রড-সিমেন্টের দামে কর-সুবিধার প্রভাব নেই

রড-সিমেন্টের দামে কর-সুবিধার প্রভাব নেই

রড ও সিমেন্টের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সরকারের চলমান উন্নয়নকাজ তথা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, ঠিকাদাররা যে দামে কাজের আদেশ পেয়েছিলেন, তাতে তাদের পোষাচ্ছে না।

নির্মাণের অন্যতম উপকরণ রড। ভবনসহ অবকাঠামো নির্মাণের যেকোনো কাজে রডের পেছনেই বেশি ব্যয় হয়। সেই রডের দাম এখন আকাশছোঁয়া। লাগামহীন দামের কারণে রডের গায়ে হাতই দেয়া যায় না।

মিলমালিকরা বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে রড তৈরির প্রধান কাঁচামাল স্ক্র্যাপের (পুরোনো লোহালক্কড়) দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে দেশীয় বাজারে এর দাম শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। রডের দাম টনপ্রতি এক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

নির্মাণশিল্পের আরেকটি উপকরণ সিমেন্টের দামেও একই অবস্থা। এ কারণে নির্মাণ খাত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।

রড ও সিমেন্টের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সরকারের চলমান উন্নয়নকাজ তথা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, ঠিকাদাররা যে দামে কাজের আদেশ পেয়েছিলেন, তাতে তাদের পোষাচ্ছে না। এ অবস্থায় তারা সরকারের কাছে কার্যাদেশ সংশোধনের দাবি করছেন। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত তাদের দাবি গ্রহণ করেনি।

এদিকে নতুন বাজেটে রড ও সিমেন্টের ওপর কর-সুবিধা দেয়া হলেও বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজেটে যে সুবিধা দেয়া হয়েছে তাতে রড ও সিমেন্টের দাম কমবে না; বরং আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে এই দুটি পণ্যের কাঁচামালের দাম বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে দেশীয় বাজারে দাম আরও বেড়ে যাবে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ডিসেম্বরে ব্র্যান্ডভেদে খুচরা পর্যায়ে প্রতি টন রডের গড় দাম ছিল ৫৩ থেকে ৫৪ হাজার টাকা। সোমবার পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৭৬ হাজার টাকা।

অর্থাৎ এই সময়ে প্রতি টনে দাম বেড়েছে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা, যা শতকরা হারে প্রায় ৩০ শতাংশ। এর আগে কখনই রডের দাম এত বেশি বাড়েনি।

অপরদিকে গত ডিসেম্বরে ব্র্যান্ডভেদে প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের দাম ছিল ৩৯০ থেকে ৪০০ টাকা। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৪৩৫ থেকে ৪৪০ টাকায়। এ সময় প্রতি ব্যাগের দাম বেড়েছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা বা শতকরা ১৫ শতাংশ।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ স্টিল মিলস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাসুদুল আলম মাসুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রড তৈরির প্রধান কাঁচামাল পুরোনো লোহা, যা স্ক্র্যাপ নামে পরিচিত। এই স্ক্র্যাপ আমদানি করে আমরা কারখানায় বিলেট তৈরি করে রড উৎপাদন করি।’

তিনি আরও জানান, আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন স্ক্র্যাপের দাম ছিল ৩৩০ ইউএস ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৫০০ থেকে ৫৭০ ডলার।

রড-সিমেন্টের দামে কর-সুবিধার প্রভাব নেই

কাঁচামাল স্ক্র্যাপের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে মাসুদুল আলম মাসুদ জানান, করোনা মহামারির কারণে বিশ্ববাজারে স্ক্র্যাপ সংকট দেখা দিয়েছে মারাত্মকভাবে। এ ছাড়া জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়াও বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক। এসব কারণে দেশে রডের দাম হু হু করে বাড়ছে।

এমএস রড উৎপাদনকারী দেশি রি-রোলিং কারখানাগুলো যে কাঁচামাল ব্যবহার করে, তার ৮০ শতাংশ আমদানি করা হয়।

মিলমালিকদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বার্ষিক রডের চাহিদা ৫৫ লাখ টন। রি-রোলিং মিল ছোট বড় মিলে প্রায় ১৩০টি। এর মধ্যে বড় আকারের ৫০টি। বাকিগুলো ছোট ও মাঝারি।

