মগবাজার বিস্ফোরণের কেন্দ্র বেঙ্গল মিট

মগবাজার বিস্ফোরণের কেন্দ্র বেঙ্গল মিট

প্রকট বিস্ফোরণে ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয়েছে মগবাজারের ৩ তলা একটি ভবনের নিচ তলার দুটি দোকান। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস

রোববার রাতে বিস্ফোরণ ঘটলেও তখন ধ্বংসস্তূপ দেখে বোঝার উপায় ছিল না ভবনে বিস্ফোরণের উৎস। ঘটনার পর ধারণা করা হচ্ছিল শর্মা হাউসের রান্নাঘর থেকে বিস্ফোরণ হয়ে থাকতে পারে। তবে দিনের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে, বিস্ফোরণ ঘটেছে মূলত বেঙ্গল মিটের আউটলেটের ভেতরে।

শর্মা হাউস রেস্তোরাঁ নয়, তার পাশের দোকান বেঙ্গল মিটের আউটলেটেই বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়েছিল। ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত ও বিস্ফোরণের গতি-প্রকৃতি দেখে এ ধারণা করছেন ঘটনার তদন্তকাজে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা।

বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি একটি তিনতলা বাণিজ্যিক ভবন। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলায় পাশাপাশি তিনটি দোকান: গ্র্যান্ড বেকারি, শর্মা হাউস রেস্টুরেন্ট এবং বেঙ্গল মিট। বেঙ্গল মিট প্রক্রিয়াজাতকৃত মাংসের চেইন দোকান।

বিস্ফোরণের ফলে শর্মা হাউস ও বেঙ্গল মিট দুটি দোকানই গুঁড়িয়ে গেছে। তৃতীয় দোকান গ্র্যান্ড বেকারির তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

রোববার রাতে বিস্ফোরণ ঘটলেও তখন ধ্বংসস্তূপ দেখে বোঝার উপায় ছিল না ভবনে বিস্ফোরণের উৎস। ঘটনার পর ধারণা করা হচ্ছিল শর্মা হাউসের রান্নাঘর থেকে বিস্ফোরণ হয়ে থাকতে পারে। তবে দিনের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে, বিস্ফোরণ ঘটেছে মূলত বেঙ্গল মিটের আউটলেটের ভেতরে।

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ভবনটির শর্মা হাউস ও বেঙ্গল মিট আউটলেটের সামনে দাঁড়ালে বোঝার উপায় নেই বিস্ফোরণের উৎপত্তিস্থল। তবে ভবনের পেছনের দিকে গেলে দেখা যায়, বেঙ্গল মিট আউটলেটটির পেছনের দিকে বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন, যেটা শর্মা হাউসের ক্ষেত্রে নেই।

শর্মা হাউস ও বেঙ্গল মিটের আউটলেটের পেছনের অংশ ভবনের সীমানাপ্রাচীরঘেঁষা। সীমানাপ্রাচীরের পরই আবার আরেকটি ভবন।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শর্মা হাউসের পেছনের সীমানা দেয়াল অক্ষত থাকলেও বড় ধরনের আঘাতে ভেঙে গেছে বেঙ্গল মিট আউটলেটের অংশের সীমানাপ্রাচীর।

ভবনটির দোতলার পুরো অংশে ইলেকট্রনিক পণ্যের কোম্পানি সিঙ্গারের পণ্যের গোডাউন। বিস্ফোরণে দোতলার যে অংশটির মেঝে ধসে পড়েছে, সেটি বেঙ্গল মিটের দিককার অংশ। কিন্তু দোতলার শর্মা হাউসের অংশে ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম।

মগবাজার বিস্ফোরণের কেন্দ্র বেঙ্গল মিট
বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত ভবনের পেছনের অংশ। ছবি: নিউজবাংলা

ভবনের পেছনের অংশে ছিল শর্মা হাউসের রান্নাঘর, ওয়াশরুম ও বেসিন। বিস্ফোরণের পর শর্মা হাউসের রান্নাঘরের কোনো অস্তিত্ব না মিললেও অক্ষত আছে পাশেই থাকা ওয়াশরুম ও বেসিন। অন্যদিকে বেঙ্গল মিটের অংশটুকু এমনভাবে ধ্বংস হয়েছে যে শুধু কয়েকটি ফ্রিজ ছাড়া আর কিছুই চেনার উপায় নেই।

মগবাজার বিস্ফোরণের কেন্দ্র বেঙ্গল মিট
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ভবনের নিচতলার শর্মা হাউসের বেসিনের পাশে মেঝেতে ঢাকনা খোলা ট্যাংক। ছবি: নিউজবাংলা

