রসুন বুনবো একুশেও

player
রসুন বুনবো একুশেও

বাংলাদেশসহ গোটা পৃথিবীর কোথাও মানুষ হত্যা থামেনি। নদী, গাছ হত্যা চলেছে অবাধে। দুর্বলের ওপর সবলের শাবলের আঘাত চলছে অবিরাম। নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ কমেনি বরং সঙ্গনিরোধকালে বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। আয়ের অবৈধ সড়কে মানুষের পদচারণা বেড়েছে। মানুষকে কাজ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে নানা অজুহাতে।

ভেঙে পড়েছে ঝাড়বাতিটা। খসে পড়েছে দেয়ালের পলেস্তরা। ভাঁজ পড়েছে অবয়বে। ব্যক্তি আমার ঘরে যে হাল, একই হাল বাইরের পৃথিবীর। মুখে মুখোশ তুলে অবয়বের ভাঁজ লুকোতে যেমন পারছি না, তেমনি নানা জয় যাত্রার ডঙ্কা বাজিয়েও পৃথিবীর নুয়ে পড়া আড়াল করা যায়নি। বরং আরও প্রকাশ্য হচ্ছে পরাজয়।

আজ মহাকালের যে ধূলিকণাটি উড়ে যাবে জীবন থেকে, তার দুই পিঠেই পরাজয়ের সিলমোহর দেয়া। গোড়াতে ভাবা হয়েছিল, আমরা পরিশোধিত হবো, কিন্তু বছরের বিদায় লগ্নে দেখছি পরিশোধনের যোগ্যতাটুকুও হারিয়ে বসে আছি আমরা। প্রকৃতি আমাদের জীবনে একটা বিরতি চিহ্ন এঁকে দিয়েছিল, সেই চিহ্নটিকে আমরা শুধরে নেবার মন্ত্র হিসেবে নেইনি। বরং আরও কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠা যায়, লোভের জিব আরও কত বিস্তৃত করা যায় সেই প্রতিযোগিতার দৌড়ে এখন আমরা।

বাংলাদেশসহ গোটা পৃথিবীর কোথাও মানুষ হত্যা থামেনি। নদী, গাছ হত্যা চলেছে অবাধে। দুর্বলের ওপর সবলের শাবলের আঘাত চলছে অবিরাম। নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ কমেনি বরং সঙ্গনিরোধ কালে বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। আয়ের অবৈধ সড়কে মানুষের পদচারণা বেড়েছে। মানুষকে কাজ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে নানা অজুহাতে। কাজ হারা মানুষের মিছিল ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে।

পরিবার পরিজন স্বজন হারানোর তালিকাটির অঙ্ক ঘূর্ণায়মান। আমরা জানি না কে কখন চলে যাচ্ছি, যাব। এই অনিবার্যতার মধ্যেই আমরা ২০২০ জুড়েই দূর ও নিকটজন বা আমাদের লালনকারীদের বিষ দাঁত দেখতে পাচ্ছি।

আচমকা এটা আজ ২০২১ সালের প্রথম প্রহরে সেই দন্ত প্রসারিত হবে খিলখিল হাসিতে এমন প্রত্যাশা করছি না। তবে মানুষের একটি শক্তি অবশ্যই আছে, যে শক্তির ওপর ভর করে টিকে আছে পৃথিবী। এটা নিজেকে প্রবোধ দেয়া নয়, পরাজয়ের শেষ বিন্দু থেকেই জয়ের পুনর্জন্ম।

মানুষ হারছে মানুষের লোভের কাছে, বিভৎসতার কাছে। এটা সত্যি। তাই বলে এখানেই শেষ নয়। মানুষ আবার জয় রথের সওয়ার হবে। রথ চালিয়ে পৌঁছবে সুন্দরের কাছে। কারণ মানুষ প্রকৃত অর্থে প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতি নিজেকে উদার করে দিয়ে পৃথিবীকে সুন্দর করে তোলে। মানুষও তাই। পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সুন্দর। সুন্দরের ধ্যানে তাদের জীবন উৎসর্গ করা। কোভিড-১৯ নামের দানবের তাণ্ডব কালেও আমরা দেখতে পাচ্ছি শেষ পর্যন্ত মানুষই দাঁড়িয়েছে মানুষের পাশে।

রাজনৈতিক সংগঠনের বদলে বিভিন্ন পেশা ও তরুণদের নিয়ে গড়া সংগঠন ধরেছে বিপন্ন মানুষের হাত। সেই আশ্চর্য দরদি। স্পর্শেই বেঁচে আছে মানুষ। প্রতি বছরান্তে আমরা আশা করি পৃথিবী জুড়ে রাজনৈতিক দলগুলো ও শাসকেরা মানবিক হবে। শোষক রূপ খানিকটা হলেও নমনীয় হবে। জনবান্ধব হবে শাসকেরা। কিন্তু প্রতিবারই করতলে জমা হয় দীর্ঘশ্বাস। পৃথিবী যতটা না জলবায়ু বিপর্যয়ে উষ্ণ হয়ে উঠছে তার চেয়েও বেশি তার উষ্ণতা বাড়ছে অধিকার বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে।

পরিসংখ্যানের, গণিতের প্রহলিকার পেছনে ছুটছি আমরা। সমৃদ্ধির অঙ্ক সূচক দেখে ঢেঁকুর তুলছি। অথচ ঘরে আমাদের উনুনে ভাত বাড়ন্ত। পৃথিবীর সম্পদ, রাষ্ট্রের সম্পদ কতিপয় মানুষের হাতের মুঠোতে। বাকিরা মুঠো চুইয়ে পড়া সম্পদের দিকে হাত পেতে থাকি। ২০২০-এ এমন পৃথিবী থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি, বরং ঘনিভূত হয়েছে সংকট।

তবে কেউ কেউ বলছেন ২০২০ ছিল বিচ্ছিন্নতার বছর। আমি তা মনে করি না। কারণ সম্পদের অসম বণ্টন ও অসাম্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বাড়ানোর খেলা শুরু তো অনাদিকালের। দিনে দিনে শুধু সেই খেলা জমজমাট হয়েছে। কোভিড-১৯ এসে বাহ্যিক ভাবে সঙ্গনিরোধে বাধ্য হতে প্ররোচিত করেছে মানুষকে। বিচ্ছিন্ন হয়েছি হয়ত দৃশ্যত। কিন্তু আমি মনে করি বঞ্চিত মানুষের আত্মিক যোগাযোগ বেড়েছে এ সময়টায়। মনযোগাযোগে তারা জোটবদ্ধ হয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই দুর্যোগকালে মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠ বারবার প্রকম্পিত করেছে পৃথিবীকে।

২০২১-এ আমরা তালি মেরে সেই সংকট উড়িয়ে দেব তা বলছি না। সেই কবে থেকেই তো বর্ষ সালতামামি করতে বসে শুধু স্বপ্ন আর প্রত্যাশার রসুন বুনেছি, কিন্তু কোনোবারই ফলন প্রত্যাশা মতো হয়নি। এবার তো বিশ্বজুড়েই স্বপ্ন ফলনে মঙ্গা। খেটে খাওয়া মানুষদের জন্যও তাই। ফলন যাই হোক কৃষক পরাজয় মানে না, কোনো খরা, অতিবর্ষণ তাকে থামাতে পারে না। ফসল বুনেই যাবে সে। অপরাজিত সেই কৃষকের মতো আবারও স্বপ্ন বুনতে চাই। ২০২১ হোক শুদ্ধতার।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

শেয়ার করুন

মন্তব্য

করোনা ও হত্যাবাণিজ্যের কড়চা

করোনা ও হত্যাবাণিজ্যের কড়চা

গত বছর যেভাবে লকডাউন দিয়ে সুফল অর্জিত হয়েছিল এখন সেটা প্রায় অসম্ভব। দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে, দরিদ্র সাধারণ মানুষের জীবন সচল রাখতে হলে এককথায় সাধারণ মানুষের খেয়েপরে বাঁচার পথ খোলা রাখতে চাইলে, গরিবের কথা মাথায় থাকলে লকডাউনে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। লকডাউনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় বাংলাদেশের পক্ষে বহন সম্ভব নয়।

করোনা পরিস্থিতির আবারও অবনতি ঘটল। বিশেষ করে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে। বহির্বিশ্বে তো বটেই বাংলাদেশেরও পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। মাঝখানে জনমনে একটা স্বস্তি এসেছিল সংক্রমণহার এবং মৃত্যুহার কমে যাওয়ার ফলে। মাত্র মাস-দুইতিন আগেও যেখানে আক্রান্তের গড় হার ছিল প্রতিদিন শতকরা ১৩-১৪ জন, সেখানে আমরা তা নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম শতকরা ১-২ জনে। কিন্তু করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট আসার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত এবং মৃত্যুহার দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত দৈনিক আক্রান্তের হার শতকরা ১৫-১৬ জনে পৌঁছেছে। আক্রান্তের পাশাপাশি বাড়ছে মৃত্যুহারও। এই অবস্থা নিঃসন্দেহে শঙ্কাজনক।

গত বছর যেভাবে লকডাউন দিয়ে সুফল অর্জিত হয়েছিল এখন সেটা প্রায় অসম্ভব। দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে, দরিদ্র সাধারণ মানুষের জীবন সচল রাখতে হলে এককথায় সাধারণ মানুষের খেয়েপরে বাঁচার পথ খোলা রাখতে চাইলে, গরিবের কথা মাথায় থাকলে লকডাউনে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। লকডাউনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় বাংলাদেশের পক্ষে বহন সম্ভব নয়।

তাহলে বিকল্প কী? এই ভাবনা অনেকেই ভাবছেন। সরকারের তরফ থেকে টিকা কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনও স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। মানানোর মতো ব্যাপক জনমত গঠন করার বিকল্প নেই।

চিকিৎসক-সাংবাদিক তথা গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি প্রবীণদেরও বুস্টার ডোজের আওতায় আনার সরকারি প্রয়াস জারি আছে। কিন্তু প্রথম ডোজইতো এখনও দেয়া যায়নি বিপুলসংখ্যক মানুষকে। প্রথমবার যারা পেয়েছেন তাদের অনেকে এখনও দ্বিতীয় ডোজ পায়নি। টিকা নেননি অথবা পাননি এমন নাগরিকের সংখ্যাও অসংখ্য!

