নিজের খোঁড়া কূপেই পড়েছে বিএনপি

নিজের খোঁড়া কূপেই পড়েছে বিএনপি

ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করে স্বয়ং জিয়াউর রহমান জীবদ্দশায় যে দাবি করেননি তার উত্তরসূরিরা সে দাবি করে লাঞ্ছিত করলেন শুধু দেশবাসীকেই নয়- জিয়াউর রহমানের বিদেহী আত্মাকেও। এক সুন্দর (!) সকালে বিএনপি নতুন তথ্য নিয়ে হাজির হলো। বলা হলো জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক। পাঠ্যবইতে লেখা হলো জিয়াউর রহমান ঘোাষণা না দিলে পাকিস্তানি আক্রমণে হতাশ বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত না। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আমি আঁতকে উঠলাম।

জন্ম যেভাবেই হোক জিয়াউর রহমান বিএনপি নামের দলটিকে একটি শক্ত ভিত দিয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তী পরিচালকরা শুদ্ধমন ও প্রজ্ঞার না হলেও তখন আওয়ামী লীগের ক্রমাগত রাজনৈতিক ব্যর্থতার সুযোগে দলের শক্তিবৃদ্ধি করতে সমর্থ হন। এভাবে বিএনপি অল্প সময়ের ব্যবধানেই এদেশের একটি বড় দলে পরিণত হয়। একইভাবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব পরস্পরের সামনে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে গিয়ে ক্রমাগতভাবে আত্মবিশ্বাস হারাতে থাকে। তাই উভয়পক্ষই সুস্থ রাজনীতির পথে না হেঁটে নানা অলিগলি খুঁজতে থাকে। সাধারণ মানুষ সহযোগিতা করার পরও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে না। এর বড় প্রমাণ ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

বিএনপি-শাসনে বীতশ্রদ্ধ হয়ে সাধারণ মানুষ প্রায় পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মহাজোটকে। অমন জনসমর্থন আর কোনো কালে কোনো রাজনৈতিক দল পাবে এমন বোধ হয় না। এ ধারার জনসমর্থন অনেক বেশি সাহসী করে তুলতে পারে একটি রাজনৈতিক দলকে। সেবারই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সুযোগ ছিল আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া। দিন বদলে দেয়ার স্লোগান ঠিকই কার্যে পরিণত করে আওয়ামী লীগ নতুন ইতিহাস রচনা করতে পারত। কিন্তু অমন সুযোগ সেসময় হেলায় হারিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীরা। বিরোধী দলকে ঠেকানোর দুশ্চিন্তায় গণশক্তি থেকে শক্তিমান হওয়ার সাহস করতে পারেননি। তাই গড্ডলিকায় গা ভাসালেন। তাই তখন মরচে ধরা রাজনীতিতে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি।

নানা ঘাটের মিলন মেলায় সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের সমাবেশ সবচেয়ে বেশি বিএনপিতে। সুতরাং নিয়মতান্ত্রিক সুস্থ রাজনীতি নষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর আশা করা যায় না। বিএনপি নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাসের জায়গাতে ঘাটতি অনেক বেশি। একারণে বিএনপি সুস্থধারার রাজনৈতিক কাঠামো গড়ার পথে হাঁটতে পারেনি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে প্রথমে একটি হীনন্মন্যতা গ্রাস করে।

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধস্নাত একটি দেশ। তাই স্বাভাবিকভাবেই এদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ বড় জায়গা নিয়ে থাকবে। বিএনপি নেতৃত্বের হতাশার কারণ এখানেই। যেহেতু আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া দল। তাই এদিক থেকে আওয়ামী লীগকে টপকানো দরকার হয়ে পড়লো বিএনপির। বিএনপির জন্ম ১৯৭৮ সালে হলেও বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ বিচ্ছিন্ন দল ছিল না। এর প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। এখান থেকেই বিএনপির মুক্তিযুদ্ধ অধ্যায় তৈরি হতে পারত। কিন্তু আত্মবিশ্বাস হারানো বিএনপি নেতৃত্ব মনে করল আওয়ামী লীগের পাশাপাশি নিজেদের অবস্থান যেন অনেকটা দুর্বল হয়ে গেল। তাই ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করে স্বয়ং জিয়াউর রহমান জীবদ্দশায় যে দাবি করেননি তার উত্তরসূরিরা সে দাবি করে লাঞ্ছিত করলেন শুধু দেশবাসীকেই নয়- জিয়াউর রহমানের বিদেহী আত্মাকেও। এক সুন্দর (!) সকালে বিএনপি নতুন তথ্য নিয়ে হাজির হলো। বলা হলো জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক। পাঠ্যবইতে লেখা হলো জিয়াউর রহমান ঘোাষণা না দিলে পাকিস্তানি আক্রমণে হতাশ বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত না। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আমি আঁতকে উঠলাম। বিএনপি নেতৃত্বের এ কেমন হঠকারী আচরণ! সাময়িক রাজনৈতিক লাভের জন্য ভবিষ্যৎ বিএনপি নেতাকর্মী সমর্থকদের মাথা হেঁট করে দিলেন। ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন পুরো দলটিকে।

এসবেও স্বস্তি পেলেন না বিএনপি নেতৃত্ব। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সরাসরি অভিযোগ আছে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়াউর রহমানের ষড়যন্ত্র কাজ করেছে। এর সত্যমিথ্যা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কিন্তু কেন যেন অভিযোগটি অস্বস্তি তৈরি করে বিএনপি নেতৃত্বের মধ্যে। বিএনপি নেতৃত্ব যেন আতঙ্কের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করতে থাকে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালনকে। যেন মনে করতে থাকে জাতীয় শোক দিবস তর্পণ প্রজন্মকে একটি কালো অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। তাই বেগম খালেদা জিয়া যখন বিএনপির হাল ধরেছেন তারই একটি পর্যায়ে আত্মবিশ্বাসহীন বিএনপি নেতা-নেত্রীরা কাঁঠাল ভাঙলেন স্বয়ং নেত্রীর মাথাতে। গিনিপিগ হতে হলো বেগম জিয়াকেই। ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো তাকে।

হঠাৎ করে আরও এক সুন্দর (!) সকালে জাতি জানলেন বেগম জিয়া জন্মে ছিলেন ১৫ আগস্ট। আর এভাবেই শোক দিবসকে চাপা দিয়ে ‘সুখ দিবস’ অর্থাৎ ঘটা করে নেত্রীর জন্মদিবস পালন করার আয়োজন শুরু হলো। আমি ইতিহাসের ছাত্র। ইতিহাস গবেষণায় সামান্য যুক্ত থাকি। তাই গবেষণা পদ্ধতি অবলম্বন করে বেগম জিয়ার জন্ম উৎসব পালনের ‘ঐতিহাসিকতা’ খোঁজার চেষ্টা করেছি। দেখা গেল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে ফার্স্ট লেডি হিসেবে ১৫ আগস্টে কখনও বেগম জিয়ার জন্ম উৎসব পালিত হয়নি। বিএনপি সভাপতি হওয়ার পর পরও নয়।

কারো জন্মদিন-তারিখ কতটা রহস্যপূর্ণ তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। অমন প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ রুচিকরও হবে না। এমন প্রশ্নও তুলতে চাই না- একটি বড় রাজনৈতিক দলের বড় নেত্রীর জন্ম তো নিশ্চয়ই নিয়মমাফিকই হয়েছিল, তবে কেন একাধিক তারিখের কথা বাজারে ছড়িয়ে আছে!

যখন জন্ম তারিখের নব রূপায়ণ করেছেন তাতে আমাদের বলার কী। কিন্তু বিএনপি নামের দলটির পরবর্তী প্রজন্মকে যে ইতিহাসের বিচারে লাঞ্ছিত হতে হবে এটিই হচ্ছে আমাদের দুর্ভাবনা। বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কলকাঠি নাড়ানোয় সিদ্ধ নষ্ট মানুষগুলোর একবারও কি মনে হয়নি, এদেশের অতি সাধারণ মানুষের কাছেও ১৫ আগস্টের মতো দিনে একজন জাতীয় নেত্রীর ঘটা করে জন্মদিন পালন কুরুচিপূর্ণ মনে হবে। অথবা তাদের মধ্যে প্রশ্ন জাগতে পারে, বিএনপি কেন অমন দৃষ্টিকটু আচরণ করে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে আড়াল করতে চায়। অমন কাজ শুধু ফারুক-রশীদ-ডালিমরাই করতে পারে। এদের সঙ্গে কী সখ্য বিএনপির?

পরে বোধ হয় বিএনপি নেতৃত্বের বোধদয় হয়েছিল। বুঝেছিলেন একটি বড় ভুল কাজ করে ফেলেছেন। তাই কয়েক বছর আগে ১৫ আগস্টের দিন কয়েক আগে কোনো এক কাগজে দেখেছিলাম বিএনপি ঘটা করে দলীয় সভানেত্রীর জন্মদিন পালন করবে না। পড়ে বড় স্বস্তি পেয়েছিলাম। এখন অবশ্য ১৫ আগস্টের জন্মদিন পালন নিয়ে আগের মতো হৈ চৈ দেখি না।

অবশ্য বেগম জিয়ার নবরূপায়ণের ৬৭তম জন্মদিনটি শেষ বারের মতো ঘটা করে পালন করা হয়েছিল। নষ্ট রাজনীতির এমন আচরণ নিশ্চয় বিবেকবান সকলকে আহত করবে। টিভি চ্যানেল ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড নিয়ে মর্মান্তিক তথ্যচিত্র উপস্থাপিত হয়। স্মৃতিচারণ করা হয় দুঃসহ অভিজ্ঞতার। নানা অঞ্চলে কাঙালি ভোজ-দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ একটি শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করে। ঠিক তখনই এসব শোকগাথাকে আমল না দিয়ে বলা যায় পায়ে মাড়িয়ে এক কুৎসিত বন্যতা নিয়ে ‘বিবেকবান’ ডানহাত-বামহাত-তস্যহাত পরিবেষ্টিত হয়ে বেগম জিয়া তার ৬৭ বছর পূর্তি উদযাপন করেছিলেন ৬৭ পাউন্ড কেক কেটে। পত্রিকা আর টেলিভিশনের স্ক্রিনে এমন দৃশ্য চোখে জ্বালা ধরিয়েছিল। আমাদের দেশেরই জাতীয় নেতা-নেত্রীদের আমানবিক আচরণ দেখে বিব্রত হতে হয়। নিজেকে ছোট মনে হয় এই ভেবে যে, আমিও বোধহয় কোনো না কোনোভাবে এই অমানবিক বন্য আচরণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম।

বিএনপির এমন রুচীহীন বিপন্ন দশা আমাদের চিন্তিত করে। গণতান্ত্রিক ধারা বহাল রাখার জন্য একটি শক্ত বিরোধী দল থাকা জরুরি। অতীতের মতো যারা সরকারও গঠন করতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের বিএনপি যেন সুস্থ ও নিয়মতান্ত্রিক ধারায় রাজনীতি করাই ভুলে গেছে।

ইতিহাসের সত্য অস্বীকার করে কোনো রকম লাজলজ্জা বালাই না রেখে বিএনপি নেতারা কলের গানের ভাঙা রেকর্ডের মতো ‘স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া’র ধরনের হাস্যকর স্লোগান দিয়েই যাচ্ছেন। এভাবে এক সময় মুক্তিযুদ্ধচর্চা বিচ্ছিন্ন প্রজন্মের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি করতেও পেরেছিলেন। কিন্তু শাসন ক্ষমতা থেকে ছিটকে পরার পর দুর্বল ভিত্তির ওপর গড়া বিএনপির বালির ইমারত ভেঙে পড়ে। প্রজন্মের সামনে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হতে থাকে। তারা বিএনপির বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ফিরিয়ে দিতে থাকে বুমেরাংয়ের মতো।

এসব দেখেও কি এক বিভ্রান্ত দশায় বিএনপি যে দীর্ঘ ৪৫ বছর পর হঠাৎ ৭ মার্চ পালনের কথা বলে নতুন করে সস্তা প্যাঁচ কষতে মঞ্চে উঠলেন। বলতে চাইলেন বঙ্গবন্ধু (দলটির ছক মতো ‘শেখ মুজিব’) ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার মতো কিছু বলেননি। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন আর বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাহলে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঘরে ঘরে দুর্গ গোড়ে তোলার আদেশ দিলে দেশজুড়ে তরুণ যুবারা শারীরিক ও মানসিকভাবে কেন প্রস্তুতি নিচ্ছিল?

জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেন। এরপরেও কতগুলো প্রশ্নের নিষ্পত্তি হলো না। ২৫ মার্চ সন্ধ্যা থেকে ঢাকার রাজপথে যে বাঙালি বেরিকেড দিচ্ছিল তা কার প্রেরণায়?

২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ার পর পথে পথে বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল কার নির্দেশে? রাজারবাগ পুলিশ লাইনের বীর পুলিশরা কেনইবা যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ বিসর্জন দিলেন?

আরও একটি বড় প্রশ্ন যে, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেন জিয়াউর রহমান সেই ট্রান্সমিটারটি ছিল ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন। যা থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ এলাকা থেকে ভালোভাবে শোনা সম্ভব। তাছাড়া কতজন মানুষ স্থানীয় বেতার কেন্দ্র শুনে অভ্যস্ত? হয়তো রেডিও সেটের নব ঘোরাতে ঘোরাতে কেউ দৈবাৎ শুনতে পারে।

তাই বলছি এমন এক বাস্তব অবস্থায় দাঁড়িয়ে খোদ জিয়াউর রহমানকে ছোট করে যে মিথ্যাচার বিএনপি নেতারা শুরু করেছিলেন তা মাঝখানে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আবার ৭ মার্চ সামনে রেখে ডুবন্ত বিএনপিকে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত করার জন্য সমস্বরে বিএনপি নেতারা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে চেঁচামেচি শুরু করেছেন। এসব উগ্রপন্থী নেতারা কি শেষ পর্যন্ত দলটিকে চূড়ান্ত লাঞ্ছিত করেই ছাড়বেন!

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
ভুলে ভরা স্মার্টকার্ডের দায় জনসাধারণের নয়
সম্পদে নারীর অধিকার
ঘটনাগুলো শুধু গল্প নয়
সুনামগঞ্জের হামলা ও ফেসবুকের অর্থনৈতিক রাজনীতি
মশা যেন ভোট খেয়ে না ফেলে

শেয়ার করুন

মন্তব্য

দায়িত্ব নাকি ক্ষমতা?

দায়িত্ব নাকি ক্ষমতা?

সাংবাদিক নির্যাতনের যে ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে, সরকারের তদন্তেও যা প্রমাণিত হয়; সেই অপরাধেরও কোনো শাস্তি হলো না! এরপর আমলা বা পুলিশ কর্মকর্তারা যদি নিজেদের সব আইনের ঊর্ধ্বে ভাবেন এবং আইন হাতে তুলে নিতে পরোয়া না করেন; তাহলে তাদের খুব একটা দোষ দেয়া যাবে না। শাস্তি না হলে অপরাধ প্রবণতা বাড়বেই শুধু।

আমাদের দেশে দায়িত্ব আর ক্ষমতার সংজ্ঞাটাই বোধহয় বদলে গেছে। এখানে দায়িত্বকেই ক্ষমতা মনে করা হয়। আর দায়িত্ব একবার পেলে তাকে ক্ষমতা মনে করে চলে ক্ষমতার দেদার অপব্যবহার। আর আমরা সাধারণ মানুষও এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কেউ কোনো দায়িত্ব পেলেই আমরা অনায়াসে বলি অমুক ক্ষমতায় গেছে। এটা রাজনৈতিক দল, রাজনীতিবিদদের জন্য যেমন সত্যি, তেমনি সরকারি কর্মচারীদের জন্যও সত্যি। এক্ষেত্রে আমলা বা পুলিশ সদস্যরা ব্যাপকভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। কারণ তাদের কাছে অনেক বড় দায়িত্ব দেয়া থাকে। সেই দায়িত্বকে ক্ষমতায় বদলে নিয়ে তারা সাধারণ মানুষের ওপর তার প্রয়োগ করেন কখনও আইন মেনে, কখনও আইনের তোয়াক্কা না করেই।

একটি সভ্য, আইনের শাসনের সমাজ গড়তে আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের দায়িত্বশীলতা আর দায়িত্বশীলদের দায়িত্বশীলতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। দায়িত্বশীলদের অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটে উল্টো ঘটনা। কেউ বেআইনি কিছু করলেই, আমরা পরামর্শ দেই, আইন হাতে তুলে নেবেন না। কিন্তু পুলিশ কিছু করলে আমরা কখনও সেটা বলি না; যেন পুলিশের যা ইচ্ছা তাই করার স্বাধীনতা আছে।

বাংলাদেশের আইনে গায়ে হাত তোলার অধিকার কারোই নেই। ধরুন, আমি যদি রাস্তায় কোনো রিকশাওয়ালাকে পেটাই, পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যেতে পারে। কারণ আমি আইন হাতে তুলে নিয়েছি। কিন্তু পুলিশ যে প্রতিদিন রাস্তায় মানুষকে পেটায়, আমরা কিন্তু কিছুই মনে করি না।

আমরা ভাবি পুলিশ তো আইনের লোক। কিন্তু আইনের লোক বলেই আইন হাতে তুলে নেয়ার অধিকার তারও নেই। কেউ যদি বেআইনি কিছু করে পুলিশের দায়িত্ব হলো তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া, তার বিরুদ্ধে মামলা দেয়া, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা, অভিযুক্তের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে আদালত। অপরাধ বিবেচনা করা শাস্তি নির্ধারণ করা হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় পেটানোর কোনো সুযোগই নেই। কিন্তু আমাদের দেশে বিচারপ্রক্রিয়ায় বাইরে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে অহরহ। আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের অনুমতি নিয়েই রিমান্ডে নেয় পুলিশ।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের কৌশলেই তথ্য আদায় করার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের শিশুও জানে, রিমান্ড মানেই পিটিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা। কোনো একটি সিনেমায় দেখেছিলাম, এক সন্ত্রাসী পুলিশকে হুমকি দিচ্ছে, তোমার গুলির হিসাব দিতে হবে। আমার গুলির কিন্তু কোনো হিসাব লাগবে না। পুলিশের হাতে যেহেতু আইন আছে, অস্ত্র আছে, গুলি আছে। তাই তাদের কাছে সর্বোচ্চ সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা এবং জবাবদিহি প্রত্যাশিত। কিন্তু পুলিশের আইনের, ক্ষমতার, অস্ত্রের, গুলির অপব্যবহার হয় সবচেয়ে বেশি। সন্দেহভাজন আসামিকে ধরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে যাওয়ার নামে তাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়।

আমরা বলি বটে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, কিন্তু এটা স্রেফ ঠাণ্ডা মাথায় খুন, যে খুনের কোনো বিচার হয় না। আমার বিবেচনায় সন্ত্রাসীর খুন আর পুলিশের খুনে কোনো পার্থক্য নেই; দুটিই সমান অপরাধ। বরং পুলিশের হাতে যেহেতু অস্ত্র আছে, তাই তার কাছে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রত্যাশিত, যা নেই বললেই চলে।

পুলিশ হোক আর আমলা হোক আর সাধারণ মানুষ হোক; শেষ পর্যন্ত সবাই মানুষ। তাই তারা ভুল করতে পারে, বেআইনি কাজ করতে পারে। সেটা যাতে কেউ না করে, সে জন্যই আইন। কেউ অপরাধ করলে তাকে সাজা দিতে হবে। সাজার ভয়ে কেউ অপরাধ করবে না। কিন্তু সাধারণ মানুষের অপরাধ শাস্তিযোগ্য হলেও আমলা বা পুলিশের ক্ষেত্রে যেন তার কোনো বালাই নেই। কোনো ঘটনায় গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক হৈ চৈ হলে, তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নেয়া হলেও শেষ বিচারে তা আইওয়াশই।

গত বছরের ১৩ মার্চ মধ্যরাতে বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয় এবং সাজানো মাদক মামলায় সাজা দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। কুড়িগ্রামের তখনকার জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের নির্দেশেই রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর নাজিম উদ্দিন এবং দুই সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এসএম রাহাতুল ইসলাম এই অভিযানে অংশ নেয়।

আরিফুল ইসলামের মূল অপরাধ ছিল, তিনি জেলা প্রশাসকের নানা অনিয়ম নিয়ে লেখালেখি করেছিলেন। কিন্তু কাগজে-কলমে দেখানো হয় তার কাছ থেকে আধা বোতল, মদ আর ১৫০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছিল। মধ্যরাতে সাংবাদিককে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও মাদক মামলায় সাজা দেয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলে জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনসহ অভিযুক্ত চারজনকেই প্রত্যাহার করা হয়।

সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভাগীয় মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে কারণ দর্শাতে বলা হয়। ব্যক্তিগত শুনানিও হয়। তদন্ত বোর্ড তার অপরাধের প্রমাণ পায় এবং তার বিরুদ্ধে গুরুদণ্ডের সুপারিশ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে দেয়া হয়, দুই বছর ইনক্রিমেন্ট স্থগিত রাখার অতি লঘুদণ্ড। কিন্তু সেই সান্ত্বনার লঘুদদণ্ডটিও শেষপর্যন্ত টিকল না। সুলতানা পারভিন রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করলে সেই অতি লঘুদণ্ড থেকেও মার্জনা পান তিনি। সুলতানা পারভীনকে সকল দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

সাংবাদিক নির্যাতনের যে ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে, সরকারের তদন্তেও যা প্রমাণিত হয়; সেই অপরাধেরও কোনো শাস্তি হলো না! এরপর আমলা বা পুলিশ কর্মকর্তারা যদি নিজেদের সব আইনের ঊর্ধ্বে ভাবেন এবং আইন হাতে তুলে নিতে পরোয়া না করেন; তাহলে তাদের খুব একটা দোষ দেয়া যাবে না।

শাস্তি না হলে অপরাধ প্রবণতা বাড়বেই শুধু। অথচ বার বার বলছি, যাদের হাতে আইন আছে, ক্ষমতা আছে, অস্ত্র আছে; তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহি প্রত্যাশিত। এটা না থাকলে আইনের শাসনের আকাঙ্ক্ষা করা আর সুন্দরবনের গহীনে বসে কান্নাকাটি করা সমান কথা।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
ভুলে ভরা স্মার্টকার্ডের দায় জনসাধারণের নয়
সম্পদে নারীর অধিকার
ঘটনাগুলো শুধু গল্প নয়
সুনামগঞ্জের হামলা ও ফেসবুকের অর্থনৈতিক রাজনীতি
মশা যেন ভোট খেয়ে না ফেলে

শেয়ার করুন

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, তবু বিস্মরণ

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, তবু বিস্মরণ

সেনাবাহিনী পরিচালিত সব সংস্থা যদি লাভজনক হয়, তাহলে একই সরকারের অসামরিক সংস্থাগুলো কেন লাভজনক হবে না? প্রশ্নটি অনেকের মাথায় আসে। দেশে যে বিপুল পরিমাণ যাত্রী, তাতে বিআরটিসি অলাভজনক তো হওয়ার কথা নয়। সরকারের কোটি কোটি টাকার বাস নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে, মেরামত হয় না। কেবল নতুন কেনার দিকে ঝোঁক!

