20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
ক্ষুধার রাজ্যে শান্তির নোবেল : কী বার্তা পেল দুনিয়া

শান্তির পথে যাত্রার প্রথম ধাপ ক্ষুধা নিবারণ। তাই ক্ষুধার জন্য দায়ী যুদ্ধবাজ, জাতিগত সহিংসতা ও অস্ত্র ব্যবসায় মরিয়া রাষ্ট্রগুলোর কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবারের শান্তি পুরস্কার।

অসলোতে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি এবারের শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ঘোষণা করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে। কোনো ব্যক্তি নয়, তারা বেছে নিয়েছে একটি সংস্থাকে। এর আগেও অনেক সংস্থা শান্তিতে নোবেল পেয়েছে, তবে এবারের পুরস্কার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

দীর্ঘদিন ধরে সারা বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষুধা মেটানোর মতো একটি বড় ও মানবিক দায়িত্ব পালন করছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে শুরু করে সারা বিশ্বের যুদ্ধ ও সংঘাতপূর্ণ এলাকা এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কাজ করে সংস্থাটির হাজার হাজার কর্মী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে পৌঁছে দেয় খাদ্য। সংস্থাটি জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থার চেয়ে তুলনামূলকভাবে কিছুটা নীরবেই কাজ করে থাকে।

নোবেল কমিটির প্রধান বেরিট রেইস এন্ডারসনের বক্তব্যটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, বর্তমান জটিল বিশ্ব পরিস্থিতিতে ‘আন্তর্জাতিক সংহতি’ ও ‘বহুপক্ষীয় সহযোগিতা’র প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। ক্ষুধামুক্তির জন্যে এর গুরুত্ব আরও বেশি। আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় এই সংহতি প্রকাশের একটি প্রকাশ হচ্ছে ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষুধা নিবারণে এগিয়ে আসা।

যদিও এটা খুবই লজ্জার কথা যে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত। এখনো কোটি কোটি শিশু ক্ষুধার যন্ত্রনায় কাতর। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো মানবসৃষ্ট সংকটই এর মূল কারণ। হোক তা যুদ্ধ, সংঘাত কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকট। এসবের নেপথ্যে মানুষ জড়িত। দুষ্টচক্রের নীতিহীন, অমানবিক কর্মকাণ্ডই এসবের জন্য দায়ী। শেষ অবধি মানুষকেই কষ্ট পেতে হয়, মানুষকেই ক্ষুধার নিষ্ঠুরতা সইতে হয়, মানুষই না খেয়ে মারা যায়।

এবারের নোবেল শাম্তি পুরস্কারের জন্য ডব্লিউএফপিকে বেছে নেওয়ার জন্য যে কারণগুলো বলা হয়েছে তাতে আরও স্পষ্ট হবে বিষয়টি। এতে বলা হয়, ক্ষুধামুক্তির লড়াই, যুদ্ধ ও সংঘাত কবলিত এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা, পরিস্থিতির উন্নয়নে ভূমিকা এবং যুদ্ধ ও সংঘাতে অস্ত্র হিসেবে ক্ষুধার ব্যবহার রোধে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করায় এবার ডব্লিউএফপিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। পুরস্কার ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বলেছে, ‘বিশ্বজুড়ে ১০ কোটির বেশি শিশু, নারী ও পুরুষের কাছে খাবার পৌঁছে দিতে জীবন উৎসর্গ করেছেন সংস্থাটির অনেক কর্মী। এ পুরস্কারে তাদের কাজ স্বীকৃতি পেল।’

কিম্তু কথা হলো, এ পুরস্কার কি যুদ্ধবাজ, আগ্রাসী, অস্ত্র ব্যবসায়ী শক্তিশালী দুষ্ট রাষ্ট্রগুলোকে সত্যিই কোনো বার্তা দিল? অথবা সেই বার্তা কি আদৌ তারা গ্রহণ করবে? কেবল ধনী ও সামরিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোই যে দুষ্টরাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত তা নয়। মিয়ানমারের মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রও লাখ লাখ রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও পুরুষকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজ আবাসস্থল থেকে বিতাড়িত করেছে, তাদেরকে ক্ষুধার মতো এক ভয়ংকর বাস্তবতায় ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্ব কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক উচ্চবিলাসী রাষ্ট্রগুলো অস্থিতিশীলতা তৈরি করে বিশ্বকে একটা ক্ষুধার রাজ্যে পরিণত করছে। লাখ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে, লাখ লাখ সিরিয়ান আশ্রয় নিয়েছে জার্মানিতে। পৃথিবীতে বাড়ছে উদ্বাস্তুর সংখ্যা, বাড়ছে ক্ষুধার পরিধি।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পূরণে এগিয়ে এসেছে, সংস্থাটির সহায়তায় রোহিঙ্গারা পাচ্ছে খাদ্য সহায়তা। দুষ্টচক্রের নিপীড়নমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই ক্ষুধার শৃংখল ভাঙার যে বার্তা নিপীড়ক রাষ্ট্রগুলোকে দেওয়া হলো, তা যদি বিশ্ব বিবেককে নাড়া না দেয় তবে শাম্তি পুরস্কার অর্থহীন হয়ে যাবে। তা হবে দুঃখজনক। কারণ ক্ষুধামুক্তি ছাড়া বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। ক্ষুধা নিবারণ শাম্তির পথে যাত্রার প্রথম ধাপ এবং শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। তাই যুদ্ধবাজ দেশগুলো, জাতিগত সহিংসতা উস্কে দেওয়া রাষ্ট্রগুলো, অস্ত্রব্যবসার জন্য মরিয়া রাষ্ট্রগুলোর কাজকর্মকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবারের শান্তি পুরস্কার। অন্য রকম ভাবনার একটা খোরাক হিসেবে এসেছে এবারের ঘোষণা।

নোবেল কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ক্ষুধা ও সংঘাতের যে যোগাযোগ তা একটি দুষ্টচক্র। যুদ্ধ ও সংঘাত খাদ্যসংকট তৈরি করে, ঠিক যেভাবে ক্ষুধা ও খাদ্য নিরাপত্তার অভাব থেকে সংঘাত ও সহিংসতার সূত্রপাত হতে পারে। কমিটি তাই যথার্থই বলেছে, ‘ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রচেষ্টায় আমরা কখনও সফল হতে পারব না, যদি আমরা যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতের ইতি টানতে না পারি’।

প্রশ্ন হলো কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙবে তো?

কবি সুকান্ত বলেছেন, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। সেই কবে বলে গেছেন তিনি! আজও তা প্রাসঙ্গিক। যে মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে মানুষ, সেই মানবিক পৃথিবীই আমাদের লাগবে, সেই মানবিক পৃথিবীর জন্যই নিরন্তর প্রচেষ্টা থাকতে হবে আমাদের। কারণ ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে চাঁদের আলো কোনো মানবিক আবেদন তৈরি করে না, তার কাছে চাঁদকে মনে হয় একটা ঝলসানো রুটি। এ পেক্ষাপটে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে শান্তির নোবেল পুরস্কার বিশ্বকে যথার্থই এক নতুন বার্তা দিয়েছে। ক্ষুধামুক্ত নিরাপদ বিশ্ব গড়ার মধ্য দিয়ে ফিরে আসুক শান্তি, সর্বত্র।

জুলহাস আলম: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

শেয়ার করুন