হাজারো মোমবাতিতে হুমায়ূন স্মরণ

হাজারো মোমবাতিতে হুমায়ূন স্মরণ

কেক কেটে জন্মদিন পালন করা হল হুমায়ূন আহমেদের। ছবি: নিউজবাংলা

সকালে কবর জিয়ারত, সমাধিতে ফুল দিয়ে লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে পরিবার, স্বজন, নুহাপল্লীর স্টাফ, ভক্ত ও পাঠকরা।

নুহাশপল্লীতে নানা আয়োজনে উদযাপন হলো জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ৭২তম জন্মদিন।

জন্মদিনের প্রথম প্রহরে লেখকের সমাধিতে এক হাজার একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়।

সকালে কবর জিয়ারত করে হুমায়ূনের আত্মার শান্তি কামনা করে প্রার্থনা করা হয়। পরে লেখকের ম্যুরালের সামনে কেক কাটা হয়‌। এসময় উপস্থিত ছিল লেখকের পুত্র নিষাদ ও নিনিত।

হাজারো মোমবাতিতে হুমায়ূন স্মরণ
সমাধিতে ফুল দিয়ে লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। ছবি: নিউজবাংলা

হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্ন ধীরে ধীরে পূরণ হচ্ছে জানিয়ে তার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন বলেন, ‘নতুন প্রজন্ম হুমায়ূন আহমেদের লেখা পাঠ করছেন। তার লেখার রস, বোধ ও মানবিকতার সাথে পরিচিত হচ্ছেন এটা বিস্ময়কর।

হুমায়ূন ভক্তরা ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করে যাবেন বলে জানান অভিনেত্রী শাওন।।

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই বরেণ্য কথাসাহিত্যিক।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

ধসে পড়লে সংস্কার?

ধসে পড়লে সংস্কার?

ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী আলেকজান্ডার ক্যাসেল জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ছবি: নিউজবাংলা

শহরের আদালত এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী দ্বিতল ভবন আলেকজান্ডার ক্যাসেল ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে জরাজীর্ণ অবস্থায় এখনও টিকে আছে। অযত্ন আর অবহেলায় ভেঙে গেছে মার্বেল পাথরের দুটি ভাস্কর্যের হাত।

বছরের পর বছর আশ্বস্ত করা হচ্ছে ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী আলেকজান্ডার ক্যাসেল বা লোহার কুঠি সংস্কার করা হবে। কার্যত ফলাফল শূন্য। ক্ষুব্ধ সংস্কৃতিকর্মীদের প্রশ্ন, ধসে পড়লেই কী এটি সংস্কার করবে কর্তৃপক্ষ?

শহরের আদালত এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী দ্বিতল এ ভবনটি ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে জরাজীর্ণ অবস্থায় এখনও টিকে আছে। অযত্ন আর অবহেলায় ভেঙে গেছে মার্বেল পাথরের দুটি ভাস্কর্যের হাত। বাকি অংশে ময়লা জমেছে।

দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য ফটকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ লিখে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। তবু ভবনটির ছাদের নিচে বসে কিংবা চারদিকে ঘুরে সৌন্দর্য উপভোগ করছেন অনেকে।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৮৭৯ সালে ময়মনসিংহ জেলার শতবর্ষ উপলক্ষে আমন্ত্রণ জানানো হয় তৎকালীন রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের স্ত্রী আলেকজান্দ্রাকে। তার নামেই এর নামকরণ হয় ‘আলেকজান্ডার ক্যাসেল’।

এর নির্মাতা মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সুকান্ত সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। তিনি ব্রহ্মপুত্র নদের পারে প্রায় ২৭ একর জমির বাগানবাড়িতে সুরম্য অট্টালিকাটি নির্মাণ করেন।

ধসে পড়লে সংস্কার?

এটি তৈরিতে লোহার ব্যবহার বেশি হওয়ায় স্থানীয় লোকজনের কাছে এটি ‘লোহার কুঠি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে বর্তমানে এটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, দ্বিতল ভবনের ছাদে অভ্র ও চুমকি ব্যবহার করে প্রাসাদের ভেতর ঠাণ্ডা রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। বহু গুণীজন ময়মনসিংহ সফরকালে এখানে এসে থেকেছেন।

ধসে পড়লে সংস্কার?

১৯২৬ সালে সফরে এসে ভবনটিতে থেকেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একই বছর আসেন মহাত্মা গান্ধী। আরও এসেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ, কামাল পাশা, লর্ড কার্জন, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, ওয়াজেদ আলী খান পন্নীসহ অনেক গুণী ব্যক্তিত্ব।

স্থানীয় শাহরিয়ার মেহেদী মোল্লা নামের একজন ব্যবসায়ী জানান, বাংলাদেশের যেকোনো জেলা থেকে কেউ ময়মনসিংহে এলে এই ভবনটি এক নজর হলেও দেখতে আসেন। তবে বর্তমানে এটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকায় দূরের দর্শনার্থী নেই বললেই চলে।

ধসে পড়লে সংস্কার?

নাদিম পারভেজ নামে এক ভবন ডিজাইনার বলেন, ‘ভবনটি দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। তা না হলে একবার ধসে পড়লে ময়মনসিংহের ইতিহাসের একটি সাক্ষী বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’

স্থাপনাটির ছাদের পাশ দিয়ে হাঁটছিলেন ফিরোজ নামে এক যুবক। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি শহরের আকুয়া এলাকায় বসবাস করি। সপ্তাহে এক দিন হলেও বিকেলে এই ভবনটির সামনে কিছুক্ষণ বসে থাকি।

‘একদিকে নিরিবিলি পরিবেশ আর অন্যদিকে আকর্ষণীয় ঐতিহ্যবাহী ভবন। তবে ছাদের নিচে বসে মাঝেমধ্যেই অনেককে আড্ডা দিতে দেখা যায়। ঝুঁকিপূর্ণ লেখাটা কেউ মানতেই চান না। যদি কারও মাথায় ধসে পড়ে তাহলে মৃত্যুর ঘটনা ঘটবে।’

ধসে পড়লে সংস্কার?

ছায়ানট ময়মনসিংহের সভাপতি আপেল চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে ভবনটির বিভিন্ন অংশ খসে পড়ছে। কী কারণে এটি সংস্কার করা হচ্ছে না, আমাদের জানা নেই। তবে সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে আমাদের খুব বেশি কিছু সরকারের কাছে চাওয়ার নেই। আমরা চাই আগামী প্রজন্মের কাছে ইতিহাস ঐতিহ্য বেঁচে থাকুক।’

এদিকে স্থাপনাটি সংস্কার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাগরিক আন্দোলনের নেতারা। তারা এটিকে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা হিসেবে অভিহিত করেন।

ধসে পড়লে সংস্কার?

সামাজিক সংগঠন ময়মনসিংহ জন-উদ্যোগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চুন্নু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটির ফটকে ঝুঁকিপূর্ণ লিখে শুধু একটি সাইনবোর্ড লাগিয়েই ক্ষান্ত কর্তৃপক্ষ। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ, অথচ এটির নিচে বসে মানুষ গল্প করে। অনেকে ভবনটির নিচে বসে থাকে। তখন ধসে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটলে, এর দায় নেবে কে?’

তিনি বলেন, ‘ইতিহাসের এই চিহ্ন ধরে রাখা প্রয়োজন। আর ভাস্কর্য যতটুকু এখনও টিকে আছে, ততটুকু রক্ষার জন্য প্রহরী দিয়ে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা দরকার।

ধসে পড়লে সংস্কার?

জেলা নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন কালাম বলেন, ‘আর কিছু দিন এই অবস্থায় থাকলে ভবনটির সম্পূর্ণ অংশই খসে পড়বে। ইতিমধ্যে মার্বেল পাথরে নির্মিত আকর্ষণীয় ভাস্কর্যগুলোর হাত ভেঙে গেছে।

‘ভবনটির চারপাশে ঝোপঝাড়। ইতিহাস টিকিয়ে রাখতে স্থাপনাটি দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।’

ধসে পড়লে সংস্কার?

এই বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ময়মনসিংহের কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আলেকজান্ডার ক্যাসেলটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। করোনার কারণে স্থাপনাটিকে দর্শনীয় হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়নি। তবে আশা করছি, দ্রুত এর সংস্কার কাজ শুরু হবে।’

শেয়ার করুন

পঠনে-আন্দোলনে ৮৫ বছর

পঠনে-আন্দোলনে ৮৫ বছর

দেশের প্রাচীনতম সাহিত্য সংগঠন সিলেটের কেন্দ্রীয় সাহিত্য সংসদ। এর সদস্যরা জানান, অবিভক্ত ভারতে শিল্প-সাহিত্যে পিছিয়ে পড়া মুসলিমদের জন্যই এই সংগঠনের জন্ম। তৎকালীন প্রেক্ষাপটের কারণে এই সংসদের নাম মুসলিম সাহিত্য সংসদ রাখা হয়েছিল। তবে এখন এর সঙ্গে সব ধর্মের মানুষই সম্পৃক্ত।

যাত্রা শুরু একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশনার মধ্য দিয়ে। এরপর তা রূপ নেয় সংগঠনে, হয়ে ওঠে একটি সাহিত্য আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনেও রয়েছে এর অনন্য ভূমিকা। এটি সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, যা কেমুসাস নামে সুপরিচিত।

এই অঞ্চলের সাহিত্য চর্চা ও পাঠাভ্যাস তৈরিতে ৮৫ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে এই সংগঠন। ১৯৩৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয় এটি। দেশের প্রাচীনতম এই সাহিত্য সংগঠন এখন সিলেটের ঐতিহ্যেরই অংশ।

১৯৪৭ সালের ৯ নভেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ। তখন ভারত-পাকিস্তান সবেমাত্র আলাদা হয়েছে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে তা চূড়ান্ত হয়নি। ওই সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ওঠে।

এ অঞ্চলের ইতিহাসবিদদের মতে, এটিই রাষ্টভাষা বাংলার দাবিতে প্রথম কোনো সভা। এরপর ৩০ নভেম্বর নগরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আরেকটি আলোচনা সভার করে সংগঠনটি। সেখানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী।

উর্দুর সমর্থকরা হামলা চালিয়ে এই সভা পণ্ড করে দেন। এর প্রতিবাদে রাজপথেও নামেন বাংলা ভাষার সমর্থকরা। সভায় পাঠ করা মুজতবা আলীর সেই প্রবন্ধ পরবর্তী সময়ে ছাপা হয় সাহিত্য সংসদের নিয়মিত প্রকাশনা ‘আল ইসলাহ’-তে।

এই আল ইসলাহর মাধ্যমেই ১৯৩৬ সালে যাত্রা শুরু হয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের।

সংগঠনসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ১৯৩২ সালে ‘অভিযান’ নামের একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশনা শুরু করেন কবি মুহম্মদ নূরুল হক। সে বছরই এর নাম বদলে রাখা হয় ‘আল ইসলাহ’।

আল ইসলাহকে কেন্দ্র করে সংগঠন গড়ে তোলার লক্ষ্যে চার বছর পর ১৬ সেপ্টেম্বর হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগার মোতাওয়াল্লি সরেকওম আবু জাফর আব্দুল্লাহর বাড়ির বৈঠকখানায় আলোচনায় বসেন কবি নূরুল হক। সেদিনই সংগঠন হিসেবে জন্ম নেয় কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট বা কেমুসাস।

পঠনে-আন্দোলনে ৮৫ বছর


সেখানে মরমী কবি হাসন রাজার ছেলে দেওয়ান একলিমুর রাজাকে সভাপতি এবং দরগা শরিফের আবু জাফরকে সম্পাদক করা হয়। পরে কবি নূরুল হক কমিটির সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৮৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।

এই সংগঠনের বর্তমান কমিটির সদস্য ও আল ইসলাহের প্রাক্তন সম্পাদক কবি আব্দুল মুকিত অপি।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘অবিভক্ত ভারতে শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ নানা ক্ষেত্রে মুসলমানরা পিছিয়ে ছিলেন। তাদের দমিয়েও রাখা হতো। মুসলিম সমাজকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যেই তৎকালীন অগ্রসর চিন্তার মানুষজন মিলে গঠন করেছিলেন এই সাহিত্য সংসদ।’

অপি জানান, প্রথমে দরগা শরিফের মোতাওয়াল্লি আবু জাফরের বাড়ির পাশের একটি ঘরে ছিল সংগঠনটির কার্যালয়। পরে ১৯৪৯ সালে আবু জাফর, আমীনুর রশীদ চৌধুরীসহ সিলেটের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রচেষ্টায় দরগার পাশে জমিতে স্থানান্তর হয় সাহিত্য সংসদের কার্যালয়। এখন সেখানে নির্মিত হয়েছে সংগঠনটির বহুতল ভবন।

অপি আরও জানান, মাত্র ১৯টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু হয় কেমুসাসের পাঠাগারের। এখন তাতে আছে অর্ধলক্ষাধিক বই। দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য কিছু বই এবং শিলালিপিও সংরক্ষিত আছে সেখানে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের হাতের লেখা কোরআন শরীফ।

