20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
মৃত্যুদণ্ড যথেষ্ট কি

দেশে ধর্ষকদের অভয়রাণ্য হওয়ার পেছনে বড় কারণ বিচারের দৃষ্টান্তের অপ্রতুলতা। বিচার কম হওয়ার পেছনে দায়ী অভিযোগ থেকে শুরু করে রায় হওয়া পর্যন্ত নানান কাঠামোগত দুর্বলতা।

ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করার পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে এসেছে জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে, যেখানে ধরে নেয়া হয়েছে যে সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডেরর ভয় থাকলে ধর্ষণ কমতে পারে। এই ধারণা অনেকখানি শাস্তির নিবৃতিমূলক তত্ত্বের (Deterrence theory) প্রতিফলন। মনে করা হচ্ছে, মৃত্যুর ভয় থাকলে সম্ভাব্য অপরাধী নিজেকে প্রতিহত করবে। অনেকে আমাকে এও বলেছেন্ যে এই সংস্কারের মাধ্যমে শরিয়া আইনের একটা হালকা প্রতিফলন আমাদের রাষ্ট্রীয় আইনে আসবে যা সংখ্যাগুরু মুসলমানদের জন্য “ভালো”!

কিন্তু এর প্রতিরোধমূলক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থায় ধর্ষণ কখনই অগুরুত্বপূর্ণ অপরাধ ছিল না। ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় ১৮৬০-এর দণ্ডবিধিতে। এরপর ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এর শাস্তির রূপরেখায় ভিন্নতা আনা হয়। ধর্ষণের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ধর্ষণের পর খুন বা ধর্ষণের ফলে মৃত্যু হলে মৃত্যুদণ্ড এবং দলগত ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান আমাদের আইনে আছে। কিন্তু ২০০০ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ধর্ষণসহ নারীর প্রতি (এসিড সন্ত্রাস ব্যতীত) অন্যান্য সহিংসতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। এর ফলে প্রশ্ন ওঠে, আইন পরিবর্তন করে শাস্তি বাড়ানো আদতে কতটা অর্থবহ?

ধর্ষণ করার সময় ধর্ষক আইনের ধারা পড়ে শাস্তির মেয়াদ সম্পর্কে ধারণা নিয়ে আসেন না। বাংলাদেশে ধর্ষকদের অভয়রাণ্য হওয়ার পেছনে বড় কারণ বিচারের দৃষ্টান্তের অপ্রতুলতা। বিচার কম হওয়ার পেছনে দায়ী অভিযোগ থেকে শুরু করে রায় হওয়া পর্যন্ত নানান কাঠামোগত দুর্বলতা।

অর্থবহ পরিবর্তন সহজে আসে না। আইনের সংশোধনী এনে যাবজ্জীবনের বদলে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আসা সহজ প্রক্রিয়া। কঠিন হলো কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক সংশোধনের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনা, যার ফলে এ সমাজের মানুষ (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) ধর্ষণের মতো অপরাধ করার ঘৃণ্যতা এবং ভয়াবহতা অনুভব করবে।

দীর্ঘ ১০-১২ বছর কারাগারে আটকে থাকাও কিন্তু শাস্তি হিসেবে কম ভয়াবহ নয়। সেই শাস্তি আইনে ছিল এবং সেই আইনে ধর্ষণ কমেনি। কাজেই এখানে দেখা দরকার, আইন থাকা সত্তেও ধর্ষণ কমেনি কেন।

শাস্তিসংক্রান্ত নানা গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কিছু আইনি বিষয় অপরাধ হ্রাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ: এক, কেবল শাস্তির মাত্রা নয় বরং শাস্তির নিশ্চয়তা মানুষকে অপরাধ থেকে নিরস্ত করতে বেশি কার্যকরী; দুই, অপরাধ সংঘটনের প্রয়োজনীয় সুযোগ পাওয়া কঠিন করা গেলে মানুষ সেই অপরাধ সহজে করতে পারে না। কারণ এর ফলে তার পরিশ্রম ও ঝুঁকি বেড়ে যায় (যেমন এসিডের সহজলভ্যতা কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের এসিড সন্ত্রস দমনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে); এবং তিন, নারীর প্রতি সহিংসতা সংক্রান্ত অপরাধের সাথে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ধ্যানধারণা জড়িয়ে থাকে, ফলে সেসব অপরাধ দমনে আইন মোটেও যথেষ্ঠ নয়, পাশাপাশি সামাজিক পদক্ষেপ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই তৃতীয় দিকটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে ধর্ষণের মামলা প্রমাণিত হওয়ার হার খুব কম। যে কোনো মামলায় সাজা না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ শাস্তির পরিমাণ কম হওয়া নয়, বরং অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারা। একজন বিচারক শাস্তি কেবল তখনই দেবেন, যখন প্রসিকিউটর আদালতে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেন।

বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলায় অভিযোগ প্রমাণে অনেক রকম কাঠামোগত দুর্বলতা আছে। প্রথমেই আসে সামাজিক বাস্তবতা: গবেষণায় প্রমাণিত যে বাংলাদেশের সিংহভাগ ধর্ষণ হয়ে থাকে পরিচিত মানুষের দ্বারা। এর অর্থ সার্ভাইভর সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক চাপের মুখে মামলা করেন না। ফলে অনেক ঘটনা অপ্রতিবেদিত থাকে আর মামলা করলেও তাতে অনেক কালক্ষেপণ হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ (বীর্য প্রভৃতি) জোগাড় করা যায় না।

