মহামারিতে বিধি ও তথ্য না মানার সুলুক সন্ধান

মহামারিতে বিধি ও তথ্য না মানার সুলুক সন্ধান

সমাজের সুবিধাভোগীদের চলাফেরায় কোনো সমস্যা নেই। কেবল নিষেধাজ্ঞা গণপরিবহনের ক্ষেত্রে, যা মূলত সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে থাকে। জনগণ যখন দেখছে কেবল তার যাত্রাপথ রহিত করা হয়েছে তখন বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না।

মহামারিতে বিধি ও তথ্য না মানার সুলুক সন্ধান

সমাজবিজ্ঞানী পল লেজারসফেল্ড ও রবার্ট কে মার্টন ১৯৪৮ সালে গণমাধ্যমের প্রভাবসংক্রান্ত নার্কোটাইজিং ডিসফাংশন তত্ত্বটি আবিষ্কার করেন। এ তত্ত্বের মূল কথা হলো- গণমাধ্যম যখন কোনো বিষয়ে প্রচুর তথ্য সরবরাহ করে তখন পাঠক ও শ্রোতা সেসব তথ্য কাজে লাগানোর ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ব্যাপকভাবে প্রবাহিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো কার্যকর উদ্যোগ বা সিদ্ধান্ত নিতে পাঠক ও শ্রোতা নিরুৎসাহিত হতে পারে।

এ তত্ত্বানুসারে বন্যার স্রোতের মতো ধেয়ে আসা তথ্য পাঠক-শ্রোতাকে উদ্দীপ্ত না করে বরং নিষ্ক্রিয় এবং সামাজিক ক্রিয়াশীলতার ব্যাপারে নির্লিপ্ত হতে সহায়তা করে পারে। পল লেজারসফেল্ড ও রবার্ট কে মার্টনের এ তত্ত্ব ‘ম্যাস কমিউনিকেশন, পপুলার টেস্ট অ্যান্ড অরগানাইজড সোস্যাল অ্যাকশন’ শিরোনামে প্রবন্ধাকারে প্রকাশিত হয়।

উল্লেখ্য, নার্কোটাইজিং ডিসফাংশন তত্ত্ব যখন আবিষ্কার হয় তখন কেবল মুদ্রণ ও রেডিওতে এর প্রভাব ছিল। বর্তমানে মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিকতা এসেছে।

করোনা বিষয়ে বানের পানির মতো তথ্যপ্রবাহ এবং বাড়তি কিছু অনুষঙ্গ এ সংক্রমণরোধে শিথিল জন-আচরণ তৈরিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। করোনাকালে জন-আচরণের ওপর অনেকাংশে পল লেজারসফেল্ড ও রবার্ট কে মার্টনের গণমাধ্যমের প্রভাবসংক্রান্ত নার্কোটাইজিং ডিসফাংশন তত্ত্বের প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। জনগণ করোনা বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে এত বেশি তথ্য পেয়েছে বা পাচ্ছে যে, তারা তথ্যভারে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এসব তথ্য অনুসরণের ক্ষেত্রে একধরনের উদাসীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

গত ২০২০-এর মার্চে যখন করোনা সংক্রমণ শুরু হয় তখন মানুষ এ বিষয় সম্পর্কে আগ্রহী এবং তা মেনে চলার ব্যাপারে অনেকাংশেই সচেষ্ট ছিল। কিন্তু মহামারি প্রভাব যত দীর্ঘ হচ্ছে তথ্য বা বার্তা মানার ক্ষেত্রে তত বেশি অনীহা লক্ষ করা যাচ্ছে। করোনা-সংক্রান্ত সচেতনতামূলক প্রচারে কেবল তথ্য ছিল না, ছিল বার্তা। তথ্য ও বার্তার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। তথ্য কাজ কগনেটিভ বা ধারণা-জ্ঞানগত পর্যায়ে আর বার্তার কাজ ব্যবহারিক পর্যায়ে।

যেমন-করোনা কী, কখন সংক্রমণ শুরু হলো, কোথা থেকে শুরু হলো, কেন শুরু হলো, কারা সংক্রমিত হচ্ছে ইত্যাদি বিষয় তথ্যের আওতাভুক্ত। আর করোনা ভাইরাস সংক্রমণ থেকে কীভাবে সুরক্ষায় কী কী স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে হবে তা সম্পর্কে নির্দেশনা হলো বার্তার কাজ।

করোনা বিষয়ে সচেতনা সৃষ্টির লক্ষ্যে তথ্য ও বার্তাবন্যা যে বয়ে গেছে, তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। তথ্য ও বার্তার এ বন্যা দর্শক-শ্রোতাকে করোনা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা নিতে হয়ত নিষ্প্রভ করে তুলছে।

পুনঃপুন করোনা ভয়াবহতার প্রচার স্বাভাবিক প্রবণতা হয়ে উঠছে। একেই বলে বার্তার স্বাভাবিকীকরণ। ভয়াবহতা বার বার উপস্থাপিত হলো বা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে দেখা দেবে। যেমনটি এখন লক্ষ করা যাচ্ছে। করোনার সংক্রমণরোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে এক ধরনের নির্লিপ্ততা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

করোনা বিষয়ে সচেতনতায় তথ্য ও বার্তা মানবীয় যোগাযোগ, গণমাধ্যম- রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্র এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষত ফেসবুকেও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে।

তথ্য বা বার্তা যে মাধ্যমে থেকে আসুক, হোক না কেন তার কার্যকারিতা নির্ভর করে বেশকিছু সূচকের ওপর। এ নিবন্ধ লেখক ও মো. হুমায়ুন কবির ব্র্যাক ও গ্রামীণ ব্যাংকের মিডিয়া এবং বার্তার কার্যকারিতা বিষয়ে গবেষণায় দেখিয়েছেন- মিডিয়া ও বার্তার কার্যকারিতা নির্ভর করে মূলত চারটি সূচকের ওপর; এগুলো হলো- বোধগম্যতা, প্রয়োগযোগ্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রভাবান। গবেষকদ্বয় দেখান- ব্র্যাক ও গ্রামীণ ব্যাংক যতগুলো মাধ্যম ব্যবহার করেছে তার মধ্যে ‘মানুষ’ ছিল সবচেয়ে কার্যকর যোগাযোগ মাধ্যম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন- ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে মানুষ ছিল সবচেয়ে ভালো মাধ্যম।

করোনা মহামারি বিষয়ে পরিবেশিত তথ্য ও বার্তার কার্যকারিতার ক্ষেত্রে মূল সমস্যা ঘটেছে প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে। জনগণ কোনো বিষয় সম্পর্কে কেবল জানলে বা বুঝলেই হবে না, তথ্য সচেতনতার পাশাপাশি তথ্য কাজে লাগানোর জন্য সহায়ক পরিবেশ দরকার।

২০০০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক ড. দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার একটি এলাকার মানুষ পানিতে আর্সেনিক দূষণ ও এর ক্ষতিকর প্রভাব বিষয়ে সচেতন হলেও তাদের কাছে নিরাপদ পানির সুব্যবস্থা না থাকায় আর্সেনিকযুক্ত পানি পানে বাধ্য ছিল।

বাংলাদেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে যে প্রচারাভিযান এটির সাফল্য এসেছিল মূলত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জন্মনিরোধ উপকরণগুলোর সহজলভ্যতার কারণে। তথ্য ও বার্তার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সহায়ক পরিবেশের। কেবল সচেতনতা বাড়লে হবে না- তাকে কাজে লাগানোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট থাকতে হবে।

মহামারিকালে তথ্য বা বার্তা কাজে লাগানোর বিষয়টি তিনটি দিক থেকে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে;

১. মহামারি সম্পর্কিত তথ্যের অসীম প্রবাহ, যা এর ভয়াবহতাকে স্বাভাবিক করছে;

২.তথ্য কাজের লাগানোর ক্ষেত্রে বিকল্পের অভাব; এবং

৩. সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে শৈথিল্য ও বৈষম্যমূলক প্রয়োগ।

করোনা মহামারি সম্পর্কিত তথ্যের অসীম প্রবাহ, যা এর ভয়াবহতাকে স্বাভাবিক করতে সহায়তা করছে: করোনা মহামারি কোনো শর্ট ইভেন্ট হিসেবে থাকছে না। এটা পরিণত হয়েছে এক লম্বা ইভেন্টে। যেকোনো লম্বা ইভেন্টের প্রতি দর্শক-স্রোতা তার মনোযোগ ধরে রাখাটা সহজ নয়। এ ধরনের দীর্ঘ পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে নৈরাশ্য তৈরি করে। ক্লান্ত করে ফেলে। তথ্য বা বার্তার অনুশাসনে জীবন চালাতে অনীহা তৈরি হয়। তারপরও মহামারির অভিঘাত যখন ক্রমশ বাড়তে থাকে পরিচিতজনদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর খতিয়ান প্রতিদিন হালনাগাদ করতে হয়। তখন ব্যক্তি ভেতরে ভেতরে নিজের মৃত্যুর হিসাব কষতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।

মানুষ একবার মৃত্যুর হিসাব কষতে শুরু করলে কোনো অনুশাসনের সে আর পরোয়া করে না। এ পরিস্থিতিতে বার্তার শ্রেণিকরণ, প্রয়োজনীয় টুকু বেছে নেয়া এবং তা কাজে লাগানোর ব্যাপারে আর বিশেষ কোনো আগ্রহ থাকে না।

তাছাড়া, এদেশের সিংহভাগ মানুষ প্রতিদিন মৃত্যুর স্বাদ অনুভব করে। নানা বঞ্চনা, বৈষম্য ও প্রত্যাখ্যান ব্যক্তির বেঁচে থাকা কঠিন করে তোলে। জীবন নিয়ে নিজের প্রতি রয়েছে এক বিরক্তিকর অনুভূতি। মৃত্যু সর্তকতা ব্যক্তির কাছে রসিকতাও বটে। এ সর্তকতা তাকে সজাগ করে না, করে না সচেতন।

এমন অবস্থায় টনকে টন তথ্য ঢাললেই তা কার্যকর হবে না। সাধারণ জনগণ কোনো মর্যাদাপূর্ণ জীবন পায়নি। করোনা মহামারিতে জনগণের জীবন সুরক্ষা বিষয়ে তথ্যের যে জোয়ার ও জোরাজুরি তা তাদের জীবন-জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং তাদের কাছে অনেক সময় বাড়াবাড়ি। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণ আরেক কাউন্টার রিয়ালিটি তৈরি করে। দ্রোহ দেখায়। তথ্য ও বার্তা বা কোনো নির্দেশনার প্রতি মনোযোগী হতে চায় না। এ জীবন সুরক্ষা বিষয়ে এ ঝুঁকি তার একধরনের প্রত্যাখ্যান।