আরও ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার জন্য গত সপ্তাহে উদ্যোগ নেয়া হলেও তা কার্যকর করা যায়নি। সরকারের তরফে বলা হয়েছিল অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের জন্য। কিন্তু গণপরিবহন সংশ্লিষ্ট মালিক-চালক কর্তৃপক্ষ সরকারের প্রস্তাব কার্যকর করেনি। গণমাধ্যমের সচিত্র প্রতিবেদনে পাওয়া প্রামাণ্য বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, অনেক বাসচালক-হেলপার এবং সুপারভাইজারও টিকা গ্রহণ করেননি অথবা পাননি! তাহলে উপায়? কেন জনগণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব টেকনিক্যাল পেশার লোকজনকে টিকার আওতায় বাধ্যতামূলকভাবে আনা গেল না! এ যে শুধু বাসচালকদের ক্ষেত্রে সত্য, তা নয়। লঞ্চ স্টিমারসহ অন্য গণ- পরিবহনের চিত্রও প্রায় অভিন্ন।

টিকার কথা আসতেই মনে পড়ল আন্তর্জাতিক বাজারের মহাপরাক্রমশালী টিকা ব্যবসায়ীদের কথাও। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি স্ট্যাটাসের কথা বলি। স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন ডক্টর তমাল রায়চৌধুরী নামে এক ভদ্রলোক। রীতিমতো পিলে চমকানো তথ্য। চীনের উহান প্রদেশ থেকে করোনার আবির্ভাব কিংবা উৎপাদন এবং এই নিষ্ঠুরতম অমানবিক বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বিশ্বমোড়লদের ভয়াবহ সব কর্মকাণ্ডের তথ্য। সত্য-মিথ্যা যাচাই করবেন গবেষকরা। কিন্তু যেসব যুক্তি ওই দীর্ঘ স্ট্যাটাসে উল্লেখ করা হয়েছে এবং যেসব রেফারেন্স দেয়া হয়েছে, তা একেবারে ঝেড়ে ফেলে দেয়াও যায় না। যাকগে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আমাদের মতো সীমিত সম্পদের দেশ এবং দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে এ মুহূর্তেই জরুরি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

বিশেষ করে টিকা কার্যক্রম জোরদার করে যত দ্রুত সম্ভব দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা। এ ক্ষেত্রে কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর ভরসা করলে হবে না। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে সমন্বিত ক্র্যাশ প্রোগ্রামও নিতে হবে। গণপরিবহনসহ জনসমাগমস্থলে যাতে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করা যায়, তাহলেও অন্তত কিছুটা শঙ্কা কমতে পারে। গার্মেন্টস, ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ কাজ করছে, তাদের সবাইকে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিষ্ঠান মালিকদেরকে দিয়েই করাতে হবে। এর বিকল্প আর কিছু নেই। যত সহজে লিখলাম তত সহজ নয় কাজটি। কিন্তু দুঃসাধ্যও নয়। অধিকাংশ কারখানায় বেশিরভাগ শ্রমিক স্বাস্থ্যবিধি না মেনে নির্বিকার কাজ করে যাচ্ছে।

এর বাইরে হাটবাজার, গণপরিবহন, জনসমাগম হয় এমন স্থান; স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংক্রমণের আশঙ্কা আছে এমন স্থানসমূহে ব্যাপক মনিটরিং করতে হবে। তা শুধু স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠার জন্যই। প্রয়োজনে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিবিড় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি অমান্যকারীদের দরকারে শাস্তির আওতায় এনে হলেও এটা বাস্তবায়ন করা জরুরি।

আরেকটি শঙ্কার কথা বলে রাখা ভালো, তা হচ্ছে দেশের রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে, এমনকি কোনো কোনো জেলা শহরেও করোনার প্রকোপকালে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য বেশ কিছু বিশেষায়িত হাসপাতাল সক্রিয় ছিল। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে এই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিস্তৃত ছিল। টেস্ট-কিটসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি তারা সংরক্ষণ করেছিল।

আইসিইউর সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু গত মাস দুই-তিনেক করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকেই অনেক হাসপাতালকে হাত-পা গুটিয়ে নিতে দেখা গেছে। এখন যদি অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে, সে ক্ষেত্রে মৃত্যুর মিছিল হয়ে যাবে যথার্থ চিকিৎসা সংকটেই। অতীত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইসিইউসহ উন্নত চিকিৎসার আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।

ডক্টর তমাল রায়চৌধুরীর দীর্ঘ লেখাটি পড়ে মনে হয়েছে করোনা যেন মানবসৃষ্ট এবং অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করা একটি বাণিজ্যিক আইটেম। নৃশংসতম গণহত্যার পথ ধরেই যেন চলেছে সেই বাণিজ্য!

২০০৮ খ্রিস্টাব্দে লেখা একটি বইয়ের নাম ‘করোনা ক্রাইসিস’। বইটির লেখক রবিন রুইট। তিনি এই বইটিতেই আগাম লকডাউন পেন্ডামিকের কথা লিখে গেছেন! লন্ডনে অনুষ্ঠিত ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ৩০তম অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও দেখানো হয় পেন্ডামিকের ওপর অনুষ্ঠান! যেখানে নার্সেরা মাস্ক পরা অবস্থায় শুশ্রূষা করছেন আক্রান্ত রোগীর! শুধু তাই নয়, ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে সাংবাদিক হ্যারি ভক্স তার প্রতিবেদনে লিখেছেন: “এক ভয়ংকর রাসায়নিক যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে, যা হয়তো পৃথিবী ধ্বংসের শুরু!”

এছাড়া ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ৬শ ডাক্তারের তৈরি করা মেডিক্যাল বোর্ড একটি সংগঠন তৈরি করে, সংগঠনটির নাম ‘ডক্টরস ফর ট্রুথ’। তারা এক সংবাদ সম্মেলনে পরিষ্কার জানিয়ে দেন “covid-19 নামের এক ভয়াবহ ভাইরাস-পরিমণ্ডল তৈরির জন্য ভয়ংকর স্ক্যামের ভাবনা ভাবা হচ্ছে (২০১৫ খ্রিস্টাব্দে covid-19 নাম!) যার মূলে আসলে ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল বাজার দখলের নোংরা খেলা এবং প্রতিষেধকের নতুন বাজার তৈরির উন্মত্ত খেলা, এটাই হতে চলেছে নিকৃষ্টতম গ্লোবাল ক্রাইম।”

যুক্তরাষ্ট্রে এই তৎপরতার ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করা হয় প্যানডেমিক নামে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে রিচার্ড রথশিল্ড নামের এক বিজ্ঞানী কোভিড টেস্টিং কিটের একটি পেটেন্ট নিয়ে রাখেন! গোপন চুক্তি হয় বিশ্বের এক নম্বর ধনকুবের বিল গেটসের সঙ্গে!

২০১৭ ও ২০১৮ সালে ১০ কোটি টেস্ট কিট উৎপাদন করা হয় এবং তা সংরক্ষণ করেন বিল গেটস! করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়া বা ডক্টর তমালের ভাষায় ছড়িয়ে দেয়ার তিন বছর আগেই Covid-19-এর রূপরেখা তৈরি হয়ে গিয়েছিল! শুধু তাই নয়, কোন দেশে কত রপ্তানি করা হবে তার ভাগবাটোয়ারাও তৈরি হয়েছিল, সে তথ্য বিল গেটস এবং তার সংগঠন WITS (world integrated trade solution) থেকে পাওয়া গেছে!

২০২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এই তথ্য সোশ্যাল-মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যেতেই পরদিন ৬ সেপ্টেম্বর ‘কোভিড-১৯ টেস্ট কিট’-এর নাম বদলে ‘মেডিক্যাল টেস্ট কিট’ করা হয় এবং তা বুলেটিন আকারে প্রকাশ করা হয়। এ প্রসঙ্গে ডক্টর তমাল রায়চৌধুরী উল্লেখ করেছেন ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের একটি ঘটনা। যখন করোনার নামগন্ধও ছিল না। এই ঘটনার দুই বছর আগেই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও চীনে কোটি কোটি ‘কোভিড নাইনটিন টেস্ট কিট’ সরবরাহ করে! ভয়ংকর হলেও সত্য বিশ্বব্যাংক বলেছে : “covid-19 এমন এক পরিকল্পনা যার ব্যাপ্তি ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চ পর্যন্ত এবং তখন থেকেই শুরু হয়ে যাবে পুরোপুরি ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এবং অটোমেশন যুগের সেটাই শুরু।

২০১৭ সালে বিল গেটসের পক্ষ থেকে অ্যান্থনি ফৌসি এক বিজ্ঞান আলোচনা অনুষ্ঠানে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে অদ্ভুত ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন: “ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৯ সালে এক বিস্ময়কর জৈব মহামারির সম্মুখিন হবেন যার উত্তর আমরা তৈরি করে রেখেছি।”

কীভাবে তিনি দুই বছর আগেই এমন নিশ্চিত করে বলতে পারলেন করোনা তথা জৈব মহামারির কথা! ২০১৮ সালে বিল গেটস বলেছিলেন: “অ্যা গ্লোবাল প্যানডেমিক ইজ অন ইটস ওয়ে, দ্যাট থার্টি মিলিয়ন পিপল... ইট উইল কনটিনিউ টিল নেক্সট ডিকেড।”

আরও বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে এর এক বছর পর ২০১৯ সালের অক্টোবরে বিশ্বের এক নম্বর ভ্যাকসিন ডিলার বিল গেটস নিউইয়র্কে দুই দিনের এক বিজনেস মিটিং ডাকলেন। তার দ্বিতীয় দিনের দিনের এজেন্ডা ছিল ‘করোনা ভাইরাস প্যানডেমিক এক্সারসাইজ’! এই বিজনেস মিটিংয়ের শিরোনাম ছিল Event 2013. মার্কেটিয়ারদের উদ্দেশে তিনি বললেন : “উই নিউ টু প্রিপেয়ার ফর দ্যাট ইভেন্ট।”

কী ভয়ংকর উক্তি! করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দেয়া বিষয়টাকে একটা ইভেন্ট বললেন তিনি! পৃথিবীর সেরা জৈব-বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় উহানে তখন জৈব মারণাস্ত্র তৈরি প্রায় শেষ করে ফেলেছেন। বিল গেটস অনুমতি দিলেই কেবল ছড়িয়ে দেয়া।

ডক্টর তমাল রায়চৌধুরী লিখেছেন: ভ্যাকসিন মানেই বাজার। একচেটিয়া বাজার। ৬শ কোটি টাকার মালিক বিল গেটসের এর পরের অবদান ডিজিটাল ভ্যাকসিন আইডি, যা হবে আপনার-আমার পরিচয়পত্র! এই আইডি যন্ত্র একটা এক্স-রে মেশিনের মতো, শরীরের স্পর্শমাত্র সে বলে দেবে আপনি ভ্যাকসিনেটেড কি-না। এই টেকনোলজির নাম W02020-0606061.

