চরাঞ্চলে চাষ হচ্ছে বেবি কর্ন

বেবি কর্ন চাষে ঝুঁকছেন শেরপুরের কুলুরচরের কৃষকরা। ছবি: নিউজবাংলা

চরাঞ্চলে চাষ হচ্ছে বেবি কর্ন

পোকার উপদ্রব ও রোগের সংক্রমণও কম থাকে ফলে উৎপাদন ব্যয় কম। ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে বেবি কর্ন সংগ্রহ করা যায়।

বালু, ঝুরঝুরা মাটি বেবি কর্ন চাষের জন্য উপযুক্ত। চরাঞ্চলে পানির ঘাটতি থাকায় চাষাবাদে কষ্ট করতে হয় কৃষকদের। এ ক্ষেত্রে বেবি কর্ন চাষে ঝুঁকছেন শেরপুরের কুলুরচরের কৃষকরা।

অন্য ফসলের তুলনায় বেবি কর্ন চাষে পানি কম প্রয়োজন। কম খরচে লাভ বেশি বলেই এই ফসল চাষে আগ্রহী কৃষকরা।

গবেষকরা বলছেন, বাজার তৈরি করা গেলে, কৃষকদের উৎসাহের সঙ্গে বাড়বে বেবি কর্ন উৎপাদন। বাড়তে থাকা চাহিদা পূরণে কমবে আমদানি নির্ভরতা।

জেলার চরাঞ্চলে বেবি কর্ন চাষের সম্ভাব্যতা নিয়ে গবেষণা করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যায়ের পিএইচডির শিক্ষার্থী পার্থ সারথী কর। তিনি পেশায় শেরপুরের জমশেদ আলী মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের চরাঞ্চলের জমির বেশির ভাগ মাটিই বেলে, ফলে পানি ধারণক্ষমতা কম। জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ও উর্বরতাও কম। রাসায়নিক সার সংযোজনের মাধ্যমে শস্যের উৎপাদনশীলতা উন্নত করা সম্ভব। কিন্তু রাসায়নিক সার ব্যয়বহুল।

বেবি কর্ন
অন্য ফসলের তুলনায় বেবি কর্ন চাষে পানি কম প্রয়োজন। ছবি: নিউজবাংলা

‘চরাঞ্চলের প্রধান ফসল হলো বোরো ও পতিত আমন ধান। তবে এ ধান আকস্মিক বন্যা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। পানির ঘাটতির কারণে বোরো ধানের উৎপাদনও লাভজনক নয়। তবুও কৃষকরা খাদ্য ও গোখাদ্যের জন্য বোরো ধান চাষ করতে বাধ্য হন।’

তিনি আরও জানান, অপর পক্ষে বেবি কর্ন একটি স্বল্পমেয়াদি ফসল, অর্থকরী ফসল হিসেবে চাষ করা যায়। ধানের তুলনায় বেবি কর্নের পানির চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম।

পোকার উপদ্রব ও রোগের সংক্রমণও কম থাকে ফলে উৎপাদন ব্যয় কম। ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে বেবি কর্ন সংগ্রহ করা যায় বলে জানান গবেষক পার্থ সারথী।

বেবি কর্ন প্রয়োজনীয় ফাইবার ও প্রোটিন ছাড়াও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ। এটি সাধারণত সবজি ও সালাদে ব্যবহার হয় যা অত্যন্ত পুষ্টিকর।

বেবি কর্ন চাষ

বেবি কর্নের গাছ সবুজ থাকা অবস্থায় সংগ্রহ করায় এর কাণ্ড ও পাতা গরুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এগুলো সাইলেজের মাধ্যমে তিন থেকে পাঁচ মাস সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

এ ছাড়া বেবি কর্ন গাছ দ্রুত বর্ধনশীল, রসালো, দূষিত পদার্থমুক্ত এবং যে কোনো পর্যায়ে প্রাণীদের খাওয়ানো যায়। ফলে গরুর দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি পায় বলে জানান ওই গবেষক।

কৃষক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘বেবি কর্নের দুই লাইনের মাঝে ডালজাতীয় ফসল চাষ করার সুযোগ রয়েছে। এতে আমরা একই জমি থাইকা বেবি কর্ন, গরুর খাবার ও ডালজাতীয় ফসলের আবাদ করতে পারতাছি।

‘আমার জমিতে তিন বছর ধইরা বেবি কর্ন চাষ করতাছি। আমি বেবি কর্ন আবাদ করে অনেক লাভবান হইছি।’

কৃষক মজিবর মিয়া জানান, এক একর জমিতে বেবি কর্ন ফলাতে তার খরচ পড়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। আর বেবি কর্ন বিক্রি করে এক লাখ টাকারও বেশি আয় করা যায়।

অভিজাত চাইনিজ রেস্টুরেন্টগুলোয় বেবি কর্ন স্যুপ একটি উপাদেয় খাবার হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোয় বেবি কর্ন খুব জনপ্রিয়। সেসব দেশে বেবি কর্ন রপ্তানি হয় চীন ও ভারত থেকে। বাংলাদেশ থেকেও বেবি কর্ন রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. আব্দুল কাদের বলেন, ‘ধান চাষ করলে যেখানে প্রতিদিন দুবার পানি দিতে হয়, সে ক্ষেত্রে বেবি কর্ন চাষে মৌসুমে মাত্র তিনবার পানি দিলেই হয়।

‘যদিও এ বেবি কর্নের এখনও পাইকারি ও খুচরা বাজার গড়ে ওঠেনি। তবে দেশের বিভিন্ন চাইনিজ ও ফাস্টফুড রেস্তোরাঁয় এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বেবি কর্নকে সহজলভ্য করতে সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় চাইনিজ রেস্তোরাঁর মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে এর বাজার তৈরি করা খুবই সহজ।’

সে জন্য বেবি কর্ন আগামীতে বাংলাদেশের সম্ভাবনার একটি ফসল বলেও মনে করেন তিনি।

শেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মুহিত কুমার দে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় নতুন করে পরীক্ষামূলকভাবে বেবি কর্ন চাষ করা হয়েছে। আমরা এর বাজার সৃষ্টি করার জন্য সার্বিক সহায়তা করব।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য

সূর্যমুখীতে টেনে এনে চাষিকে ‘পানিতে ফেলল’ কৃষি বিভাগ 

সূর্যমুখীতে টেনে এনে চাষিকে ‘পানিতে ফেলল’ কৃষি বিভাগ 

বীজ সার দিয়ে সূর্যমুখী চাষে উৎসাহ যোগালেও ফসল ওঠার পর কৃষকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না কৃষি বিভাগ। ছবি: নিউজবাংলা

