বঙ্গবন্ধু ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া নেতা ছিলেন না

বঙ্গবন্ধু ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া নেতা ছিলেন না

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া নেতা ছিলেন না। তিনি ধীরে ধীরে উপরে উঠেছেন। কারো তৈরি করা সিঁড়ি দিয়ে নয়, নিজে সিঁড়ি তৈরি করেছেন, তারপর ধাপে ধাপে উপরে উঠেছেন। মানুষের মধ্যে থেকে, মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রাজনীতির ইমারত গড়ে তুলেছিলেন বলে তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন, মানুষকে বিশ্বাস করতেন। আর তাই তার সবলতা যেমন মানুষকে ভালোবাসা তেমনি দুর্বলতাও মানুষকে ভালোবাসা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিবিসির জরিপে যখন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে নির্বাচিত করে সেটা ঘোষণা দেয়া হয়, তখন কারো কারো মধ্যে যে বিস্ময় দেখা দেয়নি, তা নয়। রাজনীতি-সাহিত্য, শিল্প-অর্থনীতি, বিজ্ঞান-সমাজ, সংস্কৃতি-শিক্ষা, সংস্কারের শত শত বছরের ইতিহাসে সব বাঙালিকে ছাড়িয়ে শেখ মুজিব কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হলেন তার উত্তর অত্যন্ত সহজ– তিনি বাঙালির ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, জনক।

শেখ মুজিব একদিকে যেমন ইতিহাসের নায়ক, আবার অন্যদিকে তিনি ইতিহাস-স্রষ্টাও। পুঁথিগতবিদ্যা-বুদ্ধিমত্তা-সৃজনশীলতায়- তার চেয়ে সেরা বাঙালি হয়তো আরও এক বা একাধিক পাওয়া যাবে কিন্তু শেখ মুজিবের মতো অসম সাহসী, দূরদর্শী এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারদর্শী রাজনৈতিক নেতা বাঙালিদের মধ্যে আর খুব বেশি নেই। তিনি জীবনের পাঠশালা থেকে শিক্ষা নিয়ে ক্রমাগত নিজেকে অতিক্রম করেছেন, অতিক্রম করেছেন তাদের, যাদের কাছ থেকে তিনি রাজনীতির অ আ ক খ শিখেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া নেতা ছিলেন না। তিনি ধীরে ধীরে উপরে উঠেছেন। কারো তৈরি করা সিঁড়ি দিয়ে নয়, নিজে সিঁড়ি তৈরি করেছেন, তারপর ধাপে ধাপে উপরে উঠেছেন। মানুষের মধ্যে থেকে, মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রাজনীতির ইমারত গড়ে তুলেছিলেন বলে তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন, মানুষকে বিশ্বাস করতেন। আর তাই তার সবলতা যেমন মানুষকে ভালোবাসা তেমনি দুর্বলতাও মানুষকে ভালোবাসা।

এ তথ্য আমাদের অজানা নয় যে, শেখ মুজিব ছিলেন গ্রামের ছেলে। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার মতো অজপাড়া গাঁয়ের কাদাপানিতে তার বেড়ে ওঠা। নিজে একেবারে দরিদ্র পরিবারের সন্তান না হলেও তিনি তৎকালীন গ্রামীণ দারিদ্র্য দেখেছেন খুব কাছে থেকেই। মানুষের অভাব-দারিদ্র্য তিনি সইতে পারতেন না। বালক বেলাতেই নিজেদের গোলার ধান চুপিসারে বিলিয়ে দিতেন গরিবদের। গায়ের চাদরও খুলে দিয়েছেন শীতে কষ্ট পাওয়া গ্রামীণ মানুষকে। থাকা এবং না-থাকার বিষয়টি তাকে ছোটবেলা থেকেই ভাবিত ও তাড়িত করেছে। তার মধ্যে একটি সহজাত নেতৃত্ব গুণ ছিল। সবার মধ্যে থেকেও তিনি একটু আলাদা। ফুটবল খেলতেন, তবে শুধু খেলোয়াড় ছিলেন না, ছিলেন ক্যাপ্টেন। তিনি বাল্যকাল থেকে যেমন হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ মানতেন না, অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষে ছিলেন, তেমনি একশ্রেণির হিন্দুর অহমিকা, দম্ভ, গরিবের প্রতি জুলুমবাজিরও বিরুদ্ধে ছিলেন।

তিনি তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতা থেকে একটি রাজনৈতিক পথ বা আদর্শ বেছে নিয়েছিলেন, আর সেটা হলো ‘গরিবের মুখে হাসি ফোটানো’। তিনি এই আদর্শ কখনও ত্যাগ করেননি। গরিবের পক্ষ তিনি কখনও ত্যাগ করেননি। ত্যাগ করার কথাও ভাবেননি। গরিব মুসলমান তার ভাগ্য ফেরানোর আশা নিয়ে পাকিস্তান চেয়েছে, সামনের কাতার থেকে পাকিস্তান আন্দোলনে শরিক থেকেছেন। আবার পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই যখন তিনি পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর বাঙালির স্বার্থবিরোধী মনোভাব বুঝতে পারলেন, অমনি গরিব বাঙালির পক্ষেই অবস্থান বেছে নিলেন। শুরু হলো তার বিরুদ্ধে শাসকগোষ্ঠীর জেল-জুলুম।

‘কারাগারের রোজনামচা’য় তিনি নিজেই লিখছেন-

“পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পরেই ১৯৪৮-এ যখন আমাকে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার করলো, আবার ১৯৪৯ সালে গ্রেপ্তার করে ১৯৫২ সালে ছাড়লো, তখন আমার মা আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘বাবা, তুইতো পাকিস্তান পাকিস্তান করে চিৎকার করেছিস, কত টাকা নিয়ে খরচ করেছিস– এদেশের মানুষ তো তোর কাছ থেকেই পাকিস্তানের নাম শুনেছিল, আজ তোকেই সেই পাকিস্তানের জেলে কেন নেয়?”(পৃষ্ঠা ৭৯)

সহজ-সরল মায়ের এই প্রশ্নের সঠিক জবাব তিনি দিতে পারেননি অথবা দেননি। তার গরিবমুখী, বাঙালিমুখী অবস্থানের কারণেই যে তাকে শাসকদের রোষানলে পড়তে হয়েছিল, এটা এখন সবারই জানা।

একাধিকবার তাকে ফাঁসির মঞ্চের মুখোমুখি করা হলেও তিনি আপস করেননি। নিজের সাহস তিনি বাঙালি জাতির মধ্যে সংক্রমিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার ডাকে বাঙালি অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে। মরণকে বরণ করেছে হাসি মুখে। তাই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তার জীবনের সেরা ভাষণে শেখ মুজিব অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পেরেছিলেন-

“আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না।” বাঙালিকে আসলেই আর কেউ ‘দাবায়ে’ রাখতে পারেনি। পাকিস্তানের শাসন-শোষণের জিঞ্জির ভেঙে বাঙালি স্বাধীনতার রক্তপতাকা ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশে গরিবের পক্ষের রাজনৈতিক ধারার অনুকূলেই তার অবস্থান নিশ্চিত করে বলেছিলেন-

“পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত – শোষক এবং শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।” বঙ্গবন্ধু বিশ্ব রাজনীতিতে তার অবস্থান ঘোষণা করেছিলেন এই বলে, “আমাদের পরিষ্কার কথা – আফ্রিকা হোক, ল্যাটিন আমেরিকা হোক, আরবদেশ হোক, যেখানে মানুষ শোষিত, যেখানে মানুষ নির্যাতিত, যেখানে মানুষ দুঃখী, যেখানে মানুষ সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা নির্যাতিত, আমরা বাংলার মানুষ দুঃখী মানুষের সঙ্গে আছি এবং থাকবো।”

নানা বাস্তব কারণেই তিনি এই রাজনীতিকে সফল পরিণতি দিতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বিভিন্ন শক্তির কাছে বিষফোঁড়ার মতো অস্বস্তিকর ছিলেন। তাকে হত্যা করার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া অশুভ গাঁটবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল।

এক জীবনে একজন মানুষ একসঙ্গে বহু ইতিহাস রচনা করতে পারেন না। টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবুর রহমান, অনেকের মুজিব ভাই, মওলানা ভাসানীর মজিবর, কারোবা শেখ সাহেব, ১৯৬৯-এ এসে বঙ্গবন্ধু এবং সবশেষ একাত্তরের যুদ্ধ জয়ের পর জাতির পিতা । বেঁচে থাকলে হয়তো আরও অনেকদূর যেতে পারতেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতক দল তাকে সপরিবারে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে তার জীবনের গতি রোধ করে দেয়া হয় চিরদিনের মতো।

১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দেয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-

“বাংলাদেশ যেমন লক্ষ লক্ষ শহীদের জন্ম দিয়েছে, তেমনি বেঈমানও রয়েছে। এখানে রাজাকার-আলবদরও হয়েছে। এসব পরগাছার শিকড় তুলে তা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তা না হলে স্বাধীনতা বিপন্ন হবে। কেউ কেউ আবার অতি বিপ্লবের নামে তলে তলে ষড়যন্ত্র করছে।”

বঙ্গবন্ধু শত্রু চিহ্নিত করেছিলেন ঠিকই। পরগাছার শিকড় তুলে আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার কথা বললেও সে লক্ষ্যে খুব বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেননি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত হৃদয়বান মানুষ। তিনি মানবিক সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বেও ছিলেন না। তিনি কখনও প্রতিহিংসার রাজনীতি করেননি। ঘোরতর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্যও ছিল তার বুক উজাড় করা ভালোবাসা। রাজনীতিতে উদারতা ও কঠোরতার যে সমন্বয় দরকার, বঙ্গবন্ধু তা করেননি। তিনি ছিলেন কেবলই উদার, মানবিক এবং সংবেদনশীল। তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে যে হিংসার রাজনীতির শুরু হয়েছে তা আর বন্ধ হচ্ছে না।

বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর রাজনৈতিক ব্রত থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। সদ্যস্বাধীন দেশে গরিবের হক কেড়ে খাওয়া ‘চাটার দল’-এর বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। তিনি বলেছিলেন-

“স্বাধীনতা অর্জন করা যেমন কষ্টকর, তা রক্ষা করা তার চাইতেও কঠিন। দেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন।”

বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অধিবেশনে বলেছিলেন- “আমাদের নীতি পরিষ্কার। এর মধ্যে কোনো কিন্তু নাই। আওয়ামী লীগ কাউন্সিলই সুপ্রিম বডি। আপনাদের সিদ্ধান্ত সরকারকে মানতে হবে। এটা আওয়ামী লীগের সরকার। সরকারের আওয়ামী লীগ নয়। আমার অনুরোধ, নির্দেশ, আবেদন- কাজ করতে হবে। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে হবে। ক্ষমতা দখলের জন্য আওয়ামী লীগ সংগ্রাম করেনি। তাই সবাইকে লোভের ঊর্ধ্বে, স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।”

বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা সবাই কি লোভের ঊর্ধ্বে, স্বার্থের উর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন? আজ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। মানুষ কি সরকার এবং আওয়ামী লীগকে আলাদা করে চিনতে পারছে? আওয়ামী লীগ নামের ইতিহাস সৃষ্টিকারী দলটি কি এখন সরকারের মধ্যে হারিয়ে যায়নি? বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন সময় যেসব বক্তব্য দিয়েছেন সেসব মনে-মননে ধারণ না করে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে তাকে স্মরণ করা আসলে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন নয়। ঠুনকো আবেগ দিয়ে নয়, বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানাতে হবে তার নীতি-আদর্শের যথাযথ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন

মন্তব্য

‘অন্তর মম বিকশিত করো’

‘অন্তর মম বিকশিত করো’

