হত্যার পর পোড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল চিকিৎসক সাবিরার মরদেহ

হত্যার পর পোড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল চিকিৎসক সাবিরার মরদেহ

চিকিৎসক সাবিরা রহমান

সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের পরিদর্শক শেখ রাসেল কবির নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যেটা বোঝা যাচ্ছে, সাবিরাকে ধারাল অস্ত্র দ্বারা হত্যা করা হয়েছে। তার ঘাড়ে ও পিঠে ক্ষতের দাগ পাওয়া গেছে। ঘাড়ের নিচে গভীর ক্ষতের দাগ আছে। তাকে মার্ডার করার পরেই শরীরে আগুন লাগানো হয়েছে।’

চিকিৎসক সাবিরা রহমানকে হত্যার পর মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ। সুরতহালে তার শরীরে ধারাল অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মুখমণ্ডল ছিল ঝলসানো।

সোমবার দুপুরে রাজধানীর কলাবাগানের ৫০/১ নম্বর বাড়ির একটি ফ্ল্যাট থেকে সাবিরার মরদেহ উদ্ধার করে কলাবাগান থানা পুলিশ। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান রমনা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ও সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।

সাবিরা যে ফ্ল্যাটটিতে থাকতেন, সেটি তিনি এ বছরের জানুয়ারিতে ভাড়া নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন বাড়িওয়ালা মাহবুব। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমি এই সময় লালমাটিয়া ছিলাম। আমি যতটুকু জানতে পেরেছি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এই ফ্ল্যাট থেকে ধোঁয়া দেখতে পান পাশের বাসার এক নারী।

‘তার এই বাড়িতে একটা ফ্ল্যাট আছে। তার অল্প কিছুক্ষণ পরেই সাবলেটে ভাড়া থাকা মেয়েটা আসে। মেয়েটিকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে দেখি রুম লক করা। পরে মিস্ত্রি এনে লক ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখি রুম ধোঁয়াচ্ছন্ন। এর কিছুক্ষণ পরে দেখি তিনি বেডের ওপরে পড়ে আছেন। পরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশকে ফোন করা হয়।’

সাবিরার আত্মীয়রা জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন সাবিরা। স্বামী শামসুদ্দীন আজাদের সঙ্গে তার বনিবনা হচ্ছিল না। এক বছর ধরে তারা আলাদা থাকছিলেন। অবশ্য তাদের ভেতর ভালো যোগাযোগ ছিল।

সাবিরার দুই ছেলে-মেয়ের মধ্যে ছেলে আগের স্বামীর। তার ছেলে বিবিএ পড়ছে; আর মেয়ের বয়স ৯ বছর।

হত্যার পর পোড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল চিকিৎসক সাবিরার মরদেহ

চিকিৎসক সাবিরার এক আত্মীয় জাকিয়া খন্দকার মমি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সাবিরা গ্রিন লাইফ হাসপাতালে বেশ কয়েক বছর ধরে চাকরি করছেন। ফ্ল্যাটে উনি আর ওনার মেয়ে থাকতেন।

‘তার স্বামী এক্স ব্যাংকার, ন্যাশনাল ব্যাংকে ছিলেন। আজকে সাবিরার অফিস ছিল এবং বেশ কয়েকজনের সাথে বাইরে যাওয়ার কথা ছিল। মেয়ে গতকাল নানুর বাসায় গিয়েছিল। ছেলে নানুর বাসায় থাকে। আমার মনে হয় আশপাশের কেউ শত্রুতার জের ধরে তাকে হত্যা করেছে।’

ঘটনাস্থলে ছুটে আসা সাবিরার স্বামী শামসুদ্দীন আজাদ বলেন, ‘আমি বেলা ১১টার দিকে খবর পেয়ে এখানে আসি। পুলিশ প্রথমে ভেতরে ঢুকতে দেয় নাই। পরে ভেতরে ঢুকে দেখি রক্তাক্ত লাশ। আমি কাউকে সন্দেহ করতে পারছি না। পুলিশের তদন্তের মাধ্যমে আমি এর সঠিক বিচার চাই।’

সাবিরা রহমানের মামাতো ভাই মো. দুলাল বলেন, ‘প্রথমে আমি শুনেছিলাম আমার বোন আগুনে পুড়ে মারা গেছে। পরবর্তীতে পুলিশের সাথে কথা বলি এবং এখানে এসে দেখলাম যে তার গলা এবং পিঠে আঘাতের দাগ আছে। এখন মনে হচ্ছে এটা একটা হত্যাকাণ্ড।’

সাবিরা যে ফ্ল্যাটটিতে ভাড়া থাকতেন সেখানে দুই নারী শিক্ষার্থী সাবলেটে ভাড়া নিয়েছিলেন। একজন ঈদের পর বাড়ি থেকে আসেননি। অপরজন ঢাকাতেই ছিলেন।

ঢাকায় থাকা সাবলেট ভাড়াটিয়া জানান, মর্নিংওয়াক করে সকাল আনুমানিক ১০টায় এসে দেখতে পান সাবিরার রুমটা বন্ধ। রুম থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। পরে তিনি বাড়ির সুপারভাইজার এবং দারোয়ানকে ডেকে রুমের লকটি ভাঙেন। ভাঙার পর দেখেন রুমটা ধোঁয়াচ্ছন্ন এবং সাবিরা বেডে শুয়ে আছেন। এরপর পুলিশকে খবর দেয়া হয়।

পুলিশ সাবিরার গায়ে তিন-চারটি আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছে। প্রাথমিকভাবে তারা ধারণা করছেন, এটি হত্যাকাণ্ড। পরে ভবনের সুপারভাইজার, দারোয়ান ও সাবলেটে ভাড়ায় থাকা নারী শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেয়া হয় ডিবি কার্যালয়ে।

সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের পরিদর্শক শেখ রাসেল কবির নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যেটা বোঝা যাচ্ছে, সাবিরাকে ধারাল অস্ত্র দ্বারা হত্যা করা হয়েছে। তার ঘাড়ে ও পিঠে ক্ষতের দাগ পাওয়া গেছে। ঘাড়ের নিচে গভীর ক্ষতের দাগ আছে। তাকে মার্ডার করার পরেই শরীরে আগুন লাগানো হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সাবিরার রুমের ভেতরে সবকিছু এলোমেলোভাবে ছড়ানো-ছিটানো ছিল। তার বালিশ, কাঁথা এলোমেলো ছিল। সে উপুড় হয়ে ছিল। আঘাতগুলো সব পেছন থেকে করা হয়েছে। ঘাড়ে দুইটা ও পিঠে দুইটাসহ মোট চারটি আঘাতের দাগ পাওয়া গেছে। এর বাইরে গলার নিচে আঁচড়ের মতো দাগ আছে। শ্বাসরুদ্ধ করে তাকে মারা হয় নাই, তাকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মারা হয়েছে। যে অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মারা হয়েছে, সে অস্ত্রটি এখানে পাওয়া যায়নি। এই কিলারকে প্রফেশনাল কিলার মনে হয়নি।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য