20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
চীন-ভারত বিবাদ, কী করবে বাংলাদেশ

সম্প্রতি চীন শতকরা ৯৭ ভাগ বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। পক্ষান্তরে, ভারত তার তাসগুলো খুব সাফল্যের সাথে খেলেছে এ কথা বলা যাচ্ছে না। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির টানাপড়েনে ঝুলে আছে তিস্তার পানিবণ্টনের যৌক্তিক চুক্তি। সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা বন্ধে ভারত চরম অসংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছে।

সীমান্ত নিয়ে চীন-ভারত বিবাদ অনেক পুরানো। পুবে অরুণাচল আর তিব্বতের মাঝে আঁকা ম্যাকমোহন লাইনকে চীন স্বীকার করে না। ১৯১৪ সালে এটা স্বাধীন তিব্বত আর ব্রিটিশ ভারতের সরকারের প্রতিনিধিরা সই করেছিল সিমলা শহরে। চীন এটা প্রত্যাখ্যান করে এই যুক্তিতে যে তিব্বতের সার্বভৌমত্ব ছিল না বিধায় এই চুক্তি সইয়ের এখতিয়ারও ছিল না। অতএব অরুণাচল তিব্বতের অংশ আর সেই সুবাদে তা চীনের অংশ। মজার ব্যাপার হচ্ছে ভারতে আশ্রিত দালাই লামা অন্তত ২০০৩ সাল পর্যন্ত অরুণাচলকে স্বাধীন তিব্বতের অংশ বলেই মনে করতেন। বস্তুত ১৯০৯ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া’য় ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের যে মানচিত্র শোভা পায়, তাতে অরুণাচলকে তিব্বতের অংশ রূপেই দেখানো হয়েছে। ২০০৭ সালেই প্রথম দালাই লামা সিমলায় স্বাক্ষরিত চুক্তিকে স্বীকৃতি দিয়ে অরুণাচলকে ভারতের ভূখণ্ড বলে স্বীকার করে নেন।

১৯৫১ সালে চীনা লালফৌজ তিব্বত দখল করে নেয়। জওহরলাল নেহরুর ভারত এতে অন্যায় বা বিপজ্জনক কিছু দেখেনি। পঞ্চশীলা, হিন্দি-চীনি ভাই-ভাই ইত্যাদিতে মগ্ন নেহরুর ঘোর কাটল ১৯৬২ সালে, যখন লালফৌজ অরুণাচল দখল করে মূল আসামের দোরগোড়ায় হাজির হলো। ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভারতীয় সেনাদের পরাজয়ের পর চীনারা ম্যাকমোহন লাইনের উত্তরে ফিরে যায় বটে, কিন্তু অরুণাচলের ওপর দাবি থেকে অদ্যাবধি সরে যায়নি তারা।

পশ্চিমে চীন-লাদাখ সীমান্তের বিষয়টা আরো জটিল। ১৮৩৪ সালে কাশ্মীরের রাজা লাদাখ দখল করেন এবং ১৮৪২-এ স্বাক্ষরিত চুক্তিতে তিব্বতের শাসনকর্তা লাদাখের ওপর কাশ্মীরের মালিকানা স্বীকার করে নেন। এর চার বছর পর ১৮৪৬ সালে কাশ্মীর ব্রিটিশ ভারতের দখলে আসে। লাদাখের আকসাই চীন অংশকে প্রাচীন চীন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করে চীন। লোকবসতিহীন এই দুর্গম অঞ্চলে অনেকটা অলক্ষে চীন পঞ্চাশের দশকেই সামরিক কার্যকলাপ চালায়, আর ১৯৬২ সালের যুদ্ধের সময় তার দখল পাকাপোক্ত করে। অরুণাচল থেকে পিছিয়ে গেলেও, আকসাই চীন থেকে সরে যায়নি চীন। বরং ভারতের দখলে থাকা লাদাখের কিছু এলাকার ওপরও চীনের দাবি বহাল আছে।

