্বকেই চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে। করোনার আগের আর পরের বিশ্ব কখনোই এক হবে না। মানুষের জীবনযাপন, অর্থনীতি, পরিবেশ- করোনার প্রভাব পড়েছে সর্বত্র। গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশও বদলে গেছে। বাংলাদেশও নিউ নরমাল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষতিই আস্তে আস্তে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষা ক্যালেন্ডারে যে লণ্ডভণ্ড অবস্থা তা কীভাবে পুনর্গঠন করা যাবে তা এখনও অনিশ্চিত। করোনা সাবধানতায় গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। একই কারণে ২৬ মার্চ শুরু হওয়া সাধারণ ছুটি ৩১ মে শেষ হয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে সবকিছুই খুলেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া। করোনার তো যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখছি না। বরং এখন আগামী শীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামলানো নিয়ে তোড়জোর চলছে। করোনা দুর্বল হয়েছে, তেমন কোনো লক্ষণও দেখছি না। বরং প্রতিদিনই লম্বা হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। তাই শিগগিরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলারও কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। কারণ আমরা সবকিছুর সাথে আপস করতে পারি, অর্থনীতি সচল রেখেই করোনা মোকাবিলার কৌশল নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি; কিন্তু সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে পারি না। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে কোনো আলোচনাই হচ্ছে না।

দেশের অন্য সব খাতের মতো শিক্ষা খাতেও চরম বৈষম্য রয়েছে। করোনা এসে সে বৈষম্যকে আরো প্রকট করেছে। দেশে নানা পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। বাংলা ভার্সন, ইংলিশ ভার্সন, ইংলিশ মিডিয়াম, কারিগরি, আলিয়া মাদ্রাসা, কওমি মাদ্রাসা- সব মিলিয়ে জগাখিচুড়ি ভার্সন। শিক্ষার মানেও রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত। ঢাকার সেন্ট যোসেফ স্কুলের শিক্ষার মান আর খাগড়াছড়ির কোনো স্কুলের শিক্ষার মান এক নয়। আমার ছেলে ভাগ্যবান, সে সেন্ট যোসেফ স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু আমার মন কাঁদে খাগড়াছড়ির সেই ছেলেটির জন্য যে ১০ কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে যায়, আধপেটা খেয়ে পড়াশোনা করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই বৈষম্য দূর করা। আর দূর না করা পর্যন্ত তাদের পাশে থাকা। এই বৈষম্য দূর করতেই শিক্ষা এবং চাকরি ক্ষেত্রে কোটা ছিল। বেশির ভাগ মানুষ না বুঝে, উল্টো বৈষম্য দূর করার ধুয়া তুলে আন্দোলন করে কোটা হটিয়েছে। এখন মেধা যতই থাকুক, খাগড়াছড়ির সেই ছেলেটা কথনোই আমার ছেলের সাথে প্রতিযোগিতায় পারবে না। শহরের ছেলের ভালো শিক্ষক, ভালো কোচিং, গাইড মিলিয়ে ভালো নম্বর পেয়ে যায়। তাই মেধা কম হলেও সার্টিফিকেটে বেশি নম্বর থাকার সুবাদে সব প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে। আর নম্বর কম থাকায় বেশি মেধা নিয়েও বারবার ছিটকে পড়ে খাগড়াছড়ির প্রকৃতির সন্তানটি। বলছিলাম, করোনা শিক্ষা ক্যালেন্ডারকে লণ্ডভণ্ড তো করেছেই, আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বৈষম্য। করোনাকালেই শুরু হয়েছে অনলাইন ক্লাস। কিন্তু অনলাইন ক্লাস সর্বজনীন করতে হলে স্কুল এবং ছাত্রের বাসায় হাইস্পিড ইন্টারনেট থাকতে হবে। ছাত্র এবং শিক্ষককে প্রযুক্তিবান্ধব হতে হবে। শিক্ষার্থীর অন্তত একটি, সম্ভব হলে একাধিক স্মার্ট ডিভাইস থাকতে হবে। অনলাইনে পরীক্ষা দেওয়ার সময় দুটি ডিভাইস লাগে। একটাতে শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়, আরেকটাতে শিক্ষক নজর রাখেন। বাংলাদেশের সকল শিক্ষার্থীর হাতে কি স্মার্ট ডিভাইস আছে, হাইস্পিড ইন্টারনেট আছে? আমার বাসায় হাইস্পিড ইন্টারনেট সংযোগ আছে, ডেস্কটপ কম্পিউটার আছে, একাধিক স্মার্ট ডিভাইস আছে। তারপরও মাঝে মাঝে রাউটারের ঝামেলার কারণে প্রসূন সময়মতো ইলেকট্রনিক উত্তরপত্র জমা দিতে পারে না। আমার ছেলের তুলনায় খাগড়াছড়ির ছেলেটি কম সুবিধা পাচ্ছে, তা আমার মধ্যে এক ধরনের অপরাধবোধ তৈরি করে। মনে হয়, নিজের ছেলেকে বেশি সুবিধা দিতে গিয়ে আমি প্রান্তিক শিশুটিকে বঞ্চিত করছি না তো?

