20201002104319.jpg
বাঙ্গাল ভাষার লড়াই

বাঙ্গাল ভাষার লড়াই

আজকে যেমন অনেকের কাছে পূর্ব বাংলার ভাষা মানে মুসলমানি বাংলা এবং পশ্চিমবঙ্গের ভাষা মানে শুদ্ধতর/প্রমিততর/সনাতনী বাংলা, চিরকাল কিন্তু বিতর্কের বিবেচনাটা সম্প্রদায়ভিত্তিক ছিল না। বাংলা ভাষার ইতিহাসে দীর্ঘতম এবং প্রাচীনতম কোন্দলটি ছিল বরং আঞ্চলিকতার। পূর্ববাংলার ভাষারীতিকে গৌণ কিংবা উপহাস করাটা ছিল তার বৈশিষ্ট্য, মুসলমানি ভাষা বলে তাকে খোঁটা দেয়া হয়নি। অন্যদিকে বিশ শতকের শুরুতে উপনিবেশোত্তর মুসলমানরা বাংলায় সাহিত্যচর্চা শুরু করলে, বাংলা ভাষার হিন্দু রূপ ও মুসলমান রূপ নিয়ে নতুন একটা বিতর্ক শুরু হয়।

হিন্দুসংহতি নামের পশ্চিমবঙ্গ কেন্দ্রিক গৌণ একটি সংগঠনের একটা পোস্টার থেকে আলাপ সামনে এলো আবারও, বাংলাদেশি ভাষাকে সনাতনী ভাষা থেকে পৃথক করবার দাবি করেছে সংগঠনটি। কেবল এই সাম্প্রদায়িক সংগঠনটির কারণেই নয়, পূর্ব বাংলার ভাষা আর পশ্চিম বাংলার ভাষার বৈশিষ্ট্য, ভালো-মন্দ, শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা ইত্যাদি নিয়ে গবেষণামূলক অনেক আলাপও বহুকাল ধরেই হয়ে এসেছে। আমার আলাপটা তাই উপসংহার দিয়েই শুরু করি। 

আজকে যেমন অনেকের কাছে পূর্ব বাংলার ভাষা মানে মুসলমানি বাংলা এবং পশ্চিমবঙ্গের ভাষা মানে শুদ্ধতর/প্রমিততর/সনাতনী বাংলা, চিরকাল কিন্তু বিতর্কের বিবেচনাটা সম্প্রদায়ভিত্তিক ছিল না। বাংলা ভাষার ইতিহাসে দীর্ঘতম এবং প্রাচীনতম কোন্দলটি ছিল বরং আঞ্চলিকতার। পূর্ববাংলার ভাষারীতিকে গৌণ কিংবা উপহাস করাটা ছিল তার বৈশিষ্ট্য, মুসলমানি ভাষা বলে তাকে খোঁটা দেয়া হয়নি। অন্যদিকে বিশ শতকের শুরুতে উপনিবেশোত্তর মুসলমানরা বাংলায় সাহিত্যচর্চা শুরু করলে, বাংলা ভাষার হিন্দু রূপ ও মুসলমান রূপ নিয়ে নতুন একটা বিতর্ক শুরু হয়। 

দ্বিতীয় পর্বের এই হট্টগোলের সাথে পূর্ব-পশ্চিম আঞ্চলিকতার কোনও সম্পর্ক ছিল না বরং সেই তর্কের অন্যতম একটি চরিত্র কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বর্ধমানের লোক, অর্থাৎ ভাষার সাম্প্রদায়িক রূপ কেন্দ্রিক বিরোধটা ছিল স্থাননিরপেক্ষ। কেবলমাত্র ১৯৪৭ সালের পর ভাষারও স্থানভিত্তিক সাম্প্রায়িক চেহারা তৈরি হয়। অর্থাৎ পূর্ববঙ্গের ভাষা অর্থে মুসলমানি বাংলা এবং বিপরীতক্রমে পশ্চিমবঙ্গের ভাষা অর্থে সনাতনী/হিন্দু/প্রমিত বাংলা এই দুইটি বর্গে বিভক্ত হয়। স্থান ও সম্প্রদায়ের এই সমাপতনের জটিলতা থেকে মুক্ত করে এইখানে আপাতত আমরা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ইতিহাস আলোচনা করব না বরং আঞ্চলিক বিভাজনটার ওপরই কিছুটা আলোক ফেলবার চেষ্টা করব।

 

