আসছে রুই মাছের নতুন জাত ‘সুবর্ণ রুই’

আসছে রুই মাছের নতুন জাত ‘সুবর্ণ রুই’

নতুন উদ্ভাবিত এই রুই মাছ দ্রুত বাড়ে। এটি খেতে সুস্বাদু। দেখতে লালচে ও আকর্ষণীয়। মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ হলে দেশে প্রায় ৮০ হাজার কেজি মাছ বেশি উৎপাদন হবে।

দেশের বিজ্ঞানীরা রুই মাছের নতুন একটি জাত উদ্ভাবন করেছেন, যা ২০ শতাংশ বেশি উৎপাদনশীল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা জেনেটিক গবেষণার মাধ্যমে হালদা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের রুই মাছের মধ্যে সংকর করে এটি উদ্ভাবন করেছেন।

বৃহস্পতিবার এটি সাধারণ চাষীদের জন্য অবমুক্ত করা হয়েছে।

এটিকে তারা বলছেন, চতুর্থ প্রজন্মের রুই মাছ। কারণ এর আগে একই পদ্ধতিতে আরও তিনটি জাত উদ্ভাবন হয়েছে গত এক যুগে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে চতুর্থ প্রজন্মের মাছটির নামকরণ করা হয়েছে 'সুবর্ণ রুই'।

বিএফআরআই থেকে জানা যায়, রুই মাছের নতুন এই জাত দ্রুত বাড়ে। এটি খেতে সুস্বাদু। দেখতে লালচে ও আকর্ষণীয়।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, নতুন উদ্ভাবিত এই মাছ মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ হলে দেশে প্রায় ৮০ হাজার কেজি মাছ বেশি উৎপাদন হবে।

হ্যাচারিতে উৎপাদিত কার্পজাতীয় মাছে জেনেটিক অবক্ষয় হয়। এছাড়া অন্তঃপ্রজননজনিত সমস্যার কারণে মাছের কঠিন। এ থেকে উত্তরণের জন্যই 'সুবর্ণ রুই' উদ্ভাবন করা হয়েছে।

বিএফআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শাহা আলী জানান, তিন নদীর রুই মাছের মধ্যে দ্বৈত অ্যালিল ক্রসিংয়ের মাধ্যমে ৯টি গ্রুপ থেকে প্রথমে বেইজ পপুলেশন তৈরি করা হয়েছে। পরে বেইজ পপুলেশন থেকে সিলেকটিভ ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে ২০০৯ সালে রুই মাছের উন্নত জাতের প্রথম প্রজন্মের মাছ উদ্ভাবন করা হয়।

পরবর্তী সময়ে সিলেকটিভ ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে রুই মাছের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের জাত উদ্ভাবন করা হয়।

সবশেষে ২০২০ সালে উন্নত জাতের চতুর্থ প্রজন্মের জাত উদ্ভাবনে সাফল্য এসেছে।

আসছে রুই মাছের নতুন জাত ‘সুবর্ণ রুই’

বৃহস্পতিবার বিএফআরআইয়ের ময়মনসিংহের সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা সভা শেষে নতুন জাতের এ মাছটি অবমুক্ত করা হয় এবং হ্যাচারি-মালিকদের কাছে এই মাছের পোনা হস্তান্তর করা হয়।

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, ‘সুবর্ণ রুই’ মাছ স্বাদু পানি ও আধা লবণাক্ত পানির পুকুর, বিল, বাওড় এবং হাওরে চাষ করা যাবে। এ ছাড়া এ জাতের রেণুপোনা হ্যাচারি থেকে সংগ্রহ করে নার্সারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেকেই লাভবান হতে পারবেন। অর্থাৎ দ্রুত বর্ধনশীল এই মাছটি চাষিদের মুখে হাসি ফোটাবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

আউশ আবাদে ব্যাপক সাড়া

আউশ আবাদে ব্যাপক সাড়া

সরকারি প্রণোদনায় বিনা মূল্যে বীজ ও সার বিতরণ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণ ও নিবিড় মনিটরিংও কৃষকদের এই ধান আবাদে আগ্রহী করে তুলেছে। বোরো ধানের ভালো দাম পাওয়াও ভূমিকা রেখেছে কৃষকদের এই আগ্রহে।

ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ করে বৃষ্টির পানি কাজে লাগিয়ে আউশ আবাদ ব্যাপক সাড়া ফেলেছে সিরাজগঞ্জের কৃষকদের মাঝে।

সরকারি প্রণোদনায় বিনা মূল্যে বীজ ও সার বিতরণ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণ ও নিবিড় মনিটরিংও কৃষকদের এই ধান আবাদে আগ্রহী করে তুলেছে। বোরো ধানের ভালো দাম পাওয়াও ভূমিকা রেখেছে কৃষকদের এই আগ্রহে।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রোস্তম আলী নিউজবাংলাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন এক ইঞ্চি জমি ফেলে রাখা যাবে না। প্রতি ইঞ্চি জমিকে কাজে লাগাতে হবে। তার এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে যেসব জমি দুই ফসলের মাঝে পতিত থাকত, কোনো আবাদ হতো না, এবার সেসব জমি আউশের আবাদের আওতায় এসেছে।

তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বীজ, সার ফ্রি দেয়া হচ্ছে। যেখানে সরকারি সেচ প্রকল্পের ব্যবস্থা আছে, সেখানে সেচও ভর্তুকির আওতায় আনা হয়েছে। তা ছাড়া এবার বোরো ধানের দাম ভালো পাওয়ায় কৃষক আউশ ধান চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’

এই কৃষি কর্মকর্তা জানান, আউশ আবাদ বৃষ্টিনির্ভর হওয়ায় এ ধান উৎপাদনে সেচ খরচ সাশ্রয় হয়। এবার সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় ১ হাজার ৫০০ বিঘা জমিতে আউশ আবাদ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক কৃষককে ৩০ কেজি সার, ৫ কেজি বীজ ও সেচসুবিধা দেয়া হয়েছে। এ কারণে এবার সিরাজগঞ্জের কৃষকরা আউশ চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

সদর উপজেলার কাওয়াকোলা গ্রামের কৃষক শহীদ শেখ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার ১২ বিঘা জমিতে বছরে দুটি ফসল আবাদ করতে পারতাম। গত দুই বছর আউশসহ তিনটি ফসল আবাদ করতে পারছি।

‘এতে আর আমার জমি পতিত থাকছে না কখনোই। আউশের আবাদ গত বছরও অনেক ভালো হয়েছে। এ বছরে বৃষ্টি বেশি থাকায় অনেক ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হামিদুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ করে বৃষ্টির পানি কাজে লাগিয়ে আউশ আবাদ বাড়াতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। সরকারি প্রণোদনায় বিনা মূল্যে আউশ ধানের বীজ ও সার কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।

‘সিরাজগঞ্জে যেসব জমি পতিত থাকত, কোনো আবাদ হতো না, এবার সেসব জমি আবাদের আওতায় আনা হয়েছে। ধানের উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায়, আমরা সে চেষ্টা করছি। কৃষককেও নানাভাবে সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে।’

শেয়ার করুন

৪৩৮ কোটি টাকায় পাঁচ লাখ পুষ্টি বাগান

৪৩৮ কোটি টাকায় পাঁচ লাখ পুষ্টি বাগান

প্রকল্পের আওতায় প্রত্যেকটি ইউনিয়ন এবং পৌরসভার বসতবাড়ির অব্যবহৃত জমিতে ১০০টি করে অর্থাৎ মোট ৪ লাখ ৮৮ হাজার সবজি, ফল ও মসলা জাতীয় ফসলের পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন করা হবে। বসতবাড়ির স্যাঁতস্যাতে জমিতে কচুজাতীয় সবজির প্রদর্শনীও স্থাপন করা হবে।

করোনা মহামারিতে খাদ্য সংকট ও দেশের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে অনাবাদি জমিতে ‘পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এ প্রকল্পের আওতায় ৪৩৮ কোটি ব্যয়ে পাঁচ লাখ পুষ্টি বাগান তৈরি করা হবে।

মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বিএআরসি মিলনায়তনে ‘অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙ্গিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন’ প্রকল্প বিষয়ক এক কর্মশালায় কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক এ কথা জানান।

প্রকল্পের আওতায় প্রত্যেকটি ইউনিয়ন এবং পৌরসভার বসতবাড়ির অব্যবহৃত জমিতে ১০০টি করে অর্থাৎ মোট ৪ লাখ ৮৮ হাজার সবজি, ফল ও মসলা জাতীয় ফসলের পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন করা হবে। বসতবাড়ির স্যাঁতস্যাতে জমিতে কচুজাতীয় সবজির প্রদর্শনীও স্থাপন করা হবে।

মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ ফসল উৎপাদনে ১০০টি কমিউনিটি বেইজড ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন পিট স্থাপন করা হবে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও গ্রুপ পর্যায়ে ক্ষুদ্র কৃষি যন্ত্রপাতিও দেয়া হবে। ইতিমধ্যে, এ প্রকল্পের আওতায় সবজি সংরক্ষণে ক্ষুদ্র আকারে দেশজ পদ্ধতির বিদ্যুতবিহীন ৬৪টি কুল চেম্বার স্থাপন করা হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘করোনায় খাদ্যসংকট মোকাবিলা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনতে পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’

প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পারিবারিক শাকসবজি ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে মনে করেন মন্ত্রী।

প্রকল্পটি সুষ্ঠু বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদেরকে তদারকির নির্দেশ দেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর আমাদের মোট বাজেট ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা, সেখানে আজকে শুধু বাড়ির আঙিনায় পুষ্টিবাগান স্থাপনে ৪৩৮ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের প্রত্যেকটি টাকার হিসাব আমাদেরকে দিতে হবে। যে উদ্দেশ্যে এ প্রকল্প নেয়া হয়েছে তার কতটুকু অর্জন হলো তার গাণিতিক ও বাস্তবসম্মত হিসাব ও মূল্যায়ন করতে হবে।’