তার শরীর হয়ে পড়ে হাঁসের মতো। হাঁস যেমন সারাদিন পানিতে থেকে ভিজে যায় না। জনগণও ঠিক ব্যাপক তথ্যপ্রবাহে নিমজ্জিত হয় কিন্তু শুকনো থাকে। করোনা সংক্রমিত হবে কি হবে না তা অনিশ্চিত কিন্তু সে যে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে পারবে তা তো নিশ্চিত। জনগণ নিশ্চিত বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পরিবার তার কাছে নিশ্চিয়তার আধার কোনো বৈরী পরিস্থিতি তাকে নিবৃত্ত করতে পারছে না। জীবন-জীবিকার তাগিদে মহানগরে এলেও তার জীবনের ফুসরৎ কম। যেখানে সবাই কোনো না কোনোভাবে ম্যানেজ করে বাড়ি যাচ্ছে সেখানে তাকেও যেতে হবে।

তথ্য কাজের লাগানো ক্ষেত্রে বিকল্পের অভাব: করোনাকালে জীবন ও জীবিকার মধ্যে সমন্বয়টা একটা বড় ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে দুস্থ ও অসহায় মানুষ সুরক্ষায় আর্থিক সহায়তা দেয়া হলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। জীবিকার বিকল্প না থাকায় সমাজের ক্ষুদ্র পেশাজীবীরা চরম সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। করোনা সংক্রমণ বিষয়ে সচেতনতা থাকলেই রুটি-রুজির সংস্থানের জন্য একটা বড় অংশকে বাইরে বের হয়ে আসতে হচ্ছে। জীবিকার প্রশ্নে ভালো কোনো বিকল্প বের করা সম্ভব হয়নি, যা তথ্য সচেতনতা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে শৈথিল্য ও বৈষম্যমূলক প্রয়োগ; করোনা মহামারি রোধে সরকার ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে শৈথিল্য লক্ষ করা গেছে এবং ঘটছে এর বৈষম্যমূলক প্রয়োগ। যেমন- আন্তজেলা গণপরিবহন ছাড়া সব পরিবহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হচ্ছে। আকাশপথে বিমান চলছে, সড়কপথে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসসহ অন্য সব পরিবহন চলছে।

সমাজের সুবিধাভোগীদের চলাফেরায় কোনো সমস্যা নেই। কেবল নিষেধাজ্ঞা গণপরিবহনের ক্ষেত্রে, যা মূলত সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে থাকে। জনগণ যখন দেখছে কেবল তার যাত্রাপথ রহিত করা হয়েছে তখন বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না। অপরদিকে, তার ‘দ্যাশে’ যাওয়ার জন্য রয়েছে পূর্বপ্রতিশ্রুতি। আর এ ঈদকে ঘিরে সে পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পায়।

গণরাসের অংশ নেয়া মানুষ জেনে গেছে করোনা তাকে ধরতেও পারে না-ও পারে। কিন্তু পরিবারের সঙ্গে তার যে দেখা হচ্ছে তা তো নিশ্চিত। মানুষ অনিশ্চিয়তার দিকে ধাবিত হয় না যা নিশ্চিত সেদিকের অনুগামী হয়। তাই সাধারণ জনগণ সুযোগ পেলে দ্যাশে যায়। কারণ, যেখানে সে যায় সেখানে ভালোবাসা, স্নেহ ও মর্যাদা পায়। পায় একটু স্বস্তি।

‘দ্যাশে’ যাওয়ার গণরাস কেবল তথ্য সচেতনতা বা বিধি-নিষেধ দিয়ে রোখা সম্ভব নয়।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও সমাজ বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা
দখলদার ইসরায়েলের আগ্রাসন ও বাংলাদেশের অবস্থান
ইতিহাস সৃষ্টি করা দিন
বিশ্বের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক
শেখ হাসিনার প্রত্যার্বতনে গণতন্ত্র প্রবহমান

শেয়ার করুন

মন্তব্য

ইসলামে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই

ইসলামে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই

ইসলামে যেখানে অন্য ধর্মের দেবতাকে গালি দেয়াই নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে মন্দির ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর কোনোভাবে ধর্মসম্মত হতে পারে না। মহানবী (সা.) আরও বলেছেন- “কোনো মুসলমান যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে কিংবা তাদের ওপর জুলুম করে, তবে কেয়ামতের দিন আমি মুহাম্মদ ওই মুসলমানের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে লড়াই করব।” (আবু দাউদ)

কুমিল্লার পূজামণ্ডপে যে ব্যক্তি কোরআন শরিফ রাখে, তাকে শনাক্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মাধ্যমে মন্দিরে কোরআন শরিফ রাখার যে গল্পটি প্রচারিত হয়- সেটি এবং এর পরবর্তী ঘটনাগুলো নিয়ে মোটামুটি সব পক্ষই এ উপসংহারে পৌঁছেছে যে, ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সুকৌশলে কাজটি ঘটানো হয়। পূজা ছিল উপলক্ষ মাত্র। কিন্তু যে আগুন ১৩ অক্টোবর ফেসবুকের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, সে আগুনই অন্তত ১৬ জেলায় হিন্দুদের বাড়ি ও প্রতিমা ভাঙচুরের ইন্ধন দিয়ে পুড়িয়ে গেছে রংপুরের পীরগঞ্জের হিন্দু সম্প্রদায়ের তিনটি গ্রামও।

এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে এবার অনেক জায়গায় পূজার সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা যায়নি, প্রতিমা বিসর্জনও হয়নি অনেক জায়গায়। মূলত, কুমিল্লার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পাঁচদিনের উৎসবের তাল কেটে যায় তৃতীয় দিনেই।

মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া একটি দেশে- যে দেশটিকে এর স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও সব মানুষের দেশ হিসেবে গড়ে তোলেন, সেখানে এমন ঘটনা শুধু দুঃখজনকই নয়, দেশের মূল চেতনা আর নীতিরও পরিপন্থি। তবে একটু দেরিতে হলেও সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন কঠোর বার্তা। কিন্তু তাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, হৃদয় থেকে যে রক্তক্ষরণ হয়েছে; তার কতটুকু উপশম হবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

মুক্তিযুদ্ধের পর এদেশের হিন্দু সম্প্রদায় নতুন দেশে সমধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধে অন্য সম্প্রদায়ের তুলনায় তাদের ত্যাগও বেশি। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় পরও আমাদের সামনে এখন একটি প্রশ্ন স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আসলে তাদেরকে এখনও এদেশের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে পারছি কি না?

পরিসংখ্যান বলছে, পাকিস্তান আমল তো বটেই, স্বাধীন বাংলাদেশেও অধিকাংশ সময় ‘সংখ্যালঘু’দের কাটাতে হয়েছে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে। রাজনৈতিক সহিংসতার সুযোগে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়কে বার বার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে আসছে। অথচ এসব সাম্প্রদায়িক কাজ মহানবীর (সা.) এর নির্দেশনা ও ইসলামি শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সুরা আনআমের ১০৮ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-

“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব দেবদেবীর পূজা-উপাসনা করে, তোমরা তাদের গালি দিও না। যাতে করে তারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দিয়ে না বসে।”

ইসলামে যেখানে অন্য ধর্মের দেবতাকে গালি দেয়াই নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে মন্দির ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর কোনোভাবে ধর্মসম্মত হতে পারে না। মহানবী (সা.) আরও বলেছেন-

“কোনো মুসলমান যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে কিংবা তাদের ওপর জুলুম করে, তবে কেয়ামতের দিন আমি মুহাম্মদ ওই মুসলমানের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে লড়াই করব।” (আবু দাউদ)

মূলত পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর থেকে তারা কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছে। এরপর সামরিক বা বেসামরিক লেবাসে জিয়া, এরশাদসহ যারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে, তারা শুধু যে সংবিধানকে ধর্মীয় এবং সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে আবদ্ধ করেছিলেন তা নয়, মাইনরিটি ক্লিনজিং প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত করে গেছেন।

১৯৯০ ও ১৯৯২-এ এরশাদ ও বিএনপি আমলে রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা লাগিয়ে সংখ্যালঘুদের বহু ঘরবাড়ি ও মন্দির ভাঙা হয়েছে। ২০০১-এর নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা সারা দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে তাণ্ডব চালায়, স্বাধীনতার পর এটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ নির্যাতন। তখন পূর্ণিমা আর সীমাদের কান্নায় বাতাস ভারী হলেও অপরাধীরা শাস্তি পায়নি। গণহত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, জোর করে বিয়ে, ধর্মান্তরিত করা, চাঁদা আদায় ও সম্পত্তি দখল কোনোকিছুই যেন বাদ ছিল না সে সময়।

দেশে প্রায় দেড় কোটি লোক আছে হিন্দু সম্প্রদায়ের। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যেসব দেশের জনসংখ্যাই এর চেয়ে কম। এই বিরাট জনগোষ্ঠীর মেজরিটিই এখন জবরদস্তি ও পীড়নের শিকার। আগে আড়ালে-আবডালে বলা হলেও এখন মুখের সামনেই তাদের বলা হয় ‘মালাউন’। এটা পরিষ্কার যে, একাত্তরের পরাজিত শক্তি ‘সংখ্যালঘু’ হ্রাসকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশে একটি গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের সংকট তৈরি করতে চায়। কারণ, এরা ভাবছে, যদি ‘সংখ্যালঘু’দের তাড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র করাও সহজতর হবে।

প্রথম আলোর ২০১২-এর ২২ সেপ্টেম্বরের একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়- দেশের জনসংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে না। ২০০১ ও ২০১১ সালের আদমশুমারির জেলাভিত্তিক তথ্য পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, ১৫টি জেলায় হিন্দু জনসংখ্যা কমে গেছে। জনসংখ্যাবিদদের মতে, এটি ‘মিসিং’ পপুলেশন বা ‘হারিয়ে যাওয়া মানুষ’। এরা কেন হারিয়ে গেল? কেন নীরবে দেশত্যাগ করার কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে অবিশ্বাস্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ল তা নিয়ে কেউ কি ভেবেছে? একটা উদাহরণে কিছুটা স্পষ্ট হতে পারে।

এক পরিসংখ্যান জানাচ্ছে- বরিশাল বিভাগের কোনো জেলাতেই হিন্দুদের সংখ্যা বাড়েনি। বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী এবং বরগুনা; এই ছটি জেলায় ২০০১-এর আদমশুমারিতে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৮ লাখ ১৬ হাজার ৫১ জন। ২০১১-এর শুমারিতে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৯ জন। খুলনা বিভাগের বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল ও কুষ্টিয়া; এ ৫ জেলায় হিন্দুদের সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে। উল্লেখ্য, ২০০১-এ বরিশাল ও খুলনা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।

গত কবছর ধরে আমরা দেখছি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিতাড়ন ও উচ্ছেদে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী একযোগে কাজ করে। ২০১২ সালে রামুতে ট্রাকে করে লোক এসে বৌদ্ধমন্দিরে হামলা করে। নাসিরনগরে কয়েক ঘণ্টা ধরে হামলা করা হয় তা সবার জানা। আর সুনামগঞ্জের শাল্লায় তো মাইকিং করে লোক জড়ো করা হয়েছে। এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়েই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাগুলো করা হচ্ছে।