জিম্মিসংকট

বছর কয়েক আগে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার এক আলাপচারিতায় দাবি করেন ‘জিম্মা’ শব্দটা বাঙলাভাষায় নেই, কারণ পশ্চিমবঙ্গে কেউ এটা ব্যবহার করেন না। ভদ্রলোককে কিছুটা উদ্ধৃত করা যাক:  ‘...আজকের কাগজে আছে, কতজন বাঙালি বা বাংলাদেশিকে লিবিয়া জিম্মা নিয়েছে, ৪০০ বাঙালি। ‘‘জিম্মা’’ শব্দটা কেন লিখবে? ‘‘জিম্মা’’ তো বাংলা শব্দের ধারে কাছে নেই।... আত্মীকরণ দিয়ে বুঝতে চান, যে কোনো ভাষার ওপর শব্দ আসবে। যেমন, ইংরেজিতে টেবিল, চেয়ার, শার্ট, প্যান্ট হিসেবে এসেছে। সেটা অভ্যেস হিসেবে এসেছে। পশ্চিম বাংলায় কোনো মানুষের ভাষায় জিম্মা শব্দ শুনবেন না। কবিতা পড়েন, গদ্যে পড়েন, গল্প পড়েন। কোথাও জিম্মা শব্দটা ছিল না। এগুলো কেন জানি মনে হচ্ছে, ১৯৭১ সালের পর থেকে এইসব শব্দ টুকটুক করে ঢোকাচ্ছে। আমার চেয়ে আপনারা ভালো বুঝবেন (যেগুলো আকাশে ভাসে সেগুলো তাৎক্ষণিক সাহিত্য : সাখাওয়াত টিপু ও ফরিদ কবির এর সাথে কথোপকথন) !’

উদ্ধৃত অংশটুকুতে উর্দু-আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার বিষয়ক একটা প্রচ্ছন্ন সাম্প্রদায়িক গন্ধ থাকলেও প্রকাশ্যে সমরেশ খুব জোর গলাতেই বলতে পারছেন যে বাংলা ভাষার শুদ্ধতার মানদণ্ড হলো পশ্চিমবঙ্গে তার প্রচলন আছে কি-না, অর্থাৎ স্থানের বিরোধটা আমরা এখানে পাচ্ছি। সেখানকার কেউ যদি জিম্মা/জিম্মি ব্যবহার না করেন, তাহলে শব্দটার আত্মীকরণের দাবি করা যাবে না।

তথ্যগত দিক দিয়ে সমরেশের দাবি যে অত্যন্ত ভুল তাতে সন্দেহ নেই। ভাষার গতিশীলতার প্রক্রিয়া সম্পর্কে যে ভাবনার প্রকাশ তিনি ঘটিয়েছেন, তা নিতান্তই কিশোরসুলভ এবং বিপজ্জনক রকম রক্ষণশীল। ‘জিম্মা’ শব্দের পক্ষে সমরেশ মজুমদারের তুলনায় বাংলা ভাষার অনেক বড় ওজনদার, অনেক বেশি মহত্তর সাক্ষীর দোহাই দিতে পারি, তিনি রবীন্দ্রনাথ। তার ‘কাব্য: স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট’ নামের রচনাটি থেকে উদ্ধৃত করা যাক: ‘‘কপালকুণ্ডলার শেষ পর্যন্ত শুনিয়া তবু যদি ছেলেমানুষের মতো জিজ্ঞাসা কর ‘‘তার পরে” তবে দামোদর বাবুর নিকটে তোমাকে জিম্মা করিয়া দিয়া হাল ছাড়িয়া দিতে হয়।’

আমাদের মতো বাঙ্গালরা সব হাফ ছেড়ে বাঁচে। ভাগ্যিস রবি ঠাকুরের বরাত দেয়া গেল। না হলে জিম্মা-জিম্মি-জিম্মাদার-এর মতো কতগুলো অতি জরুরি শব্দও ‘অনাত্মীয়’ তকমায় ভাষার ভেতর-বাড়িতে আর ঢুকতে পেত না, সমরেশীয় শুদ্ধি অভিযানে হয়তো তাদের বিদায় দিতে হতো। পশ্চিমবঙ্গে আদৌ ব্যবহৃত না হয়ে যদি থাকেও, পূর্ববঙ্গে তো কিছু পরিস্থিতির প্রকাশে ‘জিম্মি’ ব্যবহার অনিবার্য। পণবন্দী শব্দটির ব্যবহার এখানে বিরল, যদিও অজ্ঞাত নয়, জানি না জিম্মদারের বিকল্প সেখানে কী। ন্যাসরক্ষক? কিন্তু প্রশ্নটা এখানে না যে রবিঠাকুর ব্যবহার করে জিম্মাকে আত্মীয়ের স্তরে শোধন করেছেন, সংকটটা আসলে খবরদারির, একটা নির্ধারক মানসিকতার। ঐতিহাসিক নানান কারণে পূর্ববঙ্গের দিক থেকে এই খবরদারির কিংবা শুদ্ধাশুদ্ধি বিচারের চেষ্টার তেমন কোনো খবর পাওয়া যাবে না। খবরদারি বা মুরুব্বিগিরি না করতে যাবার মাঝে ঔদার্য বা স্বভাবসিদ্ধ মহত্ত্ব যদি কিছু থেকে থাকে, তার মাঝে হয়তো পূর্বাঞ্চলের ঐতিহাসিক/সাংস্কৃতিক যে মুখাপেক্ষিতা পশ্চিমাংশের প্রতি, তারই একটা স্বাভাবিক স্বীকৃতি আছে, তবে নির্ভরশীলতামুক্ত হবার চেষ্টাও আছে। প্রবণতা হিসেবে সাধারণভাবে দেখা যাবে পূর্বাঞ্চলের প্রতিক্রিয়ায় বৈচিত্রের স্বীকৃতি প্রদানের চেষ্টা করে নিজের অবস্থানকে যুক্তিসিদ্ধ করবার চেষ্টা আছে, পশ্চিমের আছে অটল-অনড় প্রমিতের দাবি।

