বাজেটে যুব উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি

বাজেটে যুব উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি

ভার্চুয়াল সংলাপে আলোচকেরা বলেন, যুবদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ, বেকার ভাতা দেয়া ও উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ দিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা গড়ে তোলার সুযোগ করে দিতে হবে। পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে বাজেট বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন এবং ইন্টারনেটের দাম কমানো ও সেবার মান বৃদ্ধি করতে হবে।

আসন্ন জাতীয় বাজেটে যুব উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোসহ উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার সুযোগ তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।

একশনএইড বাংলাদেশ ও ধ্রুবতারা ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত প্রাক বাজেট ভার্চুয়াল সংলাপে এ আহ্বান জানোনো হয়। একইসঙ্গে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের জন্য দুর্নীতি রোধের দাবি জানান আলোচকেরা।

রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারক, অর্থনীতিবিদেরা ভার্চুয়াল সংলাপে অংশ নিয়ে বলেন, যুবদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ, বেকার ভাতা দেয়া ও উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ দিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা গড়ে তোলার সুযোগ করে দিতে হবে। পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে বাজেট বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন এবং ইন্টারনেটের দাম কমানো ও সেবার মান বৃদ্ধি করতে হবে।

এছাড়া, আলোচকেরা কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও পণ্যের ন্যায্য মূল্য প্রদান, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিতে খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন ও পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বরাদ্দ এবং যুব ব্যাংক প্রতিষ্ঠা উপর জোর দেয়া হয় সংলাপে।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক আজহারুল ইসলাম খান বলেন, যুবদের উন্নয়নে জাতীয় যুব কাউন্সিল গঠন করা প্রয়োজন। তাহলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যতও উন্নত হবে।

ভার্চুয়াল সংলাপে সঞ্চালক হিসেবে ছিলেন ধ্রুবতারা ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অমিয় প্রাপণ চক্রবর্তী।

আলোচনায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক ও এস এম শাহজাদা, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সায়েদা রুবিনা আক্তার, সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হেদায়াতুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহীম।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার যুগ্ম সচিব ইকবাল হাবীব, একশনএইড বাংলাদেশের ম্যানেজার নাজমুল আহসান, অধ্যাপক এমএম আকাশসহ অর্থনীতি খাতসংশ্লিষ্ট ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা আলোচনায় তাদের মতামত দেন।

আরও পড়ুন:
বাজেট ভাবনা তুলে ধরায় বিএনপিকে কাদেরের ধন্যবাদ
মন্দঋণ আদায়ে ‘আলাদা কোম্পানি’ গঠন জরুরি
আগামী বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে দ্বিগুণের বেশি বরাদ্দ
বাস্তবায়নযোগ্য নয়: বাজেট পেশের আগেই ফখরুল
শেয়ারে লভ্যাংশে আরও কর ছাড় দেয়া উচিত

শেয়ার করুন

মন্তব্য

প্রণোদনার ঋণ ছাড়া অন্য ঋণ নিচ্ছে না কেউ

প্রণোদনার ঋণ ছাড়া অন্য ঋণ নিচ্ছে না কেউ

প্রণোদনার ঋণ ছাড়া অন্য কোনো ঋণ নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। ফাইল ছবি

এক বছরের পুরোটা সময় ধরেই ছিল করোনাভাইরাস মহামারির ধকল। সেই ধাক্কায় নতুন ঋণ বিতরণ করতে সাহস পায়নি ব্যাংকগুলো। উদ্যোক্তারাও ঋণ নিতে এগিয়ে আসেননি।

৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এপ্রিল মাস শেষে এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। প্রণোদনার ঋণ ছাড়া অন্য কোনো ঋণ নিচ্ছে না কেউ।

দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির লক্ষ্যের কিনারায় পড়ে আছে।

বছরের শেষ দুই মাস মে ও জুনেও উন্নতি হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। করোনাভাইরাস মহামারি দেখা দেয়ার পর থেকে নতুন ঋণ বিতরণ হচ্ছে না বললেই চলে; সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকই এখন প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করছে। ঋণ বিতরণ যেটা বেড়েছে, সেটা আসলে প্রণোদনার ঋণে ভর করেই বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বৃহস্পতিবার সর্বশেষ যে হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, এপ্রিল মাসে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ; গত অর্থবছরের এপ্রিলে ছিল ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।

২০২০-২১ অর্থবছরের দশম মাস এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। গত বছরের এপ্রিল শেষে এর পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৭৫ হাজার ১৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এই এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ বেড়েছে ৮৯ হাজার ১৬১ কোটি টাকা।

আর এই এক বছরে ৮৩ হাজার ৫৩ কোটি টাকার প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। এতেই বোঝা যায়, মহামারিকালে নতুন কোনো ঋণ বিতরণ হয়নি; সামান্য কিছু যা বিতরণ হয়েছে, তা চলমান কিছু ভালো প্রকল্পের ঋণ।

গত ৩১ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, করোনাভাইরাসের প্রকোপ মোকাবিলায় সরকার এখন পর্যন্ত ২৩টি প্যাকেজের আওতায় মোট ১ লাখ ২৮ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৮৩ হাজার ৫৩ কোটি টাকার তহবিল ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। বাস্তবায়নের হার মোট প্যাকেজের ৮৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, এই এক বছরের পুরোটা সময় ধরেই ছিল করোনাভাইরাস মহামারির ধকল। সেই ধাক্কায় নতুন ঋণ বিতরণ করতে সাহস পায়নি ব্যাংকগুলো। উদ্যোক্তারাও ঋণ নিতে এগিয়ে আসেনি।

তবে প্রণোদনার ঋণ বিতরণ সন্তোষজনক বলে জানান তিনি।।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, মহামারির ধাক্কায় গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে আসে। এরপর সরকারের প্রণোদনা ঋণে ভর করে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে এই প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৯ দশমিক ২০ শতাংশ হয়। আগস্টে তা আরও বেড়ে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশে এবং সেপ্টেম্বরে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে ওঠে।

কিন্তু অক্টোবরে এই প্রবৃদ্ধি কমে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে আসে। নভেম্বরে তা আরও কমে ৮ দশমিক ২১ শতাংশ হয়। ডিসেম্বরে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ হয়।

২০২১ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫১ ও ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

সরকারি ঋণপ্রবাহেও একই হাল

প্রবৃদ্ধি কমেছে সরকারি খাতের ঋণপ্রবাহেও। এপ্রিল শেষে সরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের অঙ্ক ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা।

এ হিসাবে এই এক বছরে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ১১ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগের মাস মার্চে এই ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

গত ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে ছিল ১৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতেও এই একই লক্ষ্য ধরা ছিল, বিপরীতে ঋণ বেড়েছিল ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।

ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর নিউজবাংলাকে বলেন, প্রণোদনার ঋণ ছাড়া ব্যাংকগুলো এখন অন্য কোনো ঋণ বিতরণ করছে না। কোভিড-১৯-এর কারণে বিশেষ ছাড়ে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো ঋণের কিস্তিও আদায় করেনি ব্যাংকগুলো। সে কারণে নতুন ঋণ বিতরণের টাকাও নেই অনেক ব্যাংকের।