নির্বাচিত কৃষকেরা সবজি উৎপাদন করছেন কী-না, অন্যরা উৎসাহিত হচ্ছে কী-না ও উৎপাদিত সবজি খেয়ে তাদের পুষ্টির উন্নতি হচ্ছে কী-না তা যথাযথ মূল্যায়ন রাখতে হবে বলেও জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে গত বছর দেশব্যাপী ৪ হাজার ৪৩১টি ইউনিয়নে ৩৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে এক লাখ ৪১ হাজার পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন করা হয়েছে।’

৪৩৮ কোটি টাকার ‘অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙ্গিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন’ প্রকল্পটি এ বছরের মার্চে একনেকে অনুমোদিত হয়। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটি বাংলাদেশের সকল উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।

প্রকল্পের উপস্থাপনায় বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৫৩ লাখ বসতবাড়ি রয়েছে। এসকল বসতবাড়ির অধিকাংশ জায়গা অব্যবহৃত ও পতিত পড়ে থাকে। কিছু বসতবাড়িতে অপরিকল্পিতভাবে শাকসবজি আবাদ করা হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে পারিবারিক পর্যায়ে নিরাপদ মানসম্মত শাকসবজি, মসলা এবং মৌসুমী ফল উৎপাদনে সহায়ক হবে। উৎপাদিত ফসল পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কৃষকের আয় বাড়াবে।

শেয়ার করুন

এবার চাষ হবে রানি মাছ

এবার চাষ হবে রানি মাছ

বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া রানি মাছের প্রজনন ও পোনা উৎপাদনকৌশল উদ্ভাবন করতে পেরেছেন। ফলে মাছটি চাষের আওতায় আসবে এবং সহজলভ্য হবে। সর্বোপরি শিগগিরই মাছটি সাধারণ ভোজনরসিকদের খাবার টেবিলে ফিরবে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলাশয় সংকোচন, পানিদূষণ, অতি আহরণ, বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় রানি মাছের প্রাপ্যতা ব্যাপকভাবে কমেছে। দীর্ঘ এক বছর এ মাছ নিয়ে গবেষণা করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবনে সফল হয়েছেন মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা।

বিএফআরআই সূত্রে জানা যায়, ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহের স্বাদুপানি কেন্দ্রে ২০২০ সালে রানি মাছের সংরক্ষণ, প্রজনন এবং পোনা উৎপাদন বিষয়ে গবেষণা কর্মসূচি নেয়া হয়। প্রজননের জন্য এই মাছটি যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও কংস নদ এবং নেত্রকোণার হাওর থেকে সংগ্রহ করা হয় এবং গবেষণাকেন্দ্রের পুকুরে প্রতিপালন করা হয়।

গবেষণার আওতায় জুন মাসের চলতি সপ্তাহে দেশে প্রথমবারের মতো রানি মাছের প্রজনন ও পোনা উৎপাদনকৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে।

গবেষক দলে ছিলেন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সেলিনা ইয়াছমিন, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রবিউল আওয়াল, পরিচালক এ এইচ এম কোহিনুর ও স্বাদুপানি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শাহা আলী।

সেলিনা ইয়াছমিন নিউজবাংলাকে জানান, পুকুর থেকে পরিপক্ব মাছ নির্বাচন করে কৃত্রিম প্রজননের পাঁচ-ছয় ঘণ্টা আগে স্ত্রী ও পুরুষ মাছকে হ্যাচারিতে হরমোন ইনজেকশন দেয়া হয়। ইনজেকশন দেয়ার ১০-১২ ঘণ্টা পর স্ত্রী মাছ ডিম দেয়। ডিম দেয়ার ২২-২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিষিক্ত ডিম থেকে রেণু বের হয়ে আসে।

এবার চাষ হবে রানি মাছ


পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ডিম নিষিক্ত ও ফোটার হার যথাক্রমে ৭৫ ও ৫০ শতাংশ। রেণুর ডিম্বথলি দুই-তিন দিনের মধ্যে নিঃশেষিত হওয়ার পর প্রতিদিন তিন-চারবার সেদ্ধ ডিমের কুসুম খাবার হিসেবে হাঁপায় সরবরাহ করা হয়। হাঁপাতে রেণু পোনা ছয়-সাত দিন রাখার পর নার্সারি পুকুরে স্থানান্তরের উপযোগী হয়।

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রবিউল আওয়াল বলেন, রানি মাছ মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রজনন করে থাকে। জুন-জুলাই এদের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম। একটি পরিপক্ব স্ত্রী মাছে প্রতি গ্রামে ৮০০-৯০০টি ডিম পাওয়া যায়। এ মাছের ডিম্বাশয় এপ্রিল মাস থেকে পরিপক্ব হতে শুরু করে।