পশ্চিমবাংলার ঐতিহ্যগত আভিজাত্য আর প্রাধান্যের পরও, এমনকি চুম্বকের মতো অদৃশ্য শক্তিতে বহুদূর থেকেই পূর্বের মননের একটা বড় অংশকে মজিয়ে রাখলেও পূর্ববাংলার জল-কাদামাখা বুনো প্রাণশক্তিও কখনও অলক্ষে এবং কখনও প্রকাশ্যে ঠিকই আপন সাম্রাজ্য বিস্তার করে গেছে। ভাষাকে যদি আমরা একটা সামাজিক উৎপাদ বলে ধরি, পূর্ব বাংলার ভাষার এই শক্তিমত্তার রহস্যটি খুঁজতে হবে বাংলা নামের বদ্বীপের দুই অংশের প্রাকৃতিক গঠনে। এটার পশ্চিমাংশ ভূগোলবিদদের ভাষায় নিষ্ক্রিয়, অন্যদিকে বদ্বীপটির পূর্বাংশ প্রতিবেশগতভাবেই সক্রিয়। তারই ছাপ পড়েছে গত কয়েকশ বছর ধরে এর উৎপাদিকা শক্তির বিপুল বিকাশে এবং গত একশ বছরে তার রাজনীতিতে। 

 

বাঙ্গালের দুর্গতি, বাঙ্গালের জবাব

পূর্ব-পশ্চিমের এই ভাষারীতির বিবাদ কিন্তু স্মরণাতীত কালের। কত পুরানো সেই হদিস যে কে জানে, তা জানি না, কিন্তু কত পুরানো হতে পারে, তার একটা আন্দাজ দেয়া সম্ভব। একদা মঙ্গলকাব্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল সমুদ্রযাত্রায় ঝড়ে সওদাগরের সর্বস্বান্ত হবার বর্ণনা। তারপর: ‘সমুদ্র ঝড়ে সর্বস্বান্ত সদাগরের করুণচিত্রের পার্শ্বে মঙ্গলকাব্যের পশ্চিমবঙ্গের কবিগণ একটি হাস্যরসের চিত্রও পরিবেষণ করিতেন, তাহা বাঙ্গাল মাঝিদের খেদ (শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য: বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস)।’ বোঝা গেল এখনকার মতো তখনও নৌচালনার মতো শ্রমসাধ্য কাজে পূর্ববঙ্গের মাঝিমাল্লারাই এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু আরও যা বোঝা গেল, বাঙ্গালের ভাষা হাস্যরসের নিয়মিত নিমিত্তও ছিল।

পূর্ব বাংলার ভাষা নিয়ে উপহাসের আরও একটা নির্দোষ এবং পুরাতন উদাহরণ দেয়া যাবে, সেটা রঙ্গপ্রিয় পরমপ্রভু শ্রীগৌরাঙ্গের। সেই পরম পাগল চৈতন্যদেব, যার প্রভাবে কবিদের আত্মম্ভর ভনিতা উধাও হয়ে আসলো ভক্তের আত্মনিবেদন, অ-জাতেরেও যিনি বিনা সংকোচে জড়িয়ে ধরতে পারতেন। বাংলা সাহিত্যের সেই সর্বশক্তিমান প্রভাবক ছিলেন খুবই আমুদে মানুষ, হাস্য-পরিহাসে ওস্তাদ। কমবেশি অন্য জেলার উচ্চারণ নিয়ে রসিকতা বাংলায় নির্দোষ পরিহাস হিসেবে সাধারণত বিবেচিত হলেও নিজের পূর্বপুরুষের বসতি সিলেটি উচ্চারণ শুনে তার আমোদ:

‘বিশেষ চালেন প্রভু দেখি শ্রীহট্টিয়া কদর্থেন সেইমত বচন বলিয়া ॥’  আর সাধারণভাবে বাঙ্গালের মুখের ভাষা নিয়ে প্রভূর পরিহাস: ‘সভার সহিত প্রভু হাস্য কথা রঙ্গে। বঙ্গদেশী যেন মত আছিলের বঙ্গে ॥ বঙ্গদেশী বাক্য অনুকরণ করিয়া। বাঙ্গালেরে কদর্থেন হাসিয়া হাসিয়া॥’

মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব ঐতিহ্য পাড়ি দিয়ে ঊনিশ শতকের কলকাতাকেন্দ্রিক নবজাগরণেও সেই ধারা অব্যাহতই ছিল। বাঙ্গালের দশা যে পাল্টায়নি তার সাক্ষ্য মিলবে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত একটি নাটকের সংলাপে, সেটি দীনবন্ধু মিত্রের ‘সধবার একাদশী’। এই নাটকটিতে বাঙ্গাল বিষয়ে প্রচলিত গোটা চারেক রঙ্গব্যাঙ্গ-রসিকতা তুলে ধরা হয়েছে, একটা আপাতত এখানে উল্লেখ করা যাক। ক্রমাগত ‘বাঙ্গাল’ গাল শুনে শুনে অতিষ্ট বেঢপ মাতাল রামের পপাত ধরণীতলে যাবার ঠিক আগে আগে দেয়া প্রত্যুত্তরে একাধারে ক্রোধ, লাঞ্ছনা আর অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে ওঠে: ‘পুঙ্গির বাই বাঙ্গাল বাঙ্গাল কর‍্যা মস্তক গুরাই দিচে —বাঙ্গাল কউস ক্যান্—এতো অকাদ্য কাইচি তবু ক্বলকত্বার মত হবার পারচি না? ক্বলকত্বার মত না কর্‌চি কি? মাগীবারী গেচি, মাগুরি চিকোন দুতি পরাইচি, গোরার বারীর বিস্‌কাট বক্কোন করচি, বাণ্ডিল খাইচি—এতো কর‍্যাও ক্বলকত্বার মত হবার পারলাম না, তবে এ পাপ দেহতে আর কাজ কি, আমি জলে জাপ দিই, আমারে হাঙ্গোরে কুম্বিরে বক্কোন করুক—’

এমনি আর একটা রসিকতা কোনো একটা উপন্যাসে পড়েছিলাম (সুনীলের কি?), পূর্ব বাংলা থেকে যাওয়া বাঙ্গালদের প্রতি কলকাতায় বিদ্রুপের একটি আদর্শ নমুনা। সম্ভবত কোনো পুরানো গানের ব্যাঙ্গাত্মক রূপ: ‘বাঙাল বলিয়া করিয়ো না হেলা আমি ঢাকার বাঙাল নহি গো।’

বাঙ্গালের উচ্চারণ নিয়ে রসিকতা করে বানানো একটি সংস্কৃত শ্লোকের কথাও মনে পড়ছে, সেখানে পূর্বদেশ কিংবা বঙ্গদেশের মানুষের কাছ থেকে আর্শীবাদ না নেয়ার উপদেশ দেয়া হয়েছে, কেননা তারা ‘শতায়ু’ বলতে গিয়ে ‘হতায়ু’ বলে ফেলে। তবে এটা বাঙ্গালের জন্য প্রযুক্ত হলেও হয়তো এই শ্লোকটির উৎপত্তি আসামকে নিয়ে, সেখানেও হ ও স বর্ণের স্থানান্তর ঘটে। সে যাই হোক, ভাগ্যিস আয়ুর দেবতা শুধু মুখের কথাই শোনেন না, অন্তরের ব্যাথাও ঠিকঠাক টের পান, তাই মা-বাপের দোয়াতে বাঙ্গাল বেঁচেবর্তে আছে এখনও।

এমনই অজস্র উদাহরণ প্রচলিত ছিল, কিন্তু আশা করি এই দৃষ্টান্তগুলোই পরিস্থিতি বোঝাতে যথেষ্ট হবে। ঔপনিবেশিক বাংলায় ছাপাখানা পরবর্তী যুগে এর বহুমুখী তাৎপর্য তৈরি হয়। শত কিংবা হাজারে ছাপা বইয়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বেন সাহিত্যিক, ছড়িয়ে পড়বে মত, পথ, তত্ত্ব কিংবা রাজনীতি। ফলে ঊনিশ শতকে বিষয়টা আর কেবল ‘কদর্থ’ করা বা রঙ্গবিদ্রুপ করা নয়, এলো ঘোষণা: বাঙ্গাল ভাষা দূষিত।   

পূব আর পশ্চিমের বাংলার এই রেষারেষির পূব দিক থেকে জবাব দেয়ার জন্য বাঙ্গালকে মনে হয় দীর্ঘ অপেক্ষাই করতে হয়েছে। পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে বিখ্যাত পত্রিকা ‘ঢাকা প্রকাশ’ ৩০ সেপ্টেম্বর ১৮৮৬ সংখ্যায় ‘পূর্বাঞ্চলীয় ভাষা’ নামের নিবন্ধটিতে পূর্বাঞ্চলের ভাষাকে পশ্চিম কতটা অবমাননার চোখে দেখে, সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছে, পূর্ববঙ্গের ভাষাকে তারা এত অশুদ্ধ মনে করেন যে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সোমপ্রকাশ’ লিখেছে:

‘তাহাদিগের মতের সারমর্ম এই যে, পূর্ব্বাঞ্চলের লোকে লেখাতে এমন অনেকপ্রকার রীতির অনুসরণ করেন তাহা হিন্দুস্তানে নয়, চব্বিশ পরগনা, হুগলী, নদীয়া ও বর্দ্ধমান এই কয়েকটি জেলায় প্রচলিত হয় না। অতএব উহা তাঁহাদিগের শ্রুতিকটু হইয়া থাকে। এই নিমিত্ত তাহা অশুদ্ধ। যদি পূর্ব্বাঞ্চলীয় গ্রন্থকারগণ ঐ সকল দোষ পরিত্যাগ করিয়া লেখেন, তাহা হইলে তাহাদের পুস্তকের প্রতি কিঞ্চিৎ অনুগ্রহ প্রকাশ করা যাইতে পারে।

‌কী ভয়ঙ্কর লাঞ্ছনা! কিন্তু এতেও কি শেষ আছে! 

