20201002104319.jpg
ধর্ষণের সাজা কাজির কেতাবে নয়, গোয়ালেও চাই

চুন খেয়ে আমার মুখ পুড়ে আছে, এখন দই দেখলেও ভয় লাগে। বিক্ষুব্ধদের শান্ত করতে আপাতত হয়তো দাবি মেনে নেওয়া হবে। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তিও হয়তো মৃত্যুদণ্ড করা হবে, আশ্বাস মিলবে দ্রুত বিচারেরও। কিন্তু আমার শঙ্কা হলো বিচার আদৌ হবে তো?

দেশজুড়ে অসাধারণ একটা আন্দোলন চলছে। এই আন্দোলনে কোনো রাজনীতি নেই, কিন্তু ন্যায্য দাবি আছে। আছে নারীদের জন্য একটা নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। এই আন্দোলনের মূল দাবি, ধর্ষকের সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসির দণ্ড নিশ্চিত এবং তা দ্রুত কার্যকর করা।

এখন পর্যন্ত এই দাবির সাথে দ্বিমত করার লোক খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে আইনমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে মহিলা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী- সবাই এই দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন। ইতোমধ্যে আইনমন্ত্রী ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে দ্রুত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই প্রস্তাব উঠছে বলে জানিয়েছেন তিনি। আমারও ধারণা সরকার দ্রুতই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে। ইতোমধ্যেই নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনায় আসামিদের প্রায় সবাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে হিসাবে বলা যায়, আন্দোলনের প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, আন্দোলনটি শুধু একটি ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার জন্য নয়। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশকে আরো মানবিক, নারীর জন্য নিরাপদ করাই যেন হয় আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

তবে চুন খেয়ে আমার মুখ পুড়ে আছে, এখন দই দেখলেও ভয় লাগে। বিক্ষুব্ধদের শান্ত করতে আপাতত হয়তো দাবি মেনে নেওয়া হবে। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তিও হয়তো মৃত্যুদণ্ড করা হবে, আশ্বাস মিলবে দ্রুত বিচারেরও। কিন্তু আমার শঙ্কা হলো বিচার আদৌ হবে তো? 

তবে এ শঙ্কা প্রসঙ্গে বিস্তারিত বলার আগে আমার ছোট্ট একটা কৌতুহল। ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা কী হওয়া উচিত, এটা যদি আমাদের বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েরা বুঝতে পারে, আমাদের আইনমন্ত্রী বা নীতিনির্ধারকরা এতদিন বোঝেননি কেন। দাবিটি যদি আপনার কাছে এখন ন্যায্য মনে হয়, তাহলে এতদিন সেটা আইনে অন্তর্ভুক্ত করেননি কেন? ন্যায্য দাবি আদায় করতে রাস্তায় নামতে হবে কেন। আপনারা আমাদের চেয়ে বেশি বোঝেন বলেই তো আপনারা মন্ত্রী, আপনারা দেশ চালাচ্ছেন। এখন যদি প্রমাণ হয়, এই বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা ন্যায্যতাটা আপনাদের চেয়ে ভালো বোঝে, তাহলে আর আপনাদের দরকার কী। ঠিকমতো চাপ দিতে পারলে আপনারা সব দাবিই মেনে নেন। নইলে কি বসে বসে আঙ্গুল চোষেন! এমনও না যে আইনটি অনেক পুরানো। বর্তমানে কার্যকর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনটি ২০০০ সালের। মাত্র ২০ বছরের পুরানো একটি আইন যদি তরুণদের রাস্তায় আন্দোলন করে বদলাতে হয়, তাহলে আমাদের আইনপ্রণেতাদের লজ্জা পাওয়া উচিত।

তবে আমার কাছে মনে হয়, কঠোর আইনের চেয়ে বিচার নিশ্চিত করাটা অনেক বেশি জরুরি। সাজা ফাঁসি না যাবজ্জীবন- তারচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো অপরাধী ধরা পড়ল তো, তদন্ত ঠিকমত হলো তো, অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হলো তো, রায়টা কার্যকর হলো তো? এখানে আমার শঙ্কার পাহাড়। আমি চাই সকল ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ন্যায্য বিচার। কিন্তু প্রথম কথা হলো, ধর্ষণের কয়টি ঘটনা থানা-পুলিশ পর্যন্ত যায়। আমার ধারণা বিশ্বের আরো অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অধিকাংশ ঘটনা আলোর মুখ দেখে না।

সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে হ্যাশট্যাগ মিটু আন্দোলনে ঝলমলে গ্ল্যামার জগতের অনেক পুরানো অন্ধকারে আলো পড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এমন হাজারো, লাখো যৌননির্যাতন বা ধর্ষণের খবর চির অন্ধকারে হারিয়ে যায়। প্রথম কথা হলো কন্যাশিশুরা থাকে সবচেয়ে ঝুঁকিতে। আসলে কাউকেই বিশ্বাস করা উচিত নয়। সবার কাছ থেকেই আপনার কন্যাকে আপনার বাঁচিয়ে রাখতে হবে। মামা, খালু, ফুপা, কাজিন, দাদা, নানা- কে যে কখন সুযোগ বুঝে নিপীড়ক হয়ে উঠবেন, ধর্ষক হয়ে উঠবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই মেয়েকে সবসময় চোখে চোখে রাখবেন। অথচ বাংলাদেশে হয় উল্টোটা।

