খাদ্যনিরাপত্তার লক্ষ্যে বরাদ্দ বেড়েছে কৃষি খাতে

খাদ্যনিরাপত্তার লক্ষ্যে বরাদ্দ বেড়েছে কৃষি খাতে

অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমানে আরও ৬ লাখ টন ধারণক্ষমতার আধুনিক খাদ্যগুদাম বা সাইলো নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। খরচ কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

কৃষির যান্ত্রিকীকরণ করে কম খরচে উৎপাদন বাড়িয়ে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন করতে চায় সরকার। এ জন্য কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন অর্থবছরে ২৪ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

এটি প্রস্তাবিত বাজেট ব্যয়ের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরের চেয়ে টাকার অঙ্কে এ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে ২৬৬ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৪ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা।

জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার আগামী অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বোরো ধানের উৎপাদন বাড়াতে অতিরিক্ত প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো হাইব্রিড ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আউশ, আমন ও বোরো ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিগত বছরের তুলনায় এ বছর উৎপাদন বেশি হবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে।’

দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২০ দশমিক ৫৫ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ সময় বৈশ্বিক মহামারি করোনা দুর্যোগে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে বাংলাদেশকে সংকটের মুখে পড়তে হয়নি বলে জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের ধারণক্ষমতা ২৭ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং রূপকল্প ২০২১ অনুযায়ী আধুনিক খাদ্যগুদাম বা সাইলো নির্মাণ করে সংরক্ষণক্ষমতা প্রায় ২২ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে আরও প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার আধুনিক খাদ্যগুদাম বা সাইলো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।’

খরচ কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।

‘কৃষকদের কৃষিযন্ত্রের ক্রয়মূল্যের ওপর ৫০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তার মাধ্যমে হ্রাসকৃত মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে কৃষিশ্রমিকের অপ্রতুলতা পরিস্থিতির মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পেয়েছে। এর আওতায় ২০১০ থেকে ২০২০ পর্যন্ত প্রায় ৬৯ হাজার ৮৬৮টি কম্বাইন্ড হারভেস্টর, রিপার, সিডার, পাওয়ার টিলারসহ কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে।’

করোনাকালে হাওর এলাকার শ্রমিকসংকট মোকাবিলা করে কৃষিযন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত ফসল কেটে আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘খামার যান্ত্রিকীকরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং মূল্য শৃঙ্খলব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে একটি আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে।’

নতুন প্রযুক্তি ও ফসলের জাত উদ্ভাবন করে উৎপাদন বাড়ানো ও বিপণনব্যবস্থা আধুনিকায়ন করে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও টেকসই আধুনিক কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলেও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘কৃষির উন্নয়নে স্বাভাবিক ভর্তুকির অতিরিক্ত হিসেবে কৃষিজাতসামগ্রী রপ্তানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ও কৃষিক্ষেত্রে বিদ্যুৎ-চালিত সেচযন্ত্রের ব্যবহারে বিদ্যুৎ বিলের ওপর ২০ শতাংশ রিবেট দেয়া হচ্ছে।’

কৃষি পুনর্বাসন সহায়তায় বিদায়ী অর্থবছরে ৪১৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকার সার-বীজসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ ২ কোটি ৫ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬৯ কৃষককে কার্ডের মাধ্যমে সরকার প্রণোদনা দিয়েছে বলেও জানান আ হ ম মুস্তফা কামাল।

সম্প্রতি কালবৈশাখীতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১ লাখ বোরোচাষিকে এককালীন নগদ অর্থসহায়তা বাবদ ২৫ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

পতিত জমির ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বাড়াতে ৮০ হাজার হেক্টর অতিরিক্ত জমি চাষাবাদের আওতায় আনা হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি ইঞ্চি জায়গা চাষের আওতায় আনয়ন ও পারিবারিক পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ৩২টি করে সবজি-পুষ্টি বাগান সৃজন হচ্ছে। এতে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৯২ কৃষক ও তার পরিবার উপকৃত হবে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমানে আমরা পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো উপযোগী কার্যক্রমের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। গবেষণার মাধ্যমে সহিষ্ণু প্রযুক্তি ও ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং হস্তান্তরের কাজ চলছে।’

কীটনাশকমুক্ত শাকসবজি নিশ্চিত করতে কৃষি মন্ত্রণালয় ‘কৃষকের বাজার’ নামে একটি কর্মসূচি নিয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে বর্তমানে ৪১টি জেলায় কৃষকের বাজার স্থাপন করা হয়েছে। ফলে কৃষকরা কৃষিপণ্যের উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছে।’

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ

দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে নতুন প্রযুক্তি ও জাত উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা, খামারিদের উদ্বুদ্ধ করা, প্রশিক্ষণ, আত্মকর্মসংস্থান নিশ্চিতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ মাছ, মাংস ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে এবং দুধ উৎপাদনে অচিরেই স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ খাত দেশের অভ্যন্তরীণ আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য এবং প্রাণিজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।’

মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের সফলতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম এবং তেলাপিয়া উৎপাদনে চতুর্থ ও এশিয়ার মধ্যে তৃতীয় স্থানে রয়েছে।’

মৎস্য খাতের উন্নয়নে নেয়া সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘খোলা জলাশয়ে মাছ চাষ, বিপন্নপ্রায় মৎস্য প্রজাতির সংরক্ষণ, মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির জন্য অভয়াশ্রম সৃষ্টি, জাটকা সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষ অব্যাহত আছে।’

গ্রামীণ মাছচাষি, জেলে ও মৎস্যজীবীদের তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে দেশব্যাপী জেলে নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান এবং ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান মুস্তফা কামাল।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মৎস্য খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় কমিউনিটি-বেইজড ক্লাইমেট রেজিল্যান্ট অ্যাকুয়াকালচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট ইন বাংলাদেশ নামের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট নামের একটি প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। হালদা নদীকে “বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ” ঘোষণা করা হয়েছে।’

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার কর্মী নিয়োগে কর ছাড়
জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় বরাদ্দ বেড়েছে
গ্রামের উন্নয়নে ৪১ হাজার কোটি টাকা
স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দে হতাশ রংপুর চেম্বার
শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধে বাজেটে প্রণোদনা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর করার তাগিদ

জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর করার তাগিদ

গত ৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ছবি: ফাইল ছবি

সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘পৃথিবীর মাত্র ৭-৮টি দেশে এ পদ্ধতির অর্থবছর হিসাব করা হয়। জুন-জুলাই মেয়াদের কারণে বাজেট বাস্তবায়ন শুরুতে বর্ষকাল থাকে। অর্থবছরে শুরুতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। বছরের শেষে গিয়ে প্রচুর অর্থ খরচ হয়। কিন্তু বেশির ভাগ দেশে অর্থবছর থাকে জানুয়ারি-ডিসেম্বর। এমনকি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোও একই সময় অর্থবছর হিসাব করে।’

বাজেট বাস্তবায়নের সমস্যা দূরীকরণে দেশের অর্থবছর জুলাই-জুন থেকে সরিয়ে বিশ্বের অন্য দেশের মতো জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা।

সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ কি বৈষম্যমূলক পুনরুদ্ধারের পথে?’ শীর্ষক ওয়েবিনারের শুক্রবার এ তাগিদ দেয়া হয়।

এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সিজিএসের চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ওয়েবিনার সঞ্চালনা করেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।

বাজেট প্রণয়নের অর্থবছর পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে সিজিএস চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে এখনো সনাতন পদ্ধতিতে জুলাই-জুন অর্থবছর ধরে বাজেট প্রণয়ন করা হয়, যা অন্যান্য দেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে বাজেট বাস্তবায়নে সমস্যা হয়। সরকারকে এই সনাতনী পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর মাত্র ৭-৮টি দেশে এ পদ্ধতির অর্থবছর হিসাব করা হয়। জুন-জুলাই মেয়াদের কারণে বাজেট বাস্তবায়ন শুরুতে বর্ষকাল থাকে। অর্থবছরে শুরুতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। বছরের শেষে গিয়ে প্রচুর অর্থ খরচ হয়। কিন্তু বেশির ভাগ দেশে অর্থবছর থাকে জানুয়ারি-ডিসেম্বর। এমনকি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোও একই সময় অর্থবছর হিসাব করে।’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘কিছুটা ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও সরকার উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণে অবিচল থেকে কাজ করে যাচ্ছে। সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছে। গত ২০ বছর আগেও তা কেউ ভাবতে পারেনি। দুই তৃতীয়াংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও গ্রাম অবহেলিত ছিল। এ সরকার গ্রামের উন্নয়নে কাজ করেছে। শহরের মতো গ্রামেরও সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরাও বলছেন বাজেট ভালো হয়েছে। কিছু এরিয়া পলিশ করার দরকার আছে। তবে পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা অর্থমন্ত্রীও সবচেয়ে সেরা বাজেট দিতে পারেন না। কিছু সমস্যা থাকবেই।’

বাজেট প্রণয়ন অর্থনীতির চেয়েও বেশি রাজনৈতিক হিসেবে উল্লেখ করেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে একটি বিশেষ শ্রেণি। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মুক্ত বাজার অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বাজেটের বরাদ্দও হয়ে পড়েছে গোষ্ঠীতান্ত্রিক। ফলে অর্থনীতিতে বাজার মূল্য ধারণাটির অধঃপতন হয়েছে।

‘এতে বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মডেল দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এখানে সম্পদ কেবল এক শতাংশ মানুষের হাতে পুঞ্জিভূত। দেশে সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এই অবস্থা চলমান থাকবে।’

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘মহামারিকালীন মানুষের দুর্দশা বেড়েছে। এ সময় সরকারের বেশি ব্যয় করার কথা। কিন্তু চলতি বছরেই রাজস্ব ব্যয় সবচেয়ে সংকুচিত হয়েছে। অর্থনীতিতে বৈষম্য বাড়ছে, সম্পদ চলে যাচ্ছে এক শ্রেণির মানুষের হাতে, প্রান্তিক হয়ে পড়ছে অপর শ্রেণি। এতে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘করোনায় বেকারত্ব, দারিদ্র্য, বৈষম্য বেড়েছে, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানও নেই। এতে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের যে আশা রয়েছে, তা সংকটের মুখে পড়ছে। সংকট উত্তরণে সঠিক নীতি নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হলে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে।’

তিতুমীর জানান, ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পে সবচেয়ে বেশি মানুষের অন্তর্ভুক্তি থাকলেও এই খাতে বরাদ্দকৃত অধিকাংশ অর্থই মানুষের কাছে এসে পৌঁছায় না। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীতে বরাদ্দ ১৩ শতাংশ বাড়লেও মাথাপিছু ভাতার পরিমাণ কমেছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বিগত বছরের চেয়ে কম। গোষ্ঠী স্বার্থ চিন্তা না করে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ চিন্তা করলেই বৈষম্যমূলক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটে তিনটি ধাপ- বাজেট প্রণয়ন, বাজেট পরবর্তী আলোচনা এবং বাস্তবায়ন। বলা হয়- বাজেট জনগণের জন্য। তাহলে, জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু বাজেট আলোচনা হয় পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। বাজেট প্রস্তাবের পরেও মুক্ত আলোচনার সুযোগ থাকে না। এতে বাজেট বাস্তবায়নেও জবাবদিহিতা এবং স্বছতার অভাব থাকে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বাজেট বাস্তবায়নের গুরুত্ব দিয়ে বলেন, কর ব্যবস্থাপনাকে প্রগতিশীল করতে হবে। দেশের অর্থনীতিতে বিভাজন ব্যবস্থা রয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে করপোরেট করের হার কমানোর অর্থ হচ্ছে দেশের অর্থনীতিকে আরও বিভাজনের দিকে ঠেলে দেয়া।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক শাহেদুল ইসলাম হেলাল বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বড় শিল্পের ক্ষেত্রে যে ধরনের কর সুবিধা রাখা হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের শিল্পগুলো সেধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

রিকন্ডিশনড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার প্রেসিডেন্ট আব্দুল হক বলেন, বাজেট ব্যবসাবান্ধব হলেও ব্যবসায়ীদের বাজেটের মাধ্যমেই বিভিন্ন কৌশলে আটকে দেয়া হচ্ছে। যার ফলে দেশে দুর্নীতির পথ প্রশস্ত হচ্ছে।

বেসরকারি খাতগুলোকে দলীয়করণ না করে গঠনমূলক সমালোচনাকে গ্রহণ করার মত দেন তিনি।

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার কর্মী নিয়োগে কর ছাড়
জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় বরাদ্দ বেড়েছে
গ্রামের উন্নয়নে ৪১ হাজার কোটি টাকা
স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দে হতাশ রংপুর চেম্বার
শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধে বাজেটে প্রণোদনা