‘সোমপ্রকাশ সম্পাদক এই দোষের নিবারণের জন্য প্রস্তাব করিয়াছেন যদি পূর্ব্বাঞ্চলীয় কোন লোকে কখন কোন পুস্তক লিখিতে প্রবৃত্ত হন তখন যেন তাঁহারা পশ্চিমাঞ্চলীয় কোন ব্যক্তি দ্বারা তাহাদিগের লেখা সংশোধন করাইয়া লন।’

‘সোমপ্রকাশ’-এর বক্তব্যটুকু আদতে কী ছিল, তা গবেষকদের খুঁজে দেখা অত্যাবশ্যক, শুধু ঢাকা প্রকাশের নালিশটাই আমার দেখা সংকলনটিতে জানতে পেরেছি।  তবে ‘সোমপ্রকাশ’-এর উস্কানিটি যে নিতান্তই সামান্য ছিল না, তা বোঝা যায় জল অনেকদূর গড়ানো থেকে। এই কথিত রূঢ়তার প্রত্যুত্তরে ‘ঢাকা প্রকাশ’ ভাষার শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা প্রশ্নে বিস্তারিত যুক্তি প্রদর্শন করেন, ঘোষণা করেন যে ‘বাঙ্গলা ভাষায় অল্পদিন হইল পুস্তক রচনা হইতে আরম্ভ হইয়াছে... কোন গ্রন্থকারই এমন শক্তি প্রদর্শন করিতে সমর্থ হন নাই, যে তাহার পুস্তক চিরকাল বা বহুদিন আদরণীয় থাকিবে এবং সেই পুস্তক ভাষার আদি সম্পত্তিরূপে বিবেচিত হইবে... যখন ভাষায় এমন পুস্তক লিখিত হইবে যে, সকল লোকেই তার গুণে বশীভূত হইয়া তাহার নিকট মস্তক অবনত করিবে... তখন সেই সমুদয়পুস্তক দেখিয়া ব্যকরণ রচনা হইবে। তখন বলা যাইবে ভাষার রীতি এই...।’

এভাবে ‘ঢাকা প্রকাশ’ সন্দেহাতীতভাবেই দেখিয়ে দেয় যে, বাংলা ভাষার তখনও পর্যন্ত কোনো ব্যাকরণ কিংবা সুনির্দিষ্ট লিখনশৈলী দাঁড়ায়নি, ‘সোমপ্রকাশ’সহ অনেকেই নতুন নতুন প্রণালী প্রচলিত করছেন। ঢাকা প্রকাশের প্রবন্ধকার আরও মত প্রকাশ করেন যে, ‘বিদ্যাসাগর, মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশ প্রভৃতি কলিকাতার প্রসিদ্ধ লেখকেরা যে হইবেক করিবেক এবং অতীত কালার্থে করেন, যান, দেন ইত্যাদি ব্যবহার করিয়াছেন, তৎপ্রতি দৃষ্টি না করিয়া যদি ইহাতে স্বীকার করা যায় যে ঐ অঞ্চলের কোন লেখকই এইরূপ শব্দব্যবহার প্রণালী অবলম্বন করেন না, তথাপি এই প্রণালীর অশুদ্ধতা কোন রূপে প্রমাণিত হয় না... এদেশ হইতে আমরা যদি আদেশ প্রচার করিয়া দি যে, অমুক অমুক শব্দ ও রীতি এদেশে প্রচলিত নাই, এদেশের গ্রন্থকাররা ব্যবহার করেন না ও এদেশের লোকের নিকট শ্রুতিকটু শুনা যায় অতএব কোনস্থানের লোকেই যেন তাহা ব্যবহার না করেন, তাহা হইলে আমাদিগের কথা যতদূর সঙ্গত ও প্রামাণ্য হইবে, অন্যস্থান হইতে ঐ প্রকার কথা বলিলেও তদরূপই হইবে সন্দেহ নাই।’

