20201002104319.jpg
হেফাজতে মৃত্যু, পুলিশের ক্ষমতা ও আকবরের আলিশান বাড়ি

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে নাগরিকদের আটক করে প্রত্যাশা অনুযায়ী টাকা দিতে না পারলে বা প্রতিপক্ষের কাছ থেকে টাকা খেয়ে আটক করে নির্যাতন, মিথ্যা মামলায় চালান এমনকি গুম করে দেওয়ার অভিযোগও ভুরি ভুরি

হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ আইন পাসের সাত বছর পরে, দেশের ইতিহাসে প্রথম এই আইনে দায়ের করা একটি মামলার রায় হওয়ার ঠিক এক মাসের মাথায় সিলেটে পুলিশের নির্যাতনে এক যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।

অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারের নাম আকবর হোসেন ভূঁইয়া। তিনি সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ছিলেন। ঘটনার পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার বেড়তলা বগইর গ্রামে তার একটি বিলাসবহুল বাড়ির ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাসছে। প্রশ্ন উঠেছে, ২০০৭ সালে কনস্টেবল পদে চাকরিতে যোগ দিয়ে পরবর্তীতে এসআই হওয়া একজন পুলিশ অফিসার কী করে এরকম একটি বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করলেন? তার পদের একজন পুলিশ অফিসারের এরকম একটি বাড়ি বানাতে পারার কথা নয়, যদি বেতনের পয়সায় তাকে সংসার চালাতে হয়।

অভিযোগ, গত ১১ অক্টোবর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে রায়হান উদ্দিন নামে এক যুবককে নির্যাতন করেন এসআই আকবর। এতে রায়হানের মৃত্যু হয়। ঘটনার পরে হত্যা মামলা করে নিহতের পরিবার।

এসআই আকবরের এই ঘটনায় কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। এর মধ্যে একটি এরকম যে, কারো অপরাধের খবর জানাজানি হওয়ার পরেই তার সম্পদের বিবরণী বেরিয়ে আসে কেন? অপরাধ ধরা পড়ার আগে কেন এসব জানা যায় না? সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করে? শুধু কি একজন এসআইয়ের এরকম বিলাসবহুল বাড়ি? সারা দেশে এরকম কতজন এসআই বা ওসির বিলাসবহুল বাড়ি আছে—সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলো কি আদৌ এই অনুসন্ধান চালাতে আগ্রহী? অবস্থাটা এখন এমন হয়েছে যে, যতক্ষণ কেউ ধরা না পড়বে ততক্ষণ সে ফেরেশতা, আর ধরা পড়লেই শয়তান। ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত দলের ত্যাগী কর্মী, আদর্শের সৈনিক। কিন্তু ধরা পড়লেই অনুপ্রবেশকারী। মূলত এই প্রবণতাই অপরাধীদের অপরাধে উৎসাহিত করে।

পাঠককে স্মরণ করিয়ে দিই, ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ বিলটি এনেছিলেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী। তিনি তখন শুধু এমপি। মন্ত্রী নন। মানে সেটি ছিল বেসরকারি সদস্য বিল। সাধারণত বেসরকারি সদস্য বিল এমপিদের কণ্ঠভোটে বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ বিলটি পাস করার ব্যাপারে সরকার এবং যদ্দুর জানা যায়, তৎকালীন স্পিকার (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি) জনাব আবদুল হামিদও যথেষ্ট আন্তরিক ছিলেন।

কিন্তু দুঃখজনক হলো, এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ তথা স্পর্শকাতর ইস্যুতে বেসরকারি সদস্য বিলও যে সরকারের আমলে পাস হয়ে যায়, সেই সরকারের আমলে নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু বন্ধ হয়নি। আবার যে পরিমাণ ঘটনা ঘটেছে, সেই তুলনায় মামলাও হয়েছে কম। গত ৯ জানুয়ারি বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আইনে এখন পর্যন্ত কতগুলো মামলার বিচার হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই আইনে মামলা হয়েছে মাত্র ১৭টি। অথচ মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই জেল কাস্টডিতে মারা গেছেন ৫৩ জন।

এই আইনে দায়ের করা মামলার প্রথম রায় হয় ঘটনার ৬ বছর পরে। ২০১৪ সালে পুলিশের হেফাজতে জনি নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় দেয়া হয় গত ৯ সেপ্টেম্বর। এতে পাঁচ আসামির মধ্যে তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপর দু্জনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত।

 

২.