কিশোরগঞ্জে এই ফসলটির চাষ বাড়াতে নানাভাবে উৎসাহ দিয়ে কৃষকদের বিপাকে ফেলেছে কৃষি বিভাগ। ফলন ভালো হলেও বীজ ভাঙানোর সুবিধা নেই। এই অবস্থায় তারা ফসল বিক্রি করতে পারছেন না। কৃষি বিভাগ বলছে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তেল ভাঙানো হয়। তাদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করছে।

হাওরে সূর্যমুখী চাষ নিয়ে কয়েক মাস ধরে দর্শনার্থীদের মধ্যে উন্মাদনা তৈরি হলেও কৃষকের জন্য এই বীজ এখন তৈরি করেছে বিপত্তি।

কৃষি বিভাগ চাষিদের এই বীজ চাষে উৎসাহ দিয়েছে বিনা মূল্যে বীজ আর সার দিয়ে। কৃষক ঘরে ফসল তুলেছে যখন বীজ বিক্রি করতে পারছে না, তখন তাদের পাশে দাঁড়ায়নি কৃষি বিভাগ।

এই বীজ দিয়ে তেল ভাঙানোর ব্যবস্থা নেই জেলায়। বাজারে বীজ নিয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা যে দাম বলেন, তাতে চাষের খরচই ওঠে না। এ অবস্থায় কৃষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ।

চাষিদের এই ক্ষোভের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণের উপপরিচালক ছাইফুল আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সূর্যমুখীর বীজ এ মুহূর্তে বিক্রি করার করার ক্ষেত্রে সমস্যা হলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেগুলো বিক্রির ব্যবস্থা আমরাই করে দেব। যে সমস্যা এখন হচ্ছে, সেটা কিছুদিনের মধ্যেই সমাধান হবে।’

কৃষকদের এই তথ্য জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। যদিও নিউজবাংলার সঙ্গে যে কজন চাষি কথা বলেছেন, তাদের কেউই এ ধরনের তথ্য দেননি।

কেবল হাওর নয়, জেলার ১৩টি উপজেলাতেই কম-বেশি চাষ হয়েছে। ৩৩৫ হেক্টর জমিতে এই তেলবীজের ক্ষেতগুলো গত কয়েক মাস ধরেই এলাকাবাসী ও দূরের মানুষদের আগ্রহের বস্তু হয়ে রয়েছে।

দল বেঁধে ছবি তুলতে গিয়ে কখনও কখনও গাছের ক্ষতিও করেছে তারা। কেউ আবার কৃষকের ক্ষতি করে ফুলও ছিঁড়ে নিয়ে এসেছে।

ফুল আসার পর কৃষকের বিরক্তি এ কারণে ছিল ছবি তুলতে আসা মানুষদের ভিড় নিয়ে। পাহারা দিয়েও রাখতে হতো জমি।

কদিন আগে কালবৈশাখি অনেক ক্ষেতের ফুল নষ্ট করে দিয়েছে। তবে যারা ফসল ঘরে তুলতে পেরেছেন, তারাও যে স্বস্তিতে আছেন, তা নয়।

নতুন ফসল হওয়ায় এই বীজ নিয়ে কী করতে হবে, তা-ও বুঝে উঠতে পারছে না কৃষকেরা। পাওয়া যাচ্ছে না ক্রেতা। বাজারে নিয়ে গেলেও কেউ জিজ্ঞেস করে না বলে জানিয়েছেন তারা।

বিক্রি না করতে পেরে বীজ ভাঙিয়ে তেল বানানোর চেষ্টাও সফল হচ্ছে না। যে মেশিন দিয়ে সরিষা ভাঙানো হয়, সেটা দিয়ে সূর্যমুখী ভাঙতে গেলে পরিমাণে অনেক কম তেল পাওয়া যাচ্ছে।

জেলার কৃষি কর্মকর্তারা জানান, সূর্যমুখী ভাঙানোর মেশিন কিশোরগঞ্জে নেই। পরিমাণে সঠিক তেল পেতে হলে বা বীজের ন্যায্যমূল্য পেতে চাইলে যেতে হবে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে।

কিন্তু একেকজন কৃষকের যে পরিমাণ বীজ আছে, সেগুলো নিয়ে রূপগঞ্জে আসাও লাভজনক হওয়ার কথা না।

মিঠামইন উপজেলার মহিষারকান্দি বেড়িবাঁধ এলাকায় ৪০ শতাংশ জমিতে সূর্যমুখীর চাষ করেছিলেন বাহাউদ্দীন।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কৃষি অফিস আমরারে বিনা পয়সায় বীজ আর সার দিছে। এর লাইগ্যা সূর্যমুখির চাষ করছিলাম।

‘সারা বছর পাহারা দেয়া ফসল ঘর তুইল্যা বিপদে পড়ছি। ছয় মণ বীজ আছে আমার ঘরো। কিন্তু কেমনে কী করাম কিছুই বুঝতাছি না। কই বেচন যাইব এইডাও জানি না। কেউ জিগায়ও না।

‘উপায় না পায়া অহন এক কেজি, দুই কেজি কইরা যারা পক্ষী (পাখি) পালে হেরার কাছে বেচতাছি। ভাঙানোরও জাগাও পাইতাছি না।’

এই চাষি বলেন, ‘জমিত ফুল আওনের (আসার) পরে যেমনে মাইনষে দেখত আইছিন, সেইবালা (সে সময়) খুব ভালা লাগত। কিন্তু কেডা জানত, পরে এই অবস্থা হইব। এই ফসল ফলায়া আমি খুবই ক্ষতিগ্রস্ত।’

ইটনা উপজেলার বড়বাড়ী ইউনিয়নের ময়নাহাটি হাওরে এক একর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ করেছিলেন আবদুল হেকিম। তিনি বলেন, ‘ফসল বালাই অইছে। কিন্তু এই বীজ লইয়া কিবা কী করবাম তা বুঝতাছি না। ধানের বেপারী তো হারাদিনই আয়ে। কিন্তু সূর্যমুখী কিনত কেউ আয়ে না।’

পাকুন্দিয়া উপজেলার আদিত্যপাশা এলাকার কৃষক মো. শফিক ও জাকির হোসেন সূর্যমুখীর চাষ করেছিলেন ৩০ শতাংশ জমিতে। ফলন খুব খুব ভালো হয়েছে। তবে ক্রেতা পাচ্ছেন না তারাও।

মিঠামইনের কুনকুনি হাওরে তিন একর জমিতে ফসল ফলানো মজিবুর রহমান ফসল ঘরে তুলতে পারেননি কালবৈশাখির কারণে।

তিনি বলেন, ‘ঝড়ে আমার সব শেষ। জমিতে ফসল পাওনের কথা ৬০ মণ। পাইছি না ছয় মণও।’