যন্ত্র তৈরি। এখন শুধু ঘোষণার অপেক্ষা। বাইরে যেখানেই ঢুকবেন এই যন্ত্রের পরীক্ষার ভেতর দিয়ে ঢুকতে হবে, এই মারণ খেলার ফাঁদে পড়ে ভ্যাকসিন নিতেই হবে।

এই নির্মম বাস্তবতার বিশ্লেষণ আর নানা জিজ্ঞাসা এখন ভাসছে বাতাসে। এই চরম বৈষম্য আর অসমতার পৃথিবীতে আমরা ভেবেও এর কোনো কূলকিনারা করতে পারব না। আমাদের প্রয়োজন এখন শুধু আত্মরক্ষার পথ উদ্ভাবন আর সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজে বাঁচা এবং সমাজকে বাঁচানো।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক পরিচালক (বার্তা) বাংলাদেশ টেলিভিশন।

শেয়ার করুন

সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয়ে ওঠার কথা

সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয়ে ওঠার কথা

সুন্দরবন এখন জলদস্যুদের কাছ থেকে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত। এটি কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সফল কার্যক্রম এবং জলদস্যুদের পুনর্বাসনে সরকারের প্রণোদনার মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বাঘ শিকার ও ব্যবসা নিয়ে প্রথমবারের মতো করা পিএইচডি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাঘ চোরাকারবারীরা এখনও সুন্দরবনে রয়ে গেছে।

সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য যার বেশিরভাগ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ এই বিশ্ব ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে, তাদের বেশিরভাগই জেলে, মধু এবং কাঠ সংগ্রাহক। উপকূলীয় জনগণকে তাদের জীবিকার জন্য ক্রমাগত প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। তার পাশাপাশি জলদস্যুদের ভয় তাদেরকে সবসময় আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখত।

২০১৬ সালে ১২টির মতো জলদস্যু বাহিনী তৎপর ছিল যারা সুন্দরবনকে নিয়ন্ত্রণ করত। এই অঞ্চলে সক্রিয় জলদস্যু চক্রের কারণে আশেপাশের উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দারা সব সময় আতঙ্কে থাকত। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে, ২০১৮ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত ঘোষণা করেন। ওই দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সামনে জুম ভিডিওর মাধ্যমে ৩ হাজার ৩২১টি অস্ত্র ও অস্ত্রভাণ্ডারসহ ৬টি গ্রুপের অন্তত ৫৮ জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণের আগে উপকূলীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি কেমন ছিল এবং কীভাবে সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয়— এর প্রেক্ষাপট ও উত্তর খোঁজা আবশ্যক।

সুন্দরবনে জলদস্যুরা সুন্দরবনের রাজা হিসাবে বিবেচিত হতো। জলদস্যুতা, ডাকাতি এবং চোরাশিকারি বেড়ে বাংলাদেশের ফুসফুসের জন্য ক্যানসারে রূপান্তরিত হয়। স্থানীয়, জেলে এবং ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ ছিল বর্ণনাতীত। জলদস্যু ও ডাকাতদের অপরাধমূলক কার্যকলাপে উপকূলীয় মানুষ, বিশেষ করে জেলে, কাঠ ও মধু সংগ্রহকারীদের প্রাত্যহিক জীবন ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতো।

জলদস্যুদের মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত হয়েছে অনেক জেলে, মৌয়াল এবং কাঠুরিয়া; অনেক নিরীহকে হারাতে হয়েছে প্রাণ। অপহরণ এড়াতে এলাকার জেলেদের জলদস্যুদের থেকে ‘জেল থেকে মুক্ত হও’ কার্ড নিতে হতো। স্থানীয়রা অভিযোগ ছিল, জলদস্যুদের কাছে মুক্তিপণের একটি নির্দিষ্ট হার ছিল— একজন মানুষের জন্য ২০ হাজার থেকে ১ লাখ এবং একটি ট্রলারের জন্য ৫ হাজার থেকে ১০হাজার টাকা। অপরাধীরা অপহরণ এবং লুটপাটের মাধ্যমে ২শ কোটিরও বেশি ‘বার্ষিক ব্যবসা’ তৈরি করেছিল। এছাড়াও, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটন খাত মূলত জলদস্যুদের কারণেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ক্রমাগত অভিযান এবং তদারকির মাধ্যমে সরকার সুন্দরবনে জলদস্যুদের দমন করতে সক্ষম হয়েছে। নদীর দানবদের প্রতি কঠোরতা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার গ্যারান্টি জলদস্যুতা নিবৃত করতে সক্ষম হয়।

সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে র‌্যাব, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, বিজিবি এবং বন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে ২০১২ সালে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ৩০ মে মাস্টার বাহিনী নামে কুখ্যাত জলদস্যু দলটি প্রথম আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু বড় ভাই বাহিনী, আইয়ুব বাহিনী, রেজা বাহিনী, শাহিনুর বাহিনী এবং অন্যান্য দল সুন্দরবনে লুকিয়ে তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছিল।

সময়ে সময়ে তাদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে। এই এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জলদস্যুদের সঙ্গে লড়াইয়ে র‌্যাবের কমপক্ষে ২৮ সদস্য নিহত হয়েছে। তবে তারা ২শ ৪৬টি সফল অভিযান চালিয়েছে এবং ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন চক্রের ৫শ ৮৬ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এমনকি জলদস্যুদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের ওপর ভিত্তি করে ‘অপারেশন সুন্দরবন’ নামে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।

শুধু দমনের প্রচেষ্টায় অভিযান চালিয়ে জলদস্যুদের ম্যানগ্রোভ বন থেকে নির্মূল করা ছিল অসম্ভব। ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের পুনর্বাসন এবং তাদের পরিবারকে স্বনির্ভর করে তোলার জন্য ‘সুন্দরবনের হাসি’ নামে একটি প্রকল্প শুরু করা হয় যা মূলত জলদস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যবস্থাপনায় ৩১ মে, ২০১৬ থেকে ০১ নভেম্বর, ২০১৮ পর্যন্ত ৪শ ৬২টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে সুন্দরবনের ৩২টি ডাকাত দলের ৩শ ২৮ সদস্য। প্রত্যেক জলদস্যু তাদের নতুন জীবন শুরু করার জন্য ১ লাখ করে টাকা পায়। এছাড়াও, সেলাই, কম্পিউটার, ড্রাইভিং, বুটিকসহ নানা বিষয়ে তাদের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

উল্লেখ্য, সুন্দরবন পুনর্বাসন প্রকল্প এতটাই সফল হয়েছে যে, এ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার ৪৩ ডাকাত ৯৪টি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আত্মসমর্পণ করে।

সুন্দরবন এখন জলদস্যুদের কাছ থেকে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত। এটি কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সফল কার্যক্রম এবং জলদস্যুদের পুনর্বাসনে সরকারের প্রণোদনার মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বাঘ শিকার ও ব্যবসা নিয়ে প্রথমবারের মতো করা পিএইচডি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাঘ চোরাকারবারীরা এখনও সুন্দরবনে রয়ে গেছে। ২০১৪ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪শ ৪০ যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ১শ ১৪ তে নেমে এসেছে যেটি সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। বাঘ শিকারের সিন্ডিকেট ভাঙতে আরও কঠোর এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক।

সুন্দরবনে জলদস্যুতা এখন একটি স্মরণীয় অতীত, যা আমরা আর দেখতে চাই না। আশা করা হচ্ছে যে, সরকারের পুনর্বাসন প্রকল্প আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে সহায়তা করবে। এছাড়া সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত রাখতে প্রকল্পের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই।

লেখক: গবেষক, প্রবন্ধকার ও কলাম লেখক।

শেয়ার করুন

মানবাধিকার ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী

মানবাধিকার ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী

বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ প্রতিবন্ধী মানুষ। শুধু সমাজ বা রাষ্ট্র থেকেই নয়, এমনকি পরিবার থেকেও প্রায়শই বঞ্চনা আর নেতিবাচক আচরণের শিকার হন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর দেশে দেশে প্রতিবন্ধীদের রয়েছে নানা বঞ্চনা আর বৈষম্যের অভিজ্ঞতা। বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নিজের অধিকার আদায়ে প্রতিবন্ধীরা নানাভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।

মানবাধিকারের ক্ষেত্রে সমতা বলতে বোঝায় মৌলিকভাবে ‘আমরা সবাই এক’, আমাদের নানা ধরনের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের সবার জীবনের মূল্য একই। শুধু মানব সন্তান হিসেবে জন্ম নেয়ার কারণেই মানবাধিকারের সব মানুষের রয়েছে সমান দাবি এবং অধিকার। মানব বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা মানুষের এ অধিকারকে স্বতন্ত্র করে তোলে কিন্তু তা কখনই ভেদাভেদ সৃষ্টি করে না। সমতার মূলনীতিসমূহ চর্চা করতে গেলে বা করার সময় ব্যক্তিসহ গোটা সমাজকে প্রতিবন্ধিতাসহ সব ধরনের মানববৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধা এবং সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।

সমতার মূলনীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি পন্থা অবলম্বন করা হয়। প্রথমেই যেটি নিয়ে আলোচনা করা হবে সেটিকে বলা হয় ‘আনুষ্ঠানিক সমতা’ এবং এটি সাধারণত ঘটে থাকে যখন কোনো আইন বা নীতিমালায় আহ্বান করা হয় যে, নানা স্তরের জনগণকে সমতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার জন্য বা কাউকে যেন বৈষম্য না করা। কিন্তু শুধু এর দ্বারা প্রতিবন্ধী বা যেকোনো জনগোষ্ঠীর জন্য সত্যিকারের সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, এটি যথেষ্টও নয়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি ও সমাজ দ্বারা সৃষ্ট কৃত্রিম বাধাসমূহের সম্মুখীন হয়, সেগুলো বিবেচনা ও মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার দরকার হতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরকে সম-সুযোগ দিতে হলে, কাঠামোগত-তথ্যগত, যোগাযোগের ক্ষেত্রে এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত যেসব বাধার সম্মুখীন হয়, সেগুলো নির্মূল করতে হবে। সমতা প্রতিষ্ঠায় আরেকটি যে পন্থা অবলম্বন করা হয়, সেটিকে প্রায় ক্ষেত্রেই বলা হয় ‘সুযোগের সমতা’। এ পন্থা স্বীকৃতি দেয় যে, মানুষ তার নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে কিছু বিষয় ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়।

বর্ণ, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা এবং সামাজিক অবস্থান। শুধু এ বিষয়গুলো অথবা এর সঙ্গে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিগত এবং অন্যান্য বাধা যোগ হয়ে নিজেদের মতো করে জীবন যাপন করা এবং সমাজে অবদান রাখা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে হলে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজন হয়, যা কিনা ‘আনুষ্ঠানিক সমতা’-র বাইরে, এবং তা বিশেষভাবে প্রতিবন্ধী মানুষদেরও একই সুযোগপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে। সেগুলো হতে পারে- পরিবহন ব্যবস্থায় প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে এমন চর্চা ও দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং প্রতিবন্ধিতার ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তৃতীয় যে পন্থা অবলম্বন হিসেবে যেটি উল্লেখ করা হয়, সেটি হলো- ‘প্রকৃত বা কার্যত সমতা’।

এ পন্থার মূল বক্তব্য হলো- ‘শুধু সুযোগের সমতা নয় ফলাফল বা পরিণতির সমতাও নিশ্চিত করা’। মানুষের সমতা নিশ্চিত করার জন্য ‘সব মানুষ সমান’ শুধু এ বাক্যটি যথেষ্ট নয়। অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে, প্রকৃত বা কার্যত সমতা মনে করে, ব্যক্তি সমাজে কতটুকু অবদান রাখতে পারল বা তার রাখার সামর্থ্য কতখানি রয়েছে তা নির্বিচারে সবারই রয়েছে মানবাধিকারসমূহে সমান ও সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করার অধিকার। যদিও ‘সুযোগের সমতা’ পন্থার সঠিক প্রয়োগই যথেষ্ট, বেশিরভাগ প্রতিবন্ধী মানুষ যাতে তাদের মতো করে মানবাধিকার উপভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য, কিন্তু ‘প্রকৃত সমতা’ পন্থার ওপর বাড়তি অঙ্গীকার প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

বলা যেতে পারে যে, কাজ বা চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যাতে বৈষম্যের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করলেই প্রতিবন্ধীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে না, যদি না একই সঙ্গে কাজ বা চাকরি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এ কারণে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রকৃত সমতা নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে প্রতিবন্ধীর জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা চাকরির বাজারে অন্য সবার মতো প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

