20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
বাবরি মসজিদ কেউ ভাঙেনি?

লখনউয়ের বিশেষ সিবিআই আদালতের এই রায় ঘোষিত হওয়ার পর কেউ শিরোনাম দিয়েছে 'নো ওয়ান ডেমোলিশড বাবরি', কেউ বা লিখেছে 'নো ওয়ান ফেলড বাবরি'। ২৮ বছর ধরে চলতে থাকা বিতর্কিত মামলার রায়ে জানা গেল, 'কেউ দোষী নয়'।

বুধবার বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলার রায় বেরোনোর পরেই আমার এক সাংবাদিক বন্ধু ফোন করে বললেন 'নো ওয়ান কিল্ড জেসিকা'।

২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে মুক্তি পাওয়া হিন্দি ছবির নাম 'নো ওয়ান কিল্ড জেসিকা'। দিল্লির একটি চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা নিয়ে তৈরি ছবিটি। ওই ছবির চিত্রনাট্যের মূল বক্তব্য ছিল, খুনের কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী কীভাবে সহজেই সব ভুলে যান বা সর্বোচ্চ দরদাতাদের কাছে তাদের সাক্ষ্য বিক্রি করতে চান। অর্থাৎ, লোভ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে বন্ধক রাখা হয় একটি খুনের সহজ সরল মামলা। যার ফলে বহু মানুষের সামনে ঘটে যাওয়া খুনের অপরাধী শাস্তি পায় না।

ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলার রায় নিয়ে লেখার শুরুতে একটি হিন্দি ছবির উল্লেখ অনেকের কাছেই অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু বৃহস্পতিবার ভারত বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বাবরি মসজিদ মামলার রায় সম্পর্কিত শিরোনামগুলি যদি আমরা দেখি, তবে সহজেই বোঝা যাবে হিন্দি ছবিটির নামের সঙ্গে বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলায় সিবিআইয়ের বিশেষ আদালতের ২৬শ পৃষ্ঠার রায়ের যোগসূত্রতা। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মামলায় ৩২ জন অভিযুক্তই নির্দোষ। লখনউয়ের বিশেষ সিবিআই আদালতের এই রায় ঘোষিত হওয়ার পর কেউ শিরোনাম দিয়েছে 'নো ওয়ান ডেমোলিশড বাবরি', কেউ বা লিখেছে 'নো ওয়ান ফেলড বাবরি'। ২৮ বছর ধরে চলতে থাকা বিতর্কিত মামলার রায়ে জানা গেল, 'কেউ দোষী নয়'।

সিবিআই বিশেষ আদালতের বিচারপতি এস কে যাদবের পাঁচ মিনিটের রায়ে মূল পাঁচটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, পরিকল্পিতভাবে বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়নি। দ্বিতীয়ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তৃতীয়ত, সিবিআই যে ভিডিও এবং অডিও রেকর্ড পেশ করেছে, তা প্রামাণ্য কিনা জানা যাচ্ছে না। চতুর্থত, সমাজবিরোধীরা মসজিদ ভাঙার চেষ্টা করেছিল। অভিযুক্তরা তাদের থামাতে চেষ্টা করেছিলেন। পঞ্চমত, অডিও ক্যাসেটে কয়েকজনের ভাষণ শোনা যাচ্ছে বটে, কিন্তু কী বলা হয়েছে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না।