মজিবুর জানান, তার ৪০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে এই ফসল চাষ করে।

নিকলী সদর ইউনিয়নের চারিদ্বার এলাকার পাটছাড়া কান্দায় ৭৫ শতাংশ জমিতে চাষ করেছিলেন মিয়া হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি ফসল ঘরই আনতাম পারছি না। জমিতেই শেষ। হেই বালায় পর্যটকদের ভিড় বেশি বাইড়া গেছিল। সামলাতাম না পাইরা না টেহা নেয়া ছবি তুলতাম দিছি।

‘চাষ করছিলাম ফসলের আশায়। কিন্তু আর কোনো উপায় আছিন না।’

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণের উপপরিচালক ছাইফুল আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সূর্যমুখী পুরো বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন ফসল হওয়ায় কৃষকেরা একটু সমস্যায় পড়েছে। তার মধ্যে আবার ঝড়েও ক্ষতি করেছে।’

‘সরিষা যে ঘানিতে ভাঙে সেখানেও সূর্যমুখী ভাঙানো যায় তবে পরিমাণে তেলটা কম পাওয়া যায়। সূর্যমুখী ভাঙানোর জন্য আলাদা স্পেশালাইজড মেশিন রয়েছে, তবে কিশোরগঞ্জে সেটা এখনও আসেনি।’

তাহলে কৃষক এখন কী করবে, এমন প্রশ্নে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটা অয়েল মিল রয়েছে। তারা বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখী কিনে ভাঙায়। আমরা সেখানেও যোগাযোগ করছি। কৃষক যাতে ন্যায্যমূল্য পায়, আমরা সেই উদ্যোগ নিচ্ছি।’

শেয়ার করুন

গরম বাতাস: ধান বাঁচবে যেসব কৌশলে

গরম বাতাস: ধান বাঁচবে যেসব কৌশলে

কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় গরম বাতাসে মাঠের পর মাঠ ধান পুড়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে। ছবি: নিউজবাংলা

গত ৪ এপ্রিল এই তাপমাত্রার সঙ্গে কালবৈশাখী ঝড় হওয়ায় দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান শুকিয়ে চিটা হয়ে গেছে। দেশের বোরো ধানের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার হঠাৎ এমন অচেনা এক দুর্যোগে (গরম বাতাস) পুড়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান। একই দশা গোপালগঞ্জেরও কয়েকটি উপজেলায়।

গত কয়েকদিনে দেশের কয়েকটি অঞ্চলে গরম বাতাস বা ‘লু হাওয়ায়’ বোরো ধান নষ্ট হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ধান রক্ষায় জমিতে পানি ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছে কৃষি বিভাগ।

শনিবার রাজধানীর ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে তাপদাহ ও কালবৈশাখীর থেকে কীভাবে ধান রক্ষা করা যায় সে বিষয়ে কিছু করণীয় উল্লেখ করেছে। তারা বলছে, ধানের বৃদ্ধি পর্যায়ে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা এর বেশি হলে ধানে চিটা দেখা যায়।

গত মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে ধানের ফুল ফোটা পর্যায়ে বেশিরভাগ সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হওয়ায় দেশের অনেক অঞ্চলে ধানে চিটা দেখা গেছে।

গত ৪ এপ্রিল এই তাপমাত্রার সঙ্গে কালবৈশাখী ঝড় হওয়ায় দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান শুকিয়ে চিটা হয়ে গেছে।

দেশের বোরো ধানের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার হঠাৎ এমন অচেনা এক দুর্যোগে (গরম বাতাস) পুড়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান। একই দশা গোপালগঞ্জেরও কয়েকটি উপজেলায়।

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, গরম বাতাসে তিন জেলায় অন্তত ৪২ হাজার হেক্টর বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত এর সঠিক কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না কৃষিবিজ্ঞানীরা। কৃষকদের স্বপ্ন তছনছ করে দেয়া এই দুর্যোগকে কৃষিবিদদের কেউ বলছেন ‘হিট শক’, কেউ বলছেন ‘লু হাওয়া’।

আর আবহাওয়াবিদদের দাবি, বাংলাদেশে এখন যে তাপমাত্রা তাতে লু হাওয়া বয়ে যাওয়ার মতো কোনো অবস্থা নেই।

এরপর পর্যবেক্ষণ ও ক্ষতির কারণ পরিদর্শনকালে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, অধিকাংশ জমির ধান কাইচ থোড় থেকে ফুল আসা পর্যায়ে রয়েছে। যেসব জমির ধান ঝড়ের দিন ফুল ফোটা অবস্থায় ছিল তার কিছু কিছু জমির ৫-১০ শতাংশ শীষ প্রথমে সাদা ও পরে কালো হয়ে চিটায় পরিণত হয়। সবেমাত্র বের হওয়া শীষ উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সংবেদনশীল থাকে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, উচ্চ তাপের সঙ্গে যদি কালবৈশাখী হয় তবে এমন সমস্যা হতে পারে। এর জন্য তারা কিছু করণীয় ঠিক করেছে কৃষকদের জন্য। তাপদাহ বা কালবৈশাখী থেকে ধানকে বাঁচাতে হলে, বোরো ধানের যে সব জাত ফুল ফোটা পর্যায়ে আছে বা এখন ফুল ফুটছে বা সামনে ফুল ফুটবে সেসব জমিতে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখতে হবে। ধানের শীষের দানা শক্ত না হওয়া পর্যন্ত জমিতে অবশ্যই দুই থেকে তিন ইঞ্চি দাঁড়ানো পানি ধরে রাখতে হবে।

তাদের হিসাবে রোববারের কালবৈশাখী ও গরম বাতাসে নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকা এবং গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ জেলাসহ কিছু অঞ্চলে বোরো আবাদের ন্যূনতম ৫ শতাংশ (ধানগাছ) মরে গেছে।

আর যে পরামর্শ

ঝড়ের কারণে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া বা ব্যাকটেরিয়াজনিত লালচে রেখা রোগের আক্রমণ হতে পারে। ধানে ফুল আসা পর্যায়ে রয়েছে এমন আক্রান্ত জমিতে ৬০ গ্রাম এমওপি, ৬০ গ্রাম থিওভিট ও ২০ গ্রাম দস্তা সার ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে বিকেলে স্প্রে করতে হবে। তবে ধানে থোড় অবস্থায় থাকলে বিঘা প্রতি অতিরিক্ত ৫ কেজি পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করলে ভাল ফলন পাওয়া যেতে পারে।