কার্যালয়ের পঞ্চম তলায় সাহিত্য সংসদের সাবেক সভাপতি ভাষাসৈনিক মতিন উদ্দীন আহমদের নামে চার হাজারেরও বেশি সংগ্রহ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত একটি জাদুঘরও আছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সুলেমানের নামে একটি মিলনায়তনও করা হয়েছে।

শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন দুপুর ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই পাঠাগার। পাঠকদের আনাগোনায় জমজমাট থাকে প্রায় প্রতিদিনই।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি জসীমউদ্‌দীন, শেরেবাংলা এ কে ফজুলল হক, কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সঙ্গীতজ্ঞ আব্বাস উদ্দিন, কবি সুলতানা কামাল, কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, বাউল শাহ আবদুল করিমসহ অনেক বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের পদচারণে হয়েছে এই সাহিত্য সংসদে।

কেমুসাসের সভাপতির দায়িত্বে এখন আছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

পঠনে-আন্দোলনে ৮৫ বছর

সংসদের সহসভাপতি সেলিম আউয়াল বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে এ অঞ্চলের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক বিকাশে কেমুসাস অনন্য অবদান রেখে চলছে। এর মুখপত্র আল ইসলাহ ৮৫ বছর ধরে প্রায় নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। ১৯৪৭ সালেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আল ইসলাহে সম্পাদকীয় লেখা হয়।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ১৯৪৩ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলামের চিকিৎসায় অর্থ সহায়তার জন্য ‘নজরুল সাহায্য ভান্ডার’ গঠন করে কেমুসাস। এ দেশে প্রথম নজরুল সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজনও করে এই সংগঠন। প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সেখানে বসে সাহিত্য আসর। জেলার সাহিত্যপ্রেমীরা সেখানে আড্ডায় মেতে ওঠেন।

সাহিত্যচর্চায় নিবেদিত ব্যক্তিত্বদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ২০০১ সাল থেকে ‘কেমুসাস সাহিত্য পুরস্কার’ দিয়ে আসছে এই সংগঠন। জ্ঞানচর্চায় ও সমাজসেবায় অবদানের জন্যে প্রতিবছর একজন বা দুইজনকে সাহিত্য সংসদের ‘সম্মানসূচক সদস্য পদ’ দেয়া হয়।

নতুন প্রজন্মকে প্রকৃতি, কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে প্রতি বছর এই সংগঠন তাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এই কর্মসূচির নাম দেয়া হয়েছে ‘শেকড়ের সন্ধানে অভিযাত্রা’।

এছাড়া, পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর বসে ‘কেমুসাস বইমেলা’।

সংসদের কার্যকরী কমিটির সদস্য ছড়াকার রিপন আহমদ ফরিদী বলেন, ‘তৎকালীন প্রেক্ষাপটের কারণে এই সংসদের নাম মুসলিম সাহিত্য সংসদ রাখা হয়েছিল। তবে এখন এর সঙ্গে সব ধর্মের মানুষই সম্পৃক্ত। সাহিত্যচর্চা ও মানুষের পাঠাভ্যাস তৈরিতে সব সময়ই কাজ করে যাবে এই সংসদ।’

শেয়ার করুন

শরতের আগমনী বার্তা নিয়ে এসেছিলেন শরৎচন্দ্র

শরতের আগমনী বার্তা নিয়ে এসেছিলেন শরৎচন্দ্র

শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের আবেদন কতটা তা বোঝা যায় এটা জেনে যে, তার সাহিত্যকর্ম ঘিরে উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ। সেই সময়ের সমাজব্যবস্থাকে নিয়ে লেখা তার উপন্যাসগুলো যেন সময়ের আয়না হয়ে আছে এ সময়ের মানুষের কাছে।

ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় বাংলার শরৎ, চলে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। শরৎচন্দ্র জন্মেছিলেন ১৫ সেপ্টেম্বর।

না, শরতে আসেননি তিনি। এসেছিলেন শরতের আগমনী বার্তা নিয়ে।

শরতে রাত তাড়াতাড়ি আসে আর আবহাওয়া ঠান্ডা হতে থাকে। এই সময়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গাছের পাতার ঝরে যাওয়া।

শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে ঋতু শরতের প্রভাব কতটুকু তা নিয়ে খুব একটা জানা যায় না। তবে শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে যে পাতা ঝরার মতো বেদনা বিদ্যমান, তা হয়তো স্বীকার করবেন পাঠকেরা।

শরৎচন্দ্র সাহিত্যিক। লিখেছেন উপন্যাস, নাটক, গল্প, প্রবন্ধ। ‘বিরাজবৌ’, ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘পরিণীতা’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘দত্তা’, ‘গৃহদাহ’, ‘শুভদা’ তার লেখা জনপ্রিয় উপন্যাস। তবে যে উপন্যাসের কথা বললে সবাই তাকে আরও ভালোভাবে চিনতে পারেন, সেই উপন্যাসটি হলো ‘দেবদাস’।

বলিউডের সঞ্জয় লীলা বানসালি নির্মিত শাহরুখ-ঐশ্বরিয়া অভিনীত দেবদাস সিনেমায় এক পাতা ঝরার দিনে দর্শকদের কাঁদিয়ে চলে গিয়েছিলেন পারুর দেবা।

দেবদাস উপন্যাসটি শরৎচন্দ্র লিখেছেন বাংলায়। কিন্তু সাহিত্যটির আবেদন এতটাই যে বাংলাসহ একাধিক ভাষায় উপন্যাসটি নিয়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমা।

বাংলা, হিন্দি এবং তেলেগু ভাষাতে উপন্যাসের নামেই অর্থাৎ দেবদাস নামেই সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে আটবার।

শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের আবেদন কতটা তা বোঝা যায় এটা জেনে যে, তার সাহিত্যকর্ম ঘিরে উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ।

সেই সময়ের সমাজব্যবস্থাকে নিয়ে লেখা তার উপন্যাসগুলো যেন সময়ের আয়না হয়ে আছে এ সময়ের মানুষের কাছে। ভবিষ্যতের মানুষও একই রকম অনুভব করবেন তার সাহিত্য পড়ে।

অথচ এ কথাসাহিত্যিককে দারিদ্র্যের কারণে বিদ্যালয়ও ত্যাগ করতে হয়েছিল। ১৮৯৪ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এনট্রান্স পরীক্ষা পাস করেন শরৎ। কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু তা আর শেষ করতে পারেননি তিনি। এর পর শুরু হয় তার কাজের সন্ধান।

১৯০৩ সালে বার্মা রেলওয়ের অডিট অফিসে অস্থায়ী চাকরি শুরু করেন শরৎচন্দ্র। ১৯০৬ সালে শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে একটি অফিসে চাকরি পান এবং পরবর্তী ১০ বছর সেখানে চাকরি করেন। ১৯১৬ সালে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে রেঙ্গুন থেকে বাংলায় ফিরে আসেন শরৎচন্দ্র।

রেঙ্গুনের উপকণ্ঠে বোটাটং পোজনডং অঞ্চলের যে বাসায় শরৎচন্দ্র থাকতেন, সে বাসার নিচে শান্তি দেবী নামে এক ব্রাহ্মণ মিস্ত্রির কন্যা থাকতেন। মদ্যপ হবু বরের হাত থেকে বাঁচাতে শান্তি দেবীর অনুরোধে তাকে বিয়ে করেন শরৎচন্দ্র। তাদের এক পুত্রসন্তানও হয়। প্লেগ রোগে স্ত্রী ও তার এক বছরের সন্তান মারা যায়। এর অনেক দিন পর শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনে কৃষ্ণদাস অধিকারী নামে এক ভাগ্যান্বেষী ব্যক্তির অনুরোধে তার ১৪ বছরের কন্যা মোক্ষদাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি মোক্ষদার নাম রাখেন হিরন্ময়ী দেবী। তারা নিঃসন্তান ছিলেন।

১৯৩৭ সাল থেকে শরৎচন্দ্রের অসুস্থতা শুরু হয়। ১৯৩৮ সালের ১২ জানুয়ারি শল্য চিকিৎসক ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় তার দেহে অস্ত্রোপচার করেন, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। চার দিন পর ১৬ জানুয়ারি সকাল ১০টায় শরৎচন্দ্র শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

শরৎচন্দ্রকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় এবং বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হিসেবে ধরা হয়। বুধবার এ সাহিত্যিকের ১২৬তম জন্মদিন। শরৎচন্দ্র ১৮৭৬ সালের আজকের এই দিনে হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

শেয়ার করুন

‘আমার কাজ স্থাপত্য দিয়ে কবিতা নির্মাণ’

‘আমার কাজ স্থাপত্য দিয়ে কবিতা নির্মাণ’

ইসলামাবাদে বাংলাদেশের চ্যান্সেরি ভবনের দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতিমান স্থপতি রফিক আজম অ্যাকাডেমিক মহলে পরিচিত ‘গ্রিন আর্কিটেক্ট’ হিসেবে। প্রকৃতি ও স্থাপত্যের মেলবন্ধন তার কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সম্প্রতি নিউজবাংলার পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার নেয়া হয় তার বারিধারার অফিসে। তিনি তার কাজ ও দর্শন, গ্রিন আর্কিটেকচারের ধারণা, ভবন নির্মাণের উপকরণ, ঢাকার দেয়াল সংস্কৃতি, বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্প, রাজধানীর নগরায়ণ নিয়ে কথা বলেছেন। নিউজবাংলার পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তরুণ সরকার।  

রাজধানীর, বিশেষত পুরান ঢাকার পার্কগুলোর স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য বদলে যাচ্ছে। পার্কের দেয়াল উঠে যাচ্ছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা যে কেউ যেকোনো দিক দিয়ে যেকোনো সময় পার্কে প্রবেশ করতে পারবে, বের হতে পারবে।

এরই মধ্যে শহীদ মতিউর পার্ক, বাহাদুর শাহ পার্ক, নবাবগঞ্জ পার্ক, ইসলামবাগ পার্ক, তাঁতীবাজার পার্ক, হাজী আবদুল আলীম মাঠসহ পুরান ঢাকার ৩০টি মাঠ ও পার্কের দেয়াল উঠিয়ে দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে।

ঢাকায় পার্কের দেয়াল উঠিয়ে দেয়ার ডিজাইন শুরু করেছিলেন স্থপতি রফিক আজম। ঢাকেশ্বরী অঞ্চলের হাজী আবদুল আলীম খেলার মাঠের ডিজাইনের জন্য তিনি গত জুন মাসে পেয়েছেন ডিএনএ প্যারিস ডিজাইন অ্যাওয়ার্ড-২০২১।

বাংলাদেশের স্থপতিদের মধ্যে রফিকই সর্বাধিক আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। প্রাপ্ত অ্যাওয়ার্ডের মধ্যে ইউরেশিয়ান অ্যাওয়ার্ড-২০২০, আর্ক এশিয়া গোল্ড মেডেল-২০১৭, ওয়ার্ল্ড আর্কিটেকচার কমিউনিটি অ্যাওয়ার্ড-২০১২, দ্য সাউথ এশিয়ান আর্কিটেক্ট অফ দি ইয়ার-২০১২, ওয়ার্ল্ড আর্কিটেকচার কমিউনিটি অ্যাওয়ার্ড-২০০৮, দি কেনেথ এফ. ব্রাউন এশিয়া প্যাসিফিক কালচার অ্যান্ড ডিজাইন অ্যাওয়ার্ড-২০০৭, ইউএসএ অন্যতম।

স্থপতি রফিক আজমের কাজ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। ইতালীয় প্রকাশনা সংস্থা স্কিরা ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশ হয়েছে ‘রফিক আজম: আর্কিটেকচার ফর গ্রিন লিভিং’ শীর্ষক গ্রন্থ। ইউরোপে তাকে নিয়ে নির্মাণ হয়েছে চলচ্চিত্র।

স্থপতি রফিক আজমের কাজের মূল বৈশিষ্ট্য উন্মুক্ততা, সবুজসংলগ্নতা ও স্থানীয় জ্ঞানের প্রয়োগ। তিনি প্রতিটি বহুতল ভবনে রাখেন বাগান।

পাঁচ তলার ওপর সুইমিং পুল রাখেন না, রাখেন ‘সুইমিং পন্ড’। ভবনের তিন তলায় তিনি তৈরি করেন ‘বৃষ্টিঘর’, ‘গোস্বাঘর’। ভবনের ছাদে থাকে ধানক্ষেত।

তার ডিজাইন করা প্রতিটি ভবনের ভেতর ও বাইরে থাকে সবুজের উপস্থিতি। তার ডিজাইনের মূল লক্ষ্য প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস। অ্যাকাডেমিক মহলে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন ‘গ্রিন আর্কিটেক্ট’ হিসেবে।

‘আমার কাজ স্থাপত্য দিয়ে কবিতা নির্মাণ’
মেঘনা রেসিডেন্স গুলশান


সম্প্রতি নিউজবাংলার পক্ষ থেকে স্থপতি রফিক আজমের বারিধারার অফিসে তার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এ সময় তার কাজ ও দর্শন, গ্রিন আর্কিটেকচারের ধারণা, ভবন নির্মাণের উপকরণ, ঢাকার দেয়াল সংস্কৃতি, বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্প, রাজধানীর নগরায়ণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয়।

নিউজবাংলা: আপনার কাজকে ‘আর্কিটেকচার ফর গ্রিন লিভিং’, ‘গ্রিন আর্কিটেকচার’ ইত্যাদি বলা হয়ে থাকে। কেন বলা হয়ে থাকে, একটু ব্যাখ্যা করবেন?