দুই দেশের দখলে থাকা এলাকার মাঝের যে সীমানা তা স্বীকৃত সীমান্ত নয়, এটাকে বলা হয় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই নিয়ন্ত্রণরেখাকে মেনে চলতে দু’পক্ষই অঙ্গীকারাবদ্ধ। ছোটখাটো সংঘাত-সংঘর্ষ অবশ্য তাতে একেবারে থেমে থাকেনি। কারণ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার অবস্থানটা ঠিক কোথায় এ নিয়ে দু’পক্ষের ব্যাখ্যায় কিছু ফারাক পাওয়া গেছে বরাবরই। জটিলতা আরো বেড়েছে এ জন্যে যে সীমান্ত নিয়ে ১৮৬৪ সনে আঁকা ‘জনসন লাইন’ অনুযায়ী আকসাই চীন কাশ্মীর তথা ব্রিটিশ ভারতের অংশ। আবার ১৮৯৩ সালে আঁকা ‘ম্যাকডোনাল্ড লাইন’ অনুযায়ী আকসাই চীনকে দেখানো হয়েছে চীনের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে। ১৯০৮ সালে ব্রিটিশ ভারতের দাবি আবার ‘জনসন লাইনে’ ফিরে যায়। পক্ষান্তরে চীনের দাবির ভিত্তি হচ্ছে ব্রিটিশদেরই আঁকা ‘ম্যাকডোনাল্ড লাইন’।

১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর, ১৯৬৭ এবং ১৯৭৫ সালেও লাদাখ-আকসাই চীনে উল্লেখযোগ্য দুটি সংঘর্ষ হয়, যাতে কিছু প্রাণহানি ঘটে। ১৯৭৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভারত-চীন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা অনেকটা ডি ফ্যাক্টো সীমান্তের মতোই কাজ করেছে, বড় কোনো সংঘাত হয়নি। দুই দেশই সীমান্তে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করার অঙ্গীকার করে এবং তা অদ্যবধি পালিত হচ্ছে। ১৯৯৩ থেকে পরবর্তী দশ বছরে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং পারস্পরিক বিশ্বাস অর্জনের লক্ষে দু’দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। এ সময়ে দু’দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়।

২০১৩ সাল থেকে কখনও কখনও পরস্পরের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রমের কিছু অভিযোগ করেছে দুই দেশই। তবে সুপ্ত এই সমস্যাটি ধীরে ধীরে আবার জেগে উঠেছে বিগত তিন বছরে। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে লাদাখের পানগং সো’র কাছে দুই দেশের সৈনিকদের মধ্যে কিল-ঘুষি, পাথর ছোঁড়াছুঁড়ি, লাঠালাঠি, মারামারির ঘটনা ঘটে, যার ফলে দু’পক্ষেরই বেশ কিছু সেনা আহত হয়। মাঝে আরো কিছু ছোটখাটো ঘটনার পর, সবচেয়ে গুরুতর সংঘাত হয় এ বছর। মে মাসে চীনা সেনাবাহিনীর বড় একটি দল গালওয়ান উপত্যকায় ঢুকে বেশ কয়েকটি স্থানে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার ভারতীয় অংশের কয়েক কিলোমিটার ভিতরে শিবির সন্নিবেশ এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন করে।

চীনের এই হঠাৎ আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়ার পেছনের কারণ নিয়ে নানা মতামত রয়েছে। কারো কারো মতে উদীয়মান বিশ্বশক্তি হিসেবে চীন তার অবস্থান জানান দিতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। নিজ দেশবাসীর কাছে নিজেকে লৌহমানব হিসেবে জাহির করার প্রয়াসেও চীনা রাষ্ট্রপ্রধান শি জিন পিং এ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে নিয়ন্ত্রণরেখার সন্নিকটে ভারত কর্তৃক দারবুক থেকে সাইয়োক হয়ে দৌলত বেগ ওল্ডি পর্যন্ত সড়ক সম্প্রসারণের প্রতিক্রিয়াতেই উদ্বিগ্ন চীন এ পদক্ষেপ নিয়েছে। সড়কটি কৌশলগত দিক থেকে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং চীন মনে করে এর ফলে আকসাই চীনের বিপরীতে ভারতীয় অবস্থান শক্তিশালী হবে।

নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর উদ্ভূত এই উত্তেজনা নিরসনে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়, কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। অবশেষে ১৫ জুন রাতে ভারতীয় সেনাদের একটি দল বলপূর্বক চীনা শিবির সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে সবচেয়ে গুরুতর সংঘাতটি ঘটে। আগের মতোই এ সংঘাতেও লাঠিসোটা, পাথর ইত্যাদিই ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু তিন ঘণ্টা স্থায়ী এই সংঘর্ষে একজন কর্নেলসহ অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা প্রাণ হারায় এবং আরো অনেকে আহত হয়। চীনাদের পক্ষ থেকে তাদের হতাহতের কোনো সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। তবে ৪০ জন চীনা সৈনিক নিহত হয়েছে বলে ভারত দাবি করেছে। চীন অবশ্য এ দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছে। বিগত ৪৫ বছরে দুই দেশের মধ্যে এটাই সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত।