কিছু মানুষের খোলসের ভেতর এখন দানবের অবয়ব। আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশটা ভয়াবহ দানবে ছেয়ে গেছে। অশিক্ষা-কুশিক্ষা মানুষকে কতটা রুচিহীন-দায়িত্বহীন-সংস্কৃতিহীন ও বোধহীন করেছে; চারপাশে চোখ বোলালেই বোঝা যায়। মনুষ্যত্বের জায়গাটা বড়ই নড়বড়ে হয়ে গেছে, ভয়াবহ অবক্ষয় বাসা বেঁধেছে মানুষের মনোজগতে।

আদিতে রাষ্ট্র ছিল না। রাষ্ট্রের আগেই সম্প্রদায় ছিল, সমাজ ছিল। রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে অনেক অনেক পরে। সমাজে সম্প্রদায়সমূহের সুশৃঙ্খল বিন্যাসের নিমিত্তেই রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তাই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মঙ্গলের জন্য সাধারণ ইচ্ছার ফল হিসেবে সামাজিক চুক্তির বাস্তব রূপই রাষ্ট্র।
একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের একত্রিত মঙ্গলার্থে কাজ করতে রাষ্ট্রগুলো আর ইচ্ছুক নয়। এখন দেশে দেশে অতিমাত্রায় আগ্রাসী, উগ্র ও জাতীয়তাবাদী সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায়। তারা বিভিন্ন বিভাজনে বিভাজন করছে রাষ্ট্রের মানুষদের। এসব কর্তৃত্ববাদী সরকারের কারণে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ, সম্প্রদায়, গোত্রের মানুষ অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। সৃষ্টি হচ্ছে মানুষে মানুষে বিভেদ-প্রভেদ, সংঘাত। মানুষ অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে, তৈরি হচ্ছে আস্থাহীনতা। মানুষ ভাবতে শুরু করেছে যেকোনো মেরুকরণের কারণে সে হতে পারে নির্যাতিত, নিপীড়িত, বাস্তুহীন, এমনকি রাষ্ট্রহীন।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সারা পৃথিবীতে যুগে যুগে সংখ্যালঘুরা নিগৃহীত, নির্যাতিত, নিপীড়িত, উপেক্ষিত। তা সে জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু যা-ই হোক না কেন । জিন্নাহ-নেহেরুর ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের কুফল সরাসরি ভোগ করছে মানুষই।
শুধু ধর্মের কারণে দুটি ভূখণ্ড যে এক থাকতে পারে না, সেটাও একাত্তরে ফায়সালা হয়ে গেছে। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, এদেশের মাটি-পানি, বায়ুতে বেড়ে ওঠা মানুষেরা কখনোই আলাদা সত্তা নয়। তারা একই হৃদয়ের অভিন্ন মানুষ। যুগে যুগে রাজনীতি এবং অর্থনীতির নোংরা খেলায় পর্যুদস্ত হয়েছে জীবন, জীবনের বোধ, মর্যাদা।

সুজলা-সুফলা শ্যামল বাংলার সবুজে আচ্ছাদিত এই দেশটিতে গত শতাব্দীর শেষের দিকেও দেখেছি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চমৎকার সহাবস্থান। ধর্ম-বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে একজন আরেকজনের পরম বন্ধু, আত্মার আত্মীয়। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে একত্রিত হওয়া, ঈদে পুজোয় অন্য ধর্মের বন্ধুদের বাড়িতে নেমন্তন্ন খাওয়া, মণ্ডপে মণ্ডপে পুজো দেখতে যাওয়ার চমৎকার রেওয়াজ ছিল। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে, উগ্র হতে দেখিনি। ভারতের বাবরি মসজিদ ইস্যুতেও অনেকটাই সুস্থির ছিল আমাদের এই ভূখণ্ড। সেটিও ছিল রাজনৈতিক চক্রান্ত।
চোখের সামনেই পাল্টে গেল দেশটা। ক্রমান্বয়ে স্বার্থ হাসিলের সবচেয়ে বড় পুঁজি হয়ে দাঁড়াল ধর্মীয় অনুভূতি। বিবেকহীন হতে হতে উন্মত্ততা বাসা বাঁধল মগজে। মানুষকে কুপোকাৎ, ঘায়েল করার পুরোনো মোক্ষম অস্ত্র ধর্মীয় অনুভূতিকেই বার বার কাজে লাগায় স্বার্থান্বেষীরা। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। মাঝখান থেকে ঝোঁকের মাথায় বুঝে উঠতে না পারা অকারণ কিছু প্রাণ গেল।
কিছু মানুষের খোলসের ভেতর এখন দানবের অবয়ব। আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশটা ভয়াবহ দানবে ছেয়ে গেছে। অশিক্ষা-কুশিক্ষা মানুষকে কতটা রুচিহীন-দায়িত্বহীন-সংস্কৃতিহীন ও বোধহীন করেছে; চারপাশে চোখ বোলালেই বোঝা যায়। মনুষ্যত্বের জায়গাটা বড়ই নড়বড়ে হয়ে গেছে, ভয়াবহ অবক্ষয় বাসা বেঁধেছে মানুষের মনোজগতে।
এক অন্ধকার সময়ে, অন্ধকার পৃথিবীতে আলো খুঁজে ফিরছি আমরা যারা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু কোথাও আলো নেই। চারদিকে শুধু বিষাদাচ্ছন্ন অন্ধকার।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উদযাপনের সময়ে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নিয়ে সাম্প্রদায়িক ঘটনাটি একেবারেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। কারণ যাদের ধর্মীয় উৎসব চলছে; তারা নিজের ধর্মকে রক্ষা করতে, ধর্মের পবিত্রতা অটুট রাখতে, উৎসব উদযাপন ক্ষুণ্ন করতে এ কাজটি করবে না, নিশ্চিত করেই বলা যায়। খুব স্বল্প বুদ্ধির মানুষও বুঝতে পারবে, এটি ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল অথবা অন্য যেকোনো কারণে হলেও অবশ্যই ধর্মীয় কারণে নয়। ধর্মপ্রাণ মুসলমান বা হিন্দুদের দ্বারা কাজটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
কোনো বিশেষ পরিস্থিতির প্রথম শিকার সংখ্যালঘু মানুষ। বাড়িঘরে আগুন দিয়ে, খেতের ফসল পুড়িয়ে, শারীরিক নির্যাতন করে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দিয়ে, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটিয়ে বিভীষিকা তৈরি করে তাদের দেশছাড়া করার চক্রান্ত করা হয়। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থকেন্দ্রিক এই কাজটা সুকৌশলে করার জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতা অথবা সংবেদনশীল সময়ের অপেক্ষা করে সুযোগ সন্ধানীরা। এক্ষেত্রে শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিবেচ্য নয়, আদিবাসী বা রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীও এর শিকার হয়।

ধনী-দরিদ্র‍, মুসলিম-অমুসলিম, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুতে, ‘উঁচু-নিচু’ বংশ, স্থানীয়-বহিরাগত, পুরুষ-নারীতে এবং এমন আরও অসংখ্য কারণে সাম্প্রদায়িকতা হয়। সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা বেশিরভাগ মানুষের ভেতরই সাম্প্রদায়িকতা স্পষ্টভাবে বা সুপ্তাবস্থায় বিরাজমান থাকে।
এ কারণেই এই দেশে হিন্দু নির্যাতন হয়, ভারতে মুসলিম নির্যাতন হয়, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন হয়, চায়নায় উইঘুর জনগোষ্ঠী নির্যাতন হয়, ইউরোপ-আমেরিকায় কালো নির্যাতন হয়। যদিও সবখানে ভিন্ন মাত্রা বা কৌশল যোগ করা হয়।
বিশ্বায়নের কালে প্রতিনিয়ত আমরা একদেশ থেকে আরেক দেশে ছোটাছুটি করি। তাই কেউ একদেশে সংখ্যাগুরু হলেও অন্যদেশে সে সংখ্যালঘু। বাংলাদেশে মুসলিম হিসেবে কেউ সংখ্যাগুরু হলেও ভারত বা আমেরিকায় কিংবা শ্রীলঙ্কায় সে সংখ্যাল। বাংলাদেশে বাঙালি হিসেবে কেউ সংখ্যাগুরু হলেও ইউরোপে সে সংখ্যালঘু।
রামুর বৌদ্ধ মন্দির ভাঙা, গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লিতে আগুন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রসরাজ নামের নিরীহ ছেলেকে ফাঁসিয়ে দিয়ে বাড়ি ও মন্দিরে আগুন দেয়ার ঘটনাগুলো ঘুরেফিরে দেখতে হচ্ছে। মসজিদ- মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা, প্রতিমা ভাঙার ঘটনাও বার বার দেখতে হচ্ছে। মৌলবাদী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক উস্কানিতে আর একটা প্রাণেরও বিনাশ দেখতে চাই না।
আমরা শুধু মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ,খ্রিস্টান হতে চাই না। আমাদের আদি এবং অকৃত্রিম পরিচয় বাঙালি। আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, লোকাচার-ঐতিহ্য সবই বাঙালিত্বকে ঘিরে। এই জীবনবোধই আমাদের শেখায় ভিন্ন ধর্ম, জাতি, ভাষার মানুষের প্রতি সহনশীলতা, সহমর্মিতা, ভালোবাসা।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্রও ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। ’৭২ সালের সংবিধানেও রাষ্ট্রীয় চারনীতির একটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। তবুও অস্থিরতার এই সময়ে প্রতিমা ভাঙচুর, ভূমি দখলসহ বেশকিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটেই চলেছে। এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার নজিরও কম। যে কারণে সংখ্যালঘুরা সবসময় নিরাপত্তার অভাব বোধ করে। তাদের মনে অনিরাপদবোধ ও পলায়নপর মনোভাব কাজ করে, সেগুলো দূর করার জন্য সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনলে, আস্থার ক্ষেত্র প্রস্তুত হলে সংখ্যালঘুরা আর নিজেদের সংখ্যালঘু মনে করবে না।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল ক্ষেত্র আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ। ছোট ভূখণ্ডের বড় জনসংখ্যার এই দেশে সবাই নিরাপদে থাকুক, স্বস্তিতে থাকুক, শান্তিতে থাকুক। মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির বন্ধন আরও গভীর হোক। ভালো থাকার জন্য, নিরাপদে থাকার জন্য, বিশ্বাসের জন্য এ বন্ধন খুবই জরুরি।
এই দেশ, এই মাটি সবার। এই ভূমিতে জন্ম নেয়া প্রতিটি মানুষই এ দেশের নাগরিক। কেউ এখানে সংখ্যালঘু নয়। এখানে সবার সমানাধিকার রয়েছে। নিশ্চিতভাবে যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে।
মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হলে, ভালোবাসতে হলে সভ্যতার আলোয় নিজেকে আলোকিত করতে হবে। সংস্কৃতিগতভাবে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার মাঝেই নিহিত আছে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ক্ষয়ের উপায়। ‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে’…
লেখক: প্রাবন্ধিক-শিক্ষক

শেয়ার করুন

নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা

নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা

সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আর নির্বাচন করার সুযোগ নেই। কাজেই দলীয় সরকারের অধীনেই আমাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ খুঁজতে হবে। যোগ্য, দক্ষ ও সাহসী কমিশন হলে দলীয় সরকারের অধীনেও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নির্বাচনের চেষ্টা অন্তত করতে পারে।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হচ্ছে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ। নতুন কমিশন গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠনপ্রক্রিয়ার জন্য আমাদের দেশে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। তাই কথা উঠেছে একটি আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও।

কমিশন গঠনের জন্য সংবিধানে মোটা দাগে কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা গাইডলাইন দেয়া আছে। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশের সংবিধানেই এরকম কিছু নীতিমালার কথাই বলা থাকে। এর ভিত্তিতেই গঠিত হয় নির্বাচন কমিশন।

দেশের সংবিধানে আছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন হবে। রাষ্ট্রপতি এই পাঁচজন নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ করবেন এ উদ্দ্যেশ্যে প্রণীত একটি আইনের মাধ্যমে। কিন্তু আজ অবধি আমরা ওই আইনটি হাতে পাইনি।