রফিক আজম: গ্রিন আর্কিটেকচার শব্দ আকারে অনেক ছড়িয়ে গেছে। গ্রিন আর্কিটেকচার কথাটার আসল সৌন্দর্য হচ্ছে আপনার এবং প্রকৃতির মাঝে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রেখে বসবাস করা। আপনি সূর্যের আলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করবেন। বাতাসকে সঠিকভাবে ব্যবহার করবেন। পাখিকে বাঁচতে দেবেন, গাছকে বাঁচতে দেবেন। এর বেনিফিট আপনি পাবেন। অক্সিজেন তৈরি করবে, কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করবে। এভাবে সম্পূরক আমরা। মানুষ একা বাঁচতে পারে না। তাদের নিয়ে আপনি বাঁচবেন।

মেইনলি ব্যাপারটা হচ্ছে, কার্বন-ডাই-অক্সাইড বেশি তৈরি হলে তো বিপদ। গাছ তা গ্রহণ করে নিচ্ছে। কার্বন রিডিউস হচ্ছে। এটা করা হচ্ছে গ্রিন। আর আপনি এনার্জি কম খরচ করবেন। আপনি যে জ্বালানি খরচ করেন, এটা তৈরি করতে যে পরিমাণ ফুয়েল লাগে, সাপোর্ট লাগে, তাতে অনেক বেশি ট্যাক্সেশন করতে হয় পৃথিবীকে।

প্রকৃতির মধ্যে যে রকম জীবনযাপন, সে রকম করে বাঁচা। এয়ার কন্ডিশন ব্যবহার কমিয়ে দিতে হবে। এয়ার কন্ডিশন একটি বড় সমস্যা। একটা গ্লাসের বিল্ডিং বানালেন। এটা গ্রিন হাউস ইফেক্ট করে। সূর্যের আলো হচ্ছে ওয়ানওয়ে ট্রাফিক। সূর্যের আলো যখন গ্লাসে ঢোকে আর বের হতে পারে না। শর্ট ওয়েব ও লং ওয়েবের একটা খেলা।

ধরুন একটা গাড়ি রোদে দাঁড়া করে রাখবেন। কত গরম হয়ে যায়; আগুন হয়ে যায়। বিল্ডিংও তাই হয়। এই গ্লাসের বিল্ডিং ঠান্ডা রাখার জন্য আপনি সারাক্ষণ এসি চালান। এনার্জি কনজাম্পশন বেড়ে যায়। এ জন্য পৃথিবীকে ট্যাক্সেশন করতে হয়। আপনি মাটি থেকে টেনে ফুয়েল বের করেন। এতে কার্বনকে ওপেন করা হয়। এগুলো বন্ধ করতে বলা হচ্ছে। কম করতে বলা হচ্ছে।

এখন বন্ধের উপায় কী, সেটা জানতে হবে। এটা নলেজের খেলা। আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে আপনি সবসময় খাদ্য উৎপাদন করবেন। কার জন্য? নিজের জন্য, পাখির জন্য, কীটপতঙ্গের জন্য। আপনি একাই খাবেন? এ জন্য আপনি যে গাছ লাগাবেন, শুধু অক্সিজেন দেবে, তা নয়। সে ফুল দেবে। সে ফল দেবে। সে পাখিকে খাওয়াবে। আপনাকে ভিটামিন দেবে, আপনার বাচ্চাকে ভিটামিন দেবে। এইভাবে সম্পূরকভাবে বেঁচে থাকা। এটাকে বলে গ্রিন।

পানির ব্যবহার পৃথিবীর একটি বড় জিনিস। পৃথিবীতে পানি আছে দুই-তৃতীয়াংশ। এর মধ্যে মাত্র শতকরা এক ভাগ বিশুদ্ধ সুপেয় পানি। সৃষ্টিকর্তা এক ভাগ পানি মাটির নিচে পাঠান। এই পানিকে আমরা বের করে ব্যবহার করি। মাটির নিচ থেকে, বৃষ্টি থেকে যে সুপেয় পানি আসে, তা মোট পানির এক ভাগ। এই জন্য বলা হয়, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি লাগে, তবে পানির জন্যই লাগবে।

এই সমস্ত জিনিস নিয়ে যারা কাজ করেন, এই প্যাসিভ এনার্জি নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের গ্রিন বলা হয়ে থাকে। আমি যেহেতু প্যাসিভ এনার্জি নিয়ে কাজ করি, খুব চেষ্টা করি; সবসময় পেরে উঠি না। সেই জন্য কেউ কেউ আমার কাজ গ্রিন আর্কিটেকচার বলে থাকেন। এই হচ্ছে গ্রিন আর্কিটেকচারের মেইন ধারণা।

নিউজবাংলা: আপনার ডিজাইনে তিনটি বিষয় প্রাধান্য পায়। আলো, বাতাস ও পানি। বিষয় তিনটি..

রফিক আজম: সৃষ্টিকর্তা কিন্তু কোরআনে এক জায়গায় বলেছেন, তোমরা কি দেখো না, সূর্য আমি এক জায়গা থেকে তুলি না। সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে। এটা সাধারণ জ্ঞান। কিন্তু ক্রিটিক্যালি যদি দেখেন, গভীরভাবে যদি দেখেন, সূর্য কিন্তু মুভিং। গরমকালে-বর্ষাকালে সে উঠবে ঠিক পূর্ব-উত্তর দিক থেকে। উত্তর দিকে চলে যায়। উত্তর-পূর্ব থেকে উত্তর-পশ্চিমে গিয়ে অস্ত যায়। এই সূর্যটা সরতে সরতে মার্চ মাসে পুবে চলে আসে। মার্চ মাসে দিন-রাত সমান থাকে যেদিন, তখন সূর্য পুব দিকে টু দি পয়েন্টে উদিত হয়। শীতকাল এলে সে চলে যায় দক্ষিণে। উদিত হয় দক্ষিণ-পুবে। অস্ত যায় দক্ষিণ-পশ্চিমে। তখন কিন্তু একটা হেলানো সূর্য। অনেকখানি হেলে যায়। ৩৭ ডিগ্রি হেলে যায়। এ জন্য আমাদের গ্রামে একটা কথা প্রচলিত আছে:

‘দক্ষিণ দুয়ারি স্বর্গবাস

উত্তর দুয়ারি সর্বনাশ

পুবে হাঁস

পশ্চিমে বাঁশ।’

কথাটা প্রচলিত হয়ে আসছে। খনার বচন। জ্ঞানী লোকেরা দীর্ঘদিন ধরে চর্চা করে এটা দাঁড় করিয়েছেন। এটাই হচ্ছে আমাদের দেশের শক্তি। এটা আমাদের দেশে বসবাস করার সৌন্দর্য।

দক্ষিণ দুয়ারি স্বর্গবাস কেন? গরমকালে সূর্য দক্ষিণ দিকে থাকে না। থাকে মাথার ওপর। সকালে ও সন্ধ্যায় থাকে উত্তরে। কখনো হেলে যায় না দক্ষিণে। ফলে গরমকালে দক্ষিণে সূর্য আপনি পাচ্ছেন না। আবার গরমকালে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে, সমুদ্র থেকে হাওয়া আসে। আর বর্ষা যখন আসে, তখন বাতাস আসে দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে। এটা বৈশ্বিক বায়ু (গ্লোবাল উইন্ড)।

আগে যেটা বললাম, সেটা দেশজ বাতাস (লোকাল উইন্ড)। দুটো আসে দক্ষিণ দিক থেকে। দক্ষিণ খোলা রাখলে গরমকালে বাতাস পাবেন। যেই শীতকাল আসল, সূর্য চলে যাবে দক্ষিণে। সূর্যের হেলান দেয়া আলো দক্ষিণ দিকে চলে আসবে আপনার ঘরে। আর হাওয়া।

শীতকালে হাওয়া আসে উত্তর দিক থেকে। হিমালয়ের ঠান্ডা বাতাস। হাওয়া নাই, কিন্তু রোদ আছে। বাসা উষ্ণ। এটা সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেশন। এটা যদি অস্ট্রেলিয়ায় করেন, তাহলে আপনি মারা যাবেন। ওরা থাকে সাউথ হেমিস্ফিয়ারে। ওর নর্থই সৌন্দর্য। আমরা নর্থ হেমিস্ফিয়ারে। আর আমাদের সৌন্দর্য দক্ষিণ।

‘আমার কাজ স্থাপত্য দিয়ে কবিতা নির্মাণ’
স্থপতি রফিক আজম


এগুলো হচ্ছে লোকাল জ্ঞান। যে এলাকায় বাস করেন, সেই এলাকার জ্ঞান। স্থানীয় জ্ঞানের ভিত্তিতে বাড়ি নির্মিত হলে অনেক বেশি সৌন্দর্যমণ্ডিত হবে, প্রাকৃতিক পরিবেশে বাস করতে পারবেন। আপনি কোন গাছ লাগাচ্ছেন, তা জানতে হবে।

গাছ সম্পর্কে, প্রকৃতি সম্পর্কে, পানি সম্পর্কে জানতে হবে। আপনি যদি নিমগাছ লাগান, নিম এমন একটা গাছ, সবচেয়ে বেশি অক্সিজেন দেয়; সবচেয়ে লম্বা সময় অক্সিজেন দেয়। আগে বাড়ির দক্ষিণে নিমগাছ লাগাত বাঙালিরা। কিন্তু নিমগাছ কোথায় গেল? এখন রাস্তায় রাস্তায় মেহগনি গাছ লাগায়। কেন লাগায়? কারণ জ্ঞানের অভাব।

আপনি জ্ঞান দিয়ে দেখবেন, আপনার যা দরকার, প্রকৃতি সব আপনাকে দিচ্ছে। কিন্তু জ্ঞানের অভাবে আপনি ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে প্রকৃতি আপনার বিরুদ্ধে কাজ করছে। আপনি প্রকৃতিকে ব্যবহার করতে জানেন না।

কম্পিউটার আপনি ব্যবহার করতে জানেন না, কম্পিউটার নিয়ে কী করবেন? ইউজলেস। প্রকৃতি আমাদের সবকিছু দিচ্ছে। কিন্তু আমরা ব্যবহার করতে জানি না। এ কারণে আমরা খুব বিপদে আছি। এত কম যে মিষ্টি পানি, তার একটা সিংহভাগ আমরা পাই। সে জন্যই আমরা সবচেয়ে সম্পদশালী দেশগুলোর একটি। সবচেয়ে কম যে জিনিস ডায়মন্ড, সেটাকে বলা হয় দামি। ওটা আসলে কিছু না। তার চেয়ে অনেক দামি পানি– সুমিষ্ট পানি। সুমিষ্ট পানি থাকায় আমরা অনেক রিচ। আমাদের উর্বর মাটি আছে। এই উর্বর মাটির কারণে আমরা অনেক রিচ।

আমাদের দেশে আপনি এক শটা ফলের নাম সহজেই বলতে পারবেন। আমাদের সূর্যের আলো দেখেন। বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ২৫০ দিন সূর্যের আলো পান। সেটা দিয়ে সৌরবিদ্যুৎ তৈরি করা যায়।

এ দেশে সব আছে। ব্যবহার করাটাই কাজ। ব্যবহার করাটাই গ্রিন আর্কিটেকচার। আমি কেন ব্যবহার করব না? আমার সব কাজে পানির ছোঁয়া থাকে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমি ডেল্টার মানুষ। বদ্বীপের মানুষ। পানি হচ্ছে বাঙালির চিহ্ন। বাঙালি বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বন্যা, পানি ইত্যাদি চিত্র।

বন্যাকে আপনি নেগেটিভলি দেখবেন না। বন্যা না হলে আপনি মারা যেতেন অনেক আগেই। এই যে ধান উৎপাদন, শস্য উৎপাদন; বন্যার পানি চলে যাওয়ার পর হয়ে থাকে। পানি চলে যাওয়ার পর পুরো দেশটাই সবুজ। আবার পানি এলে দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ডুবে যায়। পানি আসা-যাওয়ার খেলা না থাকলে, পানি না এলে শস্য উৎপাদন করা সম্ভব? সুতরাং বন্যাকে যদি হার্ডলি ম্যানেজ করতে পারেন, তাহলে মানুষ মারাই যাবে না। এখনও বন্যায় মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা খুব কম আগের তুলনায়। কিন্তু কত লোক বাঁচে? সারা জাতি কিন্তু বাঁচে এটার ওপর।

