অবহেলাজনিত মৃত্যুর মামলা ৩ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে

অবহেলাজনিত মৃত্যুর মামলা ৩ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে

ঢাকার মুখ্য মহানগর আদালতের (সিএমএম) হাকিম রাজেশ চৌধুরীর আদালতে রোববার এ মামলা করেন মৃত ডা. তৌফিক এনামের বাবা আক্তারুজ্জামান মিয়া। বিচারক বাদির জবানবন্দি নিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ।

রাজধানীতে তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত কারণে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগে মামলা হয়েছে। রোগীর মরদেহ আটকে টাকা আদায়ের অভিযোগও তোলা হয়েছে মামলায়।

ঢাকার মুখ্য মহানগর আদালতের (সিএমএম) হাকিম রাজেশ চৌধুরীর আদালতে রোববার এ মামলা করেন মৃত ডা. তৌফিক এনামের বাবা আক্তারুজ্জামান মিয়া। বিচারক বাদির জবানবন্দি নিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ।

মামলায় যে তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তারা হলেন, কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ল্যাপারোস্কপিক সার্জন অধ্যাপক ডা. আবদুল ওহাব খান, ল্যাবএইড হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল এবং বিআরবি হাসপাতালের হেপাটোবিলিয়ারি সার্জন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী।

মামলার বাদি আক্তারুজ্জামান মিয়ার ছেলে ডা. তৌফিক ছিলেন রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার।

বাদির আইনজীবী হেমায়েত উদ্দিন খান হিরোন বিষয়টি নিউজবাংলাকে নিশ্চিত করেছেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, গত ৪ মে ডা. তৌফিক এনাম অসুস্থ হলে আখতারুজ্জামান মিয়া তাকে ডা. আবদুল ওহাব খানের কাছে নিয়ে যান। এরপর জরুরি ভিত্তিতে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে আবদুল ওহাবের অধীনে তাকে ভর্তি করা হয়।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ডা. ওহাব জানান, রোগীর গলব্লাডারে পাথর হয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন করতে হবে। এরপর বাদি অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা পরিশোধ করেন।

এরপর গত ৫ মে ডা. আবদুল ওহাব খান অপারেশন করে পরদিন ৬ মে রোগীকে ছাড়পত্র দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেন। ৯ মে সন্ধ্যার পর রোগী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ডা. আবদুল ওহাবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বাদী।

পরে আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখে ডা. ওহাব বলেন, ‘রোগীর অপারেশনের স্থানে কোনো জটিলতা হয়েছে কি না জানতে এমআরসিপি পরীক্ষা করতে হবে।

১১ মে পরীক্ষা করে কাগজপত্র নিয়ে গেলে ডা. আবদুল ওহাব বলেন, ‘অপারেশনের পর রোগীর কমন বিলেডাক্ট চিকন হয়ে গেছে এবং অপারেশনের সময় একটি সমস্যা হয়েছে।’

তিনি রোগীকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীলের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, মানসিক চাপ সৃষ্টি ও এক প্রকার জোর করেই ডা. ওহাব রোগীকে ল্যাবএইড হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। সেখানে ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল রোগীর কতগুলো পরীক্ষা করেন। পরীক্ষা শেষে রোগীর ইআরসিপি উইথ স্টেনটিং করার ব্যর্থ চেষ্টা করেন তিনি।

এ কারণে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। রোগীর প্যানক্রিয়েটিটিস বাড়তে থাকে এবং তিনি মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন।

এক পর্যায়ে ডা. স্বপ্নীল রোগীকে বিআরবি হাসপাতালের হেপাটোবিলিয়ারি সার্জন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলীর কাছে নিয়ে যাওয়োর পরামর্শ দেন।

এরপর আক্তারুজ্জামান মিয়া তার ছেলেকে বিআরবি হাসপাতালে ভর্তি করলে ডা. মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘রোগীর অবস্থা ভালো না। জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন না করলে তাকে বাঁচানো যাবে না।’

মামলায় অভিযোগ করা হয়, রোগীর পরিবারের সদস্যরা বিআরবি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে চাননি। তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল বা অন্য কোথাও চিকিৎসা করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরস্পর যোগসাজশে জোর করে এবং ভয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রোগীকে বিআরবি হাসপাতালে রেখে দেয়া হয়।

আক্তারুজ্জামান মিয়ার অভিযোগ, রোগীকে ছাড়পত্র দেয়ার জন্য ডা. মোহাম্মদ আলীকে বারবার অনুরোধ করলেও তিনি সাড়া দেননি। জোর করে টাকা আদায়ের জন্য সংকটাপন্ন অবস্থায় বিনা চিকিৎসায় রোগীকে তিনি হাসপাতালে আটকে রাখেন।

রোগী মারা যাওয়ার পরও ডা. মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘রোগী ভালো আছেন।’তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাদির কাছ থেকে টাকা আদায় করেন বলেও অভিযোগ করা হয় মামলায়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, এ ঘটনায় গত ১৫ জুন কলাবাগান থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ না করে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেয়।