বাস্তবতা হচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্য এরকম একটি আইন করা কঠিনই বটে। তড়িঘড়ি করে যাচাই-বাছাই ছাড়া আইন প্রণয়ন করা যেতেই পারে, কিন্তু তাতে আইনের উদ্দেশ্য সফল হয় না। উল্টো আইন নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। তবে গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনেরও যে কোনো বিকল্প নেই সে বিষয়টিও আমাদের ভাবতে হবে।

বর্তমান কমিশনের মতোই যদি একটি কমিশন গঠন করা হয়, তবে সেই কমিশনের ওপর সব দলের আস্থা থাকবে কি না সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা রাখতে পারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে নবগঠিত এই নির্বাচন কমিশনের অধীনেই। কাজেই এই কমিশনের ওপর আস্থার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার সার্চ কমিটি গঠন করে সে কমিটির সুপারিশ করা ব্যক্তিদের নিয়েই কমিশন গঠন করতে চায়। এর মাধ্যমে সরকার মূলত নিরপেক্ষভাবে কমিশন গঠনের একটি বার্তা দিতে চায়। সন্দেহ নেই এটি একটি শুভ উদ্যোগ।

কারণ, বর্তমান সংবিধানের অধীনে এরকম কোনো সার্চ কমিটি গঠনের সুযোগ নেই। তবে সার্চ কমিটি গঠন যে সংবিধানের লঙ্ঘন সেটিও নয়। আসলে এ বিষয়ে সংবিধানে কিছু বলা নেই। আইন প্রণয়ন হলে সেখানে হয়তো কমিশনারদের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ থাকত। যদিও ভারতে প্রণীত আইনে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে কিছু বলা নেই।

বর্তমান কমিশনও সার্চ কমিটির বাছাইকৃতদের নিয়েই গঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি সব দলের কাছ থেকেই তাদের প্রস্তাবিত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নাম চেয়েছেন। বর্তমান কমিশনে বিএনপির মনোনীত একজন কমিশনারও আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শুধু একজন নির্বাচন কমিশনার, অথবা প্রধান নির্বাচন কমিশনার অথবা এমনকি শুধু নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষেই কি একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব? অন্তত আমাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়? নিরপেক্ষতার বিষয়টি তো শুধু নির্বাচন কমিশনের একার বিষয় নয়। আর কমিশনের নিরপেক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে এর দক্ষতা, যোগ্যতা ও সাহসিকতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

এ মুহূর্তে সার্চ কমিটি ছাড়া অন্যকোনো বিকল্প আছে কি? যাচাই-বাছাই করে একটি কার্যকর আইন প্রণয়নের সময়ও হাতে নেই। আইনমন্ত্রী যদিও বলছেন কোভিড সিচুয়েশনের জন্য আইন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেছেন,কোভিড সিচুয়েশন ইমপ্রুভ করলে পুরো সংসদে আমরা সাড়ে তিনশ’ সদস্য বসতে পারব, বসে এই রকম একটা গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করতে পারব।’

কিন্তু আইন করার জন্য সংসদে তিনশ’ সদস্যের উপস্থিতি লাগে না। আইন পাসের জন্য সর্বনিম্ন সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট। মূল বিষয়টি হচ্ছে একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর আইন প্রণয়ন করার মতো সময় হাতে নেই। এ আলোচনাটা আরও আগেই ‍শুরু হতে পারত।

রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করে গেজেট নোটিফিকেশন জারি করেন। সংবিধান অনুযায়ী ‘নোটিফিকেশন’ ও আইনের মর্যাদাসম্পন্ন (১৫২ অনুচ্ছেদ)। কিন্তু তারপরও সার্চ কমিটি গঠন করা আইনের বিকল্প নয়। হলে অন্যান্য দেশও সার্চ কমিটি গঠন করেই কমিশন গঠন করত। কেউ আর আইন প্রণয়ন করত না। এর বিপরীতেও বলা যায়, আইন প্রণয়ন করলেই কি একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা যায়, বা নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব?

ভারত ১৯৯১ সালে আইন করেছে। ১৯৯১-এর আগে কি তারা নিরপেক্ষ নির্বাচন করেনি? এখনও পৃথিবীর অনেক দেশেই নির্বাচন কমিশনের কোনো আইন নেই, তারা কি নিরপেক্ষ নির্বাচন করছে না? কাজেই শুধু আইন প্রণয়ন করেই নিরপেক্ষ, যোগ্য ও দক্ষ কমিশন গঠন করা যায় না, যায় না নিরপেক্ষ নির্বাচন করাও। নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সব দলের সদিচ্ছা বিশেষ করে সরকারের সদিচ্ছা জরুরি। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

রাষ্ট্র চালায় নির্বাহী বিভাগ। নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছা অনুযায়ীই রাষ্ট্রের সব কাজ পরিচালিত হয়। এটাই আমাদের সংবিধানের বিধান। সংবিধান অনুযায়ী দেশে সংসদীয় শাসন বিদ্যমান। রাষ্ট্রপতির এখানে কার্যত তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা।

প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য সব দায়িত্ব পালনে তিনি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাধীন। কাজেই যে সার্চ কমিটি গঠনের কথা বলা হচ্ছে, তাও তিনি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বাইরে গিয়ে করতে পারবেন না। কমিশনার নিয়োগতো পরের কথা। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি ছাড়া সার্চ কমিটির সদস্যদের ঠিক করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নেই। এটাই সংবিধানের বিধান।

সার্চ কমিটিতে কারা থাকবেন সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ তারা চাইলে যে কাউকেই (গ্রহণযোগ্য) সুপারিশ করতে পারেন। সে সুপারিশ মানা না মানা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাধীন রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বিষয়। তবে সার্চ কমিটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতেই পারে। আর রাষ্ট্রপতিও যৌক্তিক কারণেই কমিটির বাছাইকৃত ব্যক্তিদের থেকে কমিশনার নিয়োগ দেবেন। ফলে, অনেক সীমাবদ্ধতা থাকলেও সার্চ কমিটি নিরপেক্ষভাবে কাজ করলে একটি গ্রহনযোগ্য সুপারিশ এলেও আসতে পারে।

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১২ জন প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭ জনই ছিলেন বিচারপতি। বিচারপতি ও পঞ্চম প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অধীনে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন থেকেই দেশে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের শুরু।

যদিও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিতর্কটি এখানে আরও আগের। ৯০-এর আগের নির্বাচন বিতর্ক যতটা না নির্বাচনকেন্দ্রিক তারচেয়েও বেশি ছিল শাসনতান্ত্রিক। কারণ, তখন দেশে গণতন্ত্রেরই উত্তরণ ঘটেনি। নির্বাচন বিতর্কতো আরও পরের কথা। ’৯০-এর পরে বিচারপতি এ. কে. এম সাদেক, মোহাম্মদ আবু হেনা, এম এ সাঈদ-এর অধীনে আমরা কয়েকটি সুষ্ঠু নির্বাচন পেয়েছি। এ নির্বাচনগুলো ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। বিচারপতি এম এ আজিজ থেকে আবার শুরু হয় নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিতর্ক। এর পর শামসুল হুদা কমিশনের অধীনে আমরা ২০০৮-এর নির্বাচন পেয়েছি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত হওয়ার পর গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে আমরা পেয়েছি রকিবুদ্দিন ও নুরুল হুদা কমিশন। এই দুই কমিশনের অধীনে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে পর পর দুইটি নির্বাচন হয়েছে। এ দুটি নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়েই নতুন কমিশন গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। কমিশন ও সরকারের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। অতীতের সুষ্ঠু নির্বাচনের ইতিহাস সে কথাই জানান দেয়।

সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আর নির্বাচন করার সুযোগ নেই। কাজেই দলীয় সরকারের অধীনেই আমাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ খুঁজতে হবে। যোগ্য, দক্ষ ও সাহসী কমিশন হলে দলীয় সরকারের অধীনেও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নির্বাচনের চেষ্টা অন্তত করতে পারে।

বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ১৯৭০-এর নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগকে পছন্দ না করলেও আইনের বাইরে গিয়ে কোনো ভূমিকা রাখেননি। ফলে স্বাধীন নির্বাচনের পথ ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি।

সার্চ কমিটি হোক। সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনও হোক। সেটি সরকারের নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ার ও ইচ্ছার বিষয়। তবে রাষ্ট্রের আইন বিভাগ একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর আইন প্রণয়ন করার কাজটিও যুগপৎ করে যেতে পারে। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও ১১৮ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সেই আইনটি আমরা পাইনি। এটি সংবিধানের প্রতিও এক ধরনের অবজ্ঞা। এক এগারোকালীন শামসুল হুদা কমিশন নির্বাচন কমিশন আইনটি করার উদ্যোগ নিয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু সে আইনটি আজ অবধি আর আলোর মুখ দেখেনি। আইন থাকলে সরকারের দায়ভারও কমে। আইনানুযায়ী কমিশন গঠন হবে ও আইনানুযায়ী কমিশন কাজ করবে। তাদের যোগ্যতা, অযোগ্যতা ও কর্মপরিধি সবই আইনানুযায়ী চলবে।

কমিশনের ক্ষমতা ও জবাবদিহিও বাড়বে। তবে কমিশন যেভাবেই গঠিত হোক না কেন তাদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হচ্ছে সংবিধানের ১১৮ (৪) অনুচ্ছেদ-যার মাধ্যমে তারা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন এবং কেবল সংবিধান ও আইনের অধীন হবেন।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন

মন্দিরে কোরআন ও অনুভূতির করাত

মন্দিরে কোরআন ও অনুভূতির করাত

গিরিশচন্দ্র সেন (১৮৩৪-১৯১০) যখন পবিত্র কোরআন শরিফের বাংলা অনুবাদ করলেন, তখন কেউ কি কোরআনের অবমাননা হয়েছে বলে অভিযোগে করেছিলেন? কেউ কি তখন এই প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, একজন হিন্দু কেন কোরআন শরিফের অনুবাদ করবেন? কেউ কি তখন বলেছিলেন যে, যেহেতু একজন হিন্দু কোরআনের অনুবাদ করেছেন, অতএব কোনো মুসলমানের এই অনুবাদ পড়া উচিত নয়?

হিন্দুদের উপাসনালয় মন্দিরে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরিফ থাকার কথা নয়। একইভাবে মুসলমানদের প্রার্থনালয় মসজিদেও হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ গীতার প্রয়োজন হয় না। কারণ দুই ধর্মের প্রার্থনার পদ্ধতি ভিন্ন। সুতরাং কুমিল্লার একটি মন্দিরে কোরআন শরিফ অবমাননা করা হয়েছে বলে যে গুজব অথবা খবরের ভিত্তিতে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেল, সেখানে খতিয়ে দেখা দরকার, কে বা কারা মন্দিরে কোরআন রেখে এসেছেন। সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো লোক মন্দিরে কোরআন রেখে আসবেন আর এটাকে ইস্যু করে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হবে— সাধারণ মানুষ এতটা অবিবেচক নয়।

হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো লোক অবমাননার উদ্দেশ্যে ওই মন্দিরে কোরআন নিয়ে গেছেন— এটা ভাবার যেমন কোনো কারণ নেই, তেমনি কোনো সাধারণ মুসলমানও হিন্দুদের ওপর দোষ চাপিয়ে মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুর চালানোর জন্য সেখানে কোরআন রেখে আসবেন— সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ। প্রশ্ন হলো- আসলেই মন্দিরে কোরআন ছিল কি না? থাকলে কে বা কারা কী উদ্দেশ্যে সেখানে কোরআন রেখে এসেছেন? আর কেউ যদি সৎ বা অসৎ যেকোনো উদ্দেশ্যেই মন্দিরে কোরআন রেখে আসেন, তাতে কোরানের অবমাননা হয় কি না?

গিরিশচন্দ্র সেন (১৮৩৪-১৯১০) যখন পবিত্র কোরআন শরিফের বাংলা অনুবাদ করলেন, তখন কেউ কি কোরআনের অবমাননা হয়েছে বলে অভিযোগে করেছিলেন? কেউ কি তখন এই প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, একজন হিন্দু কেন কোরআন শরিফের অনুবাদ করবেন? কেউ কি তখন বলেছিলেন যে, যেহেতু একজন হিন্দু কোরআনের অনুবাদ করেছেন, অতএব কোনো মুসলমানের এই অনুবাদ পড়া উচিত নয়?