নিউজবাংলা: আপনার কাজে ভবনের ম্যাটেরিয়ালের ক্ষেত্রেও কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। ইটের ব্যবহার হ্রাস, কংক্রিট ব্যবহারের আধিক্য, দেয়ালে প্লাস্টার বা রং না করা ইত্যাদি। পোড়া মাটির ব্যবহার একেবারেই করেন না।

রফিক আজম: পোড়া মাাটির একটা স্ট্রেংথ আছে। বাংলাদেশ একটা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। বেশ ঝুঁকিতে আছে অঞ্চলটি। ভূমিকম্পের সময় যখন চারদিক থেকে একসঙ্গে আক্রমণ হয়, এই ধাক্কাটা নেয়ার মতো ম্যাটেরিয়াল না থাকলে আপনি বাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখতে পারবেন না। একতলা ভবন হলে হয়তো বুদ্ধি করে করা যায়। কিন্তু আমাদের লোকসংখ্যা বেশি, জমি কম। ধানি জমিতে যদি বাড়ি বানিয়ে ফেলি, ধানি জমিগুলো যদি খেয়ে ফেলি, তাহলে খাব কী? সুতরাং যত কম জমি ব্যবহার করা যায়।

জমিতে উঁচা বিল্ডিং বানাই। ১০ তলা, ১৫ তলা, ২০ তলা ভবন। এই বাড়ি কি দাঁড়িয়ে থাকবে? থাকবে না। এর স্ট্রেংথ থাকতে হবে। তাই কংক্রিটের বাড়ি যদি হয়, তাহলে স্ট্রেংথ থাকবে। কংক্রিট খুব গ্রিন ম্যাটেরিয়াল না। আবার খুব বাজে জিনিসও না।

আপনাকে একটা চয়েস নিতে হবে। আমরা একটা মাঝামাঝি জায়গায় থাকি। বিল্ডিং ঘরে গ্রিন দিতে পারি, ছাদে গ্রিন দিতে পারি। প্লাস-মাইনাস করে একটা জায়গায় আসতে পারি। আমি বেঁচেও থাকব, গ্রিনও থাকবে। ব্যালেন্সটাই জীবনে আসল। আমি কংক্রিট ব্যবহার করি। অ্যাকচুয়ালি বাংলাদেশে কংক্রিট জনপ্রিয় হয়েছে আমার হাতেই।

নিউজবাংলা: আপনি কি ইটের ব্যবহার একবারেই করেন না?

রফিক আজম: করি, কম। ইটের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছি। কারণ ইট মাটি পুড়িয়ে, ধানি জমি পুড়িয়ে, কার্বন পুড়িয়ে তৈরি করা হয়। ইট তৈরির ফলে আমরা মাটি হারাতে থাকি। এতে সমস্যা হচ্ছে। ওয়েস্টে ম্যাটেরিয়াল দিয়ে রিসাইকেল করে যদি আমরা কংক্রিটের ব্লক তৈরি করি, তাহলে কিন্তু মাটি হারাতে হবে না। কিন্তু কাজ তো হয়। তাহলে কেন আমরা মাটি পুড়িয়ে, কার্বন পুড়িয়ে ইট তৈরি করব? অনেক প্রসেসের পরও গ্রিন থাকছে না।

নিউজবাংলা: আপনি কি ইটের ব্যবহার পুনর্বিবেচনা করতে বলছেন?

‘আমার কাজ স্থাপত্য দিয়ে কবিতা নির্মাণ’
চট্টগ্রামে স্থপতি রফিক আজমের করা একটি আবাসিক ভবন


রফিক আজম:
হুম। কারণ এতে পোড়াতে হয়। মাটি নিতে হয়। আমরা কত মাটি নেব? পুরো দেশ উজাড় করে দেবো নাকি? পুরোনো বিল্ডিংয়ের ইট, রড, সিমেন্ট, খোয়া ইত্যাদি ভেঙেচুরে রিসাইকেল করা যাচ্ছে। কংক্রিটের ব্লক তৈরি করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। মাটি নষ্ট না করি, জমি নষ্ট না করি। ওদিকে আমরা যাচ্ছি। কংক্রিটের ব্লক আমরা ব্যবহার করছি। পুরোনা বিল্ডিং, বালি, সিমেন্ট মিশিয়ে আমরা বানিয়ে নিচ্ছি। এর জন্য মাটি পোড়ানোর দরকার হচ্ছে না।

আমরা আস্তে আস্তে ফেইজ আউট করছি। আস্তে আস্তে আমরা ইট থেকে সরছি। এখনও যে ব্রিক ব্যবহার করি না, তা নয়। তবে কম করি। আমরা যদি ব্রিকের ব্যবহার কমিয়ে দিই, তাহলে একটা সময় দেখবেন মাটি কেটে আর ইট পোড়াতে হচ্ছে না। বিশেষ কারণে লাগতে পারে, লাগুক। কিন্তু এটাই যদি পূর্ণাঙ্গ হয়, তাহলে সব মাটি একদিন আপনারা খেয়ে ফেলবেন। এটা কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, ‘প্লিজ, আপনারা মাটি পুড়িয়ে ব্রিক তৈরি বন্ধ করেন।’ সরকারি কাজে ইতিমধ্যেই নির্দেশনা এসেছে। প্রাইভেট কাজে হচ্ছে কিছু। সরকারি কাজে বন্ধ হয়ে গেছে।

নিউজবাংলা: কংক্রিট ব্লক কীভাবে তৈরি করেন?

রফিক আজম: ওয়েস্ট (পরিত্যক্ত) কংক্রিট। ভাঙা বিল্ডিং। ব্রিজ বানাতে গিয়ে অনেক ব্লক বানায়। এগুলো কোথায় নিয়ে যাবে? এগুলো স্ম্যাশ করে আবার কংক্রিটের ছোট ছোট ব্লক বানানো হয়, যা বাড়িঘরে লাগানো হয়। এভাবে রিসাইকেল করা গ্রিন আর্কিটেচারের অংশ। আমরা পুনর্ব্যবহার করি।

গার্বেজ সমস্যা নয়; বরং সম্পদ। কমিউনিটির সম্পদ। এই গার্বেজ দিয়ে সার বানানো হচ্ছে, ইলেকট্রিসিটি বানানো হচ্ছে। যশোরে এটা করছে। ইতিমধ্যে ওরা প্ল্যান্ট বানিয়েছে। ওরা এখন গার্বেজ পাচ্ছে না। অন্য শহর থেকে গার্বেজ আনতে চাচ্ছে; গার্বেজ তো সোনার খনি। গার্বেজ সব শেষ হয়ে যাবে। সার বানিয়ে ফেলবে; গ্যাস বানিয়ে ফেলবে। সিলিন্ডারে ভরে গ্যাস বিক্রি করবে।

গার্বেজ কি এখন আর শহর নষ্ট করবে? এইসব চিন্তাভাবনা হচ্ছে গ্রিন। রিসাইকেল করা, রিইউজ করা আর রিডিউস করা; কম ব্যবহার করা। প্রয়োজন না হলে ব্যবহার না করা। জীবনটাকে এমন বোহেমিয়ান ধরনের করবেন না, ‘যা খুশি করব।’ এটা বন্ধ করেন। গ্রিন অ্যাকটিভিস্টরা এটাকে ‘থ্রি আর’ বলে। রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল।

নিউজবাংলা: আপনার কাজ অ্যাকাডেমিক মহলে প্রশংসিত। আবার ভোক্তাদের কাছেও আপনার কাজের চাহিদা বেশ। দুটোর...

রফিক আজম: হিসাব করলে হয়তো দেখা যাবে, ৫০-৬০টি অ্যাওয়ার্ড আমি পেয়েছি। যখন ইয়াং ছিলাম, তখন খুব ভালো লাগত এসব। অ্যাওয়ার্ডের জন্য জমা দিলাম। এটা পেলাম, ওটা পেলাম। বিদেশে লেকচার দিতে গেলাম, পড়াতে গেলাম। অনেক দেশে পড়িয়েছি। আমাকে নিয়ে পড়ানো হচ্ছে, বই বের হচ্ছে, আমাকে নিয়ে ইতালিতে ফিল্ম হয়েছে। এগুলো একসময় এক্সাইটমেন্ট ছিল আমার। এখন কিন্তু মানুষ যে আমার কাজ পছন্দ করে, তারা যায়, কথা বলে, তাদের জীবন বদলাচ্ছে, পরিবেশ সুন্দর হচ্ছে, তাদের বাচ্চারা মানুষ হচ্ছে। এটাই আমার পুরস্কার।

আমি অনেক বড়লোকের বাড়ি করেছি। এখনও করি। করতে আপত্তি নেই। বড়লোকের বাড়ি করতে পেরেছি বলেই অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছি। অন্যরা তো পয়সা দিত না। আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে তারা। এ কথাও আমি শুনেছি, ‘উনি তো বড়লোকের আর্কিটেক্ট। উনি তো অনেক টাকা নেন।’ কথাটা মিথ্যা না। তো আমার মনে মনে স্বপ্ন ছিল, আমি মানুষের আর্কিটেক্ট হব; বড়লোকের বা ধনী লোকের আর্কিটেক্ট না।

আমি সাধারণ মানুষের আর্কিটেক্ট হব। সেই কারণে হয়তো সৃষ্টিকর্তা আমার কথা শুনেছেন। আমি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাজ করছি। সরকারি কিছু কাজ করছি, যেগুলো সাধারণ মানুষ ব্যবহার করবে।

যখন বড়লোকদের কাজ করেছি, তখন বাউন্ডারি ওয়ালটা ফেলে দিয়েছি। বড়লোকের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে বাউন্ডারি ওয়াল নাই। আমার অনেক বাড়ি আছে এমন। এখন অনেকেই এমন ডিজাইন করছে। আপনি যদি গুলশান এলাকায় হাঁটেন, বাড়ির সামনের দেয়ালটা গ্লাস দিয়ে তৈরি। আপনি গুলশান-বারিধারা এলাকায় হাঁটেন, তবে এ ধরনের গ্লাস দেয়া অনেক বাড়ি অ্যাপার্টমেন্ট দেখতে পাবেন। বারিধারায় আমার বাড়িতেও গ্লাসের বাউন্ডারি ওয়াল। ২০০৯ সালে যখন গ্লাসের বাউন্ডারি দেয়ালের প্রথম কাজের উদ্বোধন করি, তখন আমি নিজেও ভয়ে ছিলাম।

‘আমার কাজ স্থাপত্য দিয়ে কবিতা নির্মাণ’
মেঘনা রেসিডেন্স গুলশান


কেন বাউন্ডারি ওয়াল ফেলে দিয়েছি? আমার মনে হয়েছে বড়লোকের বাড়ি এবং রাস্তা একে অপরের শত্রু। যখন রাস্তা দিয়ে কেউ হেঁটে যায়, তখন রাস্তার পাশে যে উঁচু দেয়াল থাকে, এর ওপর থাকে কাঁটাতারের বেড়া। লেখা থাকে কুকুর হইতে সাবধান। একটা গার্ডরুমে গার্ড বসে আছে। এটা কিসের চিহ্ন? ও বলতে চায় সাধারণ মানুষকে, ‘তুমি তো চোর। তোমার তো বিশ্বাস নাই। আমার কুকুর কামড়ে দেবে। আর যদি টপকাতে চাও, তাহলে এই তারকাঁটা দিয়ে রেখেছি, তুমি রক্তাক্ত হয়ে যাবে।’

এটার মানে কী? একটা বিরাট দেয়াল দিয়ে বাড়ি আটকে রেখেছে। তারকাঁটা আছে। গার্ড লাঠি হাতে বসে থাকে। আপনাকে পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে দেবে। এগুলো কিসের চিহ্ন? এগুলো সমাজের মধ্যে বিভেদের চিহ্ন। রাস্তায় যারা যায়, তারাও গালি দিয়ে থাকে। ও ব্যাটা টাকা-পয়সা মাইরা-মুইরা বাড়ি বানাইছে। এই হচ্ছে আমাদের মনে মনে কথোপকথন।

আমি ভেবেছি, এটা ভাঙতে হবে। আমি বাসার সামনে থেকে এমন ডিজাইন করেছি, ও কিন্তু ঢুকতে পারবে না বাসায়, কিন্তু বাসার সামনের অংশ, গাছগাছালি, বসার জায়গা, পানির ফোয়ারা দেখা যাচ্ছে। ওর কাছে মনে হবে: ‘বাহ! কী সুন্দর! লোকটার রুচি আছে। গ্লাসের দেয়াল দিয়েছে। ভেঙে যাবে না? লোকের সাহস আছে।’

কথাবার্তা কিন্তু চেইঞ্জ। সে কিন্তু আর গালি দিচ্ছে না। আগে ধানমন্ডিতে ছোট ছোট দেয়াল ছিল। তার মানে আপনাকে বলত, ‘দেখো, সমস্যা নেই। এটা আমার টেরিটোরি, প্রবেশ করো না।’ কত ভদ্রভাবে বলত। ‘তুমি দেখো, কিন্তু ঢুকো না।’ এটা বাড়তে বাড়তে এখন এমন হয়েছে, স্বাধীনতার পর ‘এ ব্যাটা তো চোর’, ‘ও ব্যাটা তো ডাকাত’ বলা শুরু হয়।

এই ভঙ্গুর সমাজ আমাকে খুব ব্যথা দিত। আমি কিন্তু পেরেছি, জানেন? পেরেছি। এখন ঢাকায় অসংখ্য বাড়িঘর দেখবেন, সামনে গাছগাছালি, সামনে তেমন কোনো দেয়াল থাকে না। ফাইনালি আমি ঢাকার পার্কগুলো থেকে দেয়াল ফেলে দিয়ে বলেছি, ওটা জনগণের। আমার ডেভেলপমেন্ট কিন্তু একদিনে হয়নি। গত ২৫-৩০ বছর ধরে স্ট্রাগল করছি। পরীক্ষামূলকভাবে দেখে বুঝেছি, এটা পসিবল। এটা আমার একটা কনট্রিবিউশন। সারা দুনিয়া এটা জানে।

নিউজবাংলা: গ্লাসের বাউন্ডারি দেয়াল প্রচলন করার সূচনাপর্বটি...