এ বিষয়ে কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ল্যাপারোস্কপিক সার্জন অধ্যাপক আবদুল ওহাব খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘চিকিৎসক তৌফিক এনামের স্ত্রী আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসক। সেই সুবাদে তৌফিক এনামের অপারেশন আমাদের হাসপাতালে করানো হয়।

‘অপারেশন খুবই পরিচ্ছন্ন হয়েছিল। অপারেশনের সময় তার স্ত্রী অপারেশন থিয়েটার ছিলেন। তার স্ত্রী গোটা সময় অপারেশনটা দেখছেন। কোনো ধরনের কোনো সমস্যা ছিল না। এই ধরনের অপারেশনের মাধ্যমে পিত্তথলিটা ফেলে দেয়া হয়। পিত্তথলিটাতে সমস্যা তৈরি হলে জন্ডিস হয়। এটা হওয়ার অনেকগুলো কারণ আছে।

‘অপারেশন পরবর্তী সময়ে যখন তিনি আমার কাছে আসলেন তখন দেখলাম তার জন্ডিস হয়েছে এবং পিত্তথলিটা ব্লক হয়ে আছে। তখন আমি বললাম, আরও কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হবে। আমাদের কাছে আবার আসেন আবার একটা অপারেশন করে ঠিক করে দিব। তবে পরবর্তী সময়ে উনি আর আমার কাছে আসেন নি। এর পর কী কী ঘটেছে এটা আপনারা ভালো জানেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই ধরনের জটিলতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় হচ্ছে। আপনি অনলাইনে সার্চ দিলে এমন ঘোষণা অনেকগুলো পাবেন। আমিও অনেকগুলো এই ধরনের অপারেশন করেছি। সারা দেশে থেকে এমন রোগী আসে। অপারেশনের পর জটিলতা নিয়েও অনেক রোগী আসে।

‘আমরা আবার অপারেশন করে দিলে, ভালো হয়ে যায়। কিন্তু কেনো উনি (তৌফিক এনাম) আবার আসলেন না আমি বুঝতে পারছি না। আমার কাছে না এসে তিনি অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেন। অন্য হাসপাতালের চিকিৎসকরা কী করেছেন এটা আমার জানা নেই।’

মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মামলা না করে তিনি আমাদের কাছে এলে আমার আলোচনা করে সমাধান করতে পারতাম। তবে যেহেতু মামলা হয়েছে। সেহেতু আমার আইনিভাবে মোকাবিলা করব।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমিও গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। শুনেছি আমার বিরুদ্ধে (সিআইডি) তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমি বাদে আরও দুই জনের নামে মামলা হয়েছে। সেই দুজনের নাম আমি এখনও জানি না।’

ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি হলো চিকিৎসক তৌফিক এনাম। শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় তার লিভার হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস সমস্যা ছিল। যে কারণে মেডিক্যালের প্রথম বর্ষ থেকে আমার শিক্ষক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. সেলিমুর রহমানের অধীনে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে আমার কাছেও কিছুদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরপর আমার সঙ্গে অনেকদিন যোগাযোগ ছিলো না।

‘গত ৪ মে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতাল কাকরাইলে তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। আমাকে সেই রিপোর্টটি মোবাইলের মেসেঞ্জারে পাঠান। আমি তার রিপোর্ট দেখে বলেছিলাম, এ ধরনের ক্ষেত্রে যে সমস্যা হয় সেটা হলো, তার মতো পরিস্থিতিতে জন্ডিস কমিয়ে দেয়া জটিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফল হওয়া যায় না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সফল হয়।

‘তার (তৌফিক এনাম) যুক্তি ছিল, তার ক্ষেত্রে হয়ত সফল হতে পারে। এরপর আমরা একটা বড় ধরনের অপারেশন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময় তৌফিক এনামের স্ত্রীও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তার স্ত্রীও একজন চিকিৎসক। তার একদিন পর ল্যাবএইড হসপাতালের অপারেশন না করিয়ে তাকে বিআরবি হাসপাতালে নিয়ে যান অভিভাবকেরা। এরপর থেকে আমার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই।

ডা. স্বপ্নীল বলেন, ‘১৫-২০ দিন পর রাতে চিকিৎসক তৌফিক এনাম মা কাঁদতে কাঁদতে আমাকে বলেন তৌফিক মারা গেছে। তার মা বলেন, আপনার কাছে অপারেশন করলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। এরপর আমি ফেসবুকে দেখলাম অনেকেই আমার বিরুদ্ধে লেখালেখি করছেন।’

মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আইনিভাবে আমাকে মোকাবিলা করতে হবে।’

এ বিষয়ে বিআরবি হাসপাতালের হেপাটোবিলিয়ারি সার্জন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী ফোনে একাধিকবার ফোন করেছে নিউজবাংলা। তাদের কাছে এসএমএসও পাঠানো হয়েছে। তবে দুজনের কেউ সাড়া দেননি।

শেয়ার করুন

মন্তব্য