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে নাগরিকদের আটক করে প্রত্যাশা অনুযায়ী টাকা দিতে না পারলে বা প্রতিপক্ষের কাছ থেকে টাকা খেয়ে আটক করে নির্যাতন; মিথ্যা মামলায় চালান করে দেওয়া এমনকি গুম করে দেওয়ার অভিযোগও ভুরি ভুরি। কিন্তু এসব ঘটনার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকে না। ভিডিও থাকে না। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা বাদ দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা মানুষ মারার দায়ে শাস্তি পেয়েছে, সেই সংখ্যা অতি নগণ্য।

হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন পাসের আগে এরকম দুটি ঘটনায় বিচার হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে—রাজধানীতে শিক্ষার্থী রুবেল হোসেন ডিবি পুলিশের হেফাজতে থাকার সময় মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় ২০০২ সালের ১৭ জুন রায় দেন বিচারিক আদালত। তখন ডিবি পুলিশের তৎকালীন সহকারী কমিশনার মো. আকরাম হোসেনসহ ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। এই রায়ের বিরুদ্ধে ওই বছরই আপিল করে আসামিপক্ষ। এরপর হাইকোর্ট ১৩ আসামিকে খালাস দেন।

২০০৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর পুলিশের হাতে খুন হয়েছিলেন জাসদ ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. মোমিন। হত্যা-মামলায় কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে ২০১১ সালের ২০ জুলাই মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। তবে রফিকুল ইসলাম কারাগারে থাকা অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর বাইরে ২০১৪ সালে রাজধানীতে মাহাবুবুর রহমান ওরফে সুজন নামে একজন ঝুট ব্যবসায়ীকে হত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছিল মিরপুর থানার সাবেক ওসি সালাউদ্দিনসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে। কিন্তু ওই মামলাটি শেষ হবার আগেই ২০১৬ সালের পয়লা জুলাই তিনি গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় নিহত হন।

 

৩.

নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু রোধে দেশে যে আইন আছে সেখানে বলা হয়েছে, হেফাজতে কাউকে নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি অন্যূন পাঁচ বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অন্যূন পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং তার অতিরিক্ত পঁচিশ হাজার টাকা ক্ষতিগ্রস্ত/সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি/ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেবেন। আইনে আরও বলা হয়েছে, কাউকে হেফাজতে নির্যাতনের ফলে যদি তার মৃত্যু হয় তাহলে নির্যাতনকারী অন্যূন যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং তার অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত/সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি/ব্যক্তিদেরকে ক্ষতিপূরণ দেবেন।

অন্যান্য আইনে যেমন ভুক্তভোগী নিজে অথবা তার পরিবারকে মামলা করতে হয়, এই আইনে সেই বিধানও শিথিল। অর্থাৎ রাষ্ট্রের যেকোনো নাগরিক আদালতে গিয়ে এই অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন যে, অমুককে হেফাজতে নির্যাতন করা হয়েছে। আইনের ৬ (১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্যাতন করিয়াছে বা করিতেছে এইরূপ কোনো তথ্য তৃতীয় কোনো ব্যক্তি আদালতকে অবহিত করিলে আদালত ধারা ৫ মোতাবেক অভিযোগকারীর বিবৃতির ওপর নিজের মন্তব্য লিপিবদ্ধ করিয়া উক্ত ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধান করিবেন। (২) যদি অভিযোগকারীর বক্তব্যে আদালত এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে, ঘটনাস্থলে পরিদর্শন করা প্রয়োজন তাহা হইলে আদালত উক্ত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করিতে পারিবেন।

এই আইনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই প্রমাণ করতে হবে যে তিনি অপরাধ করেননি। ১৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা অথবা তাহার পক্ষে কর্তব্যরত কোনো ব্যক্তির গাফিলতি বা অসতর্কতার কারণে অভিযোগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হইলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই প্রমাণ করিতে হইবে যে, তাহার বা তাহার পক্ষে কর্তব্যরত ব্যক্তির গাফিলতি বা অসতর্কতার কারণে ওই ক্ষতি হয় নাই।

তবে এটা ঠিক যে, এরকম একটি জনবান্ধন আইন থাকার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন। কারণ একবার কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হলে, পরবর্তী হয়রানির ভয়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা পরিবার আইনের আশ্রয় নিতে চায় না। রাষ্ট্র তাকে সেই সুরক্ষাও দিতে পারে না। একজন পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য কোনো বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করার পরে সেই ব্যক্তি বা পরিবারকে যে আরও কত ভয়াবহ সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কারো পক্ষে ধারণা করাও অসম্ভব। বিচার তো দূরে থাক, উল্টো নিত্য নতুন মামলা অথবা ভয়-ভীতির মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়। ফলে খুব সাহসী এবং প্রভাবশালী না হলে কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঘাটাতে চায় না। বরং অধিকাংশেরই ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা হয়।

শুধু তাই নয়, পুলিশ এই ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ বাতিলে বিভিন্ন সময়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছে। যে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জনগণের প্রতিনিধি সংসদ সদস্যরা যথেষ্ট আলাপ-আলোচনা আর বিচার-বিশ্লেষণের পরে মানবাধিকারের সুরক্ষায় একটি আইন পাস করলেন, পুলিশের মতো একটি বাহিনীর কী করে সেই আইন বাতিল চায়, বা কী করে তাদের এই দাবি তোলার সাহস হয়—সে প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

 

৪.

