20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
করোনাকালে মিডিয়া ভুবন

এতসব হতাশাজনক চিত্রের মাঝেও কিছু আলোর রেখা আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের মিডিয়া ভুবনে। প্রায় সব বড় মাধ্যমই অনলাইনে তাদের বিচরণ বাড়িয়েছে এবং অনেকে সাফল্যও পেয়েছে।

অর্থনীতির প্রতিটি খাতেই করোনাভাইরাসের প্রভাব দৃশ্যমান। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত যেসব খাত আছে, তার মধ্যে গণমাধ্যম অন্যতম। সারাদেশের সাংবাদিকেরা এই ভাইরাসের কারণে ব্যাক্তিগতভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। অনেকেই আছেন টিকে থাকার সংগ্রামে, অনেকে পেশা ছেড়ে দিতেও বাধ্য হয়েছেন।

আসলে কোভিড-১৯ এমন এক সময়ে আঘাত করেছে, যখন বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অবস্থা এমনিতেই বেশ সঙ্গীন ছিল। ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিচালিত হয় এক বৈরী পরিবেশে। সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভাজিত সাংবাদিক সমাজের নানা সমীকরণ, সমালোচনা সইতে না পারার সংস্কৃতি ছাড়াও বাংলাদেশের গণমাধ্যম সনাতনভাবেই কাজ করে এক ধরনের আর্থিক অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে।

করোনা আসার আগে থেকেই মিডিয়ার রাজস্ব আয় কমছিল। সেটি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে করোনার অভিঘাতে। ডিজিটাল দুনিয়ায় সামাজিক মাধ্যমের আগ্রাসী অবস্থান এবং হাতে হাতে স্মার্টফোনের ব্যাপক বিস্তারে প্রচলিত গণমাধ্যমের ব্যবসা সংকুচিত হচ্ছিল অনেক দিন ধরেই। করোনা এসে এতে আরও গতি যুগিয়েছে। পাঠক আর দর্শক কমে যাওয়ায় বিজ্ঞাপন হ্রাসে গণমাধ্যমের স্বাভাবিক পরিচালনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর বাইরে বেড়েছে কাজের চাপ, তৈরি হয়েছে আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং করোনা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও।

বাংলাদেশে করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। একদম শুরুতে সংবাদমাধ্যমগুলো শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে তৎপর হয়। অফিসে এবং কর্মী আনা নেয়ার পরিবহনগুলো জীবাণুনাশক ছিটিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করে। একদম জরুরি কর্মী ছাড়া বড় অংশই বাসায় থেকে কাজ করার প্রক্রিয়া শুরু করে। কিন্তু সবাই যে এমনটা করেছে তা নয়। কিছু পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল কর্মীদের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা না করেই তাদের স্বশরীরে অফিস করতে বাধ্য করেছে। কর্মস্থলেও নেওয়া হয়নি যথাযথ জীবাণুনাশক ব্যবস্থা। লকডাউন শিথিল হলে বাসা থেকে কাজ করা কর্মীরা এখন গণপরিবহন ব্যবহার করে অফিস করেছেন চাকরি হারানোর ভয়ে। ঢাকার বাইরে যেসব সাংবাদিক কাজ করেন, তাদের খুব অল্পই কেন্দ্রীয় অফিসের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আওতায় সুবিধা পেয়েছেন।

শত শত সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, অনেকে মারাও গেছেন। করোনা নমুনা পরীক্ষার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না কোনো হাউজেই। তবে উদ্যমী সম্প্রচার সাংবাদিকদের সংগঠন ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার, ঢাকা রিপোর্টারস ইউনিটি ও জাতীয় প্রেসক্লাব তাদের সদস্যদের জন্য নমুনা পরীক্ষার আয়োজন করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায়।

এই মুহূর্তে করোনার প্রাথমিক সেই ভয়টা নেই। গণমাধ্যমের সামগ্রিক আয়োজন হলো খরচ কমানোর দিকে। পত্রিকাগুলো পৃষ্ঠা সংখ্যা কমিয়েছে, টেলিভিশন চ্যানেলগুলো (দুয়েকটা ব্যাতিক্রম ছাড়া) জুমের মাধ্যমে টকশো আয়োজন করে ও বড় সময় ধরে একই ঘটনা লাইভ করে খরচ কমানোর চেষ্টা করে চলেছে। অনুষ্ঠানভিত্তিক চ্যানেলগুলো নতুন নাটক ও অনুষ্ঠান কেনা বন্ধ রেখেছে। কোনো কোনো হাউজ কর্মী ছাটাই করেছে, কেউবা অনেক কর্মীকে বাধ্যতামূলক বিনা বেতন ছুটিতে পাঠিয়েছে। আর এই সময়টিতে মিডিয়াতে সরকারের প্রচার বেড়েছে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।