আরেকটি ব্যাপার হলো, যত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাই ঘটুক; পুলিশ আসে ঘটনার পরে। কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে হামলা ও লুটপাটের পর পুলিশ এসেছে, একই অবস্থা রামুতেও হয়েছিল। আর পীরগঞ্জে আমরা দেখলাম, পুলিশ নিরাপত্তা দিতে গেল এক জায়গায়, কিন্তু অগ্নিসংযোগ হলো অন্য জায়গায়।

আমরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক দাবি করছি। অথচ কদিন ধরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে সন্ত্রাসী হামলা হলো, তাদের মন্দির ও পূজামণ্ডপে ভাঙচুর করা হলো- বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হলো- সেসব ঘটনা সংখ্যাগুরুদের মনে কি খুব একটা দাগ কেটেছে? উল্টো রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা যেসব কথা বলছে, তাতে আক্রান্তের ওপর তাদের সহানুভূতি প্রকাশের চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লাভের চেষ্টাই বেশি দেখা গেছে।

এ কারণে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন- ‘রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আমাদের আস্থা নেই।’ কিন্তু এই অনাস্থা কি একদিনে তৈরি হয়েছে? ক্রমাগত আক্রান্ত হতে হতে তাদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে।

কোনো দেশের ‘সংখ্যালঘু’ নিরাপদ থাকবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সেদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মনমানসিকতার ওপর। বাংলাদেশের ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের মানুষ মাটি কামড়ে এদেশেই থাকতে চায়। তাদের তাড়িয়ে বা তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করে বাংলাদেশ কি লাভবান হতে পারবে? বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো হোক সেটা আমরা কেউই চাই না।

দেশটিতে একদিকে যেমন সংখ্যালঘু নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া সফলতার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে, একইভাবে সংখ্যাগুরুরাও নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে। সেখানে শিয়ারা সুন্নিদের মারছে, সুন্নিরা শিয়াদের। আর সবাই মিলে হত্যা করছে মানবতাকে। বাংলাদেশেও যাতে সে পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়, সেজন্য এখনই আমাদের সজাগ হওয়া উচিত।

পাশাপাশি ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়কে সুরক্ষায় নারী নির্যাতন দমন আইনের মতো একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। বর্তমানে যে আইনগুলো আছে, সেসব দিয়ে এ সমস্যা মোকাবিলা করা যাবে না। এ আইন প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত সন্ত্রাস দমন আইন, দ্রুত বিচার আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের প্রয়োগ ঘটানো যেতে পারে। ‘সংখ্যালঘু’দের পাশে দাঁড়ানো উচিত ‘সংখ্যালঘু’দের স্বার্থে নয়, সংখ্যাগুরুদের স্বার্থেও। কারণ, বহুত্ববাদের ধারণা থেকে রাষ্ট্র একবার সরে এলে সেটি ফিরিয়ে আনা শুধু কঠিনই হবে না বলা যায় অসম্ভব হয়ে যাবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা
দখলদার ইসরায়েলের আগ্রাসন ও বাংলাদেশের অবস্থান
ইতিহাস সৃষ্টি করা দিন
বিশ্বের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক
শেখ হাসিনার প্রত্যার্বতনে গণতন্ত্র প্রবহমান

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক শক্তি রুখতে কালক্ষেপণ নয়

সাম্প্রদায়িক শক্তি রুখতে কালক্ষেপণ নয়

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কী করছিলেন জানি না। তারা যদি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বুকে নয়, মুখে বলে তাহলে কিছু বলার আছে। যদি অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলেন। আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় মুখ বুজে পড়ে থাকেন, তাহলে আপত্তি আছে। তার মানে বুঝতে হবে চেতনায় মরিচা ধরেছে।

গতকাল ২০ অক্টোবর ছিল লক্ষ্মীপূজা, ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী, প্রবারণা পূর্ণিমা; একদিনেই। এই একদিনে তিনটি ধর্মীয় উৎসব পালন এদেশেই সম্ভব। কেননা, তিন ধর্মের মানুষ যুগ যুগ ধরে এদেশে সহাবস্থান করছে। এর চেয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর কী হতে পারে! আমরা সবাই একসঙ্গে মিলে উৎসব পালন করছি। তবে এবার বড় বেদনাহত হয়ে আমরা দুর্গোৎসব পালন করেছি। দেশের ‘সংখ্যালঘু’ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ভীতসন্ত্রস্ত।

আমরা বীরের জাতি। বাঙালি জাতি কোনো সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ভয় পায় না। কুমিল্লার নানুয়ার দীঘির পাড়ে পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখা নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে, আমি হতবাক হয়েছি। আমি ভয় পেয়েছি। আমার ভয়টা অন্য জায়গায়। আবার না জানি কার বাড়ি-ঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে! কোন মায়ের বুক খালি হবে। মায়ের আর্তচিৎকারে জন্মভূমি কেঁপে উঠবে। এখন ভয় নিত্যদিনের সঙ্গী হয়েছে।

পত্রিকায় দেখলাম, মানুষ সবকিছু হরিয়ে কপালে হাত দিয়ে বসে আছে। রংপুরের পীরগঞ্জে চারদিকে পোড়া গন্ধ। মাটি পুড়ে লাল হয়ে গেছে। কিন্তু পোড়েনি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হৃদয়। বাচ্চারা ভাতের অভাবে তাকিয়ে আছে। কিন্তু মন গলেনি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর। বরং সাম্প্রদায়িক শক্তির বীভৎস রূপ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। হিন্দুদের মণ্ডপ, বাড়ি-ঘর, নারী ও লুটপাট এখন তাদের টার্গেট।

এরাই জামায়াত-বিএনপি আমলে মা-মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। মায়ের সামনে মেয়েকে অপমান করেছে। সুখের সংসারে আগুন জ্বালিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে অনেক পরিবারকে। কিন্তু কান্না শোনার যেন কেউ নেই।

গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লার নানুয়ার দীঘির পাড়ে পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগে এনে হামলার ঘটনাকে ধিক্কার জানানোরও ভাষা নেই। শুধু হামলা নয়, ভাঙচুর, খুন, লুটপাটসহ এমন কোনো ঘটনা নেই, যা ঘটেনি। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন কী করছিলেন? সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে। এই সংস্থাগুলো কী করছিল?

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কী করছিলেন জানি না। তারা যদি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বুকে নয়, মুখে বলে তাহলে কিছু বলার আছে। কিন্তু যদি অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলেন। আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় মুখ বুজে পড়ে থাকেন, তাহলে আপত্তি আছে। তার মানে বুঝতে হবে চেতনায় মরিচা ধরেছে। এতো গেল কুমিল্লার ঘটনা। কিন্তু পরে নোয়াখালীর ঘটনাকে আরও বেশি নাড়া দিয়েছে। অন্তত সরকার ও প্রশাসনের সজাগ থাকলে এমন পরিস্থিতি হতো না। এখানে সরকারের গাফলতি রয়েছে। রয়েছে প্রশাসনের উদাসীনতা।

নোয়াখালী মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম ঘাঁটি। অনেক বড় মানুষের জন্ম। তাদের সন্তানরা আজকে স্থানীয় প্রতিনিধি সেখানে এমন ঘটনা কীভাবে ঘটল সেটা বোধগম্য নয়। যেখানে ত্যাগী আওয়ামী লীগের নেতারা রয়েছেন। তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষাকে কেন্দ্র করে আজ সেখানে আওয়ামী লীগ বিভক্ত। আপনারা বিভক্ত হন, আর অবিভক্ত থাকেন, সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা, আপনারা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাস করেন। তাহলে নোয়াখালীতে এমন দুঃখজনক ফটনা ঘটে কীভাবে?

রংপুরের পীরগঞ্জ। জানা মতে, শান্তিপ্রিয় এলাকা। এলাকায় জেলেপল্লিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। গোয়ালের পশু পর্যন্ত রেহাই পায়নি। মানুষের গোলার ধান, ঘরের টিনসহ সব কিছু পুড়ে ছাই হয়েছে। আর সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তালি দিয়েছে। প্রশাসন ঘটনা শেষ হওয়ার পর সেখানে যাচ্ছে। প্রশাসনকে জানানোর পরেও তারা ঘটনার অনেক পর সেখানে উপস্থিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাহলে কি প্রশাসনের মধ্যেও গলদ আছে?

গত ১৩ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। কিন্তু এই ১৩ বছরেও প্রশাসন অসাম্প্রদায়িক কি না প্রশ্নসাপেক্ষ। সেখানে অজ্ঞাত অসংখ্য মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু এতদিনে হিন্দুদের ওপর যতগুলো হামলা হয়েছে, তার কটির বিচার মানুষ দেখতে পেয়েছে? হয়নি বললেই চলে।

মামলা হয়। গ্রেপ্তার হয়। কদিন পর জামিনে বেরিয়ে আসে। কিন্তু ভুক্তভোগী বা ক্ষতিগ্রস্তরা বিচার পায় না। এবারও মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে। কদিন পর হয়তো ছেড়ে দেয়া হবে। বিচার হবে কি না সেট আরও দূরের বিষয়। কারণ সরকারের ইচ্ছে থাকলেও প্রশাসনসহ বিচারকাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি জায়গায় সাম্প্রদায়িক শক্তি রয়েছে। যেখান থেকে সরকার চাইলেও বের হয়ে আসতে পারছে না কেন সেটা উদঘাটন জরুরি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তাই এদেশের মানুষের তার প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা অনেক বেশি। এই বিশ্বাস ও আস্থা যেন উবে না যায়। এদেশের ‘সংখ্যালঘু’রা সব সরকারের আমলেই মার খায়। কিন্তু শেখ হাসিনার আমলে মার খাবে, এটা ভাবতে অবাক লাগে।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার পার্শ্ববর্তী এলাকা আগৈলঝাড়া, গৌরনদী। সেখানে হিন্দুদের বাড়িতে হামলা করা হয়েছিল। মায়ের সামনে মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। মন্দিরে হামলা ভাঙচুর করা হয়। কিন্তু তার কতটুকু বিচার হয়েছে আজও জানি না। সেটা ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমল। বিএনপির সঙ্গে ছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। ফলে জনগণ আশার আলো একটু বেশি দেখতে চাইবে, এটিই স্বভাবিক। কিন্তু সেই ‘গুড়ে যদি বালি’ পড়ে, এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে!

