দিল্লি-ঢাকা টানাপড়েন

একটি সময় ছিল যখন ভারতের সঙ্গে চুক্তি বা সম্পর্ক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্যতম আলোচনার বিষয় ছিল। বাংলাদেশ সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে। ভারতেরও উচিত সেই পথ অনুসরণ করা। সে ক্ষেত্রে সোনালি অধ্যায়ে যে কালো মেঘের ছায়া পড়েছে, সেটি দ্রুত সরে যাবে।

আমলা থেকে শুরু করে ভারতের ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে সোনালি অধ্যায় বলে দাবি করে থাকেন। কিন্তু গত কয়েক মাসে বেশ কিছু ঘটনা নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের কপালে যে ভাঁজ ফেলেছে, সেটি চশমা ছাড়াই চোখে পড়ে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকারের সাফল্যের পাল্লা যত ভারি হোক না কেন, বৈদেশিক নীতিতে কোনোভাবে সুবিধা করে উঠতে পারছে না। বিশেষ করে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ভারত বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যার উত্তরণে মোদির ক্যারিশমাও কাজে লাগছে না।

অথচ বিজেপি সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘প্রতিবেশী প্রথম’ স্লোগান দিয়ে। ২০১৪ সালে মোদির অভিষেকে তার আগ্রহে পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান হাজির ছিলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হা্সিনা পূর্বনির্ধারিত সফরে জাপান থাকায় উপস্থিত থাকতে পারেননি।

সাড়ে ছয় বছর পর বাংলাদেশ ছাড়া প্রায় সব প্রতিবেশীর সঙ্গে ভারতের বিরোধ ও দূরত্ব বেড়েছে। চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির ঝগড়া বেশ পুরানো। সম্প্রতি লাদাখ সীমান্তে চীনা সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়েছে। নেপালের নতুন মানচিত্রে ভারতের কিছু অংশ তাদের বলে দাবি করা হয়েছে। ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান বলেছেন, এর পেছনে চীনের উসকানি আছে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশই ভারতের পরীক্ষিত বন্ধু। অন্তত ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ সেই বন্ধুত্বের নিদর্শন দেখাতে কার্পণ্য করেনি। বিশেষ করে, নয়া দিল্লির মূল উদ্বেগ ছিল উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, যাদের অনেকেই বাংলাদেশে ঘাঁটি গেড়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি হলো বাংলাদেশের ভূখণ্ড কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশ সরকার কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটি নির্মূল করেনি, এখানে পালিয়ে থাকা উলফা নেতাদের ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। ভারত এখন পুরোপুরি নিরুদ্বিগ্ন। কিন্তু বাংলাদেশের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা রয়েই গেছে।

গত ১০ বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেকার যেসব বড় সমস্যার সমাধান হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্থলসীমা নির্ধারণ ও ছিটমহল বিনিময় এবং সমুদ্রসীমা নির্ধারণ। দুটোর ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের উদ্যোগী ভূমিকা ছিল। ১৯৭৪ সালে স্থল সীমান্ত চুক্তি সই হওয়ার পর পরই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সেটি অনুমোদন করে, ভারতে অনুমোদন পেয়েছে ২০১৫ সালে। সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি হয়েছে আন্তর্জাতিক আদালতে। তারপরও মোদি সরকার দীর্ঘদিনের বকেয়া স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের কৃতিত্ব দাবি করতে পারে।

কিন্তু তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়েও বাস্তবায়িত হতে পারেনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে। এমনকি, ‘আমার ও শেখ হাসিনার সরকারের আমলে’ তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়িত হবে বলে নরেন্দ্র মোদি একাধিকবার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি নেই।

অন্যদিকে ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইন ও নাগরিকপঞ্জী বাংলাদেশকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে। কেননা বিজেপির নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকেই ইস্যু করেছিল। নতুন নাগরিক আইনে বলা হয়, ২০১৪ সালের আগে যেসব অমুসলমান (হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ ও খ্রিষ্টান) বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত হয়ে ভারতে এসেছে, তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে।

উপমহাদেশে বর্তমানে বাংলাদেশই ন্যূনতম সেক্যুলার চরিত্র বজায় রাখতে পেরেছে। সেই বাংলাদেশকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে পঙক্তিভুক্ত করা সম্পর্কের সোনালি অধ্যায়ের পরিচায়ক নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের একটি পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে তার অসন্তোষের কথা প্রকাশ করতেও দ্বিধা করেননি। তিনি বলেছেন, এই আইনের প্রয়োজন ছিল না।