ডিসেম্বর কড়া নাড়ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৫০ বছর বা সুবর্ণজয়ন্তীর বছর ২০২১ এখন অস্তাচলে। দিন যায় কিন্তু কিছু স্মৃতি, কিছু অবিস্মরনীয় ঘটনা থেকে যায়। সেসব কেউ ভোলে, কেউ মনে রাখে। যারা ভোলে না তারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে। অনেকের দুর্ভাগ্য এই যে, তারা ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে না। আর করে না বলেই মারাত্মক ভুলের ফাঁদে পড়তে হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর গৌরবময় ২০২১ সাল চলে যাবে কিন্তু রেশ থেকে যাবে। ২০২২ সালেও মনে পড়বে করোনা মহামারির তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড সময়ের কথা। এই দুর্যোগ ছাড়াও মনে পড়বে রাজনৈতিক অবক্ষয়জনিত দুর্ভোগের নানা স্মৃতি।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে পেছনে তাকালে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মতো একটি আনন্দমুখর স্থানীয় নির্বাচন কীভাবে সহিংসতায় আক্রান্ত হয়েছে ২০২১ সালে। সেই অবাঞ্ছিত বাস্তবতা নিয়েই শুরু হবে ২০২২ সাল। পর নতুন বছর। কিন্তু জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তৃতীয় ধাপের যে ইউপি নির্বাচন, সেখানে কি থাকবে না এমন দুঃখজনক সহিংসতার ঘটনা? এই গ্যারান্টি তো নেই।

সড়ক পরিবহনের সৃষ্ট অনিয়মের কারণে সারা বছর যে কত প্রাণ ঝরে গেছে সেসব দুঃখজনক অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে যেতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু যাওয়া যাবে না। যারা পরিবহন সেক্টর সুশৃঙ্খল করতে পারত, তারা সক্রিয় হবে না। যদি সরিষাতেই ভূত থাকে তাহলে সেই সরিষা দিয়ে ভূত তাড়ানো যায় না। সবকিছুতেই প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ লাগে! বাংলাদেশে এ এক বিস্ময়কর ব্যাপার! গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড হচ্ছে। বহু বছরের চলে আসা এই নিয়ম এখন মেনে নিতে রাজি নয় পরিবহন মালিক-শ্রমিকপক্ষ। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এক সাবেক মন্ত্রী, যিনি পরিবহন সেক্টরেরও শীর্ষপর্যায়ের নেতা, বললেন- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা বলবেন, তাই মেনে নেব আমরা।

শিক্ষার্থীরা সমস্ত গণপরিবহনে হাফ ভাড়ায় চলাচল করবে, এটা তো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দাবি ছিল না। কিছুদিন আগেও এ নিয়ম চালু ছিল। আজ থেকে ৪০-৪৫ বছর আগেও শিক্ষার্থীরা যানবাহনের ভাড়া দিয়েছে অর্ধেক। তাদের দাবি পূরণের যৌক্তিকতা সরকারও স্বীকার করছে। আলোচনায় বসেছে। হতাশার কথা এই যে, নিষ্ফল সে আলোচনা।

পরিবহন মালিকরা হাফ ভাড়ার দাবি মেনে নিচ্ছে না অথবা পারছে না। সরকার বিআরটিসি বাসের অর্ধেক ভাড়ায় শিক্ষার্থীদের চলাচলের ঘোষণা দিয়েছে। বিআরটিসির সীমিত বাসে তা কতটা কার্যকর করা সম্ভব? সমস্যা থেকেই যাবে। বিআরটিসি বাসের আশায় রাস্তায় অপেক্ষা করে সময়মতো ক্লাস করা সম্ভব হবে না।

বিআরটিসি হতে পারত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন। কিন্তু শুধু অব্যবস্থাপনার কারণেই বছরের পর বছর ধরে খুঁড়িয়ে চলছে এই সরকারি সংস্থাটি। বিপুল ঘাটতি টেনে সরকার এই সংস্থাটিকে আজও কেন টিকিয়ে রেখেছে তাও এক অমীমাংসিত প্রশ্ন। সেনাবাহিনী পরিচালিত সব সংস্থা যদি লাভজনক হয়, তাহলে একই সরকারের অসামরিক সংস্থাগুলো কেন লাভজনক হবে না? প্রশ্নটি অনেকের মাথায় আসে। দেশে যে বিপুল পরিমাণ যাত্রী, তাতে বিআরটিসি অলাভজনক তো হওয়ার কথা নয়। সরকারের কোটি কোটি টাকার বাস নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে, মেরামত হয় না। কেবল নতুন কেনার দিকে ঝোঁক!

অথচ পরিবহন খাতে বেসরকারি বাসমালিকরা একটি বাস থেকে দশটি বাসের মালিক হয়েছে ১০ বছরের ভেতর, এমন দৃষ্টান্ত একাধিক। টিসিবি আর বিআরটিসি হতে পারত দরিদ্র জনগণের সবচেয়ে বড় সহায়ক প্ল্যাটফর্ম। বাজারের আগুনের তাপ থেকে স্বল্প আয়ের মানুষকে বাঁচাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত এই দুটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে তা হয়নি।

কথায় বলে বোঝার উপর শাকের আঁটি। সম্প্রতি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বহু সংকট সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার্থীরা এখন যে রাজপথে, তারও কারণ ওই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। একটি খাতকে সহায়তা করতে গিয়ে শত খাতকে বিপর্যস্ত করার কোনো মানে হয় না।

প্রসঙ্গক্রমে স্মরণ করা যেতে পারে, গত ১২ বছর ধরে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায়। দেশের অনেক সেক্টরে অভূতপূর্ব উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে এই সরকারের হাত দিয়ে। কিন্তু সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার উপায় এখনই উদ্ভাবন করতে হবে। ২০২৩-এর ডিসেম্বরে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। এর আগেই দেশে একটা অরাজক অবস্থা সৃষ্টির আলামত ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে।

আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুবাদে সারা দেশের নানা স্তরে সুবিধাবাদী লোক এই দলে ঢুকে পড়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক নেতার ব্যক্তিগত দুর্বলতার সুযোগ না পেলে এই অনুপ্রবেশ ছিল অসম্ভব। ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে দেশ ও দলকে বড় করে দেখলেই এটি হতো না। দলে এমন লোকরাই ঢুকেছে- যারা বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ঘোরতর বিরোধী। সাম্প্রদায়িক রাজনীতিই তাদের অস্তিত্বে গাঁথা!

ক্যাসিনো কাণ্ডে ধরপাকড়কে কেন্দ্র করে কেঁচো খুঁড়তে বহু বিষধর সাপও বেরিয়ে আসে। যারা আওয়ামী লীগের সম্পদ নয়, কলঙ্ক। তাদেরই দায় বহন করতে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এবং বাংলাদেশকে উন্নয়নে আধুনিকতায় শাণিত করা দল আওয়ামী লীগকে!

সম্প্রতি গাজীপুর এবং রাজশাহীর কাটাখালির বহিষ্কৃত দুই মেয়রের দুটি অডিও আলোচনা শুনে চমকে ওঠেছি। কী ভয়ংকর সে আলোচনা! সেখানে ৩০ লাখ শহীদের মৃত্যুর জন্য সরাসরি বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী বলা হচ্ছে! বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাস্কর্য স্থাপনকে মৌলবাদী জঙ্গিদের ভাষায় তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে!

জীবন দিয়ে হলেও সেই ভাস্কর্য স্থাপন ঠেকানো হবে; এমন জঙ্গিবাদী উক্তি করতে পারে যে বা যারা, তাদেরকে দলে আনতে কারা পৃষ্ঠপোষকতা করেছে? আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উচিত তাদেরকে খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা। আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত না হলে ২০২১ সাল মোটেও সুখকর হবে না।

২০০১ সালে শাহ এমএস কিবরিয়ার নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এক সভায় মতামত জানতে চাওয়া হলে বলেছিলাম, গ্রামগঞ্জে জামায়াত-বিএনপিকর্মীরা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। মসজিদে মসজিদে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, জনগণকে বিভ্রান্ত করছে; তৃণমূলপর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় করে এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা না নিলে বিপর্যয় এড়ানো যাবে না।

অনেকেই সেদিন বিরক্ত হয়েছিল। নির্বাচনে দেখা গেছে লতিফুর রহমানের মতো পক্ষপাতদুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে অপপ্রচার আওয়ামী লীগকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। শুধু তাই নয়, সহিংসতার তাণ্ডবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছিলেন।

ইউপি নির্বাচনে এই বছর যে মাত্রায় সহিংসতা হলো এমন কোনো নজির অতীতে নেই। এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। অবশ্য এ কাজেও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকেই সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। তিনি হস্তক্ষেপ না করলে কিছুই হবে না।

মনে রাখতে হবে, দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তত সুস্থির নয়। ঘোলা পানিতে মাছ শিকার কিংবা ঘর পোড়ার মধ্যে আলুপোড়া দেয়ার মতো লোকের অভাব নেই। দেশ-বিদেশে নানা ষড়যন্ত্র চলছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়টি একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপান্তরের চেষ্টা চলছে। তাকে বিদেশ নিয়ে চিকিৎসা করানোর দাবিতে বিএনপি এবং তাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য মিত্র দেশ-বিদেশে জোট বাঁধছে।

দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা হোক, তিনি সুস্থ হয়ে উঠুন এটা দলনিরপেক্ষ মানুষও চায়। কিন্তু তার চিকিৎসা নিয়ে যেন রাজনৈতিক ফায়দা লোটার সুযোগ করে দেয়া না হয়। তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকার সর্বাত্মক আন্তরিকতার পরিচয় দেবে, এ আশা করাই যায়।

প্রবল প্রতাপশালী জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে কঠোর হাতে দেশ শাসন করেছেন ৯ বছর। কল্পনাও করেননি তাকে কারাগারে যেতে হবে কোনোদিন! নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনে এরশাদের পতনের পর ৩ জোটের রূপরেখা অনুযায়ী নির্বাচন হলো। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবে এটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অলৌকিকভাবেই যেন জিতে যায় বিএনপি।

সরকার গঠনের পর এরশাদ গেলেন কারাগারে। নয়টি বছর মামলার পীড়নে জর্জরিত হলেন। দণ্ডিতও হলেন দু-একটি মামলায়। তখন কি বেগম জিয়া কল্পনাও করেছেন কোনোদিন তিনিও বিচারের মুখোমুখি হয়ে দণ্ডিত হবেন?