কোরআন শরিফ শুধু মুসলমানদের জন্য অবতীর্ণ হয়নি। সুতরাং কোনো মন্দিরের পুরোহিত বা পূজারি যদি মনে করেন যে, আন্তধর্মীয় সম্পর্ক বোঝানোর জন্য তারা মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে কিছু উদ্ধৃতি ব্যবহার করবেন, সেজন্য কেউ যদি কোরআন শরিফ মন্দিরে নিয়ে যান, যদি এখানে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে সেটি কী করে অবমাননা হয়?

কোনো মসজিদের ইমাম যদি মনে করেন যে, তিনি হিন্দুদের কোনো দর্শন সম্পর্কে জানা বা বোঝার জন্য গীতা পড়বেন, এমনকি জুমার খুতবায়ও তিনি যদি মনে করেন যে, এটা থেকে রেফারেন্স দেবেন—তাতে কি গীতার অবমাননা হবে এবং এজন্য মসজিদে হামলা চালানো হবে? সব ধর্মের মূল বাণীই তো হচ্ছে মানুষকে মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা করা, ভালোবাসা। সুতরাং ধর্মগ্রন্থের অবমাননা হয়েছে— এই যুক্তিতে মানুষ কী করে ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা চালায়? ধর্মীয় অনুভূতি এত ঠুনকো কেন?

কথিত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা এবং এরপর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অনেককে গ্রেপ্তারের পরে যে প্রশ্নটি বার বার সামনে আসছে তা হলো- ধর্মীয় অনুভূতির সংজ্ঞা বা মানদণ্ড কী? অর্থাৎ কোন বক্তব্যে বা কী কথায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে?

মানুষের যদি বাকস্বাধীনতা থাকে; সংবিধান যদি নাগরিকের বাকস্বাধীনতা স্বীকার করে নেয়— তাহলে সেই নাগরিকরা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কেন প্রকাশ্যে, উপাসনালয়ে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা ও বিতর্ক করতে পারবে না? আন্তধর্মীয় বিতর্কও হতে পারে। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই বিতর্ক প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতি বছরগুলোয় অবস্থা এমন হয়েছে যে, ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে কথা বললেই সেখানে অবমাননার গন্ধ খোঁজা হয়। এর ফলে অ্যাকাডেমিক আলোচনা বা বিতর্তের স্পেসও সংকুচিত হচ্ছে।

স্মরণ করা যেতে পারে, লালমনিরহাটের পাটগ্রামে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একজন মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা এবং তারপরে তাকে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। এটি কোনো ধর্ম সমর্থন করে? যারা এই কাজ করেছেন, তারা যে ধর্মীয় অনুভূতি থেকে এই কাজ করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, সেই ইসলাম ধর্মের মহানবী মোহাম্মদ (সা.) সারা জীবনই সহনশীলতা ও ভিন্নমত প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। যে মক্কা থেকে তিনি কার্যত বিতাড়িত হয়েছেন— সেই মক্কা বিজয়ের পরে তিনি শত্রুদের প্রতিও যে মানবিক আচরণ করেছেন— সেটিই প্রকৃত ইসলাম।

অথচ কোরআন অবমাননা হয়েছে বলে একজন লোককে পিটিয়ে মারা হলো; মরদেহ পুড়িয়ে দেয়া হলো। মন্দিরে হামলা হলো। হিন্দুদের বাড়িঘরে আক্রমণ করা হলো। এর নাম ইসলাম নয়। বরং একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার পরে যে পুড়িয়ে দেয়া হলো, এটি স্পষ্টতই ইসলামের অবমাননা। কোনো মন্দিরে হামলা বা প্রতিমা ভাঙচুরই ইসলামের অবমাননা।

প্রশ্ন হলো, হাজার হাজার মানুষ এই যে ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থের অবমাননা হয়েছে গুজবে একটি জায়গায় জড়ো হলেন এবং একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার পরে পুড়িয়ে দিলেন; এই যে কিছু লোক জড়ো হয়ে কুমিল্লার মন্দিরে হামলা চালালেন, এর পেছনে কোন মন্ত্রটি কাজ করে? মানুষ কেন ‘ধর্মের অবমাননা’ হয়েছে শুনলেই উত্তেজিত হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে এবং হত্যার মতো জঘন্য কাজে শামিল হয়? ধর্মীয় শিক্ষার কোথাও কি তাহলে একটা বড় ধরনের গলদ রয়ে গেছে? ধর্মের উদ্দেশ্যই যেখানে মানুষকে আরও বেশি মানবিক ও সহনশীল করা, সেখানে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ শুনলেই মানুষ কেন হিংস্র হয়ে ওঠে?

বাস্তবতা হলো- অধিকাংশ মানুষই ব্যক্তিজীবনে ধর্মের অনুশাসনগুলো ঠিকমতো পালন না করলেও নিজধর্মের কোনো বিষয়ে ভিন্নমত শুনলেই তাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে। যে মানুষটি নিজে অন্যায় করে, ঘুষ খায়, মানুষ ঠকায়, মিথ্যা বলে— অথচ কেউ যখন কোনো ধর্মীয় নেতা বা ধর্মের কোনো বিষয় নিয়ে সমালোচনা করে, তার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে পড়ে। অনুভূতিতে আঘাতের মামলা করে।

মুরতাদ ঘোষণা করে ফাঁসির দাবি জানায়। অথচ ব্যক্তিজীবনে সে নিজেই ধর্মকর্মের ধারেকাছে নেই। এখানে ধর্মীয় অনুভূতি কোনো বিষয় নয়। এখানে বিষয়ের আড়ালে অন্য বিষয় রয়েছে। সেই বিষয়ের অনুসন্ধান জরুরি।

একটি বড় কারণ আমাদের ভোটের রাজনীতি। কেননা বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে এই ধর্ম বরাবরই অন্যতম প্রধান ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। প্রধান দলগুলোও ধর্মকে ভোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। যেহেতু এই দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান এবং এর মধ্যে অধিকাংশ মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মের চর্চা না করলেও এবং সারা জীবন মিথ্যা ও দুর্নীতির উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকলেও নিজের ধর্ম বা ধর্মীয় গ্রন্থের কথিত অবমাননার খবর পেলেই লাঠিসোঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে; ফলে রাজনীতিবিদরাও জানেন মানুষের এই হুজুগকে ভোটের মাঠেও কাজে লাগানো সম্ভব। যে কারণে আমাদের শীর্ষ রাজনীতিবিদরাও নিজেদেরকে যতটা ‘মানুষ’ তার চেয়ে বেশি ধার্মিক হিসেবে প্রমাণে ব্যস্ত থাকেন। সাধারণ নেতাকর্মীরাও তাদের দলের শীর্ষ নেতাদের কে কত বড় ধার্মিক; ধর্মীয় বিষয়ে তাদের কার কী অবদান; কে কতগুলো উপাসনালয় বানিয়েছেন— সেই তথ্য গর্বভরে প্রচার করা হয়।

অথচ শীর্ষ রাজনীতিবিদদের উচিত, ধর্ম নিয়ে যতটা সম্ভব কম কথা বলা। কিন্তু তারা কম কথা বলেন না। কারণ ধর্ম তাদের কাছে ব্যক্তিগত চর্চার বিষয় নয়। তারা জানেন, ধর্ম এই দেশে বিরাট রাজনৈতিক অস্ত্র— যে অস্ত্র ভোটের বৈতরণি পার হতে সহায়তা করে। অতএব কুমিল্লার ঘটনার পেছনে যে সাধারণ মুসলমান বা হিন্দুর প্ররোচনা নেই, বরং এটি যে কোনো অসৎ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক গেমের অংশ— তা চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়। তবে এই রাজনীতি খুঁজতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে রাজনীতি না করে; যাতে প্রকৃত অপরাধীরাই ধরা পড়ে— সেটি নিশ্চিত করাও জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

শেয়ার করুন

অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের অপরিহার্যতা

অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের অপরিহার্যতা

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটি আধুনিক চরিত্র দানের বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন । তিনি ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রটি পরিচালিত হবে, রাষ্ট্রের আধুনিক রূপটি সমাজসহ সর্বত্র ধীরে ধীরে দৃশ্যমান- এটিই স্বাভাবিক নিয়ম। রাষ্ট্রের সংবিধানের গণতন্ত্র , সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ দর্শন হিসেবে গৃহীত হয়।

পৃথিবীতে এই সময়ে রাষ্ট্রের সংখ্যা ২০২টি। এর মধ্যে ১৯৫টি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র। বাকি রাষ্ট্রগুলোর কোনোটি এখনও পরিপূর্ণভাবে সার্বভৌমত্ব লাভ করেনি, আবার কোনো কোনোটি এতই ছোটো যে, এখনও অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি।

জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আন্তর্জাতিক বেশ কিছু আইন নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। সদস্য রাষ্ট্রগুলো সেসব আইন ও নিয়ম-কানুনে অনুস্বাক্ষরও করেছে। ফলে রাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘের বিভিন্ন কাজে যেমন অংশগ্রহণ করে থাকে, সুযোগ-সুবিধা লাভেও প্রাধান্য পেয়ে থাকে।

এটি মোটা দাগে বর্তমান বিশ্ব রাষ্ট্র ব্যবস্থার একটি চিত্র। তবে যেটি ভুলে গেলে চলবে না তা হচ্ছে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ১৯৫ বা মোট ২০২টি রাষ্ট্রের সবকটি এক চরিত্রের নয়। তাদের মধ্যে আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও আদর্শগত ভিন্নতা রয়েছে। পরস্পর বিরোধী মতাদর্শের রাষ্ট্রও জাতিসংঘের গুরত্বপূর্ণ সংস্থায় অংশগ্রহণ করে থাকে। পৃথিবীর নানা ইস্যুতে এসব রাষ্ট্রের মধ্যে ভিন্নতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পরস্পর বিরোধী অবস্থান গ্রহণের ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে।

এরপরও বড়, ছোটো ও শক্তিশালী বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক, আন্তরাষ্ট্রীয়, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা ধরনের যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে। যদিও কোনো কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বাহ্যিক সম্পর্ক থাকলেও ভেতরে অনাস্থা ও সন্দেহের দূরত্ব যোজন যোজন বলে মনে হয়। আবার কোনো কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক রাষ্ট্রই কোনো ধরনের কূটনৈতিক বা যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা না করেই অবস্থান করছে। এসব জটিলতাকে মেনে নিয়েও বলতে হবে আমরা এখন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার যুগে বসবাস করছি। যখন তখন কেউ কাউকে ইচ্ছে করলেই দখল করে নিতে পারে না কিংবা কলোনি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। প্রত্যেক রাষ্ট্রকে অন্যের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেই চলতে হয়। এর ফলে রাষ্ট্রের নাগরিক এবং জাতিসমূহ অন্তত স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার এক ধরনের নিশ্চয়তা ভোগ করে থাকে।

অথচ ২০০-৩০০ বছর আগেও পৃথিবীর চিত্র এমন ছিল না। অল্প কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্র পৃথিবীর মহাদেশগুলোকে দখলের মাধ্যমে নিজেদের কলোনি তথা উপনিবেশ স্থাপন করে রেখেছিল। সেটিও প্রায় ২০০-৩০০ বছরের ইতিহাস। অধিকৃত এসব উপনিবেশ স্বাধীন কোনো রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি। শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় ওই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষজন এঁটে উঠতে পারেনি। তাই তাদেরকে হারাতে হয়েছিল নিজেদের স্বাধীনতা। তাদেরও ছিল না কোনো স্বাধীন সার্বভৌম শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা। অনেক জায়গায় রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল। রাজারা নিজেদেরকে খুব পরাক্রমশালী ভাবতেন। কিন্তু জনগণের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না।

