মৃত্যুদণ্ডই ধর্ষণের উপযুক্ত সাজা

এ ধরনের বর্বরোচিত অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি তথা মৃত্যুদণ্ডের বিধান না থাকলে সেটা হবে ধর্ষণের শিকার নারী এবং সমাজের প্রতি চরম অবিচার।

বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান আছে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাধারণ অর্থ আমৃত্যু কারাবাস। কিন্তু বাংলাদেশে এই বিধান নিয়ে বেশ ধোঁয়াশা রয়েছে। গত বছর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি রায়ে এর সমাধান দেওয়া হলেও এখনো এটি একটি বিতর্কিত বিষয়।

বাংলাদেশের জেল কোড অনুযায়ী এর মেয়াদ তিরিশ বছর। অন্যদিকে দণ্ডবিধি ৫৭ ধারা অনুযায়ী তা সাজার ভগ্নাংশ হিসাবে গণনা করা হয়। যেসব অপরাধের ক্ষেত্রে সাজা মৃত্যুদণ্ড ও জরিমানা, সেখানে জরিমানা অনাদায়ে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কারাগারে ভালো আচরণের জন্য জেল কোড অনুযায়ী ৩০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত একজন কয়েদিও মুক্তি পেতে পারেন। জেল কোড অনুযায়ী নয় মাসে এক বছর হয়।

অন্যদিকে দণ্ডবিধির ৫৫ ধারা অনুযায়ী সরকার চাইলে এই সাজা কমিয়ে ২০ বছর করতে পারে। আপিল বিভাগ বা হাইকোর্ট বিভাগে দণ্ড কমানোর পরও সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতি যে কোনো দণ্ড মার্জনা, স্থগিত ও কমাতে পারেন।

আইজি প্রিজনসেরও সাজা কমানোর ক্ষমতা রয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বিশ থেকে বাইশ বছর হতে পারে।

২০১৩ সালের আপিল বিভাগের একটি রায়ে যাবজ্জীবনের মেয়াদ সাড়ে ২২ বছর বলা হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৩৫ (ক) অনুযায়ী মোট সাজার মেয়াদকাল থেকে বিচারিক সময়ের হাজতবাসের সময় বাদ দিয়ে এই হিসাব করতে হবে।

যদিও, একটি রায়ে আপিল বিভাগ পরিষ্কার বলে দিয়েছে যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে আমৃত্যু কারাবাস, তবুও এটি নিয়ে এখনও অস্পষ্টতা দূর হয়নি।

এসব কারণে ধর্ষণের মতো একটা বর্বরোচিত অপরাধে কেবল কারাদণ্ডের বিধান ধর্ষককে উপযুক্ত কোনো সাজাই দিতে পারে না।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৯ ধারা মতে সাজাগুলো হলো: ১. যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

২. যদি কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তা হলে ওই ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

৩. যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে ওই নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তা হলে ওই দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

চীন, আফগানিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, ইরান, সৌদি আরব, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়াসহ অনেক দেশে ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার আইন রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান নিয়ে সংশয় থাকায়, অনেক ধর্ষক বা দণ্ডপ্রাপ্ত ভাবেন আজ হোক কাল হোক তারা জেল থেকে মুক্তি পাবেন।

এ ধরনের বর্বরোচিত অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি তথা মৃত্যুদণ্ডের বিধান না থাকলে সেটা হবে ধর্ষণের শিকার নারী এবং সমাজের প্রতি চরম অবিচার। যাদের ভেতর অপরাধ প্রবণতা রয়েছে তারা মৃত্যুদণ্ডে কিছুটা ভীত হয়ে, এসব অপরাধ করার আগে একবার হলেও ভাববেন। কাজেই এই ঘৃণ্য অপরাধের শাস্তি কেবল মৃত্যুদণ্ডই হওয়া উচিত।

ব্যারিস্টার মিতি সানজানা: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সমাজকর্মী

শেয়ার করুন