২০০৬ সালে যখন তার প্রবল প্রতাপ, লাখো শহীদের রক্তেভেজা জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছেন একাত্তরের ঘাতকদের গাড়িতে; তখন তো কল্পনাও করতে পারেননি যাকে চক্ষুশূল মনে করেন, তার কাছেই বেঁচে থাকার প্রয়োজনে বিদেশে যাওয়ার জন্য তার অনুকম্পা চাইতে হবে।

সম্প্রতি গণভবনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত ক্ষোভে-দুঃখে বিএনপি এবং বেগম জিয়ার তার প্রতি নৃশংস মানসিকতা আর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের প্রতি অন্ধ পক্ষপাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ২০০৭ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যবর্তী ঘটনাগুলো এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কালো অধ্যায়। কাদের উদগ্র ক্ষমতালিপ্সায় কীভাবে ওয়ান ইলেভেন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তাও ইতিহাসে লেখা আছে।

অতএব, স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগকেও আজ জোয়ারভাটার এই দেশের অস্থিরচিত্ত মানুষের মন বুঝে সতর্ক পা ফেলতে হবে। প্রকাশ্য অথবা গোপনে শুদ্ধি অভিযান দলের ভেতরে চালাতে হবে। এভাবে এই সংকটময় পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক। সাবেক পরিচালক (বার্তা), বাংলাদেশ টেলিভিশন।

আরও পড়ুন:
ভুলে ভরা স্মার্টকার্ডের দায় জনসাধারণের নয়
সম্পদে নারীর অধিকার
ঘটনাগুলো শুধু গল্প নয়
সুনামগঞ্জের হামলা ও ফেসবুকের অর্থনৈতিক রাজনীতি
মশা যেন ভোট খেয়ে না ফেলে

শেয়ার করুন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা গণতন্ত্রের জন্য সুসংবাদ নয়

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা
গণতন্ত্রের জন্য সুসংবাদ নয়

নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সাধারণ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার দিকে লক্ষ করি, তাহলে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে সেটি হলো, এই সহিংসতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রাজনৈতিক সহিংসতার পরিমাণ অন্য নির্বাচনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এবারের সহিংসতা মূলত হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গণতন্ত্রের ভিত্তিভূমি। কারণ এখান থেকেই গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। একটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকারের ভূমিকা অনন্য। গণতন্ত্রে কেন্দ্রীয় সরকার নীতি প্রণয়ন করবে এবং স্থানীয় সরকার সেই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করবে- এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু জনগণের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে, সেহেতু বিভিন্ন ধরনের সেবা ও পণ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।

আমরা জানি, বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ ধারায় কেন্দ্রীয় সরকারের নিচে স্থানীয়পর্যায়ে বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় সরকারের স্তর প্রতিষ্ঠা করা এবং সেই স্তরগুলো জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার বিধান রয়েছে। গ্রামীণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে নিচের স্তর ইউনিয়ন পরিষদ প্রায় ২০০ বছরের অধিক সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্য স্তরগুলোর তুলনায় নিজেদের এখতিয়ারের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। যদিও এই প্রতিষ্ঠানের বাজেটনির্ভরতা রয়েছে সরকারের ওপর।

স্থানীয় সরকারে রাজনৈতিক দলভিত্তিক নির্বাচন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনুশীলন করা হয়। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই প্রক্রিয়া চলমান। এই অনুশীলনের বিষয়টির কথা মাথায় রেখেই বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় সরকারে রাজনৈতিক দলভিত্তিক নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করে। দলভিত্তিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ-উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেয়।

অন্যদিকে, এসব স্তরের সদস্য ও কাউন্সিলররা সরাসরি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না করলেও রাজনৈতিক দলগুলো চেষ্টা করে প্রতিটি নির্বাচনে স্থানীয়পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক দলীয় নমিনেশনের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের। দলীয় মনোনয়ন দেয়ার সময় স্থানীয় নেতা ও সংসদ সদস্য নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন না দিয়ে এমন অনেক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য কেন্দ্রে সুপারিশ করেন, যাদের দলের সঙ্গে তেমন কোনো যোগাযোগ নেই।

এমনকি অন্য দল থেকে আসা অনেক প্রার্থী মনোনয়ন পাওয়ায় দলের যোগ্য, ত্যাগী ও নিবেদিত প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে এলাকার সক্রিয় নেতাকর্মীরা দলীয় মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং অপেক্ষাকৃত জনপ্রিয় বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেয়। আর এ কারণেই স্থানীয়ভাবে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তির কারণে পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণের চেষ্টা করে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাড়ছে সহিংস ঘটনা। চলতি বছরে শুধু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরেই প্রায় ২০০ সংঘাতের ঘটনায় ৪৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন অসংখ্য। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীদের নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনেরও নানা অভিযোগ উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন ও ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, নির্বাচন ঘিরে এ সংঘাত, বিশৃঙ্খলা ও হতাহতের দায় ইসি, সরকার ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে। কারণ আইন ও বিধিমালায় নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেয়া আছে। পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এতে সংঘাত বেড়েই চলেছে। এছাড়া নির্বাচনি মাঠে দলীয়ভাবে বিএনপি না থাকায় অধিকাংশ স্থানেই রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। তারা নিজেরাই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগ তাদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারছে না।

তৃতীয় ধাপের ১০০৭ ইউপিতে ভোট হবে ২৮ নভেম্বর। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটছে সংঘর্ষের ঘটনা। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য নির্বাচন কমিশন কী ব্যবস্থা নিয়েছেন? এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এসব সহিংস ঘটনারোধে তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছে? যেভাবেই হোক, পুলিশকে দ্রুত ঘটনার তদন্ত করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলার চার্জশিট দিতে হবে। অবশ্য এক্ষেত্রে পুলিশকে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।

নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সাধারণ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার দিকে লক্ষ করি, তাহলে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে সেটি হলো- এই সহিংসতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রাজনৈতিক সহিংসতার পরিমাণ অন্য নির্বাচনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।

এবারের সহিংসতা মূলত হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে। কারণ বিএনপি এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা এই সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। যেহেতু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের সুযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই বিএনপি প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে দেশব্যাপী বিএনপি এতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, তাদের পক্ষে নির্বাচনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেতা কঠিন।

ফলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় মানুষ মারা যাচ্ছে, যেটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং দেশের সামগ্রিক নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং নির্বাচন হবে প্রশ্নবিদ্ধ। ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্থানীয়পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীরা চেয়ারম্যান-মেম্বার নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছেন। এভাবে দুই ধাপের ইউপি নির্বাচনে বিএনপির শতাধিক চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় সরকারি দল আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা যারা পাচ্ছেন তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছেন একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। অধিকাংশ ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না পেয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েও কোথাও কোথাও ভোটে জিতে যাচ্ছেন।

এ পরিস্থিতিতে তৃণমূলপর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হওয়ায় সরকারি দল আওয়ামী লীগ সম্পর্কে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। তাই দেশব্যাপী চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে সংঘাত-সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকার ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ বিব্রত। আর এ কারণেই আইন সংশোধনের ৫ বছরের মাথায় আবার আগের মতো প্রতীক ছাড়া ইউপি নির্বাচনের কথা ভাবছে সরকার।

রাজনীতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নানা হিসাব-নিকাশ, কৌশল ও মূল্যায়ন থাকবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে এটা পরিষ্কার যে নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা নিয়ে কোনো পক্ষেরই পরিষ্কার অবস্থান নেই। এ ব্যর্থতার দায় নির্বাচন কমিশনের।

ইউপি নির্বাচন নিয়ে যে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করার উপায় হচ্ছে সামনের নির্বাচনগুলো অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত করা। নির্বাচন কমিশনকেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও সহিংসতার পথ পরিহার করে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। এসব ক্ষেত্রে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি যত গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় তৎপরতা। নির্বাচনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে দলমত নির্বিশেষে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে হবে এবং আইন প্রয়োগকারীদের অবশ্যই নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করতে হবে।

নির্বাচনকে অবাধ-সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে নির্বাচন কমিশন সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ব্যাপারে আইনগত কোনো বাধা নেই। কিন্তু শুরু থেকেই তাদের কাজকর্মে একধরনের ঢিলেঢালা ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করছে।

নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দলের মধ্যে উত্তেজনাও তত বাড়বে। তাই আগামীতে নির্বাচন কমিশনকে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে আরও সক্রিয় ও সজাগ হতে হবে। যেকোনো মূল্যে নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন নিয়ে আর কোনো মৃত্যু আমাদের কাম্য নয়।

অতীতেও স্থানীয়পর্যায়ের নির্বাচনে বিভিন্ন ধরনের সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সেসব তথ্য বিবেচনায় রেখে এবারও যাতে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে কোনো ধরনের সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটে সে জন্য কর্তৃপক্ষের করণীয় নিয়ে নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই নানা মহল থেকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করা হয়েছিল। দুঃখজনক হলো, তারপরও ইউপি নির্বাচনে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন প্রতিটিতেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বের বিষয়টি নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। আগামীতে অনুষ্ঠেয় তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন এবং স্থানীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠিতব্য অন্যান্য নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণা ও ভোটগ্রহণ যাতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে পারে, সেদিকে নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষ নজর দিতে হবে। লেভেল প্লেইং ফিল্ড প্রস্তুতসহ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। প্রার্থী, নেতাকর্মী ও সমর্থকদেরও নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে চলতে হবে।

নির্বাচনের সব অংশীজন উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিচয় না দিলে এককভাবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা বেশ কঠিন। কাজেই উন্নত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় আগামীতে সব নির্বাচন সুষ্ঠু ও সফলভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন, এটাই দেশবাসী কামনা করে।

লেখক: গবেষক, কলাম লেখক। সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি

আরও পড়ুন:
ভুলে ভরা স্মার্টকার্ডের দায় জনসাধারণের নয়
সম্পদে নারীর অধিকার
ঘটনাগুলো শুধু গল্প নয়
সুনামগঞ্জের হামলা ও ফেসবুকের অর্থনৈতিক রাজনীতি
মশা যেন ভোট খেয়ে না ফেলে

শেয়ার করুন

ফিলিস্তিনের জন্য ভালোবাসা

ফিলিস্তিনের জন্য ভালোবাসা

অনেক আগে থেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি দেখিয়ে আসছে বাংলাদেশ। ১৯৭২-এর ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে তৃতীয় দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল ইসরায়েল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ফিলিস্তিনের সমর্থনে বাংলাদেশ মেডিক্যাল টিম ও ত্রাণ পাঠিয়েছিল। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন ইয়াসির আরাফাত।

পৃথিবীর ইতিহাসে ইংরেজদের বেইমানির অগণিত উদাহরণ আছে। তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক ও দুঃখজনক উদাহরণ হচ্ছে ফিলিস্তিন। ইংরেজরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) সময় ফিলিস্তিনি আরবদের কথা দিয়েছিল- তোমরা যদি তুর্কিদের সঙ্গে যোগ দিয়ে লড়াই না করো, তবে তোমাদের (সেলফ ডিটারমিনেশন) স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র দেব। ওদিকে আরবদের অগোচরে ইহুদিদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যদি তোমরা জার্মানিকে অর্থসাহায্য বন্ধ করে সে অর্থ ইংরেজকে দাও, তবে যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনে তোমাদের ‘ন্যাশনাল হোম’ নির্মাণ করতে দেয়া হবে।

ইংরেজদের এই দুমুখো নীতি প্রকাশ পেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে। এই যুদ্ধের আগে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ছিল তুরস্কের উসমানিয়া সাম্রাজ্যের অধীন। ইংরেজদের ষড়যন্ত্রে তুরস্কের মুসলিম খেলাফত ভেঙে যায় এবং একটি গুলিও খরচ না করে ইরাক, সিনাই উপত্যকা, ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম দখল করে নেয় ব্রিটিশ বাহিনী। ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জর্ডান ও লেবানন চলে যায় ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের দখলে। ১৯১৭-এর ২ নভেম্বর সে সময়ের ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর একটি চিঠিতে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন, যেটা বেলফোর ঘোষণা নামে পরিচিত।

ইউরোপের নানা দেশে ইহুদিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। তবে এই বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হতেই দলে দলে ইহুদি আসতে শুরু করল ফিলিস্তিনে। ওদিকে বেইমান ইংরেজ ক্ষমতালিপ্সু ও আরেক বেইমান জাতি ইহুদিদের ইউরোপে রাষ্ট্র তৈরির পক্ষে কখনও সমর্থন দেয়নি। বরং ঝামেলাবাজ ইহুদিদের ঠেলে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে।

রোমান সময় থেকে ইহুদিদের ছোট্ট একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী সেখানে বাস করত। তাদের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হওয়ায় বিপুলসংখ্যক ইহুদি ইউরোপ থেকে পাড়ি জমায় ফিলিস্তিনে। ব্রিটিশদের সহায়তায় ১৯১৮ সালের মধ্যে ইহুদিদের সংখ্যা হয়ে যায় ২০ হাজার। যা ১৯২৩ সালে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার এবং ১৯৩১ সালে ১ লাখ ৮০ হাজারে।

এর মধ্যেই ব্রিটিশদের সহযোগিতায় ১৯১৮ সালে তৈরি হয় গুপ্ত ইহুদি বাহিনী ‘হাগানাহ’। এই বাহিনী প্রথম দিকে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইহুদিবাদীদের সহায়তা করত। পরবর্তী সময়ে তারা সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী বাহিনীতে পরিণত হয়। শুধু ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও ক্ষেত-খামার দখল করেই তারা ক্ষান্ত থাকেনি, জোর করে বিতাড়িতও করত। বাজার ও রাস্তাঘাটে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা ছিল তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ।