এবার চাষ হবে রানি মাছ


রবিউল আওয়াল আরও বলেন, অক্টোবরের শেষ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত যখন বিলের পানি কমে যেতে থাকে, তখন রানি মাছ জালে ধরা পড়ে বেশি। এ মাছ খালবিল, নদীনালা, হাওর-বাঁওড় ইত্যাদির তলদেশে পরিষ্কার পানিতে বসবাস করতে পছন্দ করে। তবে কখনও কখনও ঘোলা পানিতেও এদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, পরিপক্ব স্ত্রী মাছের জননেন্দ্রিয় গোলাকার ও হালকা লালচে রঙের হয় কিন্তু পুরুষ মাছের জননেন্দ্রিয় পেটের সঙ্গে মেশানো, কিছুটা লম্বাটে ও ছোট হয়। এ মাছের মুখ আকারে ছোট এবং চার জোড়া ক্ষুদ্রাকৃতির স্পর্শী থাকে। তবে এর দেহে ইংরেজি ‘ওয়াই’ বর্ণমালার মতো চারটি কালো দাগ থাকে এবং দুটি দাগের মধ্যবর্তী অংশে একটি কালো দাগ অবস্থিত। আঁশ অত্যন্ত ক্ষুদ্রাকৃতির, যা প্রায় সাধারণ দৃষ্টিতে বোঝাই যায় না। রানি মাছ প্রায় ৬-৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। তবে সর্বোচ্চ ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হওয়ার রেকর্ডও রয়েছে।

এবার চাষ হবে রানি মাছ


বিএফআরআই মহাপরিচালক ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, এ মাছটি বউ মাছ, বেটি মাছ, পুতুল মাছ, বেতাঙ্গী মাছ প্রভৃতি আঞ্চলিক নামে পরিচিত। অনেকেই আবার ‘গাঙ্গ রানি’ বলেও ডাকে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ভুটান ও মিয়ানমারে এ মাছ পাওয়া যায়।

বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া রানি মাছের প্রজনন ও পোনা উৎপাদনকৌশল উদ্ভাবন করতে পেরেছেন। ফলে মাছটি চাষের আওতায় আসবে এবং সহজলভ্য হবে। সর্বোপরি শিগগিরই মাছটি সাধারণ ভোজনরসিকদের খাবার টেবিলে ফিরবে। ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, বিপন্ন মাছ পাতে ফেরাতে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। গবেষণার ৩০তম সাফল্য হিসেবে রানি মাছ এসেছে।

গত ১২ বছরে চাষের মাধ্যমে দেশীয় ছোট মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ। দেশীয় মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহের স্বাদুপানি কেন্দ্রে ২০২০ সালে একটি ‘লাইভ জিন ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশীয় মাছ সংরক্ষণ এবং পোনা উৎপাদনে গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০২০ সালে ‘একুশে পদক’ লাভ করে।

শেয়ার করুন

মুজিববর্ষে দুটি ‘মৎস্য গ্রাম’ পেল দেশ

মুজিববর্ষে দুটি ‘মৎস্য গ্রাম’ পেল দেশ

মাছ চাষ করে সফল উদ্যোক্তা জয়পুরহাটের সুজাউল। ফাইল ছবি

এ কার্যক্রমের আওতায় গ্রামাঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, মৎস্য চাষ, কৃষিনির্ভর শিল্প, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষির বহুমুখীকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনাসহ নানা রকম সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও জীবনমান উন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে নেত্রকোণা সদরের দক্ষিণ বিশিউড়া ও শরীয়তপুরের নড়িয়ার হালইসার গ্রামকে ফিশার ভিলেজ বা মৎস্য গ্রাম ঘোষণা করেছে সরকার।

গ্রাম দুটিকে মৎস্য গ্রাম ঘোষণা করার কথা মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইফতেখার হোসেন।

সোমবার এ-সংক্রান্ত একটি পত্র জারি করেছে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মৎস্য অধিদপ্তর।

পত্রে বলা হয়, বর্তমান সরকারের বিশেষ কর্মসূচি ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ বাস্তবায়নে মৎস্য অধিদপ্তরের ‘মৎস্য গ্রাম’ কার্যক্রম মূলত সমৃদ্ধ গ্রাম গড়ে তোলার উদ্যোগ।

এ কার্যক্রমের আওতায় গ্রামাঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, মৎস্য চাষ, কৃষিনির্ভর শিল্প, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষির বহুমুখীকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনাসহ নানা রকম সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও জীবনমান উন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মৎস্য অধিদপ্তর এ গ্রাম দুটিতে ব্যাপক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, গ্রামের সব পুকুর-দিঘিতে বিজ্ঞানসম্মত মাছ চাষ কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে ব্যবস্থা গ্রহণ, মাছচাষিদের দল গঠন, প্রশিক্ষণ ও প্যাকেজভিত্তিক পুকুরে মাছ চাষ প্রদর্শনী, জেলেদের দল গঠন, প্রশিক্ষণ, বিকল্প কর্মসংস্থান ও ঋণ সহায়তা প্রদান, উন্মুক্ত জলাশয় তথা বিল ও প্লাবনভূমিতে সমাজভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা দল গঠন, বিল নার্সারি স্থাপন ও পোনা অবমুক্তকরণ, জলাশয় সংস্কার ও মাছের অভয়াশ্রম স্থাপন এবং কমিউনিটি সঞ্চয় দল গঠনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন।

এ ছাড়া গ্রাম দুটিতে সরকারের অন্য দপ্তরের সহায়তায় যে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তা হলো, গভীর নলকূপ ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা স্থাপন, যানবাহন চলাচল উপযোগী রাস্তা নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ, সুফলভোগীদের হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ।