যুগে যুগে ‘সংখ্যালঘু’রা মার খাবে, এটা হতে পারে না। অপরাধীদের এমন শাস্তি দিতে হবে যাতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা
দখলদার ইসরায়েলের আগ্রাসন ও বাংলাদেশের অবস্থান
ইতিহাস সৃষ্টি করা দিন
বিশ্বের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক
শেখ হাসিনার প্রত্যার্বতনে গণতন্ত্র প্রবহমান

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িকতার কাছে বাংলাদেশ হারবে না

সাম্প্রদায়িকতার কাছে বাংলাদেশ হারবে না

ইসলাম কিছুতেই মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট সমর্থন করে না। এটা ভয়ংকর শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং কঠোর শাস্তির মতো পাপ। একজন ভালো মুসলমান কিছুতেই ভিন্নধর্মের নিরপরাধ মানুষের ওপর আঘাত করবে না। একজনের অপরাধে আরেকজনকে শাস্তি দেবে না। কুমিল্লার ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তির শাস্তি আমরা সবাই চাই। কিন্তু কুমিল্লার ঘটনায় পীরগঞ্জে আগুন, নোয়াখালীতে লুটাপাট হবে কেন?

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যাওয়ার আগে উপমহাদেশকে দুই ভাগ করে দিয়ে যায়। ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে গঠিত হয় ভারত। আর দ্বিজাতিত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত হয় ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তান। বর্তমান বাংলাদেশ তখন ছিল পাকিস্তানের অংশ- পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ভৌগোলিক ব্যবধান ছিল ১১০০ মাইল, আর মানসিক দূরত্ব ছিল অলঙ্ঘনীয়। পাকিস্তান গঠনের পর পরই এ অঞ্চলের মানুষ বুঝে যায়, এটি তাদের দেশ নয়। ধর্ম কখনও একটি রাষ্ট্রের ঐক্যের সূত্র হতে পারে না, হয়নিও। ২৩ বছরের মুক্তিসংগ্রাম শেষে নয়মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন। স্বাধীনতার পর সংবিধানেও ঠাঁই হয় সেই মূল চেতনা ধর্মনিরপেক্ষতার।

আবহমানকাল ধরেই এ অঞ্চলের সব ধর্মের মানুষ মিলে-মিশে থাকছে। এটাই বাংলাদেশের মূল চেতনা, মানুষের মূল শক্তি। কিন্তু ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশ আবার পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। গর্তে লুকিয়ে থাকা একাত্তরের পরাজিত শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সামরিক শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে ধর্মকেই বেছে নেয় ঢাল হিসেবে। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। আর এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে রাষ্ট্রের মূল চেতনায় আঘাত হানেন।

সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম নিয়ে কোনো বিরোধ নেই, কোনো বিদ্বেষ নেই। তারা মিলে মিশেই থাকছেন আবহমানকাল ধরে। কিন্তু কখনও কুচক্রী মহলের উসকানিতে, কখনও রাজনৈতিক কারণে, কখনও সম্পত্তির লোভে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নির্যাতনের শিকার হয়। আর কোণঠাসা হতে হতে একসময় তাদের কেউ কেউ দেশ ছাড়তেও বাধ্য হয়েছেন।

’৪৭ সালে দেশে ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায় ছিল ৩৩ ভাগ, এখন সেটা নেমে এসেছে ৮ ভাগে। এই পরিসংখ্যানটি আমরা যারা ধর্মীয় সংখ্যাগুরু তাদের জন্য লজ্জার, গ্লানির। একজন মানুষ কখনোই স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়েন না, শেকড় কেউ ছাড়তে চান না। পিঠ যখন একদম দেয়ালে ঠেকে যায়, তখনই মনের কষ্ট চাপা দিয়ে দেশ ছেড়ে উদ্বাস্তু হয় মানুষ। সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কমে যাওয়া মানে সংখ্যাগুরু হিসেবে আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে পারিনি, তাদের সত্যিকারের বন্ধু হতে পারিনি, তাদের মনে নিরাপত্তাবোধ দিতে পারিনি। এমনিতে সাধারণভাবে বাংলাদেশে খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি সবই হয়। কিন্তু একজন মানুষ যখন ধর্ম পরিচয়ের জন্য নির্যাতনের শিকার হবে সে অপরাধটা সবচেয়ে বড়।

আমরা আসলেই পারিনি ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দিতে। তারা সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে। উৎসব মানে আনন্দ, বাধভাঙা উচ্ছ্বাস। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে উৎসব করতে হয় ভয়ে ভয়ে, তাদের উৎসব যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। শারদীয় দুর্গোৎসব যেন প্রতিমা ভাঙার মৌসুম। দিনের পর দিন চলে আসছে এই অবস্থা। তবে এবার কুমিল্লা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্নস্থানে যা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্ক হয়ে থাকবে।

কুমিল্লায় পবিত্র কোরআন অবমাননার ঘটনায় ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের হৃদয়ে আঘাত করেছে। তারা দায়ীদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। কিন্তু বিক্ষোভ করা আর মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এক নয়। যারা হামলা করেছে তারা বিছুতেই ধর্মপ্রাণ মুসলমান হতে পারে না। ইসলাম কিছুতেই মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট সমর্থন করে না। এটা ভয়ংকর শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং কঠোর শাস্তির মতো পাপ। একজন ভালো মুসলমান কিছুতেই ভিন্নধর্মের নিরপরাধ মানুষের ওপর আঘাত করবে না। একজনের অপরাধে আরেকজনকে শাস্তি দেবে না। কুমিল্লার ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তির শাস্তি আমরা সবাই চাই। কিন্তু কুমিল্লার ঘটনায় পীরগঞ্জে আগুন, নোয়াখালীতে লুটাপাট হবে কেন?

এ ধরনের ঘটনায় চেনা বাংলাদেশ মুহূর্তেই অচেনা হয়ে যায়। পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস, দোষারোপ চলতে থাকে। কিন্তু এসব কিছু নয়, প্রয়োজন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ। আশার কথা হলো, বাংলাদেশ তার আপন শক্তিতে জেগে উঠেছে। গোটা বাংলাদেশ এখন প্রতিবাদে উত্তাল। প্রতিদিনই এখন দেশের কোথাও না কোথাও বিক্ষোভ, শান্তির পদযাত্রা, সমাবেশ, মানববন্ধন হচ্ছে। কুমিল্লার ঘটনার পর থেকে দেশের বিভিন্নস্থানে মন্দির বা হিন্দুদের বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছে মুসলমান যুবকরা। এমনকি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের রক্ষা করতে গিয়ে আহত হয়েছেন মুসলমানদের অনেকে।

কুমিল্লার ঘটনা অচেনা হয়ে ওঠা বাংলাদেশ আবার ফিরছে চেনা রূপে। আমি সবসময় যেটা প্রত্যাশা করি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়নের প্রতিবাদে হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানরা বেশি মাঠে নামবে। এবার তাই হচ্ছে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষই সামনের কাতারে। সাধারণত এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দ্রুত ছড়ায় গুজবের পাখায় ভর করে। আর ধর্মের নামে কিছু অমানুষ এই গুজব ছড়ায়। এখন আবার ফেসবুক আসায় গুজবটা সহজে ছড়ানো যায়।

বেদনাদায়ক হলো- ইসলামের লেবাসধারী কিছু কাঠমোল্লা ধর্মের আসল চেতনাকে পাশ কাটিয়ে ঘৃণা ছড়ায়, বিদ্বেষ ছড়ায়; তাতে সহিংসতা আরও বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিছু ফেসবুক প্রোফাইল থেকে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে কুমিল্লার ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছে। আর তাতে হাওয়া দিয়েছে কিছু লেবাসধারী মোল্লা। তবে আশার কথা হলো, ইসলামকে যারা অন্তরে ধারণ করেন, তেমন মওলানারা এবার সোচ্চার। তারা কথা বলছেন, মসজিদের খুতবায় ইসলামের আসল চেতনাটা তুলে ধরছেন, রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঠেকাতে এর চেয়ে ভালো উপায় আর নেই।

একজন ইসলামি চিন্তাবিদ যখন ইসলামের আলোকে বুঝিয়ে দেবেন মন্দিরে হামলা করাটা পাপ, হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা করাটা ভয়ংকর অন্যায়; তখন সাধারণ মানুষ সেটা সবচেয়ে ভালো করে বুঝবে, তারা কারো উসকানিতে পা দেবে না। ইসলাম তো নয়ই কোনো ধর্মই ভিন্নধর্মের মানুষের ওপর হামলাকে সমর্থন করে না। আপনি যখন ভিন্নধর্মের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত দিলেন, মনে রাখবেন, অন্য কেউও আপনার ধর্মকে আঘাত করার সুযোগ খুঁজবে। সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ইসলাম ধর্মের অবমাননা, বাংলাদেশের মূল চেতনার ওপর আঘাত।

কুমিল্লা এবং এরপর দেশজুড়ে তাণ্ডবে যতটা হতাশ হয়েছিলাম, দেশজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে তার অনেকটাই কেটে গেছে। আবার আমরা আশাবাদী হচ্ছি। বাংলাদেশ হারবে না, সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেই। সত্যের জয়, মানবতার জয় অবশ্যম্ভাবী।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা
দখলদার ইসরায়েলের আগ্রাসন ও বাংলাদেশের অবস্থান
ইতিহাস সৃষ্টি করা দিন
বিশ্বের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক
শেখ হাসিনার প্রত্যার্বতনে গণতন্ত্র প্রবহমান

শেয়ার করুন

‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি’

‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি’

পাকিস্তান আমলে এমন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক হাজারো মুসলমান এর বিরুদ্ধে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল করে। দাঙ্গা থামাতে জীবন দিয়েছে এমন নজিরও আছে। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত আত্মত্যাগে এই দেশটি স্বাধীন হয়েছে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা আছে। তবু একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু কোটি কোটি অসাম্প্রদায়িক মুসলমান বন্ধু রীতিমতো চুপ।

বিজয়া দশমী চলে গেছে। বড্ড বিবর্ণ, ম্লান, এক রক্তঝরা দুর্গোৎসব পার করলাম। আমি সকালে পত্রিকাগুলো হাতে পেয়ে লিখতে বসছি। আগেই লেখা উচিত ছিল, কিন্তু পারিনি। এ লেখার তৈরির আগের দিন পাবনাতে ঢাকার পত্রিকাগুলো আসেনি। সংবাদপত্রবাহী গাড়ি সরকারি অগ্রাধিকার তালিকায় প্রথমদিকে। পুলিশের কর্তব্য ছিল যে করেই হোক, যানযটের তোয়াক্কা না করে এই গাড়িগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে দেয়া। পুলিশ সে দায়িত্ব পালন করেনি।

কী লিখব আর কীভাবে লিখব? কেমন উপসংহার টানব বুঝে ওঠতে পারছি না। মনে যা আসে, ঘটনা যেভাবে দেখেছি তাই স্পষ্টভাষায় লিখব।

বিদ্রোহী কবির ভাষায়-‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি- তাই যাহা আসে কই মুখে।’ পরিস্থিতিটা এমনই যা ভাষায় প্রকাশ করতে কষ্ট হয়। এই কষ্ট তো হওয়ার কথা ছিল না। ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো। কিন্তু জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তীব্র ও আপসহীন লড়াইয়ের মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে আনা হয়। ভাষাসংগ্রামীদের আত্মদানও ঘটেছে। তবু কেউ পিছু হটেনি। কী লিখেছে জাতীয় ও বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রগুলো?