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ তিস্তার পানিপ্রবাহ বাড়াতে একটি প্রকল্প নিয়েছে, যাতে চীন ১ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। চীন ও ভারত দুই বিশাল অর্থনীতির দেশ। দুই দেশ থেকেই আমরা সহযোগিতা নেব। এখানে পক্ষ-বিপক্ষ বলে কিছু নেই। চীন ও ভারত উভয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরাট বাণিজ্য ঘাটতি আছে। বাংলাদেশের চেষ্টা হলো আমদানি-রফতানির বৈষম্য যথাসম্ভব কমিয়ে আনা। সম্প্রতি চীন প্রায় ৯০০ পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা ঘোষণা করে। এতে আরও বেশি পরিমাণে বাংলাদেশি পণ্য চীনে যাবে।

এরইমধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করে করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের গণমাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে নানা রকম খবর ও বিশ্লেষণ প্রকাশ হতে থাকে। কোনো কোনো পত্রিকা মন্তব্য করে যে বাংলাদেশ ভারত ছেড়ে চীনের প্রতি ঝুঁকছে।

এতেই নয়াদিল্লির অন্দরমহলে নড়াচড়া শুরু হয়। তারা প্রথমে ঢাকার ভারতীয় হাই কমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাশের বদলির সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ভারত পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাকে ঢাকায় পাঠান বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করতে। শ্রিংলা এর আগে তিন বছর বাংলাদেশে হাই কমিশনার ছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একটি চিঠি দিয়েছেন, যাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গতিশীল করার কথা বলা হয়েছে।

এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এম এ মোমেন এবং এস জয়শঙ্কর এক ভার্চুয়াল বৈঠকে মিলিত হয়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ওপর জোর দেন এবং একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সীমান্তে হত্যার সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনার তাগিদ দিয়ে বলেন, এটি বাংলাদেশকে মর্মাহত করেছে। তিন বছর আগে রোহিঙ্গা সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত নিরপেক্ষ ভূমিকা নেয়। ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে নিরপেক্ষ ভূমিকা শেষ তক অন্যায়কারীকেই সহায়তা করে। এই প্রথম ভারত রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনকে অগ্রাধিকার দিতে সম্মত হয়েছে। এটি তাদের আগের অবস্থানের বিপরীত।

দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে ভারতীয় অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পগুলোর কাজ তরান্বিত করা এবং যৌথভাবে মুজিব জন্মশতবর্ষ পালনের কথাও বলা হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়াল বৈঠকে মিলিত হবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

কিন্তু তাতে দ্বিপক্ষীয় অমীমাংসিত বিষয়গুলো সুরাহা হবে কিনা বলা কঠিন। নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকেরা যখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সোনালি অধ্যায় বলে অভিহিত করছেন, তখনই দেখা যাচ্ছে, তিস্তা চুক্তি চূড়ান্ত হয়েও আটকে আছে, গত বছরের মতো এ বছরও ভারত হঠাৎ করে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। সাধারণত্ উৎপাদক ও ভোক্তার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু ভারতের কৃষকেরা এখন পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করছে। সেখানখান বিশ্লষকেরা বলেছেন, অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক কারণেই মোদি সরকার পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। সামনে বিহারের নির্বাচন। কোনোভাবেই সরকার চাইছে না বিরোধিরা পেঁয়াজকে ভোটের ইস্যু করে ফায়দা নিক।

ভারতের নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে যে সোনালি অধ্যায়ে নিয়ে যেতে চান, তা তখনই সম্ভব যখন এটি ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহৃত হবে না কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ইস্যু হবে না। একটি সময় ছিল যখন ভারতের সঙ্গে চুক্তি বা সম্পর্ক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্যতম আলোচনার বিষয় ছিল। বাংলাদেশ সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে। ভারতেরও উচিত সেই পথ অনুসরণ করা। সে ক্ষেত্রে সোনালি অধ্যায়ে যে কালো মেঘের ছায়া পড়েছে, সেটি দ্রুত সরে যাবে। তখন আর চীন, পাকিস্তান কিংবা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে ভারতকে বিচলিত হতে হবে না। দুই দেশের সম্পর্ক কখনো আবেগ দ্বারা চালিত হয় না, হলেও সেটি টেকসই হয় না। সম্পর্ক হতে হবে ‘দেবে আর নেবে মিলাবে মিলিবে—এই নীতির ভিত্তিতে।

আরিফ হাসান: সাংবাদিক

শেয়ার করুন