পাশাপাশি গ্রামের অধিবাসীদের সন্তানদের শতভাগ শিক্ষা কর্মসূচি নিশ্চিতকরণ ও অন্য শিক্ষা কার্যক্রম গ্রহণ করা।

শেয়ার করুন

বাজারে হাঁড়িভাঙ্গা

বাজারে হাঁড়িভাঙ্গা

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ছোট সাইজের আমের দাম বর্তমান বাজারে প্রতি মণ ১৪০০-১৫০০ টাকা, মাঝারি আম সর্বোচ্চ ২২০০ টাকা আর বড় আম বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ২২০০ থেকে ২৪০০ টাকা পর্যন্ত।

আঁশবিহীন, স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় হাঁড়িভাঙ্গা আম বাজারে এসেছে। রংপুরের বিভিন্ন হাটে-ঘাটে, ছোট-বড় বাজারে, রাস্তার মোড়ে, রিকশা, ভ্যানে, বাইসাইকেলে করে চাষি, ফড়িয়ারা আম বিক্রি করছেন। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বাজার কিছুটা চড়া।

নগরীর লালবাগ এলাকায় রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আয়োজনে রোববার বিকেলে এই আম বিক্রির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক আসিব আহসান।

কৃষি বিভাগের উপপরিচালক ওবায়দুর রহমান জানিয়েছেন, জুনের শেষ সপ্তাহে অর্থাৎ ২০ জুনের পর এই হাঁড়িভাঙ্গা আম পরিপক্ব হয়। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০ জুনের পর আম নামাতে চাষিদের অনুরোধ করা হয়।

আমচাষি মজিবর রহমান বলেন, ‘এবার তো বারবার ঝড় হইচে। যে সময়টা ঝড় হইচে তখন আমের গুটি আসছিল। ঝড়ে ওই গুটি পড়ি গেছিল। আমগাছে সেই আগের মতন আম নাই। তা ছাড়া তো গাছোত পরিচর্যা করতে লাগছে, ওষুধ দিতে লাগছে। খরচ বেশি পড়ছে। একটু দাম না নিলে তো লাভ হবে না...।’

আব্দুল মিয়া নামে এক আমচাষি বলেন, ‘গত দুই দিন আগে আমের দাম কম আছিল, এখন দামটা বাড়ছে। গত বছর পোত্তম (প্রথম) দিকে যে আম আচিল ১৪০০-১৬০০ টাকা মণ, আইজ সেই আম বেচনোং ১৮০০-১৯০০ টাকা। দাম আরও বাড়বে। শুনবেনজি পোস্ট অফিসোত করি নাকি আম পাডাইবে সরকার। তাহলে তো ভালো হইবে।’


বাজারে হাঁড়িভাঙ্গা


আমের মৌসুমি ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘আইজ আম কিনচি ১৮০০ টাকা মণ দরে, বিক্রি করনোং ২২০০ পর্যন্ত। দাম এবার একনা বেশি। বেশি দাম ছাড়া বাগানমালিকরা বেচপার চায় না। খরচ বেলে বেশি হইচে ওই জন্যে দাম কম।’

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ছোট সাইজের আমের দাম বর্তমান বাজারে প্রতি মণ ১৪০০-১৫০০ টাকা, মাঝারি আম সর্বোচ্চ ২২০০ টাকা আর বড় আম বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ২২০০ থেকে ২৪০০ টাকা পর্যন্ত।

রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপপরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘চাষিরা যাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আম নির্বিঘ্নে পাঠাতে পারেন, সে জন্য আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। আশা করছি, চাষিরা হয়রানির শিকার হবেন না।’

জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, ‘অন্যান্য বছর বিআরটিসিতে আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। তাতে করে খরচ যে খুব একটা কমবেশি তা হয়নি। সে কারণে বিকল্প ব্যবস্থা করব। এ ছাড়া ডাক বিভাগের মাধ্যমে আম পাঠানোর বিষয়টি ভাবা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘সড়কে আমের গাড়িতে যেকোনো ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধে সরকার কঠোর রয়েছে। আমরা সেই নির্দেশনা দিয়েছি।’

শেয়ার করুন

১০ বছরে কমেছে ২ হাজার হেক্টর কৃষিজমি

১০ বছরে কমেছে ২ হাজার হেক্টর কৃষিজমি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পরিকল্পনার অভাবে আশঙ্কাজনক হারে কমছে কৃষিজমি। ছবি: নিউজবাংলা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা সুশান্ত সাহা বলেন, ‘কৃষিজমি হ্রাস পাওয়ার মূল কারণ এসব জমিতে ইটভাটা স্থাপন, শিল্পকারখানা, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর নির্মাণ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় আশঙ্কাজনক হারে কমছে কৃষিজমি। অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প, শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং উর্বর মাটি তুলে ফেলায় কমে আসছে ফসল উৎপাদনের জমির পরিমাণ। একে ত্বরান্বিত করছে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ফসলি জমির মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণ।