বোরো ধানের এই পর্যায়ে নেক ব্লাস্ট ও শীষ ব্লাস্ট রোগের ব্যাপক আক্রমণ হতে পারে। শীষ ব্লাস্ট রোগ হলে পরে দমন করার সুযোগ থাকে না। তাই ধানের জমিতে রোগ হোক বা না হোক, থোড় ফেটে শীষ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একবার এবং পাঁচ-সাতদিন পর আরেকবার প্রতি বিঘা জমিতে ৫৪ গ্রাম টুপার ৭৫ ডব্লিওপি অথবা ৩৩ গ্রাম নাটিভো অথবা ট্রাইসাইক্লাজল গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ৬৭ লিটার পানিতে ভালোভাবে মিশিয়ে শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে।

জমিতে বাদামী ঘাসফড়িং আক্রমণ হতে পারে উল্লেখ করে ধান গবেষণা ইনস্টিটিটিউট বলেছে, আক্রমণ প্রবণ এলাকায় কীটনাশক যেমন মিপসিন ৭৫ ডব্লিও, প্লিনাম ৫০ ডব্লিও, একতারা ২৫ ডব্লিও, এডমায়ার ২০ এসএল, সানমেক্টিন ১.৮ ইসি, এসাটাফ ৭৫ এসপিও, প্লাটিনাম ২০ এসপিও অথবা অনুমোদিত কীটনাশক এ মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।

শেয়ার করুন

লকডাউনে তরমুজ নিয়ে বিপাকে ব্যবসায়ীরা

লকডাউনে তরমুজ নিয়ে বিপাকে ব্যবসায়ীরা

মাগুরা সদর উপজেলার ফল ব্যবসায়ী হাসেম আলীর আক্ষেপ লকডাউনে তরমুজের বেচাবিক্রি হচ্ছে না। ছবি: নিউজবাংলা

তরমুজ কেনাবেচায় হঠাৎ ভাটার টানে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, গরম যত পড়বে তত তরমুজের চাহিদা বাড়তে থাকে। কিন্তু শনিবারে লকডাউন ঘোষণার পর থেকে বিক্রি শূন্যের কোঠায়।

‘লকডাউনে বাজারে মানুষ আসতিছে না। এই ভরা গরমে যেইখানে তরমুজ বিক্রি কইরে ফুরায় যায়, সেইখানে গত দুদিন হাজিরাই উঠিনি। এ রকম চললি পুঁজি হারাতি হবে। ব্যবসা লাটে উঠবে।’

আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন মাগুরা সদর উপজেলার ইছাখাদা বাজারে ফল ব্যবসায়ী হাসেম আলী।

তিনি জানান, মোট ৫০ হাজার টাকার তরমুজ এই মৌসুমে এনেছেন। প্রতিবছরের মতো এবারও ভেবেছিলেন তরমুজ বিক্রি করে কিছুটা লাভের মুখ দেখবেন। কিন্তু লকডাউনে বেচাবিক্রি একেবারে নেই।

সদরের ইটখোলা বাজারের প্রধান সড়কের পাশে তরমুজ বিক্রি করছিলেন মজনুর মোল্লা। তিনি বলেন, ‘লকডাউনে আবার ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। শনিবার এক লক্ষ টাকার তরমুজ আনছি বরিশাল থেকে। ভাবলাম গরম পড়িছে ভালো বিক্রি হবে। এখন মানুষ থাকলিউ কেউ পয়সা খরচ করছেন না।’

তরমুজ কেনাবেচায় হঠাৎ ভাটার টানে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, গরম যত পড়বে তত তরমুজের চাহিদা বাড়তে থাকে। কিন্তু শনিবার লকডাউন ঘোষণার পর থেকে বিক্রি শূন্যের কোঠায়। এভাবে কদিন চললে সব তরমুজ নষ্ট হয়ে যাবে।

খুচরা বিক্রেতাদের পাশাপাশি পণ্য নিয়ে বিপাকে পড়েছেন পাইকাররাও। শহরের জামরুল তলায় তরমুজের পাইকারি ব্যবসায়ী সোহান। তিনি বলেন, ‘বরিশাল ও কুষ্টিয়া থেকে শনিবার দুই ট্রাক তরমুজ এনেছি। আড়াই লাখ টাকার তরমুজের অধিকাংশ গুদামে পড়ে আছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা তরমুজ অল্প পরিমাণে নিলেও তাদের বিক্রি থেমে গেছে। এখন মৌসুমের শুরুতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি।’

তরমুজ কিনতে আসা সখিনা খাতুন বলেন, ‘বাড়ি মনিরা তরমুজ খাবি। তাই কিনতে আইছি। এখন দেখি তরমুজ নরম হয়ে গেছে। এই তরমুজ খাতি তিতা লাগবি বলে কিনতে চাইছি না।’

তরমুজ ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্যমতে, এবার ছোট সাইজের তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। বড় সাইজের হলে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বিক্রি করছেন তারা। তবে যদি কালো জাতের তরমুজ হয় তবে তার দাম পিসপ্রতি ১০ টাকা বাড়তি।

তরমুজ আড়তের মালিক বাবুল ফকির বলেন, দাম কমিয়ে ধরলেও তরমুজ কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ক্রেতারা। লকডাউনে শখ করে কিছু কেনার প্রবণতা কমে গেছে।

জেলা ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তা মামুন হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘তরমুজ বিক্রি গত সপ্তাহে ভালো ছিল। আমি বিভিন্ন বাজারে দেখেছি ব্যবসায়ীরা তরমুজ ভালো দামে বিক্রি করছেন। সেখানে ক্রেতারা অভিযোগ করছিল দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে। সে বিষয়ে আমরা ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করেছি ক্রেতাদের কাছে অল্প লাভে মৌসুমি ফল তরমুজ বিক্রি করেন।’

শেয়ার করুন

হাওরে নতুন দুর্যোগে দিশেহারা কৃষক

হাওরে নতুন দুর্যোগে দিশেহারা কৃষক

গরম বাতাসে পুড়ে গেছে তিন জেলার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান। ছবি: নিউজবাংলা

এর সঠিক কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না কৃষিবিজ্ঞানীরা। তবে কেউ কেউ বলছেন ‘লু হাওয়া’ তথা গরম বাতাসের কারণে এমনটি হয়েছে। যদিও আবহাওয়াবিদদের দাবি, বাংলাদেশে এখন যে তাপমাত্রা তাতে লু হাওয়া বয়ে যাওয়ার মতো কোনো অবস্থা নেই।

দেশের বোরো ধানের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার কৃষকদের মাথায় হাত। হঠাৎ অচেনা এক দুর্যোগ ‘গরম বাতাসে’ এসে এলোমেলো করে দিয়েছে সব। পুড়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান। একই দশা গোপালগঞ্জেরও কয়েকটি উপজেলায়।