ইউরোপে ইহুদিদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও হিটলারের কঠোরতায় ১৯৪৮ সালেই ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা হয়ে যায় ৬ লাখ। টনক নড়ে আরবদের। ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ফিলিস্তিনি আরবরা বিদ্রোহ শুরু করে। ব্রিটিশ সৈন্যরা ভয়ংকর দমন-পীড়নের মাধ্যমে সে বিদ্রোহ দমন করে কঠোরভাবে। বিবিসির খবরে প্রকাশ, এ সময় ৩২ হাজার ইহুদি ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগ দিয়ে রণকুশলী হয়ে ওঠে।

ইহুদিরা সেই রণকৌশল প্রথমে প্রয়োগ করে আরবদের বিরুদ্ধে। এরপর ইহুদি রাষ্ট্র তৈরিতে চাপ সৃষ্টি করার জন্য ব্রিটিশ সৈন্যদের ওপর। ওদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরায়েল রাষ্ট্রের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান। হিটলারের কবল থেকে বেঁচে যাওয়া এক লাখ ইহুদিকে অতিদ্রুত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জায়গা দেয়ার জন্য চাপাচাপি করতে থাকেন। যদিও ব্রিটেন বুঝে গিয়েছিল এত ইহুদিকে তাদের উপনিবেশ ফিলিস্তিনে নিয়ে গেলে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। অর্থাৎ ইংরেজ তখন গৃহস্থকে ঘর পাহারা দেয়ার কথা বলে চোরকে চুরি করার অনুমতি দিল।

জাহাজ বোঝাই করে পঙ্গপালের মতো হাজার হাজার ইহুদি এসে আস্তানা গাড়তে থাকে ফিলিস্তিনে। ধীরে ধীরে দখলদার ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। এবার জাতিসংঘের মাথায় কাঁঠাল ভাঙতে শুরু করে ইংরেজরা। ১৯৪৭-এর নভেম্বরে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে দুটি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ। একটি ইহুদিদের, অন্যটি আরবদের জন্য। এই আরব কিন্তু শুধু মুসলিম নয়। এখানে মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিষ্টানসহ অন্য ধর্মের অনুসারীও ছিল।

এটি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিতকরণসংক্রান্ত ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব ছিল। এ প্রস্তাব অনুসারে ফিলিস্তিনের ৪৫ শতাংশ জমি ফিলিস্তিনি এবং ৫৫ শতাংশ জমি ইহুদিদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। অথচ তখন অবধি জোরজবরদস্তি ও সন্ত্রাসী কায়দায় দখল করার পরও ইহুদিরা ছিল মাত্র ১০ শতাংশ জমির মালিক। স্বাভাবিকভাবে এই চক্রান্তকে মেনে নেয়নি ফিলিস্তিন ও অন্যান্য আরব দেশ। জাতিসংঘে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোকে চাপ দিতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। এই সুযোগে আরবদের মাঝে বিষফোড়া ইহুদি ঢুকিয়ে ফিলিস্তিন থেকে ইংরেজরা সটকে পড়ে ১৯৪৮-এর ১৪ মে। সেদিনই পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গঠিত হয় ইসরায়েল রাষ্ট্র।

পৃথিবী অবাক হয়ে দেখল, কার জমিতে কারা রাষ্ট্র গঠন করেছে! সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তোড়ে ভেসে গেল সব নীতিনৈতিকতা। যদিও আরব দেশগুলো এটা মোটেই মেনে নিতে পারেনি। সে কারণে রাষ্ট্র ঘোষিত হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে মিসর, ইরাক, লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়া সম্মিলিতভাবে ইসরায়েল আক্রমণ করে।

তীব্র লড়াইয়ে ইসরায়েলের পরাজয় তখন ছিল সময়ের ব্যাপার। ইহুদিদের অস্ত্রের মজুতও ফুরিয়ে যায়। আর কিছুটা এগোলেই মিসরীয় বাহিনী তেল আবিব কবজা করে ফেলতে পারত। কিন্তু তখনই ইসরায়েলের সৃষ্টিদাতার মতো ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় জাতিসংঘ। ইহুদি ও আরব দেশগুলোকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয় সংস্থাটি।

১৯৭১-এর ১১ ডিসেম্বর পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের সামরিক উপদেষ্টা গণহত্যাকারী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যুদ্ধবিরতির জন্য জরুরি বার্তা পাঠান। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত যুদ্ধবিরতির এ প্রস্তাব মেনে নিতে জোরালো দাবি জানায় যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র পর্যন্ত বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব মেনে নেয়া ভারত-পাকিস্তান উভয়ের জন্যই অত্যাবশ্যক। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সে ফাঁদে পা দেয়নি মুক্তিযুদ্ধের সম্মিলিত বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাহিনী। আর সে ফাঁদে পা না দেয়ার সুফল হিসেবে ফাঁদ পাতার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নেয় ‘বাংলাদেশ’।

তবে ২৩ বছর আগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এই যুদ্ধবিরতির ফাঁদে পা দেয় আরব বাহিনী। যুদ্ধবিরতির সুযোগে চেকোস্লোভাকিয়ার কাছ থেকে আধুনিক অস্ত্রের চালান এসে পৌঁছায় ইসরায়েলে। ফাঁদটা কাজে লাগিয়ে আরবদের ওপর নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইহুদিরা। আরবদের হটিয়ে নতুন কিছু জায়গাও কবজা করে নেয়। আরব দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা না থাকার কারণেই নতুন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে মাথা তোলার সুযোগ পায় ইহুদিরা।

পরের জায়গা পরের জমিতে ঘর বানিয়ে থাকলেও উদ্বাস্তু ইহুদিরা কখনোই সে ঘরের মালিক ছিল না। ওদিকে নিজেদের জায়গাজমি-ঘর ও ঠিকানা হারিয়ে আসল মালিক ফিলিস্তিনিরা এখন উদ্বাস্তু হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দুনিয়ার নানা দেশে। একসময় ইহুদিরা যে রকম ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।

সময় গড়ানোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইহুদি-ফিলিস্তিন সমস্যা প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠেছে। পরজমি দখলকারী ইহুদিদের নৃশংসতার শিকার হচ্ছে অসংখ্য ফিলিস্তিনি নাগরিক। ফিলিস্তিনি ইস্যুতে ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালে আরও তিনবার আরব-ইহুদি যুদ্ধ হয় এবং প্রতিটা যুদ্ধই আরবদের জন্য আরও দুর্ভোগ বয়ে এনেছে। আরও অপ্রতিরোধ্য ও সাম্রাজ্যবাদী হয়ে উঠেছে ইসরায়েল। নিরীহ আরবদের করুণ আর্তনাদ আর হাহাকারে গুমোট হয়েছে ইহুদি অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলো।

গায়ের জোরে টিকে আছে ইসরায়েল। আর তাদের এই গায়ের জোরের ইন্ধন জুগিয়েছে বিশ্বের দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মার্কিন-ইংরেজ। গত শতাব্দীর ষাটের দশকেই পারমাণবিক শক্তি অর্জন করে গায়ের জোর বাড়িয়েছে ইসরায়েল। অস্ত্র ও অর্থের জোর এতটাই হয়েছে যে, ইসরায়েল এখন দুনিয়াকেই গোনায় ধরে না। যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটাচ্ছে যখন তখন। ইচ্ছেমতো নতুন অস্ত্রের কার্যকারিতার পরীক্ষা চালাচ্ছে নিরীহ ফিলিস্তিনি জনগণকে গিনিপিগ বানিয়ে। কৃত্রিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কত আরবের রক্ত যে ঝরিয়েছে, সে হিসেব নেই। যতই দিন গড়াচ্ছে, ততই মার খাচ্ছে জায়গাজমি ও ঘরের বৈধ মালিক ফিলিস্তিনিরা।

১৯৭৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৯ নভেম্বরকে ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রদর্শন হিসেবে ‘আর্ন্তজাতিক ফিলিস্তিন সংহতি দিবস’ হিসেবে গ্রহণ করে। এর ১০ বছর পরে ১৯৮৭ সালের ২৯ নভেম্বর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘ইউনাইটেড নেশনস পার্টিশন প্ল্যান ফর প্যালেস্টাইন’ প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। এরপর থেকে এ দিনটি ‘আন্তর্জাতিক ফিলিস্তিনি সংহতি দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবহিকতায় ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনকে পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়া হয়। আর ২০১৫-এর ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ফিলিস্তিনের জাতীয় পতাকা স্থান পায়।

সংহতি দিবসে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকোর আশা ফিলিস্তিনি জনগণ যেন শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান এবং স্বাধীনতাকে প্রকাশ করার সুযোগ পায়। দেশের নারী ও শিশুসহ সব মানুষ যেন সব ধরনের ঘৃণা, হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত হয়ে স্বাধীন জীবনযাপন করতে পারে। নিরাপদে ও শান্তিতে থাকতে পারে।

যদিও জাতিসংঘের ঘোষণার অনেক আগে থেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি দেখিয়ে আসছে বাংলাদেশ। ১৯৭২-এর ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে তৃতীয় দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল ইসরায়েল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ফিলিস্তিনের সমর্থনে বাংলাদেশ মেডিক্যাল টিম ও ত্রাণ পাঠিয়েছিল। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন ইয়াসির আরাফাত।

বাংলাদেশ সব সময়ই দখলদার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশ কখনোই ফিলিস্তিনিদের ওপর ইজরায়েলের নির্মমতা ও দখলদারত্বকে সমর্থন দেয় না। এমনকি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে এখন অবধি স্বীকৃতিও দেয়নি। কারণ বাংলাদেশ কখনোই সাম্রাজ্যবাদে বিশ্বাস করে না।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার।

আরও পড়ুন:
ভুলে ভরা স্মার্টকার্ডের দায় জনসাধারণের নয়
সম্পদে নারীর অধিকার
ঘটনাগুলো শুধু গল্প নয়
সুনামগঞ্জের হামলা ও ফেসবুকের অর্থনৈতিক রাজনীতি
মশা যেন ভোট খেয়ে না ফেলে

শেয়ার করুন

রাজপথে শিক্ষার্থী: সমাধান সহজ  

রাজপথে শিক্ষার্থী: সমাধান সহজ  

বাসের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন একজন ছাত্রের খরচ বেড়ে গিয়েছে ৩০/৪০ টাকা। একদিকে খরচের চাপ অপরদিকে অযৌক্তিক তেলের দাম ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি তাদেরকে প্রতিবাদী করে তুলেছে। তারা চাইছে পরিবহনে অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত করার অধিকার। এটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি। ’৬৯ সালের ১১ দফাতেও পরিবহনে কনসেশনের দাবি ছিল। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় এই দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে, কিছু ক্ষেত্রে হাফ ভাড়া চালু হয়। আর এখন তো শিক্ষার্থীরা খবর পাচ্ছে যে, ভারত-নেপাল, শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানসহ অনেক দেশেই শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাস, টিকেট, কনসেশনের ব্যবস্থা আছে।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছে গণপরিবহনে বিশেষত বাসে তাদের হাফ ভাড়া কার্যকরের জন্য। দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এখন স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনেও নাভিশ্বাস, কারণ দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে এমন কোনো জিনিস নেই যা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে না। মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় চাল-চিনি, আটা-তেলসহ খাদ্যপণ্য তো আছেই- রান্নার গ্যাস-বিদ্যুৎ, পানি সব কিছুর দাম বাড়াতে তেমন কোনো অজুহাত এখন প্রয়োজন হয় না।

ব্যবসায়ীদের আবদার এবং সরকারের অনুমোদন একটা যুগলবন্দির মতো পরিবেশ তৈরি করেছে। পরস্পর পরস্পরকে সহায়তা করে সরকার ও ব্যবসায়ীদের এই যৌথ সংগীতের মূর্ছনায় সাধারণ মানুষের মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম। এর সঙ্গে আছে ক্ষমতাসীন দলের উচ্চপর্যায়ের নেতা-মন্ত্রীদের উপদেশ ও অপমানসূচক কথা। বিদেশিরা চাল-গম কম খায়, আমরা ভাত বেশি খাই তাই খাদ্যঘাটতি।

অতএব ভাত কম খাওয়ার পরামর্শ দেয়ার সহজ পথ বেছে নিয়েছেন তারা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যায় মুনাফার ব্যাপারে নীরবতা ভীষণ অর্থ বহন করে। এর পর আবার বলা হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকলে সব তেল ভারতে পাচার হয়ে যাবে কিন্তু সীমান্ত রক্ষায় দায়িত্ব যাদের তাদের সতর্ক না করে শাস্তি দিলেন সাধারণ মানুষকে। কৃষকরা কম দামে তেল পেলে তা কৃষি উৎপাদনে সহায়ক হতো কি না সে বিষয় কি আলোচনার অপেক্ষা রাখে?