জেলার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুল আমিন জানান, এসব কারণে গত ১০ বছরে জেলায় ২ হাজার ৩৮ হেক্টর কৃষিজমি কমেছে। এর আগে নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে যে হারে আবাদি জমি কমত, বর্তমানে বাড়ি নির্মাণ বা পুকুর খুঁড়ে মাছ চাষের কারণে তার চেয়ে বেশি হারে কমছে।

জেলার কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দেশে ফসলি জমি রক্ষায় কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই। কৃষিজমি রক্ষায় তাই তেমন কিছু করতে পারে না প্রশাসন। এ জন্য ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তার কথা ভেবে নিয়মিত মনিটরিং এবং ফসলি জমি সুরক্ষায় সিটি করপোরেশন অথবা পৌরসভার মতো ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায়ও নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দেন তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, সর্বশেষ দুই অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় এক, দুই, তিন ও চার ফসলি মিলিয়ে মোট জমির পরিমাণ ১ লাখ ৩০ হাজার ৯৭৮ হেক্টর। দুই বছর আগে যা ছিল ১ লাখ ৩২ হাজার ১৮৫ হেক্টর। মাত্র দুই বছরেই জেলায় ১ হাজার ২০৭ হেক্টর জমি কৃষি খাত থেকে অকৃষি খাতে রূপান্তরিত হয়েছে।

১০ বছরে কমেছে ২ হাজার হেক্টর কৃষিজমি

জেলার বিজয়নগর, আশুগঞ্জ ও আখাউড়া উপজেলায় দেখা যায়, কৃষিতে লোকসানের কারণে অনেক চাষিই এখন মাছ চাষের দিকে ঝুঁকছেন। ফসলি জমিতে তৈরি করা হচ্ছে বড় বড় পুকুর-দিঘি। তবে এই চিত্র সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সদর উপজেলাসহ পূর্বাঞ্চলের কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগর উপজেলায়।

কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আবার অধিক মুনাফার লোভে কৃষিজমির মাটি কিনে বিক্রি করছেন। এসব মাটি দিয়ে রাস্তার পাশের জমি ভরাট করে কেউ নির্মাণ করছেন মার্কেট, কেউবা করছেন আবাসন প্রকল্প।

ধরখার এলাকার রহিম মিয়া, বিজয়নগরের ফজলু মিয়া ও আশুগঞ্জের আলমগীর মিয়াসহ কয়েকজন কৃষক নিউজবাংলাকে জানান, গত ৫ থেকে ৭ বছরে ধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করে বারবার লোকসানে পড়ায় তারা ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এ জন্য কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে ফসলি জমিতে কেউ করছেন মাছ চাষ, আবার কেউ জমি ভরাট করে নির্মাণ করেছেন মার্কেট ও দালানকোঠা।

১০ বছরে কমেছে ২ হাজার হেক্টর কৃষিজমি
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং নগরায়ণের কারণে কমে আসছে ফসলি জমির পরিমাণ। ছবি: নিউজবাংলা

এ বিষয়ে সচেতন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক আবদুর নূর বলেন, ‘দেশে যেভাবে ফসলি জমি কমছে এবং যেভাবে জ্যামিতিক হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, এতে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে যতই খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করুক না কেন, ভবিষ্যতে আমাদের খাদ্যঘাটতির সম্মুখীন হতে হবে।

‘এমতাবস্থায় কেউ যেন ফসলি জমিতে বাড়িঘর নির্মাণ করতে না পারে, সে জন্য সরকারকে অবশ্যই কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।’

১০ বছরে কমেছে ২ হাজার হেক্টর কৃষিজমি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কৃষিজমি হ্রাস পাওয়ার মূল কারণ এসব জমিতে ইটভাটা স্থাপন, শিল্পকারখানা, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর নির্মাণ। ছবি: নিউজবাংলা

তিনি আরও বলেন, ‘পরিকল্পনার অভাবেই দিন দিন কমছে ফসলি জমির পরিমাণ। পৌরসভার মতো যদি ইউনিয়ন পরিষদেও প্ল্যান পাস করে বাড়িঘর নির্মাণ করা হতো, অথবা শহরের মতো যদি গ্রামেও সামান্য একটু জায়গার মধ্যে বহুতল ভবন নির্মাণের মানসিকতা তৈরি হতো, তবে আমাদের দেশের ফসলি জমি এভাবে হ্রাস পেত না।’

কৃষিজমি হ্রাসের তথ্য স্বীকার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুল আমিন জানান, জেলায় কী পরিমাণ কৃষিজমি কমেছে, তার কোনো সঠিক তথ্য বা পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। তবে বর্তমানে জেলায় যে ইটভাটা রয়েছে, তা আগের ১০ বছরের দ্বিগুণ।

তিনি বলেন, ‘একটা ইটভাটা স্থাপন করতে পাঁচ একর জমির প্রয়োজন। সেই হিসাবে ১০০টি ইটভাটা তৈরি করতে ৫০০ একর জমির প্রয়োজন। এতে দেখা যায়, গত ১০ বছরে শুধু ইটভাটা স্থাপন করতে ৫০০ একর জমি হ্রাস পেয়েছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা সুশান্ত সাহা বলেন, ‘কৃষিজমি হ্রাস পাওয়ার মূল কারণ এসব জমিতে ইটভাটা স্থাপন, শিল্পকারখানা, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর নির্মাণ। কোনো কৃষিজমি যেন অকৃষি খাতে রূপান্তরিত না হয়, সে জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে গ্রামে গ্রামে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জনসচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।’