তিনি বলেন, ‘তাই, মাঝে প্রণোদনার ঋণের কারণে কয়েক মাস বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও এখন তা আবার কমে এসেছে। এখন সেটা কতটা কমবে; সেটাই উদ্বেগের বিষয়।’

গত বছরের ২৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০-২১ অর্থবছরের যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে, তাতে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ; যার মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য হচ্ছে যথাক্রমে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ ও ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৃহস্পতিবার যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে এপ্রিল মাস শেষে দেশে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৮২ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণ ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। সরকার নিয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা।

গত বছরের এপ্রিল শেষে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ৭৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। যার মধ্যে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৭৫ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। আর সরকারের ঋণ ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা।

এ হিসাবেই এপ্রিল শেষে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। সরকারি ঋণের ১১ দশমিক ১৬ শতাংশ; আর বেসরকারি খাতে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।

বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আসলে এখন ঋণের চাহিদাই নেই। সাম্প্রতিককালে যেসব খাতে ভালো ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সেখানে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। করোনা পরিস্থিতি শেষ অবধি কোথায় গিয়ে ঠেকে, কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে- সে জন্য উদ্যোক্তারা অপেক্ষা করছেন।’

আরও পড়ুন:
বাজেট ভাবনা তুলে ধরায় বিএনপিকে কাদেরের ধন্যবাদ
মন্দঋণ আদায়ে ‘আলাদা কোম্পানি’ গঠন জরুরি
আগামী বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে দ্বিগুণের বেশি বরাদ্দ
বাস্তবায়নযোগ্য নয়: বাজেট পেশের আগেই ফখরুল
শেয়ারে লভ্যাংশে আরও কর ছাড় দেয়া উচিত

শেয়ার করুন

নতুন বাজেটে বেগবান হবে দেশীয় ব্র্যান্ড: এম এ রাজ্জাক

নতুন বাজেটে বেগবান হবে দেশীয় ব্র্যান্ড: এম এ রাজ্জাক

এফবিসিসিআই-এর সহ-সভাপতি ও মিনিস্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক খান রাজ

এফবিসিসিআই-এর সহ সভাপতির মতে, স্থানীয় শিল্পের জন্য বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোয় গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত ফ্রিজ, এসি, ব্লেন্ডারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক শিল্পের বিকাশ ঘটবে। সেই সঙ্গে এসব পণ্যের দাম কমার সঙ্গে মানও ভালো হবে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ২০২১-২২ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট দেশীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান ও বাংলাদেশি ব্র্যান্ড তৈরির স্বপ্ন সুসংহত করবে বলে মন্তব্য করেছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সহ সভাপতি ও মিনিস্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক খান রাজ। বলেছেন, দেশি ব্র্যান্ড তৈরির অগ্রযাত্রার পথে নতুন মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে এবারের বাজেট।

বাজেট প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, স্থানীয় শিল্পের জন্য বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোয় গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত ফ্রিজ, এসি, ব্লেন্ডারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক শিল্পের বিকাশ ঘটবে। সেই সঙ্গে এসব পণ্যের দাম কমার সঙ্গে মানও ভালো হবে।

ব্যবসায়ীদের এই নেতার মতে, দেশীয় শিল্প বিকাশের জন্য ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প, ওষুধ শিল্প, কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, খেলনা উৎপাদন, হাঁস-মুরগি মাছের খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, স্যানিটারি ন্যাপকিন অর্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ নানান শিল্পের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। এতে দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির গতিও বাড়বে।

নতুন বাজেট দেশীয় শিল্প ও ব্যবসাবান্ধব হলেও দরকার নীতির ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপর জোর দেয়ার পরামর্শ দেন রাজ্জাক।

এবারের বাজেটে শিল্পের ১৯টি খাতে কর অবকাশ সুবিধা থাকছে। তার মধ্যে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে আগাম কর (এআইটি) এক শতাংশ কমিয়ে ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এলপিজি সিলিন্ডার, ফ্রিজার, রেফ্রিজারেটর ও এর কম্প্রেসারের উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এয়ারকন্ডিশনার ও এর কম্প্রেসার, মোটর কার ও মোটর ভেহিক্যাল উৎপাদনেও বিদ্যমান সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। তাছাড়া, দেশীয় গৃহস্থালি কাজের জন্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য বিশেষ করে ব্লেন্ডার, জুসার, মিক্সার, গ্রাইন্ডার, ইলেকট্রনিক কেটলি, রাইস কুকার, মাল্টি কুকার পেসার কুকারে স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ছাড় দেয়া হয়েছে। একই সুবিধা দেয়া হয়েছে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ইলেকট্রনিক ওভেনের স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে।

দেখা যায়, ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশে কর্পোরেট কর হার কম এবং কর কাঠামো সহজ। ভারতে করপোরেট কর হার দুটি। বড় কোম্পানির জন্য ৩০ শতাংশ এবং স্থানীয় কোম্পানির ক্ষেত্রে ২৬ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে কর্পোরেট কর হার যথাক্রমে ২৮ ও ৩০ শতাংশ। সিঙ্গাপুরে একটিমাত্র কর্পোরেট কর হার এবং তা মাত্র ১৩ শতাংশ। এটা বিবেচনা করেই সরকার এবারের বাজেটে ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে বলে ধারণা করছেন অনেকেই।

বর্তমানে দেশের উদীয়মান শিল্প হচ্ছে ইলেক্ট্রনিক শিল্প। এ শিল্প বর্তমানে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও পণ্য রপ্তানি করছে। ফলে এ শিল্পকে আরও চাঙ্গা রাখতে ফ্রিজ, টেলিভিশন, এয়ারকন্ডিশনসহ এসব পণ্য দেশীয় ইলেক্ট্রনিক্স শিল্প মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা দিচ্ছে সরকার। এর ফলে উৎপাদিত পণ্যের বিপরীতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে না। আবার যারা এসব কারখানা স্থানীয়ভাবে স্থাপন করবেন, তাদের জন্য ১০ শতাংশ কর অবকাশ সুবিধা (ট্যাক্স হলিডে) দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে এ বাজেটে।

বাজেটে সরকারি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর ২৫ শতাংশ হতে ২২.৫ শতাংশ, নন-তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৩২.৫ শতাংশ হতে ৩০ শতাংশ এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর ব্যাংকের মতো করার মাধ্যমে শিল্প খাতকে আরও সম্প্রসারিত করতে সরকার যে শিল্পবান্ধব বাজেট নিয়ে এসেছে তার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামালকে ধন্যবাদ জানিয়ে জানান রাজ্জাক। তিনি বলেন, অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে দেশীয় শিল্পখাত। কারণ, দেশীয় শিল্প ঘুরে দাঁড়ালে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকা- তৈরি হবে -কর্মসংস্থান বাড়বে-উদ্যোক্তা তৈরি হবে।