পুরো একশত তিরিশ বছর আগে ‘ঢাকা প্রকাশ’ নামের পত্রিকাটি সমরেশ মজুমদারের হাল আমলে ছড়ানো বিভ্রান্তির উত্তর দিয়ে রেখেছে! তবে দ্রষ্টব্য যে এখন পর্যন্ত প্রদত্ত উদাহরণগুলোতে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়গত ছাপ মেলেনি। সেটা শুরু হয় মুসলমান মধ্যবিত্তের উত্থান পরবর্তীকালে এবং, যেটা আগেই বলেছি, ১৯৪৭ এর পর অঞ্চল আর সম্প্রদায়ের পরিচয় এই যুদ্ধে একাকার হতে শুরু করে। আরও খেয়াল করবার বিষয় হলো, ভাষাতাত্ত্বিক যুক্তির জায়গাতে ‘ঢাকা প্রকাশ’ বরং কিছুটা রক্ষণাত্মক, ‘সোমপ্রকাশ’ আক্রমণাত্মক। এর কারণ খানিকটা আগেই ইঙ্গিত করেছি।

ভাষার বিষয় বৈচিত্রের স্বীকৃতি নিয়ে আগ্রহী থাকলেও সব ক্ষেত্রে ‘ঢাকা প্রকাশ’ কিংবা বাঙ্গাল প্রতিনিধিরা অতটা নমনীয় ছিলেন না, তারও দৃষ্টান্ত আছে। ওই ‘ঢাকা প্রকাশ’-এই পূর্বঙ্গীয়দের প্রতি এই ‘বিজাতীয় ঘৃণা’র জবাব ‘খোষ খবর’ শিরোনামায় পুরুষালী একটি উত্তরও দেয়া আছে। কেন পূর্ববঙ্গবাসীদের বাঙ্গাল বলা হয় সে নিয়ে পাঠানো এক প্রশ্নের জবাবে ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর রায়: ‘পত্র প্রেরকের লিঙ্গজ্ঞান থাকিলে বুঝিতেন; বাঙ্গাল শব্দটি পুংলিঙ্গ, আর বাঙ্গালী শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ।’ পশ্চিমা ভাইদের নিয়ে পূব দিকে এই মশকরাটি বোধহয় বেশ জনপ্রিয় ছিল, প্রায় অর্ধশতক পর অদ্বিতীয় পরিহাসবিদ ভানুও পশ্চিমবঙ্গবাসীকে জব্দ করতে লিঙ্গভেদের এই একই পুরুষালী অস্ত্রটি শানিয়েছিলেন বাঙ্গালের তূণ থেকে।

 

অবসরভোগী বনাম মেহনতি

প্রত্যুত্তর শুরু করলেও বহু মানদণ্ডে পূর্ব বাংলা পিছিয়ে যে বরাবরই ছিল, তার একটা নিদর্শন পাওয়া যাবে ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর একটা ঘটনা থেকে। বাংলা ১৩০৮ সালে ‘ঢাকা প্রকাশ’-এর মালিকানা কেনেন ত্রিপুরার মহারাজার মন্ত্রণাদাতা রাধারমণ। কারণটা ছিল অপমানবোধ। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বেঙ্গলী’ পত্রিকার অফিসে গেলে কথাপ্রসঙ্গে সুরেন্দ্রনাথ রাধারমণকে বলেন, ‘তুমি যাহাই বলো না কেন, যেখান হইতে এই উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগেও পড়িবার যোগ্য একখানি সংবাদপত্র প্রকাশিত হইতে পারে নাই, সেখানকার শিক্ষা দীক্ষার গৌরব করা যাইতে পারে না।’

‘পড়িবার যোগ্য’ কাগজ শুধু নয়, এই ঘটনার বহু বছর পরও সাধারণ শিক্ষাদীক্ষা-সাংস্কৃতিক তৎপরতায়ও যে পূর্ববঙ্গ অনেকটাই পিছিয়ে ছিল, এ তো সত্যি। কারণ উৎপাদনের বৃহদাংশ পূর্বের চাষীরা সম্পাদন করলেও ভোগটা প্রায় সর্বাংশে ঘটতো কলকাতা শহরে। উঁচুসাহিত্য তো অবসরজীবীদের বিলাস, শ্রমক্লান্ত পূর্ব বাংলা থেকে জমিদাররা রস অপহরণ করে কলকাতায় যে-বাংলা সংস্কৃতির গোড়ায় তা সিঞ্চন করেছেন, তারই অনিবার্য ফল এটা। এরই ফল বাঙ্গালের কলকাতায় আকর্ষণে ছুটে যেতে বাধ্য হওয়া। ‘কলকাত্তাইয়া’ হবার প্রাণপণ আকুতি, শুধু জমিদারির খাজনা ওড়ানোই নয়, শিক্ষা আর চাকরিরও সেরা সুযোগগুলো তখন কলকাতাকেন্দ্রিক, কিংবা সেখান থেকেই তা বণ্টিত হয়, এরই ফল বাঙ্গালের মুখের ভাষার অশুদ্ধ ঘোষিত হওয়া। কিন্তু এত কিছু ছাপিয়েও চাষাড়ে সুলভ গোঁয়ার্তুমির শক্তি তার ছিল। পাশাপাশি ছিল সহজ সজীব সৃজনশীলতা, বাংলাভাষা বহুবার তাতে সমৃদ্ধ হয়েছে। কলকাতা বাঙ্গালকে উদ্বাস্তু শ্রমিক কিংবা বিলাসী বাবু আকারে টেনে নিলেও আপন ছাপ সে কলকাতার ভাষাতেও ঠিকই রেখে দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং বিষয়টা খেয়াল করেছিলেন। ভাষার গতিশীলতার দিকেও তার নজরটা কড়াই ছিল: 