বৈষম্যকরণ-এর মূল অর্থই হলো ‘ভেদাভেদ করা, অবজ্ঞা করা, অবহেলা করা, নিম্নশ্রেণির ভাবা, অবমাননাকর আচরণ করা’ এবং এর ভাব বা লয় সম্পূর্ণ নেতিবাচক। আচরণ বর্ণনার ক্ষেত্রে শব্দটি ব্যবহারকালে সেটি আরও নেতিবাচক রূপ নেয়। যখন কোথাও উল্লেখ করা হয় কাউকে ‘বৈষম্য’ করা হয়েছে, তখন এর অর্থই হলো- ব্যক্তিটির সঙ্গে শুধু ভিন্ন আচরণই না অন্যায্য আচরণও করা হয়েছে।

এ ধরনের অন্যায্য আচরণ করা হতে পারে সুস্পষ্টভাবে, যেমন- এমন একটি আইন পাস হলো, যেটি খুব উন্মুক্তভাবে প্রতিবন্ধী মানুষকে বৈষম্য করে অথবা এটি হতে পারে খুবই অস্পষ্টভাবে। যেমন- আইনটি হয়তো নিরপেক্ষ, কিন্তু এর প্রয়োগ হয় প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিকূলে। এ ধরনের অস্পষ্ট বৈষম্য ক্ষতিকর হতে পারে কারণ, জনগণ মনে করতে পারে যে, সুস্পষ্ট বৈষম্য না থাকার অর্থই হলো সেটি ন্যায্য, এর প্রভাব ক্ষতিকর হলেও।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এর দ্বারা যে ক্ষতি হতে পারে তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হলো কীভাবে বিষয়গুলোকে আখ্যায়িত করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনগুলোতে নির্দিষ্ট কোনো কিছু, প্রতিবন্ধিতা, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ, জাতিসত্তা ইত্যাদি অথবা অন্য যেকোনো কিছুর ভিত্তিতে কাউকে বৈষম্য করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ কারণেই বৈষম্যহীনতার মূলনীতি হলো- কোনো ধরনের বৈষম্যের সঙ্গে জড়িত না হওয়ার অঙ্গিকার এবং অস্পষ্ট ও পরোক্ষ বৈষম্যের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া। রাষ্ট্রকেও নিশ্চিত করতে হবে সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে থাকবে তার অবস্থান, সেটি ব্যক্তিগত পর্যায়ের বৈষম্য হলেও।

বৈষম্যহীনতার সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর দিক হচ্ছে যে, রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য বিশেষ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করে, কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজনও হয়। এর কারণ হলো- বৈষম্যহীনতা ও সমতার মূল নীতিসমূহ একে অপরের সঙ্গে ক্রিয়াশীল। প্রতিবন্ধীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি যে বৈষম্য করা হয়েছে, যা তাদেরকে অন্য সবার মতো সম্পূর্ণ সমতা উপভোগ করা থেকে বঞ্চিত হতে বাধ্য করেছে।

এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে রাষ্ট্র কিছু পদক্ষেপ বা ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যা বিশ্বের নানা দেশে ও প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়। নানা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী কর্মীদের অবদানকে মূল্যায়ন ও আরও বেশি প্রতিবন্ধীকর্মী নিয়োগ দেয়ার জন্য উৎসাহিত করতে প্রচেষ্টা নিলে হয়তো নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কিছু বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদে সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ‘স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন সেবা প্রাপ্তির অধিকার’কে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির এ অধিকার লঙ্ঘিত হলে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার থেকেও সে বঞ্চিত হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অধিকার বিষয়ে বলা হয়েছে। সর্বজনীন মানবাধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিপূরক ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে আলাদাভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারসনদ প্রণীত হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ প্রতিবন্ধী মানুষ। শুধু সমাজ বা রাষ্ট্র থেকেই নয়, এমনকি পরিবার থেকেও প্রায়শই বঞ্চনা আর নেতিবাচক আচরণের শিকার হন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর দেশে দেশে প্রতিবন্ধীদের রয়েছে নানা বঞ্চনা আর বৈষম্যের অভিজ্ঞতা। বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নিজের অধিকার আদায়ে প্রতিবন্ধীরা নানাভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। দুনিয়াব্যাপী প্রতিবন্ধিতা আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন জাতিসংঘ প্রতিবন্ধীর অধিকার সনদ বা সিআরপিডি।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরকে মানব বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তাদের চিরন্তন মর্যাদার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এখানে প্রতিবন্ধীদেরকে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে সমাজকে সবার জন্য উপযোগী করার মাধ্যমে সব সামাজিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। দুনিয়াব্যাপী প্রতিবন্ধিতা আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন এই সনদের এক গর্বিত ও অগ্রণী অংশীদার বাংলাদেশ। বর্তমান সরকার অত্যন্ত প্রতিবন্ধীবান্ধব এবং প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করছে। প্রতিবন্ধীরা সমাজের সব ক্ষেত্রে তাদের অধিকার ভোগ করতে পারছে। তবু সমাজের সবাইকে প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণে আরও কাজ করতে হবে এবং তাদের সম-অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি

শেয়ার করুন

কৌশলটার পরিবর্তন চাই

কৌশলটার পরিবর্তন চাই

গত ২১ মাসে করোনার দুটি ঢেউ বুঝিয়ে দিয়েছে ‌যে, যুদ্ধের কৌশলেও পরিবর্তন চাই। কেবল গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাফেরাসহ কিছু খাপছাড়া বিধিনিষেধ দিয়ে তৃতীয় প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। সুস্থ স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়তে পারলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে।

করোনার ঢেউ সহসা বন্ধ হচ্ছে না। একটার পর একটা আসছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কিন্তু করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের হাত ধরে গত ৩ জানুয়ারি থেকে দেশে দৈনিক শনাক্তের হার বাড়তে থাকে। করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রায় পাঁচ মাস পর ১১ দফা নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।

১১ দফার মধ্যে অন্যতম হলো- ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরা এবং রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে টিকার সনদ দেখানো। সেইসঙ্গে উন্মুক্ত স্থানে সব ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সমাবেশ পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বলা হয়। সরকারিভাবে বলা হয়েছে এসব বিধিনিষেধের মূল লক্ষ্য হচ্ছে—মহামারি থেকে সুরক্ষার জন্য জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনা। করোনার সংক্রমণ দ্রুত ছড়ানো ঠেকাতে মাস্কের ব্যবহার নিশ্চিত করা। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য গণপরিবহনে সক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী পরিবহন। প্রাত্যহিক জীবনে হাত ধোয়া এবং স্যানিটাইজ করার অভ্যাস চালু রাখা।

সরকারঘোষিত ১১ দফা নির্দেশনা করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও এগুলো আদৌ বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে সংশয়।সরকারি ঘোষণা ও বাস্তবতার মধ্যেই রয়েছে অনেক স্ববিরোধিতা। বাণিজ্য মেলা চলছে, পিঠা উৎসব চলছে, রাজনৈতিক সমাবেশ চলছে, নির্বাচন চলছে— এটা স্পষ্টতই ১১ দফার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বাণিজ্য মেলাকে আরও সফল করার জন্য, আরও জনসমাগম বাড়ানোর জন্য আয়োজন হচ্ছে, প্রচারণা হচ্ছে। কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাণিজ্য মেলা চলবে- বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাণিজ্য মেলা কি খোলা রাখা সম্ভব? আর স্বাস্থ্যবিধি কেউ মানছে কি না, সেটাইবা নিশ্চিত করবে কে?

টিকার সনদ দেখিয়ে রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়ার বিষয়ে সরকার যে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে সেটাও অবাস্তব এক প্রস্তাব। মানুষ কি টিকার সার্টিফিকেট নিয়ে ঘুরবে? আর এ ব্যাপারে তদারকিইবা কে করবে?

১১ দফা প্রস্তাব শেষ বিচারে কাগুজে ঘোষণা ছাড়া কাজের কাজ কিছু হবে বলে মনে হয় না। কারণ এই ১১ দফা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কে বাস্তবায়ন করবে, কে তদারকি করবে— তার কোনো নির্দেশনা নেই। এমন ঘোষণা বা বিধিনিষেধ অতীতেও দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি। তদারকির ব্যবস্থা না থাকলে সে নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয় না। তা ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে একটা সমন্বিত, সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। জনমানুষের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। কিন্তু তেমন কিছু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না।

সরকার যা বলছে, যা করছে, তা যেন কেবলই করার জন্য করা। তা না হলে গণপরিবহনে সক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের মতো অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে কেন? আর ঘোষণা দেয়ার পর আবার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরেইবা আসবে কেন? দোকান-পাট, অফিস-আদালতসহ মানুষের রুটি-রুজির জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু খোলা রেখে শুধু গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের সিদ্ধান্ত কোন যুক্তিতে গ্রহণ করা হয়েছিল? এমনিতেই আমাদের দেশে গণপরিবহনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম।

সেখানে যদি অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাচলের নিয়ম করা হয়, তাহলে মানুষ গন্তব্যে পৌঁছবে কীভাবে? বড়লোকদের নিজস্ব পরিবহন আছে। তাদের জন্য ওয়ার্ক ফ্রম হোমসহ নানা সুবিধা আছে। এমনকি সপ্তাহের প্রতিদিন তাদের বাইরে বের না হলেও চলে। কিন্তু দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সেই সুযোগ নেই। জীবন বাঁচানোর তাগিদে তাদের বাড়ির বাইরে বা কর্মস্থলে যেতেই হবে। এসব মানুষের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টি কি সরকারের বিবেচনার বাইরেই থেকে যাবে?

গত প্রায় ২১ মাসের মহামারি জীবনে লকডাউনের মতো কঠোর বিধিনিষেধ সাধারণ মানুষের জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। টিকাকরণও এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয়নি। দেশের প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন। দুই ডোজ করে টিকা পেয়েছেন প্রায় ৩২ শতাংশ মানুষ। যদিও টিকাকরণ মানেই করোনা থেকে রেহাই পাওয়া নয়। টিকাকরণের পরেও যে কোভিড ছড়িয়েছে, তার সাক্ষী বহু দেশ। ইজরায়েলে চার ডোজ় টিকার পরেও সংক্রমণ বেড়েছে পনেরো গুণ! জার্মানিতে তৃতীয় ঢেউ পেরিয়ে কোভিডের চতুর্থ প্রবাহে জানুয়ারিতে প্রতিদিন আক্রান্ত প্রায় এক লাখ মানুষ। আমেরিকায় দিনে দশ লাখ। প্রতিবেশী ভারত, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডেও করোনা সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

করোনা ভাইরাসের ক্রমাগত মিউটেশন চলছে, আসছে একের পর এক স্ট্রেন। কোনটা অধিক সংক্রামক, কোনটা বেশি প্রাণঘাতী, এসব তথ্য অনেকটাই অজানা। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রধান অস্ত্র মনে করা হয় মাস্ককে। ভালো মানের মাস্ক ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক পরা ও খোলা, নিয়মিত মাস্ক পরিষ্কার করা ইত্যাদি কাজগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনসমাগম হয়- এমন স্থানে গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের দেশে এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে মাস্ক ব্যবহারে উৎসাহী করা যায়নি। শহরে অল্প কিছু মানুষ ছাড়া কেউই মাস্ক ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না।

