20201002104319.jpg
আভা মুর্তো আর জমসেরের মেয়ে

বাংলাদেশ ২০২০ সালের মধ্যে শিশু-বিয়ে নির্মূলের অঙ্গীকার করলেও বর্তমানে ৫২.৩ শতাংশ শিশু ১৮তম জন্মদিনের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হয়।

কাজের তাগিদে দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতে হয় আমাকে। একবার কুড়িগ্রামে নদী ভাঙন এলাকায় গিয়েছিলাম। শিশু-বিয়ে নিয়ে কাজ করার ক্ষুদ্র একটা অভিজ্ঞতা হয় সেখানে।

জমসের মিয়ার বাড়ি। এটাকে কোনো বাড়ি বলা যাবে না, সাকুল্যে একটা ঘর, বাঁধের পাশেই। বাবা-মা, ছেলে, ছেলের বউ, ১৪ বছর বছরের মেয়ে ও পাঁচ বছর বয়সী আরও একটা সন্তান। ছয় সদস্যের পরিবারের বাস ওই একটাই ঘরে। আয়তন ১৫০ বর্গফুট বা একটু কম বেশিও হতে পারে।

মূল বাড়ি নদীগর্ভে। বাড়ির দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে সম্প্রতি, ১৪ বছর বয়সে। কনে দেখার দিন দেনা-পাওনায় একমত হওয়ায় বর পক্ষ মেয়ে রেখে যায়নি। বরের ‘দাম ৪০ হাজার টাকা’। রান্নারও খুব একটা আয়োজন ছিল না। আলুভাজি, গরুর মাংস, সাদা ভাত আর শরবত।

মেয়ের জন্য কেনা হয়েছিল জড়ি পাড় লাল শাড়ি, দুই ফিতাওয়ালা লাল রংয়ের কলাপুরি স্যান্ডেল, দুই ডজন চুরি। এই আয়োজনেই দম যায় জমসের মিয়ার।

১৪ বছর বয়সে বিয়ে কেন? মূল কারণ হিসেবে উঠে এলো ‘সেয়ানা মাইয়া, পোলা-পোলার বউ সব নিয়া কিবায় থাকি, উপায় আছাল না গো সোনা’। আর্থিক দীনতা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, পাছে লোকে কিছু বলে বিষয়গুলো জমসের মিয়ার স্ত্রীর কথার ফাঁকে ফাঁকে উঠে এলো।

এটা আমার দেশের ৫২.৩ শতাংশ কন্যাশিশুর ঘরের গল্প। আয়োজনে হয়তো ব্যতিক্রম খুঁজে পাবেন। কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত গল্পটা মোটেই ব্যতিক্রম নয়।১৮তম জন্মদিনের আগে যে শিশুটিকে জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে পা রাখতে হয় সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তা, অজানা, অচেনা এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অপছন্দের একটি মানুষের সঙ্গে। তার জীবনের বাকি অধ্যায়গুলোর গল্প অনুধাবন করা আমার-আপনার পক্ষে কাগজে কলমে লেখা বাক্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২১ ভাগ কিশোর, যার সংখ্যা তিন কোটি ৪০ লাখ। এদের বয়স ১০ থেকে ১৯ এর মধ্যে। যাদের অর্ধেক কিশোরী। শতাংশের হিসেবে কিশোরী বধূর সংখ্যায় নাইজারের পরে দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ।

২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গার্লস সামিটে বাংলাদেশ ২০২০ সালের মধ্যে শিশু-বিয়ে নির্মূলের অঙ্গীকার করলেও বর্তমানে ৫২.৩ শতাংশ শিশু ১৮তম জন্মদিনের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হয়। গার্লস সামিটে স্বাক্ষরিত সনদের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ কিছু উদ্যোগ রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রাথমিকে ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা কমিয়ে আনা, জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। কিন্তু ২০১৯ সালে দেশে প্রতিদিন তিন জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি। ২০২০ সালে এটি আরও ঊর্ধ্বমুখী।

বিশ্বব্যাপাী শিশু-বিয়ে নির্মূলে জোড়ালো অঙ্গীকার থাকলেও বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন কন্যাশিশুর বিয়ে হয়। এসডিজির লক্ষ্য ৫.৩ অর্জনে বাস্তবসম্মত ও শক্তিশালী উদ্যোগ না নিলে, ২০৩০ সালের আগে ১২০ মিলিয়ন শিশু তার ১৮তম জন্মদিনের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসবে (ইউনিসেফ প্রতিবেদন অনুযায়ী)। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক মন্দা, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধীরগতির সঙ্গে যোগ হবে আরও ১৩ মিলিয়ন শিশু (ইউএনএফপিএ প্রতিবেদন অনুযায়ী)।

বিশ্বে প্রতি ১০ জনে এক জন কন্যাকে জোড়পূর্বক যৌন সম্পর্কে বা অন্যান্য যৌন ক্রিয়াকলাপে বাধ্য করা হয়, যাদের বয়স ২০ এর নিচে। এর সংখ্যা প্রায় ১২০ মিলিয়ন। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি।

এ বছরের আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু অধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আমার কণ্ঠস্বর আমাদের সমতার ভবিষ্যৎ’। বেইজিং প্ল্যাটফর্ম ফর অ্যাকশনের ২৫ বছর পূর্তিতে বিশ্বব্যাপী নারী এবং কন্যাশিশুর অগ্রগতি এজেন্ডাকে সামনে রেখে এই প্রতিপাদ্য। ২০২০ এর বৈশ্বিক এজেন্ডা এবং কন্যাশিশুর অধিকার সুরক্ষার বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই প্রতিপাদ্য কতটা সাযুজ্যপূর্ণ?

‘কন্যা শিশু অধিকার সুরক্ষা এবং ক্ষমতায়ন’ প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সান্না মেরিন ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীর হাতে একদিনের জন্য দেশের দায়িত্ব দিয়েছেন ৭ অক্টোবর।

আভা মুর্তো নামের দক্ষিণ ফিনল্যান্ডে বসবাসকারী ১৬ বছরের ওই কিশোরী অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে। এ সময়ে সে মিডিয়া, বিচার বিভাগ, পার্লামেন্ট, পরিবেশ ও মানবাধিকার সুরক্ষায় কর্মরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। একই উদ্যোগের পরিকল্পনা রয়েছে কেনিয়া, পেরু, সুদান, ভিয়েতনামের।

আভা মুর্তোর ক্ষমতায়নের সূচক- একদিনের জন্য দেশকে নেতৃত্ব দেওয়া আর জমসের মিয়ার মেয়েরা ক্ষমতায়িত হয় ভাঙা ঘরের এক কোণায় একটা পার্টিশন থাকলে। ভাঙা ঘরের নিভু আলোয় পড়ার সুযোগ পেলে। পরিবার ও সমাজ তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে।

একজন আভা মুর্তো তৈরিতে কাজ করেছে পরিবার, সংগঠন, রাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে। আমাদের দায়িত্ব একজন জমসের মিয়ার মেয়েরাও পৌঁছে যাক নেতৃত্বের কোনো না কোনো স্তরে, অনিশ্চিত অজানাকে পেরিয়ে।

অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমতার অঙ্গীকার হোক আমাদের সবার।

 

তাছলিমা আক্তার: ডেপুটি ম্যানেজার, উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইক্যুইটি, একশনএইড বাংলাদেশ

শেয়ার করুন