এফবিসিসিআই-এর সহ-সভাপতি বলেন, করোনাকালের বাজেট শিল্পবান্ধব হওয়ায় দেশীয় শিল্প খাতের সঙ্গে যারা জড়িত তারা ব্যাপক সুবিধা পাবে এবং মার্কেটেরও প্রসার হবে। কিন্তু এই শিল্পগুলোকে শুধু দেশের ভেতরে না রেখে বিশ্ববাজারে নিয়ে যেতে হবে।

আরও পড়ুন:
বাজেট ভাবনা তুলে ধরায় বিএনপিকে কাদেরের ধন্যবাদ
মন্দঋণ আদায়ে ‘আলাদা কোম্পানি’ গঠন জরুরি
আগামী বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে দ্বিগুণের বেশি বরাদ্দ
বাস্তবায়নযোগ্য নয়: বাজেট পেশের আগেই ফখরুল
শেয়ারে লভ্যাংশে আরও কর ছাড় দেয়া উচিত

শেয়ার করুন

‘প্রস্তাবিত তামাক কর তরুণ ও দরিদ্রদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াবে’

‘প্রস্তাবিত তামাক কর তরুণ ও দরিদ্রদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াবে’

প্রস্তাবিত বাজেটে উচ্চ স্তরে ১০ শলাকার প্যাকেটে ৫ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরে ৭ টাকা বাড়ানো হলেও নিম্ন ও মাঝারি স্তরের সিগারেটের দাম ও শুল্ক অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর এ প্রস্তাবনাকে তরুণ ও দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের হুমকি হিসেবেও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

তামাক কোম্পানিতে সরকারের ক্ষুদ্র মালিকানা থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠান মালিকেরা তামাকজাত পণ্যে প্রত্যাশিত কর আরোপ করতে দেয় না বলে মনে করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তামাক কোম্পানিকে অগ্রাধিকার দেয়ার পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বৃহস্পতিবার বেসরকারি মানবাধিকার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভয়েসের ‘তামাক কর বিষয়ে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনায় বক্তারা এ মতামত দেন।

তামাকের ওপর প্রস্তাবিত কর নিয়ে হতাশ হয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘খুব নগণ্য হলেও তামাক কোম্পানিতে সরকারি মালিকানা বা শেয়ার আছে। যার কারণে একটা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বোঝাপড়া তৈরি হয়। তামাক কোম্পানিগুলো তাদের অশুভ চক্র কাজে লাগিয়ে সুবিধা ভোগ করে।’

প্রস্তাবিত বাজেটে উচ্চ স্তরে ১০ শলাকার প্যাকেটে ৫ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরে ৭ টাকা বাড়ানো হলেও নিম্ন ও মাঝারি স্তরের সিগারেটের দাম ও শুল্ক অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর এ প্রস্তাবনাকে তরুণ ও দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের হুমকি হিসেবেও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রস্তাবিত বাজেট চূড়ান্ত না হলেও এই করের হার সংশোধনের সম্ভাবনা কম বলেও মনে করেন ড. নাসির।

তিনি বলেন, ‘তামাক কর বাড়াতে হলে ভবিষ্যতে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর কৌশল বদলাতে হবে। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আইন সংশোধনের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে আলোচনার জায়গা বৃদ্ধি করতে হবে।’

আলোচনায় মূল প্রবন্ধ তুলে করেন ভয়েসের প্রকল্প সমন্বয়কারী জায়েদ সিদ্দিকী।

প্রবন্ধে প্রস্তাবিত বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ার পাবার আশঙ্কা করা হয়। এতে বলা হয়, বাজারে ৮৪ শতাংশ সিগারেট নিম্ন ও মধ্যম মানের হলেও সেগুলোর ওপর কর বাড়ানো হয়নি। আর এসব সিগারেটের মূল ভোক্তা হচ্ছে তরুণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ‘বিশ্বে সর্বোচ্চ তামাক ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম প্রথম দিকে। দেশের ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাকে আসক্ত। প্রতিবছর এক লাখ ৬১ হাজার মানুষ তামাকজনিত রোগে প্রাণ হারায়। অনেকে অকালে পঙ্গু হয়ে যান।’

করোনা মহামারিতে বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, ‘বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য ক্ষতি কমিয়ে আনতে তামাকের বহুস্তরভিত্তিক ব্যবস্থা লোপ করা থেকে শুরু করে সুনির্দিষ্ট কর আরোপের দাবি জানানো হলেও প্রস্তাবিত বাজেটে তার প্রতিফলন নেই।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের প্রধান হাসান শাহরিয়ার বলেন, ‘সাধারণত বাজেটের সময় এমনভাবে কর ধার্য করা হয় যাতে নিম্ন আয়ের মানুষের চাপ কম হয়। কিন্তু বিড়ি-সিগারেটের মত ক্ষতিকর পণ্যের জন্য নিয়ম প্রযোজ্য নয়। বরং ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার কমাতে ধনী এবং দরিদ্র্য সবার জন্য সমান কর আরোপ করা উচিত।’

প্রস্তাবিত বাজেটে নিম্ন ও মধ্য স্তরের সিগারেটের মূল্য ও শুল্ক অপরিবর্তিত রেখে ছাড় দেয়ার একটা প্রবণতা দেখা গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডসের গ্র্যান্ট ম্যানেজার মনে করিয়ে দেন, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাক মুক্ত করতে চান প্রধানমন্ত্রী। প্রস্তাবিত বাজেট তার সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে কী না তা নিয়ে সংশয় আছে তার।

ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডসের প্রধান পলিসি অ্যাডভাইজার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘যদিও আমরা এ বছর রাষ্ট্রযন্ত্রের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছি। তবুও আমাদের থেমে গেলে চলবে না। আমাদের কাজ করে যেতে হবে। সফলতা একদিন আসবেই।’

ভয়েসের নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদের পরিচালনায় এই সম্মেলনে অংশ নেন ঢাকা আহসানিয়া মিশন, প্রজ্ঞা, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন, উন্নয়ন সমন্বয় এবং ডর্পের প্রতিনিধিরা।

আরও পড়ুন:
বাজেট ভাবনা তুলে ধরায় বিএনপিকে কাদেরের ধন্যবাদ
মন্দঋণ আদায়ে ‘আলাদা কোম্পানি’ গঠন জরুরি
আগামী বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে দ্বিগুণের বেশি বরাদ্দ
বাস্তবায়নযোগ্য নয়: বাজেট পেশের আগেই ফখরুল
শেয়ারে লভ্যাংশে আরও কর ছাড় দেয়া উচিত

শেয়ার করুন

পরিবেশ রক্ষায় বাজেট বরাদ্দ ‘উপেক্ষিত’ দাবি বিশ্লেষকদের

পরিবেশ রক্ষায় বাজেট বরাদ্দ ‘উপেক্ষিত’ দাবি বিশ্লেষকদের

অতিরিক্ত ধুলায় অতিষ্ঠ ঢাকার জনজীবন। ছবি: সাইফুল ইসলাম

পরিবশে-বান্ধব বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর সদিচ্ছা ও আর্থিক বরাদ্দই যথেষ্ট নয়। সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার কঠোর বাস্তবায়নের জন্য দরকার প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর পরিবেশবিরোধী অন্যায় কার্যকলাপ বন্ধ করা। পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ করতে হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাকৃতিক পরিবেশের অবনতি রোধ নিয়ে তেমন কিছু বরাদ্দ দেয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে সবুজায়নের কথা বললেও পরিবেশ রক্ষায় বাজেট বরাদ্দ উপেক্ষা করা হয়েছে বলে করছে পরিবেশবাদীরা।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) উদ্যোগে ‘জাতীয় বাজেট: স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ’-শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সভায় এ সব কথা উঠে আসে।