শেয়ার করুন

রড-সিমেন্টের দামে কর-সুবিধার প্রভাব নেই

রড-সিমেন্টের দামে কর-সুবিধার প্রভাব নেই

রড ও সিমেন্টের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সরকারের চলমান উন্নয়নকাজ তথা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, ঠিকাদাররা যে দামে কাজের আদেশ পেয়েছিলেন, তাতে তাদের পোষাচ্ছে না।

নির্মাণের অন্যতম উপকরণ রড। ভবনসহ অবকাঠামো নির্মাণের যেকোনো কাজে রডের পেছনেই বেশি ব্যয় হয়। সেই রডের দাম এখন আকাশছোঁয়া। লাগামহীন দামের কারণে রডের গায়ে হাতই দেয়া যায় না।

মিলমালিকরা বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে রড তৈরির প্রধান কাঁচামাল স্ক্র্যাপের (পুরোনো লোহালক্কড়) দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে দেশীয় বাজারে এর দাম শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। রডের দাম টনপ্রতি এক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

নির্মাণশিল্পের আরেকটি উপকরণ সিমেন্টের দামেও একই অবস্থা। এ কারণে নির্মাণ খাত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।

রড ও সিমেন্টের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সরকারের চলমান উন্নয়নকাজ তথা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, ঠিকাদাররা যে দামে কাজের আদেশ পেয়েছিলেন, তাতে তাদের পোষাচ্ছে না। এ অবস্থায় তারা সরকারের কাছে কার্যাদেশ সংশোধনের দাবি করছেন। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত তাদের দাবি গ্রহণ করেনি।

এদিকে নতুন বাজেটে রড ও সিমেন্টের ওপর কর-সুবিধা দেয়া হলেও বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজেটে যে সুবিধা দেয়া হয়েছে তাতে রড ও সিমেন্টের দাম কমবে না; বরং আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে এই দুটি পণ্যের কাঁচামালের দাম বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে দেশীয় বাজারে দাম আরও বেড়ে যাবে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ডিসেম্বরে ব্র্যান্ডভেদে খুচরা পর্যায়ে প্রতি টন রডের গড় দাম ছিল ৫৩ থেকে ৫৪ হাজার টাকা। সোমবার পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৭৬ হাজার টাকা।

অর্থাৎ এই সময়ে প্রতি টনে দাম বেড়েছে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা, যা শতকরা হারে প্রায় ৩০ শতাংশ। এর আগে কখনই রডের দাম এত বেশি বাড়েনি।

অপরদিকে গত ডিসেম্বরে ব্র্যান্ডভেদে প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের দাম ছিল ৩৯০ থেকে ৪০০ টাকা। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৪৩৫ থেকে ৪৪০ টাকায়। এ সময় প্রতি ব্যাগের দাম বেড়েছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা বা শতকরা ১৫ শতাংশ।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ স্টিল মিলস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাসুদুল আলম মাসুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রড তৈরির প্রধান কাঁচামাল পুরোনো লোহা, যা স্ক্র্যাপ নামে পরিচিত। এই স্ক্র্যাপ আমদানি করে আমরা কারখানায় বিলেট তৈরি করে রড উৎপাদন করি।’

তিনি আরও জানান, আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন স্ক্র্যাপের দাম ছিল ৩৩০ ইউএস ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৫০০ থেকে ৫৭০ ডলার।

রড-সিমেন্টের দামে কর-সুবিধার প্রভাব নেই

কাঁচামাল স্ক্র্যাপের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে মাসুদুল আলম মাসুদ জানান, করোনা মহামারির কারণে বিশ্ববাজারে স্ক্র্যাপ সংকট দেখা দিয়েছে মারাত্মকভাবে। এ ছাড়া জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়াও বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক। এসব কারণে দেশে রডের দাম হু হু করে বাড়ছে।

এমএস রড উৎপাদনকারী দেশি রি-রোলিং কারখানাগুলো যে কাঁচামাল ব্যবহার করে, তার ৮০ শতাংশ আমদানি করা হয়।

মিলমালিকদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বার্ষিক রডের চাহিদা ৫৫ লাখ টন। রি-রোলিং মিল ছোট বড় মিলে প্রায় ১৩০টি। এর মধ্যে বড় আকারের ৫০টি। বাকিগুলো ছোট ও মাঝারি।

বাজেটে যে সুবিধা দেয়া হয়েছে

প্রস্তাবিত বাজেটে রড ও সিমেন্টের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর এবং ভ্যাটের আগাম কর ১ শতাংশ কমানো হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বাজেটে যে কর সুবিধা দেয়া হয়েছে, তা দেশীয় বাজারে রড এবং সিমেন্টের দামে তেমন প্রভাব ফেলবে না।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে প্রতি টন স্ক্র্যাপের সুনির্দিষ্ট ট্যারিফ দেড় হাজার টাকা। এর সঙ্গে অগ্রিম আয়কর ৫০০ টাকা এবং উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ২ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়।

মিলমালিক মাসুদুল হক মাসুদ বলেন, রডের কাঁচামালে বিদ্যমান করকাঠামো থাকলে এই পণ্যের দাম কখনোই কমবে না; বরং আরও বাড়বে।

রডের দাম সহনীয় রাখতে নির্ধারিত ট্যারিফ দেড় হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫০০ টাকা এবং উৎপাদন পর্যায়ে ২ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা ‍নির্ধারণ করার দাবি জানান তিনি।

প্রস্তাবিত করকাঠামো কার্যকর করলে দেশের বাজারে রডের দাম টনপ্রতি ৬০ হাজার টাকায় নেমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সিমেন্টের দামেও প্রভাব নেই

প্রস্তাবিত বাজেটে সিমেন্ট খাতে যে করভার কমানো হয়েছে, তা খুবই নগণ্য।

বিশ্ববাজারে সিমেন্টের কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে বাজেটে দেয়া এ ছাড় দামের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা।

সিমেন্টের অন্যতম কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানিতে শুল্কহার এখন টনপ্রতি ৫০০ টাকা।

রড-সিমেন্টের দামে কর-সুবিধার প্রভাব নেই

ব্যবসায়ীরা আমদানি মূল্যের ওপর শুল্ক হার ৫ শতাংশ করার দাবি করছেন। সেটি করা হলে সিমেন্টের দাম সহনীয় হবে এবং ভোক্তারা সুবিধা পাবে।