জনগণও কর দেয়া ছাড়া রাষ্ট্রের কোনো নিয়ম কানুন সুযোগ সুবিধা ভোগ করার পর্যায়ে ছিল না। এরও আগে কিছু স্বৈরতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল। এগুলোর কোনোটিই জনকল্যাণকামী হয়ে ওঠেনি। আরেকটু পেছনের দিকের ইতিহাসে গেলে যে সভ্যতার কথা আমরা গৌরবের সঙ্গে উল্লেখ করি (গ্রিক, রোমান, চীনা, মেসোপটেমীয়া, পারস্য, মিশরীয়, মায়ান, আজটেক, ইনকা, হরোপ্পা-মহেঞ্জোদারো ইত্যাদি) সেগুলোও ছিল চরিত্রগতভাবে স্বৈরতান্ত্রিক এবং অস্থায়ী। একসময় নগরকেন্দ্রিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠেছিল। সেগুলো ছিল আয়তনে খুবই ছোট। এসব নগররাষ্ট্রের বাইরে অসংখ্য মানুষ বসবাস করত। রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তথাপিও কোনো কোনো নগর রাষ্ট্র তাদেরকে দখলের মাধ্যমে দাসে পরিণত করে। হরণ করে তাদের স্বাধীন প্রাকৃতিক জীবন। সুতরাং রাষ্ট্রের উত্থানের যুগটি আজ থেকে ৫ থেকে ৬ হাজার বছর আগে শুরু হলেও এর সঙ্গে মানুষের সহজাত কোনো স্বাভাবিক সুসম্পর্ক শুরুতেই ছিল না।

রাষ্ট্র ছিল একটি ছোট সম্পদশালী শক্তির নিয়ন্ত্রাধীন ব্যবস্থা। তাদের ছিল সামরিক ক্ষমতা। রাজশক্তি ও সামরিক শক্তিকে ব্যবহারের মাধ্যমে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে, বসবাসকারী মানুষকে দাসে পরিণত করেছে। এসব দাসতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা দাসদের নাগরিক হিসেবে কোনো অধিকার দেয়নি। রাষ্ট্র তখন নাগরিকের অধিকার স্বীকার করার বোধে ছিল না। সেকারণেই আমরা প্রাচীন এবং মধ্যযুগের কোনো নগররাষ্ট্র সভ্যতা, সাম্রাজ্য, রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশাল আয়তনের রাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্যকে খুব দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে দেখিনি। এসব রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক কোনো কালেই নিবিড় থাকেনি, রাষ্ট্রও জনগণকে আপন করে নেয়নি।

সেকারণে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়েছে সেনা সদস্যদের নিয়ে, জনগণ যুদ্ধের দৃশ্য তাকিয়ে দেখেছে। কিন্তু এই যুদ্ধের পরিণতি কী তা তাদের জানা ছিল না। রাজার পরাজয়ে যে তাদের জীবনে পরাধীনতা নেমে আসবে সেটি বুঝতে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। যেমন- পলাশীর আম্রকাননে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজ লর্ড ক্লাইভের বাহিনীর বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধ করেছে তখন গ্রামের কৃষক যুদ্ধ দেখেছে। কিন্তু বুঝতে পারেনি যে এর মাধ্যমেই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা পরাক্রমশালী ইংরেজদের হাতে ২০০ বছরের জন্য চলে যাবে।

জনগণের এই বিষয়টি না বোঝার কারণটি ছিল ভারতবর্ষে তখন যে ধরনের মোগল সাম্রাজ্য ছিল সেটি ভারতীয় জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেনি, ভারতীয় অভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেনি। সেই ধারণা এই তথাকথিত রাষ্ট্রের ছিল না। সেকারণেই এই রাষ্ট্রগুলোকে আধুনিক কোনো রাষ্ট্রের নতুন মর্যাদায় ভূষিত করা যায় না।

আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠা শুরু করে ইউরোপে রেনেসাঁ তথা নবজাগরণ, শিল্পবিপ্লব, ১৮ শতকের আলোকিত যুগ এবং সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত ফরাসি বিপ্লব-উত্তর যুগ থেকে। দার্শনিকরা মানুষকে রেনেসাঁর যুগ থেকে নতুন মর্যাদায় দেখার শিক্ষা দিতে থাকে। তারা রাজা ও প্রজায় নয়, বরং নাগরিকতার ধারণায় মানুষকে চিন্তা করার নতুন শিক্ষায় শিক্ষিত হতে উজ্জীবিত করেন।

গোটা শিক্ষাব্যবস্থা তখন ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে। আলোকিত মানুষ সমাজে সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে থাকে। মানুষে মানুষে সাম্য এবং মৈত্রীর গুরত্ব উপলব্ধিতে আসতে থাকে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রের স্বাধীনতার সঙ্গে মানুষেরও মৌলিক অধিকারের ধারণা গুরত্ব পেতে থাকে। সামাজিক-রাজনৈতিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক নানা সংগঠন ও আন্দোলন ক্রমেই দানা বাঁধতে থাকে। ১৯ শতকে ইউরোপীয় সমাজ ব্যবস্থায় এসব আন্দোলন ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তাতে সৃষ্টি হয় আধুনিক জাতি- রাষ্ট্রের।

রাষ্ট্রে এক বা একাধিক জাতি নাগরিক পরিচয়ে সকল সুযোগ-সুবিধা লাভ করার অধিকার সংরক্ষণ করবে। এখান থেকেই বলা চলে আধুনিক রাষ্ট্রচরিত্রের নতুন যাত্রা শুরু হয়। ২০ শতকে এই যাত্রায় শামিল হয় পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের জাতিসমূহ। বিশেষত, ১৯৪৫ সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষে উপনিবেশবাদের পতন ঘটতে থাকে, অভ্যুদয় ঘটে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের। সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের তালিকায় আমরা ১৯৪৭ সালে যুক্ত হয়েও স্বাধীনতা ভোগ করতে পারিনি। ফলে আমাদেরকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম শেষে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করে স্বাধীনতা লাভ করতে হয়েছে।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটি আধুনিক চরিত্র দানের বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন । তিনি ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রটি পরিচালিত হবে, রাষ্ট্রের আধুনিক রূপটি সমাজসহ সর্বত্র ধীরে ধীরে দৃশ্যমান- এটিই স্বাভাবিক নিয়ম। রাষ্ট্রের সংবিধানের গণতন্ত্র , সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ দর্শন হিসেবে গৃহীত হয়।

গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা মৌলিকভাবে একই দর্শন। গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া কল্পনা করা যায় না। রাষ্ট্র সকল নাগরিকের রাজনৈতিক-ধর্মীয়, অর্থনৈতিক-শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকসহ সব অধিকার প্রদান করাই হচ্ছে মূল লক্ষ্য। কোনো বিশেষ জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্ম সম্প্রদায়ের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার অধিকার আধুনিক রাষ্ট্রের থাকে না। আধুনিক রাষ্ট্র হয় সবার। গণতন্ত্রের শিক্ষা এটিই ।

সুতরাং গণতন্ত্র চরিত্রগত ভাবে জাতি, সম্প্রদায় ও ধর্মনিরপেক্ষ। সুতরাং আমাদের শাসনতন্ত্রের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা আলাদাভাবে উল্লিখিত হলেও এর দর্শনগত ভিত্তি এক ও অভিন্ন। সমাজতন্ত্রকে দেখা হয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে মুক্ত রাখার দর্শন থেকে। সমাজের যাতে ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য আকাশ-পাতাল না হয় সেজন্যই সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ধারণা সংবিধানে গৃহীত হয়েছিল। এটি গণতন্ত্রের সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ।

জাতীয়তাবাদ আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম একটি চেতনা। এই চেতনায় রাষ্ট্রের সব নাগরিক উজ্জীবিত হবে, নিজ নিজ ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত অধিকার রক্ষার সুযোগ লাভ করবেন। এটিই হচ্ছে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের অন্যতম দর্শন। কোনো জাতিগোষ্ঠীই রাষ্ট্রে পিছিয়ে থাকবে না কিংবা কোনো জাতিগোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব করবে না- এটি জাতীয়তাবাদের মূল চেতনা।

জাতীয়তাবাদ একটি আধুনিক উদারবাদী দর্শন যা রাষ্ট্রের সব নাগরিককে জাতিগত পরিচয়ে নয়, নাগরিক পরিচয়ে বসবাস করার অধিকার সংরক্ষণ করবে। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে নতুন সংবিধানে বর্ণিত আদর্শে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেছিল। কিন্তু এর চর্চা যথাযথভাবে না ঘটলে সমাজে যেসব সমস্যা ও সংকট তৈরি হয় তাতে রাষ্ট্রের চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নাগরিকরা শোষণ, বঞ্চনা ও অধিকারহারা হয়।

সেকারণে বাংলাদেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার প্রধান দায়িত্ব সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রতিষ্ঠান এবং সব জাতিধর্ম পরিচয়ে নাগরিক সমাজের। কোনো বিশেষ জাতি বা সম্প্রদায় এক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় ঘটালে রাষ্ট্র ও সমাজে অস্থিরতা, জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা এবং মানুষে মানুষে আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব ঘটবে। এতে রাষ্ট্রই শুধু নয়। প্রতিটি নাগরিকই শেষ বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচাইতে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা আজ শেষ হচ্ছে। আশা করা গিয়েছিল এই উৎসবটি কোনো ধরনের বাধা-বিপত্তি ছাড়াই নির্বিঘ্নে পালিত হবে। তারপরও দুঃখজনক কিছু দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। মহল বিশেষ দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার চাইতে নষ্ট করার ক্ষেত্রে গোপন তৎপরতায় লিপ্ত হতে থাকে। এবারও মনে হচ্ছে কোথাও কোথাও সেসব অশুভ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অপতৎপরতা ছিল। এটি না ঘটলেই আমাদের রাষ্ট্র-সমাজের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পেত। সবাইকে মনে রাখতে হবে- ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র আমাদের সবার।

লেখক: অধ্যাপক, গবেষক

শেয়ার করুন

বেদনাবিধুর জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি

বেদনাবিধুর জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি

রোকেয়া হলের ছাত্রী অর্চনা সাহা যে ভূমিকা নিয়েছিলেন তা সত্যি মনে রাখার মতো। হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের এক মেধাবী ছাত্র শান্তিপ্রিয় চাকমা রাতের পর রাত জেগে বিভিন্ন হাসপাতালে আহত ছাত্রদের সেবা-শুশ্রূষা দিয়ে এতটাই বিমর্ষ, ক্লান্ত ও ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন যে, একদিন দুপুরে জগন্নাথ হলের উত্তর ভবনের নিজকক্ষে হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়।

১৫ অক্টোবর বেদনাবিধুর একটি দিন। ১৯৮৫ সালের এই দিনটির দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের অডিটোরিয়াম ভবনের ছাদ ধসে ৩৯ ছাত্র নিহত এবং ৩ শতাধিক আহত হয়। বিশ্বের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনায় এত সংখ্যক শিক্ষার্থী হতাহতের ঘটনা এর আগে ঘটেছে কি না জানা নেই। তবে আর যেন কখনই কোথাও না ঘটে, সেটাই কামনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র হিসেবে অল্পের জন্য সে দুর্ঘটনা থেকে যেভাবে নিজে রক্ষা পাই এবং যেভাবে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করি তা এত বছর পরেও বিস্মৃত হইনি, মনে পড়লেই শিউরে ওঠি। সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্গাপূজার ছুটি শুরু হয় এবং পরদিন অধিকাংশ ছাত্রের পূজা উপলক্ষে বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। তখন টেলিভিশনে একটি জনপ্রিয় নাটক ‘শুকতারা’ প্রচারিত হচ্ছিল। ছাত্ররা নাটকটি দেখার জন্য অডিটোরিয়াম ভবনে সমবেত হয়। যদিও তখন সেই ভবনের ছাদ মেরামতের কাজ চলছিল। আমি নিজেও আমার এলাকার অগ্রজ অশোক সাহা এবং সহপাঠী গৌতম মল্লিকের সঙ্গে অডিটোরিয়ামে টেলিভিশন সেটের কাছাকাছি বসে ছিলাম।

খবর শুরু হতেই ভাবলাম যে, নাটক শেষে খাবার খেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তাই অশোক দা এবং বন্ধু গৌতমকে সিট রাখার কথা বলে রাতের খাবার শেষ করার জন্য বেরিয়ে যাই। আর এতেই অল্পের জন্য সেই দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পাই। পরে অশোক দাকে খুঁজে পাই হলের শহীদমিনারের পাদদেশে রাখা লাশের সারিতে, আর বন্ধু গৌতমকে আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যালের বিছানায়।

এর দুদিন আগেই অশোক দার সঙ্গে পরিচয়। যথেষ্ট উৎফুল্ল ছিলেন কারণ সরকারি কর্মকর্তা পদে চাকরি হয় তার। আমাকে অনেক উপদেশও দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সাধের নিয়োগপত্র হাতে আসার আগেই হয়ে গেলেন লাশ!