কম্পিউটার, ইন্টারনেট, স্মার্ট ডিভাইস শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে ব্যাহত করে। শিক্ষার্থীদের এখন আর আউটবুক পড়ার সময় নাই, সবাই ফেসবুক পড়তে ব্যস্ত। তাই একটা বয়স পর্যন্ত শিশুদের ভার্চুয়াল জগত থেকে দূরে রাখতে পারলে ভালো। তবে কাজটা শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব। আমার স্ত্রী মুক্তি পরীক্ষার আগে প্রসূনের স্মার্টফোন তালা দিয়ে রাখেন, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখেন। কিন্তু অনলাইন ক্লাসের কারণে তাকে এখন সবকিছু দিতে হচ্ছে। করোনার কারণে অভিভাবকের আয়ও বন্ধ। তবুও ধার-দেনা করে সন্তানকে ল্যাপটপ বা ট্যাব কিনে দিতে হচ্ছে। স্মার্ট ডিভাইসের দাম এখন দারুণ চড়া।

করোনা শিক্ষাখাতে কতটা আঘাত করেছে, সেই ক্ষতটা বোঝা যাবে করোনা যাওয়ার পর। এরইমধ্যে অনেক বেসরকারি স্কুল, কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়ে গেছেন অনেক শিক্ষক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললে আবার বেতন পাবেন, এ আশায় বিনা বেতনে অপেক্ষা করছেন অনেক শিক্ষক। কোচিং বা টিউশনির বাড়তি আয়ের পথও বন্ধ। অথচ শিক্ষকদের কথা যেন সবাই ভুলে গেছেন। তাদের বেদনার কথা কেউ বলে না। যেন শিক্ষকদের পেট নেই, সংসার নেই, তাদের খিদে পায় না।

তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে শিক্ষা ক্যালেন্ডারে। এটা যে কীভাবে পুনঃস্থাপিত হবে, সেটা নিয়েও পরিকল্পনা করার সুযোগ নেই। কারণ কবে খুলবে, সেটা না জানলে পরিকল্পনাটা করাও কঠিন। পিইসি, জেএসসি পরীক্ষা বাতিল হয়েছে আগেই। জটিলতা ছিল এইচএসসি নিয়ে। কারণ এইচএসসি পরীক্ষাটি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই পরীক্ষাটি প্রাথমিক-মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকের সাথে উচ্চশিক্ষার সংযোগ সেতু। এইচএসসি পরীক্ষায় পাওয়া চাবি দিয়েই শিক্ষার্থীরা খোলে ভবিষ্যতের অনেক সম্ভাবনার তালা। তাই সরকারকে অনেক ভেবেচিন্তে, অনেক সিদ্ধান্তের পারমুটেশন, কম্বিনেশন করে শেষ পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল করে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলের গড়ে মূল্যায়ন করে সার্টিফিকেট দেওয়া হবে এবং সবাই অটো পাস। এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় খুশিতে এক শিক্ষার্থী টিভি পর্দায় শিক্ষামন্ত্রীকে চুমু খাচ্ছে, এমন ছবি ভাইরাল হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল তর্ক চলছে। মজার কথা হলো, দুইপক্ষের যুক্তির সাথেই আমি একমত। এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত অনেক জটিলতা সৃষ্টি করেছে এবং করবে, অনেকে বঞ্চিত হবে। আবার এটাও বুঝি, ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেয়ার মতো বাস্তবতা দেশে নেই, নিকট ভবিষ্যতে হবে তেমন সম্ভাবনাও নেই। তাই সরকারের এই বিরল সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