রফিক আজম: গ্লাসের দেয়াল উদ্বোধন করি ২০০৯ সালে, কিন্তু চিন্তাটা এসেছিল ২০০৫ সালে। ডিজাইন করা, পারব কি না, এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে করতে ২০০৯ সালে প্রথম একটি বাড়ির ডিজাইন করি আমেরিকান অ্যাম্বাসির পাশে। এ জন্য আমি সাহস পেয়েছিলাম। একটা গ্লাস যদি কেউ ভেঙে ফেলে তাহলে আইডিয়া কিন্তু বাতিল। সবাই বলল, ‘পাগল নাকি আপনি?’

খান জয়নুলের কাচের দেয়াল নামে একটা মুভি ছিল। ছোটবেলায় ওই মুভি দেখার পর মজা পেয়েছিলাম। কাচের আবার দেয়াল হয়? পাগল নাকি! একটা কাব্যিক ব্যাপার। কিন্তু আমার মনে গেঁথে ছিল। মিলে গেল। আমি কাচের দেয়াল করলাম। কিন্তু ভয়ে থাকি। প্রতিদিন ইঞ্জিনিয়ারকে ফোন করে খবর নিতাম, ঠিক আছে নাকি কেউ ভেঙে ফেলেছে? আমি ওখানে করেছিলাম। কারণ ওখানে অনেক গার্ড থাকে। আমি যদি প্রথম ভুল জায়গায় করতাম, কেউ যদি একটা গ্লাস ভেঙে ফেলত, তাহলে তো সবাই এসে বলবে, ‘জীবনে ও রকম আর করবেন না। খবরদার। দেখা হইছে, বাঙালিরা এটা মানবে না। বাঙালিদের তুমি চিনো?’

ওটা সাসটেইন করেছে, ওখানে পাহারা ছিল। লোকজন তখন বিশ্বাস করা শুরু করে, পসিবল। দ্বিতীয়বার করলাম গুলশান ক্লাবের পাশে। ততদিনে মানুষ একটু একটু করে বুঝে ফেলেছে, আরে! এটা তো থাকে। আমার দেখাদেখি অন্যরাও শুরু করল।

আপনি আজকে হাঁটলেও দেখতে পাবেন, এমন অনেক বাড়ি। সামনে কাচের দেয়াল অথবা দেয়াল নাই। বিষয়টি খুবই ইন্টারেস্টিং। কখনো কখনো গাছ দিয়ে রিপ্লেস করেছি; গাছগাছালির সংখ্যা বাড়িয়েছি। গাছের সংখ্যা তো আমাদের কম। গাছের সংখ্যা তো বাড়াতে হবে।

আমার আরেকটি কাজ কংক্রিটের ব্লকের বাড়ি নির্মাণ জনপ্রিয় করা। তবে এটা আমার আবিষ্কার নয়। আগেও অল্প কয়েকটি ছিল। সেনাকল্যাণ ভবনসহ কয়েকটি অফিস ভবন। আগে সবার ধারণা ছিল, এটা দামি জিনিস; বাণিজ্যিকভাবে নির্মাণ করা যাবে না, কিন্তু আমি প্রমাণ করেছি, এটা দামি নয়। করে করে দেখিয়েছি, এটা করা যায়। এখন ডেভেলপাররাও করে থাকে।

আগে ডেভেলপাররা বলত, ‘পাগল হইছো? লস করব নাকি?’ তখন অঙ্ক করে দেখালাম, এটা কস্টলি হবে না। অঙ্ক করে দেখানোর পর বলে, ‘তাই নাকি? দেখি তো করি।’ আর এখন বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আপনি যদি কোনো ডেভেলপারের কাছে কংক্রিটের ব্লক ছাড়া বাড়ির ডিজাইন জমা দেন, তাহলে বলবে, ‘ভাগেন। এসব দিয়ে চলবে না।’ ঢাকায় এখন ৯০ ভাগ বাড়ি কংক্রিট দিয়ে হয়। গাছের বাউন্ডারি দেয়াল, প্রচুর গাছগাছালি, বাড়ির সামনে পুকুর ইত্যাদি।

নিউজ বাংলা: কংক্রিট তাহলে আগামী দিনে হতে যাচ্ছে প্রধান উপকরণে?

রফিক আজম: উপায় নাই। উপায় নাই। বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। দামে কম। কিন্তু হেভি পোক্ত। ছোটখাটো ভূমিকম্পে কিছুতেই পড়বে না। এই একটা ম্যাটারিয়েল দামে কম। বিদেশে তৈরি অন্য ম্যাটারিয়েল অনেক দামি।

নিউজবাংলা: কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারের শুরুর কাহিনিটা...

রফিক আজম: আমার ডিজাইন করার পর খুব জনপ্রিয় হয় বিষয়টি। এরপর সবাই ফলো করতে থাকে। বাংলাদেশের যত ইয়াং আর্কিটেক্ট, আমার নাম বললেই বুঝবেন, তারা আমাকে কীভাবে দেখে।

নিউজ বাংলা: আপনি প্রথম কোথায় কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার করেছিলেন?

রফিক আজম: খাজে দেওয়ান বলে পুরান ঢাকায় একটি জায়গা আছে। সেখানে ছোট্ট একটি বাড়িতে।

নিউজবাংলা: আপনার খাজে দেওয়ান লেনের বাড়ির ডিজাইন তো বিশ্বব্যাপী আলোচিত।

রফিক আজম: ১৯৯৯ সালে ডিজাইন করেছিলাম। এটা এখন এমআইটি, হার্ভার্ডে পড়ানো হয়। খাজে দেওয়ানের বাড়িতে চার কাঠা জমির ওপর পাঁচ তলা একটি বিল্ডিং। ১৪টি পরিবার এতে বসবাস করে। ছোট্ট ছোট বাড়ি। বাড়িগুলোর আয়তন ৪০০ স্কয়ার ফুট থেকে সাড়ে ৬০০ স্কয়ার ফুট। ওটা কংক্রিট দিয়ে বানানো। এক্সপোসড কংক্রিট। আর কিছু ব্রিক।

কিছু ব্রিক দেয়া হয়েছে খরচ কমানোর জন্য। এ রকম বাড়ি বাংলাদেশে আগে আর হয়নি। কোনো প্লাস্টার নাই, রং নাই। বাড়ির ফ্রেম হচ্ছে কংক্রিট। কম খরচে স্ট্রং বাড়ি। বাড়ির ফ্রেম হবে কংক্রিটে। আর গ্যাপগুলো পূরণ করবে জানালা, ইট ইত্যাদি। দেয়ালে প্লাস্টার নাই, রং নাই। প্লাস্টার, রং উঠিয়ে দিয়ে প্রথম ডিজাইন করি খাজে দেওয়ান মহল্লায়। এটা একটা সিস্টেম। অর্গানাইজড সিস্টেম। আমার আগে কেউ করেনি; এখন সবাই করছে।

‘আমার কাজ স্থাপত্য দিয়ে কবিতা নির্মাণ’
স্থপতি রফিক আজমের কাজের মূল বৈশিষ্ট্য প্রকৃতি ও স্থাপত্যের মেলবন্ধন


পুরান ঢাকার মানুষ তো গরিব। চিকন একটা গলির ভেতরে বাড়ি। এই যে কংক্রিটের বিম, যেটা বিল্ডিং ধরে রাখছে, তারপর কলাম আছে। তারপর ছাদ। কোনো রং নাই, প্লাস্টার নাই, ঢাকাঢাকি নাই। কংক্রিট ওপেন, ব্রিক ওপেন। এই ১৪টি বাড়িতে সবার একটি করে বাগান আছে। সেটা সাড়ে ৪০০ স্কয়ার ফুটের বাড়ি হোক, আর হোক সাড়ে ৬০০ স্কয়ার ফুটের। সততার সঙ্গে বাড়ির ভেতরে যা, বাইরেও তা। কোনো কিছু প্লাস্টার করে ঢাকি নাই। টাইলস লাগাই নাই। কোনো কিছু হাইড করি নাই। কম খরচে। এই আইডিয়াটা আমি অস্ট্রেলিয়ায়ও করেছি।

নিউজবাংলা: বহুতল ভবনের প্রতিটি বাড়িতে একটি করে বাগান থাকার আইডিয়া?

রফিক আজম: হ্যাঁ। প্রতি বাড়িতে বাগান থাকবে। এই আইডিয়াটাও আমাদের দেশে নতুন। উঁচা বিল্ডিং বানাও। আমাকে দশ তলায় পাঠাতে চান, ঠিক আছে, রাজি আছি। কিন্তু আমাকে একা পাঠাবেন না। তাহলে আমি, আমার পরিবার, বাচ্চারা মারা যাব। ওখানে একা গেলে আমার মাটি কোথায়? গাছ কোথায়? পানি কোথায়? আকাশ কোথায়? আমাকে ১০০ তলায় পাঠিয়ে দেন, আমি যাব। কিন্তু আমি মাটি চাই, গাছ চাই, ফুল চাই, ফল চাই, পাখি চাই। সব দিতে হবে। এটা একটা ফিলোসফি।

হ্যাঁ, উঁচা বিল্ডিং বানাবেন। কিন্তু মাটি দিতে হবে, পানি দিতে হবে, গাছ দিতে হবে, বাগান দিতে হবে। এটা একটা নতুন আইডিয়া। বাংলাদেশে তো অবশ্যই। আমি যখন শুরু করছিলাম, তখন পৃথিবীতেই নতুন ধরনের এই বিষয়টা তৈরি হচ্ছিল।

ধানমন্ডি মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সের বিপরীত দিকে তিন তলার ওপর একটা বাড়ি করেছি। নাম ‘বৃষ্টিঘর’। বৃষ্টি হলে এখানে পানি জমে। এটাই সৌন্দর্য।

লিভিংরুম থেকে বের হয়ে এখানে পানিতে পা ডুবিয়ে বসার ব্যবস্থা রয়েছে। আমেরিকায় লিভিংরুমে বসে বসে টিভি দেখে। আমাদের দেশে তা হবে কেন? আমাদের দেশে লিভিংরুমে বসে পানিতে পা ডুবিয়ে গল্প করবে। এই যে দেখেন, লিভিংরুম থেকে বের হলেই বৃষ্টিঘর।

তখন পৃথিবীও এ রকমভাবে চিন্তা করছে না। খুব অল্প কিছু মানুষ বিষয়টি নিয়ে তখন ভাবছিল। এ জন্য পৃথিবীতে আমাকে এত অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়েছে।

এক ক্লায়েন্ট বললেন, পাঁচ তলার ওপর সুইমিংপুল বানাতে। আমি বললাম, বাঙালির কিসের সুইমিং পুল? বাঙালির সুইমিং পুল দরকার নাই। আমাদের দরকার পন্ড। সুইমিং পন্ড। পুকুরে নেমে বাঙালিরা গোসল করে। আমি পাঁচ তলার ওপর পন্ড বানাব। আমাকে তখন জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘পন্ড মানে কী? সুইমিং পন্ড ও সুইমিংপুলের মধ্যে পার্থক্য কী?’