তিনি দাবি করেন, কৃষিজমি কমলেও জেলার খাদ্য উৎপাদনে তার প্রভাব পড়েনি। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে।

শেয়ার করুন

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

পলিথিনে বানানো অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘরে গাদাগাদি করে যাযাবর জীবন যাপন করছে জেলে পরিবারগুলো। ছবি: নিউজবাংলা

বংশী নদীর তীর ঘেঁষে গোয়ালট্যাক চকে অস্থায়ী আবাস গেড়েছে মাছ শিকারি কিছু যাযাবর পরিবার। প্রায় তিন মাস পলিথিনের তৈরি ঘরে তারা বসবাস করছে নির্জন প্রান্তরে। প্রতিবছর এরা আসে নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম থেকে।

শহুরে কোলাহলের পাশে নিস্তব্ধ জঙ্গল। চারদিক পানিতে ঘেরা ছোট্ট টিলায় কাশবনের আড়ালে গুটি কয়েক মানুষের বসবাস। কোনো রকমে দুমুঠো খাবার আর মলিন পোশাক ছাড়া বাকি মৌলিক চাহিদা নাগালের বাইরে তাদের।

পলিথিনে বানানো অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘরে গাদাগাদি করে যাযাবর জীবন যাপন করছে জেলে পরিবারগুলো। রাতে শিয়াল আর সাপের আতঙ্ক যেন তারা মেনেই নিয়েছে জীবনের অংশ হিসেবে। তবে শিশু আর বয়োবৃদ্ধদের নিয়ে উৎকণ্ঠা বেশি।

রাজধানীর নিকটবর্তী সাভার উপজেলা সবার কাছে পরিচিত শিল্পাঞ্চল হিসেবে। দ্রুত শিল্পায়নের ফলে একসময়কার পল্লিপ্রান্তর এখন আধুনিক শহর। এখানে বসবাস প্রায় ২০ লাখ মানুষের।

আশুলিয়ার নলাম এলাকায় বংশী নদীর তীর ঘেঁষে গোয়ালট্যাক চকে অস্থায়ী আবাস গড়েছে মাছ শিকারি কিছু যাযাবর পরিবার। প্রায় তিন মাস পলিথিনের তৈরি ঘরে তারা বসবাস করছে নির্জন প্রান্তরে। এরা নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম থানার নগরথানাই খাড়া গ্রামের ৪ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদের বাসিন্দা।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের কয়েক মাস আগে থেকে ওই জঙ্গলের টিলা গোয়ালট্যাক চকে আসে যাযাবর পরিবারগুলো। রাতভর নৌকা নিয়ে তারা বংশী নদীতে মাছ ধরার জন্য চাই (ফাঁদ) পাতে। সকালে সেই মাছ আশপাশের বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করেন।

মাঝেমধ্যে এলাকার লোকজন তাদের কাছ থেকে দেশীয় প্রজাতির শিং, টাকি, ট্যাংরাসহ বিভিন্ন মাছ কিনে নেয়। কিন্তু স্থানীয় লোকজনের অনেকেই দাম কম দেন। আবার কখনও জোর করে মাছ নিয়েও চলে যান। এ জন্য স্থানীয় লোকজনের কাছে অনেক সময় তারা মাছ বিক্রি করতে চান না।

নলাম এলাকার কয়েক কিলোমিটার মেঠোপথ আর কাশবন পেরিয়ে এই চকে গিয়ে দেখা যায়, বংশী নদীর পাশে জঙ্গলের ভেতর ছোট ছোট বেশ কয়েকটি ঘর। বাঁশের কাঠামোর সঙ্গে পলিথিন মুড়িয়ে বসবাসের জন্য তৈরি করা হয়েছে এসব অস্থায়ী নিবাস। ভেতরে ছোট্ট পরিসরের মধ্যে একেকটি ঘরে গাদাগাদি করে থাকছেন পাঁচ-ছয়জন। ওই জায়গাতেই রান্নার জন্য বসানো হয়েছে চুলা। সুপেয় পানির ব্যবস্থা না থাকায় দূর থেকে আনতে হয়।

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

দুপুর ১২টা নাগাদ এসব জেলে পরিবারের কর্তাদের দেখা মেলে না। তারা চলে যান নদীতে রেখে আসা ফাঁদ থেকে মাছ সংগ্রহ করতে। আর স্ত্রীরা তখন রান্নাবান্না আর শিশুদের নিয়ে ব্যস্ত। মাছ শিকারিদের স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার। তারা জানান তাদের নানান দুঃখ-দুর্দশা আর হতাশার কথা।