কনফিডেন্স সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকারের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে সিমেন্টের দামে কর কমানোর প্রভাব পড়ছে না। কারণ কাঁচামালের দাম না কমলে কার্যত ভোক্তা পর্যায়ে সুখবর আসবে না। সে ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।

গত অর্থবছর বিশ্ববাজারে ক্লিংকারের প্রতি টনের দাম ছিল ৪০ থেকে ৪২ ডলার। সেটি এখন বেড়ে হয়েছে ৬০ থেকে ৬২ ডলার। বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে প্রতি বস্তা সিমেন্টের উৎপাদন খরচ ৭০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

সিমেন্ট শিল্পের সব কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। গত অর্থবছরও দেশে ১ কোটি ৮৭ লাখ টন ক্লিংকার আমদানি হয়েছে।

উন্নয়নকাজ ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা

রড ও সিমেন্টের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের উন্নয়নকাজে বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা করছেন ঠিকদার ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির (বিএসিআই) সভাপতি প্রকৌশলী সফিকুল হক তালুকদার বলেন, নির্মাণ খাত হচ্ছে বাংলাদেশের পঞ্চম বৃহত্তম শিল্প। বর্তমানে জিডিপিতে এই খাতের অবদান ১০ শতাংশের বেশি। প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।

সম্প্রতি দেশের বাজারে রডের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উন্নয়নকাজের গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দাম না কমলে সরকারি-বেসরকারি নির্মাণকাজ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।

রডের দাম কমাতে পাঁচ দফা সুপারিশ করেছে বিএসিআই। এগুলো হলো সরকারি ক্রয় নীতিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা চালু, সরকারি কাজের মূল্য সমন্বয় করা, সব ধরনের শুল্ক-কর কমানো, সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে দ্রুত শুল্কবিহীন রড আমদানির উদ্যোগ নেয়া ও বর্তমান বাজারদরের ভিত্তিতে গণপূর্তের কাজের মূল্য হালনাগাদ করা।

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার কর্মী নিয়োগে কর ছাড়
জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় বরাদ্দ বেড়েছে
গ্রামের উন্নয়নে ৪১ হাজার কোটি টাকা
স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দে হতাশ রংপুর চেম্বার
শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধে বাজেটে প্রণোদনা

শেয়ার করুন

ঘাটতি বাজেট শুধু দায় নয়, আয়ও সৃষ্টি করে

ঘাটতি বাজেট শুধু দায় নয়, আয়ও সৃষ্টি করে

অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি উৎস থেকে নেয়া ঋণের সুদ বাবদ এবারের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। গত পাঁচ অর্থবছরে এ খাতে যে পরিমাণ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা দিয়ে ৯টি পদ্মাসেতু তৈরি করা যেত।

ঘাটতি না উদ্বৃত্ত বাজেট – এ বিতর্ক বহু পুরোনো। বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই বর্তমানে ঘাটতি বাজেট করা হয়। বাংলাদেশ শুরু থেকে এ নিয়ম অনুসরণ করে জাতীয় বাজেট ঘোষণা করে আসছে।

তবে এবারের বাজেটে যে ঘাটতি ধরা হয়েছে, তা সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মূলত, করোনাকালে ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি চাঙা করতে ধার করে বেশি ব্যয়ের লক্ষ্য নিয়ে ঘোষণা করা হয় প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট।

তত্ত্ববধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক অর্থসচিব ড. আকবর আলি খান রচিত বাংলাদেশে বাজেট অর্থনীতি ও রাজনীতি বইয়ে বলা হয়েছে: ‘ইতিহাস বলে বেশির ভাগ সময়ই রাজাদের অর্থাভাব ছিল। আয় ও বেশি ব্যয়ের ফলে আর্থিক অনটনের সমস্যা দেখা যেত।’

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এখন ঘাটতি বাজেট করা হয়। বাংলাদেশে বাজেট ঘাটতি সহনীয় থাকলেও করোনার অভিঘাতে তা বেড়ে যায়। এ ছাড়া আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল, যে কারণে বাজেট অর্থায়নে ধার বা ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে।

বিশ্বের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অর্থনীতিতে ঘাটতির প্রভাব নিয়ে তর্ক আছে। যারা এর বিপক্ষে, তাদের মতে, বাজেট ঘাটতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বোঝা সৃষ্টি করে। কারণ, ঋণের প্রতিটি টাকা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শোধ করতে হবে।

তাদের মতে, অর্থনীতিকে চাঙা করতে হলে কর হার কমিয়ে বেসরকারি খাতকে সুবিধা দিতে হবে, যাতে তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়।

অপরদিকে যারা ঘাটতি বাজেটের পক্ষে তাদের মতে, ঘাটতি হলেই মূল্যস্ফীতি হবে না। বরং ব্যয় বেশি করলে উৎপাদন কর্মকাণ্ড বেগবান হবে। ফলে অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে। বাড়বে কর্মসংস্থান।

ড. আকবর আলি খান বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এই ঘাটতি শুধু দায় সৃষ্টি করে না। ঘাটতি দিয়ে যদি অবকাঠামো খাতে ব্যয় করা হয়, তা হলে আয়ও সৃষ্টি করতে পারে।’

ঋণের সুদের পেছনে ব্যয়

বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় ঋণের সুদ পরিশোধে। এটা এখন মোট বাজেটের ১৮ শতাংশের বেশি। প্রতি বছর বাজেটে এই বরাদ্দ বাড়ছেই। এবার রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে সুদ পরিশোধে মোট বরাদ্দ দেয়া হয় ৬৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। এর ৯০ শতাংশ দিয়ে অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধ করা হবে। বাকি ১০ শতাংশ বিদেশি ঋণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিকভাবে ঘাটতি ধরা হয়েছে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৬ দশমিক ২ শতাংশ, টাকার অঙ্কে যা ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। এটি এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে এই ঘাটতি পূরণ করা হবে।

যে অর্থবছরটি শেষ হতে যাচ্ছে, তাতেও ঘাটতি জিডিপির ৬ শতাংশ। তবে অর্থমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, চূড়ান্ত হিসাব শেষে এই ঘাটতি কমবে।

কারণ, অর্থবছরের শুরুতে সরকার ব্যয়ের বিশাল যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, শেষ পর্যন্ত তা খরচ করতে পারবে না।

সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা

জিডিপির সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ঘাটতি ধরে বাংলাদেশে বাজেট প্রণয়নের রেওয়াজ আছে। এতদিন তা মেনেই বাজেট ঘোষণা করে আসছিল সরকার।

কিন্তু করোনাকালে এই নিয়মের ব্যতয় ঘটিয়ে ঘাটতি ৬ শতাংশের বেশি ধরে দুটি বাজেট দেয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে: বেশি বেশি খরচ করে মন্দায় অচল অর্থনীতিকে চাঙা করা।

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত পাঁচ অর্থবছরে ঘাটতি মেটাতে ঋণের সুদ পরিশোধে মোট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২ লাখ ৮১ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা, যা দিয়ে ৯টি পদ্মা সেতু বানানো যেত। পাঁচ বছরে এ খাতে মোট বরাদ্দের পরিমাণ বিদ্যমান বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির চেয়ে বেশি।

পাঁচ বছরে ঘাটতির চিত্র

অর্থমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ দেয়া হয় ৬৩ হাজার ৮২৩ কোটি কোটি টাকা।

এতে মূল বাজেটের আকার ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতি জিডিপির ৬ শতাংশ বা ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে বরাদ্দ ছিল ৫৮ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা। ওই অর্থবছর মূল বাজেটের আকার ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা এবং ঘাটতি ৫ শতাংশ।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের শেষ সময়ে অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মূল বাজেটের আকার ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা।

ওই বাজেটে সুদ পরিশোধে বরাদ্দ ছিল ৪৯ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। আর ঘাটতি ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ।

ওই বাজেটকে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ বাজেট বলে দাবি করেছিলেন মুহিত।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে সুদ পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। মূল বাজেটের আকার ছিল ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা এবং ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশ।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, মূল বাজেট ঘোষণার পর সংশোধন করা হয়। অর্থবছর শেষে দেখা যায়, সংশোধিত বাজেটও ঠিকমতো খরচ হয় না। ফলে প্রকৃত খরচেরে পর ঘাটতি কমে আসে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে দুর্বলতার কারণেই বাজেট ঘাটতি পূরণে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে। এতে উদ্ধিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

কারণ, করোনাকালে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, ভোগ ব্যয় বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চাঙা করা। এ জন্য ঋণের টাকা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষাসহ অবকাঠামো খাতে ব্যয় করার পরামর্শ দেন তারা।

সাবেক অর্থউপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ঘাটতি বেশি হওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ দেখছি না আমি। এখন আমাদের বেশি বেশি খরচ করতে হবে ধার করে। তবে এই টাকা ব্যয় করতে হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অবকাঠামো খাতে। এর ফলে নতুন নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’

বিদেশি ঋণ সস্তা

বিদেশি ঋণের সুদ হার নমনীয় হওয়ায় এটি বেশি করে সংগ্রহের পরামর্শ দেন অর্থনীতিবিদরা। যে পরিমাণ ঋণ জমেছে, তার বিপরীতে বছরে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলার সুদ পরিশোধ করতে হয় সরকারকে।

তবে এ কথাও সত্যি, বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বেড়েছে। এ কারণে ঋণের পরিমাণও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিআরআই-এর নির্বাহী পরিচালক ও আইএমএফ-এর সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘দেশীয় উৎস থেকে নেয়া ঋণের সুদের হার অনেক বেশি, গড়ে ১১ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ। আর বিদেশি ঋণের জন্য মাত্র ১ থেকে দেড় শতাংশ হারে সুদ দিতে হয়। অর্থাৎ দেশীয় ঋণের খরচ অনেক বেশি। এ কারণেই দেশি ঋণে সুদ অনেক বেড়ে যায়।’

সক্ষমতা বেড়েছে

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা বলেন, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছে বাংলাদেশ। দেশের ক্রেডিট রেটিংও ভালো।

বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আমাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা অনেক ভালো। ঋণ-অনুপাত জিডিপির ৪০ শতাংশের নিচে। এ ক্ষেত্রে ভারত ও চীনের চেয়ে আমরা ভালো অবস্থানে আছি।

ইআরডির এক কর্মকর্তা বলেন, বিদেশি ঋণ একদিকে বাড়ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও কয়েক গুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ কখনও খেলাপি হয় নি। ঋণ পরিশোধে সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে উন্নয়ন সহযোগীরা ঋণ দিতে আগ্রহী।

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার কর্মী নিয়োগে কর ছাড়
জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় বরাদ্দ বেড়েছে
গ্রামের উন্নয়নে ৪১ হাজার কোটি টাকা
স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দে হতাশ রংপুর চেম্বার
শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধে বাজেটে প্রণোদনা

শেয়ার করুন

৩৩ বছর ধরে বাজেট ঘোষণা করছেন তিনি

৩৩ বছর ধরে বাজেট ঘোষণা করছেন তিনি

নীলফামারী পৌরসভায় ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। ছবি: নিউজবাংলা

বাজেট বক্তব্যে মেয়র দেওয়ান কামাল আহমেদ বলেন, ‘প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ৩ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করি। আজকে ৩৩তম বাজেটে যা বেড়ে ৪৫ কোটিতে পৌঁছেছে।’

নীলফামারী পৌরসভায় ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ৪৫ কোটি ৭৪ লাখ ৩২ হাজার ২৩১ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে।

নতুন কোন করারোপ ছাড়াই বৃহস্পতিবার দুপুরে টানা ৩৩তম বাজেট উপস্থাপন করেন পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দেওয়ান কামাল আহমেদ।

বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ কোটি ৭০ লাখ ২৮ হাজার টাকা। আর ২০২০-২০২১ইং অর্থবছর এবং ২০২১-২০২২ অর্থবছর নিয়ে বাজেটে উদ্বৃত্ত দেখানো হয়েছে ৩৪ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৭ টাকা।

এ সময় বক্তব্যে মেয়র দেওয়ান কামাল আহমেদ বলেন, ‘প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ৩ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করি। ৩৩তম বাজেটে যা বেড়ে ৪৫ কোটিতে পৌঁছেছে।’

‘প্রথম দিকে কোনো রাস্তাঘাট পাকা ছিল না কিন্তু আজ শহরের প্রতিটি সড়ক এমনকি গ্রামাঞ্চলের সড়কও পাকা হয়েছে। আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে পৌরবাসীর ভালোবাসা আর আস্থার কারণে।’

বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে পৌরসভার সচিব মশিউর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী তারিক রেজা, প্যানেল মেয়র ঈসা আলীসহ কাউন্সিলররা উপস্থিত ছিলেন।

বাজেট ঘোষণার আগে শহর সমন্বয় কমিটির (টিএলসিসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় শহরের প্রয়াত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন ও বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার কর্মী নিয়োগে কর ছাড়
জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় বরাদ্দ বেড়েছে
গ্রামের উন্নয়নে ৪১ হাজার কোটি টাকা
স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দে হতাশ রংপুর চেম্বার
শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধে বাজেটে প্রণোদনা

শেয়ার করুন

বাজেট প্রত্যাখ্যান করে ৭ শ্রমিক সংগঠনের মানববন্ধন

বাজেট প্রত্যাখ্যান করে ৭ শ্রমিক সংগঠনের মানববন্ধন

২০২১-২২ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রত্যাখ্যান করে বরিশালে মানববন্ধন করেছে সাত শ্রমিক সংগঠন। ছবি: নিউজবাংলা

বরিশাল জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে জনগণের স্বার্থ সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত হয়েছে। এটি দুর্নীতিবাজদের সুযোগ দেয়ার বাজেট। বাজেট বিলাসী ও লুটেরা মুক্ত করতে হবে।

২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রত্যাখ্যান করে বরিশালে মানববন্ধন করেছে সাতটি শ্রমিক সংগঠন।

মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে এই মানববন্ধন হয়।

সেখানে বক্তারা শ্রমিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় উত্থাপন করে বিবেচনার আহ্বান জানান।

বরিশাল মহানগর দোকান কর্মচারী শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি স্বপন দত্ত এতে সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য দেন জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে আজাদ, দোকান কর্মচারী ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক আবুল বাসার, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা কিশোর বালা, শ্রমিক নেতা তুষার সেন, আকতার রহমান স্বপনসহ অনেকে।

এ কে আজাদ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে জনগণের স্বার্থ সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত হয়েছে। এই বাজেট দুর্নীতিবাজদের সুযোগ দেয়ার বাজেট।

বাজেট প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, বাজেট বিলাসী ও লুটেরা মুক্ত করতে হবে। এটি পরনির্ভরশীল ও দুর্নীতিবাজ কালো টাকার মালিকদের বাজেট হয়েছে, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও সুচিকিৎসার নিশ্চয়তা নেই, সামাজিক সুরক্ষায় দুস্থ, অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের কোনো ব্যবস্থা নেই।

তিনি বলেন, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ১ কোটি ৫৬ লাখ শ্রমিক উপেক্ষিত। বিদেশ ফেরত ৬ লাখ শ্রমিক এবং ২২ লাখ বেকার যুবকের চাকরির নিশ্চয়তা নেই। ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত করে শিক্ষাকে আরও বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে।

মানববন্ধনে সিপিবি নেতা আজাদ বলেন, এই বাজেট গরিব মানুষের ব্যবহৃত নিত্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করবে। এটি কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে আধুনিক ও প্রযুক্তি ব্যবহারের অন্তরায়। বাজেটে শ্রমজীবী মানুষের রেশনের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, নারী ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, মহানগর দর্জি শ্রমিক সংগ্রাম কমিটি, জেলা ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন, দোকান কর্মচারী ইউনিয়ন, জেলা বস্তিবাসী ইউনিয়ন ও রিকশা ভ্যান ঠেলাগাড়ি শ্রমিক ইউনিয়ন এই মানববন্ধনের আয়োজন করে।

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার কর্মী নিয়োগে কর ছাড়
জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় বরাদ্দ বেড়েছে
গ্রামের উন্নয়নে ৪১ হাজার কোটি টাকা
স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দে হতাশ রংপুর চেম্বার
শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধে বাজেটে প্রণোদনা

শেয়ার করুন

বেতন-ভাতায় খরচ বাড়ছে, সেবা বাড়ছে না

বেতন-ভাতায় খরচ বাড়ছে, সেবা বাড়ছে না

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতর বৃদ্ধির চিত্র। ছবি: নিউজবাংলা

১১ বছরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতায় বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৩ গুণ। কিন্তু জনগণকে দেয়া তাদের সেবার মান বাড়েনি। কমেনি দুর্নীতি।

প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতায় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মোট ৭০ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ চলতি অর্থবছর থেকে প্রায় ৬ শতাংশ বেশি।

প্রতিবছরই বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও ভাতার জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হলেও প্রশ্ন ওঠে; জনগণকে দেয়া তাদের সেবার মান কি বেড়েছে, কমেছে কি দুর্নীতি?

অর্থনীতিবিদ সাধারণ মানুষ একবাক্যে স্বীকার করেন, সরকারি সেবার মান বাড়েনি, দুর্নীতি তো কমেনি, উল্টো বেড়েছে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আবুল হোসেন একটি বাড়ি বানিয়েছেন তিন বছর আগে। এখনও সব ইউটিলিটি সেবার সংযোগ পাননি। দপ্তরে দপ্তরে দরখাস্ত দিয়ে ঘুরছেন। শুধু বাসা-বাড়ি নয়, অগ্রাধিকার প্রাপ্ত শিল্প-কলকারখানায় সময়মতো অত্যাবশকীয় সেবা মিলছে না।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, ‘আমাদের দেশে শিল্পায়নে এখনও বড় বাধা অবকাঠামো দুর্বলতা।’

প্রস্তাবিত অর্থবছরের বাজেটে সরকারি বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। বেতন-ভাতার বাইরে পেনশন খাতেও বিশাল অংকের ব্যয় হয়।

নতুন বাজেটে বেতন ভাতায় বরাদ্দ দেয় হয় ৭০ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা এবং পেনশন বাবদ ২৬ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয় ৯৭ হাজার ৩২১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের সাড়ে ১৯ শতাংশ।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, করপোরেট ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ জনপ্রশাসনে বর্তমানে প্রায় ২২ লাখ চাকরিজীবী আছেন, যারা নিয়মিত সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। আর অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের সংখ্যা সাত থেকে আট লাখের মতো।

প্রতি বছর বাজেটে এই বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ নিয়ে সবার মনে একটি প্রশ্নই জাগে, সরকারি সেবার মানও কি বরাদ্দের সঙ্গে বাড়ছে?