কৃষি মন্ত্রণালয় বলেছে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বোরো মৌসুমে কৃষিতে ৭৫০ কোটি টাকার বেশি বাড়তি খরচ করতে হবে ধানচাষিকে। দেশের ১৬ লাখ সেচ পাম্পের ৭০ শতাংশের বেশি চলে ডিজেল দিয়ে। এতে প্রতি বিঘায় সেচ খরচ বাড়বে ৩০০ টাকার বেশি। আমন ধান কাটা শেষ। বোরো মৌসুম শুরু হবে। এই বোরো মৌসুমে দেশের ধানের ৬০ শতাংশের বেশি উৎপাদন হয়। ফলে সরকার তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব কৃষকের খেতে আর জনগণের পাতে সরাসরি পড়বে।

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাড়িয়ে দেয়া হলো পরিবহনের ভাড়া। সরকার তেলের দাম বাড়াল ২৩ শতাংশ। পরিবহনের ব্যয়ের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল একমাত্র উপাদান নয়। বাস বা ট্রাকের দাম, পরিচালনা খরচ, ড্রাইভার হেলপারের বেতন, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, অবচয়, অদৃশ্য খরচ (বিআরটিএর ঘুষ, পুলিশ খরচ, চাঁদা ইত্যাদি), কত সিট খালি থাকে ইত্যাদিসহ ১৬ ধরনের বিষয় যুক্ত করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়ে থাকে বলে জানা যায়। সাধারণত মোট খরচের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হয়ে থাকে জ্বালানি তেলবাবদ।

এক হিসাবে দেখানো হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাসের ভাড়া ৬ থেকে ৭ শতাংশ বাড়তে পারে। কিন্তু ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ২৭ শতাংশ। ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরে প্রতি কিলোমিটারে ৪৫ পয়সা বাড়িয়ে কিলোমিটার প্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৫ পয়সা। কিন্তু ভাড়া তো আগেও বেশি নেয়া হতো এখন তা আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

যেমন প্রেস ক্লাব থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি পর্যন্ত দূরত্ব ৪ কিলোমিটারের বেশি নয়। বর্ধিত ভাড়া অনুযায়ী এই ভাড়া হওয়ার কথা ৮ টাকা ২০ পয়সা। কিন্তু আগে নেয়া হতো ১০ টাকা এখন তা নেয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। সাধারণ মানুষ বাসে প্রতিদিন ঝগড়া করছেন বাড়তি ভাড়া নিয়ে। বাসের কন্ডাকটর বলছেন মালিক প্রতি ট্রিপে তার জমা বাড়িয়েছেন ১৫০০ টাকা। বেশি ভাড়া আদায় না করলে তারা এটা দেবেন কোথা থেকে? ঝগড়া কখনও রূপ নিচ্ছে মারামারিতে। যাত্রী আর পরিবহন শ্রমিক মারামারি করছেন, মুনাফা যাচ্ছে পরিবহন মালিকের পকেটে।

শিক্ষার্থীরা তুলনামুলকভাবে সংগঠিত। কলেজের সামনে থেকে বাসে ওঠে, কলেজের সামনে নেমে যায়। ফলে তারা শক্তি দেখাতে পারে। বাসের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন একজন ছাত্রের খরচ বেড়ে গিয়েছে ৩০/৪০ টাকা। একদিকে খরচের চাপ অপরদিকে অযৌক্তিক তেলের দাম ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি তাদেরকে প্রতিবাদী করে তুলেছে।

তারা চাইছে পরিবহনে অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত করার অধিকার। এটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি। ’৬৯ সালের ১১ দফাতেও পরিবহনে কনসেশনের দাবি ছিল। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় এই দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে, কিছু ক্ষেত্রে হাফ ভাড়া চালু হয়।

আর এখন তো শিক্ষার্থীরা খবর পাচ্ছে যে, ভারত-নেপাল, শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানসহ অনেক দেশেই শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাস, টিকেট, কনসেশনের ব্যবস্থা আছে। ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলের উন্নয়ন দেখছে যে ছাত্র, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হিসাব পত্রিকায় পড়ছে, দুরন্ত গতিতে দেশ এগিয়ে যাওয়ার ঘোষণা শুনছে নেতাদের কাছ থেকে তাহলে শিক্ষার্থীদের, যাদের ওপর নির্ভর করবে দেশের অগ্রযাত্রা তাদের জন্য রাষ্ট্র ভর্তুকি দেবে না কেন? এই ভর্তুকির টাকা তো আসবে জনগণের কাছ থেকে।

জনগণের টাকা তাদের সন্তানদের জন্য ব্যয় করা হবে না কেন? কেন তাদের সন্তানরা পরিবহন মালিকদের মুনাফার শিকারে পরিণত হবে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ডের সঙ্গে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই দায়িত্ব নেয়া হবে না কেন, যাতে পরিবহন মালিকরা তাদের কাছে হাফ ভাড়া নেন। একজন ছাত্র গড়ে কতবার বাসে ওঠে, তার কাছে হাফ ভাড়া নিলে কত টাকা কম আয় হবে, এর কত অংশ সরকার দেবে, কত অংশ মালিক বহন করবে এ নিয়ে একটা সমীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়া কি খুব কঠিন বিষয়?

ছাত্র এবং পরিবহন শ্রমিক মুখোমুখি বিরোধে জড়ালে যে আর্থিক ক্ষতি ও সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হয় তার তুলনায় কি হাফ ভাড়া অনেক কম নয়? সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পরিবহন কার্ড পেতে পারে, রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরিবহন বরাদ্দ দিতে পারে কি না, ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকার শিক্ষা বাজেটে আর কত টাকা বরাদ্দ বাড়ালে পরিবহনে সাবসিডি দেয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা করা এখন জরুরি।

প্রতিদিন সংঘাত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের, কখনও কখনও আক্রান্ত হচ্ছে পরিবহন শ্রমিকরা। ভাড়া বৃদ্ধির সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকরা যুক্ত না থাকলেও ভাড়া আদায়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে শ্রমিকরা যুক্ত বলে ছাত্র এবং যাত্রীদের ক্ষোভের প্রধান টার্গেট হয়ে পড়ে পরিবহন শ্রমিকরা। ফলে প্রতিদিন কিছু না কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। শিক্ষার্থীরা যেমন হাফ ভাড়ায় যাতায়াত করতে চায়, তেমনি ঝগড়া ও সংঘাত থেকে পরিবহন শ্রমিকরাও পরিত্রাণ চায়। এই প্রসঙ্গে কিছু বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে-

১. সরকার সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআরটিসি পরিচালিত বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া নেয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে কীভাবে তা জানা থাকলে আমাদের জন্য ভালো হতো। তা না হলে বিআরটিসির বাসে হাফ ভাড়া অন্য বাসগুলোতে কেন নয়- বলে উত্তেজনা আরও বাড়বে।

২. হাফ ভাড়া শিক্ষার্থীরা দেবে বাকি টাকা পূরণ করা হবে কীভাবে এবং কোন তহবিল থেকে?

৩. সারা দেশে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আসার ক্ষেত্রে বাস ব্যবহার করে কতজন শিক্ষার্থী? হাফ ভাড়া নিলে ভর্তুকি কত টাকা দিতে হবে?

৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা কীভাবে কনসেশন প্রদান করে তা জানা দরকার।

৫. শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন কার্ড চালু করা দরকার যা প্রতিষ্ঠান প্রদান করবে। তাহলে যাত্রী কোন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র তা নিশ্চিত সম্ভব হবে।

৬. এ বছর শিক্ষাবাজেট ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মিলে মোট বাজেট দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। প্রতিবছর শিক্ষাবাজেট থেকে বেশ কিছু টাকা ফেরত যায়। ফেরত যাওয়া এই টাকাটা পরিবহন ভর্তুকি হিসেবে দেয়া যেতে পারে।

৭. যে সমস্ত পরিবহন শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া কার্যকর করবে, তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

৮. দেশের ছাত্রসমাজের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। তাদের শিক্ষা সহায়ক কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরিবহনে সাবসিডি দেয়া এবং একটি যুক্তিসংগত নিয়ম-বিধি প্রণয়ন করা হলে তা ছাত্র এবং পরিবহন শ্রমিক উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক।

৯. দেশের বড় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা এবং চট্টগ্রামে নগর পরিবহন আছে আবার এই দুই শহরেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ছাত্রসংখ্যা বেশি। বাকি সারা দেশে সাধারণত স্বল্প দূরত্বে শিক্ষার্থীরা বাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা করে। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরিবহন সহায়তার জন্য বাজেটে থোক বরাদ্দ করা যেতে পারে।

১০. বিভিন্ন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরিবহন ফি নেয়া হয়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেতন ও ফি বেশি। উভয়ক্ষেত্রেই যারা গণপরিবহনে যাতায়াত করে তাদের কাছ থেকে নেয়া পরিবহন ফি এবং সরকারপ্রদত্ত বরাদ্দ দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় তহবিল গঠন করা যেতে পারে।

১১. সরকার, পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও ছাত্র প্রতিনিধি সমন্বয়ে মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে। তাহলে যেকোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আরও পড়ুন:
ভুলে ভরা স্মার্টকার্ডের দায় জনসাধারণের নয়
সম্পদে নারীর অধিকার
ঘটনাগুলো শুধু গল্প নয়
সুনামগঞ্জের হামলা ও ফেসবুকের অর্থনৈতিক রাজনীতি
মশা যেন ভোট খেয়ে না ফেলে

শেয়ার করুন

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তিনি যে অভিযোগগুলো করেছেন তা কি ভিত্তিহীন? ১৫ আগস্টের দায়ভার থেকে কি জিয়া পুরোপুরি মুক্ত? জিয়াউর রহমান কি ১৫ আগস্টের খুনিদের পুরস্কৃত করেননি? ১৫ আগস্টে নিজের ভুয়া জন্মদিন পালন করে তিনি কি সমঝোতার পথ রুদ্ধ করে দেননি? ২১ আগস্টের খুনিদের তিনি বিচার না করে মদদ দেননি? প্রধানমন্ত্রীর এ অভিযোগগুলোর কোনোটাই ভিত্তিহীন নয়।

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের সিসিইউতে রয়েছেন। বিএনপির দাবি তাকে সুস্থ করে তুলতে হলে এ মুহূর্তে বিদেশে নেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সরকারের সর্বোচ্চপর্যায় থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, তাকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেয়া সম্ভব নয়।

খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, উচ্চরক্তচাপ, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা রোগে ভুগছেন। তার হাঁটুতে অপারেশন হয়েছে দুবার। চোখেও অপারেশন হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন কোভিডে। কোভিড-পরবর্তী জটিলতায় তার ফুসফুস, লিভার, হার্ট ও কিডনির অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে বলে জানা যায়। এমতাবস্থায় তিনি ২০১৮ সাল থেকে কারাভোগ করছেন।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে বিএনপির দাবি, তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। তার বিরুদ্ধে সব মামলাই মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক। তবে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ বিএনপি করতেই পারে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলার সুযোগ নেই। আদালতে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং তিনি সাজাপ্রাপ্ত।

খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঁচবার আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা প্রসঙ্গে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।

তিনি বলেছেন, ‘নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা তিনি ইতোমধ্যেই ব্যবহার করেছেন। আমার হাতে যেটুকু পাওয়ার, সেটুকু আমি দেখিয়েছি। এখানে আমার কিছু করার নাই। আমার যেটা করার, আমি করেছি। এটা এখন আইনের ব্যাপার। খালেদা জিয়াকে যে কারাগার থেকে বাসায় থাকতে দিয়েছি, চিকিৎসা করতে দিয়েছি, এটাই কি বেশি নয়?’