বললাম, পুকুরে নামার জন্য ঘাট থাকে। পুকুরপাড়ে জংলা থাকে। গুলশানের বাড়িটিতে ঘাটলা, জংলা নিয়ে পাঁচ তলায় পুকুর হলো। এখানে সুইমিং পুলের মতো মেশিনে পানি ট্রিটমেন্ট হয়। কিন্তু চেহারাটা দেখেন, আমাদের দেশের পুকুরের মতো। ঘাট আছে, জংলা আছে। পুকুরের পানিতে ভাসছে নৌকা। নীল রঙের সুইমিং পুলের ধারণাটি ইউরোপীয়। আমি বাঙালি। সুইমিংপুল বানাব না। আমি সুইমিং পন্ড বানাব।

এটা হচ্ছে গোস্বা নিবারণী ঘর। আমাদের দেশে আগে ছিল। পুকুরের পাড়ে একটি ঘর থাকত। রাগ হলে সেখানে গিয়ে বসে থাকত। স্বামী বা স্ত্রী তখন গিয়ে অনুনয় করত, ‘খেয়ে যাও। রাগ কোরো না।’ অ্যাংগারটা বের করে দিতে এটা ছিল সামাজিক উদ্যোগ। সেই সামাজিক উদ্যোগ কই গেল? এখন চড়থাপ্পড় মেরে দেয়, বিচ্ছেদ হচ্ছে। এমনকি খুনোখুনির ঘটনাও ঘটছে। এর কারণ হচ্ছে অ্যাংগার বের করে দেয়ার জায়গা নেই। তাই বাড়িগুলোতে আমি গোস্বা ঘর বা গোস্বা নিবারণ ঘর রাখা শুরু করি।

আমি এসব পাগলামি চিন্তা করি, করতে থাকি। অনেকেই আবার পছন্দ করেন। অ্যাংগার রিডাকশন রুম মানে এখানে বিউটিফুল মিউজিক বাজতে পারে, বিউটিফুল ভিউ পাচ্ছেন, পাশে কাঠ গোলাপের গাছ, প্রিয় আরও গাছ। পাখি বসে আছে। ফুলের সুগন্ধ আসছে। কিছুক্ষণ বসলেন, অবশ্যই আস্তে আস্তে আপনি আরও ভালো মানুষ হয়ে উঠবেন।

এই ইনগ্রেডিয়েন্ট না থাকলে বাসা হলো? বাসায় ফিরে কি শুধু ঘুমাবেন আর চলে যাবেন? সারা দিন খেটে যখন আপনি বাসায় ফেরেন, তখন জিব বের হয়ে যায়। বাসা কি শুধু ঘুমানোর স্থান? বাসায় এসে শুয়ে পড়লেন। সকালে উঠে দেখলেন, গাছ দেখা যাচ্ছে; পাখি কিচিরমিচির করছে। এ পরিবেশে নাশতা করলেন। আপনি আবার শক্তি নিয়ে সারা দিনের যুদ্ধ করতে যাত্রা শুরু করলেন। বাসা যদি আপনাকে আরও টায়ার্ড করে দেয়, তাহলে সকালে আপনি অর্ধেক টায়ার্ড হয়ে থাকবেন। সারা দিন কাজ করবেন কীভাবে? আপনাকে রিভাইটালাইজ করা, রিঅ্যানার্জাইজ করা বাসার কাজ। সেটা হতে পারে বড়লোকের বাসা, হতে পারে খাজে দেওয়ান লেনের ৪০০ স্কয়ার ফুটের বাসা। আমার আইডিয়ার কোনো পার্থক্য নেই।

ধানমন্ডির বাসাটা ৩০ হাজার স্কয়ার ফুটের। আর খাজে দেওয়ান লেনের ৪০০ স্কয়ার ফুটের বাসা। দুজনই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমি ক্লাসলেস। আমার কাছে কোনো ক্লাস নেই। যিনি আসছেন, তিনি বড়লোক হোন, আর গরিব লোক হোন, তার বাসাটি হবে পূর্ণাঙ্গ।

একটি বাড়ির নাম দিয়েছিলাম ‘স্মল ইয়েট অ্যাবানডেন্ট’। ছোট্ট কিন্তু অসীম। ছোট্ট কখনো অসীম হয়? কিন্তু আমি ‘ছোট্ট অসীম’ নাম দিয়েছি। আমরা শুনে থাকি, ‘ভাই, আমার একটি ছোট্ট আশা আছে। ছোট একটি বাসা থাকবে। ছোট্ট একটি বারান্দা থাকবে, ছোট্ট একটু উঠান থাকবে। একটু গাছ লাগাব। আমার রুমের পাশে পড়ার একটু জায়গা থাকবে। ছোট্ট একটি বাগান থাকবে।’

বলতে বলতে কিন্তু দেখবেন, তার আশা বিরাট। ছোট্ট বাসা মানে কি ছোট্ট আশা? বাসা ছোট্ট হলেও তার আশা কিন্তু অনেক বড়। ছোট বাসা কিন্তু বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে দেখে। সে এটা এনজয় করে। গাছ দেখে, বাগান দেখে। নিজের বাগান, এমনকি অন্যের বাগান। দূরের মাঠও দেখে। আকাশের তারা। কাজ করার সময় আর্কিটেক্টকে সব বিষয় খেয়াল রাখতে হবে।

আচ্ছা, উনার বাসা ছোট। ওখানে দূরে একটি মাঠ দেখা যাচ্ছে। ওদিকে একটি গাছ দেখা যাচ্ছে। আচ্ছা, তাহলে এদিকে একটি জানালা দেই। ও, ছোট্ট বাসা থেকে ওটা দেখে বলছে, ‘ওয়াও!’ পৃথিবীকে যদি কানেক্ট করতে পারেন, প্রকৃতিকে যদি কানেক্ট করতে পারেন, তাহলে আশাটা অনেক বড় হয়ে যায়। লালন বলেছেন, যা দেহে নাই, তা দেহের বাইরেও নাই। তার মানে পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আপনার দেহে আছে।

নিউজবাংলা: ‘যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে দেহভাণ্ডে।’

রফিক আজম: কী করে সম্ভব? আপনার এতটুকু দেহ, এর মধ্যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আসে কী করে? তার মানে স্কেল ভুল করা যাবে না। ছোট একটি বাসা, তার মানে এই নয়, এর মধ্যে কিছু নাই। আমি লালনকে নিয়ে কাজ করেছি। ওই কাজটি ইউরোপ-আমেরিকায় বহুল প্রশংসিত হয়েছে। গুলশানের একটি বাড়ি, বড়লোকের একটি বাড়ি। লালনের ভাষায় করা এটি। নাম ‘আনফোল্ডিং নাথিংনেস’।

আপনি তখন উন্মুক্ত করতে থাকবেন সবকিছু, তখন আপনি শূন্যতাকে উন্মুক্ত করবেন। শূন্যতাই উন্মুক্ততা।

লালনের মতে, দেহে দুটি পার্ট আছে। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।’ তার মানে উনি দেহকে একটি খাঁচা বলে বিবেচনা করছেন।

‘বাড়ির কাছে আরশিনগর।’ এগুলো কী? খাঁচা হচ্ছে বডি। আর চিন্তাগুলো হচ্ছে অচিন পাখি। ‘ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম তার পায়।’ অর্থাৎ তাকে ধরতে পারা যায় না। চিন্তা আসে আর যায়। আপনার দেহের মধ্যে আসে, আর যায়। আর আসা-যাওয়ার খেলাই জীবন।

যেদিন পাখি গেল, আর এলো না, সেদিন আপনি ডেড। আপনি শেষ। আমি ভাবলাম, আচ্ছা আমি যদি একটি বাড়ি বানাই খাঁচার মতো। খাঁচা বানালাম। খাঁচার মধ্যে কী আসবে-যাবে? রোদ আসবে, চলে যাবে। বৃষ্টি আসবে, চলে যাবে। বাতাস আসবে, চলে যাবে। ফুলের সুগন্ধ আসবে-চলে যাবে। আমি কী করতে পারি?

আমি লালন যেভাবে বলেছেন, বাতচিত করা। আপনি বাতচিত করবেন, নেগোশিয়েট করবেন। ধারণ করবেন। পাত্র হিসাবে ধারণ করবেন ভালো ভালো জিনিসগুলো। তখন আপনি আদমি হবেন। মানুষ হবেন।

আপনি যদি প্রকৃতির ভালো ভালো জিনিসগুলো গ্রহণ করেন, সূর্যের আলো, বাতাস, সুগন্ধকে ধারণ করতে পারেন, তাহলে কী হবে? আদমি হবে, আর্কিটেকচার হবে। এই জন্যই দেখেন, বাড়ির মাঝখানে খোলা উঠান, ওই যে পুকুর। পুকুরে নৌকা। ওই যে দেখেন তিন তলায় ধানক্ষেত। সূর্যের আলো আসবে, আবার চলে যাবে। পূর্ব দিকে কামিনীগাছ; পূর্বের বাতাস সুগন্ধসহ বাসায় ঢোকে। ওই যে দেখেন পুকুরপাড়ে হিজলগাছ। চিচিঙ্গা ঝুলছে। জায়গাটা একটা জঙ্গলের মতো।

ওই জায়গাটি পাখিদের জন্য। পানি পার হয়ে যেতে হয়। পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য তৈরি করা হয়েছে। কিছু প্রজাপতি আসা-যাওয়া করে। কিছু পাখি বাসা বেঁধেছে। এই যে বাতচিত করা প্রকৃতির সঙ্গে, রোদের সঙ্গে, বাতাসের সঙ্গে, পানির সঙ্গে, বৃষ্টির সঙ্গে, ফুলের সুগন্ধের সঙ্গে। এটাই জীবন। এটাই গ্রিন আর্কিটেকচার। এটাই লালনের দর্শন।

‘আমার কাজ স্থাপত্য দিয়ে কবিতা নির্মাণ’
সাউথ ওয়াটার ক্যারেস, বারিধারা

বিদেশে দার্শনিকদের নিয়ে কাজ হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের দার্শনিকদের নিয়ে কাজ হয়নি। যখন বিদেশে বক্তৃতা দিতে যেতাম, খুব রাগ হতো আমার। তখন বলতাম, আমিও আমাদের দেশের দার্শনিককে নিয়ে কাজ করব। আমি একবার লেকচারে বলেছিলাম, রুমির কবিতার প্রসঙ্গ।

রুমি বলেছিলেন, ‘আলো সন্ধ্যায় যখন গন্তব্যে চলে যায়, সে কিন্তু তার কাছ থেকে কিছুই নিয়ে যায় না, যাকে সে আলোকিত করেছিল।’ না, আমি মনে করি, রুমি ভুল বলেছিলেন। সন্ধ্যায় যখন সে এই বাসা ছুঁয়ে চলে যায়, তখন সে বলে, ‘আমি একটি সুন্দর জায়গা ছুঁয়ে এসেছি। আমার আনন্দ।’ এ কথা বলতে সাহস লাগে। আমি কাজের গভীরে প্রবেশ করে আনন্দ নিতে থাকি। মানুষকে আনন্দ দিতে থাকি।

নিউজবাংলা: বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পের সাম্প্রতিক অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলুন।

রফিক আজম: অনেক ভালো। আগের তুলনায় খুব ভালো। আমরা যখন শুরু করেছি, তখন আর্কিটেক্টদের তেমন চিনত না। আমরা কাজ পেতাম না। কাজ দিলে টাকা দিত না। একটুখানি টাকা দিতে যেন দয়া করত। ওই জায়গা থেকে আমরা ভয় পেতাম। আমরা পড়াশোনা করলাম কোন দুঃখে? এর চেয়ে ডাক্তার হতাম, ল’ইয়ার হতাম বা অন্য পেশায় যেতাম। তখন খুব কষ্ট হত। কিন্তু ধীরে ধীরে মনোযোগ দিয়ে যখন কাজ করি, কয়েকজন আর্কিটেক্ট বিশেষত মুস্তাফা খালিদ পলাশ একজন আছেন, আপনি তার নাম শুনেছেন কি না, নির্ঝরকেও বলা যায় কিছুটা। ফিল্মও বানায় সে। তারও কিছুটা অবদান আছে।

উত্তম কুমার সাহা বলে একজন আছেন। এ রকম অল্প কয়েকজন আর্কিটেক্ট কষ্ট করতে করতে মানুষজনের কাছে ইম্পরট্যান্ট হয়ে উঠল। ডেভেলপাররা আমাদের এসে ধরল। আমরাও তাদের সে রকম বিল্ডিং দিলাম। গাছগাছালিসহ কংক্রিটের বিল্ডিং। তাদের ব্যবসা বাড়ল। আর আমাদেরও পজিশন বাড়ল।

এখন তো কিছু আর্কিটেক্টকে বলা হয় সেলিব্রেটি, স্টার আর্কিটেক্ট। এখন তো আমরা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেতে শুরু করেছি। বাংলাদেশের স্থাপত্য ইন্টারন্যাশনালি ইম্পরট্যান্ট হয়ে পড়েছে।

গত দুই বছর ধরে ইউরোপে একটি এক্সিবিশন ঘুরে বেড়াচ্ছে ‘বেঙ্গল স্টিম’ নামে। বাংলাদেশের ২৯ জন আর্কিটেক্ট নিয়ে ইউরোপীয়রা নিজেরা আয়োজন করেছে। এটা আমেরিকায় যাবে। বাংলাদেশেও একসময় আসবে।

তো ইউরোপের কী এমন দুঃখ হলো যে, তারা বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পকে এমন মর্যাদা দিচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের আর্কিটেক্টরা প্রমাণ করেছে তারা মারাত্মক লেভেলে কাজ করে। আমি প্রথম ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। আমাকে নিয়ে প্রথম ইন্টারন্যাশনালি বই বেরিয়েছে। তবে আমি প্রথম বলে আমি একা না। আমি শুরু করেছি। অনেক মানুষ এসে গেছে।

এখন ভয়ের জায়গা হচ্ছে, ইয়াং জেনারেশন এদিক-ওদিক দেখে কপি করে ফেলে। এই যে গভীরতা, আমি লালন নিয়ে কথা বলছি, আমি হাসন রাজা নিয়ে কাজ করেছি। বাংলাদেশের পানি, বাংলাদেশের জলবায়ু, বাংলাদেশ কোথা থেকে পানি পায়, কখন সূর্য কোথায় থাকে, এই যে জ্ঞানের বিবেচনায় কাজ করি, সেইভাবে স্কুলেও পড়ায় না। তারা চর্চাও করে না। কপি করলে আপনি কতটুকু যেতে পারবেন?