এটা অবশ্য শুধু বাংলাদেশের চিত্র নয়, কোভিড-আক্রান্ত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই মাস্ক পরতে নারাজ নাগরিক নীতিনির্ধারকদের বিরাট চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এমনকি, স্বজনের মৃত্যু দেখেও কোভিড বিধি পালন করতে অনেকে অনাগ্রহী। চ্যালেঞ্জটা এখানেই। জীবনযাপনকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজটি অত্যন্ত কঠিন। যদি আমরা বাধ্য হতাম, মাস্ক ব্যবহার করতাম তাহলে ভিন্ন রকম প্রেক্ষিত তৈরি হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তা হয়নি।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়েই অবশ্য একই ক্লান্তি এবং অনীহা। সেক্ষেত্রে ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। মানুষ কেন এত ক্ষত ও ক্ষতি নিজচোখে দেখেও কোভিড-বিধি মানতে নারাজ? এ এক আশ্চর্য প্রবণতা! গবেষকরা বলছেন, করোনা ঠেকাতে সবাইকেই মাস্ক পরতে হবে। দেখতে হবে যাতে বন্ধ ঘরে অনেক মানুষ এক সঙ্গে না থাকেন ইত্যাদি। আর এ সব আমরা কর্তব্য হিসেবে জানি। কিন্তু তা পালন করার ধর্মটা মানছি না।

আসলে করোনাসংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সতর্কতা ও সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। যাবতীয় উদ্যোগ ও পরিকল্পনা সরকারের তরফে শুরু হলেই ভালো, কিন্তু নাগরিক সমাজেরও কিছু দায়িত্ব আছে। প্রয়োজনে সরকারের কাছে দাবিও পেশ করতে হবে নাগরিকদেরই। নিয়ম মেনে চলার ব্যাপারে সব নাগরিককেই সমানভাবে তৎপর হতে হবে।

গত ২১ মাসে করোনার দুটি ঢেউ বুঝিয়ে দিয়েছে ‌যে, যুদ্ধের কৌশলেও পরিবর্তন চাই। কেবল গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাফেরাসহ কিছু খাপছাড়া বিধিনিষেধ দিয়ে তৃতীয় প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। সুস্থ স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়তে পারলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে। স্বাস্থ্যকর্মী বলতে শুধু ডাক্তার, নার্স, বা হাসপাতালের অন্য কর্মী নন, গ্রামের স্বাস্থ্যকর্মী এবং সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার স্বাস্থ্যকর্মীরাও।

এই স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর কেবল কাজ চাপালেই হবে না, তাদের অভিজ্ঞতা, পরামর্শও শুনতে হবে। কারণ কোথায়, কীভাবে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, কারা রয়ে যাচ্ছেন টিকার বাইরে, তা তাদের মতো কেউ জানে না। এসব স্বাস্থ্যকর্মী ও সর্বস্তরের সরকারি কর্মীদের এখন শুধু কোভিড সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রশিক্ষণ দেয়াই যথেষ্ট নয়। কর্মক্ষেত্রে এবং পরিবার-প্রতিবেশে কোভিড পজিটিভ মানুষ থাকবেন, কী করে স্বাভাবিক জীবন-জীবিকার সব কর্তব্য পালন করা যায়, সে বিষয়েও তাদের অবহিত করা চাই।

কারণ কোভিড সহজে যাবে না। বার বার মিউটেশন মানেই নতুন নতুন স্ট্রেন, সংক্রমণের ঢেউ বার বার। আগে থাকতে যুদ্ধের রূপরেখা ঠিক করা থাকলে পালে বাঘ পড়লে খাঁচাবন্দি করতে সময় লাগে কম। তাই প্রয়োজন নানা প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট কোভিড-বিধি। স্কুলে একজন শিক্ষার্থী আক্রান্ত হলেই কি গোটা স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে?

একজন কর্মী আক্রান্ত হলেই স্তব্ধ হবে গোটা দপ্তর? এতদিনে বোঝা গিয়েছে যে, স্কুল বন্ধ রাখলে শিশুরা নিরাপদ, এই ধারণাও একটা সময়সীমার পরে আর কাজ করে না। গত দুবছরে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের। লেখাপড়া তো বটেই, স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। ঘরে থেকে শিশুদের স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে।

সংক্রমণ সত্ত্বেও কাজ চালিয়ে যাওয়া যায়, এর একটা উদাহরণ তো চোখের সামনেই রয়েছে— হাসপাতাল। অসংখ্য ডাক্তার আক্রান্ত হচ্ছেন, তা সত্ত্বেও চিকিৎসা পরিষেবা চালু থাকছে। নানা কৌশল বের করা হচ্ছে। এখন যেমন স্বাস্থ্য দপ্তর ব্যবস্থা করেছে যে, মেডিসিন, স্ত্রীরোগ, সার্জারি ও অন্য ক্লিনিক্যাল বিভাগে সব ডাক্তার একসঙ্গে রোগী না দেখে, ভাগ করে রোগী দেখবেন।

অসুস্থতার জন্য চিকিৎসকের অভাব কমাতে ননক্লিনিক্যাল বিষয়ের ডাক্তাররাও এগিয়ে আসবেন। জুনিয়রদের পাশাপাশি সিনিয়ররাও আর একটু দায়িত্ব নিন। কোভিড ও ননকোভিড ইমার্জেন্সি শুধু নয়, ফিভার ক্লিনিকে, সাধারণ আউটডোরে এই চিকিৎসকদের কাজে লাগানো হোক। প্যারামেডিক্যাল কর্মীরা টিকা দিতে, কোভিড টেস্ট করতে, চিকিৎসাতে ডাক্তারদের সাহায্য করতে পারেন অনেকটাই। টিকাকরণের দায়িত্ব নিন জনস্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞরাও।

করোনার অব্যাহত ঢেউ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা, সুচিন্তিত উদ্যোগ। এই ঢেউটা পার করে দিতে পারলেই কোভিড-পর্ব সামাল দেয়া যাবে, এই মনোভাব নিয়ে যদি কাজ করে সরকার বা নাগরিকসমাজ, তা হলে বুঝতে হবে, মহামারি থেকে আমরা আসলে কিছুই শিখিনি।

লেখক: প্রবন্ধকার-সাবেক ছাত্রনেতা, রম্য লেখক।

শেয়ার করুন

নাসিক নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ

নাসিক নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ

ভোটের দিন সকাল পর্যন্ত এমনকি ভোট প্রদান শেষ না হওয়া পর্যন্তও চলে ভোটের হিসাব-নিকাশ। রাজনীতিকদের হিসাব-নিকাশ আর জনগণের হিসাব-নিকাশ যার পক্ষে যায়, শেষ হাসি তিনিই হাসেন। নাসিক নির্বাচনে শেষ হাসি কে হাসবেন সেটা শুধু নাসিকবাসী নয়, পুরো দেশবাসীই দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। বিজয়ী যিনিই হোন না কেন, মূল বিজয়টি যেন গণতন্ত্রেরই হয়।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ভোট নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ততই বাড়ছে। নাসিক নির্বাচনে পাওয়া যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের আমেজ।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী। ২০১১ সালে শেখ হাসিনা তাকে মনোনয়ন দেননি। দিয়েছিলেন শামীম ওসমানকে। সেবার স্বতন্ত্র প্রার্থী আইভী ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৮০ হাজার। আর শামীম ওসমান পেয়েছিলেন ৮০ হাজার। সরকারদলীয় প্রার্থীর চেয়ে ১ লাখ ভোট বেশি পেয়েছিলেন আইভী। আইভী ২০১১ সালে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। তাই, পরবর্তী সময়ে নেত্রীও তাকে কাছে টেনে নিয়েছেন। নিয়েছেন তার প্রমাণ পরবর্তী নির্বাচনে আইভীর হাতেই নৌকা তুলে দেয়া।

২০১১ সালে নাসিক নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তৈমূর আলম খন্দকার। কিন্তু ভোটের আগের রাতে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। তখন তৈমূরের কিছু ভোট আইভীর বাক্সে পড়ায় শামীমের চেয়ে তিনি এখানেও এগিয়ে যান। এছাড়া আওয়ামী লীগের শামীমবিরোধী ভোট ও সাধারণ ভোটও আইভীর বাক্সে পড়ায় তিনি সহজেই জয়ী হন।

২০১৬ সালে শামীম প্রার্থী ছিলেন না। আওয়ামী লীগের পুরো ভোটই আইভীর পাওয়ার কথা। নারায়ণগঞ্জে ভোটের রাজনীতিতে দুটি ধারা বিদ্যমান। একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন শামীম ওসমান। আরেকটি অংশের নেতৃত্বে আছেন সেলিনা হায়াৎ আইভী।

২০১৬-তে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন শাখাওয়াত হোসেন। তিনি বিজয়ী হতে পারেননি কিন্তু শেষপর্যন্ত নির্বাচনে ছিলেন। ভোট পেয়েছিলেন ৯৬ হাজার। আর আইভী পেয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার। তখন শামীম নির্বাচনে না থাকায় তার ভোট বিভক্ত হয়ে কিছু গিয়েছে আইভীর বাক্সে আর বাকি শাখাওয়াতের বাক্সে।

সম্প্রতি শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলন করে আইভীকে সমর্থন করার কথা বলেছেন। কিন্তু সংবাদ সম্মেলন করা মানে শামীমের সব আইভী পাওয়া নয়। একই দলের দুই নেতা কখনই একজন আরেকজনকে একনিষ্ঠ সমর্থন করেন না। যদি তাই হতো তবে শামীমকে ম্যানেজ করার জন্য কেন্দ্র থেকে নানককে পাঠাতে হতো না।

একটি বড় দলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে ইউপি নির্বাচনেও আমরা দলীয় প্রার্থী ও নেতাদের মধ্যে ভোটের মাঠে টানাপোড়েন দেখি। এই টানাপোড়েনের মধ্যে সাধারণত বিরোধীপক্ষই সুবিধা নেয়।

এবারের ইউপি নির্বাচন তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ইউপি নির্বাচনে মনোনীতদের বিদ্রোহী প্রার্থীরা সেভাবে সমর্থন না দেয়ায় আওয়ামীবিরোধী প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেশি জয়ী হয়েছে। ইউপিতে আওয়ামী লীগ কৌশলগত কারণেই এবার বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, এবারের নির্বাচনে ২০১৬ সালেরই পুনরাবৃত্তি হওয়ার কথা। কারণ, ২০১৬ সালে শামীম ওসমান প্রার্থী ছিলেন না। এবারও তিনি নেই। বিএনপি সেবার মাঠে ছিল, এবারও আছে। বিএনপির শাখাওয়াতের চেয়ে তৈমূর হয়তো আরও জনপ্রিয়। তবে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তৈমূর শাখাওয়াতের চেয়ে বেশি ভোট (৯৬ হাজারের চেয়ে বেশি) পাবেন কি না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

শামীম প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে যদিও নেতাকর্মীদের আইভীর পক্ষে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন, তবে গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী তার নেতাকর্মীদের সেভাবে আইভীর পক্ষে মাঠে দেখা যায়নি। শামীমের সংবাদ সম্মেলনের পরে আইভী যদিও শামীমের সমালোচনায় অতটা সরব নন, কিন্তু তারপরও তিনি অভিযোগ করেছেন যে, নেতাকর্মীরা সেভাবে মাঠে নেই।

২০১৬ সালে শামীমের ভোট তার প্রার্থিতার অনুপস্থিতিতে বিভক্ত হয়েছে, সেটাই স্বাভাবিক। এবারও যদি সে রকম হয় সেক্ষেত্রেও আইভীর পাল্লাই ভারী হওয়ার কথা। ২০১৬ সালেও তাই হয়েছিল। জনপ্রিয়তার কারণে তৈমূর শাখাওয়াতের চেয়ে বেশি ভোট পেলে ভোটের ব্যবধান কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু তাতে জয়-পরাজয়ের ফলাফল ভিন্ন হওয়ার কথা নয়। কারণ, ২০১১ ও ২০১৬ সালে উভয় নির্বাচনেই আইভী ৮০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। তাই হাতির জোয়ার হলেও তাতে নৌকার গতি কিছু কমার কথা নয়।

শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলন করে নৌকাকে সমর্থনের কথা বললেও তার সমর্থকরা সেভাবে মাঠে নেই যা আগেই বলা হয়েছে। উপরন্তু আইভী অভিযোগ করেছেন যে, ‘আমাকে পরাজিত করার জন্য অনেক পক্ষ এক হয়ে গেছে। পক্ষগুলো ঘরের হতে পারে, বাইরেরও হতে পারে। সবাই মিলেমিশে চেষ্টা করছে কীভাবে আমাকে পরাজিত করা যায়।’ তার অভিযোগের তির মূলত শামীমের দিকে। অভিযোগ সত্য-মিথ্যা প্রমাণসাপেক্ষ। তবে, তাকে পরাজিত করতে হলে সব পক্ষেরই এক হতে হবে বলেই মনে হয়।

সব পক্ষ মানে মূলত শামীম ও তৈমূর। কিন্তু শামীম আইভীকে হারাতে চাইলেও যে তার সব ভোট নৌকার বিপক্ষে (আইভীর বিপক্ষে) যাবে বিষয়টি সেরকম নয়। কারণ, শামীমের সব নৌকাসমর্থক হাতিকে ভোট দিতে যাবে না। তারা হয়তো নৌকায় বা আইভীকে ভোটদানে বিরত থাকতে পারে। কিন্তু তারা সবাই হাতিকে ভোট দিতে যাবে না। সেক্ষেত্রে আইভীর ভোট কিছু কমলেও হাতির ভোট বাড়বে না।

আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ সমর্থকরা যা-ই হোক না কেন নৌকার গলুইতেই আশ্রয় নেবে, তাও হাতির পিঠে চড়বেন না। একইভাবে ধানের শীষের একনিষ্ঠ সমর্থকরা হাতির পিঠে না উঠলেও নৌকায় চড়বে না। তবে নৌকা ও ধানের শীষের একনিষ্ঠ সমর্থকদের বাইরেও অনেক ভোটার আছেন যাদেরকে আমরা বলি ফ্লোটিং ভোটার। যেকোনো নির্বাচনের ফলাফলে এই ফ্লোটিং ভোটারই বড় ফ্যাক্টর। নাসিক নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হবে না।

ফ্লোটিং ভোটারের সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন ভোটার। জয়-পরাজয়ে এদেরও রয়েছে বড় ভূমিকা। এছাড়া নারী ভোটাররা হয়তো আইভীকেই বেছে নেবে। নতুন ভোটাররা রাজনীতিবিমুখ তবে রাজনীতিতে অজ্ঞ নয়। তারা সবকিছু বুঝেশুনেই ভোট দেবে।

একটি নির্বাচনে ভোটাররা অনেক কিছু বিবেচনা করে ভোট দেয়। কেউ কেউ প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা বিবেচনা করে আবার কেউবা বিবেচনা করে প্রতীক। এছাড়া ব্যক্তি-ইমেজও বিবেচ্য।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরেও নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টিও একটি ফ্যাক্টর। সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ ও সেই সঙ্গে ওসমান পরিবারের সদস্য ও শামীম ওসমানের বড় ভাই। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শুধু শামীম ওসমানই গুরুত্বপূর্ণ নন, ওসমান পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ। নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ওসমান পরিবার ও চুনকা পরিবার দুটোই গুরুত্বপূর্ণ।

নাসিম, সেলিম ও শামীম ওসমানের দাদা এম ওসমান আলী আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আর তাদের বাবা একেএম শামসুজ্জোহা বাংলাদেশের প্রথম সংসদের সদস্য। শামীম ওসমান নিজে ১৯৯৬ সাল থেকে সংসদ সদস্য। আর আইভীর বাবা আলী আহাম্মদ চুনকা স্বাধীনতার পর থেকে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম চেয়্যারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে আইভী তারই উত্তরাধিকার। কাজেই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দুই পরিবারই গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে তৈমূর আলম খন্দকারের রাজনীতি শুরু আইভীর বাবা আলী আহাম্মদ চুনকার হাত ধরে। আইভী তৈমূরকে চাচা বলেই সম্মোধন করেন।

কাজেই নাসিকের লড়াইটা প্রকাশ্যে যদিও চাচা-ভাতিজির লড়াই। কিন্তু পর্দার অন্তরালে চলমান ভাই-বোনের (শামীম আইভীকে বোন বলেই সম্মোধন করেন) লড়াইয়ের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করে চাচা-ভাতিজির লড়াইয়ের ফলাফল। তাই এ লড়াইয়ে ওসমান পরিবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।

দলীয় কারণে শামীম ওসমান প্রত্যক্ষভাবে আইভীর বিপক্ষে যেতে না পারলেও সেলিম ওসমানের সে সমস্যা নেই। আর জাতীয় পার্টি (জাপা) যদিও জোটবদ্ধভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিন্তু সেটা কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে। মাঠের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির কাছাকাছি অবস্থান করে। সে হিসেবে ওসমান পরিবারের সমর্থনের একটি অংশ তৈমূরের পক্ষেই যাওয়ার কথা।

সেলিম তৈমূরের পক্ষে না গেলেও জাপার সমর্থন যে নৌকায় যাবে না তা মাঠের প্রচারণায়ও স্পষ্ট। জাপার মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা তৈমূরের সঙ্গেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সেলিম ওসমান প্রকাশ্যভাবে তৈমূরকে সমর্থন না দিলেও তার নীরব সমর্থন রয়েছে। সেটাও যদি না হয়, অন্তত সেলিমের প্রকাশ্য সমর্থন যে আইভীর জন্য নেই, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেলিম প্রকাশ্যভাবে আইভীর বিরোধিতা করবেন বলে মনে হয় না।

জোটের রাজনীতির কারণেই তিনি আওয়ামী লীগের কাছেও দায়বদ্ধ। এছাড়া আগামী নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির প্রশ্নেও সেলিম ওসমান জোটের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগের পছন্দকে অবজ্ঞা করবেন না। প্রশ্ন আসতে পারে, আগামী নির্বাচনে জাপা যে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই জোট করবে সেটিতো নিশ্চিত না। ঠিক একই কারণে তিনি বিএনপির তৈমূরেরও বিরোধিতা করবেন না, জোট বিএনপির সঙ্গেও হতে পারে।

মূল কথা, ওসমান পরিববার কৌশলগত কারণেই আইভীর প্রকাশ্য বিরোধিতা করছে না। অথবা বলা যায়, অন্তরালে আইভীর বিরোধিতা করলেও প্রকাশ্যে নৌকারই সমর্থন করছেন। কৌশল হিসেবে এটি মন্দ নয়। কারণ, হারলে আইভী হারবেন, জিতলে নৌকা জিতবে-শামীম ওসমান এ কৌশলেই এগোচ্ছেন। সে কারণেই তার মাঠকর্মীরা ‘আইভী আইভী’ না করে ‘নৌকা নৌকা’ করছে।

এ নির্বাচনে আইভীকে ডুবিয়ে কি নৌকা ভাসিয়ে রাখা যাবে? বাহ্যিক দৃষ্টিতে আইভীর ভরাডুবিতে শামীমের লাভ হলেও নৌকা ডুবিয়ে শেষমেষ তার ভেসে থাকাও কঠিন হতে পারে। শামীম ওসমান অন্তত সেটা চাইবেন না। আর দুই ভাই দুই দলের হলেও তাদের পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত মজবুত। হাতিকে জেতাতে বা আইভীকে হারাতে সেলিম ওসমানও ভাইকে ডোবাবেন না। নৌকা ভাসলে ভাসবে সবাই। সে কারণেই দুভাই আইভীকেই নীরব সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।

দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা পরপর দুবার আইভীকে মনোনয়ন দিয়েছেন। এবার তিনি শুধু মনোনয়নই দেননি আইভীর জন্য নানককে পাঠিয়ে নারায়ণগঞ্জে আইভী বিরোধিতার অবসান চেয়েছেন। সবাইকে বিরোধিতা পরিহার করে আইভীর জন্যই কাজ করতে বলেছেন। শেখ হাসিনা নানককে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছেন, ‘আমার আইভীর কী খবর?’ কাজেই আইভীর ভালো খবরের জন্য স্থানীয় সব নেতাকর্মীকেই যে কাজ করতে হবে শেখ হাসিনা সে বার্তাটি পরিষ্কার করেই বলেছেন। শামীম ওসমান বা স্থানীয় নেতাকর্মীরা নিশ্চয় শেখ হাসিনার আইভীর ভালো খবরের জন্যই কাজ করবে।

সব কথার শেষ কথা- রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। ভোটের দিন সকাল পর্যন্ত এমনকি ভোট প্রদান শেষ না হওয়া পর্যন্তও চলে ভোটের হিসাব-নিকাশ। রাজনীতিকদের হিসাব-নিকাশ আর জনগণের হিসাব-নিকাশ যার পক্ষে যায়, শেষ হাসি তিনিই হাসেন। নাসিক নির্বাচনে শেষ হাসি কে হাসবেন সেটা শুধু নাসিকবাসী নয়, পুরো দেশবাসীই দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। বিজয়ী যিনিই হোন না কেন, মূল বিজয়টি যেন গণতন্ত্রেরই হয়। সেটি সম্ভব শুধু একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন

টিএসসির অনুষ্ঠানে হামলা ও সাংস্কৃতিক দায়

টিএসসির অনুষ্ঠানে হামলা ও সাংস্কৃতিক দায়

একসময় মিছিল-সমাবেশে হামলা হতো, এখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা; এটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্বাধীনতার পক্ষের সরকারের আমলে সংস্কৃতিচর্চায় বাধা আাসা কাঙ্ক্ষিত নয়।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে কাওয়ালি সংগীত অনুষ্ঠানে হামলা হয়েছে। কেন হামলা হয়েছে তার কারণও স্পষ্ট নয়। তবে হামলার অভিযোগ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ আসার পরে এই সংগঠনটি সাংগঠনিক কাজের চেয়ে অসাংগঠনিক কাজে বেশি মনোযোগ দেয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। কিন্তু সবার প্রশ্ন একটাই কেন এই হামলা? কাওয়ালরা সাধারণত সুফিবাদী ধারার সঙ্গে যুক্ত। এই সুফিবাদীদের বিরোধীরা বিভিন্ন সময়ে কাওয়ালদের ওপর হামলা করেছে। ভারত উপমহাদেশের একটি জনপ্রিয় সংগীতধারা।

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান― তিন দেশেই এ সংগীত প্রচলিত। কাওয়ালদের সঙ্গে উগ্রবাদীদের কোনো সংশ্লিষ্টতার থবর পাওয়া যায়নি। কাওয়ালরা সাম্প্রদায়িকও নন। তারা উদার ও সহজিয়া ধারার গায়ক। তাছাড়া এখানে মুর্শিদি-ভাণ্ডারি গানও হওয়ার কথা ছিল। মুর্শিদি-ভাণ্ডারি সংগীত উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে যায় না। দুটির অবস্থান পরস্পর বিপরীত ধারায়। ইসলামের সুফিধারার সঙ্গে যাদের বিরোধ এই হামলা তারা করতে পারে। ২০১৬ সালে পাকিস্তানের করাচিতে বিশ্বখ্যাত কাওয়াল আমজাদ সাবরিকে যারা হত্যা করে সেই হত্যার দায় স্বীকার করেছিল পাকিস্তানি তালেবান। তদন্তে এর সঙ্গে লস্কর-ই-ঝাংভির সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। এই সংগঠনের দুজন সদস্যকে বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় ২০১৮ সালে। তারা স্বীকার করে যে, তারা সাবরিকে হত্যা করেছে।

বাংলাদেশে এই ধারার সমর্থক আছে। তারা এই হামলা চালিয়েছে বলে এখন পর্যন্ত কেউ বলেনি। তাহলে এই হামলার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের সঙ্গে কাওয়ালদের মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়। তাহলে কাওয়ালি গানের ওপর বিদ্বেষ নাকি কারো ঘরে কেউ আগুন দিয়ে খই ভেজেছে? ঘটনার অন্তরালে চাঁদাবাজির দ্বন্দ বলে শোনা গেছে। আসলে কি তাই? তার মানে আন্তদলীয় কোন্দলে এই সংস্কৃতির ওপর হামলা হবে কোন যুক্তিতে?

