20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
অন্তরে সমর্থন, বাহিরে আন্দোলন

রাজু ভাস্কর্যের নিচে মেয়েটি অনশন করে গেছেন। অথচ শাহাবাগে চলমান আন্দোলনের কাউকে মেয়েটার অভিযোগ স্পর্শ করে নি। তারাও নুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেয়েটাকে অবিশ্বাস করে গেছে।

ধর্ষণের বিচার চাই, কিন্তু আমার দলের ধর্ষকের না। ধর্ষণের বিচার চাই, কিন্তু মেয়েটা দুশ্চরিত্র। ধর্ষণের বিচার চাই, কিন্তু মেয়েটা নাটক করছে। ধর্ষণের শিকার সকল নারীর পাশে আছি, কিন্তু আমার বিরুদ্ধে, আমাদের নেতার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছে, তার পাশে ছাড়া।

এই হলো চলমান ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের একাংশের অবস্থান। হ্যাঁ, আমি ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা এবং সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুরের কথাই বলছি।

ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বলা সহজ নয়, যেমন সহজ নয় ধর্ষকামী মানসিকতা নিয়ে ধর্ষণকারীর নিঃশর্ত বিচার চাওয়া। ধর্ষণের বিচার ও শাস্তি নয়, যখন কারো আন্দোলন-প্রতিবাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হয় সেই প্রতিবাদে সওয়ার হয়ে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ফায়দা লোটা, তখন কোনো না কোনোভাবে এইরকম দ্বিচারিতা প্রকাশিত হবেই, যেমন হয়েছে সাবেক ভিপি নুরের ক্ষেত্রে।

ঝোঁক উঠলে বহু প্রকাশ্য ধর্ষণকারী, গোপন ধর্ষণকারী, ধর্ষণকারীর সহযোগী, ধর্ষণকারীর সমর্থনকারী, ধর্ষণের জন্য নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা এমন অসংখ্য মানুষ দিব্যি মুখোশ এঁটে প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে যায়। কেউ ট্রেন্ডি হতে চায়, তো কারো মনে গোপন এজেন্ডা থাকে। গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে একবার ঢুকতে পারলে ধীরে ধীরে সেই গোপন এজেন্ডা বের করে। এবং সেই এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পুরো আন্দোলনটাকেই বিতর্কিত করে ছাড়ে এই ধর্ষকামী ভন্ডগুলা। সেই ঘটনারই পুনরাাবৃত্তি ঘটালেন ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা নূর।

দীর্ঘদিনের আন্দোলন, সংগ্রাম এবং লেখালেখির অভিজ্ঞতা থেকে জানি, আন্দোলনের মাঠে আমার পাশে দাঁড়ানো পুরুষটাও হতে পারে গোপন ধর্ষণকারী। যে পুরুষটি ধর্ষণ করে, সে শুধু নিপীড়নের কাজটি সম্পাদন করে মাত্র। তার কাজের পিছনে নিরন্তর সমর্থন যোগায় ধর্ষণের জন্য নারীকে, নারীর পোশাককে, নারীর চরিত্রকে দোষারোপ করতে থাকা এই সমাজ, রাষ্ট্র, পুরুষ ও নারীকুল। অন্তরের অন্তঃস্থলে তারা সকলেই ধর্ষণকারী বা ধর্ষণকারীর সহযোগী।

ভিপি নুরের সংগঠন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের একজন নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেছে সেই সংগঠনেরই আরেক নারীকর্মী। যে নারী কর্মীটি কিনা তাদের দুঃসময়ে পাশে থেকেছেন সবসময়, সংগঠনের কেউ প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হলে যে মেয়েটি খাবার রান্না করে নিয়ে যেতেন, সেই মেয়েটিই যখন ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগ নিয়ে তার কাছে বিচার চাইতে গেছেন, তখন নুর মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন অবলীলায়। ভিকটিম মেয়েটার পাশে নয়, উল্টো অভিযুক্ত ধর্ষণকারীর পাশে দাঁড়িয়েছেন, সংগঠনের সাথে মেয়েটার সম্পর্ক শুধু অস্বীকারই করেন নি, তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করেছেন এবং লাইভে এসে মেয়েটাকে ‘দুশ্চরিত্রা’ বলেছেন।

এরা জানেন না এমনকি যৌনকর্মীকেও ধর্ষণ করা যায় না। এরা না বোঝেন ধর্ষণের শিকার নারীর বাস্তবতা, না বোঝেন চরিত্র কাকে বলে, না বোঝেন কোনটা নিপীড়ন, না বোঝেন কোনটা ভিকটিম ব্লেইমিং। অথচ, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের নেতা হয়ে বসে আছেন।

এসব নতুন নয় আমাদের কাছে। বহুদিনের সংগ্রামে দাঁড়িয়ে আমরা এসব হাড়ে হাড়ে জানি। শুধু হতাশা এইটুকুই যে, আন্দোলনের অপর অংশটিও এই দ্বিচারিতা থেকে বের হতে পারে নি।

রাজু ভাস্কর্যের নিচে ভিকটিম মেয়েটি দিনের পর দিন একা অনশন করে গেছেন। অথচ শাহাবাগে চলমান আন্দোলনের কাউকে মেয়েটার অভিযোগ স্পর্শ করে নি। তারাও নুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেয়েটাকে অবিশ্বাস করে গেছে। কাছে যাওয়াতো দূরের কথা, দূর থেকে হলেও কোনোরকম সংহতি জানায় নি। অন্তত এইটুকুও বলতে পারে নি, অভিযোগ খতিয়ে দেখা হোক। অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হোক।

ধর্ষণের বাস্তবতা বোঝা এবং পক্ষপাতহীন প্রতিবাদ আসলেই কঠিন। কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তির বিধান করেও কিছুই বদলাবে না, যতোদিন এই ধর্ষকামী মানসিকতা এবং সিলেক্টিভ প্রতিবাদের মানসিকতা না বদলাবে।

সকলের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

শাশ্বতী বিপ্লব: কলাম লেখক

শেয়ার করুন

মন্তব্য