একটা দুইটা ভালো হতে পারে। সব তো ভালো হবে না। আপনি ভুল করবেন। আপনাকে গাছ চিনতে হবে। পাখি চিনতে হবে। ম্যাটেরিয়েল বুঝতে হবে। গ্রিন জিনিসটা বুঝতে হবে। ইকোনমি বুঝতে হবে। আমাদের দেশে পড়াশোনা তেমন হচ্ছে না। পড়াশোনায় গভীরতা নেই। অনেক গভীরতায় পড়ানো হয় না। ফলে ওরা শিখতে পারে না। পড়ে শেখার যে কষ্ট, সেটাও করতে চায় না অনেক সময়।

আমি তরুণদের বলব, তাদের খাটতে হবে। দেয়ার ইজ নো রয়্যাল ওয়ে ফর লার্নিং। ইয়াং জেনারেশন যদি পরিশ্রম না করে, আমাদের চেয়ে বেশি এগিয়ে না যায়, তাহলে দেশ কীভাবে আগাবে? আমার পর্যন্ত থাকলে হবে? আমরা তো এক জায়গা পর্যন্ত আসছি। আমরা তো এখন পুরান হয়ে যাচ্ছি। এ জন্য আমি মনে করি, ওদের আরও অ্যাগ্রেসিভ হতে হবে। আরও ডেডিকেডেট হতে হবে। সারা দুনিয়াতে আরও নজর রাখতে হবে। রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে হবে।

আজকাল ক্যাপিটালিস্টরা গ্লোবালাইজেশনের কথা বলে। তারা কি গ্লোবালাইজ করেছে? প্রেম, ভালোবাসা, সমতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ইত্যাদি তারা গ্লোবালাইজ করেছে? তারা করেছে অস্ত্র, যুদ্ধ, ধ্বংস। এগুলো যদি তরুণ প্রজন্ম না বোঝে…। তারা করেছে ব্যবসার জন্য। অস্ত্র বিক্রির জন্য, তাদের পণ্য বিক্রির জন্য। এগুলো কি আমরা মেনে নেব? আমরা যদি বোকা হই, তাহলে কি বুঝব এগুলো?

আমাকে রেসপন্ড করতে হবে জ্ঞানের ভিত্তিতে। আমরা যদি ওদের কথা শুনে গ্রিন আর্কিটেকচার বলতে এসি লাগাই, বলবে গ্রিন এসি। এসি তো এসিই। এখানে আবার গ্রিন কী? এমন ডিজাইন করতে হবে, যেখানে এসি লাগবে অতি নগণ্য। ফলে আমার খরচ কম হবে, প্রকৃতিকে ব্যবহার করব এবং ইমিউন থাকব।

প্রকৃতির সঙ্গে থেকে থেকে ইমিউনড হব। ভিটামিন ডি পাব। আমি কালেভদ্রে খুব যখন বাজে গরম, এক মাস তখন এসি চালালাম। ওরা শুরুই করে এসি দিয়ে।

‘কাচ লাগাও। মোটা মোটা কাচ লাগাও’। কেন কাচ লাগাব? কাচ লাগালে আমাকে বুঝতে হবে, কাচে যদি রোদ না পড়ে, কাচের ওপর যদি আমি একটা শেডিং দিই, তাহলে ভাদ্র মাসে যখন কঠিন গরম, সূর্যটা হেলে গেছে, হেলানো সূর্যটা কাচে পড়ে না। কারণ একটা হেডের মতো মাথালের মতো দিয়ে দিয়েছি, যার ছায়ায় থাকে। তাহলে আমার আর গরম লাগবে না। শীতকালে সূর্যটা যখন আরেকটু হেলে যায়, তখন যদি শেডটা বড় হয়, তখন রোদ আটকে গেলে রুম ঠান্ডা থাকবে। তাহলে রোদটাকে অ্যালাও করতে হবে।

কৃষকের মাথালের একটা মাপ আছে। মাপ হচ্ছে গরমকালে সূর্যটা যখন মাথার ওপরে থাকবে। তখন পুরো শরীর ছায়াতে থাকবে। যেই শীতকাল এসে যায়, তখন মাথালের সাইড দিয়ে রোদ তার শরীরে পড়ে। এটা ম্যাথমেটিকস।

‘আমার কাজ স্থাপত্য দিয়ে কবিতা নির্মাণ’
বহুতল ভবনেও পুকুর রফিক আজমের স্থাপত্যের অনন্য দিক


চট্টগ্রামে একটি বাড়িতে আমি মাথালের ব্যবহার করেছি। অ্যাসথেটিক হচ্ছে ম্যাথমেটিকস। আমি গণিত খুব পছন্দ করি। গণিতে যারা সিরিয়াস, তারা বলেন, গড হচ্ছে একটা সংখ্যা। আসলেই কিন্তু সংখ্যা। সম্প্রতি হলিউডে একটা ফিল্ম হয়েছে। ৩১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণকারী একজন ভারতীয় গণিতবিদকে নিয়ে; পড়াতেন কেমব্রিজে।

নিউজবাংলা: রামানুজন?

রফিক আজম: হ্যাঁ, রামানুজন। তাকে নিয়ে নির্মাণ হয়েছে মুভিদ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। আমি মুভিটি দেখেছি।

আবার কংক্রিটের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আমি এটার আবিষ্কারক বলে দাবি করি না। পৃথিবীতে এর আগে অনেক হয়েছে। গ্রেট আর্কিটেক্টরা এর আগেও করেছেন।

আমাদের দেশে চিন্তাও করত না। দু-একটা হয়েছিল অফিস। কিন্তু বাসাবাড়িতেও এটা করা যায়। ইট লাগে, শক্তিশালী জিনিস, দেখতে খুব সুন্দর লাগে। আমাদের দেশে মাটির বাড়ি ছিল গ্রে কালারের। আমি ও রকম একটা গন্ধ পাই। আমি দাবি করছি না, মাটির বাড়ি বানাচ্ছি। কিন্তু ও রকম একটা গন্ধ পাই। ছাইরঙা লেপা বাড়ি, ও রকম একটা ছাঁচ পাই। ওটা নিজেই একটি কবিতার মতো।

আমার সৌন্দর্য পাবেন ডিটেইলসগুলোতে। প্রকৃতি, পানি, কংক্রিটকে আমি এক করে ফেলেছি। আজ থেকে ১৫ বছর আগে কেউ চিন্তা করত? এখন অনেকেই করেন। আমার চেয়ে বেশিও কেউ কেউ করতে পারেন।

আমরা তো এখন অসহায়। কাজ পাব, খেতে পাব, নাকি দুনিয়ার সাথে কমপিট করে দেখাব, আমরা কম না? আমার এমনও দিন গেছে, ইউরোপের বার্লিনের রাস্তায় হাঁটছি, আর কাঁদছি। আমরা তো কিছু করতে পারব না। ওরা এত কিছু পারে, জানে। আমাদের না আছে টেকনোলজি, না আছে প্রজেক্ট। প্রজেক্ট দেখাতে হবে। সিভিল প্রজেক্ট।

মাঠ-ঘাট দেখাতে হবে। এই যে পাঠালাম প্যারিসে অ্যাওয়ার্ড পেয়ে গেল। বড়লোকের বাড়ি বানালে আর প্রাইজ দেয় না। এখন বলে, আর্কিটেকচার হ্যাজ চেইঞ্জড। মানুষের জন্য কী করেছে বলো। ১০-১২ বছর আগে পেয়েছি। এখন কিন্তু বড়লোকের বাড়ি করলে আর পাত্তা পাব না।

অনেক আর্কিটেক্ট আছে আমাদের চেয়ে ভালো আইডিয়া দিয়ে বসে থাকে। কত আর দিব? দিচ্ছি আর দিচ্ছি। এ জন্য আমি কাজের ধারা চেঞ্জ করে মানুষের জন্য কাজ করছি। ওল্ড ঢাকায় কাজ করছি। আমার কাজ হচ্ছে কবিতা তৈরি করা। আর্কিটেকচার দিয়ে কবিতা তৈরি করা। মানুষ যেন জীবনকে আনন্দময় করে তুলতে পারে, শিখতে পারে, চিন্তা করতে পারে।

নিউজবাংলা: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলবেন?

রফিক আজম: আমি এখন পুরোপুরি শহরের কাজে নামছি। দেশ বললে তো পারব না। আমি ঢাকা শহর, বিশেষ করে পুরান ঢাকার কাজ যেভাবে শুরু করেছি, নদীর ধার, পুরোনো বাড়িঘর ইত্যাদি ঠিক করে, পুরান ঢাকায় ফরেস্ট এরিয়া বানানো যায় কি না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ১৮টি ওয়ার্ড পেয়েছে নতুন। ওয়ার্ড ১৮টি হলেও জায়গা কিন্তু আগের চেয়ে বেশি। ধ্বংস করার আগেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া দরকার।

নিউজবাংলা: এখন ঢাকার বিস্তৃত হবে মূলত পুব দিকে। ঢাকার একমাত্র পুব দিকেই এখনও প্রচুর উন্মুক্ত স্থান রয়েছে। সেখানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন আবাসিক প্রকল্প করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কিছু বলুন।

রফিক আজম: ঢাকা শহরের জনঘনত্ব বেশি হয়ে গেছে। আপনি ইচ্ছে করলেই পুরান ঢাকা থেকে মানুষকে বের করে দিয়ে করতে পারবেন না। এখনই সুযোগ আছে পুব দিকে শহর ফ্লারিশ করা। কী পরিমাণ গ্রিন হবে, কী গাছ হবে, ট্রেনের ব্যবস্থা করা যায় কি না, পেরিফেরাল রোড ব্যবহার করা যায় কি না, পানিকে পুরোপুরি ট্রান্সপোর্টের রোড হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না।

কোর ঢাকার লোককে ডিস্ট্রিবিউশন, ডিসেন্ট্রালাইজ করতে পারেন। কোর ঢাকার লোক প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৫০ হাজার হতে পারে। কোনো কোনো স্পটে ১ থেকে দেড় লাখও রয়েছে। গেন্ডারিয়ায় লক্ষাধিক লোক বাস করে। ভাবা যায় বিষয়টি?

অনেক শহর আছে, ৫ হাজার লোক বাস করে। পৃথিবীর সর্বাধিক ঘনবসতির শহরগুলোর মধ্যে মুম্বাইয়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৭ হাজার লোক বাস করে। ম্যানিলায় ৪০ হাজার হতে পারে। ওদের অবস্থাও টাইট। আমরা ওই জায়গায় যাব কেন? আমাদের লোকজনদের ডিস্ট্রিবিউশন করার তো এখনও সুযোগ আছে। তারা যদি চলে যায়, ট্রেনে করে অফিসে আসবে অথবা ওখানেই অফিস-টপিস তৈরি করা যেতে পারে। তখন ঢাকার লোড কমতে থাকবে। পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকবে।

এখন যে পরিস্থিতি, এ সুযোগ কি সবসময় পাওয়া যাবে? এখন যে এত জমি পাওয়া গেল, সবসময় কি তা পাওয়া যাবে? কোথায় অক্সিজেনের ফ্যাক্টরি তথা ফরেস্ট হবে, কোথায় সেন্ট্রাল ফরেস্ট হবে, ভেঙে ভেঙে কোথায় ফরেস্ট হবে, কোথায় ট্রেন হবে, পেরিফেরাল রোড কোথায় হবে, এভাবে চিন্তা করলে ঢাকাকে দারুণভাবে ফিরিয়ে আনা যায়।

এটাকে আমি একটা অপরচুনিটি মনে করি। গ্রেট অপরচুনিটি। এইবার যদি ভুল করি, তাহলে আমাদের আর জায়গা নেই। ঢাকাকে চাইলে এখন ভালো করা যায়। ঢাকা কেন রাজনীতির রাজধানী হবে, কেন কালচারাল রাজধানী হবে, কেন বিজনেসের রাজধানী হবে? পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভাগ করা হয়েছে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদ কিন্তু শুধু পাকিস্তানের রাজধানী কিংবা কুয়ালালামপুর কিন্তু মালয়েশিয়ার রাজধানী নয়, রাজধানী পুত্রজায়া।

কেন ঢাকার মধ্যে সব হবে? মিলিটারি, এয়ারফোর্স সব কেন ঢাকায় হতে হবে? ফ্যাক্টরিগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। এসব যদি সরিয়ে ফেলা যায়, ঢাকা হবে বাংলাদেশের কালচারাল রাজধানী অথবা বিজনেস ও কালাচারাল রাজধানী; পলিটিক্যাল নয়।