সেসময় হলে প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। আক্রমণ এবং পাল্টা আক্রমণ ছিল নিয়মিত ঘটনা। কদিন ধরেই সরকারসমর্থিত ছাত্র সংগঠন- নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের হল আক্রমণের গুজব চলছিল। আমরা যখন হলের ডাইনিং রুমে খাবারের মাঝপথে, তখন হঠাৎ দমকা বাতাসের সঙ্গে এক বিকট শব্দ পাই, সেই সঙ্গে কিছু মানুষের চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ। আমরা ধরে নেই যে, নতুন বাংলা ছাত্র সমাজ হল আক্রমণ করেছে। নিজেদের রক্ষা করার জন্য খাবার ফেলেই হলের পুকুরপাড়ের কর্মচারীদের বাসার দিকে দৌড়ে পালাতে শুরু করি। কিছু দূর যেতেই আমাদের ভুল ভাঙে। এটা ছাত্র সংগঠনের আক্রমণ নয়, হলের অডিটোরিয়ামের ছাদ ধসে পড়েছে।

তখনই ছুটে যাই অডিটোরিয়ামের সামনে। শুধু অডিটোরিয়ামের ভিতর থেকে আসা ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে আর্তচিৎকার শুনতে পাই। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, সাধারণ ছাত্রদের পক্ষে অডিটোরিয়াম থেকে আহতদের উদ্ধার করার কোনো সুযোগ ছিল না। শুধু দরজার সামনে দাঁড়ানো যেসব ছাত্র আঘাত পেয়ে আহত হয়ে ছিটকে পড়েছিল তাদের নিয়েই হাসপাতালে যেতে পেরেছিলাম।

বিপুলসংখ্যক আহত ছাত্রের সেবা দেয়ার জন্য হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগ মোটেই প্রস্তুত ছিল না। ফলে প্রথমদিকে কিছুটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও, মুহূর্তের মধ্যে ডাক্তার নার্স ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে আহত ছাত্রদের চিকিৎসাসেবা দিতে শুরু করে। রাত বাড়ার সঙ্গে উদ্ধার কাজেও গতি পায় এবং সে সঙ্গে হলের শহীদমিনার প্রাঙ্গণে রাখা লাশের সারিও বাড়তে থাকে।

মাঝরাতের মধ্যেই পঁচিশ ছাত্রের লাশ রাখা হয় শহীদমিনারের পাদদেশে। অবস্থা এতটাই বিপর্যস্ত ছিল যে, লাশের সারি থেকে একজন ছাত্রের দেহ নড়েচড়ে ওঠে এবং বেঁচে থাকার আকুতি জানায়। মুহূর্তের মধ্যে তাকে আবার হাসপাতালে নেয়া হয়, যদিও বাঁচানো যায়নি। কারণ, হাসপাতালে নেয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। সকাল হতেই উদ্ধারকাজ শেষ হয় এবং তখন পর্যন্ত ৩৫ ছাত্রের মৃত্যু নিশ্চিত হয়। পরে আরও কজন আহত ছাত্র হাসপাতালে মারা যায়। ইতোমধ্যে দুর্ঘটনার খবর দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং আহতদের সহযোগিতা ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মহল সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।

এই দুর্ঘটনার পর সেদিন জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এমনকি পুরো ঢাকা শহরে যে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয় তা আবারও প্রমাণ করে যে, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ বাংলদেশ যে সত্যিকার অর্থে একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ তাও প্রমাণিত হয় সেদিন।

যে রিকশাওয়ালাদের সঙ্গে ছাত্রদের ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডা নিত্যদিনের ঘটনা, সেই রিকশাওয়ালারাও আগ্রহভরে বিনা ভাড়ায় আহত ছাত্রদের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যায়। রক্তের প্রয়োজন হলে রক্তদানের জন্য আহবান জানানোর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক ছাত্রজনতা রক্তদানের জন্য এগিয়ে আসে। দুর্ঘটনার পরদিন আবহাওয়া মোটেই অনুকূল ছিল না। দিনভর বৃষ্টি হচ্ছিল। এমন প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে বৃষ্টিতে ভিজে ধর্ম-বর্ণ, দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ জগ্ননাথ হলের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে শুধু নিহত ছাত্রদের এক পলক দেখার জন্য। শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য।

জগন্নাথ হলের অনেক ছাত্র ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাসায় প্রাইভেট পড়াত। তাদের অভিভাবকরাও ছুটে আসে ছেলেমেয়েদের গৃহশিক্ষকের খোঁজখবর নিতে। অনেকে চিকিৎসার জন্য আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

তখন মোবাইল ফোন ছিল না। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ছুটে আসা ঢাকা শহরের বাসিন্দারা হলে যাদের পেয়েছে, তাদের কাছেই ঠিকানা দিয়ে বলে যোগাযোগ করার জন্য, যেন তারা কোনোভাবে সাহায্য করতে পারে। আমার কাছেও কজন অভিভাবক তাদের বাসার ঠিকানা রেখে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করেন।

আমি প্রথমবর্ষের ছাত্র ছিলাম এবং ঢাকায় নতুন তখন। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তেমন কিছু করতে পারিনি। শুধু হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি এবং হলের বিভিন্ন ভবন ও শহীদমিনার পর্যন্ত ছোটাছুটির মধ্যেই নিজেকে ব্যস্ত রাখি। কিন্তু আমার গ্রামের বাড়ির অবস্থা কী হতে পারে সে ব্যাপারে কোনো ধারণাও ছিল না। আমার গ্রামের এক অগ্রজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদুল্লাহ হলের ছাত্র আমজাদ ভাই দুপুরের দিকে হন্যে হয়ে আমাকে খুঁজে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। জোরপূর্বক বাসে তুলে দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। বাড়ি পৌঁছে দেখি সেখানে আরেক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়ে আছে।

যেহেতু আমার নামের একাধিক ছাত্র নিহত হয় এবং রেডিও টেলিভিশনে সে খবর প্রচারিত হয়; তাই গ্রামের মানুষ ধরে নেয় যে, আমিও দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছি। গ্রামের অসংখ্য মানুষ আমাদের বাড়িতে সমবেত হয় বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য। দেখার পর বাড়ির লোকজন এবং গ্রামবাসী যেন আমাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করল।

শিক্ষা খাতে চরম অবহেলা এবং উদাসীনতার শিকার হয়েই এই ৩৯ মেধাবী ছাত্র অকালে প্রাণ হারায়। কিন্তু দুর্ঘটনা-পরবর্তী সব স্তরের মানুষের সহমর্মিতা, সাহায্য-সহযোগিতা এবং গৃহীত ব্যবস্থা অবশ্যই সান্ত্বনা জোগায়। সেসময় জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ ললিত মোহন নাথ, অন্যান্য হাউজ টিউটর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক অক্লান্ত পরিশ্রম করে আহত ছাত্রদের চিকিৎসা নিশ্চিত করেন। ইংরেজির অধাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ব্যক্তিগতভাবে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে আহত ছাত্রদের সেবা-শুশ্রূষার ব্যবস্থা নেন।

রোকেয়া হলের ছাত্রী অর্চনা সাহা যে ভূমিকা নিয়েছিলেন তা সত্যি মনে রাখার মতো। হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের এক মেধাবী ছাত্র শান্তিপ্রিয় চাকমা রাতের পর রাত জেগে বিভিন্ন হাসপাতালে আহত ছাত্রদের সেবা-শুশ্রূষা দিয়ে এতটাই বিমর্ষ, ক্লান্ত ও ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন যে, একদিন দুপুরে জগন্নাথ হলের উত্তর ভবনের নিজকক্ষে হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার মাস খানেক পর জগন্নাথ হলের মাঠে ইংরেজির প্রফেসর এবং সেসময়ের হাউজ টিউটর কাশিনাথ বসাকের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত শোকসভায় আগত অনেক নিহত ছাত্রের মায়ের আহাজারিতে আকাশ বাতাস যেভাবে ভারী হয়ে ওঠে তা ভেবে আজও চোখের জল আটকাতে পারি না।

সে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পঁয়ত্রিশ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এতে যারা আহত হয়েও বেঁচে ছিল তাদের অনেকেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। যারা দুর্ঘটনা-পরবর্তী পরিস্থিতি সামলে নিতে ভালো ভূমিকা রাখে তাদেরও অনেকে গত হয়েছে। চলে গেছেন সেসময়ের প্রাধ্যক্ষ ললিত মোহন নাথ এবং ইংরেজির অধ্যাপক ও হাউজ টিউটর কাশীনাথ বসাক। সেসময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা স্বৈরাচারী সরকারপ্রধান এরশাদও চলে গেছেন। যার অনুপ্রেরণায় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছিলাম এবং সুস্থ আছি কি না সে চিন্তায় যিনি উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন, আমার সেই অগ্রজ আমজাদ ভাইও অকালে চলে গেছেন গতবছর।

সে ধ্বংসস্তূপের ওপর নির্মিত হয়েছে বহুতল ভবন। অক্টোবর স্মৃতি ভবন তারই একটি কক্ষে থেকে নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন অতিবাহিত করি। হলের ঝুঁকিপূর্ণ আগের ভবন কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হবার আগেই সরিয়ে ফেলে নতুন একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবছর এই দিনটি বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে। আর আমাদের স্মৃতি থেকেও হারিয়ে যায়নি সেই বিভীষিকাময় রাত্রির বেদনাময় ঘটনা।

লেখক: কলাম লেখক, ব্যাংকার। কানাডা-প্রবাসী।

শেয়ার করুন

বিষণ্ন বিজয়া দশমী

বিষণ্ন বিজয়া দশমী

পূজায় এবার দেশের কয়েকটি স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনার কথা শোনা গেছে। এর মধ্যে কুমিল্লায় মন্দিরে হনুমানের কোলে পবিত্র কোরআন শরীফ পাওয়ার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দিরে হামলার ঘটনা শান্তিপ্রিয় মানুষকে বিস্মিত করেছে! এটা আমাদের সম্প্রীতির বাংলাদেশের চিত্র নয়। এটা নিঃসন্দেহে ভেদবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের ন্যক্কারজনক কাজ।

প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটছে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গোৎসবের। আজ বিজয়া দশমী, অশ্রুসজল নয়নে ভক্তরা দুর্গতিনাশিনী দেবীদুর্গাকে বিদায় জানাবে। সনাতন ধর্মমতে, আজ দেবী ফিরে যাবেন কৈলাসে। মহালয়ার মধ্য দিয়ে যে দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছিল বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তার সমাপ্তি ঘটছে। এই ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়েই জগৎজননী প্রকৃতি ও মানবকুলকে আলোকিত করে যাবেন। আগামী শরতে মা আবার ফিরে আসবেন- এমন প্রত্যাশা নিয়েই তাকে বিদায় জানাবে ভক্তরা।

শরৎকাল মানেই দেবীদুর্গার আগমনীবার্তা। প্রতিবারের মতো দেবীবরণে এবারও প্রস্তুত ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। অসুর নাশকারী দেবীর পৃথিবীস্পর্শে পূর্ণতা পায় ঋতুরাণী শরৎ। দেবীর সন্তুষ্টি লাভে পাঁচ দিনব্যাপী পূজা-অর্চনায় মেতে ছিল সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষজন। উৎসবের রং ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। বিশ্বব্যাপী নির্মল সম্প্রীতি থেকে উৎসারিত উৎসবের ফল্গুধারা বইছে।

