20201002104319.jpg
ধর্ষণের প্রতিবাদে ফুঁসছে ভারতও

হাথরাস কাণ্ডের ধিক্কার জানিয়ে গোটা দেশ যখন উত্তাল, তখন পুলিশ কার্যত অবরোধ করে রাখল ভুলাগড়ি গ্রাম। সাংবাদিক, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলো ওই গ্রামে। বিরোধী নেতাদের ওপর বলপ্রয়োগ করে আটকানো হলো। এর আগে, নির্ভয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে তোলপাড় হয়েছিল গোটা ভারতে। রাজধানী দিল্লিতে রাজপথে নেমে এসেছিলেন হাজার হাজার মানুষ। কোথাও কাউকে বাধা দেয়নি প্রশাসন। কিন্তু এখন 'নিউ নর্মালের' কাল। এখন ধর্ষিতা, নির্যাতিতার পরিবারের পাশে দাঁড়ালে সরকার ও প্রশাসন চিৎকার করে বলবে, উত্তরপ্রদেশের 'মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র হচ্ছে।'

আবার একটা ধর্ষণ, নৃশংস বর্বরতায় খুনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল গোটা ভারত। দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্বপ্নের 'রামরাজ্য' প্রতিষ্ঠার পরীক্ষাগার এই রাজ্যের হাথরাসে উচ্চবর্ণের ঠাকুর সম্প্রদায়ের চার অভিযুক্ত ব্যক্তি ধর্ষণ ও হত্যা করেছে ১৯ বছরের দলিত তরুণীকে। 

উত্তর প্রদেশে এরকম ঘটনা নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি উচ্চবর্ণের অপরাধীদের বাঁচাতে প্রশাসনিক তৎপরতা।

অভিযোগ রয়েছে, ১৪ সেপ্টেম্বর হাথরাস শহরের কাছেই ভুলাগড়ি গ্রামে উচ্চবর্ণের চার যুবক ধর্ষণ করে মেরে ফেলার চেষ্টা করে ১৯ বছরের দলিত তরুণীকে। গ্রামেরই সীমানায় এক পরিত্যক্ত ভাঙা ঘরে অচৈতন্য অবস্থায় মৃত্যুর অপেক্ষা করতে থাকে সে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসার পরেও তরুণী বাড়ি না ফেরায় পরিবার থেকে পুলিশের কাছে নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়।

তরুণীটিকে খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে পুলিশের বিশেষ উদ্যোগ দেখেননি আত্মীয় পরিজনেরা। নিখোঁজ হবার প্রায় ১৭ ঘণ্টা পর তরুণীর মা-ভাইয়েরা খুঁজে পায় মৃতপ্রায় দেহ। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আলিগড়ের জওহরলাল নেহরু মেডিক্যাল কলেজে। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে নিয়ে আসা হয় দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে। কিন্তু বাঁচানো যায়নি তাকে। 

এরপরেই শুরু হলো উত্তরপ্রদেশ পুলিশের যুদ্ধকালীন তৎপরতা। অবশ্য পুলিশ আগেই কিছুটা ইতিবাচক তৎপরতা দেখিয়েছিল চার অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। কিন্তু তরুণীর মৃত্যুর পরেই পুলিশের তৎপরতার গতিমুখ বদলে গেল। পরিবারের শোকার্ত আবেদন উপেক্ষা করে পুলিশ দিল্লির হাসপাতাল থেকে কার্যত ছিনিয়ে নিয়ে গেল তরুণীর মৃতদেহ।

তরুণীর মা বলেছিলেন, 'আব লটকে তো দোবারা নেহি আয়েগি, হাম আপনে ঘর সে হি বিদায়ি করনা চাহতে হ্যায়।' অর্থাৎ, আর তো ও দ্বিতীয়বার ফিরে আসবে না, তাই আমাদের নিজ গৃহ থেকেই ওকে বিদায় দিতে চাই। সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট আদরের মেয়েকে শেষবারের মতো হলুদ মাখিয়ে নিজের ঘর থেকে বিদায় দিতে চেয়েছিলেন মা।

পুলিশ তা হতে দেয়নি। মধ্যরাতের অন্ধকারে পরিবারের অনুপস্থিতিতে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ দাহ সম্পন্ন করে। গ্রামে গৃহবন্দী তরুণীর মা দূর থেকে ওই আগুন দেখে আর্তনাদ করছেন  'ওখানে কী জ্বলছে - কী জ্বলছে ওখানে।'

এ ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে ধিক্কারের মাঝেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছেন,  'ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।' কিন্তু নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে যে চরম অমানবিক আচরণ করা হলো, সে সম্পর্কে কোনো শব্দ শোনা গেল না। 

তথাকথিত 'রামরাজ্যের' আর এক প্রবক্তা উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্তে বিশেষ দল গঠনের কথা বলেছিলেন। কিন্তু পরে জনরোষের চাপে, মতান্তরে ঘটনা ধামাচাপা দিতে, মুখ্যমন্ত্রী সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। বিরোধীদের বক্তব্য, সকল সরকারি তদন্তকারী সংস্থারই নিরপেক্ষতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এখন তলানিতে। লোকের মুখ বন্ধ করতেই এখন ওই সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করা হয়। 