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে বিএনপিপন্থিরা নাখোশ হয়েছেন। তা হতেই পারেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সবগুলো কথাই সঠিক বলেছেন। তিনি তার হাতে যে ক্ষমতা আছে সেটা প্রয়োগ করেছেন। মানবিকতা দেখিয়ে তিনি খালেদা জিয়াকে বুয়াসহ জেল ও বর্তমানে সাজা স্থগিত রেখে বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন। এগুলো তিনি মানবিকতা দেখিয়েই করেছেন।

কিন্তু খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তিনি যে অভিযোগগুলো করেছেন তা কি ভিত্তিহীন? ১৫ আগস্টের দায়ভার থেকে কি জিয়া পুরোপুরি মুক্ত? জিয়াউর রহমান কি ১৫ আগস্টের খুনিদের পুরস্কৃত করেননি? ১৫ আগস্টে নিজের ভুয়া জন্মদিন পালন করে তিনি কি সমঝোতার পথ ‍রুদ্ধ করে দেননি?

২১ আগস্টের খুনিদের তিনি বিচার না করে মদদ দেননি? প্রধানমন্ত্রীর এ অভিযোগগুলোর কোনোটাই ভিত্তিহীন নয়। তবে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা প্রশ্নে বিএনপি এখন যথেষ্ট নমনীয়। তারা পাল্টা যুক্তির পথে না গিয়ে বিদেশে চিকিৎসার বিষয়টিকে মানবিকতার সঙ্গে দেখার দাবিই করে আসছেন। সেই সঙ্গে হয়তো কিছু আইনি ও রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন।

খালেদা জিয়ার জীবনমৃত্যুর প্রশ্নটিকেই তারা বড় করে দেখছেন। খালেদা জিয়া একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নারী ও যথেষ্ট অসুস্থ। এছাড়া তিনি তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও একজন বীরোত্তমের স্ত্রী। বিএনপি এ কথাগুলোই বার বার বলছে। কিন্তু একজন ভিকটিম বা সংক্ষু্ব্ধ ব্যক্তির কাছে তিনি শুধুই একজন হুকুমের আসামি ও বর্তমানে দণ্ডিত কয়েদি।

বিএনপি খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার দাবিকে রাজনৈতিকভাবেই আদায় করতে চায় বলেই মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপি গত ১২ বছরে কোনো দাবিই আদায় করতে পারেনি। খালেদা জিয়ার বিচারের বিষয়টিকেও তারা প্রথমে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি।

পরে আইনগতভাবে মোকাবিলা করতে চেয়েছিল, সেখানেও ব্যর্থ হয়েছে। শেষমেশ তাকে কারাগারেই যেতে হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে দাবি আদায়ের শক্তি ও কৌশল কোনোটিই বিএনপি দেখাতে পারেনি। এখনও তারা একটি আইনগত বিষয়কে আইনি প্রক্রিয়ায় সুরাহা করার চেষ্টা না করে রাজনৈতিক ইস্যু বানাতে চায়।

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার দাবিই এ মুহূর্তে তাদের একমাত্র রাজনৈতিক পুঁজি। নেত্রীর অসুস্থতাকে মানুষের সহানুভূতি আদায়ের হাতিয়ার বানানো বা তার বিদেশে চিকিৎসার দাবির আড়ালে দলকে রাজপথমুখী করা মূলত এক ধরনের রাজনৈতিক দেউলিয়ার বহিঃপ্রকাশ।

দাবি আদায়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকতেই পারে। কিন্তু এ বিষয়টি সুরাহা করতে হলে আইনগতভাবেই করতে হবে। কারণ, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা বা মুক্তির বিষয়টি অনেক আগেই আইনের আওতাধীন একটি বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কাজেই, এ বিষয়টি আইনগতভাবেই সমাধান করতে হবে। আওয়ামী লীগও যদি খালেদা জিয়াকে মু্ক্তি দিতে চায় বা বিদেশে চিকিৎসা দিতে চায় তাকেও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তা করতে হবে।

বিএনপি নেত্রী গত এক দশক ধরেই শোচনীয় অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় ও নিয়মের কারণে বাসা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। বিচার শেষে তিনি কারাভোগ করেছেন। বর্তমানে সাজা স্থগিত আছে। সাজাভোগের এ মধ্যবর্তী অবস্থায় আওয়ামী লীগ তার প্রতি আরও মানবিকতা দেখাবে কি না সেটি একান্তই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যাপার। তবে সেই মানবিকতা দেখালেও তা আইনানুযায়ীই হতে হবে। আইনে এখনও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখানোর সুযোগ আছে।

মানবিক কারণ বিবেচনা করেই অনেক সময় আসামিকে জামিন প্রদান করা হয় ও তার সাজা স্থগিত করা হয়। বিচারকালীন জামিন প্রদান করা আদালতের কাজ। আদালত মানবিক বিবেচনায় জামিন দিতে পারেন। সাজা হয়ে গেলে সরকার মানবিক বিবেচনায় সাজা স্থগিত করতে পারে।

এটাই ফৌজদারি আইনের বিধান। এছাড়া রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিষয়টিও রয়েছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমার এ বিষয়টিও পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের অংশ। রাষ্ট্রপতি ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে যেকোনো আসামিকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। বিএনপি দাবি করতেই পারে যে, এ দেশে খুনের আসামিকেও রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করেছেন। সেখানে তিনবারের নির্বাচিত একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা করতে বাধা কোথায়?

এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি পরিষ্কার। তিনি ইতোমধ্যে মানবিকতা দেখিয়েছেন। মানবিক কারণেই তিনি এখন বাসায় আছেন। তার সাজা স্থগিত আছে। মানবিক কারণেই তার দেখভাল করার জন্য একজন কাজের বুয়াকেও সঙ্গে থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এসবই সত্য। বিএনপির দাবি, সেই মানবিকতাকে আরও প্রসারিত করে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানো!

আইনমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদিও ফৌজদারি কার্যবিধি ভিন্ন কথা বলে। বর্তমানে তার সাজা স্থগিত রয়েছে। তবে কিছু শর্ত রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম শর্ত হচ্ছে, তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না। (ফৌজদারি কার্যবিধির সিআরপিসি) ৪০১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘কোনো ব্যক্তি কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হইলে সরকার যে কোনো সময় বিনা শর্তে বা দণ্ডিত যাহা মানিয়া নেয় সেইরূপ শর্তে যে দণ্ডে সে দণ্ডিত হইয়াছে, সেই দণ্ডের কার্যকরীকরণ স্থগিত রাখিতে বা সম্পূর্ণ দণ্ড বা দণ্ডের অংশবিশেষ মওকুফ করিতে পারিবেন।’

কাজেই সরকার চাইলে শর্ত তুলে নিয়ে সাজা স্থগিত করতে পারে। এমনকি সাজা মওকুফও করতে পারে। সিআরপিসি’র ৪০১ (৬)-এর অধীনে তাকে কয়েকটি শর্ত দিয়ে সাজা স্থগিত করা হয়েছে। ৪০১(৬) ধারা বলছে, ‘সরকার সাধারণ বিধিমালা বা বিশেষ আদেশ দ্বারা দণ্ড স্থগিত রাখা এবং আবেদনপত্র স্থগিত রাখা এবং আবেদনপত্র দাখিল ও বিবেচনার শর্ত সম্বন্ধে নির্দেশ দিতে পারিবেন।’

কাজেই ৪০১(৬) ধারা প্রয়োগ করে যে নির্বাহী আদেশে শর্ত দিয়ে সাজা স্থগিত করা হয়েছে, সেই একই ধারা প্রয়োগ করে আরেকটি নির্বাহী আদেশে জারি করে উক্ত শর্তটি তুলে দিলেই তার বিদেশে যাওয়ায় আর কোনো বাধা থাকে না। বিএনপি সেই দাবিটিই করছে। অর্থাৎ নির্বাহী আদেশটি আরেকবার পরিবর্তন করে জারি করাই যথেষ্ট। তবে, এক্ষেত্রে ৪০১(২) ধারা অনুযায়ী আসামির তরফ থেকে আবেদন করতে হবে।

এছাড়াও সরকার চাইরে The Probation of offenders Ordinance ১৯৬০ ও The Probation of offenders Rules ১৯৭৫ অনুযায়ীও যেকোনো সময় যেকোনো সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মুক্তি দিতে পারে।

সরকার থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার কথা আগেও বলেছে। কিন্তু বিএনপি সে পথে যায়নি। তারা কৌশলগত কারণেই সে পথে যায়নি। কারণ, ক্ষমা চাইতে হলে দোষ স্বীকার করতে হবে, মানে সব অভিযোগ স্বীকার করে নিতে হবে। তবে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার অধিকারটি সার্বভৌম নয়।

কারণ, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ মোতাবেক রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া সব ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। কাজেই ক্ষমা করার অধিকারটিও প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তিনি চাইলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমাও মিলতে পারে। কিন্তু বিএনপি সে পথে যাবে কি না সেটাই প্রশ্ন।

দুই নেত্রীর মধ্যে আজকে বিভেদের দেয়াল থাকলেও তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সদ্ভাব ও সহমর্মিতার কথাও আমরা ভুলে যাইনি। এক/এগারোকালে শেখ হাসিনা বন্দি হলে খালেদা জিয়া তার মুক্তির দাবি করেছিলেন। পরে খালেদা জিয়াও অন্তরীণ হলে দুই নেত্রী পাশাপাশি থেকেছেন। তাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে।

শেখ হাসিনা তাকে রান্না করা খাবারও পাঠিয়েছেন। শেখ হাসিনার মুখেই আমরা একথা শুনেছি। এরশাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দুই নেত্রীর সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখ এদেশের জনগণের কাছে অত্যন্ত প্রিয় এক মুহূর্ত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দুই নেত্রীর নিজস্ব একটি জায়গা আছে। সেখানে তারা অনন্য।

অতীতে তাদের দুইজনকেই রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। তাদের বিকল্প তারা নিজেরাই। এই দুই দল ও নেত্রীর মধ্যে শত বিভেদ থাকলেও তাদের একটু পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ও এদেশের মানুষকে যার পর নাই আশান্বিত করে।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে মানবিকতা দাবি করছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ও ক্ষোভ তার ঊর্ধ্বে উঠে আরও মানবিকতা দেখাবেন কি না সেটি একান্ত তার ব্যক্তিগত বিষয়। তবে এ ব্যাপারে তাকে দায়ী করা কোনোভাবেই সংগত হবে না। বিশেষ করে ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্ট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ গুরুতর।

বঙ্গবন্ধুকন্যা, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দুবারের বিরোধীদলীয় নেত্রী, গণতন্ত্রের মানসকন্যা, মাদার অব হিউম্যানিটি ও একজন নারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, দুবারের বিরোধী দলের নেত্রী, বিরোত্তমের স্ত্রী, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী ও একজন মরণাপন্ন বয়োবৃদ্ধ নারী খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দেন অথবা না দেন-দুটোই আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
ভুলে ভরা স্মার্টকার্ডের দায় জনসাধারণের নয়
সম্পদে নারীর অধিকার
ঘটনাগুলো শুধু গল্প নয়
সুনামগঞ্জের হামলা ও ফেসবুকের অর্থনৈতিক রাজনীতি
মশা যেন ভোট খেয়ে না ফেলে