বাজেটে যে সুবিধা দেয়া হয়েছে

প্রস্তাবিত বাজেটে রড ও সিমেন্টের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর এবং ভ্যাটের আগাম কর ১ শতাংশ কমানো হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বাজেটে যে কর সুবিধা দেয়া হয়েছে, তা দেশীয় বাজারে রড এবং সিমেন্টের দামে তেমন প্রভাব ফেলবে না।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে প্রতি টন স্ক্র্যাপের সুনির্দিষ্ট ট্যারিফ দেড় হাজার টাকা। এর সঙ্গে অগ্রিম আয়কর ৫০০ টাকা এবং উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ২ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়।

মিলমালিক মাসুদুল হক মাসুদ বলেন, রডের কাঁচামালে বিদ্যমান করকাঠামো থাকলে এই পণ্যের দাম কখনোই কমবে না; বরং আরও বাড়বে।

রডের দাম সহনীয় রাখতে নির্ধারিত ট্যারিফ দেড় হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫০০ টাকা এবং উৎপাদন পর্যায়ে ২ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা ‍নির্ধারণ করার দাবি জানান তিনি।

প্রস্তাবিত করকাঠামো কার্যকর করলে দেশের বাজারে রডের দাম টনপ্রতি ৬০ হাজার টাকায় নেমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সিমেন্টের দামেও প্রভাব নেই

প্রস্তাবিত বাজেটে সিমেন্ট খাতে যে করভার কমানো হয়েছে, তা খুবই নগণ্য।

বিশ্ববাজারে সিমেন্টের কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে বাজেটে দেয়া এ ছাড় দামের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা।

সিমেন্টের অন্যতম কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানিতে শুল্কহার এখন টনপ্রতি ৫০০ টাকা।

রড-সিমেন্টের দামে কর-সুবিধার প্রভাব নেই

ব্যবসায়ীরা আমদানি মূল্যের ওপর শুল্ক হার ৫ শতাংশ করার দাবি করছেন। সেটি করা হলে সিমেন্টের দাম সহনীয় হবে এবং ভোক্তারা সুবিধা পাবে।

কনফিডেন্স সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকারের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে সিমেন্টের দামে কর কমানোর প্রভাব পড়ছে না। কারণ কাঁচামালের দাম না কমলে কার্যত ভোক্তা পর্যায়ে সুখবর আসবে না। সে ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।

গত অর্থবছর বিশ্ববাজারে ক্লিংকারের প্রতি টনের দাম ছিল ৪০ থেকে ৪২ ডলার। সেটি এখন বেড়ে হয়েছে ৬০ থেকে ৬২ ডলার। বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে প্রতি বস্তা সিমেন্টের উৎপাদন খরচ ৭০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

সিমেন্ট শিল্পের সব কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। গত অর্থবছরও দেশে ১ কোটি ৮৭ লাখ টন ক্লিংকার আমদানি হয়েছে।

উন্নয়নকাজ ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা

রড ও সিমেন্টের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের উন্নয়নকাজে বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা করছেন ঠিকদার ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির (বিএসিআই) সভাপতি প্রকৌশলী সফিকুল হক তালুকদার বলেন, নির্মাণ খাত হচ্ছে বাংলাদেশের পঞ্চম বৃহত্তম শিল্প। বর্তমানে জিডিপিতে এই খাতের অবদান ১০ শতাংশের বেশি। প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।

সম্প্রতি দেশের বাজারে রডের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উন্নয়নকাজের গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দাম না কমলে সরকারি-বেসরকারি নির্মাণকাজ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

রডের দাম কমাতে পাঁচ দফা সুপারিশ করেছে বিএসিআই। এগুলো হলো সরকারি ক্রয় নীতিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা চালু, সরকারি কাজের মূল্য সমন্বয় করা, সব ধরনের শুল্ক-কর কমানো, সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে দ্রুত শুল্কবিহীন রড আমদানির উদ্যোগ নেয়া ও বর্তমান বাজারদরের ভিত্তিতে গণপূর্তের কাজের মূল্য হালনাগাদ করা।

আরও পড়ুন:
ঘাটতি বাজেট শুধু দায় নয়, আয়ও সৃষ্টি করে
বাজেট প্রত্যাখ্যান করে ৭ শ্রমিক সংগঠনের মানববন্ধন
বেতন-ভাতায় খরচ বাড়ছে, সেবা বাড়ছে না
ঠিকাদারদের কপালে দুশ্চিন্তার বলিরেখা
আমরা কি সংসদে আছি শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার জন্য?

শেয়ার করুন

মন্তব্য