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, গরম বাতাসে তিন জেলায় অন্তত ৪২ হাজার হেক্টর বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত এর সঠিক কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না কৃষিবিজ্ঞানীরা। কৃষকদের স্বপ্ন তছনছ করে দেয়া এই দুর্যোগকে কৃষিবিদদের কেউ বলছেন ‘হিট শক’, কেউ বলছেন ‘লু হাওয়া’। আর আবহাওয়াবিদদের দাবি, বাংলাদেশে এখন যে তাপমাত্রা তাতে লু হাওয়া বয়ে যাওয়ার মতো কোনো অবস্থা নেই।

নেত্রকোণা

জেলাটিতে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা।

চলতি বোরো মৌসুমে নেত্রকোণার ১০ উপজেলায় ১ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। আবহাওয়া পরিস্থিতি এত দিন চমৎকার থাকলেও রোববার হানা দেয় অচেনা বিপত্তি।

সেদিন সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ কালবৈশাখির দমকা বাতাস বয়ে যায় জেলার ওপর দিয়ে। এই বাতাস শুরুর কিছু সময় পর বইছিল গরম বাতাস। এই প্রথম তখন ১০ থেকে ১৫ মিনিট নাগাদ বয়ে যাওয়া গরম বাতাসে ফুল অবস্থায় থাকা জমির পুরোটাই শুকিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।

জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই কমবেশি ক্ষতি হয়েছে। তবে মদন, খালিয়াজুরী ও কেন্দুয়া উপজেলায় বেশি ক্ষতি হয়েছে।

মদনে ৪ হাজার হেক্টর, কেন্দুয়ায় ২ হাজার ৭০০ হেক্টর ও খালিয়াজুরী উপজেলায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ফসল পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, প্রাথমিকভাবে ১৪ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১১৬ কোটির বেশি টাকা।

ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কয়েকজন কৃষক জানান, তারা ঋণ করে ফসল করছেন। হাওরাঞ্চলে একটাই ফসল হয়। এখন ঋণ পরিশোধ হবে কীভাবে, আর কীভাবে সংসার চলবে, সেটি বুঝে উঠতে পারছেন না তারা।

মদন উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আব্দুর রহমান বলেন, ‘জীবনে এইরম গরম বাতাস দেখছি না। অক্করে আগুনের লুক্কার মতো গরম। ঝড় কইম্যা গেলে ঘরতে বাইর অয়া দেহি পুড়ার গন্ধ। পয়লা বুঝতে পারছি না। বেইন অক্ত (সকালে) হাওরে গেয়া দেহি, ধানের ভিতরে যে চাউল অয় হেইডা অক্করে ঝইরা পুইড়া গেছে।’

কেন্দুয়া উপজেলা রোয়াইলবাড়ি ইউনিয়নের কইলাটি গ্রামের কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, ‘রাইতে যে হাওয়াডা অইছে এইডায় জমি পুইরা গেছেগা। আমার ২৫ কাঠা জমির ধান শেষ অইয়া গেছে।’

খালিয়াজুরী উপজেলার আদমপুর বোয়ালবাড়ি গ্রামের কৃষক বাবলু চৌধুরী এবার ৮ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। তার অর্ধেক জমির ফসলই নষ্ট হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘ভাটি অঞ্চলে একডাই ফসিল অয়। ঋণ ফিন কইরা বোরো করছিলাম। সব গেছেগা। অহন আমরা কী খাইয়া বাঁচব।’

মোহনগঞ্জ উপজেলার বানিহারি গ্রামের কৃষক আইন উদ্দিন বলেন, ‘কী কষ্ট কইরা রেনাদেনা কইরা একডাই ফসিল করলাম। সব নষ্ট অইয়া গেছে। কিবায় চলাম?’

কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় গরম বাতাসে মাঠের পর মাঠ ধান পুড়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে। ছবি: নিউজবাংলা

কিশোরগঞ্জ

গরম বাতাসের প্রভাবে গত রোববার কিশোরগঞ্জে হাজার হাজার একর জমির বোরো ধান পুড়ে গেছে।

জেলার ১৩টি উপজেলার হাওরে মাত্র ১০ মিনিটের গরম বাতাসে প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমির ধান পুড়ে গেছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২০০ কোটি টাকার মতো।

জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, বোরো ধানের জমি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে ৩ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমির। আর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২২ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমির ধান।

কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার রায়টুটী ইউনিয়নের কৃষক পালন মিয়া। এই চাষি ধান আবাদ করেছিলেন ছয় একর জমিতে। আশা করছিলেন ধান পাবেন কমছে কম চার শ মণ। কিন্তু সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। মাত্র ১০ মিনিটের গরম বাতাসে নষ্ট হয়েছে কৃষক পালন মিয়ার জমির ফসল।

রায়টুটী এলাকার তলার হাওরে ১২ একর জমি আবাদ করেছিলেন কৃষক আ. হেকিম। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গত বছর ধানের দাম বেশি ফাইছি, হের লাইগ্যা এইবার আরও বেশি কইরে জমি করছি। জমির মইধ্যে ফসলও অইছিন বালা। কিন্তু গত রাইতেই ১০ মিনিডের একটা গরম বাতাসে সব পুইড়ে ছারকার কইরে দিসে। আমার সত্তর বছর বয়সে এই যাইত্তে বাতাস আমি জীবনেও দেখছি না। সহালে ঘুমেত্তে উইট্টে জমিতে গিয়া দেহি সব শেষ।

কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি কৃষি বিভাগকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছি। তালিকা হাতে পেলে সহায়তা চেয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখিত পাঠানো হবে।’

গোপালগঞ্জের অনেক ধান মাঠেরও একই একই অবস্থা। ছবি: নিউজবাংলা

গোপালগঞ্জ

গরম বাতাসে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে গোপালগঞ্জের বোরোচাষিরাও। জেলা কৃষি বিভাগ ক্ষতির পরিমাণ এখনও সুনির্দিষ্ট করতে না পারলেও তাদের ধারণা অন্তত হাজার- বারো শ হেক্টর জমির ধান পুড়ে গেছে।

জেলার কৃষি বিভাগ বলছে, অন্তত ১০টি ইউনিয়নে এই হাওয়ার প্রভাব দেখা গেছে। হঠাৎ করে এ ধরনের ঘটনায় একদিকে যেমন কৃষকেরা হতবাক অন্যদিকে, এর জুতসই কারণ খুঁজে পাচ্ছে না কৃষি বিভাগ।

এর আগে এ ধরনের ঘটনা কোথাও ঘটেছে কি না কারও জানা নেই। যে কারণে গোপালগঞ্জ কৃষি অফিস থেকে বিষয়টির ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য ফরিদপুরের ভাঙ্গায় অবস্থিত ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের আহ্বান জানিয়েছে।