শেয়ার করুন

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও বিএনপির মামাবাড়ির আবদার  

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও
বিএনপির মামাবাড়ির আবদার  

খালেদা জিয়া যে মামলায় দণ্ড ভোগ করছেন সেটা তো আওয়ামী লীগ সরকার করেনি। তারপরও বিএনপি অভিযোগ করে আসছে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে সরকার তাদের নেত্রীকে কারাদণ্ড দিয়েছে। মামলার প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এতিমের টাকা আত্মাসাতের কারণে দুদক ২০০৮ সালের ৪ জুলাই এ মামলাটি করে। এ মামলায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার পুত্র তারেক রহমানও আসামি ছিলেন।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে দেশবাসী ধোঁয়াশার মধ্যে আছে। কখনও মুত্যুগুজব, কখনও বলা হচ্ছে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে, আবার কখনও শোনা যাচ্ছে তিনি মোটামুটি সুস্থ আছেন। এ প্রসঙ্গে ঈশপের একটি গল্প মনে পড়ে গেল। যদিও গল্পটি প্রায় সবাই জানে। এক মিথ্যাবাদী রাখাল বালক প্রতিদিন বাঘ আসছে, বাঘ আসছে বলে গ্রামবাসীকে মিথ্যে ভয় দেখাত। সত্যিই একদিন যখন বাঘ এল, সেদিন কিন্তু তার কথাকে আর কেউ বিশ্বাস করে এগিয়ে যায়নি। পরিণতি যা হওয়ার তাই হয়েছে। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে।

বেগম জিয়া জেলে যাওয়ার পর থেকেই বিএনপির নেতারা বলে আসছে- তিনি মারাত্মক অসুস্থ, জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, সরকার চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করছে এসব অবান্তর গল্প শুনতে শুনতে জনগণ এখন ক্লান্ত। এখন তাদের কোন কথা সত্য আর কোনটি মিথ্যা সাধারণ মানুষ যথেষ্ট সন্দিহান।

খালেদা জিয়া যখন জেলে ছিলেন তখন বিএনপি থেকে দাবি করা হতো তাকে বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু তিনি মুক্তি পাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে চিকিৎসা নিচ্ছেন এভারকেয়ার হাসপাতালে (সাবেক অ্যাপোলো) আবার যখন নিজেরদের পছন্দমতো হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে তখন আবার নতুন উছিলা তুলেছে, খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে বিএনপি যে রাজনীতি করছে সেটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তাদের নেত্রীর সুচিকিৎসার থেকে বেশি মনোযোগ রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করে সরকারকে বিব্রত করা। বিএনপির নেতারা সচেতনভাবে জানেন একজন দণ্ডিত আসামির বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ নেই। তারপরও তারা এই বিষয়টি নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করতে চাইছে।

খালেদা জিয়া যে মামলায় দণ্ড ভোগ করছেন সেটা তো আওয়ামী লীগ সরকার করেনি। তারপরও বিএনপি অভিযোগ করে আসছে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে সরকার তাদের নেত্রীকে কারাদণ্ড দিয়েছে। মামলার প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এতিমের টাকা আত্মাসাতের কারণে দুদক ২০০৮ সালের ৪ জুলাই এ মামলাটি করে। এ মামলায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার পুত্র তারেক রহমানও আসামি ছিলেন।

পিতা মারা গেলে পুত্র এতিম হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তারেক জিয়া নিঃসন্দেহে এতিম হন। কিন্তু মা যখন প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান তখন কি আর ছেলেটা এতিম থাকে? ১৯৯১ সালে সৌদি আরব বাংলাদেশের এতিমদের সহায়তার জন্য ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে’ সাড়ে ৪ কোটি টাকা দান করে। পরবর্তী সময়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল নামে ভুয়া দুটি ট্রাস্ট গঠন করে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সমুদয় অর্থ আত্মসাৎ করে খালেদা জিয়া ও তার পুত্র তারেক রহমান।

জিয়া অরফানেজ মামলায় এতিমের টাকা আত্মসাতের কারণে বিচারিক আদালত খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়। তবে হাইকোর্টে সাজা বাতিল চেয়ে আবেদন করলে উল্টো সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করে দেন। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায়ও খালেদা জিয়াকে আরও ৭ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন।

খালেদা জিয়া কতটুকু অসুস্থ সে বিষয়ে সার্টিফিকেট দেবে চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকরা। গণমাধ্যমসূত্রে জানা যাচ্ছে, এভারকেয়ার হাসপাতালে বিশজনের চিকিৎসক প্যানেল বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। কিন্তু চিকিৎসকরা তার অসুস্থতা বিষয়ে মুখে কলুপ এঁটেছেন। প্রতিদিন বিএনপি নেতারা বলে যাচ্ছেন, খালেদা জিয়া জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছেন। যে কথাটা বলার কথা চিকিৎসকদের, কিন্তু সেটি বলে যাচ্ছে ফখরুল সাহেবরা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকরা এবিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব। বিএনপি নেত্রী কেমন আছেন সেটা জানার অধিকার জনগণের আছে। কিন্তু জনগণ তো দূরের কথা বিএনপির নেতাকর্মীরাই ধোঁয়াশার মধ্যে আছে, আদৌ তাদের নেত্রীর কী অবস্থা। বিএনপি নেত্রী এখন মুক্তভাবে জীবনযাপন করছেন। পরিবার ও দলের কিছু নেতা চিকিৎসা-সংশ্লিষ্টতায় জড়িত। তারা ছাড়া সবাইকে অসুস্থতার বিষয়টি নিয়ে অন্ধকার রাখা হচ্ছে। এখানেই রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির আভাস পাওয়া যায়।

খালেদা জিয়া এবারই প্রথম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, এমনটি নয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যাওয়ার পর ৬ অক্টোবর অসুস্থবোধ করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেয়া হয়। সেসময় এক মাসেরও বেশি হাসপাতালে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আবার অসুস্থবোধ করলে ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল পুনরায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মুক্তির আগপর্যন্ত সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার মহানুভবতার কারণে করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার আগে ২৫ মাস কারাভোগের পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান বেগম খালেদা জিয়া। এরপর আরও তিনদফা সাজা স্থগিতের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তার মুক্তির ক্ষেত্রে শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না এবং দেশের পছন্দমতো যেকোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নেবেন।

বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার অজুহাতে মাঠ গরম করার দিকে বেশি তৎপর হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদেরকে আদৌ আন্তরিক মনে হচ্ছে না। খালেদা জিয়ার বিদেশ যেতে বাধা থাকলেও বিদেশ থেকে ডাক্তার আনার ক্ষেত্রে তো কোনো বাধা নেই। কিন্তু সেদিকে বিএনপির কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

বিএনপি যদি প্রকৃতপক্ষেই খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার কথা ভাবত তাহলে তারা আন্দোলনের নামে জলঘোলা না করে চিকিৎসার দিকে আরও বেশি নজর দিত। কথায় কথায় আন্দোলনের হুমকি, সরকার পতনের কথা বলত না। সরকারের কাছে দেনদরবারের পাশাপাশি আইনগতভাবে প্যারোলে মুক্তির জন্য চেষ্টা করতে দেখতে পারত।

মির্জা ফখরুল বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়াকে নাকি স্লো পয়জনিং করা হচ্ছে। বেগম জিয়া ২১ মাস ধরে মুক্ত আছেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে থাকেন। আর আশপাশে ঘোরাঘুরি করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। আর ব্যক্তিগত পছন্দের চিকিৎসকরাই তাকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।

তাহলে স্লো পয়জনিং যদি কেউ করে থাকেন তাহলে আপনজনদের মধ্যেই তো কেউ করেছেন। এখানে তো সরকারের করার কোনো সুযোগই নেই। আবার তিনি এ-ও বলছেন, খালেদা জিয়ার রোগনির্ণয়ের প্রযুক্তি দেশে নেই। এসব উদ্ভট কথা বলে তিনি জনগণের কাছে সার্কাসের জোকারে পরিণত হয়েছেন।

পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে বিদেশে চিকিৎসা দেয়ার উদাহরণ কি আছে? নেই, সেটা জেনেও বিএনপি খালেদা জিয়াকে পুঁজি করে আন্দোলনের ইস্যু তৈরির চেষ্টা করছে।

বিএনপি-জামায়াতপন্থি কিছু কথিত বুদ্ধিজীবী টেলিভিশনে গলা ফাটাচ্ছে সরকারের উচিত মানবিক কারণে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানো। যারা মানবিক হওয়ার কথা বলেন, তারা কি কখনও নিজেরা আত্মোপলব্ধি করেছেন যে, শেখ হাসিনা কতটা মানবিক হলে খালেদা জিয়াকে নির্বাহী ক্ষমতার বলে সাজা স্থগিত করে মুক্তভাবে চলাফেরা সুযোগ করে দিয়েছেন। শুধু কি তাই? বেগম জিয়া যখন জেলে ছিলেন তখন তাকে দেখাশোনার জন্য ব্যক্তিগত গৃহপরিচারিকা ফাতেমাকে সঙ্গে থাকার সুযোগ করে দেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেই এমন উদারতা দেখাতে পারেন।

যেসব বুদ্ধিজীবী খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠাতে উঠে পড়ে লেগেছেন তারা কি নিশ্চয়তা দিতে পারবেন খালেদা জিয়া বিদেশে থেকে চিকিৎসা শেষে আবার দেশে ফিরে আসবেন? বেগম জিয়ার পুত্র তারেক রহমান যিনিও একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তিনি ১৪ বছর ধরে চিকিৎসার কথা বলে পালিয়ে আছেন।

বিএনপি নেতাদের তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে প্রশ্ন করলে বলেন, তিনি চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরবেন। তারেক রহমান এমন কী রোগে আক্রান্ত যে চৌদ্দ বছরে সুস্থ হতে পারেননি। এটা হলো রাজনৈতিক অসুস্থতা। খালেদা জিয়াও একবার দেশ ছাড়তে পারলে আর ফিরে আসবেন না, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। তখন মা-ছেলে মিলে দেশের বিরুদ্ধে আরও জোরালোভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করবে।

বিএনপি নেতারা মায়াকান্না করলেও যার জন্য খালেদা জিয়ার এই পরিণতি তার সেই সুপুত্র তারেক রহমান একবারও মাকে দেখতে আসার আগ্রহ দেখাননি। অনেকে যুক্তি দেখান তিনি গ্রেপ্তার আতঙ্কে আসতে পারছেন না।

তারেক রহমান বিএনপির অন্যতম ‘শীর্ষনেতা’, তিনি কেন গ্রেপ্তারকে ভয় পাবেন? নৈতিকভাবে দুর্বল বলেই কারাগারকে ভয় পায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে ঝড়ের রাতে প্রবল স্রোতে সাঁতার কেটে দামোদর নদী পার হয়ে অসুস্থ মার কাছে পৌঁছেছিলেন। আর তারেক রহমান অসুস্থ মাকে রেখে আরাম আয়েশ করে বেড়াচ্ছেন! এতেই বোঝা যায় মায়ের প্রতি তিনি কতটা উদাসীন! তিনি মাকে নিয়ে রাজনীতি করবেন নাকি মায়ের ভালোবাসার টানে দেশে ফিরে আসবেন এখন সেটিই দেখার সময় এসেছে।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

[email protected]

আরও পড়ুন:
ভুলে ভরা স্মার্টকার্ডের দায় জনসাধারণের নয়
সম্পদে নারীর অধিকার
ঘটনাগুলো শুধু গল্প নয়
সুনামগঞ্জের হামলা ও ফেসবুকের অর্থনৈতিক রাজনীতি
মশা যেন ভোট খেয়ে না ফেলে

শেয়ার করুন