দেশের অন্যতম প্রাচীন পত্রিকাটির প্রতিবেদন দিয়েই শুরু করি। ‘আবারও ধর্মীয় উস্কানী, সাম্প্রদায়িক হামলা, নিহত ৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়ে দুর্গাপূজার আগে দেশে বেশ কটি জায়গায় পূজামণ্ডপে হামলা হয়েছে। এধরনের ঘটনায় চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে সংঘর্ষে ৪ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পূজামণ্ডপে বিচ্ছিন্নভাবে আরও একাধিক ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি পুলিশ, র‌্যাব ছাড়াও দেশের ২২ জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে হাজীগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

ঘটনার সূত্রপাত, গত বুধবার ১৩ অক্টোবর মহাষ্টমীর দিন কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে প্রতিমার পায়ের কাছে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়া গেছে এমন খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে উসকানি দেয়া হয়েছে। এরপর কুমিল্লার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। এ নিয়ে সেখানে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও গুলি ছোড়ে।

‘কুমিল্লায় হামলার ঘটনায় সন্দেহজনক কজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আরও কজনকে চিহ্নিত করেছে। তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে শিগগিরই সক্ষম হবে বলে মনে করছি।’ বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

হাজীপুরে (চাঁদপুর) গত বুধবার (১৩ অক্টোবর) রাত নটার দিকে চাাঁদপুরের হাজীগঞ্জ বাজারে লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর আখড়া মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসময় পুলিশের সঙ্গে মিছিলকারীদের সংঘর্ষের সময় গোলাগুলিতে ৪ জন নিহত হয়। আহত হয় পুলিশসহ ৩০ জন। পরিস্থিতি সামাল দিতে বুধবার রাত এগারোটার পর থেকে হাজীগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার পূজামণ্ডপ ও হিন্দু বসতিতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। মোতায়েন করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য।

সাম্প্রদায়িক অপশক্তি উলিপুরের পরিবেশ বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এমন ঘটনা ঘটল।

কুমিল্লার ঘটনার জের হিসেবে সিলেটের জকিগঞ্জের কালীগঞ্জে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ৩০০-৪০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়।

পাবনা জেলার বেড়াতেও অনুরূপ ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার নিশ্চয়ই এখানেই শেষ নয়- এটি শুরুও নয়। দশকের পর দশক ধরে এ জাতীয় কিংবা এর থেকেও ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটছে কিন্তু বিচার নেই, মামলা নেই, মামলা হলেও চার্জশিট নেই। জামিনও পেতে লাগে মাত্র ৩ থেকে ৭ দিন। তারপর ফাইনাল রিপোর্ট।

তাহলে উপায়? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার বলেছেন, কুমিল্লার সাম্প্রদায়িক ঘটনায় কাউকে ছাড় নয়। একথা সত্য হোক। কিন্তু অভিজ্ঞতা করুণ। আরও বহু জায়গায় কুমিল্লার মতো ঘটনা ঘটেছে। সেসবসহ যেগুলো ঘটবে সেগুলো এবং অতীতে যেগুলো ঘটেছে সেগুলোর কী হয়েছে?

এ কথা সবারই জানার কথা, পাকিস্তান আমলে এমন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক হাজারো মুসলমান এর বিরুদ্ধে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল করে। দাঙ্গা থামাতে জীবন দিয়েছে এমন নজিরও আছে। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত আত্মত্যাগে এই দেশটি স্বাধীন হয়েছে।

সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা আছে। তবু একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু কোটি কোটি অসাম্প্রদায়িক মুসলমান বন্ধু রীতিমতো চুপ। রাজপথে মাঝেমধ্যে ‘সংখ্যালঘু’দের কিছু সংগঠনকে মিছিল করতে দেখা যায়। এরা অনেকেই সরকারের কাছ থেকে সুবিধাভোগী। লোক দেখানো হলেও তবু তারা মাঝেমধ্যে মাঠে বা রাস্তায় নামে। এর কোনো প্রতিক্রিয়া বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে আদৌ হয় না। আবার যে আইনি ব্যবস্থার কথা সরকার ও আমরা বলে থাকি, তারা যেন মনে রাখে আইন দ্বারা সব হয় না। আইনি পথে মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতাও হয়নি।

লেখক: রাজনীতিক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা
দখলদার ইসরায়েলের আগ্রাসন ও বাংলাদেশের অবস্থান
ইতিহাস সৃষ্টি করা দিন
বিশ্বের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক
শেখ হাসিনার প্রত্যার্বতনে গণতন্ত্র প্রবহমান

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িকতার অন্ধত্ব নয় মানবিকবোধসম্পন্ন হতে হবে

সাম্প্রদায়িকতার অন্ধত্ব নয় মানবিকবোধসম্পন্ন হতে হবে

এরা শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারীই যদি হবে তবে ২০১৪-এর নির্বাচন ঠেকানোর সন্ত্রাসী আয়োজনের সময় শিবিরের আস্তানায় পেট্রোলবোমা, গানপাউডার আর ককটেল পাওয়া যাবে কেন? কেন সিতাকুণ্ডের পাহাড়ে শিবির মানুষ হত্যার জন্য, সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলবে? কেন সেখানে ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্রের মজুদ পাওয়া যাবে? ধর্মের নাম ভাঙিয়ে চলা এসব লোভী মানুষ ধর্ম ও সভ্যতার শত্রু।

সচেতন আর বিবেকবান মানুষেরা আতঙ্কিত ও বিস্মিত এই জন্য যে, একুশ শতকের এ অগ্রগতির যুগে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে কীভাবে একদল মানুষ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াতে মাঠে নেমেছে। এদেশের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উজ্জ্বল ক্যানভাসের কথা এসব অন্ধকার জীবের জানা নেই। ১৩ শতক থেকে ১৮ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এদেশে বহিরাগত মুসলিম- সুলতান ও মোগলরা শাসন করেছে। সুফি-সাধকরা ধর্মপ্রচার করেছে মানবতার বাণী ছড়িয়ে।

ইসলামের শান্তির বাণী ও মানবিক আচরণ আকৃষ্ট করে ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসকদের অত্যাচারে বিপন্ন সাধারণ হিন্দুকে। সুফির কাছে এসে তারা বেঁচে থাকার আশ্বাস পেতে চেয়েছে। অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পৃষ্ঠপোষকতা পেত মুসলমান শাসকদের কাছ থেকে। মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বন্ধুর মতো পাশাপাশি বাস করত। একে অন্যের প্রয়োজনে ছুটে আসত।

এখনও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার ভেদবুদ্ধি নেই। হঠাৎ সাম্প্রদায়িক হিংসা উসকে দেয়া দেখে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে সব অপকাণ্ডের সূত্র হচ্ছে নষ্ট রাজনীতি। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে সমাজকে বিপন্ন করে তুলছে সুবিধাবাদী কিছু মানুষ।

গণতান্ত্রিক পথচলার পরিক্রমা নষ্ট করে ফেলেছে বিভিন্ন পক্ষের রাজনীতিকরা। সরল পথে কেউ হাঁটতে পারছে না। নিয়মতান্ত্রিক পথে গণতান্ত্রিক ধারা বজায় থাকলে রাজনীতিতে এত হতাশা নেমে আসত না। তাই সরল পথ না পেয়ে মোক্ষ লাভের জন্য অন্ধকার পথ খুঁজতে হচ্ছে সব পক্ষকে।

এমন বাস্তবতায় নৈরাজ্য দানা বাধবেই। এসবের মধ্যে আবার এ আধুনিক সময়ে নানা নামে ধর্মীয় মৌলবাদীদের বিকাশ ও বিস্তার ঘটছে। পাকিস্তান আমলেও ধর্ম নিয়ে এমন ফিতনা-ফ্যাশাদ ছিল না। গ্রামগঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় গজিয়ে ওঠা অসংখ্য মাদ্রাসায় তৈরি করা হচ্ছে মৌলবাদীদের তালেবে এলেম। দায়িত্বশীল মাদ্রাসার প্রকৃত ইসলামচর্চাকারী আলেম ও শিক্ষার্থীরা এদের দাপটে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।

ধর্মের ভুল ব্যাখ্যায় এদের বিভ্রান্ত করে অন্যায়ের পথে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর এসবের ভেতর থেকে একে একে ঘটে যাচ্ছে রামুর বৌদ্ধদের ওপর আঘাত হানা, নাসিরনগরে হিন্দুদের জীবন ও সম্পদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া, কুমিল্লার পূজামণ্ডপে সাম্প্রদায়িকতার কূটচালে নাটক সাজানো।

জঙ্গি দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কৃতিত্ব এসব ঘটনায় অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। গোয়েন্দাদের দুর্বলতা এখন আর লুকোছাপা নেই। কুমিল্লার ঘটনার আগে কোনো পক্ষ আঁচ করতে পারেনি- তা না হয় মানা যায় কিন্তু এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া যে হতে পারে তা না ভাববার কারণ কী? রংপুরের জেলেপল্লিতে এতবড় তাণ্ডব ঘটে গেল অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুই আঁচ করতে পারল না! ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ভাঙা রেকর্ড বাজতে থাকে। খুঁজে বের করবে, কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে... ইত্যাদি।

ধর্মীয় মৌলবাদীরা ও রাষ্ট্রক্ষমতা প্রত্যাশী রাজনীতিকরা অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহে যুগ যুগ ধরে সরল মানুষদের ধর্মান্ধ জঙ্গি বানাতে চেষ্টা করেছে। এই সরল মানুষদের মুক্তবুদ্ধি আর চেতনার সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। একচোখা গণ্ডারের মতো অন্ধ বানিয়ে ছেড়েছে মানবতা ও সভ্যতার বক্ষ বিদীর্ণ করতে।

ব্যক্তিগত লাভের ফসল ঘরে তুলতে নিজধর্মকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। খ্রিস্ট-সনাতন, ইসলামসহ অন্যসব ধর্মের নামাবরণে এ ধারার ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের অশুভ অবস্থান দেখা গিয়েছে, যাচ্ছেও। বিশ্বজুড়ে এসময় ইসলামের নাম ভাঙানো জঙ্গিবাদ শান্তিবাদী মানবিক ধর্ম ইসলামকে ভুলভাবে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করছে।

আমাদের দেশে লেবাস ও বর্ণিত আদর্শে জামায়েতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির ইসলামের নাম নিয়েই রাজনীতি করে। এখন যদিও নিজ অপকর্মে এই দল দুর্বল হয়ে গেছে। এরা কি কম আসুরিক কাজ করেছে? এই দলের নেতাকর্মীরা নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য চরম ইসলামবিরোধী কাজ করে যাচ্ছিল অবলীলায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা নিজেদের আদর্শিক কারণে পাকিস্তানপন্থি হতেই পারে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান না-ও নিতে পারে। তাই বলে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হয়ে গণহত্যায় অংশ নেবে? ধর্ষণের সহযোগী হবে? নিরীহ-নিপরাধ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে? ইসলামের দৃষ্টিতে তো এসব আচরণ ঘোরতর পাপের কাজ। ইসলামী ছাত্র শিবির যখন প্রতিপক্ষ ছাত্রবন্ধুকে হত্যা করে, পায়ের রগ কেটে দেয় এর কি কোনো অনুমোদন পাবে ইসলামে? কবছর আগেও আন্দোলনের নামে বিএনপির বন্ধু হয়ে যেভাবে নিরীহ সাধারণ মানুষকে পেট্রোল বোমায় পোড়াচ্ছিল এর অনুমোদন কোথায় ইসলাম ধর্মে?