গত রোববার রাতে ৩০ মিনিটের মতো জেলার বিভিন্ন এলাকায় গরম বাতাস বয়ে যায়। আর এতে ক্ষেতে উঠতি বোরো ধান যেগুলেতে কেবল ধানের শিষ (দুধ) এসেছে সেই ধান সব চিটায় পরিণত হয়ে সাদা বর্ণ ধারণ করে। আর এতে জেলার শত শত কৃষক কয়েক কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে কোটালীপাড়া উপজেলার কান্দি, পিঞ্জুরী, হিরণ ও আমতলী ইউনিয়ন, টুঙ্গিপাড়া উপজেলার গোপালপুর, ডুমুরিয়া, পাটগাতি ও বর্নি ইউনিয়ন, কাশিয়ানীর রাতইল ইউনিয়ন, সদর উপজেলার লতিফপুর ইউনিয়নের শ শ হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে।

কৃষকেরা আগামী বছর কী খেয়ে বাচঁবে তা নিয়ে তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। রোববার বিকেলেও কৃষকেরা তাদের ধান ক্ষেতে সবুজ দেখে আসলেও সকালে জমির আলে গিয়ে দেখেন সব ধান সাদা হয়ে গেছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি। কীভাবে কী হলো।

জেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, এ বছর গোপালগঞ্জ জেলায় ৭৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এর এক দল বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার পুড়ে যাওয়া বিভিন্ন জমি পরিদর্শন করেন। এই দলে ছিলেন ইনস্টিটিউটের ড. মো. নজরুল বারী, মোহাম্মদ আসিক ইকবাল খান, ড. মো. সাজ্জাদুর রহমান।

কেন্দুয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একেএম শাহজাহান কবীর জানান, বিজ্ঞানী দলের সদস্যরা মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন করেছেন। তারা উপজেলার তাম্বুলিপাড়া, গোগ এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে যান। সেখানে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরে ধানের ফুল ও দুধ অবস্থায় তাপ প্রবাহের দরুণ ‘হিট শক’ হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছেন দলের সদস্যরা ।

নেত্রকোণায় গরম বাতাসে পুড়ে যাওয়া ধান মাঠ পরিদর্শনে যান কৃষি বিজ্ঞানীরা। ছবি: নিউজবাংলা

তিনি আরও জানান, এ অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে বারির পরিদর্শন টিমের সদস্যরা দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তাদের পরামর্শ, যেসব ধান এখনও শীষ বের হয়নি অর্থাৎ বুটিং ও হেডিং স্টেজ এ আছে, সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে। তাই এই স্টেজে থাকা ধানের ক্ষেতগুলোতে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখা এবং ম্যাজিক স্প্রে (১০ লিটার পানিতে ৬০ গ্রাম এমওপি সার, ৬০ গ্রাম থিওভিট ও ২০ গ্রাম চিলেটেড জিংক) জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। এতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকা ধানগাছগুলো কিছুটা শক কাটিয়ে উঠতে পারবে।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ছাইফুল আলম বলেন, ‘বৃষ্টিবিহীন ঝড়ো বাতাসে এই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হাওরের ধানের গাছগুলো এখন মিল্কিং স্টেজে (দুধ অবস্থায়) আছে। এই সময়ে প্রায় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম বাতাসে ধান পুড়ে চিটা হয়ে গেছে।’

গরম বাতাস তথা ‘লু হাওয়ার’ কারণেই এসব ধান নষ্ট হয়েছে বলে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিদের বরাতে জানিয়েছেন গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. অরবিন্দ কুমার রায়।

তিনি বলেন, ‘জেলার টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া এবং কাশিয়ানীতে এক রাতের মধ্যে শত শত হেক্টর জমির ধান সবুজ থেকে সাদা হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে ধানের শিষ (দুধ অবস্থায়)। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন লু হাওয়া বা গরম বাতাসের কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।’

মঙ্গলবার ধান গবেষণা ইনিস্টিটিউটের ভাঙ্গা (ব্রি) এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. একলাচুর রহমান, বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফরিদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মনোজিৎ কুমার মল্লিক, গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. অরবিন্দ কুমার রায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন।

তারা জানান, গরম বাতাসের কারণে যেসব ধান কেবল দুধ অবস্থায় বা ফ্লাওয়ারিং অবস্থায় রয়েছে সেসব ধানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা কৃষকদের ধান গাছে পানি দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাতে যেসব ধান ফ্লাওয়ারিং অবস্থায় রয়েছে সেগুলো বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।

শেয়ার করুন

পুরোদমে চালু জিকে সেচ পাম্প

পুরোদমে চালু জিকে সেচ পাম্প

গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের প্রধান খাল। ছবি: নিউজবাংলা

পদ্মায় পানি স্বল্পতার কারণে জিকে সেচ প্রকল্পের পানি সরবরাহ ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় শূন্যে নেমে যায়। এরপর এক সপ্তাহ বন্ধ ছিল সেচ সুবিধা। পানি সরবরাহ বাড়ায় মঙ্গলবার সরবরাহ সর্বোচ্চ ১৪.৫ মিটার আরএলে পৌঁছায়।

পদ্মায় পানি স্বল্পতার কারণে সরবরাহ শূনে্য নামার পর আবার পুরোদমে চালু হয়েছে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প।

দেশের বৃহত্তম এ সেচ প্রকল্পের পানি সরবরাহ ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় শূন্যে নেমে আসে। এরপর এক সপ্তাহ বন্ধ ছিল সেচ সুবিধা।

প্রকৌশলীরা ২ এপ্রিল সকাল ১০টা থেকে স্বল্পমাত্রায় পাম্প চালু করেন। শূন্য থেকে ধীরে ধীরে পানি সরবরাহ ১৩.২৫ মিটার আরএল (রিডিউসড লেভেল) পর্যন্ত হয়।

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পাম্প হাউজের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকে ডিসচার্জ চ্যানেলে ১৪.৫ মিটার আরএল পানি সরবরাহ হচ্ছে। এটিই সর্বোচ্চ সরবরাহ। এই লেভেলে পানি গেলে প্রকল্পের প্রধান খাল থেকে সব শাখা এবং প্রশাখার শেষপর্যন্ত পানি পাবে কৃষক।

পদ্মা নদী থেকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় চ্যানেলের মাধ্যমে পানি এনে পাম্পের মাধ্যমে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলার কৃষকদের জন্য সরবরাহ করা হয় এই প্রকল্পের মাধ্যমে।

প্রকৌশলী মিজানুর আরও জানান, ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় কালবৈশাখী ঝড়ে একটি পাম্প বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেটি ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় চালু করা গেছে।