প্রথম দিন তদন্তে নেমে এই বিষয়গুলোই লক্ষ করেছেন একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে জানান, তারা লক্ষ করেছেন বেঙ্গল মিটের আউটলেটের পেছনের দিকে ক্ষতি বেশি হয়েছে। আর যেকোনো আঘাতের কেন্দ্রেই যেহেতু সবচেয়ে বেশি শক্তি থাকে, তাই তাদের মনে হচ্ছে, বেঙ্গল মিটের পেছনের অংশেই বিস্ফোরণ হয়ে থাকতে পারে।

দুটি দোকানের নিচে সেপটিক ট্যাংক?

বিস্ফোরণের শিকার মগবাজার প্লাজার লাগোয়া ভবনটি বহু পুরোনো একটি বাণিজ্যিক ভবন। ভবন মালিকের নাম মশিউর রহমান খোকন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। ভবন মালিক থাকেন ধানমন্ডিতে।

শর্মা হাউস রেস্তোরাঁর পেছনের অংশে অক্ষত রয়েছে বেসিন ও ওয়াশরুম। বেসিনের সঙ্গেই দেখা গেল, মেঝেতে একটি ট্যাংকের ওপরের লোহার ঢাকনা খোলা পড়ে আছে। আর ট্যাংকের ভেতরে শুকনা ময়লা জমে আছে। ট্যাংকটি কি ভবনের পয়োনিষ্কাশনের সেপটিক ট্যাংক নাকি পানি ধারণ করে রাখার ট্যাংক, তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও এটা যে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত তা বোঝা যায়।

তদন্তকারী একজন কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে নিশ্চিত করেন, ভবনের সেপটিক ট্যাংকটি শর্মা হাউসের রান্নাঘরের কিছু অংশ ও বাকিটা বেঙ্গল মিটের পেছনের অংশজুড়ে বানানো। ভবন মালিক এ বিষয়টি ওই কর্মকর্তার কাছেও স্বীকার করেছেন বলে জানান তিনি।

মগবাজার বিস্ফোরণের কেন্দ্র বেঙ্গল মিট
শর্মা হাউসের বেসিনের পাশের ট্যাংক। ছবি: নিউজবাংলা

ঘরের ভেতরে সেপটিক ট্যাংক রাখার সুযোগ আছে কি না, জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘কোনোভাবেই না। সেপটিক ট্যাংকের ভেতরের ময়লা থেকে কয়েক ধরনের গ্যাস জমা হয়, বদ্ধ জায়গায় এই ধরনের ট্যাংক স্থাপন করার কোনো সুযোগ নেই। ঢাকা শহরের ভবনমালিকরা নিজেদের মতো নিয়মের বাইরে গিয়ে যা খুশি তাই করে যান।’

এ বিষয়ে কথা বলতে ভবনমালিক খোকনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

কথা হয় একজন স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে। তিনি জানান, ভবনমালিক নব্বইয়ের দশকে এই ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন। তখন নিচতলার অংশটি ফাঁকা রাখা হয়েছিল ভবনের গাড়ির পার্কিং ব্যবস্থার জন্য। এই ফাঁকা জায়গাতেই ভবনটির পেছনের অংশে সেপটিক ট্যাংক বানানো হয়েছিল। কিন্তু গত ১৫ বছর আগে ওই ফাঁকা অংশে ভাড়া দেয়ার জন্য দোকান নির্মাণ করেন ভবনমালিক।

রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে একটি তিনতলা ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহত হন ছয়জন, আহত অর্ধশতাধিক। সন্ধ্যা ৭টা ২২ মিনিটে এই বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আশপাশের অন্তত সাতটি ভবন ও তিনটি বাস। ঘটনার পর থেকেই কারণ জানতে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

[সংশোধনী: প্রতিবেদনে এর আগে স্থানীয় কয়েক জনের উদ্ধৃতি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের মালিকের নাম হারুণ লেখা হয়েছিল, তবে পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া গেছে ভবন মালিকের প্রকৃত নাম খোকন।]

আরও পড়ুন:
মগবাজারের বিস্ফোরণ তদন্তে পুলিশের কমিটি
মিলল নোমানের নিথর দেহ
মগবাজার বিস্ফোরণ: বিপুর কাছে বিবৃতি দাবি
ভেঙে ফেলতে হবে মগবাজারের সেই ভবন
মগবাজার বিস্ফোরণ: তল পাচ্ছে না বিস্ফোরক পরিদপ্তর

শেয়ার করুন

মন্তব্য