সাড়ম্বরে এই উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও কল্যাণময় অবস্থানের বিকাশ আরও বিস্মৃত এবং বিকশিত হয়। অশুভ শক্তির পরাজয় ঘটিয়ে মঙ্গলদায়ক, শুভশক্তি ও ইতিবাচক চেতনার সম্প্রসারণ ঘটে। সামাজিক সহিষ্ণুতা ও উদারতা এবং প্রশাসনের তীক্ষ্ণ নজরদারি এক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখে।

হিন্দু ধর্মে দেবীদুর্গা পরমা প্রকৃতি ও সৃষ্টির আদি কারণ। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে তিনি শিবের স্ত্রী পার্বতী, কার্তিক ও গণেশের জননী এবং কালীর অন্যরূপ। দেবী দুর্গার পুরো কাঠামোতে থাকে ৮টি মূর্তি। এটি তার সংহতি শক্তি বা সব শক্তির ভিন্নভাবে দেখানো এক রূপের স্থিতি। যেমন গীতায় শ্রীকৃষ্ণ তার এক অঙ্গে বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন। তেমনি সর্বশক্তিমান মায়েরও সেইরূপ এক কাঠামোতে পরিস্ফুটন করা হয়েছে।

প্রতিটি জাতি-দেশ, রাষ্ট্র চারটি শক্তির মাধ্যমে গঠিত হয় এবং প্রসার ও স্থিতি লাভ করে। এই শক্তিগুলো হচ্ছে জ্ঞান, ক্ষেত্র, ধন ও জনশক্তি। গীতায় বলা হয়েছে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র বর্ণরূপে। মূলত এ ভাগ কোনো ভেদ বা পৃথকীকরণ নয়, একের মধ্যেই যে এ চারের অবস্থান তা দেখানো হয়েছে। দেবী দুর্গা কাঠামোতে জাতি ভেদ নয়, প্রকৃত প্রস্তাবে একই দেহে চারগুণের অবস্থান ও শক্তি। কাঠামোতে প্রধান রূপ মায়ের। মা দুর্গার আধ্যাত্মিক রূপ হলো দুঃখ। তবে দুর্গতিনাশিনী সর্বকল্যাণ কাম্য দশভুজা মা এক কিন্তু অনন্ত অসীম।

ভক্তকুলের শেষ আশ্রয় মা দুর্গা। সুখে-দুঃখে সব কিছুতেই মা, তাই তার রূপ মাতৃরূপ। ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন, মায়ের ওপর সন্তানের জোর বেশি খাটে, তাই মাতৃরূপে তার আরাধনাই হিন্দুদের কাছে অধিক প্রাধান্য। একারণে মায়ের দশ হাত সর্বব্যাপিত্বের প্রতিনিধি। সন্তানের কল্যাণ কামনায় সব সময় মন্দের সঙ্গে মা যুদ্ধরত।

এখানে মন্দের রূপ অসুরের সঙ্গে মায়ের শক্তি আলাদা করে বর্ণনায় দেখা যায়। ১. শ্রীশ্রী লক্ষ্মী ধনশক্তি মা- জগৎ পালিনা মা বিষ্ণু শক্তি ২. শ্রীশ্রী সরস্বতী- মায়ের জ্ঞানের বা সাত্ত্বিকতার প্রতীক ৩. শ্রীশ্রী গণেশ-গণদেবতা বা জনশক্তির রূপ, শূদ্র বর্ণ ৪. শ্রীশ্রী কার্তিক- মায়ের ক্ষাত্রশক্তি পরাক্রমশালী চির তারুণ্য যুবশক্তি ৫. সিংহ- হিংস্রতা, পশুত্ব এবং রজ’র প্রতীক ৬. অসুর- অহংকার, কাম ও তমদোষের প্রতীক।

আসলে সকল শক্তির আধার মা। তাই অশুভ (অসুর) শক্তিকে মা রেখেছেন পদতলে অর্থাৎ জগতে কোনো ভালো কাজ করতে হলে মাকে যেমন প্রয়োজন দৈব ও কল্যাণ শক্তিরূপে, তেমনি প্রয়োজন ইষ্টলাভের জন্য হিংস্র পশুশক্তি ও অশুভ (কাম) ক্রোধ দম্ভ দর্প অজ্ঞানতাকে পদদলিত করতে।

দুর্গাপূজার প্রধান আবেদন হলো- ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’। সব অশুভ শক্তি নির্মূল করার জন্য পৃথিবীতে প্রতি বছর দুবার দেবীদুর্গার আগমন হয়। প্রাচীনকাল থেকে বছরের চৈত্র মাসে বসন্তকালে বাসন্তী নামে পৃথিবীতে মা দুর্গা আবির্ভূত হন যা হিন্দু সম্প্রদায়ের বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত। এটা দুর্গার আরেক রূপ। শরৎকালে শারদীয়া নামে। দুই পর্বেই অসুরের দলপতি মহিষাসুরকে বধ করে দেবকুলকে রক্ষা করেন দুর্গতিনাশিনী। সেই থেকে বিজয় ঘটে শুভশক্তির।

দেবীর আগমন ঘটে অন্যায়ের বিনাশ ঘটিয়ে সজ্জনদের প্রতিপালনের অঙ্গীকার নিয়ে, মানুষের মধ্যে নৈতিক আদর্শ জাগ্রত করার জন্য। মানুষের চিত্ত থেকে যাবতীয় দৈন্য ও কলুষতা দূর করার জন্য। এজন্য দুর্গোৎসব ধর্মীয় উৎসব হলেও তা সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। সম্প্রদায়গত বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে এক পরম আনন্দের সোপানে দাঁড় করাচ্ছে। শারদীয় দুর্গোৎসব সবার জন্য থাকে উন্মুক্ত। দেবীদুর্গার আগমনী আনন্দকে সবাই ভাগাভাগি করে নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। বাঙালি জাতি নিরন্তর উন্মুক্ত উৎসবমুখর পথে চলতে পছন্দ করে। এই পছন্দের স্রোতধারায় এই কদিন ভিন্ন আমেজ ও ভিন্নতর সুবাতাস বয়ে গেছে দেশজুড়ে।

দেবীদুর্গা সাধারণত গজ, ঘোটক, নৌকা এবং দোলা এই চার প্রকার বাহনেই আগমন এবং গমন করেন। ২০২১ সালে দেবীর আগমন হয়েছে ঘোটকে। আর কৈলাসে ফিরে যাচ্ছেন দোলায়। শাস্ত্রমতে, এবারের আগমন এবং গমন উভয়ই অশুভ ইঙ্গিত। দোলা অর্থাৎ পালকিতে আগমন বা গমনের ফল- দোলায়াং মকরং ভবেৎ অর্থাৎ মহামারি বা মড়কতুল্য বিষয়ে ভোগার আশঙ্কা। ঘোটক অর্থাৎ ঘোড়া। ঘোড়ায় আগমন বা গমনের ফল ছত্রভঙ্গ, ধ্বংস বা ছন্নছাড়া কিংবা ধ্বংসাত্মক লীলার আশঙ্কা।

এক্ষেত্রে মা দুর্গাই রক্ষাকর্তা। মা তার ভক্তের কল্যাণে সর্বদাই নজর রাখেন। বাংলাদেশ বরাবরই ধর্মীয় সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির এক মেলবন্ধন। সবাই স্বাধীনভাবে নিজধর্ম পালন করছে। ধর্ম যার যার উৎসব সবার- এদেশের মানুষের এই অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবার পূজাকে সীমিত আকারে করা হলেও আনন্দঘন আবহের সৃষ্টিতে কোথাও কমতি ছিল না।

পূজায় এবার দেশের কয়েকটি স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনার কথা শোনা গেছে। এর মধ্যে কুমিল্লায় মন্দিরে হনুমানের কোলে পবিত্র কোরআন শরীফ পাওয়ার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দিরে হামলার ঘটনা শান্তিপ্রিয় মানুষকে বিস্মিত করেছে! এটা আমাদের সম্প্রীতির বাংলাদেশের চিত্র নয়। এটা নিঃসন্দেহে ভেদবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের ন্যক্কারজনক কাজ। এদেশে এই ধরনের ঘটনা সত্যি দুঃখজনক। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এসব ঘটনা ঘটেছে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কোনো অপশক্তি তাদের হীন উদ্দেশ্যে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে, এটি তারই অংশ।

এ বিষয়ে কজন সন্দেহভাজন আটক হয়েছে। তদন্ত ও অনুসন্ধান চলছে। আমাদের বিশ্বাস প্রকৃত তথ্য প্রকাশ ও অপরাধী শনাক্ত এবং শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

অবশ্য সামাজিক সহিষ্ণুতা ও উদারতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের তীক্ষ্ণ নজরদারি এক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখে। মায়ের কাছে প্রার্থনা কলুষমুক্ত সমাজ, সুন্দর দেশ ও সুস্থ পৃথিবী গড়া। মানব-ধরা আজ মহামারি করোনা নামক অপশক্তির কোপানলে। বলা যায়, বিশ্ব এখন মহাসংকটের মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করছে। এই সংকটে জগৎমাতা দেবীদুর্গার সুদৃষ্টি সর্বাগ্রে প্রয়োজন। মায়ের আশীর্বাদ পর্যবসিত হোক বসুন্ধরায়। দূর হোক অন্ধকার, ছড়িয়ে পড়ুক আলো। মানুষের মাঝে উদয় হোক শুভবুদ্ধি। বিরাজ করুক শান্তির সুবাতাস।

করোনামুক্ত পৃথিবী মায়ের কাছে এই মুহূর্তের প্রার্থনা। মা তার ভক্তকুলকে সব অপশক্তির হাত থেকে রক্ষা করবেন অতীতের মতো। ধর্ম মানুষে মানুষে প্রীতি, প্রেম, সহিষ্ণুতা, ঐক্য ও শান্তির ডাক দিয়ে যায়। তারপরও অসুরের আকস্মিক উন্মত্ততা নষ্ট করে দেয় আবহমানকালের প্রীতিধন্য পারস্পরিক অবস্থানকে, ধ্বংস করে দেয় দীর্ঘকালের হৃদ্যতা। সৃষ্টি হয় বৈষম্য, বিভেদ, হিংসা, অন্যায় ও অকল্যাণ। আর এজন্যই মঙ্গলদাত্রী দেবীদুর্গার আগমন ঘটে কল্যাণ ও শান্তিকে সংস্থাপন করার জন্য।

বিশ্বে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন থাকবে, দূর হবে সব সংকীর্ণতা ও বিভেদ। মানুষে মানুষে সম্প্রীতি রক্ষা হবে, এমন প্রার্থনাই আনন্দময়ীর কাছে।

লেখক: সাংবাদিক

শেয়ার করুন

বাজারদর: মানুষ অন্তত খেয়ে বাঁচুক

বাজারদর: মানুষ অন্তত খেয়ে বাঁচুক

ভারতের কোনো এক রাজ্যে বৃষ্টি হলে বাংলাদেশের টেকনাফে পেঁয়াজের দাম সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে কেন? ভারতে বৃষ্টি হলে সেখানকার বাজারে এর প্রভাব পড়বে, সেই পেঁয়াজ বেনাপোল বা ভোমরা দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকবে। তারপর সেখান থেকে ঢাকা হয়ে টেকনাফ যাবে। কিন্তু টেকনাফের যে ব্যবসায়ী দ্বিগুণ দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন, সেটা তো আগের দামে কেনা। সেই ব্যবসায়ী কিন্তু ফাঁকতালে শেয়ার বাজারের সেই বিনিয়োগকারীর মতো ‘মানি ডাবল’ আইটেম পেয়ে যান। তার চেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশে এখনও পেঁয়াজের যা স্টক আছে, তাতে দুই মাস চলার কথা।