একজন সাবেক সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, উত্তরটি হবে, নিশ্চয়ই না।

বলা হয়ে থাকে, সরকারি চাকরিজীবীরা অনিয়ম আর দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে দেশ। এর প্রধানতম কারণ, সরকারি খাতে কম বেতন। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, জনগণসহ সংশ্লিষ্টমহলের পক্ষ থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর দাবি ওঠে।

এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে পে কমিশন গঠন করে, যাতে সরকারি খাতে বেতন আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ করা হয়।

পরবর্তীতে তাদের জন্য অন্যান্য ভাতাও বাড়ানো হয়। এ ছাড়া তাদের ফ্ল্যাট ও গাড়ি কেনার জন্য অল্প সুদে ঋণ নেয়ার সুবিধা ও দেয়া হয়।

নতুন বেতন স্কেল (অষ্টম) ২০১৫ সালে পয়লা জুলাই থেকে কার্যকর করা হয়েছিল এবং এর জন্য সরকারকে তখন আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ অর্থ বরাদ্দ করতে হয়।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে সরকারি কর্মচারীদের বেতনের জন্য বাজেটে ২৬ হাজার ৮২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নতুন বেতন স্কেল চালু হওয়ার পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯ হাজার ৪৩ কোটি টাকায়।

এর পর থেকে প্রতিবছর এ খাতে বরাদ্দ বাড়ছেই।

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেতন-ভাতায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫৪ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৬৬ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে ৭০ হাজার ৬৩১ কোটি টাকার মধ্যে ভাতা ৩৩ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা, কর্মচারীদের বেতন বাবদ ২৫ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা ও কর্মকর্তাদের বেতন বাবদ ১১ হাজার ৫২৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়।

বর্তমানে ২০টি গ্রেডে সরকারি চাকরিজীবীরা বেতন পান। এর মধ্যে সর্বোচ্চ গ্রেড-১ সচিবদের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের (২০তম গ্রেড) মূল বেতন ৮ হাজার ২৬০ টাকা।

এর বাইরে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসাসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন সরকারি চাকরিজীবীরা।

এনবিআরের সাবেক সদস্য সৈয়দ আমিনুল করিম বলেন, বেতন বাড়ার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করা যায় যে, সেবার মান বাড়বে এবং দুর্নীতি কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

সরকারি গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের গবেষক, বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বেতন বাড়লেই যে দুর্নীতি কমবে, তার সাথে আমি একমত নই। মানুষ দুর্নীতি করে অভাবের কারণে নয়। ঘুষ নেয়া যাদের অভ্যাস হয়ে গেছে, তাদের বেতন বাড়িয়ে দিলেও এ অভ্যাস থেকে বের হতে পারবে না।’

দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া এবং যতটা সম্ভব কর্মকাণ্ডকে ডিজিটালাইজ করা হলে দুর্নীতি রোধ করা যাবে বলে মত দেন এই অর্থনীতিবিদ ও গবেষক।

‘বিশ্ব প্রতিযোগিতার সক্ষমতার’ সবশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সেবা খাত আরও নিচে নেমে গেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) এর দুর্নীতির ধারণা সূচক ২০২০-এ বাংলাদেশের অবস্থান দুই ধাপ পিছিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দুর্নীতিতে বাংলাদেশ শুধুমাত্র আফগানিস্তানের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে।

বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশ নিচের দিক থেকে ১২তম স্থান দখল করেছে। সূচকে উচ্চক্রম (ভালো থেকে খারাপের দিকে) অনুযায়ী, টানা তিন বছর ধরে বাংলাদেশের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুরের মতে, পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করেছে সরকার। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো সুফল দেখা যায়নি। দুর্নীতিও কমেনি। বাড়েনি সরকারি সেবার মান।

তিনি বলেন, যারা বিভিন্ন ধরনের সরকারি সেবা নিচ্ছে, সরকারের উচিত তাদের ওপর প্রতিবছর নির্দিষ্ট সেবা বিষয়ে জরিপ করা। এটা করা হলে সেবার মান বাড়াতে সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর চাপ বাড়বে।

১১ বছরে বেতন-ভাতার খরচ বৃদ্ধি ২৩০%
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতায় মোট বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ২১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। আর নতুন বাজেটে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৭০ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। এ প্রস্তাব ঠিক রেখে বাজেট পাস হলে ১১ বছরে এ খাতে মোট বরাদ্দ বেড়ে প্রায় সাড়ে ৩ গুণ হবে। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে ২৩০ শতাংশ বাড়ছে।

নানা ধরনের ভাতা

সরকারি চাকরিতে নানা ধরনের ভাতা রয়েছে। যেমন ধোলাই ভাতা, কার্যভার ভাতা, পাহাড়ি ও দুর্গম ভাতা, বিশেষ ভাতা, অবসর ভাতা, কিট ভাতা, রেশন ভাতা, ঝুঁকি ভাতা, ক্ষতিপূরণ ভাতা, প্রেষণ ভাতা, ইন্টার্নি ভাতা, প্রশিক্ষণ ভাতা, মহার্ঘ্য ভাতা, অধিকাল ভাতা, বিশেষ গার্ড ভাতা ইত্যাদি। অবশ্য এ ক্ষেত্রে সব ভাতা সবাই পান না।

এর মধ্যে দেশের ভেতরে ভ্রমণ ভাতা দেয়া হয় এলাকা ও কিলোমিটার অনুযায়ী। বিদেশে ভ্রমণে করলে প্রতিদিনের থাকা-খাওয়ার জন্য ভাতা দেয়া হয়। আর বিশেষ ভাতা দেওয়া হয় বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাব ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের।

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার কর্মী নিয়োগে কর ছাড়
জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় বরাদ্দ বেড়েছে
গ্রামের উন্নয়নে ৪১ হাজার কোটি টাকা
স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দে হতাশ রংপুর চেম্বার
শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধে বাজেটে প্রণোদনা

শেয়ার করুন

বাজেটে টিকার বরাদ্দ ‘যথেষ্ট নয়’

বাজেটে টিকার বরাদ্দ ‘যথেষ্ট নয়’

এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশেও টিকাপ্রদান প্রক্রিয়া শেষ করতে না পারলে রপ্তানির প্রধান বাজারগুলো হারাতে হবে। তাই, এই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর মধ্য দিয়েই বাজেট পাস করতে হবে।’

করোনাভাইরাস মহামারি থেকে রেহাই পেতে প্রস্তাবিত বাজেটে টিকার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ রাখার হয়েছে তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন।