‘কলকাতা শহরের নিকটবর্তী চার দিকের ভাষা স্বভাবতই বাংলাদেশের সকল দেশী ভাষা বলে গণ্য হয়েছে। এই এক ভাষার সর্বজনীনতা বাংলাদেশের কল্যাণের বিষয় বলেই মনে করা উচিত। এই ভাষায় ক্রমে পূর্ববঙ্গেরও হাত পড়তে আরম্ভ হয়েছে, তার একটা প্রমাণ এই যে, আমরা দক্ষিণের লোকেরা ‘‘সাথে’’ শব্দটা কবিতায় ছাড়া সাহিত্যে বা মুখের আলাপে ব্যবহার করি নে। আমরা বলি ‘‘সঙ্গে’’। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কানে যেমনি লাগুক, ‘‘সঙ্গে’’ কথাটা ‘‘সাথে’’র কাছে হার মেনে আসছে। আরও একটা দৃষ্টান্ত মনে পড়ছে। মাত্র চারজন লোক : এমন প্রয়োগ আজকাল প্রায় শুনি। বরাবর বলে এসেছি ‘চারজন মাত্র লোক', অর্থাৎ চারজনের দ্বারা মাত্রা-পাওয়া, পরিমিত-হওয়া লোক। অবশ্য ‘মাত্র’’ শব্দ গোড়ায় বসলে কথাটাতে জোর দেবার সুবিধে হয়। ভাষা সব সময়ে যুক্তি মানে না।’

সার্বজনীন বাংলা হিসেবে কলকাতার বাংলাকে বাংলার জন্য কল্যাণকর বিবেচনাটি নিয়ে এক দফা জরুরি আলাপ হওয়া দরকার। তবে রবীন্দ্রনাথ এইখানে কলকাতা শহরের ভাষাকে ‘সকলদেশীর’, সেই হিসেবে, সর্বজনীন ঘোষণা করার পরও, তাকে বাংলাদেশের জন্য কল্যাণের বিষয় হিসেবে মানদণ্ডরূপে বিবেচনা করলেও বাস্তবতার ঝাঁঝ ততদিনে বোঝা যাচ্ছে। ও-দেশীয় কানে তা যেমনটাই লাগুক, কলকাতার দোর্দণ্ড প্রতাপের যুগেই পূবের রুচি যে তাতে ছাপ ফেলতে শুরু করেছিল, সেটা এই সাক্ষ্যে ভালোমতোই বোঝা যায়। 

‘সঙ্গে’ কথাটার তুলনায় ‘সাথে’ এমনই অনাড়ম্বর, সরল এবং আন্তরিক, হার না মেনে সঙ্গের হয়তো উপায় ছিল না। মুখের ভাষার জন্য বারণ হলেও কবিতার জন্য যে তা জায়েজ ছিল, তার কারণ হতে পারে এটাও যে ‘সঙ্গে’ কথাটার ছন্দসঙ্গী মোটে কয়টা: রঙ্গে-ঢঙ্গে-বঙ্গে-জঙ্গে-ভঙ্গে-টঙ্গে ইত্যাদি। অন্যদিকে ‘সাথে’ শব্দটির ছন্দসাথী অজস্র। কাব্যভাষা আর মুখের ভাষার মাঝে প্রভেদ মানার শিক্ষিত অনুশীলন সর্বজনের থাকে না বলেই কলকাতাবাসীদেরও হয়তো অনেকেই সহজে ‘সাথী’ হয়েছেন, ছন্দের শক্তিতেই। কিংবা আরও একটা সম্ভাবনা হলো জনদেবতার রায়; কলকাতা তো শুধু সংস্কৃতি আর ভোগের মধুর লোভে উড়ে যাওয়া অনুপস্থিত জমিদারদের কমলালয় ছিল না, পেটের খিদায় পাটকল-চটকলের টানে ঘূর্ণিবায়ুতে বালুকণার মতো বাংলার সর্বত্র থেকে তারা জড়ো হচ্ছিল কলকাতায়। হয়তো তাদের সূত্রেও সাথী হঠিয়ে দিচ্ছিল সঙ্গীকে। সৈয়দ মুজতবা আলীও তার একটি প্রবন্ধে বাংলা ভাষার জমাখরচ হিসেব করতে গিয়ে পূর্ব বাংলার দাপটে পশ্চিম বাংলার কথ্যরীতির পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন।