ফেসবুকে নানা অ্যাকাউন্ট আর গ্রুপে শেয়ারবাজার নিয়ে নানারকম তথ্য শেয়ার করা হয়। নামধারী বিশেষজ্ঞরা তাদের অনুসারীদের ‘মানি ডাবল’ আইটেম দেন। অনেকে আবার ইনবক্সে আসার পরামর্শ দেন। বিশেষজ্ঞ পরামর্শের জন্য তাদেরকে লাভের অংশও দিতে হয়। তেমনি এক সাধারণ বিনিয়োগকারী নামধারী এক বিশেষজ্ঞের কাছে ‘মানি ডাবল’ আইটেম চাইলেন।

এমনিতে গত কদিন ধরে মূল্য সংশোধন চলছে। তাতে বিনিয়োগকারীরা একটু আতঙ্কিতও। ‘মানি ডাবল’ আইটেম চাওয়া সেই বিনিয়োগকারীর স্ট্যাটাসে আরেক রসিক বিনিয়োগকারী মন্তব্য করলেন, শেয়ার না কিনে পেঁয়াজ কিনুন, ডাবল হবে। সেই বিনিয়োগকারী যদি সত্যি সত্যি শেয়ার না কিনে পেঁয়াজ কিনতেন, তাহলে একমাসে তার মানি ডাবল হয়ে যেত। শেয়ারবাজারে মূল্য সংশোধন হলেও নিত্যপণ্যের বাজারে যেন আগুন লেগেছে। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ায় বেসামাল সাধারণ মানুষ।

অন্ন, বস্ত্র বাসস্থান হলো মানুষের মৌলিক চাহিদা। তবে মৌলিকতম চাহিদা হলো- অন্ন। মানুষ গাছের পাতা পরে, গাছতলায় থেকেও জীবনধারণ করতে পারে। কিন্তু না খেয়ে বাঁচতে পারে না। এখন এই খাবার কিনতেই মানুষের ফতুর হওয়ার দশা।

শায়েস্তা খাঁর আমলে ঢাকায় টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। শুনলে রূপকথা মনে হতে পারে। কিন্তু বুঝতে হবে, তখন মানুষের আয়ও কম ছিল। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের আয় বাড়ে, সঙ্গে বাড়ে ব্যয়ও। মূদ্রাস্ফীতির সঙ্গে ঘটে মূল্যস্ফীতিও। সমস্যা হলো- যখন ব্যয়ের সঙ্গে আয় পাল্লা দিতে পারে না। গত দেড় বছরে করোনার হানায় গোটা বিশ্বের অর্থনীতিই বড় ধাক্কা খেয়েছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়।

বরং স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা বাংলাদেশে ধাক্কাটা বেশিই লেগেছে। শুরুতে ভেবেছিলাম, করোনার ধাক্কা সবার গায়েই লাগবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো- যথারীতি করোনার মূল ধাক্কা লেগেছে নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত আর মধ্যবিত্তের গায়েই। উচ্চবিত্তের মানুষের গায়ে করোনার আঁচ তেমন লাগেনি। করোনা মানুষের জীবন ওলটপালট করে দিয়েছে।

গত দেড়বছর, বিশেষ করে প্রথম একবছর সবকিছুই ছিল অনিশ্চিত। কত মানুষ চাকরি হারিয়েছে, কত মানুষের ব্যবসা লাটে উঠেছে, কত মানুষ পেশা পরিবর্তন করেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অনেক মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়ি ফিরে গেছে, এর সংখ্যা কোনো পরিসংখ্যানে লেখা থাকবে না। এই সময়টা ছিল মানুষের টিকে থাকার, কোনো রকমে নাক ভাসিয়ে বেঁচে থাকা আর কি। কিন্তু এই বেঁচে থাকার সংগ্রামটা আরও কঠিন করে দিয়েছে বাজারদর।

বলছিলাম আয়-ব্যয়ের হিসাবের কথা। আগেও বলেছি, করোনার সময়ে অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। কিন্তু এই সময়ে আরেকটা চাকরি জোগার করে ফেলা কঠিনই শুধু নয়, অসম্ভবও। তাই আগের দিনও ছিলেন সচ্ছল মধ্যবিত্ত, পরদিন তিনি এক ধাক্কায় নিম্নবিত্ত অথবা নিঃস্ব। যাদের চাকরি যায়নি তাদেরও বেতন বাড়ে তো নাই-ই, অনেক অফিস বেতন কমিয়ে দিয়েছে।

এমনিতে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে প্রতিবছর ইনক্রিমেন্ট হওয়ার কথা। সরকারি অফিসে নিয়ম করে ইনক্রিমেন্ট হলেও সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই নিয়ম মানে না। ইনক্রিমেন্টকে আমি কখনও বেতন বাড়ানো বলি না। ইনক্রিমেন্টে আসলে মূদ্রাস্ফীতি সমন্বয় হয়ে যায়। তাই ইনক্রিমেন্ট না হওয়া মানে মূদ্রাস্ফীতির বিবেচনায় বেতন কমে যাওয়া। চাকরি হারানো, পেশা বদলানো, বেতন কমে যাওয়ার ধাক্কায় মানুষ যখন দিশেহারা; তখন বাজারদর তাদের অসহনীয় বোঝার ওপর শাকের আটি চাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মানুষের এখন আর শাকের আটি নেয়ারও সামর্থ্য নেই।

বাজারে যখন আগুন লাগে, তখন মুক্তবাজার অর্থনীতি, চাহিদা-সরবরাহতত্ত্ব হাজির করা হয়। কিন্তু অর্থনীতির এই জটিলতত্ত্বে তো মানুষের পেট ভরবে না। এতকিছু তারা বুঝবেও না। সাধারণ মানুষ তাদের আয় অনুযায়ী ব্যয় করে খাবার কিনতে চাইবে। যখন পারবে না, তখন তাদের খাবারটা কে দেবে?

বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন এবং চিনির দাম বাড়ছে। তাই বাংলাদেশেও এই পণ্যের দাম বাড়াতে হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে যে চালের দাম কমছে, তাহলে চালের দাম কমছে না কেন? বাংলাদেশের বাজার ব্যবসায়ীদের নানা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এখানে আন্তর্জাতিক বাজার বা কোনো জটিল তত্ত্ব খাটে না। এখানে ব্যবসায়ীদের একটাই তত্ত্ব- লাভ। আর তাদের এই লাভের লোভের আগুনে পুড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। ব্যবসায়ীরা নিশ্চয়ই লাভ করবে। কিন্তু লাভেরও তো একটা ন্যায্যতা থাকবে।

ভারতের কোনো এক রাজ্যে বৃষ্টি হলে বাংলাদেশের টেকনাফে পেঁয়াজের দাম সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে কেন? ভারতে বৃষ্টি হলে সেখানকার বাজারে এর প্রভাব পড়বে, সেই পেঁয়াজ বেনাপোল বা ভোমরা দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকবে। তারপর সেখান থেকে ঢাকা হয়ে টেকনাফ যাবে। কিন্তু টেকনাফের যে ব্যবসায়ী দ্বিগুণ দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন, সেটা তো আগের দামে কেনা। সেই ব্যবসায়ী কিন্তু ফাঁকতালে শেয়ার বাজারের সেই বিনিয়োগকারীর মতো ‘মানি ডাবল’ আইটেম পেয়ে যান। তার চেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশে এখনও পেঁয়াজের যা স্টক আছে, তাতে দুই মাস চলার কথা। তাহলে তো ভারতের বৃষ্টির প্রভাব বাংলাদেশের বাজারে দুই মাস পরে পড়ার কথা। পেঁয়াজের ৮০ ভাগই এখন বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। ২০ ভাগ আসে ভারত থেকে। গত কয়েকবছর ধরে সেই ২০ ভাগ ৮০ ভাগকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এটা অর্থনীতির কোন সূত্র?

ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছামতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। অথচ এটা করার কথা সরকারের, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু সরকার গর্ব করে বলে, তারা ব্যবসায়ীবান্ধব সরকার। সমস্যাটা এখানেই, সরকার আসলে ব্যবসায়ীবান্ধব নয়, ব্যবসায়ী-নিয়ন্ত্রিত। বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যার কাজ সেই বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেও একজন ব্যবসায়ী। সম্ভবত তারা নানা উদ্যোগে ব্যবসায়ীরাই লাভবান হন।

সরকার যেদিন ব্যবসায়ীবান্ধব থেকে জনবান্ধব হতে পারবে; সেদিন সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে বাজারে যেতে পারবে। একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে সরকার জনগণের ভালোমন্দ দেখভাল করবে। প্রয়োজনে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে। চাহিদা ও সরবরাহনীতিই যদি বাজারকে মুক্ত করে দেয়, তাহলে আর সরকারের দরকারটা কী? সরকার কখনও শুল্ক বাড়িয়ে, কখনও কমিয়ে বাজারকে জনগণের জন্য সহনীয় রাখবে। ধরুন, যখন দেশি পেঁয়াজ বাজারে আসবে, তখন কৃষক যাতে ন্যায্যমূল্য পায়, তাই শুল্ক বাড়িয়ে দেবে। আর যখন দেশের বাজারে সংকট সৃষ্টি হবে, তখন শুল্ক প্রত্যাহার করবে। এটাই সরকারের দায়িত্ব।

গত কবছর ধরেই একটা সময়ে পেঁয়াজের বাজার অস্থির হয়। কল্যাণ রাষ্ট্র হলে পেঁয়াজের বাজারের ক্যালেন্ডার আমার আপনার মনে রাখলেও চলবে। আর বাণ্যিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাজই এটা। কিন্তু সমস্যা হলো- বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সবার আগে এই ক্যালেন্ডার ভুলে যায়। পেঁয়াজ ‘মানি ডাবল’ আইটেম হয়ে গেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঘুম ভাঙে। তারা তখন শুল্ক কমানোর জন্য প্রস্তাব। লালফিতা পেরিয়ে এই প্রস্তাব পাস হতে হতে ব্যবসায়ীদের ‘মানি ডাবল’ হয়ে যায়, সাধারণ মানুষের কাছে পেঁয়াজ মহার্ঘ্য হয়ে যায়। এটা শুধু পেঁয়াজ নয়, সব পণ্যের ক্ষেত্রেই সত্যি। সিদ্ধান্ত নিতে নিতে সরকারের শুধু দেরিই হয়ে যায়।

সরকার ব্যবসায়ী নয়। তারা লাভের চিন্তা করবে না। তারা মানুষের জীবনকে সহনীয় করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে, দ্রুত সিদ্ধান্ত কার্যকর করবে। সরকার কৃষিতে, জ্বালানি তেলে, বিদ্যুতে ভর্তুকি দেয়। প্রয়োজনে বাজারেও দিতে হবে। করোনার সময় সরকার ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিয়েছে, সেই প্রণোদনার ছিটেফোঁটাও জনগণ পায়নি। এবার সরকার শক্ত হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করুক, জনগণের পাশে দাঁড়াক। যদি কোনো ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, যদি ভোমরা বন্দরের পেঁয়াজ ঢাকায় আসতে আসতে আকাশ ছোঁয়; তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাজারে আগুন লাগলে টিসিবি ট্রাকে করে ন্যায্য দামে নিত্যপণ্য বিক্রি করে। সাধারণত নিম্নবিত্তের মানুষ এখান থেকে পণ্য কিনত। মধ্যবিত্তের পেটে ক্ষুধা, চোখে লাজ। তাই দরকার থাকলেও তারা ট্রাকের লাইনে দাঁড়াবে না। কিন্তু করোনা এসে তাদের চোখের লজ্জার সেই পর্দাটা সরিয়ে দিয়েছে। শুরুর দিকে একটু আড়াল করে লাইনে দাঁড়ালেও এখন অধুনা নিম্নবিত্ত সাবেক মধ্যবিত্তরাও অনায়াসে লাইনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। সরকার অন্তত টিসিবির ট্রাক ছড়িয়ে দিক সারা দেশে। মানুষ অন্তত খেয়ে বাঁচুক।

লেখক: সাংবাদিক-কলাম লেখক।

শেয়ার করুন