কিন্তু এতসব হতাশাজনক চিত্রের মাঝেও কিছু আলোর রেখা আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের মিডিয়া ভুবনে। প্রায় সব বড় মাধ্যমই অনলাইনে তাদের বিচরণ বাড়িয়েছে এবং অনেকে সাফল্যও পেয়েছে। প্রিন্টে আর পর্দায় রাজস্ব কমলেও অনেকেই আয়ের পথ দেখছে ডিজিটাল প্লাটফরমে, কারণ মানুষ এখন পত্রিকা পড়া ও টেলিভিশন দেখার চেয়ে বেশি ব্যস্ত ডিজিটাল জগতে।

তাই কোভিড-১৯ গণমাধ্যমের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ – দুটি পথই খুলে দিয়েছে। এখন প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া আলাদা করা যাচ্ছে না, প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতিযোগী। প্রত্যেকেই এক ধরনের গ্রাহক আর বিজ্ঞাপন ধরতে সক্রিয়। একটা বিষয় মনে রাখা দরকার: এই বাজারটা বড়, কিন্তু মিডিয়া নিজে ততটা বড় কিনা সেটাই ভাবনার বিষয়। কী করে মানসম্পন্ন কনটেন্ট নিয়ে মানুষের কাছে উপস্থিত হওয়া যাবে সেটিই বড় কৌশল।

আমরা দেখছি, এর মধ্যেই কারও কারও সাফল্য এসেছে। কিন্তু বেশিরভাগই পারছে না কুলিয়ে উঠতে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম মালিকদের ভেতর আরেকটু প্রাতিষ্ঠানিক ভাবনা আসা প্রয়োজন। ‘সামন্ত প্রভুর’ ব্যক্তিগত গণমাধ্যম আর টিকবে না। বাণিজ্যিক পরিচালনার পদ্ধতি বদলাতে হবে। সাংবাদিক ও কর্মীদের সুস্থ ও সুষ্ঠু আর্থিক নিশ্চয়তার ব্যবস্থা না করলে ভালো কনটেন্ট সৃষ্টি হবে না। মানুষ যে তথ্য চায়, যে কনটেন্ট চায়, যে মানের কনটেন্ট চায়, সেটি দিতে না পারলে গণমাধ্যম এগুবে না। নিজস্ব রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থে এতদিন যারা তাদের পত্রিকা আর টেলিভিশনকে ব্যবহার করেছেন, কিংবা ভাবছেন অনলাইনকে ব্যবহার করবেন, তারা ভুল পথে হাঁটছেন। ডিজিটাল দুনিয়ার মানুষ এমন মালিককে প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেছে।

রাজনৈতিক বাণিজ্যের মিডিয়া বেশিদিন আর চলবে না। কারণ মিডিয়া এখন একমুখী নয়। দর্শক, পাঠক বা শ্রোতা নিজেদের যুক্ত করে টু-ওয়ে মিডিয়ার সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ গণমাধ্যমে নিজস্ব চাহিদার বাজার সৃষ্টি করছে। মালিকানার নামে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিজস্ব প্রচারণায় অর্থ খরচ করতে রাজি নয় তারা। বিজ্ঞাপনদাতারাও সেরকম কনটেন্ট সৃষ্টির পক্ষে। তাই এখন সাংবাদিকতার চেহারা বদলাবে, যা অনেক বেশি মানুষের কথা বলবে। সংকট আছে, সংকটের ভেতর দিয়েই প্রগতির পথে হাঁটতে হয়। বাংলাদেশে মিডিয়ার সামনে প্রতিবন্ধকতা অনেক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ডিজিটাল সাংবাদিকতা প্রসারে বড় বাধা। কিন্তু তবুও মানুষের কথা মিডিয়াই বলবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ দুর্বল বলে মিডিয়ার দায়িত্ব অনেক বেশি। করোনাকাল আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে চ্যালেঞ্জ নিতে হয়, কীভাবে সুযোগকে কাজে লাগাতে হয়। আমরা আছি এমন এক জীবনে, যখন মাধ্যম ডিজিটাল, মানুষ ডিজিটাল, পেশাজীবিরা ডিজিটাল। সাংবাদিকতা হলো এই নতুন ব্যবস্থার সাথে, নয়া স্বাভাবিকতার সাথে পেশাদারিত্বের সমন্বয় ঘটিয়ে একদিকে ভা্লো সাংবাদিকতা করা এবং সেই সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখতে গণমাধ্যমের আর্থিক ব্যবস্থাকে সংহত করা।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি

শেয়ার করুন