এরা শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারীই যদি হবে তবে ২০১৪-এর নির্বাচন ঠেকানোর সন্ত্রাসী আয়োজনের সময় শিবিরের আস্তানায় পেট্রোলবোমা, গানপাউডার আর ককটেল পাওয়া যাবে কেন? কেন সিতাকুণ্ডের পাহাড়ে শিবির মানুষ হত্যার জন্য, সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলবে? কেন সেখানে ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্রের মজুদ পাওয়া যাবে? ধর্মের নাম ভাঙিয়ে চলা এসব লোভী মানুষ ধর্ম ও সভ্যতার শত্রু। এসব বিচারে ইসলামী স্টেটস নামধারী জঙ্গি থেকে শুরু করে জামায়েতে ইসলামী এবং ইসলাম নামধারী নানা জঙ্গি ভাবাদর্শের দল সবাই একসূত্রে গাঁথা।

ইন্টারনেটের কল্যাণে পাঠক নিশ্চয়ই বেশ কবছর আগে বর্বর জঙ্গিদের মসুল জাদুঘরে রাখা এশেরীয় সভ্যতার মহামূল্যবান নিদর্শনগুলো নির্দয়ভাবে হাতুড়ি চালিয়ে ভেঙে ফেলতে দেখেছিলেন! চোখে দেখেও বিশ্বাস হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল হাতুড়ির প্রতিটি ঘা বুকের একটি করে পাঁজর ভেঙে ফেলছে। সেই মধ্যযুগে আব্বাসীয় শাসনপর্বে বাগদাদ ছিল ইসলামি সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি।

এখানে আক্রমণ করেছিল মঙ্গোলীয় বর্বর নেতা হালাকু খান। পুড়িয়ে দিয়েছিল বাগদাদের জাদুঘর আর লাইব্রেরি। এখনও ঘৃণাভরে সে বর্বরতার কথা স্মরণ করে পৃথিবীর সংস্কৃতিসচেতন মানুষ। এই আধুনিক যুগে এসেও ইসলামি রাজ্য গড়ার কথা বলে ইসলামের উদারতা ও গরিমাকে কলঙ্কিত করে বিশ্ববাসীর কাছে সংকীর্ণভাবে উপস্থাপন করছে কিছু ধর্মান্ধ মানুষ। এজন্যই বুঝি বলে ধার্মিক মানুষ সবসময় মানবিকতার পক্ষে আর মানবতা ও ধর্মের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ধর্মান্ধ মানুষ। কারণ অন্ধ রেখে ধর্মের নাম ভাঙিয়ে এদের দিয়ে যেকোনো অপকর্ম করানো যায়।

২০০১-এর কথা কি আমরা ভুলতে পেরেছি? আফগানিস্তানের তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের ফরমান মতো বামিয়ান উপত্যকায় অনিন্দ্য সুন্দর বৌদ্ধ ভাস্কর্য গুড়িয়ে দিয়েছিল মূর্খ, উন্মাদ তালেবান জঙ্গিরা। ২০০৮-এর কথা; হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বরাবর মূল সড়কের সড়কদ্বীপে লালন ভাস্কর্য তৈরি করা হয়। সে ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে মৌলবাদীরা। এদেশের মৌলবাদী ইসলামি নেতারা কতটা গভীরভাবে নিজধর্মকে বোঝে জানি না, তবে তারা যে অসংখ্য ধার্মিক মুসলমানকে ধর্মান্ধ বানিয়ে ইসলামের কমনীয় রূপে কালিমা লেপন করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

গভীরভাবে ইসলাম ও ইতিহাস না বুঝতে পারায় সম্ভবত অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী লালনকে এ যুগের মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষরা চিনতে পারল না। যে মরমি সাধক লালন আল্লাহর সঙ্গে নিজের হৃদয় এক করে দিতে চেয়েছিলেন, তাকে প্রতীক হিসেবে ধারণ করে আমরা প্রতিদিন শুদ্ধ হতে পারতাম। এর বদলে কিছু অশিক্ষিত, অসংস্কৃত, অমার্জিত মানুষ বোকা ছাত্রদের উসকে দিয়ে লালন ভাস্কর্যকে পায়ের তলায় পিষে ফেলতে চাইল। এদের কাছে কি মূর্তি আর ভাস্কর্যের পার্থক্য স্পষ্ট নয়?

নিরাকার আল্লাহর প্রতিরূপ যাতে কেউ না দেয় সে অর্থে মূর্তি গড়ার বিরুদ্ধে বক্তব্য আছে ইসলামে। ভাস্কর্য তো সৌন্দর্যের প্রতিরূপ, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের প্রতিরূপ। এর প্রতি হিংসা প্রকাশ করতে পারে একমাত্র অন্ধকারের জীবরা।

এশেরীয় সভ্যতার নিদর্শনসমূহের ভেতর একটি বড় অহংকার শিল্প সৌকর্যে পূর্ণ ভাস্কর্য। প্রায় ৩ হাজার বছর আগের নাম না জানা শিল্পীরা কতটা নৈপুণ্যে গড়ে তুলেছিল এসব শিল্প। তা দেখে শিল্প ইতিহাসের মূল্যায়ন করবে এযুগের মানুষ। অথচ একমুহূর্তে জঙ্গির তকমা আঁটা কিছু অন্ধ উন্মাদ এই মহামূল্যবান প্রত্নঐতিহ্য নির্দয়ভাবে গুড়িয়ে দিল।

ইরাকের নিমরুদ শহরের এসব ভাস্কর্য গুড়িয়ে দেয়ার পর আরেকটি প্রাচীন শহর হাত্রার স্থাপত্যসমূহ ভেঙে ফেলে জঙ্গিরা। বুঝলাম এরা ভাস্কর্যকে পূজ্য মূর্তি বিবেচনায় ভেঙেছে। যেমন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙতে চেয়েছিল। আসলে অন্ধকারের জীবরা আলোকে সবসময় ভয় পায়। এদের কাণ্ড দেখে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আর্যদের কথা মনে পড়ল।

তাদের গ্রন্থ বেদের ভাষ্য থেকে জানা যায়, গ্রামীণ-সংস্কৃতির ধারক আর্যরা ভারতে ঢুকে সিন্ধু সভ্যতার দুর্গ নগরী দেখতে পায়। নগরীকে ভীতিকর মনে করে। তাই তাদের দেবতা ইন্দ্র ‘পুর’ অর্থাৎ নগর ধ্বংস করে দেয়। একারণে আর্যরা গর্ব করে দেবতা ইন্দ্রকে বলেছে ‘পুরন্দর’। অর্থাৎ পুর ধ্বংসকারী দেবতা।

দেখা যাচ্ছে মেসোপটেমিয়া থেকে বাংলাদেশ সর্বত্রই ধর্মান্ধরা তাদের ছড়ানো উন্মাদনায় শুধু সভ্যতার শত্রু হিসেবেই চিহ্নিত হয়নি, এরা নিজধর্মেরও শত্রু। নিজেদের ক্ষমতার লোভ এবং ধর্মকে ভুল ব্যাখ্যায় উপস্থাপন করে কলঙ্কিত করছে ধর্মের ঔজ্জ্বল্য। একারণে সুস্থ চিন্তার সব মানুষকেই প্রতিহত করতে এগিয়ে আসতে হবে।

আসলে আমরা মনে করি হিংসাকে বন্ধ করতে হিংসা ছড়ানো নয়। মানবিকতার আহবানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। যারা আজ কুমিল্লা, নোয়াখালী ও রংপুরে নিরীহ হিন্দুদের ওপর আঘাত হেনেছে, তাদের সম্পদ ধ্বংস করেছে, তারা যাতে মানবিকতার আহবানে সুন্দরের দিকে ফিরে তাকায় তেমন পরিবেশ রচনা করতে হবে। মতলববাজ গুরুরা এসব তরুণের কাঁচা মাথা চিবানোর আগেই সমাজের সচেতন মানুষকে সুন্দর ও যুক্তির পথ রচনা করতে হবে। একটি মানুষ মানবিকবোধসম্পন্ন হলে তাকে অন্ধকারের পথে নেয়া সহজ হবে না।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা
দখলদার ইসরায়েলের আগ্রাসন ও বাংলাদেশের অবস্থান
ইতিহাস সৃষ্টি করা দিন
বিশ্বের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক
শেখ হাসিনার প্রত্যার্বতনে গণতন্ত্র প্রবহমান

শেয়ার করুন

ধর্মমুখী রাজনীতি ও ‘সংখ্যালঘু’র যাতনা

ধর্মমুখী রাজনীতি ও ‘সংখ্যালঘু’র যাতনা

ধর্মমুখী রাজনীতির দিকে অতিরিক্ত ঝোঁক, নীতি-নৈতিকতা আদর্শ-মূল্যবোধহীন স্বার্থপর জীবনযাপন, সুবিধাবাদিতাকে তালিম দেয়া, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা-অভাব, শোষণ আমাদের মনমানসিকতাকে ভীষণ রকম সংকীর্ণ বানিয়ে ফেলেছে। আমরা এখন নিজেদের ব্যর্থতার জন্য কেবলই অন্যকে দায়ী করি। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো এই দায়ী করাটা হয়তো ঠিক; কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা ঠিক নয়।

বাংলা অ্যাকাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের পরিমার্জিত সংস্করণের ৯৮১ পৃষ্ঠায় ‘মালাউন’ শব্দের তিনটি অর্থ দেয়া আছে। ১. লানতপ্রাপ্ত; অভিশপ্ত; বিতাড়িত; কাফের। ২. শয়তান। ৩. মুসলমান কর্তৃক ভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের লোককে দেয়া গালিবিশেষ। অভিধানের ১০৫৪ পৃষ্ঠায় লানত শব্দেরও তিনটা অর্থ দেয়া আছে। ১. অভিশাপ। ২. অপমান; লাঞ্ছনা; ভর্ৎসনা। ৩. শাস্তি।

মনে হচ্ছে মালাউন শব্দের অর্থের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার চলছে বাংলাদেশে। এখানকার হিন্দুরা প্রতিদিনই বুঝতে পারছে বাংলাদেশে হিন্দু হয়ে জন্ম নেয়াটা অভিশাপের শামিল, প্রতিদিনই তাদের কোনো না কোনোভাবে অপমানিত হতে হয়। নির্যাতিত হতে হয়। ভীত হতে হয়। বিপন্ন হতে হয়। অপরাধ না করলেও শাস্তি পেতে হয়– ‘মালাউন’ হওয়ার চেয়ে বড় অপরাধ আর কী হতে পারে?