কোনো কন্যাশিশু বয়স্ক কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললে মা-বাবা তাকে অবিশ্বাস করেন, বকা দেন, মারধোর করেন। আর একটু বড় হয়ে ধর্ষণের শিকার হলে নারী প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বাড়ি ফিরে দীর্ঘ সময় ধরে গোসল করে শরীর থেকে ‘কলঙ্ক’ চিহ্ন মুছে ফেলতে চান, একই সঙ্গে ধুয়ে ফেলেন ধর্ষণের সব প্রমাণও। সন্তানের ধর্ষণের খবর শোনার পর বাবা-মার প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়, আর কেউ দেখেনি তো, কেউ জানে না তো, কাউকে বলিস না, চেপে যা। তাদের ভাবনা হলো, জানাজানি হলে মেয়ের বিয়ে হবে না। এই সুযোগটাই নেয় দুর্বৃত্তরা। যদি কোনোভাবে জানাজানি হয়ে যায়, স্থানীয় মাতব্বররা বসে সমঝোতা করে দেন।

সবচেয়ে প্রচলিত ‘ন্যায্য বিচার’ হলো ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতার বিয়ে। অথবা কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া। আর যদি ধর্ষণের শিকার নারী সাহস করে থানা-পুলিশ পর্যন্ত যান, তাহলে শুরু হয় লাঞ্ছনার দীর্ঘ যন্ত্রণাময় দ্বিতীয় অধ্যায়। ডাক্তারি পরীক্ষা, পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ, আইনজীবীর জেরায় ধর্ষণের শিকার নারীকে সবার সামনে পুনরায় বারবার ধর্ষিত হতে হয়। 

ধর্ষণের শিকার সব নারীর শেষ পর্যন্ত মামলা লড়ে যাওয়ার সাহস থাকে না। অনেকে মাঝপথে হাল ছেড়ে দেন। অনেকে সমঝোতায় বাধ্য হন। ধর্ষণের শিকার নারীদের বেশিরভাগ নিম্ন আয়ের অসহায় পরিবার থেকে আসা। তাদের পক্ষে দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য থাকে না। উল্টোদিকে ধর্ষক থাকে প্রভাবশালী, বিত্তশালী। তাদের সাথে লড়া যায়, কিন্তু জেতা কঠিন। তারা তদন্ত পর্যায়ে, চার্জশিট পর্যায়ে মামলা দুর্বল করে দেয়। ধর্ষক চতুর উকিল খুঁজে বের করে, যারা আইনের ফাঁক বের করে ধর্ষককে বাঁচিয়ে দেয়। আর শেষ পর্যন্ত ধর্ষণ প্রমাণ করাও কঠিন। তাই আইনে শাস্তি ফাঁসি না যাবজ্জীবন যাই হোক, তাতে ধর্ষকের কিছু যায় আসে না। সে জানে, সে বেরিয়ে যাবে।

ধরে নিচ্ছি বাংলাদেশে মাত্র ১০ ভাগ ধর্ষণের ঘটনা থানা-পুলিশ পর্যন্ত যায়। তার মাত্র ৩ ভাগ শেষ পর্যন্ত রায় হয়। আপনারা হিসাব করে দেখেন কয়টা ধর্ষণের মামলার বিচার হয়েছে। কয়জন ধর্ষকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। তাই ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসি করা অবশ্যই দরকার। কিন্তু তারচেয়ে বেশি দরকার, সব ধর্ষণের ঘটনাকে আইনের কাছে নিয়ে যাওয়া, সকল ধর্ষককে কাঠগড়ায় তোলা। তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত এবং সঠিকভাবে করা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন মৃত্যুদণ্ড তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে আমরা কেন ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসির দাবি করছি? এই দাবি কি নিছক তরুণ প্রজন্মের আবেগ? প্রথম কথা হলো বিশ্বের অনেক দেশেই ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বহাল আছে। তবে অন্য দেশে কী হচ্ছে, সেটা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। আমি ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড এবং তা অতি দ্রুত কার্যকর চাই। কারণ আমার বিবেচনায় ধর্ষণ হত্যার চেয়েও বড় অপরাধ। ধর্ষণের গ্লানি একজন নারীকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। একজন নারীকে খুন করার চেয়ে ধর্ষণ করলে তার অপমান, গ্লানি, কষ্ট অনেক বেশি হয়। অনেক নারী এই গ্লানি বইতে পারেন না, অনেকে আত্মহত্যা করেন। তাই মৃত্যুদণ্ডই হতে হবে ধর্ষকের একমাত্র সাজা।

আগেই বলেছি, চুন খেয়ে মুখ পুড়ে আছে, এখন দই দেখলেও আমার ভয় লাগে। এর আগে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল। তাদের দাবির মুখে কঠোর আইন পাসও হয়েছে। কিন্তু পরিবহন মাফিয়াদের কারণে সেটি কার্যকর করা যায়নি। তার মানে বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোকে সান্ত্বনা দিয়ে বাসায় পাঠানো হয়েছে। এবার যেন তেমন কিছু না হয়। আইনমন্ত্রী যে আশ্বাস দিয়েছেন, আমরা তাতে আস্থা রাখছি। আশা করছি, দ্রুতই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করা হবে। এর সাথে বিচার যেন দ্রুত হয়, রায় যাতে কার্যকর হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। কাগজে-কলমের আইন নয়, আমরা ধর্ষককে ফাঁসির মঞ্চে দেখতে চাই। কাজির গরু যেন খালি কেতাবে না থাকে, গোয়ালেও চাই।

 

প্রভাষ আমিন: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

শেয়ার করুন