সভায় সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক ড. এ এম জাকির হোসেন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সংগঠটির পরিবেশ স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মসূচি কমিটির সদস্য-সচিব গবেষক বিধান চন্দ্র পাল এমন তথ্য জানান।

তিনি বলেন, পরিবশে-বান্ধব বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর সদিচ্ছা ও আর্থিক বরাদ্দই যথেষ্ট নয়। সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার কঠোর বাস্তবায়নের জন্য দরকার প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর পরিবেশবিরোধী অন্যায় কার্যকলাপ বন্ধ করা। পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ করতে হবে।

সবার জন্য টিকা নিশ্চিতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজেটে ৮০ শতাংশ মানুষের টিকা নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে। এটা কত সময় মধ্যে দেয়া হবে, তা উল্লেখ্য নেই। যেহারে টিকা প্রয়োগ করছে, এইভাবে টিকাদান কর্মসূচি চলতে থাকলে আগামী ৫ বছর সময় লাগবে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে। টিকার সংগ্রহ বরাদ্দ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে টিকা নিশ্চিতে সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান বলেন, ‘করোনাকালে আমরা বঝুতে পেরেছি প্রকৃতিতে বিনিয়োগ হলো সঠিক বিনিয়োগ। এখন দেখার বিষয় আমার সঠিক বিনিয়োগ করছি কি না। এখন প্রকৃতিকে বিনিয়োগ করলে আমার সন্তানরা এর সুফল পাবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বাজেটে যে বরাদ্দ দেয়া সেটা সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে খরচ করতে হবে।’

সীমান্তে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট দেশে প্রবেশ করায় সীমান্ত এলাকায় সংক্রমণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। তবে আরও ভয়ের বিষয় সীমান্ত এলাকায় যেভাবে সংক্রমণ বেড়েছে, সেভাবেই স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতা বেড়েছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।’

তিনি আরও বলেন, গ্রিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোবারক হোসেন সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রকাশ করেছেন, সেখানে দেখা গেছে, যেসব এলাকায় ১০০ শতাংশ মাস্ক ব্যবহার করেছে, সেই সব এলাকায় করোনা সংক্রমণ অনেক কম গেছে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বিকল্প নেই।

অর্থনীতিবিদ আনু মোহাম্মদ বলেন, পানি, নদী ও সুন্দরবন নিয়ে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প হচ্ছে, এ উন্নয়ন প্রকল্পের কারণেই পরিবেশ ও জলুবায়ু ক্ষতি হচ্ছে। যে উন্নয়ন প্রকল্প পরিবেশ ক্ষতি করে, এসব প্রকল্প বন্ধ কারার দাবি তোলেন তিনি।

পানি ও বায়ুদূষণ বন্ধ এবং বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য উদ্যোগ নেয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে সরকারকে তেমন কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে দেখছি না।’

তিনি বলেন, এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার থাকলেও এই খাতে সরকারের অবহেলার কারণে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের সার্বিক অবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের জন্য ক্ষতিকর এমন প্রকল্পে যদি বাজেটে বরাদ্দ বাড়ে, তাহলে জনগণের এই বরাদ্দ জনগণের কাজে আসে না। দেশে কিছুসংখ্যাক মানুষের সুবিধার্থে বাজেট বরাদ্দ বাড়ছে। দেশে প্রতিবছর বায়ুদূষণের কারণে দুই লাখের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। বায়ুদুষণ প্রতিরোধে সরকারকে কাজ করতে হবে।

আরও পড়ুন:
বাজেট ভাবনা তুলে ধরায় বিএনপিকে কাদেরের ধন্যবাদ
মন্দঋণ আদায়ে ‘আলাদা কোম্পানি’ গঠন জরুরি
আগামী বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে দ্বিগুণের বেশি বরাদ্দ
বাস্তবায়নযোগ্য নয়: বাজেট পেশের আগেই ফখরুল
শেয়ারে লভ্যাংশে আরও কর ছাড় দেয়া উচিত

শেয়ার করুন

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে করের প্রস্তাবে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে করের প্রস্তাবে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে, যা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত। তাই সেখানে কর আরোপ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষায় ব্যয় বাড়বে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। কারণ বাড়তি করের বোঝা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরই বহন করতে হবে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, এ ধরনের কর আরোপ উচ্চশিক্ষার ব্যয়ই শুধু বাড়াবে না, উচ্চশিক্ষার সুযোগকেও সংকুচিত করবে। ফলে সবার পক্ষে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা তো আইন মোতাবেক সরকার করতে পারে না। কারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে, যা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত। ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠানগুলো চলে, সেখানে কর আরোপ করা যায় না। তাই এটি বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের কর আরোপের ফল হবে বহুমুখী। এতে শুধু শিক্ষার্থীরা নন, শিক্ষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বলা যায়, এর প্রভাব গোটা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়বে, যা খুবই বাজে নজির সৃষ্টি করবে। আমি সরকারকে বলব, অবিলম্বে এ ধরনের কর আরোপ থেকে বিরত থাকতে।’

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আরও বলেন, এ ধরনের কর আরোপের ফলে দুঃখজনকভাবে ড্রপ আউট বাড়বে, যা উচ্চশিক্ষার পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে করের প্রস্তাবে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দা তাহমিনা আক্তার নিউজবাংলাকে বলেন, শিক্ষায় এ ধরনের কর আরোপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষা কোনো পণ্য নয়। তাই অবিলম্বে এ ধরনের কর আরোপের চিন্তা পরিহার করা উচিত।

শিক্ষার্থীরা কী বলছেন?

প্রাইম ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের তৃতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষা কি কোনো পণ্য? তাহলে কেন বাজেটে বেসরকারি শিক্ষায় কর আরোপের প্রস্তাব করা হলো? এর ফলে আমরা যারা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, তারা তো উচ্চশিক্ষা গ্রহণই করতে পারব না।’

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মেহেদী তালুকদার বলেন, ‘এর আগেও সরকার একবার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তারা সফল হয়নি। আমার ভাবতে অবাক লাগে সরকার কেন বারবার শিক্ষাকে পণ্য ভাবে?’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে করের প্রস্তাবে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ

নো ভ্যাট অন এডুকেশন

বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গত ৪ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ ব্যানারে সংবাদ সম্মেলন করেন তারা। এ ছাড়া গত মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে তারা একই দাবিতে মানববন্ধনও করেন।

মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিলও করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা ‘শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষা আমার অধিকার’, ‘শিক্ষা ও বাণিজ্য, একসাথে চলে না’র মতো স্লোগান দেন।