১৯৭১ সালে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। সেসময় পাকিস্তানিদের কর্মকাণ্ডে নারকীয়তার কথা ভাবলে আজও আমরা শিউরে উঠি। পাকিস্তানিদের উপরে তাই বাঙালিদের বিরূপ মনোভাব কোনোকালে মোছার নয়। এ ক্ষত আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি যুগ যুগ ধরে। আরও কত বছর বয়ে বেড়াতে হবে তা জানে না কেউ। তার মানে এই নয় যে, উর্দু ভাষার সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ আছে।

কাওয়ালি উর্দুতে গীত হয় সেটা কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। পৃথিবীর সব ভাষারই যা কিছু লালিত্য, যা কিছু চিত্ররূপময়― সবই সংস্কৃতির স্বরূপের এক একটি বিন্যাস। আমরা এখনও মেহেদী হাসান, নূরজাহানের গানে বিমোহিত হই। সুরাইয়া মুলতানীকর, সালমার উর্দু গানে আমরা প্রাণের উচ্ছ্বাস খুঁজে নিই। বাংলাদেশের শিল্পী রুনা লায়লা অথবা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আলমগীরের উর্দু গান শুনতে সবাই আগ্রহী।

সাদত হাসান মান্টো, ইসমত চুগতাই, কৃষণ চন্দর, আল্লামা ইকবালসহ খ্যাতিমান লেখকদের লেখা পাঠ করে ঋদ্ধ হই। পাকিস্তানের অজস্র লেখক রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পক্ষ নিয়েছিল। আমরা তাদের কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি। তাতে কি আমার দেশপ্রেমের কোনো ঘাটতি দেখা যাচ্ছে? আমাদের বাংলা ভাষার ভেতরে যে পরিমাণ উর্দু শব্দ আছে আমরা সেসব কি বাদ দেব?

ভাষা ও সংস্কৃতি- প্রবহমান নদীর মতো। যেখানে বাধা পাবে সেখানে আটকে যাবে। আমাদের শাস্ত্রীয় সংগীতের বড় অংশটি উর্দু শব্দে বিন্যস্ত। আমাদের পুরান ঢাকায় উর্দুতে কথা বলে এমন অজস্র পরিবার আছে। উর্দু কবিদের একটা গোষ্ঠীও আছে। কাওয়ালিরও ভালো শিল্পী আছে।

আমরা কি সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হবো? সেটা কোনো ভালো কাজ? একটা দেশে কত ভাষা কত সংস্কৃতি থাকে। ভাষা- সংস্কৃতির এই বৈচিত্র্য দেশের সার্বিক সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করে। আমি যে কথা বলছি সে কারণে যদি কাওয়ালির ওপর হামলা হয়ে থাকে তাহলে যারা করেছে, তারা সম্ভবত কাওয়ালি সংগীতের ইতিহাস জানে না। তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা ভাষা আন্দোলনের মর্ম কিছুই বোঝে না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাওয়ালি সংগীত অনুষ্ঠান পণ্ড করার কাজটা ভীষণ অন্যায়। এটা কেবল কাওয়ালি অনুষ্ঠানের ওপর হামলা নয়, এ হামলা বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির ওপরও। যেটা কোনো মতেই কাম্য হতে পারে না। এর মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বৃহত্তম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ-আবহের জন্য ক্ষতি হলো। যার দায় পুরোটাই হামলাকারীদের।

১৯৫২ সালে আমাদের যে মহান ভাষা আন্দোলন, তা ছিল পাকিস্তানের ভাষাগত রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের বিপক্ষে, সেটা উর্দুর বিপক্ষে নয়। তার নিষ্পত্তি সেইসময় হয়ে গেছে। ভাষা কোনো অপশক্তি নয়। ভাষার কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কিংবা ভৌগোলিক সীমানা থাকে না। ভাষা কারা কীভাবে ব্যবহার করছে সংকট সেখানে। সংস্কৃতি, সংগীত চিত্রকলা এক কথায় সৃষ্টিশীল কর্মের কোনো বন্ধন বা দেশ নেই, সীমানা নেই, কাঁটাতার নেই।

সুরের যেমন কোনো দেশ থাকে না, পাখির ডাক, নদীর বহতার সঙ্গে যেমন কোনো সীমানাপ্রাচীর থাকে না ঠিক তেমনি ভাষা সংস্কৃতির বিস্তারেও কোনো বাধা নেই -থাকতে পারে না। তবে হামলাকারীদের যেসব তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে তাতে মনে হচ্ছে না ভাষাগত সমস্যার কারণে এই হামলা হয়েছে। এই হামলার নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ আছে। সূক্ষ্ম কোনো কারণ। সেই কারণটি এখনও জানা নেই। অচিরেই হয়তো জানা যাবে। এটা বোঝা গেছে যে, পুরোনো একটা অশুভ চক্র নানাভাবে- নানা মাত্রায় জেঁকে উঠছে। এদের নিবৃত্ত করতে সরকারের উচিত ছিল হামলাকারীদের খঁজে বের করে সংস্কৃতির আওতায় আনা। কারণ ইতোমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি টিএসসি, শিল্পকলা- সংস্কৃতিচর্চার জায়গা সংকুচিত হয়ে আছে। শীতের শুরুতে যেসব স্থানে সাংস্কৃতিক পার্বণ লেগে থাকত সেগুলো আর আগের মতো হচ্ছে না।

আমাদের সাংস্কৃতিক দলের সব নেতারা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা নিতে ব্যস্ত। এরা এখন মস্ত ঠিকাদার একেকজন। সংস্কৃতিচর্চার জায়গাটা সংকুচিত হওয়ার কারণে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলার সাহস পাচ্ছে এরা। এই হামলার প্রতিবাদ করার কণ্ঠটাও ক্ষীণ। কারা প্রতিবাদ করবে? ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’ রবীন্দ্রসংগীতের লাইনের মতো এ ঘটনা হলে সেটা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।
একসময় মিছিল-সমাবেশে হামলা হতো, এখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা; এটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্বাধীনতার পক্ষের সরকারের আমলে সংস্কৃতিচর্চায় বাধা আাসা কাঙ্ক্ষিত নয়।

কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির ফলাফলে এসব ঘটনা ঘটছে। কারণ কর্তৃত্ববাদ প্রচলিত রাজনীতির মধ্যে সীমিত থাকে না। তা ক্রমাগতভাবে বিস্তার লাভ করে। রাজপথের রাজনীতি, গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যমের ওপরে নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতায় এখন সাংস্কৃতিকচর্চায় তা প্রসারিত হচ্ছে। মতপ্রকাশের, কথা বলার, সমাবেশ করার স্বাধীনতা সীমিত হয়ে গেলে সাংস্কৃতিকচর্চার জায়গা অবারিত থাকবে এমন মনে করার কারণ নেই; আমরা কি এটাই ভেবে নেব?

এই হামলার ব্যাখ্যা এবং প্রতিবাদের জায়গাটা যেভাবে নেতিয়ে গেছে সেটা কোনো ভালো ঘটনা নয়। সরকারের সবাই গুণগান করবে সেটা সরকারের জন্য যতটা ক্ষতির তার চেয়ে বেশি দেশবাসীর জন্য। যারা বহুদিন পর স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধে একটি শক্তিকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় পেয়ে আনন্দিত। আমরা চাই এই হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কেবল টিএসসিতে নয়― সারা দেশে সব জায়গায় কাওয়ালি হবে, কীর্তন হবে, গণসংগীত হবে, ব্যান্ড সংগীত, রবীন্দ্র-নজরুল সংগীত সব কিছু চলবে। এ সময় না চললে আর সময় কোথায়?

লেখক: গবেষক-প্রবন্ধকার, সাংবাদিক।

শেয়ার করুন

খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার দাবি, বাস্তবতা ও বিএনপির আন্দোলন

খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার দাবি, বাস্তবতা ও
বিএনপির আন্দোলন

গত ৯ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়াকে সিসিউ থেকে সাধারণ কেবিনে নেয়া হয়েছে। তার মানে তার শারীরিক অবস্থা আগের চাইতে ভালো হয়েছে। দেশে তার চিকিৎসা নেই এই দাবিটি এখন আর জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। এই সত্যটি বোঝার পর অনেকেই বিএনপির এতদিনকার দাবিটি যে সত্য ছিল না সেটিই ধরে নিতে পারে। এর মানে হচ্ছে বিএনপি নেতৃবৃন্দের অনেক কথাই রাজনৈতিক, দলীয় ।

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার’ রায়ে ২০১৮ সাল থেকে কারাভোগ করছেন। তার শারীরিক কিছু রোগের কারণে প্রায় প্রথম থেকেই তাকে কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হয়। যদিও ব্যক্তিগতভাবে তিনি এবং তার দল বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী ছিলেন না, ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার ব্যাপারে অনড় ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালেই চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল। তখন অবশ্য তার চিকিৎসার ব্যপারে গঠিত মেডিক্যাল টিম নিয়মিত তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে গণমাধ্যমে বিবরণ জানাত।

বিএনপি সেসব প্রতিবেদন গ্রহণ করত না। তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে প্রতিদিনই বিএনপি নেতৃবৃন্দ বেশ উদ্বেগজনক খবর গণমাধ্যমে প্রচার করত- যা বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত মেডিক্যাল টিমের প্রতিবেদনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। যা জনমনে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। যারা সরাসরি তার শারীরিক অবস্থা প্রতিদিন তদারকি করতেন তারা সত্য বলছেন, নাকি যারা শারীরিক অবস্থা না দেখে কথা বলছিলেন তারা- এ নিয়ে একধরনের বিভ্রান্তি চলছিল। মূলত এটি রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে বিএনপি রাজনৈতিক সুবিধা লাভের অবস্থান থেকেই কথা বলছিল, যা সবাই বিশ্বাস করতে পারছিল না।

বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসার জন্য গঠিত ডাক্তারি টিম তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর কোনো তথ্য দিতে পারেন না, এটি চিকিৎসক-মহল বিশ্বাস করলেও রাজনীতিতে সেই বিশ্বাসের অবস্থান খুব একটা পাত্তা পায় না- এটিই তখন মনে হয়েছিল। যারা বিএনপির সমর্থক কিংবা সরকারবিরোধী চিন্তাভাবনা করেন তারা গঠিত ডাক্তারি টিমকেও সরকারবিরোধী মনোভাব থেকে দেখার বাইরে খুব একটা যেতে চাননি। বিএনপি সেই অবস্থানটিকেই কাজে লাগিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি ও সরকারের বিরুদ্ধে মনোভাব জাগ্রত করার প্রচারণায় তখন তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নানা ধরনের তথ্য প্রদান করত।

বিএনপিপন্থি ডাক্তারদের দেয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিএনপি নেতৃবৃন্দ বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে যে ধারণা তখন প্রতিদিন গণমাধ্যমে অব্যাহত রেখেছিল সেটি যদি পুরোপুরি সত্য হতো তাহলে বেগম খালেদা জিয়ার বেঁচে থাকা নিয়েই এতদিন কেউ যদি সন্দেহ পোষণ করেন তাহলে খুব বেশি অমূলক হবে না। তবে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকরা তার চিকিৎসাদানে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে এবং জাতিকে আশ্বস্ত করেছে যে তার যেসব জটিল রোগ রয়েছে সেগুলোর চিকিৎসা বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া সম্ভব এবং সেগুলো তারা নিজেরা দিয়ে যাচ্ছেন। সুতরাং চিকিৎসক দল দেশবাসীকে তার সুচিকিৎসার ব্যাপারে সবসময় আস্থা রাখার অনুরোধ করেছিল।

তাদের অনুরোধ সবাই বিশ্বাস করেছে এমনটি শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যায় না। সন্দেহপ্রবণরা তাতে আস্থা রাখেনি আবার যারা চিকিৎসাবিজ্ঞানের নৈতিকতা সম্পর্কে ধারণা রাখে এবং বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসার মান সম্পর্কে অবগত আছে তারা চিকিৎসকদের বক্তব্য বিশ্বাস করত। কিন্তু বিএনপির কাউকেই সেটি বিশ্বাস করানো যায়নি। তারা একবাক্যে তা প্রত্যাখ্যানই শুধু করত না, ইউনাইটেড হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেয়ারও দাবি অনবরত করতে থাকে। কিন্তু কখনও তারা বেগম খালেদা জিয়ার একমাত্র বিদেশেই চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে এমনটি দাবি করেনি।

২০২০ সালের করোনার সংক্রমণ বাংলাদেশে ধরা পড়ার পর বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বেগম খালেদা জিয়াকে বিশেষ ব্যবস্থায় হাসপাতাল থেকে মুক্তি দিয়ে বাসায় চিকিৎসা গ্রহণের অনুমতি প্রদানের যে আবেদন করে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনি বিধান অনুযায়ী সেই ব্যবস্থায় অনুমতি দেন। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ পরিবারের অনুরোধে নির্বাহী আদেশে তার সাজা স্থগিত রেখে তাকে প্রথমে ৬ মাসের জন্য মুক্তি দেয় সরকার। পরে ওই আদেশ ৬ মাস করে বাড়ানো হয়। তিনি গুলশানস্থ তার বাসায় এই সময় অবস্থান করতেন।

উক্ত বাসায় তিনি একবার করোনা আক্রান্ত হলে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে যাওয়ার কিছুদিন পর তাকে আবারও হাসপাতালে অন্য রোগের চিকিৎসার জন্য ভর্তি হতে হয়। এরই মধ্যে বিএনপি তাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য মুক্তি দেয়ার দাবি জানিয়ে বিভিন্ন সভা-সমিতি ও জনমত সৃষ্টি করতে থাকে। গত ১৩ নভেম্বরের তিনি আবার এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিউতে ভর্তি হন। সেখানে তার চিকিৎসা চলতে থাকে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে তার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের কোনো চিকিৎসক টিমের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়নি।

বিএনপি নেতৃবৃন্দ গণমাধ্যমে তার শারীরিক অবস্থার প্রতিদিনই অবনতি হচ্ছে বলে জানাচ্ছিলেন। কিন্তু বিএনপির কোনো নেতৃবৃন্দ এভারকেয়ার হাসপাতালে বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যাওয়ার সুযোগ পেতেন না বলে গণমাধ্যমে খবর প্রচারিত হয়। তখন থেকে দাবি করা হচ্ছিল যে তার চিকিৎসা এদেশে কোনোভাবে সম্ভব নয়।

একমাত্র বিদেশে উন্নত চিকিৎসা দিয়েই তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে পারে বলে দাবি করা হয়। বিএনপির নেতৃবৃন্দ তিনটি দেশের নাম উল্লেখ করে তাকে সেখানে পাঠানোর দাবি করছিলেন। দেশ তিনটি হচ্ছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্র। কেন অন্য কোনো দেশে নয় সেটি অবশ্য তারা বলতেন না। শুধু বলা হতো যে তিনটি দেশেই নাকি সর্বাধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন যাদের কাছে তিনি চিকিৎসা পেলেন সুস্থ হতে পারেন।

এভারকেয়ার হাসপাতালের চিকিৎসকদের কোনো মন্তব্য কেউ কখনও জানতে পারেননি। এ নিয়ে বিএনপির অবস্থান বেশ রহস্য সৃষ্টি করে। গত নভেম্বর থেকেও বিএনপি নেতৃবৃন্দ বেগম খালেদা জিয়ার স্টমাকে রক্তক্ষরণের যে খবারখবর প্রতিদিন দিচ্ছিলেন তাতে তার অবস্থা আঁৎকে ওঠার মতোই বিশ্বাস করার কথা মনে হতে থাকে। বিএনপি নেতৃবৃন্দ তখন ক্রমাগত দাবি করছেন যে, তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছেন। তার চিকিৎসা এদেশে আর সম্ভব নয়, তাকে এখনই এয়ারবাসযোগে বিদেশে পাঠানোর অনুমতি দিতে তারা সরকারের নিকট দাবি জানাতে থাকেন। বিএনপির এসব দাবি নিয়ে সমর্থক নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও বাইরের মানুষ বিষয়টি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগার তেমন বড় ধরনের কোনো অবকাশ ছিল না।

বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত চিকিৎসক টিমের কোনো বক্তব্য যেহেতু ছিল না তাই সরকারের কোনো হাত বা বেহাতের বিষয় অনুমান করার সুযোগ ছিল না। এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক টিমের কোনো বক্তব্য না দিয়ে বিএনপি পুরোপুরি রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টির লক্ষ্যেই বেগম খালেদা জিয়া ও তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বক্তব্য দিচ্ছে এটি সবার কাছে স্পষ্ট হতে থাকে। বিএনপির এসব বক্তব্যে নেতাকর্মীরা আয়োজিত বিভিন্ন সমাবেশে জড়ো হতে থাকে।

বিএনপি নেতৃবৃন্দ সেগুলোতে সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক দিতে থাকেন। বেগম খালেদা জিয়ার ভাইবোন প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে দুবার আবেদন করেছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয় যে, যেহেতু তিনি সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত তাই একই আইনের সরকারের ভিন্ন কোনো সিদ্ধন্ত নেয়ার সুযোগ নেই।

সরকার থেকে বলা হয়েছিল যে, এ ব্যাপারে পরিবারের সদস্যগণ সর্বোচ্চ আদালতের কাছে জামিনের আবেদন করতে পারেন কিংবা রাষ্ট্রপতির কাছে। কিন্তু তার পরিবারের সদস্যরা এবং দলীয়ভাবে বিএনপির উচ্চ আদালতে তার বিদেশে চিকিৎসার জন্য জামিন প্রার্থনা করে করে কোনো আবেদন করেনি, রাষ্ট্রপতির কাছেও কোনো প্রার্থনা জানানো হয়নি।

কেন তারা সর্বোচ্চ আদালত বা রাষ্ট্রপতির কাছে যাননি সেটির জবাব তারাই ভালো দিতে পারবেন। তবে আইন ও বিচারের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই মনে করছেন যে সরকার যখন বিএনপিকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে উচ্চ আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল তখন ধরেই নেয়া যায় যে ডাক্তারি রিপোর্ট, সুপারিশ এবং দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামত উচ্চ আদালত আইন ও বিধিসম্মতভাবে গ্রহণ করলে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস হয়তো এর বিরোধিতা করত না।

বিএনপির আইনজ্ঞরাও এই বিষয় সম্পর্কে কম জানেন না। কিন্তু বিএনপি উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন না হওয়ায় এবং ঘটনাবলির অবস্থা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে, বিএনপি বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে দেশে জনমত সৃষ্টি করতে অনেক বেশি আগ্রহী ছিল এবং প্রকৃত চিত্র জনগণকে বুঝতে দিতে চায়নি। সরকার বিষয়টি সম্পর্কে যে অবহিত ছিল না, তা নয়। বিএনপির মনোভাব, উদ্দেশ্য এবং তাদের অবস্থান সরকারের নিকট স্পষ্ট থাকায় মনে হচ্ছিল সরকার নিজস্ব অবস্থানে অনড় ছিল।

বিএনপি নেতৃবৃন্দ যেভাবে তার মৃত্যু ঘটলে সরকারের বিরুদ্ধে দেশে গণ-আন্দোলন, অভ্যুত্থনা সংঘটিত হওয়ার ‘জুজুর ভয়’ দেখাচ্ছিল সেটি জনগণ হয়তো ভালোভাবে না-ও জানতে পারে কিন্তু সরকারের কাছে বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার প্রতিদিনের খবরাখবর নিশ্চয়ই জানা থাকত সেকারণে কোনটা জুজুর ভয় কোনটা প্রকৃত ভয় সেই হিসাব সরকারের হয়তো ছিল। তবে নেতৃবৃন্দ বেগম খালেদা জিয়ার বিষয়টিকে নিয়ে সরকারের ওপর যে চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল সেটি সফল হয়নি।

একটি বিষয়ে বিএনপি কিছুটা সফল হয়েছে বলা চলে। বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এতদিন যে গা ছাড়া ভাব ছিল সেটি কাটিয়ে ওঠার একটি সুযোগ তারা নিয়েছে। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের শহরগুলোতে তারা জনসভা অনুষ্ঠিত করার মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর একটা সুযোগ তারা কাজে লাগিয়েছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা চাঙাভাব ফিরে এসেছে। তবে সেটিও আবার কিছুটা নেতিয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

গত ৯ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়াকে সিসিউ থেকে সাধারণ কেবিনে নেয়া হয়েছে। তার মানে তার শারীরিক অবস্থা আগের চাইতে ভালো হয়েছে। দেশে তার চিকিৎসা নেই এই দাবিটি এখন আর জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। এই সত্যটি বোঝার পর অনেকেই বিএনপির এতদিনকার দাবিটি যে সত্য ছিল না সেটিই ধরে নিতে পারে। এর মানে হচ্ছে বিএনপি নেতৃবৃন্দের অনেক কথাই রাজনৈতিক, দলীয় ।

এটিও তাই প্রমাণ করল। তাছাড়া এখন বিশ্বে যেভাবে ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়ছে তাতে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র বা জার্মানিতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া অনেকের জন্যই নিরাপদ নয়। বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা দেশে বসেই যতটা ভালোভাবে নেয়া যেতে পারে, ততটাই তার এবং তার দলের জন্য মঙ্গলজনক।

লেখক: গবেষক-অধ্যাপক।

শেয়ার করুন