‘সঙ্গে’ এবং ‘সাথে’ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আঞ্চলিকতার গোড়ামি থেকে মুক্ত হয়ে একে গ্রহণ করবার পক্ষেই ইশারা দিয়েছিলেন বটে, পূর্ববাংলায় কিন্তু তা এখনও বেশ জোরেশোরেই সিন্দাবাদের ভূতর মতো চেপে বসে আছে, কোনো কোনো স্থলে হয়তো নিছক অভ্যাসবশতই, নিজেদের অজ্ঞাতসারেই। একটা উদাহরণ দেই। বহু বছর পর একটি দৈনিক পত্রিকায় চাকরিসূত্রে সেখানকার বানান মার্জনাকারীদের মুখে প্রথমবার শুনেছিলাম, কবিতা ছাড়া অন্য সর্বত্র ‘সাথে’ কেটে ‘সঙ্গে’ করতে হবে, সেটাই শুদ্ধ। অবাক হয়েছিলাম, কলকাতার ভরামাঠে খেলায় জিতে এসেও নিজের দেশেই ‘সাথে’ হীনম্মন্যতা সংস্কারের শিকার হয়ে আছে আজও! অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে, মাহবুবুল হক, সাজ্জাদ শরীফ, অরুণ বসু ও ফরহাদ মাহমুদের মতো চার কৃতী ভাষা বিশেষজ্ঞ মিলে যে প্রথম আলো ভাষারীতিটি তৈরি করেছেন, সেখানেও ‘সাথে’ ব্যবহার না করে ‘সঙ্গে’ ব্যবহারের নির্দেশনা আছে। যদিও পত্রিকাটার অন্তর্জালিক ঠিকানাতে সঙ্গে আর সাথে দুটিই ব্যবহারেরই নমুনা আছে, ছাপা পত্রিকাতে সঙ্গের সংখ্যাই বিপুল।

কিন্তু বাংলা ভাষা ঔপনিবেশিক কলকাতার ছকে চিরতরে আটকা পড়ে আছে, এমন কোনো সংস্কারে আস্থা রাখা কঠিন। ভাষা এত বেশি বাস্তব বিষয় যে একদিকে তাকে প্রতিদিন নিয়মের সাথে সংগ্রাম করতে হয়, অন্যদিকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন নতুন শব্দ ও প্রয়োগ বের করে নিতে হয়। পূর্ববঙ্গে ছাপা একটি পত্রিকা হাতে পেয়ে সেখানে ‘ভাষাভাষী’ এই শব্দটি দেখে ‘হাসাহাসি’ করতে ইচ্ছা হয়েছিল প্রমথ চৌধুরীর, আজ সেটা প্রয়োজনীয় একটা শব্দ। একই পত্রিকায় ‘সাহিত্যিক’ শব্দটি দেখে তার মনে হয়েছিল ভাষার ওপর ‘বলাৎকার’, কেননা তা নাকি সংস্কৃত ও বাংলা উভয় ব্যাকরণমতে অশুদ্ধ। অথচ আমরা আজ জানি, ‘সাহিত্যিক’ হিসেবে প্রমথ চৌধুরী চলিত রীতিকে আধুনিকায়নে এবং বাংলাকে সাবলীল করার বেলায় বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পৃথক হয়ে একদম ভিন্ন ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে বলেও মনে করা কঠিন, যদিও সেই আশঙ্কা কিংবা আশাবাদ সুনীতিকুমারেরর মতো ভাষাতাত্ত্বিক বা কায়কোবাদের মতো কবি করেছিলেন, হিন্দু বাংলা আর মুসলমান বাংলা আকারে দুটো রূপের বিকাশের সম্ভাবনা দেখে। তবে এটা ঠিক যে আনন্দবাজার পড়তে আমাদের যেমন কিছু খটকা লাগে, বাংলাদেশের পত্রিকা বিষয়েও নিশ্চয়ই তাদেরও তেমন কিছুটা হয়। বাদানুবাদ বাংলাদেশের পত্রিকায় প্রচুর দেখি, আনন্দবাজারে দেখি ‘তরজা’।

ভাষার সাথে অর্থনীতির এবং উৎপাদনশীলতার যে অঙ্গাঙ্গি সম্পর্কটি রয়েছে, সেটা পশ্চিম বাংলাকে খানদানি অর্থে একটি সনাতন, শরিফ ভাবগাম্ভীর্য হয়তো দেয়, কিন্তু মুখের ভাষা আপন গতিতে রাস্তা কেটে এগিয়ে যায়। সেই কারণেই প্রয়োজন মাফিক পুরানো বহু কিছু সে গ্রহণ করে, প্রয়োজন মতো বর্জনও করে, জীবনের গতি ও স্ফূর্তি যেখানে জমাট, সেখানে বৈচিত্র সংগ্রহ করে শক্তিশালী হতে থাকে। ব্যাকরণে ভুল হলেও যেমনটা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘“মাত্র” শব্দ গোড়ায় বসলে কথাটাতে জোর দেবার সুবিধে হয়।’ ভাষার বিকাশ গঞ্জে, ভাষার দাঁতকপাটি গোড়ামিতে।

 

ফিরোজ আহমেদ: লেখক, অনুবাদক ও রাজনৈতিক কর্মী

শেয়ার করুন