এভাবে ঢাকাকে ভালো করা যায়। সবাই মিলে বসলে আরও আইডিয়া আসবে। এটা একটা অপরচুনিটি। এটাকে কাজে লাগাতে হবে।

শেয়ার করুন

গানে-আলোচনায় শাহ আব্দুল করিম স্মরণ

গানে-আলোচনায় শাহ আব্দুল করিম স্মরণ

বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম। ছবি: নিউজবাংলা

১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে জন্ম শাহ আব্দুল করিমের। ৯৩ বছর বয়সে ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মারা যান এই বাউল সাধক।

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে নানা আয়োজনে স্মরণ করা হচ্ছে তাকে।

জন্মস্থান সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের বাড়িতে রোববার দুপুরে হয়েছে মিলাদ মাহফিল। বাউল সাধকের বাড়িতে বিকেলে রয়েছে স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা সভা। সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি অনলাইনে রেখেছে গানের আয়োজন।

রাতভর শাহ আব্দুল করিমের গান নিয়ে তার বাড়িতে হবে করিমগীতি।

শাহ আব্দুল করিম পরিষদের সভাপতি আপেল মাহমুদ বলেন, ‘শাহ আব্দুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা ছোট করে আয়োজনমালা হাতে নিয়েছি।

‘তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী আরও বড় আকারে হওয়া প্রয়োজন ছিল, কিন্তু আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী করে যাচ্ছি। গত দুই বছর তো সবকিছু বন্ধই ছিল করোনার কারণে।’

১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে জন্ম শাহ আব্দুল করিমের।

৯৩ বছর বয়সে ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মারা যান এই বাউল সাধক।

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, গাড়ি চলে না চলে না, গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমানসহ অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা তিনি।

শাহ আব্দুল করিম পেয়েছেন ‘একুশে পদক’। এছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননাসহ পেয়েছেন নানা পুরস্কার।

শেয়ার করুন

মন্ত্রের শক্তিতে মনভোলানোর ‘পাতা খেলা’

মন্ত্রের শক্তিতে মনভোলানোর ‘পাতা খেলা’

এই খেলায় তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে পাতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন তান্ত্রিক বা ওঝা। মন্ত্রের শক্তিতে পরাস্ত কোনো পাতা নির্ধারিত দাগের বাইরে বেরিয়ে এলে জয়ী হন তান্ত্রিক। আর মন্ত্রের শক্তিকে দমন করে কোনো পাতা নিজের সীমানায় অটল থাকলে বিজয়ী হন তিনি।

বিকেল ঠিক ৪টা। নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার উষ্টি বিএস উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের চারপাশে জড়ো কয়েক হাজার দর্শক। গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী ‘পাতা খেলা’ উপভোগের অপেক্ষায় সবাই।

সুসজ্জিত মাঠে ১৩ জন তান্ত্রিক এবং ‘পাতা’ হিসেবে পাঁচ জনের অংশগ্রহণে শুরু হয় টানটান উত্তেজনার খেলা। নিয়ম অনুযায়ী, তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে পাতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করবেন ১৩ তান্ত্রিক বা ওঝা। মন্ত্রের শক্তিতে পরাস্ত হয়ে কোনো পাতা নির্ধারিত দাগের বাইরে বেরিয়ে এলে জয়ী হবেন মন্ত্র উচ্চারণকারী সংশ্লিষ্ট তান্ত্রিক। আর মন্ত্রের শক্তিকে দমন করে কোনো পাতা নিজের সীমানায় অটল থাকলে বিজয়ী হবেন তিনি।

দর্শকের তুমল করতালির মধ্যে শনিবার বিকেলে শুরু হয় খেলা। এতে ‘তন্ত্রমন্ত্র মন্ত্রী’ বা তান্ত্রিক হিসেবে অংশ নেন নজরুল ইসলাম, সারোয়ার হোসেন, বেলাল হোসেন, আকবর আলী, রতন আলী, লুৎফর রহমান, খাদেমুল ইসলাম, সেকেন্দার আলী, মাহাবুর রহমান, সোলাইমান আলী, জুয়েল রানা, লাবিব হাসান ও নুরুল ইসলাম।

পাতা হিসেবে অংশ নেন আব্দুল খালেক, আতোয়ার হোসেন, সবুজ হোসেন, লোকমান আলী ও শাহাজান আলী।

বেসরকারি সংস্থা দ্য হাঙ্গার প্রজেক্টের অনুপ্রেরণায় তৈরি ছাত্র সংগঠন ইয়ুথ এন্ডিং হাঙ্গার আকবরপুর ইউনিয়ন ফোরাম এবং পত্নীতলা উপজেলা ফোরাম আয়োজন করে খেলাটি।


মন্ত্রের শক্তিতে মনভোলানোর ‘পাতা খেলা’

খেলার জন্য মাঠের মাঝখানে পুঁতে রাখা হয় কলাগাছের গোড়ায় পানিভর্তি মাটির ঘটি। এর চারপাশ চুন দিয়ে বৃত্ত আঁকা। গোটা মাঠটিতেও বৃত্তাকারে চিহ্নিত করা। খেলার শুরুতেই ১৩ তান্ত্রিক মাটির ঘটির পানিতে হাত ভিজিয়ে নেন। এর পর মাঠের বিভিন্ন অংশে অবস্থান নিয়ে মাটিতে হাত রেখে মন্ত্র জপতে শুরু করেন।

অন্যদিকে মাঠের বিভিন্ন জায়গায় পাঁচ পাতা মাটিতে হাত রেখে অনড় অবস্থান নেন। তাদের সবার লক্ষ্য, কোনোভাবেই যাতে তান্ত্রিকের মন্ত্রে মনভোলা না হন। ধীরে ধীরে জমে ওঠে খেলা। বিকেল গড়িয়ে ঘনিয়ে আসে সন্ধ্যা। যে সব ওঝা তাদের মন্ত্রে পাতাদের পরাস্ত করেছেন বিজয়ী ঘোষণা করা হয় তাদের।

উষ্টি গ্রামের সেকেন্দার আলীর পরিচালনায় টানা প্রায় ২ ঘণ্টার খেলায় মহাদেবপুর উপজেলার নজরুল ইসলাম দুটি পাতার মন ভুলিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন। আর একটি করে পাতাকে আকৃষ্ট করে যৌথভাবে রানার আপ হন পত্নীতলা উপজেলার মাটিন্দর ইউনিয়নের জয়পুর গ্রামের সারোয়ার হোসেন, আকবরপুর ইউনিয়নের বড়মহারন্দি গ্রামের সেকেন্দার আলী এবং মধইল গ্রামের মাহাবুর রহমান।

মন্ত্রের শক্তিতে মনভোলানোর ‘পাতা খেলা’

খেলা শেষে অশংগ্রহণকারী সব পাতাকে গামছা, সাবান এবং নারকেল উপহার দেয়া হয়। এছাড়া প্রত্যেক তান্ত্রিককে নারকেল এবং চ্যাম্পিয়ন ও রানার আপদের এলাকার ঐতিহ্য মেনে এক ডজন করে নারকেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে। অংশ নেয়া সবাই পেয়েছেন বিশেষ পরস্কারও।

চ্যাম্পিয়ন নজরুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্রায় ১৫ বছর থেকে এই খেলা খেলছি। শুধু নওগাঁ নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি। এখন আর আগের মতো তন্ত্র-মন্ত্রের পাতা খেলার আয়োজন হয় না।’

তিনি বলেন, ‘মন্ত্র বা বান দিলে সেই বানটি আবার ফেরত আনা যায়। ফলে এই বানে কারো কোনো ক্ষতি হয় না।’

পাতা হিসেবে অংশ নেয়া আব্দুল খালেক বলেন, ‘ওঝা বা তান্ত্রিকরা যখন মন্ত্র পড়েন তখন নিজের মন ঠিক রাখা খুব কঠিন হয়ে যায়। অনেকদিন পর এমন খেলায় অংশ নিতে পেরে খুব ভালো লেগেছে।’

মন্ত্রের শক্তিতে মনভোলানোর ‘পাতা খেলা’
পাতা খেলার বিজয়ীদের পুরস্কার দেয়ার জন্য রাখা নারকেল

নওগাঁর স্থানীয় লেখক, গবেষক ও মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নওগাঁতে প্রায় শত বছর আগে এই খেলার প্রচলন হয়। পাতা খেলাটি এক ধরনের ব্ল্যাকম্যাজিক। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের আসাম রাজ্য থেকে খেলাটি আমাদের দেশে এসেছে। দেশ স্বাধীনের পর নওগাঁতে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় এই খেলা হতো। এখন দুই-এক জায়গায় মাঝে-মাঝে হয়ে থাকলেও আগের মতো বড় পরিসর নেই।’

দ্য হাঙ্গার প্রজেক্টের পত্নীতলা এলাকার সমন্বয়ক আসির উদ্দীন বলেন, ‘গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখতেই আমাদের এই আয়োজন। আমরা চাই সামাজিক সম্প্রীতি অটুট রেখে সহনশীলতার চর্চা অব্যাহত থাকুক।’

শেয়ার করুন

উজানে ফিরলেন হাসান আজিজুল হক

উজানে ফিরলেন হাসান আজিজুল হক

কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। ছবি: সংগৃহীত

হাসান আজিজুল হকের ছেলে ইমতিয়াজ হাসান জানান, তার বাবা বাড়িতে ভালোই আছেন। এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন। আগেই উনার খাওয়া কমে গিয়েছিল। উনাকে এখন নিয়ম ধরে আর খাওয়ানোর কিছু নাই, যখন ক্ষুধা লাগবে তখনই খাওয়াতে হবে। ডাক্তাররা বলেছেন, খেয়াল রাখতে হবে যাতে উনার সুগার লেভেলটা ঠিক থাকে।

প্রিয় বাড়ি ‘উজানে’ ফিরলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। ঢাকায় চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান তিনি।

১৯ দিন পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রবেশ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে নগরের চৌদ্দপায় এলাকার আবাসিক এলাকা ‘বিহাস’-এর নিজ বাড়ি ‘উজানে’। এর আগে বেলা ১১টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বাড়ি ফেরার অনুমতি দেয়।

হাসান আজিজুল হকের ছেলে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ইমতিয়াজ হাসান জানান, তার বাবা বাড়িতে ভালোই আছেন। এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন। আগেই উনার খাওয়া কমে গিয়েছিল। উনাকে এখন নিয়ম ধরে আর খাওয়ানোর কিছু নাই, যখন ক্ষুধা লাগবে তখনই খাওয়াতে হবে। ডাক্তাররা বলেছেন, খেয়াল রাখতে হবে যাতে উনার সুগার লেভেলটা ঠিক থাকে।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ হাসান বলেন, যেসব বড় ধরনের জটিলতা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন, তা কেটে গেছে। বর্তমানে যে ধরনের ছোটখাটো শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তা বাড়ি থেকেই চিকিৎসা চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তাই তাকে বাড়িতে নেয়া হয়েছে। তারা আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে করে ফিরেছেন। সন্ধ্যায় তারা বাসায় পৌঁছেন।

এর আগে গত ২১ আগস্ট হাসান আজিজুল হককে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়া হয়। গুনী এই লেখককে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে প্রথমে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়, পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় সেই দিন রাতে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়।

তাকে এই হাসপাতালে আনার পরদিন ২২ আগস্ট বিএসএমএমইউর ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ আরাফাতকে প্রধান করে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। এই মেডিকেল বোর্ডের অধীনেই তার চিকিৎসা চলে।

১৬ আগস্ট এই লেখকের ছেলে অধ্যাপক ইমতিয়াজ হাসান এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তার বাবার গুরুতর অসুস্থতার কথা জানান। ওই দিন বাবা হাসান আজিজুল হককে নিয়ে এক দীর্ঘ ফেসবুক স্ট্যাটাস দেন ইমতিয়াজ হাসান।

সেখানে তিনি লেখেন, ‘আব্বা বয়সের ভারে শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন অনেকটা, মনটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছে একটু। আড়ালেও কি চলে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে? গত এক মাস যাবৎ তিনি ভীষণ অসুস্থ, ছোট একটি শিশুর মতোই আমাদের ওনার পরিচর্যা করতে হয়। পরিবারের মানুষ আর গুটিকয়েক শুভানুধ্যায়ী ছাড়া আর কেউ সে কথা জানেন না। অনেকেই হয়তো মন চাইলেও তার খবর নিতে পারেননি বা যোগাযোগ করতে পারছেন না। সে জন্যই এটুকু লেখা। আপনাদের দোয়ায়, প্রার্থনায় তাকে রাখবেন।’

হাসান আজিজুল হক ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি রাজশাহীতে কাটিয়েছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪ সাল পর্যন্ত টানা ৩১ বছর অধ্যাপনা করেন।

শেয়ার করুন