বিরল সিদ্ধান্ত বলছি, কারণ এর আগে স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো পাবলিক পরীক্ষা বাতিল হয়নি। এ অঞ্চলে দুবার ডিগ্রি বাতিল হয়েছিল, একবার ৪৭ সালে দেশভাগের সময়। আরেকবার ৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনের পর। তবে তখন এত প্রতিযোগিতা ছিল না। এখন নম্বরের ভগ্নাংশের কারণে অনেকের অনেক সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। যে শিক্ষার্থী তাৎক্ষণিক আনন্দে শিক্ষামন্ত্রীকে চুমু খেয়েছেন, দুদিন পর তিনিও টের পাবেন, এ সিদ্ধান্ত তার কপালে সারাজীবনের জন্য কী কলঙ্কতিলক এঁকে দিল। স্বাধীন বাংলাদেশে পরীক্ষা বাতিল না হলেও ৭২ সালে ম্যাট্রিক, ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় অবাধে নকলের সুবিধা ছিল। তাই 'বাহাত্তরে ম্যাট্রিক' মানেই একধরনের গালি ছিল। আমার ছেলে আগামীবছর মানে ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। সেটার কী হবে এখনও জানি না, তবে লকডাউন শুরুর পর থেকে আমি তাকে মজা করে 'করোনা ইন্টার' ডাকি। কারণ ২০২০ সালের পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ না পেলেও প্রস্তুতি প্রায় পুরোটাই নিয়েছিল। কিন্তু আগামী বছরের পরীক্ষার্থীরা তো ঠিকমতো ক্লাস করারই সুযোগ পায়নি। প্রস্তুতি যতই নিক, এবারের অটো এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীদের সারাজীবন 'অটো ইন্টার', 'করোনা ইন্টার' বা 'টি-২০ ইন্টার' শুনতে হবে। শুধু মজা করে বলা নয়, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে, চাকরির ক্ষেত্রে তাদের বাঁকা চোখে দেখা হবে, বঞ্চিত করা হবে। তারচেয়ে বড় কথা মূল্যায়ন নিয়েও জটিলতা কম হবে না। অনেক শিক্ষার্থী আছে, জেএসসি, এসএসসি পরীক্ষায় ঘাটতিটুকু পুষিয়ে নিতে চায়। যখন বোঝে এইচএসসির রেজাল্টই ভবিষ্যতের আসল চাবি, তখন জানপ্রাণ দিয়ে খেটে শেষ দৌড়ে জিততে চায়। কিন্তু এবার সেই ওস্তাদরা শেষ রাতে মাইর দেয়ার সুযোগটা পেলেন না।

আগেই বলেছি, পরীক্ষা বাতিল না করে সরকারের কিছু করার ছিল না। কিন্তু আমি জানি প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীবান্ধব। শিক্ষা উপমন্ত্রীও দারুণ ডায়নামিক। আমি জানি, শিক্ষা টিম পরীক্ষা বাতিল থেকে সৃষ্ট বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব জটিলতা নিরসনে কাজ করছে। আমার খালি চাওয়া, আমাদের সন্তানরা যেন বঞ্চিত না হয়, অবহেলিত না হয়। এই প্রজন্মটা বড্ড দুর্ভাগা। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন তাদের শিক্ষাজীবনকে বিঘ্নিত করেছে, আর এবার করলো করোনা।

লেখাটি শেষ করছি, ফেসবুক থেকে পাওয়া দুটি কৌতুক দিয়ে। একটি কার্টুনে রিজেন্ট সাহেদ বলছে, ‘খালি আমি পরীক্ষা ছাড়া রেজাল্ট দিলেই দোষ’। পরের কৌতুকটি আরো ক্রিয়েটিভ। এক সাংবাদিক এক এইচএসসি পরীক্ষার্থীর কাছে জানতে চাইলেন, পরীক্ষা ছাড়া গড় করে অটো পাস দেওয়া কি ঠিক হলো? তার উত্তর হলো, ‘২০০৮ সালের নির্বাচনের ফলের গড় দিয়ে যদি ২০১৪ ও ২০১৮ সালের এমপিরা অটো পাস করতে পারেন; দুই পরীক্ষর ফলের গড় দিয়ে এক পরীক্ষায় অটো পাস দিলে সমস্যা কোথায়?’

 

প্রভাষ আমিন: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

শেয়ার করুন