হাথরাস কাণ্ডের ধিক্কার জানিয়ে গোটা দেশ যখন উত্তাল, তখন পুলিশ কার্যত অবরোধ করে রাখল ভুলাগড়ি গ্রাম। সাংবাদিক, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলো ওই গ্রামে। বিরোধী নেতাদের ওপর বলপ্রয়োগ করে আটকানো হলো। 

এ ঘটনা কিন্তু ঘটেনি ২০১২-তে নির্ভয়া কাণ্ডের সময়। নির্ভয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে তোলপাড় হয়েছিল গোটা ভারতে। রাজধানী দিল্লিতে রাজপথে নেমে এসেছিলেন হাজার হাজার মানুষ। কোথাও কাউকে বাধা দেয়নি প্রশাসন। কিন্তু এখন 'নিউ নর্মালের' কাল। এখন ধর্ষিতা, নির্যাতিতার পরিবারের পাশে দাঁড়ালে সরকার ও প্রশাসন চিৎকার করে বলবে, উত্তরপ্রদেশের 'মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র হচ্ছে।'

হাথরাসের নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন দলিত সংগঠন 'ভীম আর্মি' প্রধান চন্দ্রশেখর আজাদ। আইন ভাঙার জন্য চন্দ্রশেখরসহ ৪শ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে উত্তর প্রদেশের পুলিশ। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ বলেছিলেন, রাজ্যের উন্নতি হওয়ায় যারা দুশ্চিন্তায় পড়েছে, তারাই হাথরাসের ঘটনা নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। 

মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাথরাস নিয়ে রাজ্যজুড়ে ১৯টি মামলা দায়ের করল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। তার মধ্যে দেশদ্রোহিতা, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, ধর্মীয় বিদ্বেষ, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মিথ্যা প্রচার করা, রাজ্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, প্রশাসনের সম্মানহানি ইত্যাদি অভিযোগ আছে। এটাই হচ্ছে শাসক ও প্রশাসনের 'নিউ নর্মাল'। 

ধর্ষণ ও খুনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সময়ে সময়ে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ আছড়ে পড়লেও নারী-শিশু নির্যাতনে লাগাম টানা যাচ্ছে না পুরুষতান্ত্রিকতার আগ্রাসী ভূমিকায়। ভারতবর্ষের বর্তমান শাসকদলের আদর্শগত প্রভু যারা, সেই সংঘ পরিবারের তত্ত্ব অনুযায়ী, নারীর স্থান পরিবারের অন্দরমহলেই। যার কর্তৃত্ব পুরোটাই পুরুষের হাতে। 

হাথরাসকাণ্ডের পর উত্তরপ্রদেশের এক বিজেপি বিধায়ক মন্তব্য করেছেন, ধর্ষণ বন্ধ করতে নারীকে সংস্কারি হতে হবে। পরিবারের দায়িত্ব মেয়েদের সঠিক শিক্ষা দিয়ে সংস্কারি করে গড়ে তোলা। অর্থাৎ, ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হলো নারীকেই। শাসকদলের মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়কেরা প্রায়শই এ ধরনের মন্তব্য করে থাকেন। ফলে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদের পাশাপাশি 'নিউ নর্মাল'-এ ধর্ষণকারীর সমর্থনেও ধরনায় বসছে একদল মানুষ শাসক দলের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির নেতৃত্বে। হাথরাসে প্রায় ৫শ ব্যক্তি স্থানীয় এক বিজেপি নেতা রাজবীর সিং পেহলওয়ানের বাড়িতে ‘রাষ্ট্রীয় সাবর্ণ পরিষদ' নামের সংগঠনের ব্যানারে জমায়েত হয়ে দাবি করেছে, ধর্ষণ ও খুনের  ঘটনায় চার জনকে মিথ্যে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।

সামগ্রিক এই আবহে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, ২০১৯ সালে প্রতিদিন গড়ে ভারতে ৮৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া এ বছর মেয়েদের বিরুদ্ধে মোট ৪ লাখ ৫ হাজার ৮৬১টি মামলা দায়ের হয়েছে। এই অপরাধের ঘটনা ২০১৮ সালের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। ২০১৮ সালে মেয়েদের বিরুদ্ধে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৩৬টি অপরাধের মামলা দায়ের হয়েছিল।

এনসিআরবি প্রকাশিত 'ক্রাইম ইন ইন্ডিয়া ২০১৯' রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে মেয়েদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনা ৭.৩ শতাংশ বেড়েছে। এসব অপরাধের মামলার ৩০.৯ শতাংশ হয়েছে মেয়েদের বিরুদ্ধে পারিবারিক হিংসার। এছাড়া ২১.৮ শতাংশ ক্ষেত্রে মহিলাদের শ্লীলতাহানির উদ্দেশ্যে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ১৭.৯ শতাংশ ক্ষেত্রে মেয়েদের অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।

স্বাভাবিক ভাবেই ক্রমবর্ধমান ধর্ষণ, খুন ও সবরকমের নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হলে পথে নেমে প্রতিবাদ করার পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিকতার আগ্রাসী ভূমিকার বিরুদ্ধে লড়াই তীব্র করার কথা ভাবতে হবে।

 

আশিস গুপ্ত: সাংবাদিক, নয়াদিল্লি

শেয়ার করুন