জেলে ইসরাফিল খাঁর স্ত্রী হাসি বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাগে দেশের বড়াইগ্রামে পরায় সবার এটাই পেশা। আমরা একিনে মাছ ধরি। তাই আমরা এই খালের পাড়েই থাকি। বাসা ভাড়া আমেগে দিলে পুসায় না। তাই পোলাপান লিয়া কষ্ট করে আমরা একিনেই থাকি। খালি খাওয়ার পানিটা টানেথেন টাইনা আনি। আর গোসল-মোসলতো সব নদীতেই করি। এভাবেই আমাগের জীবন কাটে।

‘পরায় ৫-৬ মাস থাকি আমরা এই জায়গায়। তারপরে আবার দ্যাশে যাই। বান আসার সময় হইলে আবার আমরা চইলা আসি।’

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

বিরান জায়গায় নিরাপত্তার অভাব নিয়ে প্রশ্ন করলে হাসি বেগম বলেন, ‘পরায় আমরা অনেক দিন যাবৎ একিনে আসা-যাওয়া করি। এই গিরামডা আমাগে নিজেগো গিরামের মতো হয়্যা গেছে, সবাই পরিচিত। ত্যা আমার একিনে অন্য কোনো সমেস্যা নাই। অন্য গিরামে গেলেও আশেপাশেই থাকি। তারপরে অনেক পানি যখন হয়্যা যায়, তখন অন্য জায়গায় যাই।

‘শিয়াল বিরক্ত করে। অনেক সাপ আছে এই জায়গায়। আমরা সাপ দেখিও মারি না। অনেক সময় ঘরের ভিতর, বিছনার ভিতর সাপ দেখা যায়। আমরা তাড়ায়া দেই। তাগো শরীলে আঘাত করি না। শিয়াল-সাপের ডরে অনেকেই আসে না এই পাড়ার। তা-ও আমরা এই জাগায় বসবাস করি।’

নদীতে মাছ পাওয়া না গেলে সমস্যার বিষয়ে বলেন, ‘আমাগের কষ্টই হয়। হয়তে কেউ সাইডে কাজে যাই। কেউ কামলা দিতে যায়। এইভাবেই দিনকাল কাটে। আমরা সবাই খুব অভাবী মানুষ।'

সরকারি কোনো সহযোগিতা পেয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নে বলেন, ‘প্রোকিতোই (প্রকৃত) আমরা মৎসজীবী। আমরা মাছ ধরি খাই। আমাদের মৎসজীবীর কাড করি দিছে সরকার থেকে। কতা ছিল, যে ছয় মাস পানি থাকে না, এই ছয় মাস আমাগের সরকার থাকি খাবার দিবি। এখন আমরা কোনো অনুদানি পাই না। গিরামের যারা নেতা আছেন তাগের কাছে বললে কয়, য্যাখিন সময় হয় তখুন দিবি। আমাগের কাড আছে কিন্তু আমরা এখুনো কোনো অনুদান পাইয়া সারি নাই।

মাছ শিকারি একদল যাযাবর

হাসি বেগমের ছোট ছেলে পুরোদস্তুর জেলে কিশোর আল আমিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পানির ভিতরে নিয়া মাছের ফাঁদ পাইতা থুই। রাতের দিক দিয়া পাতি। সকাল বেলা ওঠাই। আবার বিকালে পাইতা থুইয়া আসি। পরে চেংটি, টাহি, খইলশা, দুই-চারডা সিংগি মিংগি পাওয়া যায় আরকি। মাছ ধরতে অনেক ভাল্লাগে।’

নলাম এলাকার বাসিন্দা আশরাফ হোসেন কামাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বর্ষা মৌসুম আসার আগে ওই চকে জেলেদের প্রায় ১০-১৫টি পরিবার আসে মাছ ধরতে। তারা বংশী নদীর তীরে জঙ্গলের মধ্যে পলিথিনের তৈরি ঘরে বসতি গড়ে। ওখানেই ছয়-সাত মাস থেকে আবার চলে যায়। আমরা যারা এলাকায় থাকি, তারা নদীর দেশীয় মাছ তাদের কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে পাই। কিন্তু এলাকার অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি মাঝেমধ্যে মাছ নিয়ে নামমাত্র টাকা দেয়। আবার অনেকে টাকা না দিয়েই মাছ নিয়ে চলে যায়। এ জন্য তারা স্থানীয়দের কাছে মাছ বিক্রি করতে চান না।’

ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘টাকা না দিয়ে কেউ জোর করে মাছ নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটলে বিষয়টা স্থানীয় থানাকে জানাতে হবে। পাশাপাশি ইউএনও মহোদয়কেও লিখিতভাবে অবহিত করলে এ বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার সিনিয়র মৎস্য অফিসার জাহাঙ্গীর আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘চার-পাঁচ বছর আগে একটা সরকারি প্রজেক্টের মাধ্যমে রাজশাহী প্রকল্প থেকে মৎসজীবী কার্ড দেয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে রাজশাহী প্রকল্প থেকে ৪০ জনের একটা বরাদ্দ দিয়েছিল কমিটির মাধ্যমে, ওটা দিয়েছি। এদিকে খাদ্য সহায়তা নাই। এদিকে মৎস্য আইন বাস্তবায়ন হয় না। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যেখানে সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে, সেসব অঞ্চলে দেয়া হয় এগুলো।’

শেয়ার করুন