যৌথ নদী কমিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ এখন গ্যারান্টিযুক্ত ৩৫ হাজার কিউসেক (প্রতি সেকেন্ড ১ ঘনফুট) পানি পাচ্ছে। ১ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পাবে বাংলাদেশ। গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি অনুযায়ী, আগের ১১ দিন ভারত ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি নিয়েছে। সে সময় বাংলাদেশ পেয়েছিল ২৩ হাজার ৫৪৪ কিউসেক পানি।

পাবনায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাইড্রোলজি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহেদুল ইসলাম জানান, ৫ এপ্রিল হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি পাওয়া গেছে ৩৫ হাজার ৯৪৬ কিউসেক।

কুষ্টিয়া অঞ্চলের চার জেলায় কৃষি জমিতে সেচ সুবিধার জন্য জিকে প্রকল্পের পাম্প দুটি গত ১৫ ও ১৭ জানুয়ারি চালু করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় বোরো মৌসুমে এবার কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও ঝিনাইদহে ১৯৪ কিলোমিটার প্রধান খালের মাধ্যমে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়।

পাম্প আবার চালু হওয়ায় খুশি কৃষকরা। কুষ্টিয়া সদরের সোনাইডাঙ্গা গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘ক্যানেলে পানি আইছে। আস্তে আস্তে বাড়ছে। পানি থাকলে বোরো ধান বাঁচানো যাবে।’

শেয়ার করুন

গরম বাতাসে নষ্ট শত শত হেক্টর জমির ধান

গরম বাতাসে নষ্ট শত শত হেক্টর জমির ধান

গরম বাতাসে নষ্ট হয়ে গেছে শত শত হেক্টর জমির ধান। ছবি: নিউজবাংলা

আকস্মিক বয়ে যাওয়া গরম বাতাসের তোড়ে কিশোরগঞ্জ ও গোপালগঞ্জের চার উপজেলাতে পুড়ে গেছে বিপুল পরিমাণ খেতের ফসল। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, এ দেশে লু হাওয়া বয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

কিশোরগঞ্জের ইটনা এবং গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া ও কাশিয়ানীতে রোববার সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টার মধ্যে হঠাৎ করে গরম বাতাস প্রবাহিত হওয়ায় শত শত হেক্টর জমির ফসল পুড়ে গেছে। স্থানীয়রা এটিকে ‘লু হাওয়া’ বলে অভিহিত করলেও আবহাওয়া দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, দেশে লু হাওয়া বয়ে যাওয়ার কোনো নজির এখন পর্যন্ত নেই। তাছাড়া বাংলাদেশের আবহাওয়ায় লু হাওয়া বয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা নয়।

কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার রায়টুটী ইউনিয়নের কৃষক পালন মিয়া। এই চাষি ধান আবাদ করেছিলেন ছয় একর জমিতে। আশা করছিলেন ধান পাবেন কমছে কম চার শ মণ। কিন্তু সেই স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। মাত্র ১০ মিনিটের গরম বাতাসে নষ্ট হয়েছে কৃষক পালন মিয়ার জমির ফসল।

রোববার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়ে শেষ হয় রাত ১১টার দিকে। ঝড় শুরুর কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ শুরু হয় গরম বাতাস। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাওরের ধান।

কৃষক পালন মিয়া নিউজবাংলাকে জানান, বছরের একমাত্র ফসল ধান চাষের ওপর নির্ভর করেই সারা বছর চলে তার পরিবার। কিন্তু এইবার সব শেষ হয়ে গেছে।

রায়টুটী এলাকার তলার হাওরে ১২ একর জমি আবাদ করেছিলেন কৃষক আ. হেকিম। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গতবছর ধানের দাম বেশি ফাইছি, হের লাইগ্যা এইবার আরো বেশি কইরে জমি করছি। জমির মইধ্যে ফসলও অইছিন বালা। কিন্তু গত রাইতেই ১০ মিনিডের একটা গরম বাতাসে সব পুইড়ে ছারকার কইরে দিসে। আমার সত্তর বছর বয়সে এই যাইত্তে বাতাস আমি জীবনেও দেখছি না। সহালে ঘুমেত্তে উইট্টে জমিতে গিয়া দেহি সব শেষ।

‘ঋণ কইরে জমি করছিলাম। অহন পুলাপান লইয়াই কেমনে চলমু আর ঋণ কেমনে পরিশোধ করমু এই চিন্তায় আর বালা লাগতাছে না।’

একই এলাকার কৃষক মতি মিয়া বলেন, ‘গতকাইল বিহালেও জমির ফসল দেইখ্যা মনডার মাঝে আনন্দ আছিন। সকালে জমিত গিয়া ফসলের এই অবস্থাডা দেইখ্যা কইলজাডা ফাইট্টে গেছেগা। জমিতে আর যাইতাম না নিয়ত করছিলাম। অহন আফনেরা আইছুইন হের লাইগ্যা জমিডার ক্ষতিডি দেহাইতাম আইছি। আমরার আর যাওয়ার জায়গা নাই। এই করোনার মাইঝে অহন তো ডাহা গিয়াও কিস্তা কইরে খাইতাম ফারতাম না।’

জেলার ১৩টি উপজেলার হাওরে মাত্র ১০ মিনিটের গরম বাতাসে প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমির ধান পুড়ে গেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বোরো ধানের জমি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে তিন হাজার ৪২৫ হেক্টর জমির। আর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২২ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমির ধান।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ছাইফুল আলম জানান, বৃষ্টিবিহীন ঝড়ো বাতাসে এই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হাওরের ধানের গাছগুলো এখন মিল্কিং স্টেজে (দুধ অবস্থায়) আছে। এই সময়ে প্রায় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম বাতাসে ধান পুড়ে চিটা হয়ে গেছে।

কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি কৃষি বিভাগকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছি। তালিকা হাতে পেলে সহায়তা চেয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখিত পাঠানো হবে।’

ধানের ক্ষেত নষ্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া ও কাশিয়ানীতে। এক রাতের মধ্যে শত শত হেক্টর জমির ধান সবুজ থেকে সাদা বর্ণ ধারণ করেছে। কৃষি বিভাগ বলছে, লু হাওয়ার কারণে চাষিরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কোটালীপাড়া উপজেলার ওপর দিয়ে গরম হাওয়া বয়ে যায়। এতে উপজেলার কান্দি, পিঞ্জুরী, হিরণ ও আমতলী ইউনিয়নের প্রায় ছয় থেকে সাত শ হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