আমাদের সমাজে নারীর শারীরিক পবিত্রতাকে কিংবদন্তির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে অনেক সার্ভাইভর, বিশেষ করে যারা ধর্ষণের মামলার কার্যবিধি সম্পর্কে জানেন না, তাঁরা ধর্ষণের পরপরই গোসল করে ফেলেন, যার ফলে প্রমাণ হারিয়ে যায়।

এরপর আসে তদন্তের কথা। ভয়েস অফ আমেরিকার এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে যারা কাজ করেন, তাঁদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, ধর্ষণের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারী দায়ি। এমন মানসিকতা নিয়ে তদন্ত করা হলে নারীর পক্ষে যায় এমন অনেক প্রমাণ চোখ এড়িয়ে যাবে, এমনটা অনুমান করা কঠিন নয়।

তাছাড়া, ধর্ষণ যেহেতু ক্ষমতার প্রতিফলন, বেশিরভাগ ধর্ষণের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি খাটিয়ে সাক্ষীদের ভয় দেখান, প্রমাণ লোপাট করে দেন, মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করেন।

আমাদের আইনে সাক্ষীর সুরক্ষা সংক্রান্ত বিধান নেই। ফলে অবদমিত সাক্ষী যখন আদালতে গরহাজির হন, তখন মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে। আমাদের সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে সচেতনতার অভাব থাকায় অনেক সাক্ষী নির্দিষ্ট দিনে আদালতে উপস্থিত থাকেন না। এমন নানা কারণে দিনের পর দিন মামলা ঝুলে থাকে, যদিও আইন অনুযায়ী এসব মামলা ১৮০ দিনে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। ১৮০দিনে যেন বিচার নিষ্পত্তি হয় সে লক্ষ্যে আমাদের উচ্চ আদালত ২০১৬ সালে একটি কমিটি ও মনিটরিং সেল গঠনের নির্দেশ দিলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয় নি।

পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার আরেকটি প্রতিফলন ঘটে মেডিকেল রিপোর্টে। এখনও অনেক চিকিৎসক সার্ভাইভরের দেহে নানারকম জখম এবং অভিযুক্তের দেহ পরীক্ষা করার সময় আত্মরক্ষার চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করেন। এখানে পূর্বানুমান থাকে যে, বলপুর্বক যৌন সম্পর্ক হলে নিশ্চয়ই বাদী ধর্ষণকারীকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিটি ধর্ষণের প্রেক্ষাপট আলাদা এবং সব ক্ষেত্রে বাদি বাধা দেয়ার মত অবস্থায় থাকেন না, বিশেষ করে যদি তিনি ভয়ে অসাড় হয়ে পড়েন। এমন আত্মরক্ষামূলক চিহ্ন না থাকলে বাদীকে মিথ্যাবাদি প্রমাণ করার একটি প্রবণতা আমাদের বিচারিক সংস্কৃতিতে আছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের আদালতে সম্মতির ওপর জোর না দিয়ে বলপূর্বক পেনিট্রেশনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। অথচ ধর্ষণের মূল কথা হল সম্মতিহীন যৌন সম্পর্কে বাধ্য হওয়া।

এ সব কিছুর সাথে বিষফোঁড়ার মতো আছে সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা। এই ধারা মোতাবেক, ধর্ষণের মামলায় বাদির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এর মানে হলো আদালতে দেখানো হয় বাদীর ছেলেবন্ধু ছিল কিনা, তিনি পুরুষদের সাথে মেলামেশা করতেন কিনা, ধর্ষণকারীকে আগে থেকে চিনতেন কিনা ইত্যাদি। নানান অপ্রাসঙ্গিক কিন্তু অপমানজনক তথ্য আদালতে এনে যেভাবে বাদীদের অপদস্থ করা হয়, তাতে ধর্ষণ প্রমাণ করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।

এতসব কাঠামোগত দুর্বলতা যদি সংস্কার করা না হয়, সেক্ষেত্রে কেবল শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে জাদুর বশে ধর্ষণ প্রতিহত হবে না। সন্দেহাতীতভাবে দোষ প্রমাণ না হলে গুরুতর অপরাধের রায় দেয়া যায় না এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম শাস্তির বিধান থাকলে বিচারক আরও বেশি সাবধানে সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই করবেন, যেন ভুলবশত কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি সাজা না পান। কাজেই মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখলেই যে হথাৎ করে সবাই ভয় পেয়ে ধর্ষণ কমিয়ে ফেলবেন, সে আশার গুড়ে বালি।

সুপ্রতিষ্ঠিত সামাজিক-আইনি গবেষণার ভিত্তিতে আমাদের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংশোধন আনা প্রয়োজন। পুরুষ ধর্ষণ করে কারণ সে নারীকে মানুষ ভাবে না, নারীকে সে নিজের চাইতে নিচু ভাবে, নারী যে ‘না’ বলতে পারে তা মানে না এবং আমাদের চলচ্চিত্রে দেখানো হয় যে নারীর ‘না’ মানে ‘হ্যাঁ’।

ধর্ষণ কমাতে তাই দরকার সমাজের নারীবিদ্বেষী ধারণার মোকাবেলা করা, যেসব বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীকে পুরুষের ‘অধীনস্ত’ বলে শেখানো হয় তার মোকাবেলা করা এবং নারীকে পুরুষের সমাবস্থানে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা। এসব কাজ কঠিন, সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। কিন্তু ধর্ষণকে যেমন এ সমাজ বহুদিন ধরে বাড়তে দিয়েছে, তেমনি বহুদিনের পরিশ্রমেই এ সামাজিক পরিবর্তন এনে ধর্ষণ কমাতে হবে।

অর্পিতা শামস মিজান: সমাজ ও আইন নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

শেয়ার করুন

মন্তব্য