গত কদিন ধরে পাইকারি হারে চলছে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলা, আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট। এসব ঘটনার কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। তেমন প্রতিবাদ-প্রতিরোধও নেই। সংখ্যালঘুদের জন্য বাংলাদেশ ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। সংখ্যাগুরুর অহমিকায় অনেককেই বলতে শুনছি: ওরা বাপের দেশ হিন্দুস্তানে যায় না কেন? ওরা কোরআন অবমাননার দুঃসাহস দেখায় কেন? ওদের জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হচ্ছে না কেন?

গত একযুগে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, তার একটিও প্রমাণিত হয়নি। কখনও আইডি হ্যাক করে, কখনও ভুয়া আইডি থেকে, কখনও কেবল কোনো একজন হিন্দুকে ট্যাগ করা ফেসবুক-পোস্টকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের ওপর পাইকারি হামলা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। সরকার আজ পর্যন্ত এসব ঘটনার কূলকিনারা বের করতে পারেনি। সরকারের সামর্থ্য নেই, না ইচ্ছে নেই- সেটা একটা বড় প্রশ্ন।

মনগড়া সব অভিযোগের ভিত্তিতে হাজার হাজার মানুষ হিন্দু গ্রামগুলোতে আক্রমণ করছে। যখনই হিন্দুবাড়িতে আক্রমণের দরকার হয়, তখনই একশ্রেণির মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে যায়। থানা-পুলিশ-আইন কোনো কিছুই এই আক্রমণ ঠেকাতে পারে না। এ ব্যাপারে সামাজিক প্রতিরোধ বলতে এখন আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।

সম্প্রতি ফেসবুকে আমার এক বন্ধু গভীর হতাশা ব্যক্ত করে লিখেছেন- ‘‘জ্বর এসেছে? ধরছে মাথা? ভাঙতে কিছু ইচ্ছে করে?/গাল দিয়েছে? জমেছে রাগ? পেটের ভেতর কেমন করে?/আরে বোকা! বলবে কে কী? দাও না আগুন হিন্দুর ঘরে!’’

বর্তমানে পরিস্থিতি যেন এমনটাই দাঁড়িয়েছে। এদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একগাদা ‘অপযুক্তি’ শোনা যায়। এমনকি ‘শিক্ষিত-সচেতন’রা পর্যন্ত মনে করেন– এ দেশে হিন্দুরা ‘খুব ভালো’ আছে, সংখ্যালঘু ইস্যুটা বিশেষ উদ্দেশ্যে সামনে আনা হয়, এদেশের হিন্দুদের মধ্যে দেশপ্রেম নেই, এদের দেহ থাকে বাংলাদেশে, কিন্তু মন ভারতে, এরা বাংলাদেশের সম্পদ ভারতে পাচার করে!

পাশাপাশি এটাও ভাবেন এবং বলেন যে– ভারতে মুসলমানরা যতটা খারাপ অবস্থায় আছে, সে তুলনায় বাংলাদেশে হিন্দুরা ‘রাজার হালে’ আছে, এরা আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়, বাড়াবাড়ি করে, এদের পিটিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেয়া উচিত!

বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, এই কথাগুলো যারা বলেন এবং বিশ্বাস করেন তারা অন্য কোনো যুক্তি-প্রমাণ-তথ্যের ধার ধারেন না। এই দেশে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আপাতত একটা বিরাট জাঁতাকলের মধ্যে আছে। নিয়মিত পিষ্ট হলেও করার কিছু তো নেই-ই, বলারও কিছু নেই। কারণ বললে তা কেউ কানে তোলে না। উল্টো এমন সব কথা বলে যে, তাতে বোবা-কালা হয়ে বেঁচে থাকাটাই শ্রেয় মনে হয়।

১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির পরিবর্তে এক ধরনের সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণ রাজনীতিচর্চা প্রাধান্য পেয়েছে। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও চর্চার জায়গা থেকে ক্রমশ রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে থাবা প্রসারিত করেছে। এখন ধর্মকে রাজনীতির বাহন বানিয়ে রাষ্ট্রীয় আচারে পরিণত করার দাবি পর্যন্ত উচ্চারিত হচ্ছে। আমরা এখন আর ‘মানুষ’ পরিচয় দিতে তেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। কে ‘কতটা’ হিন্দু বা মুসলমান– সেটাই আমরা মূখ্য করে তুলছি।

এদেশের এক শ্রেণির মানুষ হিন্দুদের কোনো কিছুই মেনে নিতে পারছে না। এমনকি তাদের উপস্থিতিও অনেকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই তো আমরা দেখছি প্রায়ই সংঘবদ্ধ মানুষের তীব্র ক্ষোভ হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিতে উৎসাহ জোগাচ্ছে।

আমরা মুখে যতই প্রেম, মানবিকতা, ঔদার্য, মহত্ত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি কপচাই না কেন, বাস্তবে কিন্তু ততটা মহৎ, উদার, মানবিক হতে পারি না। সংকীর্ণতা, বিদ্বেষ, ঘৃণা আমাদের চেতনাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আচ্ছন্ন করে রাখে। আমাদের মধ্যে প্রেম-মানবিকতা অবশ্যই আছে; কিন্তু ঘৃণা-বিদ্বেষ-হিংস্রতা আছে তার চেয়ে বেশি। আমাদের মধ্যে জাতিগত, সম্প্রদায়গত সম্প্রীতি যতটুকু আছে, অধিক পরিমাণে আছে ভিন্ন জাতি, অন্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি বিদ্বেষ।

আসলে ধর্মমুখী রাজনীতির দিকে অতিরিক্ত ঝোঁক, নীতি-নৈতিকতা আদর্শ-মূল্যবোধহীন স্বার্থপর জীবনযাপন, সুবিধাবাদিতাকে তালিম দেয়া, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা-অভাব, শোষণ আমাদের মনমানসিকতাকে ভীষণ রকম সংকীর্ণ বানিয়ে ফেলেছে। আমরা এখন নিজেদের ব্যর্থতার জন্য কেবলই অন্যকে দায়ী করি। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো এই দায়ী করাটা হয়তো ঠিক; কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা ঠিক নয়।

তারপরও আমরা সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা ও বিদ্বেষের কারণে অন্য ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল, সম্প্রদায় ও জাতির প্রতি আমাদের যাবতীয় ঘৃণা ও অভিসম্পাত ঠিকই জমা রাখি। সময়-সুযোগমতো তার বহিঃপ্রকাশও ঘটাই। এটা আমাদের সামগ্রিক অধঃপতন ও ব্যর্থতা।

আজকে শিক্ষিত ও সচেতনদের এ জন্য অবশ্যই নিজেদের ভূমিকা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে দেখতে হবে। নিজেদের ব্যর্থতা আমাদের স্বীকার করতে হবে। রাজনৈতিক ব্যর্থতা আছে, আছে সামাজিক ব্যর্থতাও। যারা ধর্মপ্রাণ, তারা সকলকে বোঝাতে পারেননি যে, অন্য ধর্মাবলম্বীকে আঘাত করা ধর্মীয় নির্দেশের পরিপন্থি। যারা ইহজাগতিক, যারা নিত্য মানবতা, শুভাশুভ, ন্যায়-অন্যায়ের কথা বলেন, তারাও সমাজে যথোচিত প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হননি।

ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করেন, তারা বরং ভেদবুদ্ধির মন্ত্র দিয়ে যাচ্ছেন মানুষের কানে। একাত্তরের ঐক্য কোথায় গেল? দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে অতি অল্পসময়ে রাজনৈতিক নেতারা মানুষকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, তেমন নেতৃত্ব আজ কোথায়? আর কতকাল হিন্দুদের ‘মালাউন’ হিসেবে দেখা হবে? সাম্প্রদায়িক পশুত্বকে আর কতকাল সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে লালন-পালন করা হবে?

লেখক: প্রবন্ধকার, সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা
দখলদার ইসরায়েলের আগ্রাসন ও বাংলাদেশের অবস্থান
ইতিহাস সৃষ্টি করা দিন
বিশ্বের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক
শেখ হাসিনার প্রত্যার্বতনে গণতন্ত্র প্রবহমান

শেয়ার করুন

অন্ধ সাম্প্রদায়িকতা: জেগে ওঠো বাংলাদেশ

অন্ধ সাম্প্রদায়িকতা: জেগে ওঠো বাংলাদেশ

আওয়ামী লীগের মতো এত বড় রাজনৈতিক দল, গত একযুগ ধরে যে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায়, সেই দলের তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার কর্মী কেন নিজ এলাকা নিরাপদ রাখতে, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ করতে দৃষ্টিগ্রাহ্য ভূমিকা রাখতে পারবে না? এটা সত্যিই ভাবনার বিষয়।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে প্রযুক্তির বিকাশ তথা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার যে নতুন যুগের সূচনা করেছে তার ইতোবাচক অর্জনের পরিমাণ বিপুল। যোগাযোগ ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে ডিজিটাইজেশন। ১৭ কোটি মানুষের এই ভূখণ্ডে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হাতেই এখন এন্ড্রয়েড সেলফোন। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সবক্ষেত্রেই ইন্টারনেট প্রযুক্তি অসাধারণ ইতোবাচক ভূমিকা পালন করে চলেছে। ব্যাংকে না গিয়ে ঘরে বসেই আর্থিক লেনদেন কেনাকাটা সবকিছু সম্ভব হচ্ছে শুধু ইন্টারনেট প্রযুক্তি-সুবিধার কারণে। কিন্তু এত বিশাল অর্জনের মধ্যেও ফুলের আড়ালে থাকা কাঁটার মতো ইন্টারনেট প্রযুক্তির অপব্যবহার আমাদের জাতীয় জীবনে বড় বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

বিশেষ করে অর্থ কেলেঙ্কারি এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অপপ্রচার ছড়িয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা পর্যন্ত বাঁধিয়ে দেয়া হচ্ছে দেশজুড়ে। শুধু তাই নয়, সরকারের বিরুদ্ধে নানামুখী উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বানোয়াট ভিজুয়াল চিত্র তৈরি করে দেশের ভেতর থেকে এবং বাইরে বসে চালানো হচ্ছে ভয়াবহ অপপ্রচার। এ ধরনের অপপ্রচার যে কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষকে উস্কে দিয়ে দাঙ্গা পরিস্থিতির সৃষ্টি।