পূর্ণবর্তী গ্রামের কৃষক ওলিউল্লাহ হাওলাদার বলেন, ‘আমি এবার ১৭ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছি। গতকাল বিকেলে অধিকাংশ জমিই ঘুরে দেখেছি। সব জমির ধান ভালো ছিল। আজ সকালে ক্ষেতে গিয়ে দেখি সব ধান নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু আমার জমির ধানই নয়, পুরো পূর্ণবর্তী গ্রামের দক্ষিণ পাশের সমস্ত বিলের ধান নষ্ট হয়ে গেছে।’

আমতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হান্নান শেখ বলেন, ‘সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আমার সঙ্গে প্রায় অর্ধশত কৃষকের কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, আমতলী ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া বিলে তাদের জমির ধান এক রাতেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফসল নষ্ট হওয়ায় কৃষকের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।

উপজেলা কৃষি অফিসার নিটুল রায় বলেন, গরম বাতাসে ধানের শীষগুলো শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। প্রাথমিক ভাবে আমরা প্রায় ছয় থেকে সাত শ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার খবর পেয়েছি। এতে কৃষকদের প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হবে। তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। সে বিষয়ে আমরা মাঠে কাজ করছি।’

টুঙ্গিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন বলেন, সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। জমিতে গিয়ে দেখি ধানগুলো সাদা বর্ণ ধারণ করেছে।

তিনি আরো বলেন, এ বছর টুঙ্গিপাড়ায় আট হাজার ছয়শ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতির কাজ চলছে।

গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. অরবিন্দ কুমার রায় বলেন, ‘গরম বাতাসে জেলার টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী ও সদর উপজেলার বোরো ধানের বেশ ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে নেমেছে। বিষয়টি ধান গবেষণা ইনিস্টিটিউটকে জানানো হয়েছে। তারা মাঠ পরিদর্শনে নেমেছেন।’

বাংলাদেশে লু হাওয়ার সুযোগ নেই

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান নিউজবাংলাকে বলেন, বাংলাদেশে এখন যে তাপমাত্রা রয়েছে, তাতে লু হাওয়া বয়ে যাওয়ার মতো কোনো অবস্থা নেই।

তিনি বলেন, লু হাওয়া বা গরম বাতাস বয়ে যেতে হলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হতে হবে। দেশে এখন পর্যন্ত লু হাওয়া বয়ে যাওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। এগুলো হলে ছোট এলাকায় হয়, স্থানীয়ভাবে। তবে তাপমাত্রা বেশি থাকলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। এখন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস আবার গত দুইদিন ঝড় বৃষ্টি হয়েছে। তাই এটা সম্ভব না।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আরেক আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, রোববার গোপালগঞ্জের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। এমন ঘটনা তাদের কাছে এখন পর্যন্ত কেউ জানায়নি। কিশোরগঞ্জ ও গোপালগঞ্জ দুই এলাকাতেই গতকাল বাতাস ছিল।

বাংলাদেশে এমন ঘটনা এর আগে হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে এখনও এমন পাইনি। তবে দেশের বাইরে অস্ট্রেলিয়া বা ক্যালিফোর্নিয়াতে এমন শুনে থাকি।’

শেয়ার করুন

গুটি ঝরা নিয়ে দুশ্চিন্তায় চাষিরা

গুটি ঝরা নিয়ে দুশ্চিন্তায় চাষিরা

গাছ থেকে ঝরে যাচ্ছে গুটি। ছবি: নিউজবাংলা

‘খরা চলছে। এই খরা যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে আমের ক্ষতি হবে। সম্ভাব্য এই ক্ষতি ঠেকাতে সেচ দেয়ার বিকল্প নাই। যাদের সেচ দেয়ার সুযোগ নেই, তারা যদি গাছে সাদা স্প্রে করে, তাতেও কিছুটা সুফল মিলবে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গাছে গাছে এখন আমের গুটি।

চলতি মৌসুমে জেলায় আমের ফলন কেমন হবে, তা নির্ভর করছে এই গুটি টেকার ওপর। আমের গুটি ঝরে যায় মূলত মাটিতে রসের অভাব হলে।

আম বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থাৎ মার্চ-এপ্রিলে বৃষ্টিপাত কম হলে দেখা দেয় এই সংকট।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, উত্তরের এই জেলায় সবশেষ বৃষ্টিপাত হয়েছে ৯ অক্টোবর। অর্থাৎ প্রায় ছয় মাস দেখা নেই বৃষ্টির। খরার কারণে বিপাকে আমচাষিরা।

গাছ থেকে ঝরে যাচ্ছে গুটি। ক্ষতি মোকাবিলায় বাগানিদের দেয়া হচ্ছে সেচ দেয়ার পরামর্শ।

সরকারি হিসাবে, জেলার ৫ উপজেলায় আমবাগান রয়েছে ৩৪ হাজার ৭৩৮ হেক্টর জমিতে। এসব বাগানে গাছের সংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ ৬৫ হাজার।

বিভিন্ন বাগান ঘুরে দেখা গেছে, মুকুল থেকে গুটি আসার প্রক্রিয়া আছে শেষ পর্যায়ে। মটরদানা থেকে মারবেল আকার ধারণ করছে গুটি। কোনো কোনো গাছে ছোট ছোট আম দৃশ্যমান।

যারা বাগানে সেচ দিয়েছেন, তাদের গাছ থেকে গুটি ঝরেছে কম। মহারাজপুর উপজেলার আমবাগানের মালিক সোহাগ মিয়া জানান, বাগানে এবার মুকুল ভালোই এসেছে, গুটিও এসেছে।

এখন এই গুটির কতটি টিকে শেষ পর্যন্ত, তার ওপরই নির্ভর করবে আমের উৎপাদন।

এখন একটা বৃষ্টির খুবই দরকার, বৃষ্টি হলে আমের গুটি ঝরে পড়বে না, বোঁটা শক্ত হবে। আর বড়ও হবে দ্রুত।

সদরের বাগানমালিক আব্দুল হামিদ জানান, খরার কারণে বেশ কয়েকবার বাগানে সেচ দিয়েছেন। তারপরও খুব বেশি কাজে আসেনি। গুটি ঝরে পড়েছে। আসলে আকাশের পানি না হলে সেচ দিয়ে কত পারা যায়। পানি হলেই আমের গুটি দ্রুত বড় হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জমির উদ্দীন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গাছে গাছে ফ্রুট সেটের প্রক্রিয়া অর্থাৎ গুটি আসার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। অনেক গাছে ছোট ছোট আমও দৃশ্যমান।

‘খরা চলছে। এই খরা যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে আমের ক্ষতি হবে। সম্ভাব্য এই ক্ষতি ঠেকাতে সেচ দেয়ার বিকল্প নাই। যাদের সেচ দেয়ার সুযোগ নেই, তারা যদি গাছে সাদা স্প্রে করে, তাতেও কিছুটা সুফল মিলবে।’

শেয়ার করুন