তিনি বলেছেন, উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশেও টিকাপ্রদান প্রক্রিয়া শেষ করতে না পারলে রপ্তানির প্রধান বাজারগুলো হারাতে হবে। তাই, এই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর মধ্য দিয়েই বাজেট পাস করতে হবে। একইসঙ্গে করোনা মোকাবিলায় একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা (রোড ম্যাপ) নিয়ে কাজ করতে হবে।

রোববার ঢাকায় ২০২১-২১ অর্থবছরের বাজেটের ওপর এক ভার্চ্যুয়াল আলোচনায় এফবিসিসিআই প্রধান এ দাবি করেন।

ঢাকায় কর্মরত অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিষয়ক রিপোর্টারদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) এই আলোচনার আয়োজন করে। ‘রিফ্লেকশনস অন দ্যা বাজেট ২০২১-২২’ শিরোনামে এই আলোচনায় এফবিসিসিআই সভাপতির সঙ্গে একমত পোষণ করে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, দেশের সব মানুষকে টিকার আওতায় আনতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী ও এফবিসিসিআই সভাপতি ছাড়াও পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্স পলিসি ইন্ট্রিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ, ইআরএফ সভাপতি শারমীন রিনভীর ও সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলাম বক্তব্য রাখেন।

টিকায় জোর দেয়া জরুরি মন্তব্য করে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা মান্নান বলেন, ‘বাজেটকে বিজনেস ফ্রেন্ডলি বলে অনেকেই বলছেন। আমরা বিজনেস সহায়ক সরকার। বিজনেসটা প্রায়রিটি দিতে হবে তা আমরা বুঝি। ব্যবসায়ীদের জন্য আমাদের দরজা খোলা রয়েছে।

‘ভ্যাকসিন নিয়ে সবাই কথা বলছেন। ভ্যাকসিন না নিলে, হার্ড ইমিওনিটি না হলে আমাদের বায়াররা এখানে আসবে না। এটা হলে আমরা কোথায় যাব? আমার মনে হয়, এ বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকার এ বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে বলে আমি মনে করি।’

এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম বলেন, ‘বাজেটে করপোরেট করহারে ছাড়ের বিষয়টি খুবই ইতিবাচক। তবে বাজেটটি এমন সময় হয়েছে যখন আমাদের সামনে করোনা সংকট থেকে উত্তোরণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রণোদনার পাশাপাশি ভ্যাকসিনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।’

‘আমাদের ভ্যাকসিনেশন প্রক্রিয়া শেষ না হলে বায়াররা আসবেন না। ভ্যাকসিন দিতে না পারলে আমাদের সঙ্গে বায়ার দেশের বিমান চলাচলও স্বাভাবিক থাকবে না। ফলে রপ্তানি বাজার হারানোর শঙ্কা রয়েছে।’

‘এলডিসি গ্রাজুয়েশন উত্তোরণ পরবর্তীতে সময়কে মাথায় রেখে বাজেটটি প্রণয়ন হওয়া দরকার ছিল। কয়েক বছর ধরেই আমাদের প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ কম। পেটেন্ট সুবিধা হারালে আমাদের জন্য অনেক কিছুতে চ্যালেঞ্জ আসবে।’

কর সংক্রান্ত সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা এটিআইটি বাতিলের কথা বলেছিলাম। এটি ব্যবসায়ীদের মূলধন আটকে দেয়। কিন্তু সরকার কিছু পণ্যে ২০ শতাংশ এটিআইটি দিয়েছে। অনেক পণ্যে অ্যাডভান্স ভ্যাট রাখা হচ্ছে। এগুলো থেকে অব্যাহতি দিতে হবে।’

টিকাপ্রদান জরুরি ভিত্তিতে সম্পন্ন করতে হবে মন্তব্য করে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘আমরা ভ্যাকসিনেশনে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছি। এটি বাড়াতে হবে। ভ্যাকসিনেশনে পিছিয়ে থাকলে রপ্তানিতেও পিছিয়ে যেতে হবে।’

বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটেনি উল্লেখ করে ফারুক হাসান বলেন, ২০১৯-২০ সালে তেমন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। বিশেষ করে করোনার সমেয়ে তো বিনিয়োগ একেবারেই হয়নি। রপ্তানি কয়েক মাস খারাপ থাকার পর তা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্স বেশ ভালো। সরকারের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রজেক্টগুলো চলেছে। ফলে অর্থনীতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও ব্যক্তি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সেভাবে হয়নি।

প্রস্তাবিত বাজেটে টিকার জন্য বরাদ্দ ১০ হাজার কোটি যথার্থ নয় উল্লেখ করে এ সংকট মোকাবিলায় থোক বরাদ্দের সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকাও ব্যবহারের পরামর্শ দেন আব্দুর রাজ্জাক।

তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিনেশন না হলে আমাদেরকে বিভিন্ন দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিতে পারে। ফলে যতদ্রুত সম্ভব মানুষকে ভ্যাকসিনেশনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।’

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এবারের বাজেটে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করার দরকার ছিল স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায়। কিন্তু হয়নি। বরাদ্দ আগের বছরের মতোই থেকেছে। এখন ভ্যাকসিনিশেনটা মূল চ্যালেঞ্জ। ভ্যাকসিনটা অতি জরুরি দরকার।

আবু ইউসুফ বলেন, ‘পেনডেমিক চ্যালেঞ্জ, এলডিসি গ্রাজুয়েশন উত্তোরণ, এসডিজি গোল অর্জন এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা সামনে রেখে বাজেট ঘোষিত হয়েছে। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে এই লক্ষ্যগুলো ঠিক রেখে প্রণয়নের দরকার ছিল।’

তিনি বলেন, বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ১ শতাংশের মতো। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এটি ২ শতাংশ করার কথা বলা রয়েছে। ফলে বাজেটে এর বাস্তবায়ন নেই। সিএমএইচসহ ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলের মতো জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল স্থাপন করা দরকার। আর সেজন্য বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দ দরকার।

আরও পড়ুন:
ট্রান্সজেন্ডার কর্মী নিয়োগে কর ছাড়
জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় বরাদ্দ বেড়েছে
গ্রামের উন্নয়নে ৪১ হাজার কোটি টাকা
স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দে হতাশ রংপুর চেম্বার
শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধে বাজেটে প্রণোদনা

শেয়ার করুন