কেন নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন বা মৃত্যু রোধ হয় না তার পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। যেমন সরকার একটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থেকে নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুরোধে আইন করলেও এও ঠিক যে, এই আইনকে তারা প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করে। যখন কোনো একটি আইনকে সরকার তার নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে, তখন ওই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান যদি আইনটির অপব্যবহার করে, তখন সেখানে বাধা দেওয়ার নৈতিক অধিকার সরকারের থাকে না। সরকার যখন কোনো আইনকে তার প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য ব্যবহার করে, তখন সেই আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা সরকারি বাহিনীর লোকেরা তাদের নিজেদের স্বার্থে, যেমন প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে কাউকে নির্যাতন এমনকি হত্যা করলেও সেখানে সরকারের তরফে খুব শক্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন।

দ্বিতীয়ত, যখন খোদ জাতীয় সংসদেই ক্রসফায়ারের পক্ষে সংসদ সদস্যরা বক্তব্য দেন বা সাফাই গান, তখন নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন অথবা মৃত্যুর বিপক্ষে তাদের অবস্থান সাংঘর্ষিক হয়। কেননা, ক্রসফায়ারও একধরনের নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু। কারণ আইনশৃঙ্খলা বা গোয়েন্দা বাহিনী যখন কাউকে আটক বা গ্রেফতার করে, তাদের প্রথম দায়িত্ব হয় তাকে দ্রুততম সময়ে আদালতে তোলা। কিন্তু সেটি না করে কথিত অস্ত্র উদ্ধারের নামে তাকে গুলি করে হত্যা করে। তার মানে আইনশৃঙ্খলা বা গোয়েন্দা বাহিনীর হাতে কেউ আটক বা গ্রেফতারের পর তিনি সেই বাহিনীর হেফাজতে চলে যান। সেই অবস্থায় তার মৃত্যু মানেই হেফাজতে মৃত্যু। ফলে এ যাবত যতগুলো কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে, তার প্রত্যেকটিকে চ্যালেঞ্জ করে এই আইনের মামলা হতে পারে। কিন্তু কে কার বিরুদ্ধে মামলা করবে বা আইনের আশ্রয় নেবে? বরং এ জাতীয় বিচারবহির্ভুত হত্যার মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনী যেভাবে প্রচলিত বিচারব্যবস্থার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়, এখন সেটিকেই বৈধতা দেওয়া হয় খোদ জাতীয় সংসদে—যে জাতীয় সংসদেই পাস হয়েছে নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ বিল।

 

৫.

আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাই শুধু নয়, যেকোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন—যদি না নিরপেক্ষ তদন্ত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আনীত বা উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত করেন তাদের সহকর্মীরাই। যে কারণে বড় ঘটনার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগীয় তদন্ত বা অন্য কোনো বাহিনী বা সংস্থার মাধ্যমের তদন্তের দাবি জানানো হয়।

আকবরের ঘটনাটির তদন্ত করছে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট পিবিআই। ফলে এটি আশা করা যায় যে, তদন্ত নিরপেক্ষ হবে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, সরকারি কর্মচারীদের সুরক্ষাবলয় খুবই শক্ত। প্রতিটি আইনের শেষ অধ্যায়ে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বলে একটি বিষয় যুক্ত থাকে—যার দোহাই দিয়ে অনেক সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যান। আকবরের ক্ষেত্রেও যদি এটি প্রমাণিত হয় যে, তিনি হত্যার উদ্দেশে মারধর করেননি বরং তথ্য আদায়ের জন্য ‘মৃদু প্রহার’ করেছেন এবং ময়নাতদন্ত রিপোর্ট যদি ‘আনবায়াসড’ বা প্রভাবমুক্ত না হয়, তাহলে আকবরকে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা কঠিন হবে। এ জন্য বিচারিক প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ঘটনার তদন্ত এবং নিহতের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। এ দুটি জায়গায় দায়িত্বরত ব্যক্তিরা নিরপেক্ষ এবং প্রভাবমুক্ত থাকতে পারলে প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সহজ। কারণ গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ধরনের প্রতিক্রিয়াই থাকুক না কেন, তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণ করা না গেলে আদালত সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে পারবেন না। অতএব সিলেটের রায়হানের মামলার পরিণতি কী হবে, পুলিশ অফিসার আকবরকে আসলেই শাস্তির মুখোমুখি করা এবং রায় কার্যকর যাবে কি না; গেলেও তাতে কত বছর লাগবে—সেই প্রশ্নগুলোও জনমনে রয়েছ।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ৩০ জুলাই সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির (কমিটি অ্যাগেইনস্ট টর্চার) সভায়ও ঘুরেফিরে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর জবাবদিহিতা না থাকার বিষয়টি এসেছে। সভায় ২০১৩ সালের নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনের বেশ কিছু দুর্বলতার দিকও তুলে ধরা হয়। এমন প্রশ্নও তোলা হয় যে, পুলিশ কি এতটাই স্বাধীন যে রাষ্ট্রের ভেতরে তারা আরেকটি রাষ্ট্র?

 

আমীন আল রশীদ: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন

শেয়ার করুন