১৯৯২-এর ডিসেম্বরে গঠিত লিবেরহান কমিশন ২০০৯ সালে তাদের রিপোর্ট পেশ করে বলেছিল, দীর্ঘ এবং বিশদ পরিকল্পনার ফল এই ধ্বংসকাণ্ড। আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অর্থ জোগাড় করা হয়েছিল, করসেবকদের নামে স্বয়ংসেবকদের হাজির করা হয়েছিল এবং কে কোন কাজ করবে তার বিশদ পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। যে হাতিয়ার নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল মসজিদ ভাঙার বাহিনি, তা পরিকল্পনা ছাড়া অসম্ভব। যেভাবে অতি দ্রুত মসজিদ ভেঙে সেখানে রামলালার মূর্তি স্থাপন করা হয়, তা পরিকল্পনা ছাড়া অসম্ভব। ১৯৯০-এ একবার মসজিদ ভাঙার চেষ্টা হয়েছে। সারা দেশে পরিকল্পিতভাবে 'মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে' শ্লোগান দিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরী করা হয়েছে। এসব কোনো কিছুই তথ্যপ্রমাণ হিসাবে বিচারপতির নজরে আসেনি। আর সে কারণেই সিবিআইয়ের বিশেষ আদালতের রায়কে 'সম্পূর্ণ প্রহসন' বলে চিহ্নিত করেছেন অন্ধ্রপ্রদেশ হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এম এস লিবারহান। তিনি বলেছেন, ‘বাবরি মসজিদ ধ্বংস পূর্বপরিকল্পিত নয় বলে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা কমিশনের রিপোর্টের সম্পূর্ণ বিরোধী। পুরো পরিকল্পনামাফিক (মসজিদ) ধ্বংস করা হয়েছিল।’ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনার তদন্তের জন্য ভি পি নরসিংহ রাও সরকারের গঠন করা কমিশনের প্রধান ছিলেন এম এস লিবারহান।

সিপিআই (এম) পলিটব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিম আদালতের রায় শোনার পরেই মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমরা অবাক হইনি। কারণ দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কুক্ষিগত করে সংকীর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এগুলোর দৃষ্টি ঘোলাটে করে দেওয়া হচ্ছে। ক্ষমতাশালীদের তুষ্ট করে যেভাবে অপরাধীদের রেহাই দেওয়া হলো, তাতে আদালত ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে দেশবাসীর ভরসা নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে, আইনের শাসন ধ্বংস করা হচ্ছে।’

আদালতের এ রায়কে ‘সংবিধানের ভাবধারার’ বিরোধী বলে মন্তব্য করেছে কংগ্রেস। ২০১৯ সালে বাবরি জমি বিতর্ক মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের ঘটনাকে ‘আইন লংঘন’ বলে অভিহিত করেছিল। এ দিনের রায় সুপ্রিম কোর্টের সেদিনের মতামতের বিরোধী বলে দাবি কংগ্রেসের। কংগ্রেসের দাবি, সিবিআইয়ের বিশেষ আদালতের রায়ের বিপক্ষে আবার উচ্চ আদালতে আবেদন করুক কেন্দ্র ও উত্তরপ্রদেশ সরকার। দলের মুখপাত্র রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা বলেছেন, ‘সিবিআইয়ের বিশেষ আদালতের রায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস প্রসঙ্গে গত বছর ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য ও সংবিধানের মূল ভাবধারার বিরোধী।

সেদিন সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর যা হয়েছে তা গুরুতরভাবে আইন-শৃঙ্খলা লঙ্ঘন। কিন্তু তারপরও বিশেষ আদালত সব অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস বলে জানিয়েছে। স্পষ্ট যে, এই রায় সর্বোচ্চ আদালতের ব্যাখ্যাকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।’ তিনি বলেছেন, ‘যে কোনো উপায় ক্ষমতা দখলের জন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ভাতৃত্ববোধ নষ্ট করে বাবরি মসজিদ ভেঙেছিল আরএসএস-বিজেপি। গোটা দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট যে সেটা ষড়যন্ত্র ছিল। এই ষড়যন্ত্রের সহযোগিতা করেছিল তৎকালীন উত্তরপ্রদেশ সরকার। এটা সংবিধানের মূল ধারার ওপর আঘাত। সুপ্রিম কোর্টকে ভুল পথে চালনার চেষ্টা করা হলেও তা হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট ওই ঘটনাকে গুরুতর আইন লঙ্ঘন বলে জানিয়েছে।’


আশিস গুপ্ত: সাংবাদিক, নয়াদিল্লি

শেয়ার করুন