১৫ জুনের সংঘর্ষের পর উভয় দেশ নিয়ন্ত্রণরেখার দু’পাশে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। জড়ো করছে সৈন্যসামন্ত আর ভারী অস্ত্রশস্ত্র। এ সংঘাতে দুই পক্ষের লাভ-লোকসান নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। যতদূর বোঝা যাচ্ছে গালওয়ান উপত্যকা এবং আশেপাশের কয়েকটি স্থানে ইতোপূর্বে ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু এলাকা চীনাদের হস্তগত হয়েছে, আর তাতে করে ভারতের জন্য কৌশলগত দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির অবস্থান কিছুটা নাজুক হয়ে পড়েছে।

আঞ্চলিক দুই পরাশক্তির এই দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তাহলে কোথায়? কেউ কেউ ভাবেন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে অদ্যাবধি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্রে ভারত আশা করে যে চীনের সাথে এ বিবাদে বাংলাদেশ তার পাশে দাঁড়াবে। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। ভারত জানে বৈদেশিক সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশকেই নিজ স্বার্থ রক্ষা করে চলতে হয়। চীনের সাথে বাংলাদেশের গভীর এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বড় অংঙ্কের বিনিয়োগ করছে চীন এবং এ বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য জরুরি। অন্যদিকে চীন এটা অবশ্যই উপলব্ধি করে যে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের বিপক্ষে গিয়ে চীনকে সমর্থন করা বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব। বাস্তবতার নিরিখে তাই বাংলাদেশ এই সংঘাতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা এবং নীরবতা অবলম্বনের নীতি গ্রহণ করেছে। বিবদমান দুই পক্ষেরই তাই প্রত্যাশিত লক্ষ্য হবে, বাংলাদেশ যেন তার প্রতিপক্ষের প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শন না করে তা নিশ্চিত করা। লাদাখ সংঘাত-পরবর্তী দিনগুলোতে তাই বাংলাদেশ নিয়ে ভারত এবং চীন উভয়েরই খানিকটা দৌড়ঝাঁপের পেছনে এটা একটা কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চীন-ভারতের হাতে খেলার মতো তাস কী আছে? চীনের তাস তার আর্থিক সক্ষমতা আর সে তাস চীন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে খেলছে, শুধু বাংলাদেশে নয় এশিয়া আফ্রিকার আরও অনেক দেশেও। রোহিঙ্গা সমস্যার মতো একটা গুরুতর সংকটে দুঃখজনকভাবে চীনের তরফে সরাসরি মিয়ানমারের পক্ষাবলম্বন সত্ত্বেও তাই বাংলাদেশ চীনের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সম্প্রতি চীন শতকরা ৯৭ ভাগ বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। পক্ষান্তরে, ভারত তার তাসগুলো খুব সাফল্যের সাথে খেলেছে এ কথা বলা যাচ্ছে না। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির টানাপড়েনে ঝুলে আছে তিস্তার পানিবণ্টনের যৌক্তিক চুক্তি। সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা বন্ধে ভারত চরম অসংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। বাণিজ্যে অশুল্ক বাধা আর প্রতিশ্রুত প্রকল্প ঋণের অর্থছাড়ে শম্বুক গতিও জনমানসে ভারতের ব্যাপারে ইতিবাচক বাতাবরণ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়নি। তার সাথে যোগ হয়েছে আসামের নাগরিকপঞ্জি আর ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন যা বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণ উভয়কেই ক্ষুব্ধ করেছে।

সীমান্ত নিয়ে চীন-ভারতের এই সংঘাত দীর্ঘদিনের, আর এরূপ সমস্যার সমাধান সহজে হয় না। আরও অনেকদিন এ সমস্যা থেকে যাবে, আর মাঝে মাঝে তা যে প্রাণঘাতী রূপ নেবে না, এ বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। দুই শক্তিমান রাষ্ট্রের যে কোনো গুরুতর সংঘাত প্রতিবেশীদের জন্য বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। নিজেদের স্বার্থেই আমরা তাই আঞ্চলিক শান্তি চাই। আমরা চাই চীন এবং ভারত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদের বিবাদ মিটিয়ে ফেলুক। আর স্বাভাবিকভাবেই, পড়শিদের এই ঝগড়া থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার নীতিতে অবিচল থাকতে হবে বাংলাদেশকে।


মো. তৌহিদ হোসেন: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব

শেয়ার করুন