গত ১৪ অক্টোবর দুর্গাপূজার মহানবমীর দিন কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে হামলার মধ্য দিয়ে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, অনেকেই ভেবেছিলেন তার সমাপ্তি হয়তো সেখানেই ঘটবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় ‘পবিত্র কোরআন অবমাননা’র প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে যে ভয়ংকর একতরফা সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে, তা দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের কাম্য ছিল না।

যারা দেশপ্রেমিক এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন, নিজের ধর্মের মতো অন্যের ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল, তারা আর যা-ই হোক এই ধরনের সহিংস ধর্মান্ধতার উন্মাদনা সমর্থন করতে পারেন না।

ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে কুমিল্লার পূজামণ্ডপে হামলার ঘটনার পরবর্তী কয়েকদিন চট্টগ্রাম, লক্ষীপুর-নোয়াখালী এবং রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে যেভাবে উগ্রবাদীরা হামলা চালিয়েছে, তা চরম দুঃখজনক বললেও সবটুকু বলা হয় না।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের নামে এমন সন্ত্রাস এভাবে চলতে দেয়া যায় না। এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখে দেয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের যে প্রস্তুতি এবং প্রতিরোধ থাকা দরকার ছিল, তা যথাযথভাবে ছিল কি না সে প্রশ্নও ইতোমধ্যেই উঠেছে।

দেশের কোনো কোনো এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও তাদের ওপর হামলার যেসব দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, তার পুনরাবৃত্তি আর কোথাও হবে না, এই মুহূর্তে এটাই নিশ্চিত করা জরুরি। এই হামলার ঘটনায় তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে সারা দেশে।

শাহবাগে সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্র-যুবা তরুণ শ্রেশি। দেশের লেখক-সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী-শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিকসহ সব মহলের সোচ্চার কণ্ঠস্বর ইতোমধ্যেই আমরা শুনতে পেয়েছি। এ অবস্থায় যা করণীয় তা হলো দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীসমূহের সর্বাত্মক সর্তকতা এবং রাজনৈতিক দলের বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সারা দেশে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের।

আওয়ামী লীগের মতো এত বড় রাজনৈতিক দল, গত একযুগ ধরে যে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায়, সেই দলের তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার কর্মী কেন নিজ এলাকা নিরাপদ রাখতে, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ করতে দৃষ্টিগ্রাহ্য ভূমিকা রাখতে পারবে না? এটা সত্যিই ভাবনার বিষয়।

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যখন ভেতরে-বাইরে ইতিবাচক বহু অর্জনে গৌরবান্বিত, তখন দেশের মাথা হেঁট করে দেয়ার মতো এমন জঘন্য সাম্প্রদায়িক হামলা কীভাবে মেনে নেয়া যায়? কারণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতো আমাদের জাতীয় জীবনের গৌরব। সেই মহান গৌরবের ঐতিহ্য দেশের অহংকার। যেকোনো মূল্যে হোক, সেই গৌরবময় অহংকার রক্ষা করতেই হবে।

প্রতিমার পায়ের কাছে কীভাবে পবিত্র কোরআন শরিফ এলো! এই অপ্রত্যাশিত রহস্যের জট খুলতেই হবে। বাংলাদেশে হিন্দু সমাজের কোনো লোক এমন আত্মঘাতী কাজ করতে পারে বলে বিশ্বাস করা যায় না। আমরা সে বিশ্বাস করতেও পারি না। যে বা যারাই এই ভয়ংকর কাজ করে থাকুক, ফেসবুকে যারাই উগ্রতা ছড়িয়ে থাকুক, নিশ্চয়ই তদন্তে সবকিছু বেরিয়ে আসবে। দেশবাসীর সামনে স্পষ্ট হবে কারা কীভাবে কাদের ইন্ধনে এমন দুঃসাহসিক অপতৎপরতা চালিয়েছিল?

ইতোমধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষমা চেয়েছেন এই ঘটনায় প্রাণহানির জন্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, দোষীদের এমন কঠোর শাস্তি দেয়া হবে, যেন ভবিষ্যতে আর কেউ এ ধরনের দুঃসাহস দেখাতে না পারে। প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর মনের কথাটাই বলেছেন।

এ প্রসঙ্গে স্মরণ রাখতে হবে- দেশে একটা অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টির জন্য নানাদিক থেকে নানামুখী তৎপরতা গত কয়েক মাস ধরে লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ঘোলা পানিতে সুবিধার মাছ শিকার করতে দেশ-বিদেশে অনেকেই বহুদিন ধরে তৎপর। এমনকি আন্তর্জাতিক চক্রান্তও এর পেছনে থাকার আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

ঘটনা যেভাবেই ঘটুক, আর যারাই ঘটিয়ে থাকুক, নিশ্চয়ই এর হদিশ মিলবে। তবে তার জন্য প্রয়োজন হবে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের যে আন্তরিক সদিচ্ছা সেই সদিচ্ছা বাস্তবায়নকারীদের নিষ্ঠা এবং সৎ প্রচেষ্টা। শান্তিপ্রিয় দেশবাসীর প্রত্যাশা সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত ভেঙে দিতে সরকার সম্ভাব্য সর্বাত্মক কঠোরতার পরিচয় দেবে।

দেশে আজ যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মনে এই আস্থার বোধ জাগিয়ে তুলতেই হবে যে, এদেশে তারা অসহায় নন। বাংলাদেশ তাদেরও মাতৃভূমি।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারাও পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, প্রাণ দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ভারতের সরকার ও জনগণ আমাদের পরম বন্ধুর ভূমিকায় ছিল। বাংলাদেশ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সব সময় তা মনে রাখে।

ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বাংলাদেশে কাউকে ছোট করেও দেখা হয় না। অন্তত রাষ্ট্রীয় জীবনে কোথাও এর কোনো চিহ্ন নেই। রাষ্ট্রের সব কর্মধারায় তা দৃশ্যমান। চাকরিতে, জনপ্রতিনিধিত্বে সর্বস্তরে- ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সচিবালয় পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত আছে হিন্দু সম্প্রদায়ের শত শত নাগরিক। এমন বৈষম্যহীন সমাজে তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজাকে অবলম্বন করে এমন দাঙ্গা বাধিয়ে দেয়ার মতো ষড়যন্ত্র হতে পারে, তা আমরা কল্পনাও করি না।

পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ যদি কারো বিরুদ্ধে ওঠে, তা হলে তার প্রতিবাদ অবশ্যই করা হবে, কিন্তু তা কেন হবে এরকম সহিংস? ইসলামে তো সহিংসতার কোনো স্থান নেই! ‘লাকুম দ্বী নুকুম ওয়ালইয়াদ্বীন (যার যার ধর্ম তার তার) যে শান্তির ধর্ম ইসলামের শিক্ষা, সেই ধর্মে আস্থাশীল মানুষ ধর্ম নিয়ে সহিংসতায় মেতে উঠবে, এমন সুযোগই তো নেই। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের প্রতি আমাদের আকুল আবেদন, কেউ হীন স্বার্থান্ধ সুবিধাবাদীদের ফাঁদে পা দেবেন না। ইসলামের আদর্শ এবং সৌন্দর্য নষ্ট হতে দেবেন না।

গত ১৮ অক্টোবর শহীদ শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষে ‘শেখ রাসেল স্বর্ণপদক’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন: ‘একটা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশকে গড়তে চাই। উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই। সোনার বাংলাদেশ গড়তে চাই। যে দেশে কোনো অন্যায় থাকবে না। অবিচার থাকবে না। মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচবে; সেটাই আমি চাই।’

দেশ-বিদেশে এ কথা আজ কে না জানেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র নয়। এখানে শত শত বছর ধরে মুসলমান-হিন্দু বৌদ্ধ- খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। পাকিস্তানি শাসনামলে রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মান্ধ পাকিস্তানি শাসকরা, আরও স্পষ্ট করে বললে সামরিক শাসকরা এখানে বহুবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধানোর অপচেষ্টা করেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ তা সমর্থন না করায় ব্যর্থ হয়েছে তাদের সেই সব অপচেষ্টা।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত চিরতরে ভেঙে দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। বঙ্গবন্ধু নিজে নামাজ পড়তেন, এককথায় ধর্মানুরাগী ছিলেন। কিন্তু ধর্মের নামে যারা রাজনীতি করে, যারা ধর্মের অপব্যবহার করে, তাদের ধর্মান্ধতাকে তিনি কোনোদিন সমর্থন করেননি।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়- দুঃশাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাম্প্রদায়িকতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যেই বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের সংগ্রাম। তার ডাকেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ করেছিল বাংলার মানুষ। তাই ৩০ লাখ শহীদের রক্তফসল এই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান থাকতে পারে না।

১৯৭৫ সালে স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বাংলাদেশকে অনেক দূরে সরে নিয়েছিল শাসকচক্র। ধর্মানুরাগের স্থলে স্থান করে নিয়েছিল ধর্মান্ধতা। ধর্মের নামে রাজনীতি উন্মুক্ত করে দেয়ার ফলে আবারও পাকিস্তানি রাজনৈতিক দর্শনে দগ্ধ হতে থাকে বাংলাদেশ।

সেই পরিস্থিতি থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি প্রায় ২৫ বছর আগে। আজ বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এশিয়ার এক উদীয়মান শক্তি। দরিদ্র দেশের গ্লানিমুক্ত হয়ে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের মর্যাদায় অভিষিক্ত। পৃথিবী আজ বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

এরকম গৌরবময় অবস্থায় আমাদের হাজার বছরের সম্প্রীতির ঐতিহ্য নষ্ট হয়ে যাক, এটা কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। সব রাজনৈতিক দল, সব ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে আজ এই আবেদন, আসুন রাজনৈতিক হীনস্বার্থ পরিত্যাগ করে দেশের মর্যাদা এবং জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রাখতে আমরা সর্বাত্মক ত্যাগ স্বীকার করি।

বাংলাদেশকে আর অসম্মানিত না করি। যদি দেশকে অপমানিত করি তাহলে লাখ লাখ শহীদের আত্মা আমাদেরকে অভিশাপ দেবে, যা আমাদের কারো কাম্য হতে পারে না।

সবশেষে বলতে চাই, দেশের প্রতিটি অঞ্চলে আওয়ামী লীগসহ সব অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে সম্মিলিত শান্তি সমাবেশের আয়োজন করুন। সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তায় নিজ নিজ এলাকায় প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলুন। তা না হলে মৌলবাদী চক্র বাংলাদেশকে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলে তখন আর কিছুই করার থাকবে না। এই পরিস্থিতি যেকোনো মূল্যে সামাল দিতেই হবে।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক। উপদেষ্টা সম্পাদক দৈনিক দেশের কণ্ঠ।

আরও পড়ুন:
দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতা
দখলদার ইসরায়েলের আগ্রাসন ও বাংলাদেশের অবস্থান
ইতিহাস সৃষ্টি করা দিন
বিশ্বের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক
শেখ হাসিনার প্রত্যার্বতনে গণতন্ত্র প্রবহমান

শেয়ার করুন