এ বিষয়ে ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’-এর সংগঠক মুক্ত রোজোয়ান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার যে ১৫ শতাংশ কর বসানোর চেষ্টা করছে, তা হলো শিক্ষাকে পণ্য বানানোর চক্রান্ত মাত্র। এ চক্রান্ত আমরা ২০১৫ সালে যেভাবে রুখে দিয়েছিলাম, এবারও সেভাবেই রুখে দেব।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ১০ জুনের মধ্যে যদি আমাদের দাবি মেনে নেয়া না হয়, তাহলে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।’

বন্ধের শঙ্কায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে ১৫ শতাংশ আয়কর আরোপ করা হলে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি)।

সম্প্রতি এপিইউবির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী ট্রাস্টের অধীন পরিচালিত অলাভজনক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে আয়কর আরোপ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিক সংকটে পড়বে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাব্যয় বাড়ার কারণে উচ্চশিক্ষা অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে এবং শিক্ষিত জাতি গঠনের মাধ্যমে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্প-২০৪১ অর্জনের লক্ষ্য ব্যাহত হবে।’

এ বিষয়ে সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল বেনজীর আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় ট্রাস্ট অ্যাক্ট দিয়ে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। আমরা দেশের উচ্চশিক্ষার সহায়ক হিসেবে কাজ করি।

‘ছাত্র-ছাত্রীদের টিউশনির ওপরই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে। আর উদ্বৃত্ত ফান্ড থাকলে সেটা উন্নয়নকাজে ব্যয় হয়। ট্রাস্টিরা এখান থেকে কোনো লভ্যাংশ নেন না। কোনো কর আরোপ করা হলে এটা আলটিমেটলি শিক্ষার্থীদের ওপরই বর্তাবে অথবা উন্নয়নকাজ ব্যাহত হবে।’

বাজেট প্রস্তাবে কী আছে

প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ১০ বছর আগে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সময়ে এই কর আরোপের প্রস্তাব করা হলেও মামলা ও আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এ কর আদায় সম্ভব হয়নি।

বাজেট বক্তৃতায় মুস্তফা কামাল বলেন, ‘প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রযোজ্য সাধারণ করহার হ্রাস করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা কেবল তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত বেসরকারি কলেজ থেকে উদ্ভূত আয়ের ১৫ শতাংশ হারে কর নির্ধারণ করা হয়েছিল। মহান এ সংসদে আমি এ কর হার অর্থ আইনের মাধ্যমে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।’

আন্দোলনের মুখে ভ্যাট প্রত্যাহার

২০১৫-১৬ অর্থবছরের খসড়া বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়। সমালোচনার মুখে সরকার পরে তা কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করে। পরে সম্পূর্ণভাবে তা প্রত্যাহার করা হয়।

সে সময় বাজেট ঘোষণার পরের দিন আন্দোলনে নামেন বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ২০১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আফতাবনগরের ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা ভ্যাট মওকুফের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন।

পুলিশ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে ফাঁকা গুলি চালায়। এতে প্রায় ২৩ শিক্ষার্থী আহত হন। ওই ঘটনার পর সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী এ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।

আন্দোলনের মুখে ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ভ্যাট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। ওই দিনই অর্থ মন্ত্রণালয় একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভ্যাট প্রত্যাহারের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়।

আরও পড়ুন:
বাজেট ভাবনা তুলে ধরায় বিএনপিকে কাদেরের ধন্যবাদ
মন্দঋণ আদায়ে ‘আলাদা কোম্পানি’ গঠন জরুরি
আগামী বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে দ্বিগুণের বেশি বরাদ্দ
বাস্তবায়নযোগ্য নয়: বাজেট পেশের আগেই ফখরুল
শেয়ারে লভ্যাংশে আরও কর ছাড় দেয়া উচিত

শেয়ার করুন

ভাতার ৫০০ টাকায় কী হয়?

ভাতার ৫০০ টাকায় কী হয়?

ভাতার কার্ড হাতে বরিশালের আনোয়ার বেগম। ছবি: নিউজবাংলা

নতুন বাজেটে এক কোটি ছাড়িয়ে যাবে সরকারের ভাতাভোগীর সংখ্যা। কিন্তু যে গরিব, অসহায় মানুষদের জন্য ভাতা দেয়া হয়, মাসে ৫০০ টাকা কতটা কাজে লাগে তাদের? কী করেন তারা এ ভাতা দিয়ে?

সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় বয়স্ক, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীরা মাসে ৫০০ টাকা ভাতা পান। তিন বছর ধরে এই একই পরিমাণ ভাতা পাচ্ছেন তারা।

এই তিন বছরে গড়ে সাড়ে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। কিন্তু ভাতার পরিমাণ বাড়েনি। এমনকি করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও তাদের ভাতার অঙ্ক বাড়ায়নি সরকার।

অনেকেই আশায় ছিলেন, এবারের বাজেটে ভাতা বাড়ানো হবে। কিন্তু ৩ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল যে বাজেট প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করেছেন, তাতে তাদের সে আশা পূরণ হয়নি। এত দিন যে ভাতা পেতেন, সেই ভাতাই পাবেন তারা।

তবে ভাতাভোগীর সংখ্যা আরও ১৫ লাখ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

সরকারি হিসাবেই বাজারে মোটা চালের কেজি এখন ৫০ টাকা। গ্রামের মানুষ সাধারণত তিন বেলা ভাত খায়। সে ক্ষেত্রে একজনের জন্য প্রতিদিন প্রায় এক কেজির মতো চাল লাগে।

এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, একজন বয়স্ক, বিধবা বা স্বামী নিগৃহীতা নারী মাসে সরকারের কাছ থেকে যে ভাতা পান, ১০ কেজি চাল কিনতেই তা শেষ হয়ে যায়। অর্থাৎ একজনের ১০ দিনের চালের খরচও হয় না এই টাকা দিয়ে।

যাদের অন্য কোনো আয় নেই; কাজ করতে পারেন না, তাদের এই অল্প টাকা দিয়ে আসলে কিছুই হয় না।

কঠিন এই বাস্তবতায় এসব ভাতার পরিমাণ কমপক্ষে ১ হাজার টাকা করার দাবি উঠেছে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে।

দেশের চার জেলায় যারা ভাতা পান, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা টোয়েন্টিফোর ডটকম। তারা তাদের নিদারুণ কষ্টের কথা জানিয়ে ভাতা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন।

তবে এই মুহূর্তে সরকার ভাতা বাড়াতে চায় না। ভাতাভোগীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়াতে চায়।

এ বিষয় নিয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের সঙ্গে কথা বলতে তার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে কলটি রিসিভ হয়নি। এসএমএস করা হলেও কোনো জবাব আসেনি।

পরে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সরকার আসলে আপাতত ভাতার পরিমাণ বাড়াতে চায় না। গ্রামে একজন বয়স্ক মানুষের কাছে ৫০০ টাকা অনেক। আমাদের সরকারের এই মুহূর্তে প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, আগে সবাই পাক। তারপর ভাতার টাকা বাড়ানোর কথা ভাবা যাবে।

‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের এমন নির্দেশনাই দিয়েছেন। আমরা সে মোতাবেকই কাজ করছি। নতুন বাজেটে আরও ১৫০ উপজেলার সব বয়স্ক এবং বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীকে ভাতার আওতাভুক্ত করা হবে।’

বিদায়ি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে ১১২টি উপজেলার সব বয়স্ক এবং বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীকে ভাতার আওতাভুক্ত করার ঘোষণা দেয়া হয়। বর্তমানে সারা দেশে ৪৯ লাখ বয়স্ক নাগরিককে মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা দেয় সরকার।

ভাতার ৫০০ টাকায় কী হয়?

নতুন বাজেটে আরও ১৫০ উপজেলায় সব বয়স্ককে ভাতার আওতাভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এতে নতুন করে ৮ লাখ সুফলভোগী যোগ হবে। সব মিলিয়ে মোট ভাতাভোগীর সংখ্যা হবে ৫৭ লাখ।

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে আরও ১৫০টি উপজেলায় সোয়া ৪ লাখ বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীকে নতুন করে ভাতার আওতায় আনার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। বর্তমানে ১১২টি উপজেলায় ২০ লাখ ৫০ হাজার নারীকে এই ভাতা দেয়া হয়।

এ ছাড়া নতুন বাজেটে অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৮ হাজার জন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যে নতুন অর্থবছরের বাজেটে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা খরচের যে পরিকল্পনা অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল সাজিয়েছেন, তার মধ্যে ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি বরাদ্দ রেখেছেন সামাজিক নিরাপত্তা খাতে।

এই অঙ্ক মোট বাজেটের প্রায় ১৮ শতাংশ। আর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ১১ শতাংশ।

নতুন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় বিভিন্ন ভাতাভোগীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা হলেও ভাতার অঙ্ক একই আছ। সব মিলিয়ে আরও প্রায় ১৫ লাখ গরিব মানুষ সরকারের সহায়তা পাবে।

এতদিন এই ভাতা পাচ্ছিলেন ৮৮ লাখ গরিব, অসহায় মানুষ। নতুন করে সুবিধাভোগীর সংখ্যা যোগ হলে ভাতা পাওয়া গরিবের সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

বয়স্ক ভাতা পেতে হলে পুরুষের বয়স কমপক্ষে ৬৫ এবং নারীর ৬২ বছর হতে হয়। এই ভাতা পেতে হলে মাসে আয় ১০ হাজার টাকার কম হতে হবে।

কেমন আছেন বরিশালের ভোতাভোগীরা

বরিশাল শহরের ৬ নং ওয়ার্ডের মাদ্রাসা রোডের বাসিন্দা আম্বিয়া খাতুন। বয়স ৬৯ বছর। চার বছর ধরে পান ভাতা। কিন্তু এই টাকা দিয়ে কিছুই হয় না তার।

নিউজবাংলার সঙ্গে আলাপকালে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘স্বামী নাই আর পোলাও নাই। দুই মাইয়া আল্লে হেয়া বিয়া দিয়া দিছি মেলা আগে। হেরা বছ্ছরে একবার পারলে সাহায্য করে, না পারলে করে না। মোর ভরসা ওই বয়স্ক ভাতাডাই।

‘৪ বছর ধইরা পাই। যা পাই, ওয়া দিয়া ঘরের ল্যাম্পও জ্বালান যায় না, হেইরপরও ওইটাই ভরসা। ওইয়া দিয়াই চলতে হয়। অনেক সময় আশপাশের মানু মেলাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে।’

ভাতার ৫০০ টাকায় কী হয়?
ভাতার কার্ড হাতে বরিশালের আম্বিয়া খাতুন। ছবি: নিউজবাংলা

নানা অভিযোগ অনুযোগ করে আম্বিয়া বলেন, ‘তিন মাস পরপর কাউন্সিলর অফিসে যাইয়া ১৫০০ টাহা আনতে হয়। আমনেরাই কন, এই দিয়া কিছু হয়? পেট তো চালান লাগে।

‘ছোডো একটু ঘরে থাহি। এক বেলা রাইন্দা দুই দিন খাই। টাহা তো লাগবে খাইতে। আর দোহানদাররা তো বাহিও দেতে চায় না মোরে। মুই তো হেয়া শোধ করতে পারমু না। সরকার যদি মোগো এই বয়স্ক ভাতার টাহাডা বাড়াইয়া দিত তাইলে অনেক ভালো হইত। এক হাজার টাহা দেলেও হেলে দুই বেলা তো খাইতে পারতাম একটু।’

একইভাবে ভাতা টাকা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন শহরের কসাইখানা এলাকার বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম।

তিনি বলেন, ‘৭৪ বছর বয়স হইছে মোর। এহন চলতে ফেরতে কষ্ট হয় অনেক। কয়েক বছর ধইরা ভাতা পাই। হেয়া একটাহাও বাড়ে নাই। জিনিসপত্রের দামও তো অনেক বাড়ছে। হেইয়ার হিসেবে এহন যে তিন মাস পরপর ১৫০০ টাহা কইরা দেয় হেতে কি কিছু হয়?

‘মোর চক্ষুতে অনেক সমস্যা। ঠিকমতো চোহে দেহি না। কেমনে যে চলি আল্লাহই জানে। মাইয়ারে বিয়া দেওয়ার পর হে কি খালি বছরে কাপড় দেয়। আর পোলার চায়ের দোহানে এক ঘণ্টা সময় দেতে হয়। হেই পারপাস আমারে দেহাশুনা করে পোলায়।’

আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আগে চাউলের কেজি যে টাহা ছিল, হেই টাহা তো এহন আর নাই। সবকিছুর দাম বাড়ছে। কয়দিন পর দেখমু পানিটাও কিন্না খাওয়া লাগতে আছে। এইয়ার মধ্যে মোগো যে ভাতা দেতে আছে হেয়া তো বাড়ে না, মোগো আগের টাহাই দেতে আছে।

‘মালের দাম বাড়ার লগে লগে মোগো টাহাও যদি বাড়াইয়া দেয়, তাইলে অনেক ভালো হয়। নাইলে মোর চলতে অনেক সমস্যা। ওষুধপত্রসহ পোলার সংসারে তিনমাস পর পর ওই টাহা দেতে হয়। এই যুগে কী হয় ১৫০০ টাহায়?’

আম্বিয়া খাতুন, আনোয়ারা বেগমের মতো বয়স্কভাতা বাড়ানোর দাবি করেছেন বিএম কলেজ রোড এলাকার বৃদ্ধা ময়নামতি দাস, পলাশপুরের সোনা খাতুনসহ অনেকে।

গাইবান্ধা

তিন বছর ধরে বিধবা ভাতা পেয়ে আসছেন গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার দামোদরপুর ইউনিয়নের উত্তর মরুয়াদহ গ্রামের বিধবা রোকেয়া বেওয়া। স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ে কাছমতি বেগমকে নিয়ে তার সংসার।

মা-মেয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তারপরও তাদের মুখে খানিকটা হাসি এনে দিয়েছে সরকারের দেয়া বিধবা ভাতার মাসিক ৫০০ টাকা।

ভাতার ৫০০ টাকায় কী হয়?
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার দামোদরপুর ইউনিয়নের উত্তর মরুয়াদহ গ্রামের বিধবা রোকেয়া বেওয়া

এই টাকা দিয়ে কী করেন জানতে চাইলে রোকেয়া বেওয়া বলেন, ‘টেকা তুলি বাজারঘাট করি। চাউল কিনি। ১৫০০ টেকা হামার কাছে মেলা টেকা। এই টেকা না দিলি বাঁচনো না হয় বাবা। না খায়া মনো হয়।’

এই টাকায় সংসার চলে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ। আর টেকা পামো কোনটে? এই টেকাই চলি ফিরি খাই। মানষের বাড়িত থাকি এনা-ওনা আনি। এগলে দিয়েই মিলিধিলি চলি বাবা।

‘কষ্ট হয় চলতি। তাও করিধরি বাঁচি আছি। আর এনা বেশি টেকা পালে ভালই চলবের পানো হয়। মানষের বাড়িত কাম করা নাগিল নে হয়।’

একই উপজেলার উত্তর দামোদরপুর গ্রামের বয়স্ক ভাতাভোগী মোন্তাজ আলী প্রামানিক বলেন, ‘ছয় মাস পর ঈদের আগত টেকা পাচি ৩ হাজার। টেকা তুলি বাড়িত যাবার পাই নাই। তার আগে শেষ। দোকানত বাকিবুকি। বাজারত বাকি সোগ শোধ কচ্চি।

‘পত্তি ওষুধপাতি খাম। টেকার জন্যি ওষুধ পামো না। বিছনেত পড়ি আছম। যে টেকা পামো, তাক দিয়ে এখান-ওখান হয়; পেটত ভাত দিবের পাম না।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাসে একটা হাজার টেকা পালি যেন হলি হয়। ডাল-ভাত, ওষুধপাতি খাবার পানো হয়। ৫০০ টেকা দিয়ে কিছু হয় না রে বাপ।’

হবিগঞ্জ

হবিগঞ্জ পৌরসভার কামড়াপুর এলাকার মৃত তুফায়েল আলীর স্ত্রী খুদেজা খাতুন। দুই ছেলে এবং চার মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেরাও বিয়ে করে আলাদা থাকেন। তার ভরণ-পোষণের জন্য ছেলেরাই মাস খরচ দেন।

তিনি বলেন, ‘সরকার আমরারে বয়স্ক ভাতা দেয় মাসে ৫০০ টেকা কইরা। তিন মাস পরপর এই টেকা তুলতা পারি। সরকারি কর্মকর্তারার বেতন বাড়ছে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, কিন্তু আমরার ভাতা বাড়তাছে না।’

দুঃখ করে তিনি বলেন, ‘মাসে ৫০০ টেকা দিয়ে একজন মানুষ চলত পারে? ৫০০ টেকা দিয়া এখন ১০ কেজি চাউলও পাওয়া যায় না।’

তেঘরিয়া গ্রামের আবু মিয়া। তিন ছেলে দুই মেয়ে। তিনিও ছেলে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা কেউ কেউ রিকশা চালান, কেউ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। অভাব-অনটনের সংসারে অসুস্থ আবু মিয়া যেন ছেলের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘সংসার চালাইতে পুলাইনতের (ছেলেদের) অনেক কষ্ট হয়। এর মাঝে আমি অসুস্থ হওয়ার কারণে কয়দিন পরপর ওষুদ লাগে। এখন লকডাউনের লাইগা রিকশা চালাইত পারে না, অন্য কোনো কামও পায় না। অনেক কষ্টে আছি আমরা।

‘সরকার আমারে যে ভাতা দেয়, ইডা দিয়া আমার ওষুদের খরচই হয় না। এই ভাতা আরও বাড়ানো দরকার।’

সরকার ভাতা না বাড়িয়ে নতুন লোকদের ভাতার আওতায় আনতে চাচ্ছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যারা বুড়া হইছে, সবাইকেই ভাতা দেয়া উচিত। কিন্তু এত কম টেকা দিলে অইব কেমনে। আরও বেশি দিতইব।’

নীলফামারী

নীলফামারী শহরের নিউ বাবুপাড়া মহল্লার বাসিন্দা পলাশ হোসেন। ২০১০ সাল থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পেয়ে আসছেন। সেখানকার আশরাফ হোসেন দুলাল ও শাবানা বেগম ছালেহার সন্তান পলাশ।

সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় মাসিক সাড়ে ৭০০ টাকা পাচ্ছেন পলাশ।

সরকারি ভাতা পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে পলাশ বলেন, ‘যে টাকা পাচ্ছি এ জন্য ধন্যবাদ জানাই তাকে। তবে এই সময়ে এসে মাসে সাড়ে ৭০০ টাকা কাজে আসে না।

‘চলাফেরা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ভাতার পরিমাণ হিসাব করলে যৎসামান্য। আমি দাবি জানাই, যেন এর পরিমাণ বাড়ানো হয়।’

মিলন পল্লী এলাকার প্রয়াত বিষাদু মামুদের স্ত্রী ছাবিয়া বেগম। ১৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে বয়স্ক ভাতা ভোগ করে আসছেন তিনি। নানা রোগ আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছে তাকে। প্রতি মাসে শুধু ওষুধই কিনতে হয় ১ হাজার ২০০ টাকার।

ছাবিয়া বেগম বলেন, ‘এই ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হলে উপকৃত হবেন আমার মতো দেশের লাখ লাখ অসহায় বয়স্ক মানুষরা।’

একই দাবি গাছবাড়ি মহল্লার খোঁচা মামুদের স্ত্রী আমিনা বেগমেরও। একমাত্র সন্তানের উপার্জনে সংসার চালাতে হয় পাঁচজনের খরচ। অভাব অনটন লেগেই থাকে।

আমিনা বেগম বলেন, ‘শরীরে ব্যথা লেগেই রয়েছে। সঠিক চিকিৎসা করাতে পারছি না। নানা রোগ শরীরে ধরেছে। আমাদের ভাতার টাকা যদি বাড়ানো হয় তাহলে কিছুটা উপকৃত হতাম।’

৯৮ সাল থেকে শুরু বয়স্ক ভাতা

অবহেলিত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছর থেকে চালু হয় বয়স্ক ভাতা। সে সময় ভাতার পরিমাণ ছিল ১০০ টাকা। ৪ লাখ ৪ হাজার জন পেতেন ভাতা। বাজেটে এ বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৪৮ হাজার ৫০ লাখ টাকা।

২০০৬-০৭ অর্থবছর ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে ২০০ টাকা করা হয়। ভাsতাভোগীর সংখ্যা বেড়ে হয় ১৬ লাখ।

২০০৯-১০ অর্থবছরে ভাতার অঙ্ক বাড়িয়ে করা হয় ৩০০ টাকা। সুবিধাভোগীর সংখ্যা হয় ২২ লাখ ৫০ হাজার।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করে সরকার। ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয় ৪০ লাখ।

৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটেও ভাতার অঙ্ক সেই ৫০০ টাকাই আছে। তবে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৪৯ লাখ হয়েছে। বাজেটে বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা।

বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা শুরু ১৯৯৯ সাল থেকে

এই ভাতাও ১০০ টাকা দিয়ে শুরু হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে বেড়ে ৫০০ টাকায় ঠেকেছে। বর্তমানে ২০ লাখ ৫০ হাজার নারী এই ভাতা পাচ্ছেন। বাজেটে বরাদ্দ আছে এক হাজার ২৩০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ৭ লাখ ৭০ হাজার দরিদ্র মায়েদের মাতৃত্বকালীন ভাতা দেয়া হচ্ছে। ১৮ লাখ অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধীকে মাসে ৭৫০ টাকা করে ভাতা দিচ্ছে সরকার।

এসব ভাতা বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক মঞ্জুর হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখন কঠিন সময়। মহামারির এই সময়ে বাজেটের আকার, ঘাটতি বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামানোর প্রয়োজন আমি দেখছি না।

‘কোভিডের মধ্যে চলতি অর্থবছরে চার-সাড়ে চার শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও যথেষ্ট। আগামী অর্থবছরে ৫ শতাংশ হলেও ভালো। সরকার নতুন বাজেটে এসব ভাতা যাতে আরও বেশিসংখ্যক মানুষ পায়, সে ব্যবস্থা নিয়েছে। এটা খুবই ভালো। তবে একই সঙ্গে আমি ভাতার পরিমাণটা বাড়ানোরও অনুরোধ করছি। কেননা এই বাজারে ৫০০ টাকা দিয়ে আসলেই তেমন কিছু হয় না।’

[সহযোগী প্রতিবেদক: বরিশাল প্রতিনিধি তন্ময় তপু, গাইবান্ধা প্রতিনিধি পিয়ারুল ইসলাম, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি কাজল সরকার এবং নীলফামারী প্রতিনিধি নূর আলম]

আরও পড়ুন:
বাজেট ভাবনা তুলে ধরায় বিএনপিকে কাদেরের ধন্যবাদ
মন্দঋণ আদায়ে ‘আলাদা কোম্পানি’ গঠন জরুরি
আগামী বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে দ্বিগুণের বেশি বরাদ্দ
বাস্তবায়নযোগ্য নয়: বাজেট পেশের আগেই ফখরুল
শেয়ারে লভ্যাংশে আরও কর ছাড় দেয়া উচিত

শেয়ার করুন

পোশাক খাতে উৎসে কর ০.২৫ শতাংশ করার দাবি

পোশাক খাতে উৎসে কর ০.২৫ শতাংশ করার দাবি

‘এসব প্রস্তাবনা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করলে বাজেট আরও ফলপ্রসূ হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায় খরচ কমবে। এবং বিনিয়োগের দ্বারও উন্মুক্ত হবে।’

তৈরি পোশাক শিল্পের উৎসে করহার ০.২৫ শতাংশ নির্ধারণ এবং তা আগামী পাঁচ বছর অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতি (ইএবি)।

বর্তমানে এ খাতে উৎসে কর ০.৫০ শতাংশ। বাজেটের আগে এটি কমানোর দাবি থাকলেও তা বিবেচনায় আনেননি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল

বুধবার আগামী ২০২১-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওপর দেয়া প্রতিক্রিয়ায় ইএবি প্রস্তাব রেখেছে।

রপ্তানি উন্নয়নের স্বার্থে বাজেট পাসের আগে অর্থমন্ত্রীকে বিবেচনার জন্য সংগঠনটি আরও বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। এর পাশাপাশি বাজেটে রাখা বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে নিজেদের মূল্যায়নের কথাও জানিয়েছে রপ্তানিকারকদের এই সংগঠনটি।

সংগঠনের সভাপতি ও সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদী বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘চমৎকার বিনিয়োগ এবং ব্যবসাবান্ধব’ বাজেট হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বাজেটে বাস্তবতার নিরিখে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবন, অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল ও গতিশীল এবং অক্ষুণ্ন রাখার সব প্রচেষ্টা প্রতিফলিত হয়েছে।’

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, অবকাঠামো, আর্থসামাজিক, দারিদ্র্য বিমোচন, মানবসম্পদ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ায় বাজেট যুগোপযোগী হয়েছে বলেও মূল্যায়ন করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

তিনি দেশের রপ্তানি উন্নয়নের স্বার্থে ইএবির দেয়া প্রস্তাবনাগুলো বাজেট পাসের আগেই অর্থমন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্তির আহ্বান জানান। বলেন, ‘এসব প্রস্তাবনা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করলে বাজেট আরও ফলপ্রসূ হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায় খরচ কমবে। এবং বিনিয়োগের দ্বারও উন্মুক্ত হবে।’

ইএবির আরও যেসব প্রস্তাব

সর্বমোট প্রাপ্তি ৩ কোটি টাকা বা ততোধিক হলে ব্যক্তি আয়করদাতাদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম করের হার ০.৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.২৫ শতাংশ করা হয়েছে। সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ন্যূনতম এই করের হার নির্ধারণ করলে কর প্রদানে উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

ব্যবসায়ী অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সহ আমদানি পর্যায়েও ভ্যাটের আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে সব ধরনের উৎসে কর ও অগ্রিম কর চূড়ান্ত কর হিসেবে সমন্বয় করার প্রস্তাব দেয় ইএবি।

সব ধরনের সুতার ওপর ৩ টাকা মূল্য সংযোজন কর ধার্যসহ সুতা তৈরিতে ব্যবহৃত সব ধরনের ফাইবারকে শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুবিধা দেয়ার আহ্বানও জানিয়েছে সংগঠনটি।

রপ্তানিকারকদের এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ) ফান্ড রপ্তানি উন্নয়নের জন্য ব্যয়ের ওপর আয়কর কেটে রাখার বিধান ও রপ্তানির বিপরীতে দেয়া নগদ সহায়তার ওপরে আয়কর কেটে রাখার প্রথাও বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।

রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানে মূল যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রেও রেয়াতি সুবিধা চেয়েছে তারা। একইভাবে রপ্তানি কাজে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত পণ্য ও সেবার ওপর ভ্যাট মওকুফ, অগ্নি-নির্বাপণ উপকরণ রেয়াতি হারে আমদানির সুযোগ দাবিও করেছে।

মাংস প্রক্রিয়াজাত খাত সম্পর্কিত গৃহীত পদক্ষেপের সঙ্গে মাংস রপ্তানিতে ফ্রিজার ভ্যান এবং চিলার ভ্যান আমদানির ক্ষেত্রে মূলধনী পণ্য বিবেচনায় শুল্ক অব্যাহতির সুবিধাও দাবি করেছে।

এ খাতে সরবরাহ করা প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উপকরণে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের মসলা এবং প্যাকেজিং আমদানিতেও শুল্ক সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব রেখেছে।

আরও পড়ুন:
বাজেট ভাবনা তুলে ধরায় বিএনপিকে কাদেরের ধন্যবাদ
মন্দঋণ আদায়ে ‘আলাদা কোম্পানি’ গঠন জরুরি
আগামী বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে দ্বিগুণের বেশি বরাদ্দ
বাস্তবায়নযোগ্য নয়: বাজেট পেশের আগেই ফখরুল
শেয়ারে লভ্যাংশে আরও কর